কবি ভবতোষ শতপথীর কবিতা
*
বিবর্ণ দিনে কেন এসেছিস ঝর্ণা দি
কবি ভবতোষ শতপথী
সোমনাথ নন্দী ও মুরারি সিংহ সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ “লোককবি ভবতোষ” থেকে নেওয়া।


বিবর্ণ দিনে কেন এসেছিস ঝর্ণা দি !
অন্তঃপুরে উথাল পাথাল ঘূর্ণি ঝড় !
ভাইয়ের ভাগ্য, বাপের চাইতে আরও ভীষণ
মড়া কান্নায় মাটি কামড়ায় দ্বিপ্রহর !
টিপ সই দিয়ে বেহাত হয়েছে ক্ষেত-খামার
বন্য লীলায় শূন্য গোলায় মরা-ইঁদুর।
এবং দুচোখে অমাবস্যার অন্ধকার
করুণ উঠোনে অক্ষমতায় ছেঁড়া মাদুর।
রক্ত চক্ষু তদন্ত করে সরজমিন
লক্ষ্মীর ঝাঁপি হাতড়ে বেড়ায় লুব্ধ হাত
অভাবে ধুঁকছে কংকালসার কুলি কামিন
কিষাণ বধুর দীর্ঘশ্বাসে আহত রাত !
গত বছরের দেনাগ্রস্ত গণ্ডগ্রাম
যতো আধমরা অপরাধীদের আস্তানা
তাদের সঙ্গে তালিকাভুক্ত আমার নাম
অপরিতৃপ্ত আত্মীয়তার যন্ত্রণা।
নির্জনতার বহুদূরে থাকি, আমি জনতার চিত্রকর
আমার ইচ্ছা, হাতুড়ির সাথে হোক্ কাস্তের স্বয়ংবর।

.             ********************              

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভাত
কবি ভবতোষ শতপথী
সোমনাথ নন্দী ও মুরারি সিংহ সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ “লোককবি ভবতোষ” থেকে নেওয়া।


আসছে যাচ্ছে ভুখা মিছিল
শহরের পথে শুনি শ্লোগান
উড়ছে শকুন উড়ছে চিল
গোপন গলির গজল গান।

ন্যাংটো শিশুর ঘুড়ি লাটাই
ওঠেনা ওপরে সুতোয় টান
নতুন চালের গরম ভাত
গন্ধ পেয়েই জুড়োয় প্রাণ।

মাননীয়দের-মন খারাপ
দক্ষিণ হাওয়া বইছে না
লোকেরা লোপাট করছে সব
রামধূন কেউ গাইছে না।

এভাবে কি আর দিন চলে
ধার-হাওলাত বাড়ছে ঋণ
ইতিহাস নাকি কথা বলে
শুনতে পায় না অর্বাচীন।

ওস্তাদ দ্যায় জোর ভাষণ
হাড়ভাঙা খেটে জোটেনা ভাত
ভূয়া ব্শেষণ নয়া শোষণ
করাতের মতো রাতের দাঁত।

.             ********************              

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বৃষ্টি
কবি ভবতোষ শতপথী
সোমনাথ নন্দী ও মুরারি সিংহ সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ “লোককবি ভবতোষ” থেকে নেওয়া।


মাঝরাতে বৃষ্টিভেজা মন
শরশয্যা সংকীর্ণ সংসার
দৃশ্যপটে আত্ম-নিবেদন
শ্রুতিকটু শব্দের ঝংকার।

ঘুম-ঘুম চোখে মেঘছায়া
নষ্ট নিসর্গের কাটা দাগ
জনারণ্যে জঘণ্য মৃগয়া
প্রাচীন দুঃখের দায়ভাগ।

মুঠো মুঠো নীল  অন্ধকার
উঠোনে অস্পষ্ট বৃষ্টিপাত
আগন্তুক করে তিরস্কার
সদর দরজায় করাঘাত॥

.             ********************              

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
তালিকা
কবি ভবতোষ শতপথী
সোমনাথ নন্দী ও মুরারি সিংহ সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ “লোককবি ভবতোষ” থেকে নেওয়া।


পাঁজির পাতায়                পাজির খাতায়
নাম-তালিকা,
অনভিপ্রেত                      প্রেত-তর্পণ
ভাষ্য-টীকা।

গড্ডালিকার                  ক্যাঁচর ক্যাঁচর
তৈল বিনা
গণতান্ত্রিক                   আন্ত্রিকে ভোগে
ভাড়াটে সেনা।

বিস্তর বাধা                      ত্রিস্তর প্যাঁচ
পাঁচমিশেলি,
ঝড়ের দাপটে                কাঁপে ছায়ানটে
মড়ার খুলি।

সুখ-দুঃখের                    উর্ধে আকাশ
ঊর্দ্ধ-সীমা,
মৃত্যুর দূত                   করে করাঘাত
জীবন বীমা।

ফাগুনের লাল                 ফুলকি ছড়ায়
তুখোড় হাওয়া,
কাল উপমার                 উল্ কি পরায়
আসা ও যাওয়া।

শানিত বরাত                শাঁখের করাত
বর্ণ মালা,
ধনুকে শব্দভেদী                  বাণ নেই
ছিন্ন ছিলা।

.             ********************              

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বারোমাস্যা
কবি ভবতোষ শতপথী
সোমনাথ নন্দী ও মুরারি সিংহ সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ “লোককবি ভবতোষ” থেকে নেওয়া।


হুজুর মালিক, দুটো শালিক ঝগড়া করে
ভেতর থেকে তালাবন্ধ প্রবেশ-দ্বারে
কামুক শরীর শামুকখোলে গুটিয়ে নিয়ে
উঁকি মারছে থুথু ফেলছে জানলা দিয়ে।

মানুষ রে, তোর ছেঁড়া মলাট ওলট-পালট
লেপটে আছে জলে-কাদায় দৃশ্যের পট
জোর কদমে ছুটছে অশ্বমেধের ঘোড়া
বিশ্বভুবন ঘুরে বেড়ায় ছন্নছাড়া।

বল্ না তোকে কোন্ চেতনা চাবুক মারে
তের্ ছানজর নজরবন্দী নিজের ঘরে
আত্মসুখী রাত-ভিখিরীর আনাগোনা
বাঁচার খাঁচা, খাঁচায় বাঁচা, অন্যমনা।

গলির ভেতর গলাগলি ভুল ভূগোলে
দোলনচাঁপা বাঁধছে খোঁপা কুর্চি ফুলে
পুরুষ-নারী সমান-সমান মদের নেশা
একেই বলে শাল-মহুলের ভালোবাসা।

মানুষ রে, তোর চামড়া ছুলে নিচ্ছে সময়
ঢিল মেরে কি দেখবি নাকি নীল জলাশয়
ফাগুন ফাগুন ফুস্ মন্তর শেষ প্রহরে
বারোমাসে তেরোপার্বণ ক্যালেণ্ডারে॥

.             ********************              

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সুখ-দুঃখের পাঁচালি
কবি ভবতোষ শতপথী
সোমনাথ নন্দী ও মুরারি সিংহ সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ “লোককবি ভবতোষ” থেকে নেওয়া।


ক্ষিপ্ত চাবুক                 চালাচ্ছে সুখ
দুঃখ খুঁড়ছে খাল
বুক ধুকধুক                 স্মৃতির অসুখ
হৃদয় হাসপাতাল।

বেহাত জমি                 সালতামামি
পাহাড় প্রমাণ ঋণ
গাইবো না আর             ভালোবাসার
ঝুমুর কোনোদিন।

চলছি নিজে                  বলছি কী যে
নিজেই বুঝি না
গৃহস্থলি                          পাকস্থলি
সাবেক ঘরানা।

দ্যায়না ভাড়া                    বস্তিপাড়া
দু’পিঠ কালো রাত
বাজিকরের                   আজব খেলা
করছে বাজিমাত।

গোপন চিঠির                 উল্টো পিঠে
শীল মোহরের ছাপ
মন খুঁড়লে                    বেড়িয়ে পড়ে
মস্ত ময়াল সাপ।

.             ********************              

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
খরস্রোত
কবি ভবতোষ শতপথী
সোমনাথ নন্দী ও মুরারি সিংহ সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ “লোককবি ভবতোষ” থেকে নেওয়া।


মাটি কাটছে কুলি-কামিন
ভাঙছে পাথর
ভরদুপুরের কাটফাটা রোদ
স্পর্শ সম্বল
শেষ সম্বল গাঁইতি শাবল
ভাতের হাঁড়ি।

দিন মজুরির হিসাব-নিকাশ
হাজিরা খাতা
স্বত্ত্বভোগী বেলেল্লাদের
ভাবালুতা
হুম্ ড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ
দু-চার কুড়ি।

আপন আপন জীবন যাপন
দিনের দাবী
স্তব্ধ রোদে শব্দ কোষের
খুলছি চাবি
বিশ বছরে বুড়িয়ে গ্যাছে
আতর বিবি।

অধিক রাতের রঙিন ঠি. ভি.
রং তামাশা
ভুল ভূগোলের ছেঁড়া পাতায়
ভালোবাসা
অদৃশ্য হাত ধূলো ঝাড়ছে
ভাতের থালায়

বাতিকগ্রস্থ বিজ্ঞাপনে
বাচালতা
রাংতা-মোড়া জমা-খরচ
বাকি খাতা
দুঃসময়ের খরস্রোতে
ভাসছি ভেলায়॥

.             ********************              

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আগুনের গান
কবি ভবতোষ শতপথী
সোমনাথ নন্দী ও মুরারি সিংহ সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ “লোককবি ভবতোষ” থেকে নেওয়া।


ইচ্ছে করছে গন্ গনে আঁচে গুন্ গুন্ গান গাইবো
কালো ঘোমটার আড়ালে রাতের বুক ফাটে মুখ ফোটেনা
অনন্তকাল পড়ে আছি জ্বরে শব্দের শর-শয্যায়
আরোগ্য লাভ করবে আগুন খাণ্ডববন পুড়লে।

অগ্নিকোণের ছাইপাঁশগুলো দিয়েছি ছড়িয়ে ছিটিয়ে
মা বলেন, খোকা, বোকার মতন বিছানা ছেড়ে উঠিসনা
উনি কি জানেন গায়ে জ্বর নেই—জ্বর যে বুকের পাঁজরায়
ঘূণ পোকাগুলো কুরে-কুরে খায় ঘরের কাঠামো বিন্যাস।

সচিত্রদেশে বিচিত্রবাবা আসলে আমার বাবা নেই
পীড়িত পাতালে তাল ঠুকে বলি এখানে প্রজার সাজা নেই
রাজা নেই তাই, মর্জি মাফিক যে যার পথেই চলছে
মৃত্যুর কথা বলে কাজ নেই, জীবনের কথা বলছি॥

.             ********************              

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মানুষের নাম মানুষ
কবি ভবতোষ শতপথী
সোমনাথ নন্দী ও মুরারি সিংহ সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ “লোককবি ভবতোষ” থেকে নেওয়া।


      ( ১ )
যে যেখানেই থাকুকনা
যে নাম ধরেই ডাকুকনা
মানুষের নাম, মানুষ।

স্পষ্টভাষা শিখুকনা
কষ্ট করে লিখুকনা
হুঁশ না থাকলে, বেহুঁশ।

উল্টো পথে হাঁটুকনা
কাঁটা ফুটছে ফুটুকনা
মানুষ মহাশয়,

বন্ধু আসছে আসুকনা
শত্রু হাসছে হাসুকনা
হৃদয় জলাশয়।

যেমন চলছে চলুকনা
লোকে যা বলছে বলুকনা
প্রশস্ত রাজপথ।

  ( ২ )
দুর্ঘটনা ঘটুকনা
ঝড় উঠছে উঠুকনা
সঠিক জনমত।

ছাই উড়ছে উড়ুকনা
কীট-পতঙ্গ পুড়ুকনা
আলোর আকর্ষণ।

আগুন জ্বলছে জ্বলুকনা
ফাগুন-ফাগুন খেলুকনা
সময়-সচেতন।

মাটি খুঁড়ছে খুঁড়ুকনা
চিঠি পড়ছে পড়ুকনা
তোমার তাতে কি ?

ভালোবাসছে বাসুকনা
সবার সাথেই মিশুকনা
জীবন ছুঁয়েছি॥

.             ********************              

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কৃষ্ণপক্ষ
কবি ভবতোষ শতপথী
সোমনাথ নন্দী ও মুরারি সিংহ সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ “লোককবি ভবতোষ” থেকে নেওয়া।


জের টেনে ফের পারবি নাকি
যোগ-বিয়োগে জোড় মেলাতে
পারবি নাকি খাঁচার পাখি
নীল আকাশে উড়িয়ে দিতে।

হাসন মুখী হাত বাড়িয়ে
ফুল তুলছে টগর ডালে
ঠাট্টা করে ঠায় দাঁড়িয়ে
নাগকেশরের নাগাল পেলে।

বিজোড় জীবন জ্বলন পুড়ন
চলন বলন অন্যরকম
গমের ক্ষেতে  গতর খাটায়
বাদশার বউ গন্না বেগম।

রায় সাহেবের বাগানবাড়ি
রাগ-অনুরাগ কান্না-হাসি
রাংতামোড়া ঘুমের বড়ি
কৃষ্ণপক্ষে অষ্টাদশী॥

.             ********************              

.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর