চিরনূতনেরে দাও ডাক ‘বাইশে  বৈশাখ’ : জন্মশতবর্ষের আলোকে
শ্রদ্ধায়, স্মরণে  বিশ শতকের  বাংলা গানের  গুরু গিরীন চক্রবর্তী
RAJESH DATTA·SATURDAY, APRIL 20, 2019·1 MINUTE    ফেসবুকের পাতায় যেতে . . .      

আজ ৬ বৈশাখ। আর কিছুদিন পরেই ‘কবিপক্ষে’র শুরু। পঁচিশে বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে প্রতি বছরের
মতো এ বছরও বাঙালি মেতে উঠবে বাংলা ও বাঙালির গর্ব কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের উৎসবে।
কিন্তু আমরা বাঙালিরা আর কতকাল ভুলে থাকব ‘বাইশে বৈশাখে’র কথা? আজ থেকে ১০১ বছর আগে
১৩২৫ বঙ্গাব্দের ২২শে বৈশাখে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলার গৌরব আরেকজন প্রবাদপ্রতিম গানের গুরু।
কিংবদন্তী লোকসংগীত ও নজরুলগীতির গায়ক, গীতিকার, সুরকার, শিক্ষাগুরু, সংগীত গবেষক এবং এক
অনন্যসাধারণ সংগীতময় ব্যক্তিত্ব পরম শ্রদ্ধেয় গিরীন চক্রবর্তী, যিনি আজ বিস্মৃতপ্রায়।
তাঁর অলোকসামান্য সংগীত প্রতিভার কোনও পূর্ণাঙ্গ ও সার্থক মূল্যায়ন আজও এদেশে হয়নি। তাঁর
সাংগীতিক জীবনের  অভিযাত্রার ও সৃজনের অন্বেষণ কোনও সংগীত-গবেষক করেছেন কিনা, তা আমার
জানা নেই। এপার বাংলায় তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গানের কোনও সংরক্ষণ করা হয়নি। কোনও সম্পূর্ণ
সংকলনও প্রকাশিত হয়নি। এই অবিস্মরণীয় সংগীতস্রষ্টার কথায়, সুরে কতগুলি গান সৃজিত হয়েছে, তার
কোনও সম্পূর্ণ তালিকাও অজানা। অথচ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান ও ওস্তাদ আফতাবউদ্দিন খান সাহেবের
সুযোগ্য শিষ্য গিরীন চক্রবর্তী অজস্র গানের কারিগর। কখনও স্বনামে, কখনও বা ‘সুজন মাঝি’, ‘রতন
মাঝি’, ‘দ্বিজ মহেন্দ্র’ কিংবা ‘সোনা মিঞা’ ছদ্মনামে তিনি গান রচনা করেছেন। লোকগান, শ্যামাসংগীত,
দেশাত্মবোধক গান, আধুনিক গান থেকে ছায়াছবির গান – তাঁর সৃষ্টির ভাণ্ডার মণিমাণিক্যে পরিপূর্ণ।

বাংলার গ্রামে গ্রামান্তরে ও বাঙালির অন্তরাত্মায় লোকগানের যে অনন্ত ঐশ্বর্য রয়েছে, জীবনভর তারই
সন্ধান করেছেন। গ্রামবাংলার লোকসংগীতের পরম্পরাগত ঐতিহ্য ও ভাবরসকে নাগরিক শ্রোতা-সহ বৃহত্তর
জনসমাজের কাছে তুলে ধরেছেন তাঁর গানে গানে। লোকগানের কথায়, সুরে, ভাবে অন্তর্লীন প্রেম, বিরহ,
বিচ্ছেদ, মিলন, সম্প্রীতি, প্রকৃতি ও মানুষের গভীর সখ্যতা, গ্রামীণ কর্মমুখর জীবনের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা,
যাতনা, বেদনার মাঝেও চিরন্তন বেঁচে থাকা বুক ভরা আশা, স্বপ্ন, আনন্দ ও মরমিয়া চেতনাকে তিনি তাঁর
সংগীতকার সত্তা ও সৃজনের মূল উপাদান হিসেবে সাগ্রহে গ্রহণ করেছিলেন। তাই তাঁর রচিত
ও সুরারোপিত গানগুলি এত হৃদয়স্পর্শী আবেগ ও প্রাণময়তায় পরিপূর্ণ ছিল যে, আজও আমাদের মন জয়
করে। একসময় কালের প্রবাহে লোকসংগীতের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা ছিল বেশ দুরূহ। লোকসংগীতের
মধ্যে ইসলামি, ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীত ও আধুনিক সুরকে অসামান্য দক্ষতায় অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে মিশিয়ে
দিয়ে যাঁরা লোকগানের ধারার জনপ্রিয়তাকে বৃহত্তর জনমানসে পুনরুজ্জীবিত করেন, তাঁদেরই
মধ্যে অন্যতম অগ্রদূত ছিলেন গিরীন চক্রবর্তী। তাঁর গায়ন ও সৃজন-শৈলী, দুই-ই ছিল অভিনব স্বাতন্ত্র্যে
সমুজ্জ্বল।

কবি জসীমউদ্দীনকে যদি বাংলা কবিতায় পল্লীবাংলার শ্রেষ্ঠ রূপকার হিসেবে মর্যাদা দিয়ে বিদগ্ধ সমাজ
‘পল্লীকবি’ বলে আখ্যা দেন, তাহলে গিরীন চক্রবর্তীকে বাংলার পল্লীগীতির জনপ্রিয়করণের পথিকৃৎ হিসেবে
সম্মানিত করে তাঁকে ‘পল্লীগীতির গুরু’ আখ্যায়িত করা কি সঙ্গত হবে না? গিরীনবাবু কবি জসীমউদ্দীন-এর
রচিত সুখ্যাত ‘ও আমার দরদী’ গানটি-সহ আরো অনেক পল্লীগীতির স্বরলিপিকারও ছিলেন।

আজীবন নিজে তো অনেক জনপ্রিয় গান লিখেছেন ও সুর দিয়েছেনই, এমনকি একথাও অনেকেরই অজানা
যে, তিনি কাজী নজরুল ইসলামের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। কাজী সাহেবের স্নেহধন্য এই মানুষটি
নজরুলের প্রায় ৩০টি গানের (মতান্তরে ২৪টি) সুরকার। (*নীচে টীকা দ্রষ্টব্য) তাঁর সুরারোপিত
জনপ্রিয় কিছু নজরুলগীতি হল, (১) আজি আকাশ মধুর বাতাস মধুর, (২) কাবার জিয়ারাতে তুমি, (৩) কূল
ছেড়ে চলিলাম ভেসে, (৪) বন বিহঙ্গ যা উড়ে (৫) মোরা আর জনমেতে হংসমিথুন, (৬) মোরা বিহান বেলা
উঠে রে ভাই, (৭) সে চলে গেছে বলে কি গো, (৮) ও শাপলা ফুল নেবো না (‘অভিনয় নয়’, ১৯৪৫, চলচ্চিত্রের
গান) (৯) কোন বিদেশের নাইয়া তুমি, (১০) সোনার বরণ কন্যা গো, (১১) আজি মধুর গগন মধুর পবন ইত্যাদি
। তাঁর দৃপ্ত, উদার অথচ কোমল মাধুরীময় সুরেলা ও দরদি কণ্ঠে রেকর্ড করেছেন অনেক নজরুলগীতি।
স্বনামে কিংবা কখনও ছদ্মনামে। নজরুলের বিখ্যাত ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গানটি গেয়ে ১৯৪৯ সালে
তিনিই প্রথম রেকর্ড করেছিলেন। তিনি ১৯৪৫ সালে ‘সুজন মাঝি’ ছদ্মনামে প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক ও
ছড়াকার অখিল নিয়োগী (স্বপন বুড়ো)-র কথায় সুর দিয়ে ‘আকাশের আরশিতে ভাই’ শীর্ষক একটি গান
রেকর্ড করেন।

তিনি নিজেও ছিলেন একজন সফল গীতিকার ও সুরস্রষ্টা। দেশভাগের দুঃসহ বেদনা ও রক্তঝরা যাতনার
স্বাক্ষর গিরীন চক্রবর্তীর অনবদ্য সৃজন ‘কিশোরগঞ্জে মাসির বাড়ি’, ‘শিয়ালদহ গোয়ালন্দ আজও আছে ভাই’,
‘বাড়ি ছিল পদ্মা নদীর পাড়ে’ –  এইসব  গানগুলো  শুনলে  আজও মন হুহু করে ওঠে। ‘আকাশবাণী  
কলকাতা'য় লোকপ্রিয় ‘পল্লীগীতির আসর’ তিনিই শুরু করেছিলেন।

তিনি সেকালের কিছু চলচ্চিত্রেরও গানের স্রষ্টা। যেমন, বহুশ্রুত অত্যন্ত জনপ্রিয় এই গানটি ‘দীন দুনিয়ার
মালিক তোমার দীনকে দয়া হয় না’ – মোহিনী চৌধুরীর কথায় গিরীন চক্রবর্তীর সুর। ১৯৪৫ সালে
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি ও নির্দেশনায় ‘ইস্টার্ন টকিজ লিমিটেড’ প্রযোজিত ‘অভিনয় নয়’
সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছিল গানটি। গেয়েছিলেন ঝর্ণা দে। এছাড়া ‘রক্তের টানে’, ‘বন্দী’ ইত্যাদি ছবিতে
তিনি সংগীত পরিচালনা করেন। চলচ্চিত্রে সংগীত নির্দেশনা ছাড়া অভিনয়ও করেছিলেন তিনি। ‘বৈকুণ্ঠের
উইল’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘স্বামী’, ‘ঠিকাদার’ ইত্যাদি ছায়াছবিতে অভিনয় করেন।

এই বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন মানুষটির এক অসাধারণ সৃষ্টিকে বাঙালি শ্রোতারা বিস্মৃত হয়েছেন। তিনি কাজী
নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ ও  ‘নারী’  কবিতাদুটিকে সংক্ষিপ্তাকারে সুরারোপ করে গীতিরূপান্তর  
করেছিলেন। স্বকণ্ঠে রেকর্ডও করেছিলেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার গীতিরূপ ‘বল বীর বল উন্নত মম শির’ গানটি
শুনতে শুনতে রোমাঞ্চিত হই। এক সার্থক গণসংগীতের উজ্জ্বল নজির। কেন যে কোনও গণসংগীতশিল্পীর
কণ্ঠে আর এই ‘বিদ্রোহী’ গিরীন চক্রবর্তীর গানটি শুনতে পাই না, তা জানি না। বাঙালি শ্রোতাদের ক’
জনই বা জানেন যে নজরুলের ‘এই শিকল পরা ছল’ গানটির সুরও গিরীন চক্রবর্তীর? এই গানটিতে
‘কাংড়া’ তালে খাম্বাজ রাগে অসামান্য সুরারোপ করে তিনি স্বয়ং নজরুলকেও চমকিত করে দিয়েছিলেন।
১৯৪১ সালে কবিশেখর কালিদাস রায়ের বিখ্যাত ‘নন্দপুর চন্দ্র বিনা বৃন্দাবন অন্ধকার’ কবিতাটিতে
সুরারোপ করে ‘এইচএমভি’ থেকে রেকর্ড করেন। তাঁর আর একটি বিস্মৃতপ্রায় অভিনব সৃষ্টিকর্ম হল
গান্ধিজির জীবনী আলেখ্য-গীতি ‘গান্ধিজির অমর কাহিনি’। গিরীন চক্রবর্তীর কথায়, সুরে এই গানটি
গেয়েছিলেন সত্য চৌধুরী। এত সব অভাবনীয় সৃষ্টির কাজকর্ম করে গেছেন মাত্র ৪৯ বছরের স্বল্প
আয়ুষ্কালের মধ্যে! কী বিস্ময়কর সংগীত প্রতিভা ছিল তাঁর! এই সংগীতগুরুর আশ্চর্য সৃজনীক্ষমতার কথা
স্মরণ করলে, তাঁর গান শুনলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।
মিলনসাগরে কবি গিরীন চক্রবর্তীর কবি পরিচিতির পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .
কথা ও সুরের এই ঐন্দ্রজালিক ১৯১৮ সালের ৫ মে (২২ বৈশাখ, ১৩২৫ বঙ্গাব্দ) অবিভক্ত বাংলার কুমিল্লার
ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম গৌরাঙ্গসুন্দর চক্রবর্তী, মা ব্রজসুন্দরী দেবী। একথা
ঐতিহাসিকভাবেই সত্য যে, এই উপমহাদেশের সংগীত জগতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে খচিত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল সংগীতের আবাদভূমি । তিতাস নদী বিধৌত এই ভূ-ভাগে সাবেককাল থেকেই গড়ে
উঠেছে সংগীত-ঋদ্ধ ঐতিহ্য । এখানেই জন্ম নিয়েছেন সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ,
ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, মহর্ষি মনোমোহন দত্ত, রওশন আরা বেগম (অন্নপূর্ণা), ওস্তাদ বাহাদুর
হোসেন খান, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু এবং সৈয়দ আব্দুল হাদী প্রমুখ প্রখ্যাত সংগীত সাধকেরা।
প্রাচীনকাল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জনপদে লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিরও একটি নিজস্ব সমৃদ্ধ পরিবেশ
গড়ে ওঠে। লোককথা, লোক সংগীত, ছড়া ও প্রবাদ-প্রবচনে এখনও এর কিছু কিছু নিদর্শন বর্তমান।
লোকসংগীতে আদিকাল থেকেই একটি বিশেষ ধারা এখানে প্রচলিত রয়েছে । মীর্জা হোসেন আলী, বাণচন্দ্র
তর্কালঙ্কার, মনোমোহন দত্ত, লবচন্দ্র পাল, ফকির আফতাবউদ্দিন, লোকশিল্পী দুলা মিঞা মাস্টার, দুর্গাচরণ
দাস প্রমুখের লোকসংগীত সারা উপমহাদেশেই জনপ্রিয় হয়েছে। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান গিরীন
চক্রবর্তীর সংগীতের প্রতি আকর্ষণ গড়ে ওঠে শৈশব থেকেই। ছেলেবেলাতেই সুযোগ হয় বাবা আলাউদ্দিন
খানের সান্নিধ্য লাভের এবং তাঁর কাছেই সংগীতশিক্ষা শুরু হয়। পরবর্তীকালের সংগীতশিক্ষায় ওস্তাদ
আফতাবউদ্দিন খান সাহেবের কাছে ‘নাড়া’ বাঁধেন।

তিতাস ও পদ্মাপারের দেশ থেকে গঙ্গার তটে এসে এপার বাংলার কলকাতা মহানগরীতে শুরু হয় তাঁর
সংগীত জীবনের জয়যাত্রা। তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে বাংলা জুড়ে। সেকালের ‘এইচএমভি’
গ্রামোফোন কোম্পানির শিল্পীদের প্রশিক্ষক হিসাবে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ম্যাজেন্টা রঙের লেবেলে
‘চোঙাওয়ালা গ্রামোফোনে গান শুনছে একটি প্রভুভক্ত কুকুর - এই চিরপরিচিত ছবিই ছিল ‘এইচএমভি’
কোম্পানির ট্রেড মার্ক। ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ ছাড়াও তখন ‘কলম্বিয়া’ কোম্পানির রেকর্ড প্রকাশিত হত।
প্রথমে ভায়োলেট রঙে, পরে নীল রঙের লেবেলে বাঘের ছবি আঁকা থাকত ‘কলম্বিয়া’র রেকর্ডে। ‘এইচএমভি’
র রেকর্ডের নম্বরের আগে ‘এন’ এবং কলম্বিয়ার নম্বরের আগে ‘জি ই’ লেখা থাকত। আরেকটি জনপ্রিয়
গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে ‘টুইন রেকর্ড’ প্রকাশিত হত। এই রেকর্ড কোম্পানির সাথেও সুরকার
হিসাবে গিরীন চক্রবর্তী যুক্ত ছিলেন। হলুদ রঙের লেবেলে কালো কালিতে ‘যমজ শিশু’র ছবির নীচে গানের
লাইন, গীতিকার ও সুরকারের নাম লেখা থাকত। রেকর্ডের নম্বরের আগে একটি লেখা থাকতো। টুইন
কোম্পানি থেকে নজরুলের বহু গান প্রকাশিত হয়েছিল। পরে এই ‘টুইন কোম্পানি’ ‘এইচএমভি’র সাথে মিশে
যায়।

গিরীন চক্রবর্তী আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্রেও কর্মরত ছিলেন। বেতারে লোকসংগীতের অনুষ্ঠানের
সম্প্রচার শুরু করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন বাংলার মাটির গন্ধ মাখা শেকড়ের গান।আকাশবাণীর
‘পল্লীগীতি’র বিভাগটি তাঁরই উদ্যোগে খোলা হয়, পরে নামকরণ হয় ‘লোকগীতি’। আকাশবাণীর কলকাতা
কেন্দ্র থেকে পল্লীগীতি, নজরুলগীতি, আধুনিক গান, শ্যামাসংগীত, ভজন, গীত ও গজল নিয়মিতভাবে
পরিবেশন করেছেন। গানের এত বহুবর্ণময় বিচিত্র ধারাকে নিবিড়ভাবে আত্মস্থ করার নেপথ্যে ছিল তাঁর
সংগীত সাগরে পূর্ণ  অবগাহন। তিনি ঢাকা বেতার কেন্দ্রের সাথেও যুক্ত ছিলেন। ‘বেঙ্গল মিউজিক কলেজ’,
‘বাসন্তী বিদ্যাবীথি’ ও ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়’-এও অধ্যাপনা করেছেন। সেই সূত্রে তিনি ছিলেন প্রশ্নকর্তা ও
সিলেবাস কমিটির সদস্য। ১৯৫২ সালে মাত্র ছত্রিশ বছর বয়স থেকেই তিনি দিল্লিতে ‘জাতীয় সংগীত
সম্মেলনে’ নিয়মিত  আমন্ত্রিত হতেন। ‘সংগীত নাটক আকাদেমি’র প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি আজীবন
আকাদেমির সদস্য ছিলেন। তাঁর সংগীতমুখর জীবনের কাজের পরিধি ছিল বহুবিস্তৃত। ১৯৬৫ সালের ২২
ডিসেম্বর, কলকাতায় মাত্র ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়।
২০১৮ সালে তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পেরিয়ে গেছে অনেকেরই অগোচরে, প্রায় নিরুচ্চারে ও তাঁর শিষ্য ও
গুণমুগ্ধ অনুরাগীদের নিভৃত যাপনে। জন্মশতবর্ষ অতিক্রান্ত হয়ে গেল, তবু এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী অবজ্ঞাত,
অবহেলিতই থেকে গেলেন আত্মবিস্মৃত বাঙালির মননে ও সাংস্কৃতিক জগতে। উপেক্ষিত রয়ে
গেলেন প্রচার মাধ্যমেও। দেশভাগের সময় স্বভূমি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে যে গভীর যন্ত্রণায় তিনি লিখেছিলেন,
আজ শতবর্ষ পেরিয়ে বাংলার মানবজমিনের ‘আবাদভূমি’তেও ঠাঁই হারিয়ে তাঁর বেদনাদীর্ণ অভিমানী কণ্ঠে
বাংলার আকাশে-বাতাসে কান পাতলে যেন শুনতে পাই সেই মর্মস্পর্শী গান… …

‘মাসির বাড়ি কিশোরগঞ্জে,
মামার বাড়ি চাতলপাড়।
বাপের বাড়ি বাউনবাইড়া,
নিজের বাড়ি নাই আমার।।
আমি রে যে জলের ঢেউ
আমার বলতে নাইরে কেউ,
চান্দের হাট ভাইঙ্গা গেছে
একূল ওকূল অন্ধকার।।’

অধিকাংশ বাঙালি শ্রোতারাই জানেন না চিরন্তন প্রবহমান বাংলা গানের স্রোতস্বিনী ধারায়
গিরীন চক্রবর্তীর অসামান্য অবদানের কথা। একথাও অনেকের কাছেই অজানা যে, বিগত শতাব্দীর চল্লিশ-
পঞ্চাশ দশকে বাংলা গানের স্বর্ণযুগের বহু সুপ্রসিদ্ধ শিল্পী তাঁর কাছে গানের তালিম নিয়েছেন, তাঁর গান
রেকর্ড করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর উৎসাহেই শচীন দেববর্মন লোকসংগীতে অনুরক্ত হন।  এমনকি  
মহম্মদ রফিও কলকাতায় এসে  গিরীন চক্রবর্তীর কাছে  বাংলা  পল্লীগীতির  শিক্ষা  নিয়ে  তামিল  ও  
হিন্দি ছবিতে গান গেয়েছেন। ১৯৪৫ সালে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ‘কলম্বিয়া’ গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে
তাঁর জীবনের প্রথম গান রেকর্ড  করেন  গিরীন চক্রবর্তীর কথায়-সুরে।  গানটি  ছিল,  ‘তোমার আকাশে
ঝিলমিল করে চাঁদের আলো’। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৪ বছর। ওই রেকর্ডের উল্টো পিঠে ছিল গিরীন
চক্রবর্তীর কথায় সুরে আরেকটি গান ‘তুমি ফিরায়ে দিয়েছ যারে’। এর পরের বছর তিনি ১৫ বছর বয়সে
‘গীতশ্রী’ উপাধি অর্জন করেন। সেকালের দিকপাল সব শিল্পীদের সামনে যোগ্যতার পরীক্ষায় বসে ‘গীতশ্রী’
উপাধি পান। আর সতেরো বছর বয়সে ‘অঞ্জনগড়’ ছায়াছবিতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের প্রথম প্লেব্যাক।
ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের কণ্ঠে ‘রক্তের টান ছায়াছবিতে ‘আমি যে হারানোর দলে’ গানটির কথা ও সুর গিরীন
চক্রবর্তীর। তালাত মাহমুদের গাওয়া অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘দুটি পাখী দুটি তীরে’ গানটির গীতিকার গিরীন
চক্রবর্তী, সুর দিয়েছিলেন কমল দাশগুপ্ত। চিন্ময় লাহিড়ীর কণ্ঠে ‘হায় নিশিরাতে যেন আসে’ গানটিও গিরীন
চক্রবর্তীর রচনা। অপরেশ লাহিড়ীর জীবনসাথী ও বাপ্পী লাহিড়ীর মা বাঁশরী লাহিড়ীর সুমধুর কণ্ঠে গিরীন
চক্রবর্তী মহাশয়-এর কথা ও সুরে দুটি অপূর্ব সুন্দর শ্যামাসংগীত রেকর্ড করা হয়েছিল। সে’দুটি হল -- (১)
কালী তারা ষোড়শী এবং (২) হিসাব যদি চাইবি মা তোর। সে সময়ের ‘মেগাফোন’ কোম্পানির গায়ক
ভবানীচরন দাস ছিলেন একজন জনপ্রিয় শিল্পী। ধ্রুপদ, ধামার ও খেয়াল গানে ব্যুৎপত্তির জন্য তাঁর বিপুল
খ্যাতি ছিল। তাঁর কণ্ঠে একটি লোকপ্রিয় রামপ্রসাদী শ্যামাসংগীত ছিল ‘অন্ন দে, অন্ন দে গো অন্নদা’। তিনি
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ গানটিও সম্ভবত প্রথম রেকর্ড করেন। গিরীন চক্রবর্তীর কথায় ও সুরে ‘তুমি
কোন বা দ্যাশে’ গানটি ভবানীচরন দাসের কণ্ঠে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে।

আব্বাসউদ্দিন, চিত্ত রায়, ভবানীচরণ দাস, চিন্ময় লাহিড়ী, আঙুরবালা দেবী, কমলা ঝরিয়া, ইন্দুমতী দেবী,
শৈল দেবী, হরিমতী দেবী, রাধারাণী দেবী, বিজনবালা ঘোষ দস্তিদার, যূথিকা রায়, শচীন দেববর্মন, তালাত
মাহমুদ, অসিতবরণ, সত্য চৌধুরী, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, বাঁশরী লাহিড়ী, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
প্রমুখ বাংলা গানের উজ্জ্বল নক্ষত্রেরা গিরীন চক্রবর্তীর সৃজিত গান গেয়েছেন। সে যুগের আব্বাসউদ্দিন থেকে
পরবর্তীতে,অমর পাল, বিষ্ণুপদ দাস প্রমুখ স্বনামধন্য লোকসংগীতশিল্পীরা তাঁর গান গেয়েছেন।
আব্বাসউদ্দিন-এর ‘আল্লা ম্যাঘ দে’ এবং ‘নাও ছাড়িয়া দে’ -- এই কালজয়ী গানদুটিরও স্রষ্টা গিরীন চক্রবর্তী
। জালালউদ্দিন নামে এক গ্রামীণ লোকশিল্পীর রচিত লোকগানের প্রথম চারটি পঙক্তি সংগ্রহ করে ‘আল্লা
ম্যাঘ দে’র গানের বাকি অংশটা নিজেই রচনা করেছিলেন।

তাঁর  জন্মশতবর্ষে  ২০১৮-র ২৪ জুলাই,  কলকাতার  শিশির মঞ্চে  লোকগানের  বিশিষ্ট  শিল্পী  ও গবেষক
ড. তপন রায়, গিরীন চক্রবর্তীর কন্যা চন্দা চট্টোপাধ্যায় এবং গিরীনবাবুর শিষ্য-অনুরাগীদের সংস্থা ‘গিরীন
চক্রবর্তী  সংগীত  সংসদে’র  প্রশংসনীয়  উদ্যোগে,  তরুণ সরকারের  ফোক ট্রুপ, ‘মাদল’ এবং চাতরা,
মসলন্দপুরের ‘অচিন পাখি’  গানের  দলের  ব্যবস্থাপনায়  লোকগানের  এই  অসামান্য  কারিগর ও  মহান
সংগীতসাধকের স্মরণে একটি সুন্দর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন সান্ধ্য-অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল।  অনুষ্ঠান  সঞ্চালনায়
ছিলেন দেবাশিস বসু, মধুমিতা বসু ও কৌশিক সেন। পূর্ণদাস বাউলের  মতো  প্রবীণ  প্রথিতযশা শিল্পীদের
থেকে শুরু করে আরো অনেক গুণী সংগীতশিল্পী - গীতা চৌধুরী, নীতিশ দত্তরায়, নূপুর
গঙ্গোপাধ্যায়, সুস্মিতা গোস্বামী-সহ ও অন্যান্যরা তাঁদের গানের ডালি সাজিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন।
পূর্ণদাস বাউলের কণ্ঠে ‘তোরা আয় কে’ গানটির পরিবেশন শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে। আয়োজক ‘মাদল’,
‘গিরীন চক্রবর্তী সংগীত সংসদ’, ‘অচিন পাখি’ ছাড়াও অন্যান্য  লোকগানের  দলের  মধ্যে  উপস্থিত  ছিল
‘বাহিরানা’, ‘শ্রীভূমি’ ও ‘ভ্রমরা’। বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক ডক্টর বরুণ কুমার চক্রবর্তী প্রমুখ আরো
কয়েকজন গবেষক ও আলোচক  গিরীন চক্রবর্তীর  জীবন  ও  সৃজন জগতের  নানা  অজানা  দিক  
সম্পর্কে আলোকপাত করে স্মৃতিচারণ করেন। এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের অকুণ্ঠ ধন্যবাদ ও অভিনন্দন
জানাই।

শৈল দেবীর কণ্ঠে গিরীন চক্রবর্তীর একটি জনপ্রিয় গান ছিল - ‘মোছে কি গো পরিচয়?’ এই  অনুষ্ঠানের  
সাফল্য সেই গানের কথাকেই সার্থক করে ধ্বনিত হয়, এত উপেক্ষা, এত উদাসীনতা ও বিস্মৃতি
সত্ত্বেও প্রকৃত শিল্পীর ‘পরিচয়’ কখনও মুছে যায় না, যেতে পারে না।

বরেণ্য সংগীতসাধক ও বাংলা সংগীত জগতের বিশেষত বাংলা লোকগানের অন্যতম পুরোধা গিরীন  
চক্রবর্তীর অমর, উজ্জ্বল স্মৃতির প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। -- রাজেশ দত্ত। চন্দননগর। ৬ বৈশাখ,
১৪২৬ বঙ্গাব্দ।

সাহায্য-সূত্র:
(১) ‘শতবর্ষে ‘আল্লা ম্যাঘ দে’-র স্রষ্টা। লেখক: অশোক দাস। ‘গণশক্তি’ পত্রিকা, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮।
(২) গিরীন চক্রবর্তীর স্মৃতিতে ‘খবর ৭ দিন’ চ্যানেলের একটি তথ্যচিত্র প্রতিবেদন এবং ইন্টারনেট
সূত্রে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যাদি।

সশ্রদ্ধ স্মরণে, স্মৃতিচারণে গিরীন চক্রবর্তীর কথা। ২০১৪ সালে তাঁর ৯৪তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে
‘খবর ৭ দিন’ নামে একটি আঞ্চলিক গণমাধ্যমের চ্যানেল একটি তথ্যচিত্র প্রতিবেদন নির্মাণ করে। প্রখ্যাত
লোকসংগীতশিল্পী অমর পাল তাঁর শিক্ষাগুরু গিরীন চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণ করেন। নীচের লিঙ্কে ক্লিক করে
এই তথ্য চিত্র-প্রতিবেদনটি দেখুন...
https://www.youtube.com/watch?v=xbXLPc1pZiE&feature=youtu.be    

---------------------------------------------------

আমার সংগ্রহ থেকে আমার পছন্দের গিরীন চক্রবর্তীর  কয়েকটি  গান আপনাদের শোনার
 জন্য  উপহার
দিলাম। নীচের লিঙ্কগুলো দেখুন। গিরীন চক্রবর্তীর সেরা গানের সংকলন। আটটি
অবিস্মরণীয় গান।

১) কিশোরগঞ্জে মাসির বাড়ি – কথা, সুর ও কণ্ঠশিল্পী: গিরীন চক্রবর্তী। (১৯৪২)
২) শিয়ালদহ গোয়ালন্দ আজও আছে ভাই – কথা, সুর ও কণ্ঠ: গিরীন চক্রবর্তী। (১৯৫২)
৩) বাড়ি ছিল পদ্মা নদীর পাড়ে – কণ্ঠশিল্পী: চিত্ত রায়, কথা ও সুর: গিরীন চক্রবর্তী। (প্রকাশকাল অজানা)
৪) ভাই রে, মানুষ নাই রে দেশে – কথা ও সুর: চারণকবি মুকুন্দ দাস। কণ্ঠশিল্পী: গিরীন চক্রবর্তী।
(প্রকাশকাল অজানা)
৫) তোর হাতের ওই খড়গ এবার – কথা, সুর ও কণ্ঠশিল্পী: গিরীন চক্রবর্তী। (১৯৪৯, শ্যামাসংগীত)
৬) এই শিকল পরা ছল – কথা: নজরুল ইসলাম, সুর ও কণ্ঠশিল্পী: গিরীন চক্রবর্তী। (১৯৪৯)
৭) কারার ওই লৌহকপাট – কথা ও সুর: নজরুল ইসলাম। কণ্ঠশিল্পী: গিরীন চক্রবর্তী। (১৯৪৯)
৮)বলো বীর বলো উন্নত মম শির – কথা: নজরুল ইসলাম, সুর ও কণ্ঠশিল্পী: গিরীন চক্রবর্তী। (১৯৫২)
আমার সংগ্রহে থাকা উপরের ৮টি গান শুনতে ও ডাউনলোড করতে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন:
https://drive.google.com/file/d/1RurtHDj4nJEYgllPp-Q0dotNP1dw3Ckt/view?usp=sharing      

**********************************************************

আমার সংগ্রহ থেকে বিভিন্ন খ্যাতনামা শিল্পীদের কণ্ঠে গিরীন চক্রবর্তীর সৃষ্ট জনপ্রিয় ১১টি গানের সংকলন।
১) আমায় তোমরা চেনো কি গো – কণ্ঠশিল্পী: চিত্ত রায়, কথা ও সুর: গিরীন চক্রবর্তী।
২) আল্লা ম্যাঘ দে – কণ্ঠশিল্পী: আব্বাসউদ্দিন। কথা ও সুর: গিরীন চক্রবর্তী। (জালালউদ্দিন নামে এক গ্রামীণ
লোকশিল্পীর রচিত লোকগানের প্রথম চারটি পঙক্তি সংগ্রহ করে বাকি গানটা গিরীন চক্রবর্তীর রচনা)
৩) নাও ছাড়িয়া দে – কণ্ঠশিল্পী: আব্বাসউদ্দিন। কথা ও সুর: গিরীন চক্রবর্তী।
৪) নিরাশার নদী তীরে বেলা বয়ে যায় – কণ্ঠশিল্পী: সত্য চৌধুরী। কথা ও সুর: গিরীন চক্রবর্তী।
৫) ধিক ধিক আমার এ জীবনে – কণ্ঠশিল্পী: শচীন দেববর্মন। কথা ও সুর: গিরীন চক্রবর্তী।
৬) ফুল ছিল ফুল বনে – কণ্ঠশিল্পী: অসিতবরণ। কথা গিরীন চক্রবর্তী ও সুর: দুর্গা সেন (১৯৪৬)।
৭) দুটি পাখী দুটি তীরে – কণ্ঠশিল্পী: তালাত মাহমুদ। গীতিকার: গিরীন চক্রবর্তী, সুরকার: কমল দাশগুপ্ত।
৮) মনেরে মানাই যদি – কণ্ঠশিল্পী: শৈল দেবী। গীতিকার: গিরীন চক্রবর্তী, সুরকার: চিত্ত রায় (১৯৪২)।
৯) দীন দুনিয়ার মালিক তুমি – কণ্ঠশিল্পী: ঝর্ণা দে। গীতিকার: মোহিনী চৌধুরী। সুরকার: গিরীন চক্রবর্তী।
ছায়াছবি: ‘অভিনয় নয়’ (১৯৪৫)।
১০) তোমার আকাশে ঝিলমিল করে চাঁদের আলো– কণ্ঠশিল্পী: সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। কথা ও সুর: গিরীন
চক্রবর্তী। (সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জীবনে প্রথম রেকর্ড করা গান, ১৯৪৫)
১১) মোছে কি গো পরিচয় – কণ্ঠশিল্পী: ইরফাত আরা দেওয়ান। কথা ও সুর: গিরীন চক্রবর্তী। ( (১৯৪২
সালে এই গানটির আদি রেকর্ডিং-এ কণ্ঠশিল্পী ছিলেন শৈল দেবী)
উপরের ১১টি গান শুনতে ও ডাউনলোড করতে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন:
https://drive.google.com/file/d/19Iuv7yprQ8r0vsPtC6Z0z5oQguzXTQhX/view?usp=sharing       

*টীকা :
নজরুল ইসলামের গানে গিরীন চক্রবর্তী-সহ অন্যান্য সুরকারদের সুর সংযোজনে গানের অসম্পূর্ণ তালিকার
সমস্যা প্রসঙ্গে বিভূতিভূষণ মণ্ডল তাঁর ‘নজরুলের গান: কিছু অমীমাংসিত প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “চার
হাজারের মতো নজরুলের গানকে শ্রেণিবিন্যাস বা বর্গীকরণ করা সত্যিই একটি জটিল সমস্যা। সুরস্রষ্টা
নজরুলের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি বড়ো প্রতিবন্ধকতা হলো - কোনগুলো নজরুলের সুরারোপিত এবং
কোনগুলো নয় তাকে চিহ্নিত করার সমস্যা। বিশেষত সেরকম কোনো মানদ- যখন আমাদের জানা নেই।
নজরুল ব্যতিরেকে তাঁর গানে অন্যান্য যেসব সুরকার সুরসংযোগ করেছেন তাদের একটি অসম্পূর্ণ তালিকা
এরকম: অনিল বাগচি (২টি গান), অনিল ভট্টাচার্য (২টি গান), আবদুল করিম (১টি গান), আব্বাসউদ্দীন
আহমদ (১১টি গান), কমল দাশগুপ্ত (১৬৪টি গান), মোহাম্মদ আসাফউদ্দৌলাহর মতে ৪০০ টি গান), কালিদাস
বন্দ্যোপাধ্যায় (১টি গান) কৃষ্ণচন্দ্র দে (২টি গান), কাশেম মল্লিক (কে মলি্লক) (১০টি গান), গিরীন চক্রবর্তী
(২৪টি গান) গোপাল সেন (২টি গান), গোপেন মল্লিক (৪টি গান), গোলাম হায়দার (২টি গান), জ্ঞান দত্ত (৬টি
গান), চিত্ত রায় (৪০টি গান), জগন্ময় মিত্র (১টি গান), জমীরুদ্দীন খাঁ (২টি গান), তুলসী লাহিড়ী (৪টি গান), দুর্গা
সেন (৪টি গান), ধীরেন দাস (৮টি গান), নরেন মুখোপাধ্যায় (১টি গান), নিতাই ঘটক (৫১টি গান), নীলমণি
সিংহ (১টি গান), পঙ্কজ কুমার মল্লিক (২টি গান), পাঁচুবাবু (১টি গান), পিয়ারু কাওয়াল (২টি গান),
বিজনবালা ঘোষদস্তিদার (৫টি গান), বিমল দাশগুপ্ত (৪টি গান), ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় (১টি গান), মনোরঞ্জন
সেন (৮টি গান), মৃণালকান্তি ঘোষ (৩টি গান), মোহিনী সেনগুপ্ত (৪টি গান), রতন মাঝি * (১টি গান), রত্নেশ্বর
মুখোপাধ্যায় (২টি গান), রাইচাঁদ বড়াল (২টি গান), রণজিৎ রায় (২৮টি গান), শচীন চক্রবর্তী (২টি গান), শেখ
লুৎফর রহমান (২টি গান) শৈলেন দত্তগুপ্ত (২১টি গান), সুখময় গঙ্গোপাধ্যায় (৬টি গান), সত্য চৌধুরী (২টি
গান), সত্যেন চক্রবর্তী (১০টি গান), সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় (২টি গান), সুবল দাশগুপ্ত (৩৪টি গান), সুবোধ
দাশগুপ্ত (১টি গান), সুরেশ চক্রবর্তী (৪টি গান), সুরেশ চৌধুরী (২টি গান), এবং সুরসাগর হিমাংশু দত্ত (৪টি
গান)। যদি সুরারোপিত গানের মোট সংখ্যা হয় দুই হাজার (তর্ক সাপেক্ষে), তবে এই তালিকায় শ’
পাঁচেকের মতো গানের সুরকার নজরুল নন। অবশ্য এই তালিকা শুধু অসম্পূর্ণই নয়, অসম্ভবও, কারণ
সকল তথ্য পাওয়া যায়নি। নজরুলের গানে সুর-যোজনায় আরও অধিক সংখ্যক সুরকারের হস্তক্ষেপ
ঘটেছে বলে আমাদের ধারণা। সে কারণে সুরকার নজরুলের মূল্যায়ণ খণ্ডিত হবার আশংকা।” (সূত্র:
‘দৈনিক জনতা’) * এখানে উল্লেখ্য যে ‘রতন মাঝি’ গিরীন চক্রবর্তীর-ই ছদ্মনাম অর্থাৎ সেই অনুসারে
গিরীনবাবু সুরারোপিত নজরুলগীতির সংখ্যা ২৫টি।
বরেণ্য সংগীতসাধক ও বাংলা সংগীত জগতের বিশেষত বাংলা লোকগানের অন্যতম পুরোধা গিরীন চক্রবর্তীর অমর,
উজ্জ্বল স্মৃতির প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।
^^ উপরে ফেরত ^^  

মিলনসাগরে কবি গিরীন চক্রবর্তীর কবি পরিচিতির পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .
প্রবাদপ্রতিম সংগীতসাধক ও বাংলা সংগীত জগতের বিশেষত বাংলা লোকগানের অন্যতম পুরোধা গিরীন চক্রবর্তী