কবি উত্তমকুমার - বাংলা সিনেমার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতা, চিত্রতারকা ও নায়ক, যিনি “মহানায়ক” নামেও পরিচিতি লাভ করেন। লেখক অভীক চট্টোপাধ্যায় তাঁর “৪৬-এর দাঙ্গায় নিজে গান বেঁধে নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে গাইতেন” লেখায় জানিয়েছেন যে উত্তম কুমারকে মহানায়ক বলে সর্বপ্রথম সম্বোধন করেন মহান শিল্পী-সঙ্গীতকার-ফিল্মমেকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, তাঁর প্রয়াণের পরে তাঁকে উৎসর্গ করা গানের রেকর্ডের প্রকাশকালে।

কবি জন্মগ্রহণ করেন তাঁর মামার বাড়িতে, কলকাতার ভবানীপুরের ৫১, আহিড়ীটোলা স্ট্রীটে। পিতা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় এবং মাতা চপলা দেবী। পিতা ছিলেন কলকাতার মেট্রো সিনেমা হলের এক সাধারণ কর্মচারী। কবিরা ছিলেন চার ভাই বোন। দিদি ছোটো বেলাতেই মারা যান। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনিই বড়। মেজ বরুণ কুমার। ছোট ভাই তরুণ কুমারও বাংলা সিনেমার প্রখ্যাত অভিনেতা ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১লা জুন তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন গৌরী দেবীর সঙ্গে। তাঁর একমাত্র পুত্র গৌতম চট্টোপাধ্যায় বাংলা সিনেমার একজন অভিনেতা, পরিচালক এবং প্রযোজক, মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পরলোক গমন করেন। উত্তম কুমারের একমাত্র নাতি গৌরব চট্টোপাধ্যায়, বর্তমানে টালিগঞ্জের জনপ্রিয় ব্যস্ত অভিনেতা।
কবির “উত্তমকুমার” নাম
কবির শিক্ষা জীবন
উত্তমকুমারের খেলাধুলা ও শরীর চর্চা
উত্তমকুমারের হিন্দী-উর্দু-ইংরেজী-অ্যাস্ট্রলজি
উত্তমকুমারের কর্ম জীবন, চাকরি ও সিনেমা
উত্তমকুমারের নাটক
উত্তমকুমারের প্রাপ্ত কিছু সম্মাননা
উত্তমকুমারের জনপ্রিয়তার স্বাদ ও বিড়ম্বনা
উত্তমকুমারের সিনেমা প্রযোজনা
রবীন্দ্রনাথের শেষ যাত্রায় উত্তমকুমার
উত্তম কুমারের গান ও ভারত ছাড়ো আন্দোলন
শিল্পী সংসদ ও বনপলাশীর পদাবলী
সমাজ সেবা ও উত্তম কুমার
প্রতিবাদী ও সহানুভূতিশীল উত্তম কুমার
উত্তম-সুপ্রিয়া
উত্তম-সুচিত্রা
উত্তমকুমার ও সত্যজিৎ রায়
উত্তমকুমার ও বিশ্বজিত চ্যাটার্জী
উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
টালিগঞ্জে মহানায়ক উত্তম কুমারের মূর্তি
মহানায়ক উত্তম কুমার মেট্রো স্টেশন
ভাষ্যকার উত্তমকুমার
আকাশবাণী কলকাতার মহালয়া ও উত্তমকুমার
সরোজ দত্ত হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী উত্তমকুমার
কবির “উত্তমকুমার” নাম
কবির শিক্ষা জীবন
উত্তমকুমারের খেলাধুলা ও শরীর চর্চা
উত্তমকুমারের হিন্দী-উর্দু-ইংরেজী-অ্যাস্ট্রলজি
উত্তমকুমারের কর্ম জীবন, চাকরি ও সিনেমা
উত্তমকুমারের নাটক
উত্তমকুমারের প্রাপ্ত কিছু সম্মাননা
উত্তমকুমারের জনপ্রিয়তার স্বাদ ও বিড়ম্বনা
উত্তমকুমারের সিনেমা প্রযোজনা
রবীন্দ্রনাথের শেষ যাত্রায় উত্তমকুমার
উত্তম কুমারের গান ও ভারত ছাড়ো আন্দোলন
শিল্পী সংসদ ও উত্তমকুমারের বনপলাশীর পদাবলী
সমাজ সেবা ও উত্তম কুমার
প্রতিবাদী ও সহানুভূতিশীল উত্তম কুমার
উত্তম-সুপ্রিয়া
উত্তম-সুচিত্রা
উত্তমকুমার ও সত্যজিৎ রায়
উত্তমকুমার ও বিশ্বজিত চ্যাটার্জী
উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
টালিগঞ্জে মহানায়ক উত্তম কুমারের মূর্তি
মহানায়ক উত্তম কুমার মেট্রো স্টেশন
ভাষ্যকার উত্তমকুমার
আকাশবাণী কলকাতার মহালয়া ও উত্তমকুমার
সরোজ দত্ত হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী উত্তমকুমার
.


কবি উত্তমকুমার - বাংলা সিনেমার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতা, চিত্রতারকা ও নায়ক, যিনি “মহানায়ক” নামেও পরিচিতি লাভ করেন। লেখক অভীক চট্টোপাধ্যায় তাঁর “৪৬-এর দাঙ্গায় নিজে গান বেঁধে নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে গাইতেন” লেখায় জানিয়েছেন যে উত্তম কুমারকে মহানায়ক বলে সর্বপ্রথম সম্বোধন করেন মহান শিল্পী-সঙ্গীতকার-ফিল্মমেকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, তাঁর প্রয়াণের পরে তাঁকে উৎসর্গ করা গানের রেকর্ডের প্রকাশকালে।

কবি জন্মগ্রহণ করেন তাঁর মামার বাড়িতে, কলকাতার ভবানীপুরের ৫১, আহিড়ীটোলা স্ট্রীটে। পিতা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় এবং মাতা চপলা দেবী। পিতা ছিলেন কলকাতার মেট্রো সিনেমা হলের এক সাধারণ কর্মচারী। কবিরা ছিলেন চার ভাই বোন। দিদি ছোটো বেলাতেই মারা যান। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনিই বড়। মেজ বরুণ কুমার। ছোট ভাই তরুণ কুমারও বাংলা সিনেমার প্রখ্যাত অভিনেতা ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১লা জুন তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন গৌরী দেবীর সঙ্গে। তাঁর একমাত্র পুত্র গৌতম চট্টোপাধ্যায় বাংলা সিনেমার একজন অভিনেতা, পরিচালক এবং প্রযোজক, মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পরলোক গমন করেন। উত্তম কুমারের একমাত্র নাতি গৌরব চট্টোপাধ্যায়, বর্তমানে টালিগঞ্জের জনপ্রিয় ব্যস্ত অভিনেতা।

১৯৬৩ সালে উত্তমকুমার তাঁর পরিবার ছেড়ে দীর্ঘ ১৭ বছর জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তাঁর ময়রা স্ট্রীটের বাড়িতে বসবাস করেন। উত্তমকুমার ২৪শে জুলাই ১৯৮০-র রাতে, বেলভিউ নার্সিং হোমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

.
কবির “উত্তমকুমার” নাম -    ^^ উপরে ফেরত
কবির পিতৃদত্ত নাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। মাতামহ নাম দিয়েছিলেন “উত্তম”। এই নামটাই ছবির জগতের পক্ষে উপযুক্ত মনে করেছিলেন তিনি। তাঁর প্রথম ছবি ‘দৃষ্টিদান’-এ (১৯৪৮) তিনি নায়ক অসিত বরণের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সেই সিনেমার পরিচয়লিপিতে তাঁর নামই ছিল না। তাঁর প্রথম নায়ক হওয়া ছবি “কামনা” (১৯৪৯) তে নাম ছিলো “উত্তম চ্যাটার্জি” কিন্তু সেই ছবি ফ্লপ্ হওয়াতে পরের ছবি “মর্যাদা” (১৯৫০) তে নাম নিয়েছিলেন “অরূপকুমার”। সেটাও ফ্লপ্। পরের ছবি “ওরে যাত্রী” তে (১৯৫১) আবার “উত্তম চ্যাটার্জি” হয়ে, তার পরের ছবি “সহযাত্রী” (১৯৫১) তে নাম বদলে রাখেন “উত্তম কুমার”। তখনও সাফল্য আসেনি! কিন্তু আর নাম পরিবর্তন করেন নি। .


কবির শিক্ষা জীবন -     ^^ উপরে ফেরত
কবির শিক্ষা জীবন শুরু হয় কলকাতার ভবানীপুরের চক্রবেড়ীয়া হাই স্কুলে। সেখানে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ে ক্লাস এইটে গিয়ে ভর্তি হতে হলো ভবানীপুরের সাউথ সাবার্বা‌ন স্কুলে ১৯৪০ সালে, কারণ তখন সেই স্কুলে আর উঁচু ক্লাস ছিল না। এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র, কবি অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত, কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়, কবি শিশির কুমার দাশ প্রমুখরা। এই স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন সেকেন্ড ডিভিশনে, সংস্কৃতে লেটার সহ। অঙ্কেও ভাল নম্বর পেয়েছিলেন। সংকৃতের নম্বর দেখে তাঁর শিক্ষক ধীরেনবাবু তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।

ম্যাট্রিক পাশ করার পর কলকাতার ডালহাউসির গভমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজের নাইটে ভর্তি হন, যাতে দিনের বেলায় কোনো চাকরি করতে পারেন। ১৯৪৫ সালে তিনি সেখান থেকে বি.কম. স্ট্যান্ডার্ড পাশ করেন যা এখনকার বি.কম.। .


উত্তমকুমারের খেলাধুলা ও শরীর চর্চা -   ^^ উপরে ফেরত
উত্তমকুমার নিয়মিত শরীরচর্চায় অভ্যস্ত ছিলেন। ইন্দিরা সিনেমার পিছনে, বিখ্যাত কুস্তিগীর ননি ঘোষের আখড়ায় গিয়ে রোজ ভোরে কুস্তি শিখতেন। তারপর যেতেন ভোম্বলদা, ভাল নাম সুকুমার গুপ্তর আখড়ায় লাঠি খেলা শিখতে।

১৯৪১ সাল নাগাদ, সাউথ সুবার্বান স্কুলে পড়ার সময়ে নিজেরাই লুনার ব্যায়ামাগার তৈরি করে সেখানে নিয়মিত ব্যায়াম করতেন। সঙ্গে খেলতেন ফুটবলও। খেলতেন ভলিবল, ক্রিকেটও, সাউদার্ন পার্ক বা লেডিজ পার্কে। তিনি বরাবর মোহনবাগানের সাপোর্টার ছিলেন।

তিনি হাফ্-এ খেলতেন। তখন তাঁর সঙ্গে যাঁরা সেখানে ফুটবল খেলতেন তাঁর মধ্যে অনেকেই পরে ফার্স্ট ডিভিশনে ফুটবল খেলেছিলেন যেমন মিতাম চ্যাটার্জী, রঞ্জিত সিন্হা, বিমল বসু, মণি গাঙ্গুলী, প্রমুখ।

স্কুলে পড়ার সময়ে ১৯৩৮ এ তিনি বন্ধুদের সাথে রোজ গিয়ে পদ্মপুকুরে সাঁতার কাটতেন। তখন তিনি একবার ১০০ ইয়ার্ড সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। তাঁদের সাঁতারের ক্লাবের হয়ে বাইরে গিয়েও তিনি ট্রফি এনেছেন। তাঁর স্মৃতিচারণে তিনি বলেছেন যে তিনি যখন সাঁতারের পরে জল থেকে উঠে আসতেন, তখন নাকি তাঁকে দেখতে বিখ্যাত আমেরিকান অলিপিক সাঁতারু এবং পরে সিনেমায় টার্জানের চরিত্রের অভিনেতা জনি ওয়েসমুলারের মতো লাগতো!

পরবর্তীকালে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল উত্তম কুমারকে লাইফ মেম্বার করে নেয়।

তাঁর “বসু পরিবার”, ১৯৫২ সালে হিট্ হবার পরে তিনি আবার ভলিবল খেলতে শুরু করেন। বন্ধুবান্ধবরা তাঁকে বলতেন শরীরচর্চা করতে কারণ তাঁর নাকি ঘাড়ের দিকটা একটু বাঁকা, সেরকম থাকলে নাকি হিরো হিরো মানায় না! ভলিবল খেললে নাকি তা ঠিক হয়ে যায়।

এ ছাড়া ১৯৫৯ সালে তাঁর বডি ফিট রাখার জন্য সাউথ ক্লাবে নিয়মিত টেনিসও খেলেছেন।


.


উত্তমকুমারের হিন্দী-উর্দু-ইংরেজী-অ্যাস্ট্রলজি -      ^^ উপরে ফেরত
১৯৫০-৫১ সালে হিন্দী ও উর্দু ভাষা শিখবার ইচ্ছে হলো। অভিনেত্রী অনুভা গুপ্ত তাঁকে শিক্ষক ঠিক করে দিয়েছিলেন। নাম অমানুল হক। বাড়ি ছিলো ইউ.পি.। কলকাতায় এসেছিলেন কবিতা লিখতে। এখানে এলে নাকি ভালো কবিতা লেখা যায়। কিন্তু তা হয়নি। কারণ তাঁর মনে হয় কলকাতা ইট-কাঠ-পাছরের শহর। কঠিন বাস্তবের শহর। অনুভা দেবী ও অমর মল্লিক তাঁকে আশ্রয় দেন এবং তিনি তাঁদের মা ও বাবার আসনে বসান। তাঁরাই এই মাস্টারজির বিয়ে দিয়েছিলেন এক হিন্দু মেয়ের সঙ্গে।

উত্তমকুমারের বাল্যবন্ধু লালমোহন মুখার্জীর ভগ্নিপতি শিবপ্রসাদ মজুমদারের কাছে তিনি ইংরেজী শিখতেন যাতে ভালোভাবে ইংরেজিটা বলতে পারেন, সঠিক উচ্চারণ সহ।

নিজে নিজেই অ্যাস্ট্রলজিও শিখে বেশ রপ্ত করে নিয়েছিলেন এবং ভবানীপুরের দু-চারজনের ঠিকুজী কুষ্ঠি তিনিই তৈরি করে দিয়েছিলেন!

.


উত্তমকুমারের কর্ম জীবন, চাকরি ও সিনেমা -        ^^ উপরে ফেরত
১৯৪৫ সালে বি.কম. স্ট্যান্ডার্ড পাশ করার পরে পরিবারের কথা ভেবে চাকরিতে যোগ দিলেন কলকাতা পোর্ট কমিশনার্স এর ক্যাশ বা অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে, ২৭৫ টাকা মাইনেতে।

এই আলেখ্যর লেখক মিলন সেনগুপ্ত, ১৯৭৩-৭৬ এই তিন বছর, কলকাতার মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার কালে, কলকাতা পোর্ট কমিশনার্স এ অ্যাপ্রেন্টিস বা শিক্ষানবিশ হয়ে কাজ করেছিলেন। তখনও সেখানকার পুরানো কর্মীদের গর্বের সঙ্গে বলতে শুনেছেন যে উত্তমকুমার একদিন সেখানে তাঁদের সঙ্গে কাজ করতেন! ১৯৭৩-৭৬ এ উত্তমকুমার বাংলা সিনেমার ১ নম্বর নায়ক!

পোর্ট কমিশনার্স এ চাকরির পাশাপাশি উত্তমকুমার চেষ্টা করে যেতেন কোনো সিনেমায় যদি সুযোগ পাওয়া যায়। প্রথম সুযোগ পান ১৯৪৬ সাল নাগাদ “মায়াডোর” নামক একটি হিন্দী সিনেমায়, এক্সট্রার রোলে পাঁচ দিন, দৈনিক পাঁচ সিকি পারিশ্রমিকে। ছবিটি রিলিজ হয় নি। এরপর ১৯৪৭ সালে সুযোগ পান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা “দৃষ্টিদান” সিনেমায়, নায়ক অসিতবরণের কম বয়সের বা ছোটবেলার রোলে। নায়িকা ছিলেন সুনন্দা দেবী এবং তাঁর ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কেতকী দত্ত। এই কাজের পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন ২৭ টাকা যার মধ্যে থেকে কমিশন ইত্যাদির টাকা বাদ দিয়ে হাতে পেয়েছিলেন সাড়ে তেরো টাকার মতন!

১৯৪৮ সালের মাঝামাঝি নবেন্দুসুন্দর ব্যানার্জীর “কামনা” ছবিতে প্রথম নায়কের ভুমিকায় অভিনয়ের সুযোগ পান। বিপরীতে তাঁর প্রথম নায়িকা ছিলেন ছবি রায়। তিনিও প্রথমবার নায়িকা হচ্ছিলেন।

১৯৫২ তে “বসু পরিবার” সিনেমা হিট করার পরে তিনি কলকাতা পোর্ট কমিশনার্স এর চাকরি ছেড়ে দেন। “বসু পরিবার” সিনেমায় নায়ক উত্তমকুমারের বোনের ভূমিকায় ছিলেন নবাগতা সুপ্রিয়া দেবী বা তখন সুপ্রিয়া ব্যানার্জী। ১৯৫২ তেই “সাড়ে চুয়াত্তর” ও “বৌঠাকুরাণীর হাট” তাঁকে একটি স্থিতির জায়গায় পৌঁছে দেয়।

১৯৫৬ সালে সাগরিকা সিনেমাটি রিলিজ হবার পরে সাংবাদিক ও ফিল্ম ক্রিটিকরা বিশেষ প্রশংসা না করলেো ছবিটি সুপারহিট হয়েছিল। সে বছরেই মুক্তি পাওয়া তাঁর অভিনীত সিনেমা “সাহেব বিবি গোলাম”, “লক্ষহীরা”, “চিরকুমার সভা”, “একটি রাত”, “শঙ্করনারায়ণ ব্যাঙ্ক”, “শ্যামলী”, “ত্রিযামা”, “নবজন্ম”, “পুত্রবধূ” প্রভৃতি সিনেমাগুলিতেও ব্যবসায়িক সাফল্য আসে। তখন থেকেই কিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে তাঁকেই প্রাধ্যন্য দিয়ে চিত্রনাট্য লিখছেন চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক ও পরিচালকেরা।

১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় আশাপূর্ণা দেবীর উপন্যাস অবলম্বনে তাঁর বড় সাধের প্রথম হিন্দী ছায়াছবি “ছোটি সি মুলাকাত”। ছবিটি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯৭৪ সালের ৮ই নভেম্বর মুক্তি পায় উত্তমকুমারের হিন্দী ও বাংলা ভাষায় অভিনীত, শক্তিপদ রাজগুরুর "নয়া বসত" কাহিনী অবলম্বনে, শক্তি সামন্ত-র “অমানুষ“। এই ছবিটি দুটি ভাষাতেই হিট্ হয়েছিল।

১৯৫৭ সালের “তাসের ঘর” ছায়াছবিতে উত্তমকুমার প্রথমবারের জন্য দ্বৈত-ভূমিকায় বা ডাবল্ রোলে অভিনয় করেন। এ ছাড়া যে যে ছবিতে তিনি ডাবল্ রোলে অভিনয় করেন তার মধ্যে রয়েছে “ঝিন্দের বন্দী”, “ভ্রান্তি বিলাস”, “উত্তরায়ণ”. “দুটি মন”, “ছিন্নপত্র”, “কায়া হিনের কাহিনী”, “আমি সে ও সখা”, “রাজবংশ”, “বন্দী”, এবং “নিশান”।
.


উত্তমকুমারের নাটক -     ^^ উপরে ফেরত
স্কুল জীবনেই পাড়ার লুনার ক্লাবের ঘর হবার আগে থেকেই এর ওর ছাদে তাঁদের নাটকের রিহার্সাল চলতো। কম বয়সী বন্ধুদের সঙ্গে মিলে শাড়ী-বেডশিট ইত্যাদি দিয়ে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরী করে নাটক উপস্থাপন করতেন। পাড়ায় সেই অস্থায়ী স্টেজে তাঁদের প্রথম নাটক ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “মুকুট”।

তাঁর প্রথম স্কুল ভবানীপুরের চক্রবেড়ীয়া হাই স্কুলের বার্ষিক উৎসবে তিনি গয়াসুর নাটকে, ছোট গয়াসুরের ভূমিকায় অভিনয় করে পেয়েছিলেন দুটি মেডেল। এটাই তাঁর জীবনের প্রথম অভিনয় কোন আসল স্টেজে। ১৯৩৯ সালে পাড়ার সুহৃদ সমাজের “ব্রজের নিমাই” নাটকে তিনি বলরামের ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ পান।

কলেজে পড়াকালীন বন্ধুরা মিলে শ্যামবাজারে দর্পণা সিনেমার পাশে বঙ্গীয় কলালয়ে ঘর ভাড়া করে রিহার্সাল দেওয়া শুরু করেন। সেখান থেকেই “ভোলামাস্টার”, “কঙ্কাবতীর ঘাট”, ভানু চট্টোপাধ্যায়ের “কানাগলি”, বিধায়ক ভট্টাচার্যর “তাইতো” প্রভৃতি নাটকে, বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় করেন।

১৯৫৩ সালে তিনি ডাক পেলেন নিরুপমা দেবীর উপন্যাস শ্যামলীর, দেবনারায়ণ গুপ্তর নাট্যরূপে নায়ক অনিল-এর ভূমিকায়। নায়িকা ছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। নাটকটি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ভুয়সি প্রসংসা পায় এবং হিট্ করে। নাটকটি চলে ১৯৫৫ সালের ১৩ নভেম্বর পর্য্যন্ত। এই নাটকটির শেষ অভিনয়ের সাথে শেষ হয় স্টার থিয়েটারে উত্তম কুমারের জীবনের শেষ নাটকের অভিনয়।
.


উত্তমকুমারের প্রাপ্ত কিছু সম্মাননা -         ^^ উপরে ফেরত
ঠিক সম্মাননা বলা যাবে কি? কিন্তু ক’জন মানুষ আছেন যাঁর জীবনকালেই তাঁকে নিয়ে কোনো প্রথিতযশা কবি কবিতা লিখেছেন? আমরা তা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্মাননা হিসেবে গণ্য করছি। কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর কবিতায় উত্তমকুমার . . .

তোমাকে দেখবার জন্যে যখন জনতা উদ্বেল হয়ে ওঠে
গাড়ী ঘোড়া ট্রাম বাস বন্ধ করে দেয়,
পথে অবরোধ সৃষ্টি করে,
ভেবো না, তারা কোন মুহূর্তের
খেলাওয়ালা অভিনেতাকে দেখতে চায়।
তারা পরোক্ষ দেখতে চায় সেই মৃত্যুহীন মহান প্রণেতাকে
যাঁর করুণায় তোমার সমস্ত কৃতিত্ব
যাঁর করুণায় জ্যোতিতে তোমার
কান্তি - কীর্তি - স্মৃতি - মেধা
তোমার সমস্ত রসানুভূতি, রসচেতনা
তারা দেখতে চায় সেই মধুমত্তম পুরুষোত্তমকে,
যাঁর দানের তুমি অগাধ ভাণ্ডার,
যাঁর অমৃতের তুমি বার্তাবহ
যাঁর তুমি উত্তমকুমার।


১৯৫৫ সালে “হ্রদ” সিনেমার জন্য তাঁকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কারে ভূষিত করেন বি.এফ.যে.এ. অর্থাৎ বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

১৯৫৬-৫৭ সালে “হারানো সুর” ছবির জন্য সার্টিফিকেট অফ মেরিট পুরস্কার গ্রহণ করেন দিল্লীতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের কাছ থেকে।

১৯৬১ সালে “সপ্তপদী” সিনেমার জন্য তাঁকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কারে ভূষিত করেন বি.এফ.যে.এ. অর্থাৎ বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

১৯৬৬ সালে পেয়েছেন সত্যজিৎ রায়ের “নায়ক” সিনেমার জন্য বি.এফ.যে.এ-র শ্রেষ্ঠ নায়ক পুরস্কার। আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভালে।

১৯৬৭ সালে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ২য় ছবি, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা “চিড়িয়াখানা”-র জন্য তিনি পান বি.এফ.যে.এ-র শ্রেষ্ঠ নায়ক পুরস্কার এবং “চিড়িয়াখানা” ও “এন্টনি ফিরিঙ্গী”-র জন্য জাতীয় ভরত পুরস্কার যা তিনি গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেন এর কাছ থেকে। এই পুরষ্কারের তিনিই প্রথম প্রাপক ছিলেন।

১৯৬৭ সালে “গৃহদাহ” সিনেমার জন্য তাঁকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কারে ভূষিত করেন বি.এফ.যে.এ. অর্থাৎ বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

১৯৭১ সালে “এখানে পিঞ্জর” সিনেমার জন্য তাঁকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কারে ভূষিত করেন বি.এফ.যে.এ. অর্থাৎ বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

১৯৭২ সালে “স্ত্রী” ছায়াছবির জন্য পান বি.এফ.যে.এ-র শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার।

১৯৭৪ সালে “অমানুষ” সিনেমার জন্য তাঁকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কারে ভূষিত করেন বি.এফ.যে.এ. অর্থাৎ বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

১৯৭৬ সালে “বহ্নিশিখা” সিনেমার জন্য তাঁকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কারে ভূষিত করেন বি.এফ.যে.এ. অর্থাৎ বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

১৯৭৭ সালে “প্রসাদ” পত্রিকা উত্তমকুমারকে জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মানে ভূষিত করেন। সম্ভবত ১৯৭৭ সালেই সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের মুখ্য মন্ত্রীত্বের আমলে, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে ৫০০০ টাকা পুরস্কার পান। সেই টাকা তিনি দুঃস্থ কলাকুশলীদের তহবিলে দিয়ে দিয়েছিলেন। এই বছরই “আনন্দ আশ্রম” সিনেমার জন্য তাঁকে সাংস্কৃতিক সাংবাদিক সংস্থা (সাসাস) শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মানে ভূষিত করেন।
.


উত্তমকুমারের জনপ্রিয়তার স্বাদ ও বিড়ম্বনা -     ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৬ সালে “হারানো সুর” ছবির জন্য সার্টিফিকেট অফ মেরিট পুরস্কার এবং সিনেমাটি হিট্ হওয়ার পরে তাঁদের বর্ধমানে সম্বর্ধনা দেবার আয়োজন করেছিলেন বর্ধমান সিনেমার কর্ধার বিমলবাবু। বর্ধমানের সিনেমা হলে পৌঁছে হলের চারপাশে প্রচণ্ড ভীড় দেখে প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও বাইরে “উত্তমদা কি জয়” স্লোগানের ধ্বনি শুনেছিলেন এই প্রথম! গাড়িতে বসে বসেই জানালা দিয়ে ভিড়ের হাতের কাগজের টুকরো. নোটবুকে এমন কি দশ টাকার নোটেও সই বা অটোগ্রাফ দেবার অনুরোধে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করেছিলেন। আশ্বস্ত হয়েছিলেন এই ভেবে যে তাঁর পূজার প্রসাদে তাঁর দর্শকদের তুষ্ট করতে পেরেছেন।

“শ্যামলী” নাটকে অভিনয় করার সময়ে একবার “সবার উপরে” সিনেমার শূটিং করতে যেতে হয়েছিলো কৃষ্ণনগরে। শুটিং সেরে গাড়িতে দ্রুত স্টার থিয়েটারে ফিরে অভিনয় শেষে যখন মেকআপ তুলছেন, তখন এক বিবাহিতা ভদ্রমহিলা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তিনি নাকি কৃষ্ণনগর থেকে তাঁদের গাড়ি ফলো করে এসে স্টার থিয়েটারে টিকিট কেটে তাঁর অভিনয়ও দেখেছেন। এরপর তিনি বোমা ফাটানোর মতো করে বললেন যে তিনি আর বাড়ি ফিরবেন না! শুনে তো উত্তমকুমার মহা অশ্বস্তিতে পড়ে গেলেন এবং বিব্রত বোধ করতে লাগলেন। সেদিন সেই মহিলাকে তিনি অনেক বুঝিয়ে, মিনতি জানিয়ে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করেছিলেন।

আরেক বার “হারানো সুর” সিনেমার শূটিং করার সময় হঠাৎ একদিন যখন বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিলেন, এক উদ্ভ্রান্ত মাঝবয়সি ভদ্রলোক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন যে তিনিই উত্তমকুমার কি না! তিনি হ্যাঁ বলাতে ভদ্রলোক ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে কাঁদতে কাঁদতে বললেন যে তাঁর স্ত্রী তাঁরই সঙ্গে দেখা করবে বলে চারদিন আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফেরেনি! শুনে তিনি খুবই লজ্জিত বোধ করেছিলেন কিন্তু নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন যে এরই নাম সত্যিকারের জনপ্রিয়তা!

তাঁর জনপ্রিয়তার সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায় এসেছিলো ১৯৬৭ সালে, যখন তাঁর অসুস্থ স্ত্রী গৌরী দেবী, ইনফেকটিভ হেপাটাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার পি জি হাস্পাতালে ভর্তি ছিলেন। তখন তিনি তাঁর প্রথম হিন্দী ছায়াছবি “ছোটি সি মুলাকাত” মুক্তি পেয়ে বক্সঅফিসে ফ্লপ্ করার পরে তাঁর প্রথম স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে কিছুটা সুস্থ। তিনি যখন গৌরী দেবীর সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করতে যেতেন তখন তিনি হাসপাতালে ঢুকলেই প্রচণ্ড বিশৃঙ্খলা দেখা দিতো। উত্তমকুমারকে দেখা চাই! শেষ পর্যন্ত সবাই বললেন, আপনি এখানে যদি না আসেন ভালো হয়। তিনি আর উপায় না দেখে সে কথা মেনে নিয়েছিলেন।
.


উত্তমকুমারের সিনেমা প্রযোজনা -     ^^ উপরে ফেরত
উত্তমকুমার, অভিনয় করার পাশাপাশি অনেক ছবির প্রযোজনাও করেছেন। তা শুধু প্রযোজক হবার সাধ বা ব্যবসায় লাভ করার সাধ থেকে নয়। তাঁর মনে হতো বাংলা ছায়াছবির সংখ্যা বাড়ানো উচিত। নতুন নতুন মানুষেরা যদি সাহস নিয়ে ব্যবসাক্ষেত্রে অবতীর্ণ না হয় তা হলে সিনেমার ব্যাবসা ক্ষীণ অবস্থায় এসে দাঁড়াবে। তার মতে এ জগৎ তো শুধু মাত্র শখ-শৌখিনতার জগৎ নয়, এ যে মহান শিল্পী-তীর্থ। কত শত মানুষের জীবিকার সঙ্গে এর সম্পর্ক। তাই তিনি প্রযোজনায় এগিয়ে এসেছিলেন।

তাঁর প্রযোজিত ছায়াছবির মধ্যে রয়েছে “হারানো সুর”, “সপ্তপদী” প্রভৃতি।
.


রবীন্দ্রনাথের শেষ যাত্রায় উত্তমকুমার -         ^^ উপরে ফেরত
১৯৪১ সালের ৭ই অগাস্ট, বাংলার ২২শে শ্রাবণ ১৩৪৮, রাখিপূর্ণিমার দিন চলে গেলেন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সে দিন যে লক্ষাধিক মানুষের ঢল নেমেছিল কলকাতার রাস্তায়, সেই বিশাল মিছিলে যোগ গিয়েছিলেন ১৫ বছরের কিশোর উত্তমকুমারও।


.


উত্তম কুমারের গান ও ভারত ছাড়ো আন্দোলন -      ^^ উপরে ফেরত
স্কুল জীবনের শেষ থেকেই গান গাইতেন। ১৯৪২ সালে কবি তখন ১৬ বছরের কিশোর, সাউথ সুবার্বান স্কুলের ছাত্র। তিনি শিল্পী ও শিক্ষক নিদান ব্যানার্জীর কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন।

৮ই আগস্ট ১৯৪২ শুরু হলো ভারত ছাড়ো আন্দোলন। গান্ধীজী সহ বহু নেতা-নেত্রী-কর্মীর জেল হলো। তমলুকে, পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারালেন পতাকা হাতে অশীতিপর মাতঙ্গিনী হাজরা। নেতাদের জেলে বন্ধী করলেও সাধারণ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রাস্তায়, মাঠে-ময়দানে, সভা-সমিতিতে। ঠিক এর মধ্যেই উত্তমকুমাররা মাঝে মাঝেই হাতে ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা নিয়ে, প্রভাত ফেরী করে ঘুরে আসতেন গোটা ভবানীপুর। সেই সব মিছিলের নেতৃত্ব দিতেন তিনি নিজে। দেশাত্মবোধক গান গাইতেন তাঁরা। সেই সব গান তিনি নিজে লিখে সুর দিয়ে গাইতেন। আমরা সেই গান পাই নি।

১৯৪৩ সালে যখন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ কোহিমায় ভারতের পতাকা উত্তোলন করলেন, তখনও তাঁরা প্রভাত ফেরী করতেন, গান গাইতেন।

১৯৪৫ সালে নেতাজীর জন্মদিনে তিনি যে গানটি রচনা করে, সুর দিয়ে গেয়েছিলেন, সেই একটি মাত্র গান এখানে কবিতার পাতায় দেওয়া রয়েছে।

১৯৪৭ সালের মার্চ থেকে কলকাতায় দাঙ্গা শুরু হয়। রিলিফের দেওয়ার সাথে তিনি একটি হিন্দি গান লিখে, সুর দিয়ে গাইতেন, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে, এবং পরে বিভিন্ন আসরেও। এই হিন্দী গানটিও আমরা এই পাতায় তুলে দিয়েছি।

তিনি গান গাইতেন বিভিন্ন বিচিত্রানুষ্ঠানে, সুযোগ পেলে। কিছুদিন চক্রবেড়িয়া (সাউথ) “মনোরমা” স্কুলে গান শিখিয়েছিলেন। কালীঘাটের একটি বাড়িতে দুটি মেয়েকেও তিনি কিছুদিন গান শিখিয়েছিলেন।

১৯৫৬ সালে দেবকীকুমার বসুর ‘নবজন্ম’ ছবিতে নচিকেতা ঘোষের সুরে ছয়টি গান বা কীর্তন গেয়েছিলেন। কেউ বলছেন - দেবকীকুমার বসুর ‘নবজন্ম’ ছবিতে নচিকেতা ঘোষের সুরে ছয়টি গান গেয়েছেন। সে সব পরে নাকি অ্যালবাম আকারে প্রকাশও হয়েছিল। তার মধ্যে “কানু কহে রাই” গানটি GOLDEn Era ফেসবুকে শুনতে এখানে ক্লিক করুন . . .

গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজে সংগীত পরিচালনা করেছেন “কাল তুমি আলেয়া” ছবিতে। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষে মেগাফোন থেকে প্রকাশিত রবীন্দ্রসংগীতের চারটি সিডির অ্যালবাম ‘আমাদের যাত্রা হলো শুরু’র শেষ দুটি গানের শিল্পী ছিলেন উত্তম কুমার। প্রযোজনা সংস্থাটির “অপ্রকাশিত রেকর্ডিং” থেকে প্রকাশিত হয়েছে উত্তম কুমারের কণ্ঠে “আমার সোনার হরিণ চাই” ও “অনেক কথা বলেছিলেম” গান দুটি। অন্যদিকে “পেরিনিয়াল রেকর্ডস” থেকে প্রকাশিত হয়েছে উত্তম কুমারের গাওয়া আরও দুটি রবীন্দ্রসংগীত “তুমি ধন্য ধন্য হে” এবং “তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী”। উত্তমকুমার “কাল তুমি আলেয়া” ছায়াছবির সব গানের সুরারোপ করেন।
.


শিল্পী সংসদ ও উত্তমকুমারের বনপলাশীর পদাবলী - ^^ উপরে ফেরত
উত্তমকুমার আমৃত্যু শিল্পী সংসদের সভাপতি ছিলেন। সিনেমা, থিয়েটার ও যাত্রার শিল্পীরাও এই সংসদের সভ্য। তিনি চেষ্টা করতেন যাতে এর মাধ্যমে দুঃস্থ শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানো যায়। তাঁরা ঠিক করলেন যে সবাই মিলে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে একটি সিনেমা করবেন যার থেকে দুঃস্থ শিল্পীদের সাহায্য করা যাবে।

রমাপদ চৌধুরীর কাহিনী “বনপলাশীর পদাবলী” বেছে নেওয়া হলো। উত্তমকুমার প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি এই ছবির জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেবেন না। চিত্রনাট্য, পরিচালনা এবং আবহসঙ্গীতও তার নিজের ছিল। এই বিরাট স্প্যানের কাহিনী নেবার পিছনে উদ্দেশ্য ছিল এই যে যেহেতু অধিকাংশ শিল্পী বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে রাজি হয়েছেন, সেহেতু তাঁদের প্রত্যেকেই যেন কিছু না কিছু দৃষ্টি-আকর্ষণীয় চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ দেওয়া যায়। রঞ্জিতমল কাঙ্কারিয়াও এগিয়ে এলেন এই ছবি তৈরিতে অংশ গ্রহণ করতে। যাত্রার জনপ্রিয় নট স্বপনকুমারও এই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন।
.


সমাজ সেবা ও উত্তম কুমার -         ^^ উপরে ফেরত
১৯৪৭ সালের দাঙ্গার সময়ে তাঁরা হতভাগ্যদের রিলিফের ব্যাবস্থা করেছিলেন। তাঁদের খিচুরি রান্না করে খাওয়াতেন।

১৯৭৪ সালে মালদহের বন্যাত্রাণ সমিতির উদ্যোগে ময়দানে শিল্পী সংসদের সৌজন্যে বন্যাপীড়িতদের সাহায্যার্থে বিচিত্রানুষ্ঠান করেছেন।

সম্ভবত ১৯৭৭ সালে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের মুখ্য মন্ত্রীত্বের আমলে, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে ৫০০০ টাকা পুরস্কার পান। সেই টাকা তিনি দুঃস্থ কলাকুশলীদের তহবিলে দিয়ে দিয়েছিলেন।

১৯৭৯ সালের মে মাসে, বন্যাত্রাণের জন্য C.A.B. (Cricket Association of Bengal) এর মাঠে কলকাতা-বম্বে-মাদ্রাজের অভিনেতাদের নিয়ে প্রদর্শনী ক্রিকেট ম্যাচ খেলার আয়োজন করেন এবং সেখান থেকে উঠে আসা চার লক্ষ বারো হাজার বিরানব্বই টাকা তদানিন্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর অফিসে গিয়ে দিয়ে এসেছিলেন।

এ ছাড়া ক্রিকেটের মাঠে নেমে খেলেছেন বেনিফিট বা চ্যারিটি ম্যাচ বা বন্যাদুর্গতদের জন্য পথে পথে ঘুরে চাঁদা তুলেছেন বহুবার।
.


প্রতিবাদী ও সহানুভূতিশীল উত্তম কুমার -         ^^ উপরে ফেরত
বাংলা সিনেমার জগতে তখন একটি নিয়ম চালু ছিলো। প্রোডিউসররা নাম করা শিল্পীদের জন্য স্পেশাল খাবারের আয়োজন করতেন। আর অনামী ও নিম্নস্তরের শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য থাকতো অতি সাধারণ ব্যবস্থা, উত্তম কুমারের ভাষায় – অখাদ্য। পরিবেশন করা হতো প্লেটের বদলে শালপাতায়। তিনিও তাঁর ফিল্ম জীবনের শুরুতে এর ভেতর দিয়েই এসেছিলেন।

একবার অনিল চ্যাটার্জীর সঙ্গে কোনো একটি সিনেমার শুটিং এর ফাঁকে তিনি অনিল বাবুকে খেতে ডেকেছিলেন তাঁর সাথে। পরবর্তিতে “মেঘে ঢাকা তারা” খ্যাত অনিল চ্যাটার্জী তখনও তেমন নাম করেন নি। তিনি উত্তম কুমারের আমন্ত্রণে কিছুটা সংকোচ বোধ করলেন। তবুও তাঁরা একত্রে খেতে বসলেন। খাবার এল। উত্তম কুমারের জন্য প্লেটে সাজানো খাবার আর অনিল চ্যাটার্জীর জন্য শালপাতায় অতি সাধারণ খাবার। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল তাঁর ক্ষোভ ছিলো। অনিল চ্যাটার্জী তাঁকে সংযত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনি প্লেটটি সরিয়ে রেখে দিলেন। খবরটি রটে যাওয়াতে প্রোডিউসার দৌড়ে এলেন। উত্তম কুমার তাঁকে বলেছিলেন যে সবাইকে যদি সমান সম্মান দিতে না পারেন তাহলে এ খাবার তিনি খাবেন না। শুধু তাঁর জন্য স্পেশাল ব্যবস্থা করে বাকি কলাকুশলীদের অপমান যেন না করেন। এই ঘটনার পরে, বাংলা সিনেমা জগতে সেই প্রথার অবসান ঘটেছিলো।

আরেকটি ছবিতে অনিল চ্যার্জীর সঙ্গে শূটিং এর সময় আবার তিনি প্রতিবাদ করে ওঠেন। নবাগত শিল্পীদের শূটিংএর কালেও কম প্রাধান্য দেওয়া হতো। এবারের শট্ টা দুজনের ছিলো। শূটিং জোনে আলো প্রস্তুত করার পর ও দুজনের মনিটার দেওয়ার পরে তিনি লক্ষ্য করলেন যে ক্যামেরা এমন জায়গায় রয়েছে যেখান থেকে টেক করলে সম্পূর্ণ প্রাধান্য তিনিই পাবেন। অথচ এই শটের চিত্রনাট্যে অনিল চ্যাটার্জীর প্রাধান্য পাওয়া উচিত। উত্তম পরিচালককে বললেন শটটা নিতে চাইলে তাঁদের পজিশন বদল করতে। পরিচালক প্রথমে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলেও শেষে উত্তমকুমারের নির্দেশ বা অনুরোধ রাখতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত অনিল চ্যাটার্জীকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল সেই সিনে।

১৯৫৬ সালে সুচিত্রা সেন অভিনীত “হারানো সুর” ছবিতে অজয় করের ক্যামেরাম্যান ইসমাইল ও কানাই, একদিন ভুল করে ক্যামেরায় সাউন্ড নেগেটিভ চাপিয়ে শূটিং করেছিলেন। ব্যাপারটা যখন ধরা পড়লো তখন ভয়ে অজয়বাবুকে এই কথা জানাতেও পারছিলেন না। তাই উত্তম কুমারের কাছে এসে ব্যাপারটা বলেছিলেন কারণ তাঁদের মতো টেকনিশিয়ানরা জানতেন যে উত্তমকুমার বড় মনের মানুষ! ছবির প্রযোজক ছিলেন অজয়বাবু এবং উত্তম কুমার। তাই তাঁরও তো রেগে যাবার কথা ছিল। কিন্তু তিনি ওদের বাঁচাতে, দোষটা নিজের ঘাড়ে নিয়ে, মানে তাঁর অভিনয় ঠিক হয়নি বলে, অজয়বাবুকে অনেক বুঝিয়ে, রিটেক করিয়েছিলেন।
.


উত্তম-সুপ্রিয়া -         ^^ উপরে ফেরত
১৯৫২ তে “বসু পরিবার” সিনেমা হিট করার পরে তিনি কলকাতা পোর্ট কমিশনার্স এর চাকরি ছেড়ে দেন। “বসু পরিবার” সিনেমায় নায়ক উত্তমকুমারের বোনের ভূমিকায় ছিলেন নবাগতা সুপ্রিয়া দেবী, তখন সুপ্রিয়া ব্যানার্জী।

সুপ্রিয়া দেবীর পরিবার থাকতেন বর্মায়। ১৯৩৯ সালে সেখানে বোমাবর্ষণের ফলে ভারতীয় মূলের মানুষ এখানে চলে আসছিলেন। তাঁরাও সেই দলে কলকাতায় এসে উত্তমকুমারদের কাছেই ভাড়া থাকতেন। অনেক ভাই-বোনের মধ্যে তাঁর বড়দির বিয়ে হয়েছিল বিখ্যাত সাহিত্যিক বনফুলের সাথে।

উত্তম কুমার তাঁকে ফ্রক পরা অবস্থা থেকেই দেখেছেন। সুপ্রিয়া দেবী সিনেমায় সুযোগ পান তখনকা অভিনেত্রী চন্দ্রাবতী দেবীর সৌজন্যে। তাঁর বিয়ে হয় বিশ্বনাথ চৌধুরীর সাথে এবং তাঁদের এক কন্যা সোমা। ১৯৬২ তে বিশ্বনাথ বাবুর সঙ্গে তাঁর বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

সুপ্রিয়া দেবী একবার উত্তমকুমারকে বলেছিলেন যে তিনি যখন সিনেমায় উত্তমের সঙ্গে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করতে শুরু করেন তখন থেকেই মনে মনে তিনি তাঁকে ভালবেসে ফেলেছিলেন। ধীরে ধীরে সম্পর্কটি পারস্পরিক বা মিউচুয়াল হয়ে উঠেছিল।

১৯৬৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, স্ত্রী গৌরী দেবীর জন্মদিনে, প্রচণ্ড মন কষাকষির ফলে উত্তমকুমার তাঁর পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে এসে ওঠেন সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা স্ট্রীটের বাড়িতে। সেখানেই তিনি জীবনের শেষ ১৭ বছর কাটান। সুপ্রিয়াদেবীর কন্যাকে তাঁর নিজের কন্যার মর্যাদা দিয়েছিলেন।

১৯৮০-র ২৪শে জুলাই রাতে, বেলভিউ নার্সিং হোমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পরে উত্তমকুমারের পরিবার তাঁর মৃতদেহ নিয়ে চলে যান তাঁদের গিরিশ মুখার্জী রোডের বাড়িতে। সুপ্রিয়া দেবী আর তাঁকে দেখতে পান নি।
.


উত্তম-সুচিত্রা -         ^^ উপরে ফেরত
উত্তম-সুপ্রিয়া জুটি বেশী জনপ্রিয় ছিল না কি উত্তম-সুচিত্রা জুটি!? সেটা নিয়ে তর্ক চলতেই থাকবে। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই যে উত্তম-সুচিত্রার ”সপ্তপদী” সিনেমার, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে, হেমন্ত ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে, উত্তম-সুচিত্রার বাইকে চড়ে ”এ পথ যদি না শেষ হয়” কালজয়ী গানটি বাংলা সিনেমার অন্যতম সেরা গানের সিকোয়েন্স হিসেবে অমর হয়ে খাকবে আরও বহু কাল।

শোনা যায় যে ১৯৭২ সালে, হার মানা হার ছায়াছবির, চণ্ডীপুরের একটি নাচের সিকোয়েন্সের শূটিং এর সময়ে সুচিত্রা দেবী নাকি সুপ্রিয়া দেবী কে বলেছিলেন যে তোমার কি হিংসে হচ্ছে, আমাদের দুজনকে এভাবে দেখতে!? সুপ্রিয়াদেবী নাকি উত্তর দিয়েছিলেন যে তিনি তো এরকম সীন বড় পর্দায় বহুবার দেখেছেন। তাই এতে তিনি অস্বাভাবিক কিছু মনে করেন না।

উত্তমকুমারের আত্মজীবনী তে সুচিত্রা দেবীর সম্বন্ধে তাঁর শ্রদ্ধাই বেশী দেখা যায়, আবেগের থেকে। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে যে সুপ্রিয়া দেবীই ছিলেন তা তিনি স্পষ্ট জানিয়ে গিয়েছেন। অবশ্য তাঁর স্ত্রী গৌরী দেবীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা, উৎকণ্ঠা ও প্রেম কোনো অংশে কম দেখা যায়না।
.


উত্তমকুমার ও সত্যজিৎ রায় -     ^^ উপরে ফেরত
১৯৬৬ সালে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে প্রথম সিনেমা “নায়ক”। এবং ১৯৬৭ সালে দ্বিতীয় সিনেমা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা “চিড়িয়াখানা”, যার জন্য তিনি পান বি.এফ.যে.এ-র শ্রেষ্ঠ নায়ক পুরস্কার এবং আমন্ত্রিত হন বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভালে।

কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় বেরিয়েছিলো যে “নায়ক” সিনেমায় কাজ করার সময়, অনেকেই যখন জানতে চায় যে সত্যজিৎ রায় উত্তমের থেকে ঠিক কি রকম কাজ চাইছিলেন, তখন তিনি নাকি বলেছিলেন যে উনি এই ভূমিকায় তাঁকে ঠিক নিজের চরিত্রটিই অভিনয় করতে বলেছিলেন! দ্বিতীয় সিনেমা “চিড়িয়াখানা”-র সময় তাঁকে বিশেষ মেকআপ নিয়ে, জাপানী ওকাকুরা সেজে অভিনয় করতে হয়। স্বল্প জানা তথ্য হলো এই যে “নায়ক” এর আগেও সত্যজিৎ রায় উত্তমকুমারকে “ঘরে বাইরে”-এর সন্দীপ এর রোল টা দিতে চেয়েছিলেন। সেটা নেগেটিভ রোল বলে তখন উত্তম তা না করে দেন।
.


উত্তমকুমার ও বিশ্বজিত চ্যাটার্জী -   ^^ উপরে ফেরত
উত্তমকুমার অভিনয় করেছিলেন কার্তিক চ্যাটার্জী পরিচালিত, বিমল মিত্রের "সাহেব বিবি গোলাম" সিনেমায় ভূতনাথ চরিত্রে। রংমহল থিয়েটারে, "সাহেব বিবি গোলাম" নাটকে ভূতনাথ চরিত্রে বিশ্বজিত চ্যাটার্জীকে অভিনয় করতে হয়। বিশ্বজিত, উত্তমকুমারের ভাই তরুণকুমারের বন্ধু ছিলেন। সেই সূত্রে তিনি এসে উত্তম কুমারের সাথে দেখা করে সেই চরিত্রের অভিনয়ের বিস্তারিত খুটিনাটি বুঝে নিতে গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, রিহারসেলের রোজ সকালে উত্তমকুমারের ভবানীপুরের বাড়িতে গিয়ে দু-তিন ঘন্টা ধরে শিখে আসতেন। উত্তমকুমার শত ব্যস্ততা সত্বেও বিশ্বজিতকে এই সময় দিয়ে দাদার কর্তব্য পালন করেছিলেন।

“মায়ামৃগ” সিনেমায় নায়ক শুভ্রর ভূমিকায় অভিনয় করার কথা ছিল উত্তমকুমারের। বিশ্বজিত তখন রংমহলে থিয়েটার করেন। দু-একটি সিনেমাতেও কাজ করেছেন। শুভ্র-র চরিত্রে অভিনয় করার তাঁর ভীষণ ইচ্ছা ছিলো। সেই কথা কানে আসতেই উত্তম বিশ্বজিত কে সেই রোলটি দেবার ব্যবস্থা করে নিজে মহিম-এর ভূমিকায় অভিনয় করেন।
.


উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় -   ^^ উপরে ফেরত
অভিনেতা ও কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও তাঁর খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। তাঁদের একত্রে অভিনয় করা ছায়াছবির মধ্যে রয়েছে “ঝিন্দের বন্দী”, “প্রতিশোধ”, “অপরিচিত”, “দর্পচূর্ণ”, “যদি জানতেম”, “যদুবংশ”, “পংখীরাজ”, “দেবদাস”, “স্ত্রী” প্রভৃতি।

১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি “ঝিন্দের বন্দী”-তে তাঁরা দুজনেই অভিনয় করেছিলেন। উত্তমকুমার দ্বৈত-ভূমিকায় এবং সৌমিত্র ভিলেন। সেই ছায়াছবির শূটিং এর জন্য তাঁদের দীর্ঘদিন উদয়পুরে থাকতে হয়েছিল। প্রচুর অবসর সময় পেতেন। সেই সময়ে দুজনে চুটিয়ে আড্ডা মারতেন, গল্প করতেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকেই প্রেস জানতে পারে ১৯৭১ সালে কেন উত্তমকুমার হঠাৎ বম্বে চলেগিয়েছিলেন, কারণ তারা বন্ধু ছিলেন।
.


টালিগঞ্জে মহানায়ক উত্তম কুমারের মূর্তি -   ^^ উপরে ফেরত
১৯৮৪ সালে টালিগঞ্জ ট্রামডিপো ও মেট্রো স্টেশনের মাঝে দেশপ্রাণ শাসমল রোড, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু রোড ও বর্তমান উত্তমকুমার সরণীর সংযোগস্থলে স্থাপন করা হয় উত্তমকুমারের পূর্ণ ব্রোঞ্জের মূর্তি।

বিখ্যাত শিল্পী নিরঞ্জন প্রধান এই মূর্তিটি তৈরী করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানেই উত্তমকুমারের স্মৃতিতে তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কলকাতার নাগরিকরা। মূর্তিটি এত সুন্দর করেছেন শিল্পী নিরঞ্জন প্রধান, যে মূর্তির পিছন দিক থেকে দাঁড়ানো উত্তমকুমারকে একবাক্যে চিনে নেওয়া যায়। কিন্তু মুখের আদলটি নিয়ে সে সময়ের পত্র-পত্রিকায় বেশ কিছু সমালোচনা হয়েছিলো। শিল্পী বলেছিলেন যে তাঁর চোখে উত্তমকুমার যেমন দেখতে, তেমনটিই তিনি বানিয়েছেন। সেটা অবশ্য অনেকেই মেনে নিতে চান নি, কারণ এমন সর্বজন পরিচিত মানুষের মূর্তি যখন প্রকাশ্যে পথের মাঝে বা মোড়ে বসানো হয় তখন প্রথম প্রয়োজন হলো সাধারণ পথ-চলতি মানুষের চোখে সেই মানুষটিকে চিনিয়ে দেওয়া। সেটা এক্ষেত্রে পুরোপুরি হয়নি।
.


মহানায়ক উত্তম কুমার মেট্রো স্টেশন -   ^^ উপরে ফেরত
২২শে অগাস্ট ২০০৯ তারিখে কলকাতার “টালিগঞ্জ” মেট্রো স্টেশনটির নতুন নামকরণ করা হয় “মহানায়ক উত্তমকুমার” মেট্রো স্টেশন। সেদিন টালিগঞ্জের দক্ষিণে আরও চারটি স্টেশনে নতুন ট্রেন চালু করা হয়। এই উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর পৌত্র তথা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী, ভারতের অর্থ মন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং ভারতের রেল মন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই নতুন স্টেশনগুলির নামকরণ করেছিলেন তদানীন্তন রেল মন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
.


ভাষ্যকার উত্তমকুমার -   ^^ উপরে ফেরত
১৯৭৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের কন্যা অপর্ণা রায়ের পঁচাত্তরতম জন্মবার্শিকী উপলক্ষে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর জীবনালেখ্য অবলম্বনে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করা হচ্ছিল। সেই তথ্যচিত্রের ভাষ্যকার হবার আমন্ত্রণ পান উত্তমকুমার। তিনি সেই দায়িত্ব শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করেছিলেন। তথ্যচিত্রটি দেখানোর দিন তিনিও উপস্থিত ছিলেন পশ্চিবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ও অন্যান্য গণ্যমান্যরা।

এছাড়া ভাষ্যকার হিসেবে তাঁর আরেকটি বড় কাজে অবদান রয়েছে। তা হলো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় আকাশবাণী কলকাতা থেকে প্রচারিত মহালয়ার “মহিষাসুরমর্দিনী”-র পরিবর্তে “দেবী দুর্গতিনাশিনী” যার ইতিহাস আমরা পরের অনুচ্ছেদে তুলে ধরেছি।
.


আকাশবাণী কলকাতার মহালয়া ও উত্তমকুমার -   ^^ উপরে ফেরত
১৯৭৬-এ আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ একবার বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বাতিল করে দিয়ে মহানায়ক উত্তম কুমারকে দিয়ে ভাষ্য পাঠ করিয়ে নতুনভাবে এই অনুষ্ঠান পরিবেশন করে যার নাম ছিল “দেবী দুর্গতিনাশিনী”, কিন্তু সে পরিবর্তন বাঙালী মেনে নেয়নি। অনুষ্ঠান শেষে ব্যাপক জনরোষ দেখা দেয়। মজার ব্যাপার ছিল এই যে এই নতুন অনুষ্ঠানের নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সকলেই সেই সময়কার সংস্কৃতিক-জগতের অতি নমস্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন! তা সত্ত্বেও প্রত্যাখ্যানের সুর এতটাই চড়া ছিল যে খ্যাতির মধ্যগগনে থাকা মহানায়ক উত্তমকুমার ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে ব্যাপক তিরস্কার হজম করতে হয় তাঁদেরই অগণিত ভক্তের কাছ থেকে। শেষে উত্তম কুমার ও আকাশবাণীকে ক্ষমা চাইতে হয়। আকাশবাণী আর দ্বিতীয়বার সাহস দেখাননি মহানায়কের অনুষ্ঠানটির সম্প্রচার করার, ওই সময়ে। সেই “জরুরী অবস্থা”-র জমানাতেও জনগণের প্রবল প্রতিবাদে মহাষষ্ঠীর সকালে “মহিষাসুরমর্দিনী” সম্প্রচার করতে বাধ্য হয়েছিল সরকারি প্রচার মাধ্যম “আকাশবাণী”। পরের বছর থেকে আবার ফিরে আসে বাণীকুমার-পঙ্কজকুমার মল্লিক-বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের “মহিষাসুরমর্দিনী”। বাঙালী, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিনা বিজ্ঞাপনেই শুনে চলেছে এই অনুষ্ঠান!

এই ঘটনাটি নিয়ে তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে জানিয়েছেন যে কাজটি তাঁকে সরকারি নির্দেশে করতে হয়, তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে। তিনি জানতেন যে এই কাজটিতে তিনি কৃতকার্য হতে পারবেন না। আর হয়েছিলও তাই।
.


সরোজ দত্ত হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী উত্তমকুমার -   ^^ উপরে ফেরত
নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতা ও কবি সরোজ দত্ত, ১৯৭০ সালে কলকাতা পুলিশের ও প্রশাসনের মোস্ট ওয়ান্টেড এর তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন। ৫ অগাস্ট ১৯৭১ এর ভোর ৫ ~ ৫.৩০ এর মধ্যে ময়দানের এরিয়ানস মাঠের কাছে তাঁকে জীপে করে এনে চুপিসাড়ে হত্যা করা হয়। গুলি করে মেরে তাঁর মাথা কেটে নেয়া হয়েছিল। “বাংলাদেশ” পত্রিকায় পরে বের হয় যে বাংলা সিনেমার এক বিখ্যাত নায়ক নাকি সেই সময় ময়দানে ভ্রমণ করতে গিয়ে এই ব্যাপারটা দেখতে পেয়েছিলেন। এবং পরে নাকি তাঁকে বেশ কিছু দিন বাংলার বাইরে গিয়ে থাকতে হয়। সেই সময়ে বম্বেতে তাঁকে শেল্টার দেন দেবেশ ঘোষ। প্রায় আড়াই মাস পরে ফিরে এসেছিলেন। বাংলার ক্ষমতায় তখন সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের কংগ্রেস সরকার।

সেই ক’মাস তাঁকে ছাড়া কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা যে খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল তা ১৯৭১ সালের “প্রসাদ” পত্রিকার ডিসেম্বর মাসের সংখ্যার এই লেখা থেকে জানা যায় . . .
“উত্তমকুমার সুদীর্ঘ আড়াই মাস কলকাতায় অনুপস্থিত ছিলেন। ফলে কলকাতার স্টুডিওগুলির অবস্থা দারুণ শোচনীয় হয়ে উঠেছিল। ওঁকে নিয়ে তখন শূটিং চলছিল বড় বড় পাঁচখানা ছবির। ...চলে যাওয়ার ফলে তাঁর এই পাঁচটি ইউনিটের কলাকুশলী এবং সহশিল্পীরা বেকার বসে ছিলেন। উত্তম বিহনে ফিল্ম লাইনের জীবনে এই ধরণের ট্র্যাজেডি এই সর্বপ্রথম। এবার আর একটা জিনিষ খুব পরিষ্কার উপলব্ধি করা গেল যে ওঁকে বাদ দিয়ে আপাতত আর কিছু করা যাবে না।...”

জলার্ক পত্রিকাকে, কলকাতার ভবানীপুরে, ১৯.১১.১৯৯৬ তে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে, অভিনেতা ও কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন যে - “. . .
উনি (উত্তম কুমার) এরকম একটা ঘটনা দেখেছিলেন --- মানে ময়দানে পুলিশ একজনকে ভ্যান থেকে নামিয়ে গুলি করছে। কিন্তু সেটা যে সরোজ দত্তই---তা অন্যেরা connect করছেন। উত্তমদার পক্ষে তিনি যে সরোজ দত্তই তা at all চেনা সম্ভব ছিল বলে আমার মনে হয় না। ব্যক্তিগত পরিচয় তো ছিলই না, আর উত্তমদা এসব থেকে অনেক দূরে ছিলেন। সে সময় ভ্যান থেকে নামিয়ে গুলি করার ঘটনা তো অনেকই ঘটেছে। . . . কেউ তাকে ফোর্স করেছিল তা কিন্তু নয় ; যা হয়েছিল ওই ঘটনা যেদিন ঘটে (এই ঘটনাও আমার শোনা---দেখিনি) সেই দিনই টালিগঞ্জে কিছু ছেলে ওঁর কাছে আসে এবং টাকা চায়। ওঁর সঙ্গে যারা থাকতো তাদের সাথে সেই ছেলেদের, যাদের কাছে কিছু অস্ত্রও ছিল, বচসা হয়। সম্ভবত অস্ত্র নিয়ে মেক-আপ রুমে ঢুকে ওঁকে ভয় দেখায়। আমার ক্ষেত্রেও এই রকম ঘটনা ঘটেছিল।” থ্রেট সেই দিনই করা হয়েছিল কি না --- এই প্রশ্নের উত্তরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, “বোধ হয় ঐ দিনই। এটা কো-ইন্সিডেন্স। এতে নার্ভাস হয়ে উনি বোম্বাই চলে যান। আমি হয়তো ব্যক্তিগতভাবে সরোজ দত্তকে না চিনলেও সরোজ দত্ত কে তা জানতাম। কিন্তু উত্তমদা সরোজ দত্ত কে তা জানতেনও না। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম --- কি ব্যাপার, তোমাকে এমন লাগছে? উনি বললেন যে --- দেখ্, এভাবে ভয় দেখাচ্ছে, আবার এরকম একটা লোককে মারতে দেখলাম। আমার সাথে এই কথাবার্তা সেই দিনই বা দু’একদিন পরে হয়। তার পরে উনি বোম্বাই চলে যান। (স্বপন দাসাধিকারী সম্পাদিত সত্তরের শহীদ লেখক শিল্পী, দ্বিতীয় পর্ব, পৃষ্ঠা-৩৯৮।)

আমরা মিলনসাগরে কবি উত্তমকুমার এর কবিতা ও তাঁর জীবন ও কর্মযজ্ঞ আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা। এই পাতা মহানায়ক উত্তমকুমার এর প্রতি মিলনসাগরের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

বাঙালীদের বহু বদনাম আছে। তাঁরা অলস, তাঁরা আড্ডাবাজ, ফাঁকিবাজ, আরও অনেক কিছু। কিন্তু বাঙালীর যে ভাল গুণগুলি আছে, তার মধ্যে একটা হলো কবিতা লেখা! প্রায় সব বাঙালীই জীবনে দু-এক লাইন কবিতা লেখেন বা লিখেছেন। মিলনসাগরে আমাদের চেষ্টা সেই কবিতার মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক বাঙালীদের মিলনসাগরের কবিদের সভায় ধরা। মিলনসাগরের বাংলা কবিতার কালানুক্রমিক সূচী আসলে বাঙালীর ইতিহাস হয়ে উঠছে, কবিদের জীবনীর মধ্য দিয়ে।



কবি উত্তমকুমার এর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন



আমাদের ই-মেল
: srimilansengupta@yahoo.co.in
হোয়াটসঅ্যাপ
: +৯১ ৯৮৩০৬৮১০১৭



এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ১৬.১০.২০২৫


উৎস ---
^^ উপরে ফেরত