কবি গীতিকার গিরীন চক্রবর্তীর কবিতা
*
মাটি
কবি গিরীন চক্রবর্তী
সজনীকান্ত দাস সম্পাদিত, “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার মাঘ ১৩৪৩ (ফেব্রুয়ারী ১৯৩৭) সংখ্যায়
প্রকাশিত।

আমরা গাঁয়ের চাশী---
ভাবনা-বিহীন দিবস-রজনী বাজাই মাঠেলী বাঁশী!
প্রভাতে ও সাঁঝে আকাশে বাতাসে
.                        আলো-হাসি খেলা করে,
আকাশের চাঁদ হেসে নেমে আসে
.                        আমাদেরই ছোট-ঘরে।
নিত্য-মুখর পাখীর কণ্ঠ শোনায় মোদেরে নিতি---
চিত্ত-হরণ হাসি-খুসীভরা চির সে নবীন গীতি।
দীঘল-দীঘির নীল কালো জল মেটায় মোদের তৃষা,
ক্লান্তি যতেক---ঘুচায় নিত্য জ্যোছনা-উজল-নিশা॥

.                        জ্বননী মেদের মাটি---
বর্ষা-শরৎ শীত-হেমন্তে আমরা সমানে খাটি।
পল্লী-মায়ের আদরের ধন আমরা গাঁয়ের চাষী,
মায়ের আশিস্‌ সর্ব্ব-ঋতুতে জীবনে বাজায় বাঁশী।
চাযা-ভুষা-লোক, নাই কোন শোক,
.                        খাই-দাই, মজা লুটি---
জগত-কাননে সুরভির সনে ফুল হ'য়ে ফুটে উঠি।
আমরা মায়ের, জননী মোদের, এম্‌নি প্রাণের টান,---
ছেলে-বুড়ো মিলে নাচি খালে-বিলে কণ্ঠে ধরিয়া গান
ক’র না মোদের ঘৃণা---
মোরাও মানুষ : মানুষের দিন চলে কি মানুষ বিনা?
একই আকাশ, একই সৃর্য্য বিরাজে ভুবন ভরি’---
তবে কেন মিছে দূরে দূরে থাক স্বজনেরে পরিহরি'!
হ’তে পারি মোরা বেজায় গরীব,
.                        তাই ব’লে কি গে ভাই,
গরীবের সাথে পথ সে চলিতে কথাও কহিতে নাই?
আমাদেরে ছেড়ে তোমাদের দিন চলিবে না ভাই, হায়,
তেমনি আবার তোমাদের ছেড়ে
.                        মোদেরো জীবন যায়!!

.                        মোদেরে বাস গো ভাল---
পরাণে-পরাণে স্নেহের আলোতে প্রীতির প্রদীপ জ্বাল।
হাতে হাতে ধরে তোমাদের ক'রে
.                        আমাদেরে লহ কাছে,---
উছল-খুসীর অনুরাগে মেতে মোদের হৃদয় যাচে।
সদা কাছাকাছি রহিব আমরা জীবন-মরণ ধরি'---
মোদের বাঁধনে বাঁধিব এ-ধরা সু-চির সুরেতে ভরি’।
পাখী গা'বে গান, সাথে কল-তান তুলিবে তরলা-নদী ;
শহরে-গেরামে হরষ-জোয়ার ব’য়ে যাবে নিরবধি॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ফুলের ফসল
কবি গিরীন চক্রবর্তী
সজনীকান্ত দাস সম্পাদিত, “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার বৈশাখ ১৩৪৪ (এপ্রিল ১৯৩৭) সংখ্যায়
প্রকাশিত।

আমরা করি ফুলের ফসল সারা-বছর ধ’রে
এমন মাণিক আছে রে কা’র নেবে সওদা ক'রে!
আকাশ-পাটে, মাঠের বাটে মোদের বেসাত-ভারা,
প্রহর জেগে দেয় পাহারা চন্দ্র, সূরুয, তারা॥
সাধ্য কা’রো নাই রে ঘটে হাতটি বাড়ায় আগে,
যেমনি ছোঁয়া অমনি নো’য়া! সাপের কামড় লাগে
ঝড়-তুফানে নৌকা মোদের সমান তালে চলে---
মোদের তরে মোমের বাতি জ্বলে জলের তলে॥
ক্ষুধা-তৃষ্ণা মোদের দেহে বন্ধু সম রয়---
জীবন সাথে সন্ধি করে মরণ মধু-ময়॥
দিনের শেষে রাত্রি হাসে, রাত্রিশেষে দিন,
ছয়টি ঋতু গানের মতন বাজায় ফুলের বীণ্।
রঙ্গন-পাখির শিশ্-মহলে খুসীর আসর বসে,
আমরা মজি পান ক'রে সে অমর সুধা-রসে।
হর্ষ-মগন মন্দ-পবন বহে মোদের ঘেরি---
মনের কোণে সংগোপনে বাজে সুরের ভেরী॥
গ্রীষ্মে যবে উষ্ণ লাগে তপ্ত অধীর বায়---
বর্ষা এসে ছন্দ ঢালে শৈতালি-হাওয়ায়।
কচি-ধানের নয়ন খোলে শরৎ দিনের প্রাতে,
হেমন্তে হায় ‘তাই রে না না’ মোদের প্রাণে মাতে!
শীতটি শুধু একটুখানি আড়া-আড়ি করে---
ফাগুনে ফের সমান-তালে গানটি গলায় ধরে॥
নেহাত যারা উদর-দায়ে ধনীর পোষাক পরে---
তা'রা-ই আসে স্রোতের মতন মোদের দুয়ার-ঘরে॥
তাদের দুঃখ দেখে মোরা অন্তরে যাই গ'লে---
অমনিতে তাই মোদের বেসাত দিই তাদের-ই বলে!
আমরা বেজায় ভাল-মানুষ! আনচানী নাই মনে,
নিজের জিনিষ পরকে বিলাই পরের কষ্ট গ’ণে॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
== একটি বিনীত আবেদন ==
কবির ছাত্রছাত্রী, বন্ধু-স্বজন, তাঁদের উত্তরসূরী, গবেষক ও পুরোনো রেকর্ড
সংগ্রাহকদের কাছে কবির রচিত আরো গান ছড়িয়ে থাকতে পারে।  
সকলকে একান্ত অনুরোধ একত্রে তা সংকলন করুন। আমাদের
অনুমান কবির শতাধিক গান পাওয়া যাবে। আমাদেরও পাঠাতে পারেন।