মনীষীদের অপমানের প্রতিবাদের দেয়ালিকা <<<॥ পাতাটি ডাইনে-বামে স্ক্রল করে॥ Page scrolls left-right ॥ >>>
|
দেশের ও দশের পথ প্রদর্শক মনীষীদের মূর্তি ভাঙা আর অপমান করা কি বাঙালীর একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়ে গেল?
|
দেশের ও দশের পথ প্রদর্শক মনীষীদের মূর্তি ভাঙা বা তাঁদের অপমান করা কি বাঙালীর একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়ে গেল?
|
|
|
যে কোনো কবিতায় ক্লিক্ করলেই সেই কবিতাটি আপনার ব্রাওজারের ডান দিক ঘেঁষে ফুটে উঠবে...
|
১৯৭০ সালের মার্চ মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিটি ভাঙা
হয়েছিল। ১৯৭০ সালের জুন মাসে কলেজ স্কোয়ারের বিদ্যাসাগরের মূর্তিটি ভাঙা হয়। ১৯৭০ সালের
সেপ্টেম্বর মাসে সংস্কৃত কলেজের বিদ্যাসাগরের মূর্তিটি ভাঙা হয়। ১৯৭০-৭১ সালে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র
রোডে ভাঙা হয় রাজা রামমোহন রায়ের মূর্তি। ১৯৭৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার আশুতোষ
মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিটি ভাঙা হয়েছিল দ্বিতীয়বার। তৎকালীন প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজ
সংস্কারকদের প্রতি ক্ষোভ এবং চিনা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আদলে বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতা ও
শিক্ষাবিদদের প্রতি তাদের প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী মতাদর্শের অংশ হিসেবে এই মূর্তিগুলো ভাঙা
হয়েছিল নকশালপন্থীদের দ্বারা।
নকশাল আন্দোলনের নেতা, বিশিষ্ট কবি সাংবাদিক সরোজ দত্ত ‘দেশব্রতী’ পত্রিকায় (২০ অগস্ট,
১৯৭০) মূর্তি ভাঙার সমর্থনে লিখেছিলেন, “যুবশক্তি, শ্রমিক ও জনতা মূর্তি ভাঙছেন শুধু মূর্তি ভাঙার
জন্য নয়, ও কাজ তাঁদের নেতিবাচক কাজ নয়। মূর্তি ভাঙছেন তাঁরা পালটা মূর্তি প্রতিষ্ঠার তাগিদে।
কারণ নতুন মূর্তি মানেই নতুন রাজনীতি, সশস্ত্র সংগ্রামের বিপ্লবী রাজনীতি। তাই মূর্তি ভাঙার লড়াই
আসলে, দুই লাইনের লড়াই, দুই শ্রেণির লড়াই। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্থান এখানে নেই।” সরোজ দত্ত
ছাড়াও আরএ কিছু বামপন্থী কবি এর পক্ষে সোয়াল করেছিলেন।
১৯৯০ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পরে লেনিনের মুর্তি ভাঙা হয়েছিল। তা নিয়ে কবি
অন্নদাশঙ্কর রায় লেখেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা “লেনিন মুর্তি”। এ ছাড়াও বহু কবি তাঁদের লেখায় ও
কবিতায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তা নিয়ে।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরেই, দক্ষিণ ত্রিপুরার বিলোনিয়ার কলেজ স্কয়ারে রুশ বিপ্লবের নায়ক
ভ্লাদিমির লেনিনের মূর্তিটি ৬ মার্চ ২০১৮ তরিখে ভেঙে ফেলা হয় একেবারে বুলডোজার দিয়ে।
দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবেকানন্দের মূর্তি ভাঙচুর করা হয় নভেম্বর ২০১৯ সালে।
মুর্শিদাবাদ জেলার বারওয়ান থানার অন্তর্গত একটি শিশু বিদ্যালয়ের সামনে স্বামী বিবেকানন্দের
একটি মূর্তি অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা ভাঙচুর করা হয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। এটি নাকি
আগেও আরেকবার ভাঙা হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাস্কর্যটি ভাঙা হয়েছিল ছিল বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ২০২৩
সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, দেশের বিভিন্ন বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার জন্য কিছু ছাত্র সেখানে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অস্থায়ী ভাস্কর্য স্থাপন করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই নীরবে সেটি
সরিয়ে ফেলে এবং পরে পূর্বানুমতি ছাড়া স্থাপনের কারণ দর্শায়। পরবর্তীতে, ক্যাম্পাসের কাছের একটি
শেড থেকে ভাস্কর্যটির ভাঙা টুকরো পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ সমালোচনার মুখে পড়ে।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছবি আঁকা DYFI-এর পতাকায় জুতো বেঁধে উল্লাস করার ঘটনাটি ঘটেছে,
২৩ থেকে ২৮ জুলাই ২০২৬, পশ্চিমবঙ্গের আরামবাগে (হুগলি জেলায়)। এই ঘটনায় অভিযোগের তির
বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে, যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
কলকাতার নিউ আলিপুরে, নেতাজির মূর্তি ভাঙার ঘটনাটি ঘটেছে ২০২৬ সালের ১২ আগস্টের রাতে।
আমরা, মিলসাগরের এই দেয়ালিকায় এই সব মূর্তি ভাঙার, প্রতিক্রিয়া ও কবিতায় প্রতিবাদ তুলে
দেবার চেষ্টা করছি। সবাই প্রশ্ন করছেন যে যদি মহারাষ্ট্রে কখনও কেউ শিবাজীর মূর্তি ভাঙে তা হলে
কি হতে পারে?!
তাহলে আজ, দেশের ও দশের পথ প্রদর্শক মনীষীদের মূর্তি ভাঙা আর অপমান করা কি বাঙালীর একটি
ঐতিহ্যে পরিণত হয়ে গেল?!
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ ২২ আগস্ট ২০২৮
লেনিন মুর্তি - কবি অন্নদাশঙ্কর রায়।
১৯৯০ সালে কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন যখন সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পরে লেনিনের মুর্তি
ভাঙা হচ্ছিল। আজ যেন এই কবিতাটি ভবিষ্যৎ বাণী হয়ে আমাদের কাছে ফিরে এসেছে।
লেনিন মুর্তি না বাঁচে তো
গান্ধীও কি বাঁচবে?
গান্ধী মুর্তি ধ্বংস করে
নাচবে ওরা নাচবে।
গান্ধী মূর্তি না বাঁচে তো
সুভাষও কি বাঁচবে?
সুভাষ মূর্তি চুর্ণ করে
নাচবে ওরা নাচবে?
ওদের নাচন ওদের মাতন
ওইখানে কি থামবে?
রাজনীতির রণাঙ্গনে
নামবে ওরা নামবে।
মারদাঙ্গা বাধিয়ে দিয়ে
বুলেট ছুঁড়ে মারবে
নির্বাচনের ব্যালট বাণে
হারবে ওরা হারবে।
বিশ শতকের সঙ্গে লড়ে
অষ্টাদশ কি পারবে?
ভাঙবে কিছু, চুরবে কিছু
সর্বশেষে হারবে।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
বিদ্রোহ কর সুর ও কণ্ঠ - দেবাশিস রায়। সঙ্গীতায়ন - অমিত রায়। কথা - দুষ্ট কবি। বাংলা জ্বলছে সিডির গান।
কলকাতার বিড়লা সভাঘরের এক অনুষ্ঠানে গাইছেন ৩০শে আগস্ট ২০০৯ তারিখে।
আজও যদি অন্তর তব বিদ্রোহ নাহি করে !
অশ্রুকণা দুই নয়নে, ঝর ঝর নাহি ঝরে !
উত্তাপহীন শীতল মননে, ক্রোধ নাহি ফেটে পরে !
ক্ষোভানল জ্বেলে, ছারখার ক'রে দিতে মন তব ডরে !
জেনো হে মানব, তুমি নিশ্চিত, পাষাণ হয়েছো ম'রে !
বিদ্রোহ কর, বিদ্রোহ কর, বিদ্রোহী নাহি মরে !
স্বাধীন দেশ আজ পরাধীনতার শৃঙ্খলে বাঁধা প'ড়ে !
নিজ দেশবাসী নিজেদেরই দ্যাখো কেমন দখল করে !
জাতীয় কেতন দেখি না, শুধু দলের নিশান ওড়ে !
আজও যদি অন্তর তব বিদ্রোহ নাহি করে !
জেনো হে মানব, তুমি নিশ্চিত, পাষাণ হয়েছো ম’রে !
বিদ্রোহ কর, বিদ্রোহ কর, বিদ্রোহী নাহি মরে !
দুষ্ট কবির বাংলায় ফের "বিদ্রোহ" গান করে !
দেশবাসী আজ নেমে এসো পথে, নব বিদ্রোহ সুরে !
তুমি ঘুরে আজ রুখে দাঁড়ালেই, আঁধার যাবে যে স’রে !
আজও যদি অন্তর তব বিদ্রোহ নাহি করে !
জেনো হে মানব, তুমি নিশ্চিত, পাষাণ হয়েছো ম’রে !
বিদ্রোহ কর, বিদ্রোহ কর, বিদ্রোহী নাহি মরে !
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
মুর্তি - কবি হেমাঙ্গ বিশ্বাস।
১৯৭১ সালের নকশালবাড়ি আন্দোলনের সময় মনীষীদের মূর্তি ভাঙার ঘটনার প্রতিবাদে হেমাঙ্গ
বিশ্বাস "মূর্তি" নামে একটি বিখ্যাত গান ও কবিতা রচনা করেছিলেন। তিনি একে অন্ধ হঠকারিতা
বলে মনে করতেন এবং পাথরের মূর্তি না ভেঙে শোষণের ভিত ভাঙার ডাক দিয়েছিলেন।
পাথরের মূর্তি ভেঙে কী হবে ভাই,
শোষণের যে ভিত শক্ত, তার বিনাশ চাই।
বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ কিম্বা রামমোহন,
পাথর ভেঙে তো কমবে না জনতার এই দহন!
তোমরা যদি ভাঙতেই চাও, ভাঙো তবে আজ,
জোতদার-ধনিক শ্রেণীর ওই শোষণের তাজ।
মানুষের মুক্তি শুধু পাথরেতে নাই,
চেতনা জাগিয়ে চলো আসল লড়াইয়ে যাই।
পাথরের বিদ্যাসাগর শান্তিতে থাক,
জীবন্ত বিদ্যাসাগর আজ ফিরে আসুক।
যাঁরা দিয়েছেন আলো, দিয়েছেন জ্ঞান,
তাঁদের ভাঙিয়া বলো কীসের কল্যাণ?
আসল শত্রু যেথা লুকিয়ে আছে,
সেথা আঘাত হানো জনতার কাছে।
পাথর ভাঙার এই অন্ধ হঠকারিতা,
নেভাতে পারবে না শোষণের চিতা।
এক হও ভাই সব, মেলাও রে হাত,
শোষকের রাজত্বে করো আঘাত!
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
বিদ্যাসাগর - কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
সত্তরের দশকে নকশাল আন্দোলনের সময় মণীষীদের মূর্তি ভাঙার ঘটনার প্রতিবাদে সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়ে. সেই সময়কার ধ্বংসাত্মক রাজনীতির বিরুদ্ধে, তিনি প্রবন্ধ ও উপন্যাসে সরব
হয়েছিলেন। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রেক্ষাপটে তাঁর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর কবিতা..
কবিতাটি আমরা পেয়েছি www.ebanglalibrary.com থেকে।
আমরা বাঙালি—এই যে গর্ব তুমি আছ এর মূলে
তোমার কীর্তি এ বাংলা দেশ যাবে না কখনো ভুলে।
জননীর প্রতি তোমার ভক্তি তোমার জ্ঞানের তৃষা
তোমার সাহস, সত্যনিষ্ঠা ঘুচাল অন্ধ নিশা।
যেমন তোমার বিদ্যা অশেষ তেমনি তোমার দান
তোমার অশেষ কীর্তির কোনো হয় নাকো পরিমাণ!
