কবি মুরারী মুখোপাধ্যায় – বামপন্থী কবি ছিলেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেন দক্ষিণেশ্বরের উত্তরে স্থিত
আরিয়াদহে। পিতা ( তাঁর নাম আমরা কোথাও পাইনি ) ছিলেন আড়িয়াদহ কালাচাঁদ স্কুলের শিক্ষক কাম
করণিক। তাঁর সেই চাকরী চলে যায় চার হাজার টাকার হিসেবের গোলোযোগের জন্য। পরে আড়িয়াদহ কো-
অপারেটিভ সোসাইটির সামান্য মাইনের অ্যাকাউন্টেন্ট কাম ক্লার্কের চাকরী জুটেছিল। বাবা বড় হয়েছিলেন
তাঁর মাতুলালয়ে, আড়িয়াদহে ঘোষাল পরিবারে। সেই পরিবারের সবাই ছিলেন কংগ্রেসের সমর্থক। ১৯৪৭
সালের পরে কবির পিতা আর কংগ্রেসকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন না। তিনি নিজেই বাড়ীতে বসে একটি
গ্রামোফোন বানিয়েছিলেন, যা হাত দিয়ে ঘোরাতে হোত। গ্রামোফোন কেনার সামর্থ তাঁর ছিলনা। কিন্তু
বাড়ীতে
কাজী নজরুলের দেশাত্মবোধক গানের প্রচুর রেকর্ড ছিল। ছিল কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের
নবজীবনের গান। মাতা অমলা মুখার্জী।

কবি ১৯৬৭ সাল নাগাদ, এম.এ. ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়ে, নকশালবাড়ী আন্দোলনে যোগ দেন। আড়িয়াদহ
দক্ষিণেশ্বর অঞ্চলের বিভিন্ন গণসঙ্গঠন ও সাংস্কৃতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এলাকার যুবছাত্রদের
বিপ্লবী রাজনীতিতে অনুপ্রাণিত করার জন্য তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের ফ্রী কোচিং সেন্টার, সাংস্কৃতিক
পত্রপত্রিকা প্রকাশ ইত্যাদি কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলেন। এর পরে তিনি আড়িয়াদহ-দক্ষিণশ্বরের আঞ্চলিক
পার্টির দায়িত্ব পরবর্তী তরুণ নেতৃত্বের উপর দিয়ে, বাংলা বিহার উড়িষ্যা সীমান্ত আঞ্চলিক কমিটির কৃষক
সংঘটনের কাজে যোগ দিতে চলে যান। ব্যক্তিগত জীবনে মুরারি ছিলে সৎ নির্ভিক কর্তব্য-সচেতন এক মানুষ
। পরিবারের প্রতি কর্তব্য, পার্টির প্রতি কর্তব্য এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনে কোন ত্রুটি ছিলনা। গুরুত্বপূর্ণ
অ্যকশনের মুহূর্তেও তিনি সংযত ধীর ও দৃঢ়সংকল্প থাকতেন। তিনি নাকি বোমার মশলাশুদ্ধ ব্যাগও
রবীন্দ্ররচনাবলী বহন করার মত করে নিয়ে যেতেন!

একটি কবিতা পাঠের আসরে মুরারির আলাপ হয়েছিল শ্রীমতী ভদ্রা চক্রবর্তীর সঙ্গে। ক্রমে তাঁরা প্রণয়-সূত্রে
আবদ্ধ হন। কিন্তু সংসার পাতার স্বপ্ন আর সফল হয়নি। মুরারি মারা যাবার পর আরও বছর দশেক তিনি
বেঁচেছিলেন। অন্য এক উদারচেতা কমরেড তাঁকে বিবাহ করেন এবং তাঁদের দুটি সন্তানও হয়। ভগ্নহৃদয়
এই নারী, সকলের অগোচরে দুঃখ দারিদ্র্যের মধ্যে কবে যে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন কেউ তা ভাবেনি। (
সুযশ ভট্টাচার্য, মরুভূমে ক্যাকটাস )।

১৯৬৯ সালের অক্টোবর-নভেম্বর নাগাদ মুরারি ওরফে আনন্দকে বহড়াগোড়া-চাকুলিয়া অঞ্চল
থেকে গ্রেফতার করা হয়। সেই সূত্রে তাঁর কারাবাস হয় বিহারের হাজারিবাগ জেলে। ১৯৭১ সালের ২৪শে
জুলাই তারিখে দুপুর আড়াইটায়, বিহারের হাজারিবাগ জেলে কারারক্ষীদের গুলি চলে যাতে শতাধিত
আহতের সঙ্গে ১৬জন বন্দী নিহত হন। কবি মুরারি মুখোপাধ্যায় সেই ঘটনার নিহতদের মধ্যে ছিলেন। যাঁরা
সেই গণহত্যায় মারা গিয়েছিলেন তাঁরা হলেন মুরারি মুখার্জী, বিজন, মিশ্র, ডি.কে,  ডাম্বেল, বাবি, চিরম্,
প্রদীপ, বেণু, অলক, সুনীল, গণেশ, গুরুচরণ, রবীন অধিকারী, মাধবানন্দ এবং সমীর। মুরারির মৃতদেহ তাঁর
পরিবারের হাতে দেওয়া হয়নি।

ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিহার সরকার এক তদন্ত কমিশন বসান। আজ পর্যন্ত তার রিপোর্ট বার হয়নি।
কমিশনের সামনে কিছু সিপাই ও জমাদার (যারা সিপাইদের পরিচালনা করেন বা সিপাইদের উপরে যাদের
স্থান) সত্য ঘটনা উপস্থান করেন। এর ফলে কোনো না কোনো অজুহাতে হয় তাঁদের চাকরী থেকে বরখাস্ত
করা হয়, নয়তো বদলি করা হয়। এমনকি তাঁদের পরিবারের ছেলেরা, যারা জেলে কাজ করতো তাদের
উপরেও নেমে আসে কর্তৃপক্ষের আঘাত। জেলে যেসব বন্দীরা কর্তৃপক্ষের হয়ে কাজ করেছিল, তাদের
অনেককেই ছেড়ে দেওয়া হয়। যে জেলারের নির্দেশে এই ঘটনা ঘটেছিলো, তাকে পদোন্নতি দিয়ে চাইবাসা
জেলের সুপারিনটেন্ডেন্ট করে বদলি করা হয়।    

১৩৭১ সালের ২৫শে বৈশাখ শুক্রবার
রবীন্দ্রনাথের মুখের রেখাচিত্র এঁকে, মুরারি, ডায়েরী লেখা শুরু করেন।
কবির, সাম্প্রদায়িকতার উপর লেখা নাটক মৃত্যু নেই, মঞ্চস্থ করেছিলেন আড়িয়াদহের চাতালের মাঠে। কবি
আবৃত্তি করতেন খুব সুন্দর। ভদ্রাদির সঙ্গে মিলে
রবীন্দ্রনাথের "কর্ণকুন্তী সংবাদ" আবৃত্তি করেছিলেন।

মুরারি স্মৃতিরক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে “মৃত্যু নেই” নামে একটি কাব্য সংকলন  প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর
লেখা “ভালবেসে চাঁদ হয়ো নাকো” কবিতাটি  
কবি সুরকার পরেশ ধরের  সুরে, গান হয়।
 
আমরা  
মিলনসাগরে  কবি মুরারি মুখোপাধ্যায়ের কবিতা  তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে
পারলেই এই প্রয়াসের সার্থকতা।

মাত্র একটি কবিতা ( ভালবেসে চাঁদ হয়ো নাকো ) নিয়ে, এই পাতাটি দিল্লীর
কবি দিলীপকুমার বসুর
অনুরোধে তোলা হয়েছিল ৩.৬.২০১৫ তারিখে। পরিবর্ধিত সংস্করণ তোলা হয় ০১.১১.২০১৫ তারিখে।
আমরা
কবি রাজেশ দত্তর কাছে ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ, কবি মুরারি মুখোপাধ্যায়ের এই পাতাটি তৈরী করার
সবরকম তথ্য, আমাদের দেবার জন্য তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে।  আমরা আরও কৃতজ্ঞ শ্রী চিররঞ্জন
পালের  (চলভাষ +৯১৯৪৩৪৫১৬৮৯৮)  কাছে   তাঁর  নানাভাবে  এই পাতাটি তৈরী করতে  সাহায্য করার
জন্য। স্বপন দাসাধিকারী সম্পাদিত  “এবং জলার্ক” থেকে ২৫.০৫.১৯৯৮ তারিখে প্রকাশিত “সত্তরের শহীদ
লেখক শিল্পী”, গ্রন্থ থেকে নেওয়া তথ্যাদি নেওয়া হয়েছে। আমরা তাঁদের কাছেও কৃতজ্ঞ।



উত্স - সুযশ ভট্টাচার্য, মরুভূমে ক্যাকটাস, স্বপন দাসাধিকারী সম্পাদিত সত্তরের শহীদ লেখক শিল্পী, ১৯৯৮।
.         কেশব সেনগুপ্ত, সেই সব দিনরাত্রি : হাজারিবাগ জেল, স্বপন দাসাধিকারী সম্পাদিত সত্তরের শহীদ
.         লেখক শিল্পী, ১৯৯৮।
.         ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় এবং মঞ্জুশ্রী মুখোপাধ্যায় ( কবির দাদা ও বৌদি ), আমার ভাই মুরারি, স্বপন
.          দাসাধিকারী সম্পাদিত সত্তরের শহীদ লেখক শিল্পী, ১৯৯৮।



কবি মুরারি মুখোপাধ্য়ায়ের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     

এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ৩.৬.২০১৫
পরিবর্ধিত সংস্করণ - ০১.১১.২০১৫

৬টি নতুন কবিতা ও কবির ছবি নিয়ে পরিবর্ধিত সংস্করণ - ২৬.৫.২০১৬

...