কবি, গীতিকার ও সুরকার শ্যামল গুপ্ত - বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগের বিশিষ্ট গীতিকার ও সঙ্গীতকার। বাংলার তারকা কণ্ঠশিল্পী গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তাঁর স্ত্রী।
তাঁর শিক্ষালাভ কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলজে থেকে। ১৯৪৫ সালে রসায়ন নিয়ে বি.এসসি. পাশ করে তিনি মহারাষ্ট্রের পুনে তে ভারত সরকারের বিস্ফোটক তৈরীর কারখানার গবেষণাগারে কেমিস্ট এর চাকরীতে যোগদান করেন। সাড়ে তিন বছর পর সেখান থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি কলকাতায় ফিরে এসে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন সঙ্গীতের জগতে।
প্রথমে তিনি HMV (হিজ মাস্টার্স ভয়েস) কোম্পানি থেকে নিজের তিনটি গান রেকর্ড করেন। সেই সূত্রে পরিচয় হয় শিল্পী জগন্ময় মিত্রের সঙ্গে। শ্যামল গুপ্তর রচিত প্রথম দুটি গানেই কণ্ঠ দিয়েছিলেন জগন্ময় মিত্র ১৯৪৬ সালে। গান দু’টি ছিল “প্রণাম তোমায় হে নির্ভয়” এবং “অন্তবিহীন নয় তো অন্ধকার”।
ছায়াছবির জগতে প্রবেশ করেছিলেন “অভিমান” ছবির গান লিখে। সুরকার ছিলেন রামচন্দ্র পাল। তিনি অন্যান্য গীতিকারদের তুলনায় কম গান লিখেছেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে বেশী সংখ্যায় গান লিখে কখনও গানের মান ধরে রাখা যায় না।
তাঁর স্মরণীয় গানের মধ্যে রয়েছে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে “আমি চলে গেলে পাষাণের বুকে”, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে “আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি”, জীবনসঙ্গিণী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে “ঝরা পাতা ঝড়কে ডাকে”, “কাঞ্চন কাঞ্চন পাহাড়ে”, “জলতরঙ্গ বাজে” প্রভৃতি। আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে “মন বলছে আজ সন্ধ্যায়”, শ্যামল মিত্রের “আমি তোমার পাশে যেমন আছি”, সুপ্রীতি ঘোষের কণ্ঠে “যেথায় গেলে হারায় সবাই”, “কৃষ্ণচূড়ার স্বপ্ন ঝরা”, যূথিকা রায়ের কণ্ঠে “মন্দিরে নয় সেথায় যাব”, মান্নাদের কণ্ঠে “ও আমার মন যমুনার”, “আমি নিরালায় বসে” এবং আরো অনেক কালজয়ী রচনা।
খুব বিচিত্র এই বাঙালী জাতি! এমন লেখাপড়া জানা বাঙালী হয়তো খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যাঁর জীবনের কোনো না কোনো সময়ে দু এক লাইন কবিতা লেখেন নি! বাংলা ভাষায় যে পরিমান কবিতার আন্দোলন ঘটে গেছে, যে পরিমান কাব্যচর্চা চলেছে, তেমনটি বোধহয় ভারবর্ষের আর কোনো ভাষায় দেখা যাবে না। অথছ আধুনিক যুগে লক্ষ্য করি যে গীতিকারদের কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাঙালী ভীষণ কুণ্ঠা বোধ করেন! পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় একবার বড় আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন ... আমি কি কবি নই ? ব্যাপারটা যেন এমন, যে কবিতায় সুর দিলেই সেই কবি আর কবি থাকেন না! নজরুলের আগে কিন্তু এমনটা দেখতে পাই না। রবীন্দ্রনাথ বলুন, দ্বিজেন্দ্রলাল বলুন, রজনীকান্ত বলুন, অতুলপ্রসাদ বলুন, দিলীপ রায় বলুন, তাঁরা আধুনিক (?) যুগের এই বিচিত্র ভেদাভেদের মানসিকতা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন।
প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়! কেন গীতিকারদের কবিদের সভায় স্থান দেওয়া হচ্ছে ? আমাদের উত্তর হলো এই যে, মিলনসাগরে আমরা মনে করি যে গান তো প্রথমে কবিতা। তাই আমরা গান ও কবিতায় কোন পার্থক্য দেখি না। অনেকে বলেন যে সব গানই কবিতা কিন্তু সব কবিতা গান হয় না!
আমরা মিলনসাগরে তাঁর কবিতা ও গানের কথা ইনটারনেটে প্রকাশিত করে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আমাদের এই প্রচেষ্টা সার্থক বলে মনে করবো।
এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ২৮.০৭.২০১২। ভ্রম সংশোধন - ২.৫.২০১৭। কবি রাজেশ দত্তর অনুমতি ক্রমে তাঁর "শ্রদ্ধায়, স্মরণে কিংবদন্তী কবি ও গীতিকার শ্যামল গুপ্ত" আলেখ্য ও কবির ছবির সংজোযন - ১৭.৭.২০২০। ...