কবি শ্যামানন্দ পুরী - এর নাম ছিল দুঃখী কৃষ্ণদাস। তিনি জন্মগ্রহণ করেন উত্কলদেশের দণ্ডকেশ্বরের অন্তর্গত ধারেন্দাবাহাদুরপুরে। পিতা শ্রীকৃষ্ণ মণ্ডল ও মাতা দুরিকা দেবী। তাঁরা জাতিতে সদগোপ ছিলেন।
শ্যামানন্দ পিতামাতার মৃতাবশিষ্ট পুত্র অর্থাৎ একমাত্র জীবিত সন্তান ছিলেন। তাই তাঁর নাম রাখা হয় “দুঃখী”। তিনি অল্প বয়সেই ব্যাকরণাদি শাস্ত্রে পারদর্শী হয়েছিলেন। কৃষ্ণ-বিরহে ব্যাকুল হয়ে অল্প বয়সেই তিনি তীর্থ পর্যটনে বেরিয়ে পড়েন। প্রথমে অম্বিকানগরে গৌরীদাস পণ্ডিত স্থাপিত গৌরনিতাই যুগল বিগ্রহ দেখে প্রেমে অভিভূত হয়ে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে হৃদয়চৈতন্য ঠাকুরের নিকটে দীক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর তিনি গুরুদেবের অনুমতি নিয়ে তীর্থ ভ্রমণে বেরিয়ে বৃন্দাবনে এসে শ্রীজীব গোস্বামীর আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি শ্রীনিবাস ও নরোত্তমের সঙ্গে ভক্তিগ্রন্থ অধ্যয়ন করেন এবং অল্পকালের মধ্যেই মহা শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত হন। ক্রমে তিনি সাধনার মার্গে এগিয়ে গিয়ে সিদ্ধিলাভ করেন।
শ্রীজীব গোস্বামীই “দুঃখী কৃষ্ণদাসের” নাম “শ্যামানন্দ পুরী” রাখেন।
শ্রীবল্লভপুরে শ্রীগোবিন্দ-বিগ্রহ স্থাপন - পাতার উপরে . . . শ্যামানন্দ শ্রীবল্লভপুরে শ্রীগোবিন্দ-বিগ্রহ স্থাপন করেন। তিনি শ্রীজীবের আজ্ঞানুসারে ১৫০৪ শকাব্দে (১৫৮২ খৃষ্টাব্দ) শ্রীনিবাস আচার্য ও নরোত্তম ঠাকুরের সঙ্গে গৌড়ে চলে আসেন এবং সেখান থেকে উত্কলের নৃসিংহপুরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। তিনি সেখানে বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং শেষ জীবন সাধন-ভজন করে কাটান। তাঁর প্রধান শিষ্যদের মধ্যে ছিলেন রসিকানন্দ ও মুরারী।
কৃষ্ণদাস কবিরাজের মৃত্যু ও বীর হাম্বীর - পাতার উপরে . . . শ্যামানন্দ পুরী ওরফে দুঃখী কৃষ্ণদাস, শ্রীনিবাস আচার্য ও নরোত্তম ঠাকুরের সঙ্গে মিলে, বৃন্দাবন থেকে, শ্রীজীব ও ষট্ গোস্বামীদের রচিত বহু গ্রন্থ সহ কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত নিয়ে গৌড়ে আসার পথে, বনবিষ্ণুপুরের কাছে, সেখানকার মল্লরাজ বীর হাম্বীরের পোষ্য ডাকাতদল, সেই বাক্সে মূল্যবান দ্রব্য রয়েছে ভেবে, তা লুঠ করে। এই সংবাদ বৃন্দাবনে পৌঁছানোর পরে কৃষ্ণদাস কবিরাজ মর্মাহত হয়ে জলে ডুবে প্রাণ বিসর্জন দেন। এই বৈষ্ণবগ্রন্থের লুঠের ঘটনা প্রবাহের ফলে মল্লরাজ বীর হাম্বীর বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন এবং একজন বৈষ্ণব পদকর্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
শ্যামানন্দের রচনাবলী - শ্যামানন্দের রচনার মধ্যে রয়েছে “অদ্বৈততত্ত্ব”, “উপাসনা-সারসংগ্রহ” এবং “বৃন্দাবন-পরিক্রম”।
শ্যামানন্দ ও দুখী কৃষ্ণদাস ভণিতা - পাতার উপরে . . . শ্যামানন্দের রচনায় “দুঃখী কৃষ্ণদাস” এবং “শ্যামানন্দ” দুটি ভণিতার পদই পাওয়া গিয়েছে। জগবন্ধু ভদ্রর মতে ‘দুঃখী কৃষ্ণদাস’ ভণিতাযুক্ত পদগুলি শ্যামানন্দ পুরী রচিত। তবে সব ‘দুঃখী কৃষ্ণদাস’ ভণিতাযুক্ত পদ তাঁরই কিনা তা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে, কারণ বহু বৈষ্ণব পদকর্তাগণ নিজের নামের সঙ্গে নানা প্রকারের দীনতাব্যঞ্জক বিশেষণ ব্যবহার করে থাকেন।
একাধিক কৃষ্ণদাস - পাতার উপরে . . . আমরা মিনলসাগরে যে দশ রকম “কৃষ্ণদাস” ভণিতার কবির পদ সংগ্রহ করতে পেয়েছি তা হলো “কৃষ্ণদাস”, “কৃষ্ণদাস কবিরাজ”, “দীন কৃষ্ণদাস”, “দীন দুখী কৃষ্ণদাস”, “দীন হীন কৃষ্ণদাস”, “দুখী কৃষ্ণদাস”, “কবি কৃষ্ণদাস”, “কবিকর্মী কৃষ্ণদাস”, “শ্রীকৃষ্ণদাস” এবং “কৃষ্ণদাসানুদাস”। এর সঙ্গে রয়েছে দুখী কৃষ্ণদাসের, রূপগোস্বামী দ্বারা নতুন নামকরণের পর রচিত “শ্যামানন্দ” ভণিতার পদাবলী।
আমরা মিলনসাগরে কবি শ্যামানন্দের বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"পাতার উপরে . . . বৈষ্ণব পদাবলীর পদগুলি মূলত গান হিসেবেই রচনা করা হোতো। প্রায় প্রতিটি পদের শুরুতেই সেই পদটির “রাগ”-এর উল্লেখ থাকে। তবে কিছু পদের আগে তার “রাগ”-এর উল্লেখ নেই এমনও পাওয়া গিয়েছে। বৈষ্ণব পদাবলীর সংকলকগণ যখন তাঁদের সংকলনে পদ সাজান, তখন পর পর একাধিক গানের যদি একই সুর বা রাগ থাকে, তাহলে তাঁরা প্রথম গানটিতে তার রাগ উল্লেখ ক’রে পরের গানটিতে রাগের যায়গায় “তথা রাগ” বা “যথা” শব্দ বসিয়ে দিতেন, এই বোঝাতে যে পরের গানটি একই রাগাশ্রিত। কিন্ত এমনও পাওয়া গিয়েছে যে একই গান বিভিন্ন সংকলকের সংকলনে ভিন্ন রাগাশ্রিত বলে উল্লেখিত। বহু পদই মুখে মুখে গীত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। তাই একই গান বিভিন্ন গায়কের মুখে ভিন্ন ভিন্ন সুরে পাওয়া গিয়ে থাকতেই পারে। তাই অনেক বিদগ্ধজনেরা মনে করেন যে এখন আর পদের রাগের উল্লেখ না করলেও চলে। যে যেমন সুরে চায়, গেয়ে আনন্দ লাভ করলেই এর সার্থকতা। আমরা অবশ্য যে সংকলন থেকে যে পদ নিয়েছি, সেই সংকলনে উল্লেখিত রাগটি মিলনসাগরের পাতায় তুলে দিয়েছি। এমন হতে পারে বিশেষজ্ঞরা অন্য সংকলনে সেই গানটির অন্য রাগ দেখতে পাবেন।
রূপ গোস্বামী দ্বারা সংগৃহীত, বিরোচিত ও পঞ্চদশ শতকে প্রকাশিত, প্রাচীন বৈষ্ণব এবং শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য- মহাপ্রভুর স্বকৃত শ্লোকসম্বলিত, ১৮৮২ সালে রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন দ্বারা অনুদিত, গ্রন্থ “পদ্যাবলী”।
বৃন্দাদন দাস দ্বারা ষোড়শ শতকে বিরচিত, অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী সম্পাদিত, “শ্রীচৈতন্যভাগবত”, ১৯১৫।
নিত্যানন্দ দাস দ্বারা ১৬০০ সালে বিরচিত, বাবু যশোদালাল তালুকদার প্রকাশিত, “শ্রীপ্রেমবিলাস”, ১৯১৩।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ দ্বারা ১৬১৫ সালে বিরচিত, জগদীশ্বর গুপ্ত দ্বারা সরল টীকা ও ব্যাখ্যা সহিত সম্পাদিত, “শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত”, ১৮৮৯।
রামগোপাল দাস (গোপাল দাস) দ্বারা ১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন "শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”।
পীতাম্বর দাস দ্বারা সপ্তদশ শতকে সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন "অষ্টরস-ব্যাখ্যা ও রসমঞ্জরী”।
বিশ্বনাথ চক্রবর্তী (হরিবল্লভ দাস) দ্বারা আনুমানিক ১৭০০ সালে সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯২৪ সালে, রাধানাথ কাবাসী দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীক্ষণদা-গীতচিন্তামণি”।
নরহরি চক্রবর্তী (ঘনশ্যাম) দ্বারা আনুমানিক ১৭২৫ সালে সংকলিত ও বিরচিত এবং ৪৬২ গৌরাব্দে (১৯৪৯), হরিদাস দাস দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীগীতচন্দ্রোদয় (পূর্বরাগ)”।
রাধামোহন ঠাকুর (রাধামোহন দাস) দ্বারা আনুমানিক ১৭২৫ সালে সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৮৭৮ সালে, রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “পদামৃত সমুদ্র”।
গোকুলানন্দ সেন (বৈষ্ণবদাস) দ্বারা আনুমানিক ১৭৫০ সালে সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯১৫-১৯৩১ সময়কালে, সতীশচন্দ্র রায় দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু”, ৫ খণ্ডে, সটীক সংস্করণ, ১৯১৫-১৯৩১। প্রথম সংস্করণ ১৮৯৬।
দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায় সংরক্ষিত ১৩৮১টি পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত।
কবির একটি ছবি ও তাঁর জীবন সম্বন্ধে আরও তথ্য যদি কেউ আমাদের পাঠান তাহলে আমরা, আমাদের কৃতজ্ঞতাস্পরূপ প্রেরকের নাম এই পাতায় উল্লেখ করবো। আমাদের ঠিকানা - srimilansengupta@yahoo.co.in