কবি কবিরুল ইসলাম-এর কবিতা
যে কোন গানের উপর ক্লিক করলেই সেই গানটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
মুখোশ
কবিরুল ইসলাম

“রাজনীতি চুরির জন্য নয়, দেশ গড়তে হবে”
বসু / বর্তমান / ১৯ জানুয়ারী ১৯৯৭


আপনার সুভাষিত খেয়ে কারও কি পেট ভরবে, বসু মহাশয় ?
এই সব উচ্চ উচ্চারণে কতো জলে কতো দুধ আপনিই বলুন |
আপনি কি আর একটি মুহুর্তও আয়নার সামনে দাঁড়াবেন না |
.        আমাদের প্রবঞ্চনা করছেন করুন
.                কিন্তু আত্মপ্রবঞ্চনা আরও কত দিন ?
.        দুঃস্বপ্নেও কি কোনও দিন মিথ্যার মুখোশ খুলে
.        সত্যের মুখশ্রী আপনি দেখবেন না ||

.                    ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
১।
২।
৩।
৪।
৫।
৬।
৭।
৮।
৯।
১০।
১১।
১২।
১৩।
১৪।
*
পারদ
কবিরুল ইসলাম

কোথাও বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেল দাহ
কিন্তু দেহ জুড়ালো কি ?
পারদ নেমেছে ঠিকই আবহবার্তার
.                উচ্চাবচ গ্রাফে
কিন্তু তা কি কোনো ভবিষ্য-দিশারী


কোথাও বৃষ্টির জলে দৃষ্টিপাত শুধু ||


.          ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
মানুষ ক্রমশ দূরে দূরে
কবিরুল ইসলাম

রাত এগারোটা হাত-ঘড়ি তাই ব’লছে
উদ্বেগ ছিল সারা রাত জুড়ে
.                উদ্বেগ ছিল সারা দিন ঘুরে-ঘুরে
কে কাকে কতোটা বানাবে বলির পাঁঠা
.                ঘুম নেই সারারাত
.                ঘুম নেই সারাদিন


সিঁড়িতে পিছলে প’ড়ে
.                ডানবাহুমূল চোটের অধীন
.                বাইরে এবং ঘরে


ক্রমে রাত বাড়ে যেন-বা লোকাল ট্রেন চ’লছে
.                দুই সীমান্তে দুঃখের তার-কাঁটা


মানুষ ক্রমশ চ’লে যায় দূরে-দূরে ||

.          ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
হাত
কবিরুল ইসলাম

যতদিন যাচ্ছে ঠেকে শিখি
এ-পৃথিবী পান্থশালা নয়
বিশেষত, দুঃখে দুঃসময়ে
কেউ হাত বাড়িয়ে দেবে না !

যতদিন যাচ্ছে ঠকে শিখি
মুখোশের মোহন আড়ালে
রুটি খায় তপস্বী বিড়াল

কেউ হাত বাড়িয়ে দেবে না ||

.          ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
যৌবন, তুমি বাড়ো ...
কবিরুল ইসলাম

তাঁকে ছুঁতে পারি অসম্ভবের স্বপ্নের কথা ছাড়ো
এ জীবনে আর পৌঁছোনো নেই, এবার ফেরার পালা
সামনে তোমার নৌকো তৈরি : টেনিশন মনে প’ড়ছে ?
কলাবৃত্তের হাওয়া লাগে পালে, আর বিলম্ব নয়
এই তো নিয়তি! অদূর যাত্রা, বৃথা বাগাড়ম্বর
তোরও সত্তর আরম্ভ হলো : দাঁতে চুলে চোখে ক্ষয়
অতএব, তাবু সংবৃত করো, ভেঙে ফেল অক্ষর
অনেকই তো হলো প্রেম-পরিণয় : উত্তরসূরি ল’ড়ছে
এবার তাদের বেঞ্চে বসাও ; যৌবন, তুমি বাড়ো ---

আস্বাদ করো অমৃত-গরল, অসম্ভবের জ্বালা ||

.          ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
তুমি রোদ্দুরের দিকে
কবিরুল ইসলাম

তুমি বড্ড দূরে চলে যাচ্ছ ইদানিং
সারা দিনমান তুমি ব্যস্ততার বর্ম পড়ে থাক
ঘাড়-ভাঙা ব্যস্ততার দুস্তর আড়ালে
তুমি কি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং
সমুহ প্রস্তুত ? সর্বনাশ! আমি কিছুই জানিনে |

আমি এ-রকম যুদ্ধ পছন্দ করিনে
দু-পক্ষ প্রস্তুত হয়ে সমকক্ষ হলে
তারপরে খেলা ...
তুমি এত ব্যস্ত থাক আমি কিচ্ছু খবরই রাখিনে |
নাকি আমি হেরে গেলে তুমি খুশি হও ?
আচ্ছা, তাই হবে | আমি যুদ্ধে হেরে যাব |
দেখে নেব তোমার শক্তির ব্যবহার---
তুমি কতদূরে যেতে পার, দেখা যাবে |

