দেখিয়া দেবলেশ্বর প্রভু গুণমণি ভণিতাহীন পদ কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার) এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৫৪- পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।
এই পদে রয়েছে . . . জিজুরী নগরীতে মুরারি নামের দেবদাসীদের ও বেশ্যাদের উদ্ধার।
দেখিয়া দেবলেশ্বর প্রভু গুণমণি। প্রণাম করিয়া তবে লুঠায় ধরণি॥ প্রেমে গদ গদ হয়ে বহুস্তব করে। প্রভুরে দেখিতে লোক আসে ভক্তিভরে॥ বিরাজে দেবলেশ্বর পর্ব্বত উপরি। তার বহুদূরে শোভে জিজুরী নগরী॥
খাণ্ডবা নামেতে দেব আছে জিজুরীতে। প্রভুর সহিতে যাই খাণ্ডবা দেখিতে॥ যে নারীর বিবাহ না হয় নানা বাদে। তার পরিণয় হয় খাণ্ডবা প্রসাদে॥ খাণ্ডবার কাছে কন্যা পিতামাতা আনি। খাগুবারে কন্যা দেয় বহু ভক্তি মানি॥ দরিদ্র পিতার কন্যা এখানে থাকিয়া। খাণ্ডবার সেবা করে আদর করিয়া॥ . খাওবারে পতি ভাবি কত শত নারী। ক্রমে ক্রমে হইয়াছে পথের ভিকারী॥ প্রতারিত হয়ে সবে খাণ্ডবার স্থানে । বেশ্যাবৃত্তি কত নারী করিছে এখানে॥ খাণ্ডবার পত্নী বলি পাপ কর্ম্ম করে। তাহাদের বড়ই দুর্গতি হয় পরে॥ তীর্থ করিবারে এথা আসে বহুজন। কৌশলে তাদের করে নরকে পাতন॥ এইস্থানে আসে যত দরিদ্র-কুমারী। বিয়া করে বলে মোরা খাণ্ডবার নারী॥ ইহা শুনি দেখিবারে প্রভু নারীগণে। উপস্থিত হৈলা তথা অতি সঙ্গোপনে॥ ইহাদের ডাকে লোকে মুরারি বলিয়া। প্রভুর হইল দয়া মুরারি দেখিয়া॥ মুরারি গণের দুঃখ শুনিলে শ্রবণে। দয়া উপজয়ে অতি নিঠুরের মনে॥ কেমন নিঠুর পিতা বলিতে না পারি। কেমনে মুরারি করে আপন কুমারী॥ এই বাক্য শুনি প্রভু যত নারীগণে। উদ্ধার করিতে যায় মুরারিপ্রাঙ্গণে॥ মুহি বলি সে স্থানেতে গিয়া কাজ নাই। না শুনিলা মোর বাণী চৈতন্য গোঁসাই॥
মুরারিপল্লীর মধ্যে মোর প্রভু গিয়া। পাবিএ করিল সবে হরিনাম দিয়া॥ রমণীগণের দুঃখ সহিতে না পারি। উদ্ধার করিতে চাহে যতেক মুরারি॥ আশ্চর্য্য প্রভুর ভাব শুনি নিজ কাণে। ক্রমে ক্রমে বহুনারী আসে এই স্থানে॥ নারীগণে বলে প্রভু কর হরিনাম। নাম বলে অবশ্য পাইবে নিত্যধাম॥ বড়ই দয়াল হরি অগতির গতি। তাঁহাকে ভাবহ সবে নিজ নিজ পতি॥ কৃষ্ণকে পাইতে পতি যত গোপীগণ। কাত্যায়নী ব্রত করে হয়ে শুদ্ধমন॥ কৃষ্ণ পতি হইলে না রবে ভবভয়। কৃষ্ণ সকলের পতি জানহ নিশ্চয়॥ কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি সদা ডাক ভক্তি ভরে। সর্ব্বদা বলহ মুখে হরে কৃষ্ণ হরে॥
এত বলি প্রভু মোর নাম আরম্ভিল। অমনি তাঁহার দেহ পুলকে পূরিল॥ দেখিয়া প্রভুর ভাব যত নারীগণ। পূজিতে লাগিলা সবে প্রভুর চরণ॥ প্রভু বলে ভিক্ষা করি গৃহস্থের দ্বারে। নিতান্ত অস্পৃশ্য মুহি ছুঁওনা আমারে॥ ভক্তি করি হরি বল ঘুচিবেক তাপ। নামবলে ভস্ম হবে সকলের পাপ॥ না বুঝিয়া যেই জন পাপে মগ্ন হয়। হরি নাম বলে তার পাপ হয় ক্ষয়॥
উপদেশ শুনি যত খাণ্ডবার নারী। প্রভুর নিকটে দাঁড়াইলা সারি সারি॥ আসিয়া ইন্দিরা বাই কর জোড়ে কয়। দয়া কর আমারে সন্ন্যাসী মহাশয়॥ বৃদ্ধ হইয়াছি মুহি কুকর্ম্ম করিয়া। উদ্ধার করহ মোরে পদধুলি দিয়া॥ এত বলি ইন্দিরা ধূলায় লুটি যায়। নাম দিয়া প্রভু উদ্ধারিল ইন্দিরায়॥ হরিনাম পেয়ে তবে ইন্দিরা সুন্দরী। গৃহ থেকে বাহিরিল সব ত্যাগ করি॥ সেই দিন হৈতে যত খাণ্ডবার নারী। মত্ত হৈলা হরিনামে চক্ষে বহে বারি॥
এমন দয়াল প্রভু কভু দেখি নাই ভণিতাহীন পদ কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার) এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৫৬- পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।
এই পদে রয়েছে . . . চোরানন্দী বনে নারোজী নামের মহা বলবান দস্যুকে উদ্ধার।
এমন দয়াল প্রভু কভু দেখি নাই। কত পাপী উদ্ধারিল লেখা জোখা নাই॥ মুরারিগণের ভক্তি দেখিয়া নয়নে। প্রভাতে যাইতে চাহে চোরানন্দী বনে॥ গ্রাম্যলোক বলে সেথা কিবা প্রয়োজন। পাপের আকর হয় চোবাননদী বন॥ চোরানন্দী বনে বহু ডাকাতের বাস। সেখানে যাইতে কেন কর অভিলাষ॥ প্রভুবলে যাব মুহি চোরানন্দী বন। চোরানন্দী দেখে সিদ্ধ হবে প্রয়োজন॥ গ্রাম্যলোক বলে সেথা না যাও সন্ন্যাসী। সাধুর গমন সেথা নাহি ভালবাসি॥ বহু চোর বহু দস্যু থাকে সেই স্থানে। জীবন সংশয় হবে যাইলে সেখানে॥
প্রভু বলে কিবা মোর লবে দস্যু'গণ। এখনি সেখানে মুহি করিব গমন॥ রাম স্বামী বলে প্রভু চোরানন্দী বন। কোন তীর্থ নহে তথা কিবা প্রয়োজন। যদি কোন অমঙ্গল করে দস্যুগণ। তোমার বিরহে লোক ত্যজিবে জীবন॥
প্রভু বলে ভয় নাহি কর রাম স্বামী। হরিনামে দস্যুগণে মাতাইব আমি॥ এত বলি প্রভু চোরানন্দীতে চলিল ৷ চোরাননদী গিয়া বৃক্ষতলায় বসিল॥ এই স্থানে আড্ডা করি বহু দুষ্টজন। ডাকাতি করিয়া করে জীবন যাপন॥ একজন লোক আসি কাঁই মাই করি। কি কহিল আমি সব বুঝিতে না পারি॥ তার বাক্য বুলি সব প্রভু সমজিয়া। কাঁই মাই করি তারে দিলেন বুঝিয়া॥ সেই লোক ক্ষণকাল চাহিয়া রহিল। ইতি উতি তাকাইয়া বনে প্রবেশিল॥
নারোজী নামেতে এক মহাবলবান্। অস্ত্র শস্ত্র সঙ্গে করি হৈল আগুয়ান॥ দুই চারিজন ক্রমে আসি দেখা দিলা। সন্ন্যাসী দেখিয়া সবে প্রণাম করিলা॥ নারোজী বলিলা তুমি চল মোর স্থানে। আজিকার রজনীতে থাকিবে সেখানে॥ নারোজীর কথা শুনি প্রভু তবে বলে। রাত্রি কাটাইব আজি থাকি বৃক্ষতলে॥ শুনিয়া প্রভুর বাক্য নারোজী শ্রবণে। ভিক্ষা আনি দিতে বলে দুই চারি জনে॥ নারোজীর কথা শুনি ছুটিল সবাই। যোগাসনে হরিনামে বসিল নিমাই॥ কেহ কাষ্ঠ চিনি আনে কেহ বা তণ্ডুল। কেহ দুগ্ধ কেহ ঘৃত কেহ ফল মূল॥ রাশি ব্লাশি খাদ্য আনি তারা যোগাইল। বহু খাদ্য দেখে মোর লালসা বাড়িল॥ বহু দেশ ভ্রমিলাম প্রভুর সহিতে। এত খাদ্য কোন স্থানে না পাই দেখিতে॥ নানা দ্রব্য যোগাইয়া চারিদিক ঘেরি। দাঁড়াইলা নরোজীর লোক সারি সারি॥
হরিনাম করিতে করিতে প্রভু মোর। সেইকালে কৃষ্ণ প্রেমে হইলা বিভোর॥ কোথা রহে দুগ্ধ চিনি কোথায় তণ্ডুল। পদম্পর্শে ছিন্ন ভিন্ন হৈলা ফল মূল॥ দুই চারি জন বলে কেমন সন্ন্যাসী। ইচ্ছা করি নষ্ট করে খাদ্যদ্রব্য রাশি॥ নারোজী বলিল কভু দেখি নাই হেন। সন্ন্যাসী দেখিয়া মোর প্রাণ কাঁদে কেন॥ কত পাপ করিয়াছি কে পারে বলিতে। আজি কেন ইচ্ছা হয় কৌপীন পরিতে॥ কিসের লাগিয়া আজি প্রাণ মোর কাঁদে। আমি কি দিলাম পদ সন্ন্যাসীর ফাঁদে॥ নষ্ট হৈল সব দ্রব্য নাহি কর ভয়। পুনঃ যোগাইব আনি এই দ্রব্য চয়॥
এক পার্শ্বে দাঁড়াইয়া নারোজী আপনি। এক দৃষ্টে চেয়ে দেখে গোরা গুণমণি॥ প্রভুর নয়ন বাহি অশ্রুধারা বহে। পুতুলের প্রায় সবে দাঁড়াইয়া রহে॥ এই কথা শুনি ক্রমে ডাকাতের দল। একে একে দেখা দিল ছাড়ি বনস্থল॥ অপরাহ্ণ কালে মোর গোরা গুণমণি। প্রেমে মূরছিত হয়ে পড়িলা ধরনী॥ প্রেমে গদগদ তনু ধূলায় ধূসর। অশ্রুধারা হৃদয়েতে পড়ে দর দর॥
কান্দিয়া নারোজী বলে শুনহ সন্ন্যাসী। কি মন্ত্র পড়িলে তুমি বলহ প্রকাশি॥ দেখিয়া তোমার ভাব হয় মোর মনে। আর না করিব পাপ থাকি এই বনে॥ ষাটি বর্ষ বয়ঃক্রম হয়েছে আমার। পাপ কার্য্য না করিব ছাড়িব সংসার॥ অতি দুরাচার আমি ব্রাহ্মণতনয়। মোরে পদধূলি দিতে না কর সংশয়॥ পুত্রকন্যা নাহি মোর নাহিক সংসার। তবে কেন পাপ কর্ম করি আমি আর॥ উদর পোষণ হয় লোকে ভিক্ষা দিলে। তবে কেন থাকি মুহি দস্যুসহ মিলে॥ বড় ঘৃণা হইয়াছে কুকর্ম্মের প্রতি। আর না রহিব মুহি দস্যুদলপতি॥ এত বলি নারোজী দলের প্রতি চায়। অস্ত্র শস্ত্র সেই দণ্ডে টানিয়া ফেলায়॥
