কবি গোবিন্দ দাসের করচার বৈষ্ণব পদাবলী
*
বর্দ্ধমান কাঞ্চননগরে মোর ধাম
ভণিতাহীন পদ
কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার)
এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র
সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ১-
পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
কবির পরিচিতি, পিতা-মাতা ও স্ত্রীর নাম, তাঁর গৃহত্যাগের সময়কাল।

বর্দ্ধমান কাঞ্চননগরে@ মোর ধাম।
শ্যামাদাস পিতৃ নাম গোবিন্দ মোর নাম॥
অস্ত্র হাতা বেড়ি গড়ি জাতিতে কামার।
মাধবী নামেতে হয় জননী আমার॥
আমার নারীর নাম শশিমুখী হয়।
একদিন ঝগড়া করি মোরে কটু কয়॥
নির্গুণে মূরখ বলি গালি দিলা মোরে॥
সেই অপমানে গৃহ ছাড়িলাম ভোরে॥
চৌদ্দশ ত্রিশ শাকে বাহিরেতে যাই।
অভিমানে গর গর ফিরে নাহি চাই॥

টীকা -
@ - কাঞ্চন নগর (বর্দ্ধমান) উত্তর কাঢ়ের অন্তর্গত।

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
ক্রমে পহুচিনু আমি কাটোয়ার ধাম
ভণিতাহীন পদ
কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার)
এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র
সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ১-
পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
কবির কাটোয়ায় আগমন, শ্রীচৈতন্যের নাম শুনে গঙ্গার পার হয়ে নদীয়ায় এসে শ্রীচৈতন্য,
নিত্যানন্দ, শ্রীবাস ঠাকুর, দামোদর, হরিদাস, গদাধর ও অদ্বৈতাচার্য্যের সঙ্গে স্নানের ঘাটে
দেখা ও শ্রাচৈতন্যের আশ্রয়লাভ।

ক্রমে পহুচিনু আমি কাটোয়ার ধাম।
সেথা আসি শুনিলাম শ্রীচৈতন্ত্যের নাম॥
সকলেই চৈতন্ত্যেরে বাখানিয়া@ বলে।
তাহা শুনি ছুটিলাম দর্শনের ছলে॥
সবদিন চলিয়া আইনু মাঠে মাঠে।
প্রাতে গঙ্গা পার হৈয়া আইনু নদের ঘাটে॥
নদীয়ার নীচে গঙ্গা নাম মিশ্রঘাট।
আনন্দ বাড়িল হেরি নদীয়ার পাট॥ #
ডাহিনে বাগ্দেবী নদী
কুলু কুলু স্বরে। @@
সকলের আনন্দ লাগিয়া গান করে

শ্রীবাস অঙ্গন হয় ঘাটের উপরে।
প্রকাণ্ড এক দীঘী হয় তাহার নিয়ড়ে॥
বল্লাল রাজার বাড়ী তাহার নিকটে।
ভাঙ্গা চূর প্রমাণ আছয়ে তার বটে॥
ঘাটে বসি কত খানা ভাবিতেছি মনে।
হেন কালে শ্রীচৈতন্য আইলেন স্নানে॥
কটিতে গামছা বাঁধা আশ্চর্য্য গঠন।
সঙ্গে এক অবধৌত প্রফুল্ল বদন॥
তিন চারি সঙ্গী আরো নাচিতে নাচিতে।
স্নানে নামিলেন প্রভু গঙ্গার গর্ভেতে॥
অবধৌত বীর পাড়ু হৈতে ঝাঁপ দিলা।
সাঁতারিয়া জল কেলি করিতে লাগিলা॥
শ্রীবাস ঠাকুর পিছু পিছু দামোদর।
সিদ্ধ হরিদাস আর বামে গদাধর॥
অবশেষে আইলা তথি অদ্বৈত গোঁসাই।
এমন তেজস্বী মুহি কভু দেখি নাই॥
পক্ক কেশ পক্ক দাড়ী বড় মোহনিয়া।
দাড়ী পড়িয়াছে তাঁর হৃদয় ছাড়িয়া॥
হরিধ্বনি সহ বুড়া করয়ে চীৎকার।
অবধৌত সাঁতারিয়া করে পারা বার॥ ১
একে একে গঙ্গা গর্ভে সবে ঝাঁপ দিলা।
সন্তরিয়া সবে নানা কেলি আরম্ভিলা॥

