কবি গোবিন্দ দাসের করচার বৈষ্ণব পদাবলী
*
তারপর পূর্ব্বদিকে চলে আবেশেতে
ভণিতাহীন পদ
কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার)
এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র
সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ১৩-
পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
সন্ন্যাসগ্রহণের পরে শচীমাতার সঙ্গে দেখা ক’রে বর্দ্ধমানে পৌঁছে গোবিন্দের বাড়ীতে গমন,
শ্রীচৈতন্যের গোবিন্দকে স্ত্রী-সংসারে থেকে যওয়ার অনুরোধ, স্ত্রীর আকুতি সত্বেও
গোবিন্দের, শ্রীচৈতন্যের সঙ্গ ত্যাগ না করা।

তারপর পূর্ব্বদিকে চলে আবেশেতে।
আচার্য্যের গৃহে ধায় মাতিয়া ভাবেতে॥
কিছুকাল আচার্য্যের গৃহেতে রহিলা।
তারমধ্যে শচীমাতা আসি দেখা দিলা॥
শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু মাতার চরণে।
প্রণাম করিয়া কথা কন সন্তর্পণে॥
দুই চারি বাত কহি মায়া কাটাইয়া।
দক্ষিণে করিলা যাত্রা সকলে ছাড়িয়া॥
ঈশান প্রতাপ গঙ্গাদাস গদাধর।
ন্যাসীর সহিত চলে আর বাণেশ্বর॥

বর্দ্ধমানে যখন পৌছিনু মোরা সবে।
ভাবিতে লাগিনু মুহি ভাগ্যে কিবা হবে॥
মোর প্রতি চাহি প্রভু কহিতে লাগিলা।
অমিয়ের ধারা যেন গলিয়া পড়িলা॥
মোর পৃষ্ঠে চাপড় মারিয়া প্রভু কহে।
চল যাই গোবিন্দরে তোমাদের গৃহে॥
এই কথা শুনি মুহি উঠিনু চমকি।
হাসিয়া চলিলা প্রভু ঠমকি ঠমকি॥
প্রভুর সন্ন্যাস-কালে ধরেছি কৌপীন।
অহঙ্কার তেজিয়া হয়েছি অতি দীন॥
আর ত বাসনা নাই সংসার করিতে।
প্রভুর সহিত যাই নাচিতে নাচিতে॥
পথেতে যাইতে মুহি জোড় করি হাত।
উত্তরে কহিনু তথা দুই চারি বাত॥
আরত যাবনা প্রভু কাঞ্চন নগরে।
বিষ্ঠাসম ত্যজিয়াছি জঘন্য সংসারে॥

এই কথা বলিতে বলিতে মোর নারী।
কেমনে শুনিয়া তথা আইলা ত্বরা করি॥
দর দর পড়িতেছে অশ্রু দুনয়নে।
পড়িলা আছাড় খেয়ে আমার চরণে॥
অশ্রুমুখে বলিতে লাগিলা এই বাত।
ফিরে চল গৃহে মুহি যাই তব সাত॥
সামান্য কথায় তুমি সংসার তেজিলে।
দাসীর উপায় তবে বল কি করিলে॥
কার দ্বারে গিয়া ভিক্ষা করিব কোথায়।
দয়া করি কেবা ভিক্ষা দিবে গো আমায়॥
কি আছে অদৃষ্টে মোর কার দ্বারে গিয়া।
ভিক্ষা করি বেড়াইব পেটের লাগিয়া॥
শুনিয়া তাহার বাণী মাথা হেট করি।
মনে মনে বলিতে লাগিনু হরি হরি॥
হরি স্মরণে কাটে যতেক বন্ধন।
তেকারণ যনে করি হরির চরণ॥

দয়াময় শ্রীচৈতন্য হেরিয়া তখন।
কহিতে লাগিলা তবে মধুর বচন॥
শুনিয়া প্রভুর বাণী হইয়া দুঃখিনী।
অশ্রুজলে ভিজাইতে লাগিলা মেদিনী॥
কান্দিয়া আকুল বামা চারিদিকে চায়।
তত্ত্বকথা বলি প্রভু তাহারে বুঝায়॥
শুনিয়া প্রভুর সেই কথা আচম্বিতে।
চক্ষু চাপি আঁচলেতে লাগিলা কাঁদিতে॥

তাহার রোদনে প্রভুর দয়া উপজিল।
অমনি ফিরিয়া মোরে কহিতে লাগিল॥
প্রভু কহে গোবিন্দরে গৃহে থাক তুমি।
অন্য ভৃত্য সঙ্গে করি পুরী যাই আমি॥

এই বাক্যে মোর চক্ষু হ'তে অশ্রু ঝরে।
অমনি চরণ ধরি পড়িনু কাতরে॥
অশ্রুজলে পাখালিনু যুগল চরণ।
অমনি ফিরিয়া প্রভু করিলা গমন॥

তবে মোর প্রতিবাসী একত্র হইয়া।
কহিতে লাগিল কথা মোরে ভুলাইয়া॥
সংসার বিষের কথা লাগিনু কহিতে।
লাগিনু নারীর গুহ্য মুহি বাখানিতে॥

শুন শুন ওহে ভাই রমণীর বাণী।
রমণী রমণ হয় একই পরাণী॥

আত্ম অংশে দৃষ্টি যদি কর সবে এবে।
রমণী রমণ সব একই দেখিবে॥
অমৃত হইতে যারা সুস্বাদু ভাবিয়া।
রমণীর লালা পিয়ে নয়ন মুদিয়া॥
নিত্যানন্দ ভুলে তাতে আনন্দ যাহার।
ধিক্ সে পামর জন্ম বৃথাই তাহার॥
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন গৌরাঙ্গ আমার।
তেয়াগিয়া তাঁর সঙ্গ লইব সংসার॥

এই কথা বলিতে বলিতে দামোদর।
পার হৈয়া চলিনু মোরা কাশী মিত্রের ঘর॥

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
পরদিন বেতরণী নদী তীরে গিয়া
ভণিতাহীন পদ
কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার)
এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র
সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ১৯-
পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
শ্রীচৈতন্যের প্রথমবার পুরীতে আগমন, বিভিন্ন মন্দিরে গমন, কাশীমিশ্রের ভবনে
শ্রীচৈতন্যের বাস এবং সেখানে প্রাপ্ত প্রসাদে নানা ফল, ভাজা-ভুজি ইত্যাদির বর্ণনা, দক্ষিণে
যাত্রার কালে নিত্যানন্দের অনুরোধ অন্যদের সঙ্গে নেবার জন্য, কিন্তু শ্রীচৈতন্য বললেন যে
তিনি গোবিন্দকেই সঙ্গে নেবেন।

পরদিন বেতরণী নদী তীরে গিয়া।
কৃষ্ণ পার কর বলি উঠিল কান্দিয়া॥
প্রেমে গদ গদ তনু সর্ব্বদা উদাস।
হরি বলি চলে নাহি দেখে আশ পাশ॥
পরদিন মহানদী পার হৈয়া যাই।
পথে গোপীনাথ দেবে দেখিবারে পাই॥
গোপীনাথের মহাপ্রসাদ পাইনু সকলে।
প্রসাদ পাইয়া মনে আনন্দ উছলে।
অনন্তর সাক্ষী গোপাল দরশন লাগি।
চলিতে লাগিল সবে হয়ে অনুরাগী॥
হরি বলি বাহু তুলি ধাইতে লাগিল।
অশ্রধারা পড়ি ধরা পঙ্কিল করিল॥
দুর হৈতে সাক্ষী গোপাল দরশন করি॥
প্রেমে গদ গদ হোয়ে পড়য়ে বিছারি॥ ১
গোপালে দেখিয়া যেন কি মনে পড়িল॥
অমনি বদন চাহি কাঁদিতে লাগিল॥
গোপাল গোপাল বলি ডাকে বারে বারে।
কত যে প্রেমের বেগ কে কহিতে পারে॥

তার পরে নিংরাজের মন্দিরে যাইয়া।
কি জানি কিভাবে প্রভু উঠিল কান্দিয়া॥
নিংরাজ ত্যজি যাই আটারনালায়।
ধ্বজা দেখি প্রভু মোর পড়িল ধরায়॥
এমন অশ্রুর বেগ দেখি নাই কভু।
পঙ্কিল করিলা ধরা অশ্রুস্রোতে প্রভু॥
হা হা প্রভু জগন্নাথ বলিয়া শ্রীহরি।
ভাসাইলা ভূমিতল অশ্রুপাত করি॥
আছাড়ি বিছাড়ি পরে উভরায় কাঁদে।
সমুখে যাহারে দেখে বাহুপাশে ফাঁদে॥
ঐ দেখ কৃষ্ণ মোর নাচে গোপালবেশে।
আহা মরি কত শোভা হইয়াছে কেশে॥
প্রভুর মন্দির হেরি কাঁদে উভরায়। ২
কখন আছাড় খেয়ে পড়িছে ধরায়॥
বেগে গিয়া ধূলা পায় প্রভুর দুয়ারে।
অশ্রুস্রোতে বিষ্ণু মূর্ত্তি দেখিতে না পারে॥
আছাড়ি বিছাড়ি চীৎকার বিলুণ্ঠন।
লক্ষ লোক আদে ভাব করিতে দর্শন॥
বহু কষ্টে প্রেমধারা প্রভু নিবারিয়া।
মহাবিষ্ণু হেরি প্রভু উঠিল কান্দিয়া॥
ভক্তগণ চমকিত রোদনের রোলে।
ধাইয়া গিয়া গদাধরে করিলেন কোলে॥
গরুড়ের স্তম্ভ গিয়া আঁকড়ি ধরিলা।
কপাল কাটিয়া রক্ত বহিতে লাগিলা॥
ইহা দেখি ধ্যানপুরী ৩ উত্তরীয় দিয়া।
প্রভুর শোণিতধারা দিলা মুছাইয়া॥
দর্শন করিয়া গেলা মিশ্রের ভবনে।
শ্রেণীবদ্ধ আসিতে লাগিলা ভক্তগণে॥
এইরূপে কিছুদিন থাকিয়া পুরীতে।
নিত্য নব নব সুখ লাগিনু ভুঞ্জিতে॥
অবধৌত কৃষ্ণদাস আর হরিদাস।
পরম আনন্দ ভুঞ্জে থাকি প্রভুর পাশ॥
নামের ধ্বনিতে পুরী পূর্ণ আট পর। ৪
গড়াগড়ি দেয় সবে ভূমির উপর॥
কেহ মালা গাঁথে কেহ ঘর্ষয়ে চন্দন।
কেহ কেহ করয়ে ভোগের আয়োজন॥
ক্রমে সব সাঙ্গোপাঙ্গ মিলিল আসিয়া।
হইল পুরীর শোভা বৈকুণ্ঠ জিনিয়া॥
বিপ্র কৃষ্ণদাস আর ভুঁড়ে শ্যামদাস।
দুইজনা রক্ষা করে প্রভুর দুই পাশ॥
কখন আছাড় খায় প্রেমেতে মাতিয়া।
কখন বা সমুদ্রেতে পড়ে ঝম্প দিয়া॥
প্রেমদাস গোপীদাস মোহান্ত ব্রাহ্মণ।
ভাগবত পাঠে করে অমৃত বর্ষণ॥
রঘুনাথ দাস আর আচার্য্য শেখর।
দামোদর নরহরি আর গদাধর॥

নিত্য নিত্য সবে মিলি যান শ্রীমন্দিরে।
আমার প্রভুরে সবে লয়ে যান ঘিরে॥
মধূর মৃদঙ্গ বাজে কভু করতাল।
নামে মত্ত সদা তার নাহি কালাকাল॥

এইরূপে প্রভু মোর মিশ্রের ভবনে।
আনন্দ করেন সদা ভক্তগণ সনে॥
কাশীমিশ্র নিত্য আনে প্রসাদ প্রচুর।
সুগন্ধে হৃদয় হরে খাইতে মধুর।
নানাবিধ ভাজাপোড়া কতই কহিব।
কতই প্রসাদ আর উদরে পূরিব॥
চানাভাজা চুরমারি মুদ্গ কলাই।
তিল তিষি গম যব বলিহার্ যাই॥
কত শত ফল মূল নারিকেল কোরা।
নিত্য হাতে তুলি দেন নদিয়ার গোরা॥
চিনাচূর খুরমার লাড্ডু আর গজা।
আঁধসা পিষ্টক পুলি রসপূর গজা॥
ঘৃতসিক্ত অন্ন ভূতঘণ্ট বেতো শাক।
এ সব প্রসাদ পেয়ে নাহি সরে বাক্॥
অবাক্‌ হইয়া নিত্য পেট ভরে খাই।
তখনি উদরসাৎ যখন যা পাই॥

এইরূপে যত দিন যাইতে লাগিল।
ক্রমে সব ভক্তগণ আসিতে লাগিল॥
শঙ্কর ভারতী আর পরানন্দপুরী।
দামোদর স্বামী প্রদুম্ন ব্রহ্মচারী॥
চিদানন্দগিরি প্রেমানন্দ সরস্বতী।
প্রভুর নিকটে নিত্য করে গতাগতি॥
বহুভক্ত একত্র হইয়া নীলাচলে।
ভজন করেন সবে অতি কুতূহলে॥
এই কালে সার্ব্বভৌম আসি দেখা দিল।
সেই সঙ্গে বহু ভক্ত আসিয়া মিলিল॥
মহাবিষ্ণু দেখিয়া প্রভুর হৈলা রতি।
পুনঃ খুনঃ করে প্রভু ভকতি প্রণতি॥
মুরছিত হৈল প্রভু গোবিন্দ দেখিয়া।
যেন মৃতদেহ তথি রহিল পড়িয়া॥
সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য ছিলা সেই স্থানে।
কোলে তুলি লয়ে গেলা আপন ভবনে॥
কত সেবা করিলেন প্রভুরে লইয়া।
সার্ব্বভৌমের ভক্তিরস পড়ে উছলিয়া॥

অনন্তর সার্ব্বভৌমে ভক্তি করি দান।
দক্ষিণযাত্রার লাগি হৈলা আগুয়ান॥
তিন মাস কাল মোর চৈতন্য গোঁসাই।
পুরীতে রহিলা সঙ্গে করিয়া নিতাই॥
তার পরে বৈশাখের সপ্তম দিবসে। ৫
দক্ষিণে করিলা যাত্রা ভাসি প্রেমরসে॥
যাত্রার সময়ে নিতাই হইয়া চিন্তিত।
কহিতে লাগিলা বাণী ভক্তিতে বিনীত॥
না যাহ একাকী কহে নিত্যাননদ রায়।
সঙ্গে সঙ্গে যাই চল মোরা সমুদায়॥
বড় ব্যস্ত যাইতে প্রাণের গদাধর।
প্রেমানন্দ সরস্বতী ভারতী শঙ্কর॥
এত শুনি প্রভু মোর ঈযৎ হাসিয়া।
বলে মুহি একা যাব সঙ্গী না লইয়া॥
অবধৌত নিত্যানন্দ শুনিয়া বচন।
কহিতে লাগিল করি অশ্রু বরষণ॥
দক্ষিণযাত্রায় তুমি যাবে অতিদূর।
সঙ্গে যা'ক্‌ কৃষ্ণদাস বাহ্মণ ঠাকুর॥
পবিত্র হইয়া বিপ্র তাহাই করিবে।
যখন ইহারে যাহা করিতে বলিবে॥
তোমারে ছাড়িয়া মোরা কেমনে রহিব।
তাই বলি সবে মোরা তব সঙ্গে যাব॥
এত শুনি মহাপ্রভু ঈষৎ হাসিয়া।
বারণ করিলা সবে উপদেশ দিয়া॥
সেই কথা শুনি সবে বলিতে লাগিল।
তব সঙ্গে দাস তব গোবিন্দ চলিল॥

এত শুনি প্রভু মোর কন হাসি হাসি।
গোবিন্দের সঙ্গ আমি বড় ভালবাসি॥
যে যাক্‌ সে নাহি যাক্‌ গোবিন্দ যাইবে।
আমার যে কার্য্য তাহা গোবিন্দ করিবে॥
এত বলি শ্রীচৈতন্য লইয়া বিদায়।
চলিলা দক্ষিণ দিকে সব ভক্ত ধায়॥ ৬

টীকা -
১ - বিছারি - বিস্মৃত হইয়া।
২ - উভরায় - উচ্চৈঃস্বরে।
৩ - ধ্যানপুরীর নাম অন্য কোন পুস্তকে পাওয়া যায় নাই।
৪ - অটপর - আটপর - অষ্ট প্রহর।
৫ - “বৈশাখ প্রথমে দক্ষিণ যাইতে হৈল মন।” চৈ, চ, মধ্য, ৭ম পঃ ৫। এখানে “বৈশাখ
প্রথমে” অর্থ বৈশাখের প্রথম ভাগে।
৬ - পুরীর বিবরণটি অতি সংক্ষিপ্ত। চৈতন্যভাগবত, চৈতন্য চন্দ্রোদয় প্রভৃতি পুস্তকে
বিস্তৃত বিবরণ আছে।

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
ক্রমে ক্রমে আলাল নাথের শ্রীমন্দিরে
ভণিতাহীন পদ
কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার)
এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র
সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ২১-
পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
সার্বভৌম ভট্টাচার্য্যের কথায় গোদাবরী তীরে রায় রামানন্দের সঙ্গে দেখা ও কথোপকথন।

ক্রমে ক্রমে আলাল নাথের শ্রীমন্দিরে।
পৌহুছিনু মোরা সব অতি ধীরে ধীরে॥
আলালনাথেরে হেরি ভাব উথলিল।
অশ্রুজলে সে স্থানের মাটি ভিজাইল॥
নাচিতে নাচিতে প্রভু অজ্ঞান হইয়া।
পড়িলেন ভূমি তলে আছাড় খাইয়া॥
পরদিন প্রাতে সবে লইয়া বিদায়।
তিনজনে বাহিরিনু দক্ষিণ যাত্রায়॥

এইকালে সার্ব্বভৌম বলে ধীরে ধীরে।
মিলিবে রায়ের সঙ্গে গোদাবরী তীরে॥
রসজ্ঞ ভক্তের শ্রেষ্ঠ রামানন্দরায়।
কৃষ্ণ নামে সদাসিক্ত নয়ন ধারায়॥
বিশুদ্ধ আনন্দভোগ রামরায় করে।
হরি নামে হয় তাঁর আনন্দ অন্তরে॥

ইহা শুনি গোদাবরী তীরেতে ধাইল।
সেই স্থানে রামানন্দ আসিয়া মিলিল॥
নবীন সন্ন্যাসী দেখি ভক্তি উপজিল।
পদধরি রামরায় কান্দিতে লাগিল॥
রানানন্দরায় বলে তুমি ত ঈশ্বর।
দর্শন পাইনু মুহি বড় ভাগ্যধর॥
প্রভু কহে রায় তুমি কহ কৃষ্ণ কথা।
তোমার সিদ্ধান্তে যাবে হৃদয়ের ব্যথা॥
রায় বলে প্রভু মুঞি কিছুই না জানি।
তুমি না বলালে মোরে নাহি সরে বাণী॥
হৃদয়ে থাকিয়া তুমি সমস্ত পড়াও।
মূকজনে কৃপা করি বাচাল করাও॥
প্রভু কহে কোন তত্ত্বে শুদ্ধ হয় মন।
রায় বলে সেই তত্ত্ব সাধুর মিলন॥
তাহতেও সূক্ষ্মতর চাই তব ঠাঁই।
রায় কহে ত্যাগ বিনু আর তত্ত্ব নাই॥
প্রভু কহে সূক্ষ্ম তত্ত্ব হয় অনুরক্তি।
রায় কহে তাহ'তেও উচ্চ প্রেমভক্তি॥
প্রভু কহে আরো সার কহ মহামতি।
রায় কহে সর্ব্ব সার রাই রসবতী॥
রামরায় আরো সার বলিবারে চায়। ১
অমনি বদন চাপি ধরে গোরারায়॥
প্রভু কহে দুগ্ধে ঘৃত আছে গুপ্ত ভাবে।
সে পাবে আস্বাদ তার যে জন মথিবে॥ ২
প্রভু কহে রায় আমি কিছুই না জানি।
কহ কহ কৃষ্ণ কথা তব মুখে শুনি॥

বিরক্ত বৈষ্ণব তুমি ওহে রাম রায়।
কহ কহ কৃষ্ণ তত্ত্ব জুড়াক হৃদয়॥
শুনিয়া প্রভুর বাণী রামানন্দ রায়।
'দৈন্যভাবে দুটী হাত জোড় করি কয়॥
বার বার কেন ছল জগৎ ঈশ্বর।
কৃপাকরি এ দাসেরে কর অনুচর॥
দেশময় ভক্তিরস ছড়াইলে তুমি।
দয়া করি পবিত্র করিলে এই ভূমি॥
অধম জনেরে দয়া কর জগন্নাথ।
হৃদয়ে বৈরাগ্য দিয়া লহ মোরে সাথ॥

এত শুনি রায়ে প্রভু কৈলা আলিঙ্গন।
হাটু ধরি রামরায় করেন ক্রন্দন॥
অশ্রুধারে রামানন্দের ভাসিল হৃদয়।
তাহা হেরি গদ গদ স্বরে প্রভু কয়॥
বৈষ্ণবের চূড়ামণি তুমি রামরায়।
অধোমুখে রামানন্দ রাম রাম কয়॥

প্রভু কহে রায় তুহু বড় ভাগ্যবান্‌।
তোমার ভাগ্যের কথা না যায় বাখান॥
রায় বলে মুঞি অতি অধম পামর।
স্পর্শদোষ হইয়াছে তোমার গোচর॥
কৃপাকরি ক্ষমি মোর সেই অপরাধ।
হৃদয়ে বসিয়া করাও ভক্তির আস্বাদ॥
দে রজনী এইরূপ কথোপকথনে। ৩
কাটাইলা রামানন্দ গোরাচাঁদ সনে॥
পরদিন রায় প্রভুর চরণ ধরিয়া।
চলি গেলা নিজ কার্য্যে বিদায় লইয়া॥
প্রভু কহে রামানন্দ এবে আমি যাই।
নীলাচলে গিয়া তুহু থেকো মোর ঠাঁই॥ ৪
তুমি আমি আর ভট্ট থাকি নিরজনে।
আলোচিয়া কৃষ্ণ তত্ত্ব জুড়াব জীবনে॥

এত বলি প্রভু রায়ে দিলেন বিদায়।
প্রণমিয়া রামানন্দ গৃহে চলি যায়॥
প্রভুর সহিত রায় যতেক কহিল।
তাহার শতাংশ এহি গ্রন্থে না রহিল॥
এইরূপে রামানন্দ দশদিন আসি।
আনন্দিত হয় হেরি নদের সন্ন্যাসী॥
দেখি রামানন্দে প্রভু বড় প্রীতি পান।
প্রভুরে দেখিলে রায় হয়েন অজ্ঞান॥

রায়ের নিকট হৈতে লইয়া বিদায়।
ত্রিমন্দ নগরে প্রভু প্রবেশ করয়॥ ৫

টীকা -
১ - চৈতন্য-চরিতামৃত এই আলোচনা বিস্তৃতভাবে পাওয়া যাইবে।
২ - এই উপলক্ষে চৈতন্য-চরিতামৃত লিখিয়াছেন--- “সহজে চৈতন্য চরিত ঘন দুগ্ধ পুর।
রামানন্দচরিত আছে খণ্ড প্রচুর॥ রাধাকৃষ্ণলীলা তাতে কর্পূর মিলন। ভাগ্যবান যেই সেই
করে আস্বাদন॥” (চৈ, চ, মধ্য ৮ম পঃ ১৯০)।
৩ - “এই মতে দুই জনে কৃষ্ণ কথা বেশে। নৃত্য গীত রোদনে হইল রাত্রি শেষে॥” (চৈ, চ,
মধ্য ৮ম পঃ ১৬৯)।
৪ - বিদায়ের কালে তারে এই আজ্ঞা দিল। বিষয় ছাড়িয়া তুমি যাহ নীলাচলে॥ আমি তীর্থ
করি তাহা আসিব অল্প কালে। দুইজনে নীলাচলে রহিব এক সাথে॥ (চৈ, চ, মধ্য ৮ম পঃ
১৮৭)।
৫ - দক্ষিণের যে বিবরণ কবিরাজ গোস্বামী দিয়াছেন, তাহা নিতান্ত অসম্পূর্ণ। পুরী ও
গোদাবরী তীর পর্য্যন্ত ঘটনা তিনি পার্শ্বচরদিগের নিকট শুনিয়াছিলেন। রামানন্দের সঙ্গের
বিচার তিনি দামোদর স্বরূপের করচা হইতে সংগ্রহ করিয়াছিলেন। (চৈ, চ, মধ্য ৮ম পঃ
১৯৩) কিন্তু দক্ষিণাপথ ভ্রমণ সম্বন্ধে “কহিতে না পারি কথা যথা অনুক্রম।” (চৈ, চ, মধ্য ১২
পঃ ৪) বলিয়া দুঃখ প্রকাশ করিয়াছেন। চৈতন্য-চরিতামৃতে ত্রিমন্দ স্থলে ত্রিমল্ল।

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
বহুবৌদ্ধ বাস করে ত্রিমন্দ নগরে
ভণিতাহীন পদ
কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার)
এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র
সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ২৩-
পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
ত্রিমন্দ নগরে বৌদ্ধ রামগিরি রায় ও তুঙ্গভদ্রাবাসী ঢুণ্ঢিরামে ভক্তি বিতরণ।

বহুবৌদ্ধ বাস করে ত্রিমন্দ নগরে।
আসিয়া মিলিল সবে গৌরাঙ্গসুন্দরে॥
বৌদ্ধগণ সহ প্রভু বিচার করিলা।
ত্রিমন্দের রাজা আসি মধ্যস্থ হইলা॥
বৌদ্ধগণ বিচারেতে পরাস্ত মানিল।
পণ্ডিত দর্শক দবে হাসিতে লাগিল ॥
সবে বলে এ সন্ন্যাসী মানুষ ত নয়।
যে বিচার কৈল তাহা কহনে না যায়॥
বৌদ্ধগণের পতি রামগিরি রায়।
প্রণমিয়া বলে পথ দেখাও আমায়॥
তুমি ত মানুষ নহ নবীন সন্ন্যাসী।
থাকিতে তোমার সহ বড় ভালবাসি॥
পাষণ্ডের শিরোমণি ছিলাম সংসারে।
কূপাকরি ভক্তিমার্গ দেখাও আমারে॥

হাসিয়া চৈতন্ত প্রভু কৃপা করি কয়।
মাথার ঠাকুর তুমি রামগিরি রায়॥
হরি বলি পুলকিত হয় যেই জন।
মাথার ঠাকুর সেই এই ত সাধন॥
শুনিয়া প্রভুর বাণী রামগিরি রায়।
অমনি আছাড় খেয়ে পড়িল ধরায়॥
পড়িয়া চরণ তলে রামগিরি কয়।
নরাধমে কি বলিলে তুমি দয়াময়॥

সর্ব্বজীবে থাকি তুমি দেখিছ সকল।
কৃপা করি রাঙ্গাপায় দেহ মোরে স্থল॥
রামগিরি পাষণ্ডের ভক্তি উপজিল।
ইহা হেরি প্রভু মোর আনন্দে পূরিল॥
পণ্ডিতের শিরোমণি যত বৌদ্ধগণ।
রামগিরি পথে সবে করিলা গমন॥
নবীন সন্ন্যাসী করে বাদীর নিরাশ।
ইহা হেরি রামানন্দ চাহে চারি পাশ॥

বিচার করিতে শেষে হয়ে অভিলাষী।
ঢুণ্ঢিরামতীর্থ আসে তুঙ্গভদ্রাবাসী॥
অহঙ্কারে সদামত্ত পণ্ডিতাভিমানী।
নাহি বুঝে ভক্তিমার্গ শুষ্কতর্কে জ্ঞানী॥
বড়ই পণ্ডিত বটে ঢুণ্ঢিরাম হয়।
বিচার করিতে কিন্তু পায় বড় ভয়॥
ঢুণ্ঢিরাম স্বামী গিয়া করিতে বিচার।
অশ্রুফেলি ধরণী লোটায় বার বার॥
প্রভু কহে শুন শুন ঢুণ্ঢিরাম স্বামী।
তোমার সহিত তর্কে হারিলাম আমি॥
জয় পত্র লিখে আমি দেই সঙ্গোপনে।
হারিল চৈতন্য এবে তোমার সদনে॥
বাণীর কৃপায় তুমি পণ্ডিত গোঁসাই।
কার সাধ্য তর্ক শাস্ত্রে জিনে তব ঠাঁই॥
ন্যায় সাংখ্য পাতঞ্জল বেদান্ত দর্শন।
সর্ব্ব শাস্ত্রে অধিকারী তুমি গো সুজন॥
মূরখ সন্ন্যাসী মুহি কিছু নাহি জানি।
বার বার তোমার নিকটে হারি মানি॥
আগেকার ঢুণ্ঢি @ হতে তুমি সুপণ্ডিত।
তোমার পাণ্ডিত্য হয় ভুবনে বিদিত॥

এত বলি ঢুণ্ঢিরাম করিলা বিদায়।
যাইতে না চায় ঢুণ্ঢি চারিদিকে চায়॥
ইতি উতি চেয়ে ঢুণ্ঢি প্রভুর চরণে।
লোটাইয়া পড়িলেক অতি শুদ্ধ মনে॥

পাষণ্ড ঢুণ্ঢিরে ভক্তি বিতরণ করি।
পন্থ-গুহা যাত্রা করে স্মরিয়া শ্রীহরি॥
ঢুণ্ঢিরাম হরিদাস নামে খ্যাত হয়।
কানাকানি পাষণ্ডেরা কত কথা কয়॥
আমারে ডাকিলা প্রভু হাসিয়া হাসিয়া।
স্কন্ধেতে লইনু তুলে দুইটি খড়িয়া॥
খড়ম করঙ্গা আদি সম্বল যা ছিল।
লইনু সংগ্রহ করি রায় যাহা দিল॥

টীকা -
@ “ঢুণ্ঢি" সম্ভবতঃ নাম নহে---উপাধি।

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
অক্ষয় নামেতে বট বহু দূরে ছিল
ভণিতাহীন পদ
কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার)
এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র
সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ২৪-
পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
পন্থ-গুহা যাত্রা, বেশ্যা সত্য বাই, লক্ষ্মী বাই ও ধনী তীর্থরামের উদ্ধার।

অক্ষয় নামেতে বট বহু দূরে ছিল।
সন্ধ্যাকালে সেই স্থানে প্রভু উত্তরিল॥
বটেশ্বর নামে শিব আছেন তথায়।
ভক্তি করি সেই খানে গোরাচাঁদ ধায়॥
ভক্তিসহ বটেশ্বর প্রভু প্রণমিলা।
অনাহারে সেই খানে রজনী যাপিলা॥
প্রভাতে যাইলা প্রভু স্নান করিবারে।
ভিক্ষা করিবারে মুহি ফিরি দ্বারে দ্বারে॥
ভিক্ষামাগি আইলাম মধ্যাহ্ন সময়ে।
পাক করি সেবা করে মোর গোরা রায়ে॥

