মহাজীবন কবি তারাপদ লাহিড়ীর সংক্ষিপ্ত জীবনী। কবিপুত্র উৎপলাভ লাহিড়ী।
লেখাটি পাঠিয়েছেন কবি সোমনাথ গুহ। মিলনসাগরে আমরা তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ রইলাম।
তৎকালীন পূর্ববঙ্গ এবং বর্তমান বাংলাদেশের একটি জেলার নাম ফরিদপুর। ফরিদপুরের ৪টি মহকুমার মধ্যে একটির নাম গোয়ালন্দ। গোয়ালন্দ মহকুমার একটি গ্রামের নাম বেলেকাঁদি।এখানেই ১৯০২ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিপ্লবী মনীষী তারাপদ লাহিড়ী। তাঁর মাতামহ ছিলেন অভিজাত ভূস্বামী পরিবারের সন্তান। পিতামহ ছিলেন বড় জমিদারি মহলের ম্যানেজার। তাঁর পিতা সীতানাথ লাহিড়ী। মাতা অন্নপূর্ণা দেবী। তারাপদ লাহিড়ীর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন তাঁর মা অন্নপূর্ণা দেবী। সেই সময়ে নারীশিক্ষার পক্ষে প্রতিকূল পরিবেশেও অন্নপূর্ণা দেবী যশোর জেলায় ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। খ্যাতনামা কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বই উপহার দিয়েছিলেন। খুব শৈশবেই তারাপদবাবু মায়ের মুখে হেমচন্দ্রের ‘ভারত সঙ্গীত’, নবীনচন্দ্রের ‘পলাশীর যুদ্ধ’--- এইসব কবিতা শুনেছিলেন। হেমচন্দ্রের ‘ভারত সঙ্গীত’ কবিতার কয়েকটি পঙক্তি এখানে উল্লেখ করা যেতে পারেঃ--- বাজ্ রে শিঙ্গা,বাজ এই রবে, সবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে, সবাই জাগ্রত মানের গৌরবে, ভারত শুধুই ঘুমায়ে রয়। তারাপদ লাহিড়ী প্রথমে গ্রামের ইস্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন সরকারি উচ্চ পদস্থ আধিকারিক। তিনি ভাইয়ের জন্য ফরিদপুর শহরের স্কুলে ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনার বন্দোবস্ত করেন।তিনি যখন ম্যাট্রিকুলেশন দিচ্ছেন তখনই ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ কর্তৃক ঘোষিত হল মন্টেগু-চেমস্ফোর্ড শাসনতান্ত্রিক সংস্কার। এই আইনে ভারতীয়দের কোনো অধিকার-ই স্বীকৃত হলো না। গান্ধীজি দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন।বাংলায় আন্দোলনের জোয়ার প্রথমে ততটা ছিল না। কিন্তু দেশবন্ধু চিত্তরাঞ্জন দাস ওকালতি ত্যাগ করে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় প্রবল আলোড়ন সৃস্টি হলো। তারাপদ লাহিড়ী তখন ম্যাট্রিকুলেশনের ৬টি পরীক্ষা দিয়েছেন। সপ্তম বা শেষ পরীক্ষাটি বাকি ছিল। তিনি সপ্তম পরীক্ষাটি না দিয়ে স্থির করলেন আর কোনও সরকারি বা সরকার অনুমোদিত স্কুলে পড়বেন না। তারাপদ লাহিড়ী সর্বান্তঃকরণে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিলেন। ১৯২১ সালে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে সেই সময়ে আন্দোলনের সমর্থনে ঢাকার করোনেশন পার্কে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য তাঁকে গ্রেফতার করা হলো। ভারতীয় দণ্ডবিধির 124A ধারায় অর্থাৎ রাষ্ট্রদ্রোহের ধারায় অভিযুক্ত হয়ে তিনি কারারুদ্ধ হলেন। প্রথমে কয়েকদিন ফরিদপুরের স্থানীয় জেল, এরপর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরিত হলেন। সেখানে জেলের অবস্থা তখন ছিল ভয়াবহ। রাজনৈতিক বন্দীদের প্রায় মানবেতর শ্রেণির মত গণ্য করা হতো। বন্দীদের লাগাতার প্রতিবাদের ফলে পরে নিয়ম কিছুটা শিথিল হয়। ভক্ষণযোগ্য খাবার এবং রাত্রে শোয়ার জন্য কিছু উপকরণ সরবরাহ করা হয়। ১৯২২ সালের মে মাসে তারাপদ লাহিড়ী কারামুক্ত হন। এদিকে চৌরিচৌরার ঘটনার পরে গান্ধীজি আইন অমান্য কর্মসূচি স্থগিত রাখলেন। অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এল। এই সময়ে তারাপদবাবু গ্রামে গ্রামে ঘুরে কংগ্রেসের সংগঠন বিস্তারে মন দিলেন। এর সাথে ছিল চরকার প্রসার,প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণকার্য চালানো ইত্যাদি, যা ছিল গান্ধীজির গঠনমূলক কর্মসূচির অঙ্গ। এই সময় থেকেই তিনি বাড়িঘর ছেড়ে দিয়ে কংগ্রেস অফিসে থাকতে শুরু করলেন। মাঝে মাঝে বাড়িতে যেতেন মায়ের সাথে দেখা করার জন্য। এদিকে ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ড ঘটে গিয়েছে। এরপর বৃটিশ সরকার রাউলাট আইন বলবৎ করলো। অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে রুদ্ধদ্বার কারাকক্ষে একতরফা বিচার করে বিনা বিচারে আটক রাখার কালো আইন। গান্ধীজি বললেন, ”উকিল নেহি, দলিল নেহি, আপীল নেহি! পাঞ্জাবে ব্যাপক পুলিশি নির্যাতন শুরু হলো। এইসব নিয়ে জনমনে অসন্তোষ দানা বাঁধছিল।এরই মধ্যে চলে এল আইনসভার নির্বাচন। গান্ধীজি তথা কংগ্রেসের তরফে আইনসভা বয়কটের ডাক দেওয়া হলো। কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাশ বল্লেন, আইনসভায় গিয়ে সরকারকে পদে পদে পর্যুদস্ত করতে হবে। তাঁর প্রস্তাব কংগ্রেসে গৃহীত না হওয়ায় স্বরাজ্য দল গঠিত হলো। তারাপদ লাহিড়ী ও তাঁর অনুগামীরা এই পর্যায়ে আইনসভা বয়কটের পক্ষেই ছিলেন। এই সময়ে বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী মানুষজনেরা বাংলার বিভিন্ন স্থানে জাতীয় বিদ্যালয়, জাতীয় মহাবিদ্যালয় গড়ে তুলছিলেন। ১৯২২ সালে জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর তারাপদবাবু কিছুদিন ঢাকা জাতীয় মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা ছিল অদম্য। বেদান্ত দর্শন অধ্যয়নের জন্য একটা প্রবল আকুতি মনের ভিতরে ছিল। ১৯২৩ সাল নাগাদ একদিন ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপণ দেখেন। ‘ভারত ধর্ম মহামণ্ডল’ নামে বেনারসের একটি প্রতিষ্ঠান সংস্কৃত শিক্ষার্থী চেয়েছে। থাকার ব্যবস্থা তাঁরাই করবেন। তারাপদ লাহিড়ী প্রায় কপর্দকহীন অবস্থায় বেনারস চলে গেলেন। স্টেশনের প্রতীক্ষালয় থেকে বেরোতেই এক সাধু ভিক্ষা চাওয়ায় তিনি খুচরো যা ছিল তাঁকে দিয়ে পায়ে হেঁটে ‘ভারত ধর্ম মহামণ্ডল’-এর দরজায় পৌঁছলেন। সেখানকার কর্মকর্তা তাঁকে বললেন, হ্যাঁ, আমরা শিক্ষার্থী চেয়েছি। থাকার এবং আহারের ব্যবস্থা-ও আমরাই করি। তবে আপনাকে একটা বন্ড সই করতে হবে। কী বন্ড জিজ্ঞাসা করাতে জানা গেল শিক্ষা শেষে ঐ প্রতিষ্ঠানে ৬ বছর কর্মী হয়ে সনাতন ধর্ম প্রচার করতে হবে। তারাপদ লাহিড়ী ভাবলেন, ‘আমি তো ধর্মের জন্য এখানে আসিনি, আমি শিক্ষা গ্রহণ করতে এসেছি। তাহলে এখানে ৬ বছর আটক থেকে আমি কেন সনাতন ধর্ম প্রচার করবো? তারাপদ লাহিড়ী কর্মকর্তার ঐ প্রস্তাবে রাজী হলেন না। তখন এক সজ্জন ব্যক্তি তাঁকে সংবাদ দিলেন,একটু দূরেই আরেকটি শিক্ষাকেন্দ্র আছে। তারাপদবাবু তখন সেখানে গিয়ে ফণিভূষণ তর্করত্নের সাথে দেখা করে তাঁর অভিপ্রায় জানালেন। তখন সেখানে ১টি আসন খালি ছিল। ফণিভূষণ তর্করত্ন মহাশয় তাঁকে সংস্কৃত শিক্ষার জন্য ভর্তি করে নিলেন। এদিকে তাঁর এক সহপাঠী তাঁকে খবর দিল, বেনারসে হরিহর শাস্ত্রীর কাছে বেদান্ত দর্শন অধ্যয়ন করা যেতে পারে। হরিহর শাস্ত্রী তাঁকে বেদান্ত দর্শন পড়াতে সম্মত হলেন। হরিহর শাস্ত্রী তখন বেনারসে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সম্পাদক ছিলেন।তাঁরই উৎসাহে তারাপদ লাহিড়ী বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের কার্যালয়ে যাতায়াত শুরু করলেন। গ্রামীণ সমাজে অনেক অমূল্য কবিতা, গান, নাটক রচিত হয় যেগুলির সৃষ্টিকর্তার নাম জানা যায় না। তারাপদ লাহিড়ী এইসব নামপরিচয়হীন কবি ও লেখকদের নিয়ে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখলেন। অপরদিকে তিনি বিশ্বনাথ মন্দিরের ঠিক পাশেই সাধারণ গ্রন্থাগারে যেতেন। তিনি বেনারসের পণ্ডিত সমাজের পুরোধা মহামহোপাধ্যায় অন্নদাচরণ তর্কচূড়ামণি ও মহামহোপাধ্যায় যাদবেশ্বর তর্কচূড়ামণির সংস্পর্শে আসেন। বেনারসের সর্বজনশ্রদ্ধ্বেয় পণ্ডিত ভগবান দাসের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এইভাবেই চলছিল তাঁর জীবন। হঠাৎ একদিন টেলিগ্রাম আসে--- Father seriously ill. তিনি বেনারস থেকে ফরিদপুরে ফিরে আসেন।অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর পিতা সীতানাথ লাহিড়ী প্রয়াত হন। অসহযোগ আন্দোলনের পরে স্বাধীনতা আন্দোলনে একটা ভাঁটার টান এসেছিল। যে কোনও গণ-সংগ্রামে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই সময়ে তারাপদ লাহিড়ী কংগ্রেসের সংগঠনকে অটুট রাখার জন্য সদাসচেষ্ট ছিলেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে সভা-সমিতি করতেন ও অন্যান্য কাজ করতেন। ১৯২৪-২৫ সালের আগে গোয়ালন্দ মহকুমায় বিপ্লবী কার্যকলাপ তেমন কিছু ছিল না। তিনি বেনারস থেকে ফিরে এসে দেখলেন তাঁরই কয়েকজন রাজনৈতিক শিষ্য অনুশীলন সমিতিতে যোগ দিয়েছে।
এইসব তরুণ যুবকদের দৃঢচেতা মন, কঠোর সংকল্প এবং ত্যাগব্রত দেখে তারাপদ লাহিড়ীও অনুশীলন সমিতির প্রতি আকৃষ্ট হলেন। তাদেরই মাধ্যমে তৎকালীন অনুশীলন সমিতির বরিষ্ঠ নেতৃবৃন্দ মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, প্রতুল গাঙ্গুলি, কেদারেশ্বর সেন প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সংস্পর্শে এলেন। এই সময়ে অনুশীলন সমিতির বিপ্লবীদের চিন্তাভাবনায় একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এলো। তাঁরা উপলব্ধি করলেন, একটা সময়ে দেশবাসীকে গভীর ঘুম থেকে জাগ্রত করার জন্য ব্যক্তিহত্যা ও বিক্ষিপ্ত হিংসার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এখন আর এই পথ ফলপ্রসূ হবে না। তাই তারা সারা ভারতে সংগঠন বিস্তার ক’রে সশস্ত্র গণ- অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। ১৯২৮-এ ভারতে শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের অছিলায় বৃটিশ সরকার সাইমন কমিশন গঠন করলো। এই কমিশনে একজন ভারতীয় প্রতিনিধিকেও রাখা হলো না। সারা দেশ গর্জে উঠলো। গান্ধীজির ডাকে দেশজুড়ে হরতাল পালিত হলো। সর্বত্র সাইমন কমিশনকে বয়কট করা হলো। তারাপদ লাহিড়ী এই আন্দোলনে সর্বান্তঃকরণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আর এই আন্দোলনের রেশ ধরেই এলো ১৯৩০ সাল।কংগ্রেস আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দিল।হাজার হাজার মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দিলেন; অনুশীলন সমিতির বিপ্লবীরাও ছিলেন। তারাপদ লাহিড়ীকে ১৯৩০ সালের শুরুর দিকেই পুনর্বার গ্রেফতার করে আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হলো। সেই সময়ে আলিপুর জেলে তাঁর সহ-বন্দীদের মধ্যে ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত, চারুচন্দ্র ভাণ্ডারি, আনান্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, কিরণ শঙ্কর রায়, ডঃ প্রতাপচন্দ্র গুহ রায় প্রমুখ নেতৃবৃন্দ এবং আরো অনেকে। সেখানে অভিজ্ঞ পোড় খাওয়া বিপ্লবীদের মধ্যে ছিলেন অশ্বিনী গাঙ্গুলি, সতীশ চক্রবর্তী, পূর্ণচন্দ্র দাস, হরিপদ চ্যাটার্জী প্রমুখ। সেই সময়ে জেল কোড অনুযায়ী সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের স্বতন্ত্র বর্গ হিসেবে গণ্য করা হত না। কেবলমাত্র যাঁরা বেশি শিক্ষিত এবং উচ্চ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত তাঁদেরই স্বতন্ত্র শ্রেণি ধরা হত। তারাপদ লাহিড়ী ও আরো ১৬ জন রাজবন্দী সকল রাজনৈতিক বন্দীদের সমমর্যাদার দাবিতে অনশন ধর্মঘট শুরু করলেন। ১৫ দিন পর সুভাষচন্দ্র বসুর অনুরোধে অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো। ঠিক তার পরদিন ড. প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এসে বললেন, ‘তারাপদবাবু, আপনার মায়ের একটা চিঠি এসেছে’। সেই চিঠি হাতে পেয়ে দেখলেন একটা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী পত্র। সেখানে এক জায়গায় অন্নপূর্ণা দেবী লিখছেন, ‘আমার মনে হয় জেলের মধ্যে ছোটখাটো সুযোগ সুবিধার জন্য শক্তিক্ষয় না করে জেলের বাইরে এসে বৃহৎ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়াই শ্রেয়। ওটাই ছিল তাঁর মায়ের লেখা শেষ চিঠি কারণ তারাপদ লাহিড়ী কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার আগেই তাঁর মা অন্নপূর্ণা দেবী প্রয়াত হন।
এদিকে আইন অমান্য আন্দোলনের উত্তাল পরিস্থিতিতে ১৯৩১ সালের মার্চ মাসে গান্ধী-আরউইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। কয়েকটি শর্তের বিনিময়ে কংগ্রেস আইন অমান্য আন্দোলন সাময়িক স্থগিত রাখতে রাজী হলো। এই শর্তগুলির মধ্যে ছিল---বিপ্লবী-সহ সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে, গৃহস্থ প্রয়োজনে লবণ প্রস্তুত করতে পারবে ইত্যাদি। যদিও ভগৎ সিং-এর ফাঁসি রদ করা ও মুক্তির বিষয়টি শর্তে না থাকায় অনেকেই গান্ধীজি তথা কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করলেন। ঐ ’৩১-এর মার্চ মাসেই তারাপদ লাহিড়ী কারামুক্ত হলেন। এরপর তিনি মাত্র ৯ মাস বাইরে থাকার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর এই ৯ মাস ছিল রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত কর্মমুখর। অনেকেই তখন বুঝতে পারছিলেন আইন অমান্য আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউ আসতে চলেছে। সেইজন্য গ্রাম গ্রামান্তরে ঘুরে প্রস্তুতি গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। ১৯৩২ সালে আইন অমান্য আন্দোলন নতুন উদ্যমে শুরু হলে মানুষের মধ্যে বিপুল উৎসাহ, উদ্দীপনা দেখা দিল। ১৯৩২ সালের শুরুতেই তারাপদ লাহিড়ীকে আবার গ্রেফতার করা হল। এবারে তাঁকে পাঠানো হল হিজলি অ্যাডিশনাল স্পেশাল জেলখানায়। এই জেলটি ছিল খড়্গপুর শহর থেকে ১.৫ কিলোমিটার দূরে এক নির্জন স্থানে। এখানে তখন ছিলেন অজয় মুখার্জী, প্রফুল্ল ঘোষ, হরিপদ চ্যাটার্জী, প্রফুল্ল সেন, সতীশ সামন্ত ও আরো অনেক রাজনৈতিক কর্মী। জেলখানার অখাদ্য,অবমাননাকর পোষাক, রাত্রে থাকার চরম অব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবাদ জানালে বন্দীদের উপর নিপীড়ন নেমে এলো। তখন কারাবিধি অনুযায়ী একটা নিয়ম ছিল, জেল সুপারকে দেখলে হাত তুলে সেলাম জানাতে হবে। রাজনৈতিক বন্দীরা এই নিয়ম মানতে অস্বীকার করলে মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন আরো বেড়ে গেল। তারাপদ লাহিড়ী ১৯৩৩ সালের শেষ দিকে হিজলি জেল থেকে মুক্তি পেলেন। বাইরে এসে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সুরেশচন্দ্র মজুমদারের সাথে দেখা করলেন এবং হিজলি জেলে বন্দী নির্যাতনের বিশদ বিবরণ দিলেন। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রতিবাদী নিবন্ধ প্রকাশিত হল। প্রখ্যাত সাংবাদিক তথা সম্পাদক রামানন্দ চট্যোপাধ্যায়ের ‘Modern Review’ পত্রিকাতেও এই ঘটনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হল। এরপর জেল কোড থেকে ঐ নিয়ম উঠে গেল।
১৯৩৪ সালে B.P.C.C. বা বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির ঐতিহাসিক অধিবেশন বসল। এই অধিবেশনে তারাপদ লাহিড়ী ডেলিগেট ছিলেন। এই অধিবেশনে কংগ্রেস দু’টি শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি শিবির B.P.C.C.-র সভাপতিরূপে ডঃ বিধানচন্দ্র রায়কে নির্বাচিত করার প্রস্তাব রাখে। এই শিবিরের অন্যতম নেতা ছিলেন কিরণ শঙ্কর রায়। বিরোধী শিবির এই প্রস্তাবে সম্মত হলো না। বিরোধী শিবিরে ছিলেন অনুশীলন সমিতির সদস্যরা, মনেপ্রাণে গান্ধীবাদী কয়েকজন প্রতিনিধি এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। অবশেষে উভয় পক্ষই ১৭ জনের প্যানেল পেশ করলো। বিরোধী শিবিরের ১৭ জনের প্যানেলে তারাপদ লাহিড়ীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু ভোটাভুটিতে বিরোধী শিবিরের প্যানেল ২০ ভোটে পরাস্ত হয়। অতএব ডঃ বিধান চন্দ্র রায় বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হলেন। এর পরেই বোম্বাইতে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন বসে। তারাপদবাবু সেই অধিবেশনে প্রতিনিধি ছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের নতুন ওয়ার্কিং কমিটিতে বিধান রায় বাদ পড়লেন। বাংলার কাউকে রাখাই হলো না। এরপর বিধান রায় B.P.C. C. এবং কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করলেন। এই সময়েই বৃটিশ একটি মোক্ষম অস্ত্র দিয়ে ভারতবর্ষকে আঘাত করলো। সেটা ছিল communal award বা সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা। এর অর্থ হল হিন্দু সমাজের মধ্যে জাতপাতের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র নির্বাচক প্রথার প্রবর্তন। কংগ্রেস বোম্বাই অধিবেশনে এ সম্পর্কে দোদুল্যমান অবস্থান নিল। তারা communal award সম্পর্কে ‘না গ্রহণ না বর্জন’ নীতি গ্রহণ করলো। Neither acceptance, nor rejection. তারাপদ লাহিড়ী ও তাঁর সহকর্মীরা এই অধিবেশনে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা সম্পুর্ণ প্রত্যাখানের পক্ষে অভিমত দিয়েছিলেন। ১৯৩৫ সালের জানুয়ারি মাসে তারাপদ লাহিড়ী চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে পুনর্বার কারান্তরালে নিক্ষিপ্ত হলেন। তিনি প্রেসিডেন্সি জেলে ছিলেন। ১৯৩৫ থেকে ৩৮-এর এপ্রিল মাস পর্যন্ত তিনি জেলে ছিলেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে অল্প বয়সে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ার জন্য তিনি পড়াশোনার তেমন সুযোগ পাননি। প্রেসিডেন্সি জেল থেকে তিনি I.A. পরীক্ষা দিলেন। তখন একটা নিয়ম ছিল I.A. করার পর ২ বছরের মধ্যে B.A. পরীক্ষা দেওয়া যাবে না। তিনি এই অন্তর্বর্তী সময়ে মোক্তারি পাশ করলেন। ১৯৩৮ সালে জেল থেকে বেরিয়ে তিনি ফরিদপুর শহরে ওকালতি প্র্যাকটিস করা শুরু করলেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফৌজদারি মামলায় সর্বাগ্রগণ্য আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেন। এই সময়ে তিনি ফরিদপুর জেলা কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক ছিলেন।
এদিকে ৩০-এর দশকের আগে থেকেই অনুশীলন সমিতির কর্মীরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯৩০-এর ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রাম অভ্যুত্থানের পর প্রায় সমস্ত বিপ্লবী কারারুদ্ধ হন। এই সময়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃবৃন্দ ত্রিদিব চৌধুরী, বিজেন রায়, কুমিল্লার অতীন রায় প্রমুখ মার্কসবাদ সম্পর্কে গভীর অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন। তারাপদ লাহিড়ীও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। কারাগারের মধ্যেই চলতে থাকে অধ্যয়ন, তর্ক-বিতর্ক, বিচার-বিশ্লেষণ ও গবেষণা। অবশেষে অনুশীলন সমিতির সদস্যদের মধ্যে মার্কসবাদ সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মালো। কিন্তু তাঁরা কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেন না। ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি তখন comintern-এর অনুমোদিত দল আর কমিনটার্ন-এর প্রধান চালিকা শক্তি তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়া। অনুশীলনের নেতারা চিন্তা করলেন যদি রাশিয়া বৃটিশের মিত্রশক্তি হয় তাহলে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। কাজেই তাঁরা স্থির করলেন কোনও বাইরের সমাজতান্ত্রিক দেশের প্রতি আনুগত্য না রেখে ভারতীয় প্রেক্ষিতে ভারতবর্ষে স্বাধীনভাবে চলতে হবে। যাকে বলা যায় Non -Conformist Marxist. তাঁরা এবার বামপন্থী হিসেবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। এরপরে এলো ইতিহাসের সেই বহু আলোচিত ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম যাকে ইতিহাসে ‘হরিপুরা থেকে ত্রিপুরী’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেস সভাপতি হওয়ার পরে ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসে পুনর্নিবাচিত হওয়ার দাবি জানিয়ে কংগ্রেস প্রার্থী হলেন। অপরদিকে গান্ধীজি মনোনীত কংগ্রেস প্রার্থী হলেন পট্টভি সীতারামাইয়া। কংগ্রেসের মধ্যে অনুশীলন সমিতির বামপন্থীরা সুভাষচন্দ্র বসুকে সমর্থন করলেন। সুভাষচন্দ্র বসু ১৫৮০x১৩৭৭ ভোটে সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। ঠিক এই সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিল। অনেকেই মনে করলেন বৃটিশরা আর ভারতে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে না, ক্ষমতা হস্তান্তর আসন্ন। ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ভারতীয়দের তরফে সংবিধান রচনার প্রয়োজন তখন জরুরী হয়ে উঠছিল। কেউ কেউ বললেন, কংগ্রেসই ভারতের সংবিধান রচনা করবে। কিন্তু অনুশীলন সমিতির বামপন্থীরা, কম্যুনিস্ট পার্টির বামপন্থীরা এবং কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টির বামপন্থীরা--- সকলেই প্রাপ্তবয়স্কের ভোটদানের ভিত্তিতে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সভা আহ্বান করার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছিলেন। এদিকে অনুশীলনের বামপন্থীরা একটি নতুন দল গড়ার পথে অগ্রসর হলেন। ১৯৪০ সালের ১৯শে মার্চ বিহার প্রদেশের রামগড়ে এক ঐতিহাসিক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে জন্ম নিল নতুন রাজনৈতিক দল Revolutionary Socialist Party বা R.S.P. এখানে বিহার থেকে উপস্থিত ছিলেন যোগেন্দ্র সুকুল, রনেন সেন, বীরা রাঘবাচারিয়া প্রমুখ। উত্তর প্রদেশ থেকে ছিলেন কেশব প্রসাদ শর্মা। ত্রিদিব চৌধুরী বাংলার প্রথম রাজ্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলায় তখন সুপরিচিত নেতাদের মধ্যে ছিলেন যোগেশ চ্যাটার্জী, ত্রৈলোক্য চক্রবর্তী, প্রতুল গাঙ্গুলি, কুমিল্লার অতীন রায়, মনীন্দ্র চক্রবর্তী, চট্টগ্রামের মোক্ষদা চক্রবর্তী, নোয়াখালির শান্তিময় দত্ত, রাজসাহীর বীরেশ চক্রবর্তী প্রমুখ। তারাপদ লাহিড়ী এই R.S.P. দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
১৯৪২-এ গান্ধিজী তথা কংগ্রেস ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দিলে R.S.P. সম্পুর্ণরূপে ও সর্বান্তঃকরণে এই আন্দোলনে সামিল হয়। কিন্তু আন্দোলনের প্রারম্ভিক পর্বেই তারাপদ লাহিড়ী গ্রেফতার হন। তিনি ১৯৪২ থেকে ’৪৬ রাজসাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। জেলের ভিতরে জেল কর্তৃপক্ষ নানান অছিলায় রাজবন্দীদের অপদস্থ করত, হেনস্থা করত। এইজন্য জেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করা একটা নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। অবশেষে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নিজামুদ্দিন জেল পরিদর্শনে আসেন। এরপর জেল কর্তাদের আচরণ কিছুটা সংযত হয়। রাজসাহী কারাগারে তখন বহু রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর সমর্থক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একটা পারস্পরিক রেষারেষি ও সংঘাতের আবহ ছিল। জেলের ভিতরে তাঁদের শান্ত, সংযত রাখতে সদাসচেষ্ট থাকতে হত। তারাপদ লাহিড়ী স্থির করলেন, সংকীর্ণ দলাদলির মধ্যে না গিয়ে বাকি সময়টা চরকায় সুতো কাটবেন। তিনি জেল থেকে তাঁর সহধর্মিণীকে লিখে পাঠালেন একটা চরকা পাঠানোর জন্য। ’৪৬ সালে মুক্তির পর তিনি সেই চরকায় কাটা সুতো দিয়ে দু’টো শাড়ি তৈরি করিয়ে স্ত্রী-কে উপহার দিয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে স্ত্রী কল্যাণী লাহিড়ী তারাপদ লাহিড়ী’র দীর্ঘ বাধাবিঘ্নসংকুল জীবনে সবসময় তাঁর পাশে থেকেছেন, সহায়তা করেছেন। এদিকে রাজসাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকেই তিনি আইন পরীক্ষা দিলেন। Preliminary, Intermediate এবং Final. প্রিলিমিনারি ও ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন এবং ফাইনাল পরীক্ষায় তৃতীয়। M.A. পরীক্ষাতেও সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। নিজের পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজ ছাড়া বাকি সময়টা তিনি উৎসাহী তরুণ ছাত্রদের পড়াতেন। কারাগারের মধ্যে অনেক মেধাবী, কৃতী অধ্যাপক, শিক্ষক ছিলেন। সকলে মিলে জেলের মধ্যেই একটা কলেজের মত করে নেওয়া হয়েছিল।
১৯৪৬ সালে তারাপদ লাহিড়ী রাজসাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ংকর ধ্বংসলীলা সবে থেমেছে। এদিকে ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তরের চরম সময় উপস্থিত হলো। ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য বৃটেন থেকে ক্যাবিনেট মিশন ভারতবর্ষে এলো। ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হলো। জহরলাল নেহেরু’র সভাপতিত্বে জরুরী সভা ডাকা হলো। তখন A.I.C.C. বা সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটিতে R.S.P.-র ৬ জন সদস্য ছিলেন। তারাপদ লাহিড়ী R.S.P. দলের প্রতিনিধি হয়ে সেই সভায় যোগ দিলেন এবং ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দৃপ্ত ভাষণ দিলেন। তাঁর আগের বক্তা ছিলেন আরুণা আসফ আলি ও পরের বক্তা ছিলেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। এর পরের ১ বছরের নাটকীয় ঘটনা প্রবাহে কংগ্রেস দেশভাগ মেনে নিল। দেশভাগের পর কলকাতায় এসে তাঁর নতুন জীবনসংগ্রাম শুরু হলো। কলকাতা উচ্চ আদালতে আইন প্র্যাকটিস করা শুরু করলেন। ‘৪৭-এর পরেও তাঁর রাজনৈতিক পথচলা থেমে থাকেনি। R.S.P. দলের সাথে আমৃত্যু সংযোগ রেখেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর নানান্ আন্দোলনের সাথে তাঁর সজীব সংযোগ ছিল। উদ্বাস্তু আন্দোলন, নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিল-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন ইত্যাদি ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ৭০-এর দশকে কলকাতা পৌরসভার অল্ডারম্যান ছিলেন। ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কারাবিধি সংস্কার কমিটির চেয়ারম্যান হয়ে ১৮৯৪ সালের সাম্রাজ্যবাদী কারা আইনের আমূল সংস্কারে নেতৃত্ব দেন। অন্যান্য রাজনৈতিক পরিবেশেও তিনি শ্রদ্ধেয় ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের ঘটনাক্রম সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। অন্যদিকে তিনি ছিলেন উচ্চস্তরের সাংস্কৃতিক বোধসম্পন্ন মানুষ। সংস্কৃত সাহিত্য থেকে শুরু ক’রে বাংলা সাহিত্যে অনায়াস বিচরণ ছিল। মূল মন্দাক্রান্তা ছন্দ বজায় রেখে কালিদাসের মেঘদূত কাব্যগ্রন্থের অপূর্ব বাংলা অনুবাদ করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র প্রমুখের সাহিত্য নিয়ে অমূল্য প্রবন্ধাবলি আছে। নিজে কুক্কুট ভট্ট ছদ্মনামে রম্যরচনা ও ছড়া লিখতেন। ‘দেশ’, ’অমৃত’ ‘গণবার্তা’, ‘কালিকলম’, ‘প্রত্যয়’ ইত্যাদি পত্রিকায় বহু সারগর্ভ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আমৃত্যু ‘রবীন্দ্রসদন’ কার্যনির্বাহক কমিটির সাম্মানিক সদস্য ছিলেন। বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। বিংশ শতাব্দীর এই মনীষী ১৯৮৬ সালের ১৫ই জুন প্রয়াত হন।
***************************************
আমরা কৃতজ্ঞ কবিপুত্র উৎপলাভ লাহিড়ীর কাছে যাঁর লেখা "মহাজীবন" নামক কবি জীবনীটি এখানে সম্পূর্ণ তুলে দিয়েছি এবং এই তথ্য থেকেই আমরা কবির কবি-পরিচিতিটি সঠিকভাবে লিখতে পেরেছি। তাঁর ইমেল -utpalavalahiri@yahoo.in আমরা কৃতজ্ঞ কবি সোমনাথ গুহর কাছেও, যিনি এই লেখাটি এবং কবির ১টি ছড়া আমাদের পাঠিয়েছেন। তাঁর ইমেল - somenath.guha26@gmail.com
মিলনসাগরে কবি তারাপদ লাহিড়ীর কবিতার পাতা তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। তাঁর কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আমাদের এই প্রচেষ্টাকে সার্থক মনে করবো।