কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় - ছিলেন
রাজশাহী জেলার নাটোর এস্টেটের মহারাজা। তাঁর
নামের বানান কোথাও রয়েছে “জগদিন্দ্রনাথ” এবং
কোথাও রযেছে “জগদীন্দ্রনাথ”। আমরা “জগদিন্দ্রনাথ”
বানানটি ব্যবহার করেছি কারণ এই বানানটিই তাঁর
সম্পাদিত এবং “মানসী ও মর্ম্মবাণী” পত্রিকাতে দেওয়া
রয়েছে। কিন্তু যখন যেখান থেকে তাঁর কবিতা ও তথ্য তোলা হয়েছে, তখন সেইখানে দেওয়া বানানই রাথা
হয়েছে।
সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত “সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান”, প্রথম খণ্ড, পঞ্চম সংস্করণ,
২০১০ এবং শিশিরকুমার দাশ সম্পাদিত “সংসদ বাংলা সাহিত্যসঙ্গী” প্রভৃতি গ্রন্থে কবির জন্মের তারিখ
২০শে অক্টোবর ১৮৬৮ পাই। কিন্তু শোধগঙ্গা ওয়েবসাইটে, এস.এম.রবিউল করিম এর ইতিহাস বিষয়ক
“Rajshahi zamindars a historical profile in the colonial period 1765 - 1947” নামক পি.এইচ.ডি-র থিসিসে
(শোধগঙ্গা ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত), নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের জন্মের তারিখ দেওয়া রয়েছে ২৬শে
অক্টোবর ১৮৬৮।
কবির পূর্বনাম ছিল ব্রজনাথ। তাঁর জন্মদাতা পিতার নাম শ্রীনাথ। নাটোরের মহারাজা গোবিন্দনাথের স্ত্রী
মহারাণী ব্রজসুন্দরী দেবী শৈশবেই কবিকে দত্তকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর নতুন নামকরণ
করা হয় জগদিন্দ্রনাথ।
১৮৮৫ সালে মাতা মহারাণী ব্রজসুন্দরী দেবী তাঁর বিবাহ দেন শ্যামমোহিনী দেবীর সঙ্গে। তখন কবির বয়স
মাত্র ১৭ বছর। তাঁদের প্রথম দুই সন্তান, প্রথমে পুত্র ও দ্বিতীয়া কন্যা, নাটোরে থাকাকালীন জন্মের পরে
শৈশবেই মারা যায়। তাই জগদিন্দ্রনাথ চিকিত্সকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর পরিবারকে নিয়ে কলকাতায়
এসে প্রথমে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে ও পরে ৬নং ল্যান্সডাউন রোডে (অধুনা শরৎ বোস রোড) বাসা ভাড়া
করে থাকতে শুরু করেন। কিছুকাল পরে তিনি সেই বাড়ীটিই আশি হাজার টাকায় কিনে নেন।
কলকাতাতেই তাঁর কন্যা রাজকুমারী বিভাবতী এবং পুত্র রাজকুমার যোগীন্দ্রনাথের জন্ম হয়। রাজকুমারী
বিভাবতীর বিবাহ হয় কলকাতা হাইকোর্টের উকিল, যতীন্দ্রনাথ লাহিড়ীর সঙ্গে ১৯০৫ সালে। রাজকুমার
যোগীন্দ্রনাথ তাঁর পিতার মতই সাংস্কৃতিবান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম “রজনীগন্ধা”
(আমাদের সংগ্রহে নেই)। পিতার মৃত্যুর পরে মহারাজ যোগীন্দ্রনাথ রায় "মানসী ও মর্ম্মবাণী" পত্রিকার
সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতায়।
২৬ ডিসেম্বর ১৯২৫ তারিখে গড়ের মাঠের কাছে হাঁটতে গিয়ে একটি গাড়ির ধাক্কায় তিনি আশঙ্কাজনকভাবে
আহত হন। ১০ দিন হাস্পাতালে চিকিত্সাধীন থাকার পর ৫ই জানুয়ারী ২০২৬ তারিখে তিনি পরলোক গমন
করেন। তাঁর অকাল মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, লর্ড লিট্টন প্রমুখরা শোক-সন্দেশ পাঠিয়েছিলেন।
ধনী জমিদার হয়েও সমাজের আদর্শস্থানীয় হয়েছিলেন কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়। এত বড় বহুমুখী
প্রতিভা সচরাচর দেখা যায় না। খেলাধুলা, সঙ্গীত ও সাহিত্যের জগতে তিনি নিজের সাক্ষর রেখে গিয়েছেন।
পত্রিকার সম্পাদনার মধ্য দিয়ে বাঙালীর কাছে যেমন পৌঁছে দিয়েছেন উত্কৃষ্ট সাহিত্য সম্ভার, তেমনই
বাঙালীকে খেলার মাঠে টেনে নিয়ে গিয়ে বিদেশী-শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন,
স্বদেশ-চিন্তার এক নতুন দিক উন্মোচন ক’রে।
আমরা মিলনসাগরে কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে
দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা। এই পাতা কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের প্রতি মিলনসাগরের
শ্রদ্ধার্ঘ্য।
উত্স -
- আর্কাইভ.অর্গ থেকে “মানসী” এবং "মানসী ও মর্ম্মবাণী" পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যা এবং কবির
"সন্ধ্যাতারা" কাব্যগ্রন্থের PDF ।
- এস.এম.রবিউল করিম, শোধগঙ্গা ওয়েবসাইটে প্রকাশিত, ইতিহাস বিষয়ক “Rajshahi zamindars a
historical profile in the colonial period 1765 - 1947” নামক পি.এইচ.ডি-র থিসিস।
- মাহবুব সিদ্দিকী, বঙ্গদেশে ক্রিকেটের সূচনাপর্ব, প্রথম আলো ওয়েবসাইট।
- সাইফুদ্দীন চৌধুরী, ক্রিকেটপ্রেমী মহারাজা, প্রথম আলো ওয়েবসাইট।
- Faisal Caesar, Bangladesh: Natore and its relation to cricket, www.cricketsoccer.com ।
- Mohammad Amjad Hossain, Tagore songs: Stirring the soul. ।
- শিশির কুমার দাশ সম্পাদিত সংসদ বাংলা সাহিত্য সঙ্গী, ২০০৩।
- সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান ১ম খণ্ড, ২০১০।
- রাজশাহী জেলার প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব, www.rajshahi.gov.bd ।
- বাংলা উইকিপেডিয়া।
- Wikipedia।
কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
আমাদের ই-মেল - srimilansengupta@yahoo.co.in
এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৫ই আগস্ট ২০২০ ^^ উপরে ফেরত
...
কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের শিক্ষাজীবন - পাতার উপরে . . .
কবির শৈশবে অজ্ঞাত কারণে দুচোখের দৃষ্টিশক্তি বিঘ্নিত হয়। কলকাতায় চিকিত্সার পরে তাঁর একটি
চোখে দৃষ্টি ফিরে এলেও একটি চোখ চিরতরের জন্য দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ে। এছাড়া নাটোরে, তিনি ম্যালেরিয়া,
গাউট প্রভৃতি নানা ব্যাধিতে ভুগছিলেন দেখে তাঁদের এস্টেটের দেওয়ান যাদবচন্দ্র মৈত্রর পরামর্শে তাঁকে
পড়াশুনার জন্য, ১৮৭৯ সালে (ফাল্গুন ১২৮৫) ১১ বছর বয়সে রাজশাহী শহরের ইংরেজি মাধ্যমের রাজশাহী
কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয় পঞ্চম শ্রেণিতে। ১৮৮৬ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে
রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন। রাজশাহীতে লেখাপড়া করার সময় পাঁচআনি মাঠে অনুষ্ঠিত ব্রিটিশ সাহেবদের
ফুটবল, হকি, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলা দেখতেন। শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি আর পড়া চালিয়ে যেতে
পারেননি। তা সত্ত্বেও কবি বাংলা সংস্কৃত ও ইংরেজি সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্ব অর্জন করেছিলেন।
কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় ও ভারতীয় ক্রিকেট - পাতার উপরে . . .
ক্রীড়ামোদী হিসেবেও তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ভারত তথা বাংলায় ক্রিকেট খেলার প্রচলন ও
জনপ্রিয় করার তিনি অন্যতম পথিকৃত ছিলেন। তাঁকে বাংলার ক্রিকেটের জনক বললেও অত্যুক্তি হবে না।
“নাটোর ইলেভেন” (Natore XI) নামে তিনি ক্রিকেট টিম গঠন করেছিলেন এবং নিজে সেই টিমের অধিনায়ক
ছিলেন। জগদিন্দ্রনাথ সপরিবারে কলকাতার বাসিন্দা হওয়ার পর কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার মসুয়া
গ্রামের বিখ্যাত রায় পরিবারের সদস্য সারদারঞ্জন রায়ের (১৮৫৮–১৯২৫) সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে
তাঁর। সারদারঞ্জন রায় ছিলেন কবি সুকুমার রায়ের পিতা ও কবি সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ, বিখ্যাত
সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভাই। তাঁদের আরও দুই ভাইয়ের নাম মুক্তিদারঞ্জন এবং
কুলদারঞ্জন যাঁরা নাটোরের টিমে ক্রিকেট খেলতেন। উপেন্দ্রকিশোরের পূর্ব নাম ছিল কামদারঞ্জন রায়। পাঁচ
বছর বয়সে তাঁকে ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জের জমিদার হরিকিশোর রায়চৌধুরী দত্তক নিয়ে নাম
রাখেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।
মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ কলকাতা টাউন ক্লাব এবং বেঙ্গল জিমখানার মেম্বার ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি
কলকাতা ক্রিকেট ক্লাবের পরিচালন মণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। কলকাতার বালিগঞ্জের পূর্বদিকে অবস্থিত
বন্ডেল রোডের কাছে নাটোর পার্কে, প্রায় ২৫ হাজার টাকায় ৪৫ একর জমিতে নাটোর গার্ডেন নামক ক্রিকেট
খেলার মাঠ এবং মাঠের পাশে সুন্দর একটি প্যাভিলিয়নও নির্মাণ করেছিলেন। এককালে কলকাতার এই
“নাটোর গার্ডেন” নাকি কলকাতার ইডেন গার্ডেনের সঙ্গে পাল্লা দিত! এভাবেই ১৯০১ সালে জগদিন্দ্রনাথ
রায়ের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় কলকাতার বালিগঞ্জের নাটোর পার্কে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল “নাটোর ইলেভেন” নামে
বাংলার একটি ক্রিকেট দল। দলটি “নাটোর টিম” নামেও পরিচিতি ছিল।
মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ নিজেও ভাল ক্রিকেট খেলোয়ার ছিলেন। তাঁর একটি চোখ ছোটবেলায় কোনো অসুখে
নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তবুও তিনি ব্যাটিং ও ফীল্ডিং করতে পারতেন। তাঁর পুত্র, পরবর্তী নাটোরের
মহারাজা যোগীন্দ্রনাথ রায়ও ভাল ক্রিকেট খেলোয়ার ছিলেন।
সেই সময়ের ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের ক্রিকেট টিমগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পাতিয়ালার মহারাজার
ক্রিকেট দল, জামনগরের বিখ্যাত রণজিত সিংয়ের ক্রিকেট দল, কোচবিহারের মহারাজার ক্রিকেট
দল, রাজস্থানের যোধপুর দল, কাশ্মীর (শ্রীনগর) দল, কলম্বো টিম, রেঙ্গুন টিম প্রভৃতি। কোচবিহারের
মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণের কোচবিহার ক্রিকেট টিমের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ১৮৯০ সালে মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ
নিজেই নাটোর ক্রিকেট দল, পুরোপুরি দেশীয় খেলোয়াড় দিয়ে গঠন করেছিলেন। তাঁর দলে খেলেছেন
তখনকার দিনের বিখ্যাত খোলোয়ার মেহেতা, পালওয়াঙ্কার বালু, শিবরাম, জসওয়ন্ত, গণপত পালওয়াঙ্কার,
বিঠল পালওয়াঙ্কার, শেষাচারী, কে.এন,মিস্তিরি, ওয়ার্ডেন, এইচ.এল. সেম্পর, সারদারঞ্জন, মুক্তিদারঞ্জন,
কুলদারঞ্জন এবং মণি দাস।
তিনি খেলার মাঠে জাত-পাতের বাছ-বিচারের উর্দ্ধে ছিলেন। ক্রিকেট মূলত উচ্চবিত্ত ও উঁচু জাতের মানুষের
খেলা। সেখানে উনি নীচু জাতের মণি দাসকে নিয়েছিলেন তাঁর দলে, কেবলমাত্র খেলার উত্কর্ষতা বিচার
করেই। এখানে উল্লেখযোগ্য হলো খেলোয়াড় পলওয়াঙ্কার বালুর কথা, যাঁকে অন্যত্র কেবল নীচু জাত বলে
আলাদা খাবার খেতে দেওয়া হতো। তাঁকে নিয়ে মহারাজা জগদিন্দ্রনাথের দলে সেরকম কোন কথা শোনা
যায়নি।
তিন তাঁর টিমের দক্ষ খেলোয়ারদের পুরস্কৃত করতেন। ভালো খেলোয়াড়দের সোনার ঘড়ি ও চেইন, হিরের
আংটি ইত্যাদি পুরস্কার হিসেবে দিতেন। মাঝেমধ্যে খেলোয়াড়দের নগদ অর্থও দিতেন। একবার, মহারাজার
রাজশাহীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও লেখক শশধর রায় ক্রিকেটের পেছনে অত্যধিক অর্থ ব্যয় হচ্ছে উক্তি করলে
মহারাজা বলেন --- “আমরা দেখাতে চাই যে আমরা কিছুতেই পিছপাও নহি। উহারা (ইংরেজগণ), মিথ্যা
নিন্দা রটায় যে আমরা অলস ও দুর্বল। তাই আমি দেখাইব যে নিজের খেলাতেই আমরা উহাদিগকে
পরাজিত করিতে সমর্থ।” ---ক্রিকেটপ্রেমী মহারাজা, সাইফুদ্দীন চৌধুরী প্রথম আলো॥
কলকাতার বাইরে ভারতের অন্যান্য জায়গাতেও অনেকগুলো খেলায় অংশগ্রহণ করেছিল নাটোর ইলেভেন।
ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের বিখ্যাত ক্রিকেট দলগুলোর সঙ্গেও নাটোর ইলেভেনের খেলা শুরু হয়। এদের
মধ্যে ছিল, পাতিয়ালার মহারাজার ক্রিকেট দল, জামনগরের বিখ্যাত রঞ্জিত সিংজীর ক্রিকেট দল,
কোচবিহারের মহারাজার ক্রিকেট দল, রাজস্থানের যোধপুর দল, কাশ্মীর (শ্রীনগর) দল, কলম্বো টিম, রেঙ্গুন
টিম প্রভৃতি। এই শক্তিশালী ক্রিকেট দলগুলোর সঙ্গে নাটোর ইলেভেনের খেলায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাটোর
টিম বিজয়ী হতে থাকে। এভাবে ১৯০১ থেকে শুরু করে ১৯১৪ সালের মধ্যে নাটোর টিম ভারতবর্ষে একটি
অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিকেট দল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯১১ সালে কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ পরলোক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুর দু-তিন বছরের
মধ্যেই ১৯১৪ সাল নাগাদ জগদিন্দ্রনাথের ক্রিকেটের প্রতি উত্সাহ কমে আসে। তিনি তখন সাহিত্যের দিকে
ঝুঁকে পড়েন। “মানসী” পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন এই বছর।
তাঁর এই ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়া নিয়ে ফৈসল সিজার, প্রথম আলো ওয়েবসাইটে তাঁর লেখা Natore and its
relation to cricket প্রতিবেদনে লিখেছেন . . .
“Why the Maharaja of Natore gave up promoting the game, which he loved so dearly, remains a moot
question. Perhaps, all his nationalistic sentiments and passion for the game cropped up to dent the pride of
his arch-rival, the Maharaja of Cooch Behar, which faded as soon as he died. But whatever the reason was,
the Maharaja of Natore had played a vital role in popularizing cricket in Natore and Bengal.”
কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের রাজনীতি - পাতার উপরে . . .
মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় রাজশাহী অ্যাসেসিয়েশনের (১৮৭২সালে প্রতিষ্ঠিত) ৫ম সভাপতি হয়েছিলেন।
১৮৭৭ সালের ১ম দিল্লী দরবারে, বড়লাট লর্ড লিট্টন জগদিন্দ্রনাথ রায় কে “মহারাজা” উপাধিতে ভূষিত
করার প্রস্তাব মঞ্জুর করেন। ১৮৭৮ সালের জানুয়ারি মাসে, সেই উপাধি ও মানপত্র হাতে পান মহারাজা
জগদিন্দ্রনাথ রায়, নাটোরের কাছে জঙ্গলি তে অনুষ্ঠিত আরেকটি দরবারে, বালার তদানন্তীন লেফটেন্যান্ট
গভর্ণরের হাত থেকে।
মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় প্রদেশ কংগ্রেস দলের সক্রীয় কর্মী ছিলেন। তিনি ১৮৯৭ সালের বাংলায় প্রাদেশ
কংগ্রেস অধিবেশনের রিসেপশন কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন। সেবার অধিবেশন হয় নাটোরে। তাঁর
আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথও সেই অধিবেশন অংশ গ্রহণ করেছিলেন।
বঙ্গীয় স্বায়ত্তশাসন আইন প্রবর্তন বিষয়ে তিনি সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহারাজা লক্ষ্মীশ্বর সিংহ,
আনন্দমোহন বসু, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের সঙ্গে রাজনীতির সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন।
১৯০১ সালে মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ, মহারাজা সূর্য্যকান্ত চৌধুরী ও দিঘাপাটিয়ার রাজা প্রমদানাথের সঙ্গে
মিলে “বেঙ্গল ল্যাণ্ড হোল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন”-এর প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯১২ সালে মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় মন্টোগো-ফোর্ড ব্যবস্থাপনার অন্তর্গত কাউনসিলের সদস্য নির্বাচিত
হন ৩য় বারের জন্য। ১৯১৩ সালে বড়লাট লর্ড কারমাইকেল মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের আতিথেয়তা
গ্রহণ করেন নাটোরে গিয়ে।
কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গীত, নাটক ও সাহিত্য-সাধনা - পাতার উপরে . . .
কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়, সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনায় সাহিত্যপ্রেমীদের মাঝে এবং বিশিষ্ট
পাখোয়াজি হিসাবে সঙ্গীত-জগতে খ্যাতিমান হয়েছিলেন এবং অনেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
তিনি নাটক ভালবাসতেন এবং বেশ কিছু নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন।--- এস.এম.রবিউল করিম,
“Rajshahi zamindars a historical profile in the colonial period 1765 - 1947” নামক পি.এইচ.ডি-র থিসিস।
মাতা মহারাণী ব্রজসুন্দরী দেবীর কথায়, কবির ২১ বছর বয়সে তিনি জমিদারী দেখাশোনার কাজে নেমে
পড়েন। তিনি জমিদারীর থেকে সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতেই আরও বেশী কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। এই সময়ে
বহু সাহিত্যসভা আয়োজিত হতে থাকে নাটোরের কোর্ট, ভিক্টোরিয়া লাইব্রেরী প্রভৃতি জায়গায়।
তিনি "মানসী" পত্রিকার ৬ষ্ঠ বর্ষ (১৯১৪) থেকে সম্পাদনা শুরু করেন। এর দু-বছর পরে “মানসী” পত্রিকা,
অমূল্যচরণ বিদ্যাভুষণের “মর্মবাণী” পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হলে, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের সহ-সম্পাদনায়
আমৃত্য "মানসী ও মর্মবাণী' পত্রিকার সম্পাদনা করেন। সেই সময়ে “মানসী ও মর্মবাণী” বাংলায় অন্যতম
শ্রেষ্ঠ পত্রিকার খ্যাতি অর্জন করেছিল।
তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহকারী সভাপতি ছিলেন ১৩২২-২৪, ১৩৩২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫-১৭,
১৯২৫ খৃষ্টাব্দ) সময়কালে।
কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় এবং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - পাতার উপরে . . .
তিনি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে
রবীন্দ্রনাথের ৫০ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে ২৮-১-১৯১২ তারিখে রবীন্দ্র-সংবর্ধনার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন।
১৮৯৭ সালের নাটোর কংগ্রেস অধিবেশনের (প্রাদেশিক) রিসেপশন কমিটির সভাপতি ছিলেন মাহারাজা
জগদিন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ সেবার তাঁর আমন্ত্রণেই সেই অধিবেশনে গিয়েছিলেন এবং তিনি সেই অধিবেশনে
কোন গান করেন নি ঠিকই, কিন্তু সেখানে, অন্য ভাষায় দেওয়া বক্তৃতাগুলিরর তাত্ক্ষণিক বাংলা ভাষায়
অনুবাদ করে গিয়েছিলেন, দোভাষীর মতন।
মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের শিক্ষাজগতে অবদান ও দান-ধ্যান - পাতার উপরে . . .
নাটোরে তিনি একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে সেই স্কুলটির তাঁরই নামে মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ
রায় স্কুল নামকরণ করা হয়েছে। নারী শিক্ষার জন্য তিনি মোটেই পিছপা ছিলেন না। নাটোর গার্লস হাই
স্কুলের জন্য তিনি বহু অর্থ দান করেছিলেন। উত্তর কলকাতায় গোয়াবাগান পার্কে তিনি রাণী ভবানী স্কুলের
স্থাপনা করেন ১৯১৬ সালে।
তিনি নাটোর ও ময়মনসিংহের মধুপুরে দাতব্য চিকিত্সালয় খুলেছিলেন। নাটোরের জলসরবরাহের জন্যও
প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছিলেন।
তিনি নানা কাজে ও উদ্যোগে, বিভিন্ন সভা-সমিতির উন্নতিকল্পে অর্থ সাহায্য করতেন নির্দ্বিধায়। যে কোনও
ধর্মেরই হোক না কেন, সৎ কর্মে তিনি দান করতে পিছপা হতেন না। তাঁর পরলোক গমনের পরে প্রকাশিত
“মানসী ও মর্ম্মবাণী” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৩ সংখ্যায় প্রকাশিত দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা “স্বর্গীয়
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ” প্রবন্ধ থেকে জানা যাচ্ছে যে তিনি কলকাতার ভবানীপুরের খৃষ্টীয় মণ্ডলীর ভ্রাতৃ
সমিতির উন্নতিকল্পে অনেক সময়ে অর্থ সাহায্য করতেন।
রাজেন্দ্রলাল আচার্য্যর “বাঙ্গালীর বল” (১৯২১) গ্রন্থটি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের অর্থানুকুল্যে প্রকাশিত
হয়েছিল।
কবি জগদিন্দ্রনাথ রায়ের রচনাসম্ভার, কবিতা ও বৈষ্ণব পদাবলী - পাতার উপরে . . .
কবির কবিতা আমরা পেয়েছি “মানসী” এবং “মানসী ও মর্ম্মবাণী” পত্রিকায় বিভিন্ন সংখ্যায়। তিনি ১৯১৪
সালে “মানসী’ পত্রিকার ৬ষ্ঠ বর্ষ থেকে তা সম্পাদনা শুরু করেন। দু-বছর পরে ১৯১৬ সালে অমূল্যচরণ
বিদ্যাভূষণের “মর্ম্মবাণী” পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হলে “মানসী ও মর্ম্মবাণী” নামে পত্রিকাটি আমৃত্যু সম্পাদনা
করেন কবি-গল্পকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতায়।
তাঁর রচনাসম্ভারে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ “সন্ধ্যাতারা” (১৯১৬), জীবনী গ্রন্থ “নুরজাহান” (১৯১৭) এবং “দারার
দূরদুষ্টি” (দারার অদৃষ্ট?)। “হায়দরাবাদ” ও “সেকেন্দেরাবাদ” নামে তাঁর দুটি ভ্রমণ কাহিনী রয়েছে।
“সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থে তাঁর রচিত কবিতার মধ্যে ৮টি রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক কবিতা আছে যা সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে
তিনি কীর্তনের জন্যও লিখে থাকতে পারেন। এগুলিকে আমরা ভণিতাহীন বৈষ্ণব পদ হিসেবে দেখছি। তাই
তাঁর নাম মিলনসাগরের বৈষ্ণব পদাবলীর সূচীতেও যোগ করা হলো।