কবি ভবতোষ শতপথীর কবিতা
*
অগ্রগতি
কবি ভবতোষ শতপথী
অরুণকুমার দে প্রকাশিত ১৯৮৮, কাব্যগ্রন্থ “অরণ্যের কাব্য” থেকে নেওয়া।


রাজপথে মজা দেখা                দূরে দাঁড়িয়ে
ড্রাগের নেশায় শেষ                 সীমা ছাড়িয়ে
রাস্তায় জানজট                     ভীড় এড়িয়ে
আমরা পৌঁছে যাবো                দুই হাজারে।

ভুখাদের খালি পেটে                লাথির চোটে
ফাইলের দাবী দাওয়া               দু’হাতে ঘেঁটে
প্রগতির পাশপোর্ট                  পাবার পরে
আমরা পৌঁছে যাবো                দুই হাজারে।


ভাড়া ঘরে ভাবাবেগ                রঙিন নেশা
টি, ভি, খোর বিবিদের             রং তামাশা
সমাজের চারপাশে                 পাঢ় কুয়াশা
বিড় বিড় করে বুড়ী                বাজার ঘুরে
তেল নেই আতেলের                 রান্না ঘরে।

পরিণয় বিপণন                     পণের প্রথা
কাগজের মগজের                   ভর্তি-পাতা
ললিত কলার                        কাটা লেজুর ধ’রে
আমরা পৌঁছে যাবো                দুই হাজারে॥

.                   *****************

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একটা হৃদয়
কবি ভবতোষ শতপথী
অরুণকুমার দে প্রকাশিত ১৯৮৮, কাব্যগ্রন্থ “অরণ্যের কাব্য” থেকে নেওয়া।


একটা হৃদয়, সাত সমুদ্র,
.             তেরো নদী,
দু’চোখ জুড়ে, দশ দিগন্ত
.              জন্মাবধি !

একটা জীবন, বাজিকরের
.            আজব খেলায়
এক ভীড় লোক জমিয়ে রাখে
.               মুখর মেলায়।

একটা মানুষ সোনার হরিণ
.                  অন্বেষণে,
শহরতলীর রাস্তা খোঁজে
.                আপন মনে।

ভালোবাসার নেশায় বেহুঁশ
.                 যখন তখন,
ইস্টিশনে বাউণ্ডুলে
.                 রাত্রি যাপন।

একটা ফাগুন পুড়ছে
.               বুকের লাল আগুনে
একটা জীবন ছুটছে
.                জনস্রোতের টানে

হলুদ রোদের আয়না ভাঙে
.                ভোর দুপুরে,
মোহিনী মুখ হঠাৎ হারায়
.               মেলার ভীড়ে।

.                   *****************

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আগামীকাল
কবি ভবতোষ শতপথী
অরুণকুমার দে প্রকাশিত ১৯৮৮, কাব্যগ্রন্থ “অরণ্যের কাব্য” থেকে নেওয়া।


কামড়ে ধরেছি কাঁটা চাবুক
প্রাণ চেতনায় দিয়েছি শান
আগুন আবেগে জ্বলছে বুক
মাটির মুলুকে কবি-কিষাণ।

ক্ষত-বিক্ষত ক্ষেত-খামার
উপোসী উঠোনে তামসী রাত
জন-সমুদ্রে জাগে জোয়ার
দু’বেলা দু’মুঠো জোটাতে ভাত।

কৃষক শ্রমিক করছে কাজ
ঝরছে রক্ত, ঝরছে ঘাম
ভয়ে পলাতক মামলা বাজ
হামলা করছে কেনা গোলাম।

উঠছে সূর্য লাল সকাল
মানুষে মানুষে ঐক্য চাই।
সামনে সুদিন আগামীকাল
সংগ্রাম ছাড়া উপায় নাই॥

.                   *****************

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
স্বগত সংলাপ
কবি ভবতোষ শতপথী
অরুণকুমার দে প্রকাশিত ১৯৮৮, কাব্যগ্রন্থ “অরণ্যের কাব্য” থেকে নেওয়া।


যতই জ্বালাও, পোড়াও, হে চণ্ডাল
পুড়বে না হাড়, দরিদ্র দধীচির।
বজ্র বানাবে বিদ্রোহী মহাকাল
সৃস্টির বুকে অবিরাম অস্থির।

সবেগে ভেঙেছে মন্দির মসজিদ
পাষাণ দেবতা, পলাতক পুরোহিত,
দুশ্চিন্তায় দু’চোখে আসে না নিদ্
বর্বরতায় ভুলে গ্যাছে হিতাহিত।

ঘাত - প্রতিঘাতে উদ্দাম দাম্ভিক !
বিষধরসহ করে সদা সহবাস !
সূর্য তাপস ভোরের বৈতালিক
করেছে রচনা অনন্য ইতিহাস।

সাহারার বুকে বেঁচে আছে বহুদিন
ধূ ধূ মরুভূমি ভাবাবেগে ভালোবেসে—
অতৃপ্ত প্রেম স্মৃতির অতলে লীন
বিষন্নতার দুঃসহ উপবাসে !

স্বকাল পুরুষ সংগ্রামী দুনিয়ার,
পরিচয়হীন মানুষের দাবীদার।

.                   *****************

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
হিড়ের উপ্ রে কাঁদে
কবি ভবতোষ শতপথী
অরুণকুমার দে প্রকাশিত ১৯৮৮, কাব্যগ্রন্থ “অরণ্যের কাব্য” থেকে নেওয়া


হিড়ের উপ্ রে কাঁদে আলছানা,  ঘাঁসের বিছ্ নায়
আয় দুধ দিয়েঁ যা মা, তবে ঘুমাবেক্ কিছুখন্
একদিনে টানা রুয়া, গটাদিন জলে ওকাদায়
তলা গূঢ়্ হা, রুয়া বিলে, আনাগনা বড় জ্বালাতন।

শরাবন মাঁসে ভিজ্যেঁ যে ছানাটা মানুষ হয়েঁছে
জ্বল্যেঁ-পুড়্যেঁ গেছে নাড়ী ভর্ খর্ ভাদরের ভখে
কড়্ রা-পড়া তার হাতে ভাঁঙা জমি সিল্ সিলাট্ হছে
ভিথা ছাঁট্যেঁ, আড়্ ধব়্যেঁ, চাষার ছানাটা চাষ শিখে।

গতর খাটায়ঁ খায়, ভাগচাষী, গরীবেই বঠে
ভাড়্যেঁ-ভুড়্যেঁ মাহাজনী,  ধঁখা দিয়েঁ নাঁয় হক ধনী
খুখ্ ঢ়া-ডাকা ভউরে উঠ্যেঁ ঘরগুষ্ঠি একসঁঘে খাটে
পেটভরা মাঁড়-ভাথ, মটা-রঠা তাঁতি বুনা ভুনি।

সুদখোরি মাহাজনী, বড়লকি মুখের ফুটানি।
ছাথির ভিথরে জ্বলে ধিক্ ধিক্ তুঁষ্যের আঁগুন
লক ঠকাবার ঠাঠ, জুহাচরি হয় জানাজানি
গরীব গেড়ায়ঁ খায়, লাজ নাঁয়, মুঁহে কালিচুন॥

.                   *****************

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
খর্ হা
কবি ভবতোষ শতপথী
অরুণকুমার দে প্রকাশিত ১৯৮৮, কাব্যগ্রন্থ “অরণ্যের কাব্য” থেকে নেওয়া


খর্ হা খর্ হা খর্ হা
শুখাঁয় গেছে নাড়ি-ভুঁড়ি
চইখে নাযঁখ ধার্ হা

মইর্ ছে মইর্ বেক চাষাভুষা
চইল্ বেক মাহাজনী
ছাগল-ভেড়া, গরু-কাড়া
হাট চালায় আমদানি।

গহনা-গাঁঠি ঘটি-বাটি
বন্ধক দিয়েঁ দিয়েঁ
রুঁজি পুঁজি সউব্ সিব়্যাল
পড়া পেটের দায়ে।

খাতে নাঁয় পাঁয় মইর্ ল তাঁতি
কানা গণক ঠাকুর
জ্যাত মইর্ ল ন মানুষ মইর্ ল
ভাইল্ ছে নাঁয় কেউ চতুর।

খর্ হা খর্ হা খর্ হা
ডেড় বিঘা চাষ শুখ্ না উপাস
ইপাশ-উপাশ মরা।

শুখাঁয় শুখাঁয় মইর্ ছে মানুষ
বার বন্নি জ্যাত
ভখা-দুখা গুইটায়ঁ লেইগ্ ছে
আঁইঠা-জুঁঠা ভাত॥

.                   *****************

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দর্ মরা দিন
কবি ভবতোষ শতপথী
অরুণকুমার দে প্রকাশিত ১৯৮৮, কাব্যগ্রন্থ “অরণ্যের কাব্য” থেকে নেওয়া


নিজের চইখে দেখেঁ আল্ হি, মায়রে দাদা।
চিকন চেম্ নার চাম্ ড়া ছুইল্ ছে, চামটু লধা !
বকা-ভখা ভুলায়ঁ ভালায়ঁ ভট্ লিয়েঁ
হল্ হল্যা সাপ চক্ কর তুইল্ ছে, খরিস হয়েঁ।

কি বইল্ ব আর, তর-হামার দুখের-কথা
ধূলা জব্ রায় লট্ পটাছি ছঁছলাতা
পেটে নাঁয় ভাত, পর্ হা পঁচা-ছিঁড়্ হা টেনা
হরিবল্ দে ! গরীব গাঁয়ের ছানাপনা।

বাজে ঢাক ঢোল, ভিতরে খোল, কঠিন কাইদা,
চ্যার্ ধারে ফাঁক, দুয়ার গড়ায় আঁক বাঁধা
কেউ বুঝে, কেউ বুইঝ্ তে লারে লৈতন কথা
হাঁইস্ তে হাঁইস্ তে, কাইশ্ তে কাইশ্ তে পেটব্যথা।

কঠিন লক্ টা টেরায়্ ভালে ভিথরে ভিথরে
হাম্ কে দেখ্যেঁ অনেক রকম ভাভ্ না করে
নাঁয় চাষবাস, শুখ্ না উপাস গরীব জীবন
আজ মাঁসভাথ কাইল্ কে হাভাথ !  ঘুইর্ ব ঢন্ ঢন্ ॥

.                   *****************

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পৌষের পদাবলী
কবি ভবতোষ শতপথী
অরুণকুমার দে প্রকাশিত ১৯৮৮, কাব্যগ্রন্থ “অরণ্যের কাব্য” থেকে নেওয়া।


কিষাণী লো তুই শান্ দিয়ে আন কাস্তে খান,
তপ্ত হাতুড়ি উঠছে পড়ছে লাল আশায়।
ঘাম ঝরা দিনে দাউ দাউ জ্বলে মাটির টান
গরীব গ্রামের গতর খাটানো ভালোবাসায়।

শহরতলীর হাটে কিনে দেব লাল শাড়ি
রূপের হাঁসুলী গড়াবো দু’কুড়ি দশ টাকায়।
ফসল উঠলে সাজাবো এবার ঘরবাড়ি
রূপশালী ধান শুকোবি উঠোনে সারা বেলায়।

কিষাণী লো তোর অধিক আদরে ভালোবাসায়
করুণ কুটিরে বাঁধা পড়ে আছি সারা জীবন।
দিপির দিতাং মাদল বাজাই ধেনো নেশায়
দেহাতী প্রেমের মৌন সাক্ষী মহুয়াবন।

ডুংগরীর ধারে ডুলুং-এর তীরে দুখিনী গ্রাম,
ঝুমুর শোনায় পাকা পৌষের প্রত্যাশায়।
মাধুরী মাহাতো, চম্পা সরেণ, অনেক নাম
আত্মীয়তার ঘনিষ্ঠ সুখ পৌষ-মেলায়।

.                   *****************

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পরের ঘর
কবি ভবতোষ শতপথী
অরুণকুমার দে প্রকাশিত ১৯৮৮, কাব্যগ্রন্থ “অরণ্যের কাব্য” থেকে নেওয়া


সবুজ শাঢ়্ হি রেশমী চুড়ি
কিন্যেঁ দিলিস্ নাঁয়
বাঁদ্ না পরব সিরায়ঁ গেল
লিতে আলিস্ নাঁয়
চাষা ভুষা বাপ
বড় ঘরে বিহা দিয়েঁ কইর্ ল বেদম পাপ।

খিঢ়্ কি ধারে মস্ত পখ্যর রুই-কাতলা মাছ
বেজায়ঁ জমিন মুনিস-কামিন, দশটা হালের চাষ
পাড়া গাঁয়ের বিটি
শহর আস্যেঁ যেঠিন সেঠিন বেদম্ বজ্ ড়ায়ঁ হছি।

তসর কাপড় খসর্-মসর্
লৈতন বিছা হ্যার
কামড়াছে আর অসজ লাইগ্ ছে
হিঁসকা নাঁয় হামার।
চিকন বিছনা পাতা—
কুথায় গেল বাপের ঘরের
মইলা ছিঁঢ়্ হা কাঁথা।
মনে পইড়্ ছে ভখা-দুখা-বাপের ভাঙা ঘর
তিতা লাইগ্ ছে ভাত তরকারী ধান-মরা বছর॥

.                   *****************

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বাক – প্রতিমা
কবি ভবতোষ শতপথী
অরুণকুমার দে প্রকাশিত ১৯৮৮, কাব্যগ্রন্থ “অরণ্যের কাব্য” থেকে নেওয়া।


শব্দ শৃংগার
ভাবের ভৃংগার
বীণার ঝংকার
.        ঝংকৃত।

শুভ্র সুষমায়
শিল্প চেতনায়
বিশ্ব চরাচর
.        চিত্রিত।

কাকলি কলতান
ভাসানে ভাসমান
বেদনা বেদগান
.        মূর্চ্ছণা।

আহত দুই তীর
সতত অস্থির
মৌন মুখরিত
.        ব্যঞ্জনা।

দীর্ঘ কেশপাশ
কবরী বিন্যাস
কবি কি ক্রীতদাস
.        বঞ্চিত ?

লুপ্ত তপোবন
সুপ্ত ত্রিভুবন
কামিনী কাঞ্চন
.        সঞ্চিত।

স্তনিত দেহভার
সুরেলা শীতকার
অশুভ অভিসার
.        স্তম্ভিত।

অসুখী শয্যায়
প্রহর কেটে যায়
মানুষ অসহায়
.        বিব্রত।

.           *****************

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর