কবি বিজয় গুপ্ত-র কাব্য
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
শঙ্কুর (শঙ্কর) গারুড়ী ও মনসা

( ১ )
সাজিয়া গোয়ালিনী বেশ                    চলিল শঙ্কুর দেশ
কপটে বধিতে ধন্বন্তরী |
ছন্দে বন্ধে বান্ধে খোপা               পৃষ্ঠেতে পাটের থোপা
শ্রবণে সোনার মদন-কড়ি ||
স্বর্ণ অলঙ্কার গায়                            চলন্ত নূপুর পায়
উল্লাসে পরিল পাটের সাড়ী |...
চন্দন লেপিল অঙ্গে                      কপালে তিলক রঙ্গে
মুখে পাণ করে খলখলে |
মাণিক্য দোসর জ্যোতি                গলায় শোভিছে পাতি
দু'নয়ন ভরিল কাজলে ||
পদ্মাবতী কুতূহলে                            খঞ্জন-গমনে চলে
যথা ওঝা ধন্বন্তরী থাকে |
দাঁড়াইয়া ওঝার পাশে                      আড় নয়নে হাসে
দধি লবা ঘন ঘন ডাকে ||


( ২ )
পদ্মা কিসেরে সাজাইলা বিষ-দধি |
আমারে মারিতে হেন                 তোমার মনে লয় কেন
কেবা তোরে দিল হেন বুদ্ধি ||
গোটা কত নাগ পোষ                 তে কারণে লোকে ঘোষ
বিবাদে আগল বিষহরী |
হেন বুদ্ধি কেবা করে                    লোকে দোষে তাহারে
আমি বিষ খাইলে না মরি ||
কি কহিব আপন কথা                      মহাজ্ঞন দিল নেতা
তে কারণে অজর অমর |
সাপ খাম বিষ পেম                        চারি যুগে মুঞি জীম
নাহিক আমার যমে ডর ||
মুঞি ধোপাঝির শিষ                      ঝারি ভরি পেম বিষ
তক্ষক চিবাইতে পারি দন্তে |
ধন্বন্তরী কথা কয়                            পদ্মার মনেতে লয়
বিজয় গুপ্ত রচিল সানন্দে ||


.                                                  ****************                                         
উপরে


মিলনসাগর
পদ্মাপুরাণ, বিজয় গুপ্ত


.                
ছয় পুত্র বধ

মহাজ্ঞান গেল চান্দর টুটিলেক বল |
অধিক পদ্মার সঙ্গে বাধিলেক কোন্দল ||
রাত্রিদিন গালি পাড়ে কোপ অহঙ্কারে |
কোপ মনে বেড়ায় চান্দ সর্প পেলে মারে ||
রাজ্যের ঠাকুর চান্দ পথে দিল থানা |
চম্পক নগর মধ্যে পূজা কর্ ল মানা ||
মহাদেবের কন্যা সবে করে ভয় |
আপন মুখে গালি পাড়ে যত মনে লয় ||
অভিমানে বলে পদ্মা কি করি উপায় |
লঘুর ভত্সনা আর সহননা যায় |
দেবতা মনুষ্য বাদ প্রাণে কত সয় |
কোন মতে করিব চান্দর বংশ ক্ষয় ||
মনে মনে চিন্তে পদ্মা হইল বিমরিষ |
ভাবিতে চিন্তিতে গেল দিন দশ বিশ ||
যে থাকে দৈবের গতি সে কথা না লড়ে |
চান্দর বংশ নাশ হেতু যেন দৈব পড়ে ||
ছোটজন নহে চান্দ রাজভোগে ভোলা |
লক্ষ লক্ষ লোক যার আছে পাঠশালা ||
নানা দেশে পাঠ সব নানা দেশে ঘর |
সোমাই পন্ডিত পাঠ পড়ায় নিরন্তর ||
কেহ কাব্য শাস্ত্র পড়ে কেহ ব্যাকরণ |
সব হইতে যোগ্য চান্দর পুত্র ছয় জন ||
মহাদেবের বরে বাড়ে সুন্দর কুমার |
রূপ গুণ বয়সেতে সেরা সবাকার ||
চান্দর মহাজ্ঞান হরিয়া পদ্মাবতী |
হরিষে মন্ত্রণা করে নেতার সংহতি ||
এখনে বধিব চান্দর ছয় কুমার |
তবে সে হয় চান্দর বাদের উদ্ধার ||
মোরে বুদ্ধি বল নেতা কি হবে এখন |
কেমনে বধিব চান্দর ছয় নন্দন  ||
নেতা বলে পদ্মাবতী শুনহ বচন |
এক কথা কহি আমি তাহে দাও মন ||
প্রকারে বধিতে বিলম্ব বড় হয় |
বিষ অন্নে ছয় জনে করহ সংশয় ||
গোবিন্দমাধব রাম শিব বিদ্যাধর |
হরিসাধু আদিকবি ছয় সহোদর ||
একদিন ছয় ভাই পড়ে পাঠশালা |
পড়িতে পড়িতে হইল দুই প্রহর বেলা ||
ক্ষুধায় বিকল সোমাই অধিক বাড়ে আশা |
শিষ্যে শিষ্যে পরিহাসে হইল জিজ্ঞাসা ||
এখন হইল সময় ভুঞ্জিবার তরে |
কোন জনে কেমনে ভুঞ্জিবা গেলে ঘরে ||
কেহ বলে ঘরে গেলে খাব নানা রস |
কেহ বলে ভুঞ্জিব ব্যঞ্জন আট দশ ||
কেহ বলে খাইব যে আর শেষ বেলা |
কেহ বলে ক্ষিধার টানে খাই চিড়া কলা ||
কেহ বলে দুঋখে আমি ঠাঁই খুঁজি |
কেহ বলে প্রবাসী আমি এক সন্ধ্যা ভুঞ্জি ||
গোবর্দ্ধন নামে শিষ্য অভয়া তার মাতা |
হাসিতে হাসিতে কহে আপনার কথা ||
আমি অতি দরিদ্র মোর জীবন ধিক্ |
ঘরে ভাত নাই মোর মায় মাগে ভিক্ ||
দৈবের প্রতাপে সে মাগিলে ভিক্ষা পায় |
আমি খাইলে যাহা থাকে মায় তাহা খায় ||
আমার বিলম্ব দেখি মায়ের দুঃখ লাগে |
বিকালে রান্ধিয়া ভাত থুয়ে থাকে পাকে ||
যত্ন করি রাখে ভাত পাকে দিয়া জল |
পরদিন খাই ভাত অত্যন্ত শীতল ||
খাইয়া ক্ষুধার কালে বড় তৃপ্তি পাই |
ঘরে গিয় সেই অন্ন নিত্য নিত্য খাই ||
গোবর্দ্ধন বলে অবধান কর মহাশয় |
কল্য না খাইলাম ভাত বৈকাল সময় ||
শীতে ভীত হইলাম মুই বস্ত্র নাহি গায়|
আপনে ম়দু আমি কম্পিত বড় তায় ||
কল্য না খাইয়াছি ভাত এই সব কথা |
আমারে দেখিয়া দুঃখিত বড় মাতা ||
বাসি ভাত ব্যঞ্জন আছিল হেন রীতে |
স্নান ভোজন করি চলহ পড়িতে ||
মায়ের বচন আমি না করি খন্ডন |
স্নান করিয়া আমি করিলাম ভোজন ||
বাসি ভাত ব্যঞ্জনে জিহ্বার রস আসে |
মূলায় সরিষা অম্বল অতি স্বাদ বাসে ||
উত্তম তন্ডুলের অন্ন গন্ধেতে আধিক |
অমৃতের তুল্য রস পাইলাম খানিক ||
এই সব কথা শিষ্য কহিল ত্বরিতে |
ছয় ভাইর স্বাদ গেল বাসি অন্ন খাইতে ||
সোমাই পন্ডিতের ঠাঁই বলে ছয় ভাই |
মায়ের নিকট আমরা যাইবারে চাই ||
এতেক শুনিয়া তবে সোমাই ব্রাহ্মণ |
হরষিতে বিদায় করে সাধুর নন্দন ||
বিদায় হইয়া চলে ভাই ছয় জন |
মায়ের নিকটে গিয়া উত্তরে তখন ||
তৃতীয় প্রহর বেলা সূর্য্য লাগে পাছে |
একেবারে ছয় ভাই গেল মায়ের কাছে ||
পুত্র সবে দেখে মায়ের কৌতুক বিস্তর |
মায়েরে হাসিয়া বলে ছয় সহোদর ||
প্রভাতে অষ্টমী তিথি কাল পাঠ নাই |
কল্য প্রভাতে যেন পান্তাভাত খাই ||
পুত্রঘণের বাক্যে রাণীর কৌতুক বিস্তর |
পান্তাভাত চাহে খাইতে ছয় সহোদর ||
খল খলি হাসে রাণী আনন্দিত হইয়া |
একে একে ছয় বধূ আনে ডাক দিয়া ||
সোনেকা বলে শুনহ বধূগণ |
পুত্র সবে করিবে কল্য বাসি ভোজন ||
সোনেকার কথা শুনি বধূ ছয় জন |
রন্ধনের সজ্জা করি দিল ততক্ষণ ||
স্নান করিল গিয়া বণিক সুন্দরী |
রন্ধন করিতে যায় অতি তাড়াতাড়ি ||
রাজ্যের ঠাকুর চান্দ দ্রব্যে দুঃখ নাই |
নানাবিধ দ্রব্য আনি থুইল ঠাঁই ঠাঁই ||
পাতলা সুন্দর কাষ্ঠ শুকনা তেঁতুলী |
পিতলের হাঁড়ি দিয়া হেটে অগ্নি জ্বালি ||
অগ্নি প্রদক্ষিণ করি মাগে বর দান |
মুই যেন রন্ধন করি অমৃত সমান ||
অগ্নি প্রদিক্ষণ করি চাপাইল রন্ধন |
ডান দিকে চড়াইল ভাত বামেতে ব্যঞ্জন|
অনেক দিন পরে রান্ধে মনের হরিষ |
ষোল ব্যঞ্জন রান্ধিল নিরামিষ ||
প্রথমে পূজিল অগ্নি দিয়া ঘৃত ধূপ |
নারিকেল কোরা দিয়া রান্ধে মুসুরীর সুপ ||
পাটায় ছেচিয়া নেয় পোলতার পাতা |
বেগুন দিয়া রান্ধে ধনিয়া পোলতা ||
জ্বর পিত্ত আদি নাশ করার কারণ |
কাঁচা কলা দিয়া রান্ধে সুগন্ধ পাচন ||
জমানী পুড়িয়া ঘৃতে করিল ঘন পাক |
সাজ ঘৃত দিয়া রান্ধে গিমা তিতা শাক ||
কোমল বাথুয়া শাক করিয়া কেচা কেচা |
লাড়িয়া চাড়িয়া রান্ধে দিয়া আদা ছেঁচা ||
নারকেল দিয়া রান্ধে কুমারের শাক |
ঝাঁজ কটু তৈলে রান্ধে কুমারের চাক ||
বেতাগ বেগুন কাটি থুইল বাটী বাটী |
ঝিঙ্গা পোলাকড়ি ভাজে আর কাঁঠাল আঁঠি ||
রান্ধিছে রান্ধনী না দেয় গা মোড়া |
ঝাঁজ কটু তৈল দিয়া রান্ধে বেগুন পোড়া ||
বাটী বাটী ভরিয়া ব্যঞ্জন থুইল ঠাঁই ঠাঁই |
কলার থোড় রান্ধিয়া বাটীতে দিল রাই ||
অত্যন্ত ধবল যেন সাজ দুগ্ধের দৈ |
সরিযা বাটা দিয়া রান্ধে পানীকচুর বৈ ||
রন্ধন করিতে লাগে বড় পরিপাটী |
মরিচের ঝাল দিয়া রান্ধে বরবটী ||
মুগের ঝোল রান্ধে মাসকলাইয়ের বড়ী |
দুগ্ধ লাউ রান্ধে আর নারিকেল কুমারি ||
সুক্তা পাতা দিয়া রান্ধে কলাইর ডাল |
পাকা কলা লেবু রসে রান্ধিল অম্বল ||
রান্ধি নিরামিষ ব্যঞ্জন হইল হরষিত |
মত্স্যের ব্যঞ্জন রান্ধে হৈয়া সচকিত ||
মত্স্য মাংস কাটিয়া থুইল ভাগ ভাগ |
রোহিত মত্স্য দিয়া রান্ধে কলতার আগ ||
মাগুর মত্স্য দিয়া রান্ধে গিমা গাছ গাছ |
ঝাঁজ কটু তৈলে রান্ধে খরসুল মাছ ||
ভিতরে মরিচ গুড়া বাহিরে জড়ায় সূতা |
তৈল পাক করি রান্ধে চিংড়ির মাথা  ||
ভাজিল রোহিত আর চিতলের কোল |
কৈ মত্স্য দিয়া রান্ধে মরিচের ঝোল ||
ডুম ডুম করিয়া ছেঁচিয়া দিল চৈ |
ছাল খসাইয়া রান্ধে বাইন মত্স্যের খৈ ||
রন্ধনের কাজ থাকুক ভোজনের কথা  |
বারমাসি বেগুনেতে শৌল মত্স্যের মাথা ||
দুই তিন আনাজ করিয়া ভাগ ভাগ  |
থোর দিয়া ইচর-ঘন্ট মূলা দিয়া শাক ||
জিরা মরিচ রান্ধনী করে মিল |
মসল্লা বাটিতে হাতে তুলে নিল শীল ||
মাংসেতে দেবার জন্য ভাজে নারিকেল |
ছাল খসাইয়া রান্ধে বুড়া খাসির তেল ||
ছাগ মাংস কলার মূলে অতি অনুপম |
ডুম ডুম করি রান্ধে গারোড়ের চাম ||
একে একে যত ব্যঞ্জন রান্ধিল সকল |
শৌল মত্স্য দিয়া রান্ধে আমের অম্বল ||
মিষ্টান্ন অনেক রান্ধে নানাবিধ রস |
দুই তিন প্রকারের পিষ্টক পায়স  ||
দুগ্ধ পিঠা ভালমত রান্ধে ততক্ষণ |
রন্ধন করিয়া হইল হরযিত মন ||
বেলা অবসান হইল উদিত শশধর |
ঢাকা দিয়া অন্ন ব্যঞ্জন এড়িল সত্বর ||
ভোজন করিতে আসিল চান্দ সদাগর |
আপনে বসিল মধ্যে রাজা চন্দ্রধর ||
সন্মুখে সুবর্ণ থাল বসিল দিব্যপাটে |
সোনেকা বসিল গিয়া চান্দর নিকটে ||
সারি দিয়া বসিল ছয় সহোদর |
যেন তারাগশে বেড়িল শশধর ||
ছয়পুত্র লইয়া করিয়া ভোজন |
একে একে খাইল যত অন্ন ব্যঞ্জন ||
পরিপূর্ণ ভোজন করিয়া সর্ব্বজন |
পিতলের ডাবরে করিল আচমন ||
রজত পাদুকায় চান্দ দিলেন চরণ |
বিনোদ মন্দিরে গিয়া করিলেন শয়ন ||
হাস পরিহাস করে সবে হরষিতে |
যতনে ভাত ব্যঞ্জন খুইল হাঁড়িতে ||
আপন বাসরে গেল ভাই ছয়জন |
যার যেই নিজ স্থানে করিল গমন ||
নিদ্রা যায় ভাই সব হয়ে আনন্দিত |
তোলপাড় করে হেতা মনসার চিত ||
সাত দন্ড অন্ধকার রজনী যে ঘোর |
মনে মনে চিন্তে পদ্মা এই বেলা মোর ||
নগরের পূজা ভাঙ্গে মোরে গালি দেয় |
লক্ষ লক্ষ নাগ মারিয়া করিল ক্ষয় ||
তার ভয়ে মোর নাগ উত্তরে না যায় |
অপমান করে নিত্য কত সবে গায় ||
তোমা সবা বিদ্যমানে মোর নাগ মারে |
তোমাদের বিষজ্বাল কে সহিতে পারে ||
তোম সবা হেন পুত্র সর্ব্বগুণশালী  |
শরীরে না সহে আর মনুষ্যের গালি ||
হাতে ধরি বলি পুত্র না করিও আন |
বধিয়া চান্দর পুত্র ঘুচাও অপমান ||
চান্দর ছয় পুত্র বাড়ে মহাদেবের বরে |
হেন বুদ্ধি কর যেন এককালে মরে  ||
চান্দর পুত্রগণ হইয়াছে অভিলাষী |
কল্য খাইতে অন্ন থুইয়াছে বাসি ||
নিদ্রায় পাড়িয়া সবে কেহ নাহি জাগে |
মায়ারূপে চান্দর ঘরে যাও অষ্টনাগে ||
সাত পাঁচ করি দুঃখ না ভাবিও চিতে |
ভাতের মধ্যে বিষ দিয়া আসিও ত্বরিতে ||
পান্তা খাইতে সব পুত্রের অভিলাষ |
না জানিয়া খাইলে ভাত প্রাণ হবে নাশ ||
এতেক বলিয়া পদ্মার মনে কুতুহল |
পায়ের ধূলা মাথায় দিয়া বলে চল চল ||
উঠ উঠ বলি দেবী হাত ধরি টানে |
লাফ দিয়া আকাশে উঠিল নাগগণে ||
বায়ু বেগে চলে নাগ যেন বহে শ্বাস |
কামরূপে প্রবেশিল চান্দর আবাস ||
ঘরে ঘরে ভ্রমে নাগ ভয়ে চমকিত |
বড় ঘরের মেঝেতে গেল আচম্বিত ||
চারিভিতে চাহে নাগ বাহে হাঁড়িগুড়ি |
রন্ধন ঘরেতে দেখে পূর্ণ ভাত হাঁড়ি ||
সন্ধান পাইয়া নাগ করিলেক তাড়া |
নিঋশব্দে ঘুচাইল হাঁড়ির মুখের শরা ||
আড়আঁখি হাসে নাগ মনেতে হরিষ |
দশন উপাড়ি ঢালে কালকূট বিষ ||
সাধিতে মায়ের কার্য্য আকাশ পায় হাতে |
লাড়িয়া চাড়িয়া বিষ মিশাইল ভাতে ||
কানাকানি করিয়া চিন্তিত মহানাগে |
সত্বর গমনে গেল মনসার আগে ||
পদ্মার নিকটে গিয়া কহে সব কথা |
শুনিয়া কৌতুক বড় হাসেন নাগমাতা ||
রজনী প্রভাত হইল অরুণ উদয় |
শয্যা ত্যাগি বাহিরে আইল সাধুর তনয়||
করিলেক প্রতঃক্রিয়া আর শিবের ধ্যান |
সভা করি বসিলেক ভাই ছয়জন ||
হেনমতে নানা বেশে আছে ছয় ভাই |
ছয় পুত্রবধূ গেল শ্বাশুড়ীর ঠাঁই ||
হেনকালে ছয় বধূ কহে স্বপনের কথা |
কান্দিতে কান্দিতে কহে মনে পাই ব্যথা ||
বধূগণে বলে মাতা শুনঙ বচন |
রাত্রি শেষে মোরা আজি দেখিলাম স্বপন ||
কাল বর্ণ পুরুষ এক হাতে দীর্ঘ কুড়ি |
তামার শলা হেন চুল দেখি গোঁফদাড়ি ||
পরিধানে বস্ত্র নাই বিপরীত অঙ্গ |
বিপরীত বেশ তার হাতে লোহার শাঙ্গ ||
সর্ব্বগায় লোমাবলি অতি স্থুলকায় |
ছয় ভাই বান্ধিয়া দক্ষিণে লইয়া যায় ||
তাহা সবার প্রহার দেখিয়া কান্দি আমি|
সিঁথির সিন্দুর খসিয়া পড়ে ভুমি ||
খসিয়া পড়িল হাতের সুবর্ণের চুড়ি |
দুই বাউ শঙ্খ মোর ভাঙ্গিয়া হইল গুড়ি||
বিধবা ব্রাহ্মণী এক বিকৃত নখ দন্তে |
ধরিয়া বাহির মোরে করে ঘর হইতে ||
আচম্বিতে হেন স্বপন দেখিলাম বিকট |
মনে বড় ভয় বাসি বড়ই শঙ্কট ||
এক নহে দুই নহে বধূ ছয়জনে |
এককালে হেন স্বপন কহিল বেহানে ||
স্বপ্ন শুনি সোনেকার স্থির নহে মন |
বধূগণের তরে তরে কহিল বচন ||
সোনেকা বলেন বধূ সবে স্থির কর মন |
তোমা সবার শত্রু দিয়া ফলিবে স্বপন ||
দেখিলে আপন দিয়া ফলে স্বপন পরে |
অন্য ঠাঁই না কহিও চল যাই ঘরে ||
সোনেকা বলেন বধূ সবে ঝাটে ঘরে যাও |
সকালে রান্ধিয়া গিয়া মত্স্য ভাত খাও ||
স্নান করি মহাদেব পূজ ছয় জালে |
বধূ সব ঘরে গেল সোনেকার বোলে ||
স্বপ্ন শুনি সোনেকার মনেতে বিষাদ |
বুঝিতে না পারি বিধি কি করে প্রমাদ ||
নাগের বিবাদী পুত্র কত হবে ভাল |
ঘরের বাহির না করিব চিরকাল ||
ভাবিতে চিন্তিতে সোনাইর স্খির নহে মন |
দশ দন্ড বেলা হইল প্রখর তপন ||
পান্তা ভাত রাখিয়াছি চিত্তে সুখ নাই |
আথেব্যথে খাইবারে যায় ছয় ভাই ||
এতেক দেখিয়া সোনাই চিন্তে মনে মন |
সুবর্ণের থালে ভাত দিল তখন ||
ভাত দেখিয়া ছয় ভাই হরষিত মন |
পরম কৌতুকে ভাত করিল ভোজন ||
নিদাঘের পান্তা ভাত বড় প্রিয় বাসি |
গন্ডুষ করিয়া সবে করে পঞ্চগ্রাসি ||
পদ্মার মায়াতে যেন মধুর লাগে স্বাদ |
স্বাদ পাইয়া ভাত খায় না জানে প্রমাদ ||
ভাতে দোষ কিছু নাই ভাবিলেক চিতে |
স্বাদ পাইয়া তাহা সবে খায় আথেব্যথে||
নানা রস ভুঞ্জিত যে ভোজনের আশ |
পেট ভরি ছয় ভাই খাইল নির্যাস ||
কালকূট বিষের ঝাল কে সহিতে পারে |
থাকুক মানুষ তাহা দেবে খেলে নরে ||
যেই বিষ ঢালিলেন দেব মহেশ্বর |
সেই বিষ খেয়ে মরে ছয় সহোদর ||
আয়ু শেষ হইলেক ধরিলেক যমে |
ভাতের সঙ্গে খাইল বিষ সঞ্চারিল লোমে ||
মহাকালকূট বিষ বায়ুর আগে ধায় |
রক্তে মিশিয়া বিষ ছাইল সর্ব্বগায় ||
ওষ্ঠ তালু ছাইলেক সকল শরীর  |
টলমল করে আঁখি প্রাণ নহে স্থির ||
তুলারাশি মধ্যে পরে যেন অগ্নিকণা |
সর্ব্বাঙ্গ ছাইল বিষে পোড়ে ছয়জনা ||
কেহ বলে আমার বড় জ্বলে সর্ব্বগাও |
কেহ বলে নিদ্রা আসে মুখে নাহি রাও ||
কেহ বলে কি খাইলাম কিছু ভাল নইল |
কেহ বলে বিষ ভাতে পদ্মা প্রাণ লইল ||
কেহ বলে নিদ্রা আসে নুখে নাহি বাণী |
ক্ষেপিল কালকূট বিষ হারাইলাম পরাণী ||
মুখ বাহিয়া পড়ে লাল নাহি সরে রাও |
শরীর হইল কাল নাহি বহে বাও||
কালনিদ্রা আসে যেন আঁখির জল ঝরে |
বিষে আচ্ছাদিল প্রাণ ধরফর করে  ||
শরীরে সামর্থ্য নাহি আপনা পাশরে |
আথালি পাথালি সবে স্থানে স্থানে পড়ে ||
গোগাল মাধব কামরূপ বিদ্যাধর |
মহীধর আদি করি ছয় সহোদর ||
কাল বিষে ঢলি পড়ে ছয় সহোদর |
নাগরথে চড়ি দেখে দেবী বিষহর ||
ছয় পুত্র পড়ে সোনা দূর হইতে দেখে |
পুত্র পুত্র বলি সোনা উচ্চঃস্বরে ডাকে ||
কলা গাছ ভাঙ্গি যেন পড়ে ঠাঁই ঠাঁই |
পুত্র পুত্র বলি সোনা কান্দে পরিত্রাহি ||
ছয় পুত্র মৈল সোনার মনে বড় দুঃখ |
পুত্র কোলে করি কান্দে হাতে হানে বুক ||
হিয়া হানি চুল ছিঁড়ি লোটে ভূমিতল |
হা হা পুত্র বলি রাণী হইল বিকল ||
পুত্র শোকে কান্দে সোনা অতি দীর্ঘরায় |
বিজয় গুপ্ত স্তুতি করে মনসার পায় ||
দারুণ শোকে কান্দে সোনা দুঃখ লাগে বৈবী |
এই কালে বল ভাই করুণ লাচাড়ী ||

            (ভাটিয়াল রাগ)

ভূমিতলে গড়ি দিয়া,                     দুই হাত প্রসারিয়া,
.        সোনেকা সুন্দরী বিলাপ যে করে|
ছিড়িল গলার হার,      আর যত অলংকার,
.    ধরিয়া রাখিতে কেহ নারে ||
কান্দিছে সোনেকা রাণী,   শিরে করাঘাত হানি,
.        ফেলাইল অঙ্গের ভূষণ|
কারে বিধি হেন করে,   একদিনে ছয় পুত্র মরে,
.        নিশ্চয় যে ত্যজিব জীবন||
পাইলম ছয় পুত,             না রহিল এক সূত,
.        সেবা করি মনসার পায়|
যেন পূর্ণ শশধর,                  ছয় পুত্র গুণাকর,
.        তারি লাগি প্রাণে লাগে তাপ|
কিবা বিষ খাইয়া মরি,    কাটারিতে ভয় করি,
.        নহে আমি জলে দিব ঝাপ||
করি ধ্যান মহাজপ,                 কত করি স্তব জপ,
.        কত দুঃখে পাইলাম নিধি |
না করি ডাকাতি চুরি,     সেবিয়া সে বিষহরী
.        কোন দোষে করিল হেন বিধি||
এক নয় দুই নয়,         রাঁড়ী হইল বঁধূ ছয়,
.        রূপে বেশে পরমা সুন্দরী|
বিধাতা হৈল বৈরী,         কেমনে পরাণ ধরি,
.        ছয় বধূ ঘরে রবে রাঁড়ী||
অতি পাপী সদাগর,                    পদ্মা সহ অথাস্তর,
.        এত হইল তাহার লাগিয়া|
ঘরেতে আগুন দিয়া,        যাইব সব পুরাইয়া,
.        যোগী হইয়া খাইব মাগিয়া||
রাজ্যের যে অধিকারী,      তার প্রাণপ্রিয়া নারী,
.        ধনে জনে কিছু নহে উনা|
বিধাতা টানিয়া লয়,        হারাইলাম পুত্র ছয়,
.        সংসারে ফুরাল বাসনা||
আমি ত গরল খাব,        অগ্নি মাঝে প্রবেশিব,
.        জীবনেতে নাহি মোর সাধ|
মরিল যে পুত্র ছয়,      না জানি আর কিবা হয়,
.        দেবতা মনুষ্যে হইল বাদ||
মরিল যে ছয় পুত্র,        কান্দি অন্ধ হইল নেত্র,
.        শোকে সোনা কান্দে উচ্চরায়|
যত সব বন্ধুলোকে,       বেড়িয়া কান্দিছে শোকে,
.        বৈদ্য বিজয় গুপ্ত গীত গায় ||


.                 ****************                                                    
উপরে


মিলনসাগর
*
চণ্ডীর চরণে মনসা


জনম-দুঃখিনী আমি দুঃখে গেল কাল |
যেই ডাল ধরি আমি ভাঙ্গে সেই ডাল ||
শীতল ভাবিয়া যদি পাষাণ লই কোলে |
পাষাণ আগুন হয় মোর কর্মফলে ||
তকারে কি বলিব মোর নিজ কর্মফল |
দেব কন্যা হৈয়া স্বর্গে না হইল স্থল ||
ডাকিবার লক্ষ্য নাই শুনিগো জননী |
বিধাতা করিল মোরে জনম-দুঃখিনী ||
আপন দুঃখের কথা কহিনু সকল |
তোমার কিছু দোষ নাই মোর কর্মফল ||
কোলের বালিকা হয়্যে বোঝাই তোমারে |
তোমার উদর ছাড়া কে জন্মিতে পারে ||
জগৎ-ঈশ্বরী তুমি দেবী মহামায়া |
তবে কেন মোর প্রতি হইল নিদয়া ||
ময়ে ঝিয়ে বিসম্বাদ কেবা নাহি করে |
ক্রোধ সম্বরিয়া মাগে রাখহ আমারে ||
কাকুতি করিয়া পদ্মা গৌরীর স্থানে কয় |
ফিরিয়া না চাহে চণ্ডী দারুণ হৃদয় ||
বিশেষ বুঝিলাম মাগো তোমার মনের আশ |
বিদায় লইয়া মাগো যাই বনবাস ||
শিবপুরী থাক তুমি আমি যাই বন |
তোমার নাহিক দোষ কপালের লিখন ||
জানিনু বড়ই তোমার নিষ্ঠুর শরীর |
প্রণাম করিয়া পদ্মা চলে ধীরে ধীর ||
শিব ঠাঞি শুনি তুমি দয়াল প্রচুর |
এবে সে বুঝিলাম তব দয়া কতদূর ||
শুন মাতা ভগবতী পর্বত-দুহিতা |
পাষাণ তোমার কায়া জানিনু সর্বথা ||
এমন অশক্য কথা কোন জনে বলে |
আমন কন্যাকে নিজে ফেলে ভূমিতলে ||

.       ****************                                                                   
উপরে


মিলনসাগর
*
*
চম্পক নগরের রাজা নাম চন্দ্রধর|
পদ্মার বিবাদে সে হারাইল সকল||
পুত্রহীন লোকের নাহিক পরলোক|
প্রভাত সময়ে কেহ না দেখিবে মুখ||
চান্দর বংশে না রহিবে বীজের বেগুন|
চান্দর পিন্ডদান করিবে কোন জন ||
এককালে এত সুখঘুচাইল গোসাঞি |
পরকালে জলাঞ্জলি দিবে হেন জন নাই ||
কহে বিজয় গুপ্ত সোনাই না কর বিষাদ|
আরো কত শত আছে নাগের বিবাদ||
ছয় বধূ কান্দে গইয়া ধুলায় ধূসর |
রাজ্য বেড়িয়া ওঠে ক্রন্দনের স্বর||
বার্ত্তা পাইয়া আইল সাধু স্থির নহে চিতে|
পুত্র পুত্র বলি সাধু পড়িল ভূমিতে||
বাহিরে থাকিয়া বার্ত্তা পাইল নৃপবরে |
প্রাণের দুর্লভ পুত্র নিল কোন চোরে ||
পুত্র পুত্র বলি চান্দ ডাকে উচ্চৈ স্বরে |
আথেবযাথে গিয়া ধাইয়া পুত্র কোলে করে ||
উলটি পালটি চাহে সাধুর নন্দন |
ছয় পুত্র পড়িয়াছে নাহিক চেতন||
মাথায় হাত দিয়া কান্দে দীর্ঘরায় |
ছয় বধূ কান্দে ধরি স্বামীগণের পায় ||
বার্ত্তা পাইয়া সোমাই আসিল উভালড়ে|
বিকল হইয়া কান্দে চক্ষের জল ঝরে||
ইষ্ট মিত্র বন্ধুবর্গ কান্দে সর্ব্বজনা |
শত শত দাস কান্দে শোকে কান্দে ধনা ||
কান্দিতে কান্দিতে লোক হইলেক ভোলা |
গগনে হইল তখন দুই প্রহর বেলা ||
চান্দর দর্প ছিল কেবল মহাজ্ঞান |
কপটে মনসা দেবী হরিল সেই ধন ||
যেবা কিছু জানে তাহা করিল কর্ণমূলে|
মনুষ্য না পাইয়া যেন ছটা মারে ভুলে||
চান্দ বানিয়া কান্দে দুঃখ লাগে বৈরী |
সংবাদ পড়িল গাইন বলরে লাচাড়ী ||



.                 ****************                                                    
উপরে


মিলনসাগর