| কবি মাধব আচার্য্যের বৈষ্ণব পদাবলী |
| আমার সুন্দর নায়, যে বা আসি দেয় পায় কবি দ্বিজ মাধব আনুমানিক ১৮৭০ সাল নাগাদ চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংগৃহীত এবং তাঁর পুত্র রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা ১৯২২ সালে প্রকাশিত “শ্রীশ্রীপদামৃতসিন্ধু”, ৮৪-পৃষ্ঠা। ॥ শ্রীরাগ॥ আমার সুন্দর নায়, যে বা আসি দেয় পায়, হাসিয়া গণয়ে ষোল পোণ। তোমরা ত তরুণী নিতম্ব কুচ, অতি গুরু উচ্চ এক নায়ে ভরা তিন জন॥ লক্ষের পসরা তোর, নায়ে পার হবে মোর, ইহাতে পাইব আমি কি। আপন বুঝিয়া বলহ, পিছে যেন নহে কলহ, শোন সব গোয়ালার ঝি॥ তুমি ত যুবক মেয়ে, আমিত যুবক নেয়ে, হাস্য পরিহাসে গেল দিন। ওকূলে মানুষ ডাকে, খেয়া কামাই মিছে পাকে, এক্ষণ হৈত খেয়া তিন॥ এখন একবোল বলুক রাই, আগে দেয় কিছু খাই, না বাহিতে গায় হউক বল। দ্বিজ মাধব কয়, রসিক যাদব রায়, নায় কর স্বকাজ সফল॥ এই পদটি সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “পদামৃত লহরী”, ৬৩-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে। ॥ রাগিণী সুহই - তাল একতালা॥ গোপীদের কথা শুনিয়া শ্রীকৃষ্ণ (নাবিক) বলিতেছেন। আমার সুন্দর না, যেবা আসি দিবে পা, হাসিয়া গণয়ে ষোল পোণা। এ তব নিতম্ব কুচ, অতি গুরুতর উচ, এক নায়ে ভরা তিন জনা॥ লাখের পসরা তোর, নায়ে পার হবে মোর, ইহাতে পাইব আমি কি। এখনি বুঝিয়া বল, পাছে যেন নহে কল, এই জীবিকায় আমি জী॥ শুন বিনোদিনী রাই, আগে দেও কিছু খাই, না’ বাহিতে গায়ে ইউক বল। এখন একবোল বলুক রাই, আগে দেয় কিছু খাই, না বাহিতে গায় হউক বল। এ দ্বিজ মাধবে কয়, রসিক অতিশয়, পাছে মিছে হইবে সকল॥ ভাবার্থ - নাবিক রূপে শ্রীকৃষ্ণ বলিতেছেন--- আমাকে কি দিবে আগে বল, পাছে যেন গোলমাল না হয়। দেখি আমার না’খানি কেমন সুন্দর। আর এক কথা আগে কিছু দাও, খাইলে পরেই নৌকা বাহিতে শক্তি হইবে ইত্যাদি। --- সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, “পদামৃত লহরী”॥ এই পদটি আনুমানিক পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে ষোড়ষ শতকের প্রারম্ভকালে, মাধবাচার্য বা দ্বিজ মাধব দ্বারা রচিত, কলকাতার ভবানীচরণ দত্তের ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী কার্যালয় থেকে, ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী ১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত, “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থের, ৭৫-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে। নৌকা খণ্ড ॥ বরাড়ী রাগ॥ আমার সুন্দর না। যেবা আসি দেয় পা॥ হাসিয়া গণয়ে ষোল পণ। তোমার নিতম্ব কুচ, অতি গুরুতর উচ, এক নায়ের ভরা দশ জন॥ হেদেলো গোআলার, মায়্যা বুঝিল, বড়ই তুমি ঢাঁট। দান ফুরাইয়া, হেদেলো গোয়ালিনি, নাএ চড়সিয়া ঝাট॥ লাখের পসরা তোর, নাএ পার হবে মোর, ইহাতে পাইব আর কি। বুঝিয়া উচিত বল, পিছে যেন নহে ফল, এই জীবিকায় আমি জী॥ তুমিত যুবতী মায়্যা, আমিত যুবক নায়্যা, হাস পরিহাসে গেল দিন। ও পারে মানুষ ডাকে, খেয়া নিয়া মিছা পাকে, এতক্ষণে হৈত ভরা তিন॥ খীর নুনী দুগ্ধ দই, আগে আন কিছু খাই, নৌকা বাহিতে হইক বল। দ্বিজ মাধবে কয়, রসিক যাদবরায়, মিছা পাকে হারাবে সকল॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| দেখ ভাই আগম নিগমে কবি দ্বিজ মাধব দাস আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস (গোকুলানন্দ সেন) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের (১৯২৭ সাল) ৩য় খণ্ড, ৪র্থ শাখা, ২৩শ পল্লব, শ্রীচৈতন্য- নিত্যানন্দের রূপ-গুণ-বর্ণন, পদসংখ্যা ২৩৩৯। ॥ তথারাগ॥ (গান্ধার) দেখ ভাই আগম নিগমে। চৈতন্য নিতাই বিনু দয়ার ঠাকুর নাই পাপী লোকে তাহা নাহি মানে॥ ধ্রু॥ সত্য ত্রেতা দ্বাপর সর্ব্ব যুগের ঈশ্বর ধ্যান যজ্ঞ পূজা প্রকাশিলা। সেই বৃন্দাবন-চাঁদ ধরি নটবর-ছাঁদ সে যুগে গোপীরে প্রেম দিলা॥ যে’জন গোকুল নাথ কংস কেশী কৈল পাত যারে কহে যশোদা-কুমার। সে জন গোকুল ছাড়ি নবদ্বিপে অবতরি পাতকীরে করিলা উদ্ধার॥ তাহার অগ্রজ নাম রোহিণী-নন্দন রাম আর যত পারিষদ মেলে। নিজ-নাম-প্রেম-গুণে পতিত চণ্ডাল জনে ভাসাইল প্রেম-আঁখি-জলে॥ যে মূঢ় পণ্ডিত-মানি পড়ুয়া তার্কিক জানি পূরবে অসুর হৈয়াছিল। দ্বিজ মাধব দাসে বলে সেই অপরাধ-ফলে এ যুগে বঞ্চিত বুঝি হৈল॥ এই পদটি ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত, জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত ও মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী”, ১৯৩৪, ৮-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে। জগবন্ধু ভদ্র জানিয়েছেন যে, ইতিহাসবিদ ও বৈষ্ণব সাহিত্যের খ্যাতনামা পণ্ডিত, অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির মতে গৌরপদ- তরঙ্গিণীতে উদ্ধৃত দ্বিজমাধব ভণিতাযুক্ত “দেখ ভাই আগম নিগমে” পদটির রচয়িতা কালিদাস মিশ্রের পুত্র মাধব বা মাধবাচার্য্যই। ॥ সুহই॥ দেখ ভাই আগম নিগমে। চৈতন্য নিতাই বিনে দয়ার ঠাকুর নাই পাপী লোকে তাহা নাহি জানে॥ ধ্রু॥ সত্য ত্রেতা দ্বাপর সত্যযুগের ঈশ্বর ধ্যান যজ্ঞ পূজা প্রকাশিলা। সেই বৃন্দাবন চাঁদ ধরি নটবর ছাঁদ সে যুগে গোপীরে প্রেম দিলা॥ সে জন গোকুল নাথ কংস কেশী কৈলা পাত যারে কহে যশোদাকুমার। নবদ্বিপে অবতরি সেই হৈল গৌর হরি পাতকীরে করিতে উদ্ধার॥ তাহার অগ্রজ নাম রোহিণীনন্দন রাম আর যত পারিষদ মিলে। নিজনাম প্রেমগুণে পতিত চণ্ডাল জনে ভাসাইলা প্রেম আঁখি জলে॥ যে মূঢ় পণ্ডিত মানি পড়ুয়া তার্কিক জানি পূরবে অসুর হৈয়া ছিল। দ্বিজ মাধব দাসে বলে সেই অপরাধ-ফলে এ যুগে বঞ্চিত বুঝি হৈল॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| আজি নহে কালি নহে জানি বাপ পিতামহে ভণিতা - মাধব কবি মাধব আচার্য ১৯৬১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “পাঁচশত বত্সরের পদাবলী”, ১৫৮-পৃষ্ঠা। পদটি তিনি নিয়েছিলেন মাধবাচার্যের শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের ৭২-পৃষ্ঠা থেকে। এই পদটি ১৯৬১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য”, ৪৬১-পৃষ্ঠায় একই রূপে দেওয়া রয়েছে। আজি নহে কালি নহে জানি বাপ পিতামহে গোকুল নগরে নহে ঘাটী। ঘৃত নবনীত দধি বেচি নিয়া নিরবধি আজি তুমি কর মিছা হঠি॥ নিলাজ কানু পথ ছাড়, না কর বিরোধে। বুঝিল তোমায় তিলেক নাহি বোধে॥ পাটে কংস নটবর অতি বড় খরতর তারেও তোমার নাহি ডর। * * * * * * * কি তোরে করিব ক্রোধ যশোদার অনুরোধ সহিল সকল কুবচন। যদি বল আর বার উচিত পাইবে তার মাধবের স্বরূপ বচন॥ এই পদটি আনুমানিক চারশো বছর পূর্ব্বে রচিত, মাধবাচার্য বা দ্বিজ মাধব দ্বারা রচিত, কলকাতার ভবানীচরণ দত্তের ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী কার্যালয় থেকে, ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী ১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত, “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” কাব্য গ্রন্থের ৭১-পৃষ্ঠায় “মাধব” ভণিতা -য় এই রূপে দেওয়া রয়েছে। ॥ পাহিড়া রাগ॥ আজি নহে কালি নহে, জানি বাপ পিতামহে গোকুল নগরে নহে ঘাটী। ঘৃত নবনীত দধি, বেচি নিয়া নিরবধি, আজি তুমি কর মিছা হঠি॥ নিলাজ কানু পথ ছাড় না কর বিরোধে। বুঝিল তোমায় তিলেক নাহি বোধে॥ ধ্রু॥ পাটে কংস নটবর, অতি বড় খরতর, তারেও তোমার নাহি ডর। আমি আঞানের রাণী, যদি কহি এই বাণী, মজিবে নন্দের গাবী ঘর॥ কি তোরে করিব ক্রোধ, যশোদার অনুরোধ, সহিল সকল কুবচন। যদি বল আর বার, উচিত পাইবে তার, মাধবের সরস বচন॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| একদিন কৈল মনে ভোজন করিব বনে ভণিতা - মাধব আচার্য কবি মাধব আচার্য আনুমানিক পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে ষোড়ষ শতকের প্রারম্ভকালে, মাধবাচার্য বা দ্বিজ মাধব দ্বারা রচিত, কলকাতার ভবানীচরণ দত্তের ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী কার্যালয় থেকে, ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী ১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত, “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” কাব্য গ্রন্থের ৪২-পৃষ্ঠায় “মাধবাচার্য্য” ভণিতাযুক্ত এই পদটি দেওয়া রয়েছে। অথ অঘাসুর-বধ। একদিন কৈল মনে, ভোজন করিব বনে, উঠিয়া প্রত্যূষে বিহানে। বেণু করে কল্পি হরি, শিশুগণ সঙ্গে করি, বত্স লৈয়া গেল তব বনে॥ লক্ষ লক্ষ শিশুগণ, লম বয় বিভূষণ, শিঙ্গা বাঁশী বিষাণ কাড়িয়া। সহস্রেক নহে ত্রুটী, লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি, চলে শিশু গোধন লইয়া॥ কৃষ্ণ বত্স রাখে যত, ব্রহ্মা বা গণিবে কত, লিখিতে কে পারে তার অন্ত। বত্স হৃত ছল ধরি, সকল একত্র করি, বত্স রাখে করিয়া আনন্দ॥ বিবিধ বালক লীলা, বহুমত শিশু খেলা, বহুভাতি খেলে শিশুগণ। প্রবাল কুসুম ফল, বনধাতু নবদল, করে শিশু অঙ্গের সাজন॥ কেহ শিক্যা করে ছুরি, কেহ ফেলে দূর করি, পুন দেই হাসিয়া হাসিয়া। কৃষ্ণ যদি দূরে খেলে, ধেয়ে সব শিশু চলে, পুন আসে কৃষ্ণ পরশিয়া॥ আমি পরশিনু আগে, তুমি পরশিলে তবে, এইরূপ আনন্দে বিহরে। কেহ শিঙ্গা বাঁশী ধরে, পক্ষশব্দ কেহ করে, কেহ কেহ নানামত করে॥ কেহ দেখি পক্ষছায়া, তার সঙ্গে চলে ধায়্যা, হংস দেখি হংসের গমন। বক দেখি বক মত, কেব রহে ধ্যানে কত, কেহ ধরে ময়ূর-পেখম॥ বানরের লেজ ধরি, কেহ টানাটানি করি, বানরে টানিয়া ফেলে গাছে। বানর আকার ধরে, তেমতি ভ্রুকুটী করে, লাফে লাফে যায় তার কাছে॥ ভেকের আকার ধরি, যায় নদী জল তরি, শব্দ যে করয়ে উচ্চ করি। নিজ প্রতিধ্বনি শুনি, বলে শিশু নানা বাণী, গালি দেয় ধর মার করি॥ জন্ম কোটি কোটি ধরি, নানা পরবন্ধ করি, কৃষ্ণ লৈয়া খেলে শিশুগণ। দেখি ব্রহ্মজ্ঞানী সব, ব্রহ্মাণ্ডের অনুভব, সাক্ষাতেত তাহার সদন॥ ভক্তজন প্রেম-সুখ, ইষ্টদেব দেখি রূপ, সাক্ষাতে দেখয়ে মূর্ত্তিমান্। মায়ান্বিত নরলোকে, সাক্ষাতে মনুষ্যরূপে, দেখি হরি আনন্দ বিধান॥ লক্ষ কোটি জন্ম ধরি, চিত্ত নিরূপণ করি, তপযোগ সাধন করিয়া। যার এক পদরেণু, না লভে যোগেন্দ্র মনু, খেলে শিশু হেন কৃষ্ণ লৈয়া॥ কি ভাগ্য বর্ণিব তার, হেন কৃষ্ণ সখা যার, ধন্য ব্রজবাসী গোপগণ। এইরূপে শিশু মিলি, বিবিধ কৌতুকে খেলি, দৈত্য আদি করিলা নিধন॥ অঘাসুর নাম তার, মহা দৈত্য ঘোরতর, কৃষ্ণলীলা দেখিতে না পারে। সুরগণ সুরপুরে, চমকিত যায় ডরে, নিরন্তর চিন্তিত অন্তরে॥ কংসের আরতি পায়ে, অঘাসুর আইল ধায়ে, আজি কৃষ্ণ বধিব সঘনে। পূতনা ভগিনী মারে, জ্যেষ্ঠ ভাই বকাসুরে, এই কৃষ্ণে মারিলা আপনে॥ ভাই ভগিনীর ধার, আইলাম শুধিবার, বত্সশিশু করিব নিধনে। তর্পণ করিব যদি, সাধিব সকল সিদ্ধি, ব্রজবাসী মারিব সঘনে॥ পুত্রগত প্রাণ যার, পুত্রদেহ প্রাণ তার, পুত্র বিনে না রহে জীবন। বত্স শিশু যত হরি, যদি মারিবারে পারি, তবেতে মারিব গোপগণ॥ এই মনে যুক্তি করি, সর্প-কলেবর ধরি, যোজনেক হইল বিস্তার। প্রহরের পথ জুড়ি, রহিলেক মুখ মেলি, যেন মহা পর্ব্বত আকার॥ বত্স বালকের সঙ্গে, কৃষ্ণেরে গিলিব রঙ্গে, এই আশা দুষ্টমতি করে। এক ওষ্ঠ পৃথিবীতে, আর ওষ্ঠ আকাশেতে, গিরি-গুহা বদন ভিতরে॥ বিকট দশনপাঁতি, পর্ব্বত-শিখর-ভাতি, উদরভিতর অন্ধকার। রসনা পথেতে পাড়ি, সঘনে নিশ্বাস ছাড়ি, যেন মুখ গহ্বর সঞ্চার॥ দেখি গোপ-শিশুগণে, অপরূপ বৃন্দাবনে, দৃষ্টান্ত করিয়া কথা কয়। কহ দেখি মিত্রগণ, গিলিবারে করি মন, কেবা এই মহাপ্রাণী হয়॥ মুখখান দেখি যেন, রবিজাল রাজা হেন, বিকশিয়া রহে ঠোঁটখান। ভূমিতলে দেখি হেন, ঠোঁট রহে একখান। হয় নয় কর অনুমান॥ দন্তগুলা দেখি যেন, পর্ব্বতের শৃঙ্গ হেন, ভিতরে দেখিয়া অন্ধকার। খরতর বহে বাত, নাকের নিশ্বাস পাত, দেখি হেন জন্তু দুরাচার॥ আছে দুষ্ট ওষ্ঠ মিলে, যদি সভাকারে গিলে, তবু নাহি করিব তরাশ। ইথে তয় না করিব, এ পথ দিয়া না যাইব, বক মত হইবেক নাশ॥ এতেক বচন বলি, দিয়া ঘন করতালি, হাসে কৃষ্ণ-মুখ নিরখিয়া। নিজ নিজ বত্স লৈয়া, প্রবেশ করিল গিয়া, কেহ নাহি বুঝে তার মায়া॥ শিশুগণ না জানিয়া, চলিল আনন্দ হৈয়া, চিন্তে প্রভু এই মনেমন। বত্স শিশু না মরিবে, দৈত্য সংহার হইবে, হেন বুঝি করিব এখন॥ অঘাসুর মহাবলী, কৃষ্ণ সংহারিব বলি, নাহি গেল করিয়া সন্ধান। কৃষ্ণ তবে প্রবেশিল, উদর ভিতর যাইল, তবেত চাপিল মুখখান॥ নকলে অভয়দাতা, অখিল ব্রহ্মাণ্ডপিতা, মনে মনে চিন্তিলা শ্রীহরি। দৈত্যের হরিব প্রাণ, বত্সশিশু-পরিত্রাণ, দুই কর্ম্মের কোন্ কর্ম্ম করি॥ অশেষ করুণাসিন্ধু, অখিল জগতবন্ধু, দৈত্য-মুখে করিলা প্রবেশ। রহিয়া মেঘের আড়ে, যত দেবগণ করে, হাহাকার শবদ-বিশেষ॥ হাসে দুষ্ট দৈত্যগণ, ব্যাকুলিত সাধুজন, ত্রিভুবনে হৈল হাহাকার। চিবায়ে করিব চুর, মনে ভাবে অঘাসুর, মুখখান বুজে দুরাচার॥ বিচারিয়া যদুরায়, বাড়িতে লাগিল কায়, নিরোধিল দৈত্য-দশদ্বার। নড়িতে চড়িতে নারে, ছটফট করি মরে, আঁখি উলটিল সেইবার॥ সকল শরীর ভরি, পবন রোধিল হরি, ব্রহ্মরন্ধ্র ফুটিয়া মরিল। কৃপাদৃষ্টি করি হরি, মরা-বত্স শিশু ধরি, মুখ-পথে বাহির আনিল॥ শ্রীকৃষ্ণের পরশনে, জীব হৈয়া সর্ব্বজনে, দেখে সেই সর্প-অঙ্গজ্যোতি। উঠিল আকাশোপরে, দশদিক্ দীপ্ত করে, পুনর্ব্বার আসি শীঘ্রগতি॥ প্রবেশিল কৃষ্ণ-কায়, বৈকিভাবে মুক্ত তায়, তিনলোক দেখিল সাক্ষাতে। আনন্দিত সুরগণ, করে পুষ্প বরিষণ, স্তুতি ভক্তি কৈল দণ্ডবতে॥ সুরবধুগণ নাচে, বিবিধ বাজনা বাজে, গন্ধর্ব্ব কিন্নর গীত গায়। ব্রহ্মণ মঙ্গল পড়ে, স্তাবকে স্তবন করে, ত্রিভুবনে আনন্দ-উদয়॥ গীত বাদ্য স্তুতি বাণী, ব্রহ্মলোকে হৈল ধ্বনি, ব্রহ্মা শুনি আইল সে স্থানে। আকাশে মঙ্গলে থাকি, প্রভুর মহিমা দেখি, বিস্ময় জানিয়া মনে মনে॥ দেখি সঙ্গী শিশুগণে, আনন্দিত হৈল মনে, মূক্ত হৈল সর্প কলেবর। সুখেতে রহিল বনে, ক্রীড়া করে শিশু গণে, চিরদিন তাহার ভিতর॥ বাল্যকালে এ প্রকারে, ক্রীড়া কৈলা দামোদরে, পৌগণ্ডে কহিবা শিশুগণে। অঘাসুর বধ করি, গো-বালক ত্রাণ করি, আসে কৃষ্ণ নিজ নিকেতনে॥ এ কোন চরিত্র-কথা, অখিল ব্রহ্মাণ্ড-পিতা, শিশু-বেশে পুরুষ প্রধান। অঘা হেন দুরাচার, অঙ্গ পরশিয়া তার, আত্মসাম্য পান বিদ্যমান॥ সিদ্ধ ঋষি মুনিবরে, নাহি পায় ধ্যানে যারে, শুদ্ধভাবে চিন্তি অনুক্ষণ। করিয়া সে শত্রু-ভাব, অনায়াসে করিল লাভ, ব্রহ্মার দুর্লভ যে চরণ॥ নৃপতি বিস্ময় শুনি, পরম সন্দেহ গণি, জিজ্ঞাসিল মুনির চরণে। কুমার কালের কর্ম্ম, কহিল জানিয়া মর্ম্ম, পৌগণ্ড-কালেতে শিশুগণে॥ এত বড় চমত্কার, কহে মুনি যোগেশ্বর, বিষ্ণু-মায়া বিনা নাহি আন। আমি অতি নরাধম, তবু হই ধন্যোত্তম, হরি-কথামৃত করি পান॥ রাজার বচন শুনি, বাহ্য পাসরিল মুনি, আনন্দে পূরিল কলেবর। ক্ষণে অবধান বলি, চাহিল নয়ন মেলি, তবে দিল রাজারে উত্তর॥ অঘাসুর-বিনাশন, বত্সশিশু বিমোচন, গোপাল-চরিত্র-গুণ গাথা। মাধব আচার্য্য কহে, শুনিলে দুরিত দহে, পরম মঙ্গল হরি-কথা॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |