নরোত্তম দাসের রচনা সম্ভার - পাতার উপরে . . .
নরোত্তম দাসের রচনার মধ্যে রয়েছে প্রেমভক্তি চন্দ্রিকা, সাধনভক্তি চন্দ্রিকা, সাধ্যপ্রেম চন্দ্রিকা ইত্যাদি গ্রন্থ।
তাঁর কয়েকটি কড়চায় ( বিষেশত দেহ কড়চায় ) বাংলা গদ্যের প্রাচীন রূপ লক্ষ করা যায়। তাঁর প্রার্থনার
পদাবলী বৈষ্ণব সাহিত্যে বিশেষ মান্যতা পেয়েছে। রসিক ভক্ত হিসেবে নরোত্তম দাস বৈষ্ণব সংসারে
স্মরণীয়তমদের একজন।
বৈষ্ণবেরা কার্ত্তিকমাসে দ্বারে দ্বারে খঞ্জরি ও করতাল সহ পাঁচটি পদ গেয়ে নামসংকীর্ত্তন করেন। এই পাঁচটি
পদের দুটি নরোত্তম দাসের রচিত। সেই পাঁচটি পদ হলো প্রেমদাসের “অশেষ গুণের নিধি গৌরাঙ্গসুন্দর”,
নরোত্তম দাসের “কলিযুগে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য অবতার”, শচীনন্দনের “জয় জয় গৌরহরি শচীনন্দন”,
দ্বিজ হরিদাসের “ভাদ্রকৃষ্ণা-অষ্টমীতে দেবকী উদরে” এবং নরোত্তম দাসের “প্রণমহ কলিযুগ সর্ব্বযুগসার”।
বাংলায় শ্রীশ্রীকৃষ্ণের পাঁচালীকার হিসেবেও তাঁর নাম রয়েছে।
হিন্দু দেবৃদেবীদের অষ্টোত্তর শতনামের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
কবি নরোত্তম দাসের বৈষ্ণব পদাবলীর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
উত্স: ডঃ শিশির কুমার দাশ, সংসদ সাহিত্য সঙ্গী ২০০৩
. সুকুমার সেন, বৈষ্ণব পদাবলী, সাহিত্য অ্যাকাদেমি
কবি নরোত্তম দাস - গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের
ভাবুক সম্প্রদায়ের অবি-সংবাদী নেতা ছিলেন। তিনি
জন্মগ্রহণ করেন অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার
গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলীর পদ্মাতীরস্থ গোপালপুর
গ্রামে। উত্তরবঙ্গের এক বড় রাজকর্মচারী-জমিদারের
ঘরের ছেলে, তিনি পিতার একমাত্র সন্তান। সংসারে
থেকেও ইনি উদাসীন বৃত্তি অবলম্বন করেছিলেন।
৯ই অক্টোবর ২০১৪ . . .
আমরা কৃতজ্ঞ শ্রী এন সি দাস মহাশয়ের কাছে যিনি আমাদের কবি ও পদকর্তা নরোত্তম দাসের ছবি এবং
তাঁর নিম্নলিখিত জীবনীটি পাঠিয়েছেন। আমরা তা হুবহু নীচে তুলে দিচ্ছি . . .
তাঁর ইমেল - Phillip Biswas writers2003@yahoo.co.in
. **************************
জমির আইলের ওপর দিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে লোক আসছে; ছেলে,বুড়ো, নানান বয়সের মেয়েরা। ওদিকে
সড়কপথে বাসের ভিড়, আর প্রত্যেক বাসেই লোক উপচে পড়ছে। নসিমন-করিমন নামের ভুটভুটি গুলো
চেপেও লোক আসছে তো আসছেই। কাছে পিঠেতো বটেই, দুরদুরান্ত থেকে, অন্য জেলা থেকেও লোক
আসার বিন্দুমাত্র কমতি নেই। প্রেমতলীর খেতুরধামে মহাউৎসবের ছোঁয়া। খেতুরের মেলা, কত কত মানুষ
এই মেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। বৈষ্ণবরাতো বটেই এমনকি যারা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক নন তাঁরাও
ভিড় করেন এই মেলায়। এতো শুধু মেলা, নয় এ এক পুণ্য তীর্থও। রাজশাহীর খেতুরের যে মহামানবটির
স্মৃতিতে এ মেলার জন্ম তিনি শ্রী শ্রী নরোত্তমদাস ঠাকুর। মানব প্রেমের ব্রত নিয়ে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন।
মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যের সর্বগ্রাসী কৃষ্ণপ্রেমের মদীরায় মাতাল হয়ে ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন মানুষে মানুষে
ভেদাভেদ আর হিংসা-হানাহানির আগুন। তাইতো যুগ যুগ ধরে মানুষ তাঁর স্মরনে এসে মিলেছে প্রেমতলীর
খেতুরধামের এই গৌরাঙ্গবাড়ীর চত্বরে। চলছে পুজা-পাঠ আর নামগান। ঈশ্বরের প্রেমে সকল মানুষকে এক
করে ফেলার এই মহা আয়োজন।
কিংবদন্তী আছে একবার মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামকীর্তনের সময় কৃষ্ণ-প্রেমের আবেশে বিভোর হয়ে
পদ্মানদীর দিকে ফিরে নরোত্তম, নরোত্তম বলে কেঁদে উঠেছিলেন। ঈশ্বর প্রেমের আকুতি তিনি সমর্পন
করেছিলেন পদ্মার কাছে, যে পদ্মা যথাসময়ে পদ্মাতীরস্থ খেতুরে সেই সম্পদ অর্পন করবে এক অনাগত
ঈশ্বর-প্রেমিককে। কিংবদন্তী তবু কিংবদন্তীই, কিন্তু বৈষ্ণব সমাজে ও পূর্ববাংলায় বৈষ্ণব ভাবধারার
বিকাশে শ্রী নরোত্তম ঠাকুর বিশেষ একটি নাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
নরোত্তম ঠাকুরের জন্ম ১৫৩১ খ্রীষ্টাব্দে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলীর পদ্মাতীরস্থ
গোপালপুর গ্রামে। ১৬১১ খ্রীষ্টাব্দে প্রেমতলীর খেতুরধামেই তাঁর জীবনাবসান হয়। পিতা কৃষ্ণানন্দ দত্ত ছিলেন
জমিদার। শোনা যায় মাঘী পূর্ণিমার গোধুলী লগ্নে শ্রীমতী নারয়ণীর গর্ভে জন্ম গ্রহন করেন
নরোত্তমদাস ঠাকুর। ছিলেন জমিদারপুত্র, বিলাস ব্যসনে জীবন কাটানোই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু কথায় বলে
স্বয়ং কৃষ্ণ যার অন্তঃকরনে ডাক পাঠান তাকে বেঁধে রাখবে কে। সংসারের মায়া কাটিয়ে সন্ন্যাস নিলেন
নরোত্তমদাস। বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীদের কাছে পৌঁছে গেলেন। অধ্যয়ন করলেন বৈষ্ণব ভাবধারার পাঠ,
দর্শন। বৈষ্ণব সমাজে ও ধর্মীয় ভাবধারায় বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীদের অবদান, প্রভাব ও মাহাত্ম্য
বিশেষভাবেই উল্লেখযোগ্য। রূপ ও সনাতন গোস্বামীর পর যার হাল ধরেন তাঁদেরই ভাইপো জীবগোস্বামী।
ছিলেন রঘুনাথ ভট্ট, গোপালদাস ও রঘুনাথদাস। নানান শাস্ত্র রচনা করে এঁরাই বৈষ্ণব দর্শনের ভিত্তি মজবুত
করে তৈরী করে দিয়েছিলেন। এঁদের তত্ত্বাবধানেই বৈষ্ণব ভাবধারায় পাঠ নিয়ে তা প্রচারে উদ্দেশ্যে বেরিয়ে
পড়েন শ্রীনিবাস-নরোত্তম-শ্যামানন্দ। বৃন্দাবনে ষড়গোস্বামীদের উত্তরাধিকার লাভ করেন এই তিন জন।
ষোড়ষ ও সপ্তদশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে তখন ভারতে স্থাপিত হতে চলেছে মোগল সাম্রাজ্য। এই সময়ে এঁদের
প্রচারেই সারা বাংলা আবার নতুন করে বৈষ্ণব মহোৎসব আর হরিনাম সংকীর্তণে ভেসে গেল। নরোত্তম
দাস ঠাকুর ছিলেন এই তিন জনেরই একজন। বৃন্দাবন থেকে আবার স্বগ্রামে ফিরে এসে প্রতিষ্ঠা করলেন
খেতুরধাম। হরিনাম সংকীর্তন আর বৈষ্ণব ভাবধারার প্রচার চলতে থাকলো। নরোত্তম দাস ঠাকুরের সরল
সদাশয় আচারে আর ধর্মীয় নিষ্ঠায় সকল স্তরের মানুষ আকৃষ্ট হয়ে তার চারপাশে ভিড় করলো। ১৫৮৩ বা
১৫৮৪ খ্রীষ্টাব্দে খেতুরে নরোত্তম আয়োজন করেন এক বৈষ্ণব মহাসম্মেলনের। এই মহোৎসবটি ছিল বৈষ্ণব
ইতিহাসে নানা দিক থেকেই একটি মহৎ ঘটনা। পূর্ববাংলায় বৈষ্ণব ভাবধারা প্রচারেই শুধু নয় নরোত্তমদাস
ঠাকুরের রচিত পদাবলী গুলোও ছিল অনন্য। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর প্রার্থনা-বিষয়ক রচনাগুলো
তাঁর বৈষ্ণব ধর্মে নিষ্ঠা আর অসাধারন চরিত্রমাধুর্যে অনন্য শ্রী ধারণ করে আছে। নরোত্তম ঠাকুরের এই
মহোৎসব থেকেই রসকীর্তনের এক অনন্য ধারার সুচনা হয়, প্রচলিত হয় গৌরচন্দ্রিকা গানের রীতি। গৌরাঙ্গ
বা মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের প্রশংসা ও তাঁর স্মৃতিতে ভক্তি নিবেদন দিয়ে শুরু হতো হরিনাম সংকীর্তন।
সারা বাংলায় হরিনাম সংকীর্তনে বিভিন্ন ঠাট ও রীতিও গড়ে ওঠে এ সময় থেকে। রানিহাটি বা রেনেটি,
ঝাড়খণ্ডি, গরানহাটি রীতি প্রভৃতি তারই ফল। নরোত্তম দাস ঠাকুরের খেতুরধামেই প্রবর্তিত হয় গরানহাটি
রীতিটির। সে সময় খেতুর ছিল গড়ানহাটি পরগনার অন্তর্ভুক্ত আর সেই সুত্রেই এই সংকীর্তন রীতিটির
নামকরন হয় গড়ানহাটি বা গরানহাটি।
ক্রমে এই খেতুরধামই হয়ে ওঠে একটি বিশিষ্ট বৈষ্ণব কেন্দ্র। নানান শ্রেণীর, নানান স্তরের মানুষ এসে এখানে
নরোত্তম দাস ঠাকুরের কাছে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন। শোনা যায় অনেক দুরাত্মা ও দস্যু প্রকৃতির
লোকও হিংসার পথ পরিত্যাগ করে এখানে কৃষ্ণ প্রেমে দীক্ষা নিয়েছে। তাঁর তিরোধানের দিবসকে কেন্দ্র
করে ঠিক কবে থেকে খেতুর মেলার উদ্ভব হয় তার হদিস মেলেনা। কিন্তু বছরের পর বছর এখানে বৈষ্ণব
ভক্তরা এসে মিলেছেন। হরিনাম সংকীর্তনে মাতিয়ে তুলেছেন খেতুরধামের আকাশ-বাতাস। যুগের পর যুগ
ধরে এই মেলা মহামিলনের রূপ নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ভক্তদের কাছে এই ধামের মাহাত্ম্য আরো
বেশি। তারা বলেন নদীয়া, পুরী, বৃন্দাবন এই তিন ধামের পুণ্য এখানে একসাথে পাওয়া সম্ভব। কেউ কেউ
এও বলেন এই ধামে হরিনাম সংকীর্তনে রাত্রি যাপনের পুণ্য উপরোক্ত তিন ধামে রাত্রি যাপনের সমান।
অসংখ্য ভক্ত পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপস্থিত হন খেতুর ধামে। বসে যায় বিরাট মেলা। মাটিরপুতুল ও
অন্যান্য খেলনা থেকে শুরু করে, পুজা-উপচারের সামগ্রী, দৈনন্দিন গেরস্থালীর জিনিস পত্র, লোকজশিল্প প্রসুত
রকমারী বাহারী দ্রব্য সামগ্রীর এক অপূর্ব সমাহার। কেনাকাটাও চলে ভালো। তবে মেলাকে অতিক্রম করে
যায় এর তীর্থ মাহাত্ম্য। পরিবার পরিজন নিয়ে ভক্তরা এখানে শুয়ে বসে কীর্তন শোনেন, রীতি মাফিক
পুজোয় অংশ নেন, প্রায়ই হরিনাম সংকীর্তনে অংশ নিয়ে সব ভুলে যান। যারা বাংলার ঐতিহ্য ও অতীত
সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহী তারাও জড়ো হন মেলায়। যুগ পরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে আসা একটা সংস্কৃতিকে
এভাবেই তারা উপভোগ করেন আর অজান্তেই ধর্মীয় বেড়াজাল টপকে এক হয়ে যান অহিংসা আর
মহামিলনের এক অনন্য স্রোতধারায়।
--- শ্রী এন সি দাস।
. **************************
আমাদের ই-মেল - srimilansengupta@yahoo.co.in
এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ২০০৬
মোট ১০টি পদ সহ পরিমার্জিত সংস্করণ - ১৭.০৭.২০১৩
শ্রী এন সি দাস-এর পাঠানোর কবির ছবি ও জীবনীর অন্তর্ভুক্তি - ৯.১০.২০১৪
মোট ১৮৭টি পদ নিয়ে এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ১৮.৩.২০১৯
...
নরোত্তম ঠাকুরের মন্ত্রদাতা ছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পার্ষদ শ্রীলোকনাথ ঠাকুর। তিনি যশোহর জেলার
অন্তর্গত তালখড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা পদ্মনাথ চক্রবর্ত্তী অদ্বৈতাচার্যের শিষ্য ছিলেন।
নরোত্তম ঠাকুর প্রসিদ্ধ বৈষ্ণব পণ্ডিত এবং কবি ছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে অথবা সপ্তদশ
শতাব্দীর গোড়ায় তাঁর জন্মভূমিতে বৈষ্ণব সুধীগণের এক সম্মেলন হয়। এই সম্মেলন বৈষ্ণব সাহিত্যের
ইতিহাসে খেতুরীর মহোত্সব নামে পরিচিত এবং তাতেই আসর-বাঁধা পদাবলী কীর্তনের সূত্রপাত।
নরোত্তম ঠাকুরের প্রিয় মিত্র ছিলেন মহাকবি গোবিন্দদাস কবিরাজের অগ্রজ রামচন্দ্র কবিরাজ। রামচন্দ্রের
পরলোক গমনের পরে নরোত্তমদাস ভারাক্রান্ত হৃদয়ে পদরচনাও করেছিলেন। শ্রীনিবাসাচার্য্য এবং শ্যামানন্দ
তাঁর মিত্রদের অন্যতম ছিলেন।