প্রতিবাদী কবিতার দেয়ালিকা
|
|
|
এই পাতাটি পাশাপাশি, ডাইনে-বামে ও কবিতাগুলি উপর-নীচ স্ক্রল করে! This page scrolls sideways < Left - Right >. Poems scroll ^ Up - Down v.
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভারতবাসী গো---জীবনহারা গরব তোদের শ্মশানে
কবিয়াল শেখ গুমানী দেওয়ান (৪.৩.১৮৯৬ - ৯.৫.১৯৭৬)। রচনাকাল
দেশভাগের পরে।
(গণ সঙ্গীত)
ভারতবাসী গো---জীবনহারা গরব তোদের শ্মশানে
জগৎ জুড়ে নাম জাঁকালে অশোকমার্কা নিশানে
আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া ব্রিটেন জাপান ইস্পেনে
সবাই জানে ভারত স্বাধীন আমরাই শুধু জানি নে।
সীতা উদ্ধার করে শ্রীরাম স্বর্গে হলেন অধিষ্ঠান
রেখে গেলেন হনু-বানর নল-নীল আর জাম্বুবান
(এরা) মাঠের ফসল গাছের পাতা ভরছে পেটে জুড়িয়ে মাথা
স্বাধীন দেশে দাঁড়াই কোথা কামলা রোগের রসানে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ছেলে বেলায় দরিদ্রের সেবার স্বপ্ন, নিষ্কলঙ্ক নৈতিক জীবন
গঠনের স্বপ্ন, তারপর সাহিত্যের রসের আয়োজন, দেশপ্রেমে বিশ্ব-
জয়ী বীর হবার কামনা ; তার পরে কৃষি, দৌকানদারী, বরোদার
জীবন ; অবশেষে রাজনীতির ঘূর্ণিপাক, বিপ্লবের রক্তচুল্লী, সব
শেষে ধর্ম্মের নেশা---দিব্য কোন্ পরম জ্যোতির্লোকের অভিমুখে
জয়যাত্রার অভিযান। সব গিয়ে এখনও আছে ঐ সবেরই কিছু
কিছু ভগ্নাংশ, বুঝি সব কয়টি মিলে হয়েছে জগতে মানব সমাজে
এক উজ্জ্বল সুসমঞ্জস সত্যলোকের আবির্ভাবের স্বপ্ন। আমার তো
বোধ হয় চেষ্টা করলে সত্যই এটা হয়, এই ভাঙা-চোরা ; বিষদৃশ
অর্দ্ধোন্মাদ-জগতের দিকে চাইলে অবশ্য এই উপাদান নিয়ে সেটা
যে খুব সম্ভব ও খুব সহজে কার্য্যকরী তা’ মনে হয় না বটে কিন্তু
অন্তরের সেই ধ্যানস্তিমিত স্বপ্ন পুরুষের দিকে চাইলে সমস্ত সত্তা
গর্জ্জে ওঠে, “এযে অনিবার্য্য, ওরে মন হবেই হবে।”
ছেলে বেলায় দরিদ্রের সেবার স্বপ্ন কবি বারীন্দ্রকুমার ঘোষ (৫.১.১৮৮০ - ১৮.৪.১৯৫৯)
তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “দ্বীপান্তরের বাঁশী” থেকে আমরা কোনো কবিতা চয়ন করলাম না। এখানে তাঁর আত্মজীবনী
“আমার আত্মকথার” শেষে “পরিশিষ্ট” থেকে তিনটি অনুচ্ছেদকে তিনটি কবিতার আকারে এখানে তুলে ধরলাম।
সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা যাচ্ছে, বারীন্দ্রকুমার সেই অলিন্দ-সংলগ্ন
কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি।
তাই তাঁদের মতো মানুষের কলমের ছোঁয়া আমাদের কাছে কবিতাই !
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জগতে প্রচুর অন্ন বস্ত্র, প্রচূর ভোগোপকরণ ও আনন্দ সম্ভার
থাকতে মানুষ কি চিরদিনই করবে কোটীপতি আর চিরকন্থা-
ধারী ভিখারীর অভিনয়? সাম্নে অন্নকুট সাজিয়ে চিরদিনই
এমনি করে তারা হাজারে হাজারে লাখে লাখে মরবে মর্ম্মান্তিক
ক্ষুধার তাড়নায়? সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর মানুষের শতকরা
নব্বই জন হয় গৃহহারা আর নয়তো পর্ণকুটীরবাসী। ভগবান
যাকে চারদিকের বাঁধন খুলে মুক্ত করে দিয়েছেন জন্ম, সে কি
এমনিই সারাটা জীবন জুড়ে করবে রাশি রাশি শৃঙ্খল রচনা আর
নিজের চারপাশে তুলবে সমাজ ধর্ম্ম রাষ্ট্র ও বিধির কারা-প্রাচীর?
একি বিসদৃশ ব্যাপার বল দেখি? মানুষ কি সর্ব্ব সংস্কার
বিমুক্তির পরম নিশ্চিন্ততায় আবার ফিরে যেতে পারে না?
দশজনকে নিয়ে সে কি সুখী হতে ভুলে গেল? মানুষের
অন্তর্নিহিত দেবত্বের নিরুপম ছন্দটি কি এমনি করে একেবারে
হারিয়ে গেছে! আজও তাই মনে হয় আর একবার বের হই
সর্ব্ব বিমুক্তির বাণী নিয়ে, প্রেমের-মহামানবতার আদর্শের---
মশাল হাতে আর একবার জীবনের শেষ নিঃশ্বান নিয়ে করি
অভিযান---মানুষকে মানুষ করবার জন্যে মানুষেরই বিরুদ্ধে
অভিযান।
জগতে প্রচুর অন্ন বস্ত্র কবি বারীন্দ্রকুমার ঘোষ (৫.১.১৮৮০ - ১৮.৪.১৯৫৯)
তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “দ্বীপান্তরের বাঁশী” থেকে আমরা কোনো কবিতা চয়ন করলাম না। এখানে তাঁর আত্মজীবনী
“আমার আত্মকথার” শেষে “পরিশিষ্ট” থেকে তিনটি অনুচ্ছেদকে তিনটি কবিতার আকারে এখানে তুলে ধরলাম।
সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা যাচ্ছে, বারীন্দ্রকুমার সেই অলিন্দ-সংলগ্ন
কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি।
তাই তাঁদের মতো মানুষের কলমের ছোঁয়া আমাদের কাছে কবিতাই !
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কে আছ মায়ের মুখপানে চেয়ে
. এস কে কেঁদেছ নীরবে
মার মুখ চেয়ে আত্মবলি দিয়ে
. সে মুখ উজ্জ্বল করিবে।
নিজেরে ভাবিয়ে অক্ষম দুর্ব্বল
বাড়ায়েছ মায়ের যাতনা কেবল
যা’র মাতৃকণ্ঠে বাজিছে শৃঙ্খল, দুর্ব্বল
. সবল সে কি ভাবিবে?
জাননারে মূঢ় জননী তোমার
পুরাকাল হ’তে কি শক্তি আধার
সন্তানের কণ্ঠে শুনিলে হুঙ্কার
. নয়নে বিজলী খেলিবে।
ক্ষুদ্র স্বার্থে মজি এখনো কি ভাই
মা হ’তে সুদূরে রবে ঠাঁই ঠাঁই?
হিন্দু মুসলমান এস সবে যাই।
. মা যে ঐ ডাকিছে সবে।
কে আছ আজি ও পর পদসেবী,
এস উঠে এস মার পুত্র সবই,
ধমনী ভিতরে এক রক্ত বহে,
. একই মাতৃ নামে উন্মত্ত হ’বে।
কে আছ মায়ের মুখপানে চেয়ে
কবি দেবব্রত বসু, স্বামী প্রজ্ঞানন্দ (১৮৮১ - ৪.১৯১৮)
সুহৃদ সমিতি ময়মনসিংহ দ্বারা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের শুরুর দিকে প্রকাশিত “গান” নামক স্বদেশী-গানের
সঙ্ককলনের, কবি দিলীপ কুমার বসু দ্বারা আষাঢ় ১৪২৬-এ (জুন ২০১৯) সম্পাদিত ৩য় সঙ্কলনের গান। তিনি বিপ্লবী
অরবিন্দ ঘোষের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও দলের মুখপত্র যুগান্তর এর লেখক ছিলেন। রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাই এর
স্বীকারোক্তির ফলে তিনি আলিপুর বোমা মামলায় ধরা পড়েন। ১৯০১ সালে ছাড়া পেয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন।
কে আছ বিদেশী আদেশে গোপনে
আছ ভাই মাতৃসেবক সন্ধানে
চেয়ে দেখ আজ মা চাহে তোমায়
. তাঁরে কি কাঁদায়ে ফিরিয়া
যাবে!
কে আছে বিপদে না করি দৃক্পাত
মৃত্যু নির্য্যাতন দৈব বজ্রাঘাত
খণ্ড খণ্ড হ’য়ে মার মুখ চেয়ে
. এস কে মরিতে পারিবে?
এস শীঘ্র এস বেলা বহে যায়
এনেছে জাপান ঊষা এসিয়ায়
মধ্যাহ্ন-গরিমা স্বাধীন ভারত
. আনিবে নিশ্চয়ই আনিবে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শাসন-সংযত-কণ্ঠ, জননি ! গাহিতে পারি না গান।
তাই মরম বেদনা লুকাই মরমে, আঁধারে ঢাকি মা প্রাণ॥
সহি প্রতিদিন কোটি অত্যাচার,
কোটি পদাঘাত, কোটি অবিচার,
তবু হাসিমুখে বলি বার বার,
“সুখী কেবা আর মোদের সমান?”
বিনা অপরাধে অস্ত্রহীন কর,
অন্নাভাবে অতি শীর্ণ কলেবর,
তবু আশে পাশে শত গুপ্তচর,
প্রতি পদে লয় মোদের সন্ধান॥
শোষণে শূন্য কমলাভাণ্ডার,
গৃহে গৃহে মর্ম্মভেদী হাহাকার,
যে বলে এ কথা অপরাধ তার,
হায় হায়, একি কঠোর বিধান !
না জানি জননি ! কত দিন আর,
নীরবে সহিব হেন অত্যাচার,
উঠিবে কি কভু বাজিয়ে আবার,
স্বাধীন ভারতে বিজয়-বিষাণ?
কবি কামিনীকুমার ভট্টাচার্য্য
|
মর্ম্মবেদনা
কবি কামিনীকুমার ভট্টাচার্য্য (১৮৮১ - ১৯৪৪)
এই গানটি বহু বৎসর পর্য্যন্ত ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিবিদ্ধ ছিল। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র
ভট্টাচার্য্য বিদ্যাবিনোদ, কাব্য-ব্যাকরণ-পুরাণ-কৃততীর্থ দ্বারা সঙ্কলিত ও সম্পাদিত মাতৃবন্দনা
দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার সঙ্কলন (১৭৪১ - ১৯৪৭) কাব্য সঙ্কলন থেকে আমরা পেযেছি।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অবনত ভারত চাহে তোমারে এস সুদর্শনধারী মুরারি !
নবীন তন্ত্রে, নবীন মন্ত্রে, কর দীক্ষিত ভারত নর নারী।
মঙ্গল ভৈরব শঙ্খনিনাদে,
বিচূর্ণ কর সব ভেদ-বিবাদে,
সম্মান-শৌর্য্যে, পৌরুষ-বীর্য্যে,
কর পূরিত, নিপীড়িত ভারত তোমারি।
মুক্ত সমুন্নত পতাকা-তলে,
মিলাও ভারত-সন্তান সকলে ;
নব আশে হিন্দুস্তান ধরুক নূতন তান।
এস রিপু শোণিতে মোদিনী রঞ্জিতে
নব বেশে ভীষণ অসিধারী।
এস ভারত পাপ নাশকারী॥
কবি কামিনীকুমার ভট্টাচার্য্য
|
সুদর্শনধারী
কবি কামিনীকুমার ভট্টাচার্য্য (১৮৮১ - ১৯৪৪)
১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য বিদ্যাবিনোদ, কাব্য-ব্যাকরণ-পুরাণ-কৃততীর্থ দ্বারা
সঙ্কলিত ও সম্পাদিত মাতৃবন্দনা দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার সঙ্কলন (১৭৪১ - ১৯৪৭) কাব্য
সঙ্কলন থেকে আমরা পেযেছি।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সোনার স্বপন মোহে ভুলিও না, ভাই সাধনা !
এ যে আলেয়ার আলো, মায়া-মরীচিকা, আশ্বাস ঢাকা ছলনা।
ওদের রুদ্ধ দুয়ারে করি করাঘাত, পেয়েছ করে বেদনা ;
ওরা বুঝিল কি তব ধর্ম্মকাহিনী, বুঝিল কি তব যাতনা?
ওরা ঘৃণা করে মোদের বর্ণ, মোদের আহ্বানে বধির কর্ণ ;
তুচ্ছ ফুৎকারে দেয় ভেঙ্গে চুরে, সকল সঞ্চিত কামনা।
ওরা মোদের দৈন্যে করি পরিহাস, কেড়ে নিতে চায় মুখের গ্রাস,
তবু যুক্তকরে ওদের দুয়ারে কেন নিত্য নিষ্ফল যাচনা?
এখন আপনার পানে ফিরাও নয়ন, জাগাও আপন শক্তি ;
পরের চরণ না করি লেহন, কর আপনার মায়েরে ভক্তি ;
তবে জাগিবে নবীন রঙ্গে, নব জীবন নব বঙ্গে ;
বিশ্ব কাঁপায়ে উঠিবে বাজিয়া রুদ্র বিজয় বাজনা !
কবি কামিনীকুমার ভট্টাচার্য্য
|
সাধনা
কবি কামিনীকুমার ভট্টাচার্য্য (১৮৮১ - ১৯৪৪)
১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য বিদ্যাবিনোদ, কাব্য-ব্যাকরণ-পুরাণ-কৃততীর্থ দ্বারা
সঙ্কলিত ও সম্পাদিত মাতৃবন্দনা দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার সঙ্কলন (১৭৪১ - ১৯৪৭) কাব্য
সঙ্কলন থেকে আমরা পেযেছি।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
॥ বাউলের সুর॥
ছেড়ে দাও কাচের চুড়ী বঙ্গনারী,
কতু হাতে আর পরো না।
জাগ গো ও ভগিনী, ও জননী !
মোহের ঘোরে আর থেকো না !
কাচের মায়াতে ভুলে, শঙ্খ ফেলে,
কলঙ্ক হাতে মেখ না !
তোমরা যে গৃহলক্ষ্মী, ধর্মসাক্ষী,
জগৎ ভরে' আছে জানা ;
চটকদার কাচের বালা, ফুকের মালা,
তোমাদের অঙ্গে সাজে না !
নাই-বা থাক্ মনের মতন স্বর্ণভূষণ,
তাতে যে দুঃখ দেখি না ;
সিঁথি-সিন্দুর ধরি' বঙ্গনারী
জগতে সতী-শোভনা !
বলিতে লজ্জা করে, প্রাণ বিদরে,
বার লাখের কম হবে না ;
পুঁতি কাচ ঝুটা মুক্তায়, এই বাংলায়---
দেয় বিদেশে, কেউ জানে না।
ছেড়ে দাও কাচের চুড়ী বঙ্গনারী
কবি মনোমোহন চক্রবর্তী (জন্ম মৃত্যু অজ্ঞাত)
১৯৬০ সালে প্রকাশিত, সৌমেন্দু গঙ্গোপাধ্যায়ের রচিত ও সংকলিত “স্বদেশী আন্দোলন ও বাংলা
সাহিত্য” গ্রন্থ থেকে নেওয়া। গানটি চারণকবি মুকুন্দদাসের রচনা বলেই পরিচিতি লাভ করেছে।
আমরা চারণকবির গানের সঙ্গেও গানটি তুলেছি। সেই গানটিতে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
ঐ শোন বঙ্গমাতা, শুধান কথা,---
“উঠ আমার যত কন্যা !
তোরা সব করিলে পণ, মায়ের এ ধন,
বিদেশে উড়ে যাবে না।
আমি যে অভাগিনী, কাঙ্গালিনী,
দুই বেলা অন্ন জোটে না ;
কি ছিলাম, কি হইলাম, কোথায় এলাম?
মা যে তোরা ভাবিলি না !
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আমি ভোটের লাগিয়া ভিখারী সাজিনু
ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে
আমি ভিখারী না শিকারী গো
আমায় আসল কেউ না বলিল না
ক্যানভাস করিলাম যারে
সব হাঁ ক’রে যে রইল দাদা
আমি কার হাঁ বল বোজাই কিসে
তাদের মুখের ভাষায় ভুলিনু আশায়
জানি না বুকের ভাষা
তাদের মনের কথা মন ই জানে
ভোট দিবে কি নাহি দিবে
বুঝি গাছে তুলে মোরে মই কেড়ে নেবে
আশায় খাটিনু চাষা
বুঝি খেটে খেটে খাটো হনু
ভাগ্যে আমার এই ছিল
যত ক্যানভাসের ভাষা
তাতে পাইনু আশা
ভোট রঙ্গের গান
কবি দাদাঠাকুর, শতৎচন্দ্র পণ্ডিত (১৮৮১ - ১৯৬৮)
দাদাঠাকুরের এই গানটি আমরা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গানের সিডি থেকে শুনে তুলেছি।
বলে সেন্ট পারসেন্ট ভোট তব
আমি তাতে রিলাই করি
দুহাতে বিলাই করি অভিনয়
আমি নেতা কি অভিনেতা
ঐ মালুম করিবে কে তা
আমি এই রূপে গত বারে
ফিরেছিনু দ্বারে দ্বারে
পেয়েছিনু এই রূপ হোপ গো
মোরে ভুলাইয়ে প্রলোভনে
ভোট দিল অন্য জনে
মোর ডিপজিট মানি হল জব্দ
আমার মান গেল মানিও গেল
আমি আসমান হতে পরলাম দাদা
আমার আশা মান দুই চূর্ণ হল
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সমাজ সমাজ শুনে শুনে
কাণটা হ'ল ভোঁতা।
খুঁজে কিন্তু পাইনা দেশে
সমাজ আছে কোথা।
যাদের ঘরে পয়সা আছে
আছে জমিদারী।
সব সমাজে নেতা তারা
করেন খুব সরদারী।
বক্তৃতাতে মানুষ ভোলায়
দিয়ে চোকে ধূলো---
সমাজেরই গলদ হচ্ছে
এই জানোয়ার গুলো।
নেমন্তন্ন গন্ধ পেলে
জোটেন সবার আগে
লম্বা লম্বা বুলি ছাড়া
কোন্ কাজে বা লাগে?
ডাক যদি মৃতদেহের
করবারে সৎকার।
বাঁধা বাল শুনতে পাবে
বৌ পোয়াতি তার।
সমাজ ন্যাতার “ভ্যালু”
কবি দাদাঠাকুর, শতৎচন্দ্র পণ্ডিত (১৮৮১ - ১৯৬৮)
১৯৮৩ সালে প্রকাশিত, জঙ্গীপুর সংবাদগোষ্ঠীর সম্পাদনায় দাদাঠাকুর রচনা সমগ্র গ্রন্থ থেকে নেওয়া।
দাদাঠাকুর দ্বারা সম্পাদিত, মুদ্রিত ও প্রকাশিত “বিদূষক” পত্রিকার ১৩২৬ সালের (১৯১৯) ৬ষ্ঠ বর্ষ ২৭শ
সংখ্যার কবিতা।
কেহ বলে শরীর অসুখ,
আফিস হবে বন্ধ।
কেহ বলে সয়না আমার
মরা পোড়া গন্ধ।
কেহ বলে তাইত বটে
ভারী মুশকিল হলো।
দিনে হ’লে যেতাম আমি
রেতে কেন মলো?
কেহ আবার চম্ কে উঠে
কন্টেজিয়াস্ নামে ;
বোধ হয় ইনি জেতেন
ম’লে সুগন্ধি ব্যারামে।
ছোঁয়াচে ব্যারামে মরা
গরীব লোকের দোষ।
এঁদের ব্যামো হবে বুঝি
কুন্তলীন দেলখোস।
মোটা মোটা বাবুর দেহ
আট যোয়ানের বোঝা---
ইনি ম’লে কি হবে তা
উচিত এখন বোঝা।
মরবে যেদিন এসব বাবু
ছেলে যাবে ঠেকে---
ইচিত এঁদের গতি করা
মুদ্দোফরাস ডেকে।
হ’তে যদি চাও হে বাবু,
সমাজেরই মাথা---
হিসেব করে কার্য্য কর
করো নাক যা’ তা’।
রাত্রিকালে ওজর কর
মরা ফেলতে যেতে।
ছেলে পিলে নিয়ে কিন্তু
ভোজ খেতে যাও রেতে।
“আয়রণ-চেষ্ট”, আছে তোমার
খাও বটে দুধ ঘি ;
তোমার ভাল তোমাতে থাক
লোকের তাতে কি?
ভাবতে পার নিজে তুমি
মস্ত একজন “হিরো”
সমাজের কার্য্যে কিন্তু “ভ্যালু”
তোমার “জিরো”।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বাবুদের ঘরে ক’পুরুষ ধ'রে
চাকরী খাটিয়া খাই।
খোরাক, পোষাক, দু’টাকা মাইনে
প্রতিমাসে আমি পাই।
থালা বাটি মাজি, তামাকুও সাজি,
ঘর দোর দিই ঝাঁ’ট।
বাঁটনাও বাঁটি, বিচালীও কাটি,
বহে’ আনি ঘুঁটে কাঠ।
জল তুলে’ আনি, পাঙ্খাও টানি,
সাফ করি আলো বাতি।
কোন কাজ হ'লে একটু কসুর,
খাই চড়, জুতো, লাথি।
কাপড় কোঁচাই, এঁটোও ঘুচাই,
বাবুরে মাখাই তেল।
পেলে কোন দোষ, বাবু করি রোষ,
বলেন খাটাব জেল।
মুনিব আমায় দিয়েছে উপাধি---
ছুঁচো, পাজি, বোকা, গাধা,
নন্ সেন্স ড্যাম, স্টুপিড, ফুলিস,
শূয়ার, হারামজাদা !
বনে’দী হারামজাদা
কবি দাদাঠাকুর, শতৎচন্দ্র পণ্ডিত (১৮৮১ - ১৯৬৮)
১৯৮৩ সালে প্রকাশিত, জঙ্গীপুর সংবাদগোষ্ঠীর সম্পাদনায় দাদাঠাকুর রচনা সমগ্র গ্রন্থ থেকে নেওয়া। দাদাঠাকুর
দ্বারা সম্পাদিত, মুদ্রিত ও প্রকাশিত “বিদূষক” পত্রিকার ১৩২৭ সালের (১৯২০) ৬ষ্ঠ বর্ষ ৩৩শ সংখ্যার কবিতা।
বাবু চেয়ে বাবু গিন্নিঠাকুরাণী,
নাকের ডগায় রাগ,
খোকার ন্যাকরা দেরিতে কাচিলে,
বলেন “হিঁয়াসে ভাগ”।
বিধির বিপাকে বাবুর গৃহিণী,
ব্যারামে পড়িল খুব।
গু’ মুত তাহার করে পারিস্কার,
দু’বেলা দিয়েছি ডুব।
জল ঘেঁটে ঘেঁটে, দিন রাত খেটে,
নিমোনিয়া হ’ল মোর।
বলিলেন বাবু---যা চালিয়া বাড়ী,
প্রাণে আশা নাই তোর।
ইস্কুলের ছেলে গোটা কত মিলে,
বাড়ী নিয়ে গেল ধ’রে।
তারা দয়া ক’রে, দেখা’য়ে ডাক্তারে
এ যাত্রা বাঁচা’ল মোরে।
দু’মাস বেতন আছিল পাওনা,
তাই আজ ধরে লাঠি,
দু’মাসের টাকা চারিটি চাহিনু,
আসিয়া প্রভুর বাটী।
বাবুজী আমায় বলিল---কামাই
বাদ দিয়া যাহা পা’স্
দিন দুই পরে, করিয়া হিসাব
মিটাইয়া নিয়া যা’স্।
বলিনু---ব্যারামে করেছি কামাই,
আর করিবো না কভু।
অন্য মাসে খেটে শোধ দিব সেটা
এ কাসে কেটোনা প্রভু।
চারিটি টাকার ভারি দরকার,
পড়ে'ছি বড় অভাবে।
এমন কাটিলে পরিবার ছেলে
না খেয়ে যে মারা যাবে।
বলিল মুনিব কেমনে খাটিবি?
হাড় কয়খানি সার।
অন্য লোক আমি করেছি বহাল,
তোরে রাখিব না আর।
এ হেন দয়ালু মনিবের কাছে
এত দিন থাকি বাঁধা,
আনিচ্ছায় আজি হইল খালাস
বনে’দী হারামজাদা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শুনরে মামু! কাল গেছিনু
জমিদারের বাড়ি।
কাছারিতে বসে বাবু
মস্ত বড় ভুঁড়ি।
আমি বুলনু খাজনা দিব
ফসল পানি হলে,
খাদ্ বেগরে মরছি হুজুর
নিয়ে মেয়ে-ছেলে।
আমায় দেখে রেগে বাবু
বুললে দারোয়ানে।
পচিশ জুত্তা লাগাও ইস্কো
খাজনা দিস্ না কেনে?
হাতির মতো গতর বাবুর
দয়ামায়া নাই।
হারামজাদা শালা বলে
গাল দিলে বেজায়।
মনে মনে বুলনু আমি
বিচার কর খোদা।
মোদের পয়সায় বাবু হয়ে
বললে হারামজাদা।
চাষার খেদ
কবি দাদাঠাকুর, শতৎচন্দ্র পণ্ডিত (১৮৮১ - ১৯৬৮)
২০০২ সালে প্রকাশিত, গোরা সিংহরায় দ্বারা সম্পাদিত “শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের শ্রেষ্ঠ কবিতা”
থেকে নেওয়া। দাদাঠাকুর দ্বারা সম্পাদিত, মুদ্রিত ও প্রকাশিত “বিদূষক” পত্রিকার ১৩২৯
সালের (১৯২২) ১ম বর্ষ ৮ম হর্ষ সংখ্যার কবিতা।
মোটা-মোটা ওই বাবুগুলো
কি কাজেই বা লাগে?
শুধুই করে বাবুগিরি
কেবল খায় আর হাগে।
মোদের মতো চাষা যদি
না থাকত সংসারে।
দানা বেগর দুনিয়াটা
যেত ছারে-খারে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
তোরা কে মন্ত্রী হবি আয়!
মন্ত্রীত্বের ঢেউ উঠলো আবার
. মালসী দরিয়ায়।
হাতছানিতে ডাকছে তোরে
আয়রে মূঢ়! আয়রে ওরে!
খেতে পাবি উদর ভরে,
. (যাতে) ভুঁড়ি ফুলে যায়।
আয় স্বরাজী! আয় নারাজী!
আয় ধীরাজী! আয় ফরাজী!
দেখে যা রে ভোজের বাজি
. হারাস না হেলায়।
মোটা টাকা মাইনে পাবি
মোটর চড়ে বেড়াইবি
মাঝে-মাঝে ডিটো দিবি
. আর কি মজা চায়?
তোরা কে মন্ত্রী হবি আয়
কবি দাদাঠাকুর, শতৎচন্দ্র পণ্ডিত (১৮৮১ - ১৯৬৮)
২০০২ সালে প্রকাশিত, গোরা সিংহরায় দ্বারা সম্পাদিত “শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের শ্রেষ্ঠ কবিতা”
থেকে নেওয়া। দাদাঠাকুর দ্বারা সম্পাদিত, মুদ্রিত ও প্রকাশিত “বিদূষক” পত্রিকার ১৩৩১
সালের (১৯২৪) ২য় বর্ষ ২৭শ হর্ষ সংখ্যার কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
॥ রামপ্রসাদী সুরে॥
(আমায়) মন্ত্রী কর মা কালি!
আমি বড় বুদ্ধিমান বাঙালি।
নেমক বজায় রাখবো আমি
দেমাক দেখাবো না খালি,
আমায় জানিস তো মা আগাগোড়া
করছি মা নেমরহালালী।
দেশের শত্রু হতে রাজি
খেতে রাজি দশের গালি,
হাসবে হাসুক আমায় দেখে
দিক না সকলে হাততালি।
স্বাজীদের ভুয়োবাজি
দিচ্ছে দেশে আগুন জ্বালি,
তাদের সবগুলোকে পূর মা জেলে
ঘুচিয়ে দে মা দেশের কালি
(এরা) নিজে খায় না খেতে দেয় না
কার্যে বাধা দিচ্ছে খালি,
(মোদের) রাঁধা ভাতে শুধু-শুধু
ছিটিয়ে দিচ্ছে ধুলোবালি।
উজিরী প্রার্থনা
কবি দাদাঠাকুর, শতৎচন্দ্র পণ্ডিত (১৮৮১ - ১৯৬৮)
২০০২ সালে প্রকাশিত, গোরা সিংহরায় দ্বারা সম্পাদিত “শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের শ্রেষ্ঠ কবিতা”
থেকে নেওয়া। দাদাঠাকুর দ্বারা সম্পাদিত, মুদ্রিত ও প্রকাশিত “বিদূষক” পত্রিকার ১৩৩১
সালের (১৯২৪) ২য় বর্ষ ৩০শ হর্ষ সংখ্যার কবিতা।
বারকতক মা জিতিয়ে দিয়ে
এদের স্পর্দ্ধা খুব বাড়ালি।
আমি কি অপরাধ করেছি যে
তৈয়ের ভাত আমায় ছাড়ালি।
টাকা ধর্ম টাকা স্বর্গ
এ মন্ত্র মা তুই শিখালি,
এখন টাকা পেলে তার বদলে
রাজি সবই দিতে ডালি।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সোনার এই কি সেই আর্য্যস্থান?
ঐশ্বর্য্যে বিভবে, বাণিজ্য গৌরবে
. ছিলে যে এ ভবে সবারি প্রধান
পুণ্যভূমি ধন্য ভারতের নামে,
বাজিত দুন্দুভি সদা স্বর্গধামে,
অসীম পুলকে, সুর-নর-লোকে
. গাহিত নিয়ত যাঁর যশোগান।
যাঁর তপোবনে পুণ্য বেদগান,
অম্বর ভেদিয়া তুলিত তুফান,
নক্ষত্র দুলিত আসন টলিত,
. কাঁপিত সঘনে দেবতার প্রাণ।
মলয়-সেবিত, শ্যাম-শস্য-ভরা
হিমাদ্রি-শোভিত, বিশ্ব-মনোহরা,
বিতরি যেথায় পুণ্য-ক্ষীরধারা
. যমুনা-জাহ্নবী বাহিত উজান।
শুনি বীর-করে কার্ম্মুক টঙ্কার,
সভয়ে জগতে জাগিত ঝঙ্কার,
যে দেশে রমণী কেশ অলঙ্কার
. সঁপিত সমরে, ত্যজিত পরাণ।
এই কি সেই আর্য্যস্থান?
কবি রামচন্দ্র দাশগুপ্ত (১৮৮১ - ১৯২১)
১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য দ্বারা সঙ্কলিত ও সম্পাদিত
“মাতৃবন্দনা দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার সঙ্কলন ১৭৪১ -১৯৪৭” থেকে নেওয়া।
আসমুদ্রব্যাপী যাঁর রাজ্যসীমা,
ভুবন ব্যাপিয়া বাণিজ্য গরিমা,
কুবের-ভাণ্ডার জিনি’ রত্নাগার,
. ছিল কমলার চির অধিষ্ঠান।
হায়! ভারতের সেই স্বর্গধাম,
এ দুর্গতি আজ, এই পরিণাম!
ফুরাইল সব, অতীত গৌরব,
. আছে শুধু রব শূন্য অভিমান!
নির্জ্জলা একাদশী
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১২.২.১৮৮২ - ২৫.৬.১৯২২)।
সুজলা এই বাংলাতে, হায়, কে করেছে সৃষ্টি রে---
নির্জ্জলা ওই একাদশী---কোন্ দানবের দৃষ্টি রে!
শুকিয়ে গেল, শুকিয়ে গেল, জ্বলে গেল বাংলা দেশ,
মায়ের জাতির নিশ্বাসে হয় সকল শুভ ভস্মশেষ।
* * * * * *
হাজার হাজার শুষ্ককণ্ঠে একটি ফোঁটা জল দিতে---
কেউ কি গো নেই কোটির মধ্যে দুরর্ব্বলেরে বল দিতে?
কেউ দেবে না জল পিপাসার ! কেউ করেনি স্তন্যপান!
কেবল এম্-এ, কেবল বি-এ, কেবল অহংমন্যমান।
কেবল তর্ক, শুষ্ক তর্ক, কেবল পণ্ড পণ্ডিতী,
হৃদয় নেইক, জীবন নেইক, নেইক স্নেহ, নেই প্রীতি।
দেখছে হয়ত নিজের ঘরেই---দেখছে এবং বুঝছে সব,
দেখছে মায়ের বোনের উপর নির্জ্জলা এই উপদ্রব ;
হয় তো রুগ্ন শরীর ভগ্ন হয় তো মুহু মূর্চ্ছা যায়,
তবুও মুখে জল দেবে না! . . .ধর্ম যাবে! হায় রে হায়!
* * * * * *
জল দেবে না, ওষুধ মানা, একাদশীর উপোষ যে,
মরা জরার বুকে বসে ভণ্ডগুলো চোখ বোজে ;
হিন্দুয়ানীর বড়াই ক'রে বি-এ, এম-এ গাল বাজায়,
লম্বা-টিকি---মড়ার মাথায় জোনাক-পোকার দীপ সাজায়।
* * * * * *
কচি মেয়ের একাদশী---জল চেয়েছে মার কাছে,
বাপ এসে তা কর্ব্বে আটক,---ধর্ম্ম খসে যায় পাছে ;
এও মানুষে ধর্ম ভাবে! হায় রে দেশের অধর্ম্ম !
হায় মূঢ়তা ! এর তুলনায় হত্যাও নয় কুকর্ম।
হত্যা---সে লোক ঝোঁকেই করে এক নিমেষে সকল শেষ ;
এ যে কেবল দগ্ধে মারা যাপ্য করা মৃত্যু-ক্লেশ ;
বিনা পাপে শাস্তি এ যে, ধর্ম্ম এ নয়, হয়রানী,
এর স্বপক্ষে শাস্ত্র নেইক, থাকতে পারে শয়তানী।
* * * * * *
ধর্ম নাকি নষ্ট হবে ! . . .বাংলা দেশের বাইরে, হায়,
হিন্দু কি আর নেই ভারতে?. . .কাঞ্চী, কাশী, অযোধ্যায়?
তারা কি কেউ পালন করে একাদশীর নির্জ্জলা?
ভ্রষ্ট সবাই? . . .বঙ্গে শুধুই হিঁদুয়ানী নিশ্চলা?
* * * * * *
স্মার্ত রঘু! স্মার্ত রঘু! শুনছ নাকি আর্ত্তরব?
দেখছ নাকি বাংলা জুড়ে বাড়ছে তোমার অগৌরব?
অগৌরবে ডুব্ছ তুমি---ডোবাচ্ছ এই দেশটাকে,
যারা তোমায় চলছে মেনে, টানছ তাদের ওই পাঁকে।
তোমার পাপের ভাগী হ'তে ডাক্ছ জরদগব সবে,
একাদশীর একলা দোষী---বাড়াচ্ছ দল রৌরবে।
* * * * * *
কচি মেয়ের একাদশী---জল চেয়েছে মার কাছে,
বাপ এসে তা কর্ব্বে আটক,---ধর্ম্ম খসে যায় পাছে ;
এও মানুষে ধর্ম ভাবে! হায় রে দেশের অধর্ম্ম !
হায় মূঢ়তা ! এর তুলনায় হত্যাও নয় কুকর্ম।
হত্যা---সে লোক ঝোঁকেই করে এক নিমেষে সকল শেষ ;
এ যে কেবল দগ্ধে মারা যাপ্য করা মৃত্যু-ক্লেশ ;
বিনা পাপে শাস্তি এ যে, ধর্ম্ম এ নয়, হয়রানী,
এর স্বপক্ষে শাস্ত্র নেইক, থাকতে পারে শয়তানী।
* * * * * *
ধর্ম নাকি নষ্ট হবে ! . . .বাংলা দেশের বাইরে, হায়,
হিন্দু কি আর নেই ভারতে?. . .কাঞ্চী, কাশী, অযোধ্যায়?
তারা কি কেউ পালন করে একাদশীর নির্জ্জলা?
ভ্রষ্ট সবাই? . . .বঙ্গে শুধুই হিঁদুয়ানী নিশ্চলা?
* * * * * *
স্মার্ত রঘু! @ স্মার্ত রঘু! @ শুনছ নাকি আর্ত্তরব?
দেখছ নাকি বাংলা জুড়ে বাড়ছে তোমার অগৌরব?
অগৌরবে ডুব্ছ তুমি---ডোবাচ্ছ এই দেশটাকে,
যারা তোমায় চলছে মেনে, টানছ তাদের ওই পাঁকে।
তোমার পাপের ভাগী হ'তে ডাক্ছ জরদগব সবে,
একাদশীর একলা দোষী---বাড়াচ্ছ দল রৌরবে।
* * * * * *
শাস্ত্র গড়ার শক্তি নিয়ে হয়নি তোমার জন্ম, হায়,
পরের উঞ্ছে পেট ভরেছ পরের অন্নে পুষ্ট কায়,
তোমার উঞ্ছ-সংহিতাতে নিজের মৌলিকত্ব কই?
মাথায় তোমার পড়ছে ভেঙে উনিশ মুনির মন্যু ওই!
কার ঘাড়ে কার জুড়লে মাথা ঠিক-ঠিকানা নেই কিছু,
নির্জ্জলা এই দুঃখ বিধান গড়ল তোমার মন নীচু।
মণির খনি খুঁড়ে তুমি কেবলি কাঁচ কুড়িয়েছ,
হায় রে শুষ্ক! হৃদয়বিহীন! কেবল ধূলো উড়িয়েছ।
* * * * * *
পাঁতি দিয়ে অনেক নরক করলে তুমি ব্যবস্থা,
ভাবছি আমি পরলোকে তোমার কেমন অবস্থা?
কোন্ পাঁকে হায় পুঁতছে তোমায় তৃষ্ণার্ত্তদের তীব্র শাপ?
কোন্ নরকে ডুবছ তুমি পুণ্যবেশী মূর্ত্তপাপ?
* * * * * *
তর্পণে যে দিচ্ছে গো জল দিচ্ছে তোমার উদ্দেশে,
তৃষার্ত্তদের নিঃশ্বাসে তা’ হয় যে ধোঁয়া নিঃশেষে!
ভিজিয়ে দেবে কে আজ তোমার জিহ্বা, তালু আর গলা,
কোন্ সহৃদয় উঠিয়ে দেবে একাদশী নির্জ্জলা?
* * * * * *
কে নেবে এই পুণ্য ব্রত? কে হবে মার পুত্র গো?
একাদশীর তেপান্তরে খুলবে কে জলসত্র গো?
কে নেবে মন্দারের মালা মাতৃজাতির আশীর্বাদ?
আশায় আছি দাঁড়িয়ে যে তার কর্ত্তে বিজয়-শঙ্খনাদ।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
@ - স্মার্ত্ত রঘু - রঘুনন্দন ভট্টাচার্য্য (১৫০৮ - ১৫৭৫)। স্মার্ত
পন্ডিত।
দোরোখা একাদশী
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১২.২.১৮৮২ - ২৫.৬.১৯২২)।
উড়িয়ে লুচি আড়াই দিস্তে দেড় কুড়ি আম সহ
. একাদশীর বিধানদাতা করেন একাদশী,
মুখরোচক এঁর উপবাস,---দমেও ভারী,---অহো!
. পুণ্য ততই বাড়ে যতই এলান্ ভুঁড়ির কশি!
ওদিকে ওই ক্ষীণ মেয়েটি নিত্য একাহারী
. একাদশীর বিধান পালন করছে প্রাণে মরে,
কণ্ঠাতে প্রাণ ধুঁকছে, চোখে সর্ষে-কুলের সারি,
. তৃষ্ণাতে জিভ অসাড়, মালা জপছে ঠাকুর-ঘরে।
অবাক চোখে বিশ্ব দ্যাখে হায় গো বিশ্বনাথ,
দোরোখা এই বিধান পরে হয় না বজ্রপাত?
নিষ্ঠাবানের সধবাও করেন একাদশী
. পতির পাতে প্রচুর ভাবে ‘আটকে’ বেঁধে রেখে,
আওটা-দুধে চুমুক লাগান্ পিছন ফিরে বসি
. পাঁতিদাতা পতি-গুরু পাছে ফেলেন দেখে।
বিড়াল চাটে দুধের বাটি বাড়িয়ে দিয়ে গলা,
. পিপড়ে মাছি আমের খোলায় উল্লাসে ভিড় করে,
শাস্ত্র যাদের ভয় দেখিয়ে করিয়েছে নির্জলা
. তারাই শুধু হাতের চেটো মেলছে মেঝের পরে।
তৃষ্ণাতে জিভ টানছে পেটে, এমনি রোদের তাত,
খসখসে দুই চোখের পাতা, হয় না অশ্রপাত।
ফৌঁটায় ফোঁটায় শিবের মাথায় ঝারার যে জল ঝরে---
. সতৃষ্ণ চোখ সারা বেলা দেখছে শুধু তাই
কাকটা কখন গুটি গুটি ঢুকে ঠাকুর-ঘরে
. অর্ঘ্যপাত্রে মুখ দে গেল,---একটুও হুঁশ নাই!
চক্ষু দিয়ে প্রাণ-পাখি হায় মেলেছে বুঝি পাখা,
. ভির্মি গেছে---ভির্মি গেছে---জল কে দেবে মুখে?
কারো সাড়া নেইকো কোথাও মিথ্যে হাঁকা ডাকা---
. একাদশীর বিধান দাতার গর্জে নাসা সুখে!
অধোমুখে বিশ্ব দ্যাখে, হায় গো বিশ্বনাথ,
পাষাণ ’পরে অশ্রু ঝরে পড়ে দিবসরাত।
কোনো নেতার প্রতি
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১২.২.১৮৮২ - ২৫.৬.১৯২২)।
দশে যা বর্জন করে, লোকে বলে, সেই আবর্জনা ;
তাই শিরোধার্য হ’ল ? তাই হ’ল তব উপার্জন ?
বিদেশীর দরজায় পেয়ে উঞ্ছ উচ্ছিষ্টের কণা
থেমে গেল অকস্মাৎ তুণ্ড-পুটে সিংহের গর্জন!
স্বদেশ একদা যারে দিয়েছিল ফুলের মুকুট,
একি হায় সেই তুমি ? মর্যাদায় রাজার অধিক---
ছিল যেই ? এ কি ভিক্ষাবৃত্তি আজ ? এ কি ঝুটমুট---
ঝুটা সম্মানের লাগি’ সম্মানীর লাঞ্ছনা, হা ধিক!
জীয়ন্তে জালিয়াঁ-বাগে পুঁতে ফেলে ভারত-মাতায়,
শ্রাদ্ধে দেবে স্বর্ণ-ধেনু ; অগ্রাহ্য সে অমানুষ দান ;
ভাটেরা আসুক ছুটে, দলে দলে, ক্ষতি নাই তায়,
তুমি যে ভিড়েছ সঙ্গে, এই দাগা, এই অপমান।
না লুকাতে রক্তচিহ্ন, না শুকাতে নয়নের পানি,
প্রবীণ স্বদেশ-ভক্ত! যেচে গিয়ে হলে অগ্রদানী!
কোনো ধর্মধ্বজের প্রতি
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১২.২.১৮৮২ - ২৫.৬.১৯২২)।
প্রেমের ধর্ম করছ প্রচার কে গো তুমি সবুট লাথি নিয়ে,
ডায়ার-মার্কা শিষ্টাচারের লাল-পেয়ালার শেষ তলানি পিয়ে!
কুশলে তো চলছে তোমার অর্ধঘন্টা ধর্মোপদেশ দেওয়া,
টিফিন এবং টি-এর ফাঁকে ? জমছে ভাল খৃষ্ট-কথার খেয়া ?
মুখোস খোলা, মুখস্থ বোল বোলো না আর টিয়াপাখির মত,
মোটা মাসহারার মোহে,---দোরেখা ঢং চালাবে আর কত ?
বয়স গত ; ক্ষ্যাপার মত কামড় দিতে এলে নকল দাঁতে ?
বাঁধানো দাঁত উল্টে গিয়ে, আহা, শেষে লাগবে যে টাক্ রাতে!
নিরীহ যে সত্যাগ্রহী---কি লাভ হল তারে লাথি মেরে ?
সে করেছে তোমায় ক্ষমা ; তার চোখে আজ নাও দেখে খৃষ্টেরে।
‘অক্রোধে ক্রোধ জিনতে হবে,’---সে শিক্ষা কি রইল শিকেয় তোলা,
ডিগ্রি নিয়েই ফুরিয়ে গেছে ডাগর-বুলির যা কিছু বোলবোলা ?
উদর তন্ত্র উদরতা ? ধর্ম কেবল কথারই কাপ্তেনী ?
ডঙ্কা-নাদের পিছন পিছন সত্য নিয়ে খেলছ ছেনিমেনি ?
চেয়ে দেখ ক্রুসের পরে ক্ষুব্ধ কে ওই তোমার ব্যবহারে।
জীবন্তবৎ পাষাণ-মুরৎ! --- হেঁটমাথা তার লজ্জাতে ধিক্কারে।
কুড়ি শ’ বত্সরের ক্ষত লাল হয়ে তাঁর উঠছএ নতুন করে।
দেখছে জগৎ --- পাথর ফেটে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ছে শোণিত ঝরে।
দাও ক্ষমা দাও, চোখ মেলে চাও,--- কি কাণ্ড হায় করছ গজাল ঠুকে ?
নিরীহদের নির্যাতনের সব ব্যথা কার বাজছে দ্যাখো বুকে!
কিম্বা দ্যাখার নাই প্রয়োজন, তোমরা এখন সবাই বিজিগীষু,
‘জিঙ্গো’ আসল ইষ্ট সবার, তার আবরণ-দেবতা মাত্র যীশু!
ডায়ার-ডৌল জবরদস্তি,--- তাতেই দেখি আজ তোমাদের রুচি।
গোবর-দস্ত আইন গড়ে নিষ্ঠুরতায় নিচ্ছ করে শুচি।
বীরত্বেরই বিজয়-মালা বর্বরতার দিচ্ছ গলায় তুলে।
অমানুষের করছ পূজা, সেরা-মানুষ খৃষ্টদেবে ভুলে।
মরদ-মেয়ে ভুগছ সমান হূণ-বিজয়ের বড়াই-লালচ-রোগে,
মানুষকে আর মানুষ বলেই চিনতে যেন চাইছ না, হায়, চোখে।
ঢাকের পিছে ট্যামট্যামি-প্রায় টমির ধাঁচায় ট্যাঁশটোশও আজ ঘোরে।
শয়তানই যে হাওয়ায় হাঁটায় শূন্যে ওঠায় সে হুঁশ গেছে সরে।
নেইক খেয়াল, আত্মা বেচে জগৎ-জোড়া কিনছে জমিদারী।
কে জানে ক’দিনের ঠিকা, ঠিকাদারের ঠ্যাকার কিন্তু ভারি!
ধিঙ্গি চলে জঙ্গী চালে, কুচ, করে লাল কাগজ-ওলা চলে,
নাক তুলে যায় দালাল-ফোড়ে, আজ দেখি হায় পাদ্ রীও সেই দলে!
যাও দ’লে যাও, ডঙ্কা বাজাও, অহঙ্কারের ছায়া ক্ষণস্থায়ী।
মিছাই ব্রতের বিঘ্ন ঘটাও অহঙ্কারের হুমকি-ব্যবসায়ী!
আমরা তোমার চাই না শিক্ষা, চাই না বিদ্যা, হে বিদ্যা-বিক্রয়ী!
ধর্ম-কথাও পণ্য যাদের তাদের পণ্য কিনতে ব্যাগ্র নহি।
মানুষ খুঁজে ফিরছি মোরা,---মানুষ হবার রাস্তা যে বাত্লাবে ;
তিক্ত হয়ে গেছে জীবন ঘরের পরের অমানুষের তাঁবে।
ফলিয়ে দেবে মর্ত্যে যে জন বুদ্ধ-যীশুর স্বর্গ-সূচন বাণী,
শহীদ-কুলের হৃদ্য-শৌর্য হৃদয়ে যার পেতেছে রাজধানী,
জাতিভেদের টিটকারী যে পরকে শুধুই দেয় না নানান ছলে,
জমিয়ে বুকে জিঙ্গোয়ানীর জবর জাতিভেদের হলাহলে,
যোল-আনা মানুষ হবার নিমন্ত্রণ দেবে যে সব জনে,
সেই মানুষে খুঁজছি মোরা, অহর্নিশি খুঁজছি ব্যাকুল মনে ;
নিক্তি ধরে করলে তৌল ওজন সে যার ভজবে পুরাপুরি,
লোভের মোহের মন্ত্রণাতে ভাবের ঘরে করবে না যে চুরি,
পথ চেয়ে তার সই অনাচার দুঃখ অপার অন্তত লাঞ্ছনা,
বেশ জানি, ‘আজ সয় যারা ক্লেশ তাদের তরেই স্বর্গীয় সান্ত্বনা,
নিরীহ যেই ধন্য যে সেই ধৃত-ব্রত দৈব-মাশাল-ধারী,
নিঃস্ব যারা তারাই হবে বিপুল ভবে রাজ্যে-অধিকারী।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অ! কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১২.২.১৮৮২ - ২৫.৬.১৯২২)। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “প্রবাসী” পত্রিকার বৈশাখ ১৩২২ (এপ্রিল ১৯১৫) সংখ্যার ২০ চৈত্র ১৩২১ তারিখে (৩/৪ এপ্রিল
১৯১৫) বর্ধমানে, অষ্টম বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনের প্রধান সভাপতি রূপে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর ভাষণে রবিন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির গুরুত্বকে “চুট্ কি” রচনার মর্যাদা দিয়ে তুচ্ছ জ্ঞান
করেছিলেন। প্রবাসীর পরের সংখ্যাতেই সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, এই কবিতাটি লিখে সেই ঘটনার প্রতিবাদ করেছিলেন।
এই চট্ করে যাহা বলে ফেলা যায় চুট্ কি তাহারে কয়, ওগো ছোট লেখা যত লেখে ছোটলোকে জানিবে সুনিশ্চয়। ওই চুট্ কি রচনা কেট্ কেট্ গ্র্যাম্ বিকিকিনি চলে চোটে, ওযে ফুট্ কড়ায়ের ছুট্ কো বেসাতি হুণ্ডি চলে না মোটে। ভুয়ো সজ্ নের খুঁটি চুট্ কি রচনা দেখিতে নিরেট বটে, ভায়া, ভর দিলে ভারে ভেঙে পড়ে চাল আয়ু-সংশয় ঘটে। ওগো লিখো না চুট্ কি, লিখিলে পুড়িবে যশোভাগ্যেতে দ, আর পণ্ডিত-সভা পুছিবে না তোরে দুখ না ঘুচিবে।--- ( কোরাস ) অ!
দেখ চুট্ কি সূত্র গোটা সত্তর লিখিল সাংখ্যকার, তাই কন্ফারেন্সে ডায়েসের পরে চেয়ার পড়েনি তার।
|
দাদা, তিনটি ভালুমে লিখিলে মালুম হইত এলেম যত, আর দর্শন-শাখে হত যোগে-যাগে শাখা-পতি অন্তত। হায় অল্পে সারিতে মরিল বেচারা লিখে হ য ব র ল, এই জম্বুদ্বীপে কোনো ফেলোশিপে বক্তা না হল।--- ( কোরাস ) অ!
দেখ হাফেজ কেবল চুট্ কি লিখিল ফেজ খোয়াইল তাই, আর রবি শেলি রুমি বার্ণস্ হাইন পড়ে সে কজন ভাই ? হোথা শ্লোক তিন টন লিখি মিলটন অমর হইল ভবে, লোকে পড়ে কি না পড়ে জানেন বিধাতা, হরি হরি বল সবে। ওগো লেখ লুসিয়াড্ লেখহ মেসায়া অথবা রৈবতক, আছে সস্তার ছাপাখানা যতদিন রইবে সে ইস্তক।
|
আর বিপুল গতর দেখি কেতাবের দুনিয়াটা হবে থ, যত বেকার ক্রিটিক্ ভুলি টিক্ টিক্ ‘ঠিক্ ঠিক্’ কবে। ( কোরাস ) অ!
দেখ ছ-শো-পাতা-রেগুলেশন নভেল বটতলা লিখেছেন,--- বাপু, বঙ্কিম যার তুলনে চুট্ কি Bambooর কাছে Cane ! এখন বাঁশের চাইতে যাঁহাদের মতে কঞ্চি অধিক দড়, হায় তাহারা বলিবে চুট্ কি-লেখক বঙ্কিমবাবু বড়! হা হা কাঁচা মগজের ধাঁচা ওযে---ওকি লিটারেচারের ল, ওগো চটক-মাংস চুটকিতে পেট ভরে না মোদের। ( কোরাস ) অ!
দেখ দুএক অঙ্কে মেটারলিঙ্কী চুট্ কি নাটক আছে,
|
হুঁ হুঁ দাঁড়াতে কি তাহা পারে দেড়-সেরী যাত্রা-পালার কাছে ? ওগো চটক দেখিয়া ভুলিও না কেউ, ভুলিও না চুট্ কিতে, বড় মজা পাবে রায়-মশায়ের বড় গীতাভিনয়ের গীতে। তাহে পাবে খাঁটি সুর যেন চিটা গুড় হুবু চিনি সে যে raw, আর চিটা সে শুদ্ধ, চিনি অশুদ্ধ শাস্ত্রে লিখেছে।--- ( কোরাস ) অ!
দেখ বিশ্বামিত্র আড়াই ছত্রে রচিল গায়ত্রী, উহা চুট্ কি বলিয়া পাইল না ঋষি ফলারের পত্রী। শেষে মীনরূপে হরি চুট্ কি চুনিল, ঘোর কলি! ঘোর কলি! ওরে দেবতার লীলা মানবে ছলিতে, ছলে ভুলিও না ভাই, চুপ্ রাঘব-বোয়াল কাব্য এখনি ভাষা জলে দিবে ঘাই!
|
ওহো কলমের ডগে ফাৎনা লাগাও নড়িও না এক য’ ( কোরাস ) অ!
দেখ রৌদ্র রসের চুটকি রচনা লা মার্সে ঈজ্ গান, ও সে চুট্ কি বলিয়া হল না আদর, হল না ক সম্মান। এখন যুদ্ধের কালে গাহে ইউরোপ হোমারের ইলিয়াদ্, ওরে চুটকি ছাড়িয়া মহাকাব্যের মহা মহা খাতা বাঁধ! ওরে বড় বড় বই লিখে ক্রমশই মানুষের মত হ। দেখ্ ধারে না কাটিস ভারে কেটে যাবি কাটা নিয়ে কথা।--- ( কোরাস ) অ!
ওরে ইতিহাস কেউ লেখেনি চুট্ কি কিম্বদন্তি জুড়ি’ ঢালি তিন পয়সার তাম্রশাসনে টিপ্পনি ত্রিশ ঝুড়ি।
|
আর গুরুগম্ভীর বিজ্ঞান-পুথি পড়ানো হবে না পুত্রে, ওতে চুট্ কি ঢুকেছে, লিখেছে---বিজলি ধরেছে ঘুড়ির সূত্রে। আর চায়ের কেট্ লি ডাকন ঠেলিয়া নাচন দেখায় তারি, হল হাজার চুট্ কি গল্পের ভারে ভিজা কম্বল ভারী। যদি পুছ ‘কেন মাথে চুট্ কি?’ ওযে গো আত্মা-বটের ব, ওগো ও যে চৈতন, চাঁই হয় উহা চুট্ কি দলের।--- ( কোরাস ) অ!
ওগো চুট্ কি লিখিলে থেকে যাবে মনে আরসোলা-চাটা-ভয়, হয় কীর্ত্তি লোপের সুবিধা বেজায়। ছোট লেখা আর নয়! লেখ এমন গ্রন্থ যাহা পাঁজাকোলা করেও না যায় তোলা, আর চারি-যুগে চাটি ফুরাতে নারে যা দুনিয়ার আরসোলা।
|
ওরে লেখ ব্যাসকূট দাঁতে বিস্কুট আদা জল খেয়ে ল, শুধু বিরাট হইলে হইবে কেতাব অজর অমর।--- ( কোরাস ) অ!
দেখ বিনা সম্বল বেকার উড়িয়া চুট্ কির কাম করে, ওসে ভিক্ষার চাল জড়ো করি শেষে বেচে গো সুবিধা দরে। ওগো ‘চুট্ কি লেখা যে চুট্ কির কাম,’ উড়িয়ার কাজ ভাই, উহা তোমরা করিলে আমরা সবাই লজ্জায় মারা যাই। ছি ছি চুট্ কি ঘৃণ্য দৈন্যের ধ্বজা, দুটি শুধু তার ভালো, ওগো পণ্ডিত শির নারীর চরণ চুট্ কিতে করে আলো! ওরে এ দুটি চুট্ কি রক্ষা করিয়া রণে আগুয়ান হ, আর চুট্ কি-নিধনে চ রে ভাই, জিভে দিয়ে খর শান। . ( কোরাস, হাই তুলিতে তুলিতে) . অ!
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
তুমি কেন পাও লাজ
‘বউ’ বলে ডাক্ লে?
তুমি কেন যাও স’রে
আর কেউ থাকলে?
তুমি কেন ম্মরি’ শুধু
অন্তরযামীকে
ভাবনা কী মনে-মনে
হৃদয়ের স্বামীকে?
তোমাকেই চিরকাল
হবে ঘর ক’রতে ;
তোমাকেই হবে হাল
চিরদিন ধ’রতে।
তুমি নুয়ে প’ড়ো না ক’
সঙ্কোচে, সরমে ;
মাঝি যদি থাকে ঠিক,
ভয় নাই চরমে।
তুমি তো ভিখারী নহ,
ভ্রুকুটিতে টল্ বে---
পথের তো ধূলা নহ,
সকলে যে দ’ল্ বে।
দাবী
কবি গিরিজাকুমার বসু (১৮৮২ - ১৯৪৫)। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও জলধর সেন সম্পাদিত
ভারতবর্ষ পত্রিকার আষাঢ় ১৩২৯ ( জুলাই ১৯২২ ) সংখ্যা থেকে নেওয়া।
তুমি শুধু চুপ্ ক’রে
থেকো না ক' দাঁড়িয়ে ;
যেও শ্লেষ, অবহেলা
পা'র তলে মাড়িয়ে।
তোমার যা দাবী, তুমি
ছেড়ে কেন রইবে?
বলে তাহা নিতে হবে---
দেবে না তো দৈবে!
পথ ছেড়ে দেবে না যে,
পথ তারে ছাড়বে ;
ভয়ে দূরে থেক' না ক’
জয়ে বশ বাড়্ বে।
বিপ্লবী কবি অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অরবিন্দের কথা একটু বলি এইবার। ইংরেজি “বন্দে মাতরম্” বেরুচ্ছে,
এদিকে 'যুগান্তর”। এই সময় অরবিন্দ থাকতেন রাজা সুবোধ মল্লিকের বাড়িতে।
রাজার বাড়িতে রাজার হালে থেকে ও তিনি অসুবিধা বোধ করছিলেন। কারণ,
অত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করার ধাত তাঁর নয়। তাই একদিন তিনি আমায়
বললেন, একটা। আলাদা বাসা ভাড়া করতে। স্কটস্ লেনে একটা বাসা ভাড়া করে
সেইখানে আমাদের সংসার পাতা হল। আমাদের সংসারে আমরা চারজন---
অরবিন্দ, তার স্ত্রী মৃণালিনী, বোন সরোজিনী আর আমি। এই সংসারে কর্তা
বলতেও আমি, আর গিন্নী বলতেও আমি। কারণ, আসল কর্তা ও গিন্নী
দুজনেই নির্লিপ্ত। বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে অরবিন্দ বসে আছেন সেই আগুনের
মধ্যে নিবাতনিষ্কম্প রূপে। আগুন জ্বলছে, কিন্তু সে আদুনের তাপ তাঁকে স্পর্শ
করে না। খর্বাকৃতি, প্রশান্ত এই মানুষটির চোখে ছিল একটা অতলগর্ভ ভাব।
সে ভাব যারা দেখেছে, তাদের মনে হত তাঁর এ জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আছে যেন একটা
অনির্বাণ আসক্তি ; আর তার পিছনে আছে অন্তর্গূঢ় রহস্যলোক যেখানে তিনি
অচলপ্রতিষ্ঠ। বাইরের কর্মে তার কোথাও বিচ্যুতি বা বিশ্রম নেই। যেন
চলছে সবই কলের মত অথচ প্রায়ই দেখা যায় তিনি ধ্যানমগ্ন।
ভালরে ভাল, অরবিন্দের আবার এ কী হল! দেখলুম সকলের মধ্যে থেকেও
তিনি সব থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নির্বিকার হয়ে যান। পোষাক-
পরিচ্ছদের কোন ৰালাই নেই ; যখন যা পান তাই খান, বাদ-প্রতিবাদ নেই।
অরবিন্দের কথা বিপ্লবী কবি অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য (৫.৪.১৮৮২ - ১০.৫.১৯৬২)। তিনি আলিপুর বোমা যড়যন্ত্র মামলায় আন্দামানের
সেলুলার জেলে দ্বীপান্তরের সাজাপ্রাপ্ত হন। দীর্ঘ হলেও, ১৯৬০ সালে প্রকাশিত, শশাঙ্কমোহন চৌধুরীর “বারবেলার বৈঠক” গ্রন্থের ৫৯-পৃষ্ঠায় শুরু
হওয়া, অবিনাশচন্দ্রের ভাষ্যে দেওয়া “অরবিন্দের কথা”-টি আমরা এই বিপ্লবীর কবিতা হিসেবে তুলে ধন্য হলাম। সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড
চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা যাচ্ছে, অবিনাশচন্দ্র সেই অলিন্দ-সংলগ্ন কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে
আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি। তাই তাঁদের মতো মানুষের কলমের ছোঁয়া বা মুখনিঃসৃত বাণী আমাদের কাছে কবিতাই!
একদিন দেখলুম আমাদের বাসায় এসেছেন একজন। নাম শুনলুম লেলে
মহারাজ। তাঁকে এর আগে কোনদিন চোখে দেখি নি। শুনেছিলুম ইনিই
অরবিন্দকে যোগের পথ দেখিয়েছেন। অরবিন্দের ধ্যান-ধারণা আরও বেড়ে
গেল। খাওয়া দাঁড়াল এক মুঠো ভাত আর আলুসিদ্ধ।
বারীন অরবিন্দকে ডাকত সেজদা বলে। আমিও তাই তাকে সেজদা বলেই
ডাকতুম। একদিন ধমক দিয়েই বললুম---কী এসব হচ্ছে, সেজদা? সেজদা
নির্বাক। শুধু একটা অপার্থিব হাসি ভেসে রইল সেজদার দুটি ঠোঁটে।
এই লেলে মহারাজ আমাদের মানিকতলার বাগানেও একদিন গেলেন এবং
আমাদের নতুন পথ দেখাবেন বললেন।
ছোকরার দলের তখন রক্ত গরম। আগুন নিয়ে খেলায় ভারা মত্ত। বারীন,
উপেন, উল্লাসকর প্রভৃতি কয়েকজনকে বসিয়ে লেলে মহারাজ তাদের ধ্যান
করতে বললেন এবং যোগীবর নিজেও বসলেন ধ্যানে।
অনভ্যস্ত ছোকরার দল মাঝে মাঝে চোখ খুলে পরস্পরের ভঙ্গিটা একবার
দেখে নেয় আবার চোখ বুজে। এমনি কিছুক্ষণ চলার পর লেলে বাবা চোখ
খুললেন। জিজ্ঞেস করলেন সবাইকে---কি দেখলে? সবাই সমস্বরে জবাব
দিলে, কিছু না। দ্বিতীয়বারও অমনই অভিনয় চলল। লেলে বাবা এবারও ঐ
একই প্রশ্ন করলেন। আমাদের মধ্যে উপেন ছিল ঠোটকাটা। সে লেলের
প্রশ্নে জবাব দিলে---ঘণ্টা!
লেলে মহারাজ আর একবার ধ্যানে বসতে সবাইকে অনুরোধ করলেন।
বার বার তিনবার।
এইবার এই তৃতীয়বার কী একটা কাণ্ড ঘটে গেল। সবাই যেন ফিরে এল
কোন্ এক অজানা রহস্যলোক থেকে, সেখানকার কথা শুধু হৃদয়ে অনুভব করা
যায় কিন্তু মুখে প্রকাশ করা যায় না। মোহাচ্ছন্নের মত সকলে চেয়ে রইল
কিছুক্ষণ যেগীবরের মুখের দিকে।
লেলে মহারাজ বললেন---ভারতের স্বাধীনতার জন্য তোমরা আকুল হয়েছ।
ভারত স্বাধীন হবেই, কিন্তু তোমরা যে পথ নিয়েছ সে পথে নয়। ---বলেই তিনি
অন্তর্হিত হলেন।
বলা বাহুল্য, রজোগুণাশ্রিত সে মোহ দূর হতে বেশি সময় লাগে
নি। সকলেই ভেবেছিল লেলে মহারাজের ওটা একটা নিছক সম্মোহনের
ব্যাপার।
বিপ্লবী কবি অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এবার আমাদের আন্দামানের একটা ঘটনার কথা বলি তোমাদের।
একবার চীফ কমিশনার এলেন জেল পরিদর্শনে। আন্দামানে তখন বাংলার
বিপ্লবীদের সঙ্গে থাকতেন বিখ্যাত মারাঠি বিপ্লবী বীর বিনায়ক দামোদর
সাতারকারও। আমি, সাভারকার এবং আরও কয়েকজন ছিলুম এক জায়গায়।
সাহেব একখানা ইংরেজি গীতাঞ্জলি হাতে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে মহা
উৎসাহে রবীন্দ্রনাথের সুখ্যাতি গাইতে লাগলেন। তাঁর বক্তৃতার সারমর্ম হল
রবীন্দ্রনাথ যে বিশ্ববরেণ্যে হয়েছেন তার কারণ তিনি ইংরেজি সভ্যতার মূল তত্ত্বটি
মনেপ্রাণে গ্রহণ করে তা নিজের জীবনে ফলিয়ে তুলেছেন। তাঁর ইংরেজি শিক্ষা
সফল হয়েছে। বিপ্লবীরা বিপথে না গিয়ে যদি রবীন্দ্রনাথের আদর্শ গ্রহণ করত
তা হলে তাদের জীবন এমনিভাবে বার্থ হত না। অর্থাৎ সাহেব সদুপদেশ
দিচ্ছিলেন বিপ্লবীরা যেন শান্ত-শিষ্ট-সুবোধ বালক হয়ে রবীন্দ্রনাথের মত মান্য,
বরেণ্য হবার চেষ্টা করে।
সাভারকার এই সাহেব পুঙ্গবের বক্তৃতা শুনে আর থাকতে পারলেন না।
নির্ভীকভাবে সাহেবকে শুনিয়ে দিলেন---দেখ সাহেব, তুমি রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি
পড়ে মুগ্ধ হয়ে আমাদের কাছে প্রমাণ করতে এসেছ, তিনি কত বড়---ইংরেজি
শিক্ষা ও সভ্যতার কী মনোমুগ্ধকর ফল। কিন্তু গীতাঞ্জলি পড়ে তোমার মত
আমরা মুগ্ধ হই না। কারণ, ঐ রকম তত্ত্বকথা আমাদের দেশে অলিতে-গলিতে
সেলুলার জেলে সাভারকারের কথা বিপ্লবী কবি অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য (৫.৪.১৮৮২ - ১০.৫.১৯৬২)
তিনি আলিপুর বোমা যড়যন্ত্র মামলায় আন্দামানের সেলুলার জেলে দ্বীপান্তরের সাজাপ্রাপ্ত হন। দীর্ঘ হলেও, ১৯৬০ সালে প্রকাশিত, শশাঙ্কমোহন
চৌধুরীর “বারবেলার বৈঠক” গ্রন্থের ৫৯-পৃষ্ঠায় শুরু হওয়া, অবিনাশচন্দ্রের ভাষ্যে দেওয়া সেলুলার জেলে সাভারকারের কথা-টি আমরা এই বিপ্লবীর
কবিতা হিসেবে তুলে ধন্য হলাম। সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা যাচ্ছে, অবিনাশচন্দ্র সেই অলিন্দ-সংলগ্ন
কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি। তাই তাঁদের মতো মানুষের
কলমের ছোঁয়া বা মুখনিঃসৃত বাণী আমাদের কাছে কবিতাই!
অমন কত ভেসে বেড়ায়। এ দেশের নিরক্ষর লোকের মুখেও ফোটে পদাবলী---
যা তারা পেয়েছে তাদের পূর্বপুরুষদের বহু যুগ-যুগান্তরের সাধনার ফলস্বরূপ।
গীতাঞ্জলির জন্য 'আমরা রবীন্দ্রনাথকে বড় বলি না। গীতাঞ্জলি ছাড়াও
রবীন্দ্রনাথের অপূর্ব সাহিত্য আছে যেখানে তাঁর অভ্রভেদী প্রতিভা দেখে
আমরা মুগ্ধ হই, যার জন্য এই মহামনীষী আমাদের বরেণ্য, নমস্য।
সাহেব, তোমাদের শ্রদ্ধা কেমন জান? যেমন গোলগাল, সুন্দর দিশি কুকুর
দেখলে তোমরা তার পিঠ চাপড়ে বল---বাঃ কুকুরটি তো বেশ !
রবীন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কার দিয়ে তোমরা ঐ রকম তাঁর পিঠ চাপড়েছ।
সাহেব আর হালে পানি না পেয়ে মুখটি লাল করে অতঃপর চম্পট দিলেন।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বিচারনিষ্ঠ বলিয়া বড়াই
করেন ব্রিটিশ জাতি,
কতটুকু তাতে সুখ্যাতি-আর
কতখানি অখ্যাতি।
যীশুকে যাহারা দিয়েছিল ক্রুশে,
বিচার কবায়ে---বিচারক পুষে,
মোরা দেখি সব শ্বেতাঙ্গ জাতি
আজিও তাদেরি জ্ঞাতি।
২
পুণ্যপ্রতিমা ‘জোয়ান ডিআর্ক’ ।
ফরাসী বীরাঙ্গনা,
বিচার করিয়া কে পোড়ালো তারে
কত্রি’ শত লাঞ্ছনা?
যে বিচার এক পাপ প্রহসন
শুনি কলুষিত হয় দেহমন,
বীভৎস সেই জঘন্য তার
করিব না আলোচনা
৩
‘নন্দকুমারে’ ফাঁসি দিল যারা
তাদেরো বিবেক আছে?
ওকে বল ন্যায়? তবে অন্যায়---
স্পৃহনীয় ওর কাছে।
ব্রিটিশের বিচার
কবি কুমুজরঞ্জন মল্লিক (১.৩.১৮৮৩ - ১৪.১২.১৯৭০)
১৯৬০ সালে “মিত্র ও ঘোষ” প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত, কবির “কুমুদরঞ্জন কাব্যসম্ভার”, ভারতচিত্র বিভাগের কবিতা।
ওকি কদর্য বিচাবের রূপ !
হীন কুৎসিত বিষ-বিদ্রূপ---
ও বিচারে মরে দেবতা মানুষ---
অসুরই কেবল বাঁচে।
কী পেলে জাপান--- ওই জার্মানী
পরাজিত অবনত?
বিচার যা তাহা--- প্রতিহিংসার
উদ্ যান বোমা মত।
সুদূর ভবিষ্যতের চক্ষে---
শুধু মহাপাপী হলে অলক্ষ্যে
বিচারাতঙ্ক বীজাণু বাহক
বিজয়ী ভাগ্যহত।
দেহ শুধু শ্বেত, চেতোদর্পণে---
আবর্জনার স্তূপ,
প্রতিফলিত কি হতে পারে সেথা
সত্য ন্যায়ের রূপ?
স্বার্থের নামে এ তো বলিদান
নাহিকো যুক্ত যুক্তির স্থান,
সব ত্যজিয়াছ---লজ্জা ত্যজো না
হে ভদ্র রও চুপ।
৬
ভেব না তোমরা ন্যায়পরায়ণ
বিচারে নরোত্তম,
কোথা বিশুদ্ধ নিরপেক্ষতা
বিবেকীর সংযম?
নরভুক যারা ভাল বরঞ্চ,
রচনা ন্যায়ের বধ্যমঞ্চ
হত্যাই করে--- প্রবঞ্চনার
আড়ম্বরটা কম।
পূর্বপুরুষ হনু ছিল বলো---
জানিনে সত্য কিনা!
ও মত গ্রহণে সন্দেহ হয়
বিশেষ প্রমাণ বিনা।
হই নিশ্চিত--- তবু মনে ভাবি,
হেসে মেনে লবে তোমাদের দাবী
অনাগত তব বংশধরেরা
হেরি বিচারের চিনা।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সভ্যতা ও তো কৃপাণ শোণিত-মাখা,
যত্নে বদ্ধ সুচারু সোনালী খাপে,
বেশী দিন তার সহে না সে ভাবে থাকা,
রুক্ত তৃষায় কাঁপায়--- নিজে সে কাঁপে।
তার ইতিহাস বর্বরতায় ভরা,
তার ইতিহাস পাপে ও দম্ভে গড়া,
অপহরণের পসরা তাহার শিরে।
২
সভ্যতম ও সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি
বলিয়া---আত্মপ্রচার যাদের সাধ,
তারাও চলেছে নৃমুণ্ডমালা গাঁখি’
আচরি’ ভয়াল হীনতম অপরাধ।
ভাবাঢ্য মন, বাকজাল পরিপাটী,
রচে আবরিয়া রক্তমাংস মাটি,
সুধার কুহেলি গরল সাগর তীরে।
৩
রাখো কৃষ্টির মহিমা এ গরিমার
যত আবরণ আভরণে তাঁরে ঘিরে
মানব আদিম পিপাসা ও হিংসায়
যাবেই নগ্ন বর্বরতায় ফিরে।
দেবত্ব নয় পশুত্ব তার প্রিয়।
বর্বরতা
কবি কুমুজরঞ্জন মল্লিক (১.৩.১৮৮৩ - ১৪.১২.১৯৭০)। ১৯৬০ সালে “মিত্র ও ঘোষ” প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত, কবির “কুমুদরঞ্জন কাব্যসম্ভার”, ভারতচিত্র বিভাগের কবিতা।
মুনি ঋষি তার কেহ নয় আত্মীয়,
ধর্ম নয়, সে শক্তি আকাঙ্ক্ষী রে
৪
হয় জাতি যবে লুন্ঠিত ধনে ধনী---
হতে চায় তারা ভদ্র সাধু ও সৎ।
সভ্যতার যে গড়ে দৃঢ় আবরণী---
করিতে দুষ্য সম্পদ নিরাপদ।
তখনি সর্বশক্তিমানে সে ম্মরে।
ষত সদাচার বিধি ও বিধান গড়ে,
বাঁধন রচে সে সকল বাধন ছিঁড়ে ।
৫
ধরাকে পীড়িত করাই নরের কাজ---
ধ্বংস হরণ মারণেতে উল্লাস,
নমনীয় তার বিবেক---নাহিকো লাজ
নিপুণ সদাই সাধিতে সর্বনাশ।
বধরতায় কৃষ্টির উন্মেষ,
বর্বরতায় পুনঃ হয় তার শেষ,
সব উত্থান মিশে পতনের ভিড়ে।
বিপ্লবী কবি মদনমোহন ভৌমিক
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বহু বৎসর যাবৎ জেলে বাস করিতেছি। অনেক দিবস কাটিয়া গেল।
এখন বন্দীজীবনের শেষকাল উপাস্থিত। পূর্বে বলিয়াছি যে যখন
আন্দামানে যাত্রা করি তখন ফিরিয়া আসিবার আশা ত্যাগ করিয়াই
গিয়াছিলাম। দেশে যখন ফিরিয়া আসি তখন অর্ধাংশের অধিক কাটিয়া
গিয়াছে। আসার পর অনেকটা ভরসা হইয়াছল যে ঘরের ছেলে ঘরে
ফিরিয়া যাইতে পারিব। ক্রমে দিনগুলি আরও ফুরাইয়া আসিল তখন
আশার উপর ভরসাও হইল। এবার হইতে মুক্তির সন্ধান পাইতে চেষ্টা
করিলাম। আন্দামানে থাকার কালে কোনরূপ Remission পাইতাম
না। এখানে আসিয়া মাসে তিন দিবস করিয়া তাহাও পাইতে লাগিলাম।
তাহাতে মুক্তির দিনগুলি আরও ঘনাইয়া আসিল। এবার হিসাব করিয়া
দেখিলাম যে এই হিসাবে Remission পাইলে কতদিন পর মুক্ত হইতে
পারি। আন্দামানে যখন ছিলাম তখন পিতার মৃত্যু সংবাদ হইতে আরস্ত
কারয়া ভগ্নী প্রভৃতি সাত জনের মৃত্যু সংবাদ পাই ; ইহার পর আমি
এখানে আসিয়া মাতৃহীন হই। মাতা-পিতা ব্যতীত আর যাহারা পরলোক
গমন করিয়াছে তাহারা সকলেই আমার বয়ঃকনিষ্ঠ। এসব কথা যখন
মনে আসিত তখন মুক্তির নেশা ছুটিয়া যাইত।
এই সন্ধান পাইয়া এখন হইতে মাস গণিতে আরম্ভ করিলাম। ক্রমে
দিন আরও ঘনাইয়া আসিল, মুক্তিতে বিশ্বাস জন্মিল ৷ জীবনের উন্নতির
প্রথম অবস্থায়, লেখাপড়ার শেষ অবস্থায় “কি করিবে' এই প্রশ্ন যেমন
মুক্তির সন্ধান বিপ্লবী কবি মদনমোহন ভৌমিক (১৮৮৪―২৭ নভেম্বর ১৯৫৫)। বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁর ১০ বছর দ্বীপান্তর দণ্ড হয়
ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী মহারাজ ও খগেন্দ্রনাথ চৌধুরীর সঙ্গে। দেশভাগ হবার পরে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করে স্বগ্রাম, ঢাকা জেলার
ডুমনিতে ফিরে যান। আমরা তাঁর রচিত “আন্দামানে ১০ বছর” গ্রন্থের “মুক্তির পূর্বাবস্থা” অধ্যায়ের ১৭৩-পৃষ্ঠায় “মুক্তির সন্ধান” থেকে কিছুটা
অংশ কবিতা হিসেবে তুলে ধন্য হলাম। সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা যাচ্ছে, মদনমোহন ভৌমিক সেই
অলিন্দ-সংলগ্ন কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি।
যাঁদের কর্মকাণ্ডের জন্য আমরা স্বাধীন দেশে জন্মাতে পেরেছি, তাঁদের কলমের ছোঁয়া আমাদের কাছে কবিতাই।
লোকের মনকে অস্থির করিয়া তোলে, তেমনই এই দীর্ঘকাল কারাবাসের
পর মাতৃ-পতৃহীন অবস্থায় বাহিরে যাইয়া কি করিব এ প্রশ্নও আমাকে
কিংকর্তব্য বিমূঢ় করিয়া ফেলিল। মুক্তির সন্ধানের সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু
সম্বলের সন্ধান না পাইলে চলে না, সে জন্যই স্বাভাবিক ভাবেই এই সকল
চিন্তা মনে আসিয়া উপাস্থিত হইত। এ সময়ে Convict mentality
মুক্তির পূর্বে যে কেমন হয় তাহা বুঝবার অবসর পাইলাম ৷
যতদিন মুক্তির কোন সন্ধান পাওয়া যায় না ততদিন বেশ শান্তিতে
থাকা যায়। যখন যেমন তখন তেমন, যথা বাস তথা ভবন থাকে মনের
অবস্থা। মুক্তি ঘনিয়া আসিলেই স্থির চিত্তকে অস্থির করিয়া তোলে।
কেন করে তাহা বুঝা বড় শক্ত। আমার একটা মনে হয় ; বহু দিবস জেলে
আবদ্ধ থাকিলে মনের অবস্থা পারিপার্শিক অবস্থার চাপে এবং সমাজের
সংস্রবহীন অবস্থায় বাসের পরিণামে এমন হয় যে হঠাৎ সেই সকল সন্বন্ধের
আশায়, দুঃখের পর হঠাৎ সুখ লাভের সম্ভাবনায় মানসিক শক্তিকে তোলপাড়
করিয়া তোলে। আর একটা মনে হয় হঠাৎ স্বজনের সঙ্গে দেখা হইবে এই
আচিন্ত্যনীয় অব্যক্ত আনন্দের ভবিষ্যৎ ভাবনায় মনকে ইতিরিক্ত আনন্দপ্লুত
করিয়া তোলে বলিয়া চাঞ্চল্য উপাস্থিত হয়। তৃতীয়তঃ শেষকালে যখন
অল্প দিবস বাকী থাকে তখন দিনগুলি যেন শীঘ্র কাটে না, রাত্র যেন ভোর
হয় না এমন একটা অবস্থা হয়। ইহা যে স্বেচ্ছায় মনে স্থান দেওয়া হয়
তাহা নহে। ভবিষাৎ চিন্তার ফলে ইহা মনে আসে। ভবিষ্যতে একটা
কিছু করিতে হইবে, কি করিতে হইবে তাহা অনেক পূর্বেই ঠিক আছে।
সেটা যাহাতে শীঘ্র করিতে পরি ; কখন বাহির হইব, কখন উহা করিবার
সুযোগ পাইব এই চিন্তাটাই মনকে আস্থির করিয়া তোলে এবং তাহার ফলে
চাঞ্চল্য উপস্থিত হয়। আর একটা ইহার উল্টা। কি করিবে ইহার
স্থিরতা নাই।
এতভিন্ন সাধারণ কয়েদীকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখিয়াছি যে মুক্তির পূর্বে
মনের অবস্থা কেমন হয়। তাহারাও এই একই কথা বলিয়া থাকে।
তাহারা একমাত্র বলে যে, দিন যেন কাটে না, এক একটা দিন যেন সপ্তাহ
বলিয়া মনে হয়। যাহার পাঁচ বৎসর দণ্ড তাহার চার বংসর কাটিতে যে
মানসিক কষ্ট হয় নাই, শেষ এক মাস শেষ করিতে তদপেক্ষা অধিক কষ্ট
হয়! তাহা কেন হয়, কিসের জন্য মনের অবস্থান্তর হয় তাহার হিসাব-
নিকাশ করিয়া উপসংহার ঠিক করিতে পারে না, বিশেষ করিয়া তলিয়ে
দেখিতে পারে না কেবল উপলব্ধি করে মনের অবস্থান্তর অবস্থা। মনো-
বৈজ্ঞানিক এই লক্ষণগুলি হইতে অনেক তত্ত্ব আবিষ্কার করিতে পারবেন
সন্দেহ নাই। কিন্তু ব্যাথিতের বেদন বুঝা শক্ত।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আমাদিগের শাস্ত্রে যেমন যপ তপ দান ধ্যান ইত্যাদি অনুষ্ঠান ও
ক্রিয়া কলাপ সম্বন্ধে তাহাদিগের মূল উদ্দেশ্যে সিদ্ধি ব্যতিরেকেও
আনুসঙ্গিক ফলস্বরূপ নানা প্রকার বাহুল্য ফলশ্রুতির উল্লেখ আছে,
অথচ ঐ সকল ফলশ্রুতি কামনা করিয়া যেমন কেহই ঐ সকল
সদুনুষ্ঠানে ব্রতী হয়েন না, তেমনি আমাদিগের এই ক্ষুদ্র ইতিবৃত্তে
যে সকল অত্যাশ্চর্য্য ও অতিলৌকিক ব্যাপার আমাদিগের মূল
লক্ষ্যের প্রতি অগ্রসর হইবার পথে আনুসঙ্গিক ফল স্বরূপ আমাদিগের
বিস্ময় ও চিত্তচমৎকার উৎপাদন করিয়াছে আমরা যেন সেই
আনুসঙ্গিক ব্যাপার সমূহ দ্বারা আকৃষ্ট হইয়া আমাদিগের মূল লক্ষ্য
হইতে বিচলিত ও বিচ্যুত হইয়া শ্বাঁস ফেলিয়া খোসা লইয়াই মাতা
মাতি আরম্ভ করিয়া না দিই, এতদুদ্দেশ্যে আমার পাঠক বর্গের প্রতি
এই বক্তব্য, যে কেবল মাত্র তত্ত্বানুষন্ধিৎসু বৈজ্ঞনিক-দৃষ্টিতে ঐ সকল
ব্যাপার সম্বন্ধীয় কার্য-কারণ শৃঙ্খল উপযুক্ত রূপ অনুসন্ধান পূর্ব্বক
আমাদিগের জ্ঞান বুদ্ধির পূর্ণতর ও প্রবলতর পুষ্টিসাধনান্তর যাহাতে,
আমরা পূর্ণতর ও উপযুক্ততর অধিকারী রূপে আমাদিগের সমগ্র শক্তির
প্রয়োগ দ্বারা মূল লক্ষের দিকে অগ্রসর হইতে পারি, তত্প্রতি দৃষ্টি রাখা
আমাদিগের একান্ত কর্তব্য ; নচেৎ ঐ সকল ঘটনা পাঠে পাঠকবর্গের
চিত্ত বিক্ষেপ উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা, এবং তৎফলে আমাকে
এই পুস্তক লিখিয়া কোনও উপকার দুরে থাক্ বরং অপকারই অধিক
সাধন করার অপরাধে সাধারণের নিকট কুণ্ঠিত ও সঙ্কুচিত হইয়া
আমাদিগের শাস্ত্রে যেমন যপ তপ দান ধ্যান
কবি উল্লাসকর দত্ত (৬.৪.১৮৮৫ - ১৭.৫.১৯৬৫)। আমরা এখানে তাঁর রচিত গ্রন্থ “আমার কারা-জীবনী”-এর উপসংহার থেকে একটি অংশ তুলে
ধরলাম। সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা যাচ্ছে, উল্লাসকর দত্ত সেই অলিন্দ-সংলগ্ন কোনো কালকুঠরীতে
জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি। তাই তাঁদের মতো মানুষের কলমের
ছোঁয়াই আমাদের কাছে কবিতার চেয়ে কিছু কম নয়।
থাকিতে হইবে। অংশের অনুভূতি দ্বার যেমন পূর্ণের অনুভূতি
অধিকতর পরিস্ফূট হয়, সূর্য্যালোকের সপ্তধা বিক্ষেপ দ্বারা যেমন
সূর্য্যালোকের জ্ঞান স্ফূটতর ও বিশদতর আকার প্রাপ্ত হয়, ঠিক ঐ
সকল অতিলৌকিক বিক্ষেপ দ্বারাও আমাদিগের লৌকিকের জ্ঞান
পরিস্ফূট ও পরিমার্জ্জিত হয়। তবে যেমন সুর্য্যালোকের সপ্তবর্ণের
সমন্বয়সন্তূত শ্বেত রশ্মিই আমাদিগের ব্যবহারিক প্রয়োজন সাধন
পক্ষে সর্ব্বাপেক্ষা আধিক উপযোগী, তেমনই লৌকিক রাজে ; অবস্থান
কালীন লৌকিক ও জাগতিক ব্যাপার সমূহই আমাদিগের সর্ব্বাপেক্ষা
অধিক সন্নিকট ও আপনার---এই কথাগুলি যাহাতে আমরা ভুলিয়া
না যাই সে জন্য উপরোক্ত কয়েকটী বিষয় উল্লেধ করা আবশ্যিক
বোধ করিলাম।
বিপ্লবী কবি যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সৃষ্টি একটা দুর্জ্ঞেয় রহস্য। আবার, সেই সৃষ্টির মধ্যে পৃথিবীতে মানুষের
আবির্ভাব, তাও কম আশ্চর্য নয়। আমরা সমাজবদ্ধ মানুষের যুগে বাস
করছি। তাই মানুষের সমাজকে বুঝতে চাই মানুষের চিন্তাধারা ও কার্য-
পদ্ধতির বিচার করে। ব্যবহারিক প্রয়োজনে আর মনের টানে মানুষ
সমাজবদ্ধ জীব হয়ে বাস করছে। দুঃখ থেকে, অভাব থেকে সে অব্যাহতি
পেতে চায়। পৌরাণিক যুগেও দেখা যায় মানুষ দুঃখ-পীড়ন থেকে বাঁচবার
জন্য প্রয়াস করছে। কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড মানুষকে শুধু সাম্প্রতিক মুক্তির
পথ নয়, আত্যন্তিক দুঃখ-নিবৃত্তির পথেরও নির্দেশ দিচ্ছে। লোকসংখ্যা
যত বর্ধিত হচ্ছে, জীবনযাত্রা সহজ ও অনাম্বর ক্ষেত্র থেকে ততই সাড়ন্বর
ও জটিল ক্ষেত্রে পৌঁছুচ্ছে। তাই মানুষ নূতন করে প্রকৃতির কাছ থেকে
কায়িক ও মানসিক পরিশ্রম দ্বারা নূতন ভাবে বাধা বিঘ্ন দূর করবার উপায় বার
করছে। কোন কোন সময়ে দেখা যায় কোন এক চিন্তাশীল ব্যক্তি পারিপার্শ্বিকের
অভাব ও বিশৃঙ্খলা ঘুচিয়ে নূতন ও বৃহত্তর জীবন উপভোগ করবার সন্ধান
বার করতে চাইছে। এই চিন্তা ব্যষ্টি মানুষে মানুষে ও সমাজে সমাজে নূতন
ছাঁদে সম্পর্ক নির্ণয় করতে চায়। যখন সমাজে রাজ্য গঠিত হল তখন রাজ্যের
সঙ্গে সমাজের কি রকম সম্পর্ক হলে ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত কল্যাণ হয় সেই
উদ্দেশ্যে চিন্তা করতে করতে অদূর ভবিষ্যতে তার বাস্তবরূপ যেন দেখতে পেল।
তখন সে চারিদিকে শোনাতে লাগল তার নিজের চিন্তার কথা। যারা এই নব
চিন্তাধারার প্রতি আকৃষ্ট হল তাদের একত্র করে দল গঠন করল এবং ভবিষ্যতের
বুকে ব্যষ্টি মানুষ, সমাজ ও রাজ্যের যে কল্যাণকর পারস্পরিক পরিপূরক
সম্পর্কের রূপ দেখেছে, তাকেই স্থির লক্ষ্য করে লক্ষ্যস্থানে পৌঁছবার পথ বা
কর্মসূচী প্রস্তুত করতে লাগল। যুগে যুগে মানুষের এই চেষ্টা মানুষকে অগ্রগতির
অধ্যাত্মবাদ ও জড়বাদ যেন ঘড়ির পেণ্ডুলামের মত
বিপ্লবী কবি যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় (১৮.৯.১৮৮৬ - ৩০.৮.১৯৭৮)। বাঘাযতীনের সহযোগী ও যুগান্তর দলের নেতৃস্থানীয় এই কবির কোনও কবিতা আমরা পাইনি। তাই তাঁর ১৯৫৬
সালে প্রকাশিত "বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি" গ্রন্থের ভূমিকার একটি অংশ তুলে দিয়েছি তাঁর কবিতা হিসেবে। যাঁদের কর্মকাণ্ডের জন্য আমরা স্বাধীন দেশে জন্মাতে পেরেছি, তাঁদের
কলমের ছোঁয়া আমাদের কাছে কবিতাই।
পথে ঠেলে নিয়ে চলেছে। কিন্তু মুস্কিল হল এই যে, লক্ষ্যের দিকে যখন কর্মসূচী ধরে
এগিয়ে যাওয়া যায় তখন দেখা যায় কিছুকাল পরে নূতন পারিপার্শ্বিকে নূতন বহুপ্রকারের সমস্যা
দেখা দিয়েছে এবং লক্ষ্যও যেখানে ছিল সেখানে আর নাই। কালের বুকে সেও পিছিয়ে গেছে,
আর যেন তেমন স্পষ্ট নাই। যাত্রাপথের নূতন সমস্যা লক্ষ্যকে ম্লান করে দিয়েছে। নূতন সমস্যার
নূতন করে নিষ্পত্তি করতে গিয়ে নূতন আর এক চিন্তাশীল ব্যক্তি পূর্ব লক্ষ্যের রদবদল করে নূতন
করে পথ বা কর্মসূচী রচনা করতে লাগল আর এক অভিনব লক্ষ্যে দৃষ্টি রেখে। এই মতপ্রচার,
দলগঠন আর পথ কেটে লক্ষ্যে পৌঁছবার চেষ্টা হল মানুষের সমাজের অগ্রগতির ইতিহাস। এই
পথের শেষ নেই, শুধু পথে চলবার গতিটাই সত্য। কোনও সমস্যার নিঃশেষে সমাধান কখনও হয়
না, তাই নিরস্তর আগন্তুক সকল দুঃখ-অভাবের, সকল সমস্যার সমাধান করবার প্রয়াসই, চলে
চিরদিন সকল আদর্শবাদ, সকল তত্ত্ব এই একই নিয়মে চলছে। শেষ কথা কোথাও নেই।
যে বাদ বা তত্ব বর্তমানে অভ্রান্ত এবং কাম্য বলে মনে হয়, সমাজের অগ্রগতির পথে কিছুকাল
পরেই তার পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা প্রত্যাহার অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সিদ্ধান্ত হল সাময়িক আর
সমস্যা পূরণের চেষ্টা হল সকল কালের। আবার যদি দৈহিক প্রয়োজন মেটে তখন দেখা যায় যে,
মনের প্রয়োজন মিটছে না। অধ্যাত্মবাদ ও জড়বাদ যেন ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো কালের বুকে
দুলছে, একদিক থেকে ঠেলে উঠে হয়ত সে জড়বাদের দিকে এগুতে লাগল। অনেকটা এগিয়েদেখা
গেল যে সব অভাব মিটল না, অনেক দুঃখই রয়ে গেছে। তখন সে দুলে বিপরীত দিকে উঠতে
লাগল। যদি সেটা অধ্যাত্ম দিকে হয়, সে পথেও অনেক দুর উঠে দেখল যে, জীবনের সব
প্রয়োজন সেখানে মিটছে না,---তখন আবার সে বিপরীতমুখী হল। দু’তিন শতাব্দী বা তারও
কমবেশী সময়ে এই পেণ্ডুলামের গতিবেগ বিভিন্নমুখী হচ্ছে। এর সাক্ষ্য প্রত্যেক
দেশ বা জাতির ইতিহাসে মিলবে।
বঙ্গদেশ ছেড়ে যদি বাঙ্গালীর যেতে হয়
অন্ধ কবি শচীন্দ্রনাথ সেন (১৮৮৬ - ৮.৭.১৯৫৬)। রচনাকাল দেশভাগের সময় ১৯৪৭।
কবি ব্যক্তিগতভাবে একজন শরণার্থী হয়েই এপার বাংলায় আসতে বাধ্য হয়েছিলেন, দেশভাগের সময়ে। স্বরাজ-স্বাধীনতা যে এই
মানুষদের কাছে এক ভয়ঙ্কর উপহাস ছাড়া আর কিছুই ছিল না তা কবির এই কয় পংক্তি থেকে স্পষ্ট করে আর কে বলতে পারে!
বঙ্গদেশ ছেড়ে যদি বাঙ্গালীর যেতে হয়
স্বরাজ অমৃতে শেষে অরুচি আসিবে হায়।
শূকর আছিল ভাল কৈ মাছ খেয়ে
ভিটাছাড়া দেশছাড়া স্বাধীনতা পেয়ে।..
বর্তমানে আসাম থেকে CAA-NRC-NPR এর নামে, উচ্চতম আদালতের ছত্রছায়ায়, বাঙালী বিতাড়নের চরম হঠকারী কার্যকলাপের
কালে কবিতাটির প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়ে গিয়েছে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভয় কি
কৰি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (২৬.৬.১৮৮৭ - ১৭.৯.১৯৫৪)
শনিবারের চিঠি, ভাদ্র ১৩৫৭ (অগাস্ট ১৯৫০) সংখ্যা থেকে নেওয়া। ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত কবির “নিশান্তিকা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বরাবর মোরা আসছি দেখে
পলায় যাহারা প্রথমে ঠেকে
শেষটা তারাই লড়াই জেতে,
বিধাতা তাদের স্বপক্ষেতে।
দু-দুবার দেখ ব্রিটিশ লায়ন
উর্ধ্বস্বাসে সে কি পলায়ন!
গ্রথম পলাল “মন্সে' হেরে
হ্যাঁথা ক্যাঁথা যত সকলি ছেড়ে
দুবারের বার ডনকার্কে
জেবরে উঠিল ডুব মারকে।
শেষটা কিন্তু জিতল সেই
জার্মানদের পাত্তা নেই।
রুশ-ভল্লুকও খায় নি কম
কভু উত্তম কভু মধ্যম,
ফাটারে গগন আর্তনাদে
ওয়ারশ হতে তালিনগ্রাদে।
সেই রুশিয়ার ভয়েতে আজ
বিশ্ব পরিছে যুদ্ধ-সাজ।
সশস্ত্র যদি পলানো চলে,
নিরস্ত্রে ভীরু কে তবে বলে?
আঁধার রাত্রে ভূতের ভয়
মানুষ মাত্রে সবারই হয়।
প্রভাতে যখন সূর্য উঠে
ভূত প্রেত সব পলায় ছুটে।
নিষ্ঠুর মূঢ় অত্যাচারী---
প্রথম জিৎ তো হবেই তারই।
বিধির বজ্র দেরিতে নামে
তখন তাদের নাচন থামে।
অতএব কোন চিন্তা নেই
লড়াই থামে না পলায়নেই।
দুধে-ভাতে নেতা আছেন বহু
তাঁদের চরণে প্রণাম রহু।
আঁক ক'ষে তারা দেখান ভয়
মেনে নিতে হবে এ পরাজয়।
জীবন-মরণ-সন্ধিক্ষণে
কত কথা আজ পড়ে যে মনে ।
বাংলায় আর নেই কি কেউ
লাগামে ফেরাবে প্রলয় ঢেউ?
সে তরঙ্গের ধরিয়া ঝুঁটি
ঝঞ্ঝর সাথে চলিবে ছুটি?
না থাকে থাক্, কিসে ভয়?
হবে হবে হবে মোদেরি জয়।
আবার আমরা ফিরব দেশ,
হব না হব না নিরুদ্দেশ।
প্রভাতে যখন সূর্য উঠে
ভূত প্রেত সব পলায় ছুটে।
নিষ্ঠুর মূঢ় অত্যাচারী---
প্রথম জিৎ তো হবেই তারই।
বিধির বজ্র দেরিতে নামে
তখন তাদের নাচন থামে।
অতএব কোন চিন্তা নেই
লড়াই থামে না পলায়নেই।
দুধে-ভাতে নেতা আছেন বহু
তাঁদের চরণে প্রণাম রহু।
আঁক ক'ষে তারা দেখান ভয়
মেনে নিতে হবে এ পরাজয়।
জীবন-মরণ-সন্ধিক্ষণে
কত কথা আজ পড়ে যে মনে ।
বাংলায় আর নেই কি কেউ
লাগামে ফেরাবে প্রলয় ঢেউ?
সে তরঙ্গের ধরিয়া ঝুঁটি
ঝঞ্ঝর সাথে চলিবে ছুটি?
না থাকে থাক্, কিসে ভয়?
হবে হবে হবে মোদেরি জয়।
আবার আমরা ফিরব দেশ,
হব না হব না নিরুদ্দেশ।
ঝুলির ভিক্ষা ঝুলিতে থাক্
পেয়েছি সত্য ক্ষুধার ডাক।
পশ্চিম পারে না পেয়ে খেতে
পূবে ফিরে যাব ক্ষুধায় তেতে।
তখন মোদের রুখবে কে?
দোর দেবে ঘরে ভাব দেখে।
ম্যয় ভুখা হুঁ --- ক্ষুধার ঝণ্ডা
তুলে বুঝে নেব আপন গণ্ডা।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
সাদা ও কালো কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (২৬.৬.১৮৮৭ - ১৭.৯.১৯৫৪)
১৯৪৫ সালে প্রকাশিত কবির “যতীন্দ্রনাথ-কাব্যসম্ভার” কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া। ১৯২৭ সালে
প্রকাশিত কবির “মরুশিখা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
. মনে বুঝে দেখ ঠিক------
কালোয় করিবে সাদার পূজা যে এ তো খুবই স্বাভাবিক।
সৃষ্টির মূল,----অসীম কালোর সাদা হইবার আশা ;
অন্ধকারের মূক কালো মুখে ফুটাতে আলোর ভাষা।
শ্যামল বনের মনের কামনা সাদা ফুলে ফুলে দোলে,
আঁধার মায়ের বুকের বাসনা-----সাদা চাঁদ পেতে কোলে।
তড়িৎ-কামনা চমকে নিয়ত কালো জলদের চিতে ;
কালো যে কেবল সাদা হতে চায়---- এ প্রমাণ চারিভিতে।
. ঠিক ভেবে দেখ ভাই,-----
নিজের চামড়া যেমনই হউক জুড়িটিরে সাদা চাই।
অপর পক্ষে শৈশব হতদে চেষ্টার নাই ত্রুটি-----
কালিদাসীদেরও যাহে জনে জনে সাদা সিব যায় জুটি।
কৃষ্ণ জীবের দেব দেবী শ্বেত, দেবতার দেবও সাদা ;
কালোর শ্রেষ্ঠ স্বয়ং কৃষ্ণ ভজিয়াছিলেন রাধা।
কাব্যে জীবনে যে দিকে চাহিবে----সাদাই শ্রেষ্ঠ ভাই ;
কালো চায় সাদা, সাদা চায় সাদা, কালোর কেহই নাই।
কালো চিরদিন মাখে পাউডার, সাদা কবে ভুষো মাখে?
কালো কত ছলে শুধু সাদা চায়, সাদা ত চায় না তাকে।
. যদি বা কখনো চায়,------
নিজের সাদামি ফুটাতে,---- সোনার নিকষ-প্রীতির প্রায়।
. তাই আঁখি-তারা কালো,-----
বিশ্বসুদ্ধ হরেক সাদার কষ্ ধরে যাতে ভালো।
নিজে ভগবান শুধিতে সরযূ-যমুনা-তটের ত্রুটি,----
গঙ্গার তীরে উঠিলেন ফিরে গৌর-রূপেতে ফুটি।
. জীবের জীবন প্রাতে,
অস্থি-মজ্জা-গত হল সাদা মাতৃ-দুগ্ধ-সাথে।
সাদা কালো শুধু উপরে তফাৎ এ কথা বিষম ভুল।
খুঁড়িলে দেখিবে, গভীর, কালোর সাদাপ্রিয়তার মূল।
তাই বুঝিয়াছে প্রাণ,-----
ছলনা মাত্র, ----- শ্বেত-বিরুদ্ধে কৃষ্ণের অভিযান।
মন যারে মানে রম্য কাম্য, তার ‘পরে সাজে রাগ?
সাদা যদি হাসে, কালোর সাধ্য মনে রাখে কোন দাগ?
কালো জন্মেছে ভালোবাসিবারে, সে তার কপালরেখা।
সুন্দর হেরে মজিবে যে কালো, জন্মান্তরে শেখা।
সাদা যদি বাঁকে, কালোর পক্ষে হয় চিরসাধাসাধি,
নহে,----অভিমানে অসহযোগেতে ঘোর অহিংবাদী।
শ্বেতপ্রীতি ছাড়ি কালোর পীরিতি, সে রীতি কঠিন ভারি ;
তুমি আমি কেন ? স্বামীজি বাবাজী নন তাহে অধিকারী।
সে প্রেম বারেক ফুটিল ভাদর-বাদরে বৃন্দাবনে ;
সে সাধনে মিলে ক্কচিৎ সিদ্ধি শ্মশানের শবাসনে।
সে কাল কালোর পীরিতিপাথারে না ডুবিল য়দি প্রাণ,---
কালো ভালবাসি বলিয়া কোরো না সত্যের অপমান।
পেট ও মাটি
কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (২৬.৬.১৮৮৭ - ১৭.৯.১৯৫৪)
রচনা অগ্রহায়ণ ১৩৬০। ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত কবির “নিশান্তিকা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এখন বুঝেছি ভাই,---
পেট ছাড়া আর পূজা করিবার
দুনিয়ায় কিছু নাই।
আপাদ-মস্ত সাড়ে-ত্রিহস্ত,
তারি মাঝে রাজে পেট,
তারি নির্দেশে দেশে ও বিদেশে
বারবার মাথা হেঁট।
আঁধার অতীতে ঋক্বেদীয়ারা
তারি ধান্দায় হ'ল ঘরছাড়া,
হ’য়ে মুরুপার গিরি কান্তার
ভাঙে ‘খাইবার’ গেট্।
বুদ্ধ শুদ্ধ,---পেয়ে বোধিমূলে
পরমান্নের প্লেট্।
তারি টানে ঢেঁকি চ’ড়ে
নারদ আকাশে ওড়ে,
ধান ভেনে ভেনে সারা ত্রিভুবনে
যত ঢেঁশকেল ঢোঁড়ে।
সত্য ছ্বাপর ত্রেতা
যা কিছু ঘটিল যেথা
একটু ভাবিলে পষ্ট হইবে
পেটই ছিল তার নেতা।
যত সিঁদূর তা গণেশের পেটে
তিন যুগই লেপা হয়,
গলিতে গলিতে ঘটিছে কলিতে
তারি পুনরভিনয়।
যা কিছু রকম-ফের---
সে শুধু বিধাতা উলটিয়া পাতা
টানিছে নূতন জের।
পেটের খোরাক ঠিক পেতে হ'লে
চিরকাল চাষা চাই ;
পেটের সুবাদে মানুষে মানুষে
সবই চাষতুতো ভাই।
তাই চারিদিকে চাষ ও চাষার
ঘন ঘন জয়রব,
তাই সংগ্রাম, তাই প্রস্তুতি,
তাই যত বিপ্লব।
বাদাড়ের বাঘ পাঁদারে কহিছে
শোন গো বিড়াল মাসি,
যে মাটি যেখানে আঁচড়াও তুমি
সে মাটি তোমারি দাসী।
ওরা সব কারা দেয় হাতনাড়া,
কি ওদের অধিকার?
যে যেখানে চষে খুঁটি গেড়ে বসে
সে জমিন খাস তার।
হ’য়ে একজোট দাসীটারে সব
ভাগাভাগি করে নাও,
সহজে সে যদি না ভরায় পেট
নাড়ি ভুঁড়ি ছিঁড়ে থাও।
টিক্ টিক্ টিক্ যত টিকটিকি
বলে ঠিক ঠিক ঠিক,
চোখ গেল চোখ গেল রব তুলে
চ্যাঁচায় চতুর্দিক।
শুধু, চার যুগ মড়ার মতন
বোবা মাটি আছে প’ড়ে,
যে যেমন খুশি চষে চোষে শোষে
কাটে ঘাঁটে ফাড়ে ফোঁড়ে।
সর্বহরণ এ উৎপীড়ন
হবে না সহনাতীত?
সব জীবনের উৎস হ’য়েও
সত্যই সে কি মৃত?
মুড়ির দস্তে মান্য চাহে যে
প্রতি পেট হবে ভুঁড়ি,
তারি যোগান কি দেবে চিরকাল
হাবা কালা এই বুড়ি?
কোন দিন সে কি স্রষ্টার কাছে
দাঁড়াবে না জুড়ি' কর---
“আর কত কাল বহিব ঠাকুর
মানব-দানব-ভর?”
ঃঃঃঃঃঃঃঃ
দেশোদ্ধার
কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (২৬.৬.১৮৮৭ - ১৭.৯.১৯৫৪)। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত কবির “যতীন্দ্রনাথ-
কাব্যসম্ভার” কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত কবির “মরুশিখা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
. বার বার তিনবার,---
এবার বুঝেছি চাষা ছাড়া কভু হবে না দেশোদ্ধার।
. শোনরে শ্রমিক শোন্ ভাই চাষা,
. আমাদের বুকে যত ভালবাসা
ঢালিব বিলাব তোদের দুয়ারে অকাতরে অনিবার।
. তোদের দুঃখে হায়,---
পাষাণ হ'লেও চক্ষের বলে বক্ষ ভাসিয়া যায়।
. কোরোনাকো ভাই হীন আশঙ্কা,
. এবার নয়নে ঘষিনি লঙ্কা ;
সত্য সত্য ত্রিসত্য করি হৃদয় তোদেরই চায়।
. ওরে চিরপরাধীন!
তোরা না জানিস মোরা জানি তোর কি কষ্টে কাটে দিন।
. নানা পুঁথি পড়ে’ পেয়েছি প্রমাণ
. তোরাই দেশের তের আনা প্রাণ ;
বৎসরে হায় বিশ টাকা আয়, তবু তোরা ভাষাহীন।
. তোরাই যে ভাই দেশ,
তোদের দৈন্য-জন্য মায়ের কঙ্কাল অবশেষ।
. মহার্ঘ্য হ'লে বেগুন পালঙ্
. যদিও ভিতরে চটে’ হই টং,
তবু তোর সেবা দেশেরই যে সেবা মন মনে বুঝি বেশ।
. ওরে নাবালক চাষা!
আমরা তোদের ভাঙ্গাব নিদ্রা মূক মুখে দিব ভাষা।
. শ্রমিক চাষীর দুঃখে ফর্দ্দ
. রচিতে ছুটিব লিলুয়া খড়দ।
গড়িয়া আইন ভাঙি বে-আইন জাগাইব নব আশা।
. ওরে ওঠ, ওঠ, জেগে,---
তরুণ অরুণ আলোকে জানা ও অজানা ব্যথায় লেগে!
. সবলে স্কন্ধে তুলে নিয়ে হল,
. পাঁচনে খেদায়ে বলদের দল,
প্রভাতের মাঠে কলকোলাহলে দল বেঁধে চল্ বেগে।
. জুড়ে দে লাঙ্গল ক'সে ;---
ফালেহ আগায় যত উচু নীচু সমভূম্ কর চষে’
. মাথা উচু করে’ আছে ঢ্যালাগুলো,
. মইএর চাপনে ক'রে দে’রে ধুলো ;
কাঁটার বংশ করুরে ধ্বংস জোএ জোএ বিদে ঘষে'।
. ফসল হবেই হবে!
আকাশ হইতে না নামে বৃষ্টি, পাতাল ফুঁড়িবি তবে।
. আপনার হাতে বুনেছিস্ যা'কে,
. টেনে তুলে' বলে রু'য়ে দিবি পাঁকে ;
বাজিবে মাদল ঝরিবে বাদল বর্ষার উৎসবে।
সেই দুর্য্যোগ-উৎসব যবে ঘনাইবে চারিধার,
মেখে ঝড়ে জলে বজ্রে বাদলে রচিয়া অন্ধকার ;---
. সরে’ পড়ি যদি ক্ষমা কোরো দাদা !
. খাঁটি চাষা ছাড়া কে মাখিবে কাদা?
মনে কোরো ভাই মোরা চাষা নই,---চাষার ব্যারিস্টার!
দুখবাদী
কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (২৬.৬.১৮৮৭ - ১৭.৯.১৯৫৪)। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত কবির “যতীন্দ্রনাথ-
কাব্যসম্ভার” কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত কবির “মরুশিখা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
তারই 'পরে তব কোপ গো বন্ধু, তারই 'পরে তব কোপ,
যে-জন কিছুতে গিলিতে চায় না এই প্রকৃতির টোপ।
সুনীল আকাশ, স্নিগ্ধ বাতাস, বিমল নদীর জল,
গাছে গাছে ফুল, ফুলে ফুলে অলি, সুন্দর ধরাতল !
ছবি ও ছন্দে তোমারি দালালি করিছে স্বভাব কবি,
সমসুন্দর দেখে তারা গিরি সিন্ধু সাহারা গোবি।
তেলে সিন্দুরে এ সৌন্দর্যে "ভবি" ভুলিবার নয় ;
সুখ দুন্দুভি ছাপায়ে বন্ধু ওঠে দুঃখেরি জয়।
. অতল দুঃখ-সিন্ধু
হাল্কা সুখের তরঙ্গ তাহে নাচিয়া ভাঙিছে ইন্দু।
তাই দেখে যারা হয় মাতোয়ারা তীরে ব'সে গাহে গান
হয় গো বন্ধু তোমার সভায় তাহাদেরি বহু মান।
দিগন্তপারে তরঙ্গ-আড়ে যারা হাবুডুবু খায়,
তাদের বেদনা ঢাকে কি বন্ধু, তরঙ্গ-সুষমায় ?
. বজ্রে যে জনা মরে,
নবঘন-শ্যাম-শোভার তারিফ সে-বংশে কে বা করে ?
. ঝড়ে যার কুঁড়ে উড়ে, ---
মলয়-ভক্ত হয় যদি, বলো কী বলিব সেই মূঢ়ে।
ফাল্গুনে হেরি' নব কিশলয় যারা আনন্দে ভাসে,
শীতে-শীতে ঝরা জীর্ণ পাতার কাহিনী না মনে আসে,
ফল দেখে যার নাহি কাঁদে প্রাণ ঝরা ফুলদল লাগি,
তারা সভাকবি, আমরা বন্ধু, সুখবাদী বৈরাগী।
এই বিশ্বের ব্যবসার লাভ বন্ধু তুমি তো জানো
একা ব'সে যবে রাতের খাতায় দুঃখের জের টানো॥
জমাখরচের কৈফ্যত্ কেটে বাকি যে ফাজিল কত,
বাহির বিজ্ঞাপনে যাই বলো, --- অন্তরে বুঝেছ তো !
বজায় থাকিতে খ্যাতি, ---
সহসা জ্বালাবে কোন সন্ধ্যায় প্রলয়ের লাল বাতি !
সুখে মোড়া দুখে ভরা কত বড়ো রচিয়াছ কৌশল,
এ-ব্রহ্মাণ্ড ঝুলে প্রকাণেড রঙিন মাকাল ফল।
সৌন্দর্যের পূজারী হইয়া জীবন কাটায় যারা,
সত্যের শাঁস কালো ব'লে খাসা রাঙা খোসা চোষে তারা॥
বাহিরের এই প্রকৃতির কাছে মানুষ শিখিবে কিবা ?
মায়াবিনী নরে বিপথযাত্রী করিছে রাত্রিদিবা।
চটক বা চখা কি জানে প্রেমের? বকে কি শেখাবে ধর্ম?
সহজস্বাধীন হিংস্র শ্বাপদ বুঝাবে জীবন মর্ম !
তরণ্য-করু জপিছে অন্ধ ঠেলাঠেলি অবিরাম,
কুসুম অলির অবাধ প্রণয়, উভয়ত কি আরাম !
বজ্র লুকায়ে রাঙা মেঘ হাসে পশ্চিমে আনমনা ---
রাঙা সন্ধ্যার বারান্দা ধ'রে রঙিন বারাঙ্গনা !
খাদ্যে-খাদকে বাদ্যে-বাদকে প্রকৃতির ঐশ্বর্য,
ষড়-ঋতু ছলে ষড়-রিপু খেলে কাম হ'তে মাত্সর্য।
ছলে-বলে-কলে দুর্বলে হেথা প্রবল অত্যাচার ;
এ যদি বন্ধু হয় তব ছায়া, কায়া তো চমত্কার !
. শুনহ মানুষ ভাই !
সবার উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠ, শ্রষ্টা আছে বা নাই।
যদিও তোমারে ঘেরিয়া রয়েছে মৃত্যুর মহারাত্রি,
সৃষ্টির মাঝে তুমিই সৃষ্টিছাড়া দুখ-পথ যাত্রী।
তোমাদেরি মাঝে আসে মাঝে-মাঝে রাজার দুলাল ছেলে,
পরের দুঃখে কেঁদে-কেঁদে যায় শত সুখ পায়ে ঠেলে।
কবি-আরাধ্য প্রকৃতির মাঝে কাথা আছে এর জুড়ি ?
অবিচারে মেঘ ঢালে জল, তাও সমুদ্র হ'তে চুরি !
সৃষ্টির সুখে মহাখুশী যারা তারা নর নহে, জড় ;
যারা চিরদিন কেঁদে কাটাইল তারাই শ্রেষ্ঠতর।
মিথ্যা প্রকৃতি, মিছে আনন্দ, মিথ্যা রঙিন সুখ ;
সত্য সত্য সহস্র গুণ সত্য জীবের দুখ !
সত্য দুখের আগুনে, বন্ধু, পরাণ জখন জ্বলে,
তোমার হাতের সুখ-দুখ-দান ফিরায়ে দিলেও চলে।
দরিদ্র নারায়ণ
কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (২৬.৬.১৮৮৭ - ১৭.৯.১৯৫৪)
সদনীকান্ত দাস সম্পাদিত “শনিবারের চিঠি” পত্রিকার বৈশাখ ১৩৫৭ (অগাস্ট ১৯৫০) সংখ্যায় প্রকাশিত।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
দেখে এনু প্ল্যাটফরমে-ফরমে
গড়ায় গড়ায় নারায়ণ।
ওপার হইতে তাড়ায়ন পেয়ে
এপারে আত্ম-ভাঁড়ায়ন।
আহা, যত নর হ'ল নারায়ণ।
শঙ্খ চক্র গদা ও পদ্ম
ছাড়ি কাষ্টম্-ক্ষেত্রে
অশ্রুমোচন কমললোচন
চাহে হরিতকী-নেত্রে।
ছোলা কলা হাতে সেবকবৃন্দ
ডাকিছে, তোরা কে যাবি আয়,
চেউয়ে ঢেউয়ে এসে গাঁদি লেগে ভেসে
নারায়ণ আজ খাবি খায়।
এবার সেবার সুবর্ণযোগ,
ধ্বনিত দিগ্ দিগন্ত,
দ্রাবিড় বেলুড় মাড়োয়ার হ'তে
ছুটিছে পুণ্যবন্ত।
যে যেমন পায় কুড়িয়ে নে যায়,
পতিতোদ্ধার-পরায়ণ ; ---
বাংলায় আর নর মেলা ভার,
যা আছে সেরেফ্ নারায়ণ।
নারায়ণে তুলে নিয়েছে পিঠে,
ত্রিশূল উঁচিয়ে খুঁচিয়ে কুচিয়ে
ছড়াবে নব একান্ন পীঠে।
তীর্থে তীর্থে পাঁজরা কণ্ঠ
দাপ্ না টেংরি সকলি পাবে,
প্রাণের চিহ্ন কোথাও পাবে না
কন্যাকুমারী আপঞ্জাবে।
হায় হায় হায় শুধাব কাহায়,---
পদ্মার জল ছিল না কি রে?
কোন্ মরীচিকা মিটাতে দিল না
মৃত্যুপিপাসা সে স্বাদু নীরে?
বারনারী
কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (২৬.৬.১৮৮৭ - ১৭.৯.১৯৫৪)। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত কবির “যতীন্দ্রনাথ-
কাব্যসম্ভার” কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত কবির “মরীচিকা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ধরণী তোমার প্রমোদ-প্রবাস
বাঁধনিক হেথা ঘর ;
বিশ্বশুদ্ধ বুকে টেনে, বল
সবাই আমার পর।
নিষ্কলঙ্ক-নিকষ হৃদয়
প্রেমলেখা-রেখাহীন ;
রূপের গরব ভেঙেছো করিয়া
রূপা হ'তে তারে দীন।
অজেয় অতনু-ফুলধনু টানি'
এসেছিল তব পাশ,
রুষিয়া ভষ্ম করনি, আজ সে
দ্বারে বাঁধা ক্রীতদাস।
মায়ার অতীত অয়ি মায়াবিনী,
কতই না রূপ ধর ;
যৌবনখানি বসনের মত
খুলে' রাখ, তুলে' পর।
কার কল্যাণে করে কঙ্কন,
সিন্দুর সিঁথা 'পরে ;
অমর কাহারে বরিয়া লয়েছ'
বিশ্ব-স্বয়ম্বরে !
ধরণীর বুকে চরণ আঘাতি'
নাচ যবে নানা ছাঁদে,
পা' দুটি জড়ায়ে মায়া মমতায়
নূপুর বৃথাই কাঁদে।
ফুলধুলি-মাখা অয়ি ভৈরবি,
কোথা তব বাসভূমি?
প্রেমে নেমে এল মন্দাকিনী যে,
তাহারো উর্দ্ধে তুমি।
হে বহ্নি ! ওই লালসা লইয়া
পুড়ে পতঙ্গদল ;
সমিধ্ যোগালে জ্বলিত তোমাতে
ঊজ্জ্বল হোমানল !
স্নেহ-প্রেমাতীতা হে নির্লিপ্তা,
নাহি তব সুখ-দুখ ;
পুণ্য তোমারে করে না লুব্ ধ,
পাপে নাহি কাঁপে বুক !
নহ মা ঘৃণ্য কৃপার পাত্র,
আজ যে বুঝেছি খাঁটি---
মায়ের পূজায় কেন লাগে তোর
চরণে দলিত মাটি !
লোহার ব্যথা
কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (২৬.৬.১৮৮৭ - ১৭.৯.১৯৫৪)। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত কবির “যতীন্দ্রনাথ-
কাব্যসম্ভার” কাব্যসংকলন থেকে নেওয়া। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত কবির “মরুশিখা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
. ও ভাই কর্মকার,---
আমারে পুড়িয়ে পিটানো ছাড়া কি নাহিক কর্ম আর?
কোন্ ভোরে সেই ধরেছ হাতুড়ি, রাত্রি গভীর হল,
ঝিল্লীমুখর স্তব্ধ পল্লী, তোল গো যন্ত্র তোল
ঠকা ঠাঁই ঠাঁই কাঁদিছে নেহাই, আগুন ঢুলিছে ঘুমে,
শ্রান্ত সাঁড়াশি ক্লান্ত ওষ্ঠে আল্ গোছে ছেনি চুমে।
দেখগো হোথায় হাপর হাঁপায়, হাতুড়ি মাগিছে ছুটি ;
ক্লান্ত নিখিল, করগো শিথিল তোমার বজ্রমুঠি।
রাত্রি দু’পরে মনে নাহি পড়ে কি ছিলাম আমি ভোরে,
ভাঙিলে গড়িলে সিধা বাঁকা গোল লম্বা চৌকা করে ;
কভু আতপ্ত, কভু লাল, কভু উজ্জ্বল রবিসম,
কভু বা সলিলে করিলে শীতল অসহ্য দাহ মম।
অজানা দুজনে গলায়ে আগুনে জুড়িয়া মিটালে সাধ,
ধড় হতে কভু বাহুল্যবোধে মাথা কেটে দিলে বাদ।
ঘন ঘন ঘন পরিবর্তনে আপনা চিনিতে নারি,
স্থির হয়ে যাই ভাবিবারে চাই, পড়ে হাতুড়ির বাড়ি।
আগুনের তাপে সাঁড়াশির চাপে আমি চির নিরুপায়,
তবু সগর্বে ভুলিনি ফিরাতে প্রতি হাতুড়ির ঘায়।
যাহা অন্যায়, হোক না প্রবল, করিয়াছি প্রতিবাদ ;
আমার বুকের কোমল অংশ, কে বলিল তারে খাদ?
তোমার হস্তে ইস্পাত হয়ে সহি শান, পান, পোড়,
রামের শত্রু শ্যামে কাটি যদি, তাহে কিবা সুখ মোর?
তোমার হাতের যন্ত্র যাহারা দিন রাত মরে খেটে,
না বুঝে চাতুরি নেহাই হাতুড়ি ভাই হয়ে ভাই-এর পেটে !
. ও ভাই কর্মকার !
রাত্রি সাক্ষী, তোমার উপরে দিলাম ধর্মভার,----
কহ গো বন্ধু কহ কানে কানে, আপনার প্রাণে বুঝি,
আমি না থাকিলে মারা যেত কিনা তোমার দিনের রুজি?
তুমি না থাকিলে আমার বন্ধু কিবা হত তাহে ক্ষতি?
কৃতজ্ঞতা কি পাঠাইছ তাই হাতুড়ির মারফতি।
কি কহিছ ভাই, আমি হব তুমি এই প্রেম সহি যদি?
পিটনের গুণে লোহা কবে হায় পায় কামারের গদি !
শিবঠাকুরের আপন দেশে,
আইন কানুন সর্বনেশে!
কেউ যদি যায় পিছলে প’ড়ে,
প্যায়দা এসে পাকড়ে ধরে,
কাজির কাছে হয় বিচার---
. একুশ টাকা দণ্ড তার॥
সেথায় সন্ধ্যে ছ’টার আগে,
হাঁচতে হ'লে টিকিট লাগে---
হাঁচলে পরে বিন্ টিকিটে---
দমদমাদম লাগায় পিঠে,
কোটাল এসে নস্যি ঝাড়ে---
. একুশ দফা হাঁচিয়ে মারে॥
কারুর যদি দাঁতটি নড়ে,
চারটি টাকা মাশুল ধরে,
কারুর যদি গোঁফ গজায়,
এদশো আনা ট্যাক্স চায়,---
খুঁচিয়ে পিঠে গুঁজিয়ে ঘাড়,
. সেলাম ঠোকায় একুশ বার॥
চলতে গিয়ে কেউ যদি চায়,
এদিক্ ওদিক্ ডাইনে বায়,
রাজার কাছে খবর ছোটে,
পল্টনেরা লাফিয়ে ওঠে,
দুপুর রোদে ঘামিয়ে তায়,
. একুশ হাতা জল গেলায়॥
যে সব লোকে পদ্য লেখে,
তাদের ধ'রে খাঁচায় রেখে,
কানের কাছে নানান সুরে,
নামতা শোনায় একশো উড়ে,
সামনে রেখে মুদির খাতা,
. হিসেব কষায় একুশ পাতা॥
হঠাৎ সেথায় রাত দুপুরে,
নাক ডাকালে ঘুমের ঘোরে,
অমনি তেড়ে মাথায় ঘষে
গোবর গুলে বেলের কষে,
একুশটি পাক ঘুরিয়ে তাকে,
. একুশ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখে॥
একুশে আইন
কবি সুকুমার রায় (৩০.১০.১৮৮৭ - ১০.৯.১৯২৩)
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
লর্জ কার্জন অতি দুর্জন বঙ্গগগন শনি
কূট নিঠুর চক্রী চতুর উগ্র গরল ফণী।...
লর্জ কার্জন অতি দুর্জন
কবি সুকুমার রায় (৩০.১০.১৮৮৭ - ১০.৯.১৯২৩)
সুকুমার রায়ের "কয়েকটি কবিতার" একটি কবিতা। কবির বঙ্গভঙ্গ বিরোধী কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ও পাড়ার নন্দ গোঁসাই, আমাদের নন্দ খুড়ো,
স্বভাবেতে সরল সোজা অমায়িক শান্ত বুড়ো।
ছিল না তার অসুখবিসুখ, ছিল যে সে মনের সুখে,
দেখা যেত সদাই তারে হুঁকোহাতে হাস্যমুখে।
হঠাৎ কি তার খেয়াল হল, চল্ল সে তার হাত দেখাতে-
ফিরে এল শুকনো সরু, ঠকাঠক্ কাঁপছে দাঁতে!
শুধালে সে কয় না কথা, আকাশেতে রয় সে চেয়ে,
মাঝে মাঝে শিউরে ওঠে, পড়ে জল চক্ষু বেয়ে।
শুনে লোক দৌড়ে এল, ছুটে এলেন বদ্যিমশাই,
সবাই বলে, 'কাঁদছ কেন? কি হয়েছে নন্দগোঁসাই?'
খুড়ো বলে, 'বলব কি আর, হাতে আমার পষ্ট লেখা
আমার ঘাড়ে আছেন শনি, ফাঁড়ায় ভরা আয়ুর রেখা।
এতদিন যায় নি জানা ফিরছি কত গ্রহের ফেরে-
হঠাৎ আমার প্রাণটা গেলে তখন আমায় রাখবে কে রে?
ষাটটা বছর পার হয়েছি বাপদাদাদের পুণ্যফলে-
ওরে তোদের নন্দখুড়ো এবার বুঝি পটোল তোলে।
কবে যে কি ঘটবে বিপদ কিছু হায় যায় না বলা-'
এই ব'লে সে উঠল কেঁদে ছেড়ে ভীষণ উচ্চ গলা।
দেখে এলাম আজ সকালে গিয়ে ওদের পাড়ার মুখো,
বুড়ো আছে নেই কো হাসি, হাতে তার নেই কো হুঁকো।
হাত গণনা
কবি সুকুমার রায় (৩০.১০.১৮৮৭ - ১০.৯.১৯২৩)
সুকুমার রায়ের জ্যোতিষবিরোধী কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই চড়ি সখের বোটে
মাঝিরে কন, “বলতে পারিস্ সূর্যি কেন ওঠে?
চাঁদটা কেন বাড়ে কমে? জোয়ার কেন আসে?”
বৃদ্ধ মাঝি অবাক হয়ে ফ্যালফেলিয়ে হাসে।
বাবু বলেন, “সারা জীবন মরলি রে তুই খাটি,
জ্ঞান বিনা তোর জীবনটা যে চারি আনাই মাটি!”
খানিক বাদে কহেন বাবু “বলতো দেখি ভেবে
নদীর ধারা কেমনে আসে পাহাড় হতে নেবে?
বলত কেন লবণপোরা সাগরভরা পানি?”
মাঝি সে কয়, “আরে মশাই, অত কি আর জানি?”
বাবু বলেন, “এই বয়সে জানিসনেও তাকি?
জীবনটা তোর নেহাৎ খেলো, অষ্ট আনাই ফাঁকি।”
জীবনের হিসাব
কবি সুকুমার রায় (৩০.১০.১৮৮৭ - ১০.৯.১৯২৩)। অতি বুদ্ধিজীবীদের প্রতি কটাক্ষ।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আবার ভেবে কহেন বাবু “বলতো ওরে বুড়ো,
কেন এমন নীল দেখা যায় আকাশের ঐ চুড়ো?
বলতো দেখি সূর্য চাঁদে গ্রহণ লাগে কেন?”
বৃদ্ধ বলে, “আমায় কেন লজ্জা দেথেন বাবু?”
বাবু বলেন, “বলব কি আর, বলব তোরে কি তা,---
দেখছি এখন জীবনটা তোর বারো আনাই বৃথা।”
খানিক বাদে ঝড় উঠেছে, ঢেউ উঠেছে ফুলে,
বাবু দেখেন নৌকাখানি ডুবলো বুঝি দুলে।
মাঝিরে কন, “একি আপদ! ওরে ও ভাই মাঝি,
ডুবল নাকি নৌকো এবার? মরব নাকি আজি?”
মাঝি শুধায়, “সাঁতার জানো?” মাথা নাড়েন বাবু,
মুর্খ মাঝি বলে, “মশাই, এখন কেন কাবু?
বাঁচলে শেষে আমার কথা হিসেব করো পিছে,
তোমার দেখি জীবনখানা ষোল আনাই মিছে।”
সাবধান! সাবধান!
আসিছে নামিয়া ন্যায়ের দণ্ড,
রুদ্র দৃপ্ত মূর্তিমান॥
ঐ শোন তাঁর গরজে কম্বু অম্বুধি যথা উচ্ছলে,
প্রলয় ঝঞ্ঝা ইরম্মদে মৃত্যু ভীষণ কল্লোলে।
হুঙ্কার শুনি গভীর মন্দ্র,
কাঁপিছে তারকা সূর্য চন্দ্র,
বিদরে আকাশ স্তব্ধ বাতাস---
শিহরি উঠিছে জগৎ প্রাণ॥
ভ্রুকুটি কুটিল রক্ত নেত্রে চিত্র ভানু উজ্জ্বলে,
উঠিছে কিরীটি গরিমা দীপ্ত ভেদিয়া সূর্য মণ্ডলে।
অগণিত করে ঝলছে কৃপাণ তপ্ত রক্ত করিতে পান ;
বলদর্পির চরণাঘাতে---
ত্রিভুবন ভীত কম্পমান॥
ত্রিভূবন জুড়ি বিরাট দেহ,
ভেবেছ কি আর পলাইবে কেহ,
এথনো চরণে শরণ লহ---
নতুবা নাহি রে পরিত্রাণ॥
কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
|
সাবধান! সাবধান! কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৯৮৮ - ১৯৩১)। সুর - চারণকবি মুকুন্দদাস। শিল্পী - সবিতাব্রত দত্ত।
কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং চারণকবি মুকুন্দদাস দুজনেই মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্তর স্নেহভাজন ছিলেন এবং সেই সূত্রে
বন্ধুস্থানীয় ছিলেন। ডঃ জয়গুরু গোস্বামী সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস” (১৯৭২) গ্রন্থ থেকে গানটি নেওয়া হয়েছে। ভিডিওটি
সৌজন্যে Sabitabrata Dutta - Topic YouTube Channel.
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই গানটি সম্বন্ধে ডঃ জয়গুরু গোস্বামী তাঁর সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস” (১৯৭২)
গ্রন্থের ৩০১-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . . “এই গানটির রচয়িতা কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায়।
সুরকার ও যাত্রা-গীতিকার চারণ-কবি মুকুন্দদাস। কিন্তু গানটি মুকুন্দদাসের নামে
চলিয়া আসিতেছে। মুকুন্দপুত্র শ্রীকালীপদ দাস মহাশয় তাঁহার সংগৃহীত “চারণ-কবি
মুকুন্দদাসের গীতাবলী” গ্রন্থে এহ গানটি মুকুন্দদাসের গান বলিয়া চিহ্নিত করিয়াছেন
(গীতসংখ্যা - ৩৩, পৃষ্ঠা - ২৫-২৬, ১ম সংস্করণ ১৩৬৩) . . . . . . . কিন্তু কার্যতঃ এই
গানটি “কবিরত্ন” হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের। ভণিতায় কাহারও নাম না থাকায় এবং বহু
যাত্রা-আসরে মুকুন্দদাস কর্তৃক নাটকীয় ভঙ্গীতে কম্বুকণ্ঠে গীত হওয়ায়
হেমকবি নেপথ্যে চলিয়া গিয়াছেন। হেমকবি দাদাঠাকুর নামে একখানি বই লিখিয়া
মুকুন্দদাসকে দেন যাহার ভিতরে “সাবধান! সাবধান!” প্রভৃতি গান রহিয়াছে। মুকুন্দদাস
বইটির কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করিয়া, নিজের লেখা কিছু গান তাহাতে যুক্ত
করিয়া “দাদাঠাকুর” নামের পরিবর্তে “আদর্শ” নাম দিয়া সমাজে প্রচার
করিয়া বইখানিকে জনপ্রয় করিয়া তোলেন।”
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আমার প্রাণ ও হৃদয় সত্তার মাঝে আছে কে এক কবি, অতি
বালক কাল থেকে যার খেলাই নানা ঘোরাল রসাল স্বপ্ন নিয়ে।
খুব ছোট বেলা ১৪।১৫ বছর বয়সেও আমার মনে আছে প্রাণের
মাঝে জাগতো একটা প্রবল বেগ, একটা আকুল ঊর্দ্ধ দৃষ্টি, বড়
কিছু হবার অদম্য স্পৃহা। দিন যেন আমার বৃথা বয়ে যাচ্ছে,
কি যেন একটা বৃহৎ ও সার্থক আয়োজন করতে হবে, এক দিনের
বা পাঁচ দিনের বিলম্বে যার বিমল শুভ্র সৌধ নীল আকাশ ছুঁয়ে
বুঝি আর উঠবে না। এই চঞ্চল উচ্চাকাঙ্খার বেগে আমি
আমার চার পাশের মানুষকে চিরদিন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছি ;
আমি চলেছি আপন স্বপ্নে নিজের বেগে আর তারা আমাকে
ঘিরে জটলা করে চলেছে আমার তাড়ায়। তাদের মধ্যে হয়তো
সবাই চায় নি কিছু, কিন্তু তবু আমার ডাকের টানে আমার
আশার ছোঁয়াচ লেগে তারাও না চেয়ে পারেনি।
আমার প্রাণ ও হৃদয় সত্তার মাঝে বিপ্লবী কবি বারীন্দ্রকুমার ঘোষ (৫.১.১৮৮০ - ১৮.৪.১৯৫৯)।
তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “দ্বীপান্তরের বাঁশী” থেকে আমরা কোনো কবিতা চয়ন করলাম না। এখানে তাঁর আত্মজীবনী
“আমার আত্মকথার” শেষে “পরিশিষ্ট” থেকে তিনটি অনুচ্ছেদকে তিনটি কবিতার আকারে এখানে তুলে ধরলাম।
সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা যাচ্ছে, বারীন্দ্রকুমার সেই অলিন্দ-সংলগ্ন
কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি।
তাই তাঁদের মতো মানুষের কলমের ছোঁয়া আমাদের কাছে কবিতাই !
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
. নন্দকুমারের সময় হইতে ভারত, বিদেশী
কবল বিমুক্ত হইবার চেষ্টা করিয়াছে । বিভিন্ন সময়ে তাহা প্রবলাকার
ধারণ করিয়া সমূর্ত্ত হইয়াছে। সেইজন্য আজ এই স্থলে নন্দকুমার এবং
তাঁহার সহকর্মী বঙ্গের সর্বপ্রথম শহীদ জগমোহন দত্তকে ইংরেজ কবল-
বিমুক্ত ভারতে শ্রদ্ধাঞ্জলির তর্পণ করিতেছি। তৎপর, রামমোহন
রায়ের মনোগত আকাঙ্খাও আজ সফলতা লাভ করিয়াছে বলিয়া
তাঁহাকেও শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করিতেছি। পুনঃ, প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের
নেতৃবৃন্দকে এইস্থলে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করিতেছি। আজ প্রথম
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শহীদদ্বয়---ব্যারাকপুরের মঙ্গল পাণ্ডে এবং
বেন্দাসিংকে স্মরণ করিতেছি ; আজ মনে পড়ে এই প্রচেষ্টার মস্তিষ্কস্বরূপ
আজীমুল্লা খাঁকে, মনে পডে তাঁতীয়া তোপীকে---যাঁহার রণ-চাতুর্য্য ফ্রান্স
ও জার্মাণীর প্রশংসা অর্জ্জন করিয়াছিল ; মনে পড়ে ঝাঁসীর তরুণী
লক্ষ্মীবাঈকে, যিনি বলিয়াছিলেন “মেরী ঝাঁসী নেহী দেবেঙ্গী”
মনে পড়ে অযোধ্যার হজরৎ মহলকে, যাঁহার বিষয়ে করুণ গাথা লোকে
নির্জনে গাহিত---“মহল মহলমে বেগম রোয়ে, গলি গলি রোয়ে
পাথেরিয়া”। মনে পড়ে আজ অশীতিবয়স্ক বীর কুমার সিংহকে, যাঁহার
গাথা তাঁহার দেশবাসীরা নির্জন গ্রামাঞ্চলে ভয়ে ভয়ে গাহিত---
“আগাডি চলে কুমার সিং পিছাডি অমর সিং........আঙ্গরেজ কহে
এইসি লড়াই কভি দেখা নাই” ; আর মনে পড়ে হিন্দু ও মুসলমানের
সংযুক্তভাবে সম্রাটপদে নির্বাচিত অন্ধ বাহাদুর শাহকে, যখন
স্বাধীনতা সংগ্রামের জয়াশা নির্ব্বাপিত হইতেছে তখন এই ভরসার
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শ্রদ্ধাঞ্জলী বিপ্লবী কবি ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (৪.৯.১৮৮০ - ২৫.১২.১৯৬১)। কবির “ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম,
অপ্রকাশিত রাজনীতিক ইতিহাস” গ্রন্থের, ৫ই জৈষ্ঠ ১৩৫৬ (১৯৪৯) তারিখে লিখিত ভূমিকার শেষাংশ কে আমরা এখানে তাঁর কবিতা হিসেবে তুলে ধরছি। তিনি
বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও দলের মুখপত্র যুগান্তর এর সম্পাদক ছিলেন। তিনি আলিপুর বোমা মামলায় ধরা পড়েন ও ১ বছরের সাজা হয়।
বাণী তিনি স্বদেশবাসীদের দিয়া গিয়াছিলেন :---
“গাজীওমে বু রহেগী যব তলক ইমানকি,
তব তক লণ্ডন তক চলেগী তেগ হিন্দুস্থান কি”।
( দেশ ভক্তদের মনে যতদিন দেশভক্তি দৃঢ়ীভূত থাকিবে, ততদিন
লণ্ডন পর্য্যন্ত ভারতবাসীর শক্তি ধাবিত হইবার আশা থাকিবে )।
অতঃপর মনে পড়ে পরের যুগের কর্ম্মী মারাঠা ফাডককে, শিখ গুরু
কুকা এবং চাইবাসার হো নেতা বীরশা “ভগবান”-কে। ইঁহারা
বজ্রানলে নিজেদের পাঁজর জাগাইয়া স্বজাতিদের মুক্তির জন্য আত্মাহুতি
প্রদান করিয়াছিলেন, তাঁহাদের শ্রদ্ধাজলি প্রদান করিতেছি।
. আজ আরও মনে পড়িতেছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা সময়ের শহীদদের,
যাঁহারা দেশে ও বিদেশে ১৯১৫-১৮ খৃষ্টাব্দের মধ্যে স্বীয় জীবন স্বাধীনতা
যজ্ঞে আহুতিরূপে প্রদান করিয়াছেন ; যেসব তরুণ শহীদদের অস্থিকঙ্কাল
আজ বিদেশের মরুভূমিতে শুষ্ক হইতেছে, যে সব তরুণ স্বদেশে ফাঁসিকাষ্ঠে
জীবন দান করিয়াছেন তাঁহাদের স্মরণ করিয়া আজ শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান
করিতেছি। তৎপর, ইঁহাদের পদাঙ্ক স্মরণ করিয়া যে সব তরুণ স্বদেশে
পরবর্ত্তীযুগে স্বধীনতার জন্য জীবন দান করিয়াছেন, তাঁহাদের স্মরণ করিয়া
আজ শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করিতেছি। শেষে, যেসব জ্ঞাত ও অজ্ঞাত
কর্মীরা দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মাহুতি প্রদান করিয়াছেন তাঁহাদের
উদ্দেশ্যে এইস্থলে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করিতেছি।
. হে ভারতবাসী। দলাদলি এবং পক্ষপাতের উর্দ্ধে উত্থিত হুইয়া
স্মরণ কর, এইসব শহীদরাই তিল তিল করিয়া স্বীয় পঞ্জর প্রদান করিয়া
নূতন মুক্ত-ভারতের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছেন। জয় হিন্দ্।
হয়ত চিরকালের জন্য বিদায় লইয়া যাইতেছি। বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন কাহারও সহিত দেখা
হইল না, কাহাকেও দুইটা কথা বলিয়া যাইতে পারিলাম না, কাহারও নিকট হইতে বিদায়
লইবারও সুযোগ পাইলাম না। যাইবার পূর্বে সেলের দেওয়ালে সুরকী দিয়া লিখিলাম . . .
বিদায় দে মা প্রফুল্ল মনে যাই আমি আন্দামানে,
এই প্রার্থনা করি মাগো মনে যেন রেখ সন্তানে।
আবার আসিব ভারত-জননী মাতিব সেবায়,
তোমার বন্ধন মোচনে মাগো যেন এ প্রাণ যায়।
বিদায় ভারতবাসী, বিদায় বন্ধু বান্ধবগণ,
বিদায় পুষ্প-তরুলতা, বিদায় পশু পাখীগণ।
ক্ষমো সবে যত করেছি অপরাধ জ্ঞানে অজ্ঞানে,
বিদায় দে মা প্রফুল্ল মনে যাই আমি আন্দামানে।
বিপ্লবী কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী
|
বিদায় দে মা বিপ্লবী কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, মহারাজ (৫.৫.১৮৮৯ - ৯.৮.১৯৭০)।
তিনি বরিশাল যড়যন্ত্র মামলায় আন্দামানের সেলুলার জেলে দ্বীপান্তরের সাজাপ্রাপ্ত হন। কবির
“জেলে তিরিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম” গ্রন্থের “আন্দামানে” পরিচ্ছেদে কবির
এই কবিতাটি রয়েছে ১১৮-পৃষ্ঠায়। কবিতাটি তিনি আলিপুর জেলের সেলের দেওয়ালে সুরকী
দিয়ে লিখেছেন, আন্দামানে স্থানান্তরিত হবার আগে। সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে
যে অলিন্দের ছবি দেখা যাচ্ছে, ত্রৈলোক্যনাথ সেই অলিন্দ-সংলগ্ন কোনো কালকুঠরীতে জীবনের
দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি। তাই তাঁদের
মতো মানুষের কলমের ছোঁয়াই আমাদের কাছে কবিতা! তিনি লিখেছেন . . .
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আমার জীবন সফল হয় নাই। সাধারণতঃ সফল জীবন বলিতে
লোকে যাহা মনে করে, অর্থাৎ অর্থ উপার্জন, গৃহধর্ম পালন, রাজ-
সম্মান লাভ, তাহা আমার ভাগ্যে হয় নাই বলিয়া আমি জীবন
ব্যর্থ হইয়াছে, মনে করি না? বস্তুতঃ একদিক দিয়া দেখিতে গেলে
আমার জীবন ব্যর্থ হয় নাই, আমার জীবন সফল হইয়াছে---সার্থক
হইয়াছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্য লইয়া জীবন প্রভাতে ঘরের বাহির
হইয়াছিলাম, সেই উদ্দেশ্য সার্থক ও সফল হয় নাই। আমার
যৌবনে যখন আমার ১৫ বংসর দ্বীপান্তর দণ্ড হয়, ডাণ্ডা বেড়ী পায়,
ক্ষুদ্র নির্জনকক্ষে দিন রাত্রি যখন আমি আবদ্ধ, তখনও মনে করি
নাই আমার জীবন ব্যর্থ হইয়াছে, তখনও আমার মনে এই ধারণাই
ছিল যে ১৫-বৎসর আর কত দিন, দেখিতে দেখিতে পনের বৎসর
কাটিয়া যাইবেই ; ইতিমধো যদি ভারতবর্ষ স্বাধীন না হয়, আমি
জেল হইতে বাহির হইয়া ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র
বিপ্লবের বাবস্থা করিব।
আমার স্বপ্ন সফল হয় নাই, আমি সফলকাম বিপ্লবী নই।
আমার ব্যর্থতার কারণ, আমার দুর্বলতা নয়! আমি কখনও ভীরু
ছিলাম না---আমার জীবনে কখনও দুর্ব্বলতা দেখাই নাই। আমি
আমার চরিত্র নির্মল ও পবিত্র রাখিতে সক্ষম হইয়াছি। অর্থলোভ
আমার ছিল না। এক সময় হাজার টাকা আমার হাতে আসিয়াছে,
কিন্তু সে টাকা নিজের ভোগ-বিলাসিতার জন্য ব্যয় করি নাই। সেই
সময়ও আমি রাস্তাঘাটে চলা ফিরার সময় চিড়া মুড়ি খাইয়াছি,
বিপ্লবী কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী
|
আমার জীবন সফল হয় নাই বিপ্লবী কবি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, মহারাজ (৫.৫.১৮৮৯ - ৯.৮.১৯৭০)। তিনি বরিশাল যড়যন্ত্র মামলায় আন্দামানের সেলুলার জেলে দ্বীপান্তরের
সাজাপ্রাপ্ত হন। দীর্ঘ হলেও, কবির “জেলে তিরিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম” গ্রন্থের “প্রস্তাবনা” পরিচ্ছেদটিকে কবির একটি কবিতা হিসেবে আমরা এখানে তুলে ধন্য হলাম, যাতে
কিছু পাঠক তা পড়ার সুযোগ পান। সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা যাচ্ছে, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, সেই অলিন্দ-সংলগ্ন কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ
সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি। তাই তাঁদের মতো মানুষের কলমের ছোঁওয়া আমাদের কাছে কবিতাই!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
যতটা সম্ভব পায়ে হাঁটিয়াই চলিয়াছি---গাড়ী ঘোড়া চড়ি নাই।
মৃত্যুভয় আমার ছিল না, যে কোন বিপদজনক কাজে হাত দিতে
আমি পশ্চাৎপদ হই নাই। আমার স্বাস্থ্য ভাল ছিল, আমি কখনও
অলস ছিলাম না, কঠিন পরিশ্রমের কাজে কখনও ভীত হই নাই,
যখন যে কাজ করিয়াছি, আন্তরিকতার সহিতই করিয়াছি। আমার
ব্যর্থতার কারণ পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আমার ব্যর্থতার কারণ একজন
দক্ষ ও সফলকাম বিপ্লবীর যতটা ধীশক্তি ও জন-গণ-মন অধিনায়কতার
যে ব্যক্তিত্ব থাকা আবশ্যক তাহার অভাব।
আমার পিতার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল ছিল। আমি ভাইদের
মধো ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ। আমার পড়ার খরচের কোন অভাব ছিল
না। আনি ছাত্রও খারাপ ছিলাম না---ভাল ছাত্রের মধ্যে গণ্য
ছিলাম। তথাপি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ডিগ্রী লাভ করিতে
পারি নাই। আমার শৈশবে ১৯০২/৩ সনে যখন আমি মালদহ
জিলার অন্তর্গত কাণসাটে ছিলাম এবং পুখুরিয়া মাইনর স্কুলে পড়িতাম
তখন সেখানে স্কুলের শিক্ষক মহাশয়গণ আশা করিতেন আমি বৃত্তি
পাইব। কিন্তু বৃত্তি পাওয়া আমার হয় নাই। মাইনর পরীক্ষা
দেওয়ার পূর্বেই আমাকে কাণসাট পরিত্যাগ করিয়া আসিতে হয়
এবং উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয়ে ভর্তি হই।
ময়মনসিংহ জিলার ধলা হাইস্কুলে আমি একবৎসর পড়িয়াছিলাম
এবং সেখানেও ভাল ছাত্রের মধ্যে গণ্য ছিলাম। পর বৎসর আমি
সাটিরপাড়া হাইস্কুলে ভর্তি হই এবং স্কুল-বোর্ডিং-এ থাকি। আমি
সাটিরপাড়া স্কুলে প্রথম দ্বিতীয় স্থানই অধিকার 'করিতাম।
একবার একটি ঘটনা ঘটে। আমি যখন থার্ড ক্লাস হইতে সেকেণ্ড
ক্লাসে উঠি, সেই বংসর সংস্কৃতের প্রশ্ন খুব কঠিন হইয়াছিল। সংস্কৃতে
মাত্র একজন ছাত্র পাশ করিয়াছিল। আমি কয়েক নম্বরের জন্য
ফেল করিয়াছিলাম, কিন্তু মোটের উপর দ্বিতীয় স্থান অধিকার
করিয়াছিলাম। সকল ছাত্রকেই কিছু গ্রেস্ দিয়া প্রমোশন দেওয়া
হইয়াছিল। আমি প্রমোশনের দিন উপস্থিত ছিলাম না, সমিতির
কাজে অন্যত্র ছিলাম, আমাকে প্রমোশন দেওয়া হয় নাই। আমি
বোর্ডি-এ উপস্থিত হইয়া যখন শুনিতে পাইলাম আমি প্রমোশন
পাই নাই,তখন বলিতে লাগিলাম,আমি আর পড়িব না, ঢাকা-সমিতির
বোর্ডিংএ চলিয়া যাইব এবং সমিতির কাজ করিব। আমার শিক্ষক
মহাশয়গণ আমাকে খুব স্নেহ করিতেন। আমার মন্তব্য শুনিয়া
তাহারা আমাকে ডাকাইলেন। আমি উপস্থিত হইলে, আমাদের
তৃতীয় শিক্ষক শ্রদ্ধেয় শীতল চক্রবর্তী মহাশয় আমাকে স্নেহভরে
বলিলেন---তুমি প্রমোশন নিশ্চয়ই পাইবে, কিন্ত তোমার নিকট
হইতে আমরা এই প্রতিশ্রুতি চাই,---তুমি সমিতির কাজের জন্য
যতক্ষণ সময় ব্যয় কর, পড়াশুনার জন্যও ততক্ষণ সময় দিতে হইবে---
তোমার সকালে দুই ঘণ্টা ও রাত্রে এক ঘণ্টা পড়াশুনা করিতে
হইবে। তিনি বলিলেন, দেশ যেমন তোমাকে চায়, আমরাও
তোমার দিকে চাহিয়া আছি। আমাদের স্কুল হইতে এপর্যস্ত কেহ
স্কলারশিপ পায় নাই। তুমি যদি প্রত্যহ তিন ঘণ্টা পড় তবে আমাদের
বিশ্বাস তুমি স্কলারশিপ পাইবে। আমি শিক্ষক মহাশয়দের কথায়
সম্মত হইলাম এবং আমার প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা
করিয়াছিলাম, কিন্তু স্কলারশিপ পাওয়া আমার অদৃষ্টে ছিল না।
প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার পূর্বেই ১৯০৮ সনের মধ্যভাগে
নারায়ণগঞ্জে ধৃত হই এবং আমার ছয় মাস জেল হয়। সঙ্গে সঙ্গে
পাঠ্য-জীবন শেষ হইয়া নূতন জীবন আরম্ত হয়।
কারা-জীবন হইতেই আমার নূতন জীবন আরম্ভ হয় এবং সম্ভবতঃ
কারাগারেই আমার জীবনের শেষ হইবে। আমি ভারতবর্ষের মধ্যে,
ভারতবর্ষ কেন সম্ভবতঃ পৃথিবীর মধ্যে রাজনৈতিক কারণে
সর্বাপেক্ষা অধিক বৎসর যাহারা কারাগারে কাটাইয়াছেন, তাহাদের অন্যতম
। আমি ১৯০৮ সন হইতে ১৯৪৬ সন পর্যন্ত ৩০ বৎসর কারাগারে
কাটাইয়াছি, ৪।৫ বৎসর অজ্ঞাতবাসে কাটাইয়াছি।
আমি ১৯১৬।১৭ সনে আন্দামানে বারীণবাবু, পুলিনবাবু, সাভারকর,
ভ্রাতৃদ্বয়, ভাই পরমানন্দ, জোয়ালা সিং, পৃথ্বি সিং, গুরুমুখ সিং, পণ্ডিত
পরমানন্দ, মোস্তাফা আমেদ প্রভৃতির সহিত একত্র ছিলাম। ১৯২৫।২৬ সনে
ব্রহ্মদেশের অন্তর্গত মান্দালয় জেলে নেতাজী সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে কাটাইয়াছি,
১৯৩২।৩৩ সনে মাদ্রাজ প্রদেশের অন্তর্গত বিভিন্ন জেলে কে রামন মেনন,
কর্ণাটকের সদাশিব রাও, অধ্যাপক এন, জি, রঙ্গ, মালাবার বিদ্রোহের নেতা
এম, পি, নারায়ণ মেনন প্রভৃতির সহিত একত্র ছিলাম। বাঙ্গালা দেশের ছয়টি
সেণ্ট্রাল জেলে এবং কয়েকটি ডিষ্ট্রিক্ট জেলেও ছিলাম। আমি বহু বংসর
সাধারণ কয়েদীর মত ছিলাম, দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদী ছিলাম এবং বিশেষ শ্রেণী
(Special Class) কয়েদী ছিলাম। আমি ষ্টেট-প্রিজনার ছিলাম, ডেটিনিউ ছিলাম,
সিকিউরিটি বন্দী ছিলাম এবং অন্তরীণাবদ্ধও ছিলাম। জেলখানার পেনাল
কোডে যে সব শাস্তির কথা লেখা আছে এবং যে-সব শাস্তির কথা লেখা নাই,
তাহার প্রায় সবগুলি সাজাই ভোগ করিয়াছি। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ জেলে
বেশীর ভাগ সময় অসহ্য উৎপীড়নে জীবনের ত্রিশ বৎসর আমার কাটিয়াছে,
জেলে এবং জেলের বাহিরে ষাট বৎসরকাল বিদেশী শাসনের অবসান
ঘটাইয়া কেমন করিয়া দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধন করিব তাহাই চিন্তা
করিয়াছি। আমার জীবনব্যাপী সাধনায় ও সেবায় জাতিকে বড় করিয়া
তুলিব, ধর্মে-কর্মে, শৌর্যে, বীর্যে সংযমে-ওদার্যে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে এবং
চারিত্রিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠ করিয়া তুলিব। আমার দেশের মানুষ অনুশীলনের
দ্বারা পূর্ণ মানুষ হইয়া উঠিবে, থাকিবে না ক্ষুদ্র স্বার্থচেতনা, দুর্নীতি, বঞ্চনা,
বৈষম্য ও শোষণ,---এই স্বপ্নই দেখিয়াছিলাম---আজ দেশ স্বাধীন হইয়াছে,---
বৃটিশ প্রভুত্বের অবসান ঘটিয়াছে বটেই ; কিন্তু দেশ ও জাতিকে
চরিত্র-গৌরবে বড় করিয়া তুলিবার যে আদর্শ ছিল বিপ্লবীর, যে দায়িত্ব ছিল
বিপ্লবীর তাহা সফল হইল কই? তাই তো স্বাধীনতার পরে দেশকে যেমনটি
দেখিবার স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম, সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবে রূপায়িত দেখিতে পাই
না। মানুষকে গতানুগতিক গ্লানি ও দুঃখ দৈন্যের ঊর্ধ্বে তুলিয়া লইয়া
যাওয়ার মধ্যে তো বিপ্লবীর সাধনার সিদ্ধি। কিন্তু সেই সিদ্ধি আনিতে পারি
নাই ; তাই মর্মান্তিক বেদনা-বোধ করিয়া বলিতে বাধ্য হইয়াছি ; আমার
জীবন সফল হয় নাই।
The Pallichitra for Asarh 1316 (June-July 1909) has the
following poem contributed by Nagendra Nath Chandra,
who styles himself as santan or son.
Come O Mother Queen of the Village (1)
By Poet Nagendra Nath Chandra in Bengali.
Translated by ..
The whole day is about to expire,
Come O Mother Queen of the Village ;
Let thy sons listening to (thy) sweet words
stand up dancing carrying off the crown of
victory from the head of (their) enemies in
the struggle for existence,
In order to deck thee out as an Empress,
I have offered up my life.
At the same time when through ignorance and
temptation, and persecution by enemies, (2)
the golden seat was lost, we did "not under-
stand, did not see, realising it in the heart.
এসো মা পল্লী রাণী কবি বিপ্লবী নগেন্দ্রনাথ চন্দ্র (সেলুলার জেলে ১৯১০-১৯১৭। জন্ম-মৃত্যু অজ্ঞাত)। নাংলা ডাকাতী
ও ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁর দ্বীপানতরের সাজা হয় সেলুলার জেলে। সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি
দেখা যাচ্ছে, নগেন্দ্রনাথ চন্দ্র, সেই অলিন্দ-সংলগ্ন কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা
স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি। তাই তাঁদের মতো মানুষের কলমের ছোঁয়া আমাদের কাছে কবিতাই!
Come O Mother Queen of the Village (1)
By Poet Nagendra Nath Chandra in Bengali.
This poem was written in Bengali and published in a periodical Pallichitra’s Asharh 1316 B (June 1909) issue, from Bagerhat of
Khulna district now in Bangladesh. For this poem, the Poet and the Editor Bidhubhusan Bose were charged with sedition and
sentenced to 2 years and the Press owner Abani Mohan Deb was sentenced to 2 months of rigorous imprisonment by the District
Magistrate of Khulna. The sentence was set aside in the Hon. High Court of Calcutta. The poet however served a sentence of
deportation to the ill-famous Cellular Jail at Port Blair for the “Nangla Political Dacoity Case” or “The Khulna Conspiracy Case”
between 19010 - 1917.
কবিতাটি মূল বাংলায় আমরা যোগাড় করতে পারিনি। বাংলায় লেখা অংশ দুটি মামলার ফাইল থেকে পেয়েছি। মিলনসাগরে
এই কবির পাতায় সেলুলার জেলের সেই ফলকটির ছবি দেওয়া রয়েছে যাতে তাঁর নাম খোদাই করা আছে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
Now thy sweet call comes, filling (all) India,
(এখন তোমার মধুর আবাহন আসিছে ভারত ভরে )
I see thee in a new light at the door of the
temple of my heart.
Under the weight of the demon’s tread, there
are no parijat(3) flowers in Nandan (Indra’s
garden of paradise).
Indra’s wife in paradise in the garb of a begger
woman lies sick unto death (lit. dead unto
the vitals).
Those heroes who are immortal, seeing these
things before them, remain with eyes shut in
shame and disgust, like cowards.
(জানি না, জননী, স্বদেশের তরে, কখন দেবতা দল
উঠিবে জ্বালিয়া কালানল সম নাশিতে অসুর বল।
অন্তঃশক্তি পরে করিয়ে নির্ভর, আপন আয়ুধ ধরে,
স্বর্গরাজ্য পুনঃ করিতে স্থাপিত, রুধির তর্পণ করে।)
I do not know when the band of Gods will fire
up like the worldly destroying flame, for the
sake of the Mother, the Native land, to
destroy the power of the demons,---will, rely-
ing on their own strength and seizing their
own weapons, re-establish heavenly dominion,
making an offering(4) of blood. The six
enemies coming into my heart like demons
sit (waiting) at the door of the temple of my
heart in order to make (me) sink in sin.
(But) has he anything to fear who has a
mother who grants emancipation, on plac-
ing whom in the heart, bondage beats a
retreat?
So long, deceived by enemies, and oppressed
by ignorance, I was in a state of forgetful-
ness.
Thou, O Mother, haying come and not hav-
ing won my heart, you went away neglected.
Through the influence of that sin, the smart-
ing of this bondage burns in my heart.
Perhaps it has been on seeing that, that thou
hast called me to destroy the spell of ignor-
ance,
Receiving a new life on hearing the blessing
in the shape of a lull
I have come with my heart and a sacrifice to
be offered up at thy worship
I have brought my heart to place thee upon it.
Come to the seat of my heart, to the mixture
of blood.
Come O Mother, Queen of the village.
1. In the sense of apposition, Queen being the same as the village. R.S.
2. The enemies may be the evil propensities of the human nature or human enemies.
The word Ripur (enemy) being capable of both the meanings, I should be disposed to
take in the latter sense, as being more in keeping with the context. R.S.
3. Name of the flower which is supposed to grow in Indra’s heaven. R.S.
4. The word tarpan (from the root trip to please) means an offering of water to the
names of deceased ancestors. R.S.
Viz, the six evil propensities, desire, anger, cupidity, ignorance, pride and envy.
* * * * *
তুমি যদি হ'তে ব্যর্থ মরুভূ ঊষর,
অথবা বিকট রুক্ষ কঠিন কঙ্কর,
হ'তে যদি আলোহীন তুহিনের দেশ,
নাহি যেথা শ্যাম-শোভা গীত-গন্ধ লেশ,
হতে যদি বর্ব্বরের বিহারের ভূমি,
তবু এই জীবনের তীর্থ হ'তে তুমি।
আফ্রিকার মরুভূমি সুইস্ পাষাণ
হতে যদি, তবে মাতঃ তোমার সন্তান,
হইত না এইরূপ ক্ষীণ কলেবর,
হইত না এইরূপ নারী সুকুমার
* * * * *
এইমত ভক্তিভরে প্রদোষ প্রভাতে
তোমার চরণ-ধুলি লইতাম মাথে।
তোমার অতীত মোরে করেনি পাগল,
ভাবী আশা করিছে না আহারে চঞ্চল,
জন্মক্ষণে শিশু চিনে যেমন মাতায়,
আমিও তেমনি মাগো, চিনেছি তোমায়,
আছি জানি ভাগ্য মোর তব সনে গাখা
জন্মজন্মান্তর হ'তে, অয়ি চির মাতা।
তুমি যদি হ'তে ব্যর্থ মরুভূ ঊষর বিপ্লবী বীরেন্দ্রচন্দ্র সেন (আনুমানিক ১৯১০ - মৃত্যু অজ্ঞাত)। কবি এই
কবিতাটি লিখেছিলেন আলিপুর বোমা মামলার সময় বন্দীদশায় আলিপুর জেলের একটি কুঠরীর মেঝেতে খোদাই করে। মাত্র ১৬-১৭
বছর বয়সে, বিচারে তিনি আন্দামানের সেলুলার জেলে নির্বাসিত হয়েছিলেন এবং সেখানে ৪ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন। আমরা
কবিতাটি পেয়েছি কবির সেই মামলারই স্বতীর্থ বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগোর, ১৯২৮ সালে প্রকাশিত “বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা” গ্রন্থের ষষ্ঠ
পরিচ্ছেদের ৮৬-পৃষ্ঠা থেকে। সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা যাচ্ছে, বীরেন্দ্রচন্দ্র সেন, সেই অলিন্দ-
সংলগ্ন কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি। তাই তাঁদের
মতো মানুষের কলমের ছোঁওয়া আমাদের কাছে কবিতাই!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
দরিদ্রে আশ্বাস দিয়া ভিক্ষা কর “ভোট দাও”---বলি
ধনীর বিশ্বাস নিয়া লহ ধন চাটুবাক্যে ছলি’
একেরে অন্যের হ’তে প্রতিশ্রুতি দাও পরিত্রাণে
উভয়ে বঞ্চনা করি “ভোটরঙ্গ” রসিকেরা জানে!
ভোটরঙ্গ
কালীকিঙ্কর সেনগুপ্ত (৯.১০.১৮৯৩ - ১০.৭.১৯৮৬)
স্বাধীনতা এবং হরিজন আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ
“মন্দিরের চাবী” দ্বিতীয় সংস্করণ (১৯৫৫)-এর কবিতা। কাব্যগ্রন্থটির প্রথম সংস্করণ
১৯৩১ সালে প্রকাশিত হওয়া মাত্র ব্রিটিশ সরকার দ্বারা বাজেয়াপ্ত করা হয়।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সুবর্ণ চমস মুখে সুস্বাদু পিষ্টক সুরভিত
কুবেরের বরপুত্র দুগ্ধফেন-শয়নে শয়ান,
সুকোমল বরবপু স্মরশরে করে জর্জ্জরিত
অমৃতসরসী-মুখে ইন্দীবর-নিন্দিত-নয়ান।
দরিদ্রা দোহদবতী জননীর সাধ নাহি মিটে
সন্তানেরা খায় অন্ন পায় যদি শালপত্র থালে
ভূ-শয্যায় দৃঢ়বপু মস্তকেরে ন্যস্ত করি ইঁটে
জেগে উঠে গিরি টুটে ভাগীরথী কেটে আনে খালে।
ধনী ও দরিদ্র
কালীকিঙ্কর সেনগুপ্ত (৯.১০.১৮৯৩ - ১০.৭.১৯৮৬)
স্বাধীনতা এ হরিজন আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ “মন্দিরের
চাবী” দ্বিতীয় সংস্করণ (১৯৫৫)-এর কবিতা। কাব্যগ্রন্থটির প্রথম সংস্করণ ১৯৩১ সালে
প্রকাশিত হওয়া মাত্র ব্রিটিশ সরকার দ্বারা বাজেয়াপ্ত করা হয়।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আলিপুর জেল থেকে আমরা ১৬ জন সরকার প্রদত্ত ছেঁচা লোহার
এক এক জোড়া বেড়ী পরে সাগর-তরঙ্গে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য যাত্রা
করলাম। সিপাই শান্ত্রীরা বন্দুক নিয়ে এসেছে দলে দলে---জাহাজে
চড়ে সাগরের বুকে নাচতে নাচতে আমরা যাব কালাপানি---আন্দামান
দ্বীপে, যেখানে কলকাতা থেকে মাসে একদিন একথানা জাহাজ কয়েদী
নিয়ে যায়। অমৃতবাজার পত্রিকায় সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল : “সমুদ্রের
ওপরও কি বন্দীদের পায়ে বেড়ী দেওয়ার প্রয়োজন আছে? যদি
বৈশাখের ঝড়ে জাহাজ ডুবে যায় তা হ'লে বাঁচার চেষ্টা করারও কোনো
উপায় তাদের থাকবে না। জাহাজ ডুবলে বাঁচার চেষ্টা করা যদি
অবৈধ না হয় তবে হতভাগ্য বন্দীদের সে সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।”
“মহারাজা” স্টীমার ডায়মণ্ড হারবার ছেড়ে যতই দক্ষিণে সাগরাভিমুখে
যেতে থাকে ততই মনে অভূতপূর্ব পুলক, বিস্ময় ও কৌতূহল হচ্ছিল।
কোথায় কোন্ অজানা-রাজ্যে যাচ্ছি! গেল যুদ্ধের সময় যারা আন্দামানে
ছিল তাদের বন্দীজীবন বড় আরামে কাটেনি---নিদারুণ লাঞ্ছনার ভিতর
তারা রাজবন্দীর মাহাত্ম্য বজায় রেখেছিল। ভারতের জনসাধারণের
কাছে আন্দামান বন্দীশালা একটা অত্যাচারের প্রত্যক্ষ নিদর্শন বলে
সরকার ওখানে স্বদেশী-বন্দী রাখা বন্ধ ক'রে দিয়েছিল। এখন আবার
সে অন্ধকূপের দ্বার তাদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। সাময়িক উদারতার
ভান করে আমাদের সাম্রাজ্যবাদী রাজ আবার নিজের স্বাভাবিক মূর্ত্তি
ধারণ ক'রেছে। তাই আমাদের “বিপজ্জনক বন্দীদের” ভারতের বাইরে
বিপ্লবী কবি সতীশচন্দ্র পাকড়াশী
|
দুরন্ত জলরাশির মাঝখানে বন্দী স্টীমারে
বিপ্লবী কবি সতীশচন্দ্র পাকড়াশী (১৮৯৩ - ৩০.১২.১৯৭৩)। তিনি মেছুয়াবাজার বোমা মামলায় আন্দামানের সেলুলার জেলে দ্বীপান্তরে সাজাপ্রাপ্ত
ছিলেন। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত, কবির “অগ্নিদিনের কথা” গ্রন্থের “আন্দামান দ্বীপের কারাকক্ষে” পরিচ্ছেদের যাহাজ-যাত্রার একটি অংশ। কবি তাঁর
কারাজীবনের মধ্যে, ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট ভাবধারায় বিশ্বাসী হয়ে পড়েন। সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা
যাচ্ছে, সতীশচন্দ্র সেই অলিন্দ-সংলগ্ন কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে
পারি। তাই তাঁদের মতো মানুষের কলমের ছোঁয়াই আমাদের কাছে কবিতা!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
---দূরে---দ্বীপান্তরে পাঠানোর ব্যবস্থা। রুশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী গভর্নমেণ্ট
বরফের দেশ সাইবেরিয়ায় রাজবন্দীদের নির্বাসনে পাঠাত। ইংরেজ
পাঠায় দ্বীপান্তরে---যেখানে স্বাস্থ্য নাই, খাদ্য নাই, বিশ্বজনের সঙ্গে
সংযোগ নাই।
দুস্তর জলরাশির মাঝখানে বন্দী স্টীমারেও আমরা বন্দী---ডেকের
একটি তালাবন্ধ প্রকোষ্ঠে আমাদের স্থান। শোয়া খাওয়া এখানে। মলমৃত্র
ত্যাগের ঝঞ্জাট কম নয়, বেড়ির উপরে আবার হাতকড়ি ও কোমরে
দড়ি বাঁধা চাই। সিপাই দড়ি ধরে নিয়ে যাবে। সকালে বিকালে
সকলকে উপরে নিয়ে যেত হাওয়া খাওয়ার জন্যে। বিশাল সমুদ্রের কূল
কিনারা কিছুই দেখা যায় না। চারদিকে গোলাকার হয়ে আকাশ ঢলে
পড়েছে সমুদ্রের গায়। দক্ষিণ সাগরের দিকে তাকিয়ে কল্পনার মানচিত্রে
দূর মেরু সাগর চোখে ভাসে। বিস্মিত হয়ে ভাবি---সে কত দূর!
সন্ধ্যাবেলা রাঙা সূর্য্য ধীরে ধীরে ডুবে যায় অগাধ জলরাশির মাঝখানে,
সমুদ্রের সুন্দর দৃশ্য আঁধারে হাহাকার ক'রে উঠে ; আমাদের টেনে নিয়ে
যায় সিপাইর দল। ভোরে উঠে তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হই উপরে ওঠার
আশায়। সমুদ্রের বুক থেকে প্রকাণ্ড সূর্য্য লাল হয়ে ধীরে ধীরে ওঠে।
তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকি। ভুলে যাই বন্দীজীবনের কথা। সিপাইর দল
আবার টেনে নিয়ে যায়---ডেকে---আলোবাতাসহীন গরম প্রকোষ্ঠে।
প্রতিদিন বিপদসঙ্কেত (Alarm) পড়ে। চারটে বয়া বুকে কাঁধে বেঁধে
লাইন করে দাঁড়াই, ক্যাপটেন সাহেবও গলায় কি একটা সুন্দর জিনিস
লাগিয়ে আসে পরিদর্শন ক'রতে। পরে জানলাম, ক্যাপটেন সাহেবের
গলায়ও বয়া। জাহাজ ডুবলে ওতে ভর করেই সাহেব মরণের বিরুদ্ধে
লড়বে। আমাদের গলার বয়া এত বিশাল কদাকার কেন? ভাবলাম
মরণেরও শ্রেণীভেদ আছে নাকি? চারদিনের পর আন্দামানে পৌছলাম।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
সাগরবুকে আন্দামান দ্বীপ। দ্বীপচরের মাঝে এক পাহাড়ের
উপর সেলুলার কারাগার। জেলের পাশেই পাহাড়ের গায়ে ফেনায়িত
ঢেউগুলি ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ে। কি তার তর্জ্জন গর্জ্জন! কবুতরের
খোপের মত সার-বাধা ক্ষুদ্র কক্ষের একটিতে বসে আমি চেয়ে থাকতাম
দূর সাগরের পানে। দিনের পর দিন ভগবানকে খুঁজতাম আতি
পাতি ক'রে। দক্ষিণ সাগরের অসীমের পানে চেয়ে বিশ্বাতীত মূল
বস্তুর সন্ধান করতাম। চোখের দৃষ্টি থেমে গেছে সাগরের নীল জলে---
যেখানে ঢলে-পড়া আকাশ মিশে আছে সাগরের গায়ে ; মনের দৃষ্টি
ভেসে গেছে দক্ষিণ সাগরের অসীমে। খুঁজেছি, ফেবল খুঁজেছি---বস্তু-
বাদ ও অধ্যাত্মবাদের মাঝে প্রকৃত সত্য কোথায় নিহিত আছে।
জীবন-মৃত্যুর বাইরে কোথাও কিছু পাইনি।
কিশোর বয়সে ভাবের আবেগে অন্তরে জিজ্ঞাসার উদয় হয়েছিল---‘এ
জীবন নিয়ে কী করব?’ সেই জিজ্ঞাসার একটা উত্তর পেলাম এই
সাগর-দ্বীপে---“সংসার-জীবনযাত্রার পথে ভগবানের কোনো স্থান নেই।”
বিজ্ঞান ছেড়ে বৃথাই আমর অন্ধ বিশ্বাসের উপর নির্ভর করেছিলাম।
সুসংগঠিত, সমষ্টিগত প্রীতিময় সাম্যময় সমাজজীবন সাধনাই মানবের
মুক্তি-সাধনা। কমিউনিস্ট সমাজ-ব্যবস্থায় তার যথার্থ পরিণতি। এই
নব বিপ্লবই সত্যিকার বিপ্লব।
বিপ্লবী কবি সতীশচন্দ্র পাকড়াশী
|
সাগরবুকে আন্দামান দ্বীপ
বিপ্লবী কবি সতীশচন্দ্র পাকড়াশী (১৮৯৩ - ৩০.১২.১৯৭৩)। তিনি মেছুয়াবাজার বোমা মামলায় আন্দামানের সেলুলার জেলে দ্বীপান্তরে সাজাপ্রাপ্ত
ছিলেন। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত, কবির “অগ্নিদিনের কথা” গ্রন্থের “আন্দামান দ্বীপের কারাকক্ষে” পরিচ্ছেদের যাহাজ-যাত্রার একটি অংশ। কবি তাঁর
কারাজীবনের মধ্যে, ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট ভাবধারায় বিশ্বাসী হয়ে পড়েন। সর্বোপরি এই পাতার ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা
যাচ্ছে, সতীশচন্দ্র সেই অলিন্দ-সংলগ্ন কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে
পারি। তাই তাঁদের মতো মানুষের কলমের ছোঁয়াই আমাদের কাছে কবিতা!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ফাসীর রজ্জু আমার মাথার উপর ঝুলছে।
মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলেছে। এই তো সাধনার
সময়। বন্ধুরূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার প্রস্তুতির এই তো সময়। চলে যাওয়া দিনগুলোকেও
স্মরণ করার এই তো সময়।
কত মধুর তোমাদের সকলের স্মৃতি প্রিয় আমার ভাই-বোনেরা, বৈচিত্রহীন আমার এই
জীবনের একঘেয়েমিকে ভেঙ্গে দাও তোমরা, উৎসাহ দাও আমাকে। এই আনন্দময় পবিত্র ও
গুরত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য কী রেখে গেলাম? মাত্র একটি জিনিষ, তা হল আমার
স্বপ্ন --- একটি সোনালী স্বপ্ন। স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। কী শুভ মুহূর্ত ছিল সেটি, যখন আমি এই স্বপ্ন
দেখেছিলাম ! জীবনভোর উৎসাহভরে ও আক্রান্তভাবে পাগলের মত সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটেছি।
জানিনা কতটা সফল হতে পেরেছি। জানিনা, কোথায় সেই অনুসরণ আজ থামিয়ে দিতে হচ্ছে
আমাকে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে মৃত্যুর হিম-শীতল হাত তোমাদেরস্পর্শ করলে তোমরা তোমাদের
অনুগামীদের হাতে ভার তুলে দেবে এই অন্বেষণের, আজ যেমন আমি তোমাদের হাতে তুলে
দিচ্ছি। প্রিয় আমার বন্ধুরা, এগিয়ে চল, এগিয়ে চল --- কখনো পিছিয়ে যেও না। বন্ধনের দিন
চলে যাচ্ছে। ঐ দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার নবারুণ। উঠে পড়ে লাগো। কখনও হতাশ হয়ো না।
সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত। ভগবান তোমাদের আশীর্বাদ করুন।
বিপ্লবী কবি মাস্টারদা সূর্য সেন
|
আমার বিদায় বাণী - আদর্শ ও একতা
বিপ্লবী কবি সূর্য সেন (২২.৩.১৮৯৪ - ১২.১.১৯৩৪)
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নায়ক এই লেখাটি লিখেছিলেন তাঁর ফাঁসির প্রাক্কালে শেষ আহ্বান হিসেবে। লেখাটি আমরা পেয়েছি, বহরমপুর,
পশ্চিমবঙ্গের সূর্যসেনা প্রকাশনী থেকে প্রকাশক প্রফুল্ল রায় দ্বারা প্রকাশিত, নির্মল সরকার দ্বারা সম্পাদিত, "সূর্যসেন ও প্রীতিলতা রচনা সংগ্রহ"
থেকে। যাঁরা তাঁদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মাতে পারি, তাঁদের লেখা আমাদের কাছে কবিতাই।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিলের চট্টগ্রাম ইষ্টার বিদ্রোহের কথা কোন দিনও ভুলো না।
জালালাবাদ, জুলধা, চন্দননগর ও ধলঘাটের সংগ্রামের কথা সব সময় স্পষ্ট মনে রেখো।
ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে যে সব দেশপ্রেমিক তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের নাম
রক্তাক্ষরে অন্তরের অস্তরতম স্থানে লিখে রেখো।
আমাদের সংগঠনে যেন বিভেদ না আসে --- এই আমার একান্ত আবেদন তোমাদের কাছে।
যারা কারাগারের ভিতরে ও বাইরে রয়েছো তাদের সকলকে জানাই আমার আশীর্বাদ।
বিদায় নিলাম তোমাদের কাছ থেকে।
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক
বন্দে মাতরম্!
চট্টগ্রাম জেল
১১ই জানুয়ারী, ১৯৩৪, সন্ধ্যা ৭টা
স্নিগ্ধ সুষমায় ভরা একটি পবিত্র ফুল তার পরিপূর্ণ সৌন্দর্য্য নিয়ে এই দীন পূজারীর
কাছে এসেছিল মায়ের চরণে অর্ঘ্য হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। পূজারীকে কত বড়ই
সে মনে করেছিল। কত বড় শ্রদ্ধার আসন তাকে দিয়েছিল, মায়ের কাছে উৎসগীঁকৃত
হওয়ার জন্য। পূজারী ফুলটিকে অতি সমাদরে গ্রহণ করেছে। তার নিষ্কলঙ্ক শুভ্রতায়,
সৌরভে মুগ্ধ হয়েছে, মায়ের চরণে তার যাওয়ার ব্যাকুলতা দেখে তাকে শ্রদ্ধা করেছে,
শেষে মায়েরই চরণে তাকে অঞ্জলি দিয়ে তার আকাঙক্ষা পূর্ণ করেছে। সে আজ মায়ের
কাছে চলে গেছে, মা তাকে কত যত্নে কত আদরে বুকে তুলে নিয়েছেন।
পৃজারী আজ ভগবানের নিকট কায়মনোবাক্য প্রার্থনা করছে সে যেন আজ ফুলের
সঙ্গে তার পরিচয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে ফুলের মহত্বটুকু নষ্ট করে না ফেলে।
বিপ্লবী কবি মাস্টারদা সূর্য সেন
|
উৎসর্গ পত্র
বিপ্লবী কবি সূর্য সেন (২২.৩.১৮৯৪ - ১২.১.১৯৩৪)
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নায়ক এই লেখাটি লিখেছিলেন তাঁর “Female Organisation” নামক প্রবন্ধের
উৎসর্গ পত্র হিসেবে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের উদ্দেশে। লেখাটি প্রবাসী পত্রিকার ১৩৫৬,
বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। যাঁরা তাঁদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন যাতে আমরা স্বাধীন দেশে
জন্মাতে পারি, তাঁদের লেখা আমাদের কাছে কবিতাই।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বাঙ্গালী সমাজ যেন পঙ্কময় বদ্ধ জলাশয়
নাহি আলো স্বাস্থ্যভরা, বহে হেথা বায়ু বিষময়
জীবন-কোরকগুলি, অকালে শুকায়ে পড়ে ঝরি,
বাঁচাবার নাহি কেহ, সকলেই আছে যেন মরি।
নাহি চিন্তা, নাহি বুদ্ধি, নাহি ইচ্ছা, নাহি উচ্চ আশা,
সুখ-দুঃখহীন এক জড়পিণ্ড, নাহি মুখে ভাষা।
এর মাঝে দেখি যবে কোনো মুখ উজ্জ্বল সরস,
নয়নে আশার দৃষ্টি, ওষ্ঠপ্রান্তে জীবন হরষ---
অধরে ললাটে ভ্রূতে প্রতিভার সুন্দর বিকাশ,
সম্ভ্রমে হৃদয় পুরে, আনন্দ ও আশা জাগে প্রাণে,
সম্ভাষিতে চাহে হিয়া বিমল প্রীতির অর্ঘ্যদানে।
তাই এই ক্ষীণ-ভাষা ছন্দে গাঁথি দীন-উপহার
লজ্জাহীন অসঙ্কোচে আনিয়াছি সম্মুখে তোমার,
উচ্চলক্ষ্য, উচ্চআশা বাঙ্গালায় এনে দাও বীর
সুযোগ্য সন্তান যে রে তোরা সব বঙ্গ-জননীর।
বাঙ্গালী সমাজ যেন পঙ্কময় বদ্ধ জলাশয়
কবি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১২.৯.১৮৯৪ - ১.১১.১৯৫০)
এই কবিতাটি কবির “অপুর সংসার” উপন্যাসের ৭ম পরিচ্ছেদ থেকে নেওয়া।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|