আমরা মিলনসাগরে  কবি নয়নানন্দের পদাবলী তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে  পারলে  এই
প্রচেষ্টাকে সফল মনে করবো।

কবি নয়নানন্দের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।    



আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ২৬.৬.২০২০।
...                                                                                            
*
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
কবি নয়নানন্দ - হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় তাঁর
১৯৪৬ সালে প্রকাশিত “বৈষ্ণব পদাবলী” নামক
সংকলনে তিন জন নয়নানন্দের পদাবলী সন্নিবেশ
করেছেন, তাঁদের বাস স্থানকে কেন্দ্র করে। তাঁরা
হলেন ...
১।
নয়নানন্দ (ভরতপুর), ২। নয়নানন্দ (মঙ্গলডিহি) এবং ৩। নয়নানন্দ (শ্রীখণ্ড)   
১। নয়নানন্দ (ভরতপুর) -                                                                পাতার উপরে . . .    
ইনি
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সমসাময়িক কবি। এঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল ধ্রুবানন্দ মিশ্র। তিনি জন্মগ্রহণ করেন   
মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দী মহকুমার, ভরতপুর গ্রামে। পিতা বাণীনাথ মিশ্র।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নিকট পার্ষদ
গদাধর পণ্ডিত ছিলেন নয়নানন্দের পিতৃব্য এবং দীক্ষাগুরু। নীলাচলে চলে যাবার আগে, গদাধর  
পণ্ডিত তাঁর  প্রতিষ্ঠিত গোপীনাথ বিগ্রহের সেবার ভার ধ্রুবানন্দের উপর অর্পণ করে যান।
নিত্যানন্দ দাসের
প্রেমবিলাস গ্রন্থের ২২শ বিলাসে রয়েছে যে এই বিগ্রহ এবং শ্রীচৈতন্যের স্বহস্তে লিখিত একটি শ্লোক সম্বলিত
তাঁর লেখা গীতা তিনি তাঁর অপ্রকট গবার কালে নয়নানন্দকে দিয়ে গিয়েছিলেন।

শ্রীচৈতন্যের লীলা দেখার সঙ্গে সঙ্গে নয়নানন্দ পদ্য রচনা করতেন। তাঁর এই আশ্চর্য্যকর কবিত্ব শক্তি দেখে
চৈতন্য এবং গদাধর,  দুজনেই  তাঁকে  অত্যন্ত  স্নেহ  করতেন  এবং গদাধর পণ্ডিত তাঁর নাম “নয়নানন্দ”
রাখেন। “প্রায়োভক্তি রসান্তর” নামে তিনি একখানা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাঁর বংশধরগণ উনিশ শতকেও
ভরতপুরে বাস করতেন।

নয়নানন্দ
শ্রীমহাপ্রভুকে সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণ এবং গদাধর পণ্ডিতকে শ্রীরাধার অবতার বলে বিশ্বাস করতেন।  
তাঁর গৌরাঙ্গবিষয়ক প্রায় প্রত্যেক পদেই শ্রীগৌরাঙ্গের সঙ্গে গদাধর পণ্ডিতের একাত্মতা ও প্রেম বিশেষভাবে
উঠে এসেছে (নীচে জগদ্বন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি পড়ুন সতীশচন্দ্র রায়ের
উদ্ধৃতিতে . . .)। পরবর্তী কালে গৌড়ীয়
বৈষ্ণবসমাজে শ্রীরাধা-কৃষ্ণ থেকে অভিন্ন-বোধে “গদাই-গৌরাঙ্গের” ভজনকারী যে সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছে,
নয়নানন্দের পদ তাঁদের ভজন-পদ্ধতির মূল-সূত্র-রূপে দেখা যেতে পারে।

১৮৮৯ সালে জগদীশ্বর গুপ্ত দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত,
কৃষ্ণদাস কবিরাজের “শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত”, আদি-
লীলা, দ্বাদশ পরিচ্ছেদ, শ্রীগদাধর পণ্ডিতের শাখাবর্ণনে নয়নানন্দের উল্লেখ রয়েছে, তাঁর পিতৃদত্ত নাম  
“ধ্রুবানন্দ” ও গুরুদত্ত নাম “নয়নানন্দ” বা “নয়ন মিশ্র” দুভাবেই . . .
শ্রীগদাধর পণ্ডিত উপশাখা মহোত্তম ;
তাঁর উপশাখা কিছু করি যে গণন।
শাখাশ্রেষ্ঠ ধ্রুবানন্দ, শ্রীধর ব্রহ্মচারী ;
ভাগবতাচার্য্য, হরিদাস ব্রহ্মচারী।
অনন্ত আচার্য্য, কবি দত্ত, মিশ্র নয়ন ;
গঙ্গা মন্ত্রী, মামু ঠাকুর, কণ্ঠাভরণ


নরোত্তম ঠাকুরের ছয় মূর্তি প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে খেতরীর মহোত্সবে যাওয়ার পথে নয়নানন্দের উল্লেখ আছে
১৯০৭ খৃষ্টাব্দে, কিশোরী দাস বাবাজী দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত
নরহরি চক্রবর্ত্তীর “নরোত্তম বিলাস” গ্রন্থের
৬ষ্ঠ বিলাসের ৪৯-পৃষ্ঠায়। এখানে নয়নানন্দের উল্লেখ রয়েছে “শ্রীনয়নানন্দ মিশ্র” নামে . . .
রঘুমিশ্র কাশীনাথ পণ্ডিত উদ্ধব।
শ্রীনয়নানন্দ মিশ্র মঙ্গল বৈষ্ণব

এই পাতার কবিদের ভণিতা
নয়নানন্দ, নয়নানন্দ দাস, নয়ান,
নয়ন দাস, দাস নয়ন
*
২। নয়নানন্দ (মঙ্গলডিহি) -                                                             পাতার উপরে . . .    
চৈতন্য পরবর্তী কবি। হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় তাঁর ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত “বৈষ্ণব পদাবলী” নামক সংকলনে
মঙ্গলডিহির নয়নানন্দের সাতটি পদ সন্নিবেশ করেছেন। চৈতন্য মহাপ্রভুর সময়কালে পর্ণিগোপাল বা  
গোপালচন্দ্র নামের এক অলৌকিক শক্তিধর ব্যক্তি, বীরভূম জেলার মঙ্গলডিহি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি
পান  বিক্রী  করে  জীবন  অতিবাহিত করতেন বলে তিনি পেনো বা পানুয়া ঠাকুর নামেও পরিচিতি লাভ
করেন। তাঁর নিজের কোনও  সন্তানাদি  ছিল না বলে তিনি এক ব্রাহ্মণের পাঁচ পুত্রকে দত্তক নিয়েছিলেন।
এঁদের মধ্যে কনিষ্ঠের নাম কানুরাম। তাঁর পুত্র গোপালচরণ। গোপাল চরণের দুই পুত্র, পদকর্তা
গোকুলানন্দ
ও নয়নানন্দ।

নয়নানন্দ সংস্কৃতে পণ্ডিত ছিলেন। মঙ্গলডিহি গ্রামে তাঁর একটি চতুষ্পাঠী ছিলো।

তাঁর রচনাসম্ভারে রয়েছে বহু কীর্তনের পদ এবং “শ্রীশ্রীকৃষ্ণভক্তি-রসকদম্ব” (১৭৩৩, মুরারিলাল অধিকারী
রচিত বৈষ্ণব দিগ্দর্শিনী মতে ১৭৩০ খৃষ্টাব্দ), “প্রয়োভক্তিরসার্ণব” (১৭৩৫) ও ভক্তিমাধ্বীকণা” নামের তিনটি
গ্রন্থ। তাঁর নিজের হাতে, তুলোট কাগজে লেখা “শ্রীশ্রীকৃষ্ণভক্তি-রসকদম্ব” নামের ২৫০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি   
সুরক্ষিত রয়েছে মঙ্গলডিহি গ্রামে। ১৯১৬ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, বীরভূম জেলার হেতমপুর এস্টেটের মহারাজা
মহিমারঞ্জন চক্রবর্ত্তী সম্পাদিত এবং তাঁর অর্থানুকুল্যে,
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় দ্বারা প্রকাশিত, “বীরভূম-
বিবরণ” ১ম খণ্ড, মঙ্গলডিহি কাহিনীতে উল্লিখিত রয়েছে এই গ্রন্থটির কথা।
*
৩। নয়নানন্দ (শ্রীখণ্ড) -                                                                   পাতার উপরে . . .    
চৈতন্য পরবর্তী কবি। এঁর সম্বন্ধে বেশী কিছু জানা যায় না। ১৩৬২ বঙ্গাব্দে (১৯৫৫ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত,  
শ্রীনিত্যনিরঞ্জন কবিরাজ দ্বারা সংগৃহীত বিভিন্ন লেখকের প্রবন্ধ-গ্রন্থের (ঘ)-পৃষ্ঠায়, তাঁর নিজের লেখা “আমার
জানা শ্রীখণ্ড সম্বন্ধে দু-চার কথা” প্রবন্ধে, একজন “নয়নানন্দ কবিরাজ”-এর উল্লেখ রয়েছে যিনি “অকিঞ্চন
সর্ব্বস্ব” নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। প্রিয়নাথ জানার “বঙ্গীয় জীবনীকোষ” গ্রন্থে তিনি লিখেছেন যে ইনি
শ্রীখণ্ড-বাসী বৈদ্য ছিলেন এবং ছিলেন প্রসিদ্ধ পদকর্তা। ইনি রঘুনন্দন ঠাকুরের শিষ্য ছিলেন।

হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় তাঁর ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত “বৈষ্ণব পদাবলী” নামক সংকলনে শ্রীখণ্ডের নয়নানন্দের
দুটি পদ সন্নিবেশ করেছেন। একটি পদ বংলায়, গৌর-বিষয়ক। অন্য পদটি ব্রজবুলিতে রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক।
*
নয়নানন্দ (ভরতপুর) সম্বন্ধে নিত্যানন্দ দাসের প্রেমবিলাস গ্রন্থের উদ্ধৃতি -      পাতার উপরে . . .   
বাবু যশোদালাল তালুকদার দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, ১৬০০ সালে বিরচিত,
নিত্যানন্দ দাসের প্রমেবিলাস
গ্রন্থের ২২শ বিলাসে নয়নানন্দ ও তাঁর দীক্ষাগুরু গদাধর পণ্ডিতকে নিয়ে লেখা আছে যে শ্রীচৈতন্যের নিকট
পরিকর, শ্রীরাধিকার অবতার গদাধর পণ্ডিত একবার গীতা লিখছিলেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেই  পুথিতে  
নিজে একটি শ্লোক লিখে দিয়েছিলেন। গদাধর পণ্ডিত সবসময় শ্রীকৃষ্ণের একটি মূর্তি গলায় পড়ে থাকতেন।
তাঁর এই
শ্রীচৈতন্যের শ্লোক লেখা হস্তলিখিত গীতাটি এবং তাঁর কণ্ঠলগ্ন শ্রীকৃষ্ণের মূর্তিটি তাঁর অপ্রকট  
(পরলোক গমন) হওয়ার সময়, শিষ্য নয়নানন্দের হাতে দিয়ে যান। নয়নানন্দ গুরুর অন্তেষ্টিক্রিয়া করার পরে
ভরতপুরে বসবাস করা শুরু করেন। অন্যত্র, নয়নানন্দকে এই দায়িত্ব গদাধর পণ্ডিত নীলাচলে যাবার আগে
দিয়েছিলেন বলে পাওয়া যায়। ঘটনার এই বিবরণটি
নিত্যানন্দ দাসের প্রেমবিলাস গ্রন্থে এইভাবে দেওয়া  
রয়েছে . . .
"ব্রজলক্ষ্মী শ্রীরাধিকা শ্রীল গদাধর।                  শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য সেবায় সদাই তৎপর॥
চৈতন্তের লীলা তিঁহো বুঝে অনুক্রমে।             সময় বুঝিয়া গদাই দাঁড়ায়েন থামে॥
গলদেশে গদাই রাখে শ্রীকৃষ্ণের মেয় মূর্ত্তি।        সর্ব্বদা সেবয়ে তাহা মনে পাইয়া প্রীতি॥
শ্রীগোপীনাথের সেবা করিলা প্রকাশ।              দেখিয়া শ্রীমহাপ্রভুর বাড়িল উল্লাস॥
শুন শুন শ্রোতাগণ হৈয়া এক মন।                 আর একদিনের কথা করহ শ্রবণ॥
পণ্ডিত গোসাঞি গীতা করিছে লিখন।             মহাপ্রভু তথা গিয়া উপনীত হন॥
প্রভু কহে শুন ওহে পণ্ডিত গোসাঞি।             কিবা লিখিতেছ গ্রন্থ কহ মোর ঠাঞি॥
পণ্ডিত বোলে শ্রীগীতা করিতেছি লিখন।          শুনি প্রভু তাঁর হাত হৈতে গীতা কাড়ি লন॥
পুঁথি লৈয়া এক শ্লোক লিখিলা তাহাতে।          নেহ গদাধর বলি দিলা তাঁর হাতে॥
শ্লোক দেখি গদাধরের আনন্দিত মন।             প্রণাম করিয়া তাহে করিলা স্তবন॥
প্রভু তাঁরে আলিঙ্গন করিলেন তৃর্ণ।                কিছু দিনে গদাই করিলা গীতা পূর্ণ॥
পণ্ডিত গোসাঞির বড় ভাই বাণীনাথ হয়।        জগন্নাধ বলি তাঁরে কেহো কেহো কয়॥
বাণীনাথ ভজে সদা গৌরাঙ্গ চরণ।                গৌরাঙ্গ চরণ বিনা নাহি জানে আন॥
বাণীনাথের পুত্র নয়ানানন্দ মিশ্র গোসাঞি।        তাঁহার যতেক গুণ তার অস্ত নাই॥
তাঁহে শিষ্য করি গোসাঞি শক্তি সঞ্চারিলা।        পণ্ডিত গোসাঞির সেবা নয়ন পাইলা॥
পণ্ডিত গোসাঞি প্রভুর অপ্রকট সময়।            নয়নানন্দেরে ডাকি এই কথা কয়॥
মোর গলদেশে থাকিত এই কৃষ্ণমূর্ত্তি।              সেবন করিহ সদা করি অতিপ্রীতি॥
তোমারে অর্পিলা এই শ্রীগোপীনাথের সেবা।       ভক্তিভাবে সেবিবে না পূজিবে অন্য দেবী দেবা॥
স্বহস্ত লিখিত এই গীতা তোমায় দিলা।             মহাপ্রভু এক শ্লোক ইহাতে লিখিলা॥
ভক্তিভাবে ইহা তুমি করিবে পৃজন।               এত কহি পণ্ডিত গোসাঞি হৈলা অন্তর্ধান॥
দেখি শ্রীনয়ন গোসাঞি বহু খেদ কৈলা।            প্রভু ইচ্ছা মতে তবে সুস্থির হইলা॥
নয়ন, পণ্ডিত গোসাঞি অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া করি।     রাঢ়দেশে ভরতপুর করিলেন বাড়ী॥
এই যে লিখিলু গুরু আজ্ঞা শিরে ধরি।            শ্রীগুরু বৈষ্ণব পদ যেন না পাসুরি॥
শ্রীজাহ্নবী বীরচন্দ্র পদে যার আশ।                প্রেমবিলাস কহে নিত্যানন্দ দাস
॥"
---
নিত্যানন্দ দাস, প্রেম-বিলাস, ২২শে বিলাস॥
নয়নানন্দ (ভরতপুর)     
নয়নানন্দ (মঙ্গলডিহি)    
নয়নানন্দ (শ্রীখণ্ড) -    
নয়নানন্দ (ভরতপুর) সম্বন্ধে নিত্যানন্দ দাসের প্রেমবিলাসে...   
নয়নানন্দ (ভরতপুর) সম্বন্ধে জগদ্বন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি   
নয়নানন্দের কবিত্ব নিয়ে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি   
নয়নানন্দ (ভরতপুর) সম্বন্ধে শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কারের উদ্ধৃতি  
নয়নানন্দ (মঙ্গলডিহি) সম্বন্ধে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি
নয়নানন্দ সম্বন্ধে রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রর উদ্ধৃতি   
নয়নানন্দ (শ্রীখণ্ড) সম্বন্ধে প্রিয়নাথ জানার উদ্ধৃতি    
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
*
নয়নানন্দ (ভরতপুর) সম্বন্ধে জগদ্বন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি -                                   পাতার উপরে . . .  
সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত, ১৯৩১ সালে প্রকাশিত, শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভূমিকাতে পদকর্তা  
নয়নানন্দর সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে
জদদ্বন্ধু ভদ্র সংকলিত ও সম্পাদিত গৌরপদ-তরঙ্গিণী সংকলন থেকে  
নয়নানন্দ ভরতপুরের নয়নানন্দের সম্বন্ধে
জদদ্বন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি তুলে দিয়েছেন। এছাড়া নয়নানন্দের একটি
পদের ভণিতা সম্বন্ধে জগদ্বন্ধু ভদ্রর সন্দেহের নিরসনও করেছেন। (আমরা এখানে কেবল
জগদ্বন্ধু ভদ্রর
উদ্ধৃতিটুকু
ইটালিক্সে দিয়েছি) তিনি লিখেছেন . . .

“শ্রীমহাপ্রভুর সমসাময়িক অনন্য-ভক্ত নয়নানন্দ মিশ্রের রচিত ২৫টি পদ পদকল্পতরু গ্রন্থে সংগৃহীত হইয়াছে।
এইগুলি সমস্তই শ্রীগৌরাঙ্গ-বিষয়ক। পদ-কর্ত্তা নয়নানন্দ শ্রীরাধাকৃষ্ণের ব্রজ-লীলা অবলম্বনে কোন পদ রচনা
করিয়াছেন কি না, জানা যায় নাই ; করিয়া থাকিলে, শ্রীগৌরাঙ্গ-লীলার বহুসংখ্যক পদাবলীর প্রসিদ্ধ রচয়িতা
বাসুদেব ঘোষের ব্রদলীলা-পদাবলীর ন্যায় সেগুলিও বিলুপ্ত হইয়াছে, মনে করিতে হইবে। আনন্দের বিষয় যে,
নয়নানন্দের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া গিয়াছে। আমরা গৌরপদ-তরঙ্গিণীর উপক্রমণিকা হইতে সেই বিবরণ
নিম্নে উদ্ধৃত করিয়া দিলাম :---

নয়নানন্দ গদাধর পণ্ডিতের ভ্রাতুষ্পুত্র এবং প্রধান ও প্রিয় শিষ্য। গদাধরের কনিষ্ঠ বাণীনাথ মিশ্র ; নয়নানন্দ  
সেই বাণীনাথের পুত্র। ইনি দারপরিগ্রহ করিয়াছিলেন। এবং ইহাঁর বংশধরগণ অদ্যাপি মুরশিদাবাদ জেলার
অন্তর্গত কাঁদির নিকটবর্ত্তী প্রীপাট-ভরতপুর গ্রামে বাস করিতেছেন।  ভরতপুর গ্রামে গদাধর পণ্ডিতের  
স্থাপিত গোগীনাথ-বিগ্রহ আছেন। পণ্ডিত যখন নীলাচলে যান, তখন নয়নানন্দকে এই বিগ্রহ সেবায় নিযুক্ত  
করিয়া যান।

নয়নানন্দের আদি নাম ছিল ধ্রুবানন্দ ; এবং চৈতন্যচরিতামৃতে ইনি “মিশ্র নয়ন” নামে উল্লিখিত। নবদ্বীপবাসী
রসিকলাল বাবাজীর নিকট যে প্রাচীন হস্তলিখিত প্রেমবিলাস গ্রন্থ আছে, তাহাতে এই শ্লোকটী দৃষ্ট হয় :---

“পণ্ডিত গোসাঞীর ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রীনয়নানন্দ।
পুষ্প গোপাল, গোপালদাস আর ধ্রুবানন্দ॥”

ধ্রুবানন্দের ন্যায় "পুষ্পগোপাল” ও “গোপালদাস”ও কি নয়নান্দের নামান্তর?  নয়নানান্দের রচিত একটী পদে
আমাদিগের ন্যায় অনেক পাঠকের মনেই বিশেষ গোল বাধিবার সম্ভব। এ পদেব শেষ দুই চরণ এই,---

“কহে নয়নানন্দ, নদীয়া আনন্দ, আনন্দে ভুবন ভোরা।
দুঃখিত জীবন, মাধব নন্দন, চরণে স্মরণ মোরা”

গদাধর ও বাণীনাথই “মাধবনন্দন”। নয়নান্দেদ পদের ভণিতায় তাঁহাদের কথা কেন? এবং এখানে “মোর”
শব্দই বা কেন  ব্যবহৃত হইল?

নয়নানন্দ নামের বুত্পত্তি সন্বন্ধে প্রবাদ এই যে, নবদ্বীপ ধামে গ্রহস্থাশ্রমে থাকিয়া গৌরাঙ্গ ও গদাধর ভাব-ভরে
যখন কীর্ত্তন ও নৃত্য করিতেন, তখন ধ্রুবানন্দ তাহা দেখিতে দেখিতে তত্ক্ষণাৎ পদ রচনা করিতেন।    
এইরূপে যখন শ্রীগৌরাঙ্গের যে লীলা দর্শন করিতেন, কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া ধ্রুবানন্দ তখনই তাহা পদে
বর্ণন  করিতেন। এই অদ্ভুত কবিত্বশক্তির স্ফুরণ দেখিয়া শ্রীগৌরাঙ্গ ও শ্রীগদাধর পণ্ডিত উভয়েই ধ্রুবানন্দকে  
ভালবাসিতেন। এবং গদাধর পণ্ডিতই ধ্রুবানন্দের নাম “নয়নানন্দ" রাখেন।  প্রাগুক্ত প্রবাদের অনুকুলে  
পদসমুদ্র গ্রন্থে একটী পদ আছে, যথা---

পণ্ডিতের স্নেহপাত্র শ্রীনয়ান মিশ্র।
বাল্যকালে প্রভু যারে করিলেন শিষ্য॥
পণ্ডিতের কাছে নয়ন থাকে সর্ব্বক্ষণ।
প্রভৃ-লীলা দেখি পদ করয়ে বর্ণন॥
ঐছে চেষ্টা দেখি প্রভু হরষিত হৈলা।
নয়নানন্দ বলি নাম পশ্চাৎ থুইলা॥
নীলাচল যাইতে প্রভু যবে ইচ্ছা কৈলা।
শ্রীনয়নানন্দে ভরতপুর নিয়োজিলা॥” (পুরো পদটি, মিলনসাগরে আমরা এখনও সংগ্রহ করতে পারিনি।)

খেতুরীর মহোৎসবে নয়নানন্দও উপস্থিত ছিলেন
।”

জগদ্বন্ধু বাবু নয়নানন্দের বিশেষ সন্দেহজনক যে পদের ভণিতার কথা লিখিয়াছেন, ইহা পদকল্পতরুর ২০৬৮
সংখ্যক পদ বটে। পদকল্পতরুতে ঐ পদের নিম্নলিখিত ভণিতা আছে,---
“কহে নয়নানন্দ                নদীয়া আনন্দ
.        আনন্দে ভুবন ভোরা।
দুঃখিত-জীবন                   মাধব নন্দন
.        চরণে শরণ মোরা॥”
জগদ্বন্ধু বাবু ভণিতার যে পঙ্ক্তিদ্বয়ের অর্থ বুঝিতে গোলযোগ করিয়াছেন, আমরা উহার টীকায় লিখিয়াছি,---
“দুঃখিত ইত্যাদি।  দুঃখিত-জীবন আমরা (আমি পদকর্ত্তা নয়নানন্দ ও আমার প্রিয় বন্ধুগণ) মাধব-নন্দন  
অর্থাৎ গদাধর পণ্ডিতের চরণে আশ্রয় (লইলাম)।”

ভণিতায় গুরুর নামোল্লেখ বা সংক্ষিপ্ত পরিচয় বৈষ্ণব পদ-কর্ত্তাদিগের পক্ষে অস্বাভাবিক নহে। সুতরাং  
নয়নানন্দ এ ভাবে তাঁহার গুরু মাধব-নন্দন অর্থাৎ গদাধর পণ্ডিতের উল্লেখ করায়, নয়নানন্দের ব্যক্তিত্ব  
সম্ভন্ধে সন্দেহ করার কোনও কারণ দেখা যায় না। আমাদের বোধ হয় আলোচ্য পঙ্ক্তি-দ্বয়ের প্রকৃত পাঠ,  
অন্বয় ও অর্থ-নির্ণয়ে গোলযোগ করায়ই
iগদ্বন্ধু বাবু অকারণে সন্দেহ প্রকাশ করিয়া গিয়াছেন।”
*
নয়নানন্দের (ভরতপুর) কবিত্ব সম্বন্ধে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি -                 পাতার উপরে . . .  
সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত, ১৯৩১ সালে প্রকাশিত, শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভূমিকার ১২৭-পৃষ্ঠায়
পদকর্তা নয়নানন্দর কবিত্ব সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

নয়নানন্দের পদগুলি মামুলী ধরণের পদ বটে। তিনি “ততক্ষণাৎ" এই সকল পদ রচনা করিয়া থাকিলে,
উহা তাঁহার দ্রুত-রচনা-শক্তির পরিচয় বলিয়া গণ্য করা যাইতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা উহাতে
তাঁহার "অদ্ভুত কবিত্বশক্তির” কোনও লক্ষণ খুঁজিয়া পাই নাই। নয়নানন্দ শ্রীমহাপ্রভৃকে সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণ ও
গদাধর পত্তিতকে শ্রীরাধার সাক্ষাৎ শক্ত্যবতার বলিয়া দৃঢ় বিশ্বাস করিতেন ; তাঁহার গৌরাঙ্গবিষয়ক লীগার
প্রায় প্রত্যেক পদেই শ্রীগৌরাঙ্গের সহিত গদাধরের একাত্মতা ও অনন্যসাধারণ প্রেম বিশেষ-ভাবে পরিস্ফুট
হইয়াছে। ভাগ্যবান্‌ পদ-কর্ত্তা নয়নানন্দ শ্রীগৌরাঙ্গের নবদ্ধীপ-লীলায়ও এই অলৌকিক ব্রজলীলার মধুর ভাব
উপলব্ধি করিয়া, উচ্ছ্বাসপূর্ণ ভাষায় উহার যে বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন, মহাত্মা বাসুদেব ঘোষের শ্রীগৌরাঙ্গ-
পদাবলীর ন্যায় কেবল অলঙ্কারশাস্ত্রের সূত্র ধরিয়া উহার কবিত্বের বিচার করিলে সঙ্গত হইবে না। আমাদের
মনে হয়, গৌরাঙ্গভক্ত জগবন্ধু বাবু নয়নানন্দের এই প্রেম ভক্তি দর্শনে মোহিত হইয়াই তাঁহার রচনার এইরূপ
উচ্চ প্রশংসা করিয়া গিয়াছেন।

নয়নানন্দ তাঁহার পদে শ্রীগৌরাঙ্গ ও গদাধরের একাত্মতা ও প্রেমের যে ভাবে অবতারণা করিয়াছেন, আমরা
দৃষ্টান্ত-স্বরূপ নিয়ে উহার কয়েকটী উদাহরণ উদ্ধৃত করিলাম,---
(ক)     “কোই বোলে গোরা                জানকীবল্লভ
.                      রাধার প্রিয় পাঁচবাণ রে।
.         নয়নানন্দ মনে                        আন নাহি জানে
.                আমারি গদাধরের প্রাণ রে॥"---(২ সংখ্যক পদ)
(খ)      "দুহুঁ দুহুঁ পিরিতি আরতি নাহি টুটে।
.        পরশে পরম কত কত সুধ উঠে॥
.        নাচয়ে গৌরাঙ্গ মোর গদাধর-রসে।
.        গদাধর নাচে পুন গৌরাঙ্গ-বিলাসে॥
.        প্রকৃতি পুরুষ কিবা জানকী শ্রীরাম।
.        রাধা কানু এই কিবা রতি দেব কাম॥”---(২০৭০ সংখ্যক পদ)
গে)                 "নাচে শচীর নন্দন দুলালিয়া।
.        সকল রসের সিন্ধু                গদাধর প্রাণবন্ধু
.                নিরবধি বিনোদ রঙ্গিয়া॥” ---(২০৭৩ সংখ্যক পদ)
(ঘ)      “কহয়ে নয়নানন্দ মনের উল্লাসে।
.        আর কি দেখিব গোরা গদাধর পাশে॥”---(২১০২ সংখ্যক পদ)
(চ)      নয়নানন্দ কছয়ে সুখ-সারে।
.        সেই বৃন্দাবন ভেল নদীয়া-নগরে॥”---(২১০৩ সংখ্যক পদ)
(ছ)     “গদাধর-মুখ হেরি কিবা উঠে মনে।
.        সোঙরি সে সব সুখ নিকুঞ্জ বৃন্দাবনে॥”---(২১১৪ সংখ্যক পদ)
(জ)     নাচয়ে গৌরাঙ্গ গদাধর-মুখ চাঞা।
.        অন্তরে পরশ-রস উথলিল হিয়া॥
.        দুহুঁ মুখ নিরখিতে দুহুঁ ভেল ভোর।
.        দুহুঁ ভেল রস-নিধি অমিয়া চকোর॥
.        বুকে বুকে মিলি দুহে কয়লহি কোর।
.        কাঁপি পুলক দুহুঁ ঝাঁপই লোর॥
.        তনু মন বাণী দুহুঁ একই পরাণ।
.        প্রতি অঙ্গে পিরিতি-অমিয়া নিরমাণ॥---(২১৭৯ সংখ্যক পদ)

পরবর্তী কালে গৌড়ীয় বৈষ্ণবমাজে শ্রীরাধা-কৃষ্ণ হইতে অভিন্ন-বোধে “গদাই-গৌরাঙ্গ” ভজন-কারী যে সম্প্রদায়-
বিশেষের উদ্ভব হইছে,  নয়নানন্দের  উদ্ধৃত পঙ্ক্তিগুলি তাঁহাদের ভজন-পদ্ধতির মূল-সূত্র-রূপে গণ্য করা
যাইতে পারে। চৈতন্যভাগবত, চৈতন্যচরিতামৃত, কিংবা চৈতন্যমঙ্গলে এ ভাবের এরূপ কোনও উক্তি  
পাইয়াছি বলিয়া স্মরণ হয় না
।”
*
নয়নানন্দ (ভরতপুর) সম্বন্ধে শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কারের উদ্ধৃতি -                     পাতার উপরে . . .  
শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কার তাঁর দ্বারা ৩১ বছর সময়কালে সংগৃহীত ও সম্পাদিত, ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে (১৯২৯খৃষ্টাব্দ)
রেঙ্গুন থেকে প্রকাশিত, “জীবনীকোষ” গ্রন্থের ১১০৮-পৃষ্ঠায় নয়নানন্দ দাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

নয়নানন্দ দাস একজন বৈষ্ণব পদকর্ত্তা ও গ্রন্থকার।  তাঁহার পূর্ব্ব নাম ধ্রুবানন্দ মিশ্র। তিনি মুর্শিদাবাদ  
জিলার কান্দী মহকুমার অধীন ভরতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম বাণীনাথমিশ্র। তিনি
প্রসিদ্ধ বৈষ্ণবাচার্য্য গদাধর পণ্ডিতের ভ্রাতুষ্পুত্র ও মন্ত্রশিষ্য ছিলেন। নীলাচলে গমনকালে গদাধর  পণ্ডিত  
তাঁহার প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ গোপীনাথের সেবার ভার ধ্রুবানন্দের উপর অর্পণ করিয়া যান। গৌরাঙ্গের লীলা দর্শন
মাত্রই তিনি তাহা পদ্যে বর্ণনা করিতে পারিতেন। তাঁহার অত্যাশ্চর্য্য কবিত্ব শক্তি দেখিয়া গৌরাঙ্গদেব ও  
গদাধর পণ্ডিত তাঁহাকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন এবং গদাধর পণ্ডিত তাঁহার নাম নয়নানন্দ রাখেন। ১৫৮২ খ্রীঃ
অব্দে খেতুরীতে নরোত্তম দাস কর্ত্তৃক বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার মহোৎসবে তিনি গমন করিয়াছিলেন। তিনি  বহু  
সংখ্যক পদ রচনা করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে তাঁহার প্রকাশিত পঁচিশটি ও অপ্রকাশিত একাত্তরটি পদ পাওয়া।
গিয়াছে। “প্রায়োভক্তি রসান্তর” নামে তিনি একখানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। তাঁহার বংশধরেরা এখনও  
ভরতপুরে বাস করিতেছেন

*
নয়নানন্দ (মঙ্গলডিহি) সম্বন্ধে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি -                    পাতার উপরে . . .  
বীরভূম জেলার হেতমপুর এস্টেটের মহারাজ মহিমারঞ্জন চক্রবর্ত্তী সম্পাদিত এবং তাঁর অর্থানুকুল্যে ১৯১৬
সালে প্রকাশিত,
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় দ্বারা প্রকাশিত, বীরভূম-বিবরণ ১ম খণ্ড, মঙ্গলডিহি কাহিনী, ১৭৭-
পৃষ্ঠায় কবি নয়নানন্দের সম্বন্ধে উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো . . .

নয়নানন্দ সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ শিক্ষিত ছিলেন, তিনি মঙ্গলডিহীতে একটি চতুষ্পাঠী প্রতিষ্ঠা করিয়া অনেক
ছাত্রকে বিদ্যাদান করিতেন এবং শ্রীশ্রীকৃষ্ণভক্তি-রসকদন্ব ও প্রেয়োভক্তিরসার্ণব নামে দুইখানি গ্রন্থ ও অনেক
গুলি কীর্তনের পদ রচনা করেন। এই গ্রন্থমধ্যে কবি স্থানে স্থানে স্বরচিত  ও নানা শাস্ত্র গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃত
শ্লোক সমূহ সন্নিবিষ্ট করিয়াছেন। শ্রীকৃষ্ণভক্তিরস-কদস্ব গ্রন্থ কবি নিজহস্তে তুলোট কাগজে লিখিয়াছেন। উহা
দুই শত পঞ্চাশ পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ। পুস্তকখানি মঙ্গলডিহীতে সযত্নে রক্ষিত হইয়াছে। গ্রন্থখানির অন্তে এইরূপ  
লিখিত আছে :---

“শ্রীরূপের লিখন গ্রন্থ বৈষ্ণব মুখে শুনি
তাহার আভাস কিছু ভাষাতে বাথানি।
শ্রীচৈতন্য নিত্যানন্দ আদ্যৈত আচার্য্য
অভিরাম সুন্দরানন্দ সর্ব্বগুণবর্য্য
শ্রীপর্ণগোপাল প্রভু গোপালচরণ---
যাঁর পদে কায়মনে লইলাম শরণ---
কৃষ্ণভক্তি-রসকদম্ব-শ্রবণে উল্লাস
কাতরে বর্ণিলা এই নয়নানন্দ দাস।”

গ্রন্থ-সমাপ্তি-প্রসঙ্গে নিম্ন লিখিত কবিতা লিখিত আছে---

যুগ্মবাণ ঋতু চন্দ্র শকে পরিগণি।            বৃষরাশি গত ভানু মাস তাহে জানি॥
ভূমি-পুত্রবারে তথা কূহুতিথিশেষে।          হইলেন গ্রন্থ সাঙ্গ পঞ্চম দিবসে॥
সেনভূমমধ্যে মঙ্গলডিহি গ্রাম।                শ্রীপর্ণিগোপাল প্রভু যাহাতে বিশ্রাম॥
ঠাকুর পানুয়া সেবা শ্রীশ্যামসুন্দর।          ‘বলরাম চন্দ্র’ প্রভু রসিকনাগর॥
সে মুর্ত্তি দেখিতে ভক্তের বাড়ে প্রেমরঙ্গ।    সেই স্থানে রহি গ্রন্থ হইল সাঙ্গ॥
কৃষ্ণভক্তিরসকদস্ব শ্রবণে উল্লাস।            কাতরে বর্ণিলা এ নয়নাননদ দাস॥

অর্থাৎ ১৬৫২ শকাব্দার ৫ই জৈষ্ঠ মঙ্গলবার শুক্ল প্রতিপদে উক্ত কৃষ্ণভক্তি-রসকদন্ব লিখিত। নয়নানন্দ-কৃত
রসকদম্বের অনুক্রমণিকা নিম্নে প্রদত্ত হইল। ইহা হইতেই গ্রন্থরচনার বিশেষ পরিচয় পাওয় যাইবে। . . .

এবে কহি গ্রন্থের অনুক্রমসূত্র।                যেবা যেই প্রকরণে হয়েছেন উক্ত॥
প্রথমে প্রকরণে হৈলাম মঙ্গলাচরণ॥          গুরুকৃষ্ণ বৈষ্ণব বন্দনারূপ হন॥
সর্ব্ব আরাধনা পর কৃষ্ণের অর্চ্চন।          মনে সম্বোধিয়ে প্রশ্ন প্রথম প্রকরণ॥
শ্রীকৃষ্ণ-সেবায় হয় জগতের প্রীতি।          ভক্তবশ ভগবান্‌ অভক্ত নিন্দা তিথি॥
কৃষ্ণাশ্রয় বিনে ভবসিদ্ধু নহে পার।          দ্বিতীয় প্রকরণে হইল তাহার বিচার॥
বাল্যারভ্য কৃষ্ণসেবা বিষয়াবিষ্ট ত্যাগ।     অনাশ্রিত পশুতুল্য ইত্যাদি বিভাগ॥
ইন্দ্রিয় থাকিতে যে ইন্দ্রিয়হীন জন।         ভক্তি শ্রেষ্ঠ তৃতীয়ে হৈল নিরূপণ॥
অকামা সকামা ভক্তি কৃষ্ণভক্তিবাণ।       অবিনাশী কৃষ্ণদাস তৃতীয়ে সকল॥
চতুর্থ সাধন ভক্তি বৈধীর কথন।            উত্তম মধ্যম ভক্ত তটস্থলক্ষণ॥
পঞ্চমে চতুঃষষ্টি ভক্তাঙ্গলক্ষণা।             ষষ্ঠে মেরা নাম আদি অপরাধবর্ণনা॥
সপ্তমে রাগভক্তি প্রকট প্রকটলীলা।         অষ্টমে ভাবভক্তি বর্ণন হইলা॥
নবম বিভাগ সূত্র পুর্ণতরতম।              ধীরোদাত্তাদি তথা নায়ক-কথন॥
নিত্যসিদ্ধাদি ভক্তি লক্ষণা নবমে।          দশমে অনুভাব তথা সাত্বিক কথনে॥
ব্যভিচারি কহিলাম প্রকরণ একাদশে।     স্থায়ী ভাব কথন হইয়াছেন দ্বাদশে॥
ত্রয়োদশে মুখ্য ভক্তি-রস-নিরূপণ।         শান্ত দাস্য পর্য্যন্ত তাহাতে লিখন॥
চতুর্দশে সখ্য ভক্তিরসের বিচার।         পঞ্চদশ প্রকরণে বাৎসল্যের সার॥
ষোড়শ সপ্তদশে উজ্জ্বল বর্ণন।              এইতো কহিল ইনি শাস্ত্র অনুক্রম
॥”
*
নয়নানন্দ (ভরতপুর) সম্বন্ধে রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রের উদ্ধৃতি -            পাতার উপরে . . .  
রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্র, ১৯৫৫সালে প্রকাশিত, নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্র  সম্পাদিত  
মহাজন পদাবলী “শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৪র্থ খণ্ডের, ভূমিকার ৪১-পৃষ্ঠায় নয়নানন্দের সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

নয়নানন্দ মিশ্র শ্রীমহাপ্রভুর সমসাময়িক কবি ছিলেন। ইনি গদাধর পণ্ডিতের ভ্রাতুষ্পুত্র ও শিষ্য।  চৈতন্য-
চরিতামৃতে ইনি “মিশ্র নয়ন” নামে উল্লিখিত হইয়াছেন। খেতরীর মহোৎসবে নয়নানন্দ উপস্থিত ছিলেন।  
নয়নানন্দ শ্রী মহাপ্রভুকে  সাক্ষাৎ  শ্রীকৃষ্ণ  এবং  গদাধরকে  শ্রীরাধার  অবতার  মনে  করিয়া পদ রচনা
করিয়াছেন
।”
*
নয়নানন্দ (শ্রীখণ্ড) সম্বন্ধে বঙ্গীয় জীবনীকোষে প্রিয়নাথ জানার উদ্ধৃতি -         পাতার উপরে . . .  
১৯৫৫ সালে  প্রকাশিত প্রিয়নাথ জানার “বঙ্গীয় জীবনীকোষ”, ১ম খণ্ডে ৫ জন নয়নানন্দের উল্লেখ রয়েছে।  
তাঁরা হলেন . . .

"
১। নয়নানন্দ - নয়নানন্দের “কৃষ্ণভক্তিরসকদস্ব” রূপ-গোস্বামী রচিত “ভক্তিরসামৃতসিন্ধু" অবলম্বনে লেখা।
রচণাকাল ১৭২৩ খ্রীষ্টাব্দ। নয়নানন্দের নিবাস ছিল উত্তর রাঢ়ে মঙ্গলডিহি গ্রামে। এঁর অপর নিবন্ধ হচ্ছে
“ভক্তিমাধ্বীকণা” ও “প্রেয়োভক্তিরসার্ণব”। এটির রচনাকাল ১৭৩৫ খৃষ্টাব্দ। নয়নানন্দ পানুয়া গোপালের শিষ্য
বংশের তৃতীয় অধস্তন।
২। নয়নানন্দ কবিরাজ - শ্রীখণ্ড-বাসী বৈদ্য। প্রসিদ্ধ পদকর্তা। ইনি রঘুনন্দন ঠাকুরের শিষ্য।
৩। নয়নানন্দ ঠাকুর - বীরভূম জেলার মঙ্গলডিহি গ্রামনিবাসী। এঁর রচিত গ্রন্থ “শ্রীকৃষ্ণভক্তিরসকদন্ব” ও
“প্রেয়োভক্তি রসার্ণব”।
৪। নয়নানন্দ দাস বা নয়ন মিশ্র -  গৌরাঙ্গ লীলা-সহচর  গদাধর পণ্ডিতের  ভ্রাতুষ্পুত্র  এবং বাণীনাথের পুত্র।
ইনি গদাধর কর্তৃক দীক্ষিত হয়েছিলেন। গদাধর তাকে স্বীয় বক্ষোদেশে রক্ষিত শ্রীকৃষ্ণমূর্তি এবং মহাপ্রভুর
হন্তলিখিত শ্লোক সম্বলিত একটি গীতা প্রদান করেন।  গদাধরের  মহাপ্রয়াণের  পর  নয়ন  মিশ্র  পিতৃব্যের  
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে রাঢ  দেশের  ভরতপুরে  বাস  স্থাপন করেন।  সম্ভবত এই নয়ন মিশ্র খেতরি  
মহামহোৎসবে যোগদান করেছিলেন। “ভক্তিরত্নাকর” থেকে জানা যায় যে নয়নানন্দ বোরাকুলি  মহা-
মহোত্সবেও মিলিত হয়েছিলেন।  নয়নানন্দ  ভণিতায়  কতকগুলি উৎকৃষ্ট  বাংলা এবং ব্রজবুলি পদ দেখা
যায়। ইনি ষোড়শ শতাব্দীতে বিদ্যমান ছিলেন। এঁর লিখিত পদগুলি সবই চৈতন্য বিষয়ক। পদগুলিতে  
ব্যাকুল ভক্ত হৃদয়ের অকৃত্রিম ঝঙ্কার আছে। যেমন :
গোরা মোর গুণের সাগর
প্রেম তরঙ্গ তায় উঠে নিরস্তর।
গোরা মোর অকলঙ্ক শশী
হরিনাম সুধা তাহে ক্ষরে দিবানিশি।”
৫। নয়নানন্দ দেব- রসিকানন্দ প্রভুর পৌত্র ও দ্বিতীয় স্থলাভিষিক্ত। আবির্ভাবকাল সপ্তদশ শকাব্দ। ইনি  
একজন পদকর্তা। বঙ্গ, উৎকল ও মৈথিলী ভাষায় এ পর্যন্ত পনেরটি পদ সংগৃহীত হয়েছে।  শ্রীশ্রীশ্যামানন্দ-
রসার্ণব-প্রণেতা কৃষ্ণদাস নয়নানন্দের অনুশিষ্য ছিলেন। বৈশাখী শুক্লা সপ্তমী তিথিতে নয়নানন্দের তিরোভাব
হয়
।"

এখানে দেখা যাচ্ছে যে উপরোক্ত ১ম এবং ৩য় নয়নানন্দ, অর্থাৎ “নয়নানন্দ” এবং “নয়নানন্দ ঠাকুর” এক ও
অভিন্ন ব্যক্তি - মঙ্গলডিহির নয়নানন্দ। ৫ম  নয়নানন্দ দেবের  আলাদা করে  কোনও  পদ  আমরা
হাতে পাই নি।