দুঃখ কিংবা সুখ কিংবা ঘৃণা
কিংবা প্রেম ভালবাসা কিংবা
বিরহ কিছুই আর ইদানিং দ্বন্দ্বাতীত নয়---
কখন ছিল কি ?
তবু এ-রকম দ্বন্দ্ব আমি কিন্তু পছন্দ করিনে |
ব্যস্ততার বর্ম ছিঁড়ে ভান ছেড়ে তোমার সহজ হওয়া চাই
বীজের খোলস ছিঁড়ে রোদ্দুরের দিকে যাওয়া চাই |

এ-জন্য দু-দণ্ড নয়, দু-এক দিনের ধৈর্য নয়---
মন্দাক্রান্তা অবসরে ফিরে যেতে হবে :
তুমি রোদ্দুরের দিকে ঈশ্বরীর মতো
আমি সমস্ত দুপুরময় হেঁটে যাব |

.          ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
এই শুরু। এইভাবে শুরু
কবিরুল ইসলাম

গাছ চিনি, ফুল চিনি আমার স্বভাবে
কি ভাবে কখন কোন্ গাছ বাড়ে
.                        ফোটে কোন্ ফুল
তাও কিছু-কিছু চিনি তাদেরই স্বভাবে
যেন বালকের হাতে-খড়ি বর্ণ পরিচয়ে

এই শুরু | এই ভাবে শুরু

.          ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
শান্তিনিকেতনের বাস এইমাত্র ছেড়ে গেল
কবিরুল ইসলাম

মেয়েটি কি নেমে গেল শান্তিনিকেতনে
আমারই পাশ দিয়ে গেল স্পর্শের নিক্কনে
আমি তার ছায়া-সঙ্গী মঞ্জুষা মায়ায়

মুষ্টিমেয় কটি ঘিরে অলীক আলপনা
যার পদচিহ্ন শিল্পে শালবীথি রাভায়
ঘন্টাঘরে থমকে থাকে যে গৌরী প্রাঙ্গণে

পায়ে-পায়ে ছায়া নাচে মেয়েটির দু’চোখে
প্রকৃতি-কন্যার মতো ছাতিম তলায়
সে দাঁড়ায়, ব’সে পড়ে রৌদ্র ছায়ালোকে

কিংকর ভাস্কর্য ওই দিব্য শরীরিণী
আমি আর আমি নেই বিমূর্ত কল্পনা
যে-কোনো এঙ্গল থেকে বিচিত্র রূপিণী

রবীন্দ্রনাথের গান জীবন-বন্দনা :
আজও অপরাহ্নে আমরা তাঁর কাছে ঋণী |

.          ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
একজন্মে একবারই সম্ভব শুধু
কবিরুল ইসলাম

একজন্মে একবারই সম্ভব শুধু
এক জন্মে মাত্র একবার
বাকি সব আধময়লা পাজামার মতো
বিবর্ণ অভ্যাস মালা
চুম্বন চুম্বন নয়, আলিঙ্গন নয়!

একবারই শিশির ঝরে এক জন্মে মাত্র একবার!

.          ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
বাংলা ছন্দ
কবিরুল ইসলাম

মাঝরাতে মানুষের কান্না শুনে ঘুম ভেঙে গেল :
.                                একবার ভেঙে গেলে
এই ঘুম এই অশেষ বয়সে আর জোড়া লাগে না
বস্তুত, বাজারে তেমন কোনও “ডেন্ড্রাইট”-ও নেই
.                        যেহেতু বিছানার সে টান-ও আর নেই ...
উঠে পড়ি, চা বানাই দিনে প্রথম কাপ
.                        বাসি মুখে সিগ্রেট ধরাই
বিস্কুটের টিন খুলি, “ল্যাকটোজেন” দুধের বদলে,
.                        কিংবা হাল্কা মদ-রং লিকার ...
.                        “হিটার”ও বন্ধ ক’রে ঠিকঠাক


পড়বার টেবিলে বসি
.                বাংলা ছন্দের বই খুলি ...
.                                যেন রাত জেগে ওঠে ||

.                 ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
নাহারের জন্য
কবিরুল ইসলাম

তোমাকে আমি রেখে এসেছি তোমারই দুই হাতে :
তুমি যা করো সইতে যেন পারি
তোমার ক্ষমা বইতে যেন পারি
তোমার দিবসরাত্রিগুলি সাজানো থরে থরে
এ ঘর থেকে ও ঘর জুড়ে আদরে অনাদরে

কান্নাহাসির টুকরোগুলো রবিঠাকুরের গানে
তোমার কণ্ঠে অবলীলায় সঙ্গী খুঁজে আনে

তুমি আমার গীতবিতান, আমার গীতাঞ্জলি
আলোয় আমার ছায়াসঙ্গী, আঁধারে দীপাবলি

আমাকে তাই রেখে যাচ্ছি তোমার দুই হাতে ...

.              ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
ভালোবাসার গান
কবিরুল ইসলাম

ভালোবাসা নিয়ে ঢের যুদ্ধ হয়ে গেছে
এই যুদ্ধ প্রাণের গানের,---
ভালোবাসা নিয়ে আরও ঢের যুদ্ধ হবে
এই যুদ্ধ মানাভিমানের |

এই যুদ্ধে জয় নেই, পরাজয় নেই :
চলো যাই উৎসে উজানের,
ভালোবাসা নিয়ে আরও ঢের যুদ্ধ হবে

এই যুদ্ধ আবহমানের ||

.      ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
আত্মখনন
কবিরুল ইসলাম


তুমি কী রকম বদলে যাচ্ছ ?
.                চেহারার সঙ্গে-সঙ্গে
কথাবার্তা, ব্যবহারে, চালচলনে তুমি কত বদলে যাচ্ছ
বড়ো শহরের দুস্তর অপরিচয়ে তুমি নিজেকে আব্রু করো
যেন আত্মরক্ষার গরজে


কিন্তু একে কি আত্মরক্ষা বলে ? তুমিই উত্তর দাও ---
.                                                বলো
আমি অনুমান করতে পারি :
যে-তুমি আমার টেবিলে স্বপ্নে, জাগরণে আলো ক’রে আছ
.                                                সব সময়
বিবাহপূর্বের অনুষঙ্গে ওই শাড়ীর আঁচল
হাওয়া ও মেঘের সঙ্গে উড়েছিল
.                        যেন বা রবীন্দ্রগানের কলি :
.                        “মন মোপ মেঘের সঙ্গী,
.                        উড়ে চলে দিগ্ দিগন্তের পানে ...”


তুমি কত বদলে গোছ : মধ্যবয়সিনী মেদে, তন্বী শ্যামা,
ত্বকের চিক্কনে আর সচ্ছল ফসলে
.                                আর বিউটি পারলারে আজকাল
মুখোশ ও মুখশ্রীতে
পূর্ব পরিচয় পট ঢাকা প’ড়ে গেছে যে-মেয়ে হাওয়ায় উড়তো লঘু পত্রালি...
আমি খুঁড়ে তুলতে গিয়ে রাখালদাসের
মাহেঞ্জোদারোর দূর, সুদূরের স্বপ্নে ও বাস্তবে
এক নাগাড়ে পিছু হেঁটে-হেঁটে
শিরা-উপশিরার জটিল জঙ্গলে
.                        একা
গাঁইতি-শাবলে
নিজেকে খনন করি শুধু


হয়তো তোমাকে তা স্পর্শও করে না কিন্তু
.                        আমি হাতে-নাতে ধরা পড়ি
জলের গভীর থেকে হঠাৎ যেমন মায়াবী বঁড়শিতে


মাছ উঠে আসে
সে সময় তোমার অস্তিত্ব আমি এক জেদে উপেক্ষা করি
ভুলে যাই
কিন্তু কি আশ্চর্য তুংমি হাঁটু মুড়ে
.                        আমার ভিতরে ঢুকে পড়ো
আর আমি তোমার চাইতেও বেশি
.                        বদলে যাই :
.                                আমার চেহারা
তোমার ফটোর মধ্যে জন্মগ্রহণ করে
আমার গলার স্বরে তোমার আওয়াজ
সুরে বসে | তোমার সংলাপ
আমি হ’য়ে উঠি


তোমার সবক’টি তৃণ লক্ষ্যভ্রষ্ট হ’য়ে
.                                আছড়ে পড়ে
ছো-নাচের বিশাল মুখোশ ...
তোমার সজত্ন ব্যুহ দাবার কূট চালে মাৎ
ধ্বসে পড়ে
যেন হাঁটু জলে ভরাডুবি |
.                                মাঝরাতের যোগাসনে
যে-রকম জিতেন্দ্রিয় ঋষি আতেংরক্ষা করেন


হায়, একে কি বলে আত্মরক্ষা ? কাকে রক্ষা ?
রক্ষণাবেক্ষণ কাকে বলে ? কে কার রক্ষক ?


--- এসব প্রশ্নের টানে আত্মখননে তোমার তো
.                                        এসে যায় না কিছু
শুধু আমার ভিতরে ভূমিকম্পে আমল ভাঙচিরে


হঠাৎই বদলে তুমি আমার টেবিলে উঠে বসো ||


.                  ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর   
*
১০০
কবিরুল ইসলাম

আনন্দ জীবনে আছে অলক্ষে কোথাও
কোথাও নদীর জল রয়ে গেছে তাই
একটু ধীরে সুস্থে সেই জীবনের স্বাদ

কেউ পায়, কেউ পায় না তবু অন্বেষণ ...

তোমার অঞ্জলি ভ’রে সে-জলের ধারা
দশটি আঙিলের ভিড়ে ঝরে গেলে
দুহাত তবু তো স্পর্শে চিরচিহ্নে ঋণী

মুহুর্ত-আনন্দে আমি ধন্য হতে পারি

যতই সে-জল বন্দী : গার্হস্থ গোপনে
আহ্নিক তো সারা যায়, নাই বা হলো স্নান

এখানে কোথাও নেই বিশুদ্ধ ডাকঘর ||


.             ******************          
.                                                                          
উপরে    




মিলনসাগর