বীন্দ্রজীবনীকার কবি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
*
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে
কবি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য্য ও ক্ষিতীন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত, “রামধনু” পত্রিকার আষাঢ়
১৩৪৬ (জুলাই ১৯৩৯) সংখ্যায় প্রকাশিত।

নিবিড় নীরদজালে ভারাক্রান্ত আষাঢ়-আকাশ ;
.                                কোথা কালিদাস?
বিজুরী চমকি' উঠে, দেখা যায় দূরে অতি দূরে
ভাবমগ্ন মহাকবি সমাধিস্থ উজ্জয়িনীপুরে।
কল কল ছল ছল বয়ে যায় শিপ্রা কলতানে,
কয়ে যায় কত কথা চুপি চুপি কৰি-কানে কানে।
সহসা শ্রবণে পশে দুরাগত ক্রন্দনের ধ্বনি,
চমকি উঠিল কবি অকস্মাৎ পরমাদ গণি।
ভাঙ্গিল শিবের ধ্যান, আনমনে ভাবে বসে কবি,
নয়নে উঠেছে ফুটে স্নিগ্ধ শান্ত করুণার ছবি।
শুনিল কাঁদিছে যক্ষ সঙ্গীহারা রামগিরি শিরে,
ব্যথা ভার ভাষা পেল তাই আজ আষাঢ়ের নীরে।
নির্ব্বাসিত যক্ষ কাঁদে---প্রাণ তার হয়েছে বিহ্বল,
চঞ্চল করেছে তারে অলকার শ্যামল অঞ্চল।
কে শোনাবে বার্ত্তা তার অলকার যক্ষপুরী-মাঝ?
স্নেহের কোমল হস্তে কে মুছাবে আঁখি-বারি আজ?

বান্ধব-স্বজনহীন নির্বাসিত যক্ষের ক্রন্দনে
জাগিবে না কোন সাড়া আজ কিগো দেবতার মনে?
কবির করুণা-গঙ্গা বাষ্প হয়ে দুঃখের উত্তাপে
মেঘ হয়ে দিল সাড়া নির্ব্বাসিত যক্ষের বিলাপে।
পুঞ্জীভূত ব্যথা তার আষাঢ়ের মেঘের আকারে
চলিল লইয়া বার্ত্তা অলকার বিস্তীর্ণ প্রাকারে।

যেথায় কাঁদিছে সাথী একমনে বসি দিন গুণে,
কহিল অমিয়-বার্তা চুপিসারে তার কানে কানে।
সুখে তার ফুটে হাসি, ভরে যায় তার প্রাণ-মন,
নয়নেতে উঠে ভাসি' অনাগত দিনের স্বপন।

এ কি মায়া---ইন্দ্রজাল, ওগো কবি, তোমার পরশে।
প্রণাম জানাই তোমা “আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে”।

.      ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নরনারায়ণে নমি
কবি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য্য ও ক্ষিতীন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত, “রামধনু” পত্রিকার পৌষ ১৩৪৫ (জানুয়ারী
১৯৩৯) সংখ্যায় প্রকাশিত।

প্রথম উষার স্বর্ণকিরণে বন্দনা-গান গাহিল যারা,
হৃদয়-দেউলে হোমানল জ্বালি মানবের পূজা করিল তারা ;

সৃষ্টি-দিনের প্রথম প্রভাকে মানুষের যারা গাহিল জয়,
নহে নহে তার ক্ষুদ্র কখনো, তুচ্ছ তাহারা কখনো নয়?
আজিকে তাদের পায়
হৃদয় আমার অর্ঘ্যকুসুম অঞ্জলি দিতে চায়।

বিশ্বের যত কবি
ঊষার মুখের ঘোমটা খুলিয়া দেখাল প্রভাত-রবি।
নটরাজে আনি নৃত্যছন্দে
রূপে রসে আর বর্ণে গন্ধে
প্রাণময়ী করি শোনাল যাহারা---ফোটাল স্বর্গছবি,
প্রণাম আমার তাদের চরণে---বিশ্বের যত কবি।

বৈজ্ঞানিকের দল
বিষের সিন্ধু মন্থন করি তুলিল অমৃত-ফল ;
দুর্ব্বিপাকের দুর্গ-চূড়ায়
বিজয়-পতাকা যাহারা উড়ায়,
মৃত্যুর সাথে করে কোলাকুলি, সত্য যাদের বল,
আমার অর্ঘ্য তাদের লাগিয়া---বৈজ্ঞানিকের দল!

নাম যার জানা নাই,
পতিতেরে যারা বুকেতে নিয়েছে, মানুষে বলেছে ভাই।
দুর্গত দীন আতুরের লাগি
ভিক্ষাপাত্র লইয়াছে মাগি,
জীবনেরে করি হেলায় তুচ্ছ, মরণ করেছে পণ,
প্রণাম আমার তাদের চরণে---তারা নরনারায়ণ।

.      ****************       
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বর্ষ বোধন
কবি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য্য ও ক্ষিতীন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত, “রামধনু” পত্রিকার বৈশাখ ১৩৪৬ (মে ১৯৩৯)
সংখ্যায় প্রকাশিত।

আজ বোশেখের প্রথম দিনে তোমারই গাই বন্দন।
বর্ষ নবীন, হউক তোমার জয় ;
যাক্‌ মুছে যাক্‌ গত কালের জল্পনা ও কল্পনা,
হারিয়ে-যাওয়া লজ্জা, ক্ষতি, ভয়।

তোমার রথের ঘর্ঘরানি শুনছি বসে আজ কানে,
ভাস্ ছে চোখে আস্ ছে-কালের ছবি,
রিক্ত হিয়া উঠ্ ছে ভরে রূপে, রসে আর গানে,
তাই তো তোমায় প্রণাম জানায় কবি।

চল্ তে পথে কুড়িয়ে-পাওয়া সঙ্গী যারা যায় চলে
ভবের হাটে কেনা-বেচার শেষে,
তাদের লাগি ঝুরছে আঁখি, লুকাই তাহা কোন্‌ ছলে
কেমন করে কান্না ঢাকি হেসে!

সব ভুলে আজ সবার সাথে তবুও করি বন্দনা,
বর্ষ নবীন, গাই তোমারি জয়,
আঁকছি বসে তোমার তরে আগমনীর আল্পনা,
ভুলেছি আজ লজ্জা, ক্ষতি, ভয়।

.      ****************       
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অতীত কবি
কবি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য্য ও ক্ষিতীন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত, “রামধনু” পত্রিকার পৌষ
১৩৪৬ (জানুয়ারী ১৯৪০) সংখ্যায় প্রকাশিত।

মৌনী থাকি যখন মনের রঙ্গিন তুলি নিয়ে---
.                আঁকি না আর আস্ ছে কালের ছবি,
কমল সম কোমল হাতের মধুর পরশ দিয়ে
.                জাগাও সাড়া, ওগো অতীত কবি!
চল্‌তে পথে হয়েছিল যাদের সনে দেখা---
.                বিদায় যারা নিয়েছে ম্লানমুখে,
কালের খাতায় মুছে গেছে যাদের হাতের লেখা---
.                ঘুমায় যারা মহাকালের বুকে,
সঞ্জীবনী মন্ত্রে তোমার প্রাণ ফিরে পায় তারা
.                চল্ ‌তে থাকে তাদের কাণাকাণি---
পুরানো সব কাজের কথা হয় নি যাহা সারা,
.                হারিয়ে-যাওয়া মনের গোপন বাণী।
তাই তো তোমায় ওগো কবি, ভালবাসি কত,
.                তাই তো কত কথা তোমার সনে,
তাই তো শুধু স্বপন তোমার দেখি অবিরত,
.                প্রণাম তোমায় জানাই মনে মনে।

.      ****************       
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বর্ষ-বিদায়
কবি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য্য ও ক্ষিতীন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত, “রামধনু” পত্রিকার চৈত্র
১৩৪৮ (এপ্রিল ১৯৪২) সংখ্যায় প্রকাশিত।

মাগিছে বিদায় পুরানো বর্ষ
.        মধু-বিহবলা চৈত্র রাতে,
বিগত কালের রোদন-হর্ষ
.        যায়---মুছে যায় তাহার সাথে।
কাল যারা ছিল মোদের ঘিরিয়া
.        রূপে, রসে আর গন্ধে ভরা,
ঝরাপাতা সাথে গিয়াছে ঝরিয়া
.        চৈতালী বায়ে আজিকে তারা।
প্রাচীন, তোমার বুকেতে লুকানো
.        রয়েছে অনেক গোপন কথা,
আশা-নিরাশার কাঁদন-মাখানো
.        স্মরণ-জাগানো অনেক ব্যথা।
উদাসী সন্ধ্যা সজল চক্ষে
.        বিদায়-রবির অস্তরাগে
বিরহ-বিধুর কোমল বক্ষে
.        প্রাচীন, তোমার বিদায় মাগে।
যাও হে অতীত, যাও হে প্রবীণ,
.        মহাকাল বুকে শাস্তি লভ,
প্রাচীনের বুকে ঘুমায় নবীন
.        মরণের কোলে জীবন নব।

.      ****************       
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিজয়ার চিঠি
কবি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য্য ও ক্ষিতীন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত, “রামধনু” পত্রিকার অগ্রহায়ণ
১৩৪৯ (ডিসেম্বর ১৯৪২) সংখ্যায় প্রকাশিত।

রামধনু সম্পাদক মহাশয় করকমলেষু---

বোমার ভয়ে পালিয়ে এসে সহর ছেড়ে অনেক দূরে
আজকে আমি আছি বসে পল্লীমায়ের অন্তঃপুরে।
নাইকো হেথায় বাসের কিংবা ট্যাক্সি ট্রামের ঘড়ঘড়ানি,---
সকাল হ'তেই ছুটাছুটী---কাজের তাড়ায় ধড়ফড়ানি।
নাইকো হেথায় ধোয়ায় ঢাকা গোমড়ামুখো আকাশ গো,
গ্যাসের গন্ধে ভারী হয়ে বয় না হেথা বাতাস তো।
সকালবেলা ভাঙ্গায় না ঘুম কাগজওয়ালা হেথায় ডেকে’
ফেরীওয়ালা যায় না মেটেই নানান সুরে হেঁকে হেঁকে।
তরুণ রবির অরুণ আলো পূবের আকাশ রোজ রাঙ্গিয়ে
খাটের পাশে লুকিয়ে এসে ঘুমটী আমার যায় ভাঙ্গিয়ে।
বৈতালিকের দল যে হেথা নাম-না-জানা বনের পাখী---
সকাল হ'লেই সবাই এসে করে আমায় ডাকাডাকি।
শিউলী গাছের আঁচল ধারে দামাল হাওয়া রোদ সকালে
লাগায় নাচন ফিঙের সাথে দোলন চাঁপার তালে তালে।
চুপটী ক'রে আছি বসে, বিসর্জ্জনের করুণ সুরে
মনটা আমার চাচ্ছে যেতে আজকে ছুটে অনেক দূরে।
হারিয়ে সে আজ গেছে কোথায় মিলছে নাকো পাত্তা তারই,
চুপি চুপি বলছি শুনুন, করছে সে খোঁজ কলকাতার-ই।
প্রণাম আমার আপনি নিয়ে বড়'র মাঝে বিলিয়ে দেবেন,
চিঠিটাকে ছিঁড়ে ফেলে প্রীতিটাকে তুলে নেবেন।
ছোটর দ্বারে পৌঁছে দেবেন আজ বিজয়ার মধুর প্রীতি,
বলার যাহা ছিল বলে এইখানেতেই করনু ইতি।

.      ****************       
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বন্দিনী ধরা
কবি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য্য ও ক্ষিতীন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত, “রামধনু” পত্রিকার মাঘ
১৩৫০ (ফেব্রুয়ারী ১৯৪৪) সংখ্যায় প্রকাশিত।

বন্দিনী ধরা রক্তধারায় নেয়ে
.        চাহিল আকাশ পানে,
হিংসা-দানব উঠেছে পরাণ পেয়ে
.        শঙ্কা জেগেছে প্রাণে ।
ভ্রূকুটী ভয়াল মুখেতে অট্টহাস,
.        কুৎসিত দেহে লাগিয়াছে আজ নাড়া,
প্রলয়ের মেঘে ঘনায় সর্বনাশ,
.        তাই কি জেগেছে ধরার বুকেতে সাড়া?
মানুষ ছুটেছে মানুষের প্রাণ নিতে
.        অত্যাচারের বিশ্বম্ভর রথে,
কামনার পায়ে দুর্ব্বলে বলি দিতে
.        ছুটেছে মানুষ নরকের রাজপথে।
ক্ষমতা তুলেছে আকাশেতে আজ মাথা---
.        রাক্ষসী ক্ষুধা মেলিয়াছে তার মুখ,
তরবারি আজ শুনিবে না কোন কথা,
.        উপাড়ি ফেলিবে জীর্ণ ধরার বুক।

দয়ারে সে আজ দিয়াছে নির্ব্বাসন,
.        কৃষ্টিরে তার পাঠায়েছে রসাতল,
লুব্ধ আঁখিতে দেখিছে দুঃস্বপন,
.        জ্ঞানেরে করেছে মানুষ মারার কল।
ক্লান্ত পৃথিবী স্তব্ধ হইয়া ভাবে
.        হয় না কি ঠাঁই বিশাল তাহার বুকে?
অন্যের ভিটে কাড়ে কেন নর তবে---
.        বিষ তুলে দেয় মানুষ ভাইয়ের মুখে?
কতখানি ধরে ছোট্ট একটু পেটে
.        তবে কেন কাড়ে খিন্ন মুখের গ্রাস,
'অজগর-ক্ষুধা কেন তার নাহি মেটে,
.        কেন সে ডাকিছে নিজের সর্বনাশ?
বন্দিনী ধরা চেয়ে আকাশের পানে
.        কাতর কণ্ঠে মাগিছে মুক্তিফল,
কে শোনাবে আজ নির্ব্বাণ-বাণী তারে,
.        কোন্‌ তথাগত ঢালিবে শান্তিজল!

.      ****************       
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিজয়ার শুভেচ্ছা
কবি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য্য ও ক্ষিতীন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত, “রামধনু” পত্রিকার কার্ত্তিক
১৩৫১ (নভেম্বর ১৯৪৪) সংখ্যায় প্রকাশিত।

আজ সকালে ঘুমটা ভেঙ্গেই হঠাৎ শুনি বাজছে দূরে
ভাঙ্গা হাটে বাদ্যি ঢাকের বিসর্জ্জনের করুণ সুরে।
শিশির-ধোয়া বকুল-জাগা মৌন মধুর শারদ-প্রাতে
পরিয়ে দিল রঙ্গীন রাখী তরুণ রবি ঊষার হাতে।
প্রথম হিমের পরশ-কাতর গন্ধ-উদাস হিমেল হাওয়া,
প্রথম মাটীর পরশ-পাগল ভোরের আলোর প্রথম চাওয়া---
সবাই মিলে আজ সকালে গহিন মনের গোপন কোণে
ঘরছাড়াদের চলার বাঁশী বাজিয়ে গেল সঙ্গোপনে।
তাই তো আমার যাত্রা সুরু, তাই চলেছি নিরুদ্দেশে---
দৃষ্টি যেথা সৃষ্টি ছেড়ে অসীম মাঝে আপনা মেশে।
ধোঁয়া বারুদ গ্যাসে ঢাকা পিছনে মোর রইল ধরা---
রক্তপাগল ছিন্নমস্তা রুধির পানে আপন-হারা।

.      ****************       
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর