কবি গোবিন্দ দাসের করচার বৈষ্ণব পদাবলী
*
মাঘের তৃতীয় দিনে মোর গোরা রায়
ভণিতাহীন পদ
কবি গোবিন্দদাস (কবি গোবিন্দ কর্মকার)
এই পদটি ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র
সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৮৪-
পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
তীর্থ-ভ্রমণ সেরে শ্রীচৈতন্যের পুরীতে প্রবেশ, মন্দিরে জগন্নাথ দর্শন, সার্বভৌমের সঙ্গে
কথোপকথন, কাশীমিত্রের গৃহে বাস, ভক্তের আগমন, শ্রীচৈতন্য নগরকীর্তনে, পিছু পিছু
মহারাজ দীনবেশে, একদিন গোবিন্দকে ডেকে একটি পত্র দিয়ে আচার্য্যের (অদ্বৈতাচার্য্য)
কাছে প্রেরণ। এখানেই গোবিন্দদাসের করচা শেষ হয়, খণ্ডিত বলেই। গ্রন্থটি গ্রন্থকার
এখানে এই গ্রন্থের ইতি বা শেষ করেননি।

মাঘের তৃতীয় দিনে মোর গোরা রায়।
সাঙ্গোপাঙ্গ সহ মিলি পুরীতে পৌঁছায়॥
অপরাহ্নে মহাপ্রভু পুরীতে পৌঁছিলা।
কোটি কোটি লোক তথা আসি ঝাঁকি দিলা॥
ধূলাপায় প্রভু বহু লোক করি সাথ।
হেরিলেন মন্দিরে প্রবেশি জগন্নাথ॥
এক দৃষ্টে মহাবিষ্ণু দেখিতে দেখিতে।
দর দর প্রেম অশ্র লাগিল বহিতে॥
একেবারে জ্ঞানশূন্য হয়ে গোরা রায়।
অমনি আছাড় খেয়ে পড়িল ধরায়॥
এলাইল জটাজুট্ খসিল কৌপীন।
ধূলায় ধূসর তনু যেন অতি দীন॥
চারিদিকে হরিধ্বনি করে ভক্তগণ।
সার্ব্বভৌম ক্রোড়ে তুলে করিলা ধারণ॥
লোমাঞ্চিত কলেবর কদম্বের প্রায়।
বহিতে লাগিল ঘর্ম্ম সহস্র ধারায়॥
চেতনা পাইয়া প্রভু উঠে দাঁড়াইলা।
একদৃষ্টে মহাবিষ্ণু দেখিতে লাগিলা॥
সার্ব্বভৌম বলে প্রভু দেখি নিজরূপ।
উথলিয়া উঠিল তোমার ভাবকূপ॥
আপনার মূর্ত্তি দেখি লোক শিখাইতে।
মহাভাবে মত্ত হয়ে লাগিলা কান্দিতে॥
সম্মুখে অচল বিষ্ণু তুমি ত সচল।
তবে কেন কান্দি প্রভু কর বহু ছল॥
তুমি ত সাক্ষাৎ কৃষ্ণ ব্রজেন্দ্র-নন্দন।
তবে কেন অন্ধা কর আমার নয়ন॥
যে না বুঝে তার কাছে কর ভারি ভূরি।
মোর কাছে নিজরূপ না করিহ চুরি॥
গোবর্দ্ধনধারী তুমি বৃন্দাবনপতি।
গোপীর জীবন তুমি অগতির গতি॥
জনমিলে যদুবংশে তারা না চিনিল।
দুর্ভাগা যাদবগণ কিছু না বুঝিল॥
হাতে পেয়ে না ছাড়িব মুহিত তোমারে।
বংশী ধরি নিজরূপ দেখাও আমারে॥
তব বক্ষে স্বর্ণ পাঞ্চালিকা আছে লেখা।
যার তেজে কালরূপ নাহি যায় দেখা॥

গ্রভু বলে সার্ব্বভৌম আর কথা কহ।
আতাল পাতাল কথা কেন না বলহ॥
মিছে ব্যগ্র হয়ে কেন কহ নানা বাত।
শুনিয়া তোমার বাক্য কর্ণে দেই হাত॥
আমারে কহিয়া তুমি ব্রজেন্দ্র-নন্দন।
কেন মোরে অপরাধী কর অকারণ॥
তব মুখে কৃষ্ণকথা অমৃত সমান।
কহ ভট্ট কৃষ্ণকথা জুড়াক পরাণ॥
ভট্ট বলে যাহা বলাইবে প্রভু তুমি।
তাহা ভিন্ন কি কহিব নর-পশু আমি॥
প্রভু বলে বহু বাক্যে আর কাজ নাই।
চল আজি স্বস্থানেতে সবে মিলে যাই॥
আরতি দেখিয়া কাশী মিশ্রের সদনে।
উপনীত হৈলা আসি সাঙ্গোপাঙ্গ সনে॥

হেনকালে সার্ব্বভৌম প্রসাদ লইয়া।
সেইখানে উপনীত হইল আসিয়া॥
প্রসাদ বণ্টন করে গোরা বিনোদিয়া।
সকলে আনন্দ করে প্রসাদ পাইয়া॥
প্রকাণ্ড আঙ্গিনা কাশী মিশ্রের সদনে।
বহুতর লোক আসে প্রভু দরশনে॥
থাকিয়া মিশ্রের গৃহে গোরা দয়াময়।
পরম আনন্দে নিত্য কৃষ্ণগুণ গায়॥
কত লোক আসে যায় কহিব কেমনে।
নিত্য নব নব সুখ মিশ্রের ভবনে॥
লোক মুখে শুনিয়া প্রভুর আগমন।
কত গৌড়বাসী আসে করিতে দর্শন॥
প্রসাদ আনয়ে নিত্য ভট্ট মহাশয়।
প্রসাদ পাইয়া প্রভুর আনন্দ উদয়॥
আনন্দে প্রসাদ লয়ে গোরা বিনোদিয়া।
সকলের হাতে দেন প্রসাদ বাটিয়া॥
নাম-সঙ্কীর্ত্তন হয় প্রসাদের আগে।
সকলে প্রসাদ খায় প্রেম অনুরাগে॥
ধন্য হইলাম আজি এই কথা বলি।
আনন্দে সকলে নাচে দিয়া করতালি॥
রামানন্দ বসু আর গোবিন্দ চরণ।
বিদায় লইয়া গৌড়ে করিলা গমন॥
পুনরায় গৌরাঙ্গের দরশন লাগি।
শত শত লোক আসে হৈয়া অনুরাগী॥
শ্রীবাস কেশব দাস সিদ্ধ হরিদাস।
সকলে মিলিয়া আসে চৈতন্যের পাশ॥
শান্তাচার্য্য বিপ্রদাস রূপ সনাতন।
ঝাঁকি বাধি আইলা করিতে দরশন॥
আননে মাতিয়া সবে হরিনাম করে।
দয়াল চৈতন্য ভক্তি দেন ঘরে ঘরে॥
কে লবে রে হরিনাম এস মোর ভাই।
ইহা বলি হরিনাম বিলায় নিমাই॥
পাপী তাপী না রহিল প্রভুর কৃপায়।
হরিনাম দেন প্রভু যথায় তথায়॥

মহাতীর্থ পুরী হৈল আনন্দের ধাম।
আবাল বনিতা বৃদ্ধ করে হরিনাম॥
পশু পক্ষী নাচে নাম শ্রবণে শুনিয়া।
সম্মুখে সমুদ্র নাচে বাহু পশারিয়া॥
বুড়া নাচে যুবা নাচে নাচে শিশুগণ।
কুলবধূ পথে আসি করে দরশন॥
একদিকে নদীপতি নাচিতে লাগিল।
অন্যদিকে প্রেমসিন্ধু উথলি উঠিল॥
যেন প্রেমে মত্ত হয়ে বৃক্ষ লতাগণ।
হিম পাত ছলে করে অশ্রু বরষণ॥
নিত্য নব নব সুখ পুরীর মাঝারে।
যে দেখেছে সেই জানে কহিব কাহারে॥
বাজিছে মৃদঙ্গ ভেরী আর করতাল।
তার মধ্যে নাচে মোর শচীর দুলাল॥

বড় পটু রামদাস ভেরী বাজাইতে।
এইজন্য নিত্য আসে কীর্তনের ভিতে॥
বড় ভক্ত রামদাস প্রেম অনুরাগে।
ভেরী বাজাইয়া চলে কীর্ত্তনের আগে॥
আনন্দে প্রতাপরুদ্র ছাড়ি রাজ্যপাট।
মিশ্রের ভবনে আসি নিত্য দেখে নাট॥
নগর কীর্ত্তনে যবে মহাপ্রভু যায়।
দীনবেশে মহারাজ পেছু পেছু ধায়॥
দুই হস্ত উর্দ্ধে তুলি অঙ্গ এলাইয়া।
নাচি নাচি যায় প্রভু প্রেমেতে মাতিয়া॥
আধ নিমীলিত চক্ষে উর্দ্ধভাগে চায়।
আছাড় খাইয়া কভু পড়য়ে ধরায়॥
হরিনামে মত্ত সবে কিবা নর নারী।
মত্ত হয়ে কুলবধূ ধায় সারি সারি॥
হাজার হাজার লোক চলে চারি ভিতে।
আগে আগে প্রভু যান নাচিতে নাচিতে॥
এইরূপে নাম করি দিবস কাটায়।
রায় সহ নিরজনে রজনী গোঁয়ায়॥
একদিন মহা প্রভু কৃষ্ণ অনুরাগে।
মহাবিষ্ণু ধরিতে ধাইলা আগে ভাগে॥
কোন বাধা নাহি মানে অনুরাগে ধায়।
সম্মুখেতে আড়ি বাধি পড়িলা ধরায়॥ # # #
সেই দিন হৈতে প্রভু না যায় মন্দিরে।
দূর হৈতে প্রতিদিন দরশন করে॥
দাণ্ডাইয়া প্রভু ভোগ-মন্দিরের দ্বারে।
এক দৃষ্টে মহাবিষ্ণু দরশন করে॥
গরুড়ের স্তম্ভোপরি বাম হস্ত দিয়া।
দরশন করে প্রভু প্রেমেতে মাতিয়া॥
এইরূপে কিছু দিন থাকিয়া পুরীতে।
অনুরাগে জগন্নাথ লাগিলা দেখিতে॥
একদিন প্রভু মোর মিশ্রের ভবনে।
কৃষ্ণগুণ গান করে ভক্তগণ সনে॥
গোবিন্দ বলিয়া মোরে ডাক দিয়া পাছে।
যাইতে কহিলা মোরে আচার্য্যের কাছে॥
আজ্ঞা মাত্র পত্র সহ বিদায় লইয়া।
শান্তিপুরে যাত্রা করি প্রণাম করিয়া॥
পৃষ্টে হাত দিয়া প্রভু আশিস্‌ করিল।
মোর চক্ষে শত ধারা বহিতে লাগিল॥
প্রভু বলে নাহি কান্দ প্রাণের গাবিন্দ।
আচার্য্যে আনিয়া হেথা করহ আনন্দ॥
এই বাক্য শুনি মোর চক্ষে বারি বহে।
প্রভুর বিরহ বাণ প্রাণে নাহি সহে॥
প্রভুর বিরহ বেগ সহিব কেমনে।
নিদারুণ কষ্ট আসি উপজিল মনে @॥

( খণ্ডিরু )



টীকা -
@ - ইহার পর যাহা ঘটিয়াছিল তাহার কতকটা আভাষ চৈতন্য চন্দ্রোদয়ে পাওয়া যায়।
কিন্তু বেশী পাওয়া যায় প্রেম দাস-কৃত চৈতন্য চন্দ্রোদয় কোমুদীতে॥---দীনেশচন্দ্র সেন॥

# # # - আমাদের হাতে আসা অপর “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থটি এখানেই শেষ হয়। এই
গ্রন্থের শুরুর কোনো পৃষ্ঠাই নেই।  তাই সম্পাদক, প্রকাশক এবং অন্যান্য তথ্য সম্বলিত
কোন পৃষ্ঠা নেই।---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥

( খণ্ডিরু ) -
শেষে এই শব্দটি ওড়িয়া ভাষার, যার অর্থ “খণ্ডিত” বা “টুকরো”। অর্থাৎ
লিপিকার বাংলা ভাষার পুথির অনুলিপি লিখেছিলেন বটে, কিন্তু যেটুকু তাঁর নিজের
পর্ষবেক্ষণ, তা তিনি ওড়িয়া ভাষাতেই লিখেছিলেন, যে ভাষাটি তাঁর সহজাত ভাষা ছিল।
সম্ভবত পুথিটির অনুলিপি নীলাচলে বসেই লেখা হয়েছিল।---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর