তবু আমরা এই সংগ্রহকে “জ্ঞানদাসের পদাবলী সমগ্র” বলার ধৃষ্টতা করবো না। কারণ এখনও হয়তো কোনো অনাবিস্কৃত, অপঠিত, পুথিতে জ্ঞানদাসের আরও পদ থেকে থাকতে পারে, যা আধুনিক কালে এখন পর্যন্ত অপ্রকাশিত।
আমরা মিলনসাগরে, কবি জ্ঞানদাসের যত বই, পুথি ও সংকলনে যত রূপে যত পদ পেয়েছি, তা এখানে তুলে দিয়েছি, বাঙালীর অমূল্য সম্পদ হিসেবেই। যেহেতু জ্ঞানদাসের নিজের লেখা, তাঁর আসল কোনো পুথি পাওয়া যায়নি, তাই একই পদ যত রূপেই নানা, পুথি, গ্রন্থ, সংকলন থেকে পেয়ে থাকি, তার সব কটা রূপই আমরা আসল বলে মনে করছি। তাই এখানে প্রতিটি পদের প্রাপ্ত সব ক’টি রূপই দেওয়া রয়েছে।
এই কাজটি পূর্বের পদ-সংকলক ও সম্পাদকগণও করেছেন টীকা ও পাঠান্তরের মাধ্যেমে। যেহেতু ইন্টারনেটে, মিলনসাগরের কাগজের প্রয়োজন নেই তাই আমরা প্রকাশের প্রতিটি পদের প্রাপ্ত রূপ আলাদা আলাদা ভাবে একের পর এক সাজিয়ে দিয়েছি, "পাঠান্তর"-এ সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ না করে।
আমরা মিলনসাগরে কবি জ্ঞানদাসের পদাবলী তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।
কবি জ্ঞানদাসের জীবনী সম্বন্ধে অল্পই জানা গিয়েছে। কিন্তু বিগত প্রায় পাঁচশ বছরে প্রকাশিত নানা পুথি, গ্রন্থ ও সংকলনে তাঁকে উল্লেখ করা পদাবলী, তাঁর জীবনী জানানো পদাবলী এবং উনিশ শতক থেকে নানা গ্রন্থে বিশেষজ্ঞদের লেখা তাঁর সম্বন্ধে তথ্য আমরা এখানে এক এক করে উদ্ধৃত করে দিয়েছি পাঠকের সুবিধের জন্য।
জ্ঞানদাস চৈতন্য পরবর্তী কবি। তিনি যে কখনও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখেন নি স্বচক্ষে তা তিনি লিখে গিয়েছেন তাঁর “কাঁচা কাঞ্চন তনু চন্দন ভালে” পদের শেষ দুটি কলিতে এইভাবে . . .
যাহাতে ধরণী ধন্য, বিশেষ নদীয়া।
জ্ঞানদাস বড় দুঃখী তাহা না দেখিয়া॥
আমরা মিলনসাগরে, কবি জ্ঞানদাসের যত বই, পুথি ও সংকলনে যত রূপে যত পদ পেয়েছি, তা এখানে তুলে দিয়েছি, বাঙালীর অমূল্য সম্পদ হিসেবেই। যেহেতু জ্ঞানদাসের নিজের লেখা, তাঁর আসল কোনো পুথি পাওয়া যায়নি, তাই একই পদ যত রূপেই নানা, পুথি, গ্রন্থ, সংকলন থেকে পেয়ে থাকি, তার সব কটা রূপই আমরা আসল বলে মনে করছি। তাই এখানে প্রতিটি পদের প্রাপ্ত সব ক’টি রূপই দেওয়া রয়েছে।
এই কাজটি পূর্বের পদ-সংকলক ও সম্পাদকগণও করেছেন টীকা ও পাঠান্তরের মাধ্যেমে। যেহেতু ইন্টারনেটে, মিলনসাগরের কাগজের প্রয়োজন নেই তাই আমরা প্রকাশের প্রতিটি পদের প্রাপ্ত রূপ আলাদা আলাদা ভাবে একের পর এক সাজিয়ে দিয়েছি, "পাঠান্তর"-এ সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ না করে।
আমরা মিলনসাগরে কবি জ্ঞানদাসের পদাবলী তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।
কবি জ্ঞানদাসের জীবনী সম্বন্ধে অল্পই জানা গিয়েছে। কিন্তু বিগত প্রায় পাঁচশ বছরে প্রকাশিত নানা পুথি, গ্রন্থ ও সংকলনে তাঁকে উল্লেখ করা পদাবলী, তাঁর জীবনী জানানো পদাবলী এবং উনিশ শতক থেকে নানা গ্রন্থে বিশেষজ্ঞদের লেখা তাঁর সম্বন্ধে তথ্য আমরা এখানে এক এক করে উদ্ধৃত করে দিয়েছি পাঠকের সুবিধের জন্য।
জ্ঞানদাস চৈতন্য পরবর্তী কবি। তিনি যে কখনও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখেন নি স্বচক্ষে তা তিনি লিখে গিয়েছেন তাঁর “কাঁচা কাঞ্চন তনু চন্দন ভালে” পদের শেষ দুটি কলিতে এইভাবে . . .
যাহাতে ধরণী ধন্য, বিশেষ নদীয়া।
জ্ঞানদাস বড় দুঃখী তাহা না দেখিয়া॥
.
নরহরি দাস ভণিতার পদে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
নরহরি দাস ভণিতার এই পদটিতে জ্ঞানদাস সম্বন্ধে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। পদটি ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত, জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত ও মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী” (১৯৩৪, প্রথম সংস্করণ ১৯০২), ৩১৩-পৃষ্ঠায় দেওয়া রয়েছে। এই পদের রচয়িতা কোন নরহরি তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকলেও, ডঃ নীলরতন সেন তাঁর ১৩৫৭ ও ১৩৭৪ বঙ্গাব্দে (১৯৫০ ও ১৯৬৭ সালে) প্রকাশিত “বৈষ্ণব পদাবলী পরিচয়” গ্রন্থের ১৪০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে পদটির রচয়িতা ছিলেন ভক্তিরত্নাকর প্রণেতা নরহরি চক্রবর্তী। ১৩২৭ বঙ্গাব্দে (১৯২০ সালে) প্রকাশিত, শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্ন, সংকলিত ও সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন, “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”, গ্রন্থের ১-পৃষ্ঠায় একই কথা লিখেছেন।
নরহরি দাস ভণিতার পদে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
নরহরি দাস ভণিতার এই পদটিতে জ্ঞানদাস সম্বন্ধে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। পদটি ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত, জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত ও মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী” (১৯৩৪, প্রথম সংস্করণ ১৯০২), ৩১৩-পৃষ্ঠায় দেওয়া রয়েছে। এই পদের রচয়িতা কোন নরহরি তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকলেও, ডঃ নীলরতন সেন তাঁর ১৩৫৭ ও ১৩৭৪ বঙ্গাব্দে (১৯৫০ ও ১৯৬৭ সালে) প্রকাশিত “বৈষ্ণব পদাবলী পরিচয়” গ্রন্থের ১৪০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে পদটির রচয়িতা ছিলেন ভক্তিরত্নাকর প্রণেতা নরহরি চক্রবর্তী। ১৩২৭ বঙ্গাব্দে (১৯২০ সালে) প্রকাশিত, শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্ন, সংকলিত ও সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন, “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”, গ্রন্থের ১-পৃষ্ঠায় একই কথা লিখেছেন।
॥ কামোদ॥
শ্রীবীরভূমেতে ধাম কাঁদড়া মাঁদড়া গ্রাম
তথায় জন্মিলা জ্ঞানদাস।
আকুমার বৈরাগ্যেতে রত বাল্যকাল হৈতে
দীক্ষা লৈলা জাহ্নবার পাশ॥
অদ্যাপি কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাস কবি নামে
পূর্ণিমায় হয় মহামেলা।
তিনদিন মহোত্সব আসেন মহান্ত সব
হয় তাহাদের লীলাখেলা॥
মদনমঙ্গল নাম রূপে গুণে অনুপাম
আর এক উপাধি মনোহর।
খেতুরীর মহোত্সবে জ্ঞানদাস গেলা যবে
বাবা আউল ছিল সহচর॥
কবিকুলে যেন রবি চণ্ডীদাস তুল্য কবি
জ্ঞানদাস বিদিত ভূবনে।
যার পদ সুধারস যেন অমৃতের ধার
নরহরি দাস ইহা ভণে॥
শ্রীবীরভূমেতে ধাম কাঁদড়া মাঁদড়া গ্রাম
তথায় জন্মিলা জ্ঞানদাস।
আকুমার বৈরাগ্যেতে রত বাল্যকাল হৈতে
দীক্ষা লৈলা জাহ্নবার পাশ॥
অদ্যাপি কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাস কবি নামে
পূর্ণিমায় হয় মহামেলা।
তিনদিন মহোত্সব আসেন মহান্ত সব
হয় তাহাদের লীলাখেলা॥
মদনমঙ্গল নাম রূপে গুণে অনুপাম
আর এক উপাধি মনোহর।
খেতুরীর মহোত্সবে জ্ঞানদাস গেলা যবে
বাবা আউল ছিল সহচর॥
কবিকুলে যেন রবি চণ্ডীদাস তুল্য কবি
জ্ঞানদাস বিদিত ভূবনে।
যার পদ সুধারস যেন অমৃতের ধার
নরহরি দাস ইহা ভণে॥
.
জ্ঞানদাস বিবাহিত না চিরকুমার ছিলেন? - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৬ সালে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত, “জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থের ভূমিকায় রয়েছে --- “কেহ কেহ লিখিয়াছেন, জ্ঞানদাস চিরকুমার ছিলেন। কান্দরায় প্রবাদ আছে, জ্ঞানদাস বিবাহিত ছিলেন। তাঁহার দুইটি পুত্রসন্তান হইয়াছিল। শ্রীপাদ নিত্যানন্দ তনয় শ্রীল বীবভদ্র প্রভুর ইষ্টচিন্তায় বিঘ্ন উৎপাদন করায় পুত্র দুইটি অকালে পরলোকগত হন।” কিন্তু ভক্তিরত্নাকর প্রণেতা নরহরি চক্রবর্তী রচিত “শ্রীবীরভূমেতে ধাম কাঁদড়া মাঁদড়া গ্রাম” পদের ২য় কলিটি থেকে জানা যায় যে জ্ঞানদাস অবিবাহিত ছিলে।
জ্ঞানদাস বিবাহিত না চিরকুমার ছিলেন? - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৬ সালে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত, “জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থের ভূমিকায় রয়েছে --- “কেহ কেহ লিখিয়াছেন, জ্ঞানদাস চিরকুমার ছিলেন। কান্দরায় প্রবাদ আছে, জ্ঞানদাস বিবাহিত ছিলেন। তাঁহার দুইটি পুত্রসন্তান হইয়াছিল। শ্রীপাদ নিত্যানন্দ তনয় শ্রীল বীবভদ্র প্রভুর ইষ্টচিন্তায় বিঘ্ন উৎপাদন করায় পুত্র দুইটি অকালে পরলোকগত হন।” কিন্তু ভক্তিরত্নাকর প্রণেতা নরহরি চক্রবর্তী রচিত “শ্রীবীরভূমেতে ধাম কাঁদড়া মাঁদড়া গ্রাম” পদের ২য় কলিটি থেকে জানা যায় যে জ্ঞানদাস অবিবাহিত ছিলে।
আকুমার বৈরাগ্যেতে রত বাল্যকাল হৈতে
দীক্ষা লৈলা জাহ্নবার পাশ॥
দীক্ষা লৈলা জাহ্নবার পাশ॥
যেহেতু হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের শোনা “কান্দরার প্রবাদ” এর চেয়ে নরহরি চক্রবর্তীর পদের প্রামাণিকতা বেশী বলে তাঁকে অকৃতদার বলেই মেনে নিয়েছেন শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার-এর মতো বিশেষজ্ঞরা।
.
জ্ঞানদাস ও মঙ্গল ঠাকুর কি একই ব্যক্তি? - ^^ উপরে ফেরত
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় খুব দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর এবং শ্রীশ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, ১৯৫৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত “জ্ঞানদাসের পদাবলী” সংকলনের ভূমিকার শুরুতেই লিখেছেন . . .
“রাঢ়দেশে কান্দরা নামেতে গ্রাম হয়।
যথায় মঙ্গল জ্ঞানদাসের আলয়॥
ভক্তিরত্বাকরের এই দুই ছত্র কবিতা লইয়া বাঙ্গালা-সাহিত্যে বহু গবেষণা হইয়া গিয়াছে। অনেকেই বলিয়াছেন, মঙ্গল জ্ঞানদাসেরই অপর নাম। কারণ ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কেহ বলিয়াছেন, “জ্ঞানদাস দেখিতে অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন তাই লোকে তাহাকে মঙ্গল বলিত।” আবার অন্য জনে বলিয়াছেন, “জ্ঞানদাস ভুবনমঙ্গল হরিনাম বিতরণ করিতেন, এইজন্যই সকলে তাঁহাকে মঙ্গল জ্ঞানদাস বলিয়া ডাকিত।'' দেহসৌষ্ঠব এবং হরিনাম বিতরণের জন্য মঙ্গল উপাধি প্রাপ্য হইলে সে কালের বৈষ্ণবগণের প্রায় সকলেই তাহা পাইতেন। এ কথাটা কেহ ভাবিয়া দেখেন নাই। এখনো কাহারো কাহারো বিশ্বাস মঙ্গল এবং জ্ঞানদাস একই ব্যক্তির নাম।
মঙ্গল একজন স্বনামধন্য ভক্ত এবং জ্ঞানদাস একজন সুবিখ্যাত পদকর্তা, দুইজন পৃথক ব্যক্তি। দুইজনই কান্দারার অধিবাসী। মঙ্গল ঠাকুর শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের অন্তরঙ্গ পার্ষদ শ্রীল গদাধর পণ্ডিতের শিষ্য। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে গদাধর শাখা গণনায় ইঁহার নাম আছে--- “যদু গাঙ্গুলী আর মঙ্গল বৈষ্ণব।” বৈষ্ণব-সাহিত্যে মঙ্গল ঠাকুর মঙ্গল বৈষ্ণব নামে পরিচিত। কান্দরায় ইঁহার বংশধরগণ বর্ত্তমান রহিয়াছেন।”
এই অংশ সহ এর পরের এই মঙ্গল বা মঙ্গল ঠাকুরকে নিয়ে আরও বিস্তারিত বিবরণ যা এই গ্রন্থে জ্ঞানদাসের জীবনীর অংশ হিসেবে দেওয়া রয়েছে, আমরা নীচে লেখা জ্ঞানদাসের জীবনীতে তুলে দিয়েছি, পাঠকের জন্য।
.
নসির মামুদের বিখ্যাত পদটি কি জ্ঞানদাসের লেখা? - ^^ উপরে ফেরত
চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা তাঁর সারা জীবন ধরে, আনুমানিক ১৮৮০ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত ও সংকলিত এবং তাঁর মৃত্যুর প্রায় ৫০ বছর পরে তাঁর পুত্র রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা ১৯২২ সালে প্রকাশিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন "শ্রীশ্রীপদামৃতসিন্ধু" এর ২৮ পৃষ্ঠায় দেওয়া “কানাই ধেনু সঙ্গে গোঠে রঙ্গে” পদটি র এই প্রথম কলিটি ছাড়া বাকি সমস্ত পদটিই, অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে প্রকাশিত, বৈষ্ণবদাস সংকলিত “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু” গ্রন্থের পদকর্তা নসির মামুদ-এর বিখ্যাত পদ "চলত রাম সুন্দর শ্যাম" এর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। শেষে ভণিতায় নসির মামুদ-এর বদলে জ্ঞানদাস দেওয়া রয়েছে। পদটি নীচের পদাবলীর পাতায় দেওয়া রয়েছে।
আমরা এই পদটি সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম।
.
নরহরি চক্রবর্তী প্রণীত ভক্তিরত্নাকর গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
৪২৬ চৈতন্যাব্দে ( ১৯১২ সালে) বহরমপুর থেকে প্রকাশিত, শ্রীরাসবিহারিসাঙ্খ্যতীর্থ দ্বারা সংশোধিত, শ্রী রামদেবমিশ্র দ্বারা প্রকাশিত নরহরি চক্রবর্তী প্রণীত ভক্তিরত্নাকর (১৬৯৪ সালের পরে রচিত) গ্রন্থের, ২য় সংস্করণের, দশম তরঙ্গের ৬৫৫-পৃষ্ঠায়, ফাল্গুণ পূর্ণিমায় খেতরি উৎসবের বর্ণনায় (১৫৮১ খৃঃ) জ্ঞানদাস ও তাঁর বন্ধু মনোহর দাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। . . .
বিদায় হইয়া চলে খেতরি হইতে।
থেতরি গ্রামের লোক ধায় চারিভিতে॥
পরস্পর কহে কত করিয়া ক্রন্দন।
দেখি সে সবারে স্থির নহে কুন জন॥
শ্রীনিবাসাচার্য্য ধৈর্য্য ধরিতে না পারে।
নরোত্তম রামচন্দ্র স্থির হৈতে নারে॥
শ্যামানন্দাদির চিত্তে খেদ অতিশয়।
গণসহু সন্তোষের, ব্যাকুলহৃদয়॥
কহিতে কি শ্রীমহান্তগণের গমনে।
ব্যাপিল দারুণ দুঃখ পণ্ড পক্ষিগণে॥
পদ্মাবতীতীরে মহালোক ভীড় হৈল।
শ্রীমহান্তগণ শীঘ্র নৌকায় চঢ়িল॥
হইয়া ব্যাকুল পদ্মাবতী পার হৈলা।
বুধরিগ্রামেতে রহি প্রাতে যাত্রা কৈলা॥
আচার্য্যাদি সবে পদ্মাবতীতীর হৈতে।
আইলেন শ্রীজাহ্নবী ঈশ্বরী গ্রামেতে॥
যদ্যপি ঈশ্বরী অতি অধৈর্য্য অন্তরে।
তথাপি প্রবোধি স্থির করিল সবারে॥
করিবেন বৃন্দাবন গমন ত্বরায়।
তাহা জানাইতে সবে ব্যাকুল হিয়ায়॥
পুন কত যত্নে প্রবোধিলা সর্বজনে।
যাত্রা স্থির কৈলা বৃন্দাবনের গমনে॥
শ্রীসন্তোষদত্ত যত্বে নানা দ্রব্য দিলা।
তারে অনুগ্রহ করি গ্রহণ করিলা॥
গৌরাঙ্গ বল্লবীকাস্ত আদি প্রভুগণে।
না জানি প্রণমি কি কহিলা সঙ্গোপনে॥
প্রভু আগে বিদায় হইয়া যাত্রা করে।
সঙ্গে ভাগবতগণ অধৈর্য্য অন্তরে॥
কৃষ্ণদাস সরখেল মাধব আচার্য্য।
মুরারি চৈতন্য কৃষ্ণদাস বিপ্রবর্ষ্য॥
নৃসিংহ চৈতন্য বলরাম মহীধর।
কানাই নকড়িদাস গৌরাঙ্গসুন্দর॥
শ্রীপরমেশ্বরীদাস দাস দামোদর।
রঘুপতি বৈদ্য উপাধ্যায় মনোহর॥
জ্ঞানদাস মুকুন্দাদি ভাগবত যত।
এ সবার প্রভাব বর্ণিবে কেবা কত॥
প্রীনিবাসাচার্য্য নরোত্তমাদি-বিচ্ছেদে।
ধরিতে না পারে হিয়া বিদরয়ে খেদে॥
কে বুঝিতে পারে প্রেম-চেষ্টা যে প্রকার।
বিদায় হইলা যৈছে নারি বর্ণিবার॥
গণসহ ঈশ্বরীর গমনসময়ে।
গোবিন্দাদি সঙ্গে চলে আচার্য্য আজ্ঞায়ে॥
খেতরি হইতে চলিলেন ধৈর্য্য ধরি।
শীঘ্র আসিবেন জানাইলেন ঈশ্বরী॥
শ্রীনিবাস আচার্য্যাদিপ্রভুর ইচ্ছায়।
ধৈর্য্যাবলম্বন করি আইলা বাসায়॥
ভক্তিরত্নাকর গ্রন্থের, ২য় সংস্করণের, চতুর্দ্দশ তরঙ্গের ১০৪৬-পৃষ্ঠায়ও আমরা জ্ঞানদাসের উল্লেখ পাই।
রাঢ়দেশে কাঁদরা নামেতে গ্রাম হয়।
তথা শ্রীমঙ্গল জ্ঞানদাসের আলয়॥
.
কৃষ্ণদাস কবিরাজের “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী দ্বারা ১৫৮১ খৃষ্টাব্দে বিরচিত, জগদীশ্বর গুপ্তর টীকা ও ব্যখ্যা সহ ১২৯৬ বঙ্গাব্দে (১৮৮৯খৃষ্টাব্দে) প্রকাশিত “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থের আদি লীলার একাদশ পরিচ্ছেদে, নিত্যানন্দ স্কন্ধ শাখা বর্ণন-এর ২৯৫-পৃষ্ঠায় জ্ঞানদাস ও তাঁর বন্ধু মনোহর দাস-র উল্লেখ রয়েছে এইভাবে...
পিতাম্বর, মাধবাচার্য্য, দাস দামোদর ;
শঙ্কর, মুকুন্দ, জ্ঞান দাস মনোহর।
সুতরাং কবি জ্ঞানদাস ছিলেন শ্রীশ্রীনিত্যানন্দ শাখা ভুক্ত।
.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচনা গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করা ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত, “আলোচনা” গ্রন্থে “বৈষ্ণব কবির গান” এ “জ্ঞানদাসের গান” অংশটি আমরা তুলে দিলাম। আমরা পেয়েছি বিশ্বভারতী থেকে ১৯৯১ সালে (চৈত্র ১৩৯৮) প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলী ১৫শ খণ্ডের ৪৮-পৃষ্ঠা থেকে . . .
“জ্ঞানদাসের গান
পূর্ব্বেই বলিয়াছি, সৌন্দর্য্য পৃথিবীতে স্বর্গের বার্ত্তা আনিতেছে। যে বধির, ক্রমশ তাহার বধিরতা দূর হইতেছে। বৈষ্ণব জ্ঞানদাসের একটি গান পাইয়াছি, তাহাই ভাল করিয়া বুঝিতে গিয়া আমার এত কথা মনে পড়িল। --
মুরলী করাও উপদেশ।
যে রন্ধ্রে যে ধ্বনি উঠে জানহ বিশেষ॥
কোন্ রন্ধ্রে বাজে বাঁশী অতি অনুপাম।
কোন্ রন্ধ্রে রাধা ব'লে ডাকে আমার নাম॥
কোন্ রন্ধ্রে বাজে বাঁশী সুললিতধ্বনি।
কোন্ রন্ধ্রে কেকা শব্দে নাচে ময়ূরিণী॥
কোন্ রন্ধ্রে রসালে ফুটয়ে পারিজাত।
কোন্ রন্ধ্রে কদম্ব ফুটে হে প্রাণনাথ॥
কোন্ রন্ধ্রে ষড় ঋতু হয় এককালে।
কোন্ রন্ধ্রে নিধুবন হয় ফুলে ফলে॥
কোন্ রন্ধ্রে কোকিল পঞ্চম স্বরে গায়।
একে একে শিখাইয়া দেহ শ্যামরায়॥
জ্ঞানদাস কহে হাসি।
"রাধে মোর" বোল বাজিবেক বাঁশী॥”
ইনটারনেটের এই দুইটি ওয়েসসাইটেও পাঠক তা পড়তে পারবেন।
https://rabindra-rachanabali.nltr.org/print/15239
https://tagoreweb.in/Others/alochona-174/boishnob-kabir-gan-2025
.
রমণিমোহন মল্লিকের জ্ঞানদাস গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
শ্রী রমণিমোহন মল্লিক তাঁর ১৩০২ সালে (১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে) সম্পাদিত, “জ্ঞানদাস” গ্রন্থে, কবির জীবনীতে লিখেছেন . . . “জেলা বীরভূমের অন্তর্গত, ইন্দ্রাণী নামে যে দেশ আছে, যে দেশে মহাভারত রচয়িতা মহাত্মা কাশীরাম দাস বাস করিতেন, যে স্থানের ৪ ক্রোশ পূর্ব্বে একচক্রা নগর যেখানে শ্রীশ্রীহারাই পণ্ডিতের আলয়ে শ্রীনিত্যানন্দ মহাপ্রভু জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন সেই নগরের পশ্চিমে দুই ক্রোশ দূরে কাঁদড়া গ্রামে বিপ্র কুলে মঙ্গল বংশে জ্ঞানদাস জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। ভক্তিরত্বাকর গ্রন্থে তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় :---
*রাঢ় দেশে কাঁদড়া গ্রামেতে নাম হয়।
তথায় বসতি জ্ঞানদাসের আলয়॥”
বর্ধমান ও বীরভূমে অদ্যাপি "মঙ্গল ব্রাহ্মণ” নামে এক সম্প্রদায় ব্রাহ্মণ বাস করেন। জ্ঞানদাস মঙ্গল বংশে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহাকে কেহ মঙ্গল ঠাকুর কেহ শ্রীমঙ্গল এবং কেহবা মদন মঙ্গল বলিয়া সম্বোধন করিতেন। জ্ঞানদাস শ্রীনিত্যানন্দ মহাপ্রভুর শাখাভুক্ত।
জ্ঞানদাস শ্রীনিত্যানন্দ পত্নী শ্রীজাহ্নবা দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করিয়া বৈরাগ্য ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁহার জ্ঞাতি বর্গও শ্রীজাহ্নবা দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করিয়া গোস্বামী পদে অভিহিত হুইয়াছিলেন। কাঁদড়ায় জ্ঞানদাসের মঠ অদ্যপি বিদ্যমান রহিয়াছে। প্রতি বৎসর পৌষ পূর্ণিমায় সেখানে জ্ঞানদাসের দিবসিক উপলক্ষ মহোৎসব হয় এবং তিন দিন মেলা হয়।
হুগলী জেলার অধীন বদনগঞ্জে বাবা আউল মনোহর দাস নামক এক জন পরম ভক্ত ছিলেন। তিনি প্রায় তিন শত বৎসর জীবিত ছিলেন। সারাবলী গ্রন্থে প্রমাণ পাওয়া যায় :---
“আদি নাম মনোহর, চৈতন্য নাম শেষ।
আউলিয়া হইয়া বুলে, স্বদেশ বিদেশ॥"
মনোহর দাস একজন সুবিখ্যাত কবি ও পণ্ডিত ছিলেন। তিনি অনেক বৈষ্ণব গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়াছিলেন। তাঁহার গ্রন্থ সকল বদনগঞ্জ নিবাসী মহাপ্রভু শ্রীনিত্যানন্দের পরিকর উদ্ধারণ দত্তের বংশাবতংস শ্রীযুক্ত হারাধন দত্ত ভক্তি নিধি মহাশয়ের পুস্তকাগারে শোভা পাইতেছে। নির্য্যাসতত্ত্ব এবং পদ সমুদ্র বাবা মনোহর দাস-এর সংগৃহীত। পদসমুদ্র গ্রন্থখানি অদ্যাপি মুদ্রিত হয় নাই। ইহাতে ১৫০০০ পদ আছে।
বাবা আউল কোন কুলে কোন স্থানে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা জানিতে পারা যায় নাা। তিনি সখীভাবে শ্রীরাধাকৃষ্ণের ভজন সাধন করিতেন। তিনি ঘাঘরা পরিতেন, কাঁচলি বক্ষে আঁটিতেন, সীঁথায় সিন্দুর পরিতেন। নিজে পদ রচনা করিয়া আক্ষেপ করিয়া মুরলীকে সম্বোধন করিয়া বলিতেন :---
“শ্যামের মুরলী, হৃদয় খুবলী, করিলি সকল নাশ।
* * * * * *
যাহার যে রীতি, না ছাড়ে কখন, কহে মনোহর দাস॥” ---- পদ সমুদ্র ১৪০৪৩
অদ্যাপি বদনগঞ্জে বাবা আউলের সমাধি আছে।
মনোহর দাস জ্ঞানদাসের বন্ধু ছিলেন। উভয়ে সর্বদা একত্রে থাকিতেন। উভয়েই শ্রীজাহ্নবার শিষ্য ছিলেন। কোন স্থানে আহ্বান হইলে উভয়েই একত্রে গমন করিতেন। খেতুরীর মহোৎসবে উভয়েই একত্রে গমন করিয়াছিলেন।
“শ্রীল রঘুপতি, উপাধ্যায় মহিধর।
মুরারী, মুকুন্দ, জ্ঞানদাস, মনোহর ॥” ----“নরোত্তম বিলাস।”
খেতুরী হইতে শ্রীজাহ্নবা দেবীর সহিত জ্ঞানদাস শ্রীবৃন্দাবনে গমন করিয়া ছিলেন এবং শ্রীজীব গোস্বামী তথায় ইহাদিগকে অভ্যর্থনা করিয়াছিলেন। জ্ঞানদাস দার পরিগ্রহ করেন নাই। তাঁহার পিতা মাতার নাম জানিতে পারা যায় না। তাঁহার জন্ম এবং মৃত্যুর সন তারিখও পাওয়া যায় না। ১৬০০ শকে বাবা আউল মনোহর গুপ্ত হন সুতরাং তাহার পূর্বে জ্ঞানদাস জীবিত ছিলেন স্থির করিয়া লইতে হুইবে। গোবিন্দ দাস জ্ঞানদাসের পরবর্ত্তী কবি।”
.
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য" গ্রন্থে - ^^ উপরে ফেরত
রায়বাহাদুর ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন-এর “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য" গ্রন্থের ৫ম সংস্করণে ১৯২৭ (১ম সংস্করণ ১৮৯৬) জ্ঞানদাসের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। ৫ম সংস্করণটি আমাদের সংগ্রহে না থাকায়, আমরা তাঁর ৬ষ্ঠ সংস্করণ, চরিত-শাখা, ২৮৯-পৃষ্ঠায় লিখেছেন --- “জ্ঞানদাস সম্বন্ধে অতি অল্প বিবরণই পাওয়া যায় ; বীরভূম জেলার অকচক্রাগ্রামে (মল্লারপুর ষ্টেশনের নিকট) নিত্যানন্দ প্রভুর পিতৃগৃহ ছিল ; সিউড়ীর বিশ ক্রোশ পূর্ব্বে ও বর্দ্ধমান জেলার অন্তর্গত কাটোয়ার ১০ মাইল পশ্চিমে কাঁদড়া গ্রাম। তথায় ব্রাহ্মণ বংশে ১৫৩০ খৃঃ অব্দে জ্ঞানদাস জন্ম গ্রহণ করেন ; ইনি নিত্যানন্দশাখাভুক্ত ; খেতুরীর উৎসবে ইনি উপস্থিত ছিলেন দেখা যায়, শুতরাং ইনি গোবিন্দদাস, বলরামদাস প্রভৃতির সমকালিন কবি। কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাসের একটি মঠ এখনও আছে ; পৌষ মাসের পূর্ণিমায় সেখানে প্রতি বৎসর মহোৎসব এবং সেই সঙ্গে তিন দিন ব্যাপিয়া মেলা হয়।”
.
হরিমোহন মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯০০ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, হরিমোহন মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “সঙ্গীত-সার-গ্রন্থ”, ১ম খণ্ডে জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“বর্দ্ধমানের অন্তঃপাতি কাঁদরা গ্রামে জ্ঞানদাসের জন্ম। জ্ঞানদাসের মঠ এখনও কাঁদরা গ্রামে আছে। মনোহর দাস ১৬০০ শকে প্রাদুর্ভূত হন। জ্ঞানদাস মনোহর দাস-এর বন্ধু ; সর্ব্বদা উভয়ে একত্র থাকিতেন। সুতরাং জ্ঞানদাসেরও আবির্ভাব-কাল ১৬০০ শক।”
.
জগবন্ধু ভদ্রর “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী” তে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯০২ সালে শ্রীজগবন্ধু ভদ্র সম্পাদিত ও সংকলিত শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী সংকলনের ১৩৪১ বঙ্গাব্দে (১৯৩৪) সালে শ্রীমৃণালকান্তি ঘোষ ভক্তিভূষণ দ্বারা সম্পাদিত সংস্করণের পদকর্ত্তৃগণের পরিচয়, ১৮২-পৃষ্ঠায় জ্ঞানদাসের সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“বীরভূম জেলায় একচক্রা গ্রামের দুই ক্রোশ পশ্চিমে কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাস ঠাকুর বাস করিতেন। কোন্ শকে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, তৎসন্বন্ধে বিভিন্ন মত আছে। ন্বর্গীয় ক্ষীরোদচন্দ্র রায়ের মতে গোবিন্দ কবিরাজ ও জ্ঞানদাস ১৪৪৭ শকে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু হারাধন দত্ত বলিয়াছেন, গোবিন্দ কবিরাজের জন্ম ১৪৫৯ শকে, এবং জ্ঞানদাস তাহার কিঞ্চিৎ পূর্ববর্তী। আবার জগবন্ধুবাবু অনুমান করেন, ১৪৫৩ শকে জ্ঞানদাসের জন্ম। কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাসের মঠ অদ্যপি বর্তমান আছে। এখানে প্রতি বৎসর পৌষ-পূর্ণিমায় জ্ঞানদাসের স্মরণার্থে তিনদিনব্যাপী মহোৎসব ও মেলা হয়। চৈতন্যচরিতামৃতে নিত্যানন্দের শাখা-বর্ণনায় জ্ঞানদাসের নাম আছে। যথা---*শঙ্কর, মুকুন্দ, জ্ঞানদাস মনোহর।” আবার ভক্তিরত্বাকরে তাঁহাকে “মঙ্গল জ্ঞানদাস” বলা হইয়াছে। ইহাতে কেহ কেহ অনুমান করেন, “মঙ্গল” ও “মনোহর” জ্ঞানদাসের দুইটা উপাধি মাত্র। কিন্ত উহা জ্ঞানদাসের উপাধি, কি তাঁহার নামান্তর, কি স্বতন্ত্র ব্যক্তির নাম, তাহা নির্ণয় করা সুকঠিন। তবে জ্ঞানদাস যে মঙ্গল-বংশীয় রাঢ়ীশ্রেণীর ব্রাহ্মণ, তাহা জানা গিয়াছে। হুগলী ও বাঁকুড়া জেলায় মঙ্গলবংশীয় বহু ব্রাহ্মণ বাস করিতেছেন। হারাধন দত্ত মহাশয় বলিয়াছেন, বাবা আউল মনোহর দাস, জ্ঞানদাসের চিরসহচর ও সতীর্থ ছিলেন। অনেক সময় উভয়ে একত্র থাকিতেন। খেতরী মহোৎসবে জ্ঞানদাস ও মনোহরদাস, নিত্যানন্দের গণসহ গমন করেন। যথা নরোত্তম-বিলাসে--"শ্রীল রঘূপতি উপাধ্যায় মহীধর। মুরারি, মুকুন্দ, জ্ঞানদাস, মনোহর॥”
কিন্তু এখানে “মনোহর” যে “আউল মনোহর দাস”, তাহার প্রমাণ কোথায়? জ্ঞানদাস অল্প বয়সে নিত্যানন্দ-পত্নী জাহ্নবা দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ এবং কৌমারে বৈরাগ্য অবলম্বন করেন বলিয়া কথিত আছে। জ্ঞানদাসকে সাধারণ লোকে “গোস্বামী” বলিয়া ডাকিত। ইহা হইতে তাঁহার জ্ঞাতিবর্গ আপনাদের নামের শেষে “গোস্বামী" শব্দ ব্যবহার করিয়া আসিতেছেন। নরহরি দাস-ভণিতাযুক্ত “শ্রীবীরভূমেতে ধাম, কাঁদড়া মাঁদড়া গ্রাম, তথায় জন্মিলা জানদাস।” এই পদটা গৌরপদতরঙ্গিণীতে সংগৃহীত হইয়াছে। কিন্তু এই নরহরি দাস কে? ঘনশ্যাম-নরহরি চক্রবর্ত্তীর “ভক্তিরত্বাকর" গ্রন্থে এ পদটী নাই। সুতরাং ইহা তাঁহার রচিত কি না, বলা যায় না।
সতীশবাবু বলেন, “জ্ঞানদাসের কয়েকটা উৎকৃষ্ট বাঙ্গালা পদ রমণীবাবুর ও বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের চণ্ডীদাসের সংস্করণে, চণ্ডীদাসের নামে উদ্ধৃত হইয়াছে। জ্ঞানদাসের গভীর ভাবপূর্ণ সরল ও আবেগময় বাঙ্গালা পদের সহিত চণ্ডীদাসের ভণিতাযুক্ত উৎকৃষ্ট বাঙ্গালা পদগুলির ভাষাগত ও ভাবগত আশ্চর্য্য সাদৃশ্য দেখা যায়। কীর্ত্তন-গায়ক ও লিপিকরদিগের ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত গোলযোগের. ফলে জ্ঞানদাসের অনেক উতকৃষ্ট বাঙ্গালা পদ অসঙ্গতভাবে চণ্ডীদাসের নামে চলিয়া গিয়াছে, এরূপ অনুমান করার যে যথেষ্ট কারণ আছে, ভাহা আমরা “চণ্ডীদাস” প্রসঙ্গে আলোচন করিয়াছি। পদকল্পতরু পুথির সঙ্কলন-কালে, অর্থাৎ আন্দাজ দুই শত বৎসরের কিছু পূর্ব্বেই, এই ভণিতার গোলযোগ সংঘটিত হইয়াছে। সুতরাং অন্যূন আড়াই শত কি তিন শত বৎসরের পুরাতন পদাবলীর পুথি যদিও উহা এখন নিতান্ত বিরল--- সহত্নে সংগ্রহ করিয়া সতর্কভাবে মিলাইয়া দেখিলে, বর্ত্তমান চণ্ডীদাসের নামে প্রচারিত অনেক উৎকৃষ্ট বাঙ্গালা পদ জানদাসের রচিত বলিয়া প্রমাণিত হইতে পারিবে বলিয়া আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।”
জ্ঞানদাসের ১৮৬টি বাঙ্গালা ও ব্রজবুলীর পদ “পদকল্পতরু” গ্রন্থে সংগৃহীত হইয়াছে স্বর্গত রমণীমোহন মল্লিক মহাশয়ের সম্পাধিত 'জ্ঞানদাসের পদাবলী' গ্রন্থে উহার অতিরিক্ত আরও কতকগুলি পদ নানা প্রাচীন পুথি হইতে সঙ্কলিত হইয়াছে। সতীশবাবুর “অপ্রকাশিত পদ-রত্বাবলী” গ্রন্থে রমণীবাবুর সংস্করণের অতিরিক্ত আরও পঞ্চাশটি পদ “পদ-রসসার”, “পদ-রত্বাকর” প্রভৃতি প্রাচীন পুথি হইতে সংগৃহীত হইয়া প্রকাশিত হইয়াছে। আমাদের বিশ্বাস, অনুসন্ধান করিলে জ্ঞানদাসের এরূপ আরও অনেক পদ আবিষ্কৃত হইতে পারে।”
.
দুর্গাদাস লাহিড়ীর “বৈষ্ণব-পদলহরী” তে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত ও সংকলিত “বৈষ্ণব-পদলহরী” গ্রন্থে জ্ঞানদাসের জীবনী নিয়ে তিনি লিখেছেন . . .
“কবি জ্ঞানদাস একজন সুবিখ্যাত বৈষ্ণব-পদকর্ত্তা। বীরভূম জেলায় ইন্দ্রাণী থানার অন্তর্গত কাঁদড়া গ্রামে ব্রাহ্মণকুলে মঙ্গল-বংশে ইহাঁর জন্ম হয়। মঙ্গলবংশে জন্ম হেতু “মঙ্গল ঠাকুর”, “শ্রীমঙ্গল” ও “মদন মঙ্গল” প্রভৃতি আখ্যায় ইনি অভিহিত। জ্ঞানদাসের সময় নির্ণয় সম্বন্ধে মতদ্বৈধ দৃষ্ট হয়। জ্ঞান দাস,---মনোহর দাস বা বাবা আউলের সমসাময়িক। উভয়েই শ্রীনিত্যানন্দপত্নী শ্রীজাহ্নবীদেবীর মন্ত্রশিষ্য ছিলেন, উভয়েই একত্র থাকিতেন। এবং উভয়েই মহোৎসবে নিমন্ত্রিত হইয়া একত্র গমন করিতেন, --- এরুপ প্রমাণ পাওয়া যায়। সে হিসাবে উভয়েই বঙ্গীয় একাদশ শতাব্দীতে (১৬০০ শকে) বিদ্যমান ছিলেন। কেহ কেহ আবার অনুমান করেন, জ্ঞানদাস ১৪৫৩ শকাব্দে (৯৩৮ সালে) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহাদের মতে বাবা আউল তিন শত বৎসর জীবিত ছিলেন, এবং তিনি ১৬০০ শকে “মনোহর দাস” নাম গ্রহণ করেন ; এবং তাঁহার এই নাম গ্রহণের বহু পরে জ্ঞানদাসের জন্ম হয়। জানদাস দারপরিগ্রহ করেন নাই। শ্রীজাহ্নবীদেবীর সহিত তিনি শ্রীবৃন্দাবনাদির তীর্থ ভ্রমণ করেন। জ্ঞানদাসের জ্ঞাতিগণ এখনও বাঁকুড়া জেলার কোতলপুর গ্রামে বাস করিতেছেন। জ্ঞানদাস, শ্রীজাহ্নবী দেবীর মন্ত্রশিষ্য বলিয়া, “গোন্বামী” পদবীতেভূষিত হইয়াছিলেন। সেই কারণ, তাঁহার জ্ঞাতিগণ আজিও “গোস্বামী” উপাধিতে অতিহিত। জ্ঞানদাস সুপুরুষ ও সুরসিক ছিলেন। তাঁহার জন্মভূমি কাঁদড়া গ্রামে তাঁহার নামে অদ্যাপিও এক মঠ বর্ত্তমান আছে। আজিও প্রভিবৎসর পৌষ পূর্নিমায় সেই মঠে তিনদিবস ব্যাপী এক মেলা হয়, এবং তাহাতে বহু লোকের সমাগম হইয়া থাকে।
বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের অনুকরণে অনেক বৈষ্ণব কবি পদাবলী রচনা করিয়া গিয়াছেন ; কিন্তু জ্ঞানদাস তন্মধ্যে প্রধানস্থানীয়। তাঁহার পদাবলীতে কবিত্ব ভাব জীবন্ত পরিস্ফুট। তাঁহার রচিত “ষোড়শ গোপালরূপ বর্ণনা” অতুলনীয়।”
.
বিমানবিহারী মজুমদারের গ্রন্থে জ্ঞানদাসের জীবনী - ^^ উপরে ফেরত
১৩২৭ বঙ্গাব্দে (১৯২০ সালে) প্রকাশিত, শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্ন, সংকলিত ও সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন, “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”, গ্রন্থের কবির পরিচয়, ১-পৃষ্ঠায় এইভাবে দেওয়া রয়েছে . . .
“নিত্যানন্দ-শাখা বর্ণনায় কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (১।১১ ) জ্ঞানদাসের নাম উল্লেখ করিয়াছেন---
পীতান্বর মাধবাচার্য্য দাস দামোদর।
শঙ্কর মুকুন্দ জ্ঞানদাস মনোহর॥
এখানে অবশ্য জ্ঞানদাসের কবিত্ব সম্বন্ধে কোন কথাই বলা হয় নাই। কিন্তু জয়ানন্দ গৌরীদাস পণ্ডিতের "কবিত্ব সুশ্রেণীর” এবং পরমানন্দ গুপ্তের গৌরাঙ্গ বিজয় গীতের কথা উল্লেখ করিলেও, কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁহাদের নাম নিত্যানন্দ শাখার বর্ণনা করিবার সময় তাঁহাদের কবিত্বশক্তি সম্বন্ধে নীরব রহিয়াছেন। কানুঠাকুর ও রামানন্দ বসু প্রসঙ্গেও তিনি তাঁহাদিগকে কবি বলেন নাই। সুতরাং এক্ষেত্রে জ্ঞানদাস বলিতে কবি জ্ঞানদাসই লক্ষিত হইতেছেন।
"ভক্তিরত্নাকর” প্রণেতা নরহরি চক্রবর্তীর একটি পদে জ্ঞানদাসের বন্দনা পাওয়া যায়। তিনি লিখিয়াছেন---
.
জ্ঞানদাস ও মঙ্গল ঠাকুর কি একই ব্যক্তি? - ^^ উপরে ফেরত
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় খুব দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর এবং শ্রীশ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, ১৯৫৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত “জ্ঞানদাসের পদাবলী” সংকলনের ভূমিকার শুরুতেই লিখেছেন . . .
“রাঢ়দেশে কান্দরা নামেতে গ্রাম হয়।
যথায় মঙ্গল জ্ঞানদাসের আলয়॥
ভক্তিরত্বাকরের এই দুই ছত্র কবিতা লইয়া বাঙ্গালা-সাহিত্যে বহু গবেষণা হইয়া গিয়াছে। অনেকেই বলিয়াছেন, মঙ্গল জ্ঞানদাসেরই অপর নাম। কারণ ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কেহ বলিয়াছেন, “জ্ঞানদাস দেখিতে অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন তাই লোকে তাহাকে মঙ্গল বলিত।” আবার অন্য জনে বলিয়াছেন, “জ্ঞানদাস ভুবনমঙ্গল হরিনাম বিতরণ করিতেন, এইজন্যই সকলে তাঁহাকে মঙ্গল জ্ঞানদাস বলিয়া ডাকিত।'' দেহসৌষ্ঠব এবং হরিনাম বিতরণের জন্য মঙ্গল উপাধি প্রাপ্য হইলে সে কালের বৈষ্ণবগণের প্রায় সকলেই তাহা পাইতেন। এ কথাটা কেহ ভাবিয়া দেখেন নাই। এখনো কাহারো কাহারো বিশ্বাস মঙ্গল এবং জ্ঞানদাস একই ব্যক্তির নাম।
মঙ্গল একজন স্বনামধন্য ভক্ত এবং জ্ঞানদাস একজন সুবিখ্যাত পদকর্তা, দুইজন পৃথক ব্যক্তি। দুইজনই কান্দারার অধিবাসী। মঙ্গল ঠাকুর শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের অন্তরঙ্গ পার্ষদ শ্রীল গদাধর পণ্ডিতের শিষ্য। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে গদাধর শাখা গণনায় ইঁহার নাম আছে--- “যদু গাঙ্গুলী আর মঙ্গল বৈষ্ণব।” বৈষ্ণব-সাহিত্যে মঙ্গল ঠাকুর মঙ্গল বৈষ্ণব নামে পরিচিত। কান্দরায় ইঁহার বংশধরগণ বর্ত্তমান রহিয়াছেন।”
এই অংশ সহ এর পরের এই মঙ্গল বা মঙ্গল ঠাকুরকে নিয়ে আরও বিস্তারিত বিবরণ যা এই গ্রন্থে জ্ঞানদাসের জীবনীর অংশ হিসেবে দেওয়া রয়েছে, আমরা নীচে লেখা জ্ঞানদাসের জীবনীতে তুলে দিয়েছি, পাঠকের জন্য।
.
নসির মামুদের বিখ্যাত পদটি কি জ্ঞানদাসের লেখা? - ^^ উপরে ফেরত
চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা তাঁর সারা জীবন ধরে, আনুমানিক ১৮৮০ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত ও সংকলিত এবং তাঁর মৃত্যুর প্রায় ৫০ বছর পরে তাঁর পুত্র রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা ১৯২২ সালে প্রকাশিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন "শ্রীশ্রীপদামৃতসিন্ধু" এর ২৮ পৃষ্ঠায় দেওয়া “কানাই ধেনু সঙ্গে গোঠে রঙ্গে” পদটি র এই প্রথম কলিটি ছাড়া বাকি সমস্ত পদটিই, অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে প্রকাশিত, বৈষ্ণবদাস সংকলিত “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু” গ্রন্থের পদকর্তা নসির মামুদ-এর বিখ্যাত পদ "চলত রাম সুন্দর শ্যাম" এর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। শেষে ভণিতায় নসির মামুদ-এর বদলে জ্ঞানদাস দেওয়া রয়েছে। পদটি নীচের পদাবলীর পাতায় দেওয়া রয়েছে।
আমরা এই পদটি সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম।
.
নরহরি চক্রবর্তী প্রণীত ভক্তিরত্নাকর গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
৪২৬ চৈতন্যাব্দে ( ১৯১২ সালে) বহরমপুর থেকে প্রকাশিত, শ্রীরাসবিহারিসাঙ্খ্যতীর্থ দ্বারা সংশোধিত, শ্রী রামদেবমিশ্র দ্বারা প্রকাশিত নরহরি চক্রবর্তী প্রণীত ভক্তিরত্নাকর (১৬৯৪ সালের পরে রচিত) গ্রন্থের, ২য় সংস্করণের, দশম তরঙ্গের ৬৫৫-পৃষ্ঠায়, ফাল্গুণ পূর্ণিমায় খেতরি উৎসবের বর্ণনায় (১৫৮১ খৃঃ) জ্ঞানদাস ও তাঁর বন্ধু মনোহর দাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। . . .
বিদায় হইয়া চলে খেতরি হইতে।
থেতরি গ্রামের লোক ধায় চারিভিতে॥
পরস্পর কহে কত করিয়া ক্রন্দন।
দেখি সে সবারে স্থির নহে কুন জন॥
শ্রীনিবাসাচার্য্য ধৈর্য্য ধরিতে না পারে।
নরোত্তম রামচন্দ্র স্থির হৈতে নারে॥
শ্যামানন্দাদির চিত্তে খেদ অতিশয়।
গণসহু সন্তোষের, ব্যাকুলহৃদয়॥
কহিতে কি শ্রীমহান্তগণের গমনে।
ব্যাপিল দারুণ দুঃখ পণ্ড পক্ষিগণে॥
পদ্মাবতীতীরে মহালোক ভীড় হৈল।
শ্রীমহান্তগণ শীঘ্র নৌকায় চঢ়িল॥
হইয়া ব্যাকুল পদ্মাবতী পার হৈলা।
বুধরিগ্রামেতে রহি প্রাতে যাত্রা কৈলা॥
আচার্য্যাদি সবে পদ্মাবতীতীর হৈতে।
আইলেন শ্রীজাহ্নবী ঈশ্বরী গ্রামেতে॥
যদ্যপি ঈশ্বরী অতি অধৈর্য্য অন্তরে।
তথাপি প্রবোধি স্থির করিল সবারে॥
করিবেন বৃন্দাবন গমন ত্বরায়।
তাহা জানাইতে সবে ব্যাকুল হিয়ায়॥
পুন কত যত্নে প্রবোধিলা সর্বজনে।
যাত্রা স্থির কৈলা বৃন্দাবনের গমনে॥
শ্রীসন্তোষদত্ত যত্বে নানা দ্রব্য দিলা।
তারে অনুগ্রহ করি গ্রহণ করিলা॥
গৌরাঙ্গ বল্লবীকাস্ত আদি প্রভুগণে।
না জানি প্রণমি কি কহিলা সঙ্গোপনে॥
প্রভু আগে বিদায় হইয়া যাত্রা করে।
সঙ্গে ভাগবতগণ অধৈর্য্য অন্তরে॥
কৃষ্ণদাস সরখেল মাধব আচার্য্য।
মুরারি চৈতন্য কৃষ্ণদাস বিপ্রবর্ষ্য॥
নৃসিংহ চৈতন্য বলরাম মহীধর।
কানাই নকড়িদাস গৌরাঙ্গসুন্দর॥
শ্রীপরমেশ্বরীদাস দাস দামোদর।
রঘুপতি বৈদ্য উপাধ্যায় মনোহর॥
জ্ঞানদাস মুকুন্দাদি ভাগবত যত।
এ সবার প্রভাব বর্ণিবে কেবা কত॥
প্রীনিবাসাচার্য্য নরোত্তমাদি-বিচ্ছেদে।
ধরিতে না পারে হিয়া বিদরয়ে খেদে॥
কে বুঝিতে পারে প্রেম-চেষ্টা যে প্রকার।
বিদায় হইলা যৈছে নারি বর্ণিবার॥
গণসহ ঈশ্বরীর গমনসময়ে।
গোবিন্দাদি সঙ্গে চলে আচার্য্য আজ্ঞায়ে॥
খেতরি হইতে চলিলেন ধৈর্য্য ধরি।
শীঘ্র আসিবেন জানাইলেন ঈশ্বরী॥
শ্রীনিবাস আচার্য্যাদিপ্রভুর ইচ্ছায়।
ধৈর্য্যাবলম্বন করি আইলা বাসায়॥
ভক্তিরত্নাকর গ্রন্থের, ২য় সংস্করণের, চতুর্দ্দশ তরঙ্গের ১০৪৬-পৃষ্ঠায়ও আমরা জ্ঞানদাসের উল্লেখ পাই।
রাঢ়দেশে কাঁদরা নামেতে গ্রাম হয়।
তথা শ্রীমঙ্গল জ্ঞানদাসের আলয়॥
.
কৃষ্ণদাস কবিরাজের “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী দ্বারা ১৫৮১ খৃষ্টাব্দে বিরচিত, জগদীশ্বর গুপ্তর টীকা ও ব্যখ্যা সহ ১২৯৬ বঙ্গাব্দে (১৮৮৯খৃষ্টাব্দে) প্রকাশিত “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থের আদি লীলার একাদশ পরিচ্ছেদে, নিত্যানন্দ স্কন্ধ শাখা বর্ণন-এর ২৯৫-পৃষ্ঠায় জ্ঞানদাস ও তাঁর বন্ধু মনোহর দাস-র উল্লেখ রয়েছে এইভাবে...
পিতাম্বর, মাধবাচার্য্য, দাস দামোদর ;
শঙ্কর, মুকুন্দ, জ্ঞান দাস মনোহর।
সুতরাং কবি জ্ঞানদাস ছিলেন শ্রীশ্রীনিত্যানন্দ শাখা ভুক্ত।
.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচনা গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করা ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত, “আলোচনা” গ্রন্থে “বৈষ্ণব কবির গান” এ “জ্ঞানদাসের গান” অংশটি আমরা তুলে দিলাম। আমরা পেয়েছি বিশ্বভারতী থেকে ১৯৯১ সালে (চৈত্র ১৩৯৮) প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলী ১৫শ খণ্ডের ৪৮-পৃষ্ঠা থেকে . . .
“জ্ঞানদাসের গান
পূর্ব্বেই বলিয়াছি, সৌন্দর্য্য পৃথিবীতে স্বর্গের বার্ত্তা আনিতেছে। যে বধির, ক্রমশ তাহার বধিরতা দূর হইতেছে। বৈষ্ণব জ্ঞানদাসের একটি গান পাইয়াছি, তাহাই ভাল করিয়া বুঝিতে গিয়া আমার এত কথা মনে পড়িল। --
মুরলী করাও উপদেশ।
যে রন্ধ্রে যে ধ্বনি উঠে জানহ বিশেষ॥
কোন্ রন্ধ্রে বাজে বাঁশী অতি অনুপাম।
কোন্ রন্ধ্রে রাধা ব'লে ডাকে আমার নাম॥
কোন্ রন্ধ্রে বাজে বাঁশী সুললিতধ্বনি।
কোন্ রন্ধ্রে কেকা শব্দে নাচে ময়ূরিণী॥
কোন্ রন্ধ্রে রসালে ফুটয়ে পারিজাত।
কোন্ রন্ধ্রে কদম্ব ফুটে হে প্রাণনাথ॥
কোন্ রন্ধ্রে ষড় ঋতু হয় এককালে।
কোন্ রন্ধ্রে নিধুবন হয় ফুলে ফলে॥
কোন্ রন্ধ্রে কোকিল পঞ্চম স্বরে গায়।
একে একে শিখাইয়া দেহ শ্যামরায়॥
জ্ঞানদাস কহে হাসি।
"রাধে মোর" বোল বাজিবেক বাঁশী॥”
ইনটারনেটের এই দুইটি ওয়েসসাইটেও পাঠক তা পড়তে পারবেন।
https://rabindra-rachanabali.nltr.org/print/15239
https://tagoreweb.in/Others/alochona-174/boishnob-kabir-gan-2025
.
রমণিমোহন মল্লিকের জ্ঞানদাস গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
শ্রী রমণিমোহন মল্লিক তাঁর ১৩০২ সালে (১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে) সম্পাদিত, “জ্ঞানদাস” গ্রন্থে, কবির জীবনীতে লিখেছেন . . . “জেলা বীরভূমের অন্তর্গত, ইন্দ্রাণী নামে যে দেশ আছে, যে দেশে মহাভারত রচয়িতা মহাত্মা কাশীরাম দাস বাস করিতেন, যে স্থানের ৪ ক্রোশ পূর্ব্বে একচক্রা নগর যেখানে শ্রীশ্রীহারাই পণ্ডিতের আলয়ে শ্রীনিত্যানন্দ মহাপ্রভু জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন সেই নগরের পশ্চিমে দুই ক্রোশ দূরে কাঁদড়া গ্রামে বিপ্র কুলে মঙ্গল বংশে জ্ঞানদাস জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। ভক্তিরত্বাকর গ্রন্থে তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় :---
*রাঢ় দেশে কাঁদড়া গ্রামেতে নাম হয়।
তথায় বসতি জ্ঞানদাসের আলয়॥”
বর্ধমান ও বীরভূমে অদ্যাপি "মঙ্গল ব্রাহ্মণ” নামে এক সম্প্রদায় ব্রাহ্মণ বাস করেন। জ্ঞানদাস মঙ্গল বংশে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহাকে কেহ মঙ্গল ঠাকুর কেহ শ্রীমঙ্গল এবং কেহবা মদন মঙ্গল বলিয়া সম্বোধন করিতেন। জ্ঞানদাস শ্রীনিত্যানন্দ মহাপ্রভুর শাখাভুক্ত।
জ্ঞানদাস শ্রীনিত্যানন্দ পত্নী শ্রীজাহ্নবা দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করিয়া বৈরাগ্য ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁহার জ্ঞাতি বর্গও শ্রীজাহ্নবা দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করিয়া গোস্বামী পদে অভিহিত হুইয়াছিলেন। কাঁদড়ায় জ্ঞানদাসের মঠ অদ্যপি বিদ্যমান রহিয়াছে। প্রতি বৎসর পৌষ পূর্ণিমায় সেখানে জ্ঞানদাসের দিবসিক উপলক্ষ মহোৎসব হয় এবং তিন দিন মেলা হয়।
হুগলী জেলার অধীন বদনগঞ্জে বাবা আউল মনোহর দাস নামক এক জন পরম ভক্ত ছিলেন। তিনি প্রায় তিন শত বৎসর জীবিত ছিলেন। সারাবলী গ্রন্থে প্রমাণ পাওয়া যায় :---
“আদি নাম মনোহর, চৈতন্য নাম শেষ।
আউলিয়া হইয়া বুলে, স্বদেশ বিদেশ॥"
মনোহর দাস একজন সুবিখ্যাত কবি ও পণ্ডিত ছিলেন। তিনি অনেক বৈষ্ণব গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়াছিলেন। তাঁহার গ্রন্থ সকল বদনগঞ্জ নিবাসী মহাপ্রভু শ্রীনিত্যানন্দের পরিকর উদ্ধারণ দত্তের বংশাবতংস শ্রীযুক্ত হারাধন দত্ত ভক্তি নিধি মহাশয়ের পুস্তকাগারে শোভা পাইতেছে। নির্য্যাসতত্ত্ব এবং পদ সমুদ্র বাবা মনোহর দাস-এর সংগৃহীত। পদসমুদ্র গ্রন্থখানি অদ্যাপি মুদ্রিত হয় নাই। ইহাতে ১৫০০০ পদ আছে।
বাবা আউল কোন কুলে কোন স্থানে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা জানিতে পারা যায় নাা। তিনি সখীভাবে শ্রীরাধাকৃষ্ণের ভজন সাধন করিতেন। তিনি ঘাঘরা পরিতেন, কাঁচলি বক্ষে আঁটিতেন, সীঁথায় সিন্দুর পরিতেন। নিজে পদ রচনা করিয়া আক্ষেপ করিয়া মুরলীকে সম্বোধন করিয়া বলিতেন :---
“শ্যামের মুরলী, হৃদয় খুবলী, করিলি সকল নাশ।
* * * * * *
যাহার যে রীতি, না ছাড়ে কখন, কহে মনোহর দাস॥” ---- পদ সমুদ্র ১৪০৪৩
অদ্যাপি বদনগঞ্জে বাবা আউলের সমাধি আছে।
মনোহর দাস জ্ঞানদাসের বন্ধু ছিলেন। উভয়ে সর্বদা একত্রে থাকিতেন। উভয়েই শ্রীজাহ্নবার শিষ্য ছিলেন। কোন স্থানে আহ্বান হইলে উভয়েই একত্রে গমন করিতেন। খেতুরীর মহোৎসবে উভয়েই একত্রে গমন করিয়াছিলেন।
“শ্রীল রঘুপতি, উপাধ্যায় মহিধর।
মুরারী, মুকুন্দ, জ্ঞানদাস, মনোহর ॥” ----“নরোত্তম বিলাস।”
খেতুরী হইতে শ্রীজাহ্নবা দেবীর সহিত জ্ঞানদাস শ্রীবৃন্দাবনে গমন করিয়া ছিলেন এবং শ্রীজীব গোস্বামী তথায় ইহাদিগকে অভ্যর্থনা করিয়াছিলেন। জ্ঞানদাস দার পরিগ্রহ করেন নাই। তাঁহার পিতা মাতার নাম জানিতে পারা যায় না। তাঁহার জন্ম এবং মৃত্যুর সন তারিখও পাওয়া যায় না। ১৬০০ শকে বাবা আউল মনোহর গুপ্ত হন সুতরাং তাহার পূর্বে জ্ঞানদাস জীবিত ছিলেন স্থির করিয়া লইতে হুইবে। গোবিন্দ দাস জ্ঞানদাসের পরবর্ত্তী কবি।”
.
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য" গ্রন্থে - ^^ উপরে ফেরত
রায়বাহাদুর ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন-এর “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য" গ্রন্থের ৫ম সংস্করণে ১৯২৭ (১ম সংস্করণ ১৮৯৬) জ্ঞানদাসের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। ৫ম সংস্করণটি আমাদের সংগ্রহে না থাকায়, আমরা তাঁর ৬ষ্ঠ সংস্করণ, চরিত-শাখা, ২৮৯-পৃষ্ঠায় লিখেছেন --- “জ্ঞানদাস সম্বন্ধে অতি অল্প বিবরণই পাওয়া যায় ; বীরভূম জেলার অকচক্রাগ্রামে (মল্লারপুর ষ্টেশনের নিকট) নিত্যানন্দ প্রভুর পিতৃগৃহ ছিল ; সিউড়ীর বিশ ক্রোশ পূর্ব্বে ও বর্দ্ধমান জেলার অন্তর্গত কাটোয়ার ১০ মাইল পশ্চিমে কাঁদড়া গ্রাম। তথায় ব্রাহ্মণ বংশে ১৫৩০ খৃঃ অব্দে জ্ঞানদাস জন্ম গ্রহণ করেন ; ইনি নিত্যানন্দশাখাভুক্ত ; খেতুরীর উৎসবে ইনি উপস্থিত ছিলেন দেখা যায়, শুতরাং ইনি গোবিন্দদাস, বলরামদাস প্রভৃতির সমকালিন কবি। কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাসের একটি মঠ এখনও আছে ; পৌষ মাসের পূর্ণিমায় সেখানে প্রতি বৎসর মহোৎসব এবং সেই সঙ্গে তিন দিন ব্যাপিয়া মেলা হয়।”
.
হরিমোহন মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯০০ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, হরিমোহন মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “সঙ্গীত-সার-গ্রন্থ”, ১ম খণ্ডে জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“বর্দ্ধমানের অন্তঃপাতি কাঁদরা গ্রামে জ্ঞানদাসের জন্ম। জ্ঞানদাসের মঠ এখনও কাঁদরা গ্রামে আছে। মনোহর দাস ১৬০০ শকে প্রাদুর্ভূত হন। জ্ঞানদাস মনোহর দাস-এর বন্ধু ; সর্ব্বদা উভয়ে একত্র থাকিতেন। সুতরাং জ্ঞানদাসেরও আবির্ভাব-কাল ১৬০০ শক।”
.
জগবন্ধু ভদ্রর “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী” তে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯০২ সালে শ্রীজগবন্ধু ভদ্র সম্পাদিত ও সংকলিত শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী সংকলনের ১৩৪১ বঙ্গাব্দে (১৯৩৪) সালে শ্রীমৃণালকান্তি ঘোষ ভক্তিভূষণ দ্বারা সম্পাদিত সংস্করণের পদকর্ত্তৃগণের পরিচয়, ১৮২-পৃষ্ঠায় জ্ঞানদাসের সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“বীরভূম জেলায় একচক্রা গ্রামের দুই ক্রোশ পশ্চিমে কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাস ঠাকুর বাস করিতেন। কোন্ শকে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, তৎসন্বন্ধে বিভিন্ন মত আছে। ন্বর্গীয় ক্ষীরোদচন্দ্র রায়ের মতে গোবিন্দ কবিরাজ ও জ্ঞানদাস ১৪৪৭ শকে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু হারাধন দত্ত বলিয়াছেন, গোবিন্দ কবিরাজের জন্ম ১৪৫৯ শকে, এবং জ্ঞানদাস তাহার কিঞ্চিৎ পূর্ববর্তী। আবার জগবন্ধুবাবু অনুমান করেন, ১৪৫৩ শকে জ্ঞানদাসের জন্ম। কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাসের মঠ অদ্যপি বর্তমান আছে। এখানে প্রতি বৎসর পৌষ-পূর্ণিমায় জ্ঞানদাসের স্মরণার্থে তিনদিনব্যাপী মহোৎসব ও মেলা হয়। চৈতন্যচরিতামৃতে নিত্যানন্দের শাখা-বর্ণনায় জ্ঞানদাসের নাম আছে। যথা---*শঙ্কর, মুকুন্দ, জ্ঞানদাস মনোহর।” আবার ভক্তিরত্বাকরে তাঁহাকে “মঙ্গল জ্ঞানদাস” বলা হইয়াছে। ইহাতে কেহ কেহ অনুমান করেন, “মঙ্গল” ও “মনোহর” জ্ঞানদাসের দুইটা উপাধি মাত্র। কিন্ত উহা জ্ঞানদাসের উপাধি, কি তাঁহার নামান্তর, কি স্বতন্ত্র ব্যক্তির নাম, তাহা নির্ণয় করা সুকঠিন। তবে জ্ঞানদাস যে মঙ্গল-বংশীয় রাঢ়ীশ্রেণীর ব্রাহ্মণ, তাহা জানা গিয়াছে। হুগলী ও বাঁকুড়া জেলায় মঙ্গলবংশীয় বহু ব্রাহ্মণ বাস করিতেছেন। হারাধন দত্ত মহাশয় বলিয়াছেন, বাবা আউল মনোহর দাস, জ্ঞানদাসের চিরসহচর ও সতীর্থ ছিলেন। অনেক সময় উভয়ে একত্র থাকিতেন। খেতরী মহোৎসবে জ্ঞানদাস ও মনোহরদাস, নিত্যানন্দের গণসহ গমন করেন। যথা নরোত্তম-বিলাসে--"শ্রীল রঘূপতি উপাধ্যায় মহীধর। মুরারি, মুকুন্দ, জ্ঞানদাস, মনোহর॥”
কিন্তু এখানে “মনোহর” যে “আউল মনোহর দাস”, তাহার প্রমাণ কোথায়? জ্ঞানদাস অল্প বয়সে নিত্যানন্দ-পত্নী জাহ্নবা দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ এবং কৌমারে বৈরাগ্য অবলম্বন করেন বলিয়া কথিত আছে। জ্ঞানদাসকে সাধারণ লোকে “গোস্বামী” বলিয়া ডাকিত। ইহা হইতে তাঁহার জ্ঞাতিবর্গ আপনাদের নামের শেষে “গোস্বামী" শব্দ ব্যবহার করিয়া আসিতেছেন। নরহরি দাস-ভণিতাযুক্ত “শ্রীবীরভূমেতে ধাম, কাঁদড়া মাঁদড়া গ্রাম, তথায় জন্মিলা জানদাস।” এই পদটা গৌরপদতরঙ্গিণীতে সংগৃহীত হইয়াছে। কিন্তু এই নরহরি দাস কে? ঘনশ্যাম-নরহরি চক্রবর্ত্তীর “ভক্তিরত্বাকর" গ্রন্থে এ পদটী নাই। সুতরাং ইহা তাঁহার রচিত কি না, বলা যায় না।
সতীশবাবু বলেন, “জ্ঞানদাসের কয়েকটা উৎকৃষ্ট বাঙ্গালা পদ রমণীবাবুর ও বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের চণ্ডীদাসের সংস্করণে, চণ্ডীদাসের নামে উদ্ধৃত হইয়াছে। জ্ঞানদাসের গভীর ভাবপূর্ণ সরল ও আবেগময় বাঙ্গালা পদের সহিত চণ্ডীদাসের ভণিতাযুক্ত উৎকৃষ্ট বাঙ্গালা পদগুলির ভাষাগত ও ভাবগত আশ্চর্য্য সাদৃশ্য দেখা যায়। কীর্ত্তন-গায়ক ও লিপিকরদিগের ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত গোলযোগের. ফলে জ্ঞানদাসের অনেক উতকৃষ্ট বাঙ্গালা পদ অসঙ্গতভাবে চণ্ডীদাসের নামে চলিয়া গিয়াছে, এরূপ অনুমান করার যে যথেষ্ট কারণ আছে, ভাহা আমরা “চণ্ডীদাস” প্রসঙ্গে আলোচন করিয়াছি। পদকল্পতরু পুথির সঙ্কলন-কালে, অর্থাৎ আন্দাজ দুই শত বৎসরের কিছু পূর্ব্বেই, এই ভণিতার গোলযোগ সংঘটিত হইয়াছে। সুতরাং অন্যূন আড়াই শত কি তিন শত বৎসরের পুরাতন পদাবলীর পুথি যদিও উহা এখন নিতান্ত বিরল--- সহত্নে সংগ্রহ করিয়া সতর্কভাবে মিলাইয়া দেখিলে, বর্ত্তমান চণ্ডীদাসের নামে প্রচারিত অনেক উৎকৃষ্ট বাঙ্গালা পদ জানদাসের রচিত বলিয়া প্রমাণিত হইতে পারিবে বলিয়া আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।”
জ্ঞানদাসের ১৮৬টি বাঙ্গালা ও ব্রজবুলীর পদ “পদকল্পতরু” গ্রন্থে সংগৃহীত হইয়াছে স্বর্গত রমণীমোহন মল্লিক মহাশয়ের সম্পাধিত 'জ্ঞানদাসের পদাবলী' গ্রন্থে উহার অতিরিক্ত আরও কতকগুলি পদ নানা প্রাচীন পুথি হইতে সঙ্কলিত হইয়াছে। সতীশবাবুর “অপ্রকাশিত পদ-রত্বাবলী” গ্রন্থে রমণীবাবুর সংস্করণের অতিরিক্ত আরও পঞ্চাশটি পদ “পদ-রসসার”, “পদ-রত্বাকর” প্রভৃতি প্রাচীন পুথি হইতে সংগৃহীত হইয়া প্রকাশিত হইয়াছে। আমাদের বিশ্বাস, অনুসন্ধান করিলে জ্ঞানদাসের এরূপ আরও অনেক পদ আবিষ্কৃত হইতে পারে।”
.
দুর্গাদাস লাহিড়ীর “বৈষ্ণব-পদলহরী” তে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত ও সংকলিত “বৈষ্ণব-পদলহরী” গ্রন্থে জ্ঞানদাসের জীবনী নিয়ে তিনি লিখেছেন . . .
“কবি জ্ঞানদাস একজন সুবিখ্যাত বৈষ্ণব-পদকর্ত্তা। বীরভূম জেলায় ইন্দ্রাণী থানার অন্তর্গত কাঁদড়া গ্রামে ব্রাহ্মণকুলে মঙ্গল-বংশে ইহাঁর জন্ম হয়। মঙ্গলবংশে জন্ম হেতু “মঙ্গল ঠাকুর”, “শ্রীমঙ্গল” ও “মদন মঙ্গল” প্রভৃতি আখ্যায় ইনি অভিহিত। জ্ঞানদাসের সময় নির্ণয় সম্বন্ধে মতদ্বৈধ দৃষ্ট হয়। জ্ঞান দাস,---মনোহর দাস বা বাবা আউলের সমসাময়িক। উভয়েই শ্রীনিত্যানন্দপত্নী শ্রীজাহ্নবীদেবীর মন্ত্রশিষ্য ছিলেন, উভয়েই একত্র থাকিতেন। এবং উভয়েই মহোৎসবে নিমন্ত্রিত হইয়া একত্র গমন করিতেন, --- এরুপ প্রমাণ পাওয়া যায়। সে হিসাবে উভয়েই বঙ্গীয় একাদশ শতাব্দীতে (১৬০০ শকে) বিদ্যমান ছিলেন। কেহ কেহ আবার অনুমান করেন, জ্ঞানদাস ১৪৫৩ শকাব্দে (৯৩৮ সালে) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহাদের মতে বাবা আউল তিন শত বৎসর জীবিত ছিলেন, এবং তিনি ১৬০০ শকে “মনোহর দাস” নাম গ্রহণ করেন ; এবং তাঁহার এই নাম গ্রহণের বহু পরে জ্ঞানদাসের জন্ম হয়। জানদাস দারপরিগ্রহ করেন নাই। শ্রীজাহ্নবীদেবীর সহিত তিনি শ্রীবৃন্দাবনাদির তীর্থ ভ্রমণ করেন। জ্ঞানদাসের জ্ঞাতিগণ এখনও বাঁকুড়া জেলার কোতলপুর গ্রামে বাস করিতেছেন। জ্ঞানদাস, শ্রীজাহ্নবী দেবীর মন্ত্রশিষ্য বলিয়া, “গোন্বামী” পদবীতেভূষিত হইয়াছিলেন। সেই কারণ, তাঁহার জ্ঞাতিগণ আজিও “গোস্বামী” উপাধিতে অতিহিত। জ্ঞানদাস সুপুরুষ ও সুরসিক ছিলেন। তাঁহার জন্মভূমি কাঁদড়া গ্রামে তাঁহার নামে অদ্যাপিও এক মঠ বর্ত্তমান আছে। আজিও প্রভিবৎসর পৌষ পূর্নিমায় সেই মঠে তিনদিবস ব্যাপী এক মেলা হয়, এবং তাহাতে বহু লোকের সমাগম হইয়া থাকে।
বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের অনুকরণে অনেক বৈষ্ণব কবি পদাবলী রচনা করিয়া গিয়াছেন ; কিন্তু জ্ঞানদাস তন্মধ্যে প্রধানস্থানীয়। তাঁহার পদাবলীতে কবিত্ব ভাব জীবন্ত পরিস্ফুট। তাঁহার রচিত “ষোড়শ গোপালরূপ বর্ণনা” অতুলনীয়।”
.
বিমানবিহারী মজুমদারের গ্রন্থে জ্ঞানদাসের জীবনী - ^^ উপরে ফেরত
১৩২৭ বঙ্গাব্দে (১৯২০ সালে) প্রকাশিত, শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্ন, সংকলিত ও সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন, “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”, গ্রন্থের কবির পরিচয়, ১-পৃষ্ঠায় এইভাবে দেওয়া রয়েছে . . .
“নিত্যানন্দ-শাখা বর্ণনায় কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (১।১১ ) জ্ঞানদাসের নাম উল্লেখ করিয়াছেন---
পীতান্বর মাধবাচার্য্য দাস দামোদর।
শঙ্কর মুকুন্দ জ্ঞানদাস মনোহর॥
এখানে অবশ্য জ্ঞানদাসের কবিত্ব সম্বন্ধে কোন কথাই বলা হয় নাই। কিন্তু জয়ানন্দ গৌরীদাস পণ্ডিতের "কবিত্ব সুশ্রেণীর” এবং পরমানন্দ গুপ্তের গৌরাঙ্গ বিজয় গীতের কথা উল্লেখ করিলেও, কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁহাদের নাম নিত্যানন্দ শাখার বর্ণনা করিবার সময় তাঁহাদের কবিত্বশক্তি সম্বন্ধে নীরব রহিয়াছেন। কানুঠাকুর ও রামানন্দ বসু প্রসঙ্গেও তিনি তাঁহাদিগকে কবি বলেন নাই। সুতরাং এক্ষেত্রে জ্ঞানদাস বলিতে কবি জ্ঞানদাসই লক্ষিত হইতেছেন।
"ভক্তিরত্নাকর” প্রণেতা নরহরি চক্রবর্তীর একটি পদে জ্ঞানদাসের বন্দনা পাওয়া যায়। তিনি লিখিয়াছেন---
শ্রীবীরভূমেতে ধাম কাঁদড়া মাঁদড়া গ্রাম
তথায় জন্মিলা জ্ঞানদাস।
আকুমার বৈরাগ্যেতে রত বাল্যকাল হৈতে
দীক্ষা লৈলা জাহ্ণবার পাশ॥
অদ্যাপি কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাস কবি নামে
পূর্ণিমায় হয় মহামেলা।
তিনদিন মহোত্সব আসেন মহান্ত সব
হয় তাঁহাদের লীলাখেলা॥
"মদনমঙ্গল” নাম রূপে গুণে অনুপাম
আর এক উপাধি মনোহর।
খেতুরীর মহোত্সবে জ্ঞানদাস গেলা যবে
বাবা আউল ছিল সহচর॥
কবিকুলে যেন রবি চণ্ডীদাস তুল্য কবি
জ্ঞানদাস বিদিত ভূবনে।
যার পদ সুধাসার যেন অমৃতের ধার
নরহরি দাস ইহা ভণে॥
--- (গৌরপদতরঙ্গিণী, ১ম সং, পৃঃ ৪৭০)
তথায় জন্মিলা জ্ঞানদাস।
আকুমার বৈরাগ্যেতে রত বাল্যকাল হৈতে
দীক্ষা লৈলা জাহ্ণবার পাশ॥
অদ্যাপি কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাস কবি নামে
পূর্ণিমায় হয় মহামেলা।
তিনদিন মহোত্সব আসেন মহান্ত সব
হয় তাঁহাদের লীলাখেলা॥
"মদনমঙ্গল” নাম রূপে গুণে অনুপাম
আর এক উপাধি মনোহর।
খেতুরীর মহোত্সবে জ্ঞানদাস গেলা যবে
বাবা আউল ছিল সহচর॥
কবিকুলে যেন রবি চণ্ডীদাস তুল্য কবি
জ্ঞানদাস বিদিত ভূবনে।
যার পদ সুধাসার যেন অমৃতের ধার
নরহরি দাস ইহা ভণে॥
--- (গৌরপদতরঙ্গিণী, ১ম সং, পৃঃ ৪৭০)
কাঁদরায় যে প্রবাদ শুনিয়া শ্রীযুক্ত হরেকৃষ্ণবাবু লিখিয়াছেন---
“জ্ঞানদাস বিবাহিত ছিলেন” তাহা অপেক্ষা নরহরি চক্রবর্তীর পদের প্রামাণিকতা ইতিহাসের ছাত্রের নিকট বেশী। সেইজন্য জ্ঞানদাসকে চিরকুমার বলিয়াই মানিতে হয়।
এই পদ হইতে জানা যায় যে জ্ঞানদাস নিত্যানন্দের পত্নী জাহ্নবাদেবীর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেন। এই উক্তির সহিত কৃষ্ণদাস কবিরাজের বর্ণনার গুরুতর পার্থক্য নাই। নিত্যানন্দ-শাখায় যাঁহাদের নাম করা হইয়াছে তাঁহারা সকলেই যে নিত্যানন্দের শিষ্য ছিলেন তাহা নহে। গোবিন্দ, মাধব ও বাসু ঘোষের নাম চৈতন্য-শাখাতে আছে, আবার মাধব ও বাসু ঘোষের নাম নিত্যানন্দ শাখাতেও আছে। তাঁহারা নিশ্চই দুইজনের নিকট দীক্ষা লন নাই।
জ্ঞানদাসের সঙ্গে নিত্যানন্দ প্রভুর সম্বন্ধের কথা কৃষ্ণদাস কবিরাজের শিষ্য বলিয়া কথিত মুকুন্দদাসের সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয় গ্রন্থে দেখা যায়। উদ্ধারণ দত্ত নিত্যানন্দ প্রভুর কাছে শুনিতে পান যে শ্রীচৈতন্যের আদেশে তিনি বিবাহ করিতে সম্মত হইয়াছেন। উদ্ধারণ দত্ত “নিত্যানন্দগণ সব ডাকিয়া আনিল"। ইঁহাদের মধ্যে ছিলেন গোরীদাস পণ্ডিত, জগদীশ পণ্ডিত, বড়গাছির কৃষ্ণদাস, সুন্দর ঠাকুর, বৃন্দাবন দাস, রামচন্দ্র কবিরাজ, কবিরাজ বলরাম এবং
পুরুযোত্তম দাস আর পরমেশ্বর দাস।
জ্ঞানদাস ঠাকুর আর দ্বিজ হরিদাস॥
শিশু কৃষ্ণদাস আর পণ্ডিত ধনঞ্জয়।
শুনিয়া এসব কথা আনন্দ হৃদয়।
--- (পঞ্চদশ প্রকরণ, পৃঃ ২০৮)
এই বিবরণের প্রামাণিকতা অবশ্য সকলে স্বীকার করেন না ; কেন না সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়ের প্রাচীন পুঁথিতে মাত্র ছয়টি প্রকরণ পাওয়া যায়।
নরহরি চক্রবর্তী ভক্তিরত্নাকর ও নরোত্তমবিলাসে কাটোয়ার ও খেতরির মহোৎসব বর্ণনা উপলক্ষ্যে জ্ঞানদাসের নাম উল্লেখ করিয়াছেন। যদুনন্দন চক্রবর্তী তাঁহার গুরুদেব গদাধর দাসের তিরোভাব উপলক্ষ্যে কার্ত্তিকের কৃষ্ণাষ্টমীতে কণ্টকনগরে বা কাটোয়ায় যে মহোৎসবের আয়োজন করিয়াছিলেন তাহাতে যাঁহারা উপস্থিত হইয়াছিলেন তাঁহাদের যধ্যে ৬৪ জন নেতৃস্থানীয় বৈষ্ণবের নাম নরহরি চক্রবর্তী লিখিয়াছেন। ঐ নামের তালিকায় আছে---
শ্রীমাধবাচার্য্য রাম সেন দামোদর।
জ্ঞানদাস নর্ত্তক গোপাল পীতাম্বর॥ --- (ভক্তি রত্নাকর, নবম তরঙ্গ, পৃঃ ৫৮৯)
নরোত্তমবিলাসে লিখিত আছে যে যখন নরোত্তম ঠাকুরের পক্ষ হইতে এক ব্যক্তি জাহ্নবাদেবীকে নিমন্ত্রণ করিবার জন্য খড়দহে উপস্থিত হন, তখন সেখানে নিত্যানন্দের অন্যান্য ভক্তের হধ্যে উপস্থিত ছিলেন---
শ্রীল রঘুপতি উপাধ্যায় মহীধর।
মুরারি-চৈতন্য জ্ঞানদাস মনোহর॥ --- (নরোত্তম বিলাস, ষষ্ঠ বিলাস)
ইঁহারা সকলেই জাহ্নবাদেবীর সঙ্গে খেতরি যাইবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ভক্তিরত্নাকরের দশমতরঙ্গে (পৃঃ ৫৩৩) দেখিতে পাই যে জাহ্নবাদেবীর সঙ্গে খড়দহ হইতে খেতরি অভিমুখে যাত্রা করিলেন---
শ্রীমীনকেতন রামদাস মনোহর।
মুরারি-চৈতন্য জ্ঞানদাস মহীধর॥
--- (দশম তরঙ্গ)
এই মীনকেতন রামদাসই কৃষ্ণদাস কবিরাজের ঝামাটপুরের বাড়ীতে অষ্টপ্রহর কীর্তনের দিনে উপস্থিত ছিলেন বলিয়া শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে (১।৫) লিখিত আছে। সুতরাং জ্ঞানদাসেরও সঙ্গে কৃষ্ণদাস কবিরাজের জানাশুনা ছিল বলিয়া ধরি লওয়া যাইতে পারে। নরহরি চক্রবর্তীর পিতা জগন্নাথ ছিলেন বিশ্বনাথ চতবর্তীর শিষ্য। বিশ্বনাথ চতবর্তীর ১৬০১ শকে বা ১৬৭৯ খৃষ্টাব্দে শ্রীকৃষ্ণভাবনামৃত এবং ভাগবতের সারার্থদর্শিনী টীকা ১৭০৪ খৃষ্টাব্দে সমাপ্ত করেন। সুতরাং নরহরি চক্রবর্তী অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পাদে ভক্তিরত্নাকর এবং নরোত্তমবিলাস লিখিয়াছিলেন অনুমান করা যাইতে পারে। খেতরির মহোৎসবের দেড়শত বৎসরের অধিককাল পরে নরহরি চক্রবর্তী যে বিবরণ লিখিয়াছেন তাহা কতটা সত্য বলা কঠিন। কিন্তু খেতরির মহোৎসব গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের ইতিহাসে এমনই একটি স্মরণীয় ঘটনা যে তাহাতে প্রধান প্রধান কবি ও ভক্ত কে কে উপস্থিত ছিলেন সে সম্বন্ধে কিম্বদন্তী গুরুপরম্পরাক্রমে প্রচলিত থাকা অসম্ভব নহে। নরহরি চক্রবর্তীর অনুসন্ধিৎসা আধুনিক গবেষকের চেয়ে বেশী বই কম ছিলনা একথাও মনে রাখা প্রয়োজন।
অষ্টাদশ শতাব্দীর চতুর্থপাদে বৈষ্ণবদাস বহুস্থান ভ্রমণ করিয়া ৩১০১টি পদ সংগ্রহ করেন এবং পদকল্পতরুতে সন্নিবিষ্ট করেন। উহার মঙ্গলাচরণে তিনি শ্রীচৈতন্য-নিত্যাননদ-অদ্বৈতাদির স্তব করিবার পর স্বরূপ দামোদর, রামানন্দ রায়, নরহরি সরকার, গদাধর, শ্রীনিবাস, বক্রেশ্বর, গদাধর দাস, মুকুন্দ, মুরারি গুপ্ত, হরিদাস প্রভৃতি ভক্ত কবির বন্দনা-মূলক এক পদে লিখিয়াছেন---
“জ্ঞানদাস বিবাহিত ছিলেন” তাহা অপেক্ষা নরহরি চক্রবর্তীর পদের প্রামাণিকতা ইতিহাসের ছাত্রের নিকট বেশী। সেইজন্য জ্ঞানদাসকে চিরকুমার বলিয়াই মানিতে হয়।
এই পদ হইতে জানা যায় যে জ্ঞানদাস নিত্যানন্দের পত্নী জাহ্নবাদেবীর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেন। এই উক্তির সহিত কৃষ্ণদাস কবিরাজের বর্ণনার গুরুতর পার্থক্য নাই। নিত্যানন্দ-শাখায় যাঁহাদের নাম করা হইয়াছে তাঁহারা সকলেই যে নিত্যানন্দের শিষ্য ছিলেন তাহা নহে। গোবিন্দ, মাধব ও বাসু ঘোষের নাম চৈতন্য-শাখাতে আছে, আবার মাধব ও বাসু ঘোষের নাম নিত্যানন্দ শাখাতেও আছে। তাঁহারা নিশ্চই দুইজনের নিকট দীক্ষা লন নাই।
জ্ঞানদাসের সঙ্গে নিত্যানন্দ প্রভুর সম্বন্ধের কথা কৃষ্ণদাস কবিরাজের শিষ্য বলিয়া কথিত মুকুন্দদাসের সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয় গ্রন্থে দেখা যায়। উদ্ধারণ দত্ত নিত্যানন্দ প্রভুর কাছে শুনিতে পান যে শ্রীচৈতন্যের আদেশে তিনি বিবাহ করিতে সম্মত হইয়াছেন। উদ্ধারণ দত্ত “নিত্যানন্দগণ সব ডাকিয়া আনিল"। ইঁহাদের মধ্যে ছিলেন গোরীদাস পণ্ডিত, জগদীশ পণ্ডিত, বড়গাছির কৃষ্ণদাস, সুন্দর ঠাকুর, বৃন্দাবন দাস, রামচন্দ্র কবিরাজ, কবিরাজ বলরাম এবং
পুরুযোত্তম দাস আর পরমেশ্বর দাস।
জ্ঞানদাস ঠাকুর আর দ্বিজ হরিদাস॥
শিশু কৃষ্ণদাস আর পণ্ডিত ধনঞ্জয়।
শুনিয়া এসব কথা আনন্দ হৃদয়।
--- (পঞ্চদশ প্রকরণ, পৃঃ ২০৮)
এই বিবরণের প্রামাণিকতা অবশ্য সকলে স্বীকার করেন না ; কেন না সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়ের প্রাচীন পুঁথিতে মাত্র ছয়টি প্রকরণ পাওয়া যায়।
নরহরি চক্রবর্তী ভক্তিরত্নাকর ও নরোত্তমবিলাসে কাটোয়ার ও খেতরির মহোৎসব বর্ণনা উপলক্ষ্যে জ্ঞানদাসের নাম উল্লেখ করিয়াছেন। যদুনন্দন চক্রবর্তী তাঁহার গুরুদেব গদাধর দাসের তিরোভাব উপলক্ষ্যে কার্ত্তিকের কৃষ্ণাষ্টমীতে কণ্টকনগরে বা কাটোয়ায় যে মহোৎসবের আয়োজন করিয়াছিলেন তাহাতে যাঁহারা উপস্থিত হইয়াছিলেন তাঁহাদের যধ্যে ৬৪ জন নেতৃস্থানীয় বৈষ্ণবের নাম নরহরি চক্রবর্তী লিখিয়াছেন। ঐ নামের তালিকায় আছে---
শ্রীমাধবাচার্য্য রাম সেন দামোদর।
জ্ঞানদাস নর্ত্তক গোপাল পীতাম্বর॥ --- (ভক্তি রত্নাকর, নবম তরঙ্গ, পৃঃ ৫৮৯)
নরোত্তমবিলাসে লিখিত আছে যে যখন নরোত্তম ঠাকুরের পক্ষ হইতে এক ব্যক্তি জাহ্নবাদেবীকে নিমন্ত্রণ করিবার জন্য খড়দহে উপস্থিত হন, তখন সেখানে নিত্যানন্দের অন্যান্য ভক্তের হধ্যে উপস্থিত ছিলেন---
শ্রীল রঘুপতি উপাধ্যায় মহীধর।
মুরারি-চৈতন্য জ্ঞানদাস মনোহর॥ --- (নরোত্তম বিলাস, ষষ্ঠ বিলাস)
ইঁহারা সকলেই জাহ্নবাদেবীর সঙ্গে খেতরি যাইবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ভক্তিরত্নাকরের দশমতরঙ্গে (পৃঃ ৫৩৩) দেখিতে পাই যে জাহ্নবাদেবীর সঙ্গে খড়দহ হইতে খেতরি অভিমুখে যাত্রা করিলেন---
শ্রীমীনকেতন রামদাস মনোহর।
মুরারি-চৈতন্য জ্ঞানদাস মহীধর॥
--- (দশম তরঙ্গ)
এই মীনকেতন রামদাসই কৃষ্ণদাস কবিরাজের ঝামাটপুরের বাড়ীতে অষ্টপ্রহর কীর্তনের দিনে উপস্থিত ছিলেন বলিয়া শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে (১।৫) লিখিত আছে। সুতরাং জ্ঞানদাসেরও সঙ্গে কৃষ্ণদাস কবিরাজের জানাশুনা ছিল বলিয়া ধরি লওয়া যাইতে পারে। নরহরি চক্রবর্তীর পিতা জগন্নাথ ছিলেন বিশ্বনাথ চতবর্তীর শিষ্য। বিশ্বনাথ চতবর্তীর ১৬০১ শকে বা ১৬৭৯ খৃষ্টাব্দে শ্রীকৃষ্ণভাবনামৃত এবং ভাগবতের সারার্থদর্শিনী টীকা ১৭০৪ খৃষ্টাব্দে সমাপ্ত করেন। সুতরাং নরহরি চক্রবর্তী অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পাদে ভক্তিরত্নাকর এবং নরোত্তমবিলাস লিখিয়াছিলেন অনুমান করা যাইতে পারে। খেতরির মহোৎসবের দেড়শত বৎসরের অধিককাল পরে নরহরি চক্রবর্তী যে বিবরণ লিখিয়াছেন তাহা কতটা সত্য বলা কঠিন। কিন্তু খেতরির মহোৎসব গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের ইতিহাসে এমনই একটি স্মরণীয় ঘটনা যে তাহাতে প্রধান প্রধান কবি ও ভক্ত কে কে উপস্থিত ছিলেন সে সম্বন্ধে কিম্বদন্তী গুরুপরম্পরাক্রমে প্রচলিত থাকা অসম্ভব নহে। নরহরি চক্রবর্তীর অনুসন্ধিৎসা আধুনিক গবেষকের চেয়ে বেশী বই কম ছিলনা একথাও মনে রাখা প্রয়োজন।
অষ্টাদশ শতাব্দীর চতুর্থপাদে বৈষ্ণবদাস বহুস্থান ভ্রমণ করিয়া ৩১০১টি পদ সংগ্রহ করেন এবং পদকল্পতরুতে সন্নিবিষ্ট করেন। উহার মঙ্গলাচরণে তিনি শ্রীচৈতন্য-নিত্যাননদ-অদ্বৈতাদির স্তব করিবার পর স্বরূপ দামোদর, রামানন্দ রায়, নরহরি সরকার, গদাধর, শ্রীনিবাস, বক্রেশ্বর, গদাধর দাস, মুকুন্দ, মুরারি গুপ্ত, হরিদাস প্রভৃতি ভক্ত কবির বন্দনা-মূলক এক পদে লিখিয়াছেন---
বসু রামানন্দ সেন শিবানন্দ
গোবিন্দ মাধব বাসু ঘোষ।
জয় বৃন্দাবন দাস গৌর রসে
জগ-জনে করল সন্তোষ॥
জয় জয় অনন্ত- দাস নয়নানন্দ-
জ্ঞানদাস যদুনাথ।
শ্রীরূপ সনাতন জয় জয় শ্রীজীব
ভট্ট-যুগল রঘুনাথ॥
গোবিন্দ মাধব বাসু ঘোষ।
জয় বৃন্দাবন দাস গৌর রসে
জগ-জনে করল সন্তোষ॥
জয় জয় অনন্ত- দাস নয়নানন্দ-
জ্ঞানদাস যদুনাথ।
শ্রীরূপ সনাতন জয় জয় শ্রীজীব
ভট্ট-যুগল রঘুনাথ॥
এখানে লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে রামানন্দ বসু হইতে আরম্ত করিয়া গোপাল ভট্ট, রঘুনাথ ভট্ট এধং রঘুনাথ দাস পর্য্যন্ত প্রায় প্রত্যেকেই কবি এবং শ্রীচৈতন্যের প্রায় সমসাময়িক। বৃন্দাবন দাস শ্রীচৈতন্যকে দর্শন করেন নাই। নরহরি চক্রবর্তী বলেন যে শ্রীজীব অতিশয় শিশুকালে শ্রীচৈতন্যকে দর্শন করিয়াছিলেন। জ্ঞানদাস নিজেই লিখিয়াছেন যে শ্রীগৌরাঙ্গের
লীলাকালে তাঁহার জন্ম হয় নাই---
যাহাতে ধরণী ধন্য, বিশেষে নদীয়া।
জ্ঞানদাস বড় দুঃখী তাহা না দেখিয়া॥
বৈষ্ণবদাস আর একটি পদে (পদকল্পতরু ১৮) শ্রীনিবাস আচার্য্য, নরোত্তম ঠাকুর, রামচন্দ্র কবিরাজ, গতিগোবিন্দ, গেবিন্দদাস কবিরাজ, গোবিন্দ চক্রবর্তী, ব্যাস, শ্যামাদাস, রামচরণ, রামকৃষ্ণ। কুমুদানন্দ, রূপঘটক, বীর হাম্বীর, কর্ণপূর কবিরাজ, গোকুলদাস, ভগবানদাস, গোপীরমণ, নরসিংহ, বল্লবিকান্ত, বল্লভ, যদুনন্দনদাস, কবি-নৃপ-বংশজ অর্থাং গোবিন্দ কবিরাজের বংশোদ্ভুত ঘনশ্যাাম ও বলরামের বন্দনা করিয়াছেন। জানদাস যদি শ্রীনিবাস-নরোত্তমের যুগের কবি হইতেন তাহা হইলে বৈষ্ণবদাস তাঁহাকে নবম পদে বন্দনা না করিয়া এই পদটতে স্তুতি করিতেন।
জ্ঞানদাস শ্রীচৈতন্যকে দর্শন না করিলেও নিত্যানন্দ প্রভুকে যে দেখিয়াছিলেন তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর ক্ষণদাগীতচিন্তামণি হইতে। তিনি ঐ গ্রন্থের ত্রিশটি ক্ষণদার প্রত্যেকটিতে গৌরচন্দ্রিকার পর নিত্যানন্দচন্দ্রিকার এক একটি পদ সন্নিবিষ্ট করিয়াছেন। নিত্যানন্দবিষয়ক পদগুলির মধ্যে তিনটি বলরামদাসের, তিনটি বৃন্দাবনদাসের এবং তিনটি জানদাসের। বলরামদাস এবং বৃন্দাবনদাসের সঙ্গে নিত্যানন্দের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের কথা শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের আদিখণ্ডের একাদশ পরিচ্ছেদে আছে। বিশ্বনাথ দুইটি করিয়া নিত্যানন্দবন্দনা তুলিয়াছেন বাসু ঘোষ, অনন্ত রায়, লোচন ও গতিগোবিন্দের রচনা হইতে। ইহা ছাড়া শঙ্কর ঘোষ ও নয়নানন্দের এক একটি পদও তিনি ধরিয়াছেন। জ্ঞানদাসের যে তিনটি নিত্যানন্দবন্দনার পদ তিনি ধরিয়াছেন তাহার প্রতি ছত্রে প্রত্যক্ষদর্শীর অনুভূতির ছাপ সুষ্পষ্ট।---
“পূরবে গোবর্দ্ধন ধরল অনুজ যার” ইত্যাদি পরটিতে (ক্ষণদা ৯।২) আছে “গৌর-পীরিতিরসে, কটির বসন খসে, অবতার অতি অনুপাম।” নিজের চোখে না দেখিলে নিতাইয়ের কটির বসন খুলিয়া যাওয়ার কথা লেখা সম্ভব মনে হয় না। বৃন্দাবনদাস বলেন--- যে নিত্যানন্দপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গের সহিত কথা বলিতে বলিতে “দিগম্বর হই বস্ত্র বান্ধিলেন শিরে” (চৈঃ ভাঃ ২।১১ )। পরণের কাপড় ভাল করিয়া সামলাইতে পারিতেন না বলিয়াই বোধ হয় অধিকাংশ সময় তিনি মালকোঁচা দিয়া কাপড় পরিতেন। ক্ষণদায় (১৩।২) ধৃত জ্ঞানদাসের আর একটি পদে তাই পাই---
“দেখরে ভাই! প্রবল-মল্ল-রূপ ধারী” ।
কবি যেন নিজে দেখিয়া অপরকে দেখাইয়া দিতেছেন যে নিত্যানন্দের “কটিতটে বিবিধ-বরণ-পটপহিরণ।” নিতাই একরংয়ের কাপড় পরেন না ; বিচিত্র বর্ণের অপূর্ব সমাবেশ তাঁহার পরিধেয় বস্ত্রে দেখা যায়, ইহা কি পরের কাছে বর্ণনা শুনিয়া জ্ঞানদাস লিখিয়াছেন? বৃন্দাবনদাসও বলেন--
শুক্ল পট নীল পীত--- বহুবিধ বাস।
অপূর্ব্ব শোভয়ে, পরিধানের বিলাস॥ --- (চৈঃ ভাঃ ৩।৫)
পরণের কাপড় না হয় বাহ্য বেশ, তাহার কথা পরের কাছে শুণিয়াও লেখা যায়, কিন্তু কবি যখন বলিতেছেন---
নাম নিতাই, ভায় বলি রোওত,
লীলা বুঝই না পারি॥
ভাবে বিঘুর্ণিত, লোচন ঢর ঢর,
দিগ বিদিগ নাহি জান
মত্ত সিংহ যেন, গরজে ঘন ঘন,
জগ-মাহ কাহু না মান॥
তখনও কি অপ্রত্যক্ষ অনুভূতির কথা কল্পনা-বলে লিখিতেছেন এই কথা বিশ্বাস করিতে হইবে? কবির বর্ণনার গুণে নিত্যানন্দের ভাবোন্মত্ত মূর্ত্তিটি যে আমাদের চোখের সামনে ভাসিয়া উঠে। ক্ষনগীতচিন্তামণিতে ধৃত (২২।২) জ্ঞানদাসের নিত্যানন্দবন্দনার তৃতীয় পদটিও ঐরূপ চিত্র-ধর্ম্মী---
আরে মোর, আরে মোর, নিত্যানন্দ রায়।
আপে নাচে, আপে গায়, চৈতন্য বলায়॥
লম্ফে লম্ফে যায় নিতাই গৌরাঙ্গ-আবেশে।
পাপিয়া পাষণ্ড-মতি না রাখিল দেশে॥
পাট-বসন পরে নিতাই, মুকুতা শ্রবণে।
ঝলমল ঝলমল---নানা আভরণে॥
বৃন্দাবনদাস নিত্যানন্দের প্রেমধর্ম প্রচারের প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন---
নিরবধি শ্রীকষ্ণচৈতন্য-সঙ্কীর্ত্তন।
করায়েন করেন লইয়া সর্ব্ব গণ॥ --- (চৈঃ ভাঃ ৩।৫)
তিনি নিত্যানন্দের অলংকারধারণের কথাও বর্ণনা করিয়াছেন। ক্ষণদাধৃত একটি পদে (১৪।২) তিনি নিত্যানন্দের চলন-বলনের ভঙ্গীর কথা লিখিয়াছেন---
ঢুলিয় ঢুলিয়া চলে, বাহু তুলি হরি বলে,
দুনয়নে বহে নিতাইর পানি॥
ক্ষণদায় বাসু ঘোষের ভণিতায় আছে (২৬।২),
“অরুণ বসনে, বিবিধভূষণে, শিরে পাগ নট-পটিয়া” পদটি পদকল্পতরু (২৩৩১)তে রামানন্দবসুর ভণিতাযুক্ত দেখা যায়। উভয়েই নিত্যানন্দলীলার প্রত্যক্ষদর্শী। নবদ্বীপে গৌরাঙ্গলীলার সহচর শঙ্কর ঘোষও ক্ষণদার (৩০।২) একটি পদে নিত্যানন্দ সম্বন্ধে বলিয়াছেন---
“গরজে পুনপুন, লম্ফ ঘনঘন, মল্ল বেশ ধরি নাচই”
সমসাময়িকদের রচনা হইতে জ্ঞানদাসের নিত্যানন্দবর্ণনার প্রত্যেকটি কখা সমর্থিত হয়, কিন্তু তাঁহাদের পদে নিত্যানন্দের রূপটি তেমন ভাবে চোখের সামনে ফুটিয়া উঠে না যেমন জ্ঞানদাসের লেখায় উঠে।”
.
কালীমোহন বিদ্যারত্নের কীর্ত্তন-পদাবলী তে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯২২ সালে প্রকাশিত, কালীমোহন বিদ্যারত্ন সম্পাদিত “কীর্ত্তন-পদাবলী” গ্রন্থের, কবিদিগের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তে জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লেখা রয়েছে . . .
বীরভূম জেলার ইন্দ্রাণী থানার অন্তর্গত কাঁদড়া নামক গ্রামে কবি জ্ঞানদাস ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। ইনি রাটী শ্রেণীর ব্রাহ্মণ ছিলেন, মঙ্গলবংশে ইহার জন্ম বলিয়া ইনি "মঙ্গল ঠাকুর” "শ্রীমঙ্গল" এবং "মদন মঙ্গল" প্রভৃতি আখ্যায় অভিহিত হইয়া থাকেন। জ্ঞানদাস ঠাকুরের সময় নির্ণয়-সম্বন্ধে একমত নাই। জ্ঞানদাস ঠাকুর মনোহর দাস বা বাবা আউলের সমসাময়িক লোক ছিলেন। দুই জনেই শ্রীনিত্যানন্দ-পত্নী শ্রীজাহ্নবী দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই হিসাবে উভয়েই ১৬০০ শকে বিদ্যমান ছিলেন। কেহ কেহ অনুমান করেন, জ্ঞানদাস ঠাকুর ১৪৫৩ শকে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁহাদের মতে বাবা আউল ৩০০ শত বৎসর জীবিত ছিলেন এবং ১৬০০ শকে মনোহর দাস নাম গ্রহণ করেন---তাঁহার উক্ত নাম গ্রহণের অনেক পরে জ্ঞানদাসের জন্ম হয়। জ্ঞানদাস ঠাকুর চিরকাল অবিবাহিত ছিলেন এবং শ্রীজাহ্নবী দেবীর সহিত তিনি শ্রীবৃন্দাবনাদি তীর্থ পর্য্যটন করিয়াছিলেন। জ্ঞানদাস যে বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, সেই বংশের কতিপয় ব্রাহ্মণ সন্তান গোস্বামী নামে পরিচয় দিয়া বাঁকুড়া জেলার কোতলপুর গ্রামে অদ্যাপি বাস করিতেছেন। শ্রীজাহ্নবী দেবীর মন্ত্রশিষ্য বলিয়া জ্ঞানদাস গোস্বামী পদবী লাভ করিয়াছিলেন, এই জন্যই তাঁহার জ্ঞাতিগণ অদ্যাবধি গোস্বামী উপাধিতে ভূষিত হইয়া আসিতেছেন। জ্ঞানদাস ঠাকুরের নামে অদ্যাপি তাহার জন্মভূমি কাঁদড়া গ্রামে এক মঠ আছে। ঐ মঠে প্রতিবৎসর পৌষ পূর্ণিমায় তিন দিন ব্যাপী একটি মেলা এবং মহোৎসবাদি হইয়া থাকে।
.
সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস (গোকুলানন্দ সেন) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের (১৯৩১ সাল), ৫ম খণ্ডের, ভূমিকার, ১১৯-পৃষ্ঠায় কবি জ্ঞানদাসের পরিচিতিতে লিখেছেন. . .
“সুপ্রসিদ্ধ পদ-কর্ত্তা জ্ঞানদাসের ১৮৬টি বাংলা ও ব্রজ-বুলীর পদ 'পদকল্পতরু' গ্রন্থে সংগৃহীত হইয়াছে। স্বর্গগত রমণীমোহন মল্লিক মহাশয়ের সম্পাদিত "জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থে উহার অতিরিক্ত আরও কতকগুলি পদ নানা প্রাচীন পুথি হইতে সঙ্কলিত হইয়াছে। আমাদের “অপ্রকাশিত পদ-রত্নাবলী” গ্রন্থে রমণী বাবুর সংস্করণের অতিরিক্ত আরও প্রায় পঞ্চাশটী পদ “পদ-রস-সার”, “পদ-রত্বাকর“, প্রভৃতি প্রাচীন পুথি হইতে সংগৃহীত হুইয়া প্রকাশিত হইয়াছে। আমাদের বিশ্বাস যে, অনুসন্ধান করিলে জ্ঞানদাসের এরূপ আরও অনেক পদ আবিষ্কৃত হইতে পারিবে। জ্ঞানদাসের কয়েকটী উৎকৃষ্ট বাংলা পদ রমণী বাবুর ও বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের চণ্ডীদাসের সংস্করণে চণ্ডীদাসের নামে উদ্ধৃত হইয়াছে। জ্ঞানদাসের গভীর ভাব-পূর্ণ সরল ও আবেগময় বাংলা পদের সহিত চণ্ডীদাসের ভণিতা-যুক্ত উৎকৃষ্ট বাংলা পদ-গুলির ভাষা-গত ও ভাব-গত আশ্চর্য্য সাদৃশ্য দেখা যায়। কীর্তন-গায়ক ও লিপিকরদিগের ইচ্ছা-কৃত বা অনিচ্ছাকৃত গোলযোগের ফলে জ্ঞানদাসের অনেক উৎকৃষ্ট বাংলা পদ অসঙ্গত-ভাবে চণ্ডীদাসের নামে চলিয়া গিয়াছে, এরূপ অনুমান করার যে যথেষ্ট কারণ আছে, আমরা “চণ্ডীদাস“ প্রসঙ্গে সে সম্বন্ধে সবিস্তারে আলোচনা করিয়াছি। “পদকল্পতরু“ পুথির সঙ্কলন-কাল অর্থাৎ আন্দাজ দুই শত বৎসরের কিছু পূর্ব্বেই এই ভণিতার গোলযোগ সঙ্ঘটিত হইয়াছে। সুতরাং অন্যুন আড়াই শত, কি তিন শত বৎসরের পুরাতন পদাবলীর পুথি--- যদিও উহা এখন নিতান্ত বিরল---সযত্নে সংগ্রহ করিয়া সতর্ক-ভাবে মিলাইয়া দেখিলে, বর্ত্তমানে চণ্ডীদাসের নামে প্রচারিত অনেক উৎকৃষ্ট বাংলা পদ জ্ঞানদাসের রচিত বলিয়া প্রমাণিত হইতে পারিবে বলিয়া আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আছে। এখন যাঁহারা জ্ঞানদাসের পদাবলীর প্রামাণিক সংস্করণ প্রকাশিত করিতে প্রবৃত্ত হইবেন, আমরা এ সম্বন্ধে তাঁহাদিগের দৃষ্টি বিশেষভাবে আকর্ষণ করিতেছি।
ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় তাঁহার “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” গ্রন্থের ৫ম সংস্করণে জ্ঞানদাসের যে সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদান করিয়াছেন, জ্ঞানদাসের সম্বন্ধে তদপেক্ষা বিশ্বাস-যোগ্য বিস্তৃত বিবরণের আপ্রাপ্তি হেতু আমরা উহাই নিম্নে উদ্ধৃত করিয়া দিলাম,---
“সিউড়ীর বিশ ক্রোশ পূর্ব্বে ও বর্ধমান জেলার অন্তর্গত কাটোয়ার ১০ মাইল পশ্চিমে কাঁদড়া গ্রাম। তথায় ব্রাহ্মণ বংশে ১৫৩০ খৃঃ অব্দে জ্ঞানদাস জন্ম গ্রহণ করেন ; ইনি নিত্যানন্দ-শাখাভুক্ত। থেতুরীর উৎসবে ইনি উপস্থিত ছিলেন দেখা যায়, সুতরাং ইনি গোবিন্দদাস, বলরামদাস প্রভৃতির সমকালিক কবি। কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাসের একটি মঠ এখনও আছে ; পৌষ মাসের পূর্ণিমায় সেখানে প্রতি বছর মহোৎসব এবং সেই সঙ্গে তিন দিন ব্যাপিয়া মেলা হয়।”
আমরা বহরমপুর হইতে প্রকাশিত ভূতপূর্ব্ব “মাধুকরী” ও শ্রীহট্ট হইতে প্রকাশিত “শ্রীশ্রীসোণার গৌরাঙ্গ” পত্রিকার “জ্ঞানদাসের পদাবলীর রসাস্থাদন" শীর্ষকে জ্ঞানদাসের অপূর্ব্ব কবিত্ব-পূর্ণ পদাবলীর সন্বদ্ধে আলোচনা করিয়াছি। জ্ঞানদাসের কোন কোন ব্রজবুলীর পদে তাঁহার পাণ্ডিত্য ও রচনা-পারিপাট্যের যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া গেলেও, তাঁহার অধিকাংশ ব্রজবুলীর পদ, বিশেষতঃ বাংলা পদগুলি এরূপ প্রাঞ্জল ও আবেগময় যে, সেগুলি পাঠ-মাত্রেই সহৃদয় পাঠকের চিত্তকে সম্পূর্ণ মোহিত করিয়া ফেলে ; ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করিয়া উহা দিগের চমৎকারিত্ব বুঝাইবার বিশেষ প্রয়োজন করে না। রচনা ও ভাবের এই সরলতা ও স্বাভাবিকতা যে অতি শ্রেষ্ঠ কবিতার অসাধারণ বিশেষত্ব, তাহাতে কোনও সহদয় সমালোচকেরই মত-ভেদ নাই। ভাবোচ্ছ্বাস-প্রধান নব্য কবিতার (Romantic Poetry) ইহাই প্রধান লক্ষণ। জ্ঞানদাসের কবিতা বেশীর ভাগেই এরূপ লক্ষণাক্রান্ত। সুতরাং আধুনিক শিক্ষিত পাঠকদিগের মধ্য অধিকাংশই ভাবোচ্ছ্বাস-প্রধান নব্য কবিতার ভক্ত বলিয়া, তাঁহাদিগের নিকট চণ্ডীদাসের ভণিতা-যুক্ত উৎকৃষ্ট পদাবলীর ন্যায় জ্ঞানদাসের পদাবলীই বিদ্যাপতি ও গোবিন্দদাসের উৎকৃষ্ট পদাবলী অপেক্ষাও অধিক সমাদৃত হইয়া থাকে। আমরা বর্ণিত অপূর্ব্বতার জন্য চণ্ডীদাসের ভণিতা-যুক্ত কতকগুলি পদের সহিত জ্ঞানদাসের উৎকৃষ্ট পদগুলিকে পদাবলী-সাহিত্যে অতুলনীয় বলিয়া স্বীকার করিলেও, মোটের উপর বিদ্যাপতি ও গোবিন্দদাসকে অধিক শক্তিশালী কবি বলিয়া স্বীকার না করিরা পারি নাই। তাঁহাদিগের পদাবলী আমাদিগের অনভ্যস্ত ভাষায় রচিত বলিয়া তেমন আবেগ-পূর্ণ মনে না হইলেও এবং তাঁহাদিগের, বিশেষতঃ গোবিন্দদাসের রচনায় নানাবিধ শব্দালঙ্কার ও শ্লেষ, রূপক সমাসোক্তি, ইত্যাদি দুরূহ অর্থালঙ্কার ও সুখ-বোধ্য রস-ধ্বনির অপেক্ষাও সুপণ্ডিত ও সুরসিকমাত্রবেদ্য অলঙ্কার-ধ্বনি ও বস্তু-ধ্বনির প্রাচুর্য্য হেতু অবিশেষজ্ঞ পাঠকদিগের পক্ষে দুরূহ হইলেও বিদ্যাপতি, বিশেষতঃ গোবিন্দদাস অনেক পদে কবিতার প্রাণ রসের উৎকর্ষকে অব্যাহত রাখিয়া কাব্যালঙ্কার, অলঙ্কার-ধ্বনি ও বস্তু-ধ্বনির যে পরাকাষ্ঠা প্রদর্শিত করিয়া গিয়াছেন, তাহা অস্বীকার করা যায় না সুতরাং আমাদিগের বিবেচনায় জ্ঞানদাস সরল স্বাভাবিক ও উচ্ছ্বাসপূর্ণ বাংলা পদ-রচনায় গোবিন্দদাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হইলেও মোটের, উপর কবিত্বের হিসাবে বাঙ্গালী পদকর্তাদিগের মধ্যে তাহার স্থান গোবিন্দদাসের পরেই নির্দেশ করা সঙ্গত।
স্বর্গগত রমণী বাবুর উদ্যোগ বিশেষ প্রশংসনীয় হইলেও দুঃখের বিষয়, তাঁহার জ্ঞানদাসের পদাবলীর সংস্করণটী আশানুরূপ শুদ্ধ হয় নাই। তাঁহার সংস্কণে যে পাঠ ও অর্থের অনেক মারাত্মক ভুল রহিয়া গিয়াছে, "সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা”র ২২ ভাগের ৩য় সংখ্যায় “জ্ঞানদাসের পদাবলী” শীর্ষক সুদীর্ঘ প্রবন্ধে আমরা উহা সবিস্তারে প্রদর্শিত করিয়াছি। সম্প্রতি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙ্গালা-বিভাগের অধ্যক্ষ ডক্টর শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের প্রশংসনীয় চেষ্টার ফলে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষগা-বৃত্তি-ভূক্ জনৈক ছাত্রের (Research Scholar) দ্বারা জানদাসের পদাবলীর একটী প্রামাণিক সংস্করণ (Critical Edition) সত্বরেই সম্পাদিত হইয়া প্রকাশিত হইবে জানিতে পারিয়া আমরা আনন্দিত হইয়াছি। আশা করি এই সংস্করণটীকে সর্বাঙ্গ-সম্পন্ন ও বিশুদ্ধ করার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় সাধ্য অনুসারে যত্নের ক্রটি করিবেন না।”
.
শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কারের জীবনীকোষ গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৩৮ সালে প্রকাশিত, শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কারের জীবনীকোষ ৩য় খণ্ডে, জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“জ্ঞানদাস --- তিনি একজন পদকর্ত্তা। তাঁহার রচিত ১৯৪টী পদ পাওয়া গিয়াছে। তিনি ১৫৩০ খ্রীঃ অব্দে কাটোয়ার দশ মাইল পশ্চিমে কাঁদরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উক্ত গ্রামে জ্ঞানদাসের একটি মঠ এখনও বর্ত্তমান আছে। তথায় প্রতি বৎসর পৌষ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে তিন দিন ব্যাপী একটি মেলা বসিয়া থাকে।”
.
চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৪০ সালে প্রকাশিত, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস ও অন্যান্য বৈষ্ণব মহাজন গীতিকা”, কবি-পরিচয়, ৭-পৃষ্ঠায় জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
জ্ঞানদাস (জন্ম ১৫৩০ - মৃত্যু ?) ---
১৫৩দ খুষ্টাব্দে সিউড়ি ও কাটোয়ার মধ্যবর্ত্তী কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাসের জন্ম হয়। তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন। ইনি বলরামদাস ও গোবিন্দদাসের সমকালিক কবি। গোবিন্দদাস যেমন বিদ্যাপতির অনুকরণকারীদ্বিগের মধ্যে প্রধান, জ্ঞানদাসও তেমনি চণ্ডীদাসের অনুকরণকারীদিগের মধ্যে প্রধান। তাঁহার ব্রজবুলির পদে পাণ্ডিত্য ও রচনা-পারিপাট্যের পরিচয় থাকিলেও তাঁহার বাংলা পদগুলিই অতিশয় প্রাঞ্জল ও মনোমুগ্ধকর। ইনি নিত্যানন্দ প্রভুর পত্নী জাহ্নবীদেবীর নিকট বৈষ্ণব-ধর্মে দীক্ষিত হন।
.
নীলরতন সেনের “বৈষ্ণব পদাবলী পরিচয়” গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৩৫৭ বঙ্গাব্দে (১৯৫০ খৃ) প্রকাশিত ডঃ নীলরতন সেনের “বৈষ্ণব পদাবলী পরিচয়” গ্রন্থের ৫ম অধ্যায় “চৈতন্য-পরবর্তী প্রখ্যাত পদকারত্রয়ী”, ১৩৯-পৃষ্ঠায়, জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“পূর্ববর্তী দুই শ্রেষ্ঠ কবি বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা বর্ণনার ষে বিশিষ্ট দুই রীতির প্রবর্তন করেছিলেন চৈতন্য-পরবর্তী ডক্ত বৈষ্ণব কবিগণ আরও সীমাবদ্ধ তত্ত্বদর্শনের আলোকে কমবেশী সেই ধারারই অনুসরণ করে চলেছিলেন। এই গণ্ডীবদ্ধ ভক্তি-প্রেমের জগতে বিচরণ করতে গিয়েও প্রতিভাবান কয়েকজন কবি তাঁদের কবিত্ব প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। চৈতন্য-পরবর্তী সেই অল্প কয়েকজন প্রতিভাবান কবির মধ্যে জ্ঞানদাস এবং গোবিন্দদাসের নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়।
বর্ধমান জেলার কাঁদড়া-মাঁদরা (বর্তমান কেতুগ্রামের অন্তর্ভুক্ত) গ্রামে সম্ভবত ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে জানদাসের জন্ম হয়। শ্রীচৈতন্যের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হলেও বাল্যকালে তিনি প্রভু নিত্যানন্দকে দেখেছেন এরূপ অনুমিত হয়। ১৫৭৬ খৃষ্টাব্দে লিখিত 'গৌরজ্ঞানোদেশদীপিকা’য় কবিকর্ণপুর জ্ঞানাদাসের নাম করেননি, বা সমসাময়িক দেবকীনন্দনের বৈষ্ণব-বন্দনায়ও জ্ঞানদাসের উল্লেখ নেই, কিন্তু ষোড়শ শতকের শেষভাগে বা সপ্তদশ শতকের সূচনাকালে অনুষ্ঠিত খেতরীর মহোৎসবে১ যখন জানদাস যোগ দেন তখন নিতাানন্দ গোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয়দের তিনি অন্যতম ছিলেন দেখা যায়। সুতরাং ষোড়শ শতকের শেষপাদেই জানদাসের প্রতিভা সম্যক পরিচিতি লাভ করেছিল এরূপ অনুমিত হয়। “ভক্তিরত্নাকর” প্রণেতা নরহরি চক্রবর্তী জ্ঞানদাস বন্দনার একটি পদে লিখেছেন,---
লীলাকালে তাঁহার জন্ম হয় নাই---
যাহাতে ধরণী ধন্য, বিশেষে নদীয়া।
জ্ঞানদাস বড় দুঃখী তাহা না দেখিয়া॥
বৈষ্ণবদাস আর একটি পদে (পদকল্পতরু ১৮) শ্রীনিবাস আচার্য্য, নরোত্তম ঠাকুর, রামচন্দ্র কবিরাজ, গতিগোবিন্দ, গেবিন্দদাস কবিরাজ, গোবিন্দ চক্রবর্তী, ব্যাস, শ্যামাদাস, রামচরণ, রামকৃষ্ণ। কুমুদানন্দ, রূপঘটক, বীর হাম্বীর, কর্ণপূর কবিরাজ, গোকুলদাস, ভগবানদাস, গোপীরমণ, নরসিংহ, বল্লবিকান্ত, বল্লভ, যদুনন্দনদাস, কবি-নৃপ-বংশজ অর্থাং গোবিন্দ কবিরাজের বংশোদ্ভুত ঘনশ্যাাম ও বলরামের বন্দনা করিয়াছেন। জানদাস যদি শ্রীনিবাস-নরোত্তমের যুগের কবি হইতেন তাহা হইলে বৈষ্ণবদাস তাঁহাকে নবম পদে বন্দনা না করিয়া এই পদটতে স্তুতি করিতেন।
জ্ঞানদাস শ্রীচৈতন্যকে দর্শন না করিলেও নিত্যানন্দ প্রভুকে যে দেখিয়াছিলেন তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর ক্ষণদাগীতচিন্তামণি হইতে। তিনি ঐ গ্রন্থের ত্রিশটি ক্ষণদার প্রত্যেকটিতে গৌরচন্দ্রিকার পর নিত্যানন্দচন্দ্রিকার এক একটি পদ সন্নিবিষ্ট করিয়াছেন। নিত্যানন্দবিষয়ক পদগুলির মধ্যে তিনটি বলরামদাসের, তিনটি বৃন্দাবনদাসের এবং তিনটি জানদাসের। বলরামদাস এবং বৃন্দাবনদাসের সঙ্গে নিত্যানন্দের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের কথা শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের আদিখণ্ডের একাদশ পরিচ্ছেদে আছে। বিশ্বনাথ দুইটি করিয়া নিত্যানন্দবন্দনা তুলিয়াছেন বাসু ঘোষ, অনন্ত রায়, লোচন ও গতিগোবিন্দের রচনা হইতে। ইহা ছাড়া শঙ্কর ঘোষ ও নয়নানন্দের এক একটি পদও তিনি ধরিয়াছেন। জ্ঞানদাসের যে তিনটি নিত্যানন্দবন্দনার পদ তিনি ধরিয়াছেন তাহার প্রতি ছত্রে প্রত্যক্ষদর্শীর অনুভূতির ছাপ সুষ্পষ্ট।---
“পূরবে গোবর্দ্ধন ধরল অনুজ যার” ইত্যাদি পরটিতে (ক্ষণদা ৯।২) আছে “গৌর-পীরিতিরসে, কটির বসন খসে, অবতার অতি অনুপাম।” নিজের চোখে না দেখিলে নিতাইয়ের কটির বসন খুলিয়া যাওয়ার কথা লেখা সম্ভব মনে হয় না। বৃন্দাবনদাস বলেন--- যে নিত্যানন্দপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গের সহিত কথা বলিতে বলিতে “দিগম্বর হই বস্ত্র বান্ধিলেন শিরে” (চৈঃ ভাঃ ২।১১ )। পরণের কাপড় ভাল করিয়া সামলাইতে পারিতেন না বলিয়াই বোধ হয় অধিকাংশ সময় তিনি মালকোঁচা দিয়া কাপড় পরিতেন। ক্ষণদায় (১৩।২) ধৃত জ্ঞানদাসের আর একটি পদে তাই পাই---
“দেখরে ভাই! প্রবল-মল্ল-রূপ ধারী” ।
কবি যেন নিজে দেখিয়া অপরকে দেখাইয়া দিতেছেন যে নিত্যানন্দের “কটিতটে বিবিধ-বরণ-পটপহিরণ।” নিতাই একরংয়ের কাপড় পরেন না ; বিচিত্র বর্ণের অপূর্ব সমাবেশ তাঁহার পরিধেয় বস্ত্রে দেখা যায়, ইহা কি পরের কাছে বর্ণনা শুনিয়া জ্ঞানদাস লিখিয়াছেন? বৃন্দাবনদাসও বলেন--
শুক্ল পট নীল পীত--- বহুবিধ বাস।
অপূর্ব্ব শোভয়ে, পরিধানের বিলাস॥ --- (চৈঃ ভাঃ ৩।৫)
পরণের কাপড় না হয় বাহ্য বেশ, তাহার কথা পরের কাছে শুণিয়াও লেখা যায়, কিন্তু কবি যখন বলিতেছেন---
নাম নিতাই, ভায় বলি রোওত,
লীলা বুঝই না পারি॥
ভাবে বিঘুর্ণিত, লোচন ঢর ঢর,
দিগ বিদিগ নাহি জান
মত্ত সিংহ যেন, গরজে ঘন ঘন,
জগ-মাহ কাহু না মান॥
তখনও কি অপ্রত্যক্ষ অনুভূতির কথা কল্পনা-বলে লিখিতেছেন এই কথা বিশ্বাস করিতে হইবে? কবির বর্ণনার গুণে নিত্যানন্দের ভাবোন্মত্ত মূর্ত্তিটি যে আমাদের চোখের সামনে ভাসিয়া উঠে। ক্ষনগীতচিন্তামণিতে ধৃত (২২।২) জ্ঞানদাসের নিত্যানন্দবন্দনার তৃতীয় পদটিও ঐরূপ চিত্র-ধর্ম্মী---
আরে মোর, আরে মোর, নিত্যানন্দ রায়।
আপে নাচে, আপে গায়, চৈতন্য বলায়॥
লম্ফে লম্ফে যায় নিতাই গৌরাঙ্গ-আবেশে।
পাপিয়া পাষণ্ড-মতি না রাখিল দেশে॥
পাট-বসন পরে নিতাই, মুকুতা শ্রবণে।
ঝলমল ঝলমল---নানা আভরণে॥
বৃন্দাবনদাস নিত্যানন্দের প্রেমধর্ম প্রচারের প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন---
নিরবধি শ্রীকষ্ণচৈতন্য-সঙ্কীর্ত্তন।
করায়েন করেন লইয়া সর্ব্ব গণ॥ --- (চৈঃ ভাঃ ৩।৫)
তিনি নিত্যানন্দের অলংকারধারণের কথাও বর্ণনা করিয়াছেন। ক্ষণদাধৃত একটি পদে (১৪।২) তিনি নিত্যানন্দের চলন-বলনের ভঙ্গীর কথা লিখিয়াছেন---
ঢুলিয় ঢুলিয়া চলে, বাহু তুলি হরি বলে,
দুনয়নে বহে নিতাইর পানি॥
ক্ষণদায় বাসু ঘোষের ভণিতায় আছে (২৬।২),
“অরুণ বসনে, বিবিধভূষণে, শিরে পাগ নট-পটিয়া” পদটি পদকল্পতরু (২৩৩১)তে রামানন্দবসুর ভণিতাযুক্ত দেখা যায়। উভয়েই নিত্যানন্দলীলার প্রত্যক্ষদর্শী। নবদ্বীপে গৌরাঙ্গলীলার সহচর শঙ্কর ঘোষও ক্ষণদার (৩০।২) একটি পদে নিত্যানন্দ সম্বন্ধে বলিয়াছেন---
“গরজে পুনপুন, লম্ফ ঘনঘন, মল্ল বেশ ধরি নাচই”
সমসাময়িকদের রচনা হইতে জ্ঞানদাসের নিত্যানন্দবর্ণনার প্রত্যেকটি কখা সমর্থিত হয়, কিন্তু তাঁহাদের পদে নিত্যানন্দের রূপটি তেমন ভাবে চোখের সামনে ফুটিয়া উঠে না যেমন জ্ঞানদাসের লেখায় উঠে।”
.
কালীমোহন বিদ্যারত্নের কীর্ত্তন-পদাবলী তে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯২২ সালে প্রকাশিত, কালীমোহন বিদ্যারত্ন সম্পাদিত “কীর্ত্তন-পদাবলী” গ্রন্থের, কবিদিগের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তে জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লেখা রয়েছে . . .
বীরভূম জেলার ইন্দ্রাণী থানার অন্তর্গত কাঁদড়া নামক গ্রামে কবি জ্ঞানদাস ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। ইনি রাটী শ্রেণীর ব্রাহ্মণ ছিলেন, মঙ্গলবংশে ইহার জন্ম বলিয়া ইনি "মঙ্গল ঠাকুর” "শ্রীমঙ্গল" এবং "মদন মঙ্গল" প্রভৃতি আখ্যায় অভিহিত হইয়া থাকেন। জ্ঞানদাস ঠাকুরের সময় নির্ণয়-সম্বন্ধে একমত নাই। জ্ঞানদাস ঠাকুর মনোহর দাস বা বাবা আউলের সমসাময়িক লোক ছিলেন। দুই জনেই শ্রীনিত্যানন্দ-পত্নী শ্রীজাহ্নবী দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই হিসাবে উভয়েই ১৬০০ শকে বিদ্যমান ছিলেন। কেহ কেহ অনুমান করেন, জ্ঞানদাস ঠাকুর ১৪৫৩ শকে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁহাদের মতে বাবা আউল ৩০০ শত বৎসর জীবিত ছিলেন এবং ১৬০০ শকে মনোহর দাস নাম গ্রহণ করেন---তাঁহার উক্ত নাম গ্রহণের অনেক পরে জ্ঞানদাসের জন্ম হয়। জ্ঞানদাস ঠাকুর চিরকাল অবিবাহিত ছিলেন এবং শ্রীজাহ্নবী দেবীর সহিত তিনি শ্রীবৃন্দাবনাদি তীর্থ পর্য্যটন করিয়াছিলেন। জ্ঞানদাস যে বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, সেই বংশের কতিপয় ব্রাহ্মণ সন্তান গোস্বামী নামে পরিচয় দিয়া বাঁকুড়া জেলার কোতলপুর গ্রামে অদ্যাপি বাস করিতেছেন। শ্রীজাহ্নবী দেবীর মন্ত্রশিষ্য বলিয়া জ্ঞানদাস গোস্বামী পদবী লাভ করিয়াছিলেন, এই জন্যই তাঁহার জ্ঞাতিগণ অদ্যাবধি গোস্বামী উপাধিতে ভূষিত হইয়া আসিতেছেন। জ্ঞানদাস ঠাকুরের নামে অদ্যাপি তাহার জন্মভূমি কাঁদড়া গ্রামে এক মঠ আছে। ঐ মঠে প্রতিবৎসর পৌষ পূর্ণিমায় তিন দিন ব্যাপী একটি মেলা এবং মহোৎসবাদি হইয়া থাকে।
.
সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস (গোকুলানন্দ সেন) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের (১৯৩১ সাল), ৫ম খণ্ডের, ভূমিকার, ১১৯-পৃষ্ঠায় কবি জ্ঞানদাসের পরিচিতিতে লিখেছেন. . .
“সুপ্রসিদ্ধ পদ-কর্ত্তা জ্ঞানদাসের ১৮৬টি বাংলা ও ব্রজ-বুলীর পদ 'পদকল্পতরু' গ্রন্থে সংগৃহীত হইয়াছে। স্বর্গগত রমণীমোহন মল্লিক মহাশয়ের সম্পাদিত "জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থে উহার অতিরিক্ত আরও কতকগুলি পদ নানা প্রাচীন পুথি হইতে সঙ্কলিত হইয়াছে। আমাদের “অপ্রকাশিত পদ-রত্নাবলী” গ্রন্থে রমণী বাবুর সংস্করণের অতিরিক্ত আরও প্রায় পঞ্চাশটী পদ “পদ-রস-সার”, “পদ-রত্বাকর“, প্রভৃতি প্রাচীন পুথি হইতে সংগৃহীত হুইয়া প্রকাশিত হইয়াছে। আমাদের বিশ্বাস যে, অনুসন্ধান করিলে জ্ঞানদাসের এরূপ আরও অনেক পদ আবিষ্কৃত হইতে পারিবে। জ্ঞানদাসের কয়েকটী উৎকৃষ্ট বাংলা পদ রমণী বাবুর ও বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের চণ্ডীদাসের সংস্করণে চণ্ডীদাসের নামে উদ্ধৃত হইয়াছে। জ্ঞানদাসের গভীর ভাব-পূর্ণ সরল ও আবেগময় বাংলা পদের সহিত চণ্ডীদাসের ভণিতা-যুক্ত উৎকৃষ্ট বাংলা পদ-গুলির ভাষা-গত ও ভাব-গত আশ্চর্য্য সাদৃশ্য দেখা যায়। কীর্তন-গায়ক ও লিপিকরদিগের ইচ্ছা-কৃত বা অনিচ্ছাকৃত গোলযোগের ফলে জ্ঞানদাসের অনেক উৎকৃষ্ট বাংলা পদ অসঙ্গত-ভাবে চণ্ডীদাসের নামে চলিয়া গিয়াছে, এরূপ অনুমান করার যে যথেষ্ট কারণ আছে, আমরা “চণ্ডীদাস“ প্রসঙ্গে সে সম্বন্ধে সবিস্তারে আলোচনা করিয়াছি। “পদকল্পতরু“ পুথির সঙ্কলন-কাল অর্থাৎ আন্দাজ দুই শত বৎসরের কিছু পূর্ব্বেই এই ভণিতার গোলযোগ সঙ্ঘটিত হইয়াছে। সুতরাং অন্যুন আড়াই শত, কি তিন শত বৎসরের পুরাতন পদাবলীর পুথি--- যদিও উহা এখন নিতান্ত বিরল---সযত্নে সংগ্রহ করিয়া সতর্ক-ভাবে মিলাইয়া দেখিলে, বর্ত্তমানে চণ্ডীদাসের নামে প্রচারিত অনেক উৎকৃষ্ট বাংলা পদ জ্ঞানদাসের রচিত বলিয়া প্রমাণিত হইতে পারিবে বলিয়া আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আছে। এখন যাঁহারা জ্ঞানদাসের পদাবলীর প্রামাণিক সংস্করণ প্রকাশিত করিতে প্রবৃত্ত হইবেন, আমরা এ সম্বন্ধে তাঁহাদিগের দৃষ্টি বিশেষভাবে আকর্ষণ করিতেছি।
ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় তাঁহার “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” গ্রন্থের ৫ম সংস্করণে জ্ঞানদাসের যে সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদান করিয়াছেন, জ্ঞানদাসের সম্বন্ধে তদপেক্ষা বিশ্বাস-যোগ্য বিস্তৃত বিবরণের আপ্রাপ্তি হেতু আমরা উহাই নিম্নে উদ্ধৃত করিয়া দিলাম,---
“সিউড়ীর বিশ ক্রোশ পূর্ব্বে ও বর্ধমান জেলার অন্তর্গত কাটোয়ার ১০ মাইল পশ্চিমে কাঁদড়া গ্রাম। তথায় ব্রাহ্মণ বংশে ১৫৩০ খৃঃ অব্দে জ্ঞানদাস জন্ম গ্রহণ করেন ; ইনি নিত্যানন্দ-শাখাভুক্ত। থেতুরীর উৎসবে ইনি উপস্থিত ছিলেন দেখা যায়, সুতরাং ইনি গোবিন্দদাস, বলরামদাস প্রভৃতির সমকালিক কবি। কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাসের একটি মঠ এখনও আছে ; পৌষ মাসের পূর্ণিমায় সেখানে প্রতি বছর মহোৎসব এবং সেই সঙ্গে তিন দিন ব্যাপিয়া মেলা হয়।”
আমরা বহরমপুর হইতে প্রকাশিত ভূতপূর্ব্ব “মাধুকরী” ও শ্রীহট্ট হইতে প্রকাশিত “শ্রীশ্রীসোণার গৌরাঙ্গ” পত্রিকার “জ্ঞানদাসের পদাবলীর রসাস্থাদন" শীর্ষকে জ্ঞানদাসের অপূর্ব্ব কবিত্ব-পূর্ণ পদাবলীর সন্বদ্ধে আলোচনা করিয়াছি। জ্ঞানদাসের কোন কোন ব্রজবুলীর পদে তাঁহার পাণ্ডিত্য ও রচনা-পারিপাট্যের যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া গেলেও, তাঁহার অধিকাংশ ব্রজবুলীর পদ, বিশেষতঃ বাংলা পদগুলি এরূপ প্রাঞ্জল ও আবেগময় যে, সেগুলি পাঠ-মাত্রেই সহৃদয় পাঠকের চিত্তকে সম্পূর্ণ মোহিত করিয়া ফেলে ; ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করিয়া উহা দিগের চমৎকারিত্ব বুঝাইবার বিশেষ প্রয়োজন করে না। রচনা ও ভাবের এই সরলতা ও স্বাভাবিকতা যে অতি শ্রেষ্ঠ কবিতার অসাধারণ বিশেষত্ব, তাহাতে কোনও সহদয় সমালোচকেরই মত-ভেদ নাই। ভাবোচ্ছ্বাস-প্রধান নব্য কবিতার (Romantic Poetry) ইহাই প্রধান লক্ষণ। জ্ঞানদাসের কবিতা বেশীর ভাগেই এরূপ লক্ষণাক্রান্ত। সুতরাং আধুনিক শিক্ষিত পাঠকদিগের মধ্য অধিকাংশই ভাবোচ্ছ্বাস-প্রধান নব্য কবিতার ভক্ত বলিয়া, তাঁহাদিগের নিকট চণ্ডীদাসের ভণিতা-যুক্ত উৎকৃষ্ট পদাবলীর ন্যায় জ্ঞানদাসের পদাবলীই বিদ্যাপতি ও গোবিন্দদাসের উৎকৃষ্ট পদাবলী অপেক্ষাও অধিক সমাদৃত হইয়া থাকে। আমরা বর্ণিত অপূর্ব্বতার জন্য চণ্ডীদাসের ভণিতা-যুক্ত কতকগুলি পদের সহিত জ্ঞানদাসের উৎকৃষ্ট পদগুলিকে পদাবলী-সাহিত্যে অতুলনীয় বলিয়া স্বীকার করিলেও, মোটের উপর বিদ্যাপতি ও গোবিন্দদাসকে অধিক শক্তিশালী কবি বলিয়া স্বীকার না করিরা পারি নাই। তাঁহাদিগের পদাবলী আমাদিগের অনভ্যস্ত ভাষায় রচিত বলিয়া তেমন আবেগ-পূর্ণ মনে না হইলেও এবং তাঁহাদিগের, বিশেষতঃ গোবিন্দদাসের রচনায় নানাবিধ শব্দালঙ্কার ও শ্লেষ, রূপক সমাসোক্তি, ইত্যাদি দুরূহ অর্থালঙ্কার ও সুখ-বোধ্য রস-ধ্বনির অপেক্ষাও সুপণ্ডিত ও সুরসিকমাত্রবেদ্য অলঙ্কার-ধ্বনি ও বস্তু-ধ্বনির প্রাচুর্য্য হেতু অবিশেষজ্ঞ পাঠকদিগের পক্ষে দুরূহ হইলেও বিদ্যাপতি, বিশেষতঃ গোবিন্দদাস অনেক পদে কবিতার প্রাণ রসের উৎকর্ষকে অব্যাহত রাখিয়া কাব্যালঙ্কার, অলঙ্কার-ধ্বনি ও বস্তু-ধ্বনির যে পরাকাষ্ঠা প্রদর্শিত করিয়া গিয়াছেন, তাহা অস্বীকার করা যায় না সুতরাং আমাদিগের বিবেচনায় জ্ঞানদাস সরল স্বাভাবিক ও উচ্ছ্বাসপূর্ণ বাংলা পদ-রচনায় গোবিন্দদাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হইলেও মোটের, উপর কবিত্বের হিসাবে বাঙ্গালী পদকর্তাদিগের মধ্যে তাহার স্থান গোবিন্দদাসের পরেই নির্দেশ করা সঙ্গত।
স্বর্গগত রমণী বাবুর উদ্যোগ বিশেষ প্রশংসনীয় হইলেও দুঃখের বিষয়, তাঁহার জ্ঞানদাসের পদাবলীর সংস্করণটী আশানুরূপ শুদ্ধ হয় নাই। তাঁহার সংস্কণে যে পাঠ ও অর্থের অনেক মারাত্মক ভুল রহিয়া গিয়াছে, "সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা”র ২২ ভাগের ৩য় সংখ্যায় “জ্ঞানদাসের পদাবলী” শীর্ষক সুদীর্ঘ প্রবন্ধে আমরা উহা সবিস্তারে প্রদর্শিত করিয়াছি। সম্প্রতি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙ্গালা-বিভাগের অধ্যক্ষ ডক্টর শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের প্রশংসনীয় চেষ্টার ফলে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষগা-বৃত্তি-ভূক্ জনৈক ছাত্রের (Research Scholar) দ্বারা জানদাসের পদাবলীর একটী প্রামাণিক সংস্করণ (Critical Edition) সত্বরেই সম্পাদিত হইয়া প্রকাশিত হইবে জানিতে পারিয়া আমরা আনন্দিত হইয়াছি। আশা করি এই সংস্করণটীকে সর্বাঙ্গ-সম্পন্ন ও বিশুদ্ধ করার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় সাধ্য অনুসারে যত্নের ক্রটি করিবেন না।”
.
শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কারের জীবনীকোষ গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৩৮ সালে প্রকাশিত, শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কারের জীবনীকোষ ৩য় খণ্ডে, জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“জ্ঞানদাস --- তিনি একজন পদকর্ত্তা। তাঁহার রচিত ১৯৪টী পদ পাওয়া গিয়াছে। তিনি ১৫৩০ খ্রীঃ অব্দে কাটোয়ার দশ মাইল পশ্চিমে কাঁদরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উক্ত গ্রামে জ্ঞানদাসের একটি মঠ এখনও বর্ত্তমান আছে। তথায় প্রতি বৎসর পৌষ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে তিন দিন ব্যাপী একটি মেলা বসিয়া থাকে।”
.
চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৪০ সালে প্রকাশিত, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস ও অন্যান্য বৈষ্ণব মহাজন গীতিকা”, কবি-পরিচয়, ৭-পৃষ্ঠায় জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
জ্ঞানদাস (জন্ম ১৫৩০ - মৃত্যু ?) ---
১৫৩দ খুষ্টাব্দে সিউড়ি ও কাটোয়ার মধ্যবর্ত্তী কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাসের জন্ম হয়। তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন। ইনি বলরামদাস ও গোবিন্দদাসের সমকালিক কবি। গোবিন্দদাস যেমন বিদ্যাপতির অনুকরণকারীদ্বিগের মধ্যে প্রধান, জ্ঞানদাসও তেমনি চণ্ডীদাসের অনুকরণকারীদিগের মধ্যে প্রধান। তাঁহার ব্রজবুলির পদে পাণ্ডিত্য ও রচনা-পারিপাট্যের পরিচয় থাকিলেও তাঁহার বাংলা পদগুলিই অতিশয় প্রাঞ্জল ও মনোমুগ্ধকর। ইনি নিত্যানন্দ প্রভুর পত্নী জাহ্নবীদেবীর নিকট বৈষ্ণব-ধর্মে দীক্ষিত হন।
.
নীলরতন সেনের “বৈষ্ণব পদাবলী পরিচয়” গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৩৫৭ বঙ্গাব্দে (১৯৫০ খৃ) প্রকাশিত ডঃ নীলরতন সেনের “বৈষ্ণব পদাবলী পরিচয়” গ্রন্থের ৫ম অধ্যায় “চৈতন্য-পরবর্তী প্রখ্যাত পদকারত্রয়ী”, ১৩৯-পৃষ্ঠায়, জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“পূর্ববর্তী দুই শ্রেষ্ঠ কবি বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা বর্ণনার ষে বিশিষ্ট দুই রীতির প্রবর্তন করেছিলেন চৈতন্য-পরবর্তী ডক্ত বৈষ্ণব কবিগণ আরও সীমাবদ্ধ তত্ত্বদর্শনের আলোকে কমবেশী সেই ধারারই অনুসরণ করে চলেছিলেন। এই গণ্ডীবদ্ধ ভক্তি-প্রেমের জগতে বিচরণ করতে গিয়েও প্রতিভাবান কয়েকজন কবি তাঁদের কবিত্ব প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। চৈতন্য-পরবর্তী সেই অল্প কয়েকজন প্রতিভাবান কবির মধ্যে জ্ঞানদাস এবং গোবিন্দদাসের নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়।
বর্ধমান জেলার কাঁদড়া-মাঁদরা (বর্তমান কেতুগ্রামের অন্তর্ভুক্ত) গ্রামে সম্ভবত ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে জানদাসের জন্ম হয়। শ্রীচৈতন্যের সাক্ষাৎ লাভে বঞ্চিত হলেও বাল্যকালে তিনি প্রভু নিত্যানন্দকে দেখেছেন এরূপ অনুমিত হয়। ১৫৭৬ খৃষ্টাব্দে লিখিত 'গৌরজ্ঞানোদেশদীপিকা’য় কবিকর্ণপুর জ্ঞানাদাসের নাম করেননি, বা সমসাময়িক দেবকীনন্দনের বৈষ্ণব-বন্দনায়ও জ্ঞানদাসের উল্লেখ নেই, কিন্তু ষোড়শ শতকের শেষভাগে বা সপ্তদশ শতকের সূচনাকালে অনুষ্ঠিত খেতরীর মহোৎসবে১ যখন জানদাস যোগ দেন তখন নিতাানন্দ গোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয়দের তিনি অন্যতম ছিলেন দেখা যায়। সুতরাং ষোড়শ শতকের শেষপাদেই জানদাসের প্রতিভা সম্যক পরিচিতি লাভ করেছিল এরূপ অনুমিত হয়। “ভক্তিরত্নাকর” প্রণেতা নরহরি চক্রবর্তী জ্ঞানদাস বন্দনার একটি পদে লিখেছেন,---
শ্রীবীরভূমেতে ধাম কাঁদড়া-মাঁদড়া গ্রাম
তথায় জন্মিলা জ্ঞানদাস।
আকুমার বৈরাগ্যেতে রত বাল্যকাল হৈতে
দীক্ষা লৈলা জাহ্নবার পাশ॥
... ... ... ... ...
মদনমঙ্গল নাম রূপে গুণে অনুপাম
আর এক উপাধি মনোহর।
খেতুরীর মহোত্সবে@ জ্ঞানদাস গেলা যবে
বাবা আউল ছিল সহচর॥
কবিকুলে যেন রবি চণ্ডীদাস তুল কবি
জ্ঞানদাস বিদিত ভুবনে।
যার পদ সুধাসার যেন অমৃতের ধার
নরহরি দাস ইহা ভণে॥
তথায় জন্মিলা জ্ঞানদাস।
আকুমার বৈরাগ্যেতে রত বাল্যকাল হৈতে
দীক্ষা লৈলা জাহ্নবার পাশ॥
... ... ... ... ...
মদনমঙ্গল নাম রূপে গুণে অনুপাম
আর এক উপাধি মনোহর।
খেতুরীর মহোত্সবে@ জ্ঞানদাস গেলা যবে
বাবা আউল ছিল সহচর॥
কবিকুলে যেন রবি চণ্ডীদাস তুল কবি
জ্ঞানদাস বিদিত ভুবনে।
যার পদ সুধাসার যেন অমৃতের ধার
নরহরি দাস ইহা ভণে॥
এই পদের প্রামাণিকতা অশ্বীকারের হেতু নেই। সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, জ্ঞানদাস প্রভু নিত্যানন্দকে বাল্যকালে দেখে থাকলেও তাঁর তিরোধানের (১৫৪২?) পর পত্নী জাহ্নবা দেবীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি চিরকুমার ছিলেন। খেতরী মহোৎসবে@ বিশিষ্ট অংশ গ্রহণ করেছিলেন এবং সেই সময়ে নিত্যানন্দ গোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয় স্থান অধিকার করেছিলেন তিনি। নিত্যানন্দের জন্মস্থান একচাকা গ্রামে।---তার চার মাইল পশ্চিমে কাঁদড়া-মাঁদড়া (কেতুগ্রাম) জ্ঞানদাসের জন্মস্থান। সেখানে জ্ঞানদাসের নামে যে মঠ রয়েছে এখনো, প্রতিবছর পৌষ-পূর্ণিমা তিথিতে সেই মঠে কবির তিরোভাব উৎসব হয়।
একমাত্র পীতাম্বর দাসের রসমঞ্জরী ১৭ শতকের শেষ পাদে সংকলিত ব্যতীত প্রাচীন সমস্ত পদসংকলন-গ্রন্থে জ্ঞানদাসের পদ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, এবং সকলেই কবি হিসাবে তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। বৈষবদাসের 'পদকল্পতরু'তে ১৮ শতকের তৃতীয় পাদে সংকলিত) ৩১০১ টি পদের মধ্যে জানদাসের ১৮৬ টি পদ রযেছে। ডঃ বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী" গ্রন্থে ৪৭৪ টি অসন্দিগ্ধ এবং ৩০ টি সন্দিদ্ধ, মোট ৫০৪ টি পদ সংগ্রহ করে দিয়েছেন।
কবিত্বের উৎকর্ষ বিচারে জ্ঞানদাস-পদাবলীর ছুটি স্তর অনুমান করা যায়। প্রথম শিক্ষানবিশী কালে তিনি বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস এবং অন্যান্য দু-একজন পূর্বসূরীর অনুসরণ করেছেন, ক্রমান্বয়ে যখন তার কবিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে, এই কবিদের, ---বিশেষ করে চণ্ডীদাসের কাব্যাদর্শকে যেন স্বীকরণের দ্বারা আত্মসাৎ করে এবং সেই সঙ্গে স্বীয় মৌলিক প্রতিভার সংযোজনের সাহায্যে এক নতূন লিরিক প্রেমানুভূতির কবিরূপে আমাদের সামনে আবির্ভূত হয়েছেন। বৃন্দাবনের রাধাকৃষ্ণের প্রেমকথার মাধ্যমে কবি যেন নরনারীর শাশ্বত প্রেম-বেদনার কথাই শোনাতে চেয়েছেন। এই ব্যক্তিক লিরিক-প্রেমানুভূতির ক্ষেত্রে জ্ঞানদাস দীর্ঘ চার শতাব্দীকালের ব্যবধান অতিক্রম করে, মধ্যযুগীয় বিশিষ্ট ধর্মগোষ্ঠীর সীমা অতিক্রম করে বৈষ্ণব-অবৈষ্ণব নির্বিশেষে এ-যুগের প্রেমাকুলে পাঠক ও শ্রোতৃ-হৃদয়ের সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছেন। তাঁর কয়েকটি অবিস্মরণীয় পদ এ-যুগের শ্রেষ্ঠকবি রবীন্দ্রনাথের মনে কি গভীর রেখাপাত করেছিল একাধিক প্রসঙ্গে তার উল্লেখ পাওয়া যায়।
@ - খেতরী মহোৎসব ঠিক কোন্ সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবিষয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভে রয়েছে। ডঃ রাধাগোবিন্দ নাথের মতে ১৬০১-২ এর কাছাকাছি সময়ে এই মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কেহ কেহ এই তারিখ ১৫৮১ বলে ধরেছেন।…”
.
প্রিয়নাথ জানার বঙ্গীয় জীবনকোষ গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৫ সালে প্রকাশিত প্রিয়নাথ জানা তাঁর "বঙ্গীয় জীবনকোষ" গ্রন্থে জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“চৈতন্যোত্তর যুগের শ্রেষ্ঠ কবিদেব মধ্যে পদকর্তা জ্ঞানদাস অন্যতম। এঁর বিস্তৃত পরিচয় আবিষ্কৃত হয়নি। তবে যতদূর জানা যায়--- ইনি বর্ধমান জেলার অন্তর্গত কাটোয়ার দশ মাইল পশ্চিমে কাঁদড়াগ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৫৩০ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি নিত্যানন্দ শাখাভুক্ত ছিলেন। নিত্যানন্দ-পত্নী জাহ্নবী দেবী ছিলেন এঁর গুরু। জ্ঞানদাস, গোবিন্দ দাস, বলরাম দাস প্রভৃতির সমকালিক কবি। খেতুরীর মহোৎসবে ইনি উপস্থিত ছিলেন। কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাসের একটি মঠ এখনো আছে। পৌষ মাসের পূর্ণিমায় সেখানে প্রতি বৎসর মহোৎসব এবং সেই সঙ্গে তিন দিন ব্যাপী মেলা হয়। বৈষ্ণব পদ রচনায় জ্ঞানদাস একাধারে বাংলা, ব্রজবুলি ও বাংলা-ব্রজবুলি বিমিশ্র ভাষার ব্যবহাব করেছেন। তবে ব্রজবুলি ভাষায় রচিত পদের সংখ্যাই অধিক। কিন্তু বাংলা ভাষায় রচিত পদগুলি ব্রজবুলি পদগুলির তুলনায় অনেক উৎকৃষ্ট। “রূপানুরাগ”, “রসোদগার” এবং "মাথুর” বিষয়ক পদগুলিতেই জ্ঞানদাসের কবিত্বের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বিদ্যমান।”
.
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে
১৯৫৬ সালে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত, “জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থে জ্ঞানদাসের জীবনী বা পরিচিতি এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
“রাঢ়দেশে কান্দরা নামেতে গ্রাম হয়।
যথায় মঙ্গল জ্ঞানদাসের আলয়॥
ভক্তিরত্বাকরের এই দুই ছত্র কবিতা লইয়া বাঙ্গালা-সাহিত্যে বহু গবেষণা হইয়া গিয়াছে। অনেকেই বলিয়াছেন, মঙ্গল জ্ঞানদাসেরই অপর নাম। কারণ ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কেহ বলিয়াছেন, “জ্ঞানদাস দেখিতে অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন তাই লোকে তাহাকে মঙ্গল বলিত।” আবার অন্য জনে বলিয়াছেন, “জ্ঞানদাস ভুবনমঙ্গল হরিনাম বিতরণ করিতেন, এইজন্যই সকলে তাঁহাকে মঙ্গল জ্ঞানদাস বলিয়া ডাকিত।'' দেহসৌষ্ঠব এবং হরিনাম বিতরণের জন্য মঙ্গল উপাধি প্রাপ্য হইলে সে কালের বৈষ্ণবগণের প্রায় সকলেই তাহা পাইতেন। এ কথাটা কেহ ভাবিয়া দেখেন নাই। এখনো কাহারো কাহারো বিশ্বাস মঙ্গল এবং জ্ঞানদাস একই ব্যক্তির নাম।
মঙ্গল একজন স্বনামধন্য ভক্ত এবং জ্ঞানদাস একজন সুবিখ্যাত পদকর্তা, দুইজন পৃথক ব্যক্তি। দুইজনই কান্দারার অধিবাসী। মঙ্গল ঠাকুর শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের অন্তরঙ্গ পার্ষদ শ্রীল গদাধর পণ্ডিতের শিষ্য। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে গদাধর শাখা গণনায় ইঁহার নাম আছে--- “যদু গাঙ্গুলী আর মঙ্গল বৈষ্ণব।” বৈষ্ণব-সাহিত্যে মঙ্গল ঠাকুর মঙ্গল বৈষ্ণব নামে পরিচিত। কান্দরায় ইঁহার বংশধরগণ বর্ত্তমান রহিয়াছেন।”
এই পর্যন্ত উপরের “জ্ঞানদাস ও মঙ্গল ঠাকুর কি একই ব্যক্তি?” অধ্যায়ে দেওয়া রয়েছে। এবাৎ পরবর্তী অংশ . . .
“মঙ্গল ঠাকুরের নিবাস ছিল মুর্শিদাবাদ জেলার কিরীটকোণা গ্রামে। কুলপরিচয়ে ইনি কিরীটকোণার পালধি বংশজাত। শৈশবে মাতৃপিতৃহীন হইয়া কুলদেবতা শ্রীনৃসিংহদেব শালগ্রাম লইয়া ঘুরিতে ঘুরিতে মঙ্গল কান্দরার পশ্চিমে রাঢ়ীপুরের ডাঙ্গায় আসিয়া বাস করেন। শালগ্রামের ভোগের জন্য তিনি দিনে একবার মাত্র ভিক্ষায় বাহির হইতেন। অবশিষ্ট সময় তাঁহার ভগবন্নাম কীর্ত্তনেই অতিবাহিত হইত। কান্দরায় প্রবাদ আছে মঙ্গল ঠাকুরের সাধন-ভজনের কথা শুনিয়া শ্রীল গদাধর পণ্ডিত জীউ কান্দরায় শুভাগমনপৃর্ব্বক তাঁহাকে দীক্ষাদান এবং স্বপূজিত শ্রীগৌরাঙ্গগোপাল বিগ্রহের সেবার ভার সমর্পণ করেন। প্রবাদ শুনিয়াছি --- শ্রীল পণ্ডিত মহোদয় শারদীয় কল্পারম্ভের কৃষ্ণানবমী দিনে শুভাগমনপূর্ব্বক পরবর্ত্তী শুক্লা প্রতিপদ পর্য্যন্ত কান্দরায় অবস্থিতি করিয়াছিলেন। এই স্মরণীয় ঘটনার স্মৃতিরক্ষার জন্য কান্দরায় ঐ কয়দিন ব্যাপিয়া একটি উৎসবের অনুষ্ঠান হয়। উৎসবের নাম “সাজি উৎসব। পূর্ব্বে এই উৎসব উপলক্ষ্যে নানাস্থান হইতে ছোট-বড় বহু কীর্ত্তনীয়া কান্দরায় উপস্থিত হইতেন। বর্তমানে সময়ের পরিবর্ত্তনের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবেরও রূপান্তর ঘটিয়াছে। দেশে কীর্ত্তনীয়ার সংখ্যা কমিয়া আসিয়াছে। ঠাকুরবাড়ীর অবস্থাও পূর্ব্বের মত নাই।
পণ্ডিত মহোদয়ের অনুমতি লইয়া মঙ্গল ঠাকুর মাত্র তিনজন শিষ্যকে দীক্ষাদান করিয়াছিলেন। প্রথম, কাঁকড়া হুসমপুরের একজন চক্রবর্ত্তী উপাধিধারী ব্রাহ্মণ। দ্বিতীয় নিকটবর্তী রাজুর গ্রামের শ্রীনৃসিংহবল্লভ মিত্র। ইনি দীক্ষা গ্রহণের পর বীরভূম জেলার ময়নাডাল গ্রামে গিয়া বাস করেন। ময়নাডাল মঙ্গলের কৃপায় সে কালে মনোহরসাহী কীর্ত্তনের শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। নৃসিংহের বংশধরগণ মিত্রঠাকুর নামে পরিচিত। তৃতীয়, ময়নাডাল গ্রামের জনৈক অধিকারী-উপাধিধারী ব্রাহ্মণ। স্বপ্নাদিষ্ট হইয়া মঙ্গল ঠাকুর ইঁহারই কন্যাকে বিবাহ করিয়াছিলেন।
মঙ্গল ঠাকুরের তিন পুত্র---রাধিকাপ্রসাদ. গোপীরমণ এবং শ্যামকিশোর। এই তিন পুত্রের বংশধরগণ যখাক্রমে বড়বাড়ী, মধ্যমবাড়ী এবং ছোটবাড়ীর ঠাকুর নামে পরিচিত। বড়বাড়ীতে শ্রীবৃন্দাবনচন্দ্র যুগল বিগ্রহ, মধ্যম বাড়ীতে শ্রীরাধাকান্ত যুগল বিগ্রহ এবং ছোট বাড়ীতে শ্রীরাধাকৃষ্ণ যুগল বিগ্রহ, মঙ্গলঠাকুরের পূজিত শ্রীনৃসিংহদেব শালগ্রাম ও শ্রীগৌরাঙ্গ-গোপাল বিগ্রহ পূজা প্রাপ্ত হইতেছেন।
মঙ্গল ঠাকুরের বংশে বহু পণ্ডিত গায়ক এবং কবি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। প্রাচীন কীর্ত্তনীয়াগণের মুখে শুনিয়াছি, জ্ঞানদাস কান্দরার শ্যামকিশোরের পুত্র বদন, শ্রীখণ্ডের শ্রীরঘুনন্দন ঠাকুর এবং ময়নাডালের নৃসিংহ মিত্র ঠাকুরের সহায়তায় রাঢ়ের পুরাতন কীর্ত্তন-ধারাকে খেতরীর গড়েরহাটী ধারা হইতে স্বাতন্ত্র্য দানে মনোহরসাহী নামে প্রচলিত করিয়াছিলেন। পদকল্পতর সঙ্কলনের পরবর্তী কালের প্রসিদ্ধ পদকর্ত্তা শ্রীচন্দ্রশেখর ও শশিশেখর ভাতৃদ্বয় মঙ্গল ঠাকুরের বংশধর বলিয়া প্রসিদ্ধি আছে।
মঙ্গল ঠাকুর জ্ঞানদাসের সঙ্গে খেতরীর মহোত্সবে উপস্থিত ছিলেন। নরোত্তম-বিলাসে অপরাপর বৈষ্ণবগণের সঙ্গে ইঁহাদেরও নাম আছে। খেতরী যাত্রাপথে কাটোয়ায় গিয়াছিলেন---
রঘুমিশ্র কাশীনাথ পণ্ডিত উদ্ধব।
শ্রীনয়নানন্দ মিশ্র মঙ্গল বৈষ্ণব॥
* * *
* * *
মুরারী মুকুন্দ জ্ঞানদাস মনোহর॥
বৈষ্ণব জগতে সুপরিচিত কান্দরা গ্রাম বীরভূমের মধ্য দিয়া উদ্ধারণপুর যাইবার পথে আমদপুর হইতে দক্ষিণ-পূর্ব্বদিকে প্রায় আটক্রোশ দূর। আামদপুর-কাটোয়া শাখা রেলপখের ষ্টেশন রামজীবনপুর কান্দরারই অপর নাম। ষ্টেশনের নাম কান্দরা না রাখিয়া কেন রামজীবনপুর রাখা হইয়াছিল জানি না। গ্রামখানি পূর্বে খুব সমৃদ্ধ ছিল। মাঝে অনেক দিন অবনতির দশা গিয়াছে। রেলপণ প্রতিষ্ঠিত হইবার পর পুনরায় গ্রামের শ্রী ফিরিয়াছে। কিন্ত ঠাকুরবাড়ীর অতীত সমৃদ্ধি আর ফিরিয়া আসে নাই।
গ্রামে প্রায় সহস্রাধিক ঘর লোকের বাস। শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বেশী না হইলেও বর্দ্ধিষ্ণু লোকের সংখ্যা মন্দ নহে। পূর্ব্বের কান্দরায় মুন্সেফী আদালত ছিল। সাব-রেজেস্ট্রী কার্য্যালয় ছিল। এখন একটি উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় ও ডাকঘর আছে। সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। হাটে গৃহস্থের প্রয়োজনীয় সকল রকম জিনিষই পাওয়া যায়। স্টেশনের নিকট চাউলের আড়ৎ, কয়লার ডিপো ও অন্যান্য জিনিষের দোকান আছে।
কেহ কেহ লিখিয়াছেন, জ্ঞানদাস চিরকুমার ছিলেন। কান্দরায় প্রবাদ আছে, জ্ঞানদাস বিবাহিত ছিলেন। তাঁহার দুইটি পুত্রসন্তান হইয়াছিল। শ্রীপাদ নিত্যানন্দ তনয় শ্রীলবীরচন্দ্র প্রভুর ইষ্টচিন্তায় বিঘ্ন উৎপাদন করায় পুত্র দুইটি অকালে পরলোকগত হন। জ্ঞানদাস শ্রীপাদ নিত্যানন্দ-পত্নী শ্রীযুক্তা জাহ্নবী দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করেন। জাহ্নবী দেবী একবার এবং শ্রীল বীরচন্ত্র প্রভু দুইবার কান্দরায় শুভাগমন করিয়াছিলেন। কান্দরায় কায়স্থ বংশীয় জয়গোপাল দাস পাণ্ডিত্য গর্ব্বে শ্রীল বীরচন্ত্র প্রভুকে অবজ্ঞা করায় বৈষ্ণব সমাজে অপাংক্তেয় হইয়াছিলেন।
কান্দ্রায় জ্ঞানদাসের মঠ অন্যতম দ্রষ্টব্য স্থান। এই মঠে (আখড়ায়) জ্ঞানদাসের পূজিত শ্রীশ্রীরাধাগোবিন্দ যুগল বিগ্রহ আজিও পূজাপ্রাপ্ত হইতেছেন। জ্ঞানদাসের বন্ধু মনোহরের ---আউলিয়া মনোহর দাসের ভ্রাতা শ্রীকিশোর দাস জ্ঞানদাসের মঠের প্রথম মোহান্ত। জ্ঞানদাসের তিরোধানের পর তিনিই শ্রীবিগ্রহযুগলের পূজার ভার গ্রহণ করেন। কিশোরের বংশ লোপ পাইলে তাঁহার শিষ্যা-প্রশিষ্যগণ মঠের সেবাপূজা নির্ব্বাহ করিয়া আসিতেছেন।
জ্ঞানদাস বাঙ্গালা-কাব্যসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। আজিকার বাঙ্গালা-সাহিত্যের উন্নতির দিনেও বাঙ্গালী কবিসমাজে তাঁহার আসন সুপ্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। শ্রীচৈতন্য-পূর্ব্ববর্ত্তী কালে যেমন চণ্ডীদাস 'ও বিদ্যাপতি, শ্রীচৈতন্য-পরবর্ত্তী দিনে তেমনই জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস।
আধুনিক কবিগণের কবিতা আলোচনায় কবি-মানসীর প্রয়োজনীয়তা প্রায় অপরিহার্য্য হইয়া পড়িয়াছে। এমন কি, এই জ্ঞানদাসেরই সুবিখ্যাত “রজনী শাঙন ঘন, ঘন দেয়া গরজন” পদের আলোচনায় স্বয় রবীন্দ্রনাথ পর্য্যন্ত কবির মানসীর অস্তিত্ব কল্পনা করিয়াছিলেন। কবির উক্তি---“অদ্ধকার বাদলা রাতে মনে পড়ছে এ পদটা—"রজনী শাঙন ঘন ঘন দেয়া গরজন”--- . . . সে দিন রাধিকার ছবির পিছনে কবির চোখের কাছে কোন একটি মেয়ে ছিল। ভালবাসার কুঁড়িধরা তার মন, মুখ-চোরা সেই মেয়ে। চোখে কাজলপরা, ঘাট থেকে নীল শাড়ী নিঙাড়ি নিঙাড়ি চলা। সে মেয়ে আজ নেই। আছে শাঙন ঘন, আছে সেই স্বপ্ন, আজো সমানই।”
.
রবীন্দ্রনাথের লেখায় জ্ঞানদাস নিয়ে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৬ সালে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত, “জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থে জ্ঞানদাসের পদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচনা নিয়ে লিখেছেন . . .
“জ্ঞানদাস বাঙ্গালা-কাব্যসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। আজিকার বাঙ্গালা-সাহিত্যের উন্নতির দিনেও বাঙ্গালী কবিসমাজে তাঁহার আসন সুপ্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। শ্রীচৈতন্য-পূর্ব্ববর্ত্তী কালে যেমন চণ্ডীদাস 'ও বিদ্যাপতি, শ্রীচৈতন্য-পরবর্ত্তী দিনে তেমনই জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস।
আধুনিক কবিগণের কবিতা আলোচনায় কবি-মানসীর প্রয়োজনীয়তা প্রায় অপরিহার্য্য হইয়া পড়িয়াছে। এমন কি, এই জ্ঞানদাসেরই সুবিখ্যাত “রজনী শাঙন ঘন, ঘন দেয়া গরজন” পদের আলোচনায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্য্যন্ত কবির মানসীর অস্তিত্ব কল্পনা করিয়াছিলেন। কবির উক্তি---“অদ্ধকার বাদলা রাতে মনে পড়ছে এ পদটা—"রজনী শাঙন ঘন ঘন দেয়া গরজন”--- . . . সে দিন রাধিকার ছবির পিছনে কবির চোখের কাছে কোন একটি মেয়ে ছিল। ভালবাসার কুঁড়িধরা তার মন, মুখ-চোরা সেই মেয়ে। চোখে কাজলপরা, ঘাট থেকে নীল শাড়ী নিঙাড়ি নিঙাড়ি চলা। সে মেয়ে আজ নেই। আছে শাঙন ঘন, আছে সেই স্বপ্ন, আজো সমানই।”
.
সুকুমার সেন সংকলিত “বৈষ্ণব পদাবলী” গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৭ সালে এ প্রকাশিত, সুকুমার সেন সংকলিত “বৈষ্ণব পদাবলী” গ্রন্থের ৯০-পৃষ্ঠায় তিনি জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
"জ্ঞানদাস নিত্যানন্দের ভক্ত এবং তাঁর পত্নী জাহ্নবাদেবীর শিষ্য ও অনুচর ছিলেন। পদকর্তাদের মধ্যে জ্ঞানদাস বোধ করি শ্রেষ্ঠতম। রামানন্দ বসুর কোনো কোনো পদে জ্ঞানদাসের ভাব অনুভূত হয়।"
.
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলিকাতার ভারতকোষ-এ জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৯ থেকে ১৯৭৩ এর মধ্যে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলিকাতা থেকে, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র মজুমদার সহ অন্যান্য প্রমুখদের ব্যবস্থাপনায়, “ভারতকোষ”-এ জ্ঞানদাস---
“জ্ঞানদাস চৈতন্য-পরবর্তী বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের প্রধান পদকর্তাদের অন্যতম। সকল প্রাচীন পদসংকলন গ্রন্থেই জানদাসের পদ পাওয়া যায়। কিন্তু তাঁহার জীবন সম্পর্কে প্রামাণিক তথ্য খুব কমই জানা গিয়াছে। মোটামুটি বলা যায় যে ১৫২০ হইতে ১৫৩৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে বা ঐ সময়ের কাছাকাছি ব্রাহ্মণকুলে জ্ঞানদাসের জন্ম হয়। তাঁহার নিবাস ছিল বর্ধমান জেলার (পূর্বে বীরভূমের অন্তর্গত) কাঁদড়া গ্রামে।
জ্ঞানদাস নিত্যানন্দের ভক্ত ছিলেন। তিনি নিত্যানন্দের সাক্ষাৎসম্পর্কেও আসিয়া থাকিতে পারেন। “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁহাকে নিত্যানন্দ-শাখাতেই গণনা করিয়াছেন। তাঁহার কিছু পদে নিত্যানন্দের সখ্যরসাশ্রিত সাধনার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। জ্ঞানদাসই প্রথম বৈষ্ণব কবি যিনি “ষোড়শ গোপাল”-এর রূপ বর্ণনা করিয়া উৎকৃষ্ট পদরচনা করিয়াছেন। জ্ঞানদাসের নিত্যানন্দলীলাবর্ণনাও প্রত্যাক্ষবৎ উজ্জ্বল।
নরহরি চক্রবর্তীর “ভক্তিরত্নাকর” ও “নরোত্তমবিলাস”-এর বিবরণ হইতে জানা যায় যে জ্ঞানদাস নিত্যানন্দ-পত্নী জাহ্নবাদেবীর শিষ্য ছিলেন। খুব সম্ভব, নিত্যানন্দের তিরোধানের পর তিনি জাহ্নবাদেবীর নিকটেই আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন।
জাহ্নবাদেবী ও তাঁহার শিষ্যবর্গসহ জ্ঞানদাস কাটোয়া ও খেতুরির বৈষ্ণবমহোৎসবে যোগ দিয়াছিলেন। উৎসবের পরে জাহ্নবাদেবী যখন সদলে বৃন্দাবন গমন করেন তখন জ্ঞানদাসও তাঁহার সঙ্গে ছিলেন। বৃন্দাবনে তিনি শ্রীজীব, রঘুনাথদাস, গোপাল ভট্ট, কৃষ্ণদাস কবিরাজ প্রমুখ বৈষ্ণব সাধক এবং পণ্ডিতদিগের সাক্ষাৎসম্পর্কে আসেন।
সাধক হিসাবে জ্ঞানদাসের খ্যাতি ছিল। “ভক্তিরত্নাকর” গ্রন্থে কাটোয়ার উৎসব বর্ণনায় জ্ঞানদাসকে “মোহাস্ত”দের একজন বলিয়া ধরা হইয়াছে। তিনি কৈশোরেই বৈরাগ্য অবলম্বন করিয়াছিলেন বলিয়া কথিত আছে। কাঁদড়ায় জ্ঞানদাসেব একটি মঠ 'আছে। এখনও সেখানে প্রতি বৎসর তাঁহার স্মরণে মেলা ও উত্সব হয়। সঙ্গীতজ্ঞ এবং নূতন কীর্তন পদ্ধতির উদ্ভাবক হিসাবেও জ্ঞানদাসের খ্যাতির কথা শোনা যায়।
বাংলা পদকর্তারূপেই জ্ঞানদাস সমধিক পরিচিত। ব্রজবুলিতেও তিনি প্রচুর পব রচনা করিয়াছেন। তাহার কোন কোনটিতে উংৎকৃষ্ট কলাকৌশলের পরিচয়ও আছে। জ্ঞানদাসের স্বকীয়তা ও কবি-প্রতিভার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন তাঁহার সরল ও অলংকারবাহুল্যবর্জিত বাংলা পদে।
“রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর। / প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর”॥ অথবা “সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু আনলে পুড়িয়া গেল”, জ্ঞানদাসের এই রকম অনেক পদ সর্বজনবিদিত।
জ্ঞানদাসের পদের সহজ সৌন্দর্য ও সুকুমার সূক্ষ্মতা চণ্ডীদাসকে স্মরণ করায়। তাঁহার কিছু পদ চণ্ডীদাসের নামে চলিয়া গিযাছে বলিয়া অনুমান করা হয়। তাঁহার পদে যে মানবিকতার স্পর্শ আছে, যে সহজ লাবণ্য ও অনুভূতির গভীরতা আছে, তাহা চণ্ডীদাস ছাড়া অন্যত্র দুর্লভ।
সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে জ্ঞানদাসের বিষয়-বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। তাঁহার গৌরাঙ্গসম্পর্কিত পগগুলিতে তেমন বিশিষ্টতা না থাকিলেও, রাধাকৃষ্ণ প্রণয়লীলার বিভিন্ন পর্যায়ের পদে বিচিত্র রস-সঞ্চারে তিনি অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়াছেন। রূপানুরাগ ও আক্ষেপানুরাগেই তিনি যেন স্বধর্ম খুঁজিয়া পাইয়াছেন। এখানে তিনি অতুলনীয়।”
.
রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রর পদামৃত মাধুরি ৪র্থ খণ্ডে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে
১৯৬২ (সম্ভবতঃ) সালে প্রকাশিত নবদ্বীপ চন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পাদিত শ্রীপদামৃতমাধুরী, ৪র্থ খণ্ডের কবিদের পরিচয়ে লিখেছেন . . .
“সুপ্রসিদ্ধ পদকর্তা জানদাস বর্ধমান জেলার কাঁদড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি গোবিন্দদাস, বলরামদাসের সমসাময়িক কবি। খেতরির মহোৎসবে ইঁহারা সকলেই উপস্থিত ছিলেন। অতএব জ্ঞানদাস ষোড়শ, শতাব্দীর কবি। জ্ঞানদাস ব্রাহ্মণ এবং মঙ্গলঠাকুর নামে পরিচিত ছিলেন। জ্ঞানদাসের কবিতায় চণ্ডীদাসের সুস্পষ্ট প্রভাব দেখিতে পাওয়া যায়। গোবিন্দদাসে যেরূপ বিদ্যাপতির শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের আড়ম্বর দেখা যায়, জ্ঞানদাসে সেইরূপ চণ্ডীদাসের সরল সহজ আবেগপূর্ণ ভাবোচ্ছাস পাওয়া যায়া। এইজন্য জ্ঞানদাসের কতকগুলি পদ বাংলা কাব্য সাহিত্যে অতুলনীয়। পদকর্ত্তা চণ্ডীদাস যে জ্ঞানদাসের পূর্ববর্তী, জ্ঞানদাসের কবিতাই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। জ্ঞানদাস সুগায়ক ছিলেন। জ্ঞানদাস প্রমুখ গায়কগণের চেষ্টায় মনোহরসাহী কীর্ত্তন-পদ্ধতির প্রবর্ত্তন হয়। পূর্ব্ববঙ্গে যেমন নরোত্তমদাস ঠাকুর গরাণহাটী কীর্ত্তনের প্রবর্ত্তক বলিয়া বিখ্যাত, পশ্চিমবঙ্গে সেইরূপ মনোহরসাহী ঢঙের কীর্ত্তনের জন্য জ্ঞানদাস প্রভৃতি প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। ইঁহাদের চেষ্টায় মনোহরসাহী সুর বা কীর্ত্তন সারা বঙ্গদেশে প্রচলিত হয়। বর্দ্ধমান জেলার একটি পরগণার নাম মনোহরসাহী ; ঐ স্থানের নাম হইতেই সুরের নাম হইয়াছে। কীর্ত্তন সুরের প্রধান চারিটি শাখা যথা --- গরাণহাটী, মনোহরসাহী, রেণেটি ও মন্দারিণী ; তন্মধ্যে প্রথম দুইটিই সুরের কারুকার্য্য ও তালের কলাকৌশলের দিক দিয়া প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছে।”
.
সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান ১ম খণ্ড-এ জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, ১ম খণ্ড-এ জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“জ্ঞানদাস (ষোড়শ শতাব্দী) কাঁদড়া --- বর্ধমান। মঙ্গল-ব্রাহ্মণবংশীয় ছিলেন বলে মঙ্গল ঠাকুর, শ্রীমঙ্গল, মদনমঙ্গল প্রভৃতি নামেও অভিহিত হতেন। তিনিই সর্বপ্রথম “ষোড়শ গোপাল” -এর রূপ বর্ণনা করে উৎকৃষ্ট পদ রচনা করেন। বৃন্দাবনে তিনি শ্রীজীব, রঘুনাথদাস, গোপাল ভট্ট, কৃষ্ণদাস কবিরাজ প্রমুখ বৈষ্ণব সাধক এবং পণ্ডিতদের সাক্ষাৎ-সম্পর্কে আসেন। নিত্যানন্দের ভক্ত ছিলেন। ব্রজবুলিতেও প্রচুর পদ রচনা করেছেন এবং রাধাকৃষ্ণ-প্রণয়লীলার বিভিন্ন পর্যায়ের পদে বিচিত্র রসসঞ্চারে অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ (?) “মাথুর” ও “মুরলীশিক্ষা” বৈষ্ণবগীতিকাব্যের মহামূল্য রত্ন। সাধক হিসাবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। "ভক্তিরত্নাকর” গ্রন্থে কাটোয়ার উদৎসব-বর্ণনায় তাঁকে “মোহন্ত” দের একজন বলে ধরা হয়েছে। সংগীতজ্ঞ এবং কীর্তনের নূতন পদ্ধতির উদ্ভাবক হিসাবেও তাঁর খ্যাতি ছিল।”
.
ডঃ দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ থেকে প্রকাশিত, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদসঙ্কলন” সঙ্কলনের, পরিশিষ্টের ২৩৩ পৃষ্ঠায় তিনি জ্ঞানদাস নিয়ে লিখেছেন . . .
“বর্ধমান জেলার কাঁদড়া গ্রামে ১৫৩০ খৃষ্টাব্দে ব্রাহ্মণ বংশে জ্ঞানদাসের জন্ম। কবি ছিলেন নিত্যানন্দ পত্নী জাহ্নবাদেবীর শিষ্য ও অনুচর। খেতুরীর বৈষ্ণব মহোৎসবে তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং এখানে সমসাময়িক কবি বলরামদাস ও গোবিন্দদাসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।”
.
কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্যের সংক্ষিপ্ত বৈষ্ণব অভিধানে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৭৮ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, শিলং শাখা থেকে প্রকাশিত, কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্যে সম্পাদিত “সংক্ষিপ্ত বৈষ্ণব অভিধান”-এ জ্ঞানদাস সম্বন্ধে রয়েছে . . .
“জ্ঞানদাস বিখ্যাত পদকর্তা। ১৫৩০ খ্রীষ্টাব্দে সিউড়ি ও কাটোয়ার মধ্যবর্তী কাঁদড়া গ্রামে জন্ম। ব্রাহ্মণ। পদকর্তা বলরাম দাস ও গোবিন্দ দাসের সমসাময়িক। গোবিন্দদাস ছিলেন বিদ্যাপতির অনুকরণকারীদের মধ্যে প্রধান এবং জ্ঞানদাস চণ্ডীদাসের অনুকরণকারীদের মধ্যে প্রধান। ইনি নিত্যানন্দ প্রভুর পত্নী জাহ্নবা দেবীর মন্ত্র শিষ্য ছিলেন।”
.
শিশিরকুমার দাসের সংসদ বাংলা সাহিত্যসঙ্গী-তে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
২০০৩ সালে প্রকাশিত, শিশিরকুমার দাস সম্পাদিত “সংসদ বাংলা সাহিত্যসঙ্গী”-তে জ্ঞানদাস সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন . . .
“জ্ঞানদাস ষেড়শ শতকের প্রথমার্ধে বর্ধমান জেলায় কাঁদড়া গ্রামে জন্ম। বৈষ্ণব পদাবলী রচয়িতাদের মধো অন্যতম। গোবিন্দদাসকে যেমন বিদ্যাপতির উত্তরসাধক মনে করা হয়, তিনি চণ্ডীদাসের ভাবধারার উত্তরসূরী রূপে পরিচিত। অনুরাগ ও আক্ষেপানুরাগের পদে তাঁর বিশেষ খাতি। বৈষ্ণব পদাবলীর নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে তিনি তাঁর স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন ঘটনা সংস্থান সৃষ্টির মৌলিকতায় এবং রূপবিহ্বলতায়। পুরোনো বাংলা কাব্যে ইন্দ্রিয়াতুর গীতলতার অপরূপ প্রকাশ তাঁর কয়েকটি কবিতায়। “রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর", “এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা", "মনের মরম কথা" ইত্যাদি পদশুলি বাংলা কবিতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। তাঁর পাঁচশোর বেশি পদ সংগৃহীত হয়েছে।”
আমরা মিলনসাগরে কবি জ্ঞানদাসের বৈষ্ণব পদাবলী ও তাঁর জীবন আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা। এই পাতা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জ্ঞানদাসের প্রতি মিলনসাগরের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
কবি জ্ঞানদাসের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
আমাদের ই-মেল : srimilansengupta@yahoo.co.in
হোয়াটসঅ্যাপ : +৯১ ৯৮৩০৬৮১০১৭
এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ৯.৪.২০০৯
এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ১০.২.২০১৭
৬৩১টি পদ সহ মোবাইল স্যাভ্যি সংস্করণ - ১৯.১২.২০২৪
.
.
.
.
একমাত্র পীতাম্বর দাসের রসমঞ্জরী ১৭ শতকের শেষ পাদে সংকলিত ব্যতীত প্রাচীন সমস্ত পদসংকলন-গ্রন্থে জ্ঞানদাসের পদ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, এবং সকলেই কবি হিসাবে তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। বৈষবদাসের 'পদকল্পতরু'তে ১৮ শতকের তৃতীয় পাদে সংকলিত) ৩১০১ টি পদের মধ্যে জানদাসের ১৮৬ টি পদ রযেছে। ডঃ বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী" গ্রন্থে ৪৭৪ টি অসন্দিগ্ধ এবং ৩০ টি সন্দিদ্ধ, মোট ৫০৪ টি পদ সংগ্রহ করে দিয়েছেন।
কবিত্বের উৎকর্ষ বিচারে জ্ঞানদাস-পদাবলীর ছুটি স্তর অনুমান করা যায়। প্রথম শিক্ষানবিশী কালে তিনি বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস এবং অন্যান্য দু-একজন পূর্বসূরীর অনুসরণ করেছেন, ক্রমান্বয়ে যখন তার কবিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে, এই কবিদের, ---বিশেষ করে চণ্ডীদাসের কাব্যাদর্শকে যেন স্বীকরণের দ্বারা আত্মসাৎ করে এবং সেই সঙ্গে স্বীয় মৌলিক প্রতিভার সংযোজনের সাহায্যে এক নতূন লিরিক প্রেমানুভূতির কবিরূপে আমাদের সামনে আবির্ভূত হয়েছেন। বৃন্দাবনের রাধাকৃষ্ণের প্রেমকথার মাধ্যমে কবি যেন নরনারীর শাশ্বত প্রেম-বেদনার কথাই শোনাতে চেয়েছেন। এই ব্যক্তিক লিরিক-প্রেমানুভূতির ক্ষেত্রে জ্ঞানদাস দীর্ঘ চার শতাব্দীকালের ব্যবধান অতিক্রম করে, মধ্যযুগীয় বিশিষ্ট ধর্মগোষ্ঠীর সীমা অতিক্রম করে বৈষ্ণব-অবৈষ্ণব নির্বিশেষে এ-যুগের প্রেমাকুলে পাঠক ও শ্রোতৃ-হৃদয়ের সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছেন। তাঁর কয়েকটি অবিস্মরণীয় পদ এ-যুগের শ্রেষ্ঠকবি রবীন্দ্রনাথের মনে কি গভীর রেখাপাত করেছিল একাধিক প্রসঙ্গে তার উল্লেখ পাওয়া যায়।
@ - খেতরী মহোৎসব ঠিক কোন্ সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবিষয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভে রয়েছে। ডঃ রাধাগোবিন্দ নাথের মতে ১৬০১-২ এর কাছাকাছি সময়ে এই মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কেহ কেহ এই তারিখ ১৫৮১ বলে ধরেছেন।…”
.
প্রিয়নাথ জানার বঙ্গীয় জীবনকোষ গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৫ সালে প্রকাশিত প্রিয়নাথ জানা তাঁর "বঙ্গীয় জীবনকোষ" গ্রন্থে জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“চৈতন্যোত্তর যুগের শ্রেষ্ঠ কবিদেব মধ্যে পদকর্তা জ্ঞানদাস অন্যতম। এঁর বিস্তৃত পরিচয় আবিষ্কৃত হয়নি। তবে যতদূর জানা যায়--- ইনি বর্ধমান জেলার অন্তর্গত কাটোয়ার দশ মাইল পশ্চিমে কাঁদড়াগ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৫৩০ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি নিত্যানন্দ শাখাভুক্ত ছিলেন। নিত্যানন্দ-পত্নী জাহ্নবী দেবী ছিলেন এঁর গুরু। জ্ঞানদাস, গোবিন্দ দাস, বলরাম দাস প্রভৃতির সমকালিক কবি। খেতুরীর মহোৎসবে ইনি উপস্থিত ছিলেন। কাঁদড়া গ্রামে জ্ঞানদাসের একটি মঠ এখনো আছে। পৌষ মাসের পূর্ণিমায় সেখানে প্রতি বৎসর মহোৎসব এবং সেই সঙ্গে তিন দিন ব্যাপী মেলা হয়। বৈষ্ণব পদ রচনায় জ্ঞানদাস একাধারে বাংলা, ব্রজবুলি ও বাংলা-ব্রজবুলি বিমিশ্র ভাষার ব্যবহাব করেছেন। তবে ব্রজবুলি ভাষায় রচিত পদের সংখ্যাই অধিক। কিন্তু বাংলা ভাষায় রচিত পদগুলি ব্রজবুলি পদগুলির তুলনায় অনেক উৎকৃষ্ট। “রূপানুরাগ”, “রসোদগার” এবং "মাথুর” বিষয়ক পদগুলিতেই জ্ঞানদাসের কবিত্বের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বিদ্যমান।”
.
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে
১৯৫৬ সালে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত, “জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থে জ্ঞানদাসের জীবনী বা পরিচিতি এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
“রাঢ়দেশে কান্দরা নামেতে গ্রাম হয়।
যথায় মঙ্গল জ্ঞানদাসের আলয়॥
ভক্তিরত্বাকরের এই দুই ছত্র কবিতা লইয়া বাঙ্গালা-সাহিত্যে বহু গবেষণা হইয়া গিয়াছে। অনেকেই বলিয়াছেন, মঙ্গল জ্ঞানদাসেরই অপর নাম। কারণ ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কেহ বলিয়াছেন, “জ্ঞানদাস দেখিতে অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন তাই লোকে তাহাকে মঙ্গল বলিত।” আবার অন্য জনে বলিয়াছেন, “জ্ঞানদাস ভুবনমঙ্গল হরিনাম বিতরণ করিতেন, এইজন্যই সকলে তাঁহাকে মঙ্গল জ্ঞানদাস বলিয়া ডাকিত।'' দেহসৌষ্ঠব এবং হরিনাম বিতরণের জন্য মঙ্গল উপাধি প্রাপ্য হইলে সে কালের বৈষ্ণবগণের প্রায় সকলেই তাহা পাইতেন। এ কথাটা কেহ ভাবিয়া দেখেন নাই। এখনো কাহারো কাহারো বিশ্বাস মঙ্গল এবং জ্ঞানদাস একই ব্যক্তির নাম।
মঙ্গল একজন স্বনামধন্য ভক্ত এবং জ্ঞানদাস একজন সুবিখ্যাত পদকর্তা, দুইজন পৃথক ব্যক্তি। দুইজনই কান্দারার অধিবাসী। মঙ্গল ঠাকুর শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের অন্তরঙ্গ পার্ষদ শ্রীল গদাধর পণ্ডিতের শিষ্য। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে গদাধর শাখা গণনায় ইঁহার নাম আছে--- “যদু গাঙ্গুলী আর মঙ্গল বৈষ্ণব।” বৈষ্ণব-সাহিত্যে মঙ্গল ঠাকুর মঙ্গল বৈষ্ণব নামে পরিচিত। কান্দরায় ইঁহার বংশধরগণ বর্ত্তমান রহিয়াছেন।”
এই পর্যন্ত উপরের “জ্ঞানদাস ও মঙ্গল ঠাকুর কি একই ব্যক্তি?” অধ্যায়ে দেওয়া রয়েছে। এবাৎ পরবর্তী অংশ . . .
“মঙ্গল ঠাকুরের নিবাস ছিল মুর্শিদাবাদ জেলার কিরীটকোণা গ্রামে। কুলপরিচয়ে ইনি কিরীটকোণার পালধি বংশজাত। শৈশবে মাতৃপিতৃহীন হইয়া কুলদেবতা শ্রীনৃসিংহদেব শালগ্রাম লইয়া ঘুরিতে ঘুরিতে মঙ্গল কান্দরার পশ্চিমে রাঢ়ীপুরের ডাঙ্গায় আসিয়া বাস করেন। শালগ্রামের ভোগের জন্য তিনি দিনে একবার মাত্র ভিক্ষায় বাহির হইতেন। অবশিষ্ট সময় তাঁহার ভগবন্নাম কীর্ত্তনেই অতিবাহিত হইত। কান্দরায় প্রবাদ আছে মঙ্গল ঠাকুরের সাধন-ভজনের কথা শুনিয়া শ্রীল গদাধর পণ্ডিত জীউ কান্দরায় শুভাগমনপৃর্ব্বক তাঁহাকে দীক্ষাদান এবং স্বপূজিত শ্রীগৌরাঙ্গগোপাল বিগ্রহের সেবার ভার সমর্পণ করেন। প্রবাদ শুনিয়াছি --- শ্রীল পণ্ডিত মহোদয় শারদীয় কল্পারম্ভের কৃষ্ণানবমী দিনে শুভাগমনপূর্ব্বক পরবর্ত্তী শুক্লা প্রতিপদ পর্য্যন্ত কান্দরায় অবস্থিতি করিয়াছিলেন। এই স্মরণীয় ঘটনার স্মৃতিরক্ষার জন্য কান্দরায় ঐ কয়দিন ব্যাপিয়া একটি উৎসবের অনুষ্ঠান হয়। উৎসবের নাম “সাজি উৎসব। পূর্ব্বে এই উৎসব উপলক্ষ্যে নানাস্থান হইতে ছোট-বড় বহু কীর্ত্তনীয়া কান্দরায় উপস্থিত হইতেন। বর্তমানে সময়ের পরিবর্ত্তনের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবেরও রূপান্তর ঘটিয়াছে। দেশে কীর্ত্তনীয়ার সংখ্যা কমিয়া আসিয়াছে। ঠাকুরবাড়ীর অবস্থাও পূর্ব্বের মত নাই।
পণ্ডিত মহোদয়ের অনুমতি লইয়া মঙ্গল ঠাকুর মাত্র তিনজন শিষ্যকে দীক্ষাদান করিয়াছিলেন। প্রথম, কাঁকড়া হুসমপুরের একজন চক্রবর্ত্তী উপাধিধারী ব্রাহ্মণ। দ্বিতীয় নিকটবর্তী রাজুর গ্রামের শ্রীনৃসিংহবল্লভ মিত্র। ইনি দীক্ষা গ্রহণের পর বীরভূম জেলার ময়নাডাল গ্রামে গিয়া বাস করেন। ময়নাডাল মঙ্গলের কৃপায় সে কালে মনোহরসাহী কীর্ত্তনের শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। নৃসিংহের বংশধরগণ মিত্রঠাকুর নামে পরিচিত। তৃতীয়, ময়নাডাল গ্রামের জনৈক অধিকারী-উপাধিধারী ব্রাহ্মণ। স্বপ্নাদিষ্ট হইয়া মঙ্গল ঠাকুর ইঁহারই কন্যাকে বিবাহ করিয়াছিলেন।
মঙ্গল ঠাকুরের তিন পুত্র---রাধিকাপ্রসাদ. গোপীরমণ এবং শ্যামকিশোর। এই তিন পুত্রের বংশধরগণ যখাক্রমে বড়বাড়ী, মধ্যমবাড়ী এবং ছোটবাড়ীর ঠাকুর নামে পরিচিত। বড়বাড়ীতে শ্রীবৃন্দাবনচন্দ্র যুগল বিগ্রহ, মধ্যম বাড়ীতে শ্রীরাধাকান্ত যুগল বিগ্রহ এবং ছোট বাড়ীতে শ্রীরাধাকৃষ্ণ যুগল বিগ্রহ, মঙ্গলঠাকুরের পূজিত শ্রীনৃসিংহদেব শালগ্রাম ও শ্রীগৌরাঙ্গ-গোপাল বিগ্রহ পূজা প্রাপ্ত হইতেছেন।
মঙ্গল ঠাকুরের বংশে বহু পণ্ডিত গায়ক এবং কবি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। প্রাচীন কীর্ত্তনীয়াগণের মুখে শুনিয়াছি, জ্ঞানদাস কান্দরার শ্যামকিশোরের পুত্র বদন, শ্রীখণ্ডের শ্রীরঘুনন্দন ঠাকুর এবং ময়নাডালের নৃসিংহ মিত্র ঠাকুরের সহায়তায় রাঢ়ের পুরাতন কীর্ত্তন-ধারাকে খেতরীর গড়েরহাটী ধারা হইতে স্বাতন্ত্র্য দানে মনোহরসাহী নামে প্রচলিত করিয়াছিলেন। পদকল্পতর সঙ্কলনের পরবর্তী কালের প্রসিদ্ধ পদকর্ত্তা শ্রীচন্দ্রশেখর ও শশিশেখর ভাতৃদ্বয় মঙ্গল ঠাকুরের বংশধর বলিয়া প্রসিদ্ধি আছে।
মঙ্গল ঠাকুর জ্ঞানদাসের সঙ্গে খেতরীর মহোত্সবে উপস্থিত ছিলেন। নরোত্তম-বিলাসে অপরাপর বৈষ্ণবগণের সঙ্গে ইঁহাদেরও নাম আছে। খেতরী যাত্রাপথে কাটোয়ায় গিয়াছিলেন---
রঘুমিশ্র কাশীনাথ পণ্ডিত উদ্ধব।
শ্রীনয়নানন্দ মিশ্র মঙ্গল বৈষ্ণব॥
* * *
* * *
মুরারী মুকুন্দ জ্ঞানদাস মনোহর॥
বৈষ্ণব জগতে সুপরিচিত কান্দরা গ্রাম বীরভূমের মধ্য দিয়া উদ্ধারণপুর যাইবার পথে আমদপুর হইতে দক্ষিণ-পূর্ব্বদিকে প্রায় আটক্রোশ দূর। আামদপুর-কাটোয়া শাখা রেলপখের ষ্টেশন রামজীবনপুর কান্দরারই অপর নাম। ষ্টেশনের নাম কান্দরা না রাখিয়া কেন রামজীবনপুর রাখা হইয়াছিল জানি না। গ্রামখানি পূর্বে খুব সমৃদ্ধ ছিল। মাঝে অনেক দিন অবনতির দশা গিয়াছে। রেলপণ প্রতিষ্ঠিত হইবার পর পুনরায় গ্রামের শ্রী ফিরিয়াছে। কিন্ত ঠাকুরবাড়ীর অতীত সমৃদ্ধি আর ফিরিয়া আসে নাই।
গ্রামে প্রায় সহস্রাধিক ঘর লোকের বাস। শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বেশী না হইলেও বর্দ্ধিষ্ণু লোকের সংখ্যা মন্দ নহে। পূর্ব্বের কান্দরায় মুন্সেফী আদালত ছিল। সাব-রেজেস্ট্রী কার্য্যালয় ছিল। এখন একটি উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় ও ডাকঘর আছে। সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। হাটে গৃহস্থের প্রয়োজনীয় সকল রকম জিনিষই পাওয়া যায়। স্টেশনের নিকট চাউলের আড়ৎ, কয়লার ডিপো ও অন্যান্য জিনিষের দোকান আছে।
কেহ কেহ লিখিয়াছেন, জ্ঞানদাস চিরকুমার ছিলেন। কান্দরায় প্রবাদ আছে, জ্ঞানদাস বিবাহিত ছিলেন। তাঁহার দুইটি পুত্রসন্তান হইয়াছিল। শ্রীপাদ নিত্যানন্দ তনয় শ্রীলবীরচন্দ্র প্রভুর ইষ্টচিন্তায় বিঘ্ন উৎপাদন করায় পুত্র দুইটি অকালে পরলোকগত হন। জ্ঞানদাস শ্রীপাদ নিত্যানন্দ-পত্নী শ্রীযুক্তা জাহ্নবী দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করেন। জাহ্নবী দেবী একবার এবং শ্রীল বীরচন্ত্র প্রভু দুইবার কান্দরায় শুভাগমন করিয়াছিলেন। কান্দরায় কায়স্থ বংশীয় জয়গোপাল দাস পাণ্ডিত্য গর্ব্বে শ্রীল বীরচন্ত্র প্রভুকে অবজ্ঞা করায় বৈষ্ণব সমাজে অপাংক্তেয় হইয়াছিলেন।
কান্দ্রায় জ্ঞানদাসের মঠ অন্যতম দ্রষ্টব্য স্থান। এই মঠে (আখড়ায়) জ্ঞানদাসের পূজিত শ্রীশ্রীরাধাগোবিন্দ যুগল বিগ্রহ আজিও পূজাপ্রাপ্ত হইতেছেন। জ্ঞানদাসের বন্ধু মনোহরের ---আউলিয়া মনোহর দাসের ভ্রাতা শ্রীকিশোর দাস জ্ঞানদাসের মঠের প্রথম মোহান্ত। জ্ঞানদাসের তিরোধানের পর তিনিই শ্রীবিগ্রহযুগলের পূজার ভার গ্রহণ করেন। কিশোরের বংশ লোপ পাইলে তাঁহার শিষ্যা-প্রশিষ্যগণ মঠের সেবাপূজা নির্ব্বাহ করিয়া আসিতেছেন।
জ্ঞানদাস বাঙ্গালা-কাব্যসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। আজিকার বাঙ্গালা-সাহিত্যের উন্নতির দিনেও বাঙ্গালী কবিসমাজে তাঁহার আসন সুপ্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। শ্রীচৈতন্য-পূর্ব্ববর্ত্তী কালে যেমন চণ্ডীদাস 'ও বিদ্যাপতি, শ্রীচৈতন্য-পরবর্ত্তী দিনে তেমনই জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস।
আধুনিক কবিগণের কবিতা আলোচনায় কবি-মানসীর প্রয়োজনীয়তা প্রায় অপরিহার্য্য হইয়া পড়িয়াছে। এমন কি, এই জ্ঞানদাসেরই সুবিখ্যাত “রজনী শাঙন ঘন, ঘন দেয়া গরজন” পদের আলোচনায় স্বয় রবীন্দ্রনাথ পর্য্যন্ত কবির মানসীর অস্তিত্ব কল্পনা করিয়াছিলেন। কবির উক্তি---“অদ্ধকার বাদলা রাতে মনে পড়ছে এ পদটা—"রজনী শাঙন ঘন ঘন দেয়া গরজন”--- . . . সে দিন রাধিকার ছবির পিছনে কবির চোখের কাছে কোন একটি মেয়ে ছিল। ভালবাসার কুঁড়িধরা তার মন, মুখ-চোরা সেই মেয়ে। চোখে কাজলপরা, ঘাট থেকে নীল শাড়ী নিঙাড়ি নিঙাড়ি চলা। সে মেয়ে আজ নেই। আছে শাঙন ঘন, আছে সেই স্বপ্ন, আজো সমানই।”
.
রবীন্দ্রনাথের লেখায় জ্ঞানদাস নিয়ে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৬ সালে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত, “জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থে জ্ঞানদাসের পদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচনা নিয়ে লিখেছেন . . .
“জ্ঞানদাস বাঙ্গালা-কাব্যসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। আজিকার বাঙ্গালা-সাহিত্যের উন্নতির দিনেও বাঙ্গালী কবিসমাজে তাঁহার আসন সুপ্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। শ্রীচৈতন্য-পূর্ব্ববর্ত্তী কালে যেমন চণ্ডীদাস 'ও বিদ্যাপতি, শ্রীচৈতন্য-পরবর্ত্তী দিনে তেমনই জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস।
আধুনিক কবিগণের কবিতা আলোচনায় কবি-মানসীর প্রয়োজনীয়তা প্রায় অপরিহার্য্য হইয়া পড়িয়াছে। এমন কি, এই জ্ঞানদাসেরই সুবিখ্যাত “রজনী শাঙন ঘন, ঘন দেয়া গরজন” পদের আলোচনায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্য্যন্ত কবির মানসীর অস্তিত্ব কল্পনা করিয়াছিলেন। কবির উক্তি---“অদ্ধকার বাদলা রাতে মনে পড়ছে এ পদটা—"রজনী শাঙন ঘন ঘন দেয়া গরজন”--- . . . সে দিন রাধিকার ছবির পিছনে কবির চোখের কাছে কোন একটি মেয়ে ছিল। ভালবাসার কুঁড়িধরা তার মন, মুখ-চোরা সেই মেয়ে। চোখে কাজলপরা, ঘাট থেকে নীল শাড়ী নিঙাড়ি নিঙাড়ি চলা। সে মেয়ে আজ নেই। আছে শাঙন ঘন, আছে সেই স্বপ্ন, আজো সমানই।”
.
সুকুমার সেন সংকলিত “বৈষ্ণব পদাবলী” গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৭ সালে এ প্রকাশিত, সুকুমার সেন সংকলিত “বৈষ্ণব পদাবলী” গ্রন্থের ৯০-পৃষ্ঠায় তিনি জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
"জ্ঞানদাস নিত্যানন্দের ভক্ত এবং তাঁর পত্নী জাহ্নবাদেবীর শিষ্য ও অনুচর ছিলেন। পদকর্তাদের মধ্যে জ্ঞানদাস বোধ করি শ্রেষ্ঠতম। রামানন্দ বসুর কোনো কোনো পদে জ্ঞানদাসের ভাব অনুভূত হয়।"
.
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলিকাতার ভারতকোষ-এ জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৯ থেকে ১৯৭৩ এর মধ্যে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলিকাতা থেকে, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র মজুমদার সহ অন্যান্য প্রমুখদের ব্যবস্থাপনায়, “ভারতকোষ”-এ জ্ঞানদাস---
“জ্ঞানদাস চৈতন্য-পরবর্তী বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের প্রধান পদকর্তাদের অন্যতম। সকল প্রাচীন পদসংকলন গ্রন্থেই জানদাসের পদ পাওয়া যায়। কিন্তু তাঁহার জীবন সম্পর্কে প্রামাণিক তথ্য খুব কমই জানা গিয়াছে। মোটামুটি বলা যায় যে ১৫২০ হইতে ১৫৩৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে বা ঐ সময়ের কাছাকাছি ব্রাহ্মণকুলে জ্ঞানদাসের জন্ম হয়। তাঁহার নিবাস ছিল বর্ধমান জেলার (পূর্বে বীরভূমের অন্তর্গত) কাঁদড়া গ্রামে।
জ্ঞানদাস নিত্যানন্দের ভক্ত ছিলেন। তিনি নিত্যানন্দের সাক্ষাৎসম্পর্কেও আসিয়া থাকিতে পারেন। “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁহাকে নিত্যানন্দ-শাখাতেই গণনা করিয়াছেন। তাঁহার কিছু পদে নিত্যানন্দের সখ্যরসাশ্রিত সাধনার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। জ্ঞানদাসই প্রথম বৈষ্ণব কবি যিনি “ষোড়শ গোপাল”-এর রূপ বর্ণনা করিয়া উৎকৃষ্ট পদরচনা করিয়াছেন। জ্ঞানদাসের নিত্যানন্দলীলাবর্ণনাও প্রত্যাক্ষবৎ উজ্জ্বল।
নরহরি চক্রবর্তীর “ভক্তিরত্নাকর” ও “নরোত্তমবিলাস”-এর বিবরণ হইতে জানা যায় যে জ্ঞানদাস নিত্যানন্দ-পত্নী জাহ্নবাদেবীর শিষ্য ছিলেন। খুব সম্ভব, নিত্যানন্দের তিরোধানের পর তিনি জাহ্নবাদেবীর নিকটেই আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন।
জাহ্নবাদেবী ও তাঁহার শিষ্যবর্গসহ জ্ঞানদাস কাটোয়া ও খেতুরির বৈষ্ণবমহোৎসবে যোগ দিয়াছিলেন। উৎসবের পরে জাহ্নবাদেবী যখন সদলে বৃন্দাবন গমন করেন তখন জ্ঞানদাসও তাঁহার সঙ্গে ছিলেন। বৃন্দাবনে তিনি শ্রীজীব, রঘুনাথদাস, গোপাল ভট্ট, কৃষ্ণদাস কবিরাজ প্রমুখ বৈষ্ণব সাধক এবং পণ্ডিতদিগের সাক্ষাৎসম্পর্কে আসেন।
সাধক হিসাবে জ্ঞানদাসের খ্যাতি ছিল। “ভক্তিরত্নাকর” গ্রন্থে কাটোয়ার উৎসব বর্ণনায় জ্ঞানদাসকে “মোহাস্ত”দের একজন বলিয়া ধরা হইয়াছে। তিনি কৈশোরেই বৈরাগ্য অবলম্বন করিয়াছিলেন বলিয়া কথিত আছে। কাঁদড়ায় জ্ঞানদাসেব একটি মঠ 'আছে। এখনও সেখানে প্রতি বৎসর তাঁহার স্মরণে মেলা ও উত্সব হয়। সঙ্গীতজ্ঞ এবং নূতন কীর্তন পদ্ধতির উদ্ভাবক হিসাবেও জ্ঞানদাসের খ্যাতির কথা শোনা যায়।
বাংলা পদকর্তারূপেই জ্ঞানদাস সমধিক পরিচিত। ব্রজবুলিতেও তিনি প্রচুর পব রচনা করিয়াছেন। তাহার কোন কোনটিতে উংৎকৃষ্ট কলাকৌশলের পরিচয়ও আছে। জ্ঞানদাসের স্বকীয়তা ও কবি-প্রতিভার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন তাঁহার সরল ও অলংকারবাহুল্যবর্জিত বাংলা পদে।
“রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর। / প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর”॥ অথবা “সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু আনলে পুড়িয়া গেল”, জ্ঞানদাসের এই রকম অনেক পদ সর্বজনবিদিত।
জ্ঞানদাসের পদের সহজ সৌন্দর্য ও সুকুমার সূক্ষ্মতা চণ্ডীদাসকে স্মরণ করায়। তাঁহার কিছু পদ চণ্ডীদাসের নামে চলিয়া গিযাছে বলিয়া অনুমান করা হয়। তাঁহার পদে যে মানবিকতার স্পর্শ আছে, যে সহজ লাবণ্য ও অনুভূতির গভীরতা আছে, তাহা চণ্ডীদাস ছাড়া অন্যত্র দুর্লভ।
সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে জ্ঞানদাসের বিষয়-বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। তাঁহার গৌরাঙ্গসম্পর্কিত পগগুলিতে তেমন বিশিষ্টতা না থাকিলেও, রাধাকৃষ্ণ প্রণয়লীলার বিভিন্ন পর্যায়ের পদে বিচিত্র রস-সঞ্চারে তিনি অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়াছেন। রূপানুরাগ ও আক্ষেপানুরাগেই তিনি যেন স্বধর্ম খুঁজিয়া পাইয়াছেন। এখানে তিনি অতুলনীয়।”
.
রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রর পদামৃত মাধুরি ৪র্থ খণ্ডে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে
১৯৬২ (সম্ভবতঃ) সালে প্রকাশিত নবদ্বীপ চন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পাদিত শ্রীপদামৃতমাধুরী, ৪র্থ খণ্ডের কবিদের পরিচয়ে লিখেছেন . . .
“সুপ্রসিদ্ধ পদকর্তা জানদাস বর্ধমান জেলার কাঁদড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি গোবিন্দদাস, বলরামদাসের সমসাময়িক কবি। খেতরির মহোৎসবে ইঁহারা সকলেই উপস্থিত ছিলেন। অতএব জ্ঞানদাস ষোড়শ, শতাব্দীর কবি। জ্ঞানদাস ব্রাহ্মণ এবং মঙ্গলঠাকুর নামে পরিচিত ছিলেন। জ্ঞানদাসের কবিতায় চণ্ডীদাসের সুস্পষ্ট প্রভাব দেখিতে পাওয়া যায়। গোবিন্দদাসে যেরূপ বিদ্যাপতির শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের আড়ম্বর দেখা যায়, জ্ঞানদাসে সেইরূপ চণ্ডীদাসের সরল সহজ আবেগপূর্ণ ভাবোচ্ছাস পাওয়া যায়া। এইজন্য জ্ঞানদাসের কতকগুলি পদ বাংলা কাব্য সাহিত্যে অতুলনীয়। পদকর্ত্তা চণ্ডীদাস যে জ্ঞানদাসের পূর্ববর্তী, জ্ঞানদাসের কবিতাই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। জ্ঞানদাস সুগায়ক ছিলেন। জ্ঞানদাস প্রমুখ গায়কগণের চেষ্টায় মনোহরসাহী কীর্ত্তন-পদ্ধতির প্রবর্ত্তন হয়। পূর্ব্ববঙ্গে যেমন নরোত্তমদাস ঠাকুর গরাণহাটী কীর্ত্তনের প্রবর্ত্তক বলিয়া বিখ্যাত, পশ্চিমবঙ্গে সেইরূপ মনোহরসাহী ঢঙের কীর্ত্তনের জন্য জ্ঞানদাস প্রভৃতি প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। ইঁহাদের চেষ্টায় মনোহরসাহী সুর বা কীর্ত্তন সারা বঙ্গদেশে প্রচলিত হয়। বর্দ্ধমান জেলার একটি পরগণার নাম মনোহরসাহী ; ঐ স্থানের নাম হইতেই সুরের নাম হইয়াছে। কীর্ত্তন সুরের প্রধান চারিটি শাখা যথা --- গরাণহাটী, মনোহরসাহী, রেণেটি ও মন্দারিণী ; তন্মধ্যে প্রথম দুইটিই সুরের কারুকার্য্য ও তালের কলাকৌশলের দিক দিয়া প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছে।”
.
সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান ১ম খণ্ড-এ জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, ১ম খণ্ড-এ জ্ঞানদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“জ্ঞানদাস (ষোড়শ শতাব্দী) কাঁদড়া --- বর্ধমান। মঙ্গল-ব্রাহ্মণবংশীয় ছিলেন বলে মঙ্গল ঠাকুর, শ্রীমঙ্গল, মদনমঙ্গল প্রভৃতি নামেও অভিহিত হতেন। তিনিই সর্বপ্রথম “ষোড়শ গোপাল” -এর রূপ বর্ণনা করে উৎকৃষ্ট পদ রচনা করেন। বৃন্দাবনে তিনি শ্রীজীব, রঘুনাথদাস, গোপাল ভট্ট, কৃষ্ণদাস কবিরাজ প্রমুখ বৈষ্ণব সাধক এবং পণ্ডিতদের সাক্ষাৎ-সম্পর্কে আসেন। নিত্যানন্দের ভক্ত ছিলেন। ব্রজবুলিতেও প্রচুর পদ রচনা করেছেন এবং রাধাকৃষ্ণ-প্রণয়লীলার বিভিন্ন পর্যায়ের পদে বিচিত্র রসসঞ্চারে অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ (?) “মাথুর” ও “মুরলীশিক্ষা” বৈষ্ণবগীতিকাব্যের মহামূল্য রত্ন। সাধক হিসাবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। "ভক্তিরত্নাকর” গ্রন্থে কাটোয়ার উদৎসব-বর্ণনায় তাঁকে “মোহন্ত” দের একজন বলে ধরা হয়েছে। সংগীতজ্ঞ এবং কীর্তনের নূতন পদ্ধতির উদ্ভাবক হিসাবেও তাঁর খ্যাতি ছিল।”
.
ডঃ দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রন্থে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ থেকে প্রকাশিত, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদসঙ্কলন” সঙ্কলনের, পরিশিষ্টের ২৩৩ পৃষ্ঠায় তিনি জ্ঞানদাস নিয়ে লিখেছেন . . .
“বর্ধমান জেলার কাঁদড়া গ্রামে ১৫৩০ খৃষ্টাব্দে ব্রাহ্মণ বংশে জ্ঞানদাসের জন্ম। কবি ছিলেন নিত্যানন্দ পত্নী জাহ্নবাদেবীর শিষ্য ও অনুচর। খেতুরীর বৈষ্ণব মহোৎসবে তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং এখানে সমসাময়িক কবি বলরামদাস ও গোবিন্দদাসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।”
.
কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্যের সংক্ষিপ্ত বৈষ্ণব অভিধানে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
১৯৭৮ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, শিলং শাখা থেকে প্রকাশিত, কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্যে সম্পাদিত “সংক্ষিপ্ত বৈষ্ণব অভিধান”-এ জ্ঞানদাস সম্বন্ধে রয়েছে . . .
“জ্ঞানদাস বিখ্যাত পদকর্তা। ১৫৩০ খ্রীষ্টাব্দে সিউড়ি ও কাটোয়ার মধ্যবর্তী কাঁদড়া গ্রামে জন্ম। ব্রাহ্মণ। পদকর্তা বলরাম দাস ও গোবিন্দ দাসের সমসাময়িক। গোবিন্দদাস ছিলেন বিদ্যাপতির অনুকরণকারীদের মধ্যে প্রধান এবং জ্ঞানদাস চণ্ডীদাসের অনুকরণকারীদের মধ্যে প্রধান। ইনি নিত্যানন্দ প্রভুর পত্নী জাহ্নবা দেবীর মন্ত্র শিষ্য ছিলেন।”
.
শিশিরকুমার দাসের সংসদ বাংলা সাহিত্যসঙ্গী-তে জ্ঞানদাস - ^^ উপরে ফেরত
২০০৩ সালে প্রকাশিত, শিশিরকুমার দাস সম্পাদিত “সংসদ বাংলা সাহিত্যসঙ্গী”-তে জ্ঞানদাস সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন . . .
“জ্ঞানদাস ষেড়শ শতকের প্রথমার্ধে বর্ধমান জেলায় কাঁদড়া গ্রামে জন্ম। বৈষ্ণব পদাবলী রচয়িতাদের মধো অন্যতম। গোবিন্দদাসকে যেমন বিদ্যাপতির উত্তরসাধক মনে করা হয়, তিনি চণ্ডীদাসের ভাবধারার উত্তরসূরী রূপে পরিচিত। অনুরাগ ও আক্ষেপানুরাগের পদে তাঁর বিশেষ খাতি। বৈষ্ণব পদাবলীর নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে তিনি তাঁর স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন ঘটনা সংস্থান সৃষ্টির মৌলিকতায় এবং রূপবিহ্বলতায়। পুরোনো বাংলা কাব্যে ইন্দ্রিয়াতুর গীতলতার অপরূপ প্রকাশ তাঁর কয়েকটি কবিতায়। “রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর", “এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা", "মনের মরম কথা" ইত্যাদি পদশুলি বাংলা কবিতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। তাঁর পাঁচশোর বেশি পদ সংগৃহীত হয়েছে।”
আমরা মিলনসাগরে কবি জ্ঞানদাসের বৈষ্ণব পদাবলী ও তাঁর জীবন আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা। এই পাতা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জ্ঞানদাসের প্রতি মিলনসাগরের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
কবি জ্ঞানদাসের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
আমাদের ই-মেল : srimilansengupta@yahoo.co.in
হোয়াটসঅ্যাপ : +৯১ ৯৮৩০৬৮১০১৭
এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ৯.৪.২০০৯
এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ১০.২.২০১৭
৬৩১টি পদ সহ মোবাইল স্যাভ্যি সংস্করণ - ১৯.১২.২০২৪
.