আশ্চর্য্য প্রভুর রূপ হেরিতে লাগিনু।
রূপের ছটায় মুহি মোহিত হইনু॥
স্নান করি গোরা চাঁদ উঠিলা ডাঙ্গায়।
কুটিল কুন্তল রাশি পৃষ্ঠেতে লোটায়॥
শুদ্ধ সুবর্ণের ন্যায় অঙ্গের বরণ।
নীলপদ্ম দল সম সুদীর্ঘ নয়ন॥
সুন্দর কপোল যুগ প্রশস্ত ললাট।
সহজে চলিলে দেখায় নাটুয়ার নাট॥ ২
রাম রম্ভা জিনি শোভে মনোহর উরু।
তুলি দিয়ে আঁকা যেন দুটী চারু ভুরু॥
আলতা রঞ্জিত যেন যুগল চরণ।
নিরখিলে মুগ্ধ হয় মুনির নয়ন॥
প্রেমময় তনুখানি মুখে হরিবোল।
যারে পান দয়া ক'রে তারে দেন কোল॥
হরি বলি অশ্রু পাত করে মোর গোরা।
পিচকারী ধারা সম বহে অশ্রু ধারা॥
চলিতে লাগিলা তবে মোর গোরা রায়।
অবধৌত নিত্যানন্দ পিছু পিছু ধায়॥
একই জেলের মুখে পরিচয় পাইয়া।
একে একে সকলেরে লইনু চিনিয়া॥
এইরূপে জলকেলি পেখিয়া নয়নে।
ভাবসিন্ধু উছলি উঠিলা মোর মনে॥
লোকে বলে শচীগৃহে ঈশ্বর আইলা।
তাই দরশনে চিত্ত আকুল হইলা॥
গৃহবিচ্ছেদের ছলা হৈল ভাগ্য ক্রমে।
তাই আইলাম শীঘ্র নবদ্বীপ ধামে॥
ঘাটে বসি এই লীলা হেরিনু নয়নে।
কি জানি কেমন ভাব উপজিল মনে॥
কদম্বকুসুম সম অঙ্গে কাঁটা দিল।
থর থরি সব অঙ্গ কাঁপিতে লাগিল॥
ঘামিয়া উঠিল দেহ তিতল বসন।
ইচ্ছা অশ্রুজলে মুহি পাখালি চরণ॥
চাচর চিকুর পৃষ্ঠে হসিত বদন।
আসিতে লাগিলা প্রভু সঙ্গে করি গণ॥
মোর ভাগ্যক্রমে প্রভু হেরিয়া আমারে।
আড়ে আড়ে চাহিতে লাগিলা বারে বারে॥
তার পর গুড়ি গুড়ি আইলা যখন।
চরণ ধরিয়া ভূমে পড়িনু তখন॥
চরণের তলে মুহি গড়া গড়ি যাই।
হাত ধরি বসাইলা দয়াল নিমাই॥

জোড় হাতে মুহি কাঁদি সম্মুখে বসিয়া।
দুই চারি বাত পুছে হাসিয়া হাসিয়া॥
হাসিতে অমিয় ধারা পড়ে অবিরত।
অঙ্গের সৌরভে চিত্ত হইলা মোহিত॥
হরিনামে সদা মত্ত অতি ক্ষীণ কায়।
পদতলে কত ভক্ত গড়াগড়ি যায়॥
সে যে কিবা ভাব তাহা বলিব কেমনে।
কোটি কোটি দেব আসি লুঠায় চরণে॥
যদ্যপি দাণ্ডায় প্রভু অন্ধকার ঘরে।
শরীরের আভায় আঁধার নাশ করে॥
অমৃত ধারায় বুঝি চাঁদেরে ছানিয়া।
কোন্‌ বিধি নিরজনে গড়েছে বসিয়া॥
যেই জন এইরূপ নিরখে নয়নে।
বিষয়াবৈরাগ্য ঘোরে তাহার পেছনে॥

হানি হাসি মোর সনে করি আলাপন।
নাম জিজ্ঞাসিলা প্রভু করিয়া যতন॥
প্রভু বলে কোন জাতি কিবা তব নাম।
কিসের ব্যবসা কর কোথা তব ধাম॥
শুনিয়া প্রভুর বাণী হাত জোড় করি।
কহিতে লাগিনু কথা আপনা পাশরি॥
এত কৃপা কেন মোরে অহে দয়াময়।
অধমের নামটি গোবিন্দ দাস হয়॥
ছিলাম গৃহস্থ গৃহে নানা কর্ম করি।
এবে কিন্তু হইয়াছি পথের ভিকারী ॥
বিষয় ছাড়িয়া এনু প্রভুদরশনে।
এবে স্থান দেহ প্রভু ও রাঙ্গা চরণে॥
বর্দ্ধমান কাঞ্চননগরে মোর ধাম।
শ্যামাদাস কর্ম্মকার জনকের নাম॥
এই বাত শুনি প্রভু বলিলা আমারে।
থাকরে গোবিন্দ তুমি আমার আগারে॥
আমার গৃহেতে তব হইবে পালন।
প্রত্যহ করিবে সুখে নাম সঙ্কীর্ত্তন॥
প্রতিদিন সুখে পাবে কৃষ্ণের প্রসাদ।
একেবারে পূরিবে মনের সব সাধ॥
সেবার কর্ম্মেতে তুমি নিয়ত থাকিবা।
গঙ্গাজল তুলসী আনিয়া যোগাইবা॥
প্রসাদ পাইবা নিত্য উদর পূরিয়া।
রসা শাক সুকুতা মোচার ঘণ্ট দিয়া॥
এত বলি সঙ্গে প্রভু চাহে লইবারে।
অমনি চলিনু মুহি প্রভুর সংসারে॥

টীকা -
@ - বাখানিয়া - প্রশংসা করিয়া,
# - পাট - প্রাচীন কালে পাট শব্দ রাজধানী (রাজপাট) বুঝাইত। এই জন্য পাট নাম পাইলে
বুঝিতে হইবে তথায় কোন সময় সম্ভবতঃ রাজধানী ছিল। এই পাট শব্দের সঙ্গে পত্তন
শব্দের ঐক্য আছে। জঙ্গল কাটিয়া কোন নগর পত্তন করা হইত। এইভাবে শব্দটির উদ্ভব
হইয়াছে। পাটনা নাম এই পত্তনের অপভ্রংশ।
@@ - বোল্ড অক্ষরে লেখা অংশটি অন্য কোন অজ্ঞাত প্রকাশকের দ্বারা প্রকাশিত
“গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত। দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদিত গ্রন্থে এই অংশটুকু
নেই।
১ - পারা বার - এপার ওপার হওয়া।
২ - নাট - নৃত্য।

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
গঙ্গার উপরে বাড়ী অতি মনোহর
ভণিতাহীন পদ
কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার)
এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র
সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৪-
পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
শ্রীচৈতন্যের গৃহের বর্ণনা। অবধূত নিত্যানন্দ, শ্রীচৈতন্যের মাতা শচীদেবী, স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া
দেবীর কথা, তাঁদে গৃহে কবির আনন্দে পেটপুরে খাওয়ার বর্ণনা।

গঙ্গার উপরে বাড়ী অতি মনোহর।
পাঁচ খানি বড় ঘর দেখিতে সুন্দর॥
নগরের দক্ষিণ সীমায় প্রভুর বাস।
হরিনামে মত্ত প্রভু সদাই উল্লাস॥
প্রকাণ্ড এক দীঘী হয় নিয়ড়ে তাহার।
কেহ কেহ বলে যারে বল্লাল সাগর॥