প্রসাদ পাইনু মুহি অমৃত সমান।
হেনকালে আইলা সেখা তীর্থ ধনবান্‌॥
দুইজন বেশ্যা সঙ্গে আইলা দেখিতে।
সন্ন্যাসীর ভারি ভুরি পরীক্ষা করিতে॥
সত্যবাই লক্ষ্মীবাই নামে বেশ্যাদ্বয়।
প্রভুর নিকটে আসি কত কথা কয়॥

ধনীর শিক্ষায় সেই বেশ্যা দুই জন।
প্রভুরে বুঝিতে বহু করে আয়োজন॥
তীর্থরাম মনে মনে নানা কথা বলে।
সন্ন্যাসীর তেজ এবে হরে লব ছলে॥ @
কত রঙ্গ করে লক্ষ্মী সত্যবালা হাসে।
সত্যবালা হাসি মুখে বসে প্রভু পাশে॥
কাঁচলি খুলিয়া সত্য দেখাইলা স্তন।
সত্যরে করিলা প্রভু মাতৃ সম্বোধন॥
থর থরি কাঁপে সত্য প্রভুর বচনে।
ইহা দেখি লক্ষ্মী বড় ভয় পায় মনে॥
কিছুই বিকার নাহি প্রভুর মনেতে।
ধেয়ে গিয়া সত্যবালা পড়ে চরনেতে॥
কেন অপরাধী কর আমারে জননী।
এইমাত্র বলি প্রভু পড়িলা ধরণী॥
খসিল জটার ভার ধূলার ধূসর।
অনুরাগে থর থর কাঁপে কলেবর॥
সব এলো থেলো হলো প্রভুর আমার।
কোথা লক্ষ্মী কোথা সত্য নাহি দেখি আর॥
নাচিতে লাগিলা প্রভু বলি হরি হরি।
লোমাঞ্চিত কলেবর অশ্রু দর দরি॥
গিয়াছে কৌপীন খসি কোথা বহির্বাস।
উলাঙ্গ হইয়া নাচে ঘন বহে শ্বাস॥
আছাড়িয়া পড়ে নাহি মানে কাঁটা খোঁচা।
ছিড়ে গেল কণ্ঠ হ'তে মালিকার গোছা॥
না খাইয়া অস্থিচর্ম্ম হইয়াছে সার।
ক্ষীণ অঙ্গে বহিতেছে শোণিতের ধার॥
হরি নামে মত্ত হয়ে নাচে গোরা রায়।
অঙ্গ হতে অদভুত তেজ বাহিরায়॥
ইহা দেখি সেই ধনী মনে চমকিল।
চরণতলেতে পড়ি আশ্রয় লইল॥

চরণে দলেন তারে নাহি বাহ্যজ্ঞান।
হরি ব'লে বাহতুলে নাচে আগুয়ান্‌॥
সত্যরে বাহুতে ছাঁদি বলে বল হরি।
হরি বল প্রাণেশ্বর মুকুন্দ মুরারি॥
কোথা প্রভু কোথায় বা মুকুন্দ মুরারি।
অজ্ঞান হইলা সবে এই ভাব হেরি॥

হরি নামে মত্ত প্রভু নাহি বাহ্য জ্ঞান।
ঘাড়ি ভেঙ্গে পড়িতেছে আকুল পরাণ॥
মুখে লালা অঙ্গে ধুলা নাহিক বসন।
কণ্টিকিত কলেবর মুদিত নয়ন॥
ভাব দেখি যত বৌদ্ধ বলে হরি হরি।
শুনিয়া গোরার চক্ষে বহে অশ্রুবারি॥

পিচকিরি সম অশ্রু বহিতে লাগিল। @@
ইহা দেখি তীর্থরাম কাঁদিয়া উঠিল॥
বড়ই পাষও মুহি বলে তীর্থরাম।
কৃপা করি দেহ মোরে প্রভু হরি নাম॥
তীর্থরাম পাষণ্ডেরে করি আলিঙ্গন।
প্রভু বলে তীর্থরাম তুমি সাধুজন॥
পবিত্র হইনু আমি পরশি তোমারে।
“তুমি ত প্রধান ভক্ত” কহে বারে বারে॥

তীর্থরাম ধনী তবে চরণে পড়িয়া।
আকুল হইল কত কান্দিয়া কান্দিয়া॥
কান্দিতে কান্দিতে যবে ভক্তি উপজিল।
অমনি ধরিয়া হাত প্রভু আালিঙ্গিল॥
প্রভু কহে তৃণসম গণহ বৈভবে।
ভক্তিধন অমূল্য রতন পাবে তবে॥
দূরেতে নিক্ষেপ কর বসন ভূষণ।
ছাড়িয়া অনিত্য ধনে ভজ নিত্য ধন॥

বার বার যাতায়াতে পাইবে যন্ত্রণা।
নিষ্কাম জনের হয় এই ত মন্ত্রণা॥
এই যে সাধের দেহ ঢাকা চর্ম্ম দিয়া।
কিছুদিন পরে ইহা যাইবে পচিয়া॥
দেহ হতে প্রাণ পাখী উড়ে যাবে যবে।
“হয় কীট নয় ভস্ম নয় বিষ্ঠা হবে॥
গৌরবের ধন কিছু নাহি ত্রিভূবনে।
কেবল গৌবব আছে ঈশ্বর ভজনে॥
বিলাস বৈভব সব অনিত্য জানিয়া।
একে একে ফেলে দাও দূরেতে টানিয়া॥
ঈশ্বরের বিশ্বাস ঈশ্বর আনিয়া মিলায়।
আর কিছু প্রমাণ ত কহেন না যায়॥
অসংখ্য জগৎ হয় প্রমাণের ঠাঁই।
প্রমাণ নাহিক চাহে পণ্ডিত গোঁসাই॥
নাহি প্রয়োজন বহু বাদ বিতাণ্ডয়।
কৃষ্ণ আনি সাধকের বিশ্বাসে মিলায়॥
বহুশাস্ত্র আলাপনে কিবা প্রয়োজন।
বিশ্বাস করিয়া কৃষ্ণ করহ ভজন॥
অর্থের গৌরব যেই করে বার বার।
দিন দিন তার দুঃখ হয় অনিবার॥
সম্ভ্রম লাগিয়া করে গৌরব যে জন।
বল তার দুঃখ কেবা করে নিবারণ॥
এ আমার আমি তার সবে এই কয়।
মুদিলে নয়ন দুটি কেহ কার নয়॥
মিছামিছি আত্মীয়তা করে সব লোক।
ভাঙ্গা পুতুলের ন্যায় মৃতদেহে শোক॥

পুত্র হয় পিতার আত্মজ সবে জানে।
দুই চিত্ত এক বলি বেদে না বাখানে॥
ছাড়িলে পুত্রের দেহ তাহার জীবন।
তাহে নাহি সিদ্ধ হয় পিতার মরণ॥
জননীর দেহ হতে পুত্র জন্ম লয়।
কিস্ত দুহে এক নহে জানিহ নিশ্চয়॥

কেহ কারু নহে এই প্রমেয়ের ধারা।
না হয় করিতে সিদ্ধ প্রমাণের দ্বারা॥
ঈশ্বর প্রমেয় হন তাহার প্রমাণ।
মনুষ্য হৃদয় মাঝে আছে বিদ্যমান॥
দুর হতে দূরে তিনি মূঢ়জনে জানে।
অত্যন্ত নিকটে তেঁহ জ্ঞানী ইহা মানে॥
সার তত্ত্ব কহিলাম বেদের বাখান।
মুর্খলোকে ইহার না রাখয়ে সন্ধান॥
এই সব সত্য তত্ত্ব জানে যেই জন।
পুনঃ পুনঃ সে জনার না হয় মরণ॥

প্রভুমুখে এহ সব শুনি তীর্থরাম।
বিষয়ে আসক্তি ছাড়ি করে হরিনাম॥
হুরি সংকীর্ত্তনে প্রভু মাতিয়া উঠিল।
ক্রমে তার সঙ্গিগণ আসিয়া জুটিল॥
ধনিজন তীর্থরাম পড়িলা বিপাকে।
ইহা বলি পাষণ্ডেরা কত কথা তাকে॥

তীর্থরাম তৃণসম বিষম ছাড়িয়া।
হরি বলি নাচে দুই বাহু পশারিয়া॥
সর্ব্বাঙ্গে তিলক ধরে পরণে কৌপীন।
ভক্তিতে করিলা তারে অতি দীন হীন॥

এই কথা কাণে শুনি তাহার রমণী।
কাঁদিতে কাঁদিতে ধেয়ে আইলা অমনি॥
তীর্থের চরণ ধরি কাঁদিতে লাগিল।
তীর্থরাম তার কথা কাণে না শুনিল॥
কমল কুমারী নাম বড়ই সুন্দরী।
তার রূপে চারিদিক দিলা আলা করি॥

কমলে বলিলা তীর্থ কর ধরি করে।
বিষয় সম্পত্তি সব দিলাম তোমারে॥
নরক হইতে ত্রাণ পাইয়াছি আমি।
বিষয় বৈভব সব ভোগ কর তুমি॥
এই কথা কাণে শুনি কমলকুমারী।
আছাড় খাইয়া পড়ে পৃথিবী উপরি॥

কমলের মায়াজাল দেখে তীর্থরাম।
ঈষৎ হাসিয়া বলে কর হরি নাম॥
কাঁদিতে কাঁদিতে তবে কমলকুমারী।
ফিরে গেল তীর্থ হলো পথের ভিকারী॥

উদ্ধারিয়া তীর্থরামে গৌরাঙ্গ সুন্দর।
ছাড়িলেন তবে প্রভু সিদ্ধ বটেশ্বর॥
কত লোক কত বস্ত্র আনি জুটাইল।
কিন্তু এক খণ্ড প্রভু হাতে না ছুইল॥
গোবিন্দ বলিয়া প্রভু ভাক দিয়া শেষে।
চাপড় মারিলা এক মোর পৃষ্ঠ দেশে॥

টীকা -
@ - "ছল" শব্দটি করচায় নানা অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। এখানে ইহার অর্থ কৌশল। কিন্তু
"গৃহ বিচ্ছেদের ছলা হৈল ভাগ্য ক্রমে।” প্রভৃতি স্থানের অর্থ ভিন্ন রূপ।

@@ - “পিচকারির ধারা যেন অশ্রু নয়নে” (চৈ, চ)। ১১ শ পঃ ১১১, মধ্য)।

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর