কবি মীর মোশার্রফ হোসেনের কবিতা মিলনসাগরে তুলে, তাঁকে মিলনসাগরের কবিদের সভায় স্থান দিতে
পারায় আমরা ধন্য হলাম। আমরা  
মিলনসাগরে  কবি মীর মোশার্রফ হোসেনের কবিতা তুলে আগামী
প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলেই এই প্রয়াসের সার্থকতা।



উত্স -   
  • দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত "বাঙ্গালীর গান", ১৯০৫।
  • ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্য সাধক চরিতমালা ২য় খণ্ড, ১৯৪০।   
  • মীর মোশারফ হোসেন - বাংলা সাহিত্যের পথিকৃৎ Rajbari-7700, Bangladesh ।   
  • ডঃ শিশির কুমার দাশ, সংসদ সাহিত্য সঙ্গী ২০০৩।           
  • সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, ২০১০।   
  • শ. ম. শওকত আলী, মীর মশাররফ হোসেন।
  • মোঃ তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, রাজবাড়ী জেলার ইতিকথা।
  • এস.এম কামরুল হাসান, বিন্দু বৃত্তান্তে।
  • ডঃ বিষ্ণু বসু সম্পাদিত মীর মশার্রফ হোসেন রচনাসংগ্রহ, প্রথম খণ্ড (১৯৫৭)।  
  • S.K. Bose, Builders of Modern India Bankim Chandra Chatterjee.     
  • উইকিপেডিয়া।   



কবি মীর মোশার্রফ হোসেনের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৩.১.২০১৭                                                            ^^ উপরে ফেরত  
"আয় মা সাধন সমরে" গানটি সংশোধনী - ৭.২.২০২০
...
ব্যক্তিগত জীবন    
পত্র-পত্রিকা    
সাহিত্য    
বঙ্কিমচন্দ্রের সমালোচনা  
সঙ্গীত   
রচনা সম্ভার    
উপসংহার   
একটি সংশোধনী   
*
*
*
*
*
*
*
কবি মীর মোশার্রফ হোসেন - জন্মগ্রহণ করেন
কুষ্টিয়া শহর থেকে তিন মাইল পূর্ব গড়াই ব্রীজের  কাছে
লাহিনীপাড়া গ্রামে, তাঁর মাতামহের বাড়ীতে। পিতা
মোয়াজ্জেম হোসেন এবং মাতা দৌলতুন্নেসা  (দৌলতন
নেছা)। তাঁর বংশমর্যাদা ও পরিচয়ের উপাধি “সৈয়দ”।
কবির প্রপিতামহ সৈয়দ সা’দুল্লাহ বাগদাদ থেকে প্রথমে
দিল্লীতে এসে মোগল সেনা বাহিনীতে যোগদান করেন এবং
পরে তিনি ফরিদপুর  জেলার  স্যাকরা গ্রামে এসে এক
হিন্দু ব্রাহ্মণ কন্যাকে বিবাহ করে বর্তমান রাজবাড়ী
জেলার পদমদী গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
কবি মীর মশাররফ হোসেনের জন্মকাল থেকে মাতামহের মৃত্যুর কিছুকাল পর অবধি, তাঁর পিতা তাঁর
মাতামহের গ্রামেই বসবাস করেছিলেন। তাই তাঁর লেখাপড়া আরম্ভ হয় সেই গ্রামেরই জগমোহন নন্দীর
পাঠশালায়। এরপর অল্পকিছুদিন কুমারখালী এম. এন. স্কুল ও কুষ্টিয়া হাই স্কুলে পড়াশুনা করেন।  ১৮৬০
সালে মা দৌলতুন্নেসার মৃত্যুর পর কবি নিজেদের বাড়ী, রাজবাড়ী জেলার পদমদী গ্রামে ফিরে আসেন এবং
পদমদী হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করতে থাকেন।পরে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। সেই সময়
মীরের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। এ বয়সেই তিনি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। কবি, সম্ভবতঃ অষ্টম শ্রেণীতে
ওঠার পর তিনি কলকাতায় পিতার বন্ধু, তত্কালীন আলীপুরের আমীন, নাদির হোসেনের চেতলার বাসায়
থেকে কিছুকাল পড়াশুনা করেন।
ব্যক্তিগত জীবন                                                                             ^^ উপরে ফেরত  
কবির ব্যক্তিগত জীবনে, কলকাতায় নাদির হোসেনের বাসায় অবস্থানকালে তাঁর বড় মেয়ে  সুন্দরী  
লতিফনের সঙ্গে প্রথমে ভালবাসা এবং পরে বিবাহের আয়োজন করা হয়। কিন্তু বিবাহের সময় নাদির  
হোসেন, প্রথম কন্যার বদলে দ্বিতীয়া ‘কুরুপা ও বুদ্ধিহীনা’ কন্যা আজিজন্নেসার সঙ্গে কবির বিবাহ দেন ১৯শে
মে ১৮৬৫ তারিখে। এই ঘটনার পরিণামে লতিফন্নেসা আত্মহত্যা করেন। মীর ভীষণ আঘাত পান। তাঁদের
প্রতি এই প্রতারণার জন্য তিনি তাঁর স্ত্রী আজিজন্নেসাকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারেন নি। কবির  সেই
বিয়ে সুখের হয়নি। এই বিয়ের আট বছর পর সাঁওতা গ্রামের এক বিধবার মহিলা, কালী ওরফে কুলসুম
বিবিকে কবি বিয়ে করেন। এই ঘটনায় প্রথমা স্ত্রী আজিজন্নেসার সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য আরও বেড়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত মীর মশাররফ হোসেন ঐ এলাকায় বসবাস করতে না পেরে টাঙ্গাইল জেলার গজনবী  এষ্টেটের
এক তরফের ম্যানেজার হয়ে টাঙ্গাইলের  “শান্তিকুঞ্জে” বিবি কুলসুমকে নিয়ে বসবাস করা শুরু করেন।  
তারপর টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার এস্টেটেও তিনি কাজ করেন। দেলদুয়ারে তিনি ম্যানেজার হন ১৮৮৪ সালে।
মীর মশাররফ হোসেনের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, পাঁচ পুত্র ও ছয় কন্যার জননী হন। তাঁর প্রথম পক্ষের স্ত্রীর  
কোনো সন্তান হয়নি।

আজিজন্নেসার মৃত্যুর পর এবং জমিদারদের সঙ্গে বিবাদের কারণে ১৮৯২ সালে দেলদুয়ার এস্টেটের চাকরি
ছেড়ে দিয়ে তিনি পুনরায় লাহিনীপাড়ায় চলে আসেন। কবির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা, তাঁর “বিষাদসিন্ধু”
গ্রন্থটি দেলদুয়ারে থাকার সময়ে লেখা হয়েছিল। জমিদারি এস্টেটে কাজ করতে গিয়ে তিনি জমিদারদের  
ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা, সম্পত্তি লিপ্সা, ষড়যন্ত্র, হিংসা-বিদ্বেষ এবং নানা রকম অনাচার দেখেছিলেন। সে সবের
বিবরণ রয়েছে ‘গাজী মিঞার বস্তানী’ ও ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ বই দুটিতে।

কবি কলকাতায় ছিলেন ১৯০৩ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত। ১৯১১ সালের ১৯শে ডিসেম্বর, রাজবাড়ী জেলার
পদমদী গ্রামে স্থিত নিজের বাড়ীতে মীর মশাররফ হোসেনের মৃত্যু হলে তাঁকে বিবি কুলসুমের কবরের
পাশেই সমাহিত করা হয়।

মীর মোশার্রফ হোসেন, গজনবী ( গজনভী ) এস্টেটের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করার সময়ে সেই এস্টেটের
হাল ধরা ছিল
কবি বেগম রোকেয়ার দিদি তথা স্বর্গীয় জমিদার আবদুল হাকিম গজনভীর স্ত্রী, কবি
করিমুন্নেসা খানমের হাতে। বাংলা সাহিত্যের এই দিকপালদের মধ্যে সাহিত্য তথা অন্যান্য বিষয় নিয়ে  
আলাপ-আলোচনা হয়তো অনেক হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ সেই সব নিয়ে কোনো লেখা, প্রবন্ধ, তথ্য বা
দলিল আমরা এখনও হাতে পাইনি। বিগদ্ধজনেরা, নিশচয়ই এ বিষয়ে আলোকপাত করতে পারবেন।
পত্র-পত্রিকা                                                                                  ^^ উপরে ফেরত  
মীর মশাররফ হোসেন প্রথম জীবনে
কাঙাল হরিনাথের (হরিনাথ মজুমদার)  “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা” (১৮৬৩)
কবি ঈশ্বর গুপ্তের “সংবাদ প্রভাকর” (১৮৩১) পত্রিকায় “কুষ্ঠিয়ার সংবাদদাতা” নামে টুকিটাকি সংবাদ
প্রেরণ করতেন। এই সুবাদে
কাঙাল হরিনাথের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল যা আমৃত্যু বহাল থাকে।
বিবাহের পর লাহিনীপাড়া থেকে প্রথম স্ত্রীর নামে “আজিজন নেহার” নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন
১৮৭৪ সালে। হুগলী কলেজের কিছু মুসলমান যুবকের উদ্যোগও এর পেছনে ছিল। সামান্য কয়েক মাস পর
পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৯০ সালে তিনি পুনরায় লাহিনীপাড়া থেকে “হিতকরী” নামে একখানি পাক্ষিক
পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ পত্রিকার কোথাও সম্পাদকের নাম ছিল না। “হিতকরীর” কয়েকটি সংখ্যা, মীর
মোশার্রফ হোসেনের কর্মস্থল টাঙ্গাইল থেকেও প্রকাশিত হয়েছিল। এই পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন
কুষ্টিয়ার বিখ্যাত উকিল রাইচরণ দাস।
সাহিত্য                                                                                       ^^ উপরে ফেরত  
মীর মশাররফ হোসেন উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তাঁর প্রথম জীবনীকার ব্রজেন্দ্রনাথ
বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বাংলা সাহিত্যে
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি লিখেছেন,---

বাংলা দেশে বাংলা-সাহিত্যে হিন্দু  ও মুসলমানের দান সম্পর্কে যদি স্বতন্ত্রভাবে বিচার করা চলে, তাহা
হইলে বলিতে হবে, এক দিকে
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসগর মহাশয়ের স্থান, অন্যদিকে ‘বিষাদ-সিন্ধু’-প্রণেতা মীর
মশার্রফ হোসেনের স্থান ঠিক অনুরূপ। এ দেশের  মুসলমান সমাজে তিনিই সর্বপ্রথম সাহিত্যশিল্পী এবং
এখন পর্য্যন্ত তিনিই প্রধান সাহিত্যশিল্পী হইয়া আছেন।
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের  ‘সীতার বনবাস’ বাংলা
দেশের ঘরে ঘরে যেমন এককালে পঠিত হইয়াছিল,  বিষাদ-সিন্ধু তেমনই আজও পর্য্যন্ত জাতীয়   
মহাকাব্যরূপে বাঙালী মুসলমানের ঘরে ঘরে পঠিত হয় ;বাংলা সাহিত্যের অপূর্ব সম্পদ হিসাবে সকল
সমাজেই এই গদ্যকাব্যখানির সমান আদর। আর একটি কথা, আজ তাঁহার সম্পর্কে আমাদের স্মরণীয় ---  
তিনি জীবনে এবং সাহিত্যে সকল সাম্প্রদায়িকতার ঊর্দ্ধে ছিলেন, হিন্দু মুসলমান --- বঙ্গমাতার এই দুই
বিবদমান সন্তানের মিলন-সাধনের জন্য আজীবন চেষ্টা করিয়া গিয়াছেন
।”

তাঁর লেখকজীবন শুরু হয় সুখপাঠ্য উপন্যাস “রত্নাবতী” (১৮৬৯) প্রকাশনার মধ্য দিয়ে।


তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা, কারবালার করুণ ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে রচিত উপন্যাস “বিষাদ সিন্ধু”। ১৮৮৫ সালে
প্রকাশিত হয় বিষাদ সিন্ধুর মহরম পর্ব, ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত হয় উদ্ধার পর্ব এবং ১৮৯১ সালে প্রকাশিত
হয় এজিদ পর্ব। এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।
শিশিরকুমার দাশ লিখেছেন, “...
কারবালা প্রান্তরের ট্রাজিক কাহিনীকে রচনার গুণে তিনি বাঙালীর অন্তরের সামগ্রীতে পরিণত করেছেন। ...
বঙ্কিমসৃষ্ট সাহিত্যধারা থেকে পৃথক পথের যাত্রী হবার সচেতন চেষ্টা দেখা যায় তাঁর লেখায়”।
বঙ্কিমচন্দ্রের সমালোচনা                                                                 ^^ উপরে ফেরত  
সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু তাঁদের সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান গ্রন্থে লিখেছেন, “যাঁরা সাহিত্যকে
কৃষক সংগ্রামের হাতিয়ার করতে চেয়েছিলেন, মীর মোশার্রফ হোসেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম”। ১৮৭২ সালে,
১৮৭২-৭৩ সালের পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জের পাট-চাষীদের বিদ্রোহ নিয়ে তিনি “জমিদার দর্পন” নাটক লিখে
সেকালে, অন্যতম শ্রেষ্ট নাট্যকারের মর্যদা লাভ করেন। এ জন্য অনেকেই তাঁকে নীলদর্পণের রচয়িতা
কবি
দীনবন্ধু মিত্রের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। সাহিত্যের দিক দিয়ে উচ্চ প্রশংসা করলেও, কৃষক বিদ্রোহে উস্কানী
দেওয়ার ভয়ে
বঙ্কিমচন্দ্র, “বঙ্গদর্শন” পত্রিকায় নাটকটির প্রকাশ ও অভিনয় বন্ধের সুপারিশ করেছিলেন।
বঙ্গদর্শন পত্রিকার ভাদ্র ১২৮০ (সেপ্টেম্বর ১৮৭৩) সংখ্যার, প্রাপ্তগ্রন্থের সংক্ষিপ্ত সমালোচনা তে
বঙ্কিমচন্দ্র
লেখেন ---

.        “জনৈক কৃতবিদ্য মুসলমান কর্ত্তৃক এই নাটকখানি বিশুদ্ধ বাঙ্গালা ভাষায় প্রণীত হইয়াছে। মুসলমানী
বাঙ্গালার চিহ্নমাত্র ইহাতে নাই। বরং অনেক হিন্দুর প্রণীত বাঙ্গালার অপেক্ষা, এই মুসলমান লেখকের  
বাঙ্গালা পরিশুদ্ধ।
.         জমীদারদিগের অত্যাচারের উদাহরণের দ্বারা বর্ণিত করা উহার উদ্দেশ্য। নীলকরদিগের সম্বন্ধে  
বিখ্যাত নীলদর্পণের যে  উদ্দেশ্য ছিল, সাধারণ জমীদার সম্বন্ধে ইহারও সেই উদ্দেশ্য।
.        এই দর্পণে জমীদারের যে প্রতিবিম্ব পড়িয়াছে, তাহা বিকৃত  কি প্রকৃত সে বিষয়ের আমরা কিছু মাত্র
আলোচনা করিতে চাহি না এ তাহার সময় নহে। বঙ্গদর্শনের জন্মাবধি, এই পত্র প্রজার হিতৈষী।  এবং  
প্রজার হিতকামনা আমরা কখন ত্যাগ করিব না। কিন্তু আমরা পাবনা জেলায় প্রজাদিগের আচরণ শুনিয়া
বিরক্ত এবং বিষাদযুক্ত হইয়াছি। জ্বলন্ত অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেওয়া  নিষ্প্রয়োজনীয়। আমরা পরামর্শ দিই যে
গ্রন্থকারের এ সময়ে এ গ্রন্থ বিক্রয় ও বিতরণ বন্ধ করা কর্ত্তব্য।
.        কিন্তু সমালোচনা করিতে প্রবৃত্ত হইয়া ইহা আমাদিগের বলা কর্ত্তব্য যে নাটকখানি অনেকাংশে ভাল
হইয়াছে। আমরা প্রজা, জমীদারের কথা বলিতে চাহি না, কিন্তু ইহা বলিতে পারি যে শেসন আদালতের  
চিত্রটি অতি পরিপাটি হইয়াছে। তদংশ উদ্ধৃত করিবার ইচ্ছা ছিল, স্থানাভাব প্রযুক্ত পারিলাম না। কিন্তু
সরোজিনী নাটকের ন্যায়, ইহাতেও অনেক পরিহার্য্য কথা সন্নিবেশিত হইয়াছে।”

কোনো লেখা পড়ে বঙ্কিমচন্দ্র, প্রকৃত সুখানুভূতির ভিতর দিয়ে না গেলে, গ্রন্থের ভাষা ও রচনার এত উচ্চ
প্রশংসা করতেন না। কোনো সন্দেহ নেই, মীর মোশার্রফ হোসেন তাঁর লেখনীর দাপটেই
বঙ্কিমচন্দ্রের কাছ
থেকে এমন একটি উচ্চ প্রশংসা-যুক্ত সমালোচনা আদায় করে নিয়েছিলেন। কিন্ত আমাদের চিন্তায় ফেলে
তাঁর “গ্রন্থ বিক্রয় ও বিতরণ বন্ধ করা কর্ত্তব্য”-পরামর্শ দানে! যে
বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্রর “নীলদর্পণ”-এর
প্রচার ও প্রসারে আনন্দিত হয়েছিলেন, তিনিই কেন মীর মোশার্রফ হোসেনের “জমীদার-দর্পণ” কে এ ভাবে
বন্ধ করে দিতে চাইছিলেন?
সঙ্গীত                                                                                         ^^ উপরে ফেরত  
“মশা বাউল” ভণিতায় তিনি কয়েকটি উত্কৃষ্ট বাউল গীত রচনা করেছিলেন। তার মধ্যে “রবে না দিন  
চিরদিন, সুদিন কুদিন” বাউল গানটি লিখে
কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের “ফিকিরচাঁদ ফকিরের” বাউল দলের
সদস্য হয়ে যান। সংগীত সম্বন্ধে মীরের বেশ ভাল জ্ঞান ছিল। তাঁর “সংগীত লহরী” গ্রন্থে বিভিন্ন তালের
অনেকগুলি উত্কৃষ্ট সংগীত রয়েছে।
রচনা সম্ভার                                                                                ^^ উপরে ফেরত  
মীর মশাররফ হোসেনের রচনাসম্ভার বিশাল।

তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে “রত্নবতী” (১৮৬৯), “বিষাদ-সিন্ধু” (ঐতিহাসিক উপন্যাস ১৮৮৫-৯১),
“বাঁধাখাতা” (১৮৯৯), “নিয়তি কি অবনতি” (১৮৯৯), “রাজিয়া খাতুন” (১৮৯৯), “তহমিনা” (১৮৯৯) প্রভৃতি।

নাটকের মধ্যে রয়েছে “জমিদার দর্পণ” (১৮৬৯), “বসন্ত কুমারী” (১৮৭৩) প্রভৃতি।

প্রবন্ধ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “গো-জীবন” (১৮৮৯), “হযরত বেলালের জীবনী” (১৯০৫), “হযরত ইউসোফ (১৯০৮),
“এসলামের জয়” (১৯০৮) প্রভৃতি।

জীবনীমূলক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “উদাসীন পথিকের মনের কথা” (১৮৯৯), “বিবি কুলসুম” (১৯১০)
এবং “আমার জীবনী” (আত্মজীবনী ১৯০৮-১০)।

রম্যরচনার মধ্যে রয়েছে “গাজী মিয়ার বস্তানী” (১৮৯৯), “গাজী মিয়ার গুলি” প্রভৃতি।

প্রহসন গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “এর উপায় কি” (১৮৭৬), “ভাই ভাই এইত চাই” (১৮৯৯), “ফাঁস কাগজ” (১৮৯৯),
“এ কি!” (১৮৯৯), “টালা অবিনয়” (১৮৯৯) প্রভৃতি।

ছাত্র ও শিশুপাঠ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “মুসলমানের বাঙ্গালা শিক্ষা” (ছাত্র পাঠ্য ১ম ভাগ ১৯০৩ এবং দিত্বীয়
ভাগ ১৯০৮), “বৃহত হীরক খনি” (শিশু পাঠ) প্রভৃতি।

সঙ্গীত ও কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “গড়াই ব্রীজ বা গৌড়ী সেতু” (১৮৭৩), “সঙ্গীত লহরী” (১৮৮৭), “বেহুলা
গীতাভিনয়” (গীতিনাট্য ১৮৮৯), “মৌলুদ শরীফ” (গদ্যে-পদ্যে লিখিত ধর্মীয় গ্রন্থ ১৯০০), “বিবি খোদেজার
বিবাহ” (১৯০৫), “হযরত ওমরের ধর্ম জীবন লাভ” (১৯০৫), “হযরত আমীর হামজার ধর্ম জীবন লাভ” (১৯০৫),
“মদিনার গৌরব” (১৯০৬), “মোশ্লেম বীরত্ব” (১৯০৭), “বাজীমাত” (১৯০৮), “খোতবা বা ঈদুল ফিতর” (১৯০৮),
“পঞ্চনারী”, “প্রেম পারিজাত” প্রভৃতি।
উপসংহার                                                                                   ^^ উপরে ফেরত  
তাঁর গদ্য ছিল বিশুদ্ধ বাংলা যা সেকালের অনেক বিখ্যাত হিন্দু লেখককেও টেক্কা দিয়েছে। তাঁর কাব্য
তেমন সমাদর পায়নি। তাঁর রচনার প্রায় অর্ধেকই কাব্য হলেও তিনি কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করতে
পারেন নি। তাঁর কোনো গান বা কবিতা আমরা, সেযুগ বা এ যুগের কোনো কাব্য সংকলনের মধ্যে পাইনি,
যা আমাদের হাতে এসেছে।  

ব্রিটিশের ছোঁয়ায় বাঙালী তখন আধুনিকতার স্বাদ পেয়েছে এবং সেই ছোঁয়ার ফলেই অন্তরে বপন হচ্ছে
স্বাধীনতার বীজ, কি হিন্দু কি মুসলমান। কবি মীর মোশার্রফ হোসেন বাংলার ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণের
মানুষ যখন হিন্দু আর মুসলমান দুই সম্প্রদায়ই পরস্পরের কাছে আসার চেষ্টায় মগ্ন ছিল। এঁরা কেউই তখন
জানতেন না যে তাঁদের সেই ভাবনায় প্রথম কুঠারাঘাত আসতে চলেছে আর মাত্র বছর কুড়ির মধ্যেই, লর্ড
কার্জনের বঙ্গভঙ্গের চেষ্টার মধ্য দিয়ে!   

মিলনসাগরের বাংলার কবিদের কালানুক্রমিক সূচীটি আসলে বাঙালীর ( যাঁরা যবে থেকে বাংলা ভাষাকে
নিজেদের ভাষা হিসেবে জেনেছেন ) ইতিহাসের কালানুক্রমিক সূচী! আমাদের সৌভাগ্য এই যে বাঙালী
জাতির প্রায় সব্বাই, জীবনে দু এক লাই কবিতা বা গান লিখে থাকেন! ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বরাও এর থেকে
বাদ যাননি! তাই এই সব ঐতিহাসিক ব্যক্তিদেরও, তাঁদের রচিত কবিতা-গানের মাধ্যমে, মিলনসাগরের
কবিদের সভার সূচীতে ধরা সম্ভব হয়।
একটি সংশোধনী                                                                          ^^ উপরে ফেরত   
মীর মোশার্রফ হোসেনের গানের মধ্যে "আয় মা সাধন সমরে" গানটিকে আমরা নিয়েছিলাম তাঁর জীবনীমূলক
গ্রন্থ “উদাসীন পথিকের মনের কথা”-র গান হিসেবে। ডঃ বিষ্ণু বসু সম্পাদিত মীর মশার্রফ হোসেন
 
রচনাসংগ্রহ, প্রথম খণ্ডে (১৯৫৭) এই রচনাটি গান সমেত রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদেরই ভুলে
গানটিকে মীর মোশার্রফ হোসেনের রচিত গানের মধ্যে ধরা হয়েছিলো। আসলে গানটি
 পাঁচালীকার  
রসিকচন্দ্র রায়ের রচিত একটি গান। গানটি রয়েছে "রসিকচন্দ্র" ভণিতাসহ, দুর্গাদাস লাহিড়ী সংকলিত ও
সম্পাদিত
"বাঙ্গালীর গান" সংকলের ৪২৭-পৃষ্ঠায়।

আমরা কৃতজ্ঞ শ্রী সুব্রত মজুমদারের কাছে যিনি আমাদের এই ভুলটি সংশোধন করিয়ে দিয়েছেন।
তাঁর ইমেল -
subrata.mjder@gmail.com   

মিলনসাগরে রসিকচন্দ্র রায়ের কবিতা-গানের পাতা এখনও তৈরী হয় নি। তাই আমরা গানটি যথাস্থানে
 
রেখেই আমাদের সংশোধনীটি উল্লেখ করছি।
*