কবি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্র - প্রখ্যাত বামপন্থী
গায়ক ও কবি। তাঁর পরিচিত মণ্ডলে তিনি “বটুকদা”
নামেই খ্যাত ছিলেন । তিনি জন্মগ্রহণ করেন তাঁর
মাতুলালয় শ্রীরামপুরে । তাঁদের আদি নিবাস ছিল
অবিভক্ত বাংলার, অধুনা বাংলাদেশের পাবনা
জেলার শীতলাই গ্রামে। পিতা যোগেন্দ্রনাথ মৈত্র
ছিলেন সেখানকার জমিদার। তিনি ছিলেন পাবনার
তৎকালীন জাতীয় আন্দোলনের নেতা। কবির মাতা
সরলা দেবী ছিলেন শ্রীরামপুরের রাজা কিশোরীলাল গোস্বামীর কন্যা। কংগ্রেস রাজনীতিতে "বিগ ফাইভ”-এর
তুলসী গোস্বামী ছিলেন কবির মাতুল। অন্য চার জন ছিলেন নির্মলচন্দ্র চন্দ্র, নলিনীরঞ্জন সরকার, ডঃ বিধান
চন্দ্র রায় এবং শরত্চন্দ্র বসু।
কবিরা ছয় ভাই ও ছয় বোন। কবি ৩য়। তাঁর অন্য ভাইদের নাম যথাক্রমে জগদিন্দ্রনাথ, যতীন্দ্রনাথ
(সন্ন্যাসগ্রহণের পরে স্বামী বিমলানন্দ), রথীন্দ্রনাথ, রণেন্দ্রনাথ এবং সুধীন্দ্রনাথ। কবির ছয় বোন যথাক্রমে
প্রতিভা সিংহ, অণিমা চক্রবর্তী, কণিকা বিশ্বাস, শান্তি রায়, বাসন্তী সিকদার এবং অন্নপূর্ণা রায়।
কবি, ১৯৩৮ সালে রিচি রোড নিবাসী বিনয়েন্দ্রপ্রসাদ বাগচীর কন্যা ঊর্মিলা দেবীর সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ
হন। ঊর্মিলা দেবী ১৯৭৩ সালে পরলোক গমন করেন। তাঁদের চার পুত্র-কন্যা যথাক্রমে শান্তনু, সুদেষ্ণা,
সিদ্ধার্থ ও সুস্মিতা।
কবির পিতা যোগেন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। কবিকন্যা সুস্মিতা রায়চৌধুরী,
১৬.৯.২০১২ তারিখে Outlook পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ একাধিকবার
তাঁর ঠাকুরদার বজরা ব্যবহার করেছিলেন।
কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর কবিতা মিলনসাগরে তুলে, তাঁকে মিলনসাগরের কবিদের সভায় স্থান দিতে পেরে
আমরা ধন্য হলাম এবং আগামী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রয়াসের সার্থকতা। এই
কবিতার পাতা, তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
কবির জন্ম শতবর্ষ ২০১১ তে কবি নবেন্দু সেন ও কবি শর্মিষ্ঠা সেনের অনুরোধে ও তাঁদেরই দেওয়া সব
রকম তথ্যা এবং সাহায্যে, মিলনসাগর থেকে কবির উপর "শতবর্ষে জ্যোতিরিন্দ্র" নামক একটি শতবর্ষ
সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সে পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . . ।
উত্স -
- "শতবর্ষে জ্যোতিরিন্দ্র", মিলনসাগরের উপস্থাপনা, ১৮ই নভেম্বর ২০১১।
- অধ্যাপক নবেন্দু সেন, “দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা”, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের “যে পথেই যাও” কাব্যগ্রন্থের,
২০০৭ সালে ডঃ নবেন্দু সেন দ্বারা সম্পাদিত ২য় সংস্করণ।
- অজিতকুমার দত্তর “প্রস্তাবনা”, ১৯৭৪ সালে দিল্লীর করোলবাগ বঙ্গীয় সংসদ থেকে অজিতকুমার দত্ত
সম্পাদিত জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের “যে পথেই যাও” কাব্যগ্রন্থ থেকে।
- চিন্মোহন সেহানবীশের প্রবন্ধ “জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র”। ১৯৭৪ সালে দিল্লীর করোলবাগ বঙ্গীয় সংসদ
থেকে অজিতকুমার দত্ত সম্পাদিত জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের “যে পথেই যাও” কাব্যগ্রন্থের, ২০০৭ সালে
ডঃ নবেন্দু সেন দ্বারা সম্পাদিত ২য় সংস্করণ থেকে নেওয়া।
- প্রীতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ “বটুকদার কথা আমার যেটুকু মনে পড়ে”। ১৯৭৪ সালে দিল্লীর
করোলবাগ বঙ্গীয় সংসদ থেকে অজিতকুমার দত্ত সম্পাদিত জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের “যে পথেই যাও”
কাব্যগ্রন্থের, ২০০৭ সালে ডঃ নবেন্দু সেন দ্বারা সম্পাদিত ২য় সংস্করণ থেকে নেওয়া।
- সাগরিকা সেনগুপ্তর স্মৃতিচারণা ২০১১, “আমাদের বটুক জেঠু”।
- ডঃ শিশির কুমার দাশ, সংসদ সাহিত্য সঙ্গী ২০০৩।
- সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত “সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান” ১ম খণ্ড, ৫ম সংস্করণ,
জুলাই ২০১০।
- জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর সিনেমা সংক্রান্ত তথ্যের উত্স imdb.com ।
- কবিকন্যা সুস্মিতা রায়চৌধুরীর, Outlook পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাত্কার।
কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
আমাদের ই-মেল - srimilansengupta@yahoo.co.in
এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১১.৩.২০১৭।
উনবিংশ শতকের ৪০ ও ৬০-এর দশকের "পরিচয়", "কৃত্তিবাস" ও "মাসিক বসুমতী" পত্রিকা
থেকে ৫টি কবিতা এবং কবির সংক্ষিপ্ত জীবনী নিয়ে পরিবর্ধিত সংস্করণ - ১৬.৬.২০২০। ^^ উপরে ফেরত
...
কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের শিক্ষাজীবন - ^^ উপরে ফেরত
কবির স্কুল জীবন শুরু হয় পাবনা জেলা স্কুলে ও শেষ হয় কলকাতার ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে। এর
পরে তিনি কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে প্রথমে রসায়নশাস্ত্রে বি.এসসি. (১৯৩১) পাশ করেন।
মেডিকেল কলেজে সিট পেয়েও সেখানে ভর্তি না হয়, সাহিত্য পাঠের আকর্ষণে ইংরেজিতে স্পেশাল
পরীক্ষায় পাশ করে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ. করেন ১৯৩৩ সালে। এম.এ. পড়ার
সময় কবি বিষ্ণু দে, প্রণতি রায়চৌধুরী, ক্ষিতিশ রায় প্রমুখরা তাঁর সহপাঠি ছিলেন।
কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর দিল্লীর বাস ও বার্ড-ওয়াচিং - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫০ সালের পরে তিনি কিছুদিন শিক্ষকতা করেন বোকারোর একটি স্কুলে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত
তিনি প্রায় স্থায়ীভাবে দিল্লীতে বসবাস করেছেন। সেখানে “সঙ্গীত নাটক আকাদেমি” ও “ভারতীয় কলাকেন্দ্র”-
এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সঙ্গীত প্রযোজনা করেন “রামলীলা”র জন্য নতুনভাবে। দিল্লীতে থাকার সময় তিনি
কবি সুকুমার রায়ের লম্বকর্ণ পালা-তে এবং তারপর ১৯৭২ সালে কবি বিষ্ণু দের “স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত”
কবিতায় সুর দেন। শ্রীবেদব্যাসের সঙ্গে হিন্দী ভাষায় তাঁর গীতিনাট্যানুষ্ঠান করিয়েছিলেন।
দিল্লীর প্রবাসকালে তিনি সেখানকার “করোলবাগ বঙ্গীয় সংসদ”-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েন। সংসদ
থেকে প্রকাশিত “অজন্তা” পত্রিকাটির তিনিই নামকরণ করেছিলেন।
তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট পক্ষী বিশারদ। নানাজনের স্মৃতিচারণে তাঁর বার্ড ওয়াচিং ও পক্ষীপ্রেমের কথা
উঠে আসে। বম্বের গণনাট্য সংঘের সদস্যা ও গণসঙ্গীত শিল্পী প্রীতি বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৭৪ সালে দিল্লীর
করোলবাগ বঙ্গীয় সংসদ থেকে অজিতকুমার দত্ত সম্পাদিত জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের “যে পথেই যাও” কাব্য
গ্রন্থের, ২০০৭ সালে ডঃ নবেন্দু সেন দ্বারা সম্পাদিত ২য় সংস্করণে, “বটুকদার কথা আমার যেটুকু মনে পড়ে”
স্মৃতিচারণে লিখেছেন যে তাঁর “বটুকদা” মনে করতেন যে পাখীর ডাক থেকেই সুরের উত্পত্তি। তাই তিনি
পাখী ডাকলে সব কিছু ফেলে পাখীর গান শুনতেন। প্রীতিদেবী আরও লিখেছেন যে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর
মৃত্যুর পরে দূরদর্শনে তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন যে তাঁর “কাঞ্চনজঙ্ঘা” ছবিতে
পাহাড়ী সান্যালের চরিত্রটি তিনি বটুকদার কথা ভেবেই সৃষ্টি করেছিলেন। সত্যজিৎ রায় আরও বলেছিলেন,
“এখন তাই পাখির ডাক শুনলে আমার বটুকদার কথাই মনে পড়ে--- ভবিষ্যতেও পড়বে।” প্রীতি
বন্দ্যোপাধ্যায়ের “বটুকদার কথা আমার যেটুকু মনে পড়ে” স্মৃতিচারণটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . .।
কবিপুত্র শান্তনু, ১৬.৯.২০১২ তারিখে Outlook পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাত্কারে এই কথাই উল্লেখ করেছিলেন
যে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন যে তাঁর "কাঞ্চনজঙ্ঘা" ছায়াছবির একটি চরিত্র তাঁর পিতার কথা ভেবে রচনা
করা হয়েছিল।
রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাগরিকা সেনগুপ্ত, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর শতবর্ষে, তাঁকে উত্সর্গ করা মিলনসাগরের
“শতবর্ষে জ্যোতিরিন্দ্র” নামক শতবর্ষ সংখ্যায় তাঁর লেখা “আমাদের বটুকজ্যেঠু” স্মৃতিচারণে লিখেছেন যে
তাঁর বটুকজেঠু, দিল্লীতে “বার্ড ওয়াচিং” করতেন নিয়মিত। সাগরিকা দেবীর কাকা অধ্যাপক, ছান্দসিক ও
কবি নীলরতন সেনের শিশুপুত্র নীলাঞ্জন কে তিনি নিয়মিত দিল্লীর “রীজ”-এ নিয়ে যেতেন পাখী দেখাতে।
একবার একটি নাইটজার পাখী দেখে নীলাঞ্জন বারবার সেই পাখী দেখার আবদার করতো। সেই থেকে
নীলাঞ্জনকে তিনি নাইটজার নামেই ডাকতেন। তাঁর এই পক্ষীপ্রেম ছায়া ফেলেছে তাঁর “কোতোয়াল” গল্প-
কবিতাটিতে। সাগরিকা সেনগুপ্তর “আমাদের বটুকজ্যেঠু” স্মৃতিচারণটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . .।
অধ্যাপক নীলরতন সেনের টেপ-রেকর্ডারে তাঁদের প্রিয় বটুকদার কণ্ঠে “মধুবংশীর গলি”-র আবৃত্তি রেকর্ড
করা ছিল। দুর্ভাগ্যবশত তা চুরি হয়ে যায় অন্য অনেক দরকারী রেকর্ডিঙের সঙ্গে। সৌভাগ্যবশত বন্ধুবর
প্রখ্যাত নাট্যকার ও কবি শম্ভু মিত্রের কণ্ঠে আবৃত্তিটি আছে। তা শুনতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
সাগরিকা দেবীর লেখা থেকে আরও জানা যায় যে দিল্লীতে তিনি ছোটোদের এবং বড়োদের আলাদা আলাদা
গ্রুপে গান শেখাতেন নিয়মিত। তাঁর গানের স্কুলের স্থায়ী কোনও আস্তানা ছিল না। তাই নানান জনের
বাড়িতে ঘুরে ঘুরে গানের ক্লাস নিতেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর ছাত্র-ছাত্রিদের দিয়ে গানও গাওয়াতেন।
কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের ফ্যাসিবাদ বিরোধী বামপন্থী কর্মকাণ্ড - ^^ উপরে ফেরত
কলেজ জীবন থেকেই তিনি মার্সবাদী চিন্তাধারার সংস্পর্শে আসেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে তিনি
যোগ দেন ১৯৪২ সালে। ১৯৪২ সাল থেকেই ফ্যাসিস্ট বিরোধী “লেখক ও শিল্পী সংঘ”-এ যোগ দেন। তিনি ঐ
সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯৮৩ সালে বম্বের গণনাট্য সংঘ প্রতিষ্ঠা কালে তিনি ঐ সংঘের
একজন বিশিষ্ট নেতা হিসাবে উঠে আসেন।
গণনাট্য সংঘের (IPTA) কেন্দ্রীয় দলের আন্ধেরির আস্তানার সঙ্গে তিনি যুক্ত থাকার সময় তিনি যুক্ত ছিলেন
রবিশঙ্কর, শান্তি বর্ধন, কবি গণসঙ্গীতকার বিনয় রায় প্রমুখের সঙ্গে।
কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর রচনাসম্ভার - ^^ উপরে ফেরত
তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন বিশ শতকের বিশের দশকের শেষদিকে। ছাত্রাবস্থায় তাঁর কবিতা
“পরিচয়” সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। "ত্রিশঙ্কু" ছদ্মনামে ও পরে স্বনামে “অগ্রণী” পত্রিকায় তাঁর
কবিতা ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয়। এছাড়া "জনযুদ্ধ", "স্বাধীনতা" প্রভৃতি পত্রিকায় এবং দিল্লী প্রবাসকালে
"ইন্দ্রপ্রস্থ", "অজন্তা", "দিগন্ত" প্রভৃতি পত্র-পত্রিকাতেও তাঁর রচনা প্রকাশিত হয়।
তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “রাজধানী ও মধুবংশীর গলি" (অগ্রণী ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ)। ১৯৪৩ এর শেষের
দিকেই তাঁর “মধুবংশীর গলি”, জনসভায় একক বা যুগ্মভাবে আবৃত্তি করা হতো। শম্ভু মিত্রের কণ্ঠে তাঁর
“মধুবংশীর গলি” জনপ্রিয়তা লাভ করে। পঞ্চাশের দশকের মন্বন্তরের মর্মান্তিক পরিবেশে রচনা করেন
“নবজীবনের গান”। তাঁর শেষ বয়সের রচনা, গদ্যছন্দে লেখা “বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে”। দিল্লীতে
থাকাকালীন রচিত কবিতার কাব্যগ্রন্থ “যে পথেই যাও”।
কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর সঙ্গীত ও সিনেমা - ^^ উপরে ফেরত
তিনি মার্গসঙ্গীতে তালিম গ্রহণ করেন হরিচরণ চক্রবর্তী, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, কালীনাথ চট্টোপাধ্যায় ও
আশফাক হোসেনের কাছে। সরলা দেবীচৌধুরাণী, ইন্দিরা দেবী ও অনাদি দস্তিদারের কাছে রবীন্দ্রসংগীতের
তালিম নেন। তিনি অল্পবয়স থেকেই সেতার, এস্রাজ, তবলা ও ঢাক বাজাতে শিখেছিলেন।
পাশ্চাত্য সংগীতেও তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর রচিত “নবজীবনের গান”-এ ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের সঙ্গে
পাশ্চাত্য সংগীতের সমন্বয় দেখা যায়। তা ছাড়া লোকসংগীতকেও তিনি তাঁর গানে ব্যবহার করেছেন।
১৯৩৯-৪০ এর কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়ে আজীবন ওই পার্টির সঙ্গে থাকেন। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র
ফ্যাসি-বিরোধী লেখক ও শিল্পী অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
তাঁর নিজের কণ্ঠে কেবল মাত্র একটি রেকর্ড বার করেছিলেন। তার এক পিঠে “জগতে আনন্দ যজ্ঞে” অপর
পিঠে “এ ভারতে রাখ নিত্য” ছিল। গানদুটি ইউটিউবে শুনতে গানগুলির উপরে ক্লিক করুন।
তিনি বহু চলচ্চিত্রেরও তিনি সুরকার ছিলেন। ঋত্বিক ঘটকের ছবি "মেঘে ঢাকা তারা" (১৯৬০), “কোমল
গান্ধার” (১৯৬১), তথ্যচিত্র “আমার লেনিন”-এর তিনিই ছিলেন সংগীত পরিচালক। এ ছাড়া যে
যে ছায়াছবিতে তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেন তাদের মধ্যে রয়েছে মার্চেন্ট-আইভরি (ইসমাইল মার্চেন্ট ও
জেম্স আইভরি) যুগলের সিনেমা “Householder” (১৯৬৩), ওস্তাদ আলী আকবর খানের সঙ্গে, মানিক
বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে অসিত ব্যানার্জীর “পুতুল নাচের ইতিকথা” (১৯৪৯), তরুণ মজুমদারের
“কাঁচের স্বর্গ” (১৯৬২), চিত্ররথ নির্দেশিত “কুমারী মন” (১৯৬২) প্রভৃতি।
এ ছাড়া জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র সত্যজিৎ রায়ের নির্দেশিত ইংরেজি তথ্যচিত্র “Rabindranath Tagore” (১৯৬১) এর
সঙ্গীত পরিচালনা করেন। সত্যজিৎ রায়ের চারুলতায় (১৯৬৪) তিনি একটি গানও গেয়েছিলেন। ওয়েস
অ্যাণ্ডার্সন নির্দেশিত The Darjeeling Limited (২০০৭) এ তাঁর একটি মিউজিক রয়েছে।
কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর বিদেশ যাত্রা - ^^ উপরে ফেরত
১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক সুরস্রষ্টা সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন যান। দিল্লী থেকে
কলকাতায় আসার পর বাংলাদেশের শিল্পীদের আহ্বানে ঢাকায় গিয়ে “নবজীবনের গান” ও অন্যান্য সঙ্গীত
শেখান। ভারতের নানা স্থানে, মস্কোতে ও ১৯৭৩ সালে পূর্ব জার্মানিতে ভ্রমণকালে অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি
তাঁর রচিত বিভিন্ন কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে।
কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর শেষ যাত্রা - ^^ উপরে ফেরত
শেষ জীবনে কবি মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রামে জমি কিনে “কর্ষণী” নামের একটি আদর্শ আশ্রম গড়ার কাজ শুরু
করেছিলেন।
২৬শে অক্টোবর ১৯৭৭ তারিখে, হায়দেরাবাদে কর্মরত ছেলের কাছ থেকে ফেরার পথে, ভিশাখাপট্টনম
(ভাইজ্যাগ) থেকে হাওড়ার পথে কোরোমণ্ডল এক্সপ্রেসে, নিদ্রারত অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ট্রেনটি হাওড়া স্টেশনে যাত্রী নামিয়ে কার-শেডে যাবার পরে রেল কর্মীরা তাঁর মরদেহ বাঙ্কে শায়িত পান।
কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র সম্বন্ধে মনফকিরার উদ্ধৃতি - ^^ উপরে ফেরত
মনফকিরা থেকে প্রকাশিত বই ”জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র লিখন সমগ্র ১” এর মুখবন্ধে তাঁর সম্বন্ধে সঠিকভাবে
প্রযোজ্য লেখাটি আমরা এখানে তুলে দিলাম . . .
"ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রযত্নে বিশ শতকের তিরিশের দশকের শেষে ভারতীয় সংস্কৃতিতে
গণচেতনার বিকাশ সৃষ্টিশীল কিছু মানুষজনকে ভিন্ন এক জীবনভাবনায় প্রাণিত করেছিল। আর তার জেরেই
গণজীবনের বিভিন্ন স্তরকে বহুমাত্রিক আলোয় ও সফলতায় তাঁরা প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। আজও তা
আমাদের হৃদয় মন ও চেতনাকে ছুঁয়ে যায়।
তাঁদের মধ্যে অনেকে আজ আর জীবিত নেই, শরীরী মৃত্যুর আগেই অনেকের মৃত্যু হয়েছিল মনের, অনেকে
থেমে গিয়েছিলেন অবসাদে।
যে গুটিকয়েক মানুষ কোন দিন থামেন নি, মন যাদের বরাবর সজাগ ও সচেতন ছিল, ঐ বিশ্বাসে ও
অনুভবে যাঁরা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁদের কৃত্য, আমৃত্যু যাঁরা পথ হেঁটেছেন, হেঁটেছেন মাথা
উঁচু করে --- জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র তাঁদের একজন।"