তাঁর লেখা এই করচা থেকে শ্রীচৈতন্যের নদীয়া থেকে নীলাচলে গমন ও তারপর দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারত- ভ্রমণের বৃত্তান্ত খুব সুন্দরভাবে পয়ার ছন্দে আমরা পাই। বিশেষজ্ঞদের অনুমান এই যে এই করচা থেকেই পরবর্তীকালের চৈতন্য-জীবনীকারগণ তথ্যপ্রাপ্ত করেছিলেন। এযাবৎ দেওয়া কবির জীবনের তথ্যাদি তাঁরই করচা থেকে পাওয়া গেছে , , , বর্দ্ধমান কাঞ্চননগরে@ মোর ধাম। শ্যামাদাস পিতৃ নাম গোবিন্দ মোর নাম॥ অস্ত্র হাতা বেড়ি গড়ি জাতিতে কামার। মাধবী নামেতে হয় জননী আমার॥ আমার নারীর নাম শশিমুখী হয়। একদিন ঝগড়া করি মোরে কটু কয়॥ নির্গুণে মূরখ বলি গালি দিলা মোরে॥ সেই অপমানে গৃহ ছাড়িলাম ভোরে॥ চৌদ্দশ ত্রিশ শাকে বাহিরেতে যাই। অভিমানে গর গর ফিরে নাহি চাই॥ ---১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ১-পৃষ্ঠা॥
গোবিন্দ দাসের করচায় শ্রীচৈতন্যর গৃহ ও পরিবার সম্বন্ধে তথ্য - পাতার উপরে . . . এই গ্রন্থে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় জানা যায় যে শ্রীচৈতন্যর গৃহে ঘরের সংখ্যা সহ গৃহের অবস্থান। তা ছিল রাজা বল্লাল সেনের নামযুক্ত দীঘীর নিকটে, যেখানে বর্তমানে বল্লাল ঢিবির অবস্থান, যেখানে এক সময়ে রাজা বল্লাল সেনের প্রাসাদ ছিল, যেখান থেকে তাঁর পুত্র কবি রাজা লক্ষ্মণ সেন, বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে পলায়ন করেছিলেন। আছে বর্ণনা শ্রীচৈতন্যের মাতা শচীদেবীর, তিনি নাকি “অতি খর্বকায়” অর্থাৎ বেঁটে ছিলেন এবং তিনি সদাই নিমাই নিমাই বলে ডাকতেন। এই রকমের বর্ণনা বিরল। রয়েছে মহাপ্রভুর স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী ও প্রভু নিত্যানন্দের বর্ণনাও . . .
গঙ্গার উপরে বাড়ী অতি মনোহর। পাঁচ খানি বড় ঘর দেখিতে সুন্দর॥ নগরের দক্ষিণ সীমায় প্রভুর বাস। হরিনামে মত্ত প্রভু সদাই উল্লাস॥ প্রকাণ্ড এক দীঘী হয় নিয়ড়ে তাহার। কেহ কেহ বলে যারে বল্লাল সাগর॥
যে সকল ভক্ত সদা থাকে প্রভুর কাছে। একে একে সকলের নাম কব পাছে॥ অদ্বৈত আচার্য্য আর স্বরূপ শ্রীবাস। আচার্য্যের দুই পুত্র অচ্যুত কৃষ্ণদাস॥ মুকুন্দ মুরারিগুপ্ত আর গদাধর। নরহরি বিদ্যানিধি শেখর শ্রীধর॥ অন্তরঙ্গ ভক্ত আরো দুই চারি জন। যাহাদের সঙ্গে হয় গোপনে ভজন॥ অবধৌত নিত্যানন্দ পাগলের মত। গড়াগড়ি দিয়া অশ্রু ফেলে অবিরত॥
শান্তমূর্ত্তি শচী দেবী অতি খর্ব্ব কায়। নিমাই নিমাই বলি সদা ফুকরার॥ বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী হন প্রভুর ঘরণী। প্রভুর সেবায় ব্যস্ত দিবস রজনী॥ লজ্জাবতী বিনয়িনী মৃদু মৃদু ভাষ। মুহি হইলাম গিয়া চরণের দাস॥ -- ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৪-পৃষ্ঠা॥
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে শ্রীচৈতন্যের গৃহের একটি ছোট্ট বর্ণনা আমরা পাই চূড়ামণি দাসের লেখা চৈতন্য জীবনী “ভূবন-মঙ্গল” বা “গৌরাঙ্গবিজয়” গ্রন্থ থেকেও . . . দক্ষিণে ত পূর্ব্বদ্বারী সুন্দর শ্রীঘরে। পূর্ব্বদ্বার অভ্যন্তরে সুরম্য চত্বরে॥ ---কলকাতার এশিয়াটিক সোটাইটি থেকে অগাস্ট ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত, সুকুমার সেন সম্পাদিত, চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গবিজয় গ্রন্থের ৪৪-পৃষ্ঠা॥
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৯৪৫ সালে, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য তাঁর সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থে, কেন কিছু মুসলমান কবি বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন হলেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে, গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন . . . “. . . রাম ও কৃষ্ণের উপর দেবত্ব আরোপিত হওয়ায় সেই-সকল কাহিনী (রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি) ইঁহারা তাঁহাদের নবলব্ধ ধর্ম্মের আদর্শের সহিত সামঞ্জস্য করিয়া মানিতে পারিলেন না। তাই কালক্রমে এদেশীয় মুসলমানদের নিকট বহুদেবতার পূজক হিন্দুদের ধর্ম্মকাহিনী পাঠের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হইয়া উঠিল। চর্চ্চার অভাবে এইজাতীয় অধিকাংশ কাহিনীই মুসলমানরা কালক্রমে ভুলিয়া গেলেন। কিন্তু চৈতন্যযুগে যখন প্রেমের প্রবল বন্যায় বঙ্গদেশ প্লাবিত, তখন তাহা মুসলমানদের আঙ্গিনার মধ্যেও প্রবেশ করিল। প্রায় সেই সময়ই প্রেমপূর্ণ বৈষ্ণব-হৃদয়ের উচ্ছ্বাস পদাবলীরূপে পরিস্ফুট হইয়া নৃত্যে ও সঙ্গীতে বাঙ্গালার গগন-পবন মুখরিত করিয়া তুলিল। এই প্রেমসঙ্গীত-মন্দাকিনী শুধু হিন্দুর গৃহপাশেই প্রবাহিত হয় নাই, মুসলমানদের আঙ্গিনার পাশ দিয়াও প্রবাহিত হইয়াছে। তাহার ফলে হিন্দুরা এই মন্দাকিনীর পূতবারি পানে যেরূপ কৃতার্থ হইয়াছেন, মুসলমানরা সেইরূপ না হইলেও প্রেমতৃষ্ণা নিবারণের জন্য এই ধারা হইতে যে সময় সময় বারি গ্রহণ করিয়াছেন, তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। হিন্দু কবিরা এই ভাবগঙ্গায় স্নাত হইয়া জাহ্নবীর অশেষ বীচিবিভঙ্গতুল্য অসংখ্য কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকার শাশ্বতমূর্ত্তি রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনা করিয়াছেন। মুসলমানদের মধ্যে কেহ কেহ এই ভাবের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া রাধাকৃষ্ণ নাম উল্লেখ করিয়া প্রেমের কথা গাহিয়াছেন।”
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক, শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ, ১৩২৫ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৮), তাঁর “সঙ্গীত শাস্ত্রের একখানি প্রাচীন গ্রন্থ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . . “. . . বৈষ্ণব পদাবলীর মত সুন্দর জিনিস বঙ্গসাহিত্যে আর নাই। কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া প্রাণ আকুল করিয়া তুলিতে পারে, এমন সুধাস্রাবী ঝঙ্কার বৈষ্ণব পদাবলী ভিন্ন বাঙ্গালায় আর কিছুতে নাই।”
কবি গোবিন্দদাস (কর্মকার) - ছিলেন বর্ধমান জেলার কাঞ্চননগরের বাসিন্দা। তাঁরা জাতিতে কামার বা কর্মকার ছিলেন। পিতা শ্যামাদাস কর্মকার এবং মাতা মাধবী দেবী। কবির স্ত্রীর নাম ছিল শশিমুখী। ১৪৩০ শকাব্দে ( ১৫০৮ খৃষ্টাব্দ ) তিনি তাঁর স্ত্রীর ভর্ৎসনা সহ্য করতে না পেরে গৃহত্যাগ করে নদীয়ায় গিয়ে শ্রীচৈতন্যের আশ্রয়লাভ করেন। তিনি শ্রীচৈতন্যের আশ্রয় লাভের পর থেকে সন্ন্যাসগ্রহণ ও তার পরবর্তিতে তাঁর নিত্যসঙ্গী ছিলেন এবং নিজে একটি করচা বা রোজনামচা বা ডায়েরি লিখে রাখতেন যা “গোবিন্দদাসের করচা” নামে খ্যাতি লাভ করে।
করচার রচনাকাল ও খণ্ডিত পুথি নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন, তাঁর “বঙ্গ সাহিত্য পরিচয়” গ্রন্থের ২য় খণ্ডে, বৈষ্ণব চরিত্যাখ্যান অধ্যায়ের ১১৪৭-পৃষ্ঠায়, "গোবিন্দদাসের করচা”-র রচনা কাল জানিয়েছেন ১৫১০ - ১৫১১ খৃষ্টাব্দ। এই সময়কালটি হচ্ছে প্রাপ্ত পুথির সময়কাল।
দীনেশচন্দ্র সেন দুভাবেই ভেবেছিলেন। প্রথমত করচাটি আরও দীর্ঘ হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয়ত করচাটি ঐ পর্য্যন্তই লেখা হয়েছিল বলে প্রায় নিশ্চিত বক্তব্য রেখেছেন। আমরা দুটি মতই তুলে ধরছি। গোবিন্দদাসের করচা গ্রন্থের ভূমিকার “গোবিন্দ কর্ম্মকারের বিস্তৃত পরিচয়” অংশে, ৭২-পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন . . .
“১৫০৮ খৃষ্টাব্দ হইতে সম্ভবতঃ চৈতন্য মহাপ্রভুর তিরোধান পর্য্যন্ত গোবিন্দ তাঁহার অনুগামী ছিলেন। যখন চৈতন্যদেব সন্ন্যাস গ্রহণ করিতে সঙ্কল্প করিয়া বর্ধমানের পথে কাটোয়ায় যাত্রা করিয়া ছিলেন তখন শশিমুখী একবার গোবিন্দকে পাকড়াও করিয়াছিল। যদিও মহাপ্রভু শশিমুখীকে নিবৃত্তি করিতে চেষ্টা পাইয়াছিলেন, তথাপি তাহার কান্না কাটিতে আর্দ্র হইয়া তিনি শেষে গোবিন্দকে গৃহে ফিরিয়া যাইতে আদেশ করেন। কিন্তু চৈতন্যদেব প্রস্থান করিলে গোবিন্দ সে আদেশ লঙ্ঘন পূর্ব্বক আত্মীয়গণের অনুরোধ উপরোধ অগ্রাহ্য করিয়া ছুটিতে ছুটিতে প্রভুর পশ্চাৎ পশ্চাৎ অনুগমন করেন। আমাদের মনে হয় আবার পাছে শশিমুখীর পাল্লায় পড়েন এবং মহাপ্রভু তাঁহাকে গৃহে ফিরিতে বাধ্য করেন, এই ভয়ে তিনি করচাখানি সম্পূর্ণ রূপে গোপন করিয়াছিলেন (“করচা করিয়া রাখি অতি সঙ্গোপণে, ৬২ পৃঃ) অর্থাৎ করচা তিনি কাহাকেও দেখিতে দেন নাই।
এখন করচায় পাওয়া যাইতেছে যে চৈতন্যদেব পুরীতে ফিরিয়া একখানি পত্রসহ গোবিন্দকে শান্তিপুর যাইতে আদেশ করেন। কিন্তু তাহার একান্ত ভক্ত অনুচরটি কয়েকটি দিনের বিরহ ভাবিয়া কাঁদিয়া আকুল হইয়াছিলেন (“এই বাক্য শুনি মোর চক্ষে বারি বহে। প্রভুর বিরহ বাণ প্রাণে নাহি সহে॥” ৮৬ পৃঃ) এই কান্নার আর একটি কারণ ছিল,---বঙ্গদেশে গেলে শশিমুখী পাছে তাঁহাকে ফিরাইয়া লইবার চেষ্টা করে,---তিনি তো মহাপ্রভু-গত প্রাণ, তাঁহাকে ছাড়া তিনি ‘কায়াছাড়া ছায়া।
এইখানে করচা শেষ হইয়া গেল। ইহার পর করচায় আর কোন বিবরণ ছিল কিনা, তাহা বলা যায় না। কারণ পুথিখানি খণ্ডিতও হইতে পারে।
কিন্তু একথা নিশ্চয় যে অতঃপর যদি গোবিন্দের বজ্রাঘাতে হঠাৎ মৃত্যু না হইয়া থাকে, তবে তিনি মহাপ্রভুকে ছাড়িয়া থাকিতে পারেন নাই। যে ব্যক্তি দুদিনের বিরহ আশঙ্কায় আকুল হইয়াছিলেন এবং মহাপ্রভুর আদেশ লঙ্ঘন পূর্বক স্ত্রীর নিকট হইতে উর্দ্ধশ্বাসে পালাইয়া ছায়ার মত তাঁহার অনুকরণ করিয়া জীবন ধন্য করিয়া ছিলেন, তিনি জীবিত থাকিলে কখন ও মহাপ্রভুকে ছাড়িয়া যাইতে পারেন নাই।”
আবার গ্রন্থের ভূমিকার “কেন করচা দীর্ঘকাল গুপ্ত ছিল?” অংশে, ৮০-পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন . . .
“দাক্ষিণাত্য হইতে ফিরিবার অব্যবহিত পরেই যদি গোবিন্দের মৃত্যু হইত, তবে তাঁহার পরিত্যক্ত জিনিষ পত্র খোঁজ করার সময় করচা ধরা পড়িয়া যাইত এবং এরূপ মূল্যবান ইতিহাসের তখনই প্রচার হইত।
যদি ফিরিয়া আসিয়া গোবিন্দ কাঞ্চননগরের গৃহে ফিরিতেন, তবে তাঁহার নিজকে ও করচাকে গোপন করিবার আর কোনই কারণ থাকিত না। করচা তাহা হইলেও প্রসিদ্ধি লাভ করিত।
একমাত্র যে কারণে এই পুস্তক গুপ্ত থাকিবার কথা, তাহা আমরা লিখিয়াছি। তিনি চৈতন্যদেবের চির সঙ্গী হওয়ার লোভে করচা গোপন করিয়াছিলেন,---পাছে সেই সঙ্গচ্যুত হইয়া স্বগৃহে প্রত্যাগমন করিতে বাধ্য হন, এই আশঙ্কায় তিনি নিজের পরিচয় একেবারে লুপ্ত করিয়া থাকিবেন।
মহাপ্রভুর জীবনের পরবর্তী ঘটনা বর্ণনা করিবার কোন প্রয়োজন গোবিন্দ অনুভব করেন নাই। কারণ মহাপ্রভু পুরীতে ফিরিয়া বহু পণ্ডিত ও গুণী ব্যক্তি দ্বারা পরিবৃত হইয়াছিলেন, তাঁহারা তাঁহার জীবনের ঘটনা লিপিবদ্ধ করিতে উদ্যোগী ছিলেন। গোবিন্দের বাঙ্গলার সামান্যরূপ অক্ষর পরিচয় মাত্র ছিল। সুতরাং ইহাদিগের মধ্যে থাকিয়া তিনি লেখনী ধারণের স্পর্ধা করেন নাই।
বিশেষ তিনি যদি ইহার পরও লিখিতে থাকিতেন, তবে চৈতন্য প্রভুর পরিকরদের মধ্যে তাহার করচা ও পরিচয় ধরা পড়িয়া যাইত। যে সময় মহাপ্রভু বিরল-সঙ্গী, এবং বঙ্গদেশ হইতে বহুদুরে একাকী পর্য্যটন করিতেছিলেন, তখন গোবিন্দ দাস যে প্রয়োজন অনুভব করিয়াছিলেন, শেষে আর তাহা ছিল না।
সুতরাং আমার মনে হয় প্রকাশিত করচা খণ্ডিত নহে। হয়ত ঐ পর্য্যন্ত লিখিয়াই গোবিন্দ আর অগ্রসর হন নাই।
তবে তিনি তাঁহার করচায় যে ডুরী বাঁধিয়াছিলেন, তাহা কে কতকাল পর খুলিয়াছিল, তাহা জানা যায় নাই।”
“করচা” প্রকাশের ইতিহাস, জাল অপবাদ, অমিয় নিমাই চরিত ও জয়ানন্দ - পাতার উপরে . . . এই গ্রন্থটি যখন প্রথম ছাপা হয় ১৮৯৫ সালে, তখন থেকেই বিভিন্ন দিক থেকে বিশেষ করে অমৃতবাজার পত্রিকা থেকে, প্রচার শুরু করা হয় যে "গোবিন্দদাসের করচা" গ্রন্থটি জাল গ্রন্থ ছাড়াও অন্যান্য অভিযোগ আনা হয় গ্রন্থটির বিরুদ্ধে। ফলে এই গ্রন্থের জাল হওয়ার অভিযোগের বিরুদ্ধে লেখেন গ্রন্থটির সহসম্পাদক রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন। তাঁদের যুকিত-তর্ক ছিল এই রকম . . .
এই গ্রন্থটির ইতিহাস এই রকম - ১৮৫০ সাল নাগাদ শান্তিপুরের কালিদাস নাথ কয়েকটি পুথি নিয়ে এসেছিলেন জয়গোপাল গোস্বামীর কাছে। সেই পুথিগুলির মধ্যে ছিল তদোবধি অপ্রকাশিত “অদ্বৈত বিকাশ” এবং “গোবিন্দদাসের করচা”। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি নিজে লিখে নকল করে রাখেন এবং পুথিদুটি ফেরত দিয়ে দেন। “অমিয় নিমাই চরিত” খ্যাত মহাত্মা শিশির কুমার ঘোষের কাছে নিয়ে গেলে তিনি নিজেই তা ছাপাবার জন্য পাণ্ডুলিপি চেয়েছিলেন। কিন্তু বইটি জয়গোপাল বাবু নিজেই ছাপাতে চান দেখে পাণ্ডুলিপির দুই ফর্মা তাঁর কাছে কয়েক দিনের জন্য রেখে যাবার অনুরোধ করেন। সেই দুই ফর্মা পাণ্ডুলিপি, শিশিরবাবুর কাছ থেকে ডঃ শম্ভু মুখোপাধ্যায় নিয়ে হারিয়ে ফেলেন। সেই দুই ফর্মায় যা পড়েছিলেন তা শিশিরবাবু তাঁর স্মৃতি থেকে অমিয় নিমাই চরিতে লিখতে গিয়ে গোবিন্দদাস কে কায়স্থ বলে উল্লেখ করেন। সেই মত ছাপানও হয়ে যায় ১৮৯৫ সালের কয়েক বছর পূর্বে (ঐ বছর জয়গোপাল গোস্বামী সম্পাদিত গোবিন্দদাসের করচা সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়)। জয়গোপাল গোস্বামী মহাশয়, শিশিরবাবুর কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যাবার পরে পুনরায় শান্তিপুর নিবাসী হরিনাথ গোস্বামীর কাছে আরেকটি গোবিন্দদাসের করচার খণ্ডিত পুথি পান। তাঁর নিজের লেখা নোট ও এই পুথি থেকে তিনি হারিয়ে যাওয়া পাতাগুলি উদ্ধার করে ১৮৯৫ সালে বইটি সংস্কৃত প্রেস ডিপোজিটারি থেকে প্রকাশিত করেন।
এর পরেই অমৃতবাজার গোষ্ঠির পক্ষ থেকে নব প্রকাশিত “গোবিন্দদাসের করচা” গ্রন্থটির কখনও প্রথম ৫১ পৃষ্ঠা, কখনও সম্পুর্ণ গ্রন্থটিকেই জাল প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালানো হয়। এই প্রচেষ্টা সম্ভবত অমিয় নিমাই চরিতে প্রকাশিত ভুলটি চাপা দেওয়ার জন্যই করা হয়।
১৯১০ সালে প্রকাশিত হয় “অমিয় নিমাই চরিত”-এর ৬ষ্ঠ খণ্ড। আমাদের সংগ্রহে রয়েছে ২০০০ সালে শ্যামাপ্রসাদ সরকার দ্বারা প্রকাশিত, মহাত্মা শিশিরকুমার ঘোষের "শ্রীঅমিয় নিমাই চরিত" (ছয় খণ্ড একত্রে)। সেই গ্রন্থে এই জাল হবার বিষয়টি এই ভাবে দেওয়া আমরা পাই . . .
“অমিয় নিমাই চরিত” গ্রন্থের ২য় খণ্ড, ১৫শ অধ্যায়, ২৬৯-পৃষ্ঠায়, শিশিরবাবু তাঁর স্মৃতি থেকে লেখেন (জয়গোপাল গোস্বামীর প্রকাশনার পূর্বে) . . . “গোবিন্দের কড়চা বলিয়া একখানি অতি সুন্দর গ্রন্থ আছে। গ্রন্থকার কায়স্থ, বেশ লিখিতে পারেন, বর্ণনাশক্তিও বেশ আছে, সংস্কৃত ভাষায়ও উত্তম অভিজ্ঞতা ছিল তাহা স্পষ্ট বোধ হয়। গোবিন্দ তাহার গ্রন্থে বলিতেছেন . . .” এরপর তিনি ওই গ্রন্থ থেকে লেখা লিখতে থাকেন।
সেই পৃষ্ঠারই পাদটীকায় রয়েছে . . . “মহাত্মা শিশিরকুমার যখন এই গ্রন্থ লেখেন, তখন গোবিন্দের কড়চা নামক একখানি পুঁথির গোড়ার কয়েকটি পাতার নকল পান। ইহার সুন্দর বর্ণনা তাঁহার মন আকৃষ্ট করে। উহা পাঠ করিয়া তিনি গোবিন্দের কথা লেখেন। কয়েক বত্সর পরে ঐ গ্রন্থ ছাপা হইলে তিনি বুঝিতে পারেন যে ইহা আধুনিক গ্রন্থ। তাই ৬ষ্ঠ খণ্ডের পাদটীকায় ইহা জানান।”
“অমিয় নিমাই চরিত” গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩য় অধ্যায়, ৮০৭-পৃষ্ঠার পাদটীকায় শিশিরকুমার ঘোষ লিখেছেন (জয়গোপাল গোস্বামীর প্রকাশনার পরে) . . . “গোবিন্দের কড়চা” বলিয়া যে পুস্তক ছাপা হইয়াছে, তাহার প্রথম অংশ ও শেষ কয়েক পত্র প্রক্ষিপ্ত। প্রভুর সঙ্গে রামানন্দের মিলনের পূর্বে এই মুদ্রিত কড়চা গ্রন্থে যাহা আছে তাহা অলীক। আবার, আলালনাথে আসিয়া। প্রভুর যে বহু ভক্তের সহিত মিলন হইল, সেখান হইতে শেষ পর্য্যন্ত এই কড়চায় যাহা মুদ্রিত হইয়াছে তাহা সমস্তই অলীক। গ্রন্থখানি প্রামাণিক করিবার নিমিত্ত---গোবিন্দের দ্বারা লেখান হইয়াছে যে, “আমি ও কালা কৃষ্ণদাস চলিলাম।” অথচ হস্তলিখিত কড়চায় কালা কৃষ্ণদাসের নামগন্ধও নাই। যে কড়চা গ্রন্থ ছাপা হইয়াছে তাহাতে রামানন্দ রায়ের মিলন হইতে আলালনাথে প্রভুর সহিত ভক্তদিগের মিলন পর্যন্ত প্রামাণিক। অবশিষ্ট সমস্তই প্রক্ষিপ্ত। প্রকাশক মহাশয় এইরূপ অন্যায় কার্য করিয়া পরে অত্যন্ত লজ্জিত হয়েন। তাহার পর তিনি তাঁহার দোষ অপনয়নের নিমিত্ত যতদূর সম্ভব শ্রীবিষুপ্রিয়া পত্রিকায় ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া একথানি পত্র লিখেন। “গোবিন্দ দাসের কড়চা রহস্য" পুস্তক পড়িয়া দেখিবেন।”
এর কিছুদিন পরেই নগেন্দ্রনাথ বসুর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় জয়ানন্দের চৈতন্য মঙ্গল গ্রন্থটি। এই গ্রন্থের বৈরাগ্য খণ্ডে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সন্ন্যাসগ্রহণ কালে তাঁর সঙ্গী ছিলেন গোবিন্দ কর্মকার। তখন গোবিন্দদাসের করচা গ্রন্থটি জাল বলা বন্ধ হয়। . . . হেনকালে নিত্যানন্দ নবদ্বীপে আসি। সন্ন্যাস রহস্য যত গৌরাঙ্গে প্রকাশি॥ শুনিয়া আনন্দ হইলা গৌরচন্দ্র। গঙ্গা পার হয়্যা আগে রৈলা নিত্যানন্দ॥ মুকুন্দ দত্ত বৈদ্য গোবিন্দ কর্মকার। মোর সঙ্গে আস্য কাঁটোয়া গঙ্গাপার॥ ---১৯৭১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” গ্রন্থ, বৈরাগ্য খণ্ড, ২৪শ অধ্যায়, ১২৪-পৃষ্ঠা॥
কিন্তু ২৭-২৮ বছর পরে পুনরায় একদল বলা শুরু করেছিলেন যে গ্রন্থটি জাল। কারণ করচায় দেওয়া তথ্য চৈতন্য ভাগবত, চৈতন্য-চন্দ্রোদয়, চৈতন্য মঙ্গল ও চৈতন্য চরিতামৃতের মতো চৈতন্য-চরিত গ্রন্থের তথ্যের সঙ্গে সব জায়গায় মিল নেই। তার উপর গোবিন্দদাসের করচায়, অন্যান্য গ্রন্থগুলির মতো, কোথাও শ্রীচৈতন্যের ঐশ্বরিক শক্তি প্রদর্শনের ঘটা নেই। ঐ গ্রন্থগুলিতে তিনি কখনও বরাহ অবতারের রূপে, কখনও নৃসিংহ অবতারের রূপে, কখনও চতুর্ভুজ শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ধারী রূপে বর্ণিত হয়েছেন। কিন্তু তিনি এই গ্রন্থের কোথাও তেমন ভাবে ভগবান রূপে বর্ণিত হন নি।
“করচা” গ্রন্থটিকে জাল প্রতিপন্ন করার পক্ষে ঐতিহাসিক বিচ্যুতির যুক্তি - পাতার উপরে . . . এই গ্রন্থটি যখন প্রথম ছাপা হয় ১৮৯৫ সালে, তখন থেকেই বিভিন্ন দিক থেকে বিশেষ করে অমৃতবাজার পত্রিকা থেকে, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রচার শুরু করা হয় যে গোবিন্দদাসের করচা গ্রন্থটি শুধু জালই নয় তার বিরুদ্ধে অন্যান্য অভিযোগও আনা হয়। “গোবিন্দদাসের করচা” গ্রন্থটি এত জোর বিতর্কের বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে বিষ্ণুপ্রিয়া পত্রিকা সহ অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় এই নিয়ে লেখালেখি করা হয়েছে।
এই সুরেই ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় শ্রদ্ধেয় মৃণালকান্তি ঘোষ ভক্তিভূষণের “গোবিন্দ দাসের কড়চা রহস্য" গ্রন্থটি। মৃণালবাবু এর মাত্র দু-বছর আগে অর্থাৎ ১৯৩৪ সালে, জগদ্বন্ধু ভদ্রর ১৯০২ সালে সংকলিত, সম্পাদিত ও প্রকাশিত বিখ্যাত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন গ্রন্থ “গৌরপদ-তরঙ্গিণীর” পুনর্মুদ্রণের সম্পাদনা করেন (১ম সম্পাদক ও সংকলক জগদ্বন্ধু ভদ্র, ১৯০২)। এই গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে প্রমাণিত করার চেষ্টা হয়েছে যে “গোবিন্দদাসের করচা” গ্রন্থটির প্রথম ৫১ পৃষ্ঠা অথবা আদ্যোপান্ত জাল বা আধুনিক কালে রচিত বা সম্ভবতঃ জয়গোপাল গোস্বামীর নিজেরই রচনা!
বিরোধীদের একটি জোরালো যুক্তি ছিল এই যে শ্রীচৈতন্যের দাক্ষিণাত্য যাত্রায় কয়েকটি বড় ঘটনাবলীর উল্লেখ করা হয়নি, যেমন শ্রীচৈতন্যের দক্ষিণ-ভ্রমণকালে সংগৃহীত গ্রন্থ “কৃষ্ণকর্ণামৃত” ও “ব্রহ্মসংহিতা”। এর উল্লেখ অবশ্য চৈতন্যভাগবতেও নেই। এ ছাড়া আরেকটি বড় ঘটনা যা করচায় নেই তা হলো শ্রীরঙ্গক্ষেত্রে তিনি চার মাস বেঙ্কট ভট্টের গৃহে থেকেছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে এমন হৃদ্যতার পরিবেশ তৈরী হয়েছিল যে বালক গোপাল ভট্ট পরে বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীদের অন্যতম হন। এই বিষয়টির কোনও উল্লেখ আমরা গোবিন্দদাসের করচায় পাই না। মনে রাখতে হবে যে গ্রন্থটি একটি খণ্ডিত পুথি থেকে পাওয়া গিয়েছে। গ্রন্থে আরও কি কি ছিল তা তো এখন আর জানার উপায় নেই। তবে এই ঘটনাবলী গ্রন্থটির মৌলিকতার উপরে প্রশ্ন চিহ্ন তোলে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বিশ্বেশ্বর দাসের মতে জয়গোপাল গোস্বামীই করচার রচয়িতা - পাতার উপরে . . . করচা বিরোধীদের আরেকটি যুক্তি ছিল এই যে, গ্রন্থটি জয়গোপাল গোস্বামীর নিজেরই রচিত। এই অপবাদ নিয়ে কিছু উল্লেখ করছি কারণ তা খুবই বিস্ময়কর!
শান্তিপুর মিউনিসিপাল হাইস্কুলের প্রধান পণ্ডিত জয়গোপাল গোস্বামীর সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছরের পরিচয় যুক্ত, তাঁর অতি প্রিয় ছাত্র ও পরবর্তিতে তাঁর স্কুলের সহশিক্ষক অর্থাৎ সহকর্মী বিশ্বেশ্বর দাস মহাশয়, দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে “গোবিন্দদাসের করচা” গ্রন্থটি তাঁর গুরু ও সহকর্মী জয়গোপাল গোস্বামীর নিজেরই রচিত গ্রন্থ! মৃণালকান্তি ঘোষের “গোবিন্দ দাসের কড়চা রহস্য" গ্রন্থের “জয়গোপাল গোস্বামী” নামক প্রবন্ধে বা অধ্যায়ে, বিশ্বেশ্বর দাস মহাশয়ের দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেওয়া রয়েছে। মৃণালকান্তি ঘোষ মহাশয় বিশ্বেস্বর দাসের একটি প্রবন্ধ থেকে তাঁর গ্রন্থে উদ্ধৃতি দিয়েছেন কিন্তু জানান নি সেই প্রবন্ধটি কোথায় প্রকাশিত হয়েছিল বা তিনি কোথা থেকে তা পেয়েছিলেন ইত্যাদি। যাই হোক সেই প্রবন্ধে বিশ্বেশ্বর বাবু, একটি দুটি নয়, মোট ১৭টি কারণ দেখিয়েছেন, কেন তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে মনে করতেন যে করচা গ্রন্থটি আসলে তাঁর গুরু, শিক্ষক ও সহকর্মী পণ্ডিত জয়গোপাল গোস্বামীর নিজের রচনা!
মৃণালকান্তি ঘোষের “গোবিন্দ দাসের কড়চা রহস্য" গ্রন্থের ১৪৯-পৃষ্ঠায় বিশ্বেশ্বর দাসের উদ্ধৃতি থেকে আমরা এখানে তুলে দিচ্ছি . . .
“শ্রীযুক্ত বিশ্বেশ্বর দাস মহাশয় লিখিয়াছেন,--- "যে সকল কারণে আমি গোবিন্দাসের করচা পণ্ডিত মহাশয়ের রচিত বলিয়াই বিশ্বাস করি, সেগুলি সংক্ষেপে উল্লেখ করিতেছি। যথা--- (১) পণ্ডিত মহাশয় করচার যে পাণ্ডুলিপি আমাকে পাঠ করিতে দিয়াছিলেন তাহা সমস্তই তাঁহার নিজের হস্তলিখিত। এই হস্তাক্ষর আমার সুপরিচিত ছিল। পাণ্ডুলিপি প্রদানকালে উহা যে কোনও প্রাচীন পুথি হইতে নকল করা হইয়াছে, একথা তিনি আমাকে আদপে বলেন নাই। তখন ঐ করচার নামগন্ধও কেহ জানিতেন না, --- উহার সম্বন্ধে বিরুদ্ধ সমালোচনা ত দূরের কথা। কাজেই উহা কোন প্রাচীন পুথির নকল হইলে সে কথা আমাকে বলিবার কোন আপত্তি পণ্ডিত মহাশয়ের থাকিতে পারে না। (২) আমি যখন পাণ্ডুলিপির লুপ্ত কয়েক পৃষ্ঠা পণ্ডিত মহাশয়কে রচনা করিয়া দিতে অনুরোধ করি, তখন তিনি কোনই আপত্তি করেন নাই, কিংবা ঘুর্ণাক্ষরেও আমাকে বলেন নাই যে, অপরের রচিত পাণ্ডুলিপিতে তিনি কিরূপে নিজের রচিত বিষয় সংযোজিত করিবেন। (৩) লুপ্ত কয়েক পৃষ্ঠা কিরূপে সংশোধিত হইল সে কথাও তিনি আমাকে বলেন নাই। (৪) প্রাচীন গ্রন্থ প্রকাশিত করিবার ভার লইয়া পণ্ডিত মহাশয় কেন যে উহার ভূমিকা লিখিলেন না, এই কথা সর্বদাই আমার মনে হইত। পণ্ডিত মহাশয় তৎকালে একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ গ্রন্থকার ছিলেন। তিনি গণিত বিজ্ঞান হইতে কাব্য দর্শন প্রভৃতি বহু পুস্তক প্রণয়ন করিয়াছিলেন। প্রাচীন গ্রন্থ প্রকাশ করতে হইলে তাহার যে একটি সমীচীন ভূমিকা লেখা আবশ্যক তাহা পত্তিত মহাশয় বিলক্ষণ জানিতেন। তথাপি গোবিন্দ-দাসের করচার ভূমিকা পণ্ডিত মহাশয় কেন লিখিলেন না, ইহা বিশেষরূপে আলোচনা করিবার যোগ্য। আজকাল অনেকে করচার মুল পাণ্ডুলিপি দেখিতে ব্যস্ত হইয়াছেন। কিন্তু করচার প্রথম সংস্করণে পণ্ডিত মহাশয়ের ন্যায় একজন সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থকার কোন ভূমিকা কেন লিখিলেন না, ইহার হেতু কেহ কি ভাবিয়া দেখিয়াছেন? (৫) করচার আদর্শ প্রাচীন পুথি পণ্ডিত মহাশয়ের নিকট কখনও দেখি নাই এবং উহার অস্তিত্ব সম্বন্ধে কোন কথাও পণ্ডিত মহাশয়ের মুখে করচার মুদ্রণকালে কিন্বা অন্য কোন সময়ও শুনি নাই। . তাহার পর internal evidence বা পুস্তকের অন্তর্গত বিষয়ের কথা। এই প্রমাণসমূহ যে কোন বিচারক্ষম চিন্তাশীল ব্যক্তির বোধগম্য নিশ্চয় হইবে। (৬) করচার মৌলিক অংশ ও পরে সংযোজিত নূতন অংশের ভাষা ও ভঙ্গি একই প্রকার। (৭)কবিতাগুলিতে মধ্যে মধ্যে দুই চারিটি প্রাচীন শব্দ থাকিলেও অধিকাংশ কবিতা আধুনিক ভাবেই রচিত। (৮) সোমনাথ-বিগ্রহের ধ্বংশবশতঃ মহাপ্রভুর আক্ষেপ আধুনিক ইতিহাস-পাঠকের কল্পনাপ্রসূত বলিয়া মনে হয়। (৯) হরিনাম-বিহ্বল হইয়া মহাপ্রভুর স্ত্রীদেহ-আলিঙ্গন আধুনিক কবির কল্পিত। (১০) পুস্তকে নিবদ্ধ বহু বহু উপদেশ আধুনিক ভাবেই রচিত। . পণ্ডিত মহাশয়ের গ্রন্থকর্ত্তৃত্ব সন্বন্ধে বিশেষ প্রমাণ বলিয়া যাহা আমার মনে হয়, সে সকল নিম্নে দেখাইতেছি। যথা--- (১১) করচা নিবন্ধ বেদান্তসম্মত উপদেশাবলী পণ্ডিত মহাশয় আমাদিগকে মৌখিকভাবেও অনেক সময় শুনাইতেন। (১২) বিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালেও পণ্ডিত মহাশয় -মহাপ্রভূর সম্বন্ধে অনেক গল্প বা প্রসঙ্গ করিতেন। তাহাতে মনে হইত মহাপ্রভুর জীবনের ঘটনাবলী লইয়া তিনি বিশেষভাবে মগ্ন থাকিতেন। (১৩) ঐতিহাসিক বা ভৌগোলিক তত্ত্ব সকল অবগত হইবার জন্য পণ্ডিত মহাশয়ের প্রবল আকাঙ্খা বা কৌতুহল ছিল। তিনি অনেক সময়ে ভূচিত্র বা ম্যাপ লইয়া একাগ্রচিত্তে উহা দর্শন করিতেন। তাঁহার “চরিত গাথা' নামক কবিতা পুস্তকে “ভূচিত্র” নামে একটি কবিতা আছে। এরূপ কবিতা আর কোন কবির পুস্তকে প্রায় দেখা যায় না। (১৪) কোন ভ্রমণকারী বা নূতন লোক দেখিলেই পণ্ডিত মহাশয় তাহার মুখে কোন নূতন কথা শুনিবার জন্য বড় আগ্রহ প্রকাশ করিতেন। এইরূপে সংগৃহীত তত্ত্বসকল করচায় বর্ণিত মহাপ্রভুর দক্ষিণদেশ ভ্রমণ-বর্ণনায় তাঁহাকে বিশেষ সাহায্য করিয়াছিল। (১৫) পণ্ডিত মহাশয় সুন্দর কবিতা রচনা করিতে পারিতেন। “চারুগাথা" ব্যতীত আমি পণ্ডিত মহাশয়ের রচিত অন্যান্য অনেক কবিতা পাঠ করিয়াছি। সেগুলি অদ্যাপি মুদ্রিত হয় নাই। (১৬) বাল-স্বভাব-হেতু পণ্ডিত মহাশয় কখন কখন অদ্ভূত বা আজগুবি বিষয়ের অবতারণা করিতে ভালবাসিতেন। তাই বোধহয়, মহাপ্রভুর দক্ষিণ-ভ্রমণের সঙ্গী “গোবিন্দ” সাজিয়া তাঁহার করচা-গ্রন্থের নায়করূপে আবির্ভাব। (১৭) হরিনাম প্রচার তাঁহার বংশগত বৃত্তি বলিয়া পণ্ডিত মহাশয় জীবহিতার্থ “করচা” রচনা করিয়াছিলেন। লোক প্রবঞ্চনা করা বা বাহাদুরী লইবার উদ্দেশ্য তাঁহার ছিল না।
বিশ্বেশ্বরবাবু উল্লিখিত কারণগুলি সরল বিশ্বাসের বশবর্তী হইয়া লিখিয়াছেন। পণ্ডিত মহাশয়কে লোকচক্ষুর গোচরে হীন ও হেয় করা তাঁহার অভিপ্রেত আদপেই থাকিতে পারে না। পাছে কাহারও মনে এরূপ ভাবের উদয় হয়, সেইজন্য তিনি লিখিয়াছেন, --- “উপসংহারে আমার অবশ্য বক্তব্য যে, পূজ্যপাদ পণ্ডিত মহাশয় বালকের নায় সরলভাবাপন্ন এবং কৃষ্ণভক্তি-পরায়ণ রসজ্ঞ-পণ্ডিত ছিলেন। ...মহাপ্রভুর প্রতিও তিনি যথেষ্ট ভক্তিমান ছিলেন। তাঁহার স্বলিখিত কথকতার পুথিতেও তিনি মহাপ্রভুর লীলার কিয়দংশ সন্নিবিষ্ট করিয়াছিলেন। ফলতঃ বৈষ্ণবাচার্য্যগণের উপদেশানুসারে তিনি মহাপ্রভুকে আনর্শস্থানীয় প্রতিপন্ন করিতেই বিধিমতে প্রয়াস পাইয়াছিলেন।” . বিশ্বেশ্বরবাবু শেষে লিখিয়াছেন, --- "আধুনিক সুবিজ্ঞ সমালোচকগণের বিচারে পুস্তকের কোনস্থলে মহাপ্রভুর চরিত্রকে যদি তিনি হীন বা কলঙ্কিত করিয়া থাকেন, তাহা তাঁহার জ্ঞানকৃত অপরাধ নহে, --- ভাবপ্রবণতা ও অনবধানতাবশতঃই উহা ঘটিয়া থাকিবে।”
বিশ্বেশ্বর দাস মহাশয়ের উপরোক্ত বক্তব্যের উপর আমাদের মত এই যে, তাঁর ১ম কারণের উত্তর --- ১৯১০ সালে প্রকাশিত বনোয়ারিলাল গোস্বামী ও রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত গোবিন্দদাসের করচার “গোবিন্দ দাসের করচা উদ্ধারের ইতিহাস” নাম্নি ভূমিকায় জয়গোপাল বাবুর পুত্র কবি বনোয়ারিলাল গোস্বামী জানিয়েছেন যে শান্তিপুর নিবাসী কালিদাস নাথের কাছ থেকে পুথি পাওয়ার পরে কয়ের দিনের মধ্যেই তাঁর পিতৃদেব জয়গোপাল বাবু, নিজের হাতে তা নকল করে রেখে পুথিটি ফেরত দিয়েছিলেন। তিনি এখানে উল্লেখ করেছেন “পিতৃদেব অতি সত্বর লিখিতে পারিতেন”। তাই বিশ্বেশ্বর বাবু এবং অমৃতবাজারের মহাত্মা শিশিরকুমার ঘোষ মহাশয় তা জয়গোপাল বাবুর হাতের লেখাতেই পেয়েছিলেন। ২য় ও ৩য় কারণে লিখেছেন যে তিনি লুপ্ত কয়েক পৃষ্ঠা পণ্ডিত মহাশয়কে রচনা করে দিতে অনুরোধ করেছিলেন. যার কোনো উত্তর তিনি পান নি। আমাদের মতে তাঁর এই পরামর্শটিই এত অনৈতিক ছিল যে, যে কোনো সৎ ব্যক্তির পক্ষে এর উত্তর দেওয়া সম্ভব ছিল না। ৪র্থ কারণ --- কেন তিনি গ্রন্থের কোনও ভূমিকা দিলেন না? এর উত্তর আমাদের জানা নেই। তবে এ থেকে কি প্রমাণ করা যেতে পারে যে বইটি নিজে লিখে গোবিন্দ দাসের নামে প্রকাশিত করেছিলেন বা জাল পুস্তক রচনা করেছিলেন? ৫ম কারণের উত্তরও, দেওয়া রয়েছে ১ম কারণের উত্তরে, বনোয়ারিলাল বাবুর কলমেই। সেখানেই --- “তাহার পর internal evidence বা পুস্তকের অন্তর্গত বিষয়ের কথা” বিষয়টি তিনি আরেকটু বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করলে ভাল হতো। তাই, এ নিয়ে আমাদের পক্ষে কিছু বলা সম্ভব হলো না। ৬ষ্ঠ কারণে --- “করচার মৌলিক অংশ ও পরে সংযোজিত নূতন অংশের ভাষা ও ভঙ্গি একই প্রকার” --- তাই তো হবার কথা! কারণ তিনি তো দ্বিতীয় একটি পুথি থেকেই সেই অংশর সংশোধন করেছিলেন! বনোয়ারিলাল গোস্বামীর লেখা থেকে জানতে পারছি যে জয়গোপাল বাবু যখন কালিদাস নাথের কাছ থেকে প্রথম পুথিটি আর পেলেন না, তার কিছুকাল পরে শান্তিপুরের পাগলা গোস্বামীদের কাছ থেকে আরেকটি পুথি (বিকৃতি দোষে দুষ্ট) পেয়েছিলেন এবং --- “পিতাঠাকুর মহাশয়ের নিকট যে কিছু কিছু নোট ছিল, তাহার সহিত ঐ পুথির লেখা মিলাইয়া কষ্টে সৃষ্টে নষ্ট পত্রগুলির পুনরুদ্ধার করা হয়”। ৭ম কারণ কবিতার মধ্যে দু-চারটি প্রাচীন শব্দ থাকলেও অধিকাংশ কবিতা আধুনিক ভাবেই রচিত --- ভাষার আধুনিকতা নিয়ে ১১তম কারণের সঙ্গে দীনেশচন্দ্র সেনের লেখা পড়ুন . . .। ৮ম কারণ --- “সোমনাথ-বিগ্রহের ধ্বংশবশতঃ মহাপ্রভুর আক্ষেপ আধুনিক ইতিহাস-পাঠকের কল্পনাপ্রসূত বলিয়া মনে হয়”। এই বর্ণনাটি আমরা মিলনসাগরে “সোমনাথ দেখিবারে চলিল ধাইয়া” শিরোনামের পদে তুলে ধরেছি। পাঠক পড়ে নিতে পারেন। আমাদের কাছে তা খুবই স্বাভাবিক লেগেছে। এমন কি, যে করচায় অলৌকিকতা বেশী নেই বলে অনেকেই অপবাদ দিয়েছেন, যে শ্রীচৈতন্যকে বেশী মানবরূপী অঙ্কন করা হয়েছে, সোমনাথ দর্শনের স্থানে কিন্তু কবিতার ভাবে ও চেতনায় তাঁকে যেন শিবের দর্শন করানো হয়েছে, এই ভাবে . . . হেনকালে অবধৌত সন্ন্যাসী আসিয়া। বার বার গোরা চাঁদে দেখে তাকাইয়া॥ সব গায় ভস্ম মাখা নাহিক বসন। উভ করি জটা বাঁধা আশ্চর্য্য গঠন॥ লোহিত বরণ তাঁর হয় চক্ষুদ্বয়। সুখে হর হর শব্দ পবিত্র হৃদয়॥ ঢুলু ঢুলু দুটি আঁখি দেখিতে সুন্দর। আশীর্ব্বাদ করে আসি ঊর্দ্ধ করি কর॥ উঠিলা আমার প্রভু তাঁহারে দেখিয়া। অন্তর্হিত হৈলা তবে কি যেন বলিয়া॥ ধূলা উড়ে চারিদিক্ করেছে আঁধার। অবধৌত কোথা গেল নাহি দেখি আর॥ ৯ম কারণ --- “হরিনাম-বিহ্বল হইয়া মহাপ্রভুর স্ত্রীদেহ-আলিঙ্গন” --- এটাকে যদি আমরা যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং ভাষ্য হিসেবে দেখি তাহলে অন্যায়ের কিছু দেখতে পাই না। লেখক তো কেবল যা দেখেছিলেন তার বর্ণনাই করেছেন! কারণ শ্রীচৈতন্য যখন ভাবে বিহ্বল হয়ে যেতেন তখন সাধারণত আসে পাশে কোনও নারীর উপস্থিতি থাকতো না। এখানে একজন নারী তার নাগালের মধ্যেই এসে পড়েছিলেন। ঘটনাটি পন্থ-গুহা যাত্রায় ঘটেছিল। ধনী তীর্থরাম দুইজন বেশ্যা - লক্ষ্মী বাই ও সত্য বাইকে দিয়ে শ্রীচৈতন্যের পরীক্ষা নেবার চেষ্টা করেছিলেন। সত্য বাইকে আলিঙ্গন করার অংশটুকু এমন ভাবে রয়েছে যা মোটেই বিষদৃশ্য বলে মনে হয় না . . . ইহা দেখি সেই ধনী মনে চমকিল। চরণতলেতে পড়ি আশ্রয় লইল॥ চরণে দলেন তারে নাহি বাহ্যজ্ঞান। হরি ব'লে বাহতুলে নাচে আগুয়ান্॥ সত্যরে বাহুতে ছাঁদি বলে বল হরি। হরি বল প্রাণেশ্বর মুকুন্দ মুরারি॥ কোথা প্রভু কোথায় বা মুকুন্দ মুরারি। অজ্ঞান হইলা সবে এই ভাব হেরি॥ হরি নামে মত্ত প্রভু নাহি বাহ্য জ্ঞান। ঘাড়ি ভেঙ্গে পড়িতেছে আকুল পরাণ॥ মুখে লালা অঙ্গে ধুলা নাহিক বসন। কণ্টিকিত কলেবর মুদিত নয়ন॥ এই উপাখ্যানটি পুরোপুরি মিলনসাগরে কবিতার পাতায় তুলে দেওয়া হয়েছে পাঠকের জন্য। ১০ম কারণে রয়েছে --- “পুস্তকে নিবদ্ধ বহু বহু উপদেশ আধুনিক ভাবেই রচিত”। রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনই করচার ভাষার আধুনিকতা নিয়ে ভূমিকার ৪৫-পৃষ্ঠায় বিস্তারিতভাবে লিখে গিয়েছেন যা আমাদের খুবই যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। আমরা তা এই পাতায় হুবহু তুলে দিয়েছি। দীনেশচন্দ্র সেনের সেই লেখাটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . .। তাই “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ভাষার আধুনিকতা নিয়ে আমাদের কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন। ১১-১৬ কারণগুলিতে বিশ্বেশ্বর বাবু তাঁর গুরু জয়গোপাল গোস্বামীর কিছু সুন্দর গুণাবলীর উল্লেখ করেছেন যা যে কোনো সুস্থ শিক্ষিত আধুনিক শিক্ষক ও কবির থাকা উচিত। সেই গুণাবলীর জন্যই তিনি গ্রন্থটি নিজে রচনা করে গোবিন্দ দাসের নামে চালানোর চেষ্টা করেছেন, এটা বিশ্বাস করা খুব শক্ত। ১৭তম কারণটি বড় বিচিত্র মানসিকতা থেকে লেখা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে! তাঁর এই সন্দেহ এতটাই বদ্ধমূল ছিল (obsessed) যে, তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে জয়গোপাল বাবুই করচার রচয়িতা। একদিকে বিশ্বেশ্বর বাবু যখন তাঁর “পূজ্যপাদ পণ্ডিত মহাশয়” কে তাঁর এই লেখার মধ্যে দিয়ে একজন জালিয়াত প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছেন তখন এ কথাও বলছেন “লোক প্রবঞ্চনা করা বা বাহাদুরী লইবার উদ্দেশ্য তাঁহার ছিল না”! তাঁর এই উক্তি যে বিরোধীদের হাতে পড়ে জয়গোপাল বাবুকে চূড়ান্তভাবে অপমানিত হতে হবে তা কি বিশ্বেশ্বর বাবু বুঝতে পারেন নি? অথচ তিনি দেখাতেও চাইছেন যে তিনি তাঁর গুরুকে কত ভক্তি-শ্রদ্ধা করেন এবং তিনি কোনো মতেই তাঁর বদনাম করছেন না! এ তো রীতিমত হাস্যকর!---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥
করচার বল্লালঢিপি ও শ্রীচৈতন্যের গ্রাম নিয়ে মোজাম্মেল হকের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . গোবিন্দদাসের করচায় উল্লিখিত বল্লালরাজার বাড়ী, বল্লাল সাগর ও প্রাচীন নবদ্বীপের অবস্থান নিয়ে ১৯২৬সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ২-পৃষ্ঠায় দেওয়া টীকায় শান্তিপুর নিবাসী সুকবি মোজাম্মেল হক সাহেবের বিবরণ উদ্ধৃত করেছেন . . .
“প্রাচীন নবদ্বীপ --- প্রাচীন নবদ্ধীপের অবস্থান ভূমি অতি বিশাল ছিল। মেয়াপুর, ভারুই ডাঙ্গা, সরডাঙ্গা, গাদীগাছা, সুবর্ণবিহার, মাজিদা, ভালুকা, কুলিয়া, সমুদ্রগড়, রাহুতপুর, বিদ্যানগর, মামগাছী, মহৎপুর, জান নগর, রুদ্র ডাঙ্গা, শরপুর, পূর্ব্বস্থলী প্রভৃতি গ্রাম ইহার অন্তর্গত ছিল। এখনও ঐ সকল গ্রাম বিদ্যমান আছে, কিন্তু নবদ্বীপ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়াছে। যে স্থলে বর্তমান নবদ্বীপ অবস্থিত, তাহা প্রাচীন নবদ্বীপের উপকণ্ঠ-পল্লী, খাস নবদ্বীপ হইতে অনেক দূর। উহা তখন কুলিয়া নামে পরিচিত ছিল। মেয়াপুর (মায়াপুর) এবং তৎসংলগ্ন পল্লীই প্রাচীন নবদ্বীপের শেষ চিহ্ন। এই ভূমিতেই রাজা বল্লালসেনের রাজপ্রাসাদ ছিল। এবং সেই রাজপ্রাসাদ হইতেই বল্লাল সেন @ বীর বক্তিয়ার খিলজীর আক্রমণে পলায়ন করিয়াছিলেন, এবং এই ভূমিতেই চৈতন্যদেব জন্মগ্রহণ করিয়ছিলেন। আমাদের এই উক্তি যে সর্ব্বাংশে সত্য তাহা কেহই অস্বীকার করিতে পারেন না। কেননা এখনও এই ভূমিতে রাজা বল্লালসেনের স্মৃতির পরিচায়ক বল্লাল দীঘি, এবং রাজপ্রাসাদ গঙ্গা গর্ভসাৎ হইলেও “বলাল ঢিবী” নামে একটী উচ্চস্তূপ বিদ্যমান রহিয়াছে। কিছু দিন পূর্ব্বে বামন পুখুরিয়ার প্রসিদ্ধ জমাদার খান সাহেব মোল্লা খোদাদাদ সাহেব উক্ত ঢিবী খনন করিয়া কয়েক খানি জীর্ণ বারকোশ এবং গলিত স্খলিত সিন্দুক আবিষ্কার করেন। সিন্দুকের ভিতর হইতে কয়েকটী রূপার টাকা এবং গলিত স্খলিত শাল ও পশ্মী কাপড় পাওয়া গিয়াছিল। মেয়াপুরই চৈতন্য দেবের জন্ম-ভিটা ও বাস ভুমি। যে কাজীর সহিত তাঁহার মতান্তর ঘটে, তাঁহারও কবর আজ পর্য্যন্ত মেয়াপুরের উত্তর পূর্ব্ব দিকে মোল্লা সাহেবের বাড়ীর নিকট বিদ্যমান রহিয়াছে। কবরের পাশে একটী বৃহৎ কাঠ-মল্লিকা ফুলের গাছ আছে। শুনিতে পাই, অনেক হিন্দু কবরে ফুল সিন্নি দিয়া সেলাম করে। ইহার নাম চাঁদ কাজী। ইহা অপেক্ষা প্রাচীন নবদ্বীপের অবস্থান-ভূমির নিদর্শন আর কি হইতে পারে? অনুসন্ধান সমিতির উৎসাহশীল ব্যক্তিগণ যদি ঐ স্থানে গিয়া ভূমি খননাদি করেন, তাহা হইলে প্রাচীন নবদ্বীপের আরও অনেক তথ্য আবিষ্কৃত হইতে পারে।”
@ - এখানে একটি তথ্যে ভুল রয়েছে। বখতিয়ার খিলজির অতর্কিত আক্রমণে পরাজিত হয়ে নদীয়া ত্যাগ করেছিলন রাজা বল্লাল সেনের পুত্র রাজা লক্ষ্মণ সেন, রাজা বল্লাল সেন নন। শিল্পী সুরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর আঁকা "লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন" নামে ১৯০৮ সালের একটি বহু-বিতর্কিত ছবি আছে! সেই ছবি এবং কবি রাজা লক্ষ্মণ সেনের কবিতার পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
শ্রীচৈতন্যের গৃহত্যাগের বর্ণনা নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৯২৬সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৭ ও ৮ পৃষ্ঠার টীকায় শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাসের পূর্বরাত্রের ঘটনাবলি নিয়ে গোবিন্দদাসের করচা আর বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবত ও লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গলের বিবরণের তুলনামূলক ব্যাখা করে দেখিয়েছেন যে করচা ও চৈতন্যভাগবতের বর্ণনায় মিল আছে এবং . . .
“চৈতন্য ভাগবতে দৃষ্ট হয় সন্ন্যাসের পূর্ব্বরাত্রে প্রভু হরিদাস ও গদাধরের সঙ্গে এক গৃহে শয়ন করিয়াছিলেন। "নিকটে শুইলা হরিদাস গদাধর।“ লোচনদাস এই উপলক্ষে মস্ত বড় একটা দাম্পত্য-লীলার অবতারণা করিয়াছেন, তাহা একবারেই সমীচীন হয় নাই। চৈতন্য ভাগবতের বর্ণনার সঙ্গে করচার খুব ঐক্য আছে। করচায় দৃষ্ট হয় “রজনীর শেষ ভাগে” চৈতন্য বহিবাটী হইতে অন্তঃপুরে গমন করিতেছেন। চৈতন্য ভাগবতেও অবিকল সেই কথাই আছে। “দণ্ডচারি রাত্রি আছে ঠাকুর জানিয়া। উঠিলেন চলিবারে সামগ্রী লইয়া॥” (চৈ, ভা, মধ্য ২৫ অ)। এই উপলক্ষে গৌরপদ তরঙ্গিণীতে যে সকল উচ্ছ্বসিত কবিত্বময় পদাবলী আছে, তাহাদের ঐতিহাসিক মূল্য কিছু নাই। তাহাতে বর্ণিত আছে রাত্রে বিষ্ণুপ্রিয়ার হাত শূন্য শয্যায় পড়াতে তিনি চমকিয়া উঠিলেন এবং স্বামী চলিয়া গিয়াছেন জানিয়া শচীদেবীর ঘরের দ্বারে বসিয়া মৃদুস্বরে কাঁদিতে লাগিলেন। পুত্রের সন্ন্যাসচিন্তাভীতা শচীর দুটি চোখে ঘুম ছিল না। তিনি বধুর মৃদু কান্নার সুর শুনিয়া অমনই বাহির হইলেন। তখন শাশুড়ী ও পুত্রবধূ দীপ লইয়া নবদ্বীপের রাস্তায় রাস্তায় চৈতন্যকে খুঁজিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। বর্ণনাগুলি ভারি সুন্দর, কিন্ত উহা ঐতিহাসিক নহে। চৈতন্যদেব কি মাতার নিকট বিদায় গ্রহণ না করিয়া চোরের মত পালাইয়া যাইতে পারেন? এখানে করচা ও চৈতন্য-ভাগবতে ঐতিহাসিক তত্ত্ব যথাযথভাবে বর্ণিত হইয়াছে।
গোবিন্দদাসের করচা গ্রন্থের ৮-পৃষ্ঠায় নীচে দেওয়া এই দুটি পঙ্ক্তি নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেন, সেই পৃষ্ঠার টীকায় লিখেছেন . . . কাঠের পুতুলী সম শচী দাণ্ডাইলা। ঝর ঝর অশ্রু বারি পড়িতে লাগিলা॥”
“শচীদেবীর এই চিত্রের সঙ্গে চৈতন্য ভাগবতের বর্ণিত মূর্ত্তি ঠিক একরূপ, “যত কিছু বলে প্রভু শচী নাহি শুনে। উত্তর না স্ফুরে কাঁদে অঝর নয়নে॥ . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . প্রভু চলিলেন শুনি শচী জগন্মাতা। জড় হইলেন কিছু নাহি স্ফুরে কথা।” (চৈ, ভা, মধ্য ২৫ অ) এই মূর্ত্তিমতী শোকের মূক চিত্র, এবং “কাঠের পুতলী”র ন্যায় নির্ব্বাক ছবি---দুইই ঠিক একরূপ।”
শ্রীচৈতন্যের মুণ্ডনের নাপিতের নাম নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . গোবিন্দদাসের করচায় শ্রীচৈতন্যের প্রাক-সন্ন্যাসের মস্তক মুণ্ডনের বর্ণনা, গ্রন্থের ১১-পৃষ্ঠায় এই রকম দেওয়া রয়েছে, যেখানে নাপিতের নাম “দেবা” . . . দেবা নামে নাপিতেরে ডাকিয়া আনিল। বিল্ববৃক্ষতলে আসি নাপিত বসিল॥ নাপিতে বলিলা তবে চৈতন্য গোঁসাই। মুণ্ডন করহ দেব ব্রজে চলে যাই॥ ভারতীয় আজ্ঞা পেয়ে নাপিত তখন। বসিলা নিয়ড়ে গিয়া করিতে মুণ্ডন॥ যখন নাপিত শেষে কেশে ক্ষুর দিলা। অমনি রমণীগণ ফুকারি উঠিলা॥ নারীগণ বলে নাপিত একাজ করো না। এমন চুলের গোছা মুড়ায়ে ফেলো না॥ এই বলি কাঁদিয়া উঠিল নারীগণ। মুণ্ডন করিতে দেবা লাগিল তখন॥
শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাসের পূর্বে মস্তক-মুণ্ডনের কালে নাপিতের নাম গোবিন্দদাসের করচায় “দেবা” উল্লেখ করা এবং নাপিতের প্রচলিত নাম “মধু” নিয়ে ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ১১-পৃষ্ঠার টীকায় লিখেছেন . . .
“জন-প্রবাদ এই, যে নাপিত চৈতন্যের মস্তক মুণ্ডন করিয়াছিল, তাহার নাম ‘মধু’। কিন্তু কোন সন্ন্যাসীর মস্তক হয়ত কোন সময় "মধু" নামক নাপিত মুণ্ডন করিয়াছিল --- তৎপর হইতে “মধু” নামটি সন্ন্যাস-গ্রহনোদ্যত ব্যক্তির সঙ্গে জড়িত হইয়া আছে। যেহেতু ময়ানামতীর গানে গোপীচন্দ্রকে যে নাপিত ক্ষৌর করিয়াছিল, তাহার নাম ও ‘মধু’ দৃষ্ট হয়। আমাদের মতে এই ‘দেবা’ নামই প্রকৃত। “মধু নাপিত” নামে এক শ্রেণীর নাপিত আছে। ‘দেবা’ এই শ্রেণীর নাপিত হইতে পারে। এখন “মধুনাপিতে”রা ময়রার কার্য্য করিয়া থাকে।”
শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস গ্রহণকালে উপস্থিতদের নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের উক্তি - পাতার উপরে . . . শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস গ্রহণকালে সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন ভক্ত ও পণ্ডিতদের উপস্থিতি নিয়ে ১৯২৬সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ১২-পৃষ্ঠার টীকায় লিখেছেন . . .
“সন্ন্যাস গ্রহণর সময় যে সকল ভক্তের নাম চৈতন্য ভাগবতে ও জয়ানন্দের চৈতন্য-মঙ্গলে পাওয়া ষায়, তাঁহাদের সঙ্গে করচা-দত্ত নামের ঐক্য আছে। জয়ানন্দের চৈতন্য-মঙ্গলে নিত্যানন্দ, মকুন্দ দত্ত, জগদানন্দ, গোবিন্দ কর্ম্মকার প্রভৃতির নাম পাওয়া যায়, চৈতন্য ভাগবতেও নিত্যানন্দ, গদাধর, মুকুন্দ, গোবিন্দ প্রভৃতির উল্লেখ আছে। “নিত্যানন্দ, গদাধর, মুকুন্দ, গোবিন্দ। সংহতি জগদানন্দ আর ব্রহ্মানন্দ॥ (অন্ত্য ২য়।) কিন্তু ঠিক সন্ন্যাসের সময় চৈতন্য ভাগবতে যে দুইটি ছত্রের উল্লেখ আছে, তৎপ্রতি দৃষ্টি আকর্ষন করিতেছি। “নিত্যানন্দ, গদাধর, মুকন্দ-সংহতি। গোবিন্দ পশ্চাতে আশে কেশব ভারতী॥" করচার “তার পর নিত্যানন্দ গদাধর সঙ্গে। ভারতীকে লয়ে চলিলেন নানরঙ্গে॥ পেছনে পেছনে আমি খড়ী লৈয়া যাই।” এই দুই বর্ণনা একরূপ। “গোবিন্দ পশ্চাতে” আর “পেছন পেছন আমি খড়ী লৈয়া যাই।” ঠিক মিলিয়া যাইতেছে। তৎসঙ্গে জয়ানন্দের এই উপলক্ষে “মুকন্দ দত্ত বৈদ্য গোবিন্দ কর্ম্মকার” পড়িলেই বুঝিতে পারিবেন, যে সেই ম্মরণীয় ঘটনা যাঁহারা চাক্ষুষ দেখিয়াছিলেন, তাঁহারা এক কথাই বলিয়া গিয়াছেন। গোবিন্দ নিজে দেখিয়াছিলেন এবং অপর দুই লেখক প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখে শুনিয়াছিলেন। এই উপলক্ষে আর একটি কথা বলা দরকার। বৈষ্ণব ভক্তদের গণ্ডী ছাড়াইয়া কয়েক জন প্রধান পণ্ডিতের নাম পাওয়া যাইতেছে ; ইহারা চৈতন্য প্রভুর সন্ন্যাস দেখিতে আসিয়াছিলেন। পরবর্ত্তী কালে, এমন কি তৎসময়েও, বৈষ্ণবগণ তাঁহাদের নাম মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করেন নাই। কিন্তু গোবিন্দ তাঁহাদের নাম দিয়া গিয়াছেন, “রুদ্রদেব” হইতে “রত্নাকর” পর্য্যন্ত ছত্র কয়েকটি দ্রষ্টব্য।”
গোবিন্দদাসের করচা গ্রন্থের ১২-পৃষ্ঠায় শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাসগ্রহণে উপস্থিত সেই পণ্ডিতদের উল্লেখ এইভাবে আছে . . . লক্ষ লক্ষ লোক চলে প্রবুর পেছনে। বিস্তর পণ্ডিত চলে প্রভু দরশনে॥ রুদ্রদেব রামরত্ন জগাই পণ্ডিত। গঙ্গাদাস শম্ভুচন্দ্র ভুবনে বিদিত॥ ঈশান শঙ্কর বলরাম গদাধর। পণ্ডিতের শিরোমণি চণ্ডচণ্ডেশ্বর॥ কাশীশ্বর ন্যায়রত্ন আর সিদ্ধেশ্বর। পঞ্চানন বেদান্তিক আর রত্নাকর॥ এই সব . . . . পণ্ডিত চলে সঙ্গে। প্রেমে মত্ত শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য চলে রঙ্গে॥ নৃত্যপরায়ণ প্রভু আগে আগে ধায়। কখন ধাবন লম্ফ পতন ধরায়॥ ধারা বহি অশ্রুবারি বহিছে নয়নে। ভারতী গোঁসাই কান্দে প্রেম আস্বাদনে॥
বারমুখী উপর ভক্তমালের বর্ণনা নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . গোবিন্দদাসের করচায় বারমুখী বেশ্যার বর্ণনা এবং নাভাজী বিরচিত ভক্তমালের বর্ণনা নিয়ে ১৯২৬সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৬৩, ৬৪ ও ৬৫ পৃষ্ঠার টীকায় লিখেছেন . . .
“ভক্তমালে এই বারমুখীর বিষয় উল্লিখিত আছে। নাভাজি এই গণিকার কথা প্রায় ঠিক রূপই শুনিয়াছিলেন, কিন্তু চৈতন্যদেবের নাম ঘোগা অঞ্চলের লোক জানিত না, কিংবা মনে রাখে নাই, এই জন্য, তাঁহাকে ভক্তমাল প্রণেতা নাভাজি শুধু বৈষ্ণব মহান্ত বলিয়াই উল্লেখ করিয়াছেন। এক দল বৈষ্ণব তাহার বাগিচায় গিয়াছিলেন, এরূপ ভক্তমালে লিখিত আছে।
বাস্তবিক চৈতন্যদেবের সঙ্গে তখন শুধু গোবিন্দ কর্ম্মকার ছিলেন না, কুলীন গ্রামবামী গোবিন্দচরণ ও রামানন্দ বসুও ছিলেন। ইহাঁরা সকলেই বৈষ্ণব ছিলেন, সুতরাং বৈষ্ণব দলের কথা যে তিনি লিখিয়াছিলেন, তাহা ঠিকই লিখিয়াছিলেন। সন্ন্যাসীর নাম গোত্র কেহ জিজ্ঞাসা করে না। এজন্য অজ্ঞাত দেশে চৈতন্যদেবের নাম অবিদিত ছিল, কিংবা জানা থাকিলেও পরবর্তী জন-শ্রুতি তাহা স্মরণ করিয়া রাখে নাই।
করচার প্রতিবাদী দল বলিতেছেন কেহ ভক্তমাল হইতে বিবরণটি লইয়া তাহা করচায় জুড়িয়া দিয়াছে। যদি চরিতামৃত কিংবা অন্য বৈষ্ণব গ্রন্থের সঙ্গে বর্ণনা মিলিয়া যায়, তবে তাঁহারা অনুমান করেন যে, করচা সেই বিবরণগুলি নকল করিয়াছে, যদি গরমিল হয় তবে বলেন, করচা খাটি নহে। তাহাদের যুক্তি অনেকটা শাঁখের করাতের ন্যায়, যাইতে আসিতে দুই দিকেই কাটে। নকল-বাজ্ কোন প্রাচীন পুস্তক হইতে বিবরণ সংগ্রহ করিতে পারে। কিন্তু প্রচলিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থের সঙ্গে বর্ণনা গরমিল করিবার সাহস তাহার থাকা স্বাভাবিক নহে। ভক্তমালের বর্ণনায় চৈতন্যের সহিত বারমুখীর সাক্ষাতের পরের ঘটনাও কিছু আছে। আমরা নাভাজির অনুবাদক কৃষ্ণদাসের বিবরণটির কতকাংশ নিয়ে উদ্ধৃত করিয়া দিতেছি :---”
এখানে দীনেশবাবু নাভাজীর ভক্তমালের কৃষ্ণদাস কৃত অনুবাদ থেকে সংশ্লীষ্ট অংশ তুলে দিয়েছেন যা আমরা বারমুখী বেশ্যাকে উদ্ধার নামক পদ “কিছু দূর গিয়া দেখি নদী শুভ্রামতী”-এর শেষে টীকায় তা সম্পূর্ণরূপে উদ্ধৃত করেছি। এর পর তিনি লিখেছেন . . .
“এই বিবরণের সঙ্গে করচার প্রদত্ত ঘটনা মিলাইয়া পড়িলে দেখা যাইবে, জন-প্রবাদ ও চাক্ষুষ ঘটনার কি প্রভেদ! করচায় যে সকল খুটি নাটি কথা আছে, যথা বালাজি নামক দুষ্ট বিপ্রের কথা---বাগানের নামটি পিয়ারী কানন, বারমুখীর মীরা নামক দাসীর কথা---এ সমস্তই বাস্তব ছবি। ভক্তমালে স্বপ্নদর্শন প্রভৃতি অলৌকিক ঘটনা আনিয়া বর্ণনাটির জন-প্রবাদ মুলক বাহুল্য প্রতিপন্ন করিতেছে।”
গোবিন্দদাসের করচা গ্রন্থ শেষ ও উড়িষ্যা যোগ - পাতার উপরে . . . পুথির শেষে লেখা রয়েছে “ খণ্ডিরু ”। এই শব্দটি ওড়িয়া ভাষার, যার অর্থ “খণ্ডিত” বা “টুকরো”। অর্থাৎ লিপিকার বাংলা ভাষার পুথির অনুলিপি লিখেছিলেন বটে, কিন্তু যেটুকু তাঁর নিজের পর্যবেক্ষণ, তা তিনি বাংলা হরফে কিন্তু ওড়িয়া ভাষাতেই লিখেছিলেন, যে ভাষাটি তাঁর সহজাত ভাষা ছিল। তাই আমাদের বিবেচনায়, সম্ভবত পুথিটির অনুলিপি নীলাচলে বসেই লেখা হয়েছিল। গ্রন্থের শেষাংশ এই ভাবে রয়েছে . . .
একদিন প্রভু মোর মিশ্রের ভবনে। কৃষ্ণগুণ গান করে ভক্তগণ সনে॥ গোবিন্দ বলিয়া মোরে ডাক দিয়া পাছে। যাইতে কহিলা মোরে আচার্য্যের কাছে॥ আজ্ঞা মাত্র পত্র সহ বিদায় লইয়া। শান্তিপুরে যাত্রা করি প্রণাম করিয়া॥ পৃষ্টে হাত দিয়া প্রভু আশিস্ করিল। মোর চক্ষে শত ধারা বহিতে লাগিল॥ প্রভু বলে নাহি কান্দ প্রাণের গাবিন্দ। আচার্য্যে আনিয়া হেথা করহ আনন্দ॥ এই বাক্য শুনি মোর চক্ষে বারি বহে। প্রভুর বিরহ বাণ প্রাণে নাহি সহে॥ প্রভুর বিরহ বেগ সহিব কেমনে। নিদারুণ কষ্ট আসি উপজিল মনে @॥
করচা গ্রন্থের ভাষার আধুনিকতা নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের প্রবন্ধ - পাতার উপরে . . . গোবিন্দ দাসের করচার বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ আনা হয়েছিল যে গ্রন্থটির ভাষা অতি আধুনিক এবং তাই গ্রন্থটি ৫০০ বছরের পূর্বে, শ্রীচৈতন্যের জীবদ্দশায় রচিত হতে পারে না।
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন করচার ভাষার আধুনিকতা নিয়ে ভূমিকার ৪৫-পৃষ্ঠায় বিস্তারিতভাবে লিখে গিয়েছেন যা নিঃসন্দেহে ভাষাতত্ত্বের ছাত্র ও গবেষকদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ। তাই “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ভাষার আধুনিকতা নিয়ে আমাদের কিছু বলা ধৃষ্টতা বই অন্য কিছু হবে না। আমরা রায়বাহাদুরের সেই প্রবন্ধটি দীর্ঘ হলেও, এখানে সম্পূর্ণ তুলে দিয়েছি!
আনন্দবাজার পত্রিকার ৩রা ফাল্গুন ১৩৩১ তারিখের সংখ্যায় প্রকাশিত রায় বাহাদুর রসময় মিত্রর একটি প্রবন্ধে তিনি গোবিন্দদাসের করচার ভাষা সম্বন্ধে লিখেছিলেন “চৈতন্যচরিতামৃতাদি গ্রন্থের সহিত তুলনায় উহার (করচার) ভাষা প্রভৃতির তুলনা করিয়া উহা যে আধুনিক” তা তিনি এবং তাঁর কয়েকজন বন্ধু সাব্যস্থ করেন। এর উত্তরেই রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন লেখেন এই প্রবন্ধ যা তিনি গোবিন্দদাসের করচা গ্রন্থের ভূমিকার অন্তর্ভুক্ত করেন . . .
করচার ভাষা - প্রতিবাদীরা বলিতেছেন, গোবিন্দ দাসের করচার ভাষা আধুনিক। পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে ইঁহারা চৈতন্য চরিতামৃতকেই ঐতিহাসিক প্রমাণ, ভাষাতত্ত্ব এবং ধর্ম্মশাস্ত্র প্রভৃতি সমস্ত বিষয়ে আদর্শ ঠিক করিয়া রাখিয়াছেন এবং এই আদর্শের আলোকে তাঁহাদের ভাষার বিচার চলিয়াছে @। একথা তাঁহাদের জানা উচিত যে চৈতন্যচরিতামৃতের ভাষা আদৌ খাটি বাঙ্গলা নহে। কবিরাজ গোস্বামী ষোড়শবর্ষ বয়সে বৃন্দাবন গিয়াছিলেন এবং সাতাশী বৎসর বয়সে চৈতন্য চরিতামৃতে প্রণয়নে নিযুক্ত হন। এই একাত্তর বৎসর এবং তাহার পরে আরও ছয় বৎসর তিনি ক্রমাগত বৃন্দাবনে থাকায় তাঁহার ভাষা হিন্দীর সঙ্গে মিশিয়া খিচুরী হইয়া গিয়াছিল। সে ভাষার নমুনা এইরূপ “কহে তাঁহা কৈছে রহে রূপ সনাতন। কৈছে করে বৈরাগ্য কৈছে ভজন॥ কৈছে অষ্ট প্রহর করে শ্রীকৃষ্ণ ভজন। তবে প্রশংদিয়া কহে সেই ভক্তগণ॥ অনিকেতন দুঁহে রহে যত বৃক্ষগণ। একৈক বৃক্ষের তলে একৈক রাতে শয়ন॥ করোয়াঁ মাত্র কাথা ছিঁড়া বহির্বাস। কৃষ্ণ কথা কৃষ্ণ নাম নর্ত্তন উল্লাস॥” (চৈ, চ, মধ্য ১৯ পঃ)। . ষোড়শ শতাব্দীতে ব্রজবুলীতে বঙ্গীয় কবিরা যে সকল পদ রচনা করিয়াছিলেন, তাহা দেখিয়াও অনেকের এই ভ্রান্ত ধারণা হইয়াছে যে সেই সময়ের বাঙ্গালা ভাষা বুঝি ঐরূপ। বস্তুতঃ বাঙ্গালী কবিদের ব্রজবুলী সম্পূর্ণ কৃত্রিম ভাষা। . এদেশে পাড়া গেঁয়ের ভাষা ৪০০। ৫০০ শত বত্সরে বড় বেশী তফাৎ হয় না। আমার পিতামহকে আমি দেখিয়াছি এবং আমার পৌত্রেরাও বর্ত্তমান আছে। পিতামহের ভাষা ও প্রপিতামহের ভাষাতে বিশেষ তফাৎ ছিল না, ইহা অনুমান করা যাইতে পারে। এই ছয় পুরুষে (প্রচলিত গণনানুসারে ২০০ বৎসর) ভাষার কিছু তফাৎ অবশ্যই হইয়াছে, কিন্তু তাহা খুব বেশী নহে। ৪০০ বৎসরে ভাষা খুব দুর্বোধ হইয়া পড়ে না। যদি কেহ খাটি বাঙ্গালায় পুস্তক রচনা করেন, তবে এখনকার ভাষা হইতে তাহার একটা বিশেষ পার্থক্য দৃষ্ট হইবে না। . ভাষা কয়েকটি কারণে তফাৎ হয়। প্রথমতঃ ভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে ; ---কোন কোন সংস্কৃতের পণ্ডিত এই বিংশ-শতাব্দীতে যেরূপ ভাষা প্রয়োগ করিয়াছেন তাহার দুরুহতা দেখিয়া কেহ কেহ অনুমান করিতে পারেন, যে উহা শ্রীহর্ষের সময়ের ভাষা। মৃত্যঞ্জয় পণ্ডিত লিখিয়াছিলেন “কোকিল কলালাপ বাচাল যে মলয়ানীল সে উচ্ছলাচ্ছীকরাত্যচ্ছ নির্ঝরান্তঃ কণাচ্ছন্ন হইয়া আসিতেছে”। মাইকেলের তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যের ভাষা এবং রবীন্দ্রনাথের ক্ষণিকার ভাষায় বিস্তর প্রভেদ আছে, অথচ এই দুই পুস্তক একরূপ সমসাময়িক (ভাষার ইতিহাস গণনা কালে ৩০। ৩৫ বৎসরের ব্যবধান গণনীয় নহে।) . ভাষা তফাৎ হওয়ার দ্বিতীয় কারণ প্রাদেশিকতা। বেশী দিন গত হয় নাই বঙ্গদেশের এক স্থানে একটি ঔষধের বিজ্ঞাপন দেওয়া হইয়াছিল। যে দেশে নবীন চন্দ্র সেন পলাশীর যুদ্ধ লিখিয়া গিয়াছেন,--- যে দেশে নবীন চন্দ্র দাস রঘুবংশের সুমধুর বঙ্গানুবাদ করিয়াছেন, এই বিজ্ঞাপনটিতে সেই দেশের ভাষা ব্যবহৃত হইয়াছে ! বিজ্ঞাপন হইতে একটি স্থান উদ্ধত হইল :--- “ইবা দাবাই না? ইবা বড় গম দাবাই। আঁব খাল্ তে ভাইর পোয়ার লাঈ একাআনা দি এক দুর্গা খাবাইলাম যে, আজ্জের আন্দাজ চীর বাইর হঈল। আর গুরা পোয়ারে খাবাইতে কোন ভয় নাই।” এই লেখাটা বার চৌদ্দ বৎসর পূর্ব্বে বঙ্গদেশের কোন এক প্রান্তে ব্যবহৃত হইয়াছিল, তাহা পড়িয়া এখনকার কোন আনাড়ি লেখক মনে করিতে পারেন, উহা অশোকের সময়ের প্রাকৃত । . কোন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ভাষা ৪০০। ৫০০ শত বৎসরে বড় বেশী পরিবর্ত্তন হয় না। যে সকল স্থানে বানিজ্যের কেন্দ্র, সেখানে বহু বিদেশী লোকের আনা গোনা হয়, তথায় নানা ভাষা মিশিয়া একটা জটিল ভাষার সৃষ্টি হইয়া থাকে। কিন্তু বঙ্গের নিভৃত পল্লীগুলিতে সহস্র বৎসরেও ভাষার কোন দ্রুত কিম্বা আমূল পরিবর্ত্তন লক্ষিত হয় না। . যে সকল লেখক পণ্ডিত, তাঁহাদের লেখায় অলক্ষিত ভাবে পূর্ববর্ত্তী গ্রস্থাদির ভাষা আসিয়া পড়ে। এই জন্য পণ্ডিত গ্রন্থকারদের ভাষায় মধ্যে মধ্যে শব্দগুলির প্রাচীন আকৃতি দৃষ্ট হইয়া থাকে। গোবিন্দ দাসের বই- পড়া বিদ্যা সামান্যই ছিল। তিনি খাটি বাঙ্গালা কথা লিখিয়া গিয়াছেন এই জন্য তাহার ভাষা অতি সরল হইয়াছে। . চৈতন্যরিতামৃতের হিন্দী-বহুল বাঙ্গলা এবং ব্রজবুলীর মৈথিল-মিশ্রিত বাঙ্গলা দেখিয়া যাঁহারা ষোড়শ শতাব্দীর ভাষার আদর্শ ঠিক করিয়া রাখিয়াছেন, তাঁহারা পদে পদেই ভুল করিবেন। মুদ্রিত পুস্তকে অনেক সময় বানান ভিন্ন রূপ করাতে ভাষা সুপ্রাচীন মনে হইয়া থাকে। যথা “পাইয়া” কথাটা যদি ‘পাইঞা’ অথবা ‘প্যাঞা’ ভাবে লিখিত হয়, তবে যেন মনে হয় শেষোক্ত আকার প্রাচীনতর। কিন্তু মূলতঃ এই বিভিন্ন প্রকারের মধ্যে উচ্চারণ গত বিশেষ তফাৎ নাই। সেইরূপ ‘এক’ যদি ‘য়েক’ কিংবা ‘লইয়া’ যদি ‘লঞা’ এই ভাবে লিখিত হয় তবে চোখে ধাঁধা লাগে, বাস্তবিক এই ভিন্ন ভিন্ন রূপের মধ্যে কথা বলিবার সময় বিশেষ কোন পার্থক্য লক্ষিত হয় না। . আমাদের পণ্ডিত মহাশয়ের যখন আগেকার দিনে প্রাচীন পুথি সম্পাদন করিতে লাগিয়া যাইতেন, তখন পুথির ঐরূপ ‘ঞ’ প্রভৃতির ব্যবহার পরিবর্ত্তন করিয়া ফেলিতেন। তাঁহাদের লক্ষ্য থাকিত যাহাতে লোকে বই পড়িতে কষ্ট না পায় সেই দিকে, ভাষা-বিজ্ঞান লইয়া তাহারা মাথা ঘামাইতেন না। কৃত্তিবাস প্রভৃতি কবির যে সকল প্রাচীন পুথি পাওয়া যায়, তাহাদের সঙ্গে বটতলার মুদ্রিত পুথি মিলাইয়া দেখিলে এইরূপ পরিবর্ত্তনের চিহ্ন পত্রে পত্রে পাওয়া যাইবে। বর্ণবিন্যাসের প্রাচীন রীতিগুলি রক্ষা করিলে ভাষা এক থাকা সত্ত্বেও পুস্তকখানি প্রাচীনতর মনে হইবে। কৃত্তিবাসাদি সম্বন্ধে প্রকাশকগণ যাহা করিয়াছেন, করচা সম্বন্ধেও জয়গোগাল গোস্বামী কতক পরিমানে সেই রীতিই অবলম্বন করিয়াছেন। তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল না পুথিতে বেশী কোন পরিবর্ত্তন করা। মাঝে মাঝে প্রাচীন শব্দ বদলাইয়া তিনি পুস্তক খানি সহজ-বোধ্য করিয়াছিলেন। . চণ্ডীদাসের বর্ত্তমান কালে যে সকল পদ পাওয়া যাইতেছে গায়কেরা তাহা কতকটা সহজ করিয়াছেন, কিন্তু তথাপি সেগুলি চণ্ডীদাসের নামেই পরিচিত হইতেছে। কৃত্তিবাস, বৃন্দাবন দাস প্রভৃতি লেখক সন্বদ্ধে ও সেই একই কথা প্রযোজ্য। . গোবিন্দকর্ম্মকারের অন্ততঃ ১২৫ বৎসর পূর্ব্বে যে সকল পদ চণ্ডীদাস রচনা করিয়াছিলেন তাহা আমরা এইরূপ ভাবে পাইতেছি :--- (১) “বহুদিন পরে বধুয়া এলে। দেখা না হইত মরণ হৈলে॥ দুঃখিনীর দিন দুখেতে গেল। তুমি ত মথুরায় ছিলে হে ভাল॥ আমি নিজ সুখ দুখ কিছু না জানি। তোমার কুশলে কুশল মানি।” (২) “সই কেবা শুনাইল শ্যামনাম। কাণের ভিতর দিয়া, মরমে পশিল গো, আকুল করিল মোর প্রাণ॥ না জানি কতেক মধু, শ্যাম-নামে আছেগো, বদন ছাড়িতে নাহি পারে। জপিতে জপিতে নাম, অবশ করিল গো, কেমনে পাইব সখী তারে॥” (৩) “বধুঁ কি আর বলিব আমি। জীবনে মরণে, জনমে জনমে, প্রাণনাথ হইও তুমি॥ তোমার চরণে, আমার পরাণে, বান্ধিল প্রেমের ফাঁসি। সব সমপিয়া, এক মন হৈয়া, নিশ্চয় হইলাম দাসী॥” (৪) “কে বলে পিরীতি ভাল। হাসিতে হাসিতে পিরীতি করিয়া কান্দিয়া জনম গেল॥” চণ্ডীদাসের কিছু পরে---চৈতন্যপ্রভুর জন্মের পূর্ব্বে---শ্রীখণ্ডের কবি নরহরি এইরূপ পদ রচনা করিয়াছিলেন :--- “অঙ্গনে রহিল আমার হিয়ার হেম হার। পিয়া যেন গলায় পরয়ে একবার॥ রোপিনু মল্লিকা নিজ করে। গাঁথিয়া ফুলের মালা পরাইও তারে॥” . গোবিন্দ দাসের প্রায় সমসাময়িক বৃন্দাবন দাস তৎকৃত চৈতন্যভাগবতে এইরূপ ভাষা ব্যবহার করিয়াছেন :--- “নাচে বিশ্বম্ভর, সবার ঈশ্বর, ভাগিরথী তীরে তীরে। যার পদধূলী, হয়ে কুতূহলী, সবাই ধরিল শিরে॥ অপূর্ব্ব বিকার, নয়নে সুধার, হঙ্কার র্জ্জন শুনি। হাসিয়া হাসিয়া, শ্রী ভূজ তুলিয়া, বলে হরি হরি বাণী॥” . কৃত্তিবাসী রামায়ণ গোবিন্দ দাসের করচার অন্ততঃ ৬০। ৭০ বৎসরের পুর্ব্ববর্ত্তী। বটতলার ছাপা রামায়ণে তাহার ভাষা কিরূপ আকার ধারণ করিয়াছে তাহা সকলেই অবগত আছেন। তথাপি কয়েকটি নমুনা দিতেছি :--- (১) “মাঝে সীতা আগে পাছে দুই মহাবীর । দুই ক্রোশ পথ বাহি যান গঙ্গা তীর॥ শ্রীরাম বলেন ভরদ্বাজের নিকটে। আজি বাসা করিয়া থাকিবা নিঃশঙ্কটে॥ মুনিগণের বেষ্টিত বসিয়া ভরদ্বাজ। তারাগণ মধ্যে যেন শোভে দ্বিজরাজ॥ হেন কালে সেখানে গেলেন তিন জন। তিন জনে বন্দিলেন মুনির চরণ॥ শ্রীরাম বলেন শুন মুনি মহাশয়। তিন জন তব ঠাঞি করি পরিচয়॥ শ্রী দশরথের পুত্র মোরা দুই জন। শ্রীরাম আমার নাম কনিষ্ঠ লক্ষণ॥” (২) “বন্ধুবান্ধবাদি কোথা কেবা আছে আর। মনে মনে চিন্তা করে দেখি একবার॥ স্বর্গে ছিল বীরবাহু মরিল আসিয়া। কারে পাঠাইব যুক্তি না পাই ভাবিয়া॥ ইন্দ্রজিৎ নাহি রণে যাবে কোন জন। অশ্রুধারা বহিতেছে বিংশতি লোচন॥ অভিমানে শীর্ণ অঙ্গ মলিন বদন। ক্ষণে উঠে ক্ষণে বৈসে রাজা দশানন॥ ক্ষণে ক্ষণে মুর্চ্ছা হয়ে ভূমিতলে পড়ে। এত দিনে পার্ব্বতী শঙ্কর বুঝি ছাড়ে॥ রাবণের মাতা সে নিকষা নাম ধরে। কান্দিতে কান্দিতে গেল রাবণ গোচরে॥ সন্তানের স্নেহ বশে দুঃখিতা অন্তরে। রাবণে বুঝায় বুড়ী অশেষ প্রকারে॥ বিভীষণ ভাই তোর ধর্ম্মশীল অতি। এসেছিল বুঝাইতে তারে মার লাখি॥” (৩) "ভূমে পড়ি বালীরাজা করে ছট্ ফট্। ধাইয়া গেলেন রাম তাহার নিকট॥ মৃগ মারি ব্যাধ যেন ধাইলা উদ্দেশে। ধাইয়া গেলেন রাম সে বালীর পাশে॥ রক্তনেত্রে শ্রীরামের পানে চাহে বালী। দন্ত কড়মড় করে দেয় গালাগালি॥ নিষেধিলা তারা মোরে বিবিধ বিধানে। করিলাম বিশ্বাস চণ্ডালে সাধু জ্ঞানে॥ রাজকুলে জন্মিয়াছ নাহি ধর্ম্মজ্ঞান। আমারে মারিলা রাম এ কোন বিধান॥ কোন দেশ লুটাইয়া দিলাম কারে ক্লেশ। কোন দোষে করিলা আমার আয়ুশেষ॥ আর বংশে জন্ম নহে জন্ম রঘুবংশে। ধার্মিক বলিয়া তোমা সকলে প্রশংসে ॥ এ কোন ধর্ম্মের কাজ করিলা আপনি। অপরাধ বিনা বিনাশিলা মম প্রাণী॥ সবে বলে রামচন্দ্র দয়ার নিবাস। যত দয়া তোমার সব আমাতে প্রকাশ॥ তপস্বীর ছলে রাম ভ্রম বনে বনে। কাহার বধিবা প্রাণ সদা ভাব মনে॥” . শান্তিপুর-নিবাসী বৃদ্ধ পণ্ডিত শ্রীযুক্ত হরিলাল গোস্বামী মহাশয় লিখিয়াছেন, করচার প্রাচীন পুথি জয়গোপাল গোস্বামী মহাশয়ের নিকট ছিল, তাহা অনেকেই জানেন। “কিন্তু করচার ষোল আনা মৌলিকতা সম্বন্ধে আমার সন্দেহ হয়।” . তাঁহার কেন? আমি নিশ্চয়ই জানি যে জয়গোপাল গোস্বামী মহাশয়ের মুদ্রিত করচা ষোল আনা খাটী নহে। তিনি নিজেও আমার নিকট একথা স্বীকার করিয়াছেন। অপরাপর প্রাচীন পুখি সম্পাদকগণের ন্যায় তিনিও প্রাচীন বর্ণ-বিন্যাসের প্রাকৃত রীতি কতকটা বদলাইয়াছেন। তাহা ছাড়া মাঝে মাঝে অপ্রচলিত শব্দও পরিবর্তন করিয়াছেন ; এবং পয়ারছন্দের যেখানে কোনরূপ ব্যতিক্রম পাইয়াছেন, সেখানে দুই একটি শব্দ কমাইয়া, বাড়াইয়া তাহা নিয়মিত করিয়াছেন। সেকালে প্রাচীন হাতের লেখা পুথি মুদ্রাযন্ত্রে উঠিলেই তাহার এইভাবে বেশ-পরিবর্ত্তন হইত, শুধু করচাকে একা এ অপরাধে দোষী করা ঠিক হইবে না। . এইরূপ পরিবর্তন সত্ত্বেও যদি চণ্ডীদাস, কৃত্তিবাস, কবিকঙ্কণ ও কাশীদাস প্রভৃতি প্রাচীন কবিদিগকে মানিয়া লওয়া হয়, তবে করচা কি দোষে অপাংক্তেয় হইয়া থাকিবে? বরঞ্চ উল্লিখিত কবিদের রচনা যতটা পরিবর্ত্তিত হইয়াছে, করচায় তাহা হইতে ঢের কম পরিবর্ত্তন হইয়াছে। . পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে যে সময়ে করচা মুদ্রিত হয় তখন জয়গোপাল গোস্বামীর জ্যেষ্ঠ পুত্র বনোয়ারী লালের বয়স ৪০ এর কম ছিল না। তিনি এই কার্য্যে সর্ব্ববিষয়ে তাহার পিতার সাহায্য করিয়াছিলেন। পুথিখানি মাঝে মাঝে কীটদষ্ট ছিল এবং তাহার কোন কোন জায়গার পাঠ পড়িতে পারা যায় নাই। সেই সকল স্থান বৃদ্ধ গোস্বামী মহাশয় অনুমানের উপর নির্ভর করিয়া পুরণ করিয়াছিলেন, এবং স্থানে স্থানে অপ্রচলিত শব্দ পরিবর্ত্তন করিয়া আধুনিক শব্দ যোজনা করিয়াছিলেন। কিন্ত মোটের উপর এই পরিবর্তন বেশী নহে। যে সকল জায়গা এইকপ পরিবর্ত্তিত হইয়াছিল, তাহার যতটা মনে আছে, বনোয়ারীলাল গোস্বামী মহাশয় স্বীয় বিশ্বাসানুসারে এই সংস্করণে তাহার প্রাচীন পাঠ রক্ষা করিয়াছেন। . যদিও করচার লেখা অতি সরল এবং সুখপাঠ্য, তথাপি ইহার ভাষায় প্রাচীনত্বের চিহ্ন অনেক আছে, কয়েকটি শব্দ লক্ষ্য করিলেই একথা প্রতীয়মান হইবে :--- . নিয়ড়ে = নিকটে (“কৃষ্ণের নিয়ড়ে তথা কাম ভষ্ম হয়”। ১০ পৃঃ) ; পাড়ু = পার (“অবধৌত বীর পাড়ু হইতে ঝাঁপ দিলা” ২ পৃঃ।) ; পিব = পান করিব। “মোরে বলে আন বিষ শীঘ্র আমি পিব” (৬ পৃঃ) ; বার দিলা = উপস্থিত হইলা (“একে একে আসি বার দিলা সেই স্থানে।” নাট = নৃত্য। (সহজে চলিলে দেখায় নাটুয়ার নাট ।” (৩ পৃঃ) ; পড়ু = পড়ুক (“তথাপি মামার মুণ্ডে পড়ু শত বাজ।” (৫ পৃঃ) ; পাকাড়ি = ধরিয়া (“অনন্তর গদাধর পাকাড়ি চরণ।” (৬ পৃঃ) ; লাগাইলা = দিলা (“প্রভু ভোগ লাগাইলা।” (৭ পৃঃ) ; তুহুঁ = তুমি (“নীলাচলে গিয়া তুহুঁ থাক মোর ঠাঁই।” (২২ পৃঃ) ; ইষ্টগোষ্ঠি করি = আত্মীয়তা করা (“এইরূপে পক্ষকাল ইষ্টগোষ্টি করি।” (৭৫ পৃঃ) ; মুহি = আমি (*ভাবিতে লাগিনু মুহি ভাগ্যে কিবা হবে।” (১৩ পৃঃ) ; বলনা = গঠন (“ডমরুর মধ্য জিনি কটীর বলনা।” (৯ পৃঃ) ; পোকুর = পুকুর (“কন্যা পুত্র অট্টালিকা পোকুর উদ্যান।” ফুকারি = কান্দিয়া (“অমনি রমণিগণ ফুকারি উঠিল।” (১১ পুঃ) ; তছু = তাহাতে (“উথলিয়া পড়ে তছু শচীমার শোক”। (৭ পৃঃ) বাত্ = বাক্য (“দুই চারি বাত্ কহি মায়া কাটাইয়া।” (১৩পঃ) : কতি = কোথায় (“কতি বা থাকিবে তব সোণা রূপা দানা।” (১৬ পৃঃ) ; মোপানে = আমার দিকে (“দুই চারি বাত কহে মোপানে চাহিয়া।” (১৬ পৃঃ) ; ঘাড়ি = ঘাড় (“ঘাড়ি ভাঙ্গি পড়িতেছে আকুল পরাণ।” (২৫ পৃঃ) ; আধসা? (“আঁধসা পিষ্টক পুরি রসপুর গজা।” (২০ পৃঃ) ; তেঁহ = তিনি (“নারায়ণ গড়ের তেঁহ গ্রাম্যদেব হয়।” (১৬ পৃঃ) ; আগুয়ান = অগ্রসর (“চারিটা রূপার হদ্দা চলে আগুয়ান।” (১৭ পৃঃ) ; আঁধা = অন্ধ (*ঘানির বলদ সম সর্ব্বদা সে আঁধা।” (১৮ পৃঃ) ; গোফা = গুম্ফ (“বহুতর গোফা আছে তার চারিভিতে।” (৩৫ পৃঃ) ; দোসর = তুল্য (“সোণার দোসর তনু ভূতলে পড়িল।” (৪৭ পৃঃ) ; ঝাঁকি দিতে = বুঝিতে (“সন্ন্যাসীরে ঝাঁকি দিতে আইলা আপনি।” (৬১ পৃঃ) ; কাঁহা = কোথায় (“গোবিন্দরে কাঁহা কৃষ্ণ আনাও মিলিয়া।” (৬৬ পৃঃ) ; উনুমত = উন্মত্ত। (“সদা উনুমত প্রভু কৃষ্ণেতে অবেশ॥” (৬১ পৃঃ) ঘাঁতি = গোপন ভাবে থাকা (“ঘাঁতি দিয়াছিল সেই বৈশ্য লুকাইয়া।” (৭৮ পৃঃ) ; মুরখ = মুর্খ (*মুরখ সন্ন্যাসী মুহি কিছু নাহি জানি।” (২৩ পৃঃ) ; থোড়া = অল্প (“থোড়া থোড়া চুনা আটা সংগ্রহ করিয়া” (৩৩ পৃঃ) ) ; পাকাইয়া = পাক করিয়া (“রুটী পাকাইয়া প্রভু লাগাইল ভোগ।” (৩৩পৃঃ) ; তথি = তথায় (“কত শত লোক তথি আসিয়া জুটিল।” (৩৬পৃঃ) ; চাম্বনি = শিঙরি? (“চাম্বনি শিঙরি বলি হাসিল তখন।” (৪২ পৃঃ) ; উভরায় = উচ্চস্বরে (“আছাড়ি বিছাড়ি সবে উভরায় কান্দে।") (১৯ পৃঃ) ; ঝাঁকি বাঁধি = একত্র হইয়া (“ঝাঁকি বাধি মুন্নাবাসী থাকিতে কহিল।” (২৭ পৃঃ) ; ইহ = এইখানে (“একজন পাণ্ডা ইহ থাকে নিরন্তর।” (৭০ পৃঃ) বাটা = দান (“কেহ চূণা আনি দেয় অতিথির বাটা।”) ; পাহাড়িয়া = পাছকোল করিয়া (“পাছাড়িয়া রাজা তবে প্রভুরে ধরিলা।” (৪৫ পৃঃ) ; হিটা? (“মিছা হিটা = মিছা ভিটা” (৫৩ পৃঃ)। বিছারি = আছাড় খাইয়া (বোধ হয় বিস্তারি কথা হইতে---প্রেমে গদ গদ হৈয়া পড়য়ে বিছাড়ি” এহি = এই (এহি গ্রন্থে না রহিল) (২২ পৃঃ)। . প্রাচীন বাঙ্গালায় অনেক হিন্দী কথা পাওয়া যায়। আমি ব্রজবুলি বা চরিতামৃতের ভাষার কথা বলিতেছি না ; খাটি প্রাচীন বাঙ্গালা পুথিতে ও এই সকল হিন্দী শব্দের প্রভাব দেখা যায়। বিজয় গুপ্তের পদ্মা পুরাণ একখানি খাটি বাঙ্গালা গ্রন্থ। ইহাতে ও 'জেতকে’ ‘তেত্ কে’ ‘পোখেরি’ ‘দোনো’ প্রভৃতি হিন্দী শব্দ দেখা যায়। চণ্ডীদাসের “নাম পরতাপে যার ঐছন করলগো, অঙ্গের পরশে কিবা হয়। যেখানে বসতি তার সেখানে থাকিয়া গো, যুবতী ধরম কৈছে রয়।” প্রভৃতি পদে হিন্দী শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। করচাতেও মাঝে মাঝে ঐরূপ হিন্দী শব্দ আছে যথা ‘ভোগ লাগাইলা’, ‘বাত’ ‘পুছে’ ‘কাঁহা শত শত গোপী কাঁহা সেই নাট।’ করচায় আবার কতকগুলি শব্দ আছে, যাহা অত্যন্ত প্রাচীন প্রয়োগ ; যথা “রাগে ডগমগ প্রভু দেয় সম্তরণ' -৫ পৃঃ এখানে রাগ অর্থ ক্রোধ নহে, অনুরাগ। অবশ্য এখন বঙ্গভাষায় রাগের মৌলিক অর্থ-প্রয়োগ আর দেখা যায় না, উহা ক্রোধার্থ সূচক হইয়া গিয়াছে।
@ - রায় বাহাদুর রসময় মিত্রর লিখিয়াছেন “চৈতন্যচরিতামৃতাদি গ্রন্থের সহিত তুলনায় উহার (করচার) ভাষা প্রভৃতির তুলনা করিয়া উহা যে আধুনিক” তাহাই তিনি এবং তাঁহার কতিপয় বন্ধু সাব্যস্থ করেন। আনন্দবাজার পত্রিকার ৩রা ফাল্গুন ১৩৩১।
“গোবিন্দ দাসের করচা”র নাম করে বা নাম না করে উল্লেখ আছে কি?পাতার উপরে . . . গোবিন্দদাসের নাম জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে পাওয়া গেলেও তাঁর রচিত “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের উল্লেখ সরাসরি কোথাও পাওয়া যায় না। ঠিক যেমন আমরা চূড়ামণিদাসের নামের উল্লেখ অষ্টাদশ শতকে প্রকাশিত বৈষ্ণবদাসের পদকল্পতরুতে পেলেও, তাঁর রচিত “গৌরাঙ্গ-বিজয়” অথবা “ভূবনমঙ্গল” এর নামের উল্লেখ কোথাও পাইনা। চূড়ামণি দাস নামের কোনও কবি বা গ্রন্থকারের বা কোনো চরিত্রের নাম কোনও শাখাবর্ণনাতেও পাওয়া যায় না।
সাধারণভাবে দেখলে, তাঁদের নাম এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ও প্রকাশিত কোনও পুথিতে বা গ্রন্থে পাওয়া যায় নি। কিন্তু সত্যিই কি তাই? চৈতন্য-জীবনীকার জয়ানন্দের অ-সংশয়াতীত লেখনীতে, নাম উচ্চারিত না থাকলেও, সম্ভবত সর্বপ্রথম চৈতন্য-জীবনীকার গোবিন্দ কর্মকারের অস্তিত্ব আমরা পাই। ঠিক যেমন আমরা পাই অপর চৈতন্যজীবনীকার কবি চূড়ামণিদাসের অস্তিত্বও।
“জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”-এর আদি খণ্ডে জয়নন্দ তাঁর পূর্বতন কবিদের এইভাবে উল্লেখ করেছেন . . . সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য ব্যাস অবতার। চৈতন্য চরিত্র আগে করিল প্রচার॥ চৈতন্য সহস্র নাম শ্লোক প্রবন্ধে। সার্ব্বভৌম রচিল কেবল প্রেমানন্দে॥ পরমানন্দ পুরী গোসাঞি মহাশয়। সংক্ষেপে করিলেন তিহোঁ গোবিন্দবিজয়@॥ আদিখণ্ড মধ্যখণ্ড শেষখণ্ড করি। বৃন্দাবনদাস প্রচারিল সর্ব্বোপরি॥ গৌরীদাস পণ্ডিতের কবিত্ব সুশ্রেণী। সঙ্গীত প্রবন্ধে তার পদে পদে ধ্বনি॥ সংক্ষেপে করিলে অতি পরমানন্দ গুপ্ত। গৌরাঙ্গবিজয় গীত শুনিতে অদ্ভুত॥ গোপাল বসু করিলেন গীতত প্রবন্ধে। চৈতন্যমঙ্গল তারা চামর বিছন্দে॥ ইবে শব্দ চামর সঙ্গীত বাদ্যরসে। জয়ানন্দ চৈতন্যমঙ্গল গাএ শেষে॥ আর যত যত কবি জন্মিল আপারে। চৈতন্যমঙ্গল তারা করিল প্রচারে॥” ---বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”, আদি খণ্ড, ৪- পৃষ্ঠা॥ @ - নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত গ্রন্থে “গোবিন্দবিজয়” রয়েছে।
জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে উল্লিখিত চৈতন্য-জীবনীকারদের আমরা এক এক করে দেখবো . . .
চৈতন্য-জীবনীকারদের মধ্যে জয়ানন্দ সর্ব প্রথম নাম করেছেন সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্যের লেখা চৈতন্য সহস্র নামের সংস্কৃত শ্লোক বিশিষ্ট গ্রন্থের। সুকুমার সেন তাঁর সম্পাদিত চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গ-বিজয় গ্রন্থে এনাকে নিয়ে কোনও টীকা-টিপ্পনী লেখেন নি। সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্যের সহস্রশ্লোক না হলেও “সার্ব্বভৌমশতক” নামের শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে নিয়ে একশত শ্লোক-বিশিষ্ট গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবতের (অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী সম্পাদিত) অন্ত্য খণ্ডের ৩য় অধ্যায়ের ৪০৭-পৃষ্ঠায়। চৈতন্যভাগবতের উক্ত অংশে এই নামকরণটি শ্রীচৈতন্যই করছেন, সার্ব্বভৌমকে নিজের ষড়ভূজ নারায়ণ মূর্ত্তি প্রদর্শন করার পরে। এখানে শ্রীচৈতন্য বলছেন . . . যতেক করিলা তুমি --- সব সত্য কথা। তোমার মুখেতে কেন আসিবে অন্যথা॥ শত শ্লোক করি তুমি যে কৈলে স্তবন। যে জন করয়ে ইহা শ্রবণ পঠন॥ আমাতে তাহার ভক্তি হইবে নিশ্চয়। ‘সার্ব্বভৌমশতক’ বলি লোকে যেন কয়॥
এর পরে জয়ানন্দ উল্লেখ করেছেন “পরমানন্দ পুরী গোসাঞি” মহাশয়ের সংক্ষেপে “গৌরাঙ্গবিজয়” নামক গ্রন্থের নাম। নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত “জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল” গ্রন্থে এই গ্রন্থের নামটি “গোবিন্দবিজয়” দেওয়া রয়েছে। “পরমানন্দ পুরী গোসাঞি” নামটি নিয়ে সরাসরি কিছু না লিখলেও বিমানবিহারী মহাশয় যে এই নামটিকে কবিকর্ণপূরের “পরমানন্দ সেন” নামের ভুল করে লেখা নাম বলে মনে করেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ তিনি প্রমাণ করেছেন কী ভাবে জয়ানন্দ আসলে কবিকর্ণপূরের লেখা পড়েন নি। তাঁর মতে জয়ানন্দ কেবল বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবত পড়েছিলেন। জয়ানন্দের দেওয়া শ্রীচৈতন্যের পূরীতে বাস, বৃন্দাবনদাসের দেওয়া ২৮ বছরের সাথে মিলছে কিন্তু কবিকর্ণপূরের (পরমানন্দ সেন) ২০ বছরের পুরী-বাস এবং তিন বছরের ভারত-ভ্রমণের সঙ্গে মিলছে না। সুতরাং উল্লিখিত “পরমানন্দ পুরী গোসাঞি” পরমানন্দ সেন বা পরমানন্দ দাস ভণিতার কবি বা কবিকর্ণপূরের শ্রীচৈতন্যের দেওয়া অপর নাম “পুরী দাস” নয়। অন্যদিকে সুকুমার সেন তাঁর সম্পাদিত চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গবিজয়-এর Introduction-এ খুব জোর দিয়ে বলেছেন যে পরমানন্দ পুরী তাঁর মতে নিশ্চিতভাবে পরমানন্দ সেন বা পরমানন্দ দাসের নাম ভুল করে লেখা।
আমরা “পরমানন্দ পুরী গোসাঞি”, এই নামের নীলাচলে শ্রীচৈতন্যের প্রিয় পরমানন্দ গোসাঞির উল্লেখ পাচ্ছি অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী সম্পাদিত, বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবতের অন্ত্য খণ্ডের ৩য় অধ্যায়ের ৪১০-৪১১ পৃষ্ঠায়। সেখানে চৈতন্য ও পরমানন্দ পুরীকে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে . . . একদিন প্রভু পুরীগোসাঞির মঠে। বসিলেন গিয়া তান পরম-নিকটে॥ পরমানন্দপুরীরে প্রভুর বড় প্রীত। পূর্ব্বে যেন শ্রীকৃষ্ণ-অর্জ্জুন দুই মিত॥
পরমানন্দ পূরী গোসাঞির মঠের একটি কূপের বিষাক্ত জল কে শ্রীচৈতন্য, জগন্নাথের কাছে প্রার্থনা করে গঙ্গার প্রবেশ ঘটিয়ে নির্মল জলে পরিপূর্ণ করিয়েছিলেন। পরে . . . পুরীগোসাঞির প্রীতে সেই দিব্য জলে। স্নান-পান করে প্রভু মহাকুতূহলে॥ প্রভু বোলে আমি যে আছি পৃথিবীতে। জানিহ কেবল পুরীগোসাঞির প্রীতে॥
কিন্তু এই পরমানন্দ পুরী কোনও “গৌরাঙ্গবিজয়” নামক চরিত-গ্রন্থ লিখেছিলেন, এমন কোথাও লেখা পাওয়া যায় না। আমাদের মনে হচ্ছে যে “গৌরাঙ্গবিজয়” গ্রন্থটির নাম ঠিক মত জেনে থাকলেও তার রচয়িতার নাম লিখতে ভুল করেছিলেন জয়ানন্দ।
এর পরে জয়ানন্দের উল্লেখ করা কবির নাম “বৃন্দাবনদাস”। সেখানে কোনও দ্বিমত দেখা যাচ্ছে না। তাই ধরে নেওয়া ভুল হবে না যে বৃন্দাবনদাসের পরেই জয়ানন্দ তাঁর চৈতন্যমঙ্গল রচনা করেছিলেন।
এরপরে রয়েছে গৌরীদাস পণ্ডিতের নাম। তাঁর কোনো রচনার নামের উল্লেখ করা হয়নি। গৌরীদাস পণ্ডিতের রচিত কোনো চৈতন্য-চরিত গ্রন্থের খবর আমরা পাই না। কিন্তু আমরা দুইজন গৌরীদাসের নাম জানতে পারি। প্রথমজন গৌরীদাস পণ্ডিত, যিনি ছিলেন শ্রীচৈতন্য এবং নিত্যানন্দের খুব নিকট ভক্ত। তাঁর ভ্রাতা সূর্য্যদাস পণ্ডিতের দুই কন্যা বসুধা ও জাহ্নবা দেবীর সঙ্গে নিত্যানন্দের বিবাহ হয়েছিল। দ্বিতীয়জন ছিলেন গৌরীদাস কীর্ত্তনিয়া। “গৌরীদাস” ভণিতার যে দুটি পদ শ্রীশ্রীপদকল্পতরুতে রয়েছে (১৬১ ও ২৩১৩ সংখ্যক পদ), সে দুটি অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধি এবং সতীশচন্দ্র রায়ের মতে গৌরীদাস কীর্তনিয়ার রচিত পদ। তার মধ্যে “পহু মোর নিত্যানন্দ রায়” পদটি বৈষ্ণবদাসের শ্রীশ্রীপদকল্পতরুতে “গৌরীদাস” ভণিতায় থাকলেও এই পদটিই দীর্ঘ “আরে মোর আরে মোর নিত্যানন্দ রায়” রূপে, রয়েছে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বা হরিবল্লভ দাসের সংকলিত শ্রীশ্রীক্ষণদাগীত-চিন্তামণি গ্রন্থে “বলরামদাস”-এর ভণিতায়। জয়ানন্দ সম্ভবত গৌরীদাসের রচিত পদাবলী পড়েছিলেন বা শুনেছিলেন এবং সে কথাই লিখে গিয়েছেন কোনও চরিত-গ্রন্থের নাম না করে। এখানে আমরা শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন মহাশয়ের সঙ্গে সহমত পোষণ করছি যে গৌরীদাস পণ্ডিতের লেখা কোনও চৈতন্য-জীবনী রচনা যদি থাকতো তাহলে তা কোনোমতেই হারিয়ে যেতে পারতো না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পদগুলি গৌরীদাস কীর্ত্তনিয়ার রচনা বলে আজ মাত্র ২ অথবা ১টি পদই অবশিষ্ট রয়েছে।
কোন কোন পুথিতে “পরমানন্দ পুরী গোসাঞি” রচিত গ্রন্থের নাম “গৌরাঙ্গবিজয়” এর যায়গায় “গোবিন্দবিজয়” দেওয়া রয়েছে। তা হলেও পুনরায় কবি “পরমানন্দ গুপ্তের” রচনাতেও গ্রন্থের নাম “গৌরাঙ্গবিজয়” দেওয়া রয়েছে দ্বিতীয়বারের জন্য। এটাই প্রমাণ করে যে জয়ানন্দ অবশ্যই গৌরাঙ্গবিজয় নামক কোনও গ্রন্থ, হয় পড়েছিলেন বা নিশ্চিতভাবে সেই গ্রন্থের নাম শুনেছিলেন। রচয়িতার নামটি তিনি সঠিকভাবে লেখেন নি, সম্ভবত সেখানে ধোঁয়াশা ছিল বলে। সুকুমার সেন প্রায় নিশ্চিতভাবে দাবী করেছেন যে পরমানন্দ পুরী নামটি আসলে হবে পরমানন্দ সেন বা পুরীদাস এবং গ্রন্থের নামটি “গৌরাঙ্গবিজয়” না হয়ে হবে চৈতন্যচরিত কাব্য অথবা “গৌরগণোদ্দেশদীপিকা”।
জয়ানন্দ, শেষ রচনাকারের নাম “গোপাল বসু” দিয়েছেন। এঁর কোন রচনাই আজ আমাদের হাতে নেই। এনার পরিচয়ও আমাদের জানা নেই।
আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে সুকুমার সেন মহাশয়ের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে মনে করছি যে জয়ানন্দের উল্লিখিত পয়ারে উদ্ধৃত প্রথম “গৌরাঙ্গবিজয়” গ্রন্থটি, যার নাম নগেন্দ্রনাথ বসুর সম্পাদিত জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে “গোবিন্দবিজয়”, তার রচয়িতার নাম গোবিন্দ কর্মকার হবার সম্ভাবনা প্রবল। এই গোবিন্দ কর্মকার “গোবিন্দদাসের করচা” নামের একটি চৈতন্যজীবনী লিখেছিলেন শ্রীচৈতন্যের জীবদ্দশাতেই। আমাদের মতে জয়ানন্দের উল্লিখিত প্রথম গ্রন্থটি “গোবিন্দদাসের করচা” যা ভুল করে “গোবিন্দবিজয়” লেখা হয়ে থাকতে পারে। এই গোবিন্দদাস বা গোবিন্দ কর্মকার শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে সন্ন্যাস গ্রহণের সময়ে থেকে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারত ভ্রমণের সঙ্গী হিসেবে ছিলেন। তিনি স্ত্রীর ভর্ত্সনার চোটে গৃহত্যাগ করে শ্রীচৈতন্যের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাঁর করচা গ্রন্থটি লুকিয়ে রাখতেন বলে নিজেই লিখে গিয়েছেন . . . না পারি লোকের বুলি সমস্ত বুঝিতে। যাহা পারি তাহা লিখি আকার ইঙ্গিতে॥ এই দেশে তীর্থ পর্য্যটিয়া দীর্ঘকাল। সকলেক বুলি বুঝে শচীর দুলাল॥ দুই চারি বাত কভু প্রভুরে পুছিয়া। করচা করিয়া রাখি মনে বিরচিয়া॥ যেই লীলা দেখিলাম আপন নয়নে। করচা করিয়া রাখি অতি সঙ্গোপনে॥ --- ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৬২-পৃষ্ঠা॥
উপরোক্ত গ্রন্থটির সম্পাদকদের মতে গোবিন্দদাস তাঁর করচাটি লুকিয়ে রাখতেন যাতে তা তাঁর স্ত্রীর হাতে না পড়ে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সব কটি লাইন পড়লে কারণটি অন্য বলে প্রতীত হচ্ছে। তবে মোদ্দা কথা হলো এই যে গ্রন্থটি তিনি লুকিয়ে রাখতেন। তাই সম্ভবত গোবিন্দদাসের করচার কথা জানতে বা শুনতে পেলেও এর পুথিটি দেখার গৌভাগ্য খুব অল্পজনেরই হয়েছিল।
জয়ানন্দ, সংস্কৃতে রচিত মুরারি গুপ্তের করচা, কবিকর্ণপূরের শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটক, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত মহাকাব্য ও গৌরগণোদ্দেশদীপিকার উল্লেখ করেন নি। সম্ভবত তিনি সেই সব গ্রন্থ তাঁর চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থ রচনাকালে হাতে পান নি। তিনি গোবিন্দদাসের করচার সরাসরি উল্লেখ না করলেও, গোবিন্দ কর্মকারের উল্লেখ করেছেন বৈরাগ্য খণ্ডের ২৪শ অধ্যায়ে, যিনি শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে কাটোয়ায় গিয়েছিলেন তাঁর সন্ন্যাস- গ্রহণের সময়ে। . . . মুকুন্দ দত্ত বৈদ্য গোবিন্দ কর্ম্মকার। মোর সঙ্গে আস্য কাঁটোয়া গঙ্গাপার॥ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষতের ২২৪১ নং পুথিতে (বৈরাগ্যখণ্ড) “গোবিন্দ”-এর বদলে “মুকুন্দ” রয়েছে। এর থেকেই আমরা মনে করছি যে জয়ানন্দ গোবিন্দদাসের রচনার খবর পেয়ে থাকবেন, যা কিনা বাংলা ভাষায় লেখা সর্বপ্রথম শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস পরবর্তী জীবন-চরিত।
জয়ানন্দের উক্ত পয়ারে ২য় “গৌরাঙ্গবিজয়” গ্রন্থের রচয়িতা, আমাদের বিবেচনা ও অনুমানে আর কেউ নন, স্বয়ং চূড়ামণি দাস। পরমানন্দ গুপ্ত নামের কোনও কবি বা গ্রন্থকারের নাম আমরা পাই নি। এমন কি এই নামের কোনও চরিত্র বা কোনও উল্লেখ পাইনি কোনও শাখাবর্ণনাতেও। চূড়ামণিদাসের নামও কোনও গ্রন্থে পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন শ্রীচৈতন্য ও নিত্যানন্দের সমসাময়িক, প্রভু নিত্যানন্দের শিষ্য, দ্বাদস গোপালের অন্যতম ধনঞ্জয় পণ্ডিতের শিষ্য, ব্রজলীলায় যাঁর নাম ছিল “বসুদাম”। সুতরাং চূড়ামণিদাস ছিলেন শ্রীচৈতন্য ও নিত্যানন্দের সমসাময়িক। চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গ-বিজয় গ্রন্থের কেবল ১ম খণ্ডটি খণ্ডিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। ২য় ও তয় খণ্ড আদৌ তিনি শেষ করে যেতে পেরেছিলেন কি না তা আমাদের জানা নেই। যদি তা করেও থাকেন, তাহলে কেন এভাবে অবলুপ্তির পথে ঠেলে দেওয়া হলো, তা নির্ভর করছে সেখানে তিনি কি লিখেছিলেন! যা লিখেছিলেন তা যদি বৃন্দাবনের অনুমোদন প্রাপ্ত না হয়ে থাকে তবে সেটাই সম্ভবত মূখ্য কারণ হবে গ্রন্থটির, জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের মতো অন্তরালে ঠেলে অবলুপ্তির দিকে পাঠিয়ে দেওয়ার।