কবি মাধব আচার্য্যের বৈষ্ণব পদাবলী
*
*
আমার সুন্দর নায়, যে বা আসি দেয় পায়
কবি দ্বিজ মাধব
আনুমানিক ১৮৭০ সাল নাগাদ চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংগৃহীত এবং তাঁর পুত্র রাজেন্দ্রনাথ
বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা ১৯২২ সালে প্রকাশিত “শ্রীশ্রীপদামৃতসিন্ধু”, ৮৪-পৃষ্ঠা।

॥ শ্রীরাগ॥

আমার সুন্দর নায়, যে বা আসি দেয় পায়, হাসিয়া গণয়ে ষোল পোণ।
তোমরা ত তরুণী নিতম্ব কুচ, অতি গুরু উচ্চ এক নায়ে ভরা তিন জন॥
লক্ষের পসরা তোর, নায়ে পার হবে মোর, ইহাতে পাইব আমি কি।
আপন বুঝিয়া বলহ, পিছে যেন নহে কলহ, শোন সব গোয়ালার ঝি॥
তুমি ত যুবক মেয়ে, আমিত যুবক নেয়ে, হাস্য পরিহাসে গেল দিন।
ওকূলে মানুষ ডাকে, খেয়া কামাই মিছে পাকে, এক্ষণ হৈত খেয়া তিন॥
এখন একবোল বলুক রাই, আগে দেয় কিছু খাই, না বাহিতে গায় হউক বল।
দ্বিজ মাধব কয়, রসিক যাদব রায়, নায় কর স্বকাজ সফল॥

ই পদটি সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “পদামৃত লহরী”, ৬৩-পৃষ্ঠায় এই
রূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ রাগিণী সুহই - তাল একতালা॥
গোপীদের কথা শুনিয়া শ্রীকৃষ্ণ (নাবিক) বলিতেছেন।

আমার সুন্দর না, যেবা আসি দিবে পা, হাসিয়া গণয়ে ষোল পোণা।
এ তব নিতম্ব কুচ, অতি গুরুতর উচ, এক নায়ে ভরা তিন জনা॥
লাখের পসরা তোর, নায়ে পার হবে মোর, ইহাতে পাইব আমি কি।
এখনি বুঝিয়া বল, পাছে যেন নহে কল, এই জীবিকায় আমি জী॥
শুন বিনোদিনী রাই, আগে দেও কিছু খাই, না’ বাহিতে গায়ে ইউক বল।
এখন একবোল বলুক রাই, আগে দেয় কিছু খাই, না বাহিতে গায় হউক বল।
এ দ্বিজ মাধবে কয়, রসিক অতিশয়, পাছে মিছে হইবে সকল॥

ভাবার্থ -
নাবিক রূপে শ্রীকৃষ্ণ বলিতেছেন--- আমাকে কি দিবে আগে বল, পাছে যেন গোলমাল না হয়। দেখি আমার
না’খানি কেমন সুন্দর। আর এক কথা আগে কিছু দাও, খাইলে পরেই নৌকা বাহিতে শক্তি হইবে ইত্যাদি।
--- সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, “পদামৃত লহরী”॥

ই পদটি আনুমানিক পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে ষোড়ষ শতকের প্রারম্ভকালে, মাধবাচার্য বা দ্বিজ
মাধব দ্বারা রচিত, কলকাতার ভবানীচরণ দত্তের ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী কার্যালয় থেকে, ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে
(ফেব্রয়ারী ১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত, “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থের, ৭৫-পৃষ্ঠায় এই রূপে
দেওয়া রয়েছে।

নৌকা খণ্ড
॥ বরাড়ী রাগ॥

আমার সুন্দর না।
যেবা আসি দেয় পা॥
হাসিয়া গণয়ে ষোল পণ।
তোমার নিতম্ব কুচ,                                অতি গুরুতর উচ,
এক নায়ের ভরা দশ জন॥
হেদেলো গোআলার,                                      মায়্যা বুঝিল,
বড়ই তুমি ঢাঁট।
দান ফুরাইয়া,                                      হেদেলো গোয়ালিনি,
নাএ চড়সিয়া ঝাট॥
লাখের পসরা তোর,                             নাএ পার হবে মোর,
ইহাতে পাইব আর কি।
বুঝিয়া উচিত বল,                                পিছে যেন নহে ফল,
এই জীবিকায় আমি জী॥
তুমিত যুবতী মায়্যা,                             আমিত যুবক নায়্যা,
হাস পরিহাসে গেল দিন।
ও পারে মানুষ ডাকে,                         খেয়া নিয়া মিছা পাকে,
এতক্ষণে হৈত ভরা তিন॥
খীর নুনী দুগ্ধ দই,                                আগে আন কিছু খাই,
নৌকা বাহিতে হইক বল।
দ্বিজ মাধবে কয়,                                      রসিক যাদবরায়,
মিছা পাকে হারাবে সকল॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সর্ব্ব শুভোদয় হইল পরম শোভন
কবি দ্বিজ মাধব
আনুমানিক ১৮৭০ সাল নাগাদ চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংগৃহীত এবং তাঁর পুত্র
রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা ১৯২২ সালে প্রকাশিত “শ্রীশ্রীপদামৃতসিন্ধু”, ১-পৃষ্ঠা।

.         মঙ্গলাচরণ।
.        ॥ শ্রীরাগ॥

সর্ব্ব শুভোদয় হইল পরম শোভন।
প্রসন্ন সকল দিক গ্রহতারাগণ॥
নদ নদী সরোবর সকল নির্ম্মল।
সরস হইল তরু প্রসন্ন অনল॥
জয় জয় যদুসিংহ করিল প্রকাশ।
কোটী কোটী চন্দ্র জিনি প্রসন্ন আকাশ॥
মাসি ভাদ্রপাদ রাশি সিংহ সুলক্ষণ।
অসিত অষ্টমী তিথি রোহিণী সলক্ষণ॥
দ্বিতীয় প্রহর রাত্রি অতি ঘোরময়।
গভীর নিনাদ অতি পয়োদ উদয়॥
স্বর্গেতে দুন্দুভি বাজে গন্ধর্ব্বেতে গায়।
সিদ্ধগণ স্তব করে অপ্সরা নাচয়॥
সুরগণ আনন্দেতে কুসুম বরিষে।
দ্বিজ মাধব কহে মনের হরিষে॥

ই পদটি আনুমানিক পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে ষোড়ষ শতকের প্রারম্ভকালে,
মাধবাচার্য বা দ্বিজ মাধব দ্বারা রচিত, কলকাতার ভবানীচরণ দত্তের ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী
কার্যালয় থেকে, ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী ১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত ও
প্রকাশিত, “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থ, ১৫-পৃষ্ঠা।

.           মঙ্গলাচরণ।
.        ॥ মহারট্টী রাগ॥

সর্ব্ব শুভকর কাল পরম শোভন।
প্রসন্ন শুভ রাশি গ্রহ তারাগণ॥
নদ নদী সরোবর সলিল নির্ম্মল।
প্রসন্ন সকল দিগ প্রসন্ন অনল॥
জয় জয় যদুবীর করিল প্রকাশ।
কোটি কোটি চন্দ্র যেন উদয় আকাশ॥
মাসি ভাদ্রপদে রাশি মহেশবাহন।
অসিত অষ্টমী রোহিণী শুভক্ষণ॥
দ্বিতীয় প্রহর নিশি অতি ঘোরচয়।
গম্ভীর নিনাদ ঘন পয়োদ-উদয়॥
কংস বংশ বীণা বেণী ঝাঝরি মুহুরি।
মৃদঙ্গ পণব কপিনাস সুমাধুরী॥
শঙ্খ দুন্দুভি বাদ্য পরমহরিষে।
উল্লসিত সুরকুল কুসুম বরিষে॥
হরল সকল তাপ এ মহীমণ্ডল।
প্রেমে আমোদ করে পুণ্য পরিমল॥
কলিযুগে চৈতন্য সেই অবতার।
দ্বিজ মাধব কহে কিঙ্কর তাহার॥

.             *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দেখ ভাই আগম নিগমে
কবি দ্বিজ মাধব দাস
আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস (গোকুলানন্দ সেন) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত
শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের (১৯২৭ সাল) ৩য় খণ্ড, ৪র্থ শাখা, ২৩শ পল্লব, শ্রীচৈতন্য-
নিত্যানন্দের রূপ-গুণ-বর্ণন, পদসংখ্যা ২৩৩৯।

॥ তথারাগ॥ (গান্ধার)

দেখ ভাই আগম নিগমে।
চৈতন্য নিতাই বিনু                                    দয়ার ঠাকুর নাই
পাপী লোকে তাহা নাহি মানে॥ ধ্রু॥
সত্য ত্রেতা দ্বাপর                                      সর্ব্ব যুগের ঈশ্বর
ধ্যান যজ্ঞ পূজা প্রকাশিলা।
সেই বৃন্দাবন-চাঁদ                                       ধরি নটবর-ছাঁদ
সে যুগে গোপীরে প্রেম দিলা॥
যে’জন গোকুল নাথ                             কংস কেশী কৈল পাত
যারে কহে যশোদা-কুমার।
সে জন গোকুল ছাড়ি                                  নবদ্বিপে অবতরি
পাতকীরে করিলা উদ্ধার॥
তাহার অগ্রজ নাম                                  রোহিণী-নন্দন রাম
আর যত পারিষদ মেলে।
নিজ-নাম-প্রেম-গুণে                                  পতিত চণ্ডাল জনে
ভাসাইল প্রেম-আঁখি-জলে॥
যে মূঢ় পণ্ডিত-মানি                                পড়ুয়া তার্কিক জানি
পূরবে অসুর হৈয়াছিল।
দ্বিজ মাধব দাসে বলে                                সেই অপরাধ-ফলে
এ যুগে বঞ্চিত বুঝি হৈল॥

ই পদটি ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত, জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত ও মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, পদাবলী
সংকলন “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী”, ১৯৩৪, ৮-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে। জগবন্ধু ভদ্র জানিয়েছেন যে,
ইতিহাসবিদ ও বৈষ্ণব সাহিত্যের খ্যাতনামা পণ্ডিত, অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির মতে গৌরপদ-
তরঙ্গিণীতে উদ্ধৃত দ্বিজমাধব ভণিতাযুক্ত “দেখ ভাই আগম নিগমে” পদটির রচয়িতা কালিদাস মিশ্রের পুত্র
মাধব বা মাধবাচার্য্যই।

॥ সুহই॥

দেখ ভাই আগম নিগমে।
চৈতন্য নিতাই বিনে                                   দয়ার ঠাকুর নাই
পাপী লোকে তাহা নাহি জানে॥ ধ্রু॥
সত্য ত্রেতা দ্বাপর                                      সত্যযুগের ঈশ্বর
ধ্যান যজ্ঞ পূজা প্রকাশিলা।
সেই বৃন্দাবন চাঁদ                                      ধরি নটবর ছাঁদ
সে যুগে গোপীরে প্রেম দিলা॥
সে জন গোকুল নাথ                            কংস কেশী কৈলা পাত
যারে কহে যশোদাকুমার।
নবদ্বিপে অবতরি                                  সেই হৈল গৌর হরি
পাতকীরে করিতে উদ্ধার॥
তাহার অগ্রজ নাম                                    রোহিণীনন্দন রাম
আর যত পারিষদ মিলে।
নিজনাম প্রেমগুণে                                     পতিত চণ্ডাল জনে
ভাসাইলা প্রেম আঁখি জলে॥
যে মূঢ় পণ্ডিত মানি                                পড়ুয়া তার্কিক জানি
পূরবে অসুর হৈয়া ছিল।
দ্বিজ মাধব দাসে বলে                                সেই অপরাধ-ফলে
এ যুগে বঞ্চিত বুঝি হৈল॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
হেনমনে মায়া পাতিয়া গোবিন্দাই
ভণিতা দ্বিজ মাধব
কবি মাধব আচার্য্য
দ্বিজ মাধব বা মাধবাচার্য রচিত শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের “উদ্ধব শ্রীকৃষ্ণে সংবাদ” পদ। এই
পদটির শেষ দুটি পংক্তি, আনুমানিক অষ্টাদশ শতকে রচিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে
অনুলিখিত (একাধিক বার), দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, বিশ্বভারতীর  গ্রন্থশালায়
সংরক্ষিত ১৩৮১টি পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থের”, ৪৭০-পৃষ্ঠায় দেওয়া “এই সব রূপে
সারিসারি গোপনারী” (নীচে দেওয়া) পদের শেষ দুই পংক্তির সঙ্গে মিলে যায়! প্রশ্ন জাগে
যে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলের রচয়িতা দ্বিজ মাধব আর শ্রীপদমেরুগ্রন্থের সংকলক দ্বিজ মাধব কি
একই ব্যক্তি ? আমরা এই পদটিকেও একটি স্বতন্ত্র পদ হিসেবে রাখছি।

উদ্ধব শ্রীকৃষ্ণে সংবাদ।

হেনমনে মায়া পাতিয়া গোবিন্দাই।
দেখিয়া উদ্ধব মনে চিন্তিলা তথাই॥
ত্রিদশের নাথ প্রভু সংসারের সার।
ভারাবতরণে কৃষ্ণ পৃথিবীউদ্ধার॥
ব্রহ্মশাপ মনে চিন্তি মায়া ত পাতিয়া।
পৃথিবী ছাড়িব হেন মনেতে চিন্তিয়া॥
নিজ দাস করি মোরে বলে সর্ব্বজনে।
কপট করিয়া মোরে বল নারায়ণে॥
এত বলি উদ্ধব কৃষ্ণের পাশে গিয়া।
কান্দিতে কান্দিতে বলেন চরণে ধরিয়া॥
উদ্ধব ক্রন্দন শুনি শ্রীমধুসূদন।
হাসিতে হাসিতে বলে মধুর বচন॥
চিন্তিয়া চৈতন্যচন্দ্রে-চরণকমল।
দ্বিজ মাধব কহে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল॥

ই পদটি আনুমানিক অষ্টাদশ শতকে রচিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত
(একাধিক বার), দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায় সংরক্ষিত ১৩৮১টি
পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”, ৪৭০-পৃষ্ঠায় এই রূপে রয়েছে।

.        ॥ রাগিণী তাল॥

এই সব রূপে সারিসারি গোপনারী।
হেরি লাজ ভয় হরিপদ অনুসারী॥
ছিদ্রাঙ্ক ধ্বনি বেণু দূতী প্রায় হয়ে।
লয়ে যায় আগেআগে পথ দেখাইয়ে॥
কিবা সে চান্দের সারি সারি চলি জায়।
কিবা সে বিজুরিমূর্তি মতি হৈল তায়॥
কিবা পঙ্কজের বন লাবণ্য বলায়।
ভাসি ভাসি চলি জায় হেন মনে লয়॥
কিবা কনকের সব পুথলি চলিল।
কিবা চম্পকের মাল্য হয় বা জানিল॥
কিবা কুমুদিনী সব কামের পাথারে।
ভাসি ভাসি আসি পড়ে চান্দের সাগরে॥
এই রূপে সকল কামিনী এক কালে।
আসিয়া মিলিল শীঘ্র শ্রীরাম গোপালে॥
সভারে করুণা দিঠে চাহে ভগবান।
সভে চায় মহাপ্রভু রামের বয়ান॥
চন্দ্রকান্ত মণি জেন ইন্দুমুখী পেয়ে।
পুরিতে লাগিল দেখ একত্তর হয়ে॥
রসের সাওরে মত্ত হল বলদেবা।
রসিক নাগরী নিত্য পদে করে সেবা॥
রোমহর্ষ হইয়ে সে আর্ঘ্য নিবেদিলা।
শ্রমজল পাদ্য দিয়া সম্মুখে দাড়াইলা॥
অধর নৈবিদ্য দিয়া রহে বিদ্যমান।
ভোগ নিবেদিয়া জেন করয়ে ধেয়ান॥
এইরূপে পরমানন্দ মহোত্সব।
তা দেখিয়া সুরগণ বধূ মিলি সব॥
পুষ্পবৃষ্টি করে সব কেহু নাচে গায়।
মহা মহা যোগী মুনিগণ স্তুতি বেদ গায়॥
চিন্তিয়া চৈতন্যচান্দের চরণকমল।
দ্বিজমাধব কহে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
গোপীর বচন শুনিয়া যদুরায়
ভণিতা - মাধাই
কবি মাধব আচার্য্য
আনুমানিক চারশো বছর পূর্ব্বে, মাধবাচার্য বা দ্বিজ মাধব দ্বারা রচিত শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্য,
১১১৮ বঙ্গাব্দে (১৭১১ সালে) লেখা শেষ করা পুথি থেকে, কলকাতার ভবানীচরণ দত্তের
ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী কার্যালয় থেকে, ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী ১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী
দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত গ্রন্থের, ৭৩-পৃষ্ঠা।