তোমার জীবন আজিকে বাঙালি আদর্শ রাখে মনে
তোমাকে স্মরণ করি গো আমরা জীবনের ক্ষণে ক্ষণে।
বীরসিংহের হে বীর মানব ধন্য তোমার নাম
তোমার চরণে নীরবে আমরা জানাই আজি প্রণাম।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
বঙ্গমাতা - কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
পুণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে
মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে
হে স্নেহার্ত বঙ্গভূমি, তব গৃহক্রোড়ে
চিরশিশু করে আর রাখিয়ো না ধরে।
দেশদেশান্তর-মাঝে যার যেথা স্থান
খুঁজিয়া লইতে দাও করিয়া সন্ধান।
পদে পদে ছোটো ছোটো নিষেধের ডোরে
বেঁধে বেঁধে রাখিয়ো না ভালোছেলে করে।
প্রাণ দিয়ে, দুঃখ স'য়ে, আপনার হাতে
সংশ্রাম করিতে দাও ভালোমন্দ-সাথে।
শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধরে
দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া ক'রে।
সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করনি।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
আনন্দময়ীর আগমনে - কবি নজরুল ইসলাম।
১৯২২ সালে প্রথমবারের মতো এই কবিতাটি প্রকাশিত হয় স্বয়ং কবি সম্পাদিত
ধূমকেতু পত্রিকাতে। কবিতাটিতে আমাদের দেশের দুর্দশার বর্ণনা রয়েছে।
আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে তোর জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেবশিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী!
দেবসেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দ্বীপান্তরে
রণাঙ্গনে নামবে কে আর, তুই না এলে কৃপাণ ধরে?
বিষ্ণু নিজে বন্দী আজি ছয় বছরী ফন্দী কারায়
চক্র তাহার চরখা বুঝি, ভণ্ড হাতে শক্তি হারায়!
মহেশ্বর আজ সিন্ধুতীরে যোগাসনে মগ্ন ধ্যানে
অরবিন্দ-চিত্ত তাহার ফুটবে কখন কে তা জানে?
সদ্য অসুরগ্রাস-চ্যূত ব্রহ্মা চিত্তরঞ্জনে, হায়!
কমণ্ডলুর শান্তিবারী সিঞ্চি যেন চাঁদ নদীয়ায়।
শান্তি শুনে তিক্ত এ মন, ক্ষিপ্ত আরও ভীষণ রবে
মরার দেশে মরা শান্তি, সে তো আছেই, কাজ কী তবে?
শান্তি কোথায়? শান্তি কোথায়? কেউ জানি না
মা গো তোর ওই দনুজদলন সংহারিনী মূর্তি বিনা
দেবতারা আজ জ্যোতিহারা, ধ্রুব তাদের যায় না জানা।
কেউ বা দৈব অন্ধ মা গো, কেউ বা ভয়ে দিনে কানা।
সুরেন্দ্র আজ মন্ত্রণা দেন দানবরাজার অত্যাচারে
দম্ভ তাহার দম্ভেলি ভীম বিকিয়ে দিয়ে পাচ হাজারে।
রবির শিখা ছড়িয়ে পড়ে দিক থেকে দিক দিগন্তরে
সে কর শুধু পশলো না মা অন্ধকারার বন্ধঘরে।
গগন পথে রবিরথের সাত সারথী হাঁকায় ঘোড়া
মর্ত্যে দানব মানব পিঠে সওয়ার হয়ে মারছে কোঁড়া।
বারি-ইন্দ্র-বরুণ আজি করুণ সুরে বংশী বাজায়
বুড়িগঙ্গার পুলিশ বুকে বাঁধছে ঘাটি দস্যু রাজায়।
পুরুষগুলোর ঝুঁটি ধরে বুরুশ করার দানব জুতো
মুখে ভজে আল্লা হরি, পূজে কিন্তু ডান্ডা-গুতো।
দাড়ি নাড়ে, ফতোয়া ঝাড়ে, মসজিদে যায় নামাজ পড়ে
নাইকো খেয়াল গোলামগুলোর হারেমে সব বন্দী গড়ে।
লানত গলায় গোলাম ওরা, সালাম করে জুলুমবাজে
ধর্মধ্বজা উড়ায় দাড়ি, গালিজ মুখে কোরান ভজে।
তাজ-হারা যার নাঙ্গা শিরে গরমাগরম পড়ছে জুতি
ধর্মকথা বলছে তারাই, পড়ছে তারাই কেতাব-পুঁথি।...
উৎপীড়ককে প্রণাম করি, শেষে ভগবানকে নমি
হিজড়ে ভীরুর ধর্মকথার ভণ্ডামীতে আসছে বমি।
পুরুষ ছেলে দেশের নামে চুগলি খেয়ে ভরায় উদর
টিকটিকি হয়, বিষ্ঠা কি নাই, ছিঃ ছিঃ এদের খাদ্য ক্ষুদোর!
আজ দানবের রঙমহলে তেত্রিশ কোটি খোঁজা গোলাম
লাথি খায়, চেঁচায় শুধু দোহাই হুজুর, মোলাম! মোলাম!
মাদিগুলোর মাদি দোষ ওই, অহিংসা বোল নাকি নাকি
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ, নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।
হান তলোয়ার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র দেখা
মাদিগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা, রক্ত দেখা।
লক্ষ্মী-সরস্বতীকে তোর আয় মা রেখে কমলবনে
বুদ্ধিবুড়ো সিদ্ধিদাতা গণেশ-টনেশ চাই না রণে।
ঘোমটা-পড়া কলা বৌয়ের গলা ধরে দাও করে দূর
ওই বুঝি দেব-সেনাপতি? ময়ূর-চড়া জামাইঠাকুর!
দূর করে দে! দূর করে দে! এ-সব বালাই সর্বনাশী।
চাই নাকো ওই ভাঙ খাওয়া শিব, নেক নিয়ে তায় গঙ্গামাসী
তুই একা আয় পাগলি বেটি তাথৈ তাথৈ নৃত্য করে
রক্ততৃষায় 'ম্যায় ভুখা হুঁ'-র কাঁদন-কেতন কণ্ঠে ধরে।
'ম্যায় ভুখা হুঁ'-র রক্তক্ষেপী ছিন্নমস্তা আয় মা কালী
গুরুর বাগে শিখ সেনা তোর হুঙ্কারে ওই 'জয় আকালী'।
এখনও তোর মাটির গড়া মৃন্ময়ী ওই মূর্তি হেরি'
দু-চোখ পুরে জল আসে মা, আর কতকাল করবি দেরি?
মহিষাসুর বধ করে তুই ভেবেছিলি রইবি সুখে
পারিসনি তা, ত্রেতা যুগে টলল আসন রামের দুখে।
আর এলিনে রুদ্রাণী তুই, জানিনে কেউ ডাকল কি না?
রাজপুতানায় বাজল হঠাৎ 'ম্যায় ভুখা হুঁ'-র রক্তবীণা।
বৃথাই গেল সিরাজ-টিপু-মীর কাশিমের প্রাণ বলিদান
চণ্ডী, নিলি যোগমায়া রূপ, বললে সবাই 'বিধির বিধান'।
হঠাৎ কখন উঠল ক্ষেপে বিদ্রোহিনী ঝাঁসি রাণী
ক্ষ্যাপা মায়ের অভিমানেও এলিনে তুই, মা ভবানী।
এমনি করে ফাঁকি দিয়ে আর কতকাল নিবি পূজা?
পাষাণ বাপের পাষাণ মেয়ে, আয় মা এবার দশভূজা!
অনেক পাঠা মোষ খেয়েছিস! রাক্ষসী, তোর যায়নি ক্ষুধা?
আয় পাষাণী, এবার নিবি আপন ছেলের রক্তসুধা।
দুর্বলদের বলি দিয়ে ভীরুর এ-হীন শক্তিপূজা
দূর করে দে, বল মা, ছেলের রক্ত মাগে দশভূজা।
সেইদিন জননী তোর সত্যিকারের আগমনী
বাজবে বোধন-বাজনা, সেদিন গাইব নব জাগরণী।
কৈলাশ হতে গিরিরাণীর মা দুলালী কন্যা অয়ি
আয় উমা আনন্দময়ী, আয় উমা আনন্দময়ী।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
বিক্ষোভ - কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য।
কবির “ঘুম নেই” কাহ্যগ্রন্থের কবিতা। কবি আজ বেঁচে থাকলে, এই অমানুষিক বর্বর
ঘটনাবলী নিয়ে কি লিখতেন?
দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম,
হে স্বদেশ, ফের সেই কথা জানলাম
জানে না তো কেউ পৃথিবী উঠছে কেঁপে
ধরেছে মিথ্যা সত্যের টুঁটি চেপে,
কখনো কেউ কি ভূমিকম্পের আগে
হাতে শাঁখ নেয়, হঠাৎ সবাই জাগে?
যারা আজ এত মিথ্যার দায়ভাগী,
আজকে তাদের ঘৃণার কামান দাগি।
ইতিহাস, জানি নীরব সাক্ষী তুমি,
আমরা চেয়েছি স্বাধীন স্বদেশভূমি,
অনেকে বিরূপ, কানে দেয় হাত চাপা,
তাতেই কি হয় আসল নকল মাপা?
বিদ্রোহী মন ! আজকে ক’রো না মানা,
দেব প্রেম আর পাব কলসীর কানা,
দেব, প্রাণ দেব মুক্তির কোলাহলে,
জীন্ ডার্ক, যীশু, সোক্রোটিসের দলে।
কুয়াশা কাটছে, কাটবে আজ কি কাল,
ধুয়ে ধুয়ে যাবে কুৎসার জঞ্জাল,
ততদিন প্রাণ দেব শত্রুর হাতে,
মুক্তির ফুল ফুটবে সে সংঘাতে।
ইতিহাস ! নেই অমরত্বের লোভ,
আজ রেখে যাই আজকের বিক্ষোভ॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
মুক্ত বীরদের প্রতি - কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য।
কবির “ঘুম নেই” কাহ্যগ্রন্থের কবিতা। কবি আজ
বেঁচে থাকলে, এই অমানুষিক বর্বর ঘটনাবলী নিয়ে কি
লিখতেন?
তোমরা এসেছ, বিপ্লবী বীর ! অবাক অভ্যুদয়!
যদিও রক্ত ছড়িয়ে রয়েছে সারা কলকাতাময়।
তবু দেখ আজ রক্তে রক্তে সাড়া ----
আমরা এসেছি উদ্দাম ভয়হারা।
আমরা এসেছি চারিদিক থেকে, ভুলতে কখনো পারি!
একসূত্রে যে বাঁধা হয়ে গেছে কবে কোন্ যুগে নাড়ী।
আমরা যে বারে বারে
তোমাদের কথা পৌঁছে দিয়েছি এদেশের দ্বারে দ্বারে,
মিছিলে মিছিলে সভায় সভায় উদাত্ত আহ্বানে,
তোমাদের স্মৃতি জাগিয়ে রেখেছি জনতার উথ্বানে।
উদ্দাম ধ্বনি মুখরিত পথেঘাটে,
পার্কের মোড়ে, ঘরে, ময়দানে, মাঠে
মুক্তির দাবি করেছি তীব্রতর
সারা কলকাতা শ্লোগানেই থরোথরো।
এই সেই কলকাতা !
একদিন যার ভয়ে দরু দুরু বৃটিশ নোয়াত মাথা।
মনে পড়ে চব্বিশে?
সেদিন দুপুরে সারা কলকাতা হারিয়ে ফেলেছে দিশে ;
হাজার হাজার জনসাধারণ ধেয়ে চলে সম্মুখে
পরিষদ-গেটে হাজির সকলে, শেষ প্রতিজ্ঞা বুকে
গর্জে উঠল হাজার হাজার ভাই :
রক্তের বিনিময়ে হয় হোক, আমরা ওদের চাই।
সফল ! সফল ! সেদিনের কলকাতা-----
হেঁট হয়েছিল অত্যাচারী ও দাম্ভিকের মাথা।
জানি বিকৃত আজকের কলকাতা
বৃটিশ এখন এখানে জনত্রাতা !
গৃহযুদ্ধের ঝড় বয়ে গেছে------
ডেকেছে এখানে কালো রক্তের বান ;
সেদিনের কলকাতা এ আঘাতে ভেঙে চুরে খান্ খান্।
দিকে দিকে আজ বিদেশী প্রহরী, সঙ্গিন উদ্যত,
তোমরা এসেছ বীরের মতন, আমরা চোরের মতো।
তোমরা এসেছ, ভেঙেছ অন্ধকার-----
তোমরা এসেছ, ভয় করি নাকো আর।
পায়ের স্পর্শে মেঘ কেটে যাবে, উজ্জ্বল রোদ্দুর
ছড়িয়ে পড়বে বহু দূর------বহুদূর।
তোমরা এসেছ, জেনো এইবার নির্ভর কলকাতা----
অত্যাচারের হাত থেকে জানি তোমরা মুক্তিদাতা।
তোমরা এসেছ, শিহরণ ঘাসে ঘাসে :
পাখির কাকলি উদ্দাম উচ্ছ্বাসে,
মর্মরধ্বনি তরুপল্লবে শখায় শাখায় লাগে ;
হঠাৎ মৌন মহাসমুদ্র জাগে
অস্থির হাওয়া অরণ্যপর্বতে,
গুঞ্জন ওঠে তোমরা যাও যে-পথে।
আজ তোমাদের মুক্তিসভায় তোমাদের সম্মুখে,
শপথ নিলাম আমরা হাজার মুখে :
যতদিন আছে আমাদের প্রাণ, আমাদের সম্মান,
আমরা রুখব গৃহযুদ্ধের কালো রক্তের বান।
অনেক রক্ত দিয়েছি আমরা, বুঝি আরো দিতে হবে
এগিয়ে চলার প্রত্যেক উৎসবে।
তবুও আজকে ভরসা, যেহেতু তোমরা রয়েছ পাশে,
তোমরা রয়েছ এদেশের নিঃশ্বাসে।
তোমাদের পথ যদিও কুয়াশাময়,
উদ্দাম জয়যাত্রার পথে জেনো ও কিছুই নয়।
তোমরা রয়েছ, আমরা রয়েছি, দুর্জয় দুর্বার,
পদাঘাতে পদাঘাতেই ভাঙব মুক্তির শেষ দ্বার।
আবার জ্বালাব বাতি,
হাজার সেলাম তাই নাও আজ, শেষযুদ্ধের সাথী॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
আঠারো বছর বয়স - কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য।
কবির “ছাড়পত্র" কাহ্যগ্রন্থের কবিতা। কবি আজ বেঁচে থাকলে, এই অমানুষিক বর্বর ঘটনাবলী
নিয়ে কি লিখতেন?
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ
স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহ
বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।
আঠারো বছর বয়সেই নেই ভয়
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়-----
আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।
এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য
বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,
প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য
সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।
আঠারো বছর বয়স ভয়ঙ্কর
তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,
এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর
এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।
আঠারো বছর বয়স যে দুর্বার
পথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান,
দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভার
ক্ষত-বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।
আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসে
অবিশ্রান্ত ; একে একে হয় জড়ো,
এ বয়স কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে
এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরোথরো।
তবু আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি,
এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,
বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী
এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।
এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,
এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়-----
এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
হে মহাজীবন - কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য।
কবির “ছাড়পত্র" কাহ্যগ্রন্থের কবিতা। কবি আজ বেঁচে
থাকলে, এই অমানুষিক বর্বর ঘটনাবলী নিয়ে কি লিখতেন?
হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো !
প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা------
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় :
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্ সানো রুটি॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
ও মশাই শুনছেন............? - কবি সলিল চৌধুরী।
সত্তরের দশকের অস্থির কলকাতায় যখন মনীষীদের মূর্তি ভাঙার হিড়িক উঠেছিল, তখন সলিল চৌধুরী
একটি অসাধারণ গদ্য-কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। কবিতাটির মূল ভাব ছিল— সমাজ থেকে মনীষীদের
আদর্শ মুছে যাচ্ছে, অথচ মানুষ পাথর বা ব্রোঞ্জের নিথর মূর্তি ভাঙা-গড়া নিয়ে মেতে আছে।
আমরা কবিতাটি পেয়েছি https://m.somewhereinblog.net/mobile/blog/mahalderblog/29431508 ব্লগ
থেকে। তাই আমরা এই ব্লগের লেখক “মহলদার” এর কাছে চির কৃতজ্ঞ রইলাম।
ও মশাই শুনছেন............?
নিশুতি মাঝ রাতে চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে যেত। পাগলটা আবার এ পাড়ায় এসেছে। কি যে ও শুনাতে
চায় তা কেউ জানে না। বড়জোর এক মিনিটের জ্যোতি, তারপর আবার সেই চিৎকার- ও মশাই
শুনছেন.......। আওয়াজ টা ক্রমশ দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যেত। কুকুর গুলো ঘেউ ঘেউ করতে করতে
হাঁপিয়ে গিয়ে এক সময় থেমে যেত।
কিন্তু ঐ চিৎকার টা থেমে যাওয়ার পরও বহুক্ষণ ধরে কলকাতার হর্ম্মে হর্ম্মে, দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা
খেতে খেতে অনুরণিত হতে থাকত- ও মশাই শুনছেন শুনছেন শুনছেন.......?
সারা কলকাতা এবং শহরতলীতে, কোন না কোন পাড়ায়, নিশুতি মাঝ রাতে কোন না কোন দিন
চিৎকার শুনে লোকের ঘুম ভেঙে যেত ... ও মশাই শুনছেন? হঠাৎ জেগে ওঠা লোকেরা বলত, পাগলটা
আবার এ পাড়ায় এসেছে।
আমি তখন তরুণ। আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা। সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে। অনেক কিছু
বঞ্চনার হতাশায়, প্রতারণার ক্ষোভে ক্ষমতাসীন শাসকেরা রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছে।
তখনকার কলকাতায় এবং শহরতলীতে সবাই ওকে জানে। জ্বলন্ত দু’টো চোখ, এক মুখ খোঁচা খোঁচা
দাঁড়ি, উস্ক-খুস্ক কাঁচা-পাকা চুল, তালি মারা লম্বা একটা আলখাল্লা, পরনে খাকি প্যান্ট, বগলে পুরোনো
কাগজ আর পায়ে মিলিটারি জুতো। কেউ বলত লোকটা ছিল টেররিস্ট; পুলিশের মার খেয়ে পাগল হয়ে
গেছে। কেউ বলত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ও ছিল মেজর; মানুষ খুন দেখে দেখে মস্তিস্ক বিকল হয়ে গেছে।
আবার কেউ বলত এক ভরাডুবি জাহাজের ও ছিল কাপ্তান; টর্পেডোর ঘায়ে জাহাজশুদ্ধ সবাই ডুবে মরে,
ওই শুধু বেঁচে যায়। সেই দুঃখে আজও ও অনুশোচনায় জ্বলছে। বলতে চাইছে কি করে ও বেঁচেছে।
আবার কেউ কেউ বলত ও মানুষ নয়; প্রেতাত্মা। অনেক চেষ্টা করেও লোকে বার করতে পারেনি
লোকটা দিনের বেলায় কোথায় থাকে? রাত্তিরে ও হঠাৎ হঠাৎ এক এক পাড়ায় এক এক দিন উদয় হয়,
তারপর আবার তেমনি হঠাৎ মিলিয়ে যায়।
একবার নাকি শ্যাম বাজারের ছেলেরা ওকে ঘিরে ধরেছিল-বলুন আপনি কি শোনাতে চান, বলুন...
বলুন...। ও নাকি বোকার মত তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে তারপর আবার
চিৎকার করে উঠেছিল, ও মশাই শুনছেন.........। আর্তনাদের মত শুনিয়েছিল ওর কণ্ঠ সেদিন।
এরও প্রায় এক দশক পরে বিধাব মা আর ছোট ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে অকূল সমুদ্রে ভাসকে ভাসতে
একদিন আমার কলকাতার বাস উঠল। ততদিনে আমার নিজের জীবনের মানেও বদলে গেছে। অন্য
চেতনা অন্য মূল্যবোধ নিয়ে ভাবতে শিখেছি। দেশ ছেড়ে চলেগেছি বহুদূরে। এক দুই তিন করে তিন
তিনটা দশক পেরিয়ে গেছে, কবে ভুলে গেছি “ও মশাই” এর কথা।
তারপর বোধহয় সেটা ১৯৮০ সাল। আগরতলায় গিয়েছি জাতীয় সংহতি সম্মেলনে যোগ দিতে। আছি
সার্কিট হাউসে, দোতলায়, একা একটি ঘরে। হঠাৎ মাঝরাত্রে আবার সেই চিৎকার- ও মশাই শুনছেন....?
আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, ধড়মড় করে উঠে বসলাম ; এ সেই কণ্ঠস্বর! তবে যেন বড় ক্লান্ত, বড়
আকুতি ভরা হতাশায় জীর্ণ। যেন কেউ শুনবে না এই চেতনার বেদনায় প্রশ্নটি বড় করুণ। তাড়াতাড়ি
পোশাক বদলে টর্চ নিয়ে নিচে নামলুম; লোকটাকে আজ ধরতেই হবে। আবছা কুঁয়াশা ঘেরা রাত, সারা
পাড়াটা ঘেউ ঘেউ করছে। রাস্তায় নেমে টর্চ জ্বালালুম, কিন্তু কোথায় গেল সেই লোকটা! তবে কি আমার
শোনা ভুল? স্বপ্ন? অনেক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে পথ হাঁটলুম। ঘেউ ঘেউ শহরটা শান্ত হয়ে এল। দূরে কারা
খোল-করতাল বাজিয়ে গান ধরেছে। ছোট বেলার কত স্বাদ, স্বপ্ন, স্মৃতির স্বাদ যেন ওই চিৎকারে মিশে
আছে।
কত কি ভাবতাম, কত কি করার ছিল, কত সোনার মত দিন বৃথা নষ্ট হল! কত জমাট দুঃখ হতাশা, কত
অঙ্কুর, আধফোটা কলিদের ভাষা, না বলতে পারার পুঞ্জীভূত বেদনায় বুকটা যেন ফেটে যেতে চাইল।
প্রচন্ড ইচ্ছা হল আমিও ওর মত চিৎকার করে উঠে ঘুমন্ত শহরটাকে খান খান করে জাগিয়ে দিই-ও
মশাই শুনছেন ও মশাই শুনছেন? ঘরে গিয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লুম।
ভোরে উঠে চলে যেতে হবে। তন্দ্রার চাদর মুড়ি দিয়ে পাশ ফিরলুম। সত্যিই তো কত কি শোনাবার ছিল,
কত গান, কত গল্প, কত কথা। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লুম।
এবার আমার জালনার ঠিক নিচে আবার সেই চিৎকার- ও মশাই.......শুনছেন.....?
খোলা জালনার বাইরে স্তিমিত কয়েকটা তারার দিকে তাকিয়ে চেয়ে রইলাম, আবার শুনে নিশ্চিত হব
বলে। আবার শুনলাম।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
সবিনয় নিবেদন - কবি শঙ্খ ঘোষ।
২০০৭ সালের সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়, শাসকের বিরুদ্ধে লেখা প্রতিবাদী
কবিতা। কবি আজ বেঁচে থাকলে, এই অমানুষিক বর্বর ঘটনাবলী নিয়ে কি লিখতেন?
আমি তো আমার শপথ রেখেছি
অক্ষরে অক্ষরে
যারা প্রতিবাদী তাদের জীবন
দিয়েছি নরক করে।
দাপিয়ে বেড়াবে আমাদের দল
অন্যে কবে না কথা
বজ্র কঠিন রাজ্যশাসনে
সেটাই স্বাভাবিকতা।
গুলির জন্য সমস্ত রাত
সমস্ত দিন খোলা
বজ্র কঠিন রাজ্যে এটাই
শান্তি শৃঙ্খলা।
যে মরে মরুক, অথবা জীবন
কেটে যাক শোক করে---
আমি আজ জয়ী, সবার জীবন
দিয়েছি নরক করে।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
শাসকের প্রতি - কবি জয় গোস্বামী।
একটি যুগান্তকারী কবিতা! এই কবিতাটি কবি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনকালে,
৮ই ডিসেম্বর ২০০৬ সালে 'তারা নিউজ চ্যানেলে' সর্বপ্রথম পাঠ করেন। বামফ্রন্ট
শাসনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীরা এর পর থেকেই বলতে শুরু করেছিলেন। কবিতাটি শুনে
লেখা তাই ভুল থাকলে মার্জনা করবেন।
আপনি যা বলবেন
আমি ঠিক তাই কোরবো
তাই খাবো
তাই পরবো
তাই গায়ে মেখে ব্যাড়াতে যাবো
কথাটি না বলে
বললে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে থাকবো সারা রাত
তাই থাকবো
পরদিন যখন বলবেন
এবার নেমে এসো
তখন কিন্তু লোক লাগবে আমাকে নামাতে
একা একা নামতো পারবো না
ও টুকু পারি নি বলে
অপরাধ নেবেন না যেন
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
দ্বেষের সীমা - কবি আর্যতীর্থ।
রচনা ২১ই আগস্ট ২০২৬।
দ্বেষের সীমা বাড়বে যত, কমবে তত দেশ-সীমানা
ইতিহাসে শ’বার ভুল-এর এসব গল্প সবার জানা।
এইটুকু দেশ , তার বেশি না, এমন বলে দ্বেষ বাড়ালে
দেশ-খেকো বেশ কুমীর আসে স্বখাত সেই কাটা খালে
পার্টিশনের জন্য দায়ী লোকরা কারা খুঁজতে গেলে
লীগ কংগ্রেস মাউন্টব্যাটেন হরেক প্রকার জবাব মেলে
এম সি কিউ’র সেই জবাবের একচোখোমির বিসদৃশে
আড়াল করে দেশীর মাঝে ছিলো ভেদের যে দ্বেষ মিশে
মুসলমানের ছোঁয়া খাওয়া আমহিন্দুদের ছিলো বারণ,
গালি ছাড়া ইসলামীরও হিন্দু কথার না উচ্চারণ
কেবল কিছু বিরল মানুষ পেরিয়েছিলেন ফারাক সবই
বাদবাকিদের শেকলটাকেই শেকড় দেখায় ধর্ম-ভবি।
তা নইলে কি ওই ব্রিটিশের এতটা বাড় বাড়ার কথা,
আমারই দেশ কেটে আমায় ভান করে দেয় স্বাধীনতা!
আজকে যদি টুকরো ভারত থাকতো হয়ে একখানা দেশ
বাদবাকি সব ছেড়েই দিলাম, উগ্রবাদের যন্ত্রণা শেষ।
টুকরো হওয়া দেশ পেয়েছি, ফের দেখি দ্বেষ তুলছে ফণা,
কারোর সাথে কারোর এখন হচ্ছে না আর বনিবনা,
পতাকা বা গান প্রতীকি, আসল কথা দেশ-জনতা,
দেশ জুড়ে দ্বেষ-অতিমারি’র টিকা দেওয়ার মানুষ কোথা?
দ্বেষ যে আবার দেশ কেটে দেয়, কাদের ঘাড়ে সে ব্যর্থতা?
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
মূর্তি তোমার ভাঙছে যারা - অজ্ঞাত কবি।
ইন্টারনেট থেকে পাওয়া এই কবিতাটি আমাদের পাঠিয়েছেন কবি অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী। রচনা সম্ভবত ১৪ই আগস্ট ২০২৬।
জয় হিন্দ
মূর্তি তোমার ভাঙছে যারা
দিচ্ছে গালি সকাল রাত,
তাদের নেতা লাল কেল্লায়
কাল শোনাবে ‘মন কি বাত’!
ক্ষমা করো নেতাজী
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
বানান - কবি আর্যতীর্থ। রচনা ১৫ই আগস্ট ২০২৬।
স্বাধীনতার অনেকগুলো বানান আছে।
ক্ষ’য় হ্রস্ব উ দ’য় হ্রস্ব ই র’ য় আকার ম.. ক্ষুদিরাম মানে স্বাধীনতা
ব’ য় আকার ঘ’য় আকার অন্তস্থ য ত’য় দীর্ঘ ঈ দন্ত্য ন
বাঘাযতীন মানে স্বাধীনতা,
ভ য়ের পরে গ য়ের পরে খণ্ড ৎ , স’য় হ্রস্ব ই আর অনুস্বার ভগৎ সিং মানে
স্বাধীনতা,
গ-আকার ন’য় ধ’য় দীর্ঘ ঈ’, গান্ধী মানে স্বাধীনতা…
তবে আমরা বাঙালিরা স্বাধীনতার যে বানানটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি,
সেটা হলো দন্ত্য স’য় হ্রস্ব উ, ভ’য় আকার তালব্য ষ,
একটা গ্যাপ দিয়ে চ আর ন’য় দ’য় র’ফলা
তারপরে ব আর দন্ত্য স’ য় হ্রস্ব উ।
মানে সুভাষ চন্দ্র বসু ,
আর ছোটো করে বললে ন’য় একার, ত’য় আকার আর বর্গীয় জ’এ দীর্ঘ ঈ।
নেতাজী।
কম্যুনিস্ট বাঙালির কাছে,
বি জে পি বাঙালির কাছে,
কংগ্রেস বাঙালির কাছে,
ভালো ও খারাপ, আসল ও নকল সব তৃণমূল বাঙালির কাছে,
স্বাধীনতার ওই একটা বানান ধ্রুবক, মানে কনস্টান্ট।
তারপর তালিকায় এক এক জন নানান রকম বানান জোড়েন।
মুসলমান বাঙালির কাছে স্বাধীনতা বানান জিজ্ঞেস করুন।
হিন্দু বাঙালির কাছে একই প্রশ্ন রাখুন।
কবি’র কাছে রাখুন, চাষীর কাছে রাখুন,
ডাইনোসর যুগের বুদ্ধিজীবী’র থেকে দৈনিক শ’জিবি খরচ করা জেন জি’র কাছে
রাখুন সেই সওয়াল।
স্বাধীনতা বানান কী?
জবাব সেই এক।
ন’য় একার, ত’য় আকার আর বর্গীয় জ’এ দীর্ঘ ঈ।
নেতাজী।
নতুন অভিধান লেখার সময় একটু খেয়াল রাখবেন
ছাপাখানার মালিকেরা।
স্বাধীনতার অন্য বানান লিখলে সেই ডিকশনারি
ছিঁড়ে আমরা বন-ফায়ার করবো,
অথবা তার পাতাদের এতটাই কুচি করবো ,
যে একটি অক্ষরও পড়ার যোগ্য থাকবে না।
শুধু আজ নয়,
আগামীর কোনো প্রজন্মে এটা
বদলাবে না।
মশাইরা,
ওসব উপাধি-টুপাধি কেড়ে নেওয়ার নাটক চলবে না ,
ওসব স্তোকের কথাগুলো বড় চেনা,
ওটুকুতে ঝামেলা মেটাতে এ রাজ্যে কেউ নই রাজি।
আমরা চাই , সকলের সামনে স্বাধীনতা বানান করে পড়ুক ওই পাজি…
ন’য় একার, ত’য় আকার আর বর্গীয় জ’এ দীর্ঘ ঈ।
নেতাজী।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
কলঙ্কিত হাত - কবি সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী।
রচনা ১৭ই আগস্ট ২০২৬।
পরাধীনতার আঁধার চিরে যারা এনেছিল স্নিগ্ধ আলো,
দেশমাতৃকার চরণে যারা সঁপে দিয়েছিল প্রাণ,
আজ তাদেরই পাথরের বুক চূর্ণ করে যারা উল্লাস করে—
তারা কি মানুষ, না কি ইতিহাসের অন্ধ কীট?
বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে নেতাজীর দীপ্ত মুখ,
যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমাদের এই স্বাধিকার—
তাঁদের গায়ে কালির ছিটে, অপমান করার এই নোংরা খেলা,
আসলে তো নিজেদেরই দেউলিয়া সত্তার প্রকাশ।
গালিগালাজে মেতে ওঠা মুখগুলো আজ সভ্যতার লজ্জা।
ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে অন্ধ কিছু উন্মত্ত মানুষ
মূর্তি ভেঙে ভাবছে বুঝি মুছে ফেলা যাবে ইতিহাস।
পাগলামির এই আগুনে কেবল পুড়ছে নিজেদের বিবেক।
যে মাটিতে মহাপুরুষদের রক্ত আর ঘাম মেশানো,
সেখানে অসভ্যতার এই তাণ্ডব কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ইতিহাসের পাতা থেকে তাঁদের নাম মুছে ফেলা অসম্ভব,
কারণ তাঁরা বেঁচে আছেন কোটি মানুষের চেতনায়।
জাগো, এবার প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় এসেছে।
বাংলার এই পবিত্র মাটিতে আর চলতে দেওয়া চলে না
বীরের প্রতিমা ভাঙার এই বেপরোয়া ও অশুভ আস্ফালন।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম উচ্চারিত হলে
কবি স্বপ্না ঘোষ। রচনা ৩০শে জুলাই ২০২৬।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম
উচ্চারিত হলে
মাথা নত হয়ে আসে।
মূলতঃ তার জন্য আমরা
স্বাধীন ভারতে বাস করছি,
একথা অনস্বীকার্য।
তাঁকে নিয়েও এক মূর্খস্য মূর্খ
অসম্মানজনক কথা উচ্চারণ
করার সাহস পেয়েছে।
বিস্ময় জাগে।
ক্রোধ নয়, হাসি পায়।
মূর্খের কাছে মুর্খামি ব্যতিরেকে
ভিন্ন কিছু আশা করাও এক মুর্খামি।
রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন, চৈতন্য হোক।
ভক্তরা একথা নিশ্চয়ই শুনেছে।
তবু ভক্তের দল ক্রমে তমসা হতে
গাঢ়তর তমসায় প্রবিষ্ট হয়ে গোটা
দেশকে তমসাচ্ছন্ন করে তুলছে।
ভারতবাসীর মুক্তির উপায়!
স্মরণ করি কবিগুরুকে,
অন্ধ জনে দেহো আলো'----।
আজও নেতাজির নাম উচ্চারিত হলে
আলোকিত হয়ে ওঠে আকাশের মৃত নক্ষত্র।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
জুতোর মালা - কবি আর্যতীর্থ। রচনা ১৫ই আগস্ট ২০২৬।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছবি আঁকা ডিওয়াইএফআই (DYFI)-এর পতাকায়
জুতো বেঁধে উল্লাস করার ঘটনাটি বিয়ে কবি লিখেছেন...
স্বপ্ন নাকি সত্যি ছিলো , এখন বলা কঠিন হবে,
আগস্ট যখন ঠিক পনেরোয়, ঠিক বারোটা বাজলো সবে,
সামনে দেখি কিশোর কবি, একশো বছর ছুঁলেন যিনি,
নিজেরই এক ছবির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে তিনি
দৃষ্টি অনুসরণ করে কুঁকড়ে গেলাম লজ্জা-ভারে
ছবির গলায় জুতোর মালা… নতুন যুগের ব্যবহারে
কবি কেমন থতমত, এই কী তবে তাঁর আগামী?
সামাল দিতে তড়িঘড়ি সামনে গিয়ে বলি আমি..
একশো-তম জন্মদিনে হঠাৎই চোখ খুললে তুমি,
দেখতে পেলে , জুতোর মালা পরিয়ে গেছে জন্মভূমি..
জন্মভূমি ঠিক কথা না , যদিও যারা পরিয়েছে তা
এই ভূমিরই বৎস তারা, তোমায় পড়ার আদিখ্যেতা
খামোখা নেই তাদের মাঝে, বস্তুত নেই কিছুই পাঠে
হোয়াটসঅ্যাপের ফেক বানানোয় একেকজনা মুনিষ খাটে,
মুনিষ বলতে পড়লো মনে, বিশ বছরেই অস্তে গেলে
বয়ঃসন্ধি থেকে মরণ , যেই কটা সাল কষ্টে পেলে,
বেগার কেন লিখলে যত ঘর্মজীবী লোকের কথা,
চর্মজীবীর সৃষ্টি গলায় পরিয়ে দিলো যেই জনতা
ওদের মাঝে আছেন মানুষ , রোজ চলে যার ঘামের রোজ-এ,
এই গ্রহে তো ধর্ম-মোহে বন্ধু ভোলা যায় সহজে,
কাজেই ভুলে আসলে কে সত্যি বোঝে পেটের জ্বালা,
খিদেই যাদের লগ্নী লাভের, তাদের হয়েই পরান মালা।
অবাক হলাম স্মিত হেসে সেই মালাটাই দেখেন দেখে
যিশু যেমন অমল-স্নেহে প্রেম বিলোলেন ক্রুশ-পেরেকে,
অনেকটা ঠিক তেমন করে, জুতোগুলোয় বোলান দু- হাত
আমার চোখে দুই বাংলার সকল নদীর জল-প্রপাত,
থমকে বলি, কিশোর কবি , পারলে কোরো যুগকে ক্ষমা
জানলা ও দোর বন্ধ করে করেছি খুব আঁধার জমা।
কবি বলেন, এই হাওয়াইএর মালিক ছিলো রিকশ-ওলা,
এখন ভাড়া পায় না বিশেষ, সেই পথে আজ টোটোর চলা
ওই চটি এক যাদবপুরের হকার পরে ঘুরতো ট্রেনে
এখন বেকার, রেল তাড়ালো নতুন রাজার বিধান মেনে
এই যে স্নিকার, এটা আবার টেট-পাশ এক চাকরিহীনের,
সিলিং থেকে নিথর দেহ, খবর তো এই পরশুদিনের,
এ বুটজুতো পেনশনারের, আজও যে লোক পাওনা চেয়ে
ঘুরেই চলে, সেভিংস ও সোল, দুটোই ঘড়ি ফেললো খেয়ে,
সব জুতোরই গল্প আছে, আজব ব্যাপার কী তা জানো,
এসব জুতোর মালিকানায় ধনী মানুষ নেই একজনও।
ছবির থেকে জুতোর মালা গলায় পরেন নিজেই কবি,
হেসে বলেন যা লিখেছি, জেনো এদের জন্য সবই
রাগবো কেন, অজান্তে তো সেই আমারই ধরেছো খেই
একটা ব্যাপার লাগছে খারাপ, বিষণ্ণ সেই সান্ত্বনাতেই ..
ওদের কথা লেখার জন্য এখন কোনো সুকান্ত নেই।
মিলিয়ে গেলেন কিশোর কবি, বলতে গেলাম আর কিছু যেই।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
মূর্তি ভাঙ্গার গান - দুষ্টকবি। (এক শিল্পীর আর্তনাদ, তার সন্তানের জন্য)
রচনা - ৭.৩.২০১৮। দক্ষিণ ত্রিপুরার বেলোনিয়া শহরের কলেজ স্কোয়ারে এবং সাবরুম নামক স্থানে লেনিনের দুটি মূর্তি
ভাঙা হয়। ভারতের তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিজেপি (BJP) এবং তাদের সহযোগী দল আইপিএফটি (IPFT)-এর সমর্থক ও
কর্মীদের বিরুদ্ধে একটি বুলডোজার বা এক্সকাভেটর দিয়ে মূর্তিটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার মূল অভিযোগ ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের
মতে, মূর্তিটি ভাঙার সময় তারা "ভারত মাতা কি জয়" স্লোগান দিচ্ছিল। ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে টানা ২৫ বছরের
বামফ্রন্ট (সিপিআইএম) সরকারের পতন ঘটিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসার ঠিক দুই দিন পর, ৫ই মার্চ ২০১৮ তারিখে এই
ভাঙচুরের ঘটনাটি ঘটে।
লেনিনের মূর্তি হলো ভাঙা।
লাগেনা বাহুর বলে হানা॥
বুলডোজারেই ক্ষেপে চেপে।
এক ঠ্যালা দিতে গেল নেবে॥
শ্মশানের বাগিচায় চুপ।
শ্যামাপ্রসাদের শীলা রূপ॥
তারো নাক-কান গেল কাটা।
দেখ্ দেখ্ কী বুকের পাটা !
মুখে চুন-কালী মেখে দিলে।
চোখের বদলে চোখ গেলে॥
এটা নাকি আর্য্যের ভূমি !
দ্রাবিড় হলেই দোষ গুণি !
তাই, পেরিয়ারও হলো নাক কাটা !
দেশটা কি খুইয়েছে মাথা?
মাথা মোরা খুইয়েছি, যবে
খুন-এ হাত রাঙাদের তাঁবে॥
দেশটিকে তুলে দিয়ে খুব।
দেশভক্তিতে দেই ডুব॥
আমি বলি তাঁহাদের কথা।
যাঁরা মূর্তির জন্মদাতা॥
কত ভাবনা-চিন্তা ভাঙা-গড়া।
কত কল্পনা-মায়াজালে ভরা॥
লালিত মানস প্রতিমাতে।
ধীরে ধীরে প্রাণ আসে তাতে॥
সৃষ্টির কাজ শেষ হলে।
যেন প্রসূতির শিশু আসে কোলে॥
নিজ শিশু এলে মার কোলে।
সাত রাজার ধন বলে॥
সে ধন মাণিক কেউ ছুঁলে।
মায়ের হৃদয় বিঁধে শূলে॥
তেমনই, শিল্পী-কাছে তাঁর
শিল্প, সন্তান-সম মার॥
পেরিয়ার লেনিন শ্যামায়।
ভেঙে কার কি যে আসে যায়?
যায় শুধু শিল্পীর প্রাণ।
প্রাণেরও অধিক সন্তান॥
এ ব্যথা কে বুঝিবে রে হায় !
শেল বিঁধে (দুষ্ট) কবির হিয়ায়॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
কবির মৃত্যু। - কবি আর্যতীর্থ। রচনা ১৩ই আগস্ট ২০২৬।
কবি যখন সেলাম করেন রাজনীতিকে,
কবিতারা ছিটকে পালায় দিগবিদিকে,
কলম যেন ছোঁয়াচ-রোগী’র হুইলচেয়ার
শব্দ চেঁচায় ওর কাছে কেউ আসিসনে আর
কাব্যভ্রমে লিখবে যা সব, তেল গড়াবে,
সময় তাদের সবকটাকেই ফেল করাবে।
কবি যখন শেয়ার করেন রাজনীতি-পোস্ট
পদ্য তখন অতীতকালের স্রেফ স্মৃতি-ঘোস্ট
কথায় তখন ঝলকানি দেয় প্রতীক-স্নেহ,
পাঠক এলেও ভীষণ করে সে সন্দেহ…
প্রচার-কাগজ লিখবে কবি পদ্য ভুলে
সেই ধারণাই ক্রমশ যায় বদ্ধ-মূলে
কবি যখন বর্ণালীতে এক-দু-রঙের
কবিতারা মাড়ায় না পথ সেই ভড়ং-এর
সাবাস বলেন লেখা পড়ে তখন যারা
রাজনীতিতে একই পথের পথিক তাঁরা
সত্যি যারা বেড়ান খুঁজে কবিতাদের
তোষণ দোষে হারিয়ে ফেলেন কবি তাঁদের
অবশ্য ঠিক যায় আসে না কবির এতে
ভালোই লাগে সভাকবির তকমা পেতে
তুষ্ট শাসক পুষ্ট করেন পুরষ্কারে,
নেপথ্যে তাঁর ডান-বাঁহাতের আয়ও বাড়ে,
সেসব সেরা'র শিরোপাদের লেবেল সেঁটে
হাতির মতো পদ্মবনে বেড়ান হেঁটে।
কেবল যখন নিশুত-রাতে একলা কবি,
আয়না বলে, আর কতকাল শূন্য হবি
তোর কলমে বিভাজন আর ঘৃণার ভাষা
কবিতারা আর করে না যাওয়া আসা
কেউ না জানুক, তুই তো জানিস কবিতা কী
মরেই গেলো তোর ভেতরের কবিটা কি?
রাজনীতি যে বাধ্য-বাধক কবি-খাকি,
মারা গেছেন, বুঝতে পারেন কবি তা কি?
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
নেতাজীর মূর্তি ভাঙা---
এখন শুরু রাজ্য জুড়ে!
এ সব দেখেও কিসের ভয়ে
চুপটি করে আছিস ঘরে?
নাম রে পথে বাঙালী সব,
স্বদেশীদের বংশধর।
স্বাধীনতার লড়াই যাঁদের
রক্তে ছিল সর্বোপর!
নামা টেনে বাতুলগুলো,
কঠোর রূপে শিক্ষা দে।
না যেন কেউ আর নেতাজীর
ভুলেও অপমান করে।
বিরুদ্ধতায় ভাসিয়ে দে সব
অপমানের দে জবাব।
ক্ষম হে নেতাজী! সবার জন্য,
দুষ্টকবি চাইছি মাফ্।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
অপমানের দে জবাব - দুষ্টকবি। রচনা - ১৪.৮.২০২৬। আজ বাংলায় ঘটে চলা, নেতাজীকে অপমানের একটি প্রতিবাদ। দুষ্টকবির কণ্ঠে আবৃত্তি শুনুন...
বাংগালি রে বাংগালি
মাখিয়ে মুখে চুনকালি,
চোখ কান সব বন্ধ করে
কাটাস সুখে দিনগুলি?
যার লড়াই আর আত্মত্যাগে
স্বাধীন ভারত মাতার ক্রোড়,
তাঁকেই দিচ্ছে গালাগাল ওরা,
শুনেও মুখে কুলুপ তোর?
ফালতু তারা লোক মোটে নয়,
কেউ এমেলে-এমপি রে,
আমাদেরই ভোটে জীতে
বলছে --- “সুভাষ গুণ্ডা” যে!
বলছে --- “সুভাষ কিসের নেতা?
ক্রিমিনাল আর দেশদ্রোহী!”
এসব শুনেও বাংগালি তুই,
মুখ বুজে যাস্ সব সহি?
একশো বছর ব্রিটিশ-চাটা,
তারাই করছে আজ নাটক।
পালটে দিচ্ছে রাজপথ-নাম,
সুভাষ বোসের নামে সড়ক।
সদনের বাইরে সাংসদরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন
কবি সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। রচনা ১৩ আগস্ট ২০২৬।
সদনের বাইরে সাংসদরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন,
"৫৬ ইঞ্চ কা ছোটা বান্দর,
কব আয়েগা সদনকে অন্দর"।
দেখে তো উনিজির মুখ ভার।
আমরা কেন এরকম লিখতে পারিনা।
আমাদের টিভি আছে, আইটিসেল আছে, ইডি আছে,
সিবিআই আছে, গেঞ্জি আছে, জেনজি আছে,
খালি একটা কবিতা লেখার লোক নেই?
উনিজির পাশে পা টিপে দেবার জন্য
সব সময় ডিম্মিডিয়া মজুদ থাকে।
তারা শুনে তো হাঁ হাঁ করে উঠল।
কেন থাকবেনা হুজুর?
পয়সা দিলে সব পাওয়া যায়,
একটা কবি পাওয়া যাবেনা?
নইলে আপনার স্ক্রিপ্ট লেখে কারা?
উনিজি বললেন, কই এক ব্যাটাকে লাও।
লাও বলতেই কবি হাজির।
উনিজি বললেন, দেখি কেমন লেখো।
এই সময় নিয়ে একটা কাব্য লিখে দেখাও তো।
কবি বলল পয়ারে লিখি স্যার?
জেনজির নাই কাজ, তাই খই ভাজ
আরশোলা চারিদিকে আরশোলা আজ।
৮-৬ ছন্দ শুনে সবাই আহা আহা করে উঠল।
কিন্তু উনিজি ভুরু কুঁচকে বললেন,
এইটা একটু সেমসাইড হয়ে গেলনা?
এইসব থেকেই তো আরশোলার ওড়াউড়িটা শুরু।
এছাড়াও বঙ্গালে সেকু-মাকুদের একটা গানা ছিল
বিদ্রোহ চারিদিকে বিদ্রোহ আজ,
খানিকটা যেন সেইরকম শোনাচ্ছে।
সবাই বলল ঠিক ঠিক।
উনিজি বললেন,
একটা অন্যরকম কিছু লেখো তো বঙ্গাল নিয়ে।
কবি বলল, তাহলে একটা মাত্রাবৃত্ত ট্রাই করব স্যার?
উনিজি বললেন, যা খুশি কর।
কবি অমনি খসখস করে লিখে ফেললঃ
অনন্ত মহারাজ ঠুসেছে নেতাজিকে,
পাবলিকে ক্ষেপে লাট কী ভীষণ
এম্পি হয়েই ব্যাটা দল আলো করে থাক,
কেড়ে নেব বঙ্গবিভূষণ।
শুনে সবাই আবার আহা বলল।
কিন্তু উনিজির খুঁতখুঁতানি যায়না।
বড্ড বেশি কঠিন হয়ে যাচ্ছেনা?
কীরকম টেনে টেনে পড়তে হচ্ছে।
কবি বলল, বঙ্গাল তো সংস্কৃতিপ্রবণ এলাকা হ্যায়,
একটু কঠিন না হলে লোকে খাবেনা।
উনিজি বললেন, ধুর কীসের সংস্কৃতি?
আমরা ওখানে সবাইকে সংস্কারী করে দিয়েছি না?
কবি বলল, তা ঠিক স্যার।
তা হলে ওই নিয়েই একটা লিখি?
একটু সোজা করে?
উনিজি বললেন লেখো।
কবি এবার আবার দু লাইন লিখলঃ
রুদ্র লাল, রুদ্র নীল, রুদ্র এখন গেরুয়া
আগে বিপ্লবী ছিল, এখন কাকতাড়ুয়া।
এরপর আর কিছু বলার থাকেনা।
সবাই বলল কী অসাধারণ, কী অসাধারণ।
কিন্তু উনিজির খুঁতখুঁতানি তাতেও যায়না।
শুনে টুনে বললেন, ভালোই হয়েছে।
কিন্তু কী বলতো, সবই কীরকম অন্যকে নিয়ে লেখা হচ্ছে।
আমাদের ইতিবাচক দিক গুলো তুলে ধরা হচ্ছেনা।
শুনে সবাই হাঁ।
ইতিবাচক ব্যাপার আবার কী।
আমাদের সবই তো ভাঙাভাঙি।
ওরা ওদের আইকনকে বলে পশ্চিমবঙ্গের রূপকার,
আর আমরা নায়ক বানাই তাঁকে
যিনি নাকি বাংলা ভেঙেছেন।
ওরা বলে আইআইটি বানিয়েছি,
আমরা বলি মসজিদ ভেঙেছি।
এর মধ্যে ইতিবাচক আবার কী?
উনিজি বললেন, তা বললে হবে?
আমরা বানিয়েছি তো।
আমাদের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি,
আর ডিম্মিডিয়া।
বানাইনি বললে হবে?
কবি শুনে বলল, ঠিক, ঠিক।
তাহলে ডিম্মিডিয়া নিয়েই কিছু লিখি?
উনিজি চোখ বুজে বললেন, লেখো।
কবি কলম খুলে অনেক ক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর জোরালো গলায় যা বলে উঠল,
তা যেমন জোরালো তেমনই সহজবোধ্যঃ
তিল চাইলে তাল দেব
খবর চাইলে বাল দেব।
শুনে সমবেত শ্রোতাবৃন্দ স্তব্ধবাক।
এ জিনিস তারা এর আগে শোনেনি।
শুধু উনিজির মুখে স্মিতহাস্য। কেমন দিলাম?
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
খাচ্ছি, আরাম করছি, ঘুমাচ্ছি
কবি দিশারী মুখোপাধ্যায়। রচনা ২২শে জুলাই ২০২৬।
খাচ্ছি, আরাম করছি, ঘুমাচ্ছি।
অবিরাম স্বপ্ন দেখছি- আকাশে কুসুম ফুটেছে প্রচুর,
বাতাসে তাদের আতর-প্রবাহ।
খাচ্ছি, আরাম করছি, ঘুমাচ্ছি।
হজম না হওয়ার সমস্যা অবশ্যই আজীবন আছে,
চিন্তা করি না,
একশোএকটা হজমের অষুধ বাজারে পাওয়া যায়।
খাচ্ছি এমন, খাওয়ার নেশা এতটাই বেড়েছে যে,
চোখের মাথা খেয়েছি ,কানের মাথা খেয়েছি,
মুখের ভেতরে নিজেরই জিভ চিবিয়ে খেয়েছি।
কারা যেন কার বাবাকে গালাগাল দিচ্ছে,
তবে তা নিয়ে বাতাসের তাপমাত্রা বাড়েনি।
কার না কার বাবাকে গালাগাল দিচ্ছে, তাতে আমার কী?
যদি আমার বাবাকেও দেয়,
তাও নিশ্চয়ই তার প্রাপ্য ছিল।
উদয়ন গুহ-স্যাররা তো এমনই বলেন।
আষাঢ়-শ্রাবণের মরশুম এখন,
প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে সারাদেশে।
এসময়ে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যায় এখানে ওখানে সেখানে।
জমিয়ে খান, আরাম করুন আর নিশ্চিন্তে ঘুমান।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
হাতে তার মশাল দেখি জ্বলে সুর ও কণ্ঠ - দেবাশিস রায়। সঙ্গীতায়ন - অমিত রায়। কথা - দুষ্ট কবি। বাংলা জ্বলছে
সিডির গান। কলকাতার বিড়লা সভাঘরের এক অনুষ্ঠানে গাইছেন ৩০শে আগস্ট ২০০৯ তারিখে। বাংলা জ্বলছে সিডির গান।
এখানে দেখতে অসুবিধা হলে Watch Video on YouTube ক্লিক করুন...
হাতে তাঁর মশাল দেখি জ্বলে
মশালের আগুন কথা বলে
তার দামাল শিখার তালে
নাচে যত বাংলা মায়ের ছেলে॥
ওঠে তোর বেবাক কণ্ঠ গেয়ে
শুনে তা, লুণ্ঠিত যায় ধেয়ে
বাংলা মায়ের যত মেয়ের
ধরাতলে রক্ত যায় বয়ে॥
ঘুম ভাঙলো বিষাণ শুনে
কালো হাত তখনও জাল বোনে
জমে মেঘ মায়ের ঈশান কোণে
নির্ভিক, বলির প্রহর গোনে॥
মশালের আগুন কথা বলে
তার দামাল শিখার তালে
আগুনে ঝাঁপায় সবাই মিলে
লেখা, জয় হবেই, তাঁদের ভালে॥ম
লজ্জিত - কবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৯ সালের ১৭ মে কলকাতার
বিদ্যাসাগর কলেজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি ভাঙার ঘটনার প্রতিবাদে
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফেসবুকে এই কবিতাটি পোস্ট করেছিলেন।
ঐতিহ্য নিয়ে খেলছ খেলা
বাংলাকে নিয়ে খেলো না,
সংস্কৃতির জাগরণ বাংলার মুক্তি
এত অবজ্ঞা করো না।
তোমাদের আছে অর্থের জোর
আর আমাদের প্রাণ-ভরা শ্রদ্ধা
বিদ্যার সাগর, আমরা লজ্জিত
ক্ষমা চাওয়ার নেই স্পর্ধা।
পাথর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলেই
চেতনা কি কখনো মরে?
শিক্ষা-দীক্ষার আলো যে জ্বেলেছ
তা রবে সবার ঘরে ঘরে।
বাংলার মাটি, বাংলার জল
মনীষীদের অবদান,
বর্বরোচিত এই হিংসার আগে
ছিল কি তোমার কোনো জ্ঞান?
ধিক্কার জানাই এই কুৎসিত কাজকে,
বাঙালির মাথা আজ নত,
তোমার বিদ্যাবত্তা চিরকাল রবে
ইতিহাসে তুমি অক্ষয়, চির-উন্নত।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
লেনিনের মূর্তি ভাঙা নিয়ে - কবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৮ সালে ত্রিপুরায় বিধানসভা নির্বাচনের পর
লেনিনের মূর্তি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে লেখা কবিতা।
মূর্তি ভাঙছ ভেঙে ফেলো,
কিন্তু সেই মানুষটাকে কী করবে—
যে সকালবেলা না খেতে পেয়ে কারখানায় যায়,
আর বিকেলের আলোয় ঘরে ফেরে এক মুঠো স্বপ্ন নিয়ে?
লেনিন তো কোনো পাথরের নাম নয়,
লেনিন তো কোনো ব্রোঞ্জের শরীর নয়,
লেনিন একটা জেদের নাম,
লেনিন একটা লড়াইয়ের নাম।
তোমরা বুলডোজার এনেছ? নিয়ে এসো,
তোমরা দড়ি বেঁধেছ গলায়? বেঁধে দাও,
একটা মূর্তি মাটিতে পড়ে গেলেই কি
একটা দর্শন ধুলোয় মিশে যায়?
যারা আজ মূর্তির মাথায় লাথি মারছে,
তারা আসলে ভয় পেয়েছে।
তারা ভয় পেয়েছে সেই চোখ দুটোকে,
যা একশো বছর ধরে শোষিতের বুকে সাহস জোগায়।
ইতিহাসকে তোমরা হাতুড়ি দিয়ে বদলাতে পারবে না,
কারণ হাতুড়িটা যার হাতে—
সে-ও একদিন লেনিনের তৈরি করা
অধিকারের দাবিতেই পথ চলতে শিখবে।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
হাতে তার মশাল জ্বলে দেখে
চমকে দাঁড়ায় দিকে দিকে
বাংলার এ-রূপ ছটা দেখে
ধন্য, দুষ্টকবি লিখে॥
হাতে তাঁর মশাল দেখি জ্বলে
মশালের আগুন কথা বলে॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
স্বাধীনতা দিবস - কবি চন্দ্রিমা গুপ্ত। রচনা ১৫ই আগস্ট ২০২৬।
তেরঙা পতাকা উড়ছে এখানে ওখানে
জয়হিন্দ স্লোগানও,
স্বাধীনতা দিবস পালনে
উৎসবের সাড়া-
সদ্য যুবক প্রযুক্তির ব্যবহারে পটু
ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামায় না তত;
স্বাধীনতা দিবস ওর কাছে যেন উৎসব মাত্র
পথে ঘাটে ভিড় অকারণ বিড়ম্বনা!
কে যেন বলেছিল "তোমরা রক্ত দাও
আমি স্বাধীনতা দেব" এসব ভাবাবেগ!
ছেলেটি বলেই বসল আচমকা।
বৃদ্ধ চমকে উঠলো, একই বাসে সহযাত্রী দুজন।
তুমি স্বাধীন দেশে জন্মেছ ,
ব্যক্তি স্বাধীনতা বোঝো কেবল!
স্বাধীনতা অর্জিত, সহজে পাওয়া নয়
এমন ভাবে ভাবতে শেখোনি তাই
"যুবশক্তির আত্মপ্রকাশ পরাধীন ভারতের কথা।"
বিপ্লব রক্তাক্ত যুগের কথা-
শৃঙ্খলমুক্ত ভারতের অতীত।
ছেলেটি বিরক্ত, সিট থেকে উঠে দাঁড়াল
বৃদ্ধ তখন ভাবছে আত্মবলিদানের ইতিহাস।
কত তরতাজা প্রাণ গেছে নিঃস্বার্থ লড়াইয়ে
অত্যাচারের শিকার ওরা মৃত্যুর মুখোমুখি
রক্তের দাগ যেন লেগে এখনও
স্বাধীন ভারতের পতাকায়-
নেতাজী সুভাষ বসু উজ্জ্বল নক্ষত্র
শৃঙ্খলমুক্ত ভারতের কান্ডারী।
আজকের যুবা মন বিক্ষিপ্ত
মুক্তমনা হবে ওরাও-
বৃদ্ধ মনে মনে প্রণাম জানালো
সেদিনের যুবা শক্তিকে
স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য কোথাও পথ হারিয়েছে
মুক্তির সন্ধানে।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
আহ্বান কণ্ঠ ও সঙ্গীতায়ন - অমিত রায়। সুর - দেবাশিস রায়। কথা - দুষ্ট কবি।
বাংলা জ্বলছে সিডির গান। কলকাতার বিড়লা সভাঘরের এক অনুষ্ঠানে গাইছেন ৩০শে আগস্ট ২০০৯ তারিখে।
এখানে দেখতে অসুবিধা হলে Watch Video on YouTube ক্লিক করুন...
অধীনতার আঁধার শেষে স্বাধীনতার আলো দেখেছি।
স্বাধীন দেশের মুক্ত বাতাসে ঋদ্ধ হয়েছি॥
দেখেছি স্বাধীন ভারত মাতার কোলে অবহেলা, ঘৃণা।
দেখেছি অধিকার কেড়ে নেওয়া বিষধর শত ফণা॥
দেখেছি কত বিদ্রোহ দেশে বহে আনে নব আশা।
তারপর সেই বিদ্রোহীদের পাঁকে ডুবে যাওয়া দশা॥
সদাই চেয়েছি পিছিয়ে পড়া মানুষের কথা বলার।
চেতনা-আলোয় তাদের নিয়ে এক সাথে পথ চলার॥
আজকে সাঁঝের শঙ্খ ধ্বনিতে শুনি বিদ্রোহ ডাক।
আহ্বান করি, সুখ নীঢ় ছাড়ি ছড়াও দ্রোহের আগ॥
দুষ্ট কবির ধন্য জীবন লিখে এই আহ্বাণ।
বাংলা জ্ব'লে, অত্যাচারের হোক আজ অবসান॥
লেখা, জয় হবেই, তাঁদের ভালে॥ম
বাঙালি এখন অন্ধ বধির পক্ষাঘাতকাতর
কবি ব্রতী মুখোপাধ্যায়। রচনা ১৩ই আগস্ট ২০২৬।
বাঙালি এখন অন্ধ বধির পক্ষাঘাতকাতর,
বাঙালি এখন জরাগ্রস্থ
লাজলজ্জাহীন
বাঙালি এখন
সুভাষচন্দ্রকে গুন্ডাদের সর্দার বলছে কেউ,
রবিঠাকুর থেকে নজরুল ইসলাম হয়ে অমর্ত্য সেন
সবাইকেই হেনস্থা করছে
প্রত্যেকদিন
বাঙালির ধমনীতে
এখন আর উষ্ণ রক্ত বইছে না
বাঙালির ধমনীতে এখন আর
ক্ষুদিরাম সূর্যসেন বাঘা যতীনের রক্ত বইছে না
বিনয় বাদল দীনেশদের রক্ত বইছে না
বাঙালি মেয়েদের অত্যন্ত নোংরাভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে
দেখেও কেমন কারো কিছুই এসে যায় না
বাঙালি সবচেয়ে অশুভশক্তির পায়ের কাছে
হাঁটু মুড়ে বসে পড়ছে এই প্রথম
বাঙালির ইতিহাসে এই প্রথম
পশ্চিমবঙ্গে কি ছেলেমেয়েরা নেই?
পারছে না অনির্দিষ্টকালের জন্যে
পশ্চিমবঙ্গ স্তব্ধ করে দিতে?
বাঙালি এখন অন্ধ বধির পক্ষাঘাতকাতর
বাঙালি এখন জরাগ্রস্থ
লাজলজ্জাহীন
বাঙালি এখন
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ মানুষ
কবি ব্রতী মুখোপাধ্যায়। রচনা ১২ই আগস্ট ২০২৬।
পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ মানুষ
ভোট দিয়ে শুভেন্দুদের জিতিয়ে এনেছে
এমন কথা সত্যি না
বেশিরভাগ মানুষ জানে
এমন কথা সত্যি না।
শুভেন্দুদের জিতিয়ে আনায়
রংনির্বিশেষে একটা অংশ খুশি হয়েছে,
অন্তত প্রথম প্রথম যার পর নেই খুশি হয়েছে,
খুশিতে হরির লুটের বাতাসা ছড়িয়েছে,
কোপ্তা-কালিয়া আর পিজ্জা, পিজ্জা আর বিরিয়ানি,
পিজ্জা আর বিরিয়ানি আর মাটনের চাপ
প্রথম প্রথম বেশ সাঁটিয়েছে।
মমতা ব্যানার্জির দুঃশাসনের অবসানে
তাহাদিগের ঘরে ঘরে এসির বাতাস,
কিন্তু অল্পদিনেই উপলব্ধি ফ্রাইং প্যান টু ফায়ার।
যা বলছিলাম, শুভেন্দুদের জিতিয়েছে গনেশ কুমার
যাকে আইনিভাবে
ন্যায় হোক অন্যায় হোক যা ইচ্ছে করবার
অধিকার আর ইমিউনিটি দেয়া হয়েছে,
সে SIR থেকে শুরু করে যা ইচ্ছে তাই করেওছে,
জিতিয়েছে
মানুষজনের ওপর আড়াই লক্ষ কেন্দ্রীয় বাহিনীর
প্রো-অ্যাকটিব চাপ,
আর এইরকম অনেক অনেক কিছু।
শুভেন্দুরা ক্ষমতাসীন হয়েই বুলডোজার নামিয়েছে,
হাজার হাজার মানুষ রাতারাতি বেআইনিভাবে বেরোজগার
হয়েছে, হাজার হাজার মানুষের ভিটে বলে কিছু ছিল যা এখন
আর নেই, অনেকদিন পরে পশ্চিমবঙ্গে এনকাউন্টার হয়েছে,
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গেরুয়া গুন্ডাদের তাণ্ডব শুরু হয়েছে,
সকালে জমা বিকেলে খরচের তত্ত্ব শুনে
কারো কারো উল্লাস গোপন নেই,
নেতাজি সুভাষচন্দ্র গুণ্ডাদের সর্দার টাইটেল পেয়েছে
আর তাতে বাঙালিজনে খুব একটা এসে গেছে মনে হচ্ছে না,
এইরকম অনেক।
তবে যা বলছিলাম
পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ মানুষ
ভোট দিয়ে শুভেন্দুদের জিতিয়ে এনেছে,
এমন কথা সত্যি না।
পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭২এর পর
ভোটের নামে আরও একটি প্রহসন দেখলাম,
নাহলে টিএমসি হয়ত জিততে পারত না
বা জিতলেও অল্প মেজরিটিতে জিতত,
নাহলে বামপন্থীরাও হয়ত বেশ কিছু আসন পেতে পারত।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
ওরা যখন লেনিনের মূর্তি ভেঙেছিল
কবি তনিমা হাজরা। রচনা ১৪ই আগস্ট ২০২৬।
ওরা যখন লেনিনের মূর্তি ভেঙেছিল
তখন তুমি বলেছিলে, ভাঙুক গে আমার কী
আমি তো আর বামপন্থী নই যে প্রতিবাদ করব
ওরা যখন সফদর হাশমীর স্মারক ভেঙেছিল
তখন তুমি বলেছিলে, ভাঙুক গে, আমার কী
আমি তো আর বামপন্থী নই যে প্রতিবাদ করব
ওরা যখন রাহুল সংস্কৃত্যায়নের মূর্তি ভেঙেছিল
তখনও তুমি বলেছিলে, ভাঙুক গে আমার কী
আমি তো আর বামপন্থী নই যে প্রতিবাদ করব
এবার ওরা প্রথমে সুভাষচন্দ্রকে গুণ্ডা বল্ল
তুমি চুপ করে রইলে,
দেশদ্রোহী বল্ল
তুমি চুপ করে রইলে
কারণ তুমি তো আর বামপন্থী নও যে প্রতিবাদ করবে।
আজ ওরা সুভাসবোসের মূর্তির হাত ভাঙলো
তুমি নিশ্চয়ই প্রতিবাদ করবে না,
কারণ এখন তুমি ধৃতরাষ্ট্র আর তোমার বাবার নাম শ্যামাপ্রসাদ।
তোমার কাছে " আজাদি" একটি দেশদ্রোহী শব্দ
তুমি তো আর বামপন্থীদের মতো প্রতিবাদী কিংবা দেশদ্রোহী নও যে
"আজাদী" "আজাদী" বলে চিৎকার করে মার খাবে।
তুমি তো আর বামপন্থী নও যে বুল্ডোজার কারুর দোকান কিংবা ঘর
ভাঙতে এলে বুক পেতে দাঁড়িয়ে লাঠির সামনে আঘাতের দায় নেবে।
সুতরাং তুমি অপেক্ষা করে থাকো কবে আঘাত তোমার দুয়ারে আসবে
কারণ তুমি জানো তুমি ভোট না দিলেও
কোভিডের সময় বামপন্থীরাই তোমার জন্য অক্সিজেন, ওষুধ আর খাবার
নিয়ে গিয়েছিল।
কারণ তুমি জানো মৌমিতা দেবনাথের বডি যাতে সঠিকভাবে পোস্ট
মর্টেম হয় সেজন্য বামপন্থীরাই গাড়ি আটকেছিল।
তুমি ৩৪ বছর নিয়ে Whatsapp University র সিলেবাস ছড়িয়ে যাও
প্রাণভরে আর তোমার সুভাসবোস, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগর,
রামমোহন হতাশ হয়ে তোমার এই অধঃপাত দেখুন কারণ তাঁদের
অপমান তোমাকে তো আর বিচলিত করে না। তাঁরা তোমার কাছে
নেহাৎই জন্মদিন মৃত্যুদিন পালনের আমোদে গড়িয়ে পড়ার একটি
অজুহাত মাত্র।
দু'বছর আগে আজকের দিনে আমরা রাত দখল করেছিলাম।
এখন রাজ্যজুড়ে রাতই আমাদের দখল করেছে।
নেতাজি দেশদ্রোহী হয়েছেন, গুন্ডা হয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা ইস্কনের গেরুয়াধারীর উপহাসের ধৃষ্টতা
হয়েছে।
এখন গুন্ডারা সাধু হয়েছেন, দেশপ্রেমিকরা গুন্ডা হয়েছেন কারণ
আমরা সবাই সানন্দে ধৃতরাষ্ট্র জন্ম নিয়ে মহানন্দে আগামীকাল
"হর ঘর তিরঙ্গা"র উৎসবে মেতে উঠবো স্থির করেছি।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
তোমার নামের রাস্তা খুঁজি নাকো আর
কবি তৈমুর খান। রচনা ১৪ই অগাস্ট ২০২৬। এই বাংলাতেই(!) নেতাজীর
নামের রাস্তা বদলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নামের করে দেওয়ার পরে রচিত।
তোমার নামের রাস্তা খুঁজি নাকো আর
এখন তোমার নামের রাস্তা হৃদয়ে আমার।
সব আলো নিভে যাক একে একে
হৃদয় আজ উদ্ভাসিত তোমার সূর্যের আলোকে।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
খ্যাপা ষাঁঢ় ঘোরে তেড়ে ফুঁড়ে - কণ্ঠ ও সুর - দেবাশিস রায়। সঙ্গীতায়ন - তাপস পাল, শঙ্খ-সবুজ।
কথা - দুষ্ট কবি। ব“ভাঙো বাস্তিল” সিডির গান। দেবাশিস রায়, কলকাতার বিড়লা সভাঘরের এক অনুষ্ঠানে গাইছেন
৩০শে অগাস্ট ২০০৯ তারিখে। এখানে দেখতে অসুবিধা হলে Watch Video on YouTube ক্লিক করুন...
ক্ষ্যাপা ষাঁড় ঘোরে তেড়ে ফুঁড়ে,
জনপথ অলি গলি কাঁপিয়ে।
সরাসরি দাঁড়া সিং ধরে,
এই বেলা পথে নাম ঝাঁপিয়ে।
চুপ ক'রে ঘরে বসে থেকে
লাভ নেই, তুই পার পাবি না।
যদি বেড়া ভেঙে ঘরে এসে ঢোকে,
তুই পালাবার পথ পাবি না।
যাঁরা পথে নেমে রোখে এই ষাঁড়,
যাঁর, আগুন ঠেকাতে পোড়ে ছাতি,
তাঁদের গায়ের আঁচে কতকাল আর
তুই রাঁধবি চড়ুইভাতি?
তোর ঘর-সংসার, পরিবার?
তোর দেশ, পরিবেশ, পারাবার?
কে নেবে ভার, তাকে বাঁচাবার?
তোর নেই কি কোনোই দায়ভার?
কালের কবি ব'লে যায় ---
যদি চাস্ এই দিন বদলায়,
তবে, দ্বার খুলে পথে নেমে আয়!
তবে, মুখ ফুটে বল --- "আর নয়"!
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
যুগে যুগে শাসকেরা
কবি মনিরুল। রচনা ৩রা অগাস্ট ২০২৪।
যুগে যুগে শাসকেরা,
দিয়ে যায় মিছে আশ্বাস...
খেটে-খাওয়া মানুষেরা,
ঠকে, করে তারে বিশ্বাস...
কবে কোথা শাসকেরা,
রাখিয়াছে তার কথা...?
পক্ষেতে আছে কতজন,
শুধু গনিয়াছে মাথা...
পক্ষেতে যদি পড়ে কম,
আছে কিনিবারে টাকা...
তাতে যদি পড়ে কম,
আছে বহু পথ বাঁকা...
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
কেউ একজন গালি দিচ্ছে? দিক না
কবি সঞ্জয় সাহা। রচনা ১২ অগাস্ট ২০২৬।
কেউ একজন গালি দিচ্ছে? দিক না।
ইতিহাসের ওপর কি গালি ছিটিয়ে
মুছে ফেলা যায় সূর্যের দাগ?
যে মানুষটা একা একা হেঁটে গেল আগুনের ভেতর দিয়ে,
যার পিতার তেজ ধমনীতে এসে বাজাল রণশিঙা,
তাকে তুমি গালি দেবে?
তোমার অত্ত বড় মুখ?
তোমার এত ছোট চোখ?
আমরা যারা এই মাটিকে প্রণাম করি,
আমরা যারা দেশের নামে বুকের ভেতর রক্ত ভরি—
আমরা জানি,
কোনটা পিত্তি আর কোনটা বীরত্ব।
আজাদ হিন্দ তো কোনো বানানো গল্প নয়,
বুকের ভেতর ফুটে থাকা এক রক্তজবা।
যে যা-ই বলুক,
যে বাতাসেই উঠুক বিষের ধোঁয়া—
নেতাজী আছেন।
আমার রাতে জোছনা আলো, তিনি আমার ত্বপ্ত অরুণ
তিনি কোটি কোটি তরুণের ত্যাগের রক্ততিলক ।
স্বঘোষিত মহারাজের খাটো কথার প্রলাপ ছাড়িয়ে
এখনও তোমার আমার হৃদয়ে বেজে চলেছে সেই এক কথা:
জয় হিন্দ।
জয় হিন্দ।
জয় হিন্দ।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
বাংলা জ্বলছে রচনা - ২.৫.২০০৭। কণ্ঠ - প্রবীর বল ও অমিত রায়। সুর - দেবাশিস রায়। সঙ্গীতায়ন - অমিত রায়।
কথা - দুষ্ট কবি।
বাংলা জ্বলছে, তাই জ্বলুক
আরও জ্বলুক, আরও জ্বলুক জ্বলুক।
নির্ঝঞ্ঝাটে ভদ্র বাবুরা
এখনও সুখ নিদ্রায়
ভীত, পথে নেমে হাঁটতে
বা শঙ্কিত নানা দ্বিধায়---
তাই জ্বলুক, বাংলা জ্বলুক
আরও জ্বলুক, আরও জ্বলুক জ্বলুক।
বাঁচন মরণ লড়াই যখন
কড়া নাড়ে এসে দরজায়
অতি শিক্ষিত বাবুরা তখনও
শান্তির পথ হাতরায়---
তাই জ্বলুক, বাংলা জ্বলুক
আরও জ্বলুক, আরও জ্বলুক জ্বলুক।
শাসক যখন শান্তিকে করে
পরিহাসে পরিনত
অশান্তিকেই মন্ত্র মেনে
শোষণেরে কও দূর হটো---
তাই জ্বলুক, বাংলা জ্বলুক
আরও জ্বলুক, আরও জ্বলুক জ্বলুক।
দুষ্ট কবির লেখনির খোঁচে
মনের গহন জ্বলে উঠুক
সুখ-শান্তির ভ্রমে আছে যারা
কালের ডাকে পথে নামুক---
তাই জ্বলুক, বাংলা জ্বলুক
আরও জ্বলুক, আরও জ্বলুক জ্বলুক॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
অজেয় লিপি - কবি অর্হণ জানা। রচনা ১২ অগাস্ট ২০২৬।
কবি বের্টোল্ট্ ব্রেখ্ট্ এর The Unconquerable Inscription (1934) এর অনুবাদ।
প্রথম মহাবিশ্বযুদ্ধের দিনগুলোয়
সান কার্লোতে ইতালীর জেলের এক খুপরিতে
কিছু সৈন্য, মাতাল আর চোর যেখানে বন্দি
সেখানে এক সোশ্যালিস্ট সৈন্য কপিং পেন্সিলে
একদিন আঁচড় কাটল দেওয়ালে:
দীর্ঘজীবী হোন লেনিন!
কিছুটা ওপরে ধূসর খুপরিতে, আবছা কিন্তু বিশাল হরফে
কথাগুলি লেখা
জেলারসাহেব দেখলেন, দেখে এক বালতি চুনসুদ্ধ
পাঠালেন এক মিস্তিরি
ছোটো একটা বুরুশে সে চুনকাম করে দিল ওই
ভয়ঙ্কর লিপি
কিন্তু সে তো কেবল অক্ষরগুলির ওপরেই বুলিয়েছিল
চুন
তাই এখনও খুপরির ওপরদিকে চুনে জ্বলজ্বল করছে:
দীর্ঘজীবী হোন লেনিন!
তারপর আরেকজন এল বড়োসড়ো এক বুরুশ নিয়ে
গোটা দেওয়ালটাতে বুলিয়ে দিল চুন
ফলে বেশ কয়েকঘণ্টা দেখা গেল না কিছু, তারপর যেই
সকাল হল
চুন শুকিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই ফুটে উঠল সেই লিপি
আবার:
দীর্ঘজীবী হোন লেনিন!
জেলারমশাই এবার এক খোদাইকার পাঠালেন
হাতে তার ছুরি
ছুরি দিয়ে সে কেটে-কেটে তুলে ফেলল একের পর এক অক্ষর
ঘণ্টাখানেক ধরে
কাজ যখন শেষ হল, খানিকটা ওপরে খুপরির মধ্যে রইল কেবল
বর্ণহীন
কিন্তু দেওয়ালে গভীর করে খুঁদে তোলা অজেয় সেই
লিপি:
দীর্ঘজীবী হোন লেনিন!
সৈনিকটা এবার বলে ওঠে:
এবার তবে দেওয়ালটাকেই ভাঙো!
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
অবমাননা - কবি চন্দ্রিমা গুপ্ত। রচনা ২৩শে আগস্ট ২০২৬।
নীতিবোধহীন করুণ সময় আজ-
নেতাজির মূর্তি ভাঙলো নির্মম আঘাতে
রাতের অন্ধকারে অসম্মাণিত দেশবরেণ্য!
স্বাধীনতা দিবসের রাতে ভাঙচুর-
বিরসা মুন্ডা,বি আর আম্বেদকরের মূর্তির
একাংশ ধুলোয় লুণ্ঠিত!
ভগবানপুর ভূপতিনগর থানা এলাকায়
মণীষীদের মূর্তি ভাঙনে সন্ত্রাসী নিষ্ঠুরতা।
অনাচার চরম পর্যায়ে,
অপসংস্কৃতি নজিরবিহীন।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
এ শুধু ভাঙার খেলা - কবি মনমী ঘোষ।
রচনা ২৩শে আগস্ট ২০২৬।
হাতুড়ির অভিঘাতে
নেতাজির হাত থেকে
খসে পড়ে এক টুকরো আকাশ,
ইতিহাসের পাঁজরে
জেগে থাকে নীল ক্ষত।
ভোলগা থেকে গঙ্গা—
ধুলোয় মিশে যায় পদচিহ্ন,
রাহুল সাংকৃত্যায়ন
মাটির অন্তঃস্মৃতিতে
অনুচ্চারিত জিজ্ঞাসা
লেনিনের পাথরচোখে
ক্ষত নয়—
অন্ধকার ভেদ করা
এক মুঠো অগ্নিবীজ।
পাথর ভাঙে,
মূর্তি ভাঙে,
অক্ষর ভাঙে না—
ধুলোর ভিতর থেকে
আগামীকাল কুড়িয়ে নেয়
প্রশ্ন-
স্বপ্ন-
অসমাপ্ত প্রতিবাদ-
অন্তঃসলিলা বিশ্বাস-পরাজয়
প্রতিবাদী সময়ও
নিরন্তর স্পন্দিত।
জনস্মৃতির অলিন্দে
অনুরণন
প্রজন্মের কন্ঠে।
ঃঃঃঃঃঃঃঃ
প্রলয়বেলা - কবি সৌমাল্য মুখোপাধ্যায়।
এই তো প্রলয়বেলা— সূর্য ফুরিয়েছে কবে—
ঊষর ও সমতল পেরিয়ে
ঊষর ও পাপ পেরিয়ে
ঊষর ও গার্হস্থ্য পেরিয়ে
ওরা আমাদের কৃতি ও গঠন ভেঙে দিয়ে গেল—
তারপর কান্না
তারপর প্রক্ষালন
প্রলয়বেলার আলো মুখে নিয়ে তুমি কাঁদছো ;
যদিও আমি নিশ্চিত
ওরা জানে না—
আকার ভেঙে দিলে, সহস্র বৎসর
এই দেশে,
নিরাকার জেগে থাকে
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
মূর্তি সংস্কার - কবি সৌমেন্দ্র মোহন পাঁজা।
আট দশকের দ্বারপ্রান্তে স্বাধীনতা,
ভুলেছে কত রক্তের বিনিময়ে শৃঙ্খল মুক্তি ;
এখন দাসত্বের কারখানা থেকে ফিরে
কষ্ট-কল্পনার অর্ধ-সত্য ইতিহাস দিচ্ছে উঁকি।
কবন্ধের উন্মাদ নৃত্য দেখছে উপমহাদেশ,
এসব সহসা নয়, পূর্বপরিকল্পিত সংঘটিত দ্বেষ।
ভাঙছে নেতাজি,ভাঙছে সংকৃত্যায়ন,
গান্ধী ভাঙছে, ভাঙছে বিদ্যাসাগর,
বীরসা ভাঙছে, ভাঙছে মুজিবের রক্তেধোয়া ঘর।
মৌলবাদের একই রূপ দেশে-দেশান্তরে-
এমব্লেমের অর্থ বোঝেনা, করছে পদাঘাত!
কোপার্নিকাসকেও চিনতে চায়নি নির্বোধ জল্লাদ।
নতুন ইতিহাস,কালো অধ্যায় লেখা হবে ব'লে
নিজেদেরই বিনাশের নবদ্বার নিমেষে খোলে।
ঐতিহাসিক গ্রাফিতি মুছছে নির্লজ্জ হুংকারে,
ঘনিয়ে এলে লুপ্তিকাল শ্বাপদ তীব্র গর্জন ক'রে।
গত এক দশকে দেখল দেশ মহামানবের চূড়ান্ত অপমান,
তাই পথে নেমেছে সচেতন ছাত্র-কৃষক ফেরাতে সম্মান।
হৃদয়ের মূর্তি অক্ষয় আছে, পাথরে জমেছে দাগ...
মনীষীদের আদর্শ বুকে জাগছে স্বর: অশিক্ষা ও বিকার নিপাত যাক।
তমসার দিনে পরাক্রমীদের বিরুদ্ধে জাগো প্রতিস্পর্ধা,
বাণীর আলোয় সত্য রূপে পায়ে পায়ে চলো;
শিকড়ে পড়েছে টান, ঔদ্ধত্য ছাড়াচ্ছে সীমা,
মহাপ্রাণদের আশিস নিয়ে দস্যুদের দ্রুত চলে যেতে বলো।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