যে সকল ভক্ত সদা থাকে প্রভুর কাছে।
একে একে সকলের নাম কব পাছে॥
অদ্বৈত আচার্য্য আর স্বরূপ শ্রীবাস।
আচার্য্যের দুই পুত্র অচ্যুত কৃষ্ণদাস॥
মুকুন্দ মুরারিগুপ্ত আর গদাধর।
নরহরি বিদ্যানিধি শেখর শ্রীধর॥
অন্তরঙ্গ ভক্ত আরো দুই চারি জন।
যাহাদের সঙ্গে হয় গোপনে ভজন॥
অবধৌত নিত্যানন্দ পাগলের মত।
গড়াগড়ি দিয়া অশ্রু ফেলে অবিরত॥
শান্তমূর্ত্তি শচী দেবী অতি খর্ব্ব কায়।
নিমাই নিমাই বলি সদা ফুকরার॥
বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী হন প্রভুর ঘরণী।
প্রভুর সেবায় ব্যস্ত দিবস রজনী॥
লজ্জাবতী বিনয়িনী মৃদু মৃদু ভাষ।
মুহি হইলাম গিয়া চরণের দাস॥

এইরূপে শচীগৃহে দাস হয়ে থাকি।
না বলিতে সব কর্ম্ম সমাপিয়া রাখি॥
ভোজনেতে পটু মুহি আনন্দেতে খাই।
করিয়া প্রভুর কার্য্য সঙ্গেতে বেড়াই॥
প্রতিদিন ভোগ হয় বিষ্ণুর মন্দিরে।
কত ফল মূল ছানা ননি সর ক্ষীরে॥
শাক সূপ দধি সূক্তা মোদক পায়স।
বড়া লাড্ডু মিষ্টকাদি খাইতে সুরস॥
প্রতিদিন শচীমাতা করেন রন্ধন।
আনন্দে করেন সবে প্রসাদ ভোজন॥
পেটুকের শিরোমণি মুই হই দাস।
দয়াল প্রভুর পত্রে থাই বার মাস॥
কি বলিব প্রসাদের নাহিক তুলনা।
অমৃত সমান হয় যার এক কণা॥
এইরূপে রহিলাম প্রভুর আগারে।
চৈতন্তের দাস বলি সবে কৃপা করে॥
আমার প্রভুর প্রভু চৈতন্য গোঁসাই।
যখন যেখানে যান সঙ্গে সঙ্গে যাই॥

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
পৌষমাস সংক্রান্তি সন্ধ্যার সময়ে
ভণিতাহীন পদ
কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার)
এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র
সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৭-
পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
সন্ন্যাস গ্রহণের জন্য গৃহত্যাগের পূর্বরাত্রি ও প্রভাতে গৃহত্যাগ করে কণ্টকনগরের দিকে
প্রস্থান, কলির প্রভাব থেকে মানুষকে মুক্ত করতে তাঁর কি কি করনীয় ইত্যাদি কথন।

পৌষমাস সংক্রান্তি সন্ধ্যার সময়ে।
ফিরিয়া আইলা প্রভু আপন আলয়ে॥
যাতায়াত করিতে লাগিলা বহু লোক।
উথলিয়া পড়ে তছু শচীমার শোক॥
মিষ্ট বাক্যে জননীকে বুঝায়ে তখন।
রন্ধন আলয়ে গিয়া দিলা দরশন॥
দ্বিতীয় প্রহর নিশা অতীত হইলা।
ভোজন করিয়া প্রভু শয়ন করিলা॥

মুহি গিয়া নিজ স্থানে করিনু শয়ন।
প্রভুর আদেশে কিন্তু করি জাগরণ॥
রজনীর শেষভাগে প্রভু দয়াময়।
হঠাৎ বাহিরে আসি মোরে ডাকি কয়॥
বলে থাক প্রস্তুত হইয়া এই খানে।
বিদায় লইয়া আসি মায়ের চরণে॥
এত বলি অন্তঃপুরে গেলেন চলিয়া।
পুনঃ আসি বাহিরিলা আমারে ডাকিয়া॥
ব্যগ্র হয়ে বলে মোরে চল মোর সনে।
কাটোয়া নগরে যাই কাটিতে বন্ধনে॥
এই বাক্য যথা তথা না বলিবে তুমি।
সন্ন্যাস করিয়া জীব উদ্ধারিব আমি॥
স্বার্থপর দুরাচার মদ্য মাংস খায়।
কলির জীবের বল কি হবে উপায়॥

শিশ্নোদর-পরায়ণ নিষ্ঠা-বিবর্জিত।
অর্থের লাগিয়া মিথ্যা কহে অবিরত॥
যোনিকীট রমণীর মুখলালা খায়।
ভক্তি অমৃতের ধারা নিছিয়া ফেলায়॥
বেশ্যার অন্নেতে রুচি বেশ্যা অনুগত।
কনক কামিনী কলা কাম কেলি রত॥
একারণ মুহি শিখা সুত্র তেয়াগিয়া।
বেড়াইব দ্বারে দ্বারে হরিনাম দিয়া॥
হরিনাম মহামন্ত্র দীক্ষা নাহি যার।
সেই নাম পথে ঘাটে করিব প্রচার॥
চণ্ডাল যুবক গৃহী বালবৃদ্ধ নারী।
নামে মত্ত হয়ে দাণ্ডাইবে সারি সারি॥
বালকে বলিবে হরি বালিকা বলিবে।
পাষণ্ড অঘোরপন্থী নামে মত্ত হবে॥
আকাশ ভেদিয়া নামের পতাকা উড়িবে।
রাজা প্রজা এক সঙ্গে গড়াগড়ি দিবে॥
সন্ন্যাস করিয়া যদি না লই কৌপীন।
তবে কিসে উদ্ধারিব পাপী তাপী দীন॥
কলির জীবের দশা মলিন দেখিয়া।
থাকিতে পারিনা আর কাঁপে মোর হিয়া।
করঙ্গ কৌপীন লয়ে সন্ন্যাস করিব।
রাধা কৃষ্ণ নাম দিয়া সবে উদ্ধারিব॥
যারা বড় পাপী তাপী তাদের লাগিয়া।
সদা মোর চিত্ত কান্দে আকুল হইয়া॥

মোর সহ এরূপে করেন আলাপন।
হেন কালে শচী দেবী দিলা দরশন॥
আথিবিথি শচী দেবী বাহিরে আসিয়া।
সম্মুখে দাণ্ডাল মাতা হস্ত প্রসারিয়া॥
তার পরে জননীর ধরিয়া চরণ।
বিদায় লইয়া প্রভু করিলা গমন॥
কান্দিতে লাগিলা মাতা দ্বারে দাঁড়াইয়া।
পশ্চাতে চলিনু মুহি খড়ম লইয়া॥
কাঠের পুতলী সম শচী দাণ্ডাইলা।
ঝর ঝর অশ্রু বারি পড়িতে লাগিলা॥ @

তার পরে দ্বার হইতে হইয়া বাহির।
গঙ্গা পার হয়ে তবে চলে ধর্ম্মবীর॥
পার হৈয়া প্রভু চলে কণ্টক নগরে।
পেছনে পেছনে যাই সেবা করিবারে॥
যে সব আশ্চর্য্য লীলা পাই দেখিবারে।
করচা করিয়া রাখি শক্তি অনুসারে॥

টীকা -
@ - শচীদেবীর এই চিত্রের সঙ্গে চৈতন্য ভাগবতের বর্ণিত মূর্ত্তি ঠিক একরূপ,  
“যত কিছু বলে প্রভু শচী নাহি শুনে।
উত্তর না স্ফুরে কাঁদে অঝর নয়নে॥
*        *        *        *        *
প্রভু চলিলেন শুনি শচী জগন্মাতা।
জড় হইলেন কিছু নাহি স্ফুরে কথা।”
(চৈ, ভা, মধ্য ২৫ অ) এই মূর্ত্তিমতী শোকের মূক চিত্র, এবং “কাঠের পুতলী”র ন্যায় নির্ব্বাক
ছবি---দুইই ঠিক একরূপ।”

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
এইরূপে দিন রাত্রি অতীত হইলা
ভণিতাহীন পদ
কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার)
এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন
ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ১০-পৃষ্ঠায়
এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
কণ্টকনগরে পৌঁছে একদিন পরে কেশ মুণ্ডন, সন্ন্যাসগ্রহণ।

এইরূপে দিন রাত্রি অতীত হইলা।
পরদিন প্রাতে প্রভু সিনান করিলা॥
আঁচলে নয়ন চাপি কাঁদে নারীগণ।
ঝর ঝর অশ্রুধারা করে বরিষণ॥
কেহ বলে রূপের বালাই লৈয়া মরি।
কেমনে ইহার মাতা রবে প্রাণ ধরি॥
কোটি মদনের গর্ব্ব খর্ব্ব এইখানে।
এমন কেশের শোভা দেখিনি নয়নে॥
চিবুকের কিবা শোভা অতি নিরমল।
নীল পদ্ম জিনি শোভে নয়ন কমল॥
এমন আশ্চর্য্যরূপ কভু দেখি নাই।
কেমনে কৌপীন দণ্ড ধরিবে নিমাই॥
পাষাণে গঠিত হয় কেশব ঠাকুর।
কমনে মুড়াবে কেশ বড়ই নিঠুর॥
আহা মরি কিবা শোভো কণ্ঠে বনমালা।
মুখ শোভা চারিদিক্ করিয়াছে আলা॥
নারীগণ এইরূপে কত কথ বলে।
হেনকালে প্রভু মোরে ডাকিলা কৌশলে॥
প্রভু বলে দ্রব্যজাত আনহ ত্বরিতে।
মুণ্ডন করিব কেশ সন্ন্যাস করিতে॥
আর না রহিব ঘরে বন্ধন দশায়।
নরক যন্ত্রণা গৃহে কথায় কথায়॥
এই কথা শুনি শুদ্ধসত্ত্ব গদাধর।
অবধৌত নিত্যানন্দ শ্রীচন্দ্রশেখর॥
সন্ন্যাসের উপযুক্ত বিবিধ সম্ভার।
আনিয়া পূরিল সবে ন্যাসীর ভাণ্ডার॥
দেবা নামে নাপিতেরে ডাকিয়া আনিল।
বিল্ববৃক্ষতলে আসি নাপিত বসিল॥
নাপিতে বলিলা তবে চৈতন্য গোঁসাই।
মুণ্ডন করহ দেব ব্রজে চলে যাই॥
ভারতীয় আজ্ঞা পেয়ে নাপিত তখন।
বসিলা নিয়ড়ে গিয়া করিতে মুণ্ডন॥
যখন নাপিত শেষে কেশে ক্ষুর দিলা।
অমনি রমণীগণ ফুকারি উঠিলা॥
নারীগণ বলে নাপিত একাজ করো না।
এমন চুলের গোছা মুড়ায়ে ফেলো না॥
এই বলি কাঁদিয়া উঠিল নারীগণ।
মুণ্ডন করিতে দেবা লাগিল তখন॥
হাজার হাজার লোক সন্ন্যাস দেখিতে।
কণ্টক নগরে সবে লাগিলা আসিতে॥

দিবসের শেষ ভাগে মুড়াইয়া কেশ।
ধরিলা নিমাই তবে সন্ন্যাসীর বেশ॥
দণ্ডকমণ্ডলু হাতে কৌপীন পরিল।
কাষায় বসনে পুনঃ তাহা আবরিল॥
দাঁড়াইলা ভারতীর সম্মুখে গোঁসাই।
রূপে দিক্ আলো কৈলা বলিহারি যাই॥
অবধৌত গদাধর আর গঙ্গাদাস।
একে একে দাঁড়াইলা স্ন্ন্যাসীর পাশ॥
প্রভুর আশ্চর্য্য রূপ দেখিয়া ভারতী।
মনে মনে পাদপদ্মে করিলা প্রণতি॥
মনে মনে বলে গোঁসাই তুমি সে ঈশ্বর।
তোমার অধীনে হয় বিশ্ব চরাচর॥
লোকশিক্ষা লাগি তুমি পরিলে কৌপীন।
ভক্তিমার্গ দেখাইতে দীনের অধীন॥
অপরাহ্ণ কালে প্রভু সন্ন্যাসী হইলা।
হলুধ্বনি নারীগণ করিয়া উঠিলা॥
লতা পাতা শাখা বৃক্ষ প্রেমেতে ভাসিল।
পশু পক্ষী কীট যেন নাচিয়া উঠিল॥
লক্ষ লক্ষ লোকে করে পুষ্প বরষণ।
কণ্টক নগর হ'লো নন্দন কানন॥

শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নাম রাখিলা ভারতী।
লক্ষ লক্ষ লোক তথি করে গতাগতি॥
আঁজলি পূরিয়া যত কুলবধূগণ।
প্রভুর মাথায় করে লাজ বরষণ॥
হরিধ্বনি উঠিলেক গগন ভেদিয়া।
গড়াগড়ি যায় সবে ভক্তিতে রসিয়া॥
আকাশ ভ্রমিয়া নাম ভ্রমিছে গগনে।
আনন্দে মাতিয়া শুনে যত দেবগণে॥
রজনীতে প্রভু মোর করি জাগরণ।
হরিনামে মাতি রাত্রি করিলা যাপন॥
প্রভাতে শেখরে১ প্রভু বলিলা বচন।
তোমরা সকলে যাও নদীয়া ভবন॥
ব্রহ্মানন্দ সহ যাও জননীর কাছে।
বল গিয়া নিমাই সন্ন্যাস করিয়াছে॥
রোদন করেন যদি আমার জননী।
আশ্বাস বাক্যেতে তাঁরে বুঝাবে অমনি॥
তারপর নিত্যানন্দ গদাধর সঙ্গে।
ভারতীকে লয়ে চলিলেন নানা রঙ্গে॥
পেছনে পেছনে আমি খড়ী লয়ে যাই।
নাম মদে মাতয়ারা চৈতন্য গোঁসাই॥
লক্ষ লক্ষ লোক চলে প্রভুর পেছনে। ২
বিস্তর পণ্ডিত চলে প্রভু দরশনে॥
রুদ্রদেব রামরত্ন জগাই পণ্ডিত।
গঙ্গাদাস শম্ভুচন্দ্র ভুবনে বিদিত॥
ঈশান শঙ্কর বলরাম গদাধর।
পণ্ডিতের শিরোমণি চণ্ডচণ্ডেশ্বর॥
কাশীশ্বর ন্যায়রত্ন আর সিদ্ধেশ্বর।
পঞ্চানন বেদান্তিক আর রত্বাকর॥
এই সব
মহান @@ পণ্ডিত চলে সঙ্গে। ৩
প্রেমে মত্ত শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য চলে রঙ্গে॥
নৃত্যপরায়ণ প্রভু আগে আগে ধায়।
কখন ধাবন লম্ফ পতন ধরায়॥
ধারা বহি অশ্রুবারি বহিছে নয়নে।
ভারতী গোঁসাই কান্দে প্রেম আস্বাদনে॥

১ - শেখরে - চন্দ্র শেখর।
@@ - বোল্ড অক্ষরে লেখা অংশটি অন্য কোন অজ্ঞাত প্রকাশকের দ্বারা প্রকাশিত “গোবিন্দ
দাসের করচা” গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত। দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদিত গ্রন্থে এই অংশটুকু নেই।
২ - এই জায়গার বর্ণনায় বৃন্দাবন দাস লিখিয়াছেন “লক্ষ কোটি লোক পাছে পাছে কাঁদি যায়।”
৩ - এখানে যে সকল পণ্ডিতের নাম দেওয়া হইয়াছে, তাঁহাদের অধিকাংশের নাম অন্য কোন
পুস্তকে পাওয়া যায় না।

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর