শরতচন্দ্রের বেনামে কুন্তলীন পুরস্কার লাভ -                                         পাতার উপরে . . .  
মামা সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের “শরৎ-পরিচয়” গ্রন্থের ১৩৬-পৃষ্ঠা থেকে জানা যায় যে, কলকাতার
পাথুরিয়াঘাটায়, শরত্চন্দ্রের মামা গিরীন্দ্রনাথ ও সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় একটি বাড়ীতে থেকে পড়াশুনা
করতেন। শরত্চন্দ্র প্রায়ই সেই বাড়ীতে যেতেন। রেঙ্গুনে যাবার আগের দিন সেখানে গিয়ে তাঁর মামাদের
অনুরোধে “মন্দির” নামের একটি গল্প লেখেন “কুন্তলীন পুরস্কারের” জন্য। সেদিনই গল্প জমা দেবার শেষ দিন
ছিল। গল্পটি লেখা শেষ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। কুন্তলীন তেল প্রস্তুতকারকের বউবাজার স্ট্রীটের
অফিসে গিয়ে তাঁরা গল্পটি জমা দেন, সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে। পরে সুরেন্দ্রনাথকে গল্পটি বুঝিয়ে,
বলেন যে যদি পুরস্কার প্রাপ্তি ঘটে তাহলে তবে মোহিত সেন প্রকাশিত
রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থাবলী
যেন তাঁকে দেওয়া হয়।

১৯৬১ সালে প্রকাশিত গোপালচন্দ্র রায়ের “শরত্চন্দ্র” ১ম খণ্ডের ৬২-পৃষ্ঠায় এই বিষয়ে তিনি লিখেছেন . . .
মন্দির গল্প প্রথম স্থান অধিকার করায়, মন্দিরের লেখক হিসাবে সুর্ন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধায়ের নামেই এইচ্ বসু
মশায় পুরস্কারের পঁচিশ টাকা পাঠিয়ে দেন। সুরেনবাবু পরে সেই টাকায় শরত্চন্দ্রের ইচ্ছানুযায়ী
রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থাবলী কিনে শরত্চন্দ্রের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন
।”

গোপালচন্দ্র রায়ের “শরত্চন্দ্র” ১ম খণ্ডের ৬২-পৃষ্ঠায় আমরা আরও জানতে পারছি যে, ঐ বছর কুন্তলীন
পুরস্কার প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন তত্কালীন বসুমতী-সম্পাদক সাহিত্যিক রায়বাহাদুর জলধর সেন।
প্রায় দেড়শ গল্পের মধ্যে তিনি মন্দির গল্পটিকেই শ্রেষ্ঠ গল্প বলে স্থির করেন। তিনি গল্পটির উপর ছোট্ট একটি
মন্তব্যও লিখেছিলেন --- “
এই লেখক যদি চর্চা রাখেন, তাহলে ভবিষ্যতে যশস্বী হবেন।” রায়বাহাদুর
জলধর সেনের সেই ভবিষ্যত বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল!

১৩১০ সালের ভাদ্রে (সেপ্টেম্বর ১৯০৩) “কুন্তলীন পুরস্কার ১৩০৯ সন” নামে কুন্তলীন প্রস্তুতকারকের তরফে
একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হয় যেখানে “মন্দির” গল্পটি ছাপা হয়, সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে। এটিই
শরত্চন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত-মুদ্রিত রচনা।

একটি মতান্তর -
এখানে একটি মতান্তরের উল্লেখ করতে হচ্ছে। উপরোক্ত সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের “শরৎ-পরিচয়” গ্রন্থে
উল্লিখিত “শরত্চন্দ্রের ইচ্ছানুযায়ী
রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থাবলী কিনে শরত্চন্দ্রের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।”
বক্তব্যটি নিয়ে একটি মতান্তর দেখতে পেয়ে আমরা এখানে তা তুলে দিচ্ছি . . .

১৯৬২ সালে প্রকাশিত বাবিদবরণ ঘোষ সম্পাদিত “কুন্তলীন গল্প-শতক” গল্প-সংকলনের ভূমিকার ২৪-পৃষ্ঠায়,
গোপালচন্দ্র রায়ের “শরত্চন্দ্র” ১ম খণ্ডের ৬২-পৃষ্ঠায় দেওয়া উক্তিটি উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন . . .
তা তা হয়তো দিয়েছিলেন, কিন্তু সুরেন্দ্রবাবুর গল্পটিতে কালাতিক্রম দোষ ঘটে গেছে। রাম জন্মাবাপ আগেই
রামায়ণ লেকা হল। শরত্চন্দ্র সুরেনবাবুকে ১৯০৩ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে যদি মোহিতচন্দ্র
সেন-সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থাবলী উপহারের কথা বলে থাকেন তো, সেটা সুরেনবাবুর নিতান্ত বানানো কথা।
কারণ মোহিতচন্দ্র সেন তখনও পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থাবলী সম্পাদনাপূর্বক প্রকাশ করেন নি। এর
পরিকল্পনাই গৃহীত হয় ১৯০৩ খ্রীষ্টাব্দের মে মাস নাগাদ। ১৬ই বৈশাখ (এপ্রিল ১৯০৩) রবীন্দ্রনাথ কন্যা
রেণুকাকে নিয়ে হাজারিবাগে প্রত্যাবর্তন করেন। সেখান থেকে মোহিতচন্দ্রকে লেখা চিঠিতে কবি এক স্থানে
লিখেছেন---‘যখন ছুটি পাইবেন তখন যদি পারেন ত আসিবার চেষ্টা করিবেন। এখানে আসিয়া নির্জনে
আপনার নূতন সংস্করণের ব্যবস্থা করিতে পারিবেন---শালিক কোকিল বুলবুল ছাড়া আর কেহ কোন
গোলমাল করিবে না।’ পরে ১৯০৩ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যভাগ থেকে কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন খণ্ড প্রকাশিত হতে থাকে
।”

এই মতান্তর নিয়ে মিলনসাগরের বক্তব্য -
১৯০৩ সালের জানুয়ারী মাসের এক রাত্রে শরত্চন্দ্র কলকাতা থেকে রেঙ্গুন যাবার জাহাজে চাপেন। তার
কয়েকদিন অথবা একদিন আগে তিনি "মন্দির" গল্পটি লিখে, মামা সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে, কুন্তলীন
তৈল প্রস্তুতকারকের অফিসে গিয়ে জমা দিয়েছিলেন, যা মোহিতচন্দ্র সেনের প্রকাশনার প্রায় চার মাস পূর্বে।
বারিদবরণ ঘোষের উপরোক্ত সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, তাঁর “শরৎ-পরিচয়” গ্রন্থের ( যা ১৯৫৬ এরও পূর্বে   
প্রকাশিত এবং আমাদের কাছে ১৯৫৬সালে প্রকাশিত ২য় সংস্করণ রয়েছে ) ১৩৬-পৃষ্ঠায় তিনি এ বিষয়ে
লিখেছেন . . .
.        "
রেঙ্গুন যাবার আগের দিন তিনি আমাদের বাসায় যান একখানি পিয়ার্স সোপের ছবি একটাকা দিয়ে
কিনে নিয়। আমার একখানি জনসনের পকেট ডিক্সনারী নেন এবং গিরীন ভায়ার কাছ থেকেও কোন একটা
বই নেন।
.        “পরে আমাকে সঙ্গে নিয়ে পাথুরেঘাটায় ঠাকুরদের বাড়ী যাচ্ছি বোলে পথে গিয়ে বলেন যে কুন্তলীন
পুরস্কারের জন্য আমার নামে একটি গল্প দিয়ে গেছেন মন্দির নাম দিয়ে। গল্পের প্লট বলেন এবং বলেন প্রাইজ
পেলে মোহিত সেন প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থাবলী যেন তাঁকে দেওয়া হয়
। . . .”

আমাদের মনে হয় তাঁকে পুরস্কারের টাকা দিয়ে মোহিতচন্দ্র সেনের প্রকাশিত,
রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থাবলী
দেবার কথা পরে কোন চিঠি পত্রে লিখেছিলেন। এবং সংকলনটি তিনি শরত্চন্দ্রকে পাঠিয়েছিলেন
নিশ্চিতভাবেই। তাই ব্যাপারটা তাঁর মনে ছিল! প্রায় ৫০বছরেরও বেশী সময় পরে লেখা স্মৃতিচারণে একটু
গড়মিল থাকতেই পারে। পাঠানোর অনুরোধটি শরত্চন্দ্র, বর্মা থেকে চিঠিতে লিখেছিলেন না সামনাসামনি
বলেছিলেন তা এতকাল পরে সঠিক মনে না রাখা মারাত্মক দোষের নয় বলে আমরা মনে করছি।
শরত্চন্দ্রের বিবাহ ও সন্তান -                                                            পাতার উপরে . . .  
শরত্চন্দ্রের রেঙ্গুনের বন্ধু গিরীন্দ্রনাথ সরকারের “ব্রহ্মদেশে শরত্চন্দ্র” এবং নরেন্দ্র দেবের “শরত্চন্দ্র” গ্রন্থ
থেকে আমরা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সহ বিবাহাদির কথা জানতে পারি। দুঃখের বিষয় উক্ত দুটি গ্রন্থই
আমরা হাতে পাইনি। কিন্তু এই গ্রন্থ থেকেই বিভিন্ন উদ্ধৃতি আমরা পাই ১৯৬১ সালে প্রকাশিত, গোপালচন্দ্র
রায়ের “শরত্চন্দ্র” গ্রন্থে। সেখানে রয়েছে যে শরত্চন্দ্র তাঁর প্রথমা স্ত্রীর সঙ্গে খুব সুখের দাম্পত্য জীবন
কাটিয়েছিলেন। তাঁদের একটি পুত্র সন্তান জন্মেছিল স্ত্রী ও পুত্র দুজনেই প্লেগে মারা যান। শরত্চন্দ্রের পুত্রের
সম্বন্ধে নরেন্দ্র দেবের “শরত্চন্দ্র” গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

শান্তি দেবীর সঙ্গে তাঁর প্রথম বিবাহ সম্বন্ধে রেঙ্গুনের বন্ধু গিরীন্দ্রনাথ সরকারের “ব্রহ্মদেশে শরত্চন্দ্র” গ্রন্থে
রয়েছে . . .
শরত্চন্দ্র  স্বজাতীয় কোন ব্রাহ্মণ কন্যাকে সমাজের অন্যায় হউতে রক্ষা করিবার জন্য স্ব-ইচ্ছায় বিবাহ
করিয়া সুখী হইয়াছিলেন। বিবাহিত জীবনে শরত্চন্দ্র বেশীদিন সুখভোগ করিতে পারেন নাই। যৌবনে তিনি
স্ত্রীর বড় অনুরক্ত ছিলেন। স্ত্রীকে ছাড়িয়া এক মুহূর্তও থাকিতে কষ্টবোধ করিতেন বলিয়া আমি তাঁহাকে
মহাস্ত্রৈণ বলিয়া উপহাস করিতাম। . . . বিধির বিপাকে বিবাহের দুই বত্সর পরেই তাঁহার প্রথম পক্ষের স্ত্রী
প্লেগ রোগাক্রান্ত হইয়া দেহত্যাগ করেন
।”

কবি নরেন্দ্র দেবের “শরত্চন্দ্র” গ্রন্থ থেকে আমরা তাঁর প্রথম বিবাহের সম্বন্ধে জানতে পারি . . .
"        
পরদুঃখকাতর কোমল হৃদয়ের অনুপ্রেরণায় এই সময় শরত্চন্দ্রকে অত্যন্ত বিপন্ন অবস্থায় ব্রহ্মদেশে
একটি স্বজাতীয় কন্যাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করতে হয়েছিল। সে কাহিনী গল্প-কথার ন্যায় রোমান্টিক।
.        তিনি তখন রেঙ্গুনের যে বাড়ীতে বাস করতেন, তার নীচের তলায় একজন মেকানিক বা কলকব্জার
মিস্ত্রী ছিল। জাতিতে সে বাঙ্গালী---চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ, বিপত্নীক। সংসারে একটিমাত্র বিবাহযোগ্যা অনূঢ়া কন্যা
ছাড়া আর কেউ ছিল না। চক্রবর্তীর চরিত্রে ছিল অনেক দোষ। সন্ধ্যার পর কারখানা থেকে ফিরে এসে  
বাড়ীতে সে এক আড্ডা বসাতো।  সেখানে  জুটতো  যত  নেশাখোর মাতাল গেঁজেল কারিগর ও বদমাইশের
দল। এরাই ছিল তার বন্ধু ও সঙ্গী। অনেক রাত্রি পর্যন্ত চলতো তাদের হুল্লোড়। মেয়েটিকে খাটতে হ’ত এই
সব পাষণ্ডদের নানারকম ফাইফরমাস। চক্রবর্তীকে রেঁধে খাওয়ানো, বাসন মাজা প্রভৃতি সংসারের যা কিছু
কজ সবই করতো এই মেয়েটি। কোনো বিষয়ে একটু কিছু ত্রুটি হ’লেই দিত মেয়েকে ধরে নির্মম প্রহার।
.        শরত্চন্দ্র সন্ধ্যার পর প্রায়ই বাসায় থাকতেন না। অনেক রাত্রে ফিরে এসে তাঁর ঘরে ঢুকে শুতেন,
আবার সকালে উঠে বেরিয়ে যেতেন।
.        একদিন রাত্রে শুতে এসে দেখেন, ঘর ভিতর থেকে বন্ধ। কে তাঁর ঘরে ঢুকে খিল দিয়েছে---চোর নয়
তো?---তিনি দরজায় জোর ধাক্কা দিয়ে খুলে দেবার জন্য ডাকতে লাগলেন। একটু পরে দরজা খুলে ঘরের
ভিতর থেকে বেরিয়ে এল চক্রবর্তীর মেয়ে। থর্ থর্ করে সর্বশরীর কাঁপছে তাঁর তখনও---দুচোখ ভেসে
যাচ্ছে অশ্রুজলে। ব্যাপার কি জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন যে, চক্রবর্তী তার বন্ধু পাকা বদমায়েস ও  
মাতাল ঘোষাল-বুড়োর সঙ্গে মেয়েটির বিবাহ দিতে প্রতিশ্রুত হয়েছে। ঘোষাল-বুড়ো সে জন্যে চক্রবর্তীকে
কিছু টাকাও নাকি দিয়েছে। আজ নেশার ঝোঁকে, চক্রবর্তীর মেয়েকে সে নিজের পত্নী বলে দাবি ক’রে  
অন্দরের মধ্যে তেড়ে এসেছিল। মেয়েটি ভয়ে পালিয়ে এসে দাদাঠাকুরের ঘরে খিল দিয়ে আত্মরক্ষা করেছে।
কিন্তু এখন আর কদিন চলবে! মেয়েটি শরত্চন্দ্রের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ল, আপনি আমাকে রক্ষা করুন,
আপনি আমাকে বাঁচান।
.        শরত্চন্দ্র মেয়েটিকে সে রাত্রের মত সেই ঘরেই নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাতে বলে নীচে নেমে গেলেন। বলে
গেলেন ভয় নেই, কাল সকালে আমি ফিরে এসে এর বিহিত করবো।
.        পরের দিন চক্রবর্তীকে মেয়ের সম্বন্ধে বলতে গিয়ে, শরত্চন্দ্র পড়লেন বিপদে। চক্রবর্তী বলে---মেয়ে
যোগ্য হয়েছে, বিয়ে দোব না? আমি গরীব মানুষ, এই বিদেশে ওর চেয়ে ভালো পাত্র কোথা থেকে পাবো?
ঘোষালদের টাকা আছে, ছুঁড়িটা ভাত কাপড়ের কষ্ট পাবে না। একটি নেশা ভাঙ করে---হোক্। সে তো
আমিও করি। আর যদি বয়সের কথা বল বাবু---বেটা ছেলের আবার বয়স কি?
শরত্চন্দ্র অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু চক্রবর্তী সে পাত্রই নয়। ঘোষালের দেনা শরত্চন্দ্র মিটিয়ে
দেবেন, তবুও বলে---না, মেয়ের আমার বিয়ে দিতে হবে তো? শেষকালে চক্রবর্তী ধরে বসলো---এতই যদি
তোমার প্রাণ দয়ামায়া বাবু, তুমিই কেন এই গরীব বামুনের মেয়েটাকে নিয়ে আমার জাত কূল রক্ষা কর না।
.        অগত্যা শরত্চন্দ্রকেই নিতে হয়েছিল সেই মেয়েটির ভার। তাকে নিয়ে শরত্চন্দ্রের দিন সুখেই
কাটছিল। একটি পুত্র সন্তানও হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য তখনও ফিরছিল তাঁর পাছে পাছে। রেঙ্গুনে আবার
একবার প্লেগের দারুণ মহামরী দেখা দিল---শরত্চন্দ্রের পত্নী, পুত্র সেই প্লেগের আক্রমণে আটচল্লিশ ঘন্টার
মধ্যে যেন স্বপ্নের মত মিলিয়ে গেল
।”

শরত্চন্দ্রের দ্বিতীয় বিবাহ হয় হিরন্ময়ী দেবীর সঙ্গে। এই বিয়ে নিয়ে তাঁর রেঙ্গুনের বন্ধুবর গিরীন্দ্রনাথ
সরকারের “ব্রহ্মদেশে শরত্চন্দ্র” গ্রন্থে রয়েছে . . .
.        “
এই ঘটনায় (শান্তি দেবীর মৃত্যু) শরত্চন্দ্রের জীবনে অনেক পরিবর্তন হইয়াছিল। তিনি ঐ  কদর্য
পল্লী ত্যাগ করিয়া শহরে কয়েকটি বন্ধু-বান্ধবের সহিত একত্রে বাসা করিয়াছিলেন। দুই বত্সর  পরে  
শরত্চন্দ্র ছুটি লইয়া কলিকাতা যান এবং দ্বিতীয়বার বিবাহ করিয়া সস্ত্রীক রেঙ্গুনে আসিয়া আমার বাড়ীর
সন্নিকটে ৩৬নং গলিতে বাড়ী ভাড়া করিয়া কয়েক বত্সর ছিলেন। তাঁহার সন্তানাদি হয় নাই। দুইটি  কুকুর
ও কয়েকটি পক্ষীশাবক তাঁহার অপত্য-স্নেহের অধিকারী হইয়াছিল
।”

শরত্চন্দ্রের দ্বিতীয় বিবাহ সম্বন্ধে
কবি নরেন্দ্র দেবের “শরত্চন্দ্র” গ্রন্থে রয়েছে . . .
.        “
মধ্যে মধ্যে অল্প কয়েক দিনের জন্য বাঙ্গালা দেশে এসে ভাইবোনদের খবর নিয়ে, আত্মীয়-বন্ধুদের
সঙ্গে দেখাশুনা করে, আবার ফিরে যেতেন রেঙ্গুনে। এমনি এক আসা-যাওয়ার মাঝে হিরন্ময়ী দেবী নামে  
একটি অসহায়া দরিদ্র ব্রাহ্মণ রমণীকে তিনি দ্বিতীয়বার সঙ্গিণীরূপে গ্রহণ করেছিলেন। ইনি মেদিনীপুর-নিবাসী
স্বর্গীয় কৃষ্ণদাস অধিকারী মহাশয়ের কন্যা
।”
ষোড়শী নাটকের নাট্যরূপ নিয়ে একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক -                       পাতার উপরে . . .  
ষোড়শী নাটকের নাট্যরূপ কার দেওয়া, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা-প্রকাশিত  গ্রন্থাবলীতে
তুমুল তর্ক-বিতর্কের সূচনা হয়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা
কবি শিবরাম চক্রবর্তীর আলাপচারিতা এবং
১৯৫৯ সালে তাঁর “ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা” গ্রন্থে এই নিয়ে লেখা, থেকেই এই বিতর্কের সূত্রপাত।

শরত্চন্দ্রের কবিতা মিলনসাগরে তুলতে গিয়ে আমাদের এই “ঘোলাজলেই” নেমে তাঁর “কবিতা” ধরে আনতে
হয়েছে!! এই বিষয়টির একটি সত্য-কেন্দ্রিক গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে যে শরত্চন্দ্রের কবিতাই আমাদের
পাওয়া হতো না। পাঠক ভাববেন না যেন যে আমরা যেন-তেন করে ষোড়শীর গানগুলির রচনা শরত্চন্দ্রের
নামে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করছি! কারণ ষোড়শীর বাইরেও শরত্চন্দ্রের ছড়া ও কবিতা আমরা সংগ্রহ  
করতে সফল হয়েছি। তা দিয়েই মিলনসাগরে শরত্চন্দ্রের কবিতার পাতা করে দেওয়া যেতো।

কিন্তু আমরা মনে করছি যে ষোড়শীর গানগুলি কার -
শিবরাম চক্রবর্তীর না শরত্চন্দ্রের লেখা এই বিতর্কের
একটি চূড়ান্ত সমাধান হওয়া বাংলা সাহিত্যের পক্ষেও শোভনীয়। তাই খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও আমরা
এই বিষয়ে আমাদের প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছি যে ষোড়শীর গানগুলি সত্যই শরত্চন্দ্রের
লেখা। পাশাপাশি আমরা আরও চাই যে, এই অবাঞ্ছিত ঘটনার ফলে শিবরাম চক্রবর্তীকে যে তিক্ততার মধ্য
দিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে হয়েছে এবং শরত্চন্দ্র ও শিশির ভাদুড়ীর নামে যে অপবাদ  ছড়িয়েছিল,  
তারও অবসান হোক।    

এই নিয়ে আমাদের বিশ্লেষণ এই রকম . . .
যে টুকরে টুকরো খবর ছড়িয়েছিল তার কয়েকটি প্রথমেই আমরা এখানে তুলে দিচ্ছি . . .

১। সাকসেস বাংলা ওয়েবসাইটে সুশান্ত কর্মকারের “ঔপন্যাসিক যখন নাট্যকার :: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়”
প্রবন্ধে তিনি ষোড়শী নাটকের সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

১৯২৭ খ্রিঃ ১৩ আগষ্ট @ শরৎচন্দ্র কৃত ‘দেনাপাওনা’ উপন্যাসের নাট্যরূপ ‘ষোড়শী’র আত্মপ্রকাশ ঘটে
‘ভারতী’ পত্রিকায়। তবে জানা যায় ‘ষোড়শী’র নাট্যরূপ দানের কৃতিত্ব শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একার নয়।
সৌরিন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় তাঁর "শরৎচন্দ্রের জীবনরহস্য" গ্রন্থে জানিয়েছেন, ‘দেনাপাওনা’ উপন্যাসের  
নাট্যরূপ প্রথমে শ্রীশিবরাম চক্রবর্তী দিয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র সেই লেখা আগাগোড়া পরিমার্জন করে  
শরৎচন্দ্রের নামেই ‘ষোড়শী’ নামে ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হল এক সংখ্যাতেই সমগ্রভাবে। নাটক বাবদ
‘ভারতী’র তরফ থেকে সম্পাদিকা সরলা দেবী শরৎচন্দ্রকে তিনশো টাকার চেক দেন। এ টাকা থেকে  
শরৎচন্দ্র অবশ্য শিবরামকে একশো টাকা দিয়েছিলেন
।”
@ ভারতীতে প্রকাশনার তারিখটা ১৩৩৩, আশ্বিন
(Puja) সংখ্যায় (অক্টোবর ১৯২৬) হবে।---মিলনসাগর॥

২। আনন্দবাজার পত্রিকায়
শিবরাম চক্রবর্তীকে নিয়ে “চকরবর্ তি” পাতায় শরত্চন্দ্রের দেনা-পাওনা
উপন্যাসের নাট্যরূপ ষোড়শী কে নিয়ে মর্মান্তিক কথা বলা হয়েছে। তাঁকে নাকি শরত্চন্দ্র কোনো পারিশ্রমিক
দেননি। নাটকের পরিচালক-অভিনেতা শিশির ভাদুড়ীই তাঁকে ১২০টাকা দিয়েছিলেন। এই লেখাটি ১৯৬০-এ
প্রকাশিত,
শিবরাম চক্রবর্তীর “ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা” গ্রন্থের লেখারই পুনরাবৃত্তি। সেই লেখাটি আমরা নীচে
দিলাম।

৩। শিবরাম চক্রবর্তীর “ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা” গ্রন্থের ৪০৩-পৃষ্ঠায় দেওয়া আলেখ্যে থেকে প্রয়োজনীয়
অংশই কেবল তুলে দিচ্ছি। তবুও এটা বেশ দীর্ঘ হয়ে গেল। পাঠক আমাদের এর জন্য মার্জনা করবেন।
এখানে তিনি অহিন্দ্র চৌধুরী এবং শিশির ভাদুড়ীর অভিনয়ের এবং শিশির ভাদুড়ী এবং প্রবোধচন্দ্র গুহর
উপস্থাপনার মধ্যে তুলনামূলক বিচার করতে গিয়ে দেনা-পাওনার নাট্যরূপ ষোড়শীর সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

“ . . .
তবে রবীন্দ্রনাথকে না আনতে পারলেও শরত্চন্দ্রকে রঙ্গমঞ্চে প্রথম আহরণের মাহাত্য তাঁর (শিশির
ভাদুড়ীর)। যদিও সেটা অনেক গড়িমসির পরেই। এবং এক রকম, ঐ প্রবোধবাবুকে টেক্কা দিতে গিয়েই।
(প্রবোধচন্দ্র গুহই রবীন্দ্রনাথকে, শিশির ভাদুড়ীর আগে, রঙ্গমঞ্চে এনেছিলেন প্রথম তাঁর চিরকুমার সভা,
শোধবোধ, গৃহপ্রবেশ ইত্যাদি মঞ্চস্থ করার মধ্যে দিয়ে )

আমি যখন দেনা-পাওনার নাট্যরূপের খসড়া নিয়ে তাঁর কাছে যাই, তিনি দেখে শুনে ‘ভেরি ক্লেভারলি ডান্’
বলে আমাকে তা ফেরত দিয়েছিলেন। আমি তখন কী করি, টাকার দরকার, আমার বন্ধু জগৎ  ভট্টাচার্যকে
তা ছাপতে দিই। সরলা দেবী সম্পাদিত ভারতী মাসিকপত্রের তিনি তখন সহযোগী সম্পাদক, শরত্চন্দ্রের
অনুমতি নিয়ে তাঁর নামেই সেটা তিনি ভারতীর শারদীয় আর সর্বশেষ সংখ্যায় বার করেন --- দক্ষিণার
সিংহভাগ স্বভাবতই শরৎবাবুকে দিয়ে নামমাত্র কিছু (নাট্যরূপ দাতারূপে নিজের নাম হারানো সত্ত্বেও)
পেয়েই আমি বর্তে যাই, বলাই বাহুল্য। এবং ভারতীতে প্রকাশ লাভের পরই প্রবোধবাবু সে বই  মঞ্চস্থ
করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। খবরটা পাবামাত্রই শিশিরকুমার পাণিত্রাসে তাঁর কাছে গিয়ে হুমড়ি  খেয়ে
পড়ে বইয়ের অভিনয় স্বত্ব আগেভাগেই হাতিয়ে নিয়ে আসেন। তাহলেও, কাজটা এমন কিছু নিন্দনীয় হয়েছে
আমার মনে হয় না। নাথিং আনফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার... ইত্যাদি বলে না?

এবং লাভের কথাটা ধরতে গেলে, এরকম কাজ করতেই হয়। আর সেটা খতিয়ে দেখে বলা যায়, ষোড়শীই
তাঁর প্রযোজনা-কৃতিত্বের ইতিহাসে  সবচেয়ে লাভজনক অধ্যায়। তাঁর অভিনয়কীর্তিতে সবচেয়ে কীর্তিত। .
. .”

এরপর শিবরাম চক্রবর্তী ৪০৫-পৃষ্টায়, তাঁর মন থেকে কী ভাবে শরত্চন্দ্রের মর্মর মূর্ত্তির স্খলন ঘটল এবং
ষোড়শীর প্রথম শোয়ের দিনের (বেনিফিট নাইটের) অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন . . .

“ষোড়শী নিয়ে লড়ালড়ি চিরদিনের---সেই সুন্দ-উপসুন্দর আমল থেকেই। আর দেনাপাওনার জেরও কখনই
মেটে না। আর সেই সব মিলিয়ে সমস্ত ব্যাপারটাই কেমন যেন অসুন্দর।

জানি ; কিন্তু জানলেও মন মানতে চায় না। এমন কি, কোনো ভাবমূর্তি নিছক মনগড়া হলেো তা ভাঙলে
মনে লাগে, না লেগে পারে না। নিতান্ত পৌত্তলিকা যদিও, অন্তর্গত সেই পুতুল (বা প্রতিমাই) ভেঙে পড়লে
মনের খানিকটা নিয়েই পড়ে বুঝি।

আমার মর্মের পীঠস্থান থেকে শরত্চন্দ্রের মর্মর মূর্তির স্খলন সেদিন আমার মনে বেশি লেগেছিল---
লাভালাভের নীট হিসেবের থেকেও। তাঁর সেই ভঙ্গুর দশাই তখন আমার কাছে মর্মান্তিক।

ভাবমূর্তি উপে গিয়ে কী ভাবমূর্তিই না দেখেছিলাম সেদিন!

ষোড়শীর বেনিফিট নাইটে আমারও কিছু প্রাপ্যগণ্ডা থাকবে আশ্বাস পেয়েছিলাম শিশিরবাবুর।

অভিনয় শেষে গ্রীনরুমে গিয়ে জানলাম, (শিশিরবাবু স্বমুখেই) সেদিনকার বিক্রির সব টাকা একটা থলেয় ভরে
রাখা হয়েছিল, সেই থলিটা নিয়ে শরত্চন্দ্র চলে গেছেন খানিক আগেই।

শিশিরবাবু আমার অংশত দাবীর কথাটা তাঁকে জানিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি নাকি তা দাবিয়ে দিয়েছেন।
বলেছেন --- ‘শিবরাম টাকা নিয়ে কী করবে? বিয়ে করেনি কিচ্ছু না! তার ছেলে নেই পুলে নেই, ঘর নেই
সংসার নেই---টাকার তার কিসের দরকার!’

এই বলে থলে নিয়ে ট্যাকসি ডাকিয়ে এতক্ষণে হয়ত হাওড়া স্টেশনে।

তবুও শিশিরকুমার বলতে গেছলেন---‘ক্ষমাঘেন্না করেও কিছু অন্তত দিন একে শরত্দা!’
তার জবাবে তিনি এই বলেছেন, ‘আমার বেনিফিট নাইটের বখরা ওকে দিতে যাব কেন? এ রাত্তিরে টিকিট
বিক্রি হয়েছে আমার নামে, আমার জন্য টাকা দিয়ে দেখতে এসেছে সবাই। এর ভেতর সে আসছে কোথা
থেকে?’

আমি আর কিছু কইতে পারি না। সত্যি! আমার টাকার দরকার কী! মেসের টাকা বাকী, এর ওর তার
কাছে ধার, এটা ওটা সেটার দরকার---কিন্তু তা নিয়ে উচ্চবাচ্যর কী প্রয়োজন! আমার অভাবের
চাকী এখানে ঘুরিয়ে কী লাভ? তা শুধু আমাকে পিষ্ট করার জন্যই, অপরের পৃষ্ঠপোষকতা লাভের নিমিত্ত নয়
। আমার নিজের চরকায় আর কেউ তেল দিতে আসবে কিসের গরজে?

আমি চুপ করে থাকি। শিশিরবাবু তাঁর এক ভাইকে বলেন---‘দ্যাখ তো কিছু পড়ে আছে কিনা কোথাও।’

‘ক্যাশবাক্সে যা ছিলো সবই তো দেওয়া হয়ে গেছে শরত্দাকে। টিকিটঘরে একটা পয়সাও পড়ে নেই আর।’

‘আমার চেক বইটা আন।’

চেক বই এলে আমাকে শুধান, ‘ক্রস চেক দেব?’

‘ভাঙাব কোথায় আমার কি কোনো অ্যাকাউন্ট আছে কোথাও!’
‘একটা পে টু সেলফ্ লিখে দাওনা দাদা’, তাঁর ভাই বাতলায়।
একশ’কুড়ি টাকার একখানা সেলফ্ চেক কেটে দেন তিনি তত্ক্ষণাৎ। ‘আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে এই
টাকাই পড়ে আছে দেখছি।’

এর বেশি আর কিছু বললেন না। যা পাই যথা লাভ জ্ঞান করে আমিও বাক্যব্যয় বাহুল্য বোধ করি।
সেই একশকুড়িই আমার কাছে এক কাঁড়ি। তখনকার মত দুঃখ প্রশমনের পক্ষে অনেক টাকা। এই সেলফ্
হেলপেই চলে যাবে এখন দিনকতক।

কিন্তু সত্যি বলতে, শিশিরবাবুর দিক থেকে ততটা নয়, শরত্চন্দ্রের ব্যবহারে আমার আঁতে লেগেছিল
যেমনটা। উপন্যাসের দরদী শরত্চন্দ্র জীবনের বাস্তববিন্যাসে এক নিমেষে কোথায় যে হারিয়ে গেলেন
। . . .”

শিবরাম কতটা আঘাত পেয়েছিলেন, তা তাঁর ৪০৭ এর পাতায় এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায় . . .

“ . . .
প্রতিভার এটা অভিসম্পাত কিনা জানি না, তবে সপ্রতিভদের এই উত্পাত। বিশ্বাত্মবোধে  বিশ্বকে
আত্মসাৎ করার ভগবদ্দত্ত ন্যায্য অধিকার তাঁদের।  অন্তত তাঁরা তাই মনে করেন।  এবং সেই কর্মের হেতু
কোনো দুঃখ দরদ  দূরে  থাক,  সঙ্কোচমাত্র  বোধ করেন না।  এইহেতু  প্রতিভাধরদের থেকে দূরে থাকাই
নিরাপদ।

প্রতিভার অবদানই শ্রেয়, তাই আমাদের গ্রহণীয় হওয়া উচিত। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রতিভার প্রতিভুকেও নিতে
গেলে তাঁর খাই মেটাতে নিজের লেশমাত্রও অবশেষ থাকে না, অবশেষে নিজেও যেতে হয়। প্রতিভা সাধারণ
নিয়মের ব্যতিক্রম। পতঞ্জলির অষ্টাঙ্গযোগে নিয়মের পরে যমের স্থান---প্রতিভা সেই যম। আশপাশের সব
কিছু, সবাইকেই তিনি হজম করেন। তাই করেই বেঁচেবর্তে থাকেন, বাড়বাড়ন্ত হয় তাঁর।

গোরুর চেয়ে গোরুর দুধ ভালো, তাই খেয়েই খুশি থাকতে হয়, তার ওপরেও যে গোসেবায় এগোয়, সে-
হতভাগা  কখনো না কখনো গোরুর গুঁতো খায়ই---যদি তার নিজেরও সমান গরুত্ব না থাকে। দুঃখের কথা,
এই জ্ঞান আগের থেকে কারুর হয় না। হলে পর হাড়ে হাড়ে সেই শিক্ষা লাভের পর তা আর যাবার নয়।  
সেই শিক্ষা কখনই সে হারায় না আবার।  তাবৎ  প্রতিভার  থকে  তার  পর  থেকে  সে সুদূরপরাহত হয়ে
থাকে। অবশ্য দূরের একটা নমস্কার রাখেই
। . . .”

এই দুঃখজনক ঘটনার মধ্যে আমরা যে যে বিষয় উল্লেখনীয় মনে করছি তা হলো . . .

১। ষোড়শীর নাট্যরূপ
শিবরাম চক্রবর্তী নিজেই লিখে প্রথমে শিশির ভাদুড়ীর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।

২। শিশির ভাদুড়ী তা ফিরিয়ে দিলে তিনি, অর্থসংকটে থাকার দরুণ ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত করতে  
দিলেন তাঁর বন্ধু জগৎ ভট্টাচার্যকে, যিনি তখন ছিলেন "ভারতী"-র সহযোগী সম্পাদক। এই পর্যন্ত আমরা
দেখছি যে শরত্চন্দ্র এই ঘটনাবলীতে প্রবেশ করেন নি। কারণ নাট্যরূপ দেবার আগে, তাঁর সঙ্গে কোন কথা  
বলেন নি শিবরাম। তেমন কোনও উল্লেখ কেউই করেননি। আমরাও সেরকম কিছু লেখা পাইনি।

৩। ভারতীতে ছাপাতে গিয়ে তারাই শরত্চন্দ্রের কাছে এটি ছাপাবার অনুমতি চায়। শরত্চন্দ্র এই প্রথম এই
কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হলেন।

৪। লেখাটি, সরলা দেবী চৌধুরাণী সম্পাদিত ভারতী পত্রিকায় ছাপা হলো ঠিকই, কিন্তু নাট্যরূপ দেবার জন্য
ভারতীতে
শিবরামের নাম না রেখে শরত্চন্দ্রের নাম রাখা হলো।

৫। এই বিষয়ে উল্লেখ করতে হচ্ছে যে সে সময় বেশিরভাগ পত্র-পত্রিকাতেই নবীন লেখকদের নাম  রাখা  
হোত না। এমন কি তাঁর প্রথম দিককার বহু লেখায়
রবীন্দ্রনাথের নামও ভারতীতে রাখা হয় নি। তখনকার  
দিনে এটাই রেওয়াজ ছিল। নবীনদের কিছুকাল নাম ছাড়াই লেখালেখি করতে হতো। যতদিন না তাঁর লেখার
চাহিদা হচ্ছে।

৬। কিন্তু
শিবরামের ক্ষেত্রে তা হয়নি। তাঁর কবিতা একাধিক বার তাঁর নামেই ভারতী পত্রিকায় ততদিনে  
ছেপে বেরিয়েছে। সেগুলি হলো . . .
  • ভারতী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩১ সংখ্যায় কবিতা “ভুল ভাঙা”। প্রথম কলি “সত্য হে কবি, এ যে ভুল ভাঙা”।  
    কবিতাটি “রবীন্দ্রনাথের ভুলভাঙা পড়িয়া” লিখেছিলেন।
  • ভারতী, শ্রাবণ ১৩৩৩ সংখ্যায় কবিতা “বর্ষা-স্বপন”। প্রথম কলি “ওগো সেদিন গগন পারে”।
  • ভারতী, ভাদ্র ১৩৩৩ সংখ্যায় কবিতা “প্রেম---?”। প্রথম কলি “প্রেম সে চিরদিনের,---কেঁদে বল্ চে
    তারা”।
এই সব কটি কবিতা মিলনসাগরের কবি শিবরাম চক্রবর্তীর কবিতার পাতায় রয়েছে।

৭। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে শরত্চন্দ্রকে খুশি করতে গিয়ে  ভারতী পত্রিকাতে  শিবরামের ষোড়শীর  
নাট্যরূপ তাঁর নাম ছাড়াই প্রকাশিত হয়েছিল। শরত্চন্দ্রের সঙ্গে ভারতী পত্রিকার কি কথার আদান  প্রদান
বা চুক্তি হয়েছিল তা আমরা জানি না। তবে শরত্চন্দ্র ভারতী থেকে পাওয়া ৩০০ টাকা থেকে ১০০ টাকা
শিবরামকে দিতে রাজি হয়েছিলেন একথা আমরা জানতে পারছি। সুতরাং এখানে আমরা মনে করছি যে
ভারতী পত্রিকার তরফে অন্তত চিত্রনাট্যকার হিসেবে
শিবরাম চক্রবর্তীর নামটি রাখার উপর জোর দেওয়া
এবং সে ভাবে শরত্চন্দ্রের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল।

৮। ভারতীতে ছেপে বার হওয়ার পরে দুটি জিনিষ হয়েছে। প্রথমে সেই খবর পেয়ে শিশির ভাদুড়ী  
শরত্চন্দ্রের সঙ্গে নাটক মঞ্চস্থ করার চুক্তি সাক্ষর করেছেন। দ্বিতীয়ত শরতচন্দ্রের মনে হয়েছে যে  
শিবরামের লেখা ষোড়শীর নাট্যরূপটি তাঁর মনের মতো হয়নি।

৯। তিনি নাটকটির আমূল পরিবর্তন করে নিজেই আবার লিখলেন। এখানে উল্লেখ করতে হচ্ছে যে আমরা
১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ভারতী পত্রিকার পূজা সংখ্যায় (অক্টোবর ১৯২৬) প্রকাশিত ষোড়শী এবং আনন্দ  
পাবলিশারস থেকে প্রকাশিত, সুকুমার সেন সম্পাদিত, “শরৎ সাহিত্য সমগ্র”-এর ষোড়শী নাটকটি মিলিয়ে
দেখেছি। দুটির মধ্যে সত্যিই কোনও মিল নেই। শরত্চন্দ্র সত্যি সত্যি খোল-নলচে পালটে নতুন নাট্যরূপ
দিয়েছিলেন। ভারতীতে প্রকাশিত
শিবরামের ষোড়শীতে কোন গান নেই। কিন্তু “শরৎ সাহিত্য সমগ্র”-এর  
ষোড়শীতে গান আছে। সুতরাং ষোড়শীর গানগুলি
শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা নয় তাতে কোন সন্দেহ নেই।

১০। এখানে আমাদের শিবরামের কৃতিত্ব আগ্রাহ্য করলে চলবে না। “দেনা-পাওনা” উপন্যাসটিকে যে একটি
নাটকের রূপ দেওয়া যায় এবং তার নাম “ষোড়শী” রাখা, এটা সম্পূর্ণ শিবরামেরই মস্তিষ্ক-প্রসূত। খোল-নলচে
বদলে লিখলেও, শরত্চন্দ্রের সামনে ছিল
শিবরামের লেখা নাট্যরূপ! তাই শরত্চন্দ্রকে নাট্যরূপ লিখতে   
অপেক্ষাকৃত কম খাটতে হয়েছিল। তাঁই শিবরামকে তাঁর কৃতিত্বের সম্মানটা সবারই দেওয়া উচিত ছিল।

১১। শরত্চন্দ্র তাঁর নিজের মতো করে ষোড়শীর নাট্যরূপ লেখার পরে গানের জন্য রবীন্দ্রনাথের কাছে
অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু
রবীন্দ্রনাথ সে অনুরোধ রক্ষা করতে পারেন নি, তাই নিজেই গান  লিখেছিলেন
যা আমাদের কবির কবিতার পাতায় দেওয়া রয়েছে। এই ঘটনাটি সম্বন্ধে এই পাতায় পূর্বেই বিস্তারিতভাবে  
দেওয়া রয়েছে।

১২। এবার আসা যাক শিশির ভাদুড়ীর নাট্য মঞ্চে। সরলা দেবী চৌধুরণী সম্পাদিত ভারতী পত্রিকার   
১৩৩৩, আশ্বিন
(Puja) সংখ্যায় ( অক্টোবর ১৯২৬ ) শিবরাম চক্রবর্তীর  লেখা ষোড়শীর নাট্যরূপ প্রকাশিত
হয় শরত্চন্দ্রের নামে।  “শরৎ সাহিত্য সমগ্রের” ষোড়শীর গ্রন্থ-পরিচিতি থেকে জানতে পারছি যে ১৩ই  
আগস্ট ১৯২৭ নাটকটি বই আকারে প্রকাশিত হয় গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স থেকে। নাটকটি প্রথম  
মঞ্চস্থ হয় ২১শে শ্রাবণ  ১৩৩৮  (৫ই  আগস্ট ১৯২৭), কলকাতার নাট্যমন্দির লিমিটেডে। অভিনয়  
করেছিলেন জীবানন্দের ভূমিকায়  শিশির  ভাদুড়ী এবং ষোড়শীর ভূমিকায় চারুশীলা দেবী।

১৩। নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল, শরত্চন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি করার পরে। তাই আন্দাজ করা অন্যায় হবে না যে   
তিনি তাঁর নিজের লেখা নাট্যরূপই শিশির ভাদুড়ীকে দিয়েছিলেন, অভিনয়ের জন্য। সেখানে গানও ছিল   
নিশ্চয়ই।

১৪। শিশির ভাদুড়ী শরত্চন্দ্রেরই নাট্যরূপে অভিনয় করিয়েছিলেন কারণ সেই অভিনয় একদিন (প্রথম দিন)
স্বয়ং শরত্চন্দ্র দেখেছিলেন এবং সেই কথা চিঠিতে জানিয়েছিলেন তাঁর স্নেহভাজন বেহালার মণীন্দ্রনাথ   
রায়কে। “শরৎ সাহিত্য সমগ্রের” ষোড়শীর গ্রন্থ-পরিচিতি তে সেই চিঠির এই অংশটি দেওয়া রয়েছে . . .  
ষোড়শী অভিনয় আমি একবার মাত্র দেখেছি, এবং তারই জের চলছে। . . . তুমি যদি পার তো একবার
গিয়ে দেখে এসো। বাস্তবিকই শিশির এবং চারুর  (জীবানন্দ-ষোড়শী) অভিনয় দেখার মত বস্তু
।”     
তিনি দেখতে বসে
শিবরামের নাট্যরূপ দেখতে পেলে নিশ্চয়ই আপত্তি করতেন বা ধরতেন। তা তিনি করেন
নি। অর্থাৎ মঞ্চে তাঁর লেখা নাট্যরূপই অভিনীত হয়েছিল।

১৫। সামতাবেড়, পাণিত্রাস পোস্ট থেকে,
কবি রাধারাণী দেবীকে লেখা এক চিঠিতে তিনি তাঁকেও ষোড়শী
বইটি পড়া এবং দেখার কথা বলেছেন। এই চিঠি অন্য একটি কারণে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই চিঠিতে
দেখা যাচ্ছে যে, যেদিন শরত্চন্দ্র ষোড়শী দেখতে গিয়েছিলেন সেদিন তাঁর জ্বরের মত হয়েছিল। চিঠির  
অংশবিশেষ এখানে তুলে দিচ্ছি . . .
“. . .
ষোড়শী বইটা পোড়ো। বোধ হয় তোমার মন্দ লাগবে না। আর অভিনয় দেখবার যদি সময় পাও,
সত্যিই খুসি হবে। শিশির কি শেখানোই শিখিয়েছে। আমি একটি দিন মাত্র দেখেচি, সেদিন আবার
ইনফ্লুয়েঞ্জার মত হয়ে শরীরটা পীড়িত হয়ে ছিল। তবু চমত্কার লেগেছিল
।”

১৬। এবার ষোড়শীর প্রথম অভিনয়ের দিনে, শিবরাম চক্রবর্তীর কথায় আসি। দেখা যাচ্ছে তিনি সেখানে
গিয়েছিলেন শিশির ভাদুড়ীর এই আশ্বাসে যে সেদিন তাঁর কিছু প্রাপ্তি হতে পারে। তাঁর লেখা “ঈশ্বর পৃথিবী
ভালবাসা” থেকে পাচ্ছি যে তিনি “অভিনয় শেষে গ্রীনরুমে” গিয়ে শিশির ভাদুড়ীর সঙ্গে দেখা করে কথাবার্তা
বলেছিলেন। আমাদের মনে হচ্ছে না যে তিনি নাটকটা হলে বসে সেদিন দেখেছিলেন। মনে হচ্ছে যে  শো
শেষ হবার পরে গিয়েছিলেন কিছু প্রাপ্তির আশায়। কারণ যদি অভিনয় দেখতেন তাহলে বুঝতে   পারতেন
যে  নাটকটি তাঁর লেখা চিত্রনাট্যে মঞ্চস্থ হচ্ছে না। এ নিয়ে অন্তত তিনি কিছু কথা তার লেখায় উল্লেখ
করতেন। তিনি সে রকম কোত্থাও কিছুই লেখেন নি। অন্যদিকে শরত্চন্দ্র আদ্যোপান্ত হলে বসে নাটকটি
দেখে প্রচণ্ড খুশি হয়েছিলেন এবং চিঠি পত্রে তা অন্যদেরও দেখতে বলেছিলেন। যদি তাঁর লেখা  নাট্যরূপে
না হয়ে থাকে তাহলে তিনি ছেড়ে কথা কইতেন না তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাতে যে গানও ছিল!  
শিবরামের নাট্যরূপে তো গান ছিল না। তাই সেটা আভিনীত হলে, গানগুলি যদি না গাওয়া হয়ে থাকে তা
হলেও কি শরত্চন্দ্র  বুঝতে পারতেন না যে এটা তাঁর লেখা নাট্যরূপ নয়?
.         তাই আমরা নিশ্চিত যে সেইদিন শরত্চন্দ্রের লেখা নাটকটি অভিনীত হয়েছিল এবং
শিবরাম তা
জানতেন না কারণ তিনি নাটকটা সেইদিন দেখেন নি।

১৭। শিশির ভাদুড়ীর কাছে টাকা চাইতে তিনি বলেন যে শরত্চন্দ্র সব টাকা নিয়ে চলে গেছেন এবং তাঁকে
বলেছেন ‘শিবরাম টাকা নিয়ে কী করবে? বিয়ে করেনি কিচ্ছু না! তার ছেলে নেই পুলে নেই, ঘর  নেই  
সংসার নেই---টাকার তার কিসের দরকার!’ ক্ষমাঘেন্না করে কিছু দেবার কথা বলতে শরত্চন্দ্র নাকি আরও
বলেন ‘আমার বেনিফিট নাইটের বখরা ওকে দিতে যাব কেন? এ রাত্তিরে টিকিট বিক্রি হয়েছে  আমার  
নামে, আমার জন্য টাকা দিয়ে দেখতে এসেছে সবাই। এর ভেতর সে আসছে কোথা থেকে?’
রাধারাণী দেবীকে লেখা চিঠি থেকে জানতে পারছি যে সেদিন শরত্চন্দ্রের “ইনফ্লুয়েঞ্জার মত হয়ে শরীরটা  
পীড়িত হয়ে ছিল
”। সুতরাং স্বাভাবিকভাবে তিনি ফিরে যাবার তাড়ায় ছিলেন। সেদিন যে নাটক অভিনীত
হয়েছিল তা যে তাঁরই করা নাট্যরূপের অভিনয় এটা তিনি জানতেন এবং তিনি সেখানে শিবরামের নাম
শুনে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তা বোঝা যাচ্ছে। কারণ তার মতে
শিবরামকে তো তিনি ভারতী পত্রিকা থেকে  
পাওয়া কিছু টাকা দিয়েই দিয়েছিলেন। সেটা ন্যায্য না অন্যায্য সেটা পরের কথা। অন্যদিকে শিবরাম  
ভেবেছিলেন যে তাঁরই লেখা নাট্যরূপ অভিনীত হয়েছে। তাই তাঁর প্রচণ্ড খারাপ লেগেছিল শিশির ভাদুড়ীর
কথা শুনে এবং পরবর্তীতে তিনি এ সব কথা লিখেছেন এবং আলাপচারিতায় বলেছেন।

১৮। একটি বিষয় অজ্ঞাত থেকেই যায়। শরত্চন্দ্র কি শিশির ভাদুড়ীকে ওসব কথা ওরকম ভাবে সত্যিই
বলেছিলেন? কারণ সে কথার সত্যতা যাঁচাই করার কোন উপায় আমাদের কাছে নেই। এমন কি  হতেই   
পারে না যে, ও সব কথা শরত্চন্দ্রের নামে বলে,
শিবরামকে বেশী টাকা দেবার দায় এড়িয়ে গিয়েছিলেন   
শিশির ভাদুড়ী সে দিন! মাত্র ১২০ টাকার চেক কেটেই কাজ সেরেছিলেন! অর্থাৎ শরত্চন্দ্র আর শিশির   
ভাদুড়ীর মধ্যে ঠিক কি কথোপকথন হয়েছিল, তা আমরা জানি না এবং আর সম্ভবত জানার উপায়ও নেই।
শিবরাম তাই লিখেছিলেন যা তাঁকে শিশির ভাদুড়ী বলেছিলেন। এই পুরো ঘটনাবলীরর মধ্যে শিশির ভাদুড়ী
আর শরত্চন্দ্রের মধ্যে আসলে কি কথা হয়েছিল সেটাই উহ্য রয়ে গেছে।

১৯। এই অবধি  পড়ে মনে করবেন না যেন, যে আমরা শিশির ভাদুড়ীকে যত নষ্টের গোঁড়া করে দেখাতে  
চাইছি। শিশির ভাদুড়ী জানতেন যে শরত্চন্দ্রের নাট্যরূপেই নাটকটা অভিনীত হচ্ছে। কারণ তাঁর সঙ্গেই   
শরত্চন্দ্রের চুক্তি হয়েছিল এবং তিনি অবশ্যই জানতেন যে অভিনীত নাটকের নাট্যরূপ শিবরামের নয়।   
কারণ তিনি আগেই
শিবরামের লেখা নাট্যরূপ পড়ে ‘ভেরি ক্লেভারলি ডান্’ বলে ফেরত দিয়েছিলেন।  
অভিনীত নাট্যরূপ শিবরামের নয় জেনেও তিনি সেকথা বলে শিবরামকে টাকা দিতে অশ্বীকার না  করে,   
তাঁর ব্যাঙ্কে যা ছিল তা চেক কেটে দিয়ে দেন। তিনি এরকম একজন নাট্যরূপকারকে হারাতে চান নি।  
দুঃখের বিষয় এই যে তিনি শিবরামকে তাঁর এবং শরত্চন্দ্রের মধ্যকার যে কথোপকথনটি শুনিয়েছিলেন  
তার জেরেই
শিবরামের চোখে “শরত্চন্দ্রের মর্মর মূর্তির স্খলন” ঘটেছিল এবং পরবর্তী জীবনে, এর   
ফলস্বরূপ, তাঁর লেখা থেকে শরত্চন্দ্র সম্বন্ধে বহু মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সূত্রপাত হয়েছিল।

উপসংহার -
আজীবন সততা ও মানবিক মূল্যবোধের অজশ্র পরিচয় যাঁর জীবন কথায়  পাওয়া যায় এমন কি যে ব্যক্তি  
একটি মেয়েকে তার মদ্যপ পিতা ও তার মদ্যপ বন্ধুবর্গদের থেকে বাঁচাতে তাকে বিয়ে করতে পিছপা  হন
নি (শরত্চন্দ্রের ১ম বিয়ে শান্তি দেবীর সঙ্গে) তার সম্বন্ধে এরকমের নিষ্ঠুর কথা বলার অভিযোগের   
বিশ্বাসযোগ্যতা কতখানি? শরত্চন্দ্রের জীবিতাবস্থায়, তাঁর অনুমতি ছাড়াই
শিবরাম, দেনা-পাওনার  
নাট্যরূপ দিয়েছিলেন, যা এই কপিরাইটের যুগে আইন-আদালতের আঙিনায় পৌঁছে যাবার যোগ্য। তা সত্বেও
শরত্চন্দ্র ভারতী পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত অর্থ শিবরামের সাথে, সমানভাবে না হলেও, ভাগ করে নিয়েছিলেন।  
সাধারণভাবে দেখলে শরত্চন্দ্রের তরফে শিবরামের সঙ্গে এ নিয়ে আর কোন দেনা-পাওনার কথা  হতেই
পারে না। এরপর তিনি নিজে প্রায় নতুন করে নাট্যরূপটি লিখেছিলেন। দুটি নাট্যরূপ পাশাপাশি  রাখলেই
তা পরিষ্কার বোঝা যায়। তাই তিনি যদি শিশির ভাদুড়ীর কাছে আবার
শিবরামের দাবীর কথা শোনেন,
তাতে রেগে ওঠা বিচিত্র নয়। তবুও আমাদের কাছে, শিশির ভাদুড়ী উবাচে তাঁর মুখে অত ঔদ্ধত্বপূর্ণ কথা
বেমানান লাগছে।

শিশির ভাদুড়ীর সঙ্গে শরতচন্দ্রের ঠিক কি কথা হয়েছিল তাই এই ঘটনাবলীর একমাত্র অজানা তথ্য।   
দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে তা আর জানার উপায় নেই। শরত্চন্দ্রের মুখে এত ঔদ্ধত্বপূর্ণ শ্লেষাত্মক কথা দেখতে
ও শুনতে আমরা অভ্যস্ত নই। তবুও সব জেনে শুনে শিশির ভাদুড়ী
শিবরামকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি।
আমাদের বলতেই হবে এটা তাঁর উদারতারই পরিচয়।

শিবরাম চক্রবর্তী জীবনে অসত পথ অবলম্বন করেছেন, এটা তাঁর শত্রুরাও বলবেন না। অর্থের অপ্রতুলতার
জন্য তাঁর জীবনের অনেক কাজই হয়তো তিনি করে উঠতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু এই ঘটনাবলীর  সময়ে  
তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার অভাব আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। তিনি যদি তাঁর প্রাপ্য অর্থ এবং নাম  দুটোর  
জন্যই ভারতী পত্রিকাকে চেপে ধরতেন, তাহলে তাঁরা হয় বাধ্য হতেন তাঁর নাম নাট্যরূপকার হিসেবে উল্লেখ
করতে, নয়তো তাঁর নাট্যরূপ ছাপানো থেকেই বাদ দেওয়া হতো। তাঁকে এভাবে ভিখারীর মত অপমানিত  
হতে হতো না। শরত্চন্দ্রকেও পুরোটা খেটে নতুন করে ষোড়শীর নাট্যরূপ লিখতে হতো। খোল-নলচে বদলে
নয়।

প্রতিষ্ঠান-বিরোধী এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বললে যেমন অন্যায়ের প্রতিকার হতে পারে তেমনি তার  
ফল ভোগ করার জন্য তৈরীও থাকতে হয়।
শিবরাম সেই কাজটি করার “সাহস” দেখাননি। শুধুমাত্র সামান্য
কিছু টাকার বিনিময়ে তিনিই ওদের “বিরূপ প্রস্তাবে” রাজি হয়ে অর্থ ও নাম দুটোই হারিয়েছেন। পরে এই  
ঘটনার কথা লিখে, (তাও কোনো ঘোষিত আত্মজীবনীতে নয়, আত্মকথা নির্ভর একটি উপন্যাসের মাধ্যমে)  
পাঠকের করুণা পেতে চাওয়ার একটা প্রচ্ছন্ন চেষ্টা কি আমরা এখানে দেখতে পাই?

পরিশেষে, আমাদের বিনম্র নিবেদন যে নতুন তথ্যের আলোকে যদি কোনও সাহিত্য পাঠক বা গবেষক এই
প্রসঙ্গে আমাদের বর্তমান সিদ্ধান্তাদি যুক্তি ও তর্কনিষ্ঠভাবে সংশোধন বা পরিমার্জন করতে চান, তা আমরা
কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করে এখানে সংযোজন করবো।
মিলনসাগরে  আমরা কবি শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই
প্রচেষ্টাকে সার্থক মনে করবো। এই পাতা কবি শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্য্যায়ের প্রতি মিলনসাগরের শ্রদ্ধার্ঘ্য।


কবি শরত্চন্দ্রের পরিচিতির আলেখ্যটি
 কবি রাজেশ দত্ত-র দেওয়া তখ্য সহকারে লিখেছেন
মিলন সেনগুপ্ত। মিলনসাগরে কবি রাজেশ দত্তর কবিতার পাতায় যেতে  
এখানে ক্লিক করুন . . . ।   


কবি শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।   


উত্স -   
  • সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, “শরৎ-পরিচয়” (২য় সংস্করণ ১৯৫৬)।
  • গোপালচন্দ্র রায়, “শরত্চন্দ্র” ১ম ও ২য় খণ্ড, ১৯৬১।
  • গোপালচন্দ্র রায়, “শরত্চন্দ্রের চিঠিপত্র” (প্রকাশকাল অজানা)।
  • গোপালচন্দ্র রায়, “শরৎ-পত্রাবলি”, ২০০০।
  • অমল হোম, “পুরুষোত্তম রবীন্দ্রনাথ”, ১৯৫৫।
  • সৌরেন্দ্রনাথ মিত্র প্রকাশিত “শরৎ-তর্পণ”, ১৯৫৯।
  • নরেন্দ্র দেব, শরৎ-বন্দনা, ১৯৩২।
  • ভারতী পত্রিকার ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের পূজা সংখ্যায়, (অক্টোবর ১৯২৬), শরত্চন্দ্রের নামে “ষোড়শী”।
  • সুকুমার সেন, শরত্চন্দ্রিকা, শরত্সাহিত্যসমগ্র, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৮৫।
  • শিশিরকুমার দাশ, “সংসদ বাংলা সাহিত্য সঙ্গী”, ২০০৩।
  • শিবরাম চক্রবর্তী, “ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা”, ১৯৫৯।
  • সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, “সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান” ১ম খণ্ড, ২০১০।
  • দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায়, “বঙ্গমঞ্চে কথাশিল্পী”, eisamay.indiatimes.com, ২১.০৯,২০১৫।
  • সুশান্ত কর্মকার, “ঔপন্যাসিক যখন নাট্যকার :: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়”, সাকসেস বাংলা ওয়েবসাইট
  • শিবরাম চক্রবর্তীকে নিয়ে “চকরবর্ তি”, আনন্দবাজার পত্রিকা ওয়েবসাইট
  • তপন মল্লিক চৌধুরী,  “রবিবারের পড়া: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সংগীতজ্ঞান” প্রবন্ধ, খবর
    অনলাইন ওয়েবসাইট     
  • বসিরুল আমিন, “কে আসল কে নকল?”, প্রথমআলো ওয়েবসাইট



কবি শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।   




আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ১২.১০.২০১৯।



...
শরত্চন্দ্রের শিক্ষাজীবন   
শরত্চন্দ্রের নিরুদ্দেশ যাত্রা   
শরতচন্দ্রের বেনামে কুন্তলীন পুরস্কার লাভ   
কুন্তলীন পুরস্কার নিয়ে দুটি কথা   
শরত্চন্দ্রের রেঙ্গুন যাত্রা   
শরত্চন্দ্রের বিবাহ ও সন্তান   
শরত্চন্দ্রের রাজনৈতিক জীবন ও মতাদর্শ   
শরত্চন্দ্রের রবীন্দ্রনাথ    
রবীন্দ্রনাথের নাইট-উপাধি বর্জনে শরত্চন্দ্র   
শরত্চন্দ্রের প্রয়াণে রবীন্দ্রনাথের বাণী ও কবিতা    
আসল ও নকল শরত্চন্দ্র   
শরত্চন্দ্রের কবিতা   
ষোড়শী-তে শরত্চন্দ্রের গান নিয়ে দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা  
ষোড়শী নাটকের নাট্যরূপ নিয়ে একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক   
শরৎ ও বঙ্কিমের কবিতা নিয়ে সুকুমার সেনের উদ্ধৃতির প্রতিবাদ  
শরত্চন্দ্রের উপন্যাসের কবিত্ব নিয়ে অজয়কুমার ঘোষের উদ্দৃতি   
শরত্চন্দ্রের রচনাসম্ভার     
কবি শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় -
জন্মগ্রহণ করেন হুগলি জেলায়, সরস্বতী নদীর
তীরে  অবস্থিত  দেবানন্দপুর গ্রামে।  প্রাচীন
বঙ্গালার রাজধানী সপ্তগ্রামের সাতটি মৌজার
মধ্যে  দেবানন্দপুর   ছিল   একটি।   পিতা
মতিলাল   চট্টোপাধ্যায়   ছিলেন   বেহিসাবী,
আত্মভোলা,  স্বপ্নবিলাসী, কাজকর্মে উদাসীন
ও  চঞ্চল   প্রকৃতির  মানুষ।  তিনি  ছিলেন
একজন   শিল্পী  ও  সাহিত্যিক  কিন্তু  কোন
রচনাই   তিনি  সমাপ্ত  করে   রেখে  যেতে
পারেন নি। মাতা ভুবনমোহিনী দেবী।

দেবানন্দপুরে   ছিল   শরত্চন্দ্রের   পিতা
মতিলালের  মাতুলালয় ।  তাঁদের  পৈতৃক
বাসভূমি  ছিল  ২৪ পরগণা  জেলার
কাঁচড়াপাড়ার কাছে মামুদপুর গ্রামে।
*
শরত্চন্দ্রের শিক্ষাজীবন -                                                                পাতার উপরে . . .  
শরত্চন্দ্রের শিক্ষাজীবন শুরু হয় দেবানন্দপুর গ্রামের প্যারী পণ্ডিতের পাঠশালায়। সেখানে তাঁর চেয়ে বছর
দুয়েকের ছোট একটি মেয়ে তাঁকে যখন বৈঁচি ফল পাকত, তা দিয়ে মালা গেঁথে শরত্চন্দ্রকে উপহার দিত।
এরপর তাঁকে পিতা মতিলাল, প্যারী পণ্ডিতের পাঠশালা থেকে তুলে এনে দেবানন্দপুরেরই সিদ্ধেশ্বর  
মাস্টারের স্কুলে ভর্তি করে দেন। সেখানে তিনি এক বছর পড়েন। এ সময়ে, কবির সাত-আট বছর বয়সে,
তাঁরা সপরিবারে পিতার, বিহারের ডিহিরির চাকরিক্ষেত্রে চলে যান। সেখান থেকে পিতার চাকরির শেষে,
বছর দুয়েক পরে শরত্চন্দ্র, সপরিবারে, ভাগলপুরে তাঁর মামাবাড়ীতে চলে আসেন। এখানকার তেজনারায়ন
জুবিলি কলেজ থেকে তিনি ১৮৯৪খৃষ্টাব্দে প্রবেশিকা বা এন্ট্রান্স পরীক্ষা অর্থাত স্কুল ফাইনাল পাশ করেন  
(মতান্তরে তিনি এফ.এ. পরীক্ষায় বসতে পারেন নি)।
মতিলালের পিতা জমিদারের বিরুদ্ধাচরণ করার ফলে খুন হন। তারপরে মতিলালের মাতা, সন্তানদের নিয়ে
দেবানন্দপুরে তাঁর পিত্রালয়ে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। শরত্চন্দ্রের জীবিত তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে,
অনিলা দেবী ছিলেন জ্যেষ্ঠা। শরত্চন্দ্র ছিলেন মেজ, পরের দু ভাই প্রভাসচন্দ্র ও প্রকাশচন্দ্র। ছোট বোন
সুশীলা দেবী । তাঁরা সবাই তাঁদের মাতুলালয়ে মানুষ হন।
*
শরত্চন্দ্রের নিরুদ্দেশ যাত্রা -                                                              পাতার উপরে . . .  
১৯০১ সালের জুলাই মাসের পরে কোন এক সময় তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান, এফ.এ. পরীক্ষার ফিস যোগাড় না
করতে পেরে। এই সময়ে তিনি নাকি কিছুকাল সন্ন্যাসী বেশে দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। এমনকি নাগা  
সন্ন্যাসীদের দলের সাথেও ঘুরেছেন।

এর পূর্বেও তিনি আরও দুইবার এরকম ভাবে নিরুদ্দেশ হয় গিয়েছিলেন। একবার পিতা মতিলাল  
চট্টোপাধ্যায়ের তিরস্কার খাওয়ার পরে এবং আরেক বার ভাগলপুরেই, তাঁর মামার বাড়ীর জগদ্ধাত্রী পূজায়
নিমন্ত্রিতদের খাওয়ানোর সময়ে অতিথিরা তাঁর হাতের করা পরিবেশনে খেতে আস্বীকার করেছিলেন কারণ
শরত্চন্দ্র উদারমনা, বিলাত ফেরৎ, রাজা শিবচন্দ্রের বাড়ীতে যেতেন বলে।
*
কুন্তলীন পুরস্কার নিয়ে দুটি কথা -                                                       পাতার উপরে . . .  
১৯৬১ সালে প্রকাশিত, গোপালচন্দ্র রায় তাঁর “শরত্চন্দ্র” ১ম খণ্ডের ৬০-পৃষ্ঠায় “কুন্তলীন পুরস্কার” নিয়ে
লিখেছেন . . .
কলকাতায় তখন এইচ্, বসু নামে একজন পারফিউমার বা গন্ধ তৈলাদির ব্যাবসায়ী ছিলেন! তাঁর দোকান
ছিল বহুবাজারে, বর্তমান বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রীট ও চিত্তরঞ্জন এভিনিউ-এর সংযোগস্থলের নিকটে।

এই এইচ্, বসু কুন্তলীন তৈল নামে একটি কেশ তৈরি করে বিক্রি করতেন। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি
বত্সর ছোট গল্পের এক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কুন্তলীন পুরস্কার নামে এক পুরস্কার দেওয়া ব্যবস্থা
করেছিলেন। ঐ গল্প-প্রতিযোগিতার মূল বিষয়টি ছিল এই যে, গল্পের ভিতর দিয়ে কৌশলে কুন্তলীন তেলের
প্রচার করতে হবে, অথচ প্রত্যক্ষভাবে সেটা যে না কুন্তলীন তেলের বিজ্ঞাপন হয়ে দাঁড়ায়।

এই প্রতিযোগিতায় যে সব গল্প আসত, সেগুলির মধ্যে যেটি শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হত, সেই গল্পের লেখককে
কুন্তলীন পুরস্কার হিসেবে পঁচিশ টাকা পুরস্কার দেওয়া হ’ত। সাধারণতঃ কোন একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের
উপরই ঐ গল্পগুলি পড়ে বিচার করার ভার থাকত। কুন্তলীন পুরস্কার প্রতিযোগীতায় যে সব গল্প আসত,
সেগুলিকে নিয়ে এইচ্ বসু প্রতি বত্সর একটি করে কুন্তলীন পুস্তকও বার করতেন
।”

আমরা এর সাথে যোগ করতে চাই যে, “কুন্তলীন পুরস্কার”-টি কবিতার জন্যও দেওয়া হতো। মিলনসাগরে
তেমন কবির কবিতাও রয়েছে যাঁরা কবিতার জন্য কুন্তলীন পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁরা অনেকেই  
পরবর্তীতে খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক হয়েছিলেন। এইচ বসুর পুরো নাম ছিল হেমেন্দ্রমোহন বসু। তিনি
ছিলেন আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসুর বন্ধু ও সহপাঠী। তিনি বাঙালীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর ব্যাবসায়ের অগ্র-
পথিক ছিলেন। বাংলায় সাইকেল, মোটরগাড়ী ও অন্যান্য ব্যাবসার তিনি পথিকৃত।

১৯৬২ সালে প্রকাশিত বাবিদবরণ ঘোষ সম্পাদিত “কুন্তলীন গল্প-শতক” গল্প-সংকলনের ভূমিকাটি কুন্তলীন
পুরস্কার ও তাঁর প্রবর্তক এইচ বোস বা হেমেন্দ্রমোহন বসু সম্বন্ধে প্রামাণিক তথ্য-সমৃদ্ধ একটি প্রবন্ধ। এ
নিয়ে আমাদের, মিলনসাগরে, ভবিষ্যতে একটি বিস্তারিত আলেখ্য প্রকাশ করার ইচ্ছা রইল।
*
শরত্চন্দ্রের রেঙ্গুন যাত্রা -                                                                পাতার উপরে . . .  
১৯৬১ সালে প্রকাশিত, গোপালচন্দ্র রায় তাঁর “শরত্চন্দ্র” ১ম খণ্ড থেকে জানা যায় যে, শরত্চন্দ্রের বড় দিদি
অনিলা দেবীর আগেই বিবাহ হয়ে গিয়েছিল। ভাগলপুরের খঞ্জরপুরের যে বাসায় ভাড়া থাকতেন সেই বাড়ীর
মালিক শরত্চন্দ্রের ছোট বোন সুশীলা দেবীর সমস্ত ভার গ্রহণ করলেন। আসানসোলে শরত্চন্দ্রের এক   
আত্মীয়ের কাছে মেজ ভাই প্রভাসচন্দ্রকে রেখে, ছোটভাই প্রকাশচন্দ্রকে জলপাইগুড়িতে সুরেন্দ্রনাথ  
গঙ্গোপাধ্যায়ের (শরত্চন্দ্রের এক মামা) বাবার কাছে রেখে তিনি কলকাতায় চলে এসে এক মামা লালমোহন
গঙ্গোপাধ্যায়ের ভবানীপুরের কাঁসারিপাড়া রোডে থাকার জায়গা পেলেন।

১৯০৩ সালের জানুয়ারী মাসের এক রাত্রে তিনি কলকাতা থেকে রেঙ্গুন যাবার জাহাজে চাপেন। তাঁকে সেই
রাত্রে জাহাজে তুলে দিতে এসেছিলেন তাঁর এক মামা উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। রেঙ্গুনে পৌঁছে,  প্লেগের
কারণে জাহাজের ডেক-যাত্রীদের ৭দিন ক্যোয়রান্টিনে রেখে ছাড়া হয়। তিনি গিয়ে ওঠেন প্রথমে এক   
উড়িয়া  ব্রাহ্মণের হেটেলে এবং সেখান থেকে তাঁর এক মেসোমশায় অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ীতে  
যিনি রেঙ্গুনের একজন বিখ্যাত অ্যাডভোকেট ছিলেন। তাঁর কাছে থাকতে পেয়ে এবং তিনি বর্মী ভাষা ও  
ওকালতি পড়া শুরু করেছিলেন। এরই মধ্যে তিনি বর্মা রেলে একটি চাকরিও পেয়ে গিয়েছিলেন।  তিনি   
বর্মায়  একাধিক চাকরি করেছেন। তাঁর বর্মার জীবন নিয়ে বহু গল্প ও কথা প্রচলিত রয়েছে। তিনি যে   
সেখানে এক পরোপকারী  জীবন কাটিয়েছিলেন তার ভুরি ভুরি সাক্ষ্য  রয়েছে সেই সব গল্প-উপাখ্যান-
চিঠিপত্রের মধ্যে।

১৯১৬ সালের ১১ই এপ্রিল তিনি সেখানকার চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে, বরাবরের জন্য রেঙ্গুন ত্যাগ করে
কলকাতায় চলে আসেন।
*
*
শরত্চন্দ্রের রাজনৈতিক জীবন ও মতাদর্শ -                                           পাতার উপরে . . .  
১৯২১ সালে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সারা দিয়ে শরত্চন্দ্র রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশ করে
কংগ্রেস দলে যোগদান করলেন।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের “নারায়ণ” পত্রিকাতে লেখা দেবার সুবাদে তাঁদের
পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা পূর্বেই ছিল। এবার এই খ্যাতনামা সাহিত্যিককে দলে পেয়ে দেশবন্ধু তাঁকে হাওড়া জেলা
কংগ্রেসের সভাপতি করে দেন। কংগ্রেসের পদাধিকারী হিসেবে তিনি দলের সব কর্মসূচী পালন করতেন।
দেশবন্ধুর মন্ত্রশিষ্য সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন তাঁর বন্ধুস্থানীয়। ১৯২২ সালের জুলাই মাসে তিনি হাওড়া কংগ্রেস
সভাপতির পদে ইস্তফা দেন।
দেশবন্ধু অল্প দিনের মধ্যেই শরত্চন্দ্রকে পুনরায় ঐ পদে বহাল করেন।  
এরপরে তিনি আর পদত্যাগ করেন নি। তখন থেকে একটানা প্রায় ১০বছর তিনি হাওড়া  কংগ্রেসের
সভাপতি ছিলেন।

আমরা শরত্চন্দ্রের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে তথ্য পেয়েছি ১৯৬১ সালে প্রকাশিত গোপালচন্দ্র রায়ের  
“শরত্চন্দ্র” গ্রন্থ থেকে।

জানা যাচ্ছে যে যখন শরত্চন্দ্র রাজনীতিতে যোগ দেন তখন কয়েকজন সাহিত্যিক তাঁকে বলেছিলেন যে এ
কাজ করে তিনি ভাল করেন নি। তিনি একজন সাহিত্যিক, সাহিত্য ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া তাঁর
পক্ষে ঠিক হয়নি। “শরত্চন্দ্র” গ্রন্থের ১৬৮-পৃষ্ঠায় রয়েছে যে এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন . . .

এটা তোমাদের ভুল ; রাজনীতির আলোচনায় যোগ দেওয়া প্রত্যেক দেশবাসীরই অবশ্য কর্তব্য বোলে আমি
মনে করি। বিশেষতঃ আমাদের দেশ হ’ল পরাধীন দেশ, এ দেশের রাজনীতিক আন্দোলন  প্রধানতঃ  
স্বাধীনতার আন্দোলন, মুক্তির আন্দোলন! এ আন্দোলনে তো সাহিত্যসেবীদেরই তো সর্বাগ্রে এসে যোগ দেওয়া
উচিত। কারণ জাতিগঠন ও লোকমত সৃষ্টির গুরুভার পৃথিবীর সর্বদেশে সাহিত্যিকদের উপরই ন্যস্ত। যুগে
যুগে মানুষের মনে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলেন তাঁরাই। তোমাদের নির্দেশমত সাহিত্যিকরা যদি  
বলেন---আমি সাহিত্যিক সাহিত্য নিয়েই থাকবো, রাজনীতিতে যোগ দেব না, তাহলে উকিল-ব্যারিস্টাররাও
তো বলতে পারেন---আমরা আইন-ব্যবসায়ী, মামলা-মোকর্দমা নিয়েই থাকবো, রাজনীতিতে যোগ দেব না।
ছেলেরা বলবে---আমরা ছাত্র, পড়াশুনা নিয়েই থাকবো, রাজনীতির মধ্যে যাব না ; তাহলে রাজনীতিটা করবে
কারা শুনি
?”

শরত্চন্দ্র চাইতেন নারীরাও স্বাধীনতা আন্দোলনে সমানভাবে অংশ গ্রহণ করুক। তাঁর "স্বরাজ সাধনায় নারী"
প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন . . .
আজ যাঁরা স্বরাজ পাবার জন্য মাথা খুঁড়ে মরছেন---আমিও তাঁদের একজন। কিন্তু আমার অন্তর্যামী  
কিছুতেই আমাকে ভরসা দিচ্ছে না। কোথায় কোন অলক্ষ্যে থেকে যেন তিনি প্রতি মুহূর্তেই আভাষ দিচ্ছেন,
এ হবার নয়। যে চেষ্টায়, যে আয়োজনে দেশের মেয়েদের যোগ নেই, সহানুভূতি নেই, এই সত্য উপলব্ধি  
করার কোন জ্ঞান, কোন শিক্ষা, কোন সাহস আজ পর্যন্ত দিই নি, তাদের কেবল গৃহেক অবরোধে বসিয়ে,  
শুদ্ধমাত্র চরকা কাটতে বাধ্য করেই এত বড় বস্তু লাভ করা যাবে না। মেয়ে-মানুষকে আমরা যে শুধু মেয়ে
করেই রেখেছি, মানুষ হতে দিইনি, স্বরাজের আগে তার প্রায়শ্চিত্ত দেশের হওয়া চাই-ই
।” . . "

বাংলার কংগ্রেসের নেতা শীর্ষনেতা দেশবন্ধুর মৃত্যুর পরে শরত্চন্দ্র বলেছিলেন . . .
আমরা করিতাম দেসবন্ধুর কাজ। আজ তিনি নাই, তাই থাকিয়া থাকিয়া মনে হইতেছে, কি হইবে আর  
কাজ করিয়া? তাঁহার সব আদেশই কি আমাদের মনঃপুত হইত? হায় রে, রাগ করিবার, অভিমান করিবার
জায়গাও আমাদের ঘুচিয়া গেছে
।”

দলের একাগ্র সৈনিক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর অনেক বিষয়েই নিজস্ব মতামত ছিল। তিনি কংগ্রেসের পক্ষ থেকে
খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করার বিনিময়ে মুসলমানদের কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন  
করাবার যে চুক্তি হয়েছিল তা তিনি সমর্থন করেন নি। তাঁর এই মত ছিল যে এরকম দেওয়া নেওয়ার থেকে
ভালো হবে যদি মুসলমানরা নিজের আগ্রহে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেন।

তিনি গান্ধীজীর নীতি অনুসারে কংগ্রেসে  যোগদান করার পরে তিনি  বহুদিন নিয়মিত চরকা কেটেছিলেন
এবং খদ্দর পড়েছিলেন। কিন্তু পরে তাঁর মনে হয় যে চরকা এ যুগে অচল। বদলে কাপড়ের কল তৈরী হোক।
এ সম্বন্ধে তিনি লিখেছিলেন, “
কাঠের চরকা দিয়ে লোহার কলকে হারানো যায় না!”

কংগ্রেসে যোগ দেবার পরে তিনি ভেবেছিলেন যে
রবীন্দ্রনাথকে যদি কংগ্রেসে যোগদান করানো যায়। যদি
নাও যায় অন্ততঃ তাঁকে দিয়ে অসহযোগ আন্দেলন সমর্থন করানো এবং শান্তিনিকেতনে চরকা ও খদ্দরের
প্রচলন করানো। অসহযোগ আন্দোলন শুরু করার সময়ে রবীন্দ্রনাথ ইউরোপে চিলেন। তিনি বিদেশ থেকে
ফিরলে শরত্চন্দ্র তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁর প্রস্তাব নিবেদন করেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই অনুরোধ রক্ষা  
করতে পারেন নি। তাতে শরত্চন্দ্র রাগ করেই ফিরে এসেছিলেন।
*
শরত্চন্দ্রের রবীন্দ্রনাথ -                                                                   পাতার উপরে . . .  
মার্চ ১৯৬১ তে প্রকাশিত, গোপালচন্দ্র রায়ের “শরত্চন্দ্র” ২য় খণ্ডের গ্রন্থের ৫-পৃষ্ঠায় “রবীন্দ্রনাথ” অধ্যায়ে
রয়েছে যে
রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একবার শরত্চন্দ্রের এক বন্ধু তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে ---আপনার লেখা
তবুও বুঝা যায়, কিন্তু রবিবাবুর লেখা কিছু বুঝা যায় না। তার উত্তরে শরত্চন্দ্র বলেছিলেন ---আমি বই  
লিখি আপনাদের জন্যে, আর তিনি বই লেখেন আমাদের জন্যে।
*
রবীন্দ্রনাথের নাইট-উপাধি বর্জনে শরত্চন্দ্র -                                          পাতার উপরে . . .  
১৩ই আগস্ট ১৯১৯ তারিখে শিখ উত্সব  বৈশাখীর দিনে,  সংঘটিত হয়  কুখ্যাত  জালিয়ানওয়ালা বাগ
গণহত্যা। এর প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাইটহুড বর্জন করেন। তার পরপরই লাহোর থেকে প্রকাশিত  
“ট্রিবিউন” পত্রিকার তত্কালীন সম্পাদক অমল হোমকে এই প্রসঙ্গে শরত্চন্দ্র একটি চিঠি লিখেছিলেন।  
চিঠিতে শরত্চন্দ্রের দেশভক্তি এবং
রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা পুরোমাত্রায় বোঝা যায়। অমল হোমের, ২২শে
শ্রাবণ ১৩৬২-এ (আগস্ট ১৯৫৫) প্রকাশিত, “পুরুষোত্তম রবীন্দ্রনাথ” গ্রন্থের ৭৭-পৃষ্ঠায় সেই চিঠিটা প্রকাশিত
হয়। আমরা চিঠির পুরোটাই এখানে তুলে দিচ্ছি কারণ কিছুই বাদ দেওয়া সমীচীন মনে হচ্ছে না।

১৮ই আগস্ট ১৯১৯ তারিখের লেখা সেই চিঠিতে শরত্চন্দ্র লিখেছিলেন। . . .

.                                                                           
বাজে শিবপুর - হাওড়া
.                                                                        ১৬-৮-১৯
পরম কল্যাণীয়েষু,
.        অমল, ভারতীর আড্ডায় সেদিন শুনলাম তোমারও নাকি খুব ফাঁড়া গিয়েছে। ইংরেজের  মারমূর্ত্তি
খুব কাছে থেকেই দেখে নিলে ভাল ক’রে। এ একটা কম লাভ নয়। আমাদের মোহ কাটাবার কাজে এরও
প্রয়োজন ছিল। দরকার মনে করলেই ওরা যে কত নিষ্ঠুর, কতটা পশু হতে পারে. তা ইতিহাসের পাতাতেই
জানা ছিল এতদিন---এবার প্রত্যক্ষ জ্ঞান হোলো।

.        আর এক লাভ---দেশের বেদনার মধ্যে আমরা নতুন করে পেলাম রবিবাবুকে। এবার একা তিনিই
আমাদের মুখ রেখেছেন।
.        নারায়ণের সময় সি আর দাশ একদিন আমাকে বলেছিলেন যে, রবিবাবু যখন নাইটহুড নেন, তখন
নাকি দাশ-সাহেব কেঁদেছিলেন। এখন একবার তাঁর দেখা পেলে জিজ্ঞাসা করতাম, আজ আমাদের বুক দশ
হাত কি না বলুন।
.        তোমার কাদজের নামই শুনেছি---কখনো চোখে দেখিনি। পাঠিও না দু’একখানা। তোমার এডিটর ত
এখন জেলে। চালাও জোরসে। তোমার নাম-ডাক এখান থেকে শুনেই আমরা খুশী হই। আমার স্নেহাশীর্ব্বাদ
জেনো। ইতি---
.                                                                                               আশীর্ব্বাদক
.                                                                                       শ্রীশরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
*
শরত্চন্দ্রের প্রয়াণে রবীন্দ্রনাথের বাণী ও কবিতা -                                  পাতার উপরে . . .  
শরত্চন্দ্রের শেষ ক’বছর নানা শরীরিক অসুস্থতার কারনে ভাল কাটেনি। সামতাবেড়ের গ্রামের বাড়ী থেকে
তাঁকে তাঁর কলকাতার বাড়ীতে আনা হয়। ডাক্তাররা এক্সরে করে জানলেন যে তাঁর যকৃতে ক্যানসার  
হয়েছিল। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের কথামতো তাঁর যকৃতের অপারেশন করা হয় এবং তিনি একটি সুস্থ হয়েও
অবস্থার অবনতির হয়ে ১৬ই জানুয়ারী ১৯৩৮ এ, ৪নং ভিক্টোরিয়া টেরাসে অবস্থিত পার্ক নার্সিং হোমে  
তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।  

শরত্চন্দ্রের নার্সিং হোমে ভর্তি হবার খবর পেয়েই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে আরোগ্য-কামনা করে চিঠি লিখেছিলেন।
২০০০ সালে গোপালচন্দ্র রায়ের “শরৎ-পত্রাবলি” গ্রন্থের ৫১৯-পৃষ্ঠায়, শরত্চন্দ্রের প্রয়াণে
রবীন্দ্রনাথের   
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বয়ান এবং একটি কবিতার উল্লেখ রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে শরত্চন্দ্রের মৃত্যসংবাদ শুনে ইউনাইটেড প্রেসের প্রতিনিধিকে বলেন :

যিনি বাঙালি জীবনের আনন্দ ও বেদনাকে একান্ত সহানুভূতি দ্বারা চিত্রিত করেছেন, আধুনিক কালের সেই
প্রিয়তম লেখকের মহাপ্রয়াণে দেশবাসীর সঙ্গে আমিও গভীর মর্মবেদনা অনুভব করছি।

পরে শরত্চন্দ্রের শ্রাদ্ধ বাসরের দিন ১২ মাঘ তারিখে কবি আবার শরত্চন্দ্রের মৃত্যু সম্পর্কে এই কবিতাটি
লিখেছিলেন :

যাহার অমর স্থান প্রেমের আসনে
ক্ষতি তার ক্ষতি নয় মৃত্যুর শাসনে।
দেশের মাটির থেকে নিল যারে হরি।
দেশের হৃদয় তারে রাখিয়াছে বরি
।”
*
আসল ও নকল শরত্চন্দ্র -                                                                 পাতার উপরে . . .  
১৯২২-২৪ সাল নাগাদ যখন শরত্চন্দ্র, সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছেন এবং তাঁর লেখা বই সম্ভবত
সর্বাধিক বিক্রী হচ্ছে এবং তিনি ততদিনে প্রচণ্ড জনপ্রিয়তাও অর্জন করে ফেলেছেন, সেই সময় আরেকজন
শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটেছিল ঔপন্যাসিক হিসেবে। ইনি ছিলেন “গল্পলহরী” পত্রিকার সম্পাদক
শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। না ইনি কোনও রকমে নিজের নাম ভাঁড়িয়ে এ কাজ করেন নি। তাঁরও পিতৃদত্ত নাম
ছিল শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়! তিনি ছিলেন এই কবি শরত্চন্দেরর থেকে ৯বছরের ছোট। তাঁর “চাঁদমুখ”  
(১৯২২), “শুভলগ্ন” (১৯২৩), “মুখরক্ষা” (১৯২৪), “সুপ্রভাত” (১৯৩৪) প্রভৃতি নামের উপন্যাস  শ্রীকান্তের  
রচয়িতা শরত্চন্দ্রের নামে বিক্রী হতে শুরু করেছিল। এর পর দুই শরত্চন্দ্রের মধ্যে রফা হয় যে তাঁদের  
বইয়ে তাঁদের নিজেদের ছবি দিতে হবে। তার পরে আর পাঠকরা বিভ্রান্ত হন নি। তবে প্রথমআলো  
ওয়েবসাইটে, বসিরুল আমিন তাঁর “কে আসল কে নকল?” প্রবন্ধে বিমল মিত্র, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও
শরত্চন্দ্রের আসল ও নকল নিয়ে লিখেছেন যে শরত্চন্দ্রকে তাঁর সাধের দাঁড়ি কেটে ফেলতে হয়েছিল কারণ
“গল্পলহরী” পত্রিকার সম্পাদক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দাঁড়ি ছিল। তিনিই আগে তাঁর উপন্যাসে নিজের ছবি
ছাপিয়েছিলেন! প্রথমআলো ওয়েবসাইটে, বসিরুল আমিনের “কে আসল কে নকল?” প্রবন্ধটি পড়তে
এখানে
ক্লিক করুন . . .
*
শরত্চন্দ্রের কবিতা -                                                                পাতার উপরে . . .  
শরত্চন্দ্রের চিঠিপত্রে পাওয়া বা অন্যের জবানীতে ও স্মৃতিচারণে তাঁর রচিত কয়েকটি ছড়ার খবর পেলেও,
তিনি নিজে কোনও গান বা কবিতা লিখেছিলেন কি না তা নিয়ে খুব সামান্য লেখালেখি চোখে পড়েছে।
আসলে শরৎচন্দ্রের লেখা নিয়ে লিখতে গেলে তাঁর গদ্য-সাহিত্যের মহাসাগরে পদ্যের কথা ওঠেইনা।  এমন
কি বিশিষ্ট বিদগ্ধজনেরাও ধরেই নিয়েছিলেন যে শরর্ত্চন্দ্র কোনও কবিতা লেখেন নি।

শরত্চন্দ্রের দূরসম্পর্কীয় মামা সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, তাঁর “শরৎ-পরিচয়” গ্রন্থের (২য় সংস্করণ ১৯৫৬)
১৪৩-পৃষ্ঠায় (প্রকাশকাল অজানা) লিখেছেন যে তাঁর প্রিয় কুকুরছানা মারা গেলে শরত্চন্দ্র একটি ইংরেজীতে
কবিতা লিখেছিলেন (মিলনসাগরে তা সংগ্রহ করা হয়েছে)। এবং তিনি বাংলাতেও কবিতা লিখতেন।

গোপালচন্দ্র রায় সম্পাদিত “শরত্চন্দ্রের চিঠিপত্র” গ্রন্থের ৯৪-৯৫ পৃষ্ঠায়, শরত্চন্দ্রের রেঙ্গুন থেকে, জানুয়ারী
১৯১৩-তে, “যমুনা” পত্রিকার সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ পালকে লেখা এক পত্রে লিখেছেন . . .

আবশ্যক হ’লে গল্প আমি ঢের লিখতে পারি---আপনার কাগজ ত এক ফোঁটা, ও-রকম ৩|৪ গুণ কাগজও   
একলা ভ’রে দিতে পারি। তা ছাড়া আমার একটা সুবিধে আছে। গল্প ছাড়া সমস্ত রকম
subject নিয়েই  
প্রবন্ধ লিখতে পারি, তা যদি আপনার আবশ্যক থাকে লিখবেন। যে কোন
subject---তাতেই আমি স্বীকার  
আছি। . . . আগেই বলেছি আমি শুধু গল্পই লিখি নে। সব রকমই পারি, শুধু পদ্য পারি নে
।”

শরত্চন্দ্রের এই উক্তিতে থেমে গেলে আমাদের চলবে না! কারণ উপরোক্ত ঐ চিঠির ১১বছর পর, ১৩৩০
বঙ্গাব্দের ২রা মাঘ তারিখে (জানুয়ারী ১৯২৪) তাঁকে দেখা যাচ্ছে তাঁর “দেনা-পাওনা” উপন্যাসের নাট্যরূপ  
“ষোড়শী”-র জন্য
রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে গান না পেয়ে দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি লিখতে। ষোড়শীর জন্য গান
লিখে দেবার অনুরোধ জানিয়ে লেখা পত্রটি আমরা পাই নি। এই দুঃখ প্রকাশ করে লেখা চিঠিটি আমরা  
পেয়েছি গোপালচন্দ্র রায়ের “শরত্চন্দ্রের চিঠিপত্র” গ্রন্থের ১৭৯-পৃষ্ঠায়। চিঠিটি আমরা এখানে পূর্ণরূপে উদ্ধৃত
করছি। কারণ এই চিঠির বয়ান শরত্চন্দ্রের কবিতা বা গান লেখা-না লেখার প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়!  . . .

.                                                                                
বাজে শিবপুর
.                                                                                ২রা মাঘ ১৩৩০
শ্রীচরণেষু,
সহস্র প্রকার কাজের মধ্যে সম্প্রতি আপনার যে কিছুমাত্র অবকাশ নেই, সে আমরা সকলেই জানি। তবুও
আমি এই ভেবে লিখেছিলাম যে গান আপনার কাছে কথা কহার মতই সহজ, অথচ, একমাত্র এর জোরেই  
আমার নাটকের সব ত্রুটি ঢেকে যেতো।

সত্যেন্দ্র (কবি সত্যান্দ্রনাথ দত্ত) বেঁচে থাকলে আপনার এই চিঠিখানি দেখিয়ে আজ তার কাছ থেকে   
অনায়াসে গান আদায় ক’রে আনতে পারতাম। এ চিঠি তার কাছে প্রায় আদেশের মত হোতো। কিন্তু সে
পরলোকে এবং আর কেউ নেই যে গিয়ে বলি।

কলকাতায় এসে আপনার নিঃশ্বাস নেবার সময় থাকে না। তখন এই নিয়ে উত্পাত করতে আমি পেরে
উঠ্ ব না। আমার শত কোটী প্রণাম গ্রহণ করবেন। ইতি --- সেবক শ্রীশরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


চিঠিটি থেকে পরিস্কার বোঝা যায় যে শরত্চন্দ্র মনে করেছিলেন যে তাঁর নাটকের জন্য শুধুমাত্র
রবীন্দ্রনাথ
অথবা  
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত গান লিখে দিলে, তাঁর নাটকের প্রতি সুবিচার করা হবে। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত   
পরলোকে।  তাই তিনি
রবীন্দ্রনাথকেই গান লিখে দিতে অনুরোধ করেন। রবীন্দ্রনাথের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি
দেখে তিনি  খুব হতাশ হয়েছিলেন। তাই ষোড়শীর জন্য অন্যকাউকে না দিয়ে, নিজেই গান লিখেছিলেন বলে
আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
*
ষোড়শী-র জন্য শরত্চন্দ্রের গান নিয়ে দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা -  পাতার উপরে . . .  
নাট্যসংগীতের বিদগ্ধ গবেষক, সংগ্রাহক এবং শিল্পী দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২১.০৯.২০১৫ তারিখে লেখা,
eisamay.indiatimes.com-এ  “বঙ্গমঞ্চে কথাশিল্পী”  প্রবন্ধে তিনিও উপরোক্ত চিঠিটিই উদ্ধৃত করে মনে   
করেছেন যে ষোড়শীর গানগুলি শরত্চন্দ্রেই লেখা। সেই চিঠির ৩য় প্যারাগ্রাফ থেকে শুরু করে তাঁর বিদগ্ধ
মতামতটি আমরা এখানে তুলে দিলাম . . .

“ . . .
সত্যেন্দ্র (নাথ দত্ত) বেঁচে থাকলে আপনার এই চিঠিখানি দেখিয়ে আজ তার কাছ থেকে অনায়াসে গান
আদায় করে আনতে পারতাম। এ চিঠি তার কাছে প্রায় আদেশের মত হতো। কিন্তু সে পরলোকে  এবং  
আর কেউ নেই যে গিয়ে বলি
।…’

তাই মঞ্চের গানের জন্য কলম ধরেন নিজেই। উপন্যাসের সংযোজক সে গান গায় ভিক্ষুক- ‘তোর পাওয়ার
সময় ছিল যখন, ওরে অবোধ মন / মরণ খেলার নেশায়মেতে রইলি অচেতন। / তখন ছিল মণি, ছিল মাণিক
পথের ধারে ধারে- / এখন ডুবল তারা দিনের শেষে বিষম অন্ধকারে।”
দেবজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের  এই  প্রবন্ধটি পড়তে
এখানে ক্লিক করুন . . .
*
*
শরত্চন্দ্রের রচনা সম্ভার -                                                                 পাতার উপরে . . .  
শরত্চন্দ্রের প্রথম মুদ্রিত রচনা “মন্দির” (১৯০২)। গল্পটি সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে কুন্তলীন পুরস্কারে
ভূষিত হয়। ১৩১৪ বঙ্গাব্দের ভারতী পত্রিকার বৈশাখ-আষাঢ় সংখ্যায় তাঁর “বড়দিদি” গল্পটি প্রকাশিত হবার
পরে তিনি সাহিত্য-রসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি মূলত ঔপন্যাসিক ও গল্পকার। তাঁর নিজের নামে
প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ “বড়দিদি” (১৯১৩)। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, “বিরাজবৌ” (১৯১৪), ৩টি গল্প “বিন্দুর
ছেলে”, “রামের সুমতি” ও “পথ-নির্দেশ” (১৯১৪), “পরিণীতা” (১৯১৪), “পণ্ডিতমশাই” (১৯১৪), “মেজদিদি”  
(১৯১৫), “পল্লীসমাজ” (১৯১৬), “চন্দ্রনাথ” (১৯১৬), “বৈকুণ্ঠের উইল” (১৯১৬), “অরক্ষণীয়া” (১৯১৬), “শ্রীকান্ত”  
(১ম খণ্ড ১৯১৭, ২য় খণ্ড ১৯১৮, ৩য় খণ্ড ১৯২৭, ৪র্থ খণ্ড ১৯৩৩), “দেবদাস” (১৯১৭), “নিষ্কৃতি” (১৯১৭),
“কাশীনাথ” (১৯১৭), “চরিত্রহীন” (১৯১৭), “দত্তা” (১৯১৮), ২টি গল্প “স্বামী” ও “একাদশী বৈরাগী” (১৯১৮),  
“গৃহদাহ” (১৯২০), “বামুনের মেয়ে” (১৯২০), ৩টি গল্প “ছবি”, “বিলাসী” ও “মামলার ফল” (১৯২০),  “দেনা-
পাওনা” (১৯২৩), “নববিধান” (১৯২৪), “পথের দাবী” (১৯২৬), “হরিলক্ষ্মী”, “মহেশ” ও “অভাগীর স্বর্গ” (১৯২৬),
“শেষ প্রশ্ন” (১৯৩১) “প্রভৃতি”। তাঁর উপন্যাসের নাট্যরূপের মধ্যে রয়েছে “ষোড়শী” (১৯২৭, দেনা-পাওনা),
“রমা” (১৯২৮, পল্লীসমাজ), “বিজয়া” (১৯৩৪, দত্তা), “অনুরাধা”, “সতী” ও “পরেশ” (১৯৩৪), “বিপ্রদাস” (১৯২৯-
১৯৩৫) প্রভৃতি। তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত তাঁর বাল্যকালের রচনা “শুভদা” (১৯৩৮) প্রভৃতি।

সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর “শরৎ-পরিচয়” গ্রন্থের ৭৩-পৃষ্ঠায় (প্রকাশকাল অজানা) লিখেছেন  যে
শরত্চন্দ্রের ভাগলপুরের বাল্যবন্ধু রাজু ওরফে রাজেন্দ্রনাথই ছিলেন শ্রীকান্তের ইন্দ্রনাথ। রাজু ছিলেন   
রামরতন মজুমদারের পুত্র।
*
শরত্চন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের কবিতা নিয়ে সুকুমার সেনের উদ্ধৃতির প্রতিবাদ -   পাতার উপরে . . .  
আনন্দ পাবলিশার্স থেকে রথযাত্রা ১৩৯২-এ (জুন ১৯৮৫) সুকুমার সেন সম্পাদিত শরৎ সাহিত্য সমগ্রের
ভূমিকা “শরত্চন্দ্রিকায়”, তিনি লিখেছেন . . .

,        “
বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস বার বার পড়ে শরত্চন্দ্র বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যরসে জারিত হয়েছিলেন এবং
তাঁর নিজের রচনাতেও তাই সেই রসই নিজস্ব পাক খেয়ে ক্ষরিত হতে থাকে। সুতরাং বঙ্কিমচন্দ্র যে   
শরত্চন্দ্রের সাহিত্যগুরু, তাতে সন্দেহ নেই। বঙ্কিমচন্দ্রের এমন প্রভাবের অনুকূলে শরত্চন্দ্রের মানসিকতায়
কিছু  প্রস্তুতিও ছিল। এ প্রস্তুতি হল কোন কোন বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ভাবসমতা। দুজনেই   
কবিতাকে  এড়িয়ে গেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র অবশ্য প্রথম জীবনে কবিতা লিখে সাহিত্য জগতে ভিড়তে চেষ্টা  
করেছিলেন। সে কবিতা সমাদৃত হয়নি। তা নিতান্তই মক্শ। তিনি তখন আর পাঁচজন শিক্ষিত কলেজিয়ান
রূপে ঈশ্বরগুপ্তের চেলা হতে চেয়েছিলেন। পরে তিনি দুটো একটা গান লেখা ছাড়া কবিতার দিকে আর পা
বাড়ান নি।
.        কবিতা রচনা সাহিত্যকর্মের মধ্যে এক হিসাবে সহজতম। সব কবি সাহিত্যিকেরই প্রথম সাধ হয়  
কবি  হবার, এবং কিশোর বয়সে অনেকেই দু-চারটে কবিতা লিখে থাকেন। শরৎচন্দ্রও তা করে থাকবেন।
কিন্তু সেটা কখনও প্রকাশ করার চেষ্টা করেননি। (সেরকম রচনার কোন উল্লেখ কোথাও দেখেছি বলে মনে
পড়ছে না। )
.        শরত্চন্দ্র যে সাহিত্যক্ষেত্রে রচনায় ও সমালোচনায় কবিতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন, তার  
কারণ কী? তাঁর গদ্য রচনায়---মানে গল্পে উপন্যাসে এতটা হৃদয়রস ঢেলে দিয়েছিলেন বলেই কি পদ্য রচনায়,
কবিতায় তাঁর স্পৃহা ছিল না? এতে শরত্চন্দ্রের সাহিত্য কর্মে কিছু ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয়। তিনি যদি  
কবিতা বুঝতে পারতেন তাহলে রবীন্দ্রনাথকে অতটা উপেক্ষা করতেন না। তাঁর অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের গল্পে  
গোড়া থেকেই শরত্চন্দ্রের প্রবেশ অবারিত ও সহজ হতে পারতো। তার ফলে তাঁর নিজের রচনা সমৃদ্ধতর
হতে পারত
।”

শরত্চন্দ্রের কবিতার প্রসঙ্গ থেকে আমাদের একটু সরে
বঙ্কিমের কবিতার প্রসঙ্গে আসতে হচ্ছে। তার জন্য
পাঠকের কাছে আমরা ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

উপরোক্ত উদ্ধৃতিটি শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন মহাশয়ের লেখা হলেও তাঁর এই উদ্ধৃতি সম্বন্ধে কয়েকটি কথা  
বলতেই হচ্ছে। প্রথমত তাঁর মতে বঙ্কিমচন্দ্রের কবিতা সমাদৃত হয়নি, কথাটি সত্যের অপলাপ বললে  
অতিকথন হবে না বিন্দুমাত্র।
বঙ্কিমচন্দ্রের কবিতার লাইন তো একটি দেশের আপামর জনগণের প্রতিবাদের
দৃপ্ত স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছিল --- “বন্দেমাতরম”! যা গাইতে গাইতে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ফাঁসির মঞ্চে উঠে
আত্ম বলিদান দিতে প্রস্তুত ছিলেন, যা একটি জাতির আত্মবলিদানের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই কবির
কবিতা সমাদৃত হয়নি এ কথা মেনে নেওয়া ইতিহাসের অবমাননা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। দ্বিতীয়ত  
বঙ্কিমচন্দ্রের কবিতা ও গানের সংখ্যা মোটেই “দুটো-একটা” নয়। মিলনসাগরেই
বঙ্কিমচন্দ্রের পাতায় রয়েছে
টি গান ও ২টি কবিতা। যার মধ্যে রয়েছে ৩টি বঙ্কিমের ভাষায় “গদ্য কবিতা”! বঙ্কিমচন্দ্রকে সেদিক
দিয়ে “আধুনিক বাংলা অন্তমিলহীন কবিতার জনক” বলেই আমরা মনে করি। এছাড়া তাঁর আরও গান  
ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে পারে যা এখনও তাঁর “সমগ্র” সংকলনে সন্নিবেশ করা হয়নি।

এ বিষয়ে তপন মল্লিক চৌধুরীর খবর
অনলাইন ওয়েবসাইটে ধারাবাহিকভাবে লেখা “রবিবারের পড়া:
সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সংগীতজ্ঞান”, প্রবন্ধটি প্রণিধানযোগ্য। শেষ পর্বে তিনি লিখেছেন যে . . .

বঙ্কিম অনুজ পূর্ণচন্দ্রের একটি লেখা থেকে জানা যায়, যখন বঙ্কিমের ১৩-১৪ বছর বয়স সেই সময় দাদা ও
ভাইদের সঙ্গে নৌকায় ভাসান দেখতে বঙ্কিম ফরাসডাঙা যাচ্ছিলেন। ভাগীরথীর পূব পাড়ের শ্মশানে তখন
শবদাহ হচ্ছিল। শ্মশানে এক মহিলা কাঁদতে কাঁদতে জলন্ত চিতায় ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করছিল, তাকে ধরে
রেখেছিল তার বাড়ির লোক। এই ঘটনায় বঙ্কিমের চোখ জলে ভরে যায়। কিশোর বঙ্কিম নৌকায় বসেই
একটি গান লিখে সুর সংযোগ করেছিলেন। মল্লার রাগিণীতে তৈরি সেই গান বহু কাল প্রচলিত থাকার পর
লুপ্ত হয়ে যায়। গানটির কথা… ‘হারালে পর পায় কি ফিরে মণি – কি ফণিনী, কি রমণী?
’ . . .”

এই গানগুলির বেশ কয়েকটা পূর্ণরূপে, এখনও আমরা কোথাও খুঁজে পাইনি। তাই মিলনসাগরের কবি  
বঙ্কিমচন্দ্রের সংগ্রহে তোলা সম্ভব হয়নি। আমরা তাই বলি যে মিলনসাগরে বঙ্কিমের গানের পাতা এখনও
অসমাপ্ত রয়েছে। এ হেন বঙ্কিমের কবিতা সমাদৃত হয়নি !? সুকুমার সেনের এই কথা অহেতুক ও  
অহিতকর।

শরত্চন্দ্রের কবিতার প্রসঙ্গে ফিরে সুকুমার সেনের “
তিনি যদি কবিতা বুঝতে পারতেন তাহলে রবীন্দ্রনাথকে
অতটা উপেক্ষা করতেন না
।”  এই উক্তিটিরও প্রতিবাদ করতে হয়। প্রথমে “শরত্চন্দ্র কবিতা বুঝতে  
পারতেন না”, একথা মেনে নেওয়া শ্রেফ অন্যায় করা ছাড়া আর কিছুই হবে না। তাঁর উপন্যাসের  কবিত্ব  
নিয়ে সৌরেন্দ্রনাথ মিত্র দ্বারা প্রকাশিত “শরৎ-তর্পণ” গ্রন্থে, অজয়কুমার ঘোষের “উপন্যাসের কৃতিত্ব ও  
শরত্চন্দ্র” প্রবন্ধটি পড়লে এ বিষয়ে ভুল ধারণার উপসম হবে। সেখাটি পড়তে
এখানে ক্লিক করুন . . .

দ্বিতীয়ত “তাহলে
রবীন্দ্রনাথকে উপেক্ষা করতেন না” - একথার মধ্যেও আমরা কোনও যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না।
রবীন্দ্রনাথ তখন বাংলা সাহিত্যের নিশ্চিতভাবে শ্রেষ্ঠ কবি এবং শরত্চন্দ্রও সে সময়ে বাংলা সাহিত্যে
সবচেয়ে শক্তিমান, খ্যাতিমান ও সফল গদ্য সাহিত্যিক। তাঁদের চিঠিপত্র থেকে যা বোঝা যায় যে, সব
বিষয়ে তাঁদের মতের মিল না থাকলেও, শরত্চন্দ্র,
রবীন্দ্রনাথের মতামতকে চরম প্রাধান্য দিতেন।  
রবীন্দ্রনাথের কথায় তিনি দুঃখ পেতেন, অভিমান করতেন, রাগের মাথায় পত্রের উত্তর লিখেও ডাকে দিতেন
না, এসব তো সে-ই করে যে উপেক্ষা করতে পারে না! তাই আমরা জোরগলায় বলতে পারি যে, শরত্চন্দ্র  
রবীন্দ্রনাথকে উপেক্ষা কোনও  কালেও  করেন নি। তাঁরা পরস্পরকে খুশি করতে চাটুকারিতার আশ্রয় নেন
নি। তাঁদের পারস্পরিক  চিঠিপত্রের ভেতর থেকে সে কথাই প্রবলভাবে শ্রবণীয় এবং স্পষ্টভাবে ভাস্বর হয়ে
ওঠে, অন্যথা নয়।

এখন পর্যন্ত আমরা সুকুমার সেনের লেখা কোন কবিতা খুঁজে পাই নি। পেলেই মিলনসাগরে তাঁর কবিতার
পাতা তৈরী করা হবে। যদি তিনিও কবিতা না লিখে থাকেন তাহলে কি শরত্চন্দ্রের সম্বন্ধে তিনি যা
লিখেছিলেন, তা ধার করে কি বলা উচিত হবে যে --- সুকুমার সেনও কবিতা বুঝতেন না এবং কবিতাকে
উপেক্ষা করেছিলেন?! এত অবাস্তবিক সরলিকরণ আমাদের পক্ষে সুকুমার সেনের সম্বন্ধে করা যেমন
হাস্যকর হবে তেমনই হবে তাঁর কাছ থেকে শরত্চন্দ্রের সম্বন্ধে করা উক্তিটি।

গ্রন্থটির প্রকাশকের বড় দুর্ভাগ্য যে যাঁকে দিয়ে শরত্চন্দ্রের রচনা-সমগ্র সম্পাদনা করালেন, তিনিই মনে
করতেন যে শরত্চন্দ্র কবিতা বুঝতে পারতেন না আর সেই হেতু “শরত্চন্দ্রের সাহিত্য কর্মে কিছু ক্ষতি
হয়েছে”! কবিতা বুঝতে না পারার জন্য তিনি রবীন্দ্রনাথকে অতটা উপেক্ষা করতেন! ফলে তাঁর নিজের
রচনাই যথাযতভাবে সমৃদ্ধ হয় নি!

এত তির্যক ভাবনা আর মন্তব্য যাঁর সাহিত্য-সৃষ্টির প্রতি, তাঁর “রচনা-সমগ্র” সম্পাদন করার কাজ কেন যে
হাতে নিয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন, সেটা ভেবেই অবাক হ’তে হয়!

এটাও বলতে হয় যে আনন্দ পাবলিশারস-এর এই ব্যাপারটা দেখা উচিত ছিল যে, যে সাহিত্যিকের রচনা-
সমগ্র ছাপিয়ে তাঁরা ব্যবসা করছেন, তাঁর সম্বন্ধেই তাঁরই রচনা-সমগ্রে, এত অপমান-জনক কথা কেন লেখা
থাকবে? এখানে "জুতো মেরে গরু দান" প্রবাদের কেবল জুতো মারাটাই করা হয়েছে। গরু-দানটা হয়নি।
তাতে অবশ্য ব্যবসার কোনও ক্ষতি হয় নি।

আমরা জানি যে শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন মহাশয়ের বিরুদ্ধে এই কথা লেখায় বিদ্বজ্জনেদের অনেকেই আমাদের
উপরে অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হবেন। তবু আমরা আমাদের মন্তব্যে স্থির থাকছি।
*
শরত্চন্দ্রের উপন্যাসের কবিত্ব নিয়ে অজয়কুমার ঘোষের উদ্দৃতি -                পাতার উপরে . . .  
সুকুমার সেন যখন বলছেন যে শরত্চন্দ্র কবিতা বুঝতে পারতেন না, তার প্রায় ২৬বছর পূর্বে, রাসপূর্ণিমা
১৩৬৬-এ (১৯৫৯), সৌরেন্দ্রনাথ মিত্র দ্বারা প্রকাশিত “শরৎ-তর্পণ” গ্রন্থে, অজয়কুমার ঘোষের “উপন্যাসের
কৃতিত্ব ও শরত্চন্দ্র” প্রবন্ধের ৬৬-পৃষ্ঠায় তিনি লিখছেন . . .

“. . .
রবিন্দ্রনাথ একস্থলে বলেছেন যা অনির্বচনীয়ের আস্বাদ দেয়, তা গদ্যই হোক আর পদ্যই হোক, কাব্য।
আমরাও বলব, গদ্য হোক, পদ্য হোক, উপন্যাস হোক, নাটক হোক, যা মানবজীবন ও প্রকৃতির  মধ্যে   
সুনিবিড় একাত্মতা গড়ে তোলে, তা-ই কাব্য। সেদিক থেকে দেখতে গেলে শরত্চন্দ্র কবি। . . .
. . . শরত্চন্দ্র মূলতঃ মুখ্যতঃ বাস্তববাদী সাহিত্যিকরূপেই খ্যাত। বর্ণনার যথাযথতা, পুঙ্খানুপুঙ্খতা,
মনস্তত্ত্বজ্ঞান ও পর্ষবেক্ষণশক্তির তীক্ষ্ণতা ও গভীরতা তাঁর ঔপন্যাসিক প্রতিভার অন্যতম ধর্ম। কিন্তু
বাস্তবতার সঙ্গে বা উল্লিখিত গুণগুলির সঙ্গে কবিত্বের তো বিরোধ নেই। ডক্টর সুবোধ সেনগুপ্ত যথার্থই
বলেছেন, “শরত্চন্দ্রের রচনার বাস্তবতা সর্বজনবিদিত, কিন্তু বাস্তবপ্রিয়তার সঙ্গে যে কবিপ্রতিভা জড়িত
আছে তত্প্রতি সকলের দৃষ্টি পড়ে না
।” (শরত্চন্দ্র / ডঃ সুবোধ সেনগুপ্ত / ৫ম সং / পৃঃ ১৮১) . . .
*