কবি ভবতোষ শতপথীর কবিতা
*
অরণ্যের কাব্য
কবি ভবতোষ শতপথী
অরুণকুমার দে প্রকাশিত ১৯৮৮, কাব্যগ্রন্থ “অরণ্যের কাব্য” থেকে নেওয়া।


প্রথম প্রবাহ


আজন্ম অরণ্যচারী ছিন্নমূল লোধা নর-নারী
কুড়ায় জ্বালানী কাঠ, শিকড়-বাকড় ধন্বন্তরী
রৌদ্রদগ্ধ দ্বিপ্রহরে অর্ধমৃত ক্ষুধায় তৃষ্ণায়
কন্দমূল ছিঁড়ে-খোঁড়ে, নিদারুণ জঠর জ্বালায়।

আসন্ন প্রসবা নারী, যৌবনের ম্লান যবনিকা,
অনাহারে জীর্ণশীর্ণ অনিশ্চিত জীবন-জীবিকা
বাঁচার সংগ্রাম করে সারাদিন বিরামহীন
ভূমিহীন ভূমিকায় অপরাধী লোধা অর্বাচীন।

স্বদেশের সংবিধানে, ইতর, তস্কর, ছোট জাত
কান্নাঘরে চুরি ক’রে চুপি চুপি খায় ফেনভাত
প্রহারের ভয়-ডর করে না পেটের তাড়নায়
চোখা চোর কেটে পড়ে: ভুখা চোর ধরা পড়ে যায়।

শতাব্দীর মুক্তি-সূর্য আদিগন্ত করে পরিক্রমা
দারিদ্রের চতুর্দিকে নির্ধারিত সতর্কের সীমা
চতুর ময়ূরপুচ্ছধারী হাস্যকর দাঁড়কাক
পুচ্ছ তুলে নাচে ছি- ছি !  বাজে লজ্জাহীন জয়ঢাক।

সুধীবৃন্দ, সুধা-ভাণ্ড পরস্পর ভাগ করে লয়
নির্বোধরা প্রতিদিন বিষপানে নীলকন্ঠ হয় !
বর্ণময় অট্টালিকা নিহত নিসর্গ-অন্তরালে
ছিন্ন শাল-মহুলের শবদেহ ব্যবচ্ছেদ চলে।
ছিদ্রপথে মুদ্রাস্ফীতি বাস্তু উচ্ছেদের বিবরণ
ধ্বংস করে বৃক্ষ-বংশ, অরণ্যের লাবণ্য-লুন্ঠন।

আমি দেখি বিশ্বরূপ নিঃস্ব মানুষের মাঝখানে
সীমাহীন বিষাদের ছায়ান্তর নিষাদ-নির্জনে
উল্লাসিত জহ্লাদের পৈশাচিক প্রবল হুংকার
লোধা বধ, বধ্যভুমি, দু’হাতে রক্তাক্ত হাতিয়ার।

মহাকাব্যে উপেক্ষিত একলব্য, দ্রোণ সন্নিধানে
তন্ময় মৃন্ময় মূর্তি গড়েছিল একান্ত নির্জনে
গুরুর গুরুত্বহীন শিষ্য-শোষণের সুকৌশল
নির্দয় দক্ষিণা দাবী, বৃদ্ধাঙ্গুলি, বীরের সম্বল।

একদা অনার্য-আর্য জাতি ভেদে, আর্য-উত্পীড়নে
অনার্য অরণ্যবাসী হীনমন্যতার নির্বাসনে
বীরসার বিচিত্রবীর্য ! বিদ্রোহীর বংশ পরম্পরা
পৃষ্ঠদেশে ধনুর্বাণ জাগে অগণিত সর্বহারা !

যৌবনে বাঁধে নি ঘর যাযাবর, প্রৌঢ়ে পরবাসী
বৃদ্ধকালে চলে যায়, মক্ কা-মদিনায় কিংবা কাশী
অজ্ঞাত জন্মের সূত্র: গোত্র পিতৃ পরিচয়হীন ----
বিক্ষত হয়েছে শুধু বিখ্যাত হবে না কোন দিন।


হে প্রিয় অরণ্যময়ী !  মৃন্ময়ী প্রতিমা জন্মভূমি,
অশ্রু রক্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়া, আর কি দেব প্রণামী ?
দু’চোখে বিবর্ণ দৃশ্য !  শস্যহীন ধূসর প্রান্তর
বৃষ্টিহীন সৃষ্টিহীন আসে ভয়ংকর মন্বন্তর।

লোধার লালিতা কন্যা ললিতার প্রণয়ভাজন
পুরাকালে ছিলো নাকি বিশ্ববসু নামক ব্রাহ্মণ
অসবর্ণ বিবাহের পুরাণে বর্ণিত পূর্বরাগ
একালের কিংবদন্তী,  দুঃসহ দিনের দায়ভাগ।

বিয়োগান্ত বিস্মৃতির রসাতলে প্রেম উপাখ্যান
সেকাল ও একালের মাঝখানে দীর্ঘ ব্যবধান
অমাসক্ত আদিরস, দ্বিধাগ্রস্ত দাম্পত্য-প্রণয়.
সর্বিগ্রাসী ক্ষুধানল গ্রাস করে লজ্জা –ঘৃণা –ভয়।

মহাকবি, মহাকাব্য, একালের অলীক কল্পনা
খণ্ডবাদী জীবনের দৈনন্দিন দণ্ডিত চেতনা
মানুষ অস্থিরচিত্ত !  সমস্যায় জর্জরিত দেশে
নির্যাতিত নিপীড়িত নিরন্নেরা ভীড় করে আসে—

অসভ্যের সভাকবি মানিনা নিষিদ্ধ কালাকাল
ব্রাহ্মণের পৈতা ছিঁড়ে হাহাকারে হয়েছি চণ্ডাল !
বেদাবেদ, ভেদাভেদ, বিসর্জন দিয়ে সিন্ধুজলে
মুণ্ডিত মস্তকে শেষে মিশে গেছি দরিদ্রের দলে।

বাস্তবের বেত্রাঘাতে বিপর্যস্ত জীবন-যন্ত্রণা
প্রতিশ্রুতি, প্রলোভন, বহুমুখী শোষণ-বঞ্চনা
আত্মাহুতি দিতে হবে আমৃত্যু আগ্নেয় তপস্যায়
ছন্নছাড়া নরনারী অগ্নিকুণ্ডে ইন্ধন যোগায়।

মনুষ্য সমাজে যারা বিত্তে, দেবত্বের দাবী করে
দলিলে স্বাক্ষর কার ? স্বৈরাচারী কালের প্রহারে
বৈভবের দৈববল ঘৃণা করি,  চাই বাহুবল
কতদিনে রাহুমুক্ত হবে এই অরণ্য অঞ্চল।

ললনা ললিতকলা, রজঃস্বলা জটিল জঙ্গলে
সৃষ্টির মিথুন-লগ্ন আসে লতাগুল্মের আড়ালে
কাঠফাটা রৌদ্রে আহা ! কাট-কাটা পুরুষ রমণী
ঘুঘু-ডাকা নির্জনতা ভেদ করে কুঠারের ধ্বনি।

শবরীর গর্ভজাত জঙ্গলের উলঙ্গ জাতক
জৈবিক নিয়মে জন্মে যত্র-তত্র ক্ষুব্ধ মানবক
কুন্ঠিত কৌপীনধারী যুবকের দুরন্ত যৌবন
উদ্ভিন্ন যৌবনা বন্য যুবতীর অনাব়ৃত স্তন
অনাহারে অত্যাচারে অবসন্ন নয় কোনদিন
আশ্চর্য জীবনীশক্তি, সহিষ্ণুতা তুলনাহীন।

নিষ্ঠুর কুঠারাঘাতে ছিন্নভিন্ন বনরাজি নীলা
অবলুপ্ত শালবন কেঁদ্-ভুঁড়্ ক কুর্চি ও কুচিলা
শিমুল মহুল আম চিরতরে সমূলে নির্মূল
কাকলি কূজনহীন বনভূমি : বিহঙ্গ বাউল।

পাষাণী পতিতা মাটি চাষাভুষা অতন্দ্র প্রহরী
বিচালির বিছানায় অভিশপ্ত শীতার্ত শর্বরী
অন্নহীন, বস্ত্রহীন, বিপন্ন নিরন্ন নাগরিক
ধুলি-মাখা পায়ে পায়ে, দলে দলে আসে পদাতিক !!


দ্বিতীয় প্রবাহ


মদালসা শ্রীমতীরা মদমত্ত শ্রীযুক্তের সাথে
প্রাচুর্যের প্রগল্ ভতা প্রদর্শন করে রাজপথে
প্রসাধনে বিজ্ঞাপনে বর্ণাঢ্য প্রচ্ছদে আধুনিকা
জীবিকা জ্বালানী কাঠ প্রাণপণে বহে নাবালিকা।

ঘামের গন্ধের সঙ্গে উগ্র আতরের গন্ধ মিলে
আশ্চর্য আমিষ গন্ধ সৃষ্টি হয় আবহমণ্ডলে
ক্ষুধার্ত মাতার গর্ভে ক্ষুধাতুর পিতার ঔরসে
আজন্ম বুভুক্ষু শিশুর জনান্তিকে জন্মায় স্বদেশে।

সুভদ্র, সুভদ্রা, ভদ্র মহোদয়াগণ
স্বার্থপর তত্পরতা, তন্ত্রমন্ত্র করেন ধারণ
একদিকে স্ফীতোদর, অন্যদিকে শূন্য পাকস্থলি
গণতন্ত্রী গণত্কার বেঁচে গ্রহশান্তির মাদুলি।

পঞ্জিকা গঞ্জিকাসেবী মর্মহীন ধর্মের বেসাতি
নকল গৈরিক বেশে সাধুনামে অসাধু দুর্মতি
সমাজবিরোধী কর্মে লিপ্ত সদা ভণ্ড ভাববাদী
পলায়নী মনোবৃত্তি সংগ্রামবিমুখ অপরাধী।


উদর পূরণ করে বৃকোদর আর লম্বোদর
বিপর্যস্ত জনগণ, প্রতিদিন জীবিকা-জর্জর !
মানুষের চতুর্দশ পুরুষের দীর্ঘ ইতিহাসে
হেন জনসেবা কেউ কোথাও দ্যাখেনি কোন দেশে।

নশ্বর নশ্বর সব, একমাত্র উপাস্য ঈশ্বর ,
ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ পড়ে যণ্ড ও পাষণ্ড পার্শ্বচর
কুটিল শ্রীকৃষ্ণ যার কুরুক্ষেত্রে রথের সারথি
নির্ভয় সে বৃহন্নলা, কেন তার হবে হে দুর্গতি ?

মুখোমুখী চোখাচেখি, এড়াবার আশ্চর্য কৌশল
নিন্দাবাদে জিন্দাবাদে সমান সমান ফলাফল
নির্বিবাদে বিচরণ করে ধূর্ত, দুষ্টু দুরাচার
সারমেয় স্বভাবের হৃষ্টপুষ্ট লুব্ধ চাটুকার।

পরিপাটি মলাটের আড়ালে অশান্তি দীর্ঘশ্বাস
অবান্তর ভাবাবেগে ভেল্ কিবাজি, বিপ্লব-বিলাস
সত্যই সংগ্রামী যদি অস্ত্রচিহ্ন শরীরে কোথায় ?
বীরত্বের বাচালতা রান্নাঘরে কিংবা রেস্তোরাঁয়।


উদারতা সরলতা অষ্টাদশ শতাব্দীর কথা
মৌলিক লৌকিক বুলি, আধুনিক আত্মকেন্দ্রিকতা
ক্ষমতার মল্লযুদ্ধ শ্রেণীশোষণের হাতযশ
আঁকা বাঁকা সব ফাঁকা,পৃথিবী টাকার পরবশ।

মানুষের হিংস্রতায় দেশত্যাগী সিংহ ও শার্দূল
কোলাহলে,  হলাহলে,  জনপদ, শ্বাপদ-সংকুল
ঘন অরণ্যের চেয়ে জনারণ্য বেশী ভয়ংকর
নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে বিষ, ভয়াল ময়াল বিষধর।

যমালয়ে মমালয়ে কোন স্থানে নাই নির্জনতা
হিমালয়ে লোকালয়ে দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপে গজ-ফিতা
ধরিত্রীর আষ্টে পৃষ্টে পুঞ্জ পুঞ্জ মনুষ্য বসতি
বিকলাঙ্গ বংশবৃদ্ধি, জীর্ণ প্রজননের প্রস্তুতি।
ধর্ষণে কর্ষণে মত্ত কামাচারী কীচকের দল
বর্ণালির শবদেহ বিশ্ব নারী বর্ষের ফসল।

দ্বিজ নই, আমি ত্রিজ, শৈশব কৈশোর ও যৌবন
প্রগাঢ় প্রৌঢ়ত্ব ছুঁয়ে, রৌদ্ররস করি আস্বাদন
অনাগত ভাবীকালে অনিবার্য বার্ধক্যের ভয়
প্রাণপণে প্রতিরোধ করি স্বকালের অবক্ষয়।


আমি রুদ্র, শূদ্রাণীর স্নেহধন্য অবাধ্য সন্তান
মৃতবত্সা মাতৃত্বের বাত্সল্যে লালিত লেলিহান্
উৎপেক্ষায় উপেক্ষায় অগ্নিগর্ভ জীবন-যন্ত্রণা
সংগ্রাম শিবিরে শুনি বাত্সায়ন-সূত্র আলোচনা।

জানিনা, মানিনা, কোন পাপ-পূণ্য আচার-বিচার
জীবতাবস্থায় ঘৃণ্য নরক দর্শন বহুবার
অহীফেন-সেবীদের অবাস্তব স্বর্গের বর্ণনা
উত্তরপুরুষ আমি ভ্রান্ত উক্তি বিশ্বাস করিনা।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে ছিঁড়ে কুসংস্কার নাগপাশ
কালবৈশাখীর সখা, সবেগে উড়াই সর্বনাশ
দানবের দৃষ্টি দেখি ছদ্মবেশী মানবের চোখে
বৈরিতার বজ্রাঘাত করি শান্ত পৃথিবীর বুকে।

মানুষের বাসযোগ্য কবে হবে এ’বিশ্বনিখিল
জাতি আর উপজাতি ভিন্ন ভাব বিচ্ছিন্ন অশ্লীল
মানুষ দাঁড়াবে কবে উদার উন্মুক্ত দরবারে
দিগ্ বিজয়ী হৃদয়ের অবারিত মানবাধিকারে।


শব্দের সমুদ্র হতে উঠে এসো,  অযোনী-সম্ভবা
ব্যঞ্জনা ! ব্যঞ্জন বর্ণা ! সশব্দ শৃংগারে মনোলোভা
কবিতা, বিদ্যুত্ লতা, হাস্যে লাস্যে আলোকে-পুলকে
নীলাম্বরে নগ্নকান্তি বর্ষণ-বিবিক্ত মোঘলোকে।


বন্ধ কর রম্যবীণা, ছয় রাগ, ছত্রিশ রাগিণী
শুচিস্মিতা সরস্বতী, নিদ্রাহীন শিল্পীর সঙ্গিনী
সংযত সংগীত গাও, মীড়ো ও গমকে মূর্ছনায়
মূর্চ্ছিত প্রহর কাটে বসন্তের অন্তিম শয্যায়।

আতংকে চিত্কার করি--- সুধা দাও,  একবিন্দু সুধা
আমার নিজস্ব সত্তা গ্রাস করে বসুধার ক্ষুধা
বিপন্ন বেহুঁশ আমি নিরন্ন মানুষ নিঃসহায়
হারাই মর্যাদাবোধ অভিশপ্ত উদর-জ্বালায়।

কোটি কোটি মানুষের কুন্ঠিত কন্ঠের সমস্বর
অভুক্তের আর্তনাদ সিংহনাদে হোক্ রূপান্তর
ঐক্যবদ্ধ  ন্যায়যুদ্ধে অখণ্ড গাণ্ডীবে দাও টান
সংগ্রাম ও সঙ্গমেই পৌরুষের প্রকৃষ্ট প্রমাণ॥

তৃতীয় প্রবাহ

সংগ্রামী সাঁওতাল জাতি  স্নেহময়ী জঙ্গল-জননী
অন্নদার কাছে বর চেয়েছিল ঈশ্বর পাটনী
তাহার সন্তান যেন মহাসুখে থাকে দুধে-ভাতে,
তুমি চাও “বাস্ কে দাকা”  ভুখা সন্তানের মুখে দিতে।


তোমার স্নেহের ঋণ দিন-দিন বাড়ে এ জীবনে
বিগত শৈশবকাল স্মৃতির শিকড় ধ’রে টানে
জাতি-ধর্ম ভুলে যাই হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য হ’য়ে
অকৃত্রিম আত্মীয়তা গ’ড়ে ওঠে আজ পাড়াগাঁয়ে।

বাত্সল্যের বাহু ডোরে বাঁধা থাকো,  না-থাকা সংসারে
দারিদ্রের মাদকতা মহুয়া-মাতাল অন্ধকারে
সামান্য ক্ষুধার অন্ন ভাগ কর অসামান্যভাবে
দ্বিধাহীন মমতায় সমতার অম্লান গৌরবে।

শ্রমজীবী-প্রসবিনী,  হে আমার মানস-জননী !
কে তোমাকে দাসী বলে? দেবী তবে কোথাও দেখিনি
শাল-মহুলের দেশে, সর্বংসহা অরণ্য-প্রতিমা
স্নেহের কোমল স্পর্শে ভুলে যাই ভৌগলিক সীমা।

হাঁড়িয়ার হাঁড়িকুড়ি “লসির” নেশায় রসিকতা
নিপুণ হাতের বোনা খেজুর চাটাই আছে পাতা।
ধম্ সার গম্ভীর ধ্বনি মাদলের মৃদু-মন্দ তালে
মদ না খেয়েও আমি মাতাল হয়েছি শালফুলে।

পথিকেরা খালি পায়ে দ’লে যায় মহুলের ফুল
পথেই পায়ের ছাপ রসে ভেজা পায়ের আঙুল।
শুক্ নো ঝুনঝুনি ফল ঘুঙুরের মতো বেজে ওঠে
অদৃশ্য নর্তকী নাচে নীল অরণ্যের ছায়াপটে।

হাঁসুলীর মতো আহা ! বাঁকা চাঁদ উঠেছে আকাশে
ঝলমল তারাদল মাঝরাতে মিটিমিটি হাসে
ফুটন্ত ভাতের গন্ধ ম্-ম্ করে,  ভাঙা কুঁড়েঘরে
বত্সহারা গাভী যেন কাঁদে রাত জ্যোত্স্নার গভীরে।

লড়াকু মোরগ ডাকে শেষ রাতে ভোর হ’য়ে আসে
কুকুরছানার কান্না নির্বাপিত উনানের পাশে
প্রচণ্ড ঠাণ্ডার চাপে প্রাণী খোঁজে আগুন উত্তাপ
খেজুর চাটাইয়ে শুয়ে কাঁপাকাঁপা আলাপ-প্রলাপ।

আমার জীবন-কাব্যে পৃথিবীর পার্থিব পয়ার
শব্দব্রহ্ম উপাসনা আধুনিক কালের ঝংকার
বিক্ষুব্ধ বেদনা-বোধে বুদ্ধি-বিবেকের বিস্ফোরণে
প্রত্যাশিত প্রতিশব্দ পাই না নিজস্ব অভিধানে।

অন্তরে অশান্ত দাহ বাহিরে বাহুল্য বেশ-ভূষা
দ্বিধাগ্রস্ত দ্বৈত সত্তা ব্যক্তিত্ব বর্জিত বিবমিষা
বীভত্স বিলাস কক্ষে দক্ষিণের রাক্ষসী জানালা
মদ্যপ লম্পটদের সারারাত্রি ব্যাপী লীলাখেলা।

উর্দ্ধগতি অধোগতি নীতিবাক্য আবাল্য শুনেছি
নমস্কার ক’রে ক’রে আমি নমঃশূদ্র হ’য়ে গেছি
অভিশপ্ত ভাবাবেগ ভ্রান্ত ভাবুকের ভুমিকায়
চাবুক ধরেছি ক্লান্ত রথাশ্বের পরিচালনায়।

কখনো সৈনিক আমি ভগ্ন রথে কখনো সারথি
সম্মুখ সমরক্ষেত্রে আমার উদ্দাম উপস্থিতি
ভিক্ষুকেরে অকাতর কবচ-কুণ্ডল করি দান
রথচক্র গ্রাসকারী পৃথিবীর নাই পরিত্রাণ।

মৃত্তিকার সঞ্জীবনী মানুষকে করে মৃত্যুঞ্জয়
দুঃখ দেয় দুঃসাহস, উচ্চ-নীচ তুচ্ছ মনে হয়
প্রাণভয়ে পলাতক একচক্ষু বিভ্রান্ত বিধাতা
দিগ্বিজয়ী দরিদ্রের কোন স্থানে নাই দুর্বলতা।

প্রচণ্ড পৌরুষ শক্তি স্বকাল পুরুষ কালঘাম
দীর্ঘদিন দুর্দশায় অবিরাম সংগ্রাম। সংগ্রাম !
আমার পুরষকার জেগে ওঠে ঘুম ভাঙা ঘামে
চন্দ্রবিন্দু দিতে চাঁদ ভুলে যায় উপেক্ষিত গ্রামে।

অদৃশ্য গহ্বর থেকে কে আমাকে ডাকে বারবার
আয় বাছা ঘরে আয়, বাহিরে জমাট অন্ধকার
সুগন্ধি চন্দন বনে বিষধর ভুজঙ্গের ভয়
বিষাক্ত দংশনে তার চৈতন্যও অচৈতন্য হয়।

হায় রে দাম্ভিক কবি, কবিতা কৈবল্য অহংকার
তীক্ষ্ণ শ্লেষ ছিন্ন বেশ অভাবের অচল সংসার
মিথ্যা খ্যাতি নাম-যশ প্রায় দিন শূন্য পাকস্থলী
ইহকালে দাবদাহ, পরকালে পাবে করতালি।

আমার একার সৃষ্টি কোন অংশ নাই বিধাতার
নশ্বর মানুষ আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস নাই আর
শোষণের সুকৌশল শালগ্রাম শিলার সম্মুখে
পূজারীর অত্যাচারে পাপী-তাপী কাঁদে অধোমুখে।

দীর্ঘকাল রুগ্ন অগ্নি দুর্বল দাহিকা শক্তিহীন
নির্বাপিত ধিকিধিকি,  ধিক্-ধিক্ লেলিহ-বিহীন
হৃত তেজ হীনবল সংগ্রাম-বিমুখ ব্যর্থতায়
খাণ্ডব দহন দ্বারা জ্বরা ব্যধি মুক্ত হতে চায়।

জীবিত কবরে বাস অগণিত বিবর-নিবাসী
সংকীর্ণ বস্তির বুকে অপুষ্টজনিত অষ্টাদশী
অস্পষ্ট যৌবন-চিহ্ন ক্ষীণ দেহ অস্থিচর্ম সার
নাই পীন পয়োধর মাতৃত্বের অমৃত পয়ার।

মনুষত্ব গ্রাস করে বৈষম্য কুটিল কুমন্ত্রণা
বহুধা বিভক্ত দেশ সর্বভারতীয় বিড়ম্বনা
ঘূণ ধরা সমাজের পৃষ্ঠে লেখা জাতীয় সংহতি
বিভেদ বিচ্ছিন্নবাদ সর্বত্র সূচিত অসঙ্গতি।

গতকাল যে লোকটা ভাবে গদগদ কথা বলে
আজ কেন সে এখন আমাকে এড়িয়ে যায় চলে
পরনিন্দা পরচর্চা ইতর ভদ্রের ইশারায়
আপন ও প্রিয়জন হঠাৎ অপ্রিয় হয়ে যায়।

মুখে মধু বুকে বিষ স্বার্থপরতার ভালোবাসা
দুর্দশা দর্শন হেতু ছদ্মবেশে করে যাওয়া-আসা
মিল নেই মানুষের মুখের ও বুকের ভাষায়
আপাতত আপন যে, পরক্ষণ পর হ’য়ে যায়।

কবিতার চিরশত্রু কাব্যকীট, ঈর্ষায় কাতর
সমালোচনার নামে নিন্দা করে অথর্ব বর্বর
সংবেদনশীল মন, উদার হৃদয় নাই যার
সেই মহামূর্খ করে ভালো-মন্দ মানুষ বিচার।

কলুসিত পরিবেশ দালাল-শোভিত সারা দেশ
মানুষের চেয়ে বেশী মূল্যবান ছাগ কিংবা মেষ
পশুকুলে বংশবৃদ্ধি বর্তমানে আশু প্রয়োজন
হায়রে মানব শিশু, তোর ভাগ্যে জন্ম-নিয়ন্ত্রণ।

চতুর্থ প্রবাহ

ঘৃণা লজ্জা শরশয্যা, সময় কালের কারচুপি
কী বিচিত্র এইদেশ সুযোগ-সন্ধানী বহুরূপী
দূষণ দূষণ রব, শোষণের চাপে মৃতপ্রায়
বুদ্ধিমত্তা কবিসত্তা শ্বাসকষ্টে নষ্ট হয়ে যায়।

সারারাত ধারাপাত লঘু-গুরু মেঘের গর্জন
দুর্যোগের যোগফল অধিক রাত্রির বিবরণ
বৈদ্যুতিক গোলযোগ বজ্জাতির গাঢ় অন্ধকার
সদর দরজায় জোরে কড়া নাড়ে, হিংস্র দু’হাজার।

অপ্রিয় বক্তব্য শুনে, গুণীজন বলে--- থামোথামো,
ভাষণ দেবেন প্রিয় সভাপতি, শতপথী নামো,
সর্বনাশা স্পষ্ট ভাষা, বলুন না, কা’র ভালো লাগে
খোলাখুলি কথা বলা, অভদ্রতা বর্তমান যুগে।

কোণ-ঠাসা সত্যবাদী কষ্ট পায় স্বভাবের দোষে
বিপদে বিপাকে প’ড়ে পাক খায় ভি. আই. পি.-রোষে
হায় বাছা ভি.আই.পি লাভ নাই ন্যায্য কথা ব’লে
মহান মিথ্যুক ছাড়া টিকে থাকা যাবেনা একালে।

স্বর্গে যান ভাগ্যবান দুর্ভাগারা মর্গেতে চালান
অমৃতস্য পুত্র-পুত্রী আদিরস চেটেপুটে খান
মরা মানুষের বুড়ো আঙুলের টিপ-ছাপ নিয়ে
স্থাবর ও অস্থাবর হস্তান্তর হয় পাড়াগাঁয়ে।

নেমেছি অনেক নীচে ঠ্যাং দুটো ঠেকেছে পাতালে
আর তো নামার কোন উপায় দেখিনা ইহকালে
ব্যূহভেদ জানি, কিন্তু নিষ্ক্রমণ পদ্ধতি জানিনা
দুর্গদ্বার ঘিরে থাকে স্বৈরাচারী সপ্তরথী সেনা।

স্বাধীন ভারতবর্ষ পণ্ডিত-মুর্খের নিজদেশ
মানুষ-নিসর্গ-মাটি মনে আনে জন্মের আবেশ
মানব-জাতির প্রতি প্রেম-প্রীতি গভীর বিশ্বাস
মানুষ না-হ’লে, কোন লাভ নেই, হ’য়ে “জিনিয়াস”।

মুণ্ডুহীন ধড়গুলি কিছুক্ষণ করে ধড়ফড়
কামড়ায় অসংখ্য মশা গালে মারি অস্থির থাপ্পড়
চল্লিশ বত্সর চলে চেতনার কানামাছি খেলা
আবার ভাষণ শুরু, কেটে পড়া যাক্ এই বেলা !!

প্রশংসায় পুলকিত বিচলিত হইনা নিন্দায়
অতিষ্ঠ-অশিষ্ট প্রায় হয়েছি সমাজ ব্যবস্থায়,
মায়াময় মানবতা মায়াবী মুখোশ ছিঁড়ে দিলে
পরোপকারের প্যাঁচ, ধরা পড়ে স্বরূপ আসলে।

মায়া কান্না, কান্না নয়, দাম্ভিকের কুম্ভীরাশ্রুপাত
নারী ও পুরুষ আর নারী ও গরীব দুটো জাত
নির্ধন গরীব ব্যক্তি ছেঁড়া জামা, ছেঁড়া জুতোধারী
মাঝরাতে মাতালের ট্রাফিক কন্ট্রোল বাহাদুরি।

সেয়ানে সেয়ানে চলে কোলাকুলি, ভাব-বিনিময়
বাগে পেলে অনুরাগ, বীতরাগে পরিণত হয়
স্বার্থপর মেলামেশা এক-বুক আত্মকেন্দ্রিকতা
আত্ম-সুখী অভাজন, মহামান্য নির্বাচিত নেতা।

দরিদ্র দধীচিবৃন্দ অস্থিদান করে চিরকাল
বংশধরদের শিরে পড়ে সেই বজ্র মহাকাল
শব্দ-জব্দ শংকাকুল পরাজয় প্রতি পদে পদে
অফুরন্ত প্রাণ শক্তি প্রয়োজন বিপদে-আপদে।

ওড়াও শান্তির শ্বেত পারাবত আনন্দে-বিষাদে
অন্তরীক্ষে বাজপাখি ডানা ঝাপটায় লুব্ধ ক্রোধে
ইহলোকে উপহাস, পরলোকে পাবে উপহার।
মড়ার মাথার খুলি পিশাচের আমিষ আহার॥

তাবৎ সৌভাগ্যবান করে পান বৃন্দাবনী মধু
চামর ঢুলায় শিরে পামরের সেবাদাসী বধু
বণিকের বাজুবন্ধে অবক্ষয় অক্ষয় কবচ
শক্তিশালী নিশাচর বিশ্বসৃষ্টি করে তছ্ নচ্।

কুকুর কামড়ালে যদি মানুষের জলাতঙ্ক হয়
স্থলাতঙ্ক কিসে হয়,  বলুন ডাক্তার মহাশয় ?
দস্যু রত্মাকর যদি সু-কবি বাল্মিকী হতে পারে
তাবৎ তস্কর যেন মরা মরা জপে কারাগারে ।


ত্যাগের প্রতীক নেতা, নিয়নিত মলমূত্র ত্যাগ
বান্দারা বহন করে দুঃসহ দুঃখের দায়ভাগ
উড়ায় ধর্মের ধ্বজা মর্মহীন ধূর্ত ধান্দাবাজ
সংসারে শাখামৃগ রাতিরাতি সাধু মহারাজ॥

পৃথিবীর কোন স্থানে পোঁতা হবে সীমার পাথর
তাই নিয়ে দীর্ঘকাল চলে লাঠালাঠি পরস্পর
জবর দখল জমি চারিদিকে কাঁটাতারে বেড়া
প্রেতের নজরে পড়ে ভীরু প্রজা ভিটে-মাটি

আকাশের লঘু মেঘ মাঝে মাঝে গুরু-গুরু ডাকে
ক্ষণপ্রভা উঁকি মারে জং-ধরা জানালার ফাঁকে।
আয়নায় নিজের মুখ এখন অস্পষ্ট তমসায়
ভালোবাসা নীল নেশা ভ্রষ্ট লগ্নে নষ্ট হয়ে যায়।

আয়. বৃষ্টি ঝেঁপে আয় জমিতে বুনেছি বীজতলা
বুকখোলা বর্ণমালা ধানক্ষেতে ছড়াই দু’বেলা
আলপথে খালপারে যাতায়াত করি বহু দূরে
অভদ্র ভাদ্রের রোদ গায়ে প’ড়ে জ্বালাতন করে।

জমির দখল নিয়ে যখন তখন হানাহানি
হাজার হাজার বিঘা রাজার বেনামী রাজধানী
যে যার জায়গায় আছি,  কোন্ দিকে কত ‘চেন্’ হলো ?
ভুবন আমিন এসে জীবন জরিপ করে গেল॥

পঞ্চম প্রবাহ

ক্রোধান্ধ বিকৃত মুখ-মণ্ডলেতে মারী-গুটি দাগ
নিশাচরী জননীর প্রিয় পুত্র সংগ্রামে সংরাগ
সূদীর্ঘ বাহুতে অবক্ষয়রোধী কুণ্ডল কবচ
ভীম পরাক্রমশালী শত্রু উৎপাটক ঘটোত্কচ।

আসুরিক মত্ততায় যৌবনের বেগে আত্মহারা
দারুণ দুন্দুভি বাদ্যে নাচে ধমণীর রক্তধারা
নির্ভয় জীবন-যুদ্ধে, নিরুদ্বেগে সহিংস হুংকার
ভীম-ভীমা মাতাপিতা, শত্রুসৈন্য করে ছারখার।

প্রস্তর প্রহার ক’রে টান মারে পর্বত ভূধর
দুর্বার দুর্জয়বীর বাজিমাৎ করে একেশ্বর
কখনো অস্থির রথে, মল্লযুদ্ধ কভু মল্লভুমে
প্রথা বহির্ভূত রণ-কৌশল দেখায় কালক্রমে।

ভীরুপ্রাণ কুরু-সৈন্য চতুর্দিকে করে পলায়ন
হিতাহিত জ্ঞানশূন্য রণোন্মত্ত হিড়িম্বা-নন্দন
কৃতঘ্ন একাঘ্নী বাণ বক্ষভেদ করে অবশেষে
অকাল মৃত্যুর ছায়া অশান্ত জীবনে নেমে আসে।

মৃত্যু চিন্তা ভুলে যাই প্রাণ-চেতনার অহংকারে
যেহেতু জীবিত আছি, আজও সচেতন চরাচরে
মর্মান্তিক মূলধন শিল্প ক্ষেত্রে করি বিনিয়োগ
যোগ-বিয়োগের ভুলে জমে ভৌগলিক অভিযোগ।

সাংসারিক সংকীর্তনে মাঝে মাঝে বাজাই মন্দিরা
কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ সক্রিয় শরীর স্নায়ুশিরা
ক্ষুধা ভুলে যেতে গাই উদাসীন পদ-পদাবলী
শূন্য গৃহে অষ্টোত্তর শতনাম লক্ষ্মীর পাঁচালী।

মন মননের মাটি খনন করেছি নিরবধি
রুক্ষ-শুষ্ক মরুবক্ষে ক্ষীণস্রোতা নিরঞ্জনা নদী
উষর সৈকতে ধু-ধু প্রখর উত্তপ্ত বালুরাশি
বাজাতে জানিনা আমি কোমল গান্ধারে আড়বাঁশী।

ঘুমভাঙা ভোরে দেখি রাঙা সূর্যোদয়ের সূচনা
বোনের হাতের আঁকা, আঁকা-বাঁকা বিচিত্র আল্ পনা
রাতের রক্তের দাগ লেগেছে কি পলাশের ডালে
তাই এত লাল ফুল ফুটে আছে রক্তিম সকালে !

বিগলিত অলিগলি অর্থাভাবে ভুগে বারোমাস
জবর দখল জমি শিশুপাল করে চাষবাস
চৌহদ্দী চিহ্নিত হয় চেতনার অতল পাতালে
শৃগাল প্রবেশ করে বাঘের গুহায় পথ ভুলে !

বিস্তারিত বিবরণ বিবিধ বিবর বে-দখল
ক্ষয়রোগে জীর্ণ-শীর্ণ নাই কোনও সহায় সম্বল
মর্মোদ্ধার করে যতো বিচক্ষণ চর্ম-ব্যবসায়ী
পাতালের অধিবাসী অন্ধকূপে ডাকে পরিত্রাহী।

আমাকে উদ্ধার কর কবিত্বের কুম্ভীপাক হ’তে
সামান্য আশ্রয় দাও সাধারণ মানুষের সাথে
যেখানে বিবেক-বুদ্ধি আচ্ছন্ন করেনা অহংকার
জীবনে মুক্তির স্বাদ পেতে চাই আমি একবার।

পরণে পবিত্রতম রিপু-করা পাঞ্জাবী পায়জামা
যেদিন যা জোটে সব উদরের কোষাগারে জমা
অভাবে  স্বভাব নষ্ট শান্তশিষ্ট বিত্তশালী হলে
ফুটপাতের ফুলশয্যা দু’হাতে গুটাই বৃষ্টি এলে।

সেলাম ! সৌজন্যবাদী শতাব্দীর হিংস্র সংকীর্ণতা
অগ্রগতি প্রগতির ধারক-বাহক পৌর-পিতা
দ্যাখোনি দুর্দশাগ্রস্ত হাজার হাজার গণ্ডগ্রাম
অসংখ্য মানুষ করে বাধ্য হ’য়ে প্রেতকে প্রণাম।

দুর্যোগের যোগফল, লোভে পাপ, পাপে পূ্ণ্যলাভ
ধনিক ও বণিকের সখ্যতা সদ্ভাব
দারিদ্রের শতছিন্ন ক্ষতচিহ্ন বস্তির শরীরে
ললিত লবঙ্গ-লতা গলিত গলির অভ্যন্তরে।

না-থাকা ঢাকার বৃথা অপচেষ্টা নাই প্রাণপণে
পাপ যে করেনি, তার প্রয়োজন নাই পুণ্যার্জনে
প্রাণখোলা পরিবেশে পাপ-পূণ্য প্রশ্নই জাগেনা
দেশকে যে ভালবাসে, তার মনে বিদ্বেষ থাকেনা।

সমবেত কন্ঠে গাই তামা-নানা, শিখণ্ডী সংগীত
প্রজনন পটুতায় পুরুষত্ব, সন্তান কুৎসিত
হয় না মহৎ জন্ম, অসতের দূষিত ঔরসে
কাপুরুষ বংশ বৃদ্ধি করে বীরপুরুষের দেশে।

শ্রবণে হিস্ হিস্ শতাব্দীর বিষ
শব্দ-দূষণের অবক্ষয়
আলাপ-পরিচয় চতুর অভিনয়
মুখের ভালোবাসা বুকের নয়।

বিনয় প্রিয়ভাষ নিছক অভ্যাস
বৃষ্টিহীনতার ছিন্ন মেঘ
রঙিন ছলা-কলা আড়ালে কথা বলা
হিংস্রতার মোড়া হৃদয়াবেগ।

মহুয়া মাদকতা শালের শালীনতা
পাহাড়ী নদীতীরে পিয়াল বন
মুখর স্বরলিপি মানুষ বহুরূপী
নিসর্গের শোভা করে হনন।

শ্রীহীন সংসার উঠোনে হাহাকার
উপোসী প্রতিবেশী শুকায় ধান
জরুরী প্রয়োজনে ঢেঁকিতে ধান ভানে
দু’বেলা অনশনে মলিন ম্লান।

জয় মা বিষহরি, বেহুলা সুন্দরী
বাসর শয্যায় লখিন্দর
শিয়রে কালসাপ অশুভ অভিশাপ,
হলুদ হতাশার শেষ-প্রহর।

যামিনী যৌতুক কামিনী কৌতুক
বিশেষ গোপনতা, গুপ্তধন
রিক্ত রতিসুখ মৃত্যু ধুক্ ধুক্
কেন যে জাগরণ, জানে জীবন।

ভীষণ সংশয় দংশনের ভয়
নিদ্রাহীন রাত আশংকায়
মরণ-অনুচর বন্দী বিষধর
আগামী প্রভাতের প্রতীক্ষায়।

অনেক অভিলাষ বাক্যবিন্যাস
প্রেয়সী বাংলার প্রণয়াবেশ
সজল অনুভব ভেলায় ভাসে শব
বাঁচাতে পারে শুধু আমার দেশ।

.             ********************              

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর