কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় - স্বনামধন্য কবি। তিনি কৃত্তিবাস পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে জড়িত
ছিলেন। তাঁর স্ত্রী স্বনামধন্যা
কবি বিজয়া মুখোপাধ্যায়। তাঁর ছদ্মনামের মধ্যে রয়েছে “ত্রিশঙ্কু” এবং “নমিতা
মুখোপাধ্যায়”! এই নামে কবি হিসেবে তাঁর বেশ পরিচিতিও হয়েছিল!

কবি অল্প বয়সেই কবিতা লেখা শুরু করেন। তাঁর কৈশোর কেটেছে বেনারসে।

তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়
কবি নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত পাঠাশালা পত্রিকায় ১৯৪৭-৪৮ সালে, নিজের
আসল নামেই! তিনি
কবি বুদ্ধদেব বসুর একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন। কবি বুদ্ধদেব বসু তাঁর সম্পাদিত
“আধুনিক বাংলা কবিতা” সংকলনের পঞ্চম সংস্করণে, ১৯৭৩ সালে, শরত্কুমারের কবিতা সন্নিবেশ করেন
শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার প্রমুখ কবিদের সঙ্গে।

প্রথম প্রথম, যখন তিনি  “নমিতা মুখোপাধ্যায়” ছদ্মনামে কবিতা লিখে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় পাঠাচ্ছিলেন,
তখন একদিন তাঁর মধ্যমগ্রামের বাড়ীতে,  “অঙ্গনা” পত্রিকার দুজন মহিলা কর্মী তাঁর সাক্ষাত্কার নিতে
আসেন, আগে থেকে চিঠি দিয়েই। তিনি নিজের মাতৃদেবীকে “নমিতা মুখোপাধ্যায়” সাজিয়ে সে যাত্রা পার
করেছিলেন! এরপরই তিনি গিয়ে দেখা করেন কৃত্তিবাস পত্রিকার অফিসে, যেটা ছিল
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের
বাড়ীতেই এবং তখন থেকে আর এই ছদ্মনাম ব্যবহার করেন নি।

কৃত্তিবাস থেকেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্য গ্রন্থ “সোনার হরিণ” এই কাব্যগ্রন্থেই তিনি বিজ্ঞাপন দিয়ে
জানান তাঁর মহিলা-ছদ্মনাম থেকে স্বনামে কবিতা লেখার কথা। কবি হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন
কৃত্তিবাস পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরই। সেই সূত্রে হৃদ্যতা ও বন্ধুত্ব হয়
সুনীল গঙ্গেপাধ্যায়, শক্তি
চট্টেপাধ্যায়
প্রমুখ কবিদের সঙ্গে।

সায়ম বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একটি সাক্ষাত্কারে কবি জানিয়েছেন, কৃত্তিবাস পত্রিকার দলের চারজন যুবকের
রাত বারোটার পর “কলকাতা শাসন” করার গল্প! সেই চারজন যুবকের দুজন অবশ্যই ছিলেন
শক্তি
চট্টোপাধ্যায়
এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়! দলের অন্যানরা বাকি দুজনের যায়গা নিতেন! ছ-সাত-আটজন
মিলিত হতেন। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা-আটটা থেকে শুরু হোতো তাঁদের কলকাতা ভ্রমণ। খালাসিটোলা, ছোটা
ব্রিস্টল হয়ে অন্য কোথাও। সেখান থেকে আরও রাতে সোজা উত্তর কলকাতার চোলাইয়ের ঠেকে! রাত
বাড়ার পর আস্তে আস্তে যে-যার বাড়ী চলে যেতেন। শেষ অবধি ওই চারজন থাকতেন। তাঁরা রিকশা করে,
হেঁটে, গান গাইতে গাইতে সারা শহর ঘুরতেন। পুলিশ দেখলেও তাঁদের কিছু বলতেন না! সব শেষে তাঁরা
হাজির হতেন শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে। কোনো কোনো দিন দেখা হয়ে যেত, শো শেষ করে বাড়ী
ফেরার পথের,
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। নাট্যকার, অভিনেতা ও কবি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের
সঙ্গে কথাবার্তা হলেও, তাঁকে কোনো দিন কিছু খেতে-তেটে দেখেননি কবি! চারজন, মোড়ের কার্তিকের দিশি
মদের দোকানের পিছনে এক জলের ট্যাঙ্কের উপর বসে, মদ খেয়ে তারপর গোলবাড়িতে মাংস-রুটি খেয়ে
বাড়ি ফিরতেন! এটাই ছিল তাঁদের “রাতের কলকাতা শাসন”!

এই ঘটনাবলী লেখা প্রয়োজন হয়ে পড়লো এই জন্য যে, একদল যুবক, স্রেফ কবিতা লেখার সৃহায় একত্র
হয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের কোনো এক সন্ধিক্ষণে, “কৃত্তিবাস” পত্রিকাকে কেন্দ্র করে।
ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রতি অশ্রদ্ধা বিশেষ করে
রবীন্দ্রনাথ! যাঁকে বাঙালী, ভক্তের মতো পূজো
করতে শুরু করেছিলো, তার বিরুদ্ধে ( সেটা কতদূর করতে পেরেছিলেন সেটা অবশ্যই তর্কসাপেক্ষ! ) একদল
যুবকের কাছে আসা এবং অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় দুঃসাহসিক কিছু করার চেষ্টার একটি উদাহরণ এই
“রাতের কলকাতা শাসন”! এই দলটির এমন অন্যান্য দুঃসাহসিক কাজের ফসলস্বরূপ রচিত হয়েছে
সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়ের
“অরণ্যের দিন রাত্রি”-র মতো কাহিনী যা চলচিত্রায়িত করেছিলেন সত্যজিত রায়!     

কর্ম জীবনে কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে সেকালের
Esso অধুনা Bharat
Petroleum
নামক তেলের কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন।    

সুনীল গঙ্গেপাধ্যায়ের বিদেশ যাত্রা কালে তিনি কৃত্তিবাস পত্রিকা সম্পাদনাও করেছেন।

তাঁর রচিত অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “ব়্যাঁবো, ভেয়ারলেন এবং নিজস্ব” (১৯৬৩), “আহত ভ্রুবিলাস”
(১৯৬৫), “অন্ধকার লেবুবন” (১৯৭৫), “মৌরির বাগান ও কিছু নতুন কবিতা” (১৯৭২)। তাঁর রচিত উপন্যাসের
মধ্যে রয়েছে “সহবাস” (১৯৭৫) এবং “কথা ছিল” (১৯৭৪)।

আমরা মিলনসাগরে  কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়ের কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে
পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।

কবির জীবন সম্বন্ধে আরও তথ্য যদি কেউ আমাদের পাঠান তাহলে আমরা, আমাদের কৃতজ্ঞতাস্পরূপ
প্রেরকের নাম এই পাতায় উল্লেখ করবো।


উত্স - সায়ম বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেয়া কবির একটি সাক্ষাত্কার। দেশ পত্রিকা   
.            
ডঃ শিশির কুমার দাশ, সংসদ সাহিত্য সঙ্গী ২০০৩।    


কবি শরত্কুমার মুখোপাধ্যায়ের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
কবি বিজয়া মুখোপাধ্যায়ের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ২৭.৪.২০১৭...

...