॥ জাকুড়ি পঠমঞ্জরী রাগ॥

গোপীর বচন শুনিয়া যদুরায়।
দেহ লো শৃঙ্গার রাধে আর নাহি দায়॥
তোমার রূপ যৌবন বড়ই মোহন।
ভাঙ্গিয়া কহিল কথা না যায় খণ্ডন॥
চলল সুন্দরী রাই পসার  ফেলাই।
করিব মদনকেলি বৃন্দাবনে যাই॥
আঁচলে বান্ধিয়া কুচ চাপে দুই করে।
ঘন ঘন চুম্ব দেই মুখের উপরে॥
কমলে ভ্রমর যেন লাগে জড়াজড়ি।
আই আই করিয়া ডাকেন বড়াইবুড়ী॥
চারিভিতে সখীগণ করে কাণাকাণি।
দেখিতে আসিতে লাজ না ধরে পরাণী॥
রাধাকানুর ধামালী দেখিয়া সব সখী।
নয়নে বসন দিয়া ঘন হাস্য মুখী॥
কেহ কেহ পসার লইয়া দূরে যায়।
রাধিকার কাছে থাকি দেখে যদুরায়॥
দেখিয়া নাগর হরি হরষিত মন।
ধাই ধাই ঠাই ঠাই করে জনে জন॥
ঘৃত ঘোল দুদ্ধ পিল ক্ষীর দধি খায়।
ছেনা নুনি লইয়া ফেলিয়া মারে গায়॥
উচ কুচ লুড়ে কার চুম্ব দেই মুখে।
কারো হার বসন কাড়িয়া লেই সুখে॥
রাধিকা বলেন কানু নহিও উতরোল।
ছাড়হ আঁচল হের শুন মোর বোল॥
দিবসে বিদায় দেহ সভে ঘরে যাই।
করিব মদনকেলি রচিল মাধাই॥

.             *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
এইরূপে সর্ব্ব গোপী ধাইল তুরিতে
ভণিতা - শ্রীমাধব
কবি মাধবাচার্য্য বা দ্বিজমাধব
আনুমানিক চারশো বছর পূর্ব্বে, মাধবাচার্য বা দ্বিজ মাধব দ্বারা রচিত শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্য,
১১১৮ বঙ্গাব্দে (১৭১১ খৃষ্টাব্দে) লেখা শেষ করা পুথি থেকে, কলকাতার ভবানীচরণ দত্তের
ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী কার্যালয় থেকে, ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী ১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী
দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত গ্রন্থের, ৯৫-পৃষ্ঠা।

অথ গোপীদিগের শ্রীকৃষ্ণ নিকটে আগমন।
.        ॥ পয়ার॥

এইরূপে সর্ব্ব গোপী ধাইল তুরিতে।
বাপ ভাই বন্ধু কেহ নারে নিবারিতে॥
কেহ কেহ আছিল মন্দির অভ্যন্তরে।
বাহির হইতে দেখিলেন পতি দ্বারে॥
চাপিয়া ধরিল রামা অনেক যতনে।
পথ না পাইয়া তবে সেই গোপীগণে॥
বিরহ অনলে পুড়ি গেল অমঙ্গল।
ধ্যানেতে পাইল কৃষ্ণ ত্যজি কলেবর॥
যার তার করি সেবা করয়ে ধেয়ানে।
সেই সেই গতি পায় বেদের বচনে॥
কাম ক্রোধ ভয় স্নেহ এ চারি প্রকার।
ভাবিলে প্রভুরে পায় তরয়ে সংসার॥
যেন তেন মতে মাত্র করুক স্মরণ।
অনায়াসে পায় তবু সে চরণ ধন॥
আর যত গোপিনী আইল বৃন্দাবনে।
দেখিয়া নাগর কানু রহিল জীবনে॥
বেড়িল গৌরাঙ্গী সব যশোদানন্দনে।
বিদ্যুতের মালা যেন মেঘ সন্নিধানে॥
দেখিয়া কামিনীঠাট নন্দের নন্দন।
মনে মনে কৌতুক চিন্তিল ততক্ষণ॥
বুঝিব এখন সব গোপিকার মতি।
মম প্রতি কার কেমন আছয়ে পিরীতি॥
এতেক চিন্তিয়া হরি দেখিয়া গোপিনী।
হাসিয়া হাসিয়া কহে কপটিয়া বাণী॥
তুমি সব কুলবতী এ ভোর যুবতী।
এ ঘোর যামিনী বনে বহু পশু ভীতি॥
কোন বা প্রমাদ ব্রজে কিবা রাজভয়।
আগমন কোন হেতু কহল নিশ্চয়॥
চল চল গোপীগণ যাহত আগারে।
এ নিশি আমার সঙ্গে নহে ব্যবহারে॥
যদি বা বলহ দরশন যে কারণ।
মনোরথ হৈল সিদ্ধি দেখিলে কানন॥
আর বা কেমন কার্য্য আছয়ে সাধন।
কেন গুণবতী এথা করেছ গমন॥
তোমা লাগি সবন্ধু বান্ধব বাপ ভাই।
খুঁজিয়া বিকল হৈয়া ভ্রমে ঠাঞি ঠাঞি॥
দুগ্ধের বালক বস্ত ফুকরে মন্দিরে।
তাহার দোহন পান করাহ সত্বরে॥
পতি পরিহরিলে পাতক বড় হয়।
ইহলোক পরলোক তরিবে সেবায়॥
স্বপ্নেহ না করিবে পরপতি আশ।
গান শ্রীমাধব রঙ্গে বঞ্চে পীতবাস॥

.             *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আজি নহে কালি নহে জানি বাপ পিতামহে
ভণিতা - মাধব
কবি মাধব আচার্য
১৯৬১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “পাঁচশত বত্সরের পদাবলী”, ১৫৮-পৃষ্ঠা। পদটি
তিনি নিয়েছিলেন মাধবাচার্যের শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের ৭২-পৃষ্ঠা থেকে। এই পদটি ১৯৬১ সালে প্রকাশিত,
বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য”, ৪৬১-পৃষ্ঠায় একই রূপে দেওয়া
রয়েছে।


আজি নহে কালি নহে                                জানি বাপ পিতামহে
গোকুল নগরে নহে ঘাটী।
ঘৃত নবনীত দধি                                        বেচি নিয়া নিরবধি
আজি তুমি কর মিছা হঠি॥
নিলাজ কানু পথ ছাড়, না কর বিরোধে।
বুঝিল তোমায় তিলেক নাহি বোধে॥
পাটে কংস নটবর                                       অতি বড় খরতর
তারেও তোমার নাহি ডর।

*        *        *        *        *        *        *

কি তোরে করিব ক্রোধ                                যশোদার অনুরোধ
সহিল সকল কুবচন।
যদি বল আর বার                                     উচিত পাইবে তার
মাধবের স্বরূপ বচন॥

ই পদটি আনুমানিক চারশো বছর পূর্ব্বে রচিত, মাধবাচার্য বা দ্বিজ মাধব দ্বারা রচিত, কলকাতার
ভবানীচরণ দত্তের ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী কার্যালয় থেকে, ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী ১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী
দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত, “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” কাব্য গ্রন্থের ৭১-পৃষ্ঠায় “মাধব” ভণিতা -য় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ পাহিড়া রাগ॥

আজি নহে কালি নহে,                                 জানি বাপ পিতামহে
গোকুল নগরে নহে ঘাটী।
ঘৃত নবনীত দধি,                                        বেচি নিয়া নিরবধি,
আজি তুমি কর মিছা হঠি॥
নিলাজ কানু পথ ছাড় না কর বিরোধে।
বুঝিল তোমায় তিলেক নাহি বোধে॥ ধ্রু॥
পাটে কংস নটবর,                                        অতি বড় খরতর,
তারেও তোমার নাহি ডর।
আমি আঞানের রাণী,                                   যদি কহি এই বাণী,
মজিবে নন্দের গাবী ঘর॥
কি তোরে করিব ক্রোধ,                                যশোদার অনুরোধ,
সহিল সকল কুবচন।
যদি বল আর বার,                                     উচিত পাইবে তার,
মাধবের সরস বচন॥

.             *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একদিন কৈল মনে ভোজন করিব বনে
ভণিতা - মাধব আচার্য
কবি মাধব আচার্য
আনুমানিক পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে ষোড়ষ শতকের প্রারম্ভকালে, মাধবাচার্য বা দ্বিজ মাধব দ্বারা
রচিত, কলকাতার ভবানীচরণ দত্তের ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী কার্যালয় থেকে, ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী
১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত, “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” কাব্য গ্রন্থের ৪২-পৃষ্ঠায় “মাধবাচার্য্য”
ভণিতাযুক্ত এই পদটি দেওয়া রয়েছে।

অথ অঘাসুর-বধ।

একদিন কৈল মনে,                                ভোজন করিব বনে,
উঠিয়া প্রত্যূষে বিহানে।
বেণু করে কল্পি হরি,                                শিশুগণ সঙ্গে করি,
বত্স লৈয়া গেল তব বনে॥
লক্ষ লক্ষ শিশুগণ,                                      লম বয় বিভূষণ,
শিঙ্গা বাঁশী বিষাণ কাড়িয়া।
সহস্রেক নহে ত্রুটী,                              লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি,
চলে শিশু গোধন লইয়া॥
কৃষ্ণ বত্স রাখে যত,                              ব্রহ্মা বা গণিবে কত,
লিখিতে কে পারে তার অন্ত।
বত্স হৃত ছল ধরি,                                    সকল একত্র করি,
বত্স রাখে করিয়া আনন্দ॥
বিবিধ বালক লীলা,                                    বহুমত শিশু খেলা,
বহুভাতি খেলে শিশুগণ।
প্রবাল কুসুম ফল,                                         বনধাতু নবদল,
করে শিশু অঙ্গের সাজন॥
কেহ শিক্যা করে ছুরি,                             কেহ ফেলে দূর করি,
পুন দেই হাসিয়া হাসিয়া।
কৃষ্ণ যদি দূরে খেলে,                                ধেয়ে সব শিশু চলে,
পুন আসে কৃষ্ণ পরশিয়া॥
আমি পরশিনু আগে,                                তুমি পরশিলে তবে,
এইরূপ আনন্দে বিহরে।
কেহ শিঙ্গা বাঁশী ধরে,                                পক্ষশব্দ কেহ করে,
কেহ কেহ নানামত করে॥
কেহ দেখি পক্ষছায়া,                               তার সঙ্গে চলে ধায়্যা,
হংস দেখি হংসের গমন।
বক দেখি বক মত,                                কেব রহে ধ্যানে কত,
কেহ ধরে ময়ূর-পেখম॥
বানরের লেজ ধরি,                                  কেহ টানাটানি করি,
বানরে টানিয়া ফেলে গাছে।
বানর আকার ধরে,                                 তেমতি ভ্রুকুটী করে,
লাফে লাফে যায় তার কাছে॥
ভেকের আকার ধরি,                                যায় নদী জল তরি,
শব্দ যে করয়ে উচ্চ করি।
নিজ প্রতিধ্বনি শুনি,                                বলে শিশু নানা বাণী,
গালি দেয় ধর মার করি॥
জন্ম কোটি কোটি ধরি,                                নানা পরবন্ধ করি,
কৃষ্ণ লৈয়া খেলে শিশুগণ।
দেখি ব্রহ্মজ্ঞানী সব,                                   ব্রহ্মাণ্ডের অনুভব,
সাক্ষাতেত তাহার সদন॥
ভক্তজন প্রেম-সুখ,                                    ইষ্টদেব দেখি রূপ,
সাক্ষাতে দেখয়ে মূর্ত্তিমান্।
মায়ান্বিত নরলোকে,                                সাক্ষাতে মনুষ্যরূপে,
দেখি হরি আনন্দ বিধান॥
লক্ষ কোটি জন্ম ধরি,                                  চিত্ত নিরূপণ করি,
তপযোগ সাধন করিয়া।
যার এক পদরেণু,                                   না লভে যোগেন্দ্র মনু,
খেলে শিশু হেন কৃষ্ণ লৈয়া॥
কি ভাগ্য বর্ণিব তার,                                হেন কৃষ্ণ সখা যার,
ধন্য ব্রজবাসী গোপগণ।
এইরূপে শিশু মিলি,                                বিবিধ কৌতুকে খেলি,
দৈত্য আদি করিলা নিধন॥
অঘাসুর নাম তার,                                   মহা দৈত্য ঘোরতর,
কৃষ্ণলীলা দেখিতে না পারে।
সুরগণ সুরপুরে,                                        চমকিত যায় ডরে,
নিরন্তর চিন্তিত অন্তরে॥
কংসের আরতি পায়ে,                             অঘাসুর আইল ধায়ে,
আজি কৃষ্ণ বধিব সঘনে।
পূতনা ভগিনী মারে,                                জ্যেষ্ঠ ভাই বকাসুরে,
এই কৃষ্ণে মারিলা আপনে॥
ভাই ভগিনীর ধার,                                     আইলাম শুধিবার,
বত্সশিশু করিব নিধনে।
তর্পণ করিব যদি,                                    সাধিব সকল সিদ্ধি,
ব্রজবাসী মারিব সঘনে॥
পুত্রগত প্রাণ যার,                                     পুত্রদেহ প্রাণ তার,
পুত্র বিনে না রহে জীবন।
বত্স শিশু যত হরি,                                যদি মারিবারে পারি,
তবেতে মারিব গোপগণ॥
এই মনে যুক্তি করি,                                   সর্প-কলেবর ধরি,
যোজনেক হইল বিস্তার।
প্রহরের পথ জুড়ি,                                    রহিলেক মুখ মেলি,
যেন মহা পর্ব্বত আকার॥
বত্স বালকের সঙ্গে,                                কৃষ্ণেরে গিলিব রঙ্গে,
এই আশা দুষ্টমতি করে।
এক ওষ্ঠ পৃথিবীতে,                                আর ওষ্ঠ আকাশেতে,
গিরি-গুহা বদন ভিতরে॥
বিকট দশনপাঁতি,                                   পর্ব্বত-শিখর-ভাতি,
উদরভিতর অন্ধকার।
রসনা পথেতে পাড়ি,                                 সঘনে নিশ্বাস ছাড়ি,
যেন মুখ গহ্বর সঞ্চার॥
দেখি গোপ-শিশুগণে,                                  অপরূপ বৃন্দাবনে,
দৃষ্টান্ত করিয়া কথা কয়।
কহ দেখি মিত্রগণ,                                   গিলিবারে করি মন,
কেবা এই মহাপ্রাণী হয়॥
মুখখান দেখি যেন,                                  রবিজাল রাজা হেন,
বিকশিয়া রহে ঠোঁটখান।
ভূমিতলে দেখি হেন,                                ঠোঁট রহে একখান।
হয় নয় কর অনুমান॥
দন্তগুলা দেখি যেন,                                   পর্ব্বতের শৃঙ্গ হেন,
ভিতরে দেখিয়া অন্ধকার।
খরতর বহে বাত,                                    নাকের নিশ্বাস পাত,
দেখি হেন জন্তু দুরাচার॥
আছে দুষ্ট ওষ্ঠ মিলে,                                যদি সভাকারে গিলে,
তবু নাহি করিব তরাশ।
ইথে তয় না করিব,                                এ পথ দিয়া না যাইব,
বক মত হইবেক নাশ॥
এতেক বচন বলি,                                     দিয়া ঘন করতালি,
হাসে কৃষ্ণ-মুখ নিরখিয়া।
নিজ নিজ বত্স লৈয়া,                                প্রবেশ করিল গিয়া,
কেহ নাহি বুঝে তার মায়া॥
শিশুগণ না জানিয়া,                                   চলিল আনন্দ হৈয়া,
চিন্তে প্রভু এই মনেমন।
বত্স শিশু না মরিবে,                                দৈত্য সংহার হইবে,
হেন বুঝি করিব এখন॥
অঘাসুর মহাবলী,                                   কৃষ্ণ সংহারিব বলি,
নাহি গেল করিয়া সন্ধান।
কৃষ্ণ তবে প্রবেশিল,                                   উদর ভিতর যাইল,
তবেত চাপিল মুখখান॥
নকলে অভয়দাতা,                                   অখিল ব্রহ্মাণ্ডপিতা,
মনে মনে চিন্তিলা শ্রীহরি।
দৈত্যের হরিব প্রাণ,                                    বত্সশিশু-পরিত্রাণ,
দুই কর্ম্মের কোন্ কর্ম্ম করি॥
অশেষ করুণাসিন্ধু,                                      অখিল জগতবন্ধু,
দৈত্য-মুখে করিলা প্রবেশ।
রহিয়া মেঘের আড়ে,                                    যত দেবগণ করে,
হাহাকার শবদ-বিশেষ॥
হাসে দুষ্ট দৈত্যগণ,                                    ব্যাকুলিত সাধুজন,
ত্রিভুবনে হৈল হাহাকার।
চিবায়ে করিব চুর,                                   মনে ভাবে অঘাসুর,
মুখখান বুজে দুরাচার॥
বিচারিয়া যদুরায়,                                   বাড়িতে লাগিল কায়,
নিরোধিল দৈত্য-দশদ্বার।
নড়িতে চড়িতে নারে,                                    ছটফট করি মরে,
আঁখি উলটিল সেইবার॥
সকল শরীর ভরি,                                      পবন রোধিল হরি,
ব্রহ্মরন্ধ্র ফুটিয়া মরিল।
কৃপাদৃষ্টি করি হরি,                                   মরা-বত্স শিশু ধরি,
মুখ-পথে বাহির আনিল॥
শ্রীকৃষ্ণের পরশনে,                                   জীব হৈয়া সর্ব্বজনে,
দেখে সেই সর্প-অঙ্গজ্যোতি।
উঠিল আকাশোপরে,                                  দশদিক্ দীপ্ত করে,
পুনর্ব্বার আসি শীঘ্রগতি॥
প্রবেশিল কৃষ্ণ-কায়,                                বৈকিভাবে মুক্ত তায়,
তিনলোক দেখিল সাক্ষাতে।
আনন্দিত সুরগণ,                                     করে পুষ্প বরিষণ,
স্তুতি ভক্তি কৈল দণ্ডবতে॥
সুরবধুগণ নাচে,                                     বিবিধ বাজনা বাজে,
গন্ধর্ব্ব কিন্নর গীত গায়।
ব্রহ্মণ মঙ্গল পড়ে,                                     স্তাবকে স্তবন করে,
ত্রিভুবনে আনন্দ-উদয়॥
গীত বাদ্য স্তুতি বাণী,                                ব্রহ্মলোকে হৈল ধ্বনি,
ব্রহ্মা শুনি আইল সে স্থানে।
আকাশে মঙ্গলে থাকি,                                  প্রভুর মহিমা দেখি,
বিস্ময় জানিয়া মনে মনে॥
দেখি সঙ্গী শিশুগণে,                                   আনন্দিত হৈল মনে,
মূক্ত হৈল সর্প কলেবর।
সুখেতে রহিল বনে,                                  ক্রীড়া করে শিশু গণে,
চিরদিন তাহার ভিতর॥
বাল্যকালে এ প্রকারে,                               ক্রীড়া কৈলা দামোদরে,
পৌগণ্ডে কহিবা শিশুগণে।
অঘাসুর বধ করি,                                   গো-বালক ত্রাণ করি,
আসে কৃষ্ণ নিজ নিকেতনে॥
এ কোন চরিত্র-কথা,                                  অখিল ব্রহ্মাণ্ড-পিতা,
শিশু-বেশে পুরুষ প্রধান।
অঘা হেন দুরাচার,                                    অঙ্গ পরশিয়া তার,
আত্মসাম্য পান বিদ্যমান॥
সিদ্ধ ঋষি মুনিবরে,                                  নাহি পায় ধ্যানে যারে,
শুদ্ধভাবে চিন্তি অনুক্ষণ।
করিয়া সে শত্রু-ভাব,                               অনায়াসে করিল লাভ,
ব্রহ্মার দুর্লভ যে চরণ॥
নৃপতি বিস্ময় শুনি,                                      পরম সন্দেহ গণি,
জিজ্ঞাসিল মুনির চরণে।
কুমার কালের কর্ম্ম,                                    কহিল জানিয়া মর্ম্ম,
পৌগণ্ড-কালেতে শিশুগণে॥
এত বড় চমত্কার,                                     কহে মুনি যোগেশ্বর,
বিষ্ণু-মায়া বিনা নাহি আন।
আমি অতি নরাধম,                                    তবু হই ধন্যোত্তম,
হরি-কথামৃত করি পান॥
রাজার বচন শুনি,                                      বাহ্য পাসরিল মুনি,
আনন্দে পূরিল কলেবর।
ক্ষণে অবধান বলি,                                     চাহিল নয়ন মেলি,
তবে দিল রাজারে উত্তর॥
অঘাসুর-বিনাশন,                                    বত্সশিশু বিমোচন,
গোপাল-চরিত্র-গুণ গাথা।
মাধব আচার্য্য কহে,                                  শুনিলে দুরিত দহে,
পরম মঙ্গল হরি-কথা॥

.             *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সাধু সাধু মহারাজ ধন্য কলেবর
ভণিতা - মাধব আচার্য
আনুমানিক পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে ষোড়ষ শতকের প্রারম্ভকালে, মাধবাচার্য বা দ্বিজ
মাধব দ্বারা রচিত, কলকাতার ভবানীচরণ দত্তের ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী কার্যালয় থেকে, ফাল্গুন
১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী ১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত, “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল”
কাব্য গ্রন্থের ৪২-পৃষ্ঠায় “মাধবাচার্য্য” ভণিতাযুক্ত এই পদটি দেওয়া রয়েছে। এই পদটি
“ভাগবতাচার্য্য” ভণিতাতেও পাওয়া গিয়েছে “প্রেমতরঙ্গিণী” গ্রন্থে।

অথ বনভোজন ও ব্রহ্মমোহন।

সাধু সাধু মহারাজ ধন্য কলেবর।
নির্ম্মল সুমতি তব ভব ভকত শেখর॥
নিরবধি হরিকথা শুন সাবধানে।
তবু নব প্রেম তুমি কর অনুক্ষণে॥
শান্ত-জন যেবা হয় চিত্তে ধরে সার।
শতবাণী চিত্তে সদা হরিপদ যার॥
কৃষ্ণ-কথা নব নব শুনে অনুক্ষণ।
স্ত্রীর কথা শুনে যেন নারীজিত জন॥
গুহ্য কথা কহি রাজা শুন সাবহিতে।
অপরূপ নাট্য-লীলা কৈল যতমতে॥
যমুনা পুলিনে তবে লৈয়া শিশুগণে।
হাসি হাসি বলে কৃষ্ণ মধুর বচনে॥
দেখ দেখ ভাই সব রম্য নদীতীরে।
কোমল বালুকা তট নির্ম্মল সুনীরে॥
প্রফুল্লকমল-গন্ধ ভ্রমর ঝঙ্কার।
জলচর-কোলাহল শব্দ যে সঞ্চার॥
মন্দ মন্দ সমীরণে তরঙ্গ সুসার।
হেথা আসি সকলেতে করিব বিহার॥
বেলা দুই প্রহর ভোজন করি আগে।
পাছে খেলা খেলাইব যেবা মনে লাগে॥
জল দিয়া আন বত্স করুক সন্তোষে।
তবে সভে ভোজন করিব নানারসে॥
কৃষ্ণের বচন শুনি গোপ-শিশুগণে।
জলপান করাইয়া বত্স দিল বনে॥
শিক্যা নামাইল সবে ভোজন করিতে।
মধ্যেতে কৃষ্ণ বসিলা শিশু চারিভিতে॥

চৌদিকে বালকগণ রচিল মণ্ডল।
বিকসিত পদ্মমুখ নয়ন-যুগল॥
বিবিধ মণ্ডল জাল করিয়া রচন।
সম্মুখে শ্রীমুখ দেখে সর্ব্ব শিশুগণ॥
চৌদিকে কমলদল মধ্যে কর্ণিকার।
সেইরূপ শোভে ব্রজশিশু পাটোয়া॥
ক্ষুধার্ত্ত হইয়া সভে বসিল সত্বরে।
ভোজন করয়ে শিশু আনন্দে বিহরে॥
আপন আপন পাক সবাই প্রসংশে।
কেহ কারও পাত্র দেখি করে উপহাসে॥
কেহ হাসে কেহ কেহ হাসিয়া হাসায়।
কেহ কারও মুখ দেখি অঙ্গুলি চালায়॥
জঠর পঠরে বেণি শিঙ্গা বেত কাঁখে।
বামকর-কমলে কবল ধরি রাখে॥
অঙ্গুলির মধ্যে মধ্যে ঝরয়ে ব্যঞ্জন।
মধ্যে নন্দসুত চারিপাশে শিশুগণ॥
হাস্য পরিহাসে প্রভু করয়ে ভোজন।
বাল্যলীলা করে যজ্ঞপতি নারায়ণ॥
এইরূপে ভোজন করয়ে শিশুগণে।
তৃণলোভে বত্স সব গেল দূরবনে॥
ত্রাস পাইল শিশুগণ বত্স না দেখিয়া।
নিবারিয়া রাখে কৃষ্ণ আশ্বাস করিয়া॥
তোমরা ভোজন নাহি ছাড় মিত্রগণ।
বাছুর আনিয়া আমি দিব ত এখন॥
এতেক বচন বলি ভকত-বত্সল।
বামহাথে সেই রূপ ধরিল কমল॥
গিরি গুহা নিকুঞ্জ তিমির ঘোর বনে।
বাছুর খুঁজিয়া হরি বেড়ান আপনে॥
ব্রহ্মলোক হৈতে ব্রহ্মা দেখি এ সকল।
মনেতে সন্দিগ্ধ করি হইল বিকল॥

বিধির অন্তরে দ্বিধা হইল তখন।
সামান্য জ্ঞানেতে তবে ভাবে মনেমন॥
বুঝিব কেমন আজি ত্রিদশ-ঈশ্বরে।
চাতুরী করিতে ব্রহ্মা করিল অম্ভরে॥
এদিকে বালক হরি ওদিকে বাছুর।
অন্তরীক্ষে ব্রহ্মা হরি গেল নিজপুর॥
বাছুর না পায়ে ত্রিভুবন-অধিকারী।
পালটি পুলিনে পুন আইল শ্রীহরি॥
এথা আসি শিশুগণে না পায় উদ্দেশ।
বনে বনে খুঁজিয়া বেড়ান হৃষীকেশ॥
হারাইল বাছুর বালক নাহি বনে।
সর্ব্বজ্ঞশেখর হরি জানিলা আপনে॥
ব্রহ্মা সে সৃজিল মায়া তত্ত্ব জানিবারে।
হেন কর্ম্ম করি যেন লঙ্ঘিতে না পারে॥
গোপ গোপীগণ চাহে বাড়াতে পিরীতি।
বিশেষ জানিতে চাহে ব্রহ্মা সুরপতি॥
ক্ষণেক বিচারি মনে এমত প্রকারে।
বত্সশিশু দুই কৈল প্রভু দামোদরে॥
যে জন লীলাতে করে জগত নির্ম্মাণ।
বাছুর বালকরূপে সেই ভগবান্॥
যত শিশু তত বত্স যার যেই বেশ।
যাহার যেমন হস্ত মুখ নাসা কেশ॥
যার যে বয়স রূপ যার যে আকার।
যাহার যেমন পদ নখ ব্যবহার॥
যার যেমন শিঙ্গা বেণু বসন ভূষণ।
যার যেই শীল ভাষা শিষ্ট সম্ভাষণ॥
যাহার যে আকৃতি প্রকৃতি রতি মতি।
যার যেমন গুণ নাম বিহরণ গতি॥
সর্ব্বভুত-অন্তর্যামী জগতবিলাস।
সর্ব্বরূপ ধরি প্রভু করেন প্রকাশ॥
বিষ্ণুময় জগতে আছয়ে বেদবাণী।
সেই যেন সাক্ষাৎ করয়ে চক্রপাণি॥

আপনি বাছুর বেশ ধরি নারায়ণ।
আপনি বালকন্ধপে করেন পালন॥
আপনে আপনা হরি করয়ে সৃজন।
আপনি আপনে হৈয়া বিহরে আপন।
আপনি আপনি লৈয়া বিহরে তখনে।
ব্রজপুরে নন্দসুত চলিল আপনে॥
যার যার বত্সগণ ভিন্ন ভিন্ন করি।
নিজগৃহে লন সেই শিসুরূপ ধরি॥
সেই শিশু সেই ভাষা সেই মত বেশ।
সেই রূপে প্রবেশ করিলা হৃষীকেশ॥
বাছুরের শব্দ শুনি হরষিতমনে।
হম্বারব করিয়া ডাকিল ধেনুগণে॥
প্রেমানন্দে বাড়াইল পূর্ব্ব-প্রেমছলে।
সেই সেই শিশু বত্স কহে কুতূহলে॥
ধেনুরব শিনি মাতা ধাইল সত্বরে।
দুইহাতে আপন বালক কৈল কোলে॥
বাহুপাশে বেড়িয়া নির্ভয়ে দিল কোল।
পুত্র দরশনে চিত্ত হৈল উতরোল॥
পুত্র-মুখে স্তন দিয়া করাইল পান।
সাক্ষাৎ পরমব্রহ্ম নরসম জ্ঞান॥
মর্দ্দন মাজন করাইয়া শিশুগণ।
দিব্য গন্ধ দিয়া কৈল অঙ্গের লেপন॥
অলঙ্কারে কৈল শিশু অঙ্গের ভূষণ।
দিব্য অন্নপান দিয়া করায় ভোজন॥
এই মতে করে মাতা লালন পালন।
দিনে দিনে আনন্দ বাড়ান নারায়ণ॥
পূর্ব্বমত কৈল কৃষ্ণ পুত্র ভাবাভাব।
পূর্ব্বের চাহিয়া মায়া অধিক প্রভাব॥
একদিন বলরামে করিয়া সংহতি।
বত্সশিশুগণ লৈয়া গেল যদুপতি॥
দিন পাঁচ সাত আছে বত্সর পূরিতে।
বেড়ান নিকট বনে বাছুর রাখিতে॥

