কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী - “মহারাজ” নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি পরাধীন ভারতে, স্বাধীনতা সংগ্রামী হয়ে মোট ছয়বারে, জীবনের ৩০ বছর, ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের জন্য জেলবন্দী ছিলেন। কলকাতায় বিনয় বাদল দীনেশ বাগে, হাওড়া ব্রীজ থেকে নেমে আসা রাস্তা ব্র্যাবোর্ন রোড কে “বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজ সরণী” নামকরণ করা হয়। কবি চিরজীবন অকৃত-দার ছিলেন।

তিনি জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহ জেলার কাপাসিয়াটিয়ায়। পিতা দুর্গাচরণ চক্রবর্ত্তী এবং মাতা প্রসন্নময়ী দেবী। তাঁদের তাঁদের ছয় সন্তানের মধ্যে, পঞ্চম সন্তান ছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ। পিতা দুর্গাচরণও স্বদেশী আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন।
পিতার স্মরণে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী
ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর পিতৃদত্ত নাম
ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর “মহারাজ” নাম
কবি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের শিক্ষাজীবন
কবি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের কর্মজীবন
কবি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের কারাবাস
স্বাধীনতার পর কবির শেষ জীবন
ভারতের সংসদে কবির সম্বর্ধনা ও ভাষণ
ত্রৈলোক্যনাথের পৈতৃক ভিটা বেদখল
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও মহারাজ
নেতাজী সুভাষ ও মহারাজ
RSS, Hindu Mahasabha and Trailokyanath
RSS, হিন্দু মহাসভা ও ত্রৈলোক্যনাথ
আমার জীবন সফল হয় নাই
কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর স্বীকারোক্তি
কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর রচনাবলী
প্রবাসীতে কবির “গীতায় স্বরাজ্য” এর সমালোচনা
কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর কবিতা

পিতার স্মরণে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী
ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর পিতৃদত্ত নাম
ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর “মহারাজ” নাম
কবি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের শিক্ষাজীবন
কবি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের কর্মজীবন
কবি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের কারাবাস
স্বাধীনতার পর কবির শেষ জীবন
ভারতের সংসদে কবির সম্বর্ধনা ও ভাষণ
ত্রৈলোক্যনাথের পৈতৃক ভিটা বেদখল
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও মহারাজ
নেতাজী সুভাষ ও মহারাজ
RSS, Hindu Mahasabha and Trailokyanath
RSS, হিন্দু মহাসভা ও ত্রৈলোক্যনাথ
আমার জীবন সফল হয় নাই
কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর স্বীকারোক্তি
কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর রচনাবলী
প্রবাসীতে কবির “গীতায় স্বরাজ্য” এর সমালোচনা
কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর কবিতা
.


কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী - “মহারাজ” নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি পরাধীন ভারতে, স্বাধীনতা সংগ্রামী হয়ে মোট ছয়বারে, জীবনের ৩০ বছর, ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের জন্য জেলবন্দী ছিলেন। কলকাতায় বিনয় বাদল দীনেশ বাগে, হাওড়া ব্রীজ থেকে নেমে আসা রাস্তা ব্র্যাবোর্ন রোড কে “বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজ সরণী” নামকরণ করা হয়। কবি চিরজীবন অকৃত-দার ছিলেন।

তিনি জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহ জেলার কাপাসিয়াটিয়ায়। পিতা দুর্গাচরণ চক্রবর্ত্তী এবং মাতা প্রসন্নময়ী দেবী। তাঁদের তাঁদের ছয় সন্তানের মধ্যে, পঞ্চম সন্তান ছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ। পিতা দুর্গাচরণও স্বদেশী আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন।


.
পিতার স্মরণে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী -    ^^ উপরে ফেরত
পিতার স্মরণে কবি তাঁর “জেলে ত্রিশ বছর” গ্রন্থের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ - স্বদেশী আন্দোলন ও তাহাতে যোগদান-এর, ২১-পৃষ্ঠায় লিখেছেন ১৯০৫ সালের একটি ঘটনা ---

“আমি তখন ধলা স্কুলে পড়ি এবং বোডিংএ থাকি। স্বদেশী আন্দোলনের ঢেউ ধলায় আসিয়া পৌছিল, জমিদার বাড়ীতে তাঁত, চরকা বসিল ; সভা, শোভাযাত্রা পিকেটিং চলিতে লাগিল --- “বন্দেমাতরম, আল্লাহো আকবর, ভারতমাতা কী জয়” ধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। যুবকের দল ডন, কুস্তি, কুচকাওয়াজ করিতে লাগিল --- লোকের মনে কি উৎসাহ! ধলাতে যাহারা আন্দোলনে মাতিয়াছিল আমি তাহাদের মধ্যে একজন ছিলাম। একদিন দেখিলাম বাড়ী হইতে আমার নামে একটা পার্শেল আসিয়াছে। কিসের পার্শেল বুঝিতে পারি নাই, আমার নামে কোন পার্শেল আসার কথা ছিল না ; আমি মনে করিলাম, এখানে খাওয়ার বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না, এজন্য বাড়ী হইতে কিছু খাদ্য দ্রব্য পাঠাইয়াছে। তাড়াতাড়ি পার্শেল খুলিয়া দেখিলাম একজোড়া দেশী মোটা কাপড়। আমার কাপড়ের প্রয়োজন ছিল না, আমার জামা-কাপড় ক্রয় করার জন্য বাড়ী হইতে টাকা আসিত, আমি আমার পছন্দমত জামা-কাপড় ক্রয় করিতাম। পার্শেল পাঠাইয়াছিলেন আমার পিতা। তিনি সম্তবতঃ চাহিয়াছিলেন, তাঁহার স্নেহের কনিষ্ঠ পুত্র স্বদেশপ্রেমিক হউক। তাই তিনি তাহাকে দেশী বেশভূষায় সজ্জিত দেখিতে চাহিয়াছিলেন ; হয়ত তিনি এজন্যই পাঠাইয়াছিলেন একজোড়া দেশী মোটা কাপড়। এই কাপড়ের মধ্য দিয়াই তিনি পাঠাইয়াছিলেন তার আশীর্বাদ --- আমি তাহা মাথা পাতিয়া লইলাম।”

১৯০৬ সালে কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর “মহারাজ” অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন। জাতীয়ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যায়াম প্রতিষ্ঠান গঠন করে নিজ জেলায় বিপ্লবী ঘাঁটি তৈরি করতে থাকেন। ১৯১৩-১৪ সালে মালদহ, রাজশাহী ও কুমিল্লায় ঘুরে গুপ্ত ঘাঁটি গড়তে থাকেন। পরে তিনি উত্তর ভারতে রাশবিহারী বসু ও চন্দ্রশেখর আজাদ ও আরও অনেকের সঙ্গে মিলেও কাজ করেছিলেন।

কবির জীবনে বিভিন্ন জেলে, ভারতে বিভিন্ন প্রদেশের সতীর্থদের সঙ্গে থেকে তিনি বহু ভাষা শিখেছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে হিন্দী, উর্দু, গুরুমুখী, মারাঠী, মালায়ালাম সহ আরও দু-একটি ভাষা এবং মান্দলয় জেলে শিখেছিলেন ব্রহ্ম-ভাষা। দুঃখের বিষয় এই যে শেষ সময় যখন ভারতে এসেছিলেন সে সব ভাষা ভুলে গিয়েছিলেন। ভারতের সংসদে তাঁর ভাষণে তিনি এ কথা জানিয়েছিলেন। .


ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর পিতৃদত্ত নাম -     ^^ উপরে ফেরত
স্কুলজীবন থেকেই কবির নাম-বিভ্রাট শুরু হয়! তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল ত্রৈলোক্যমোহন চক্রবর্তী। কি ভাবে ত্রৈলোক্যনাথ হলো তা নিয়ে তিনি তাঁর “জেলে ত্রিশ বছর” গ্রন্থের তৃতীয় পরিচ্ছেদ – বিপ্লববাদের উৎপত্তি ও কর্মধারা-এর, ২৭-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .

“আমার নাম ছিল ত্রৈলোক্যমোহন। কিন্তু ‘মোহন’ শেষ পর্য্যন্ত ‘নাথে’ পরিবন্তিত হইয়াছিল। ইহার একটি ইতিহাস আছে। একদিন বিদ্যালয় পরিদর্শকের কর্মস্থল হইতে আমাদের প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের নিকট একখানি পত্র আসিল, তাহাতে লেখা ছিল, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবতী তোমার বিদ্যালয়ের ছাত্র। সে রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদান করে, সুতরাং তাহার নাম কেন বিদ্যালয় হইতে কাটা যাইবে না --- ইত্যাদি। ইহাও ছিল যে আমি কোন প্রকার রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দিব না এই মর্ম্মে যেন একখানা প্রতিশ্রুতি-পত্র লিখিয়া দেই। চিঠি পাইয়া শিক্ষক মহাশয়গণ চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। আমি কিন্তু আনন্দিত হইলাম। আমি এইজন্য আনন্দিত হইলাম যে, আমার নাম কাটিয়া দিলে আমি ঢাকায় গিয়া সমিতির বোডিংএ থাকিয়া জাতীয় বিদ্যালয়ে ভতি হইতে পারিব। আমার মাষ্টার মহাশয়গণ আমাকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন বলিয়া তাঁহাদের চিন্তা হইল কি করিয়া তাহারা আমাকে রক্ষা করিবেন। প্রথমতঃ তাঁহারা স্থির করিলেন যে, তাঁহারা উত্তরে লিখিবেন “ত্রৈলোক্যনাথ বলিয়া আমাদের স্কুলে কেহ নাই।” পরে ভাবিয়া দেখিলেন যে, ইহাতে সমস্যার সমাধান হইবে না। সমাধানের জন্য তাই তাহারা ললিতবাবুর উপদেশ চাহিয়া পাঠাইলেন, ললিতবাবু সকল দিক রক্ষা করিয়া একখানা মুসাবিদা লিখিয়া পাঠাইলেন। মুসাবিদার মর্ম্ম ছিল : আমি কোন রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দিই না বা দিবার ইচ্ছা রাখিনা, আমি শুধু স্বদেশী ব্যায়াম করি এবং স্বদেশী খেলা খেলি। শীতলবাবু আমাকে দিয়া এ মুসাবিদায় নকল করাইয়া যথা সময়ে তাহা পাঠাইয়া দেন। এ মুসাবিদায় আমার নাম ত্রৈলোক্যনাথই লেখা ছিল। ইহার পর হইতে এই চিঠির ফলে বিদ্যালয়ের হাজিরা বহিতে আমার নাম ‘মোহনের’ পরিবর্তে ‘নাথ’ লিখিত হইল এবং আমি ‘ত্রৈলোক্যনাথ’ হইলাম।”

তাঁর কারাবাসের বাইরে অজ্ঞাতবাসের সময় তিনি কালীচরণ মাঝি নামও খ্যাত হয়েছিলেন। সে সময় তিনি মাঝিমাল্লাদের মতন নৌকা চালাতেন ও থাকতেন। বরিশাল যড়যন্ত্র মামলার সময় রাজসাক্ষীরা তাঁকে কালীচরণ, বিরজা, হরেন্দ্র প্রভৃতি নামে চিহ্নিত করেন। .


ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর “মহারাজ” নাম -   ^^ উপরে ফেরত
৯ই অগাস্ট ২০২৪ তারিখের জাগোবাংলা পত্রিকায় দেবু পণ্ডিতের “তিনি বিপ্লবী পাকেচক্রে মহারাজ”, আলেখ্যতে এ নিয়ে লিখেছেন ---

“মহারাজ! হ্যাঁ, মহারাজ তিনি। ওড়িশার পুরীতে থাকার সময় ছদ্মনাম নিয়েছিলেন, ‘শশীকান্ত’। ময়মনসিংহ জেলার তখনকার মহারাজের নাম ছিল শশীকান্ত রায় চৌধুরী। লোকে তাঁকে শশীকান্ত রায় চৌধুরী মনে করে ‘মহারাজ’ বলে ডাকতেন। এভাবেই তিনি হয়ে যান ‘মহারাজ’। পরে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী (Trailokyanath Chakraborty) বললে কেউ না চিনলেও মহারাজ নামে সকলেই তাকে চিনতেন। সুদর্শন পঞ্জিকা ও মাসিক সমাজ দর্পণ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শিবশঙ্কর চক্রবর্তী একবার স্মৃতিচারণা করতে বসে বলেছিলেন, ‘আমি যখন পুঁথিঘরে চাকরি করি তখন আমাদের কাছে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী মহাশয় যাওয়া-আসা করতেন। তো একদিন আমাদের পাশে বসে সচিবালয়ে ফোন করছেন। কে যেন ফোন ধরেছে এবং বলছে - আপনি কে? মহারাজ উত্তর দিচ্ছেন — “তুমি কে? আর তুমি যেই হও, গিয়ে বল ‘মহারাজ’ ফোন করেছে।” তাঁর এ কথাতেও বুঝা যায় ‘মহারাজ’ হিসেবে তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন।”

উপরোক্ত জাগোবাংলায় দেবু পণ্ডিতের “তিনি বিপ্লবী পাকেচক্রে মহারাজ” পুরো আলেখ্যটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন...।


.


কবি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের শিক্ষাজীবন -         ^^ উপরে ফেরত
ত্রৈলোক্যনাথের ভাষায় তাঁর পিতার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল ছিল। তাঁর পড়ার খরচের কোনো অভাব ছিল না। ১৯০২-৩ সালে যখন তাঁর বয়স ১২-১৩ ছিল, তিনি মালদহ জেলার অন্তর্গত কাণসাটে পুখুরিয়া মাইনর স্কুলে পড়তেন। সেখানে তাঁর আশা ছিল বৃত্তি পাবার কিন্তু তা না হয়ে তাঁকে উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। এরপর তিনি ময়মনসিংহ জেলার ধলা হাইস্কুলে এক বছর পড়েছিলেন। সেখানেও তিনি ভাল ছাত্রদের মধ্যে গণ্য হয়েছিলেন। তারপর তিনি সাটিরপাড়া হাই স্কুলে ভর্ত্তি হন এবং স্কুল-বোর্ডিং-এ থাকতেন। এখানেও তাঁর স্কলারশিপ পাওয়া হয়নি কারণ প্রবেশিকা পরীক্ষার পূর্বেই ১৯০৮ সালের মধ্যভাগে তাঁকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ধরা হয় এবং ছয় মাস জেল হয়। এরপর আর তাঁর পক্ষে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি কারণ তিনি জেলেই বেশী থেকেছেন। তিনি সেই সময় থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর কারাগারের বন্দী জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন এবং ৪-৫ বছর অজ্ঞাতবাসেও কাটিয়েছেন।

.


কবি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের কর্মজীবন -         ^^ উপরে ফেরত
এই অংশটি লিখতে আমরা ভীষণ বিব্রত বোধ করছি। যে মানুষটি তাঁর সারা জীবন ব্যায় করলেন যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মাতে পারি, তাঁর তো স্বাধীনতা সংগ্রামই কর্ম জীবন! তবুও লিখছি যে যখন তিনি জেলের বাইরে থাকতেন তখন তিনি কি করতেন!

তিনি দ্বীপান্তরে যাবার পূর্বে মানিকগঞ্জের কাছে গড়পাড় গ্রামের মাইনর স্কুলে কিছুদিন হেডমাস্টারী করেছেন। ১৯০৯ সালে তখন তিনি পলাতক ছিলেন। স্কুলটি ছিল তাঁর সতীর্থ স্বদেশী জমিদার পুত্র অশ্বিনী ঘোষের।

১৯২৪ সালে দ্বীপান্তরের সাজা শেষ হলে তিনি কলকাতায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের কথায় দক্ষিণ কলিকাতা জাতীয় বিদ্যালয়ে মাত্র তিন মাস শিক্ষকতা করেন। তিনি সেই স্কুলে ইতিহাস ও ইংরেজী এবং শিখ ও হিন্দুস্থানী ছাত্রদের গুরুমুখী ও হিন্দী পড়াতেন যা তিনি আন্দামানের সেলুলার জেলের কয়েদী বন্ধুদের থেকে শিখেছিলেন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি সারপেনটাইন লেনে তাঁর জেলের স্বতীর্থ মদনবাবুর মেসে থাকতেন যেখানে তাঁর থাকা-খাওয়া ফ্রী ছিল। প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী বিদ্যা দান করবেন বলে মায়না নিতে চাইলেন না। কিন্তু রোজ চার-পাঁচ মাইল হেঁটে যাওয়া-আসা করা কষ্টের ছিল। ট্রাম ভাড়ারও দরকার ছিল। তাই তিনি দেখা করলেন দেশপ্রাণ শাসমলের সঙ্গে, যিনি তাঁকে স্কুলের কাছেই, তাঁর বাড়ীতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। কিছুদিনের মধ্যে তাঁর যায়গা হয়েছিল হেমেন্দ্র দাশগুপ্তের বাসায়। গরমের ছুটির আগে এক মাসের বেতন নিয়ে তিনি আর স্কুলে ফেরত যান নি। ২০২৪ এর শেষেদিকে পুনরায় ময়মনসিংহ থেকে ধরা পড়েন।
.


কবি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের কারাবাস -     ^^ উপরে ফেরত
কবি পরাধীন ভারতে মোট ছয়বার জেলে গিয়েছিলেন। মোট তিরিশ বছর তিনি জেলখানায় কাটিয়েছিলেন। আমরা অতি সংক্ষেপে তা এখানে তুলে দিলাম ---

১ম বারের কারাবাস – ১৯০৮ সালে ডাকাতি ও নৌকাচুরীর অভিযোগে পঞ্চাস টাকা জরিমানা ও পাঁচমাস সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জ জেলে ছিলেন এক সপ্তাহ। তার পরে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে চালান করা হয়। ১৯০৯ সালের প্রথমভাগে তিনি মুক্ত হন।

২য় বারের কারাবাস – তখন তিনি ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলায় পলাতক আসামী ছিলেন। তাঁর নামে ৫০০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এই মামলার ব্যরিষ্টার ছিলেন। ১৯১২ সালে ঢাকায় তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তিনি ছাড়া পেয়ে যান। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে ১০৯ ধারায় মামলা দেওয়া হয়। এই কেসেও তিনি বেকসুর খালাস পান কয়েকমাস হাজত বাসের পরে। এর পর তিনি সর্বদা গুপ্তচরদের নজরেই থাকতেন।

৩য় বারের কারাবাস – ১৯১৪ সালে হাপানী রোগের জন্য মহারাজ কলকাতায় স্বামী বালাজী মহারাজ নামের এক সাধুর চিকিৎসায় ছিলেন। তাঁকে রোজ একঘন্টা ধরে গায়ে সরষের তেল মালিশ করে গঙ্গায় অন্তত ৫০-৬০টা ডুব দিতে হতো। তেমন তেল মাখার সময় একদিন তাঁকে অ্যারেস্ট করা হয়। এই মামলায় তাঁর দশ বছর সাজা হয়। পাঠানো হয় আন্দামানের সেলুলার জেলে। ১৯১৬ সালের মাঝামাঝি আন্দামান পৌঁছান। ১৯২১ সালের শেষভাগে তাঁকে আলীপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯২৪ সালের প্রথমভাগে তাঁকে ময়মনসিংহ জেলে পাঠানো হয় এবং তারপরে ছাড়া পান। বাড়ী পৌঁছে তিনি প্রথমে তাঁর মেজদাকে প্রণাম করাতে তিনি তাঁর নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন!

৪র্থ বারের কারাবাস – ১৯২৪ সালের শেষভাগে আলীপুর জেলে, স্টেট প্রিজনার। একমাস পর মেদিনীপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯২৫ এর জানুয়ারী তে বর্মার মান্দালয় জেলে পাঠানো হয়, সুভাষচন্দ্র, সত্যেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, সুরেন্দ্রমেহন ঘোষ ও মদনমোহন ভৌমিকের সঙ্গে জাহাজে করে। ছাড়া পান ১৯৩০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। পাঠানো হলো বরিশাল যড়যন্ত্র মামলায় বরিশাল জেলে। এর মাঝে ১৯২৮ সাল নাগাদ তাঁকে মান্দলয় থেকে ভারতে এনে হাতিয়া দ্বীপে অন্তরীন করে রাখা হয়। এই কারাবাস কালে কবি শ্রীমদ্ভাগবত গীতার সহজ ভাষ্য “গীতায় স্বরাজ্য” প্রথম চার অধ্যায় রচনা শেষ করেছিলেন।

৫ম বারের কারাবাস – ১৯৩০ এপ্রিলে রাজশাহীতে আটক হন, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পরে পরেই আরও বহু স্বদেশীদের সাথে। ১৯৩০ এর অক্টোবরের পরে তাঁকে বহরমপুর জেলে চালান করা হয়। কয়েক মাস পর তাঁকে বক্সা ক্যাম্প জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। এরপর মাদ্রাজ সহ দেশে আরও নানা জেলে স্থানান্তরিত হবার পরে ১৯৩৮ এর সেপ্টেম্বর মাসে ছাড়া পান। এই সময়টা আসলে তাঁরা বিনা বিচারেই জেল খাটেন। এই কারাবাস কালে কবি শ্রীমদ্ভাগবত গীতার সহজ ভাষ্য “গীতায় স্বরাজ্য” রচনা শেষ করেছিলেন।

৬ষ্ঠ বারের কারাবাস – ১৯৩৯ সালে তিনি সুভাষচন্দ্রের ডাকে দিল্লী যান এবং উত্তর ভারতে সুভাষচন্দ্রের জনপ্রিয়তা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পান। ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারীতে কলকাতায় ফেরেন। সেখান থেকে মার্চ মাসে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা হয়ে চট্টগ্রামে পৌছান। সেখানে এক জনসভা থেকে তাঁকে আশরাফ উদ্দিন চৌধুরীর সাথে গ্রেপ্তার করা হয় বে-আইনী সভা করার জন্য। এক বছর পর সেখান থেকে হিজলী জেল এ পরে ঢাকা জেলে পাঠানো হয়। সেই সময় সেই জেলে অন্তত ৫০জন কয়েদীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। এবং বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক সাহেবের সরকার তার জন্য কাউকে শাস্তি দেয়নি। সেই সরকারের অর্থ মন্ত্রী ছিলেন হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়!

কবি পরাধীন ভারতে শেষবারের জন্য জেল থেকে মুক্ত হয়েছিলেন ১৯৪৬ সালের ১৩ই মে তারিখে। তখন বাংলায় শুর হয়ে গিয়েছে জাতি দাঙ্গা। মহারাজ সেই দাঙ্গা থামাবার ও হিন্দু-মুসলমানদের শান্তিতে বসবাস করানোর চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিলেন। তার কিছু পূর্বে ১৯৪৩-এ হয়ে গেছে মন্বন্তর যাতে প্রায় ৩০ লক্ষ লোক অনাহারে মৃত্যুবরণ করেন।

১৯১৬-১৭ সালে তিনি আন্দামানের সেলুলার জেলে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, পুলিনবিহারী দাস, বিনায়ক ও গণেশ সাভার্কার, ভাই পরমানন্দ, জোয়ালা সিং, পৃথ্বী সিং, গুরুমুখ সিং, পণ্ডিত পরমানন্দ, মোস্তাফা আমেদ প্রমুখদের সাথে কাটিয়েছেন। ১৯২৫-২৬ সালে বর্মার মান্দালয় জেলে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সাথে কাটিয়েছেন। ১৯৩২-৩৩ সালে মাদ্রাজ প্রদেশের বিভিন্ন জেলে কে রামন মেনন, কর্ণাটকের সদাশিব রাও, অধ্যাপক এন জি রঙ্গ, মালাবার বিদ্রোহের নেতা এম পি নারায়ণ মেনন প্রমুখদের সঙ্গে কাটিয়েছেন। বাংলার ছয়টি সেন্ট্রাল জেল ও কয়েকটি ডিস্ট্রিক্ট জেলেও বন্দীজীবন কাটান। তিনি প্রথমে সাধারণ কয়েদী, পরে দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদী ও বিশেষ শ্রেণীর কয়েদী ছিলেন। ছিলেন স্টেট প্রিজনার, ডিটিনিউ, সিকিউরিটি বন্দী এবং অন্তরীণাবদ্ধও ছিলেন। তিনি জেলখানার পেনাল কোডে যে সব শাস্তির কথা লেখা আছে এবং যে-সব শাস্তির কথা লেখা নেই, তার প্রায় সবগুলিই ভোগ করেছিলেন।

১৯২১ সালের শেষভাগে তাঁকে আন্দামান সেলুলার জেল থেকে আলীপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। সেই সময়ে গান্ধীজীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনের ফলে আলীপুর জেল সত্যাগ্রহীদের দ্বারা ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগপ্ত, দেশগৌরব সুভাষচন্দ্র বসু, শ্রীযুক্ত শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী, দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, মৌলানা আক্রাম খাঁ, মৌলানা মুজিবর রহমান, পীর বাদসা মিঞা, (ফরিদপুর) চান্দমিয়া সাহেব, (করাটিয়া) জমিদার শ্রীযুক্ত হেমেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত, শ্রীযুক্ত ত্রিপুরা চৌধুরী, কবি নজরুল ইসলাম, প্রোঃ নৃপেন ব্যানাজি, প্রোঃ জে, এল, ব্যানার্জি, মহিমচন্দ্র দাস, (চট্টগ্রাম) বসন্ত কুমার মজুমদার (কুমিল্লা) সতীন সেন (বরিশাল) কিরণ শঙ্কর রায়, (জমিদার তেওতা) ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, (কলিকাতা) চিররঞ্জন দাস (দেশবন্ধুর পুত্র), বসম্ত লাল মুড়ারকা, পদ্মরাজ জৈন, মূল চাঁদ আগড়ওয়ালা, হীরা লাল লোহিয়া, হাজী আবদুর রশীদ খান, (নোয়াখালী) নগেন্দ্রকুমার গুহ রায়, (মোক্তার, নোয়াখালী) হেমন্ত সরকার, ঈশান চক্রবর্তী (রংপুর) প্রমুখ নেতাদের সেখানে রাখা হয়েছিল। আলিপুর জেলে তখন প্রায় ছয়শো সত্যাগ্রহী কয়েদী ছিলেন। নেতাদের প্রত্যেকেই বম্‌ ইয়ার্ডে গিয়ে মহারাজদের মতো কয়েদীদের সঙ্গে দেখা করে যেতেন। তাঁরাও তাঁদের ইয়ার্ডে গিয়ে সকলের সঙ্গে আলাপ করতেন। নেতাদের সকলেই তাঁদের স্নেহের চোখে দেখতেন এবং তাঁদের বাড়ী থেকে যে সমস্ত খাবার-দাবার যেতো তার ভাগও তাঁরা পেতেন।
.


স্বাধীনতার পর কবির শেষ জীবন -         ^^ উপরে ফেরত
ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী পূর্ব-পাকিস্তানেই থেকে গিয়েছিলেন এবং সেখানে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। ১৯৫৪ সালে সংযুক্ত প্রগতিশীল দলের প্রার্থী হিসেবে পূর্ব-পাকিস্তান অ্যাসেমব্লিতে নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৫৮ সালে তার নির্বাচন অগ্রাহ্য হয় এবং রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ এমনকি সামাজিক কাজকর্মেও তার ওপর বাধানিষেধ আরোপ করা হয়। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় খোদ নিজের দেশের জেনারেল আয়ুব খানের সরকারই এই বৃদ্ধ বিপ্লবীকে আবার কারারুদ্ধ করে। সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হওয়া বৈমাতৃসুলভ ব্যবহারে ব্যথিত হন তিনি। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত স্বগ্রামে প্রকৃতপক্ষে নির্জনবাস করেন।

১৯৭০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর উদ্যোগে হৃদরোগের (dilated heart) চিকিৎসার জন্য কবি ভারতে আসেন। কলকাতার সফরে তিনি দক্ষিণ কলকাতার অনুশীলন ভবনে থাকতেন। সেই সময় চাতরায় 'সংগঠনী'র কর্মীদের সঙ্গে কয়েকদিন কাটিয়ে কলকাতা হয়ে দিল্লি যান ও ভারতের পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেন ৬ই আগস্ট ১৯৭০ তারিখে, যা আজ এক ঐতিহাসিক দলিল। দিল্লিতে তিনি সংবর্ধনা পান। সেখানেই ৯ই আগস্ট তারিখে তার জীবনাবসান হয় তাঁর বন্ধু ও সহ-স্বাধীনতা সংগ্রামী সুরেন্দ্রমোহন ঘোষের বাসভবনে, ৮ জনপথ-এ।

তাঁর মৃত্যুতে ভারতের সংসদের লোকসভায় দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেছিলেন – "His daring and courage inspired young men of older generation. Long years of suffering didn't weaken his belief in democracy or his complete commitment to socialism and secularism."

ত্রৈলোক্যনাথের শেষকৃত্য নিয়ে দুরকম খবর পাওয়া যায়।
১। পরদিন তাঁর মরদেহ কলকাতায় এনে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন তাঁর ভাইপো অথবা ভাগনে (Nephew)।
২। তিনি ৯ আগস্ট ১৯৭০ তারিখের রাত ৩টা ২০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দিল্লির ঐতিহাসিক রাজঘাটে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান সম্পাদিত হয়।

এই দুটো খবরের মধ্যে কোনটি সঠিক আমাদের জানা নেই, তাই পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কেউ যদি আমাদের সঠিক খবর, প্রমাণসহ দেন, তাহলে আমরা তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।
.


ভারতের সংসদে ১৯৭০ সালে কবির সম্বর্ধনা ও ভাষণ - ^^ উপরে ফেরত
কবির চিকিৎসার জন্য ভারতের তদানিন্তন প্রধাণমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে ভারতে নিয়ে আসেন। কবির মৃত্যুর তিন দিন পূর্বে ১৯৭০ সালের ৬ই আগষ্ট দিল্লীতে ভারতীয় সংসদে কবিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনার উত্তরে প্রদত্ত ভাষণ তিনি বাংলা ভাষাতেই দিয়েছিলেন। বাংলা ভাষণের ইংরেজী তর্জমা করেন গোয়া স্বাধীনতা আন্দোলেন অংশগ্রহণকারি, Revolutionary Socialist Party-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, বহরমপুরের লোকসভা সদস্য শ্রীত্রিদিব চৌধুরী। কবির “জেলে ত্রিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম” গ্রন্থের পরিশিষ্টের ১১৫ পৃষ্ঠায় এই পুরো ভাষণটি দেওয়া রয়েছে।

“মিঃ স্পীকার, মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী এবং বন্ধুগণ ---

আমি অসুস্থ, হৃদরোগে ভুগছি, দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে পারি না, আপনারা আমাকে বসে বলবার অনুমতি দিন। প্রথমেই আমি প্রধান মন্ত্রীকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তাঁর এবং আরও কয়েকজন বন্ধুর প্রচেষ্টায় আমি কিছু দিনের জন্য ভারতে আসবার সুযোগ পেয়েছি। ১৯০৭/৮ সন থেকে শুরু করে যে সব বন্ধু-বান্ধবের সাথে একত্রে দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছিলাম, জীবনসন্ধ্যায় তাঁদের দেখবার বড়ই আকাঙ্খা ছিল। ভারতবর্ষে এসে সেইসব পুরনো বন্ধু এবং সহযাত্রীদের সাথে মিলিত হবার সুযোগ পেয়ে খুবই আনন্দ লাভ করেছি। এমনকি দিল্লীতেও আমার অনেক পুরনো বন্ধু ও সহকর্মী আছেন ; তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ায় আমি খুবই খুশী হয়েছি।

১৯০৬ থেকে ১৯৪৬ সনের মধ্যে আমি ছ'বার কারারুদ্ধ হয়েছি ভারতবর্ষে এবং বার্মার বিভিন্ন কারাগারে। সর্বসমেত ৩০ বছর কারাগারে আবদ্ধ ছিলাম এবং ঐ কারাজীবনে ভারতের অনেকগুলি প্রান্তীয় ভাষা শিখেছিলাম ; কিন্তু দুর্ভাগ্য, প্রায় সবগুলিই এখন ভুলে গেছি।

১৯১৫ সনে আন্দামান সেলুলার জেলে ছিলাম। তখন সেখানে একশ'জন রাজনৈতিক বন্দী কারারুদ্ধ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাভারকার ভ্রাতৃদ্বয়, গুরুমুখ সিং, জোয়ালা সিং, পৃথ্বী সিং, শের সিং, ভাই পরমানন্দ এবৎ আরও অনেকে। বাঙ্গালী বিপ্লবীদের মধ্যে ছিলেন আশুতোষ লাহিড়ী, শচীন সান্ন্যাল, বারীন ঘোষ, পুলিন দাস প্রমুখ। আন্দামানে থাকা কালে উর্দু এবং গুরুমুখী শিখেছিলাম এবং সাভারকর ভাইদের কাছ থেকে শিখেছিলাম মারাঠী। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সে সব ভাষা এখন ভুলে গেছি।

নেতাজী সুভাষচন্দ্র, সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ এবং অরও অনেকের সাথে ১৯২৫ / ২৬ সনে মান্দালয় জেলে দিন কাটিয়েছি। সে সময় ব্রহ্ম-ভাষা শিখেছিলাম ; তাও এখন ভুলে গেছি। ১৯৩০ সনে কেরেলার কেনানুর জেলে ছিলাম ; সহবন্দী ছিলেন এ কে গোপালন, ই এম এস নাম্বুদ্রিপাদ, কৃষ্ণ পিল্লাই, গোবিন্দন নায়ার, সদাশিব রাও, মাধব মেনন প্রমুখ ; তখন “মালায়ালাম” শিখেছিলাম, --- এখন তাও ভুলে গেছি। ১৯৩২ সনে আমাকে ভেলোর সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। তখন সে জেলে ছিলেন প্রফেসর এন জি রঙ্গ, বাপিনেদি নারায়ণ মেনন এবং মোপলা-বিদ্রোহের বন্দী আরও অনেকে। সেখানেও আরও ২ / ১ টি ভাষা শিখেছিলাম ; এখন ভুলে গেছি। হিন্দীও শিখেছিলাম, কিন্তু আমি স্বীকার করি তাও আমি ভুলে গেছি। কারণ দীর্ঘকাল যাবৎ পূর্বপাকিস্তানে আছি, সেখানে হিন্দীতে কেউ কথাবার্তা বড় একটা বলে না, আমারও চর্চা নেই, --- ফলে হিন্দীও প্রায় ভুলে গেছি।

নোয়াখালী দাঙ্গার পর --- বিশেষতঃ দেশ-বিভাগের পর – মহাত্মা গান্ধীর প্রিয় শিষ্য শ্রীযুক্ত সতীশ দাশগুপ্তের সাথে গান্ধীজীর প্রদর্শিত পথে গঠনমূলক কাজ শুরু করি। দেশ-বিভাগের পর কিছুকাল সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, দাঙ্গা, মারপিট দেশে চলতে থাকে। আমি স্থির করলাম আমি পাকিস্তান ছাড়ব না ; সেখানে দেশবাসীর পাশে দাঁড়াব এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পাকিস্তানেই বসবাস করব।

বন্ধুগণ, আমি আনন্দের সাথে আপনাদের জানাচ্ছি যে এককালে, --- বিশেষতঃ দেশ-বিভাগের অব্যবহিত পরে পাকিস্তানে মুসলমানদের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং বিদ্বেষের ভাব বর্তমান ছিল অনেক বছর কেটে যাবার পর, তা এখন আর নেই। পাকিস্তানেও বর্তমান ইয়ং জেনারেশন বিশেষতঃ ছাত্র এবং যুবকদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষভাব নেই। আজকাল সেখানে সাধারণ মানুষ, মুসলমান নওজোয়ান সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষভাব থেকে মুক্ত। পাকিস্তানে একটা নুতন জাগরণের হাওয়া বইছে। পাকিস্তানের তরুণরা কে মুসলমান, কে হিন্দু, সেকথা ভাবে না। তাদের মনে একটা নতুন জাতীয়তা বোধ জাগছে। তাদের শ্লোগান --- “বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা --- বাংলা দীর্ঘজীবী হোক।” এই চিন্তাধারা সেখানে সকল সম্প্রদায়ের মধ্যেই বর্তমান। পাকিস্তানের জনতা নতুন চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন শ্লোগান দিচ্ছে। বিশেষ করে পূর্বপাকিস্তানের জনতা চায় ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, “full autonomy” এবং সমাজতন্ত্রবাদের প্রতিষ্ঠা।

পাকিস্তানের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের ওপর পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ শুভাশুভ এমন কি জীবনমরণ সমস্যা নির্ভর করছে। বিশেষতঃ এই নির্বাচনে যারা জয়ী হবে তারাই করবে সরকার গঠন আর সংগে সংগে সংবিধানও পরিবর্তন করবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আসন্ন নির্বাচনে প্রগতিশীল দলই জয়লভ করবে এবং সংবিধানকে গণতান্ত্রিক আদর্শে রূপায়িত করবে। আর এক কথা এই যে, প্রগতিশীল দল যদি ক্ষমতায় আসে তবে পাকিস্তানের সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ন্যায্য দাবী ও অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চয় করবে।

পাকিস্তানের সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায়ের দাবী হচ্ছে একটি পূর্ণ গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। যদি সেখানে সত্যিকার ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্টিত হয় এবং গণতান্ত্রিক অধিকার স্থির নিশ্চিতভাবে স্বীকৃত হয় তাহলে সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায় আর বাস্তুত্যাগ করবে না এবং পাকিস্তানকেই নিজেদের স্বদেশ ও মাতৃভূমি মনে করে সেখানেই নিশ্চিন্তে বসবাস করবে।

বন্ধুগণ, আমি পাকিস্তানে বাস করি এবং একজন পাকিস্তানী নাগরিকও বটে। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে এসে আমি তাঁদের যতটুকু জেনেছি ও বুঝেছি তাতে করে এইটুকু আপনাদের আমি জোর দিয়েই বলতে পারি যে, পাকিস্তানের জনগণ এখন আর ভারতবিরোধী নয়। তাঁরা সত্যি সত্যি ভারতের সঙ্গে বন্ধুভাবে বসবাস করতে চায়। আমি ভারতে এসে বিভিন্ন পর্যায়ের লোকের সঙ্গে আলাপ আলোচনান্তে এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, ভারতীয়রাও পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব পোষণ করে না এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুভাবেই বসবাস করতে চায়।

উভয় দেশের মানুষই পরস্পর মিত্রভাবে বসবাস করতে চায় অথচ তা কার্যতঃ হচ্ছে না। এর কারণ কি? হতে পারে উভয় দেশের নেতৃবৃন্দ এবং রাজনীতিকদের এই ব্যাপারে কোথাও কিছু একটা অসুবিধা আছে। তবুও তাদের মিলিতভাবে এবিষয়ে সমাধানে আসতে হবে।

আমার বিশ্বাস এই দুই দেশের মধ্যে যে মিত্রতার বন্ধন স্থাপিত হচ্ছেনা তার মূলে কাজ করছে বৈদেশিক শক্তি --- যেহেতু এই দুই দেশের মধ্যে মৈত্রীর বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হলে কোনো কোনো বৈদেশিক শক্তির কাছে তা অসুবিধার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

যদি উভয় দ্বেশের মধ্যে মৈত্রীর বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হয় তবে দেশ রক্ষা ব্যাপারে ষে বিপুল অর্থ ব্যয় হয় সেই অর্থ শিল্পোনয়নে ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ব্যায়িত হতে পারে এবং তা যদি হয় তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, আগামী দশ বছরের মধ্যে ভারতবর্ষ ও পাকিস্তান বৈষয়িক উন্নতিতে অনেক দূর এগিয়ে যাবে এবং বিশ্বের দরবারে তাদের যথোপযুক্ত স্থান করে নেবে। কেবল তাই নয়, উভয় দেশের মধ্যে মৈত্রীর বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হলে কাশ্মীর সমস্যা, ফরাক্কা সমস্যা কোনো সমস্যা বলেই মনে হবে না। সব কিছুর তখন সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে এবং কাশ্মীর রক্ষার ব্যাপারে যে অর্থ ব্যায় হয় --- তা অন্যান্য গঠনমূলক কাজে ব্যয়িত হতে পারবে। উভয় দেশের মধ্যে মৈত্রীর বঙ্গন প্রতিষ্ঠিত হলে ফরাক্কা দিয়ে পাকিস্তানের যতটা জল প্রয়োজন ভারতবর্ষ তা তাকে দেবে। ভারতবর্ষ উত্তর বঙ্গকে মরুভূমিতে পরিণত করতে কখনই চায় না ; বরং ভারতের স্বার্থে উত্তর বঙ্গকে শস্য ভাণ্ডারে পরিণত করবে এবং তা দ্বারা ভারতবর্ষও যথেষ্ট উপকৃত হবে।

সমগ্র ভারতে আমার বন্ধুবান্ধব এবং নেতৃবৃন্দ যাঁরা উপস্থিত আছেন তাঁদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, আপনারা পাক-ভারত মৈত্রী বন্ধন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হউন। এটা মনে রাখবেন যে, উভয় দেশের মধ্যে এই মৈত্রীর বন্ধন এবং মধুর সম্পর্ক সকলের স্বার্থেই প্রয়োজন। বন্ধুগণ, আমি কিছুটা দুঃখের সঙ্গেই আর একটা ব্যাপারে আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। ভারতবর্ষ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র --- এখানে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা কেন ঘটবে? ভারতে যখন সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা ঘটে তখন পাকিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অত্যন্ত দুঃশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটায় ; মেয়েরা বিনিদ্র রজনী যাপন করে। পাকিস্তান ঐশ্লামিক রাষ্ট্র সেখানে আমাদের সমানাধিকার নেই। তৎসত্ত্বেও আমরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় পাকিস্তানকে মাতৃভূমি বলেই মনে করি। ভারতবর্ষে সাত কোটি মুসলমান। ভারতে যারা সাম্প্রদায়িক মনোভাবসম্পন্ন তাদের একথা জানা উচিত যে, তারা এই সাত কোটি মুসলমানকে ধ্বংস করতে পারবে না। আর যদিও বা তারা এস্থান ত্যাগ করে তবে ভারতবর্ষ দুর্বলই হইবে।

আমার মুসলমান বন্ধুরা বলেন ষে ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ; কাজেই তারা এখানে সংখ্যালঘু নয়। পাকিস্তানে হিন্দুরা সত্যি সত্যি সংখ্যালঘু যেহেতু পাকিস্তান ঐশ্লামিক রাষ্ট্র। ভারতবর্ষে মুসলমানরা হিন্দুদের সঙ্গে সমান অধিকার ভোগ করে। এখানে তাঁরা গভর্ণর, জজ বা উচ্চপদস্থ কর্মচারী হতে পারেন, এমন কি গণতান্ত্রিক ভারতের প্রেসিডেন্টও হতে পারেন। কিন্তু পাকিস্তানে আমরা এরকমটা কল্পনাও করতে পারি না।

আমি ভারতীয় মুসলমানদের বলবো তাঁরা যেন তাদের সত্যিকারের ভারতীয় বলে যনে করেন, ভারতবর্ষকে যেন তাঁরা তাঁদের মাতৃভূমি বলে মনে করেন, কারণ তাঁদের সকল স্বার্থ, সকল শুভাশুভ ভারতের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। আমরা পাকিস্তানী। আমরা চাই পাকিস্তান বড় হোক। আমরা পাকিস্তানে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাই এবং পাকিস্তানেই গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে আপ্রাণ সংগ্রাম করে চলেছি। পাকিস্তান যদি বড় হয় তবে আমরাও বড় হবো এবং আমরা আমাদের পাকিস্তানী বলে ঘোষণা করতে গর্ববোধ করব। (হর্ষধ্বনি)

আজ যদিও আমি পাকিস্তানী নাগরিক কিন্তু ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশের অধীন ছিল তখন ইন্দো-পাক মিলিত এই অখণ্ড মহাদেশের স্বাধীনতার জন্য আমিও সংগ্রাম করেছি। আজ দেশ স্বধীন --- একজন স্বাধীনতা-সংগ্রামী হিসাবে আমি আজকের ছাত্র ও যুব সম্প্রদায়কে এর জন্য গর্ববোধ করতে বলবো। আমি মনে করি এ উপদেশ দেওয়ার অধিকার আমার আছে। কারণ আজ তারা যে স্বাধীনতা উপভোগ করছে সে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আমি একজন। উভয় দেশের যুবসম্প্রদায়ের কাছে অমি এই আবেদন রাখবো যে তারা যেন সাম্পদায়িকতার বিরদ্ধে সংগ্রাম করে, সংগ্রাম করে অনগ্রসরতার বিরুদ্ধে এবং সর্বোপরি চেষ্টা করে শৃঙ্ঘলা-পরায়ণ হতে, যাতে করে তাদের মাতৃভূমি জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করে
।”
.


ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর পৈতৃক ভিটা বেদখল হচ্ছে -     ^^ উপরে ফেরত
বাংলাদেশের DeshTV-র ৬ই মে ২০২৩ এর একটি সংবাদে জানা যাচ্ছে যে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর পৈতৃক ভিটা বেদখল হয়ে যাচ্ছে। সেই খবরে লেখক ও গবেষক ফয়সাল আহমেদ, মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর পৈতৃক ভিটা দখলমুক্ত করে এটিকে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী স্মৃতি কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করার দাবী করেছেন, যার মধ্যে দিয়ে তরুণ প্রজন্ম তাঁকে এবং বাংলার ইতিহাসকে আরও বেশী করে জানতে পারে। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে তাঁর নামে বর্তমানে একটি পাঠাগার রয়েছে যা বেশীরভাগ সময়ে বন্ধই থাকে বলে খবরে প্রকাশ। মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথের স্মৃতিতে এটিই বোধহয় একমাত্র প্রতিষ্ঠান। এই খবরের ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
.


দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও মহারাজ -         ^^ উপরে ফেরত
শ্রীমতী কৃষ্ণা বসু তাঁর আনন্দবাজারের ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখের “বিস্মৃত বিপ্লবী ও তাঁর দেশ” লেখায় লিখেছেন ---

“দেশবন্ধুর প্রসঙ্গে বহু যুগ আগে তাঁর বিপ্লবী জীবনের গোড়ার দিনগুলির কথায় চলে এলেন। ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের সমর্থনে এলেন ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন। সেই প্রথম দেশবন্ধুর সঙ্গে মহারাজের যোগাযোগ। এই ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি হিসেবে মহারাজ বহু দিন পলাতক ছিলেন। সেই পলাতক জীবনেও কত অ্যাডভেঞ্চার।

বিপ্লবীজীবনের সেই গোড়াকার দিনগুলির কথায় ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি ললিত রায়ের গল্প করলেন। ললিত রায় বাংলাদেশের ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই এক আশ্চর্য জেনারেশনের লোক, যাঁরা আর ফিরে আসবেন না। পূর্ব বাংলার উদারহৃদয় জমিদার, সমাজসংস্কারক, স্বদেশিওয়ালা, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোয় পরম উৎসাহী। ঠিক হল বিদেশি কোম্পানির স্টিমারে কেউ চড়বে না। ললিত রায়ের স্বদেশি স্টিমার পাসা পারাপার শুরু করল। কিন্তু কম ভাড়া, বিনা পয়সায় চা-বিস্কুট খাওয়ানো ইত্যাদি প্রলোভনেও কোম্পানি ফেল পড়ল। অকৃতজ্ঞ স্বদেশবাসী সাহেবি কোম্পানির জাহাজে চড়তেই পছন্দ করে দেখা গেল। এতে করে জমিদারির কয়েকটা মহল লাটে উঠল বটে, কিন্তু মহারাজের পক্ষে একটা মস্ত সুবিধা পাওয়া গিয়েছিল এই যে, বেশ কিছু দিন তিনি খালাসি সেজে জাহাজে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে পেরেছিলেন।

ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলা চলার সময় এক বাঙালি পুলিশ ইনস্পেক্টর, যাকে বলে বেশ ‘ড্যামেজিং’ সব সাক্ষ্য দিয়ে চলে গেলেন। কোর্ট থেকে ফিরে এলেন দেশবন্ধু। বেশ বিরক্ত ভাবে বললেন, এই ভাবে সবাই যদি এসে সাক্ষী দিয়ে যায়, তবে তোমরা আমাকে ডেকেছ কী করতে? কথাটার কী অর্থ, কে বুঝেছিল, কে জানে। পর দিন ঢাকা স্টেশনের কাছে সেই ইনস্পেক্টরের মৃতদেহ পাওয়া যায়। “আমি করি না, আর একজনে করছিল” — আমাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন মহারাজ
।”

আনন্দবাজার পত্রিকার ওয়েবসাইটে পুরো আলেখ্যটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন...।
.


নেতাজী সুভাষ ও মহারাজ -         ^^ উপরে ফেরত
শ্রীমতী কৃষ্ণা বসুর আনন্দবাজারের “বিস্মৃত বিপ্লবী ও তাঁর দেশ” লেখায় তিনি লিখেছেন যে ১৯৭০ সালে কলকাতায় যখন মহারাজ এসেছিলেন, তখন কৃষ্ণা বসু তাঁর সঙ্গে যাদবপুরে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তাঁকে মহারাজ যা বলেছিলেন তা থেকে আমরা কয়েকটি লাইন তুলে দিচ্ছি ---

“আলিপুর জেলে এক বার নেতাজির সঙ্গে একসঙ্গে বন্দিজীবন। দেশবন্ধুর কী সেবাযত্নটাই না সুভাষ সে সময় করতেন। এমনকি রেঁধে-বেড়ে খাওয়ানো পর্যন্ত সব। তার পর আবার একসঙ্গে হলেন সুদূর বর্মাদেশে মান্দালয় জেলে। সুভাষচন্দ্র আগেই বললেন, মহারাজের সিট আমার পাশে থাকবে। সেই ব্যবস্থাই হল। জেলখানায় টেনিস খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়ে হাঁটু কেটে গেল মহারাজের। সুভাষচন্দ্র মহাব্যস্ত হয়ে পড়লেন। নিজের হাতে হাঁটুতে ওষুধ লাগিয়ে দিলেন।”

কৃষ্ণা বসু সেই আলেখ্যর শেষে লেখেন --- “মৃত্যুর কয়েক দিন আগে নেতাজি ভবনে তাঁকে শেষ বার দেখি। সে দিন মিউজ়িয়ামের ভিজ়িটরস বুক-এ এই বিরাশি বছরের তরুণ বিপ্লবী যে কথা ক’টি লিখে রেখে গিয়েছিলেন ভারতবর্ষের তরুণ সমাজের উদ্দেশে তাই রয়ে গেল তাঁর অন্তিম বাণী।” ---

“নেতাজি সুভাষচন্দ্র ভারতের যুবকদের আদর্শ। ভারতের যুবকেরা নেতাজির আদর্শে শক্তিশালী ভারত গড়িয়া তুলিবে ইহাই আশা করি।”

আনন্দবাজার পত্রিকার ওয়েবসাইটে পুরো আলেখ্যটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন...।
.


RSS, Hindu Mahasabha and Trailokyanath -  ^^ উপরে ফেরত
In the article “Trailokyanath Chakraborty: The Revolutionary Who Spent 30 Years in Jail, But Never Apologised” by Harshvardhan and Prabal Saran Agarwal on 9th Aug 2022 in The Wire.in, they wrote about Trailokyanath’s interaction with founder of the Rashtriya Swayamsevak Sangh (RSS), Keshav Baliram Hedgewar, and the leader of the Hindu Mahasabha, Ganesh Savarkar ---

“He even met the founder of the Rashtriya Swayamsevak Sangh (RSS), Keshav Baliram Hedgewar, and the leader of the Hindu Mahasabha, Ganesh Savarkar, as they also claimed to be ‘nationalists’. But the two openly refused to participate in any kind of action against the British, as Chakraborty has himself mentioned in his memoirs.

It is surprising that while nationalist and Marxist historians have completely forgotten Chakraborty, he has found a place, though in a selective manner, in right-wing intellectual propaganda where one single line from his book is used to absolve the founder of the RSS from the charge of not participating in the freedom struggle.

In almost every piece of hagiographic literature that has been written – and is still being written – on Hedgewar, a single line from Chakraborty’s autobiography, where he says that the former was at one time a member of the Anushilans, is quoted to prove the ‘revolutionary’ credentials of the founder of RSS. These academicians and journalists deliberately ignore the lines that follow, however, where Chakraborty narrates his meeting with Hedgewar in considerable detail:

“On one afternoon of 1940, I reached the house of [Hedgewar] and asked him; ‘Do you still remember Kalicharan da?’ He embraced me…I asked him, ‘What is the strength of your volunteer force?’ He replied, ‘Sixty thousand.’ I said, ‘They will have to join the revolutionary struggle.’ I explained everything and made him aware that Subhas Chandra Bose was in support of our plan. Listening to this, Keshav Hedgewar replied, ‘Out of the sixty thousand volunteers, many are young kids. They have not been trained properly. Moreover, you people did not care to ask about my whereabouts for so long and now suddenly you are asking for my help! How is this possible?’ Upon hearing this, I replied, ‘We are not going to get such a golden opportunity again in our lifetime. We must exploit this opportunity provided by the world war. Please convince your lieutenants anyhow to participate in the upsurge, others will follow suit.’”

After this failed meeting with Hedgewar, Chakraborty left for Varanasi where he met Ganesh Damodar Savarkar, the elder brother of V.D. Savarkar and leader of the Hindu Mahasabha. He tried to convince him to join the insurrection. Narrating this meeting he writes:

“Ganesh Damodar Savarkar – the elder brother of Vinayak Damodar Savarkar – was in Kashi. We were together in the Andaman Jail. He had learnt a good deal of Bengali. I also used to learn Marathi from him. I addressed him as Ganesh da. After telling him about our plans of insurrection I asked him, ‘Will the Hindu Mahasabha support us?’ To this Ganesh da replied, ‘The train has left the station, now what is the use of limping after it…opportunity is lost, now nothing can be done.”

After being disappointed by Ganesh Savarkar, Chakraborty writes that he met another fellow inmate from Andamans, Sachindranath Sanyal, who not only readily accepted his proposal but even began preparations.
”

We understand that the above piece from “The Wire” may never be believed by the present day so-called Indian “Nationalistic” intelligentsia. So we decided to quote from the original book by Trailokyanath Chakraborty in Bangla, below ---

To read the full article in The Wire.in website please click here… (To reach this website sometimes you may have to try some network other than BSNL!)

.


RSS, হিন্দু মহাসভা ও ত্রৈলোক্যনাথ -         ^^ উপরে ফেরত
দ্বিতীয় বিশ্বের সময়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে নেতাজী সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্ত্বে এক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনায় তিনি, R. S. S. অধিনায়ক শ্রীকেশব বলিরাম হেডগেওয়ার এবং হিন্দু-মহাসভার অন্যতম নেতা শ্রীগণেশ দামোদর সাভারকারের সঙ্গে তাঁদের নাগপুর ও কাশীর বাড়িতে গিয়ে দেখা করেছিলেন। সেই হতাশাব্যঞ্জক সাক্ষাৎকারের কথা তিনি লিখে গিয়েছেন তাঁর “জেলে ত্রিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম” গ্রন্থের ২০৪-পৃষ্ঠায় ---

“রাষীয় স্বয়ংসেবক-সঙ্ঘের ( R. S. S.) অধিনায়ক শ্রীকেশব হেডগেওয়ার আমাদের অনুশীলন সমিতির সভ্য ছিলেন। তিনি যখন ১৯১০ সনে কলিকাতা ন্যাশনেল মেডিক্যাল কলেজে পড়িতেন, তখন তিনি বীর সাভারকারের কনিষ্ঠ ভ্রাতা নারায়ণ দামোদর সাভারকার, ডাঃ এথলে (সাতারা) এবং আরও কিছু মহারাষ্ট্রদেশীয় যুবক, ন্যাশনেল মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র আমাদের বিপ্লব-দলে যোগ দিয়াছিলেন। "বাংলায় বিপ্লববাদ” পুস্তকের লেখক শ্রীনলিনীকিশোর গুহ ঐ সময় ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে পড়িতেন, তিনি তাঁহাদিগকে দলে টানিয়া আনেন। আমার পলাতক অবস্থায় আমি ২/১ বার তাঁহাদের ছাত্রাবাসে ছিলাম। ১৯৪০ সনে আমি হঠাৎ তাঁহার নাগপুরের বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হই এবং জিজ্ঞাসা করি “কালীচরণ দা’র কথা মনে আছে কি?” তিনি আমাকে জড়াইয়া ধরিলেন। আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনার ভলান্টিয়ার-বাহিনীর সংখ্যা কত?” তিনি বলিলেন, “৬০০০০ হাজার।” আমি বলিলাম, “এই ষাট হাজার সৈন্য লইয়া আপনাকে ভাবী বিপ্লবে ঝাপাইয়া পড়িতে হইবে।” আমি তাঁহার নিকট সব কথাই বলিলাম, সুভাষবাবুর কথাও বলিলাম। কেশব হেডগেওয়ার উত্তরে বলিলেন,“এই ষাট হাজার ভলান্টিয়ার-এর মধ্যে বহু অল্পবয়স্ক ছেলে আছে, বিশেষতঃ আমি সে ভাবে তাহাদিগকে গড়িয়া তুলি নাই। আপনারা এতদিন আমার কোন খোঁজ খবর লন নাই, আজ হঠাৎ বলিলেন, “ঝাঁপাইয়া পড়িতে হইবে, ইহা কি প্রকারে সম্ভবপর হয়?” আমি বলিলাম, *“এরূপ সুবর্ণ সুযোগ আর আমাদের জীবনে আসিবে না, এই মহাযুদ্ধের সুযোগ আমাদের গ্রহণ করিতে হইবে। আপনি আপনার বিশ্বস্ত লোকদিগকে এই ভাবে গড়িয়া তুলুন, অপর সব উত্তেজনার মুখে ঝাঁপাইয়া পড়িবে।” আমি তাঁহার সহিত আলাপ শেষ করিয়া কাশী যাই। নাগপুর সহরে হেডগেওয়ারের একখানা ছোট্ট বাড়ী ছিল, আমি সেই বাড়ীতে ছিলাম।

হিন্দু-মহাসভার অন্যতম নেতা শ্রীগণেশ দামোদর সাভারকার (বীর সাভারকারের বড় ভাই) তখন কাশীতে ছিলেন। আন্দামানে আমরা একত্র ছিলাম, তিনি বেশ বাংলা ভাষা শিখিয়াছিলেন, আমিও তাহার নিকট মারহাট্টি ভাষা শিখিতাম। আমি তাহাকে গণেশ দা" বলিয়া সম্বোধন করিতাম। আমি গণেশ দা'কে ভাবী বিপ্লবের কথা বালিয়া জিজ্ঞাস করিলাম, “হিন্দু মহাসভা আমাদের সহিত যোগ দিবে কিনা?” গনেশবাবু বলিলেন “গাড়ী ছাড়িয়া দিয়াছে, এখন গাড়ীর পেছনে পেছনে খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে দৌড়াইয়া কোন লাভ আছে কি?” তিনি আরও বলিলেন, “সময় চলিয়া গিয়াছে, এখন বৃথা চেষ্টা করিয়া কোন লাভ নাই।” অতঃপর আমি কাশীতে শ্রীশচীন্দ্রনাথ সান্ন্যালের সহিত দেখা করিয়া ভাবী বিপ্লবের প্রস্ততির জন্য বাড়ী ছাড়ার কথা বলিলাম, তিনি রাজী হইলেন। শচীন্দ্রনাথ বিবাহ করিয়াছিলেন, তিনি বাড়ীর ব্যবস্থা করিতে পারিলেই বাহির হইবেন বলিলেন। বাংলার বাহিরে “অনুশীলন-সমিতির যাহারা নেতৃস্থানীয় ছিলেন তাঁহাদের সকলেই সৈন্য-সংগ্রহের চেষ্টা করিতে লাগিলেন
।”
.


আমার জীবন সফল হয় নাই -         ^^ উপরে ফেরত
কবির “জেলে তিরিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম” গ্রন্থের “প্রস্তাবনা”। দীর্ঘ হলেও পরিচ্ছেদটিকে কবির একটি কবিতা হিসেবে আমরা ২০২১ সালে প্রকাশিত, "মিলনসাগরের প্রতিবাদী কবিতার দেয়ালিকায়" তুলে ধন্য হয়েছিলাম, যাতে কিছু পাঠক তা পড়ার সুযোগ পান। ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, সেলুলার জেলের অলিন্দ-সংলগ্ন কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি। তাই তাঁদের মতো মানুষের কলমের ছোঁওয়া আমাদের কাছে কবিতাই ---

"আমার জীবন সফল হয় নাই। সাধারণতঃ সফল জীবন বলিতে লোকে যাহা মনে করে, অর্থাৎ অর্থ উপার্জন, গৃহধর্ম পালন, রাজ-সম্মান লাভ, তাহা আমার ভাগ্যে হয় নাই বলিয়া আমি জীবন ব্যর্থ হইয়াছে, মনে করি না? বস্তুতঃ একদিক দিয়া দেখিতে গেলে আমার জীবন ব্যর্থ হয় নাই, আমার জীবন সফল হইয়াছে---সার্থক হইয়াছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্য লইয়া জীবন প্রভাতে ঘরের বাহির হইয়াছিলাম, সেই উদ্দেশ্য সার্থক ও সফল হয় নাই। আমার যৌবনে যখন আমার ১৫ বংসর দ্বীপান্তর দণ্ড হয়, ডাণ্ডা বেড়ী পায়, ক্ষুদ্র নির্জনকক্ষে দিন রাত্রি যখন আমি আবদ্ধ, তখনও মনে করি নাই আমার জীবন ব্যর্থ হইয়াছে, তখনও আমার মনে এই ধারণাই ছিল যে ১৫-বৎসর আর কত দিন, দেখিতে দেখিতে পনের বৎসর কাটিয়া যাইবেই ; ইতিমধো যদি ভারতবর্ষ স্বাধীন না হয়, আমি জেল হইতে বাহির হইয়া ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবের বাবস্থা করিব।

আমার স্বপ্ন সফল হয় নাই, আমি সফলকাম বিপ্লবী নই। আমার ব্যর্থতার কারণ, আমার দুর্বলতা নয়! আমি কখনও ভীরু ছিলাম না---আমার জীবনে কখনও দুর্ব্বলতা দেখাই নাই। আমি আমার চরিত্র নির্মল ও পবিত্র রাখিতে সক্ষম হইয়াছি। অর্থলোভ আমার ছিল না। এক সময় হাজার টাকা আমার হাতে আসিয়াছে, কিন্তু সে টাকা নিজের ভোগ-বিলাসিতার জন্য ব্যয় করি নাই। সেই সময়ও আমি রাস্তাঘাটে চলা ফিরার সময় চিড়া মুড়ি খাইয়াছি, যতটা সম্ভব পায়ে হাঁটিয়াই চলিয়াছি---গাড়ী ঘোড়া চড়ি নাই। মৃত্যুভয় আমার ছিল না, যে কোন বিপদজনক কাজে হাত দিতে আমি পশ্চাৎপদ হই নাই। আমার স্বাস্থ্য ভাল ছিল, আমি কখনও অলস ছিলাম না, কঠিন পরিশ্রমের কাজে কখনও ভীত হই নাই, যখন যে কাজ করিয়াছি, আন্তরিকতার সহিতই করিয়াছি। আমার ব্যর্থতার কারণ পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আমার ব্যর্থতার কারণ একজন দক্ষ ও সফলকাম বিপ্লবীর যতটা ধীশক্তি ও জন-গণ-মন অধিনায়কতার যে ব্যক্তিত্ব থাকা আবশ্যক তাহার অভাব।

আমার পিতার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল ছিল। আমি ভাইদের মধো ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ। আমার পড়ার খরচের কোন অভাব ছিল না। আনি ছাত্রও খারাপ ছিলাম না---ভাল ছাত্রের মধ্যে গণ্য ছিলাম। তথাপি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ডিগ্রী লাভ করিতে পারি নাই। আমার শৈশবে ১৯০২/৩ সনে যখন আমি মালদহ জিলার অন্তর্গত কাণসাটে ছিলাম এবং পুখুরিয়া মাইনর স্কুলে পড়িতাম তখন সেখানে স্কুলের শিক্ষক মহাশয়গণ আশা করিতেন আমি বৃত্তি পাইব। কিন্তু বৃত্তি পাওয়া আমার হয় নাই। মাইনর পরীক্ষা দেওয়ার পূর্বেই আমাকে কাণসাট পরিত্যাগ করিয়া আসিতে হয় এবং উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয়ে ভর্তি হই।

ময়মনসিংহ জিলার ধলা হাইস্কুলে আমি একবৎসর পড়িয়াছিলাম এবং সেখানেও ভাল ছাত্রের মধ্যে গণ্য ছিলাম। পর বৎসর আমি সাটিরপাড়া হাইস্কুলে ভর্তি হই এবং স্কুল-বোর্ডিং-এ থাকি। আমি সাটিরপাড়া স্কুলে প্রথম দ্বিতীয় স্থানই অধিকার 'করিতাম। একবার একটি ঘটনা ঘটে। আমি যখন থার্ড ক্লাস হইতে সেকেণ্ড ক্লাসে উঠি, সেই বংসর সংস্কৃতের প্রশ্ন খুব কঠিন হইয়াছিল। সংস্কৃতে মাত্র একজন ছাত্র পাশ করিয়াছিল। আমি কয়েক নম্বরের জন্য ফেল করিয়াছিলাম, কিন্তু মোটের উপর দ্বিতীয় স্থান অধিকার করিয়াছিলাম। সকল ছাত্রকেই কিছু গ্রেস্‌ দিয়া প্রমোশন দেওয়া হইয়াছিল। আমি প্রমোশনের দিন উপস্থিত ছিলাম না, সমিতির কাজে অন্যত্র ছিলাম, আমাকে প্রমোশন দেওয়া হয় নাই। আমি বোর্ডি-এ উপস্থিত হইয়া যখন শুনিতে পাইলাম আমি প্রমোশন পাই নাই,তখন বলিতে লাগিলাম,আমি আর পড়িব না, ঢাকা-সমিতির বোর্ডিংএ চলিয়া যাইব এবং সমিতির কাজ করিব। আমার শিক্ষক মহাশয়গণ আমাকে খুব স্নেহ করিতেন। আমার মন্তব্য শুনিয়া তাহারা আমাকে ডাকাইলেন। আমি উপস্থিত হইলে, আমাদের তৃতীয় শিক্ষক শ্রদ্ধেয় শীতল চক্রবর্তী মহাশয় আমাকে স্নেহভরে বলিলেন---তুমি প্রমোশন নিশ্চয়ই পাইবে, কিন্ত তোমার নিকট হইতে আমরা এই প্রতিশ্রুতি চাই,---তুমি সমিতির কাজের জন্য যতক্ষণ সময় ব্যয় কর, পড়াশুনার জন্যও ততক্ষণ সময় দিতে হইবে---তোমার সকালে দুই ঘণ্টা ও রাত্রে এক ঘণ্টা পড়াশুনা করিতে হইবে। তিনি বলিলেন, দেশ যেমন তোমাকে চায়, আমরাও তোমার দিকে চাহিয়া আছি। আমাদের স্কুল হইতে এপর্যস্ত কেহ স্কলারশিপ পায় নাই। তুমি যদি প্রত্যহ তিন ঘণ্টা পড় তবে আমাদের বিশ্বাস তুমি স্কলারশিপ পাইবে। আমি শিক্ষক মহাশয়দের কথায় সম্মত হইলাম এবং আমার প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছিলাম, কিন্তু স্কলারশিপ পাওয়া আমার অদৃষ্টে ছিল না। প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার পূর্বেই ১৯০৮ সনের মধ্যভাগে নারায়ণগঞ্জে ধৃত হই এবং আমার ছয় মাস জেল হয়। সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্য-জীবন শেষ হইয়া নূতন জীবন আরম্ভ হয়।

কারা-জীবন হইতেই আমার নূতন জীবন আরম্ভ হয় এবং সম্ভবতঃ কারাগারেই আমার জীবনের শেষ হইবে। আমি ভারতবর্ষের মধ্যে, ভারতবর্ষ কেন সম্ভবতঃ পৃথিবীর মধ্যে রাজনৈতিক কারণে সর্বাপেক্ষা অধিক বৎসর যাহারা কারাগারে কাটাইয়াছেন, তাহাদের অন্যতম। আমি ১৯০৮ সন হইতে ১৯৪৬ সন পর্যন্ত ৩০ বৎসর কারাগারে কাটাইয়াছি, ৪।৫ বৎসর অজ্ঞাতবাসে কাটাইয়াছি।

আমি ১৯১৬।১৭ সনে আন্দামানে বারীণবাবু, পুলিনবাবু, সাভারকর, ভ্রাতৃদ্বয়, ভাই পরমানন্দ, জোয়ালা সিং, পৃথ্বি সিং, গুরুমুখ সিং, পণ্ডিত পরমানন্দ, মোস্তাফা আমেদ প্রভৃতির সহিত একত্র ছিলাম। ১৯২৫।২৬ সনে ব্রহ্মদেশের অন্তর্গত মান্দালয় জেলে নেতাজী সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে কাটাইয়াছি, ১৯৩২।৩৩ সনে মাদ্রাজ প্রদেশের অন্তর্গত বিভিন্ন জেলে কে রামন মেনন, কর্ণাটকের সদাশিব রাও, অধ্যাপক এন, জি, রঙ্গ, মালাবার বিদ্রোহের নেতা এম, পি, নারায়ণ মেনন প্রভৃতির সহিত একত্র ছিলাম। বাঙ্গালা দেশের ছয়টি সেণ্ট্রাল জেলে এবং কয়েকটি ডিষ্ট্রিক্ট জেলেও ছিলাম। আমি বহু বংসর সাধারণ কয়েদীর মত ছিলাম, দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদী ছিলাম এবং বিশেষ শ্রেণী (Special Class) কয়েদী ছিলাম। আমি ষ্টেট-প্রিজনার ছিলাম, ডেটিনিউ ছিলাম, সিকিউরিটি বন্দী ছিলাম এবং অন্তরীণাবদ্ধও ছিলাম। জেলখানার পেনাল কোডে যে সব শাস্তির কথা লেখা আছে এবং যে-সব শাস্তির কথা লেখা নাই, তাহার প্রায় সবগুলি সাজাই ভোগ করিয়াছি। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ জেলে বেশীর ভাগ সময় অসহ্য উৎপীড়নে জীবনের ত্রিশ বৎসর আমার কাটিয়াছে, জেলে এবং জেলের বাহিরে ষাট বৎসরকাল বিদেশী শাসনের অবসান ঘটাইয়া কেমন করিয়া দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধন করিব তাহাই চিন্তা করিয়াছি। আমার জীবনব্যাপী সাধনায় ও সেবায় জাতিকে বড় করিয়া তুলিব, ধর্মে-কর্মে, শৌর্যে, বীর্যে সংযমে-ওদার্যে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে এবং চারিত্রিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠ করিয়া তুলিব। আমার দেশের মানুষ অনুশীলনের দ্বারা পূর্ণ মানুষ হইয়া উঠিবে, থাকিবে না ক্ষুদ্র স্বার্থচেতনা, দুর্নীতি, বঞ্চনা, বৈষম্য ও শোষণ,---এই স্বপ্নই দেখিয়াছিলাম---আজ দেশ স্বাধীন হইয়াছে,--- বৃটিশ প্রভুত্বের অবসান ঘটিয়াছে বটেই ; কিন্তু দেশ ও জাতিকে চরিত্র-গৌরবে বড় করিয়া তুলিবার যে আদর্শ ছিল বিপ্লবীর, যে দায়িত্ব ছিল বিপ্লবীর তাহা সফল হইল কই? তাই তো স্বাধীনতার পরে দেশকে যেমনটি দেখিবার স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম, সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবে রূপায়িত দেখিতে পাই না। মানুষকে গতানুগতিক গ্লানি ও দুঃখ দৈন্যের ঊর্ধ্বে তুলিয়া লইয়া যাওয়ার মধ্যে তো বিপ্লবীর সাধনার সিদ্ধি। কিন্তু সেই সিদ্ধি আনিতে পারি নাই ; তাই মর্মান্তিক বেদনা-বোধ করিয়া বলিতে বাধ্য হইয়াছি ; আমার জীবন সফল হয় নাই"
।
.


কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর স্বীকারোক্তি -         ^^ উপরে ফেরত
ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী তাঁর “জেলে ত্রিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম” গ্রন্থের, চতুর্থ পরিচ্ছেদ – “অস্ত্র সংগ্রহ, বোমার কারখানা” অংশের ৫০-পৃষ্ঠার “বাঙ্গালী মারিতে জানে” অনুশির্ষে লিখেছেন তাঁর স্বীকারোক্তি, যা আমরা, তাঁদের সৃষ্ট স্বাধীন দেশে জন্মানো নাগরিক হয়ে শিরোধার্য করে নিচ্ছি ---

“আমি পরাধীন ভারতে বহু ডাকাতি করিয়াছি, খুন করিয়াছি, চুরি করিয়াছি, নোট জাল করিয়াছি, কিন্তু যাহা কিছু করিয়াছি, সবই দেশের স্বাধীনতার জন্য --- কর্তব্যের দায়ে। আমরা বিদ্বেষ ভাব হইতে বা ব্যক্তিগত স্বার্থ সাধনের জন্য কিছুই করি নাই। আমি যাহাকে হত্যা করিয়াছি, তাহার আত্মার কল্যাণ কামনাই করিয়াছি, তাহার পরিবারের শুভ চিন্তাই করিয়াছি। ডাকাতি বা খুন আমাদের পেশা ছিল না। আমরা যাহাদের বাড়ীতে ডাকাতি করিয়াছি, যাহাদিগকে হত্যা করিয়াছি, আমরা জানিতাম তাহারা আমাদের স্বদেশবাসী। আজ স্বাধীন ভারতে আমাদের হাতে যদি রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকিত, তবে আমরা যাহাদের বাড়ীতে ডাকাতি করিয়াছি, তাহাদের বংশধরদের মধ্যে যাহারা আজ বিপন্ন তাহাদিগকে সরকারী সাহায্য দান করিতাম। ঘটনাচক্রের আবর্তনে দেশের শাসনভার বিপ্লবীদের হাতে না আসিয়া, ন্যস্ত হইয়াছে অন্যত্র, এরূপ ক্ষেত্রে সক্রিয় সাহায্য দানের সামর্থ্য হইতে বঞ্চিত যাহারা, আন্তরিক সমবেদনা কেবলমাত্র কথায় জ্ঞাপন করিয়াই তাহারা তাহাদের কর্তব্য সম্পন্ন করিতে বাধ্য হইতেছে।”
.


কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর রচনাবলী -         ^^ উপরে ফেরত
তাঁর রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে “জীবন স্মৃতি”, “জেলে ত্রিশ বছর”, “পাক ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম”। লিখেছিলেন “গীতায় স্বরাজ্য”, যার ১ম খণ্ড (প্রথম চারটি অধ্যায়) ১৯২৮ সালে জেল থেকে ছাড়া পাবার পর প্রকাশ করেছিলেন। “প্রবাসী” ও “আনন্দবাজার পত্রিকায়” তার সমালোচনাও বার হয়েছিল। ১৯৩০-৩৮ সালের কারাবাসের সময় তিনি বাকি গীতার অধ্যায়গুলির ভাষ্য রচনা করেছিলেন। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর দেশের অবস্থা দেখে তা আর প্রকাশ করার সাহস পান নি। এবং তাঁর সেই অর্থও ছিল না। এছাড়া ছাত্রদের নির্ভীক, চরিত্রবাণ ও দেশপ্রেমিক তৈরী করার উদ্দেশ্যে জাতীয় বিদ্যালয়গুলোর প্রাথমিক স্তরের জন্য পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছিলেন দেশপ্রাণ বীরেন্দ্র শাসমলের অনুরোধে, প্রথম থেকে পঞ্চম ভাগ পর্যন্ত। তিনি তা মাঝে মাঝে দেখে কিছু পরিবর্তনও করতে বলতেন। খবরটি হেমেন্দ্র দাশগুপ্তের মাধ্যমে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের কানে পৌঁছলে, তিনিও তা দেখতে চান মান্দলয় জেলে এবং তিনি তার এক কপি, সঙ্গে করে নিয়ে আসেন ছাড়া পাওয়ার সময়ে। সুভাষচন্দ্রকেও তিনি এই পাঠ্যপুস্তকের কথা জানিয়েছিলেন। ১৯২৯ সালে জেল থেকে ছাড়া পাবার পর নেতাজীর সুপারিশ পত্র নিয়ে কলকাতা করপোরশনের এডুকেশন অফিসার ক্ষিতিশপ্রসাদ চ্যাটার্জীর (K. P. Chatterjee) কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আমলাটি তাঁকে দীর্ঘকাল ঘুরিয়েছিলেন এবং ঘন্টার পর ঘন্টা বাড়িতে অপেক্ষা করিয়ে অপমান করেছিলেন। কবির কথায় --- করপোরেশনের তালিকাভুক্ত পাঠ্য-পুস্তকের গ্রন্থকারদের নাকি “---বহু বেগ পাইতে হয়, ---বহু মাল মশলা খরচ করিতে হয়, ---তৈল মর্দনও করিতে হয় বহু, এবং কয়েক জোড়া জুতার তলীও বদলাইতে হয়”।(পৃ-১৭৪) । ফলে, তিনি শেষে পাণ্ডুলিপি রাগের মাথায় ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্রকেও তিনি এই ঘটনার কথা জানিয়েছিলেন। শুনে তিনিও খুব দুঃখিত হয়েছিলেন।
.


প্রবাসীতে কবির “গীতায় স্বরাজ্য” এর সমালোচনা -     ^^ উপরে ফেরত
কবির “গীতায় স্বরাজ্য” গ্রন্থের প্রবাসী পত্রিকার ভাদ্র ১৩৩৭ (August-Sept 1930) সংখ্যার পুস্তক পরিচয়তে সমালোচনাটি আমরা আমাদের সংগ্রহের প্রবাসী পত্রিকা থেকে তুলে দিলাম ---
   “গীতায় স্বরাজ্য (১ম খণ্ড) - শ্রীত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্ত্তী প্রণীত। প্রকাশক শ্রীসতীশচন্দ্র পাক্ড়াশী ; ঢাকা। মূল্য এক টাকা। পৃঃ ১২০।
   গীতার বহুপ্রকারের টীকা হইয়াছে। বিভিন্ন টীকাকার বিভিন্ন দৃষ্টি লইয়া স্বীয় মতের অনুকূলভাবে গীতার ব্যাখ্যা করিয়াছেন। একই গ্রন্থের এত ভিন্ন অর্থের মধ্যে সবগুলিই সঙ্গত হইতে পারে না ; কোন কোনটাতে টীকাকারের মত প্রতিপাদনের জন্য গীতাকে বাহনরূপে গ্রহণ করা হইয়াছে মাত্র। বর্ত্তমান গ্রন্থের একটি বিশেষত্ব আছে। সত্বর স্বাধীনতা লাভচেষ্টার প্রথম যুগে যাঁহারা স্বরাজ্যসাধনার জন্য বহু দুঃখকষ্ট, নির্ব্বাসন নির্য্যাতন ভোগ করিয়াছিলেন, গ্রন্থকার তাঁহাদের মধ্যে অন্যতম এবং নেতৃস্থানীয়। গীতাই সে যুগে তাঁহাদের সাধনার আদিগ্রন্থ ছিল এবং তাহারই মধ্যে তাঁহারা তাঁহাদের আদর্শের আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠা খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। গীতার যে অর্থ তাঁহারা সেদিন করিয়াছিলেন, সেই অর্থের অনুযায়ী আদর্শই তাঁহারা সাধনা করিয়াছিলেন এবং তাঁহাকেই কার্য্যে পরিণত করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। এইখানেই এই ব্যাখ্যার বিশেষত্ব এবং এইজন্যই ইহা সকলের প্রণিধানযোগ্য। বর্তমান খণ্ডে মাত্র প্রথম চারিটি অধ্যায়ের ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে। আমরা সাগ্রহে বাকি খণ্ডগুলির জন্য অপেক্ষা করিয়া থাকিব। গ্রন্থের রচনা সুখপাঠ্য, ছাপাও ভাল, তবে মাঝে মাঝে বর্ণাশুদ্ধি আছে।              --- শ্রীঅনাথনাথ বসু।”
.


কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর কবিতা -   ^^ উপরে ফেরত
কবি তাঁর জেলে কবিতা লেখা নিয়ে তাঁর “জেলে ত্রিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম” গ্রন্থের ১৩১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন ---

“সেলগুলি আট হাত লম্বা ও পাচ হাত চওড়া ছিল, ইহারই মধ্যে আমাদিগকে সারা দিনরাত থাকিতে হইত। সেলে দিনের বেলায় বিছানা রাখিবার হুকুম ছিল না সকালে বিছানা লইয়া যাইত। সেলে আমরা কবিতা লিখিয়া সময় কাটাইতাম। কিন্তু কেহই কবি ছিলাম না। কবি হইবার সাধও ছিল না, কবিতা লিখিতেও জানিতাম না। কবিতার ছন্দ-ব্যাপারে বাধ্য হইয়াই আমরা ছিলাম বিপ্লবী, কবিতা লিখিবার সাধারণ নিয়ম-কানুন মানিয়া চলিতাম না। যাহা খুসী এবং যেভাবে ইচ্ছা আমরা কবিতা রচনা করিতাম। আমরা জানিতাম আমাদের কবিতা কখনও পুস্তকাকারে বাহির হইবে না, বাহির হইলেও কেহ পয়সা দিয়া তাহা কিনিয়া পড়িবে না। কাজেই কবিতা লিখিয়া আমাদের মার খাইবার কোনই ভয় ছিল না। ষ্ট্রাইকারদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল পাঞ্জাবী। তাহারা বাঙ্গালা জানিতেন না। তাই আমি স্থির করিলাম, ইংরাজীতে কবিতা লিখিব। কবিতা লিখিবার জন্য আমাদের কাগজ-কলম ছিল না, কাগজ-কলমের প্রয়োজনও হইত না। আমাদের সম্বল ছিল সেলের মেঝে, দেওয়াল ও সুরকী।”

এই পাতা ছাড়া, মিলনসাগরে কবি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের কবিতা রয়েছে “মিলনসাগরের প্রতিবাদী কবিতার দেয়ালিকা”-তেও। সেই কবিতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন...।

আমরা মিলনসাগরে কবি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের কবিতা ও তাঁর জীবন ও কর্মযজ্ঞ আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা। এই পাতা বাংলা তথা ভারতবর্ষের আজীবন স্বাধীনতা সংগ্রামী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী মহারাজের প্রতি মিলনসাগরের শ্রদ্ধাঞ্জলি।



কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী মহারাজের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।



আমাদের ই-মেল
: srimilansengupta@yahoo.co.in
হোয়াটসঅ্যাপ
: +৯১ ৯৮৩০৬৮১০১৭



এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ১০.৬.২০২৫


উৎস ---