প্রভু কহে নারোজী আমার কথা শুন। আর কত কহিব তোমারে পুনঃ পুনঃ॥ কৌপীন পরিয়া কর লজ্জা নিবারণ। মাঙ্গিয়া যাচিয়া কর উদর পোষণ॥ কাহার লাগিয়া অর্থ করহ সঞ্চয়। পিতা মাতা ভাই বন্ধু কেহ কার নয়॥ এক মুষ্টি অন্নে যদি দেহরক্ষা হয়। তবে কেন পাপে কর অর্থের সঞ্চয়॥ অঞ্জলি পাত্রেতে পিয় ঝরণার জল। বহু পাত্র সংগ্রহ করিয়া কিবা ফল॥ কুবের সমান যত আছে ধনিগণ। একদিন প্রেতপুরে করিবে গমন॥ যে পথে দরিদ্র যাবে এ দেহ ত্যজিয়া। অবশ্য সম্রাট যাবে সেই পথ দিয়া॥ আমার আমার করি বৃথা কেন মর। প্রেম ভক্তি সহ ভাই হরিনাম কর॥
এই উপদেশ শুনি নারোজী ব্রাহ্মণ। আমাদের সঙ্গে চাহে করিতে গমন॥ নারোজী কহিলা সব তীর্থ দেখাইব। তীর্থে তীর্থে আপনার পেছনে যাইব॥ এত দিন চক্ষু অন্ধা ছিল ভ্রান্তি ধূমে। আজি হৈতে অস্ত্র শস্ত্র ফেলিলাম ভূমে॥ এই হস্তে কত নরহত্যা করিয়াছি। এই মুখে কত জনে কটু বলিয়াছি॥ আর না রহিব মুহি ডাকাতের পতি। কি পথ দেখালে মোরে অগতির গতি॥ জঙ্গলের মধ্যে থাকি সদা লুকাইয়া। পাপে দেহ জর জর না দেখি ভাবিয়া॥
এত বলি দস্যুপতি সব তেয়াগিয়া। চলিল প্রভুর সঙ্গে কৌপীন পরিয়া॥ কে কোথা চলিয়া গেল তবে দস্যুগণ। নারোজী মোদের সঙ্গে করে আগমন॥ তার পরে চোরানন্দী কানন হইতে। যাত্রা করি চলে প্রভু খণ্ডলা দেখিতে॥ . ************************* . সূচীতে . . .
পশ্চিমেতে প্রভাতে উঠিয়া চলে যাই ভণিতাহীন পদ কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার) এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৬২- পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।
এই পদে রয়েছে . . . আমোদাবাদে নন্দিনী বাগানে এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে ভাগবত আলোচনা, কবির করচা রচনা সঙ্গোপনে ইত্যাদি লেখা।
পশ্চিমেতে প্রভাতে উঠিয়া চলে যাই। কিছু দূর গিয়া মোরা মহানদী পাই॥ বড় বেগবতী নদী দেখিতে সুন্দর। তার মধ্যে বেগে চলে বিস্তর পাথর॥ নদী পার হয়ে মোর গোরা বিনোদিয়া। আমেদাবাদের কাছে পৌহুছিলা গিয়া॥ আশ্চর্য আমেদাবাদ জাঁকের সহর। কতই উদ্যান কত গৃহ মনোহর॥ বড় বড় অট্টালিকা মধ্যে শোভা পায়। নিরত দেশের লোক অতিথি সেবার॥ গ্রাম্য লোক অতিথিরে দেবতুল্য মানে। অতিথির সেবা তারা করে প্রাণপণে॥ প্রভুর রূপেতে লোক মোহিত হইয়া। ভক্তি ভাবে চারিদিকে দাঁড়ায় আসিয়া॥ কেহ বলে শুন শুন নবীন সন্ন্যাসী। ভিক্ষা দেই সেবা কর মোর গৃহে আসি॥ প্রভু বলে না যাইব গৃহীর আগারে। আজি রাত্রি কাটাইব নন্দিনীর ধারে॥
নন্দিনী বাগান এক বাগিচা সুন্দর। তার ধারে আড্ডা করে প্রভু বিশ্বম্ভর॥ ইহা দেখি গ্রাম্য লোক ভিক্ষা আনি দিল। রজনীতে গোরা চাঁদ ভোগ লাগাইল॥ বহু লোক জন আসি প্রভুরে বেষ্টিয়া। ভক্তি ভরে কথা কহে সন্ন্যাসী দেখিয়া॥ এক জন পণ্ডিত আসিয়া দেখা দিল। শ্রীভাগবতের শ্লোক পড়িতে লাগিল॥ প্রভু বলে কৃষ্ণগুণ গাহ ভাল করি। ইচ্ছা হয় শ্লোক শুনি সমস্ত পাশরি॥ ভাগবত নিত্য তুমি কর আলোচনা। তোমারে দেখিলে ঘুচে সংসার যাতনা॥ প্রতিদিন কর তুমি কষ্ণগুণগান। ধন্য ধন্য বিপ্র তুমি বড় ভাগ্যবান্॥ প্রভুর সহিত বিপ্র করি আলাপন। সমস্ত লোকেরে ডাকি কহিলা তখন॥ ভাল করি কর সবে সন্ন্যাসীর সেবা। সন্ন্যাসী সামান্য নহে হবে কোন দেবা॥ ইহারে দেখিলে হয় বৈরাগ্য উদয়। সামান্য মানুষ নহে জানিহ নিশ্চয়॥ না পারি লোকের বুলি সমস্ত বুঝিতে। যাহা পারি তাহা লিখি আকার ইঙ্গিতে॥ এই দেশে তীর্থ পর্য্যটিয়া দীর্ঘকাল। সকলের বুলি বুঝে শচীর দুলাল॥
দুই চারি বাত কভু প্রভুরে পুছিয়া। করচা করিয়া রাখি মনে বিচরিয়া॥ যেই লীলা দেখিলাম আপন নয়নে। করচা করিয়া রাখি অতি সঙ্গোপনে॥ সদা উনুমত প্রভু কৃষ্ণপ্রেমাবেশে। তীর্থে তীর্থে ঘুরিয়া বেড়ায় দেশে দেশে॥ . ************************* . সূচীতে . . .
কিছু দূর গিয়া দেখি নদী শুভ্রামতী ভণিতাহীন পদ কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার) এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৬৩- পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।
এই পদে রয়েছে . . . শুভ্রামতী নদী (সাবরমতী) তীরে দুই বাঙালী বৈষ্ণব রামানন্দ ও গোবিন্দ চরণ এর সঙ্গে দেখা, ঈশ্বর প্রেমে মত্ত শ্রীচৈতন্য, নদী পার হয়ে ঘোগা গণ্ডগ্রামে এসে বারমুখী বেশ্যাকে উদ্ধার।
কিছু দূর গিয়া দেখি নদী শুভ্রামতী। কুলু কুলু স্বরে গান করে রসবতী॥ @@ নদী পারে গিয়া দেখি দুই চারি জন। দ্বারকায় যাইতেছে তীর্থের কারণ॥ দেখিলাম তার মধ্যে বাঙ্গালি দুজনে। মহাভক্ত রামানন্দ গোবিন্দ চরণে॥
বহু কাল পরে গৌড়বাসীরে দেখিয়া। আনন্দে মানস যেন উঠিল নাটিয়া॥ পুছিলাম রামানন্দে কোথা তব ঘর। রামানন্দ বলে ভাই কুলীন নগর॥ শুভ্রামতী নদী মধ্যে প্রভু করে স্নান। হেন কালে রামানন্দ করে আলাপন॥ রামানন্দ বলে তুমি চলেছ কোথায়। মুহি বলি প্রভু সঙ্গে যাই দ্বারকায়॥ চৈতন্য দেবের নাম রামানন্দ শুনি। প্রফুল্ল বদন যেন হইল অমনি॥ ধাইয়া গিয়া রামানন্দ প্রণাম করিল। দুই চারি বাত তারে চৈতন্য পুছিল॥ পরম বৈষ্ণব হয় রামানন্দ দাস। রামানন্দ দাসে প্রভু দিলেন আশ্বাস॥ প্রভু বলে রামানন্দ তোমারে দেখিয়া। গৌড়ের ভাব মনে উঠিল জাগিয়া॥ কত দিন গৃহত্যাগ করিয়াছ তুমি। কত দিন আসিয়াছ এই পুণ্যভূমি॥ চল তবে এক সঙ্গে দ্বারকা যাইব। আনন্দে দ্বারকাধীশে সকলে হেরিব॥
এত শুনি প্রভুমুখে রামানন্দ দাস। থাকিতে প্রভুর সঙ্গে পাইল উল্লাস॥ সিনান করিয়া প্রভু ধীরে বীরে যায়। ঘোগা নামে গণ্ডগ্রামে আসিয়া পৌছায়॥
বারমুখী নামে বেশ্যা থাকে এই ঠাঁই। ১ তাহার ধনের কথা কহিবারে নাই॥ বেশ্যাবৃত্তি করি সাধিয়াছ বহু ধন। বহু মুল্য হয় তার বসন ভূষণ॥ প্রকাণ্ড বাড়ীর মধ্যে বারমুখী থাকে। হরিতে ধনীর ধন ফিরে পাকে পাকে॥ পেশয়াজি পরিধানে ডগমগি চায়। কত শত কামাচার তার গৃহে যায়॥ বহু দাস দাসী লয়ে থাকে এই খানে। জাক পশারের কথা সর্ব্ব লোকে জানে॥ প্রকাণ্ড বাগিচা নাম পিয়ার কানন। কাননের ধারে প্রভু করিলা গমন॥ অতি বড় নিম্ব বৃক্ষ আছে এই স্থানে। কি ভাবিয়া প্রভু গিয়া বসিলা সেথানে॥ আজ্ঞা পেয়ে মুহি যাই গৃহস্থের দ্বারে। ফল মূল আদি কিছু ভিক্ষা করিবারে॥ ভিক্ষা করি আইলাম দিবা দ্বিপ্রহরে। ভোগ লাগাইলা প্রভু প্রফুল্ল অন্তরে॥ প্রসাদ পাইনু তবে মোরা তিন জনে। মুহি রামানন্দ আর গোবিন্দ চরণে॥
হাসিয়া গোবিন্দ মুহি মিতে বলি ডাকি। প্রভু বলে রামানন্দে কেন দেহ ফাকি॥ গোবিন্দ যদ্যপি মিতে হইল তোমার। তবে রামানন্দ মিতে হইল আমার॥ হাদিতে হাসিতে রামানন্দে মিতে বলি। নাম আরম্ভিলা প্রভু দিয়া করতালি॥ প্রভু মুখে রামানন্দ একথা শুনিয়া। এক পার্শ্বে দাণ্ডাইলা হাত কচালিয়া॥
বহুতর লোক জুটে নাম শুনিবারে। অশ্রুবহে প্রভুর নয়নে শত ধারে॥ পিচকিরি সম অশ্রু বহিতে লাগিল। তাহা দেখি ঘোগাবাসী আশ্চর্য্য হইল॥ দেখিয়া প্রভুর সেই হরিসঙ্কীর্ত্তন। মাতিয়া উঠিল প্রেমে দুই চারি জন॥ গ্রাম্য লোক জনের নয়নে বহে বারি। বহু লোক আসি দাড়াইলা সারি সারি॥ কেমন ভক্তির ভাব কহনে না যায়। অনিমিষে প্রভুর বদন পানে চায়॥ কখন হাসিছে প্রভু কখন কাঁদিছে। কখন বা বাহু তুলি নাচিছে গাইছে॥ থর থর কাঁপে কভু ঘর্ম্ম বারি বহে। কখন বা প্রেমাবেশে চুপ করি রহে॥ কখন টলিছে রোমাঞ্চিত কলেবরে। প্রাণ কৃষ্ণ বলি কভু ডাকে উচ্চস্বরে॥ ঈশ্বরের প্রেমে মত্ত নবীন সন্ন্যাসী। এই কথা কাণা কাণি করে ঘোগাবাসী॥ হরি হরি বলিতে আনন্দ ধারা বহে। পুতুলের প্রায় সবে দাণ্ডাইয়া রহে॥ আধ নিমীলিত চক্ষু জটা এলায়েছে। ধূলা মাটী মেখে অঙ্গ মলিন হয়েছে॥ কোথায় প্রাণের কৃষ্ণ এই বলি ডাকে। কখন বা হাত তুলি উর্দ্ধ মুখে থাকে॥ গোবিন্দ রে কাঁহা কৃষ্ণ মিলাও আনিয়া। কোথার প্রাণের কৃষ্ণ দেহ দেখাইয়া॥ এক বার ঐ বলি ধাইয়া যাইল। বাহু পশারিয়া নিম্বে জড়ায়ে ধরিল॥ ঈশ্বরের প্রেমে মত্ত হইল নিমাই। এমন উন্মাদ মুহি কভু দেখি নাই॥ বহু দিন সঙ্গে থাকি ফিরি নানা দেশ। দেখি নাই কেনে দিন এমন আবেশ॥ রামানন্দ গোবিন্দ চরণ দুই ধারে। তালি দিয়া হরি ধ্বনি করে বারে বারে॥
প্রকাণ্ড এক গর্ত ছিল সড়কের ধারে। আবেশে গড়ায়ে পড়ে তাহার ভিতরে॥ এক জন দুষ্ট আসি করি হানা পানা। প্রতুরে বলিলা কেন কর প্রবঞ্চনা॥ গ্রাম্য লোকে ভুলাইয়া অর্থ লবে হরি। তাই বেড়াইছ তুমি হরিধ্বনি করি॥ সন্ন্যাসীর পরীক্ষা লইতে আসিয়াছি। কত শত কপট সন্ন্যাসী দেখিয়াছি॥ সে পাষণ্ড এই কথা কহিলা যখন। প্রহার কহিতে তাঁরে চাহে গ্রাম্য জন॥ প্রভু বলে ভাই সব মারিবে কাহারে। হরিনাম সুধা পান করাও উহারে॥ পিপাসায় শুষ্ক কণ্ঠ হয়েছে উহার। উহার বদনে সুধা দেহ এক ধার॥ ভক্তি বিনা শুকায়েছে উহার হৃদয়। নাম দিয়া নাশহ উহার যমভয়॥ মরুভূমি সম হয় পাষণ্ডের মন। উৎপাদিকা শক্তি তাহে কর অর্পণ॥ এম সাধু মোর কাছে হরিনাম দিব। তোমার পাপের ভার উতারিয়া নিব॥ নব তাপ দূর হবে এই মন্ত্র বলে। হরিনাম মন্ত্র পাঠে সদ্য ফল ফলে॥ এই মহামন্ত্র পাঠ করে যেই জন। সে পাপী নরকে কভু না করে গমন॥ এমন সুলভ মন্ত্র থাকিতে জগতে। পাপী কেন অনর্থক ফিরে মন্দ পথে॥
জানালা হইতে দেখি এসব ব্যাপার। বারমুখী মনে মনে করয়ে বিচার॥ আশ্চর্য্য প্রভুর দয়া দেখিয়া নয়নে। আপনারে ধিক দেয় বসিয়া নির্জ্জনে॥ বারমুখী বলে ছি ছি অর্থের লাগিয়া। দিনে শত বার দেহ ফেলাই যেচিয়া॥ পাপমূর্ত্তি পরপুরুষের সঙ্গে মেলি। ছি ছি নিত্য নিত্য আমি করি কাম-কেলি॥ এই যে সন্ন্যাসী দেখি ঈশ্বর সমান। সব ছাড়ি যাই মুহি এর বিদ্যমান॥ সন্ন্যাসীর টাকা কড়ি সঙ্গে কিছু নাই। তবে কেন উহারে দেখিয়া সুখ পাই॥ কেন বা নরক ভোগ ঘরে বসে করি। আমার প্রতি কি দয়া না.করিবে হরি॥ বালাজী দুষ্টের কাণে কি মন্ত্র পড়িয়া। এই ত সন্ন্যাসী দিলা উদ্ধার করিয়া॥ ইহার নিকটে গিয়া পাপ ক্ষয় করি। কাছে গিয়া জড়াইয়া পদ চাপি ধরি॥
জানালা হইতে ইহা বারমুখী বলে। তার কথা শুনে সুখী হইলা সকলে॥ লোক জনন চারি ধারে একথা তুলিয়া। মহা কোলাহল করে হাসিয়া হাসিয়া॥ ক্ষণকাল-পরে বেশ্যা নামিয়া আসিল। মিরানামে তার দাসী পেছনে চলিল॥ বারমুখী বলে তবে বিনয়ে মিরারে। আজি হৈতে সর্ব ধন দিলাম তোমারে॥ বহু অর্থ আছে মোর সব তুচ্ছ করি। আজি হৈতে হইলাম পথের ভিকারী॥ এলাইয়া দিলা কেশ বারমুখী দাসী। স্থির বিদ্যুতের পাশে যেন মেঘরাশি॥ নিতম্ব ছাড়িয়া পড়ে দীর্ঘ কেশ জাল। নয়ন মুদিয়া রহে শচীর দুলাল॥ আশ্চর্য্য রূপের ছটা সকলে দেখিয়া। তাহার বদন পানে রহে তাকাইয়॥ বারমুধী হাত জোড়ি কহে বার বার। বন্ধন কাটিয়া দেহ সন্ন্যাসী আমার॥ বড়ই পাপিষ্ঠ মুহি নরকের কীট। যদি দয়া নাহি কর যাব পিট পিট॥ দাসীর বলিয়া দেহ কিসে ত্রাণ পাব। মরণান্তে যমভয় কিরূপে এড়াব॥
এই পাপ দেহে আর কিবা প্রয়োজন। এত বলি দীর্ঘ কেশ করিলা ছেদন॥ সামান্য বসন পরি লজ্জা নিবারিল। জোড় হস্তে প্রভুর সম্মুখে দাঁড়াইল॥ প্রভু বলে বারমুধী দুই চারি কথা। তোমারে কহিয়া দেই করহ সর্ব্বথা॥ এই স্থানে করি তুমি তুলসী কানন। তার মাঝে থাকি কর কৃষ্ণের সাধন॥ তুমি কৃষ্ণ তুমি হরি বারমুখী বলে। এই মাত্র বলি পড়ে প্রভু-পদতলে॥ বারমুখী পদতলে যখন পড়িল। তিন চারি পদ প্রভু অমনি হটিল॥ আর যত লোক ছিল কাছে দাঁড়াইয়া। ধন্য ধন্য করে সবে বেশ্যারে দেখিয়া॥
মিরাবাই দাসী বহু কান্দিতে লাগিল। হাসিমুখে বারমুখী তাহারে কহিল॥ কাণ দিয়া শুন মিরা আমার বচন। তোমারে দিলাম মোর যত আছে ধন॥ ভাল রূপে সেবা কোরো অতিথি আইলে। হরিনামে মন দিও বসিয়া বিরলে॥ না করিবে পাপ কর্ম্ম মোর দিব্য লাগে। ভজিবে শ্রীরাধাকৃষ্ণ প্রেম অনুরাগে॥ প্রেম করা ভাল বটে ধূর্ত্ত সহ নয়। কৃষ্ণের সহিত মিরা করিও প্রণয়॥ দেহ মন প্রাণ সব কৃষ্ণে সমর্পিবে। তাহ হৈলে নিত্য ধন কৃষেরে পাইবে॥ শুনহ আমার কথা মিরা মন দিয়া। কারো সঙ্গ না করিবে কৃষ্ণেরে ছাড়িয়া॥ অবশ্য কৃষ্ণের কৃপা তোমারে হইবে। প্রাণপণে কৃষ্ণ ধনে কভু না ছাড়িবে॥ প্রভুর কৃপায় মোর কেটেছে বন্ধন। আজি হৈতে বাসস্থান তুলসী কানন॥ এত বলি বারমুখী লয়ে জপমালা। তুলসী কানন করে ভুলি সব জালা॥ বারমুখী কুলটারে প্রভু ভক্তি দিয়া। সোমনাথ দেখিবারে চলিল ধাইয়া॥
টীকা - @@ - বোল্ড অক্ষরে লেখা অংশটি অন্য কোন অজ্ঞাত প্রকাশকের দ্বারা প্রকাশিত “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত। দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদিত গ্রন্থে এই অংশটুকু নেই। ১ - ভক্তমালে এই বারমুখীর বিষয় উল্লিখিত আছে। নাভাজি এই গণিকার কথা প্রায় ঠিক রূপই শুনিয়াছিলেন, কিন্তু চৈতন্যদেবের নাম ঘোগা অঞ্চলের লোক জানিত না, কিংবা মনে রাখে নাই, এই জন্য, তাঁহাকে ভক্তমাল প্রণেতা নাভাজি শুধু বৈষ্ণব মহান্ত বলিয়াই উল্লেখ করিয়াছেন। এক দল বৈষ্ণব তাহার বাগিচায় গিয়াছিলেন, এরূপ ভক্তমালে লিখিত আছে।
বাস্তবিক চৈতন্যদেবের সঙ্গে তখন শুধু গোবিন্দ কর্ম্মকার ছিলেন না, কুলীন গ্রামবামী গোবিন্দচরণ ও রামানন্দ বসুও ছিলেন। ইহাঁরা সকলেই বৈষ্ণব ছিলেন, সুতরাং বৈষ্ণব দলের কথা যে তিনি লিখিয়াছিলেন, তাহা ঠিকই লিখিয়াছিলেন। সন্ন্যাসীর নাম গোত্র কেহ জিজ্ঞাসা করে না। এজন্য অজ্ঞাত দেশে চৈতন্যদেবের নাম অবিদিত ছিল, কিংবা জানা থাকিলেও পরবর্তী জন-শ্রুতি তাহা স্মরণ করিয়া রাখে নাই।
করচার প্রতিবাদী দল বলিতেছেন কেহ ভক্তমাল হইতে বিবরণটি লইয়া তাহা করচায় জুড়িয়া দিয়াছে। যদি চরিতামৃত কিংবা অন্য বৈষ্ণব গ্রন্থের সঙ্গে বর্ণনা মিলিয়া যায়, তবে তাঁহারা অনুমান করেন যে, করচা সেই বিবরণগুলি নকল করিয়াছে, যদি গরমিল হয় তবে বলেন, করচা খাটি নহে। তাহাদের যুক্তি অনেকটা শাঁখের করাতের ন্যায়, যাইতে আসিতে দুই দিকেই কাটে। নকল-বাজ্ কোন প্রাচীন পুস্তক হইতে বিবরণ সংগ্রহ করিতে পারে। কিন্তু প্রচলিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থের সঙ্গে বর্ণনা গরমিল করিবার সাহস তাহার থাকা স্বাভাবিক নহে। ভক্তমালের বর্ণনায় চৈতন্যের সহিত বারমুখীর সাক্ষাতের পরের ঘটনাও কিছু আছে। আমরা নাভাজির অনুবাদক কৃষ্ণদাসের বিবরণটির কতকাংশ নিয়ে উদ্ধৃত করিয়া দিতেছি :---
“বেশ্যা এক হয় অতি ধনাঢ্য সুন্দরী। পুষ্কৃণী বাগিচা বেড়া ভৃত্য সহচরী॥ অনেক বৈষণবগণ ভ্রমিতে ভ্রমিতে। উত্তরিলা একদিন তার বাগিচাতে॥ জলে স্থলে অতি পরিস্কার দেখিয়া ৷ তৃপ্ত হৈল সাধুগণ সুচ্ছায়া পাইয়া॥ বারমুখী নিজ গৃহ বালাখানা হৈতে। ঝরকাতে উকি মারি লাগিল দেখিতে॥ আহা কি আশ্চর্য্য যার নাহিক উপমা। বৈষ্ণব দরশনে যে কতেক মহিমা॥ * * * * * * * * * অতএব ছি ছি মুই ত্যজি হেন অর্থ। দেহ পণ করিব নিতান্ত পরমার্থ॥ এতেক চিন্তিয়া বেশ্যা অমনি উঠিল। থলি ভরি এক থাল মোহর লইল॥ চলিলেন ধীরে ধীরে মহন্তের স্থানে। গৃহ হইতে নিকশিয়া যথা সাধুগণে॥ পরম সুন্দরী রত্ন ভূষণে ভূষিতা। থমকিয়া চলিল কামিনী মনোনীতা॥ * * * * * * * * * তবে নিজ পরিচয় যথার্থ কহিল। মহান্ত কহয়ে তব হউক ভাল ভাল॥ কৃষ্ণে ষদি মতি তব ঐকান্তিক হয়। তবে তো কৃতার্থ তুমি চিন্তা কি আছয়॥ এক পরামর্শ আমি কহি যে তোমারে। তোমার মানস পূর্ণ হইবে অদুরে॥ মোহরের থলি রঙ্গনাথের চরণে। রাখিয়া শরণ লও গিয়া কায়মনে॥ অবশ্য করিবে দয়া ঠাকুর তোমারে। বারমুখী কহিল উপেক্ষা কেন মোরে॥ কান্দিতে কান্দিতে মোহরের থলি লৈয়া। চলিলেন আপনাকে ধিক্কার করিয়া॥ রঙ্গনাথ ঠাকুর সিন্ধুকে বলি রাখি। কান্দয়ে বিলাপ করি বদন নিরখি॥ বেশ্যা বলি পুজারী সে দ্রব্য না লইল। চূড়া বানাইয়া দেহ পশ্চাৎ কহিল॥ ঘরেতে যাইয়া বহু অর্থ ব্যয় করি। নানা রত্ন চুরি আর মণি মুক্তা ঝুরি॥ যেখানে যে গহনা সাজয়ে রঙ্গনাথে। বানাইয়া লৈয়া গেল আপনার সাথে॥ পুজারি কহেন পুনঃ বেশ্যার সামগ্রী। কভু নাহি হয় ইহা ঠাকুরের যেগী॥ ইহা শুনি তাঁর মুখ মলিন হইল। অশ্রু ধারা দুনয়নে পড়িতে লাগিল॥ ঘরে গিয়া উপবাসী পড়িয়া রহিল। পরাণ ছাড়িব বলি প্রতিজ্ঞা করিল॥ দয়াল হরি না বাছিল উত্তম মধ্যম। যেই প্রীতি করে সেই হয় প্রিয় মম॥ পুজারীরে আদেশ করেন ক্রোধে হরি। শীঘ্র বারমুখীরে আনহ স্তুতি করি॥ বারমুখী নিজ হস্তে পরাবে গহনা। তুমি তারে শিষ্য কর না করিহ ঘৃণা॥ পুজারী কাঁপয়ে ডরে তখনই চলিল। মিনতি করিয়া গিয়া ডাকিয়া আনিল॥ তার নিজ হস্তে অলঙ্কার পরাইয়। সেবক করিয়া গিয়া মন্ত্র উপদেশ দিয়॥ বারমুখী ঠাকুরাণী আনন্দ সাগরে। প্রেমানন্দে মধুপান করিয়া সাঁতারে॥ সর্ব্বস্ব লুটায়ে কৈল মহামহোৎসব। বিষ ত্যজি পান কৈল কমল আসব॥
এই বিবরণের সঙ্গে করচার প্রদত্ত ঘটনা মিলাইয়া পড়িলে দেখা যাইবে, জন-প্রবাদ ও চাক্ষুষ ঘটনার কি প্রভেদ! করচায় যে সকল খুটি নাটি কথা আছে, যথা বালাজি নামক দুষ্ট বিপ্রের কথা---বাগানের নামটি পিয়ারী কানন, বারমুখীর মীরা নামক দাসীর কথা---এ সমস্তই বাস্তব ছবি। ভক্তমালে স্বপ্নদর্শন প্রভৃতি অলৌকিক ঘটনা আনিয়া বর্ণনাটির জন- প্রবাদ মুলক বাহুল্য প্রতিপন্ন করিতেছে। . ************************* . সূচীতে . . .
সোমনাথ দেখিবারে চলিল ধাইয়া ভণিতাহীন পদ কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার) এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৬৭- পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।
এই পদে রয়েছে . . . ঘোগা গ্রামে বারমুখী বেশ্যাকে উদ্ধার করার পরে জাফরাবাদ হয়ে সোমনাথে আগমন, মন্দিরের ভগ্নদশা দেখে শ্রীচৈতন্যের দুঃখ, হঠাৎ এক অবধৌত সন্ন্যাসীর দেখা ও তাঁর অন্তর্ধান, সম্পাদক দীনেশচন্দ্র সেনের মতে গোবিন্দদাস সম্ভবত সন্ন্যাসীকে শিব (সোমনাথ) ভেবেছিলেন কিন্তু স্পষ্ট করে লেখেন নি।
. . . . সোমনাথ দেখিবারে চলিল ধাইয়া॥ জাফেরাবাদের দিকে প্রভু চলি যায়। বহু কষ্টে তিন দিনে পৌঁছায় তথায়॥
জাফরাবাদ লোক বড় দুঃখী হয়। কিন্তু অতিথির বহু সন্মান করয়॥ গ্রামবাসী বহু লোক ভিক্ষা আনি দিল। রুটি করি প্রভু মোর ভোগ লাগাইল॥ প্রবেশিয়া একজন মালীর বাগানে। যাপিলাম রাত্রি মোরা আনন্দিত মনে॥ প্রভাতে উঠিয়া মোরা সোমনাথে যাই। ছয় দিন পরে গিয়া সেখানে পৌঁছাই॥
নাহিক পূর্ব্বের শোভা নাহি সে মন্দির। দুঃখের অবস্থা দেখি চক্ষে বহে নীর॥ ঢিবি ঢাবা ভাঙ্গা চিহ্ন আছে সেই খানে। দেখি আঘাত বড় লাগিল পরাণে॥ মন্দির বাড়ীর শোভা গিয়াছে চলিয়া। ইহা দেখি প্রভু মোর আকুল কাঁদিয়া॥ কান্দিয়া আমার প্রভু বলিতে লাগিল। দুরাত্মা যবন আসি কি দশা করিল॥ কোথা লুকাইলে প্রভু যবনের ভয়ে। একবার দেখাদিয়া জুড়াও হৃদয়ে॥ হায় হায় ইহ দুঃখ কহনে না যায়। সোমনাথে উদ্দেশিয়া কান্দে গোরা রায়॥
প্রভু বলে এত শোভা কেবা হরে নিল। অর্থের লাগিয়া দুষ্ট এদশা করিল॥ অহে প্রভু সোমনাথ তোমারে দেখিতে। আকু বাকু করে প্রাণ না পারি সহিতে॥ তোমার বিরহ আর সহ্য নাহি হয়। তোমারে উদ্দেশ করি ফাটিছে হৃদয়॥ হায় হায় ভক্তগণ কি পাপ করিল। কি পাপে তোমারে দেব আর না হেরিল॥ তোমার বিরহে শত শত পাণ্ডাগণ। দুঃখের সাগরে আছে হয়ে নিমগন॥ তুমি কি যবন ভয়ে কৈলাসে যাইয়া। প্রিয় ভক্তগণে এবে রহিলে ভুলিয়া॥ এ সকল দেখি মোর হৃদয় ফাটিছে। বুকের মাঝারে অশ্রু বাহিয়া পড়িছে॥ আহা মরি ভগ্নশেষ রয়েছে পড়িয়া। পাপ চক্ষুঃ সহ্য করে কেমন করিয়া॥ এস প্রভু সোমনাথ অন্তরে আমার। হৃদয়ের মধ্যে হেরি মূরতি তোমার॥ কোথায় লুকালে প্রভু না দেখি তোমারে। কেমন করিছে প্রাণ কহিব কাহারে॥ হায় হায় গঙ্গাধর তোমারে দেখিতে। আর না আসিবে লোক বিদেশ হইতে॥ দেখিতে আসিত যাত্রী গৌরব করিয়া। এবে কিন্তু সে গৌরব গিয়াছে মুছিয়া॥ দ্বেষ ভরে যবনেরা অত্যাচার করি। মণি মুক্তা আদি ধন লইয়াছে হরি॥ হায় প্রভু স্মরহর কোথায় রহিলে। কৃপা করি ভক্ত জনে দেখা নাহি দিলে॥
এই রূপে প্রভু মোর পরিতাপ করে। হেন কালে ঝড় উঠে আকাশ উপরে॥ ধূলা উড়ে চারিদিক কৈলা অন্ধকার। পাগুাগণ বন্ধ করে কুটীরের দ্বার॥ বাহিরের দ্বারে বসি আমরা সকলে। হরিবোলা প্রভু আসি বসে মধ্যস্থলে॥
হেনকালে অবধৌত সন্ন্যাসী আসিয়া। বার বার গোরা চাঁদে দেখে তাকাইয়া॥ সব গায় ভস্ম মাখা নাহিক বসন। উভ করি জটা বাঁধা আশ্চর্য্য গঠন॥ লোহিত বরণ তাঁর হয় চক্ষুদ্বয়। সুখে হর হর শব্দ পবিত্র হৃদয়॥ ঢুলু ঢুলু দুটি আঁখি দেখিতে সুন্দর। আশীর্ব্বাদ করে আসি ঊর্দ্ধ করি কর॥ উঠিলা আমার প্রভু তাঁহারে দেখিয়া। অন্তর্হিত হৈলা তবে কি যেন বলিয়া॥ ধূলা উড়ে চারিদিক্ করেছে আঁধার। অবধৌত কোথা গেল নাহি দেখি আর॥ @
ঈষৎ হাসিয়া তবে চৈতন্য আমার। সোমনাথ পরিক্রমা করে তিন বার॥ মুহি রামানন্দ আর গোবিন্দ চরণ। প্রভুর সহিত করি হরি সংঙ্কীর্ত্তন॥ সোমনাথ ঠাকুরের প্রীতি লাগিয়া। কীর্ত্তন করেন প্রভুর প্রেমেতে গলিয়া॥ দুই চারি জন পাণ্ডা আসিয়া মিলিল। আমাদের কাছে কিছু মাগিতে লাগিল॥ হাসিয়া বলিয়া প্রভু সন্ন্যাসীর ঠাঁই। টাকা কড়ি অন্নবস্ত্র কিছু দিতে নাই॥ এই বাত শুনি কাণে গোবিন্দ চরণ। দুই মুদ্রা পাণ্ডা হস্তে করিলা অর্পণ॥ পবিত্র কুণ্ডের ধারে পাণ্ডা লয়ে যায়। জল লয়ে প্রভু মোর দিলেন মাথায়॥
সোমনাথ ছাড়ি মোরা জুনাগড়ে যাই। বড় গ্রাম বটে কিন্তু কোন তীর্থ নাই॥
টীকা - @ - লেখার ভাবে মনে হয় যেন গোবিন্দ দাস এই সন্ন্যাসীকে শিব ( সোমনাথ ) বলিয়া অনুমান করিয়াছিলেন, যদিও তিনি একথা স্পষ্ট করিয়া বলেন নাই। . ************************* . সূচীতে . . .