প্রতাপাদিত্যর সংক্ষিপ্ত জীবনী...
প্রতাপাদিত্য উৎসব...
প্রতাপাদিত্যর কবিতা...
*

কবি প্রতাপাদিত্য - আমরা দুটি মাত্র কবিতা পেয়েছি যার ১ম টি একটি সমস্যাপূরণ কবিতা, রচয়িতার নাম প্রতাপাদিত্য। কবিতায় "বেচারি রায়" ভণিতা রয়েছে। "রায়" রাজা প্রতাপাদিত্যর পদবি ছিল। দ্রিতীয় কবিতাটি "প্রতাপ আদিত্য" ভণিতাযুক্ত একটি বৈষ্ণব পদ, যার প্রকাশক ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ

প্রথম কবি রাজা প্রতাপাদিত্য জন্মগ্রহণ করেন অধুনা বাংলাদেশের যশোহরে। তাঁর সম্বন্ধে তথ্য নানা সময় রচিত বাংলা সাহিত্য থেকে ও ব্রিটিশযুগের ঐতিহাসিকদের রচনায় আমরা পাই যেমন রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্য, রাম রাম বসুর প্রতাপাদিত্য চরিত্র ইত্যাদি।

রাজা প্রতাপাদিত্যের পিতা শ্রীহরি। তিনি গৌড়ের অধিপতি দায়ুদ খাঁর বিশ্বস্ত মন্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর কাছ থেকে “বিক্রমাদিত্য” উপাধি ও যশোহর (চণ্ডীখান)-এর জমিদারি লাভ করেন।

প্রতাপাদিত্য অস্ত্র-চালনায় সুদক্ষ ছিলেন এবং তাঁর সুন্দরবনের বাঘ শিকারের রুচি ছিল।

প্রতাপাদিত্য এক শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তুলেছিলেন পোর্তুগিজ রণকুশলী রডার সহায়তায় ।

প্রতাপাদিত্য তাঁর রাজ্যাভিষেকের পরে নিজের নামের সিক্কা বা মুদ্রার প্রচলন করেন, যা ছিল দিল্লীর সম্রাটের বিরুদ্ধে তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণার সমান।

বঙ্গদেশের বারোভুঁইয়ার অন্যতম প্রধান প্রতাপাদিত্য সন্বন্ধে ইংরেজ লেখকের লেখায় দেখা যায় প্রথমদিকে তিনি যশোহরের যথেষ্ট শ্রীবৃদ্ধিসাধন এবং প্রজাহিতকর কার্য করেন। পরে অতিরিক্ত সাফল্যে অত্যান্ত গর্বিত ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠেন।

তাঁর নিজের কাকা রাজা বসন্ত রায় ও তাঁর পরিবারের অনেককে মৃত্যদণ্ডে দণ্ডিত করেন বা সহস্তে খুন করেন। কোনো এক দাসীর দুই স্তন কেটে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন যা নাকি কার্যকর করা হয়েছিল।

বাহুবলে পার্শ্ববর্তী রাজাদের রাজ্য করায়ত্ত করেন। যশোহর, খুলনা এবং ২৪ পরগনার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল তার শাসনাধীনে ছিল। দিল্লির বাদশাহ আকবরকেও অগ্রাহ্য করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

সম্রাট আকবর প্রেরিত মোগল সেনাপতিরা তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। পরে জাহাজীরের আমলে ভবানন্দ মজুমদারের সাহায্যে (বিশ্বাসঘাতকতা ব'লে অনেক গ্রন্থে উল্লিখিত রয়েছে) মোগল সেনাপতি মানসিংহের সঙ্গে সালকা ও মগরাঘাট উভয় স্থানের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

প্রবাদ আছে যে, প্রতাপাদিত্যের পরাজয়ের পরে, মহারাজ মানসিংহ --- তিনজন মজুমদারের (বাদশাহী আমলের উপাধি, কর সংগ্রাহক) মধ্যে বঙ্গরাজ্য ভাগ করে দেন --- লক্ষ্মীকান্ত, জয়ানন্দ ও ভবানন্দ। লক্ষ্মীকান্ত বড়িশার সাবর্ণ চৌধুরীদের আদিপুরুষ। জয়ানন্দ বাঁশবেড়িয়া রাজবংশের আদিপুরুষ এবং ভবানন্দ কৃষ্ণনগর রাজবংশের আদিপুরুষ। --- হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, কলিকাতা সেকালের ও একালের (১৯১৫), ৩য় অধ্যায়, ৫৭-পৃষ্ঠা।

এই ভবানন্দ মজুমদারের বংশধর রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে, রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রচনা করেন অন্নদামঙ্গল কাব্য যেখানে রাজা মানসিংহের সঙ্গে প্রতাপাদিত্যের যুদ্ধ, পরাজয়, বন্দীদশা ও মৃত্যুর উল্লেখ রয়েছে।

পাতশাহী ঠাঁটে    কবে কেবা আঁটে
বিস্তার লস্কর মারে।
বিমুখী অভয়া    কে করিবে দয়া
প্রতাপাদিত্য হারে॥
শেষে ছিল যারা    পলাইল তারা
মানসিংহে জয় হৈল।
পিঞ্জর করিয়া    পিঞ্জরে ভরিয়া
প্রতাপাদিত্যে লৈল॥
দল বল সঙ্গে    পুনরপি রঙ্গে
চলে মানসিংহ রায়।
ললিত সুছন্দে    পরম আনন্দে
রায় গুণাকর গায়॥

--- রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র, অন্নদামঙ্গল, ৩য় খণ্ড, মানসিংহ ও প্রতাপাদিত্যের যুদ্ধ॥

প্রতাপাদিত্য রায়ে পিঁজরা ভরিয়া।
চলে রাজা মানসিংহ জয় জঙ্কা দিয়া॥

--- রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র, অন্নদামঙ্গল, ৩য় খণ্ড, মানসিংহের ভবানন্দবাটী আগমন॥

বন্দি অবস্থায় দিল্লির পথে বারাণসীতে প্রতাপাদিত্যের মৃত্যু হয়।

প্রতাপাদিত্য রাজা মৈল অনাহারে।
ঘৃতে ভাজি মানসিংহ লইল তাহারে॥
কত দিনে দিল্লীতে হইয়া উপনীত।
সাক্ষাত করিলা পাতশাহের সহিত॥
ঘৃতে ভাজা প্রতাপাদিত্যে ভেট দিলা।
কত কব যত মত প্রতিষ্ঠা পাইলা॥
পাতশার আজ্ঞামত মানসিংহ রায়।
প্রতাপাদিত্যে ভাসাইলা যমুনায়॥

--- রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র, অন্নদামঙ্গল, ৩য় খণ্ড, মানসিংহের দিল্লীতে উপস্থিতি॥

প্রতাপাদিত্যের আরাধ্যা দেবী যশোরেশ্বরীকে মানসিংহ নিয়ে তাঁর রাজ্য রাজস্থানের অম্বরে প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীর সঙ্গে এ দেশীয় ব্রাহ্মণ পূজারীও তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন।
*

প্রতাপাদিত্য উৎসব - সরলা দেবীচৌধুরাণী-এর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে, বাংলার যুবসমাজকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াসে, মহারাষ্ট্রের বাল গঙ্গাধর তিলকের শুরু করা “শিবাজী উৎসব”-এর অনুসারী “প্রতাপাদিত্য উত্সব”-এর সূচনা করা। তার জন্য তাঁকে মাতুল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ অনেকেরই বিরাভাজন হতে হয়। বাংলার ইতিহাসে যশোররাজ প্রতাপাদিত্য একজন হৃদয়হীন রাজা বলে কুখ্যাত হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু সরলা দেবী রাজার, মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের সিক্কা চালাবার সাহস ও বীরত্বকে বাংলার যুবক যুবতীদের কাছে তুলে ধরেছিলেন, তাদের ইংরেজদের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করার জন্য। তাই শুরু করেছিলে প্রতাপাদিত্য উৎসব।
*

প্রতাপাদিত্যর কবিতা - আমরা কবি প্রতাপাদিত্যের দুটি কবিতা পেয়েছি, যার মধ্যে প্রথমটি "রায় বেচারি" ভণিতাযুক্ত সমস্যাপূরণ কবিতা। দ্বিতীয় কবিতাটি একটি বৈষ্ণব পদাবলী যাতে “প্রতাপ আদিত্য” ভণিতা রয়েছে।

প্রথম কবিতাটি পেয়েছি ১৮০১ সালে শ্রীরামপুর থেকে ছাপা ও প্রকাশিত, রাজা রামমোহন রায়ের শিষ্য রাম রাম বসুর, অন্যতম প্রথম বাংলাভাষায় রচিত গদ্য রচনা, “রাজা প্রতাপাদিত্যচরিত্র” গ্রন্থের ২৫-পৃষ্ঠায় উল্লিখিত সম্রাট আকবরের সমস্যার কথায়। তিনি লিখেছেন . . .

“ইতিমধ্যে এক দিবস পূর্বাহ্নে এক চবুতারায় আমির ও রাজা ও কবিগণ ও পণ্ডিত ইত্যাদি সমস্ত ওমরা লোকের বৈঠক হইয়াছে এবং আর২ জমিদার ও উকিল লোকেরা আপন২ উপযুক্ত স্থানে আছে এই সময় বাদসাহের আগমণ সেই স্থানে হইল একব্বর বাদসাহ অতি রসিক লোক সে সভায় আসিবামাত্রেই এক সমস্যা কবিরদিগকে জিজ্ঞাসা করিল এই সমস্যা শেত ভুজঙ্গিণী জাত চলিহেঁ। এ কি কবিলোকেরা সকলে বিব্রত হইলেন সমস্যা পুরিতে কেহ পারিতেছেন না। ইহাতে সকলে ব্যাস্তিত এবং বাদসাহ বারং তাকিদ করিতেছেন তথাচ কেহ সমস্যা পূরিতে পারিতেছেন না।

ইহাতেই লজ্জিত রাজা প্রতাপাদিত্য অতি বিদ্যান সৎকবি এ কথা শুনিয়া কিঞ্চিত অগ্রগামি হইয়া নিরুপিত স্থানে যাইয়া কায়দা মত শেলাম করিয়া ডণ্ডাইলে বাদসাহকে নিবেদন করিলেন যাহাঁপনার হুকুম হইলে এ গোলম দিয়া এ সমস্যা পূরণ হইতে পারে। বাদসাহ দৃষ্টিপাত করিয়া ইসারাক্রমে অনুমতি দিলেন। রাজা প্রতাপাদিত্য আদব বাজাইয়া নিবেদন করিলেন দৈবক্রমে তাহার সমস্যা পূরণ তন্মত হইল। সে এই সাহ একব্বর।

শোবর কামিনী নীর নাহারতি।
রিত ভালিহেঁ।
চিরমচরকে গচপর বাবিকে।
ধারেছ চল্ল চলিহেঁ।
রায় বেচারি আপন মনমে।
উপমাও চারি হেঁ।
কেছুঙ্গ মরোরতি সেত ভুজঙ্গিণী।
জাত চলি হেঁ।

এই সমস্যা পূরণ তন্মতে হইল।

ইহাতে বাদসাহ উহাকে সন্তুষ্ট হইয়া উজিরকে জিজ্ঞাসা করিলেন এ কেটা। পরে উজির প্রতাপাদিত্যের দিগে দৃষ্টিপাত করিলে প্রতাপাদিত্য ফের আদব বাজাইয়া নিবেদন করিলেন যাহাপানা গোলামের নাম প্রতাপাদিত্য বঙ্গদেশের যশহর চাকলা ওগএরহের জমিদার বিক্রমাদিত্যের তরফ লোক। এ সমস্ত উজির পুনরায় নিবেদন করিলেন বাদসাহের সম্মুখে। ইহাতে বাদসাহের অনুমতিতে উজির উহাকে খেলাত দিয়া সম্ভ্রান্ত করিলেন।“ ....

গ্রন্থের “টিপ্পনী”-র পৃষ্ঠা-৯৬ এ অমূলাচরণ বিদ্যাভূষণ মহাশয় দ্বারা কৃত অর্থ দেওয়া রয়েছে . . .

সো বর কামিনী    নীর নাহারতি।
রিত ভালি হেঁ।
চির মচরকে    গচপর বাবিকে
ধাবেছ চল্ল চলি হেঁ।
রায় বেচারি    আপন মনমে।
উপমা ও চারি হে।
কে ছঙ্গ মরোরতি    শ্বেত ভুজঙ্গিনী।
জাত চলি হেঁ।

সো = সেই, বরকামিনী = শ্রেষ্ঠ রমণী, নীর = জল, নাহারতি = স্নান করিতেছে, রিত = রীতি, ভালি = ভাল, চির = বস্ত্র, মচরকে = নিঙ্গাড়িয়া, গচপর = ঘাটের উপর, বাবিকে = বাপীকে = পুষ্করিণীর, ধাবেছ = ধারে ধারে, চল্ল চলি = চলিয়া যাইতেছে, রায় বেচারি = রায় বেচারা, আপন = আপনার, মনমে = মনে, ও চারি = বিচার করিতেছে, ছঙ্গ = সঙ্গ, মরোরতিকে = মূর্ত্তির, (অর্থাৎ মূর্ত্তিসহ = মূর্ত্তিমতী) জাত চলি = চলিয়া যাইতেছে।

সেই শ্রেষ্ঠ কামিনী জলে স্নান করিতেছে, এ রীতি ভাল বটে। তাহার পর ঘাটের উপর বস্ত্রখানি নিঙ্গাড়িয়া পুষ্করিণীর ধারে ধারে চলিয়া যাইতেছে। (সম্ভবতঃ মস্তকের কেশজাল বস্ত্রাবৃত করিয়া নিঙ্গাড়াইতে ছিল) রায় বেচারা আপনার মনে বিচার করিয়া এই উপমা স্থির করিল যেন, মূর্ত্তিমতী শ্বেত ভুজঙ্গিনী চলিয়া যাইতেছে।

ই কবিতাটি নিয়ে ১৩২৯ বঙ্গাব্দে (১৯২২ সালে) প্রকাশিত, সতীশচন্দ্র মিত্র প্রণিত “যশোহর-খুলনার ইতিহাস”, ২য় খণ্ডের, ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ – আগ্রার রাজনীতি ক্ষেত্র, ১১৭-পৃষ্ঠার পাদটীকায় লিখেছেন . . .
“প্রবাদ আছে, একদা সুরসিক বাদশাহ আকবর সমবেত কবি ও রাজন্যবর্গের পুরণ করিবার জন্য সভায় একটি সমস্যা উপস্থিত করেন, সেটি এই :--- “শ্বেত ভুজঙ্গিনী যাঁত চলি হেঁ।” যখন কেহই সন্তোষজনক ভাবে সে সমস্যা পূরণ করিতে পারিলেন না, তখন প্রতাপাদিত্য উঠিয়া সে সমস্যা নিম্নলিখিতভাবে পূরণ করেন :---

“শো বর কামিনী নীর নাহারতি রিত (রীত) ভালি হেঁ
চির মচরকে গচপর বাবিকে, ধারেছু চল্ল চলি হেঁ।
রায় বেচারি আপন মনমে উপমা ওচারি হেঁ।
কে ছঙ্গ মরোরতি সেত (শ্বেত) ভুজঙ্গিনী, জাত চলি হেঁ॥”
---রাম রাম বসুর “রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র,” মূল গ্রন্থ ৬২পৃঃ।

অর্থাৎ সেই শ্রেষ্ঠরমণী জলে স্নান করিতে ছিলেন, এ রীতি ভাল। পরে পুষ্করিণীর ঘাটের উপর বস্ত্র নিঙ্গড়াইয়া উহার ধারে ধারে চলিয়া যাইতে চিলেন। তাহা দেখিয়া রায় বেচারা আপন মনে এই উপমা স্থির করিলেন যেন মূর্ত্তিমতী শ্বেত ভুজঙ্গিনী চলিয়া যাইতে ছিলেন।
---নিখিল বাবুর প্রতাপাদিত্য” ৯৬--৭ পৃঃ।

বিশ্বকোষে (১২শ খণ্ড, ২৬৩ পৃঃ) “চির মচরকে" স্থলে “চির আঁচারকে”, “গচপর“ স্থলে “গঠপর” ও “কে ছঙ্গ মরোরতি” স্থলে “কৈছন মরাবতী' আছে। “চির আঁচরকে” অর্থে বস্ত্রাঞ্চল বুঝায় “চিরমচরকে” থাকিলে চির - বস্ত্র, মচরকে নিঙ্গড়াইয়া ; গচপর ও গঠপর উভয়েরই একই অর্থ - ঘাটপর বা ঘাটের উপর। বাবিকে - বাপীকে - পুষ্করিণীর।

এই সমস্যা পুরণের গল্প কোথা হইতে পাওয়া গিয়াছিল, তাহা জানা যায় না। সম্ভবতঃ “রাজনামা” প্রভৃতি যে পারসী গ্রন্থানুসারে বসুমহাশয় নিজ পুস্তক প্রণয়ন করেয়, তাহাতেই এই সমস্যা পূরণের গল্প থাকিতে পারে। “বহারিস্থানে” এ গল্প আছে বলিয়া জানিতে পারি নাই।

বসু মহাশয় বলেন এই সমস্যাপুরণ হইতে প্রতাপের পরিচয় হয় ; তাহা আমরা বিশ্বাস করি না ; তবে সমস্যাপূরণের সময় হইতে তিনি বাদশাহের সুনজরে পড়েন, এটুকু সত্য হইতে পারে। বসু মহাশয়ের গ্রন্থে আছে, “ইহাতে বাদশাহের অনুমতিতে ওজির উহাকে খেলাত দিয়া সম্ভ্রান্ত করিলেন।” ৬৩পৃঃ”

ই কবিতাটি নিয়ে ১৯৬১ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা প্রকাশিত, বিমানবিহারী মজুমদারের “গোবিন্দদাসের পদাবলী ও তাঁহার যুগ” পদাবলী সংকলনের গোবিন্দদাসের যুগ প্রবন্ধের, প্রথম অধ্যায়, ৩৯৫-পৃষ্ঠা থেকে। আমরা এই কবিতাটি সম্বন্ধে তাঁর লেখা থেকে তুলে দিচ্ছি . . .

“. . . ১৬১২ খ্রীষ্টাব্দের পূর্ব্বে তিনি (কবি গোবিন্দদাস) এতদূর প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন যে, শাক্ত হইয়াও যশোহরের প্রতাপাদিত্য তাঁহাকে আদৃত ও সম্মানিত করিয়াছিলেন এবং তাহারই প্রতিদানে কবি অন্ততঃ দুইটী পদের সহিত তাহার নাম সংযুক্ত করিয়াছেন (পদসংখ্যা ৪৬৪ ও ৬৩৩)।

... গোবিন্দদাস তাঁহার "প্রেম আগুনি মনহিঁ গুনি গুনি" ইত্যাদি পদের শেষে শ্রীরাধার মানজনিত বিরহে শ্রীকৃষ্ণ কিরূপ কষ্ট পাইতেছেন বর্ণনা করিয়া ভণিতায় লিখিয়াছেন---

প্রতাপআদিত্য    ও রস গাহক
দাস গোবিন্দ ভান।

আবার "শুন নিরদয়-হৃদয় মাধব" ইত্যাদি পদে রাধার বিরহ বর্ণনা করিয়া লিখিয়াছেন---

এতহি বিরহে    আপহি মুরদই
শুনহ নাগর কান।
প্রতাপআদিত    এ রসে ভাসিত
দাস গোবিন্দ গান॥

১৮০১ খ্রীষ্টাব্দে মুদ্রিত রামরাম বসুর ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্রে’ (পৃঃ ২৭) লিখিত এক কিন্বদন্তী হইতে জানা যায় যে, প্রতাপাদিত্য আগ্রায় বাদশাহের সামনে একটী সমস্যা পূরণ করিয়া নিম্নলিখিত কবিতা রচনা করিয়াছিলেন…”

সো বরকামিনী নীর নাহারতি
রিত ভালি হেঁ।
চিরমচরকে গচপর বারিকে
ধীরেছু চল্ল চলিহেঁ॥
রায় বেচারি আপন মনমে
উপমা ও চারিহেঁ॥
কৈছঙ্গ মরোরতি সেত ভুজঙ্গিনী
জাত চলিহে।


বিমানবিহারী মজুমদার এই কবিতাটি নিয়ে আরও লিখেছেন . . . “পদটীর পাঠ বিকৃত---ইহার বিশুদ্ধ পাঠ উদ্ধার করা প্রয়োজন ; আপাততঃ ইহার মানে বুঝা কঠিন। তবে একখা বলা যাইতে পারে ষে, প্রতাপাদিত্যেরও কবিতা রচনার অভ্যাস ছিল, কাজেই তিনি সে যুগের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী কবি গোবিন্দদাসকে সম্মান প্রদর্শন করিয়া উৎসাহিত করিয়াছিলেন মনে হয়। প্রতাপাদিত্য শক্তি-উপাসক হইলেও তাঁহার প্রাসাদে গোবিন্দমূর্ত্তিও ছিল। রামরাম বসু লিখিয়াছেন যে, প্রাসাদের অভ্যন্তরে চকের “মধ্যস্থলে নানাবর্ণের প্রস্তরে রচিত এক উচ্চতর দিব্য মঞ্চ তাহার উপরে শ্রীমুর্ত্তির বার হয় বিশেষত পর্ব্ব উচ্ছবের সময়ে গোবিন্দদেব তাহার উপরে বিরাজমান হএন” (পৃঃ ৩৮)। তিনি আরও বলেন যে, অভিষেকের উৎসবের সময় “রাজাগণ ও অধ্যাপক ও কায়ন্ত ও বৈদ্য আর ব্রাহ্মণ লোকেরদের আগমন পাঁচদিন থাকিতে আরম্ভ হইল” (পৃঃ ৪২)। এরূপ সমারোহের সময় গোবিন্দদাসও হয়তো নিমন্ত্রিত হইয়া আসিয়াছিলেন।


দ্বিতীয় কবিতাটি “ভারতবর্ষ” পত্রিকার জৈষ্ঠ, ১৩২৬ বঙ্গাব্দের (১৯১৯ সাল) সংখ্যায় প্রকাশিত শ্রী আবদুল করিম সাহিত্য-বিশারদের “অপ্রকাশিত প্রাচীন বৈষ্ণব পদাবলী” প্রবন্ধ, ৭৯৭-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। তিনি লিখেছেন যে এই কবি "প্রতাপ আদিত্য"-এর তিনি কোনো পরিচয় পাননি। পদটি তাঁর হিসাবে ১৬৪৯ শকাব্দের বা ১৭২৭ খৃষ্টাব্দের পূর্বের ও এই প্রবন্ধ প্রকাশনার থেকে ১৯১ বছরের পূর্ববর্তী রচনা। পদটি কবিতার পাতায় দেওয়া রয়েছে।



বাঙালী জাতির বহু বদনাম আছে যা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁরা অলস, তাঁরা আড্ডাবাজ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এমন বাঙালীও খুব বেশী পাওয়া যাবে না যাঁরা জীবনে কখনও কোন কবিতা লেখেন নি! তাই মিলনসাগর কেবল মাত্র কবিতার সংগ্রশালা নয়, কবিদের জীবনীর ভিতর দিয়ে আমরা সমগ্র বাংলার ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করে চলেছি।

তাই কবি রাজা প্রতাপাদিত্য এবং হয়তো ভিন্ন বৈষ্ণব পদকর্তা প্রতাপাদিত্যের মত মানুষের লেখা কবিতা পেয়ে তাঁদের মিলনসাগরে আসন দিতে পেরে আমরা ধন্য।


কবি প্রতাপাদিত্যের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


উৎস -
  • রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র, "অন্নদামঙ্গল"।
  • রাম রাম বসু, "প্রতাপাদিত্য চরিত্র", ১৮০১ ।
  • হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, "কলিকাতা সেকালের ও একালের", ১৯১৫ ।
  • আবদুল করিম সাহিত্য-বিশারদের “অপ্রকাশিত প্রাচীন বৈষ্ণব পদাবলী” প্রবন্ধ, “ভারতবর্ষ” পত্রিকার জৈষ্ঠ, ১৩২৬ বঙ্গাব্দ (১৯১৯) সংখ্যা।
  • বিমানবিহারী মজুমদার, “গোবিন্দদাসের পদাবলী ও তাঁহার যুগ”, ১৯৬১।
  • সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত "সংসদ বাঙালি চরিতাবিধান", ১ম খণ্ড, ২০০৩।
  • আর্কাইভ.অর্গ
             



    আমাদের ই-মেল
    : srimilansengupta@yahoo.co.in
    হোয়াটসঅ্যাপ
    : +৯১ ৯৮৩০৬৮১০১৭       



    এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১.৮.২০২৪।