মধুবাবুর লক্ষ্মীর ধামের ইতিবৃত্ত
দীপালী সেনগুপ্ত,
১৪ই ফাল্গুন ১৪১৬
২৭শে ফেব্রুয়ারী ২০১০
কলকাতা

মে ২০১০


ই-মেল : srimilansengupta@yahoo.co.in                   এই পাতাটি Counter বার দেখা হয়েছে
                                                                
                                  
লপাইগুড়ি জেলার গড়ালবাড়ী গ্রামে মধুবাবু অর্থাৎ শ্রী মধুসূদন দাশগুপ্ত-র জোত জমি প্রায় ৩০০ বিঘা ছিল | মধুবাবুর জোতে লক্ষ্মীপূজার প্রচলন হয় ১৯৩৫ সালে |

মধুবাবুর নামের সাথে তাঁর ব্যবহার এবং স্বভাবেরও খুব মিল ছিল | তিনি ছিলেন বিপদ-তাড়ণ “শ্রীমধুসূদন” | শত্রু মিত্রে ভেদ নেই, যে যখনই বিপদে প’ড়ে তাঁর দ্বারস্থ হয়েছে, বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যায় নি | নিজের যত কষ্টই হোক পরের কাজে আপনাকে সঁপে দেওয়াই ছিল মধুবাবুর আনন্দ | মুখের কথা রাখতে বা সত্যবদ্ধ হলে সে কাজ জীবন দিয়েও পূর্ণ করার চেষ্টা করতেন | কলির তপস্যা সত্যকথা বলাই ছিল সাধনা | অবশ্য এ কারণে তাঁকে অনেক দুর্ভোগ ভুগতে হয়েছিল | কিন্তু সত্যের জয় সর্বদাই |

এ হেন মিষ্টভাষী সদানন্দ লোকপ্রিয় মানুষটিকে ভাল না বেসে কি পারা যায়!

খুব লম্বাও নন, খুব খাটোও নন, মাঝারি চেহারা | মুগুড়-ভাজা চেহারা | আধমন করে কাঠের মুগুড় দুহাতে দুটো ধরে অবলীলায় ঘোরাতেন | ডন্, বৈঠক ইত্যাদিতে শরীর ছিল বলিষ্ঠ মজবুত | মুখের শোভা বর্ধন করত স্যার আশুতোষের মত একজোড়া গোঁফ | উন্নত ললাটে তেজস্বীতার আলো যেন ফুটে বেরুত | নিঃশংক নির্ভিকভাবে পান চিবুতে চিবুতে তিনি যখন পথে হেঁটে যেতেন, পথচারি লোকজন কাছে এসে নমস্কার করে দুটো কুশল বার্ত্তা বলে যেতেন | কত অভাবী ঘরের ছেলেরা যে তাঁর বাড়ীতে বিনা পয়সায় খাওয়া পড়া চালিয়ে থেকে স্কুলে কলেজে পড়ে পাশ করে গেছে তার হিসাব কেউ রাখেনি | মধুসূদন দান করতেন ডান হাতে কিন্তু বা হাত তার খবর রাখতো না | জনপ্রিয় লোক বলতে যা বোঝায় তিনি ছিলেন তাই |

চেহারা ছিল লোহা দিয়ে গড়া আর মনটা ছিল ফুলের মত কোমল | তাঁর মিষ্টি ব্যবহারে বনের পশু-পাখীও পোষ মানতো |

করলা নদীর ধারে বাড়ীর সংলগ্ন বিরাট ফুলবাগানের সাথেই ছিল চিড়িয়াখানা | নয়টা মূর ময়ূরী ছিল | নানান রকমের ক্যানোরিজ পাখী বর্ণের বৈচিত্রে অনন্য | দুটো হরিণ আর ছিল দুটো প্রকাণ্ড ময়াল সাপ, উত্তরবঙ্গে যা বিখ্যাত সপ্তাহে একটা করে মুরগী ছিল তাদের অহার্য্য | অবশ্যই দুটোর জন্য দুটো মুরগী | জোড়ার একটা মরে যাবার পর আর একটা সাপ তার সঙ্গীকে খুঁজতে লোহার রড বেঁকিয়ে, খাঁচা ভেঙ্গে বেরিয়ে যেত, আবার সন্ধ্যার মুখে ঠিক ফিরে আসতো | মধুবাবু একটা চায়ের প্যাকিং বাক্স সাপটার মুখের সামনে ধরে "আয় আয়" বলে ডাকতেন আর সাপটা নির্বিবাদে বাক্সটার মধ্যে বন্দি হয়ে যেত | তারপর তাকে আবার খাঁচায় রাখা হতো |

বনের জীব জন্তু যেখানে পোষ মানতো সেখানে মানুষ পোষ মানবে এ আর বেশী কথা কী ?

মধুবাবুর জোতে প্রজাদের মধ্যে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকই ছিল | মুসলমানের সংখ্যাই বেশী ছিল | হিন্দু মুসলমান সবই ছিল রাজবংশী | প্রজাদের ভেতর মুসলমান প্রজা দেবারু ছিল পূর্বে ডাকাতের সর্দ্দার | মাথায় ঝাকড়া চুল, গায়ের রং শ্যামলা, খাটো চেহারা | শরীরের গাঁটে গাঁটে ভেলকি খেলতো, হাতের পাঁকা বাঁশের লাঠি যখন ঘুরতো শব্দ হতো ভ্রমরের চাকের মত ভ....ন্ ভ....ন্ করে | দেবারুর লাঠির কাছে দাঁড়াবার ক্ষমতা কারুরই হতো না | মধুবাবুর সংশ্পর্ষে এসে দেবারুর চরিত্র একেবারে বদলে যায় | এ হেন দেবারু মধুবাবুর সবচেয়ে বশংবদ প্রজা ছিল | মধুবাবুর জোতে কখনও কোন গণ্ডগোল বা মারপিট হয় নি একমাত্র দেবারুর জন্য | খুব সৎ লোক ছিল, মিথ্যা কথা ছিল "হারাম" | ডাকাতি করতো অভাবে প'রে বা কিছুটা (রক্তের দোষে) উত্তরাধিকার সূত্রে | ওর বাপ পিতামহও সেকালে ডাকাত ছিল | পরে হিন্দু মুসলমান সব প্রজাই দেবারুর বাধ্য হয়ে যায় |

জলপাইগুড়ি শহর থেকে গড়ালবাড়ী দশ বার মাইল দূরে অবস্থিত | শহরের উপকণ্ঠে ছিল মধুবাবুর বসত বাড়ী | প্রজারা গরুর গাড়ী করে জমিতে উত্পন্ন শষ্য, ধান, পাট, পাটখড়ি বোঝাই করে শহরে নিয়ে আসতো |

একবার লক্ষ্মী পূজার পরে, ১৯৩৫ সালে, দেবারু এসে বড়বাবুকে বলেছিল মধুবাবুকে সমস্ত প্রজারা বা গ্রামবাসীরা সবাই বড়বাবু বলে ডাকতো, মালিক বা হুজুর নয় |

গড়ালবাড়ূর পাশ দিয়ে তিস্তা নদীর একটা শাখা বয়ে যেত, অন্য সময় ক্ষীণ জলধারা বয়ে যেত কিন্তু বর্ষায় উদ্দাম হয়ে উঠতো | জনসাধারণ বলতো যমুনা নদী | অবশ্য এখনও বলে | দেবারি বলেছিল "একদিন দুপুরে যমুনা নদীর ধারে ঘুড়ছি, হঠাৎ দেখি নদীর ধার থেকে অপূর্ব সুন্দরী তিনটি মেয়েলোক উঠে আসছে" | হিন্দু ঘরের বৌয়ের মতো | গা ভর্তি সোনার গহনা, মাঝের মোয়োলোকটির মাথায় সোনার মুকুট কাঁধে সোনার কলস | দেবারু বলে সে নদীর পাড়ে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় কোন নৌকা বা ডুঙ্গি কিছুই ছিলনা | তবে এই স্ত্রীলোকেরা এলো কোথা থেকে? পাড়ে উঠে এক যায়গায় অদৃশ্য হয়ে যায় | (পরে সেখানেই মধুবাবু লক্ষ্মীর মণ্ডপ তৈরী করেন) | দেবারু বলার সাথে সাথেই মধুবাবু বুঝেছিলেন --- উনি স্বয়ং মা লক্ষ্মী | সেই বছর থেকেই পূজোর প্রচলন করেন |

বাড়ীতে কোজাগরি লক্ষ্মী পূজা হতোই | সেই সাথে জোতের জন্য আলাদা করে মূর্তি বানিয়ে পূজা করলেন | মাঝে মা লক্ষ্মী ঝাঁপি কোলে বসে, দুই ধারে জয়া বিজয়া দুই সখী দাঁড়িয়ে | এই মূর্তি মুসলমান হিন্দু উভয় প্রজারাই বাঁশে করে ঝুলিয়ে নিয়ে যেতো গড়ালবাড়ী | এই এতখানি রাস্তা এক মুহুর্তের জন্যও কাঁধের থেকে নামাতো না | যখন একদল হাঁফিয়ে যেত, তখন আর চারজন কাঁধে নিত | মাটিতে নামাতো না | দশবারোজন প্রজা আসতো | স্নান করে পরিস্কার জামা কাপড় পড়ে | বড়বাবুর বাড়ী থেকে পেট পুরে ভাত খেয়ে, প্রসাদ পেয়ে সাথে করে নিয়ে যেত, পরিবার পরিজনদের জন্য | পূজার দেখভাল প্রজারাই করতো |

মেলার প্রচলন, ধাম বা যাত্রাগান :--- ধুবাবু দেখলেন ১টি বছর ধরে এই প্রজাদের এবং অন্যান্য গরীব গ্রামবাসীদের পরিবার পরিজন পথ চেয়ে থাকতো কবে মা লক্ষ্মী ওদের দুয়ারে আসবেন | সবাই মিলে একটু আনন্দ করবে | সামান্য সামান্য দুচারখানা মনোহারী সামগ্রী নিয়ে দোকান বসতো, পানবিড়ির দোকানই বেশী | গ্রামের গৃহিণী বধুরা তাদের সঞ্চয়ের থেকে সামান্য সঞ্চয় ভেঙ্গে সন্তানদের মাটির পুতুল খেলনা, নিজেদের ঘর গেরস্থালীর জন্য হাতা খুন্তি ইত্যাদি কিনে আনন্দিত হতো | এই টুকু সামান্য উপকরণেই গরীব মানুষের মুখে যেন আলো জ্বলে উঠতো |

তারপরই মধুবাবু স্থির করলেন --- মেলা বসাতে হবে |

থানায় যোগাযোগ করে অনুমতি নিয়ে নিলেন | সবাইকে ডাক দিয়ে মেলা বসাবার অনুমতি দিলেন নিজের জমিতে | তবে দোকানী এবং জনগণের সাথে চুক্তি রইলো --- মেলাতে জুয়ার আড্ডা বসবে না | মদ খাওয়া বা বিক্তী করা চলবে না | কোন রকম অসামাজিক কাজকর্ম চলবে না | গরীব মানুষের সারা বছরের তিল তিল করে সঞ্চয় করে, তার যেন অপব্যায় না হয় | যার জন্য থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ প্রহরা রাখা হয়েছিল |

মেলা ছিল প্রথম দুতিন বছর তিন দিন করে | তারপর সাত দিন করে | তারপর মানুষের মনোরঞ্জনে জন্য শুরু হলো যাত্রাপালা, যাকে উত্তরবঙ্গের অধিবাসীরা বলে "ধাম" | এই ধাম হতেই লোকের মুখে মুখে প্রচারিত হলো "মধুবাবুর ধাম" | কেউ বলে না মধুবাবুর মেলা |

এই যাত্রা পালা যারা গাইতে আসতো, তাদের সম্মান মূল্য দেওয়া হতো, কারণ অনেক দূর দূর থেকে অধিকারীরা তাদের শিল্পী গোষ্ঠিকে সাথে করে আনতেন | তাদের সাজপোষাক, যাতায়াত, খরচাপাতি সবই বহন করতে হতো অধিকারীকে | তাই মধুবাবু যাত্রাপালার জন্য সম্মান মূল্য দিতেন | সঙ্গে চা, পান, তামাক তো ছিলই |

এই মেলাতে দোকান বসাতে কোন ট্যাক্স বা কর দিতে হতো না |

মধুবাবুর জনপ্রিয়তা কেন? এমন প্রজারঞ্জন, মরমী, দুঃখীজনের ব্যাথার ব্যাথী কমই ছিলেন | কোন সমস্যা নিয়ে কেউ এলে, সে শত্রু মিত্র যেই হোক, বিমুখ হয়ে ফিরে যেত না |

আজ কত বছর চলে গেছে | আর মানুষের মনে রয়ে গেছে সেই অতি প্রিয় মানুষটির সহৃদয়তা মানবিকতা আর ভালোবাসার দান | মধুসূদন, বিপদতারণ শ্রী মধুসূদন, নাম তাঁর সার্থক | এমন মানুষই তো অমর হয়ে বেঁচে থাকেন এই বিস্মৃতির পৃথিবীতে!

১৪ই ফাল্গুন ১৪১৬
২৭শে ফেব্রুয়ারী ২০১০
কলকাতা

লেখকের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করুন তাঁর এই ঠিকানায় ---
দীপালী সেনগুপ্ত,
প্রযত্নে শ্রীমতী সাগরিকা সেনগুপ্ত,
২০ লেক ইস্ট সেকেণ্ড রোড,
কলকাতা ৭০০০৭৫,



                                               ************************

.                     
.                                                                                                                      উপরে  



লেখকের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করুন তাঁর ই-মেলে srimilansengupta@yahoo.co.in

"আপনার মতামত" পত্রিকার সূচির পাতায় যেতে এইখানে ক্লিক করুন

মিলনসাগর