কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর মেঘনাদবধ কাব্য
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
মিলনসাগরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর মেঘনাদবধ কাব্যের সূচী...
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম
মেঘনাদবধ কাব্য দ্বিতীয় সর্গ
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রথম প্রকাশ ১৮৬১।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে রামকমল সিংহ দ্বারা প্রকাশিত, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবি সজনীকান্ত দাস দ্বারা মূলতঃ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ সংস্করণ থেকে গৃহীত ও সম্পাদিত এবং ১২৭৪ বঙ্গাব্দে (১৮৬৭ সালে) প্রকাশিত, কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-কৃত টীকা ও ব্যাখ্যা সহ।
মিলনসাগরে প্রকাশ ২১শে ফেব্রুয়ারী ২০২৬।
গ্রন্থের ৫৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
দ্বিতীয় সর্গ
(অস্ত্রলাভো নাম)
অস্তে গেল! দিনমণি ; আইলা গোধূলি,---
একটি রতন ভালে। ফুটিলা কুমুদী ;
মুদিলা সরসে আঁখি বিরসবদনা
নলিনী ; কূজনি পাখী পশিল কুলায়ে ;
গোষ্ঠ-গৃহে গাভী-বৃন্দ ধায় হম্বা রবে।
আইলা সুচারু-তারা শশী সহ হাসি,
শর্ব্বরী ; সুগন্ধবহ বহিল চৌদিকে,
সুস্বনে সবার কাছে কহিয়া বিলাসী,
কোন্ কোন্ ফুল চুম্বি কি ধন পাইলা।
আইলেন নিদ্রা দেবী ; ক্লান্ত শিশুকুল
জননীর ক্রোড়-নীরে লভয়ে যেমতি
বিরাম, ভূচর সহ জলচর-আদি
দেবীর চরণাশ্রমে বিশ্রাম লভিলা।
উতরিলা শশিপ্রিয়া ত্রিদশ-আলয়ে।
বসিলেন দেবপতি দেবসভা মাঝে,
হৈমাসনে ; বামে দেবী পুলোম-নন্দিনী
চারুনেত্রা। রাজ-ছত্র, মণিময় আভা,
শোভিল দেবেন্দ্র-শিরে। রতনে খচিত
চামর যতনে ধরি, ঢুলায় চামরী।
আইলা সুসমীরণ, নন্দন-কানন-
গন্ধমধু বহি রঙ্গে। বাজিল চৌদিকে
ত্রিদিব-বাদিত্র। ছয় রাগ, মূর্ত্তিমতী
ছত্রিশ রাগিণী সহ, আসি আরম্ভিলা
সঙ্গীত। উর্ব্বশী, রম্ভা সুচারুহাসিনী,
চিত্রলেখা, সুকেশিনী মিশ্রকেশী, আসি
৬-৭। সুচারু-তারা শর্ব্বরী---সুন্দর তারাবৃন্দমণ্ডিত রজনী।
৮। বিলাসী---সৌখিন, ফুলবাবু।
২২। বাদিত্র---বাজনা।
গ্রন্থের ৫৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
নাচিলা, শিঞ্জিতে রঞ্জি দেব-কুল-মনঃ!
যোগায় গন্ধর্ব্ব স্বর্ণ-পাত্রে সুধারসে।
কেহ বা দেব-ওদন ; কুঙ্কুম, কস্তুরী,
কেশর বহিছে কেহ ; চন্দন কেহ বা ;
সুগন্ধ মন্দার-দাম গাঁথি আনে কেহ।
বৈজয়ন্ত-ধামে সুখে ভাসেন বাসব
ত্রিদিব-নিবাসী সহ ; হেন কালে তথা,
রূপের আভায় আলো করি সুর-পুরী,
রক্ষঃ-কুল-রাজলক্ষ্মী আসি উতরিলা।
সসম্ভ্রমে প্রণমিলা রমার চরণে
শচীকান্ত। আশীষিয়া হৈমাসনে বসি,
পদ্মাক্ষী পুণ্ডরীকাক্ষ-বক্ষোনিবাসিনী
কহিলা ; “হে সুরপতি, কেন যে আইনু
তোমার সভায় আজি, শুন মনঃ দিয়া।”
উত্তর করিলা ইন্দ্র ; “হে বারীন্দ্র-সুতে,
বিশ্বরমে, এ বিশ্বে ও রাঙা পা দুখানি
বিশ্বের আকাঙ্খা মা গো। যার প্রতি তুমি,
কৃপা করি, কৃপা-দৃষ্টি কর, কৃপাময়ি,
সফল জনম তারি! কোন্ পুণ্য-ফলে,
লভিল এ সুখ দাস, কহ, মা, দাসেরে?”
কহিলেন পুনঃ রমা, “বহুকালাবধি
আছি আমি, সুরনিধি, স্বর্ণ-লঙ্কাধামে।
বহুবিধ রত্নদানে, বহু যত্ন করি,
পূজে মোরে রক্ষোরাজ। হায়, এত দিনে
বাম তার প্রতি বিধি! নিজ কর্ম্ম-দোষে,
মজিছে সবংশে পাপী ; তবুও তাহারে
না পারি ছাড়িতে, দেব। বন্দী যে, দেবেন্দ্র,
১। শিঞ্জিতে---অলঙ্কার-ধ্বনিতে। ৩। ওদন--অন্ন।
১২। পুণ্ডরীকাক্ষ---বিষ্ণু।
গ্রন্থের ৬০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কারাগার-দ্বার নাহি খুলিলে কি কভু
পারে সে বাহির হতে? যত দিন বাঁচে
রাবণ, থাকিব আমি বাঁধা তার ঘরে।
মেঘনাদ নামে পুত্র, হে বৃত্রবিজয়ি,
রাবণের, বিলক্ষণ জান তুমি তারে।
একমাত্র বীর সেই আছে লঙ্কাধামে
এবে ; আর বীর যত, হত এ সমরে।
বিক্রম-কেশরী শূর আক্রমিবে কালি
রামচন্দ্রে ; পুনঃ তারে সেনাপতি-পদে
বরিয়াছে দশানন। দেব-কুল-প্রিয়
রাঘব ; কেমনে তারে রাখিবে, তা দেখ।
নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করি, আরম্ভিলে
যুদ্ধ দম্ভী মেঘনাদ, বিষম শঙ্কটে
ঠেকিবে বৈদেহীনাথ, কহিনু তোমারে ।
অজেয় জগতে মন্দোদরীর নন্দন,
দেবেন্দ্র! বিহঙ্গকুলে বৈনতেয় যথা
বল-জ্যেষ্ঠ, রক্ষঃ-কুল-শ্রেষ্ঠ শূরমণি!”
এতেক কহিয়া রমা কেশব-বাসনা
নীরবিলা ; আহ মরি, নীরবে যেমতি
বীণা, চিত্ত বিনোদিয়া সুমধুর নাদে!
ছয় রাগ, ছত্রিশ রাগিণী আদি যত,
শুনি কমলার বাণী, ভুলিলা সকলে
স্বকর্ম্ম ; বসন্তকালে পাখীকুল যথা,
মুঞ্জরিত কুঞ্জে, শুনি পিকবর-ধ্বনি!
কহিলেন স্বরীশ্বর ; “এ ঘোর বিপদে,
বিশ্বনাথ বিনা, মাতঃ, কে আর রাখিবে
রাঘবে? দুর্ব্বার রণে রাবণ-নন্দন।
৪। বৃত্রবিজয়ী---বৃত্রঘ্ন, ইন্দ্র।
১৬। বৈনতেয়---বিনতানন্দন, গরুড়।
১৭। বল-জ্যেষ্ঠ---বলে সর্ব্বাপেক্ষা প্রবল।
২৩। স্বকর্ম্ম---গীত বাদ্যাদি।
গ্রন্থের ৬১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
পন্নগ-অশনে নাগ নাহি ডরে যত,
ততোধিক ডরি তারে আমি! এ দম্ভোলি,
বৃত্রাসুর শিরঃ-চূর্ণ যাহে, বিমুখয়ে
অস্ত্র-বলে মহাবলী ; তেঁই এ জগতে
ইন্দ্রজিৎ নাম তার। সর্ব্বশুচি-বরে
সর্ব্বজয়ী বীরবর। দেহ আজ্ঞা দাসে,
যাই আমি শীঘ্রগতি কৈলাস-সদনে।”
কহিলা উপেন্দ্র-প্রিয়া বারীন্দ্রনন্দিনী ;---
“যাও তবে, সুরনাথ, যাও ত্বরা করি।
চন্দ্র-শেখরের পদে, কৈলাস-শিখরে,
নিবেদন কর, দেব, এ সব বারতা।
কহিও সতত কাঁদে বসুন্ধরা সতী,
না পারি সহিতে ভার ; কহিও, অনন্ত
ক্লান্ত এবে। না হইলে নির্ম্মুলি সমূলে
রক্ষঃপতি, ভবতল রসাতলে যাবে!
বড় ভাল বিরূপাক্ষ বাসেন লক্ষ্মীরে।
কহিও, বৈকুণ্ঠপুরী বহু দিন ছাড়ি
আছয়ে সে লঙ্কাপুরে! কত যে বিরলে
ভাবয়ে সে অবিরল, এক বার তিনি,
কি দোষ দেখিয়া, তারে না ভাবেন মনে?
কোন্ পিতা দুহিতারে পতি-গৃহ হতে
রাখে দূরে---জিজ্ঞাসিও, বিজ্ঞ জটাধরে!
ত্র্যম্বকে না পাও যদি, অম্বিকার পদে
কহিও এ সব কথা।” ---এতেক কহিয়া,
বিদায় হইয়া চলি গেলা শশিমুখী
হরিপ্রিয়া। অনম্বর-পথে সুকেশিনী,
কেশব-বাসনা দেবী গেলা অধোদেশে।
১। পরগ-অশন---সর্পভক্ষক, গরুড়।
৫। সর্ব্বশুচি---অগ্নি। মেঘনাদের ইষ্টদেব।
১০। চন্দ্র-শেখর---চন্দ্রশিরোভূষণ, শিব।
১৬। বিরূপাক্ষ---শিব।
২৩। ত্র্যম্বক---ত্রিলোচন, মহাদেব।
২৬। অনম্বর-পথ---আকাশপথ।
গ্রন্থের ৬২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সোণার প্রতিমা, যথা! বিমল সলিলে
ডুবে তলে জলরাশি উজলি স্বতেজে!
আনিলা মাতলি রথ ; চাহি শচী পানে
কহিলেন শচীকান্ত মধুর বচনে
একান্তে ; “চলহ, দেবি, মোর সঙ্গে তুমি!
পরিমল-সুধা সহ পবন বহিলে,
দ্বিগুণ আদর তার! মূণালের রুচি
বিকচ কমল-গুণে, শুন লো ললনে।”
শুনি প্রণয়ীর বাণী, হাসি নিতম্বিনী,
ধরিয়া পতির কর, আরোহিলা রথে।
স্বর্গ-হৈম-দ্বারে রথ উতরিল ত্বরা।
আপনি খুলিল দ্বার মধুর নিনাদে
অমনি! বাহিরি বেগে, শোভিল আকাশে
দেবযান ; সচকিতে জগত জাগিলা,
ভাবি রবিদেব বুঝি উদয়-অচলে
উদিলা! ডাকিল ফিঙা ; আর পাখী যত
পুরিল নিকুঞ্জ-পুঞ্জ প্রভাতী সংগীতে!
বাসরে কুসুম-শয্য ত্যজি লজ্জাশীলা
কুলবধূ , গৃহকার্য্য উঠিলা সাধিতে!
মানস-সকাশে শোভে কৈলাসশিখরী
আভাময় ; তার শিরে ভবের ভবন,
শিখি-পুচ্ছ-চূড়া যেন মাধবের শিরে!
সুশ্যামাঙ্গ শৃঙ্গধর ; স্বর্ণ-ফুল-শ্রেণী
শোভে তাহে, আহা মরি পীত ধড়া যেন!
নির্ঝর-ঝরিত-বারি-রাশি স্থানে স্থানে---
বিশদ চন্দনে যেন চর্চ্চিত সে বপুঃ!
ত্যজি রথ, পদব্রজে, সহ স্বরীশ্বরী,
৩। মাতলি--ইন্দ্রসারাথি।
১৩। বাহিরি---বাহির হইয়া।
১৯। রাত্রি প্রভাত হইয়াছে, এই ভাবিয়া।
গ্রন্থের ৬৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
প্রবেশিলা স্বরীশ্বর আনন্দ-ভবনে।
রাজরাজেশ্বরী-রূপে বসেন ঈশ্বরী
স্বর্ণাসনে ; ঢুলাইছে চামর বিজয়া ;
ধরে রাজ-ছত্র জয়া। হায়রে, কেমনে,
ভবভবনের কবি বর্ণিবে বিভব?
দেখ, হে ভাবুক জন, ভাবি মনে মনে!
পূজিলা শক্তির পদ মহাভক্তি ভাবে
মহেন্দ্র ইন্দ্রাণী সহ। আশীষি অম্বিকা
জিজ্ঞাসিলা ;---“কহ, দেব, কুশল বারতা,---
কি কারণে হেথা আজি তোমা দুই জনে? ”
কর-যোড়ে আরম্ভিলা দম্ভোলি-নিক্ষেপী ;---
“কি না তুমি জান, মাতঃ, অখিল জগতে?
দেবদ্রোহী লঙ্কাপতি, আকুল বিগ্রহে,
বরিয়াছে পুনঃ পুত্র মেঘনাদে আজি
সেনাপতি-পদে? কালি প্রভাতে কুমার
পরন্তপ প্রবেশিবে রণে, ইষ্টদেবে
পূজি, মনোনীত বর লভি তাঁর কাছে।
অবিদিত নহে, মাতঃ, তার পরাক্রম।
রক্ষঃ-কুল-রাজলক্ষ্মী, বৈজয়ন্ত-ধামে,
আসি, এ সংবাদ দাসে দিলা, ভগবতি।
কহিলেন হরিপ্রিয়া, কাঁদে বসুন্ধরা,
এ অসহ ভার সতী না পারি সহিতে ;
ক্লান্ত বিশ্বধর শেষ ; তিনিও আপনি
চঞ্চলা সতত এবে ছাড়িতে কনক-
লঙ্কাপুরী। তব পদে এ সংবাদ দেবী
আদেশিলা নিবেদিতে দাসেরে, অন্নদে!
দেব-কুল-প্রিয় বীর রঘু-কুল-মণি।
কিন্তু দেবকুলে হেন আছে কোন্ রথী
১৬। পরন্তপ---শত্রুপীড়ক।
২৩। তিনিও আপনি---স্বয়ং লক্ষ্মীও ;
গ্রন্থের ৬৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ “”
বুঝিবে যে রণ-ভূমে রাবণির সাথে?
বিশ্বনাশী কুলিশে, মা, নিস্তেজে সমরে
রাক্ষস, জগতে খ্যাত ইন্দ্রজিত নামে!
কি উপায়ে, কাত্যায়নি, রক্ষিবে রাঘবে,
দেখ ভাবি। তুমি কৃপা না করিলে, কালি
অরাম করিবে ভব দুরন্ত রাবণি।”
উত্তরিলা কাত্যায়নী ;---“শৈব-কুলোত্তম
নৈকষেয় ; মহা স্নেহ করেন ত্রিশূলী
তার প্রতি ; তার মন্দ, হে সুরেন্দ্র, কভু
সম্ভবে কি মোর হতে? তপে মগ্ন এবে
তাপসেন্দ্র, তেঁই, দেব, লঙ্কার এ গতি।”
কৃতাঞ্জলি-পুটে পুনঃ বাসব কহিলা;---
পরম-অধর্ম্মাচারী নিশাচর-পতি---
দেব-দ্রোহী! আপনি, হে নগেন্দ্র-নন্দিনি,
দেখ বিবেচনা করি। দরিদ্রের ধন
হরে যে দুর্ম্মতি, তব কৃপা তার প্রতি
কভু কি উচিত, মাতঃ? সুশীল রাঘব,
পিতৃ-সত্য-রক্ষা-হেতু, সুখ-ভোগ ত্যজি
পশিল ভিখারী-বেশে নিবিড় কাননে।
একটা রতনমাত্র তাহার আছিল
অমূল ; যতন কত করিত সে তারে,
কি আর কহিবে দাস? সে রতন, পাতি
মায়াজাল, হরে দুষ্ট! হায়, মা, স্মরিলে
কোপানলে দহে মনঃ! ত্রিশূলীর বরে
বলী রক্ষঃ, তৃণ-জ্ঞান করে দেব-গণে!
পর-ধন, পর-দার লোভে সদা লোভী
পামর। তবে যে কেন (বুঝিতে না পারি)
হেন মূঢ়ে দয়া তুমি কর, দয়াময়ি?”
২। কুলিশ---বজ্র।
২৩। হরে দুষ্ট---দুষ্ট রাবণ হরণ করিয়াছে।
গ্রন্থের ৬৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
নীরবিলা স্বরীশ্বর ; কহিতে লাগিলা
বীণাবাণী স্বরীশ্বরী মধুর সুস্বরে ;---
“বৈদেহীর দুঃখে, দেবি, কার না বিদরে
হৃদয়? অশোক-বনে বসি দিবা নিশি
(কুঞ্জবন-সখী পাখী পিঞ্জরে যেমতি)
কাঁদেন রূপসী শোকে! কি মনোবেদনা
সহেন বিধুবদনা! পতির বিহনে,
ও রাঙা চরণে, মাতঃ, অবিদিত নহে।
আপনি না দিলে দণ্ড, কে দণ্ডিবে, দেবি,
এ পাষণ্ড রক্ষোনাথে? নাশি মেঘনাদে,
দেহ বৈদেহীরে পুনঃ বৈদেহীরঞ্জনে ;
দাসীর কলঙ্ক ভঞ্জ, শশাঙ্কধারিণি!
মরি, মা, শরমে আমি, শুনি লোকমুখে,
ত্রিদিব-ঈশ্বরে রক্ষঃ পরাভবে রণে!”
হাসিয়া কহিলা উমা ; “রাবণের প্রতি
দ্বেষ তব, জিষ্ণু! তুমি, “হে মঞ্জুনাশিনী
শচি, তুমি ব্যগ্র ইন্দ্রজিতের নিধনে।
দুই জন অনুরোধ করিছ আমারে
নাশিতে কনক-লঙ্কা। মোর সাধ্য নহে
সাধিতে এ কার্য্য। বিরূপাক্ষের রক্ষিত
রক্ষঃ-কুল ; তিনি বিনা তব এ বাসনা,
বাসব, কে পারে, কহ, পুর্ণিতে জগতে?
যোগে মগ্ন, দেবরাজ, বৃষধ্বজ আজি।
যোগাসন নামে শৃঙ্গ, মহাভয়ঙ্কর,
ঘন ঘনাবৃত, তথা বসেন বিরলে
যোগীন্দ্র। কেমনে যাবে তাঁহার সমীপে?
পক্ষীন্দ্র গরুড় সেথা উড়িতে অক্ষম!”
১২। দাসীর কলঙ্ক---আমার পতিকে হে ইন্দ্রজিত রণে পরাভূত করে, এই আমার কলঙ্ক।
১৬। মঞ্জুনাশিনী---সুন্দরী-কুল-গর্ব্ব-হারিণী।
১৭। নিধন---নাশ।
২৩। বৃষধ্বজ---শিব।
গ্রন্থের ৬৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কহিলা বিনত-ভাবে অদিতিনন্দন ;---
“তোমা বিনা কার শক্তি, হে মুক্তি-দায়িনি
জগদম্বে, যায় যে সে যথা ত্রিপুরারি
ভৈরব? বিনাশি, দেবি, রক্ষঃ-কুল, রাখ
ত্রিভুবন ; বৃদ্ধি কর ধর্ম্মের মহিমা ;
হ্রাসো বসুধার ভার ; বসুন্ধরাধর
বাসুকিরে কর স্থির ; বাঁচাও রাঘবে।”
এইরূপে দৈত্য-রিপু স্তুতিলা সতীরে।
হেন কালে গন্ধামোদে সহসা পূরিল
পুরী ; শংখঘণ্টাধ্বনি বাজিল চৌদিকে
মঙ্গল নিক্কণ সহ, মৃদু যথা যবে
দূর কুঞ্জবনে গাহে পিককুল মিলি!
টলিল কনকাসন! বিজয়া সখীরে
সম্ভাষিয়া মধুস্বরে, ভবেশ-ভাবিনী
সুধিলা ; “লো বিধুমুখি, কহ শীঘ্র করি,
কে কোথা, কি হেতু মোরে পূজিছে অকালে?”
মন্ত্র পড়ি, খড়ি পাতি, গণিয়া গণনে,
নিবেদিলা হাসি সখী ; “হে নগনন্দিনি,
দাশরথি রথী তোমা পূঞ্জে লঙ্কাপুরে।
বারি-সংঘটিত-ঘটে, সুসিন্দুরে আঁকি
ও সুন্দর পদযুগ, পূজে রঘুপতি
নীলোৎপলাঞ্জলি দিয়া, দেখিনু গণনে।
অভয়-প্রদান তারে কর গো, অভয়ে।
পরম ভকত তব কৌশল্যা-নন্দন
রঘুশ্রেষ্ঠ ; তার তারে বিপদে, তারিণি!”
কাঞ্চন-আসন ত্যজি, রাজরাজেশ্বরী
উঠিয়া, কহিলা পুনঃ বিজয়ারে সতী ;---
“দেব-দম্পতীরে তুমি সেব যথাবিধিত,
৩। জগদম্বে---জগদ্মাতা।
৮। স্বতিলা---স্তব করিলা।
১১। মঙ্গল নিকণ--মঙ্গলধ্বনি।
গ্রন্থের ৬৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
বিজয়ে! যাইব আমি যথা যোগাসনে
(বিকটশিখর!) এবে বসেন ধূর্জ্জটি।”
এতেক কহিয়া দুর্গা দ্বিরদ-গামিনী
প্রবেশিলা হৈম গেহে। দেবেন্দ্র বাসবে
ত্রিদিব-মহিষী সহ, সম্ভাষি আদরে,
স্বর্ণাসনে বসাইলা বিজয়া সুনারীষ
পাইলা প্রসাদ দোঁহে পরম-আহ্লাদে।
শচীর গলায় জয়া হাসি দোলাইলা
তারাকারা ফুলমালা ; কবরী-বন্ধনে
বসাইলা চিররুচি, চির-বিকচিত
কুসুম-রতন-রাজী ; বাজিল চৌদিকে
যন্ত্রদল, বামাদল গাইল নাচিয়া।
মোহিল কৈলাসপুরী ; ত্রিলোক মোহিল!
স্বপনে শুনিয়া শিশু সে মধুর ধ্বনি,
হাসিল মায়ের কোলে, মুদিত নয়ন!
নিদ্রাহীন বিরহিণী চমকি উঠিলা।
ভাবি প্রিয়-পদ-শব্দ শুনিলা ললনা
দুয়ারে! কোকিলকুল নীরবিল বনে।
উঠিলেন যোগীব্রজ, ভাবি ইষ্টদেব,
বর মাগ বলি, আসি দরশন দিলা!
প্রবেশি সুবর্ণ-গেহে, ভবেশ-ভাবিনী
ভাবিলা, “কি ভাবে আজি ভেটিব ভবেশে?”
ক্ষণ কাল চিন্তি সতী চিন্তিলা রতিরে।
২। বিকটশিখর---ভীষণশৃঙ্গ। মহাদেব এই শৃঙ্গোপরি বসিয়া যোগসাধন করেন বলিয়া ইহা যোগাসন নামে বিখ্যাত। কবি এই সর্গের স্থানান্তরে তাহা স্পটরূপে লিখিয়াছেন, যথা---
কৈলাসশিখরীশিরে ভীষণশিখর
ভৃগুমান্ , যোগাসন নামেতে বিখ্যাত
ভুবনে * * *
৯। তারাকারা---তারাকৃতি, অর্থাৎ তারাস্বরূপ।
২১। ভবেশভাবিনী---শিবমোহিনী দুর্গা।
২২। ভেটিব---সাক্ষাৎ করিব।
গ্রন্থের ৬৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
যথায় মন্মথ-সাথে, মন্মথ-মোহিনী
বরাননা, কুঞ্জবনে বিহারিতেছিলা,
তথায় উমার ইচ্ছা পরিমলময়
বায়ু-তরঙ্গিণী-রূপে, বহিল নিমিষে।
নাচিল রতির হিয়া বীণা-তার যথা
অঙ্গুলির পরশনে! গেলা কামবধূ ,
দ্রুতগতি বায়ু-পথে, কৈলাস-শিখরে।
সরসে নিশান্তে যথা ফুটি, সরোজিনী
নমে ত্বিষাম্পতি-দূতী উষার চরণে,
নমিলা মদন-প্রিয়া হরপ্রিয়া-পদে!
আশীষি রতিরে, হাসি কহিলা অন্বিকা ;---
“যোগাসনে তপে মগ্ন যোগীন্দ্র ; কেমনে,
কোন্ রঙ্গে, ভঙ্গ করি তাঁহার সমাধি,
কহ মোরে, বিধুমুখি?” উত্তরিলা নমি
সুকেশিনী ;---“ধর, দেবি, মোহিনী মূরতি।
দেহ আজ্ঞা, সাজাই ও বর বপুঃ, আনি
নানা আভরণ ; হেরি যে সবে, পিনাকী
ভূলিবেন, ভুলে যথা ঋতুপতি, হেরি
মধুকালে বনস্থলী কুসুম-কুন্তলা!”
এতেক কহিয়া রতি, সুবাসিত তেলে
মাজি চুল, বিনানিলা মনোহর বেণী।
যোগাইলা আনি ধনী বিবিধ ভূষণে,
হীরক, মুকুতা, মণি খচিত ; আনিলা
চন্দন, কেশর সহ কুঙ্কুম, কস্তুরী ;
রত্ন-সঙ্কলিত-আভা কৌষেয় বসনে।
লাক্ষারসে পা দুখানি চিত্রিলা হরষে
২। বিহারিতেছিলা---বিহার করিতেছিলা।
৯। ত্বিষাম্পতি---সূর্য্য।
১৩। সমাধি-ধ্যান।
১৭। পিনাকী---পিনাক নামক ধনুর্দ্ধারী---অর্থাৎ শিব।
২৫। কৌষেয়---রত্নবিশেষ। রত্ন-সঙ্কলিত-আভা---অর্থাৎ যে বস্ত্রে বিবিধ রত্নের আভা আছে।
২৬। লাক্ষারস---আল্ তা।
গ্রন্থের ৬৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
চারুনেত্রা। ধরি মূর্ত্তি ভুবনমোহিনী,
সাজিলা নগেন্দ্র-বালা ; রসানে মার্জ্জিত
হেম-কান্তি-সম কান্তি দ্বিগুণ শোভিল!
হেরিলা দর্পণে দেবী ও চন্দ্র-আননে ;
প্রফুল্ল নলিনী যথা বিমল সলিলে
নিজ-বিকচিত-রুচি। হাসিয়া কহিলা,
চাহি স্মর-হর-প্রিয়া স্মর-প্রিয়া পানে,---
“ডাক তব প্রাণনাথে।” অমনি ডাকিলা
(পিককুলেশ্বরী যথা ডাকে খতুবরে!)
মদনে মদন-বাঞ্ছা। আইলা ধাইয়া
ফুল-ধনুঃ ; আসে যথা প্রবাসে প্রবাসী,
স্বদেশ-সঙ্গীত-ধ্বনি শুনি রে উল্লাসে!
কহিলা শৈলেশসুতা ; “চল মোর সাথে,
হে মন্মথ যাব আমি যথা যোগীপতি
যোগে মগ্ন এবে ; বাছা, চল ত্বরা করি।”
অভয়ার পদতলে মায়ার নন্দন,
মদন আনন্দময়, উত্তরিলা ভয়ে ;---
“হেন আজ্ঞা কেন, দেবি, কর এ দাসেরে?
স্মরিলে পূর্ব্বের কথা, মরি, মা, তরাসে!
মূঢ় দক্ষ-দোষে যবে দেহ ছাড়ি, সতি,
হিমাদ্রির গৃহে জন্ম গ্রহিলা আপনি,
তোমার বিরহ-শোকে বিশ্ব-ভার ত্যজি
বিশ্বনাথ, আরম্ভিলা ধ্যান ; দেবপতি
ইন্দ্র আদেশিলা দাসে সে ধ্যান ভাঙিতে।
কুলগ্নে গেনু, মা, যথা মগ্ন বামদেব
তপে ; ধরি ফুল-ধনুঃ, হানিনু কুক্ষণে
ফুল-শর। যথা সিংহ সহসা আক্রমে
গজরাজে, পূরি বন ভীষণ গর্জ্জনে,
৭। স্মর-হর-প্রিয়া---শিবপ্রিয়া দুর্গা। স্মরপ্রিয়া---কামপ্রিয়া রতি।
১২। স্বদেশ-সঙ্গীত-ধ্বনি---স্বদেশীয় ভাষা শব্দ।
গ্রন্থের ৭০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
গ্রাসিলা দাসেরে আসি রোষে বিভাবসু,
বাস যাঁর, ভবেশ্বরি, ভবেশ্বর-ভালে।
হায়, মা, কত যে জ্বালা সহিনু, কেমনে
নিবেদি ও রাঙা পায়ে? হাহাকার রবে,
ডাকিনু বাসবে, চন্দ্রে, পবনে, তপনে ;
কেহ না আইল ; ভস্ম হইনু সত্বরে!---
ভয়ে ভগ্নোদ্যম আমি ভাবিয়া ভবেশে ;---
ক্ষম দাসে, ক্ষেমঙ্করি! এ মিনতি পদে।”
আশ্বাসি মদনে, হাসি কহিলা শঙ্করী ;---
“চল রঙ্গে মোর সঙ্গে নির্ভয় হৃদয়ে,
অনঙ্গ। আমার বরে চিরজয়ী তুমি!
যে অগ্নি কুলগ্নে তোমা পাইয়া স্বতেজে
জ্বালাইল, পূজা তব করিবে দে আজি,
ঔষধের গুণ ধরি, প্রাণ-নাশ-কারী
বিষ যথা রক্ষে প্রাণ বিদ্যার কৌশলে।”
প্রণমিয়া কাম তবে উমার চরণে,
কহিলা ; “অভয় দান কর যারে তুমি,
অভয়ে, কি ভয় তার এ তিন ভুবনে?
কিন্তু নিবেদন করি ও কমল-পদে ;---
কেমনে মন্দির হতে, নগেন্দ্র-নন্দিনি,
বাহিরিবা, কহ দাসে, এ মোহিনী-বেশে?
মুহূর্ত্তে মাতিবে, মাতঃ, জগত, হেরিলে
ও রূপ-মাধুরী ; সত্য কহিনু তোমারে।
হিতে বিপরীত, দেবি, সত্বরে ঘটিবে।
সুরাসুর-বৃন্দ যবে মথি জলনাথে,
লভিলা অমৃত, দুষ্ট দিতিসুত যত
বিবাদিল দেব সহ সুধামধু-হেতু।
মোহিনী মূরতি ধরি আইলা শ্রীপতি।
হারাইলা জ্ঞান সবে এ দাসের শরে!
গ্রন্থের ৭১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
অধর-অমৃত-আশে ভুলিলা অমৃত
দেব-দৈত্য ; নাগদল নম্রশিরঃ লাজে,
হেরি পৃষ্ঠদেশে বেণী ; মন্দর আপনি
অচল হইল হেরি উচ্চ কুচ-যুগে!
স্মরিলে সে কথা, সতি, হাসি আসে মুখে।
মলম্বা অন্বরে তাম্র এত শোভা যদি
ধরে, দেবি, ভাবি দেখ বিশুদ্ধ কাঞ্চন-
কান্তি কত মনোহর!” অমনি অম্বিকা,
সুবর্ণ বরণ ঘন মায়ায় সৃজিয়া,
মায়াময়ী, আবরিলা চারু অবয়বে।
হায় রে, নলিনী যেন দিবা-অবসানে
ঢাকিল বদনশশী! কিম্বা অগ্নি-শিখা,
ভস্মরাশি মাঝে পশি, হাসি লুকাইলা!
কিম্বা সুধা-ধন যেন, চক্র-প্রসরণে,
বেড়িলেন দেব শক্রু সুধাংশু-মণ্ডলে!
দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত গৃহদ্বার দিয়া
বাহিরিলা সুহাসিনী, মেঘাবৃতা যেন
ঊষা! সাথে মনমথ, হাতে ফুল-ধনুঃ,
পৃষ্ঠে তূণ, খরতর ফুল-শরে ভরা---
কণ্টকময় মৃণালে ফুটিল নলিনী!
কৈলাস-শিখরি-শিরে ভীষণ শিখর
ভৃগুমান্ , যোগাসন নামেতে বিখ্যাত
ভুবনে ; তথায় দেবী ভুবন-মোহিনী
৬। মলম্বা---ন্বর্ণ পত্র। অম্বর---বসন। মলম্বা অন্বরে ইত্যাদি---তাম্র স্বর্ণপত্রস্বরূপ বস্ত্রাবৃত হইলে, অর্থাং তামায় গিল্টী করিলে যদি এত শোভা হয়, তাহা হইলে, বিশুদ্ধ কাঞ্চনকান্তি কত মনোহর হইবে। শ্রীপতি বিষ্ণু পুরুষ হইয়া স্ত্রী-বেশ ধরিতে যখন এত মনোহর হইয়াছিলেন, তখন তুমি প্রকৃত নারী, তোমাকে এ বেশে দেখিলে লোকের কি দশা না ঘটিবে?
২০। কণ্টকময় মৃণালে ইত্যাদি---অগ্রে দুর্গা নলিনীস্বরূপ, পশ্চাতে মদন কণ্টকময় মৃণাল। তূণস্থ শর---সকল কণ্টকস্বরূপ।
গ্রন্থের ৭২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
উত্তরিলা গজপতি। অমনি চৌদিকে
গভীর গহ্বরে বদ্ধ, ভৈরব নিনাদী
জলদল নীরবিলা, জল-কান্ত যথা
শান্ত শান্তিসমাগমে ; পলাইল দূরে
মেঘদল, তমঃ যথা ঊষার হসনে!
দেখিলা সম্মুখে দেবী কপর্দ্দী তপসী,
বিভূতি-ভূষিত দেহ, মুদিত নয়ন,
তপের সাগরে মগ্ন, বাহ্য-জ্ঞান-হত।
কহিলা মদনে হাসি সুচারুহাসিনী ;---
“কি কাজ বিলম্বে আর, হে শম্বর-অরি?
হান তব ফুল-শর।” দেবীর আদেশে,
হাঁটু পাড়ি মীনধ্বজ, শিঞ্জিনী টংকারি,
সম্মোহন-শরে শূর বিঁধিলা উমেশে!
সিহরিলা শূলপাণি। লড়িল মস্তকে
জটাজুট, তরুরাজী যথা গিরিশিরে
ঘোর মড় মড় রবে লড়ে ভূকম্পনে।
অধীর হইলা প্রভু! গরজিলা ভালে
চিত্রভানু, ধকধকি উজ্জ্বল জ্বলনে!
ভয়াকুল ফুল-ধনুঃ পশিলা অমনি
ভবানীর বক্ষঃ-স্থলে, পশয়ে যেমতি
কেশরী-কিশোর ত্রাসে, কেশরিণী-কোলে,
গম্ভীর নির্ঘোষে ঘোষে ঘনদল যবে,
বিজলী ঝলসে আঁখি কালানল তেজে!
উন্মীলি নয়ন এবে উঠিলা ধূর্জ্জটি।
মায়া-ঘন-আবরণ ত্যজিলা গিরিজা।
8। শান্তিদেবী আইলে যেমন সমুদ্র শান্তভাব ধরেন।
৬। কপর্দ্দী---মহাদেব।
১৮। চিত্রভানু--অগ্নি।
২১। কেশরী-কিশোর ইত্যাদি---মেঘের গর্জ্জনে এবং বিদ্যুদগ্নিতে ভীত হইয়া যেমন কেশরী-কিশোর অর্থাৎ সিংহশাবক সিংহীর ক্রোড়দেশে প্রবেশ করে, সেইরূপ শিবের ললাটস্থ অগ্নির গর্জ্জনে ও তেজে ভীত হইয়া, মদন ভগবতীর বক্ষঃস্থলে আশ্রয় লইলেন।
গ্রন্থের ৭৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
মোহিত মোহিনীরূপে, কহিলা হরষে
পশুপতি ; “কেন হেথা একাকিনী দেখি,
এ বিজন স্থলে, তোমা, গণেন্দ্রজননি?
কোথায় মৃগেন্দ্র তব কিঙ্কর, শঙ্করি?
কোথায় বিজয়া, জয়া?” হাসি উত্তরিলা
সুচারুহাসিনী উমা ; “এ দাসীরে, ভুলি,
হে যোগীন্দ্র, বহুদিন আছ এ বিরলে ;
তেঁই আসিয়াছি, নাথ, দরশন-আশে
পা দুখানি। যে রমণী পতিপরায়ণা,
সহচরী সহ সে কি যায় পতি-পাশে?
একাকী প্রত্যুষে, প্রভু, যায় চক্রবাকী
যথা প্রাণকান্ত তার!” আদরে ঈশান,
ঈষত হাসিয়া দেব, অজিন-আসনে
বলাইলা ঈশানীরে। অমনি চৌদিকে
প্রফুল্লিল ফুলকুল ; মকরন্দ-লোভে
মাতি শিলীমুখবৃন্দ আইল ধাইয়া ;
বহিল মলয়-বায়ু ; গাইল কোকিল ;
নিশার শিশিরে ধৌত কুসুম-আসার
আচ্ছাদিল শৃঙ্গবরে! উমার উরসে
(কি আর আছে রে বাসা সাজে মনসিজে
ইহা হতে!) কুসুমেষু, বসি কুতূহলে,
হানিলা, কুসুম-ধনুঃ টঙ্কারি কৌতুকে
শর-জাল ; ---প্রেমামোদে মাতিলা ত্রিশূলী!
লজ্জা-বেশে রাহু আসি গ্রাসিল চাঁদেরে,
হাসি ভস্মে লুকাইলা দেব বিভাবসু!
মোহন মূরতি ধরি, মোহি মোহিনীরে
কহিলা হাসিয়া দেব ; “জানি আমি, দেবি,
২৪-২৫। চন্দ্রচুড়কে কামমদে মত্ত দেখিয়া ললাটস্থ চন্দ্র লজ্জায় মলিন হইলেন। অগ্নিও ভস্মাবৃত হইয়া রহিলেন।
গ্রন্থের ৭৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
তোমার মনের কথা,---বাসব কি হেতু
শচী সহ আসিয়াছে কৈলাস-সদনে ;
কেন বা অকালে তোমা পূজে রঘুমণি?
পরম ভকত মম নিকষানন্দন ;
কিন্তু নিজ কর্ম্ম-ফলে মজে দুষ্টমতি।
বিদরে হৃদয় মম স্মরিলে সে কথা,
মহেশ্বরি! হায়, দেবি, দেবে কি মানবে,
কোথা হেন সাধ্য রোধে প্রাক্তনের গতি?
পাঠাও কামেরে, উমা, দেবেন্দ্র সমীপে।
সত্বরে যাইতে তারে আদেশ, মহেশি,
মায়াদেবী-নিকেতনে। মায়ার প্রসাদে,
বধিবে লক্ষ্মণ শূর মেঘনাদ শূরে।”
চলি গেলা মীনধ্বজ, নীড় ছাড়ি উড়ে
বিহঙ্গম-রাজ যথা, মুহুর্ম্মুহুঃ চাহি
সে সুখ-সদন পানে! ঘন রাশি রাশি,
স্বর্ণবর্ণ, সুবাসিত বাস শ্বাসি ঘন,
বরষি প্রসূনাসার---কমল, কুমুদী,
মালতী, সেঁউতি, জাতি, পারিজাত-আদি
মন্দ-সমীরণ-প্রিয়া---ঘিরিল চৌদিকে
দেবদেব মহাদেবে মহাদেবী সহ।
দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত হৈমময় দ্বারে
দাঁড়াইলা বিধুমুখী মদন-মোহিনী,
অশ্রুময় আঁখি, আহা! পতির বিহনে!
হেন কালে মধু-সখা উতরিলা তথা।
অমনি পসারি বাহু, উল্লাসে মন্মথ
আলিঙ্গন-পাশে বাঁধি, তুষিলা ললনে
১৯। তারে---ইন্দ্রকে।
১৫-১৬। ঘন রাশি রাশি ইত্যাদি। স্বর্ণবর্ণ মেঘপুঞ্জ সুরভিবায়ুস্বরূপ নিশ্বাস ত্যাগ এবং নানা প্রকার সুগন্ধ পুষ্প বৃষ্টি করিয়া দেব-দম্পতীকে বেষ্টিত করিল।
১৭। প্রসূনাসার---পুষ্পবৃষ্টি।
গ্রন্থের ৭৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
প্রেমালাপে। শুখাইল অশ্রুবিন্দু, যথা
শিশির-নীরের বিন্দু শতদল-দলে,
দরশন দিলে ভানু উদয়-শিখরে।
পাই প্রাণ-ধনে ধনী, মুখে মুখ দিয়া,
(সরস বসন্তকালে সারী শুক যথা)
কহিলেন প্রিয়-ভাষে ; “বাঁচালে দাসীরে
আশু আসি তার পাশে, হে রতি-রঞ্জন ;
কত যে ভাবিতেছিনু, কহিব কাহারে?
বামদেব নামে, নাথ, সদা, কাঁপি আমি,
স্মরি পুর্ব্ব-কথা যত! দুরন্ত হিংসক
শূলপাণি! যেয়ো না গো আর তার কাছে,
মোর কিরে প্রাণেশ্বর!” সুমধুর হাসে
উত্তরিলা পঞ্চশর ; “ছায়ার আশ্রমে,
কে কবে ভাস্কর-করে ডরায়, সুন্দরি!
চল এবে যাই যথা দেবকুল-পতি।”
সুবর্ণ-আসনে যথা বসেন বাসব,
উতরি মম্মথ তথা, নিবেদিলা নমি
বারতা। আরোহি রথে দেবরাজ রথী
চলি গেলা দ্রুতগতি মায়ার সদনে।
অগ্নিময় তেজঃ বাজী ধাইল অন্বরে,
অকম্প চামর শিরে? গম্ভীর নির্ঘোষে
ঘোষিল রথের চক্র, চূর্ণি মেঘদলে।
কত ক্ষণে সহস্রাক্ষ উতরিলা বলী
যথা বিরাজেন মায়া। ত্যজি রথ-বরে,
সুরকুল-রথীবর পশিলা দেউলে।
কত যে দেখিলা দেব কে পারে বর্ণিতে?
৩। ভানু---সূর্য্য।
৯। বামদেব---মহাদেব।
১৩। পঞ্চশর---পঞ্চবাণ অর্থাৎ কন্দর্প।
১৪। ভাস্কর-কর - সূর্য্যকিরণ।
১৬। বাসব---ইন্দ্র।
২০। বাজী---ঘোড়া।
২৩। সহস্রাক্ষ---ইন্দ্র।
গ্রন্থের ৭৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সৌর-খরতর-কর-জাল-সঙ্কলিত
আভাময় স্বর্ণাসনে বসি কুহকিনী
শক্তীশ্বরী। কর-যোড়ে বাসব প্রণমি
কহিলা ;---আশীষ দাসে, বিশ্ব-বিমোহিনি!”
আশীষি সুধিলা দেবী ;--- “কহ কি কারণে,
গতি হেথা আজি তব, অদিতি-নন্দন?”
উত্তরিলা দেবপতি ;--- “শিবের আদেশে,
মহামায়া, আসিয়াছি তোমার সদনে।
কহ দাসে, কি কৌশলে সৌমিত্রি জিনিবে
দশানন-পুত্রে কালি? তোমার প্রসাদে
(কহিলেন বিরূপাক্ষ) ঘোরতর রণে
নাশিবে লক্ষণ শূর মেঘনাদ শূরে।”
ক্ষণ কাল চিন্তি দেবী কহিলা বাসবে ;---
“দুরন্ত তারকাসুর, সুর-কুল-পতি,
কাড়ি নিল স্বর্গ যবে তোমায় বিমুখি
সমরে ; কৃত্তিকা-কুল-বল্লভ সেনানী,
পার্বতীর গর্ভে জন্ম লভিলা তৎকালে।
বধিতে দানব-রাজে সাজাইলা বীরে
আপনি বৃষভ-ধ্বজ, সৃজি রুদ্র-তেজে
অস্ত্রে। এই দেখ, দেব, ফলক, মণ্ডিত
সুবর্ণে ; ওই যে অসি, নিবাসে উহাতে
আপনি কৃতান্ত ; ওই দেখ, সুনাসীর,
ভয়ঙ্কর তূণীরে, অক্ষয়, পূর্ণ শরে,
বিষাকর ফণী-পূর্ণ নাগ-লোক যথা!
ওই দেখ ধনুঃ, দেব!” কহিলা হাসিয়া,
হেরি সে ধনুর কান্তি, শচীকান্ত বলী,
১। সৌর-খরতর-কর-জাল ইত্যাদি---সূর্য্যের করজালনির্ম্মিত, অর্থাৎ অতীব উজ্জ্বল।
৯। সৌমিত্রি---সুমিত্রানন্দন লক্ষ্মণ।
১৬। কৃত্তিকাকুলবল্লভ সেনানী---কার্ত্তিকেয়।
১৯। বৃষভ-ধ্বজ---শিব। ২০। ফলক---ঢাল।
২২। সুনাসীর---হে ইন্দ্র।
গ্রন্থের ৭৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
“কি ছার ইহার কাছে দাসের এ ধনুঃ
রত্নময়! দিবাকর-পরিধি যেমতি,
জ্বলিছে ফলক-বর---ধাঁধিয়া নয়নে!
অগ্নিশিখা-সম অসি মহাতেজস্কর!
হেন তূণ আর, মাতঃ, আছে কি জগতে?”
“শুন দেব,“ (কহিলেন পুনঃ মায়াদেবী)
“ওই সব অস্ত্রবলে নাশিলা তারকে
ষড়ানন। ওই সব অস্ত্রবলে, বলি,
মেঘনাদ-মৃত্যু, সত্য কহিনু তোমারে।
কিন্তু হেন বীর নাহি এ তিন ভুবনে,
দেব কি মানব, ন্যায়যুদ্ধে যে বধিবে
রাবণিরে। প্রের তুমি অস্ত্র রামানুজে,
আপনি যাইব আমি কালি লঙ্কাপুরে,
রক্ষিব লক্ষ্মণে, দেব, রাক্ষস-সংগ্রামে।
যাও চলি সুর-দেশে, সুরদল-নিধি।
ফুল-কুল-সখী ঊষা যখন খুলিবে
পূর্ব্বাশার হৈমদ্বারে পদ্মকর দিয়া
কালি, তব চির-ত্রাস, বীরেন্দ্রকেশরী
ইন্দ্রজিৎ-ত্রাস-হীন করিবে তোমারে---
লঙ্কার পঙ্কজ-রবি যাবে অস্তাচলে!”
মহানন্দে দেব-ইন্দ্র বন্দিয়া দেবীরে,
অস্ত্র লয়ে গেলা চলি ত্রিদশ-আলয়ে।
বসি দেব-সভাতলে কনক-আসনে
বাসব, কহিলা শূর চিত্ররথ শূরে ;---
“যতনে লইয়া অস্ত্র, যাও মহাবলি,
স্বর্ণ-লঙ্কা-ধামে তুমি। সৌমিত্রি কেশরী
মায়ার প্রসাদে কালি বধিবে সমরে
মেঘনাদে। কেমনে, তা দিবেন কহিয়া
১৭। পূর্ব্বাশায়---পূর্ব্বদিকের।
১৯। ইন্দ্রজিৎ-ত্রাস-হীন করিবে---কেন না লক্ষণ তাহাকে বধ করিবে।
গ্রন্থের ৭৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
মহাদেবী মায়া তারে। কহিও রাঘবে,
হে গন্ধর্ব্ব-কুল-পতি, ত্রিদিব-নিবাসী
মঙ্গল-আকাঙ্ক্ষী তার ; পার্ব্বতী আপনি
হর-প্রিয়া, সুপ্রসন্ন তার প্রতি আজি।
অভয় প্রদান তারে করিও সুমতি।
মরিলে রাবণি রণে, অবশ্য মরিবে
রাবণ ; লভিবে পুনঃ বৈদেহী সতীরে
বৈদেহী-মনোরঞ্জন রঘুকুল-মণি।
মোর রথে, রথীবর, আরোহণ করি
যাও চলি। পাছে তোমা হেরি লঙ্কা-পুরে,
বাধায় বিবাদ রক্ষঃ ; মেঘদলে আমি
আদেশিব আবরিতে গগনে ; ডাকিয়া
প্রভঞ্জনে, দিব আজ্ঞা ক্ষণ ছাড়ি দিতে
বায়ু-কুলে ; বাহিরিয়া নাচিবে চপলা ;
দম্ভোলি-গম্ভীর-নাদে পূরিব জগতে।”
প্রণমি দেবেন্দ্র-পদে, সাবধানে লয়ে
অস্ত্রে, চলি গেলা মর্ত্ত্যে চিত্ররথ রথী।
তবে দেব-কুল-নাথ ডাকি প্রভঞ্জনে
কহিলা, “প্রলয়-ঝড় উঠাও সত্বরে
লঙ্কাপুরে, বায়ুপতি ; শীঘ্র দেহ ছাড়ি
কারাবদ্ধ বায়ুদলে ; লহ মেঘদলে ;
দ্বন্দ্ব ক্ষণ-কাল বৈরী বারি-নাথ সনে
নির্ঘোষে!” উল্লাসে দেব চলিলা অমনি,
ভাঙিলে শৃঙ্খল লম্ফী কেশরী যেমতি,
যথায় তিমিরাগারে রুদ্ধ বায়ু যত
গিরি-গর্ভে। কত দূরে শুনিলা পবন
ঘোর কোলাহলে ; গিরি (দেখিলা) লড়িছে
১৪। চপলা---চঞ্চলা অর্থাৎ বিদ্যুৎ।
১৫। দম্ভোলি---বজ্র।
১৮। প্রভঞ্জন---বায়ু।
গ্রন্থের ৭৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
অন্তরিত পরাক্রমে, অসমর্থ যেন
রোধিতে প্রবল বায়ু আপনার বলে।
শিলাময় দ্বার দেব খুলিলা পরশে।
হুহুঙ্কারি বায়ুকুল বাহিরিল বেগে
যথা অম্বুরাশি, যবে ভাঙে আচম্বিতে
জাঙাল! কাঁপিল মহী ; গর্জ্জিল জলধি!
তুঙ্গ-শৃঙ্গধরাকারে তরঙ্গ-আবলী
কল্লোলিল, বায়ু-সঙ্গে রণরঙ্গে মাতি!
ধাইল চৌদিকে মন্দ্রে জীমূত ; হাসিল
ক্ষণ-প্রভা ; কড়মড়ে নাদিল দম্ভোলি।
পলাইলা তারানাথ তারাদলে লয়ে।
ছাইল লঙ্কায় মেঘ, পাবক উগরি
রাশি রাশি ; বনে বৃক্ষ পড়িল উপড়ি
মড়মড়ে ; মহাঝড় বহিল আকাশে ;
বর্ষিল আসার যেন সৃষ্টি ডুবাইতে
প্রলয়ে। বৃষ্টিল শিলা তড়তড়তড়ে।
পশিল আতঙ্কে রক্ষঃ যে যাহার ঘরে।
যথায় শিবির মাঝে বিরাঞ্জেন বলী
রাঘবেন্দ্র, আচম্বিতে উতরিল। রথী
চিত্ররথ, দিবাকর যেন অংশুমালী,
রাজ-আভরণ দেহে! শোভে কটিদেশে
সারসন, রাশি-চক্র-সম তেজোরাশি,
ঝোলে তাহে অসিবর---ঝল ঝল ঝলে!
কেমনে বর্ণিবে কবি দেব-তূণ, ধনুঃ,
১। অন্তরিত পরাক্রমে---কেন না পরাক্রমী বায়ুদল তাহার অন্তরে অর্থাৎ গর্ভদেশে আবদ্ধ রহিয়াছে।
৭। তুঙ্গ-শৃঙ্গধরাকারে---উচ্চ পর্ব্বতাকারে। তরঙ্গ-আবলী---টেউসমূহ।
৯। মন্দ্র---গম্ভীর শব্দ। জীমূত---মেঘ।
১০। ক্ষণপ্রভা---বিদ্যুৎ।
১৬। বৃষ্টিল শিলা---শিলাবৃষ্টি হইল।
২২। সারসন---কট্যাভরণ অর্থাৎ কোমরবন্ধ।
গ্রন্থের ৮০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
চর্ম্ম, বর্ম্ম, শূল, সৌর-কিরীটের আভা
স্বর্ণময়ী? দৈববিভা ধাঁধিল নয়নে
স্বর্গীয় সৌরভে দেশ পুরিল সহসা।
সসম্ভ্রমে প্রণমিয়া, দেবদূত-পদে
রঘুধর, জিজ্ঞাসিলা, “হে ত্রিদিববাসি,
ত্রিদিব ব্যতীত, আহা, কোন্ দেশ সাজে
এ হেন মহিমা, রূপে?---কেন হেথা আজি,
নন্দন-কানন ত্যজি, কহ এ দাসেরে?
নাহি স্বর্ণাসন। দেব, কি দিব বসিতে?
তবে যদি কৃপা, প্রভু, থাকে দাস প্রতি,
পাদ্য, অর্ঘ্য লয়ে বসো এই কুশাসনে।
ভিখারী রাঘব, হায়!” আশীষিয়া রথী
কুশাসনে বসি তবে কহিলা সুস্বরে ;---
“চিত্ররথ নাম মম, শুন দাশরথি ;
চির-অনুচর আমি সেবি অহরহঃ
দেবেন্দ্রে ; গন্ধর্ব্বকুল আমার অধীনে।
আইমু এ পুরে আমি ইন্দ্রের আদেশে।
তোমার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী দেবকুল সহ,
দেবেশ। এই যে অস্ত্র দেখিছ নৃমণি,
দিয়াছেন পাঠাইয়া তোমার অনুজে
দেবরাজ। আবির্ভাবি মায়া মহাদেবী
প্রভাতে, দিবেন কহি, কি কৌশলে কালি
নাশিবে লক্ষণ শূর মেঘনাদ শূরে।
দেবকুল-প্রিয় তুমি, রঘুকুল-মণি।
সুপ্রসন্ন তব প্রতি আপনি অভয়া!”
কহিলা রঘুনন্দন ; “আনন্দ-সাগরে
১। সৌর-কিরীট---সূর্য্যসদৃশ উজ্জ্বল মুকুট।
৫-৭। হে ত্রিদিববাসি ইত্যাদি---হে স্বর্গবাসি, আপনি যে এক জন স্বর্গীয় পুরুষ, তাহার কোন সন্দেহ নাই। কেন না, স্বর্গ ব্যতীত আর কোন্ স্থলে লোকের এরূপ মহিমা এবং রূপের সম্ভব আছে?
২১। আবির্ভাবি---আবির্ভূত হইয়া।
গ্রন্থের ৮১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ভাসিনু, গন্ধর্ব্বশ্রেষ্ঠ, এ শুভ সংবাদে!
অজ্ঞ নর আমি ; হায়, কেমনে দেখাব
কৃতজ্ঞতা? এই কথা জিজ্ঞাসি তোমারে।”
হাসিয়া কহিল দূত ; “শুন, রঘুমণি,
দেব প্রতি কৃতজ্ঞতা, দরিদ্র-পালন,
ইন্দ্রিয়-দমন, ধর্ম্মপথে সদা গতি ;
নিত্য সত্য-দেবী-সেবা ; চন্দন, কুসুম,
নৈবেদ্য, কৌষিক বস্ত্র আদি বলি যত,
অবহেলা করে দেব, দাতা যে যদ্যপি
অসৎ! এ সার কথা কহিনু তোমারে!
প্রণমিলা রামচন্দ্র ; আশীষিয়া রথী
চিত্ররথ, দেবরথে গেলা দেবপুরে।
থামিল তুমুল ঝড় ; শান্তিলা জলধি ;
হেরিয়া শশাঙ্কে পুনঃ তারাদল সহ
হাসিল কনকলঙ্কা। তরল সলিলে
পশি, কৌমুদিনী পুনঃ অবগাহে দেহ
রজোময় ; কুমুদিনী হাসিল কৌতুকে।
আইল ধাইয়া পুনঃ রণ-ক্ষেত্রে। শিবা
শবাহারী ; পালে পালে গৃধিনী, শকুনি,
পিশাচ। রাক্ষসদল বাহিরিল পুনঃ
ভীম-প্রহরণ-ধারী---মত্ত বীরমদে।
ইতি শ্রীমেঘনাদবধে কাব্যে অস্ত্রলাভো নাম
দ্বিতীয়ঃ সর্গঃ।
৮। বলি---পূজোপহার।
১৫-১৭। তরল সলিলে ইত্যাদি---রজোময় কৈমুদিনী অর্থাৎ রৌপ্যপ্রভা চন্দ্রিকা পুনঃ তরল সলিলে অর্থাৎ চঞ্চল জলে দেহ অবগাহে---অবগাহন করিতে লাগিল, অর্থাৎ মেঘমুক্ত চন্দ্রের কিরণজাল পুনঃ জলস্থলে শোভমান হইল।
১৯। শিবা---শৃগালী।
১৯ শবাহারী---মৃতদেহভক্ষক।
২১। ভীম প্রহরণ---ভয়ানক অস্ত্র।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রথম প্রকাশ ১৮৬১।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে রামকমল সিংহ দ্বারা প্রকাশিত, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবি সজনীকান্ত দাস দ্বারা মূলতঃ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ সংস্করণ থেকে গৃহীত ও সম্পাদিত এবং ১২৭৪ বঙ্গাব্দে (১৮৬৭ সালে) প্রকাশিত, কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-কৃত টীকা ও ব্যাখ্যা সহ।
মিলনসাগরে প্রকাশ ২১শে ফেব্রুয়ারী ২০২৬।
গ্রন্থের ৫৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
দ্বিতীয় সর্গ
(অস্ত্রলাভো নাম)
অস্তে গেল! দিনমণি ; আইলা গোধূলি,---
একটি রতন ভালে। ফুটিলা কুমুদী ;
মুদিলা সরসে আঁখি বিরসবদনা
নলিনী ; কূজনি পাখী পশিল কুলায়ে ;
গোষ্ঠ-গৃহে গাভী-বৃন্দ ধায় হম্বা রবে।
আইলা সুচারু-তারা শশী সহ হাসি,
শর্ব্বরী ; সুগন্ধবহ বহিল চৌদিকে,
সুস্বনে সবার কাছে কহিয়া বিলাসী,
কোন্ কোন্ ফুল চুম্বি কি ধন পাইলা।
আইলেন নিদ্রা দেবী ; ক্লান্ত শিশুকুল
জননীর ক্রোড়-নীরে লভয়ে যেমতি
বিরাম, ভূচর সহ জলচর-আদি
দেবীর চরণাশ্রমে বিশ্রাম লভিলা।
উতরিলা শশিপ্রিয়া ত্রিদশ-আলয়ে।
বসিলেন দেবপতি দেবসভা মাঝে,
হৈমাসনে ; বামে দেবী পুলোম-নন্দিনী
চারুনেত্রা। রাজ-ছত্র, মণিময় আভা,
শোভিল দেবেন্দ্র-শিরে। রতনে খচিত
চামর যতনে ধরি, ঢুলায় চামরী।
আইলা সুসমীরণ, নন্দন-কানন-
গন্ধমধু বহি রঙ্গে। বাজিল চৌদিকে
ত্রিদিব-বাদিত্র। ছয় রাগ, মূর্ত্তিমতী
ছত্রিশ রাগিণী সহ, আসি আরম্ভিলা
সঙ্গীত। উর্ব্বশী, রম্ভা সুচারুহাসিনী,
চিত্রলেখা, সুকেশিনী মিশ্রকেশী, আসি
৬-৭। সুচারু-তারা শর্ব্বরী---সুন্দর তারাবৃন্দমণ্ডিত রজনী।
৮। বিলাসী---সৌখিন, ফুলবাবু।
২২। বাদিত্র---বাজনা।
গ্রন্থের ৫৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
নাচিলা, শিঞ্জিতে রঞ্জি দেব-কুল-মনঃ!
যোগায় গন্ধর্ব্ব স্বর্ণ-পাত্রে সুধারসে।
কেহ বা দেব-ওদন ; কুঙ্কুম, কস্তুরী,
কেশর বহিছে কেহ ; চন্দন কেহ বা ;
সুগন্ধ মন্দার-দাম গাঁথি আনে কেহ।
বৈজয়ন্ত-ধামে সুখে ভাসেন বাসব
ত্রিদিব-নিবাসী সহ ; হেন কালে তথা,
রূপের আভায় আলো করি সুর-পুরী,
রক্ষঃ-কুল-রাজলক্ষ্মী আসি উতরিলা।
সসম্ভ্রমে প্রণমিলা রমার চরণে
শচীকান্ত। আশীষিয়া হৈমাসনে বসি,
পদ্মাক্ষী পুণ্ডরীকাক্ষ-বক্ষোনিবাসিনী
কহিলা ; “হে সুরপতি, কেন যে আইনু
তোমার সভায় আজি, শুন মনঃ দিয়া।”
উত্তর করিলা ইন্দ্র ; “হে বারীন্দ্র-সুতে,
বিশ্বরমে, এ বিশ্বে ও রাঙা পা দুখানি
বিশ্বের আকাঙ্খা মা গো। যার প্রতি তুমি,
কৃপা করি, কৃপা-দৃষ্টি কর, কৃপাময়ি,
সফল জনম তারি! কোন্ পুণ্য-ফলে,
লভিল এ সুখ দাস, কহ, মা, দাসেরে?”
কহিলেন পুনঃ রমা, “বহুকালাবধি
আছি আমি, সুরনিধি, স্বর্ণ-লঙ্কাধামে।
বহুবিধ রত্নদানে, বহু যত্ন করি,
পূজে মোরে রক্ষোরাজ। হায়, এত দিনে
বাম তার প্রতি বিধি! নিজ কর্ম্ম-দোষে,
মজিছে সবংশে পাপী ; তবুও তাহারে
না পারি ছাড়িতে, দেব। বন্দী যে, দেবেন্দ্র,
১। শিঞ্জিতে---অলঙ্কার-ধ্বনিতে। ৩। ওদন--অন্ন।
১২। পুণ্ডরীকাক্ষ---বিষ্ণু।
গ্রন্থের ৬০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কারাগার-দ্বার নাহি খুলিলে কি কভু
পারে সে বাহির হতে? যত দিন বাঁচে
রাবণ, থাকিব আমি বাঁধা তার ঘরে।
মেঘনাদ নামে পুত্র, হে বৃত্রবিজয়ি,
রাবণের, বিলক্ষণ জান তুমি তারে।
একমাত্র বীর সেই আছে লঙ্কাধামে
এবে ; আর বীর যত, হত এ সমরে।
বিক্রম-কেশরী শূর আক্রমিবে কালি
রামচন্দ্রে ; পুনঃ তারে সেনাপতি-পদে
বরিয়াছে দশানন। দেব-কুল-প্রিয়
রাঘব ; কেমনে তারে রাখিবে, তা দেখ।
নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করি, আরম্ভিলে
যুদ্ধ দম্ভী মেঘনাদ, বিষম শঙ্কটে
ঠেকিবে বৈদেহীনাথ, কহিনু তোমারে ।
অজেয় জগতে মন্দোদরীর নন্দন,
দেবেন্দ্র! বিহঙ্গকুলে বৈনতেয় যথা
বল-জ্যেষ্ঠ, রক্ষঃ-কুল-শ্রেষ্ঠ শূরমণি!”
এতেক কহিয়া রমা কেশব-বাসনা
নীরবিলা ; আহ মরি, নীরবে যেমতি
বীণা, চিত্ত বিনোদিয়া সুমধুর নাদে!
ছয় রাগ, ছত্রিশ রাগিণী আদি যত,
শুনি কমলার বাণী, ভুলিলা সকলে
স্বকর্ম্ম ; বসন্তকালে পাখীকুল যথা,
মুঞ্জরিত কুঞ্জে, শুনি পিকবর-ধ্বনি!
কহিলেন স্বরীশ্বর ; “এ ঘোর বিপদে,
বিশ্বনাথ বিনা, মাতঃ, কে আর রাখিবে
রাঘবে? দুর্ব্বার রণে রাবণ-নন্দন।
৪। বৃত্রবিজয়ী---বৃত্রঘ্ন, ইন্দ্র।
১৬। বৈনতেয়---বিনতানন্দন, গরুড়।
১৭। বল-জ্যেষ্ঠ---বলে সর্ব্বাপেক্ষা প্রবল।
২৩। স্বকর্ম্ম---গীত বাদ্যাদি।
গ্রন্থের ৬১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
পন্নগ-অশনে নাগ নাহি ডরে যত,
ততোধিক ডরি তারে আমি! এ দম্ভোলি,
বৃত্রাসুর শিরঃ-চূর্ণ যাহে, বিমুখয়ে
অস্ত্র-বলে মহাবলী ; তেঁই এ জগতে
ইন্দ্রজিৎ নাম তার। সর্ব্বশুচি-বরে
সর্ব্বজয়ী বীরবর। দেহ আজ্ঞা দাসে,
যাই আমি শীঘ্রগতি কৈলাস-সদনে।”
কহিলা উপেন্দ্র-প্রিয়া বারীন্দ্রনন্দিনী ;---
“যাও তবে, সুরনাথ, যাও ত্বরা করি।
চন্দ্র-শেখরের পদে, কৈলাস-শিখরে,
নিবেদন কর, দেব, এ সব বারতা।
কহিও সতত কাঁদে বসুন্ধরা সতী,
না পারি সহিতে ভার ; কহিও, অনন্ত
ক্লান্ত এবে। না হইলে নির্ম্মুলি সমূলে
রক্ষঃপতি, ভবতল রসাতলে যাবে!
বড় ভাল বিরূপাক্ষ বাসেন লক্ষ্মীরে।
কহিও, বৈকুণ্ঠপুরী বহু দিন ছাড়ি
আছয়ে সে লঙ্কাপুরে! কত যে বিরলে
ভাবয়ে সে অবিরল, এক বার তিনি,
কি দোষ দেখিয়া, তারে না ভাবেন মনে?
কোন্ পিতা দুহিতারে পতি-গৃহ হতে
রাখে দূরে---জিজ্ঞাসিও, বিজ্ঞ জটাধরে!
ত্র্যম্বকে না পাও যদি, অম্বিকার পদে
কহিও এ সব কথা।” ---এতেক কহিয়া,
বিদায় হইয়া চলি গেলা শশিমুখী
হরিপ্রিয়া। অনম্বর-পথে সুকেশিনী,
কেশব-বাসনা দেবী গেলা অধোদেশে।
১। পরগ-অশন---সর্পভক্ষক, গরুড়।
৫। সর্ব্বশুচি---অগ্নি। মেঘনাদের ইষ্টদেব।
১০। চন্দ্র-শেখর---চন্দ্রশিরোভূষণ, শিব।
১৬। বিরূপাক্ষ---শিব।
২৩। ত্র্যম্বক---ত্রিলোচন, মহাদেব।
২৬। অনম্বর-পথ---আকাশপথ।
গ্রন্থের ৬২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সোণার প্রতিমা, যথা! বিমল সলিলে
ডুবে তলে জলরাশি উজলি স্বতেজে!
আনিলা মাতলি রথ ; চাহি শচী পানে
কহিলেন শচীকান্ত মধুর বচনে
একান্তে ; “চলহ, দেবি, মোর সঙ্গে তুমি!
পরিমল-সুধা সহ পবন বহিলে,
দ্বিগুণ আদর তার! মূণালের রুচি
বিকচ কমল-গুণে, শুন লো ললনে।”
শুনি প্রণয়ীর বাণী, হাসি নিতম্বিনী,
ধরিয়া পতির কর, আরোহিলা রথে।
স্বর্গ-হৈম-দ্বারে রথ উতরিল ত্বরা।
আপনি খুলিল দ্বার মধুর নিনাদে
অমনি! বাহিরি বেগে, শোভিল আকাশে
দেবযান ; সচকিতে জগত জাগিলা,
ভাবি রবিদেব বুঝি উদয়-অচলে
উদিলা! ডাকিল ফিঙা ; আর পাখী যত
পুরিল নিকুঞ্জ-পুঞ্জ প্রভাতী সংগীতে!
বাসরে কুসুম-শয্য ত্যজি লজ্জাশীলা
কুলবধূ , গৃহকার্য্য উঠিলা সাধিতে!
মানস-সকাশে শোভে কৈলাসশিখরী
আভাময় ; তার শিরে ভবের ভবন,
শিখি-পুচ্ছ-চূড়া যেন মাধবের শিরে!
সুশ্যামাঙ্গ শৃঙ্গধর ; স্বর্ণ-ফুল-শ্রেণী
শোভে তাহে, আহা মরি পীত ধড়া যেন!
নির্ঝর-ঝরিত-বারি-রাশি স্থানে স্থানে---
বিশদ চন্দনে যেন চর্চ্চিত সে বপুঃ!
ত্যজি রথ, পদব্রজে, সহ স্বরীশ্বরী,
৩। মাতলি--ইন্দ্রসারাথি।
১৩। বাহিরি---বাহির হইয়া।
১৯। রাত্রি প্রভাত হইয়াছে, এই ভাবিয়া।
গ্রন্থের ৬৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
প্রবেশিলা স্বরীশ্বর আনন্দ-ভবনে।
রাজরাজেশ্বরী-রূপে বসেন ঈশ্বরী
স্বর্ণাসনে ; ঢুলাইছে চামর বিজয়া ;
ধরে রাজ-ছত্র জয়া। হায়রে, কেমনে,
ভবভবনের কবি বর্ণিবে বিভব?
দেখ, হে ভাবুক জন, ভাবি মনে মনে!
পূজিলা শক্তির পদ মহাভক্তি ভাবে
মহেন্দ্র ইন্দ্রাণী সহ। আশীষি অম্বিকা
জিজ্ঞাসিলা ;---“কহ, দেব, কুশল বারতা,---
কি কারণে হেথা আজি তোমা দুই জনে? ”
কর-যোড়ে আরম্ভিলা দম্ভোলি-নিক্ষেপী ;---
“কি না তুমি জান, মাতঃ, অখিল জগতে?
দেবদ্রোহী লঙ্কাপতি, আকুল বিগ্রহে,
বরিয়াছে পুনঃ পুত্র মেঘনাদে আজি
সেনাপতি-পদে? কালি প্রভাতে কুমার
পরন্তপ প্রবেশিবে রণে, ইষ্টদেবে
পূজি, মনোনীত বর লভি তাঁর কাছে।
অবিদিত নহে, মাতঃ, তার পরাক্রম।
রক্ষঃ-কুল-রাজলক্ষ্মী, বৈজয়ন্ত-ধামে,
আসি, এ সংবাদ দাসে দিলা, ভগবতি।
কহিলেন হরিপ্রিয়া, কাঁদে বসুন্ধরা,
এ অসহ ভার সতী না পারি সহিতে ;
ক্লান্ত বিশ্বধর শেষ ; তিনিও আপনি
চঞ্চলা সতত এবে ছাড়িতে কনক-
লঙ্কাপুরী। তব পদে এ সংবাদ দেবী
আদেশিলা নিবেদিতে দাসেরে, অন্নদে!
দেব-কুল-প্রিয় বীর রঘু-কুল-মণি।
কিন্তু দেবকুলে হেন আছে কোন্ রথী
১৬। পরন্তপ---শত্রুপীড়ক।
২৩। তিনিও আপনি---স্বয়ং লক্ষ্মীও ;
গ্রন্থের ৬৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ “”
বুঝিবে যে রণ-ভূমে রাবণির সাথে?
বিশ্বনাশী কুলিশে, মা, নিস্তেজে সমরে
রাক্ষস, জগতে খ্যাত ইন্দ্রজিত নামে!
কি উপায়ে, কাত্যায়নি, রক্ষিবে রাঘবে,
দেখ ভাবি। তুমি কৃপা না করিলে, কালি
অরাম করিবে ভব দুরন্ত রাবণি।”
উত্তরিলা কাত্যায়নী ;---“শৈব-কুলোত্তম
নৈকষেয় ; মহা স্নেহ করেন ত্রিশূলী
তার প্রতি ; তার মন্দ, হে সুরেন্দ্র, কভু
সম্ভবে কি মোর হতে? তপে মগ্ন এবে
তাপসেন্দ্র, তেঁই, দেব, লঙ্কার এ গতি।”
কৃতাঞ্জলি-পুটে পুনঃ বাসব কহিলা;---
পরম-অধর্ম্মাচারী নিশাচর-পতি---
দেব-দ্রোহী! আপনি, হে নগেন্দ্র-নন্দিনি,
দেখ বিবেচনা করি। দরিদ্রের ধন
হরে যে দুর্ম্মতি, তব কৃপা তার প্রতি
কভু কি উচিত, মাতঃ? সুশীল রাঘব,
পিতৃ-সত্য-রক্ষা-হেতু, সুখ-ভোগ ত্যজি
পশিল ভিখারী-বেশে নিবিড় কাননে।
একটা রতনমাত্র তাহার আছিল
অমূল ; যতন কত করিত সে তারে,
কি আর কহিবে দাস? সে রতন, পাতি
মায়াজাল, হরে দুষ্ট! হায়, মা, স্মরিলে
কোপানলে দহে মনঃ! ত্রিশূলীর বরে
বলী রক্ষঃ, তৃণ-জ্ঞান করে দেব-গণে!
পর-ধন, পর-দার লোভে সদা লোভী
পামর। তবে যে কেন (বুঝিতে না পারি)
হেন মূঢ়ে দয়া তুমি কর, দয়াময়ি?”
২। কুলিশ---বজ্র।
২৩। হরে দুষ্ট---দুষ্ট রাবণ হরণ করিয়াছে।
গ্রন্থের ৬৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
নীরবিলা স্বরীশ্বর ; কহিতে লাগিলা
বীণাবাণী স্বরীশ্বরী মধুর সুস্বরে ;---
“বৈদেহীর দুঃখে, দেবি, কার না বিদরে
হৃদয়? অশোক-বনে বসি দিবা নিশি
(কুঞ্জবন-সখী পাখী পিঞ্জরে যেমতি)
কাঁদেন রূপসী শোকে! কি মনোবেদনা
সহেন বিধুবদনা! পতির বিহনে,
ও রাঙা চরণে, মাতঃ, অবিদিত নহে।
আপনি না দিলে দণ্ড, কে দণ্ডিবে, দেবি,
এ পাষণ্ড রক্ষোনাথে? নাশি মেঘনাদে,
দেহ বৈদেহীরে পুনঃ বৈদেহীরঞ্জনে ;
দাসীর কলঙ্ক ভঞ্জ, শশাঙ্কধারিণি!
মরি, মা, শরমে আমি, শুনি লোকমুখে,
ত্রিদিব-ঈশ্বরে রক্ষঃ পরাভবে রণে!”
হাসিয়া কহিলা উমা ; “রাবণের প্রতি
দ্বেষ তব, জিষ্ণু! তুমি, “হে মঞ্জুনাশিনী
শচি, তুমি ব্যগ্র ইন্দ্রজিতের নিধনে।
দুই জন অনুরোধ করিছ আমারে
নাশিতে কনক-লঙ্কা। মোর সাধ্য নহে
সাধিতে এ কার্য্য। বিরূপাক্ষের রক্ষিত
রক্ষঃ-কুল ; তিনি বিনা তব এ বাসনা,
বাসব, কে পারে, কহ, পুর্ণিতে জগতে?
যোগে মগ্ন, দেবরাজ, বৃষধ্বজ আজি।
যোগাসন নামে শৃঙ্গ, মহাভয়ঙ্কর,
ঘন ঘনাবৃত, তথা বসেন বিরলে
যোগীন্দ্র। কেমনে যাবে তাঁহার সমীপে?
পক্ষীন্দ্র গরুড় সেথা উড়িতে অক্ষম!”
১২। দাসীর কলঙ্ক---আমার পতিকে হে ইন্দ্রজিত রণে পরাভূত করে, এই আমার কলঙ্ক।
১৬। মঞ্জুনাশিনী---সুন্দরী-কুল-গর্ব্ব-হারিণী।
১৭। নিধন---নাশ।
২৩। বৃষধ্বজ---শিব।
গ্রন্থের ৬৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কহিলা বিনত-ভাবে অদিতিনন্দন ;---
“তোমা বিনা কার শক্তি, হে মুক্তি-দায়িনি
জগদম্বে, যায় যে সে যথা ত্রিপুরারি
ভৈরব? বিনাশি, দেবি, রক্ষঃ-কুল, রাখ
ত্রিভুবন ; বৃদ্ধি কর ধর্ম্মের মহিমা ;
হ্রাসো বসুধার ভার ; বসুন্ধরাধর
বাসুকিরে কর স্থির ; বাঁচাও রাঘবে।”
এইরূপে দৈত্য-রিপু স্তুতিলা সতীরে।
হেন কালে গন্ধামোদে সহসা পূরিল
পুরী ; শংখঘণ্টাধ্বনি বাজিল চৌদিকে
মঙ্গল নিক্কণ সহ, মৃদু যথা যবে
দূর কুঞ্জবনে গাহে পিককুল মিলি!
টলিল কনকাসন! বিজয়া সখীরে
সম্ভাষিয়া মধুস্বরে, ভবেশ-ভাবিনী
সুধিলা ; “লো বিধুমুখি, কহ শীঘ্র করি,
কে কোথা, কি হেতু মোরে পূজিছে অকালে?”
মন্ত্র পড়ি, খড়ি পাতি, গণিয়া গণনে,
নিবেদিলা হাসি সখী ; “হে নগনন্দিনি,
দাশরথি রথী তোমা পূঞ্জে লঙ্কাপুরে।
বারি-সংঘটিত-ঘটে, সুসিন্দুরে আঁকি
ও সুন্দর পদযুগ, পূজে রঘুপতি
নীলোৎপলাঞ্জলি দিয়া, দেখিনু গণনে।
অভয়-প্রদান তারে কর গো, অভয়ে।
পরম ভকত তব কৌশল্যা-নন্দন
রঘুশ্রেষ্ঠ ; তার তারে বিপদে, তারিণি!”
কাঞ্চন-আসন ত্যজি, রাজরাজেশ্বরী
উঠিয়া, কহিলা পুনঃ বিজয়ারে সতী ;---
“দেব-দম্পতীরে তুমি সেব যথাবিধিত,
৩। জগদম্বে---জগদ্মাতা।
৮। স্বতিলা---স্তব করিলা।
১১। মঙ্গল নিকণ--মঙ্গলধ্বনি।
গ্রন্থের ৬৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
বিজয়ে! যাইব আমি যথা যোগাসনে
(বিকটশিখর!) এবে বসেন ধূর্জ্জটি।”
এতেক কহিয়া দুর্গা দ্বিরদ-গামিনী
প্রবেশিলা হৈম গেহে। দেবেন্দ্র বাসবে
ত্রিদিব-মহিষী সহ, সম্ভাষি আদরে,
স্বর্ণাসনে বসাইলা বিজয়া সুনারীষ
পাইলা প্রসাদ দোঁহে পরম-আহ্লাদে।
শচীর গলায় জয়া হাসি দোলাইলা
তারাকারা ফুলমালা ; কবরী-বন্ধনে
বসাইলা চিররুচি, চির-বিকচিত
কুসুম-রতন-রাজী ; বাজিল চৌদিকে
যন্ত্রদল, বামাদল গাইল নাচিয়া।
মোহিল কৈলাসপুরী ; ত্রিলোক মোহিল!
স্বপনে শুনিয়া শিশু সে মধুর ধ্বনি,
হাসিল মায়ের কোলে, মুদিত নয়ন!
নিদ্রাহীন বিরহিণী চমকি উঠিলা।
ভাবি প্রিয়-পদ-শব্দ শুনিলা ললনা
দুয়ারে! কোকিলকুল নীরবিল বনে।
উঠিলেন যোগীব্রজ, ভাবি ইষ্টদেব,
বর মাগ বলি, আসি দরশন দিলা!
প্রবেশি সুবর্ণ-গেহে, ভবেশ-ভাবিনী
ভাবিলা, “কি ভাবে আজি ভেটিব ভবেশে?”
ক্ষণ কাল চিন্তি সতী চিন্তিলা রতিরে।
২। বিকটশিখর---ভীষণশৃঙ্গ। মহাদেব এই শৃঙ্গোপরি বসিয়া যোগসাধন করেন বলিয়া ইহা যোগাসন নামে বিখ্যাত। কবি এই সর্গের স্থানান্তরে তাহা স্পটরূপে লিখিয়াছেন, যথা---
কৈলাসশিখরীশিরে ভীষণশিখর
ভৃগুমান্ , যোগাসন নামেতে বিখ্যাত
ভুবনে * * *
৯। তারাকারা---তারাকৃতি, অর্থাৎ তারাস্বরূপ।
২১। ভবেশভাবিনী---শিবমোহিনী দুর্গা।
২২। ভেটিব---সাক্ষাৎ করিব।
গ্রন্থের ৬৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
যথায় মন্মথ-সাথে, মন্মথ-মোহিনী
বরাননা, কুঞ্জবনে বিহারিতেছিলা,
তথায় উমার ইচ্ছা পরিমলময়
বায়ু-তরঙ্গিণী-রূপে, বহিল নিমিষে।
নাচিল রতির হিয়া বীণা-তার যথা
অঙ্গুলির পরশনে! গেলা কামবধূ ,
দ্রুতগতি বায়ু-পথে, কৈলাস-শিখরে।
সরসে নিশান্তে যথা ফুটি, সরোজিনী
নমে ত্বিষাম্পতি-দূতী উষার চরণে,
নমিলা মদন-প্রিয়া হরপ্রিয়া-পদে!
আশীষি রতিরে, হাসি কহিলা অন্বিকা ;---
“যোগাসনে তপে মগ্ন যোগীন্দ্র ; কেমনে,
কোন্ রঙ্গে, ভঙ্গ করি তাঁহার সমাধি,
কহ মোরে, বিধুমুখি?” উত্তরিলা নমি
সুকেশিনী ;---“ধর, দেবি, মোহিনী মূরতি।
দেহ আজ্ঞা, সাজাই ও বর বপুঃ, আনি
নানা আভরণ ; হেরি যে সবে, পিনাকী
ভূলিবেন, ভুলে যথা ঋতুপতি, হেরি
মধুকালে বনস্থলী কুসুম-কুন্তলা!”
এতেক কহিয়া রতি, সুবাসিত তেলে
মাজি চুল, বিনানিলা মনোহর বেণী।
যোগাইলা আনি ধনী বিবিধ ভূষণে,
হীরক, মুকুতা, মণি খচিত ; আনিলা
চন্দন, কেশর সহ কুঙ্কুম, কস্তুরী ;
রত্ন-সঙ্কলিত-আভা কৌষেয় বসনে।
লাক্ষারসে পা দুখানি চিত্রিলা হরষে
২। বিহারিতেছিলা---বিহার করিতেছিলা।
৯। ত্বিষাম্পতি---সূর্য্য।
১৩। সমাধি-ধ্যান।
১৭। পিনাকী---পিনাক নামক ধনুর্দ্ধারী---অর্থাৎ শিব।
২৫। কৌষেয়---রত্নবিশেষ। রত্ন-সঙ্কলিত-আভা---অর্থাৎ যে বস্ত্রে বিবিধ রত্নের আভা আছে।
২৬। লাক্ষারস---আল্ তা।
গ্রন্থের ৬৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
চারুনেত্রা। ধরি মূর্ত্তি ভুবনমোহিনী,
সাজিলা নগেন্দ্র-বালা ; রসানে মার্জ্জিত
হেম-কান্তি-সম কান্তি দ্বিগুণ শোভিল!
হেরিলা দর্পণে দেবী ও চন্দ্র-আননে ;
প্রফুল্ল নলিনী যথা বিমল সলিলে
নিজ-বিকচিত-রুচি। হাসিয়া কহিলা,
চাহি স্মর-হর-প্রিয়া স্মর-প্রিয়া পানে,---
“ডাক তব প্রাণনাথে।” অমনি ডাকিলা
(পিককুলেশ্বরী যথা ডাকে খতুবরে!)
মদনে মদন-বাঞ্ছা। আইলা ধাইয়া
ফুল-ধনুঃ ; আসে যথা প্রবাসে প্রবাসী,
স্বদেশ-সঙ্গীত-ধ্বনি শুনি রে উল্লাসে!
কহিলা শৈলেশসুতা ; “চল মোর সাথে,
হে মন্মথ যাব আমি যথা যোগীপতি
যোগে মগ্ন এবে ; বাছা, চল ত্বরা করি।”
অভয়ার পদতলে মায়ার নন্দন,
মদন আনন্দময়, উত্তরিলা ভয়ে ;---
“হেন আজ্ঞা কেন, দেবি, কর এ দাসেরে?
স্মরিলে পূর্ব্বের কথা, মরি, মা, তরাসে!
মূঢ় দক্ষ-দোষে যবে দেহ ছাড়ি, সতি,
হিমাদ্রির গৃহে জন্ম গ্রহিলা আপনি,
তোমার বিরহ-শোকে বিশ্ব-ভার ত্যজি
বিশ্বনাথ, আরম্ভিলা ধ্যান ; দেবপতি
ইন্দ্র আদেশিলা দাসে সে ধ্যান ভাঙিতে।
কুলগ্নে গেনু, মা, যথা মগ্ন বামদেব
তপে ; ধরি ফুল-ধনুঃ, হানিনু কুক্ষণে
ফুল-শর। যথা সিংহ সহসা আক্রমে
গজরাজে, পূরি বন ভীষণ গর্জ্জনে,
৭। স্মর-হর-প্রিয়া---শিবপ্রিয়া দুর্গা। স্মরপ্রিয়া---কামপ্রিয়া রতি।
১২। স্বদেশ-সঙ্গীত-ধ্বনি---স্বদেশীয় ভাষা শব্দ।
গ্রন্থের ৭০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
গ্রাসিলা দাসেরে আসি রোষে বিভাবসু,
বাস যাঁর, ভবেশ্বরি, ভবেশ্বর-ভালে।
হায়, মা, কত যে জ্বালা সহিনু, কেমনে
নিবেদি ও রাঙা পায়ে? হাহাকার রবে,
ডাকিনু বাসবে, চন্দ্রে, পবনে, তপনে ;
কেহ না আইল ; ভস্ম হইনু সত্বরে!---
ভয়ে ভগ্নোদ্যম আমি ভাবিয়া ভবেশে ;---
ক্ষম দাসে, ক্ষেমঙ্করি! এ মিনতি পদে।”
আশ্বাসি মদনে, হাসি কহিলা শঙ্করী ;---
“চল রঙ্গে মোর সঙ্গে নির্ভয় হৃদয়ে,
অনঙ্গ। আমার বরে চিরজয়ী তুমি!
যে অগ্নি কুলগ্নে তোমা পাইয়া স্বতেজে
জ্বালাইল, পূজা তব করিবে দে আজি,
ঔষধের গুণ ধরি, প্রাণ-নাশ-কারী
বিষ যথা রক্ষে প্রাণ বিদ্যার কৌশলে।”
প্রণমিয়া কাম তবে উমার চরণে,
কহিলা ; “অভয় দান কর যারে তুমি,
অভয়ে, কি ভয় তার এ তিন ভুবনে?
কিন্তু নিবেদন করি ও কমল-পদে ;---
কেমনে মন্দির হতে, নগেন্দ্র-নন্দিনি,
বাহিরিবা, কহ দাসে, এ মোহিনী-বেশে?
মুহূর্ত্তে মাতিবে, মাতঃ, জগত, হেরিলে
ও রূপ-মাধুরী ; সত্য কহিনু তোমারে।
হিতে বিপরীত, দেবি, সত্বরে ঘটিবে।
সুরাসুর-বৃন্দ যবে মথি জলনাথে,
লভিলা অমৃত, দুষ্ট দিতিসুত যত
বিবাদিল দেব সহ সুধামধু-হেতু।
মোহিনী মূরতি ধরি আইলা শ্রীপতি।
হারাইলা জ্ঞান সবে এ দাসের শরে!
গ্রন্থের ৭১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
অধর-অমৃত-আশে ভুলিলা অমৃত
দেব-দৈত্য ; নাগদল নম্রশিরঃ লাজে,
হেরি পৃষ্ঠদেশে বেণী ; মন্দর আপনি
অচল হইল হেরি উচ্চ কুচ-যুগে!
স্মরিলে সে কথা, সতি, হাসি আসে মুখে।
মলম্বা অন্বরে তাম্র এত শোভা