কবির প্রকাশিত রচনা -                                                               পাতার উপরে . . .   
বিভিন্ন চটি বই আকারে কবিতা প্রকাশ ছাড়া তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েচে “ব়্যাডিক্যাল
ইম্প্রেশন” থেকে প্রকাশিত “অরণ্যের কাব্য” (১৯৮৮) এবং “লোককবি ভবতোষ” (১৯৯৬)। “অরণ্যের কাব্য”
বইটির মুখবন্ধ রচনা করেছিলেন
কবি মণিভূষণ ভট্টাচার্য
শিক্ষা জীবন ও প্রতিবাদী মনোভাব   
প্রেম ও কবিতা এবং শিক্ষার সমাপ্তি   
প্রথম কবিতা প্রকাশ   
কবির বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন   
কবিতায় প্রেম ও বিপ্লবের ছোঁওয়া   
দারিদ্র্য ও আঞ্চলিভাষায় কবিতা রচনা   
ঝুমুর ও টুসু গানের রচনা   
কবির প্রাপ্ত সহায়তা এবং সম্মাননা ও স্বীকৃতি   
কবির প্রকাশিত রচনা   
জীবনাবসান ও আনন্দবাজার পত্রিকার খবর  
শ্রী মলয় প্রামাণিকের পাঠানো কবি-জীবনী   
কবি ভবতোষ শতপথী - জন্মগ্রহণ করেন
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার, ঝাড়গ্রাম মহকূমার,
জামবনীর টুলিবড় গ্রামে। পিতা শ্রীপতিচরণ শতপথী,
মাতা বিনোদবালা দেবী। তাঁর শৈষবে নাম রাখা হয়
“ভবতারণ”। বড় হবার পর তিনি নিজেই তা
ছেট করে “ভবতোষ” করে নেন। তাঁর পরিবার
টুলিবড়ের একমাত্র ব্রাহ্মণ পরিবার ছিল। বাকী সব
মাহাত---আদিবাসী সম্প্রদায়। তাঁদের ঘরের ছেলে
মেয়েরাই ভবতারণের খেলার সঙ্গীসাথী ছিল শৈশবে।
*
শিক্ষা জীবন ও প্রতিবাদী মনোভাব -                                                  পাতার উপরে . . .   
শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের পাঠশালায়। পাঠশালার পড়া শেষ হলে শ্রীপতিচরণ ছেলেকে ভর্তি করেন চিঁচড়া  
মিডল ইংলিশ স্কুলে। বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে তার থাকার ব্যবস্থা হয়। এই সময় তাঁর বই পড়ার নেশা হয়।  
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালিদাস রায়,  
কুমুদরঞ্জন মল্লিক, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এবং আরও  অনেকে। এই সময়ে তিনি ছড়া রচনা শুরু করেন।

তাঁদের জমির এক কোণে থাকে এক তন্তুবায় পরিবার কষ্টের জীবন যাপন করতেন। শতপথীরা মামলা করে
তাঁদের উঠে যাবার জন্য। মামলা লড়ার ক্ষমতা ছিল না বলে এক তরফা ডিক্রী পেয়ে যায় শতপথী পরিবার।
থানা থেকে পুলিশ আসে ঘর ভেঙ্গে দখলকারীকে উচ্ছেদ করতে। তাঁতী বউ কাঁদতে কাঁদতে ছুটে লুটিয়ে  
পড়েছিল শ্রীপতিচরণের পায়ে। সব কিছু দেখেশুনে তার মন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল। পিতার কাছে প্রতিবাদ
জানাতে, উচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল সেই অসহায় পরিবারটি।
*
প্রেম ও কবিতা এবং শিক্ষার সমাপ্তি -                                              পাতার উপরে . . .   
এরপর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্ত্তি হন ভবতারণ। সেখানে সহপাঠিনী – মিতালির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। এই  
সময় তাঁর কবিতা লেখা শুরু। পিতা শ্রীপতিচরণের ছেলের কবিতা লেখা মোটেই ভাল লাগে নি। তিনি  
ভবতারণকে যথেষ্ট তিরস্কারও করেন। কিন্তু ভবতারণ তবু তার অভ্যাস ছাড়তে পারে না। লুকিয়ে লুকিয়ে
তার কবিতা লেখা চলতে থাকে।

ছেলের পড়াশুনা এভাবে নষ্ট হচ্ছে দেখে তিনি তাকে চিঁচিড়া স্কুল থেকে ছাড়িয়ে ঝাড়গ্রামে কুমুদকুমারী
বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেন। ঝাড়গ্রামে ভবতারণের মায়ের মামাবাড়ি সেখানেই তার থাকার ব্যবস্থা হল।
ভবতারণ আর পড়াশুনায় মন বসাতে না পেরে অবশেষে এন্ট্রান্স পরীক্ষার আগেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে
ফিরে আসেন গ্রামে।

স্কুলের বন্ধু মিতালির বিয়ে হয়ে যাবার খবর শুনে মুষড়ে পড়েন। সব কিছু ফেলে চাষবাসে মন দিতে চেষ্টা
করেন। এই সময়ে তাঁর জীবনে আসে আর এক নারী। দূর সম্পর্কের আত্মীয়া। তাদের পরিবারে একজন
আশ্রিতা। ক্রমশ ভবতারণের সঙ্গে তার একটা ঘনিষ্টতা গড়ে ওঠে। এর ফলে ভবতারণ কবিতা লেখায়
আবার উত্সাহ পান। জানাজানি হলে, পারিবারিক চাপে সে সম্পর্কও ছিন্ন করতে হয়।
*
প্রথম কবিতা প্রকাশ -                                                                    পাতার উপরে . . .   
ঝাড়গ্রামে থাকার সময় ভবতারণের হাতে এসে যায় বেশ কিছু পত্রপত্রিকা, আধুনিক কবিতার বই।
সুভাষ
মুখোপাধ্যায়, রাম বসু, বিমলচন্দ্র ঘোষ, সুকান্ত ভট্টাচার্য্য, এঁদের কবিতার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। নিজের
কাব্যচর্চার ধারাতেও তার প্রভাব পড়ে। কুমুদকুমারীর বাংলা শিক্ষক শক্তি সরকার ভবতারণের কবিতা
পড়ে তাকে কবিতা লেখায় উত্সাহিত করেন।

কবির কলকাতার এক বন্ধু, অতুল মাহাত, কলকাতায় থেকে ওকালতি পড়তে পড়তে, গ্রন্থাগার আন্দোলনের
সঙ্গে যুক্ত হয়ে, তাঁর একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। নাম “গ্রামের ডাক”। কবিতাটি গ্রামের ডাক নামক  
পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়।এটাই তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা। ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের আষাঢ় সংখ্যায় তার প্রথম
কবিতা “গ্রামের ডাক”। ঠিক এক বছর পর ১৩৫৯ বঙ্গাব্দের আষাঢ় সংখ্যায় ছাপা হয় দ্বিতীয় কবিতা  
“গ্রন্থাগার বিপ্লব সংগীত”। কবিতা দুটিতে ভবতারণের নামের আগে লেখা হয় “কাব্যপ্রদীপ” এবং নামের
শেষে বন্ধনীর মধ্যে “পল্লী কবি”।
*
কবিতায় প্রেম ও বিপ্লবের ছোঁওয়া -                                                 পাতার উপরে . . .   
ঝড়ঝাপটার মধ্যে হয়তো সাময়িক ছেদ এসেছে কিন্তু কবিতা লেখা একেবারে বন্ধ হয় নি। তাঁর কবিতা
স্বাধীনতা, বসুন্ধরা, দৈনিক সমাচার প্রভৃতি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। রোমান্টিক কবিতার পাশাপাশি শিশুদের
জন্যও তিনি কবিতা লেখেন। সেগুলি ছাপা হয় আনন্দমেলা, শিশুসাথী, রঙ মশাল প্রভৃতি পত্রিকায়। একবার
আনন্দমেলায় কবিতা লিখে কবি দশ টাকা সান্মানিক পেয়েছিলেন। ঝাড়গ্রাম থেকে প্রকাশিত ঝাড়গ্রাম
বার্তাতে প্রথম থেকেই তিনি নিয়মিত লিখছেন। কবিতা লেখার পাশাপাশি কবিতা পড়াও তাঁর চলেছে।
তাঁর কবিতায় রোমান্টিক প্রেমের সঙ্গে পাওয়া যায় রোমান্টিক বিপ্লবের ছোঁয়া। সাধারণ মানুষের ওপর
জমিদারদের অত্যাচারের স্বরূপ কবির অজানা নয়। তিনি নিজে একজন বর্ধিষ্ণু কৃষক পরিবারের ছেলে।
এই অত্যাচারকে তিনি কখনও মেনে নিতে পারেন নি, গ্রহণ করতেও পারেন নি। প্রতিবাদ করেছেন। তিনি
দেখেছেন জমিদার বাগদী পাঠিয়ে ধরে নিয়ে গিয়েছে গরিব কৃষককে – অপরাধ সে খাজনা দিতে পারে নি।
সারা দিন রোদে বেঁধে রেখে তার সর্বাঙ্গে চাবুক মারা হয়েছে। খাবার তো দূরের কথা, এক ফোঁটা জল পর্যন্ত
তাকে দেওয়া হয় নি। নিজের আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই ছিলেন এই গোত্রের। জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ হয়ে
গেলেও, বাবুদের জমিদারী মেজাজ এতটুকু বদলায় নি। বন্ধ হয় নি অত্যাচার।

এই অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত গরিব মানুষগুলোর নির্মম যন্ত্রণার কথা ফুটে উঠেছে তার লেখায়। কবিতাগুলি
নন্দন, কালিকলম, দ্রুপদী, প্রভৃতি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। স্পষ্টতই কবি এখন মার্ক্সীয় দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট
হয়েছেন। এরকম সময়ে, নিজের নামটাকে অল্প বদলে ছোট করে করেছেন ভবতোষ। তাঁর কবিতা প্রভাব
ফেলেছেন
রাম বসু, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, মণীন্দ্র রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, গোলাম
কুদ্দুস প্রমুখরা।

ষাটের দশক থেকে রাজ্যে বামপন্থী আন্দোলনের জয় হয়েছে। গঠিত হয়েছে যুক্তফ্রন্ট সরকার।  অজয়
মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণে বলেছেন – “মুখ্যমন্ত্রী থেকে ঝাড়ুদার পর্যন্ত আমরা একই সূত্রে গ্রথিত একটি
মালা”। কথাগুলি কবির মনে গেঁথে গিয়েছিল।

কবি ভবতোষের কবিতার এই ধারাবদলকে তাঁর আত্মীয়-পরিজনেরা খুব সুনজরে দেখেন নি। কবির ওপর
মানসিক নির্যাতন শুরু করা হয়েছিল। নিন্দা-মন্দ থেকে সামাজিক বযকট কিছুই বাদ থাকে নি। শ্বশুরবাড়ির
লোকজনও তাতে সামিল হয়েছিল। কিন্তু কবি তাতে দমে যান নি।
কবির বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন -                                                    পাতার উপরে . . .   
এরপর ভবতারণের বিবাহ দেওয়া হয় চন্দ্রী নামক গ্রামের বর্ধিষ্ণু চাষী সতীশচন্দ্র হোতার মেয়ে গায়ত্রী  
দেবীর সঙ্গে। তাঁদের দুই কন্যা দিপালী ও রূপালী এবং এক পুত্র আশিস। কবি চাষবাস দেখাশোনার ফাঁকে
ফাঁকে কবিতা লিখে যেতেন। স্ত্রী গায়ত্রী দেবী কাছ থেকে কবিতা লেখার প্রতি বিশেষ উত্সাহ না পেয়ে,  
ভবতারণ তাঁর পূর্বের প্রেমিকাদেরই প্রেরণাদাত্রী মেনে নিয়ে কবিতা রচনা করে যেতেন। পুত্রের জন্মের  
কিছুকাল পরেই স্ত্রী যক্ষা রোগে মারা যান। স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তিনি উদ্ভ্রান্তের মতো হয়ে তাঁর চাষবাস  
থেকে মন উঠে যায়। মেয়েদের বিবাহের জন্য জমিজমা বিক্রী করতে হয়। এক ব্যবসাদারের পরামর্শে তিনি
একটা বিদেশি প্লাইমাউথ গাড়ি কেনেন। কিন্তু ব্যবসা করা হয় নি। ইয়ারদোস্তদের নিয়ে দিনের পর দিন  
দীঘা, কাঁকড়াঝোর, রাণীবাঁধ সহ নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়ে জীবনটাকে চুটিয়ে উপভোগ করেন। জমানো  
টাকা শেষ হয়ে যায়। বিক্রি হয়ে যায় প্লাইমাউথ গাড়ি।
*
*
দারিদ্র্য ও আঞ্চলিভাষায় কবিতা রচনা -                                            পাতার উপরে . . .   
ব্যক্তিগত জীবনে একেবারেই বৈষয়িক না হবার জন্য, কবির আর্থিক অবস্থার খুবই অবনতি ঘটে।
অর্ধাহারে, অনাহারে তাঁর দিন কাটতে থাকে। স্থানীয় কিছু অনুরাগী অবশ্য কবির পাশে দাঁড়ান। সাহায্য ও
সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেন। এই সময়ে “পান্থসখা” হোটেলের মালিক কবি অশোক মহান্তি,  কবি
মুরারীশংকর ভট্টাচার্য্য। তিনিও মাঝে মাঝে কবিকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে দিয়েছেন।

এই কঠোর দারিদ্রের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে কবির জীবনে এক নতুন উপলব্ধি এল। তাঁর কেমন যেন মনে
হল তিনি তাঁর কবিতায় যাদের কথা বলেছেন সেই নিপীড়িত, নির্যাতিত অসহায় মানুষগুলোর কাছে তাঁর
কবিতা একেবারেই পৌঁছতে পারে নি। তাঁর এই কবিতা লেখাকে মনে হোলো শুধু বিলাসীতা আর  
রোমান্টিক বিপ্লব-বিলাস! এই অশিক্ষিত মানুষগুলোর মুখের ভাষায়, তাঁর কবিতা লেখার কথা ভাবলেন।
এই চিন্তার মধ্যে কবি একটা নতুন দিশা খুঁজে পেলেন। তাঁর কবিতায় এই লোকভাষা প্রয়োগ শুরু করলেন।
এই প্রয়োগ তাঁর কবিতায় নতুন মাত্রা এনে দিল। এই ভাষায় লেখা কবিতাগুলি তিনি চটি বই আকারে
ছাপিয়ে বিক্রি শুরু করলেন। গ্রামে-গঞ্জে হাটে-বাজারে-মেলায় কবি কবিতার ফেরিওয়ালা হয়ে নিজেই বিক্রী
করতে শুরু করেন। ভাল বিক্রি হোতো তাঁর বই। এতে করে একদিকে যেমন তাঁর কবিতা সাধারণমানুষের
মধ্যে ছড়িয়ে গেল, জনপ্রিয়তা লাভ করল, অন্যদিকে বই বিক্রি করে কিছু অর্থাগমও হল। বেশ কিছু কবিতা
বিশেষ করে “শিরি চুনারাম মাঁহাত”, “ডের বিঘা জমিন” জনপ্রিয় হয়ে লোকের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে। কবি
মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হলেও সক্রিয়ভাবে কোন রাজনীতি করেন নি।
*
ঝুমুর ও টুসু গানের রচনা -                                                              পাতার উপরে . . .   
এর পর কবি ভবতোষ শতপথী, ঝুমুরের জগতে প্রবেশ করলেন। ঝুমুরের সফল ব্যবহার দেখা গেল কবি
ভবতোষের লেখা গানগুলিতে। এবার মণিকাঞ্চন যোগ হল যখন ভবতোষবাবুর লেখা গানগুলিতে কন্ঠ দিলেন
সুগায়ক এবং কবি বিজয় মাহাত। বিজয় মাহাতর গাওয়া ঝুমুর গানের পাঁচটি ক্যাসেটের মোট ৩৪টি  
গানের মধ্যে একা ভবতোষ শতপথীর লেখা ১৯টি গান আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় “আকাল বছর
আল্যও ঝড়” গানটি।

ঝুমুর ছাড়াও কবির লেখা টুসু গানগুলিও জনপ্রিয় হয়েছে। সেই অঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় উত্সব
মকর-সংক্রান্তি। এই উত্সবকে কেন্দ্র করে সারা এলাকায় যেন আনন্দের ঢল নেমে আসে। মকর পরবের
অন্যতম অঙ্গ টুসু গান। নানা বয়সের মেয়েরা টুসুগান গাইতে গাইতে সুবর্ণরেখা, ডুলং, কংসাবতী,  
দ্বারকেশ্বর, দামোদর, কুমারী প্রভৃতি নদীতে অথবা কোন জলাশয়ে টুসু বিসর্জন দেয়। এই গানগুলিতেও  
সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ-হাসি-কন্নার কথাই ব্যক্ত হয়। কবির লেখা কয়েকশো টুসুগান এখন এই উত্সবে  
সগৌরবে জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর লেখা টুসু গানগুলির সংকলন চটি বইয়ের আকারে বিভিন্ন মেলায়,  
হাটে, বাজারে বিক্রি হয়। এরপরেও অন্নসংস্থাপনের জন্য কবি একে একে সাইকেল, ঘড়ি, আসবাবপত্র, থালা-
বাটি-গেলাস বিক্রি করেছেন।
*
কবির প্রাপ্ত সহায়তা এবং সম্মাননা ও স্বীকৃতি -                                  পাতার উপরে . . .   
ঝাড়গ্রামের এক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার শ্রী শংকর বসুমল্লিক ১৯৮০ সাল থেকে কবির জন্য মাসিক
২০০ টাকা সাহায্যের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৮৯ সালের ১৮ আগষ্ট “আজকাল” সংবাদপত্রে কবির দুঃখ ও
দারিদ্রের ওপর একটি মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই সূত্রে কিছু চিঠিপত্রও ছাপা হয়। এরপর
তত্কালীন রাজের বামফ্রন্ট সরকারের পক্ষ থেকে কবিকে এককালীন পাঁচ হাজার টাকার অনুদান মঞ্জুর করা
হয়। ঝাড়গ্রামের বলাকা মঞ্চে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে কবির হাতে চেক তুলে দেওয়া হয়। এরপর
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চশিক্ষা দপ্তর, লিটারেরি পেনসন কমিটির সুপারিশক্রমে কবিকে মাসিক ৩০০ টাকা
পেনশন দানের সিদ্ধান্ত নেন। তারপর পেনশন বেড়ে ৪০০ টাকা হয় এবং এটি ছিল কবির জীবিকা নির্বাহের
অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

কবি ভবতোষ শতপথী,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “চণ্ডালিকা” নৃত্যনাট্য-কে আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ করেন।
আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ করা চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যটি ১৯৯৫ সালের মে মাসে কবিপক্ষে কলকাতার রবীন্দ্র
সদনে অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতার “রাগিনী সাংস্কৃতিক সংস্থা” একদল আদিবাসী শিল্পীর সহযোগে এই অনুষ্ঠান
করেন। অনুষ্ঠানটি প্রশংসিত হয় এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে তার সংবাদ প্রকাশিত হয়। ইংরেজী দৈনিক ‘দি
স্টেটস্ ম্যান’ পত্রিকা কবি ভবতোষ শতপথীর অনুবাদ করা চণ্ডালিকার প্রশংসা করে লেখেন


Ragini’s Chandalika claimed to be the first ever Tagorean production in the regional language of Kurmali .
The well-known poet Bhabatosh Satapathy did a fairly good job of transcreating  Tagore.

কবির প্রাপ্ত সম্মাননার মধ্যে রয়েছে ২৯.৫.১৯৮৮ তারিখে কলকাতার স্টুডেন্টস হলে, ব়্যাডিক্যাল ইম্প্রেশনের
উদ্যোগে
মণিভূষণ ভট্টাচার্য এবং মহাশ্বেতা দেবী দ্বারা, কবির সম্বর্ধনা।  
*
জীবনাবসান ও আনন্দবাজার পত্রিকার খবর -                                      পাতার উপরে . . .   
কবি ১৫ই জানুয়ারী ২০১৭ সাল, রবিবার সকালে ঝাড়গ্রামের সত্যবানপল্লির বাড়িতে প্রয়াত হন। মৃত্যুকালে
তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮বছর। কয়েক মাস ধরে তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছিল।
শেষের দিনগুলি ছিল যন্ত্রণার।

তাঁর মৃত্যুর পর
আনন্দবাজার পত্রিকার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদদাতা কিংশুক গুপ্ত খবরের অংশ
বিশেষ, আমরা এখানে উদ্ধৃত করছি যা থেকে পরিবর্তনের পরে, শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের
আমলে এই কবি যে বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন তার খানিকটা জানা যায় . . .

গরিব, খেটেখাওয়া আদিবাসী-মূলবাসী মানুষের হাজারও বঞ্চনাই ছিল তাঁর কবিতার উপজীব্য। বাংলা ও
কুড়মালিতে সমান সাবলীল জঙ্গলমহলের সেই লোককবি ভবতোষ শতপথী (৮৮) নিজেও চলে গেলেন বঞ্চনা
নিয়ে। রবিবার সকালে ঝাড়গ্রামের সত্যবানপল্লির বাড়িতে প্রয়াত হন কবি। কয়েক মাস ধরে শয্যাশায়ী
ছিলেন। স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছিল। শেষের দিনগুলি ছিল নিতান্ত যন্ত্রণার। সরকারি ভাতা বন্ধ হয়ে
গিয়েছিল। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও অনেকে ব্যক্তিগত ভাবে আর্থিক সাহায্য করেছিলেন।
তবে তা নেহাতই সিন্ধুতে বিন্দুবৎ।

তাঁর সরকার লোকশিল্পের কদর বোঝে বলে বারবার দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য
সরকারের ‘লোকপ্রসার প্রকল্প’-এ শুধুমাত্র ঝাড়গ্রাম মহকুমায় চার হাজারেরও বেশি লোকশিল্পী ও গীতিকার
ভাতাও পান। তবে সেই তালিকায় নাম ওঠেনি ভবতোষবাবুর। বাম আমলে তিনি তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের
নথিভুক্ত দুঃস্থ সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে মাসে দেড় হাজার টাকা ভাতা পেতেন। রাজ্যে পালাবদলের পরে তা
বন্ধ হয়ে যায়। তথ্য-সংস্কৃতি দফতরে ভাতা চালুর জন্য তিনদফা আবেদন করেছিলেন ভবতোষবাবু। পরে
গোয়েন্দা শাখার অফিসারেরা কবির সম্পর্কে খোঁজখবর করেন। তথ্য সংগ্রহ করে রাজ্য চারুকলা পর্ষদও।
তবে ভাতা চালু হয়নি। কবি যখন শেষশয্যায়, তখন ঝাড়গ্রামের সংস্কৃতি মহলের একাংশ ভবতোষবাবুকে
সরকারি ভাতা ও সম্মান দেওয়ার দাবি তুলেছিল। বিশিষ্ট ঝুমুরশিল্পী বিজয় মাহাতোর ক্ষোভ,  
“ভবতোষবাবুর প্রতি অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে লজ্জার।” মৃত্যুর পরে  
ভবতোষবাবুর ছেলের হাতে ঝাড়গ্রামের পুরপ্রধান দুর্গেশ মল্লদেব দু’হাজার টাকা দেওয়ার পরে সংস্কৃতি
মহলে ক্ষোভ ছড়ায়। পুরপ্রধানের ব্যাখ্যা, দুঃস্থ কারও শেষকৃত্যে পুরসভার তরফে সাহায্যের যে নিয়ম
রয়েছে, সেটাই পালন করা হয়েছে।

কিন্তু কেন ভাতা পেলেন না লোককবি? প্রশাসনের কাছে এর সদুত্তর নেই। পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা তথ্য-
সংস্কৃতি আধিকারিক কৌশিক নন্দী শুধু বলেন, “ভবতোষবাবুকে সরকারি সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারে একটি
প্রস্তাব উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল।” এ নিয়ে কবির অবশ্য খুব একটা আক্ষেপ ছিল না।
ভাতা বন্ধের প্রসঙ্গ উঠলে খালি হাসতেন। তারপর আওড়াতেন,
'সুখের মুখে ছাই দিয়েছি, দুঃখের দায়  ভাগ
এই জীবনের প্রতি আমার অন্য অনুরাগ
।’
*
শ্রী মলয় প্রামাণিকের পাঠানো কবি-জীবনী -                                      পাতার উপরে . . .   
কবি ভবতোষ শতপথী – অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার জামবনি থানার অন্তর্গত টুলিবড় গ্রামে জন্ম গ্রহণ
করেন। পিতা- শ্রীপতিচরণ শতপথী, মাতা- বিনোদবালা দেবী। খুব কম বয়সে গায়ত্রী  দেবীর সঙ্গে পরিণয়
এবং কবির যখন মাত্র ২৮ বছর বয়স, তখন পত্নীবিয়োগ হয়। তাঁর দুই কন্যা এবং এক পুত্র মামাবাড়িতে
মানুষ হন। স্ত্রীর পরলোক গমনের পর কবি চলে আসেন ঝাড়গ্রাম শহরে। দীর্ঘ সময় একাকীত্বে প্রবাহিত হয়
তাঁর। কবিতা একমাত্র সঙ্গী তখন।

কবি, খুব ছোটবেলায় স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। আঞ্চলিক ভাষায় তাঁর লেখা কবিতা  ও
গান বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 'শিরি চুনারাম মাঁহত' তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক কবিতা। এই কবিতা
প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর খ্যাতি সুদূর প্রসারিত হয়। তাঁর লেখা বিখ্যাত ঝুমুর গান কয়েকজন শিল্পীকে
প্রতিষ্ঠিত করে। পাশাপাশি প্রচলিত বাংলায় তাঁর বহু কবিতা 'দেশ', 'কৃত্তিবাস', 'এক্ষণ' সহ বিভিন্ন ছোট-বড়
পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সেই সূত্রে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ
ঘোষ প্রমুখ বিশিষ্ট কবির সঙ্গ ও বন্ধুত্ব লাভ করেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে সংবর্ধনা দিয়েছেন।

সত্যজিৎ রায় এই কবির ভক্ত ছিলেন এবং তাঁর পুত্র সন্দীপ রায় ঝাড়গ্রামে কবির বাড়িতে এসে  সাক্ষাত
করে যান। একাধিকবার এসেছেন মহাশ্বেতা দেবীও। আরো অনেক বিশিষ্ট সাহিত্যিকের সঙ্গে কবির নিবিড়
যোগাযোগ ছিল।

আমরা কৃতজ্ঞ শ্রী মলয় প্রামাণিকের কাছে যিনি আমাদের কবির এই সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং কবির ছবিটি
আমাদের পাঠিয়েছেন। তাঁর যোগাযোগের ইমেল -
tarafeni2@gmail.comআমরা কৃতজ্ঞ কবি রাজেশ
দত্তর
কাছে জিনি এই পাতাটি প্রকাশের উদ্যোগ নিজে গ্রহণ করেছিলেন

আমরা
মিলনসাগরে  কবি ভবতোষ শতপথীর কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে
আমাদের এই প্রচেষ্টা সার্থক মনে করবো।



কবি ভবতোষ শতপথীর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন



উত্স -
  • কবির কাব্যগ্রন্থ "অরণ্যের কাব্য", ১৯৮৮।
  • সোমনাথ নন্দী, মুরারি সিংহ সম্পাদিত লোককবি ভবতোষ, ১৯৯৬।         
  • শ্রী মলয় প্রামাণিকের পাঠানো কবি-জীবনী ও ছবি।  



আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     



এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ২০.৮.২০১৬
এই পাতার ছবি-সহ পরিবর্ধিত সংস্করণ - ২.৮.২০১৭  
এই পাতায় শতাধিক কবিতার সংযোজন - ৯.৮.২০১৮


...
*