*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
প্রিয়নাথ জানা সম্পাদিত বঙ্গীয় জীবনকোষে ৬য় জন মনোহর   
মনোহর দাস সম্বন্ধে প্রদীপকুমার সিংহের উদ্ধৃতি    
মনোহর দাস নিয়ে রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রের উদ্ধৃতি   
সংসদ বাংলা চরিতাভিধানে মনোহর দাস আউলিয়া   
চৈতন্যচরিতামৃতে মনোহর এবং মনোহর দাস   
প্রেমবিলাসে আউলিয়া চৈতন্যদাসের বিবরণ   
নরোত্তমবিলাস গ্রন্থে মনোহর    
অনুরাগবল্লীর রচয়িতা মনোহর দাস    
সারাবলী গ্রন্থে আউল মনোহর দাস   
পদসমুদ্র ও বাবা আউল মনোহর দাস সম্বন্ধে দীনেশচন্দ্র সেনে   
হারাধন দত্তের প্রতি দীনেশচন্দ্র সেনের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন   
পদসমুদ্র পুথি ও হারাধন দত্ত সম্বন্ধে দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি   
মনোহর দাস সম্বন্ধে জগবন্ধু ভদ্র ও সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি   
মনোহর দাসের পদসমুদ্র সম্বন্ধে হারাধন দত্তর উদ্ধৃতি     
পদসমুদ্রের অস্তিত্ব কাল্পনিক  নিয়ে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধতি  
পদসমুদ্র গ্রন্থের বিশ্বাসযোগ্যতা      
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি   
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
.
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি -                                   পাতার উপরে . . .  
শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক,
শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র
সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ, ১৩২৫ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৮), তাঁর “সঙ্গীত শাস্ত্রের
একখানি প্রাচীন গ্রন্থ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .

“. . .
বৈষ্ণব পদাবলীর মত সুন্দর জিনিস বঙ্গসাহিত্যে আর নাই। কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া প্রাণ
আকুল করিয়া তুলিতে পারে, এমন সুধাস্রাবী ঝঙ্কার বৈষ্ণব পদাবলী ভিন্ন বাঙ্গালায় আর কিছুতে নাই
।”



আমরা
মিলনসাগরে  কবি মনোহর দাসের বৈষ্ণব পদাবলী তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে  পৌঁছে  দিতে  
পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।



কবি মনোহর দাসের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ২০.৬.২০১৯


...
কবি মনোহর দাস - বঙ্গীয় বৈষ্ণব ইতিহাসে
একাধিক মনোহর দাসের উল্লেখ পাওয়া যায়।
তাঁদের প্রায় সবাই অথবা অনেকেই পদকর্তা
হবার দাবী রাখেন। কোন জন কোন পদের  
রচয়িতা তা এখন আর বলা সম্ভব নয়। মনোহর
দাসের ভণিতায় রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদের  
পাশাপাশি রাম-সীতা বিষয়ক পদও রয়েছে।  
বৈষ্ণবদাসের শ্রীশ্রীপদকল্পতরুতে তাঁর মাত্র ৬টি
রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদ রয়েছে। অন্যান্য গ্রন্থ
 
মিলিয়ে মিলনসাগরে তাঁর রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক  
পদের সংখ্যা ২
। এখানে তাঁর রামসীতা  
বিষয়ক পদের সংখ্যা ১১।

তাঁদের মধ্যে কারো কারও উপরে অলৌকিকত্ব ও
সাধনবল-এর মতো শক্তি আরোপিত করা হয়েছে,
যার ফলে তাঁদের কর্মজীবন ও জীবনকাল   
ইত্যাদি, সাধারণ কল্পনার গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।
আমরা, প্রাপ্ত তথ্যাদি এখানে তুলে দিচ্ছি, ঠিক
যেমন যেমন আমরা তা পেয়েছি।
উল্লিখিত মনোহর-দের মধ্যে “বাবা আউল মনোহর দাসের” নামে “পদসমুদ্র” নামে প্রায় ১৫০০০ পদ বিশিষ্ট
পদসংকলন রচনার কিংবদন্তী চালু আছে। তিনি
কবি জ্ঞানদাসের বন্ধু ছিলেন বলে প্রচলিত।

হুগলী জেলার বদনগঞ্জ গ্রামে তাঁর এক প্রিয় শিষ্যর বংশধর হারাধন দত্ত ভক্তিনিধির কাছে এই “পদসমুদ্র”  
গ্রন্থটি উনবিংশ শতকের শেষ দিকে ছিলো বলে তিনি দাবী করতেন।

৪০৪ গৌরাব্দে (১৮৯১) একবার বৃন্দাবনে
শ্রীগৌরাঙ্গদেবের মন্ত্র ও পুজা নিয়ে বিবাদ সৃষ্টি হয়, তখন হারাধন
দত্ত শ্রীগৌর মন্ত্রের ও পূজার অনুকূলে নানাবিধ প্রমাণ সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। এই ঘটনার পরে দেনুর  
নিবাসী কেশব ভারতীর বংশীয় শ্রী অম্বিকাচরণ ব্রহ্মচারী, হারাধন দত্ত মহাশয়কে ভক্তিনিধি উপাধি প্রদান
করেন।

যাই হোক, হারাধনবাবু কিন্তু গ্রন্থটি কখনো কোনও সাহিত্য-সেবককে চাক্ষুস দেখার সুযোগ দেন নি।  
উনবিংশ শতকের শেষ দিকে এই বিষয়টি নিয়ে বঙ্গীয় বৈষ্ণব সাহিত্য জগতে তীব্র তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
বিশেষজ্ঞগণের কেউ কেউ বইটিকে কোনো মতে দেখার সুযোগ না পেয়ে মনে করতে শুরু করেছিলেন যে
গ্রন্থটি জালও হতে পারে! তবে সৌভাগ্যবশত শেষ পর্যন্ত তাঁরা গ্রন্থটিকে জাল বলে উড়িয়ে দেন নি। ৪১৩
গৌরাব্দের ১০ই ভাদ্র তারিখে (১৩০৭ বঙ্গাব্দ, অগাস্ট ১৯০০) হারাধন দত্ত ভক্তিনিধি পরলোক গমন করেন।
শ্রীশ্রীবিষ্ণুপ্রিয়া পাক্ষিক পত্রিকার ৪১৩ গৌরাব্দ (১৯০০), ভাদ্র, ৮ম সংখ্যার ৩৬৯-পৃষ্ঠায়, তাঁর পরলোক  
গমনের খবর পরিবেশিত হয়। তাঁর সংগ্রহে থাকা পদসমুদ্র নিয়ে তর্ক-বিতর্ক বিংশ শতকের বাংলা বৈষ্ণব
সাহিত্য সরগরম ছিল এবং এখনও আছে।

হারাধন দত্ত ভক্তিনিধি বৈষ্ণব সাহিত্যে এতটাই প্রসিদ্ধ এবং প্রিয় ছিলেন যে বিখ্যাত ঐতিহাসিক, বৈষ্ণব  
সাহিত্যিক ও “শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত” গ্রন্থের রচয়িতা
অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, হারাধন বাবুর প্রয়াণে একটি
কবিতা লিখে “বিষ্ণুপ্রিয়া” পত্রিকায় প্রকাশিত করেছিলেন। সেই কবিতাটি পড়তে, মিলনসাগরে অচ্যুতচরণ
চৌধুরী তত্ত্বনিধির কবিতার পাতায় যেতে
এখানে ক্লিক করুন . . .

“পদসমুদ্র” গ্রন্থ থেকে
বিদ্যাপতির পরিচয় উদ্ধৃত করা পদ, চণ্ডীদাসের প্রেমিকা রামী রজকিনীর লেখা পদ,
নরহরি সরকার ঠাকুরের লেখা গৌর-বিষয়ক পদ রচনা করার ইচ্ছাজ্ঞাপন করা পদ, যা কিনা শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভুকে
নিয়ে রচিত প্রথম পদ হিসেবে গণ্য করা হয়, ইত্যাদি নানা চমকপ্রদ পদাবলী, হারাধন দত্ত  
মহাশয় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, বিভিন্ন প্রবন্ধে প্রকাশিত করেছিলেন। তত্সত্ত্বেও তিনি গ্রন্থটি
কখনই কাউকে দেখতে দেন নি। ইচ্ছে থাকলেও পুস্তকাকারে ছাপাবার ব্যবস্থা করে যান নি।

আমরা “পদসমুদ্র” গ্রন্থটি নিয়ে সেই সময়কার পত্র-পত্রিকা ও গ্রন্থাদিতে প্রকাশিত তর্ক-বিতর্ক এবং বিভিন্ন
বিশেষজ্ঞদের মতামত, যতটা সম্ভব এখানে তুলে দেবার চেষ্টা করেছি।

১৯৭৬ সালে প্রকাশিত সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান গ্রন্থে তাঁরা
লিখেছেন যে বাবা আউল মনোহর দাসই নাকি “মনোহরশাহি” সঙ্গীতরীতির প্রবর্তন করেন।
.
প্রিয়নাথ জানা সম্পাদিত বঙ্গীয় জীবনকোষে ৬য় জন মনোহর -                  পাতার উপরে . . .  
১৯৫৫ সালে প্রকাশিত, প্রিয়নাথ জানা সম্পাদিত বঙ্গীয় জীবনকোষ ১ম খণ্ডে ৬য় জন বৈষ্ণব মনোহর দাসের
উল্লেখ রয়েছে! . . .

১।
মনোহর - অষ্টদশ শতাব্দীর শেষার্ধের কবি। রচিত কাব্য পঞ্চানন-মঙ্গল বা পঞ্চাননের ব্রতকথা। নিবাস
ছিল বর্ধমান শহরের পশ্চিম প্রান্তে গোদা গ্রামে। স্বপ্নাদেশে ব্রতকথাটি লেখা হয়েছিল। --- ইনি বৈষ্ণব
পদাবলীর কবি নন।

২।
মনোহর দাস - জনৈক প্রসিদ্ধ বৈষ্ণব কবি। পদকর্তা জ্ঞানদাস এঁর বন্ধু ছিলেন। মনোহর “নিত্যানন্দ
পরিবার” ভুক্ত প্রাচীন ভক্ত।

৩।
মনোহর দাস - শ্রীনিবাস আচার্য্যের শিষ্য কৃষ্ণদাস চট্টরাজের পুত্র এবং শ্রীনিবাসের অপর এক শিষ্য
রামশরণ চক্রবর্তীর শিষ্য। মনোহর দাস গুরুদত্ত নাম। মনোহর কাটোয়ার নিকটবর্তী বেগুনকোলা গ্রামে
থাকতেন। পরে গুরুর আদেশে ব্রজবাস করেন। মনোহর সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ অভিজ্ঞ ছিলেন। এঁর রচিত
গ্রন্থের নাম “অনুরাগবল্লী”। গ্রন্থটির বিষয়েও প্রেমবিলাস-প্রেমামৃত-কর্ণানন্দের অনুরূপ। এটি ১৬৯৭ খৃষ্টাব্দে
বৃন্দাবনে রচিত হয়। মনোহর কিছু কিছু পদও রচনা করেছিলেন। “অনুরাগবল্লী” বাংলা পয়ার ছন্দে রচিত।

৪।
মনোহর দাস - শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুচর রামানন্দ রায়ের অনুজ বাণীনাথ পট্টনায়কের প্রপৌত্র।
মনোহর দাসের বিশেষ উল্লেখযোগ্য রচনা “দিনমণিচন্দ্রোদয়”। কবির আত্মপরিচয় থেকে জানা যায়
বাণীনাথের পৌত্র, কটকবাসী গোবিন্দানন্দ, নিত্যানন্দ ও মনোহর এই দুই পুত্র রেখে পরলোক গমন করলে
তাঁদের সম্পত্তি উড়িয়া রাজা আত্মসাৎ করেন। তখন মনোহর বালক মাত্র। অগ্রজের সঙ্গে বর্ধমানে এসে
বসবাস করেন। একদিন তিনি পথে গৌরহরি বাউলকে দেখে আকৃষ্ট হন। এবং তাঁর সঙ্গে কেন্দুবিম্ব হয়ে
বৃন্দাবনে যান। সেখানে কয়েকবছর থেকে নবদ্বীপে এসে পুনর্বার গৌরহরি বাউলের সঙ্গে মিলিত হন। পরে
তাঁর আদেশে ঘরে ফিরে আসেন এবং গৃহদেবতা গোপীনাথের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ইনি সপ্তদশ
শতাব্দীতে অবস্থান করছিলেন। মনোহর ভণিতায় আরও কতকগুলি নিবন্ধ পাওয়া যায়। এগুলিও হয়ত এই
মনোহর দাসের রচনা। যেমন, “আশ্রয়কল্পলতিকা”, “ভক্তিরসোজ্জ্বল চূড়ামণি”, “মনোহরকারিকা”,
 
“রূপঞ্জনলতিকা”।

৫।
মনোহর দাস (আউল) - ভক্ত বৈষ্ণব। ১৬৫৭ শকাব্দের ১৭ পৌষ (১৭৩৫) ইনি বদনগঞ্জ থেকে
শ্রীবৃন্দাবনে গমন করেছিলেন বলে জানা যায়। এঁর তিরোভাবের জন্য বদনগঞ্জে মকর সংক্রান্তিতে মহোত্সব
হয়ে থাকে। ইনি অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন ছিলেন। হুগলী জেলার আরামবাগ মহকুমার গোমট থানার অন্তর্গত
বদনগঞ্জ গ্রামে, বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের গোকুলনগর গ্রামে এবং সোনামুখী গ্রামে বাবা মনোহর দাসের
সমাধি আছে। এঁর বহু শিষ্য ছিল। ইনি দেশের পাঠশালাসমূহে গমন করে বালকদের ধর্ম শিক্ষা দিতেন। এঁর
নিকট বহু বৈষ্ণব গ্রন্থ ছিল। ইনি দীর্ঘজীবি ছিলেন।

৬।
মনোহর দাস বাবাজী - প্রসিদ্ধ সাধক। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত রাজা বীর হাম্বিরের (১৫৬৫-
১৬১৯খৃ) সভাপণ্ডিত ছিলেন। এঁর রচিত গ্রন্থের নাম “দিনমণিচন্দ্রোদয়”। সোনামুখী গ্রামে তাঁর পটে প্রতি
বছর রামনবমী তিথিতে মহাসমারোহে মহোত্সব হয়।
.
মনোহর দাস সম্বন্ধে প্রদীপকুমার সিংহের উদ্ধৃতি -                                   পাতার উপরে . . .  
প্রদীপকুমার সিংহ তাঁর ১৯১৫সালে প্রকাশিত, রাঢ়ের পদাবলী গ্রন্থে মনোহর দাসের জীবন ও পদ সম্বন্ধে iv-
পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .

"
চৈতন্যোত্তর বৈষ্ণব পদকর্তাদের মধ্যে মনোহর দাস একজন উল্লেখ যোগ্য কবি ছিলেন। তিনি নিত্যানন্দ
প্রভুর পুত্র বীরচন্দ্রের শিষ্য ও জ্ঞানদাসের সম সাময়িক কবি ছিলেন। সিদ্ধ সাধক. কবি ও উচ্চস্তরের
কীর্ত্তনীয়া বলিয়া তাঁহার সুপরিচিতি ছিল। বাঁকুড়ার জেলা সোনামুখীতে তাঁহার আখড়া রহিয়াছে।
প্রতিবত্সর রামনবমী হইতে একাদশী পর্য্যন্ত, এই তিনদিন ঐ স্থানে সহোত্সব চলিতে থাকে। এই উপলক্ষে
ঐ সময় বহু ভক্ত বৈষ্ণব ও সাধু সন্তের সেখানে আবির্ভাব ঘটে। মল্লভূমের তন্তুবায় শ্রেণীর উপর মনোহর
দাসের প্রভাব ছিল অসাধারণ। কথিত আছে একবার তাঁতে পিঁপড়ার উপদ্রবে তন্তুবায়দের বিশেষ ক্ষতি
হইয়া থাকে। অনেক তন্তুবায় তাঁহাদের জাতি ব্যবসা নষ্ট হইতেছে বলিয়া, মনোহর দাসের কাছে ইহার
প্রতিকারের প্রার্থনা জানায়। মনোহর তাঁহাদের শান্ত করেন এবং তাহারপর হইতে তাঁহাদের তাঁতে আর
পিঁপড়ার উপদ্রব হয় নাই। সেউ হইতে তন্তুবায়গণ তাঁহার একনিষ্ঠ ভক্ত হয়। বিষ্ণপুরের তন্তুবায়রা
বিষ্ণুপুরের রঘুনাথসায়েরের নিকট মনোহর দাসের একটি আস্তানা নির্ম্মাণ করে।সেখানেও প্রতি বত্সর
সাড়ম্বরে মহোত্সব পালিত হইয়া আসিতেছে। মনোহর দাসের ভনিতাযুক্ত রাম ও রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক
কিছু পদ পাওয়া গিয়াছে। . . .
. . . মনোহর দাস যেমন রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদ রচনা করিয়াছেন, তেমনি রাম বিষয়ক কয়েকটি পদও রচনা
করিয়াছেন। উক্ত পদগুলির ছত্রে ছত্রে কবির হৃদয় মথিত ভক্তির সুর ধ্বনিত হইয়াছে। পদগুলি
সহজ, সরল, প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা। পাণ্ডিত্বের গুরুভার নাই। নিরাভরণ, নিরলংকৃত ভাষার মধ্যদিয়া কবি
রামায়ণের বিষয়বস্তুকে উপস্থাপিত করিয়াছেন
।"
.
মনোহর দাস নিয়ে রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রের উদ্ধৃতি -                      পাতার উপরে . . .  
১৯৫৫ সালে প্রকাশিত নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও
রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রর মহাজন পদাবলী  
“শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৪র্থ খণ্ডের ভূমিকায়, ৫৩-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .

চৈতন্যচরিতামৃতে নিত্যানন্দ শাখা-গণনায় ইঁহার উল্লেখ আছে। ‘সারাবলী’ গ্রন্থে নিত্যানন্দ শাখাভুক্ত এক
বাবা আউল মনোহর দাস এক উল্লেখ দেখা যায়
।”
.
সংসদ বাংলা চরিতাভিধানে মনোহর দাস আউলিয়া -                             পাতার উপরে . . .  
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান গ্রন্থে
মনোহর দাস আউলিয়া সম্বন্ধে লেখা আছে . . .

মনোহর দাস, আউলিয়া (? - ১৬৩৮) বিষ্ণুপুর - বাঁকুড়া। নিত্যানন্দ শাখাভুক্ত জাহ্নবী দেবীর শিষ্য। তিনি
প্রথমে বিষ্ণুপুরের রাজার গ্রন্থাগারের অধ্যক্ষ ছিলেন। ‘পদসমুদ্র’ ও ‘নির্যাসতত্ত্বের’ সংগ্রহকর্তা এবং ‘দিনমণি
চন্দ্রোদয়’ গ্রন্থপ্রণেতা। কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে ঘুরতেন বলে আউলিয়া মনোহর নামে পরিচিত ছিলেন।
বৈষ্ণব কবি জ্ঞানদাসের সঙ্গে তিনি কাঁদড়া গ্রামে থাকতেন এবং তাঁর সঙ্গে খেতুরির মহোত্সবে যোগ
দিয়েছিলেন। তিনি গরানহাটি ঢঙে প্রাচীন রাঢ়ীয় সংগীতরীতির সহযোগে মনোহরশাহী রীতির প্রবর্তন করেন
। হুগলি জেলার আরামবাদ মহকুমার বদনগঞ্জ গ্রামে তাঁর সমাধিক্ষেত্রে মকরসংক্রান্তি তিথিতে মেলা বসে।
বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী গ্রামে এবং বিষ্ণুপুরের কাছে গোপালনগরেও তাঁর সমাধিস্থল দেখানো হয়ে থাকে
।”
.
চৈতন্যচরিতামৃতে মনোহর এবং মনোহর দাস -                                     পাতার উপরে . . .  
১২৯৬ বঙ্গাব্দে (১৯৮৯খৃষ্টাব্দে) প্রকাশিত, জগদীশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত,
কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতের
আদি-লীলার একাদশ পরিচ্ছেদ - নিত্যানন্দস্কন্ধশাখা বর্ণন, ২৯৫-পৃষ্ঠায় এক জায়গায় “মনোহর” এবং অন্য
জায়গায় “মনোহর দাস” এর উল্লেখ রয়েছে। এই মনোহর দাস পদকর্তা বা পদ-সংকলক কি না তা সেখান
থেকে জানা যায় না। যদি একই ব্যক্তি হন তবে, “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থটির রচনাকাল ১৫৮১খৃষ্টাব্দ হওয়ার
দরুণ, মনোহর দাস, এর পূর্বেই জীবিত ছিলেন বলে ধরে নেওয়া যায়।

নারায়ণ, কৃষ্ণ দাস, আর মনোহর।
দেবানন্দ---চারি ভাই নিতাই কিঙ্কর॥

পিতাম্বর, মাধবাচার্য্য, দাস দামোদর।
শঙ্কর, মুকুন্দ, জ্ঞান দাস মনোহর

.
প্রেমবিলাসে আউলিয়া চৈতন্যদাসের বিবরণ -                                        পাতার উপরে . . .  
প্রভু নিত্যানন্দের পত্নী জাহ্নবা দেবীর শিষ্য
নিত্যানন্দ দাস বিরচিত “প্রেমবিলাসে” এক আউলিয়া চৈতন্য
দাসের উল্লেখ রয়েছে, যাঁর কাছে বৃন্দাবনের
শ্রীগোপালভট্ট,  শ্রীনিবাসের বিবাহের থবর পেয়ে মর্মাহত
হয়েছিলেন।

১৩২০ বঙ্গাব্দে (১৯১৩খৃষ্টাব্দ) বাবু যশোদালাল তালুকদার দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত,
নিত্যানন্দ দাস
বিরচিত প্রেমবিলাস গ্রন্থের ষোড়শ বিলাস, ১৩০-পৃষ্ঠায় আউলিয়া চৈতন্যদাস সম্বন্ধে রয়েছে . . .

গ্রন্থকার নিত্যানন্দ দাস বলছেন . . .

লেখিনু তাহার গুণ আজ্ঞা বলবান্।
পূর্ব্বে বলিয়াছি পরে যে আছে আখ্যান॥
মোর ঠাকুরাণীর শিষ্য শ্রীচৈতন্য দাস।
আউলিয়া বলি তাঁকে সর্ব্বত্র প্রকাশ


শ্রীগোপালভট্টের সঙ্গে আলাপচারিতায় চৈতন্য দাস বলছেন . . .

বিষ্ণুপুরে মোর ঘর হয় বার ক্রোশ।
রাজার দেশে বাস করি হইয়া সন্তোষ
॥ . . .

কিন্তু এখানে কোথাও লেখা নেই যে এই চৈতন্য দাসই মনোহর।
.
নরোত্তমবিলাস গ্রন্থে মনোহর -                                                           পাতার উপরে . . .  
জুলাই ১৯০৭খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, শ্রীকিশোরী দাস বাবাজী সম্পাদিত,
নরহরি চক্রবর্তী বিরচিত নরোত্তমবিলাস
গ্রন্থের ষষ্ঠ বিলাস,
ঠাকুর নরোত্তমের শ্রীবিগ্রহ স্থাপন ও প্রতিষ্ঠা উত্সবে সমগ্র গৌর পার্ষদ বর্গের খেতুরী
আগমন, ৪৬-পৃষ্ঠায় মনোহর এর উল্লেখ রয়েছে . . .

চতুর্দ্দিকে লোক সবে করে ধাওয়াধাই। সভে কহে আইলা শ্রীজাহ্নবী প্রেমময়ী॥
শ্রীজাহ্নবী ঈশ্বরী সহ্গের একজন। তেহো আইসে জানাইতে ঈশ্বরী গমন॥
দেখি আচার্য্যের গতি অতি হর্ষচিতে। ঈশ্বরী গমন কহে প্রণমি ভূমেতে॥
তাঁরে প্রণমিয়া শ্রীআচার্য্য মহাশয়। জিজ্ঞাসে বিশেষ তেঁহো বিবরিয়া কয়॥
এথাকার সমাচার পাঞা পত্রদ্বারে। হৈলা উত্কণ্ঠিত সভে এথা আসিবারে॥
তথায় ছিলেন কৃষ্ণদাস অত্যুদার। সূর্য্যদাস সরখেল জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যাঁর॥
শ্রীল রঘুপতি উপাধ্যায় মহীধর। মুরারি চৈতন্য জ্ঞানদাস মনোহর
॥ . . .
.
অনুরাগবল্লীর রচয়িতা মনোহর দাস -                                                পাতার উপরে . . .  
৪১৩ গৌরাব্দে (১৯০০খৃ) মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, মনোহর দাস বিরচিত “অনুরাগবল্লী”-তে তিনি গ্রন্থের
৮ম মঞ্জরীর ৪৯-পৃষ্ঠায়, নিজের সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

আসমুদ্র পর্য্যন্ত বৈষ্ণব নাম যাঁর। নিমানন্দী শুনি পূজ্য বুদ্ধি সভাকার॥
অনন্ত পরিবার তাঁর সর্ব্ব সদগুণধাম। তার মধ্যে এক শ্রীগোপালভট্ট নাম॥
ইহাঁর অনেক শিষ্য কহিলে না হয়। এক লিখি শ্রীনিবাস আচার্য্য মহাশয়॥
ইহাঁর যতেক শিষ্য কহিতে না শকি। এক শ্রীরামচরণ চক্রবর্ত্তী লিখি॥
ইহাঁর অনেক হয় শিষ্যের সমাজ। তার মধ্যে এক রামশরণ চট্টরাজ॥
শ্রীআচার্য্য ঠাকুরের সেবক-প্রধান। শ্রীকৃষ্ণদাস চট্টরাজ ঠাকুর নাম॥
তাঁর পুত্র হন ইহঁ পরম সুশান্ত। তাঁহার চরণ মোর শরণ একান্ত॥
তিহোঁ মোর গুরু তাঁর পদ প্রাপ্তি আশ। তাঁর দত্ত নাম মোর মনোহর দাস॥
কাটোয়া নিকট বাগ্যনকোলা পাটবাড়ী। সেখানে বসতি আর সর্ব্ব বাড়ী ছাড়ি


এখান থেকে জানা যায় যে
শ্রীগোপালভট্টের শিষ্য শ্রীনিবাস আচার্য্য। তাঁর শিষ্য রামচরণ চক্রবর্তীর শিষ্য
রামশরণ চট্টরাজই লেখকের দীক্ষাগুরু ছিলেন। অনুরাগবল্লীর রচয়িতা মনোহর দাসের নামটিও তাঁর গুরুর
দেওয়া। এই অংশের পরে তিনি আরও লিখেছেন যে গুরুর আদেশে তিনি বৃন্দাবন বাস করেন।
অনুরাগবল্লী গ্রন্থটি সমাপ্ত হয় ১৬১৮ শকে অথবা ১৭৫৩ সম্বত-এ, অর্থাৎ ১৬৯৬ খৃষ্টাব্দে।
.
সারাবলী গ্রন্থে আউল মনোহর দাস -                                                   পাতার উপরে . . .  
সারাবলী গ্রন্থটি আমরা যোগাড় করে উঠতে পারিনি। তাই আমরা এই অংশটি
সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত
বৈষ্ণবদাসের পদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভুমিকায়, পদকর্তা মনোহরের পরিচিতির অংশ বিশেষ, ১৮৫-পৃষ্ঠা
থেকে তুলে দিচ্ছি . . .

“(২)
বাবা আউল মনোহর দাস। ইনিও নত্যানন্দ শাখা-ভুক্ত। ইহাঁর নামান্তর চৈতন্যদাস। সারাবলী
গ্রন্থে ইহাঁর এইরূপ উল্লেখ আছে,---

আদি নাম মনোহর চৈতন্য নাম শেষ।
আউলিয়া হইয়া বুলে স্বদেশ ও বিদেশ
॥”
.
পদসমুদ্র ও বাবা আউল মনোহর দাস সম্বন্ধে দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি -        পাতার উপরে . . .  
স্বাধীন ত্রিপুরার
মহারাজ বীরচন্দ্রমাণিক্যের অর্থানুকুল্যে ১৮৯৬খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, দীনেশচন্দ্র  সেনের  
“বঙ্গভাষা ও সাহিত্য”, ১ম ভাগ গ্রন্থের ৭ম অধ্যায়ে, ১৭৬-পৃষ্ঠায় বাবা আউল মনোহর দাস এবং পদসমুদ্র
সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন . . .

"
বৈষ্ণব কবিগণের পদ প্রথম সংগ্রহ করেন, বাবা আউল মনোহর দাস ; হুগলী জেলার বদনগঞ্জে ইঁহার সমাধি
আছে ; কথিত আছে ইনি জ্ঞানদাসের বন্ধু ছিলেন ও যোগবলে অতি দীর্ঘজীবন লাভ করিয়াছিলেন ; ইঁহার
রচিত সংগ্রহের নাম পদ-সমুদ্র। খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষে এই সংগ্রহ সংকলিত হয়। ইহার পদ-সংখ্যা
১৫০০০ ; বোধ হয় পদসমুদ্রের অব্যবহিত পরেই শ্রীনিবাসাচার্য্যের পৌত্র (বৃদ্ধপ্রপৌত্র হবে) রাধামোহনঠাকুর
পদামৃতসমুদ্র সংকলন করেন
।"
.
হারাধন দত্তের প্রতি দীনেশচন্দ্র সেনের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন -                         পাতার উপরে . . .  
স্বাধীন ত্রিপুরার
মহারাজ বীরচন্দ্রমাণিক্যের অর্থানুকুল্যে ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, দীনেশচন্দ্র সেনের  
“বঙ্গভাষা ও সাহিত্য”, ১ম ভাগ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন . . .

এই ত্রিপুরায় বসিয়া শ্রীরাধাগোবিন্দ স্মরণ ভিন্ন বৈষ্ণব সাহিত্যের আর কোন রূপ চর্চ্চা করা আমার পক্ষে
সুবিধাজনক হইত কি না সন্দেহ ; কিন্তু শ্রীযুক্ত পণ্ডিত হারাধন দত্ত ভক্তিনিধি মহাশয় বৈষ্ণব সাহিত্য সম্বন্ধে
আমি যখন যে প্রশ্ন করিয়াছি, অগৌণে তাহার উত্তর দিয়া আমাকে উপকৃত করিয়াছেন ; তাঁহার বয়স এখন
৬৫ বত্সর কিন্তু আমার জন্য তিনি যুবকের ন্যায় শ্রম স্বীকার করিয়াছেন
।”
.
পদসমুদ্র পুথি এবং হারাধন দত্ত সম্বন্ধে দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি -              পাতার উপরে . . .  
দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত
"বঙ্গভাষা ও সাহিত্য", ১ম ভাগ গ্রন্থের ৭ম অধ্যায়ে, ১৭৬-
পৃষ্ঠার পাদটীকায় পদসমুদ্র পুথি ও হারাধন দত্ত সম্বন্ধে লিখেছেন . . .


পদসমুদ্র পুঁথি শ্রীযুক্ত হারাধন দত্ত ভক্তিনিধি মহাশয়ের নিকট আছে ; কলিকাতার কোন দোকানদার ২০০০
টাকা মূল্যে এই গ্রন্থসত্ত্ব খরিদ করিতে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু ভক্তিনিধি মহাশয় তাহা দেন নাই ; বৃদ্ধ বয়সে  
তিনি এই পুস্তক নিজের তত্ত্বাবধানে ছাপাইয়া পাত্রবিশেষে বিতরণ করিবেন, ইহাই তাঁহার সঙ্কল্প ;  এখন
তাঁহার বয়স ৭২ ; বহু ব্যায় সাধ্য পুস্তকের মুদ্রাঙ্কণ বিনা সাহায্যে করেন, এরূপ অর্থ সঙ্গতি নাই,---কিন্তু এই
পুস্তক মুদ্রাঙ্কণ ভিন্ন তাঁহার বৃদ্ধ বয়সের আর লক্ষ্য নাই। বঙ্গদেশে বঙ্গভাষার উন্নতি কল্পে এইরূপ  লোক
দেখা যায়---ইহা ভাবী উন্নতির শুভ চিহ্ন বলিয়া বোধ হয় ; এই কার্য্য অর্থাভাবে অসম্পূর্ণ থাকিলে তাহা  
আমাদের জাতীয় মনস্তাপের কারণ হইবে ; যে ধনাঢ্য ব্যক্তি এই সাধু কার্য্যে সহায় হইবেন, বঙ্গদেশের  
সাহিত্যে তাঁহার সেই বদান্যতার কথা চিরদিন উল্লিখিত থাকিবে
।”
.
মনোহর দাস সম্বন্ধে জগবন্ধু ভদ্র ও সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি -                    পাতার উপরে . . .  
সতীশচন্দ্র রায় ১৯৩১ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, তাঁর সম্পাদিত “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু” গ্রন্থের, ৫ম খণ্ডে, ১৮৫-
পৃষ্ঠায়, বাবা আউল মনোহক দাস সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে
জগবন্ধু ভদ্রের উদ্ধৃতি তুলে দিয়েছেন এইরূপে . . .

জগবন্ধু বাবু লিখিয়াছেন,--- . . .
ইনি প্রথমে বনবিষ্ণুপুরের বৈষ্ণব রাজা বীর হাম্বীরের ভক্তিগ্রন্থ-ভাণ্ডারের ভাণ্ডারী ছিলেন এবং রাজার  
দ্বারপণ্ডিত ব্যসাচার্য্য ইহাঁর বন্ধু ছিলেন। ইনি কি জাতি এবং কোন্ সময়ে ইহাঁর জন্ম, নিশ্চয় জানা যায় না।
কিন্তু ইনি ১৫০০ শকাব্দার পূর্ব্বেই বৈষ্ণবধর্ম্ম গ্রহণপূর্ব্বক নানা তীর্থ ভ্রমণ করিয়াছিলেন, তাহা এক প্রকার
নিশ্চিত। বীর হাম্বীরের মৃত্যুর পর আবার দেশভ্রমণে বহির্গত হয়েন। পরিশেষে হুগলী বদনগঞ্জে আসিয়া
একটী পর্ণকুটীর নির্ম্মাণপূর্ব্বক বহু দিন বাস করেন। ঐ অঞ্চলে যত বৈষ্ণব-পরিবার আছেন, তাহার  
অধিকাংশই ইহাঁর শিষ্য। * * * বদনগঞ্জনিবাসী ঁহারাধন দত্ত ভক্তিনিধি মহাশয় বলেন যে, ইনি তদীয়  
অতিবৃদ্ধপিতামহ শ্রীরূপরাম সিংহ মহাশয়কে স্নেহ করিতেন এবং তাঁহাকে শ্রীকৃষ্ণবিজয় গ্রন্থখানি অর্পণ  
করেন। ১৬৫৯ শকের ২৯শে পৌষ বদনগঞ্জ পরিত্যাগপূর্ব্বক বৃন্দাবনধামে গমন করেন। পথিমধ্যে জয়পুরে
ইহাঁর অপ্রকট হয়। তথায় অদ্যপি তাঁহার সমাধিমন্দির আছে। * * * ইনি  পদসমুদ্র  ও  নির্যাসতত্ত্বের  
সংগ্রহকার। কেহ কেহ বলেন, পদসমুদ্রে মনোহর দাস ভণিতাযুক্ত যে সকল পদ আছে, তাহা ইহাঁরই রচিত।
ইহাঁর রচিত দিনমণি-চন্দ্রোদয় নামে একখানি গ্রন্থ আছে
।”

সতীশচন্দ্র এখানে এর পরে লিখেছেন . . .

শ্রীযুক্ত অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি মহাশয় নাকি পূর্বোবোক্ত উভয় মনোহর অভিন্ন ব্যক্তি বলিয়া মত  
প্রকাশ করিয়াছেন। জগবন্ধু বাবু তাহা মানিতে চাহেন নাই ; কিন্তু সে সম্বন্ধে কোন বিচারও করেন নাই।  
কিংবদন্তী অনুসারে আউলিয়া মনোহর দাস প্রায় দুই শত বত্সব জীবিত ছিলেন। আমাদের মনে হয় যে,
উভয় মনোহর অভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন, এইরূপ ধারণা হইতেই এই কিংবদন্তীর উত্পত্তি হইয়াছে। ১৫৫৯ শক
তাঁহার বৃন্দাবন গমনের কাল ধরিলে, উভয় মনোহর একই ব্যক্তি হওয়া অসম্ভব মনে হয় না। পদসমুদ্র পুথির
সম্পূর্ণতায় ও প্রামাণিকতায় আমরা বিশ্বারস করিতে না  পারিলেও  উহাকে  একেবারে  উড়াইয়া দেওয়া  
চলে না। আমাদের বিবেচনায় উক্ত পুথির সঙ্কলয়িতা মনোহরদাসই সম্ভবতঃ আলোচ্য পদাবলীর রচয়িতা
হইবেন। মনোহরের পদগুলি বিশেষত্বহীন চলসই পদ বটে
।”
.
মনোহর দাসের পদসমুদ্র নিয়ে হারাধন দত্তর উদ্ধৃতি -                             পাতার উপরে . . .  
বাবা আউল মনোহর দাস “পদসমুদ্র” নামক একটি পদসংকলন গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সেই গ্রন্থে কিছু কম
১৫০০০পদ ছিল বলে জানিয়েছিলেন গ্রন্থটির মালিক, হুগলী জেলার বদনগঞ্জ নিবাসী হারাধন দত্ত ভক্তিনিধি।
“পদসমুদ্র” গ্রন্থটি, হারাধন দত্ত ভক্তিনিধির ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল বলে তিনি দাবী করতেন কিন্তু কোনও দিন
অন্য কেউ গ্রন্থটিকে চাক্ষুস দেখার সুযোগ পায়নি। এমনকি গ্রন্থটিকে বিক্রী করার জন্য তখনকার দিনে  
২০০০টাকা দর পেয়েও তিনি সে পথে এগোন নি। জগবন্ধু ভদ্র তাঁর সংকলিত “গৌরপদতরঙ্গিণী” এবং  
সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু” গ্রন্থের পুথি-পরিচয়ে এই “পদসমুদ্র” গ্রন্থটি নিয়ে বিস্তারিত
আলোচনা করেছেন। কিন্তু গ্রন্থটি দেখতে না পাওয়া নিয়ে কেবল দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া তাঁদের পক্ষে আর
কিছু করা সম্ভব ছিল না। হারাধন দত্ত ভক্তিনিধি মহাশয়, পদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভুমিকা লেখার পূর্বেই
পরলোক গমন করেছিলেন।

দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী সম্পাদিত “নব্যভারত” পত্রিকার কার্ত্তিক ১৩০০ সংখ্যায় (অক্টোবর ১৮৯৩খৃষ্টাব্দ)
প্রকাশিত, হারাধন দত্ত ভক্তিনিধি রচিত “বঙ্গের বৈষ্ণব কবি (৪)। শ্রীজ্ঞানদাস।” প্রবন্ধে বাবা আউল মনোহর
দাস সম্বন্ধে বিস্তারিত লিখেছেন। এখানে তিনি “পদসমুদ্র” গ্রন্থটিকে বই আকারে ছাপানোর ইচ্ছা প্রকাশ   
করেছিলেন। তাঁর নিজের আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় অন্য কোন ব্যক্তির সাহায্য নেবার কথাও লিখেছিলেন।
সুতরাং “পদসমুদ্র” গ্রন্থটি ভালো ভাবেই তাঁর কাছে ছিলো বলে মনে হয়। কিন্তু কোন কারণে শেষ পর্যন্ত  
ছাপানোটা আর হয়ে ওঠে নি। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর পরিবারবর্গ গ্রন্থটি নিয়ে কি করেছিলেন তা জানা যায়
না। তিনি লিখেছিলেন . . .

“. . .
বিখ্যাত বাবা আউল মনোহর দাস এই জ্ঞানদাস মহাত্মার সঙ্গী ও সহাধ্যায়ী ও উভয়েই এক গুরুর শিষ্য
ছিলেন। কোন স্থানে যাইতে হইলে উভয়েই একত্র গমন করিতেন এ একত্র থাকিতেন। খেতুরীর মহোত্সবে
উভয়েই একত্র গমন করিয়াছিলেন। . . .

. . . মহাত্মা জ্ঞানদাসের অভিন্নাত্মা যে বাবা মনোহর দাসের কথা উল্লেখ হইয়াছে, তাহার পূর্ব্বাশ্রম এইখানে।
অর্থাৎ এই বদনগঞ্জ গ্রামে অদ্যাপি তাহার সমাধি মঠ আছে। প্রতিবছর মকর সংক্রান্তিতে মহোত্সব  অর্থাৎ
বৈষ্ণব সেবা হয়। বাবা মনোহর তেজঃপুঞ্জ সাধক সিদ্ধ মহাপুরুষ ও দীর্ঘজীবী ছিলেন। মৃত্যু তাহার  
করতলাধীন ছিল। পদসমুদ্র ও নির্য্যাস তত্ত্ব গ্রন্থ তাঁহারই সংগৃহীত। তিনি বহুশত গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়াছিলেন।
পূর্ব্বপুরুষদের আমল হইতে তত্ত্বাবৎ আমার বাড়ীতে পূজা পাঠ হইতেছে।

“নির্য্যাস তত্ত্ব” গ্রন্থখানি  সংস্কৃত দেবনাগরাক্ষরে লিখিত এবং তাহা প্রকাশের প্রতি একেবারে নিষেধাজ্ঞা। যে
হেতু, তাহার শিক্ষা দেয়, এখনকার কালে এমন গুরু নাই। “পদসমুদ্র” এমন গ্রন্থ আর দ্বিতীয় নাই। ইহার  
ভিতর যাবতীয় মহাজন কৃত পদ আছে, পদ সংখ্যা কিছু কম ১৫০০ হাজার। (সংখ্যাটি এভাবেই মুদ্রিত  
রয়েছে) যাহা কিছু রত্ন, ইহাতেই আছে ; তাই ইহার নাম সমুদ্র। যে কিছু রত্নের আবশ্যক হয়, এই সমুদ্রে মগ্ন
হলেই সুলভে পাওয়া যায়। এতৎ গ্রন্থ মুদ্রাযন্ত্রের সাহায্যে মুদ্রিত করা হইলে সহস্রখণ্ড প্রকাশে প্রতি খণ্ডে ৫\
টাকার অধিক ব্যয় পড়িবে। আমি কাঙ্গাল, তদ্ব্যয়ে আমার সামর্থ নাই। তথাপি কাঙ্গালের  উচ্চবাসনা  
অনেকে সাহায্য করিবেন বলিয়া আশা দিয়াছেন। আমি সেই ভরসায় তাহার প্রকাশ ইচ্ছা করিয়াছি ;  হায়!
এ দীনের প্রতি কৃপা করিয়া কি প্রভু এই ইচ্ছা পূরণ করিবেন? সে দিন কবে হবে
!”
.
পদসমুদ্রের অস্তিত্ব কাল্পনিক কি না তা নিয়ে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধতি -       পাতার উপরে . . .  
সতীশচন্দ্র রায় ১৯৩১ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, তাঁর সম্পাদিত “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু” গ্রন্থের, ৫ম খণ্ডে, ভূমিকায়, ১৩-
পৃষ্ঠায়, পদ-সমুদ্র গ্রন্থ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে, হারাধন দত্ত ভক্তিনিধি মহাশয়কে কোন দোকানদার ২০০০ টাকা
মূল্যে পদসমুদ্র গ্রন্থের গ্রন্থসত্ত্ব কিনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভক্তিনিধি মহাশয় তাহা দেন নি ইত্যাদির উল্লেখের
পরে পদসমুদ্রের অস্তিত্ব কাল্পনিকতা নিয়ে লিখেছেন . . .

". . .
এ সম্বন্ধে আরও একটি বক্তব্য আছে, আমার শ্রদ্ধাস্পদ কয়েকজন সাহিত্যিক বন্ধু এই পুস্তকের অস্তিত্বে
সন্দিহান হইয়াছেন। আর কেন জানি না, কিন্তু এই সন্দেহকারীদিগের মধ্যে আমি একজন আর দীনেশ বাবু
স্বয়ং একজন। সন্দেহ করিবার প্রচুর কারণও আছে। কিন্তু ভক্তিনিধি মহাশয় এখন গৌর ধামে গোলোকে ;
তথা হইতে তাঁহাকে টানিয়া আনিবার চেষ্টা নিষ্ঠুর এ অসভ্যের কাজ, অতএব আমরাও নীরব রহিলাম।

জগবন্ধু বাবু কিংবা দীনেশ বাবু পদ-সমুদ্রের কাল্পনিকতার সম্বন্ধে কোনও প্রমাণ প্রয়োগ করেন নাই ; শুধু  
সন্দেহ প্রকাশ করিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছেন। আমাদিগের বিবেচনায়, স্বর্গীয় ভক্তিনিধি মহাশয়ের প্রতি ইহা দ্বারা
অবিচারই করা হইয়াছে ; কেন না, সন্দেহের কারণগুলি ব্যক্ত করিলে, উহা যথেষ্ট কি না, অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা
বিচার করিতে পারিতেন। উপযুক্ত কারণ না দর্শাইয়া, একজন ভদ্রলোকের সত্যবাদিতার বিরুদ্ধে এরূপ   
ইঙ্গিত করা সঙ্গত বলিয়া মনে হয় না। জগবন্ধু বাবু ও দীনেশবাবুর আলোচনা হইতে এইমাত্র জানা গিয়াছে
যে, ভক্তিনিধি মহাশয় দুই হাজার টাকা মূল্য পাইলেও তাঁহার পুথিখানা বিক্রয় করিতে রাজি হন নাই ; এমন
কি, কলিকাতার কোন সাহিত্য-সেবী চেষ্টা করিয়াও এই পুথিখানি দেখিতে পান নাই। বলা বাহুল্য যে, এই  
দুইটী কারণ পুথিখানার অনস্তিত্বের পক্ষে প্রচুর কারণ বলিয়া গণ্য হইতে পারে না। ভক্তিনিধি মহাশয়  
তাঁহার পদ-সমুদ্র পুথি হইতে বিদ্যাপতির আত্মপরিচয়-বিষয়ক---

জনমদাতা মোর              গণপতি ঠাকুর
.        মৈথিলী দেশে করু বাস।
পঞ্চ গৌড়াধিপ                শিবসিংহ ভূপ
.        কৃপা করি লেউ নিজ পাশ॥
বিফসী গ্রাম                  দান করল মুঝে
.        রগতহি রাজ-সন্নিধানে।
লছিমা-চরণ-ধ্যানে         কবিতা নিকসয়ে
.        বিদ্যাপতি ইহ ভণে॥

পদাংশ ও চণ্ডীদাসের রামী রজকিনীর চরিত---
কোথা যাও ওহে,             প্রাণ-বঁধু মোর,
.        দাসীরে উপেক্ষা করি
।  ( পুরো পদটি পড়তে মিলনসাগরে রামী-রজকিনীর পাতায় . . . )

তথা---

তুমি দিবাভাগে,              লীলা অনুরাগে
.        ভ্রম সদা বনে বনে
।  ( পুরো পদটি পড়তে মিলনসাগরে রামী-রজকিনীর পাতায় . . .  )

ইত্যাদি পদ-দ্বয় উদ্ধৃত করিয়াছেন। আন্দাজ পাঁচশত বত্সর পূর্ব্বের এক রজক-ঝিয়াড়ীর পক্ষে এরূপ ভাষায়
এরূপ পদ রচনা করা যদি সম্ভবও মনে করা হয়, তাহা হইলেও বিদ্যাপতির পক্ষে লছিমা-চরণ-ধ্যানে কবিতা
নিকসয়ে ইত্যাদি উক্তি করা যে, সম্পূর্ণ অসম্ভব, তাহা এখন অভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রেই বুঝিতে পারেন। কিন্তু তা
বলিয়াই কি ভক্তিনিধি মহাশয় বাহাদুরী লওয়ার জন্যে এই সকল রচনা জাল করিয়া পদ-সমুদ্রের নামে
প্রকাশিত করিয়া গিয়াছেন---এরূপ মনে করা যাইতে পারে? বিদ্যাপতি ও রামী রজকিনীর সম্বন্ধে বঙ্গদেশের
বৈষ্ণব-সমাজে যে কিংবদন্তী প্রচলিত আছে, উহার উপর নির্ভর করিয়া পরবর্ত্তী কোন কোন পদ-কর্ত্তা এই
পদগুলির রচনা করিয়া গিয়াছেন, এবং সেগুলি বিদ্যাপতি ও রামীর খাঁটি রচনা-জ্ঞানেই হউক কিংবা
তাঁহাদিগের মনোভাবের সূচক অন্যের বর্ণনা বলিয়াই হউক, মনোহরের পদ-সমুদ্রে সংগৃহীত হইয়াছে---এরূপ
অনুমান করাই আমাদিগের সঙ্গত মনে হয়।

বলা বাহুল্য যে, আমরা ভক্তিনিধি মহাশয়ের পক্ষে ওকালতী গ্রহণ করি নাই পনের হাজার পদ-পূর্ণ পদ-
সমুদ্রের সম্পূর্ণ পুথিখানা ভক্তিনিধি মহাশয়ের নিকট ছিল কি না, সে বিষয়ে আমাদেরও সন্দেহ আছে। তবে
আমাদের বিশ্বাস যে, পদ-সমুদ্র পুথির কিয়দংশ ভক্তিনিধি মহাশয়ের নিকট ছিল ; তিনি উহা হইতেই এরূপ
অনেক অজ্ঞাত পদ তাঁহার লেখায় উদ্ধৃত করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার পুথিখানা খণ্ডিত বলিয়া উক্তি করিলে,
উহার প্রামাণিকতার বিষয়ে পাঠকদিগের মনে সন্দেহ হইতে পারে বলিয়া তিনি সম্ভবতঃ আগে প্রকৃত কথাটা
গোপন করিয়া গিয়াছেন এবং পরে অপ্রতিভ হইবেন বলিয়া তাঁহার খণ্ডিত পুথিখানা আর লোক-লোচনের  
গোচর করিতে সমর্থ হন নাই। সম্পূর্ণ পুথিখানাতে পনের হাজার পদ ছিল বলিয়া হয় ত একটা জন-প্রবাদ  
ছিল ; তিনি উহার উপরে নির্ভর করিয়াই সে কথাটার প্রচার করিয়া গিয়াছেন। পদকল্পতরুতে প্রায় দেড় শত
পদ-কর্ত্তার পদাবলী সংগৃহীত হইয়াছে। দেড় শত পদকর্ত্তার প্রত্যেকে গড়ে একশত পদ রচনা করিলে পনের  
হাজার পদ হইতে পারে। বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস প্রভৃতির প্রত্যেকের এক শতের অনের
বেশী পদ পা
য়া গিয়াছে ; সংরক্ষণের ত্রুটিতে কাল-ক্রমে অনেক পদকর্ত্তারই যে অধিকাংশ পদাবলী   
বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে এবং পদকল্পতরু প্রভৃতি সংগ্রহ গ্রন্থে স্থান পাইয়া তাঁহাদিগের এল্প মাত্র পদ স্থায়িত্ব লাভ
করিয়াছে, ইহার বহু প্রমাণ বিদ্যমান আছে। সুতরাং এরূপ অবস্থায় এখন পনের হাজার পদ-পূর্ণ পদসংগ্রহ
পুথির কথা যত অসম্ভব মনে হয়, প্রকৃত পক্ষে উহা সেরূপ নহে। . . .
. . . সে যাহা হউক, ভক্তিনিধি মহাশয় যে সম্পূর্ণ পদ-সমুদ্র পান নাই, উহার অতি অল্প কিছু খণ্ডিত অংশ
পাইয়া থাকিবেন, আমাদিগের এই অনুমানের কারণ এই যে, তাঁহার নিকট ঐ পুথির সম্পূর্ণ অথবা গ্রন্থাকারে
প্রকাশ-যোগ্য অংশ থাকিলে তাঁহার ন্যায় বিজ্ঞ ব্যক্তি বৈষ্ণব-সমাজের হিতার্থে এবং নিজের স্বার্থে   
সুযোগসত্ত্বেও যে উহার মুদ্রাঙ্কনের ব্যবস্থা করেন নাই, ইহা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। পদ-সমুদ্রের অস্তিত্ব
যথার্থ কিংবা কাল্পনিক, যাহাই হউক না কেন, এখন আর উহা পাওয়ার আশা করা যায় না ; ভক্তিনিধি  
মহাশয়ের উদ্ধৃত পদগুলিই কেবল পদ-সমুদ্রের ক্ষীণ স্মৃতিকে জাগরূক রাখিবে
।"
.
পদসমুদ্র গ্রন্থের পদ অন্য সংকলনে এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতা -                 পাতার উপরে . . .  
বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত, হারাধন দত্ত ভক্তিনিধির লিখিত বিভিন্ন বৈষ্ণব পদাবলী সংক্রান্ত প্রবন্ধে তিনি
পদসমুদ্র গ্রন্থ থেকে পদ উদ্ধৃত করেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই পদসমুদ্র গ্রন্থের পদসংখ্যা সহ। এই পদগুলির মধ্যে
অনেক পদই আমরা পদকল্পতরুতে এবং অন্য সংকলনে পেয়েছি এবং অনেক পদই পাইনি।  অর্থাৎ  
পদসমুদ্র গ্রন্থের অনেক পদই পদকল্পতরু তথা অন্যান্য সংকলন গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে। আবার অনেক পদই  
হয়নি।

যেমন
নরহরি সরকার ঠাকুরের গৌরাঙ্গ-লীলার পদ রচনার ইচ্ছাজ্ঞাপন করা অতি গুরুত্বপূর্ণ “গৌরলীলা  
দরশনে বাঞ্ছা বড় হয় মনে” পদটি
বৈষ্ণবদাসের "পদকল্পতরুতে" নেই। মুকুন্দদাস গোস্বামীর "সিদ্ধান্ত-
চন্দ্রোদয়",  
রামগোপালদাসের "শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী",  বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর "ক্ষণদাগীতচিন্তামণি",  
রাধামোহন ঠাকুরের "পদামৃতসমুদ্র", নরহরি চক্রবর্তীর "ভক্তিরত্নাকর" এবং "গীতচন্দ্রোদয়" গ্রন্থেও এই পদটি
নেই।

পদকল্পতরুর সম্পাদনা করার সময়ে,
সতীশচন্দ্র রায়, ৫ম খণ্ডের ভুমিকায়, নরহরি সরকার ঠাকুরের   
পরিচিতির পাতায় এই পদটি উদ্ধৃত করেছেন। দুর্ভাগ্যবশত সতীশচন্দ্র রায় এই পদটির উত্স-গ্রন্থের নামটি
সেখানে উল্লেখ করেন নি। অন্য কোন তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত ধরে নিতে হবে যে এই
 পদটি  সতীশচন্দ্র,
হারাধন দত্ত ভক্তিনিধির “নব্যভারত” পত্রিকার কার্তিক ১৩০০ বঙ্গাব্দের সংখ্যায় লেখা “বঙ্গের বৈষ্ণব কবি”
প্রবন্ধ থেকেই নিয়েছিলেন।

আরেকটি বিতর্কিত পদ হলো
লক্ষ্মণ ভূপ ভণিতার “বোলো হো বোলো হো উদ্ধব মাধবে” পদটি। পদটি  
শ্রীপাদ হরিদাস গোস্বামী সম্পাদিত, নবদ্বীপধাম থেকে ১৯২৩ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, “শ্রীশ্রীবিষ্ণুপ্রিয়া-গৌরাঙ্গ”  
মাসিক পত্রিকার, ১ম বর্ষের, ৪র্থ সংখ্যার, ৭০-পৃষ্ঠায় “
রাজা লক্ষ্মণ সেন রচিত একটী প্রাচীন পদ” শীর্ষক  
অনুপ্রবন্ধে দেওয়া রয়েছে। পদটি আউল মনোহর দাস সংকলিত, ১৫০০০পদ সম্বলিত “পদসমুদ্র” গ্রন্থের পদ
বলে উল্লিখিত রয়েছে। প্রবন্ধকারের কোনও নাম নেই। তাই ধরে নিতে হবে যে সম্পাদকই পদটি শুরু হবার
আগে লিখেছেন --- “নিম্নলিখিত প্রাচীন পদটী মুখে মুখে এত দিন গীত হইয়া আসিতেছে, এইটির মত প্রাচীন
বাংলা পদ বোধ হয় নাই। কৃষ্ণবিরহবিধুরা ব্রজগোপীগণ উদ্ধবকে বলিতেছেন,---”। মিলনসাগরে  পদটি  
পড়তে,
কবি রাজা লক্ষ্মণ সেনের বৈষ্ণব পদাবলীর পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .

হারাধন দত্তনিধি মহাশয় তাঁর প্রবন্ধাদিতে “পদসমুদ্র” গ্রন্থ থেকে
বৈষ্ণবদাসের পদও উদ্ধৃত করেছেন! উক্ত
প্রবন্ধে উদ্ধৃত দুটি পদই রয়েছে পদকল্পতরুতে। বৈষ্ণবদাসের পদ প্রথম আমরা পাই তাঁরই সংকলিত  
পদকল্পতরু গ্রন্থে, যার প্রকাশকাল ১৭৫০ এর আশেপাশে ধরা হয়।

পদসমুদ্র গ্রন্থ থেকে
বৈষ্ণবদাসের পদও উদ্ধৃত করলে আমাদের ধরে নিতে হবে যে বাবা আউলিয়া মনোহর
দাস অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন, এবং তাই তিনি তাঁর “পদসমুদ্র” গ্রন্থে বৈষ্ণবদাসের পদ
সন্নিবেশ করতে পেরেছিলেন!

এদিকে হারাধন দত্ত ভক্তিনিধির নিজের উদ্ধৃতি থেকে আমরা মনোহর দাসের প্রয়াণের সময়কাল পাই ১৬৫৯
শকের ২৯শে পৌষ। সেদিন তিনি “বদনগঞ্জ পরিত্যাগপূর্ব্বক বৃন্দাবনধামে গমন করেন। পথিমধ্যে জয়পুরে
ইহাঁর অপ্রকট হয়”। অর্থাৎ বাবা আউল মনোহর দাসের মৃত্যুর বছর ১৭৩৭ খৃষ্টাব্দ। যা পদকল্পতরুর  
প্রকাশনার পূর্বেকার সময়।
বৈষ্ণবদাসের পদ মনোহর দাসের “পদসমুদ্রে” থাকা টা বেশ বিস্ময়কর  এবং
খুবই টায়টায়, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ঠিক এই সময় নাগাদ প্রকাশিত বৈষ্ণবদাসের গুরু
রাধামোহন  
ঠাকুরের
সংকলিত “পদামৃতসমুদ্র” গ্রন্থে বৈষ্ণবদাসের একটিও পদ তোলা হয়নি, কিন্তু  আশ্চর্যজনকভাবে
বাবা আউল মনোহর দাসের “পদসমুদ্র” গ্রন্থে ১৯৩৭ খৃষ্টাব্দের মধ্যেই বৈষ্ণবদাসের পদ তোলা হয়েছিল!

সময়কালের হিসাবে এত গড়মিল থাকলে "পদসমুদ্র" সংকলনটি সম্বন্ধে সন্দেহের উদ্রেক হতেই পারে। এই সব
কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞই পদসমুদ্র গ্রন্থটির অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ বইটিকে জাল
বলতেও কুণ্ঠা বোধ করেন নি। কিন্তু মোটের উপর গ্রন্থটি আমাদের হাতে না আসাটা বৈষ্ণব সাহিত্যের  
অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥
এই পাতার ভণিতা
মনোহর, মনোহর দাস