বনে বনে বাছুর রাখেন ঙগবান্।
ধীরে ধীরে গেলা গোবর্দ্ধন সন্নিধান॥
পর্ব্বত শিখরে হোথা বৃদ্ধ গোপগণ।
ধেনুগণ চরাইতে আনন্দিতমন॥
দৈবে ধেনিগণ তথা দেখে হেনকালে।
আপন বাছুর তথা পর্ব্বতের তলে॥
বত্স-প্রেমে আপনা পাসরে ধেনুগণ।
ঊর্দ্ধ গ্রীবা ঊর্দ্ধ পূচ্ছ বদ্ধ বিলোচন॥
সভে হাম্বারব করি আকর্ণ পূরিয়া।
দুর্গপথ চলি যায় দ্বিপথ তুলিয়া॥
নিজ নিজ বত্স লৈয়া যত ধেনুগণে।
ক্ষীরপান করাইল আনন্দিত মনে॥
নির্জ্জল পোছন কৈল লালন পালন।
মনঃসুখসাগরে ভাসিল ধেনুগণ॥
ব্রজ-গোপগণ নানা যতন করিয়া।
ধেনু সব রাখিবারে নারে নিবারিয়া॥
ক্রোধ করি কৈল গোপ তর্জ্জন গর্জ্জন।
নানাদুঃখে কৈল দুর্গ পথ বিলঙ্ঘন॥
আজি এত প্রমাদ করিল শিশুগণে।
বত্স লৈয়া হেথা তারা আইল কি কারণে॥
আজিকার গোরস সকল হৈল নাশ।
নিষেধ না মানে কিছু নাহিক তরাস॥
গোপকুলে কলঙ্ক রাখিল শিশুগণে।
আজি শাস্তি সভাকার দিব ভাবে মনে॥
এইরূপে সর্ব্ব গোপ তর্জ্জিয়া গর্জ্জিয়া।
নানাদুঃখ পায়্যা আইল পর্ব্বত লঙ্ঘিয়া॥
যেইক্ষণে শিশুমুখ কৈল দরশন।
সেইক্ষণে সর্ব্বক্রোধ হৈল নিবারণ॥
বুকের উপরে তুলি দিল আলিঙ্গন।
নয়নে আনন্দ-নীর পড়ে ততক্ষণ॥
প্রেমরসে জড়বৎ নাহি অবধান।
পাসরিল গোপগণ আত্মপর জ্ঞান॥

বলরাম দেখি প্রেম-সম্পদ উদয়।
মনে মনে চিন্তিতে লাগিলা মহাশয়॥
স্তনের বালকে প্রেম বাড়িতে জুআয়।
এ সর্ব্ব বালকগণ স্তন নাহি খায়॥
তবে কেন এত বড় হৈল অনুরাগ।
বুঝিতে না পারি নারায়ণ অনুভব॥
ব্রজকুলে উথলিল প্রেমের সাগর।
আমার হৃদয়ে প্রেম বাড়ে নিরন্তর॥
কোথা হৈতে আইল মায়া কাহার ঘটনা।
কিবা দেব মায়া কিবা অসুরমন্ত্রণা॥
অভিপ্রায় বুঝি মায়া রচিল ঈশ্বরে।
অন্যের মায়াতে কিবা মোহিবে আমারে॥
সীত পাঁচ ভাবি রাম মুদিল নয়ান।
ধ্যান করি দেখিলেক সর্ব্ব ব্রহ্মজ্ঞান॥
শিশুগণ দেব-অংশে হৈল উপাদান।
ঋষি-অংশে যতেক বাছুর বিদ্যমান॥
এ সকল কেহ দেব-ঋষি-অংশে নয়।
সর্ব্বরূপ ধরি লীলা করে মহাশয়॥
এ বোল শুনিয়া কৃষ্ণ করিল ইঙ্গিতে।
বলরাম সকল বুঝিলা ভালমতে॥
এিরূপে যেদিন বত্সর পূর্ণ হৈল।
সেদিন আসিয়া ব্রহ্মা সকল দেখিল॥
বত্স আর শিশুগণ পূর্ব্বেতে হরিয়া।
রাখিয়াছিলেন গিরি গহ্বরে লইয়া॥
তখন আসিয়া ব্রহ্মা বিস্ময় হইল।
পুনরায় সেই সর্ব্ব গোকুলে দেখিল॥
নিজ হস্ত বত্স শিশু পর্ব্বত-গহ্বরে।
শয়ন করিয়াছে সেই উঠিতে না পারে॥
যতেক বালক বত্স হইয়া শ্রীহরি।
বিহরে আনন্দে শিশু বত্সরূপ ধরি॥
এ সব দেখিয়া ব্রহ্ম কৈল প্রণিধান।
চিরকাল রহে চিত্ত করি সমাধান॥

কিবা এই সত্য কিবা সেই সত্য হয়।
কিবা সেই মিথ্যে কিবা এই মায়া কয়॥
চৌদ্দভুবনের পতি ব্রহ্মা হেন হয়।
তবু কিছু না বুঝিল যোগমায়াময়॥
নিত্য শুদ্ধ জ্ঞানময় বিশুদ্ধ মোহন।
তিমিরে মজিল যেন নীহার দর্শন॥
মহাব্যস্তে অন্তমায়া কে বুঝে এ স্থলে।
দিবসসময়ে যেন জোনা কীট জ্বলে॥
জ্ঞানচক্ষে ব্রহ্মা তবে দেখেন তখন।
সাক্ষাৎ পরমব্রহ্ম এক এক জন॥
নবঘন শ্যামতনু পীতবাস ধরে।
শঙ্খচক্রগদাপদ্ম শোভে চারি করে॥
কিরীট কুণ্ডল হার বনমলা গলে।
হৃদয়ে কৌস্তুভ মণি সুশোভিত ভালে॥
বলয় কঙ্কণ চারু ভুজে বিরচিত।
সুবর্ণ মঞ্জীর মৃগ চরণে রঞ্জিত॥
কটিতটে পীতবাস কনক-মগলা।
নব জলধর যেন চমকে চপলা॥
আপাদমস্তকে দোলে তুলসীর মালা।
দশনখ বিরাজিত জিনি শশীকলা॥
মকরকুণ্ডলে দোলে কর্ণে চমত্কার।
সুবর্ণে জড়িত কণ্ঠে মণিময় হার॥
বিনোদ চন্দ্রিকা চারু মন্দ মধুহাস।
সত্ত্বগুণে যেন বিশ্বপালন প্রকাশ॥
অরূপিত অপাঙ্গ-ভঙ্গিমা নিরীক্ষণ।
রজোগুণে ধরে যেন সৃষ্টিকর্ত্তা জন॥
আত্মা যদি করি তৃণ স্তম্ব যে পর্য্যন্ত।
চরাচর সর্ব্বজীব হয় মূর্ত্তিমন্ত॥
নৃত্যগীত বহুবিধ অনেক প্রকার।
নানাভাবে স্তুতি ভক্তি করে নমস্কার॥
অণিমাদি অষ্টসিদ্ধি অষ্ট মহানিধি।
মায়া আদি বিভূতি যতেক কর্ম্ম সিদ্ধি॥

সাক্ষাতে রচিত সেই নিজমূর্ত্তি ধরি।
কালকর্ম্ম স্বভাব সকল আদি করি॥
অনন্ত মূরতি ধরি করে উপাসনা।
অনন্ত মূরতি হরি অনন্ত ভাবনা॥
হেন পরিপূর্ণ হরি অনন্ত মূরতি।
বত্স শিশু সকল দেখিল প্রজাপতি॥
হরণ-কারণ মনে আর অতি ভয়।
সকল ইন্দ্রিয়গণ প্রেমে বশ হয়॥
দেখিয়া জন্মিল মোহ বাক্য নাহি সরে।
চিত্রের পুত্তলি প্রায় পড়ি রহে দূরে॥
থাকুক দূরেতে তার জানিবার কাজ।
দেখিতে শকতি নাই পাইল বড় লাজ॥
নিঃশব্দে রহিল নিজধাম-দরশনে।
চিত্রের পুতলি যেন মুদিল নয়নে॥
অসঙ্খ্য মহিমা যার প্রকৃতির পর।
বেদ নিরসন মুখে প্রমাণ-গোচর॥
সুখময় সুপ্রকাশ আনন্দ সে ময়।
দেখিয়া মোহিত ব্রহ্মা হৈল অতিশয়॥
মহিমা দেখিয়া ব্রহ্মা হৈল অচেতন।
তবে কৃপা কৈল প্রভু জগত-জীবন॥
বিধি-সন্মোহন দেখি কৃপার সাগর।
সে সব বৈভব প্রভু সম্বরে সত্বর॥
মায়া-আচ্ছাদন-পটে ব্রহ্মায় আচ্ছাদিল।
কেবল মরিয়া যেন বিরিঞ্চি উঠিল॥
নয়ন মেলিল ব্রহ্মা অনেক যতনে।
ফিরিয়া চৌদিকে চাহে ঘুর্ণিত লোচনে॥
সন্মুখে দেখয়ে ব্রহ্মা সেই বৃন্দাবন।
সর্ব্বলোক জীবন তরুণ তরুগণ॥
নানা গুল্ম লতা বৃক্ষ ফল মনোহর।
নানাজাতি পক্ষী নদী খগ মৃগবর॥
বৈরী ভাব ত্যজি তথা নর মৃগ বসে।
ক্ষুধা তৃষ্ণা শোক যাতে নাহি কৃষ্ণ-রসে॥

নিরখিয়া দেখ ব্রহ্মা সেই বৃন্দাবন।
গোপশিশু নাট্যলীলা কৈল নারায়ণ॥
অনন্ত পরম ধাম অগাধ সে জ্ঞান।
গোপাল বালক নাট্য কৈলা ভগবান্॥
বাছুর বালক চাহে পূর্ব্বের সমান।
বাস করে কেবল বেড়ান বনেবন॥
সেইরূপ সেই বেশ সেই সব ধর।
সেই প্রভু বনে বনে ফিরে একেশ্বর॥
অদ্ভূত সে নাট্য লীলা দেখি সুরেশ্বর।
হংস হৈতে ব্রহ্মা তবে নামিল সত্বর॥
দণ্ডবৎ হৈয়া ব্রহ্মা পড়ে ভূমিতলে।
পদযুগে পরশিল মুকুট-শেখরে॥
অভিষেক কৈল অষ্ট নয়নের নীরে।
অষ্টাঙ্গে প্রণাম করে সভয় অন্তরে॥
ভয়ে কম্পবান্ গদগদ স্তুতিবাণী।
নানামত স্তুতি করে সুরশিরোমণি॥
শ্রীকৃষ্ণের লীলা যত অদ্ভূত কাহিনী।
মাধব আচার্য্য রচে কৃষ্ণ-তরঙ্গিণী॥


টীকা-
১২৬৩ সালের মুদ্রিত পুস্তকে শেষ দুটি পংক্তি এইরূপে দেওয়া ছিল . . .
শ্রীগদাধরবীর খ্যাতশিরোমণি।
ভাগবতাচার্য্য রচে প্রেমতরঙ্গিণী॥

.             *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
এই সব রূপে সারিসারি গোপনারী
কবি দ্বিজ মাধব
আনুমানিক অষ্টাদশ শতকে রচিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত (একাধিক বার),
দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায় সংরক্ষিত ১৩৮১টি পদবিশিষ্ট
“শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”, ৪৭০-পৃষ্ঠা।

.        ॥ রাগিণী তাল॥

এই সব রূপে সারিসারি গোপনারী।
হেরি লাজ ভয় হরিপদ অনুসারী॥
ছিদ্রাঙ্ক ধ্বনি বেণু দূতী প্রায় হয়ে।
লয়ে যায় আগেআগে পথ দেখাইয়ে॥
কিবা সে চান্দের সারি সারি চলি জায়।
কিবা সে বিজুরিমূর্তি মতি হৈল তায়॥
কিবা পঙ্কজের বন লাবণ্য বলায়।
ভাসি ভাসি চলি জায় হেন মনে লয়॥
কিবা কনকের সব পুথলি চলিল।
কিবা চম্পকের মাল্য হয় বা জানিল॥
কিবা কুমুদিনী সব কামের পাথারে।
ভাসি ভাসি আসি পড়ে চান্দের সাগরে॥
এই রূপে সকল কামিনী এক কালে।
আসিয়া মিলিল শীঘ্র শ্রীরাম গোপালে॥
সভারে করুণা দিঠে চাহে ভগবান।
সভে চায় মহাপ্রভু রামের বয়ান॥
চন্দ্রকান্ত মণি জেন ইন্দুমুখী পেয়ে।
পুরিতে লাগিল দেখ একত্তর হয়ে॥
রসের সাওরে মত্ত হল বলদেবা।
রসিক নাগরী নিত্য পদে করে সেবা॥
রোমহর্ষ হইয়ে সে আর্ঘ্য নিবেদিলা।
শ্রমজল পাদ্য দিয়া সম্মুখে দাড়াইলা॥
অধর নৈবিদ্য দিয়া রহে বিদ্যমান।
ভোগ নিবেদিয়া জেন করয়ে ধেয়ান॥
এইরূপে পরমানন্দ মহোত্সব।
তা দেখিয়া সুরগণ বধূ মিলি সব॥
পুষ্পবৃষ্টি করে সব কেহু নাচে গায়।
মহা মহা যোগী মুনিগণ স্তুতি বেদ গায়॥
চিন্তিয়া চৈতন্যচান্দের চরণকমল।
দ্বিজমাধব কহে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল॥

ই পদটির শেষ দুটি পংক্তি আর দ্বিজ মাধব বা মাধবাচার্য রচিত শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের
“উদ্ধব শ্রীকৃষ্ণে সংবাদ” পদটির শেষ দুটি পংক্তি প্রায় এক। প্রশ্ন জাগে যে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলের
রচয়িতা দ্বিজ মাধব আর শ্রীপদমেরুগ্রন্থের সংকলক দ্বিজ মাধব কি একই ব্যক্তি ? আমরা
এই পদটিকেও একটি স্বতন্ত্র পদ হিসেবে রাখছি।

উদ্ধব শ্রীকৃষ্ণে সংবাদ।

হেনমনে মায়া পাতিয়া গোবিন্দাই।
দেখিয়া উদ্ধব মনে চিন্তিলা তথাই॥
ত্রিদশের নাথ প্রভু সংসারের সার।
ভারাবতরণে কৃষ্ণ পৃথিবীউদ্ধার॥
ব্রহ্মশাপ মনে চিন্তি মায়া ত পাতিয়া।
পৃথিবী ছাড়িব হেন মনেতে চিন্তিয়া॥
নিজ দাস করি মোরে বলে সর্ব্বজনে।
কপট করিয়া মোরে বল নারায়ণে॥
এত বলি উদ্ধব কৃষ্ণের পাশে গিয়া।
কান্দিতে কান্দিতে বলেন চরণে ধরিয়া॥
উদ্ধব ক্রন্দন শুনি শ্রীমধুসূদন।
হাসিতে হাসিতে বলে মধুর বচন॥
চিন্তিয়া চৈতন্যচন্দ্রে-চরণকমল।
দ্বিজ মাধব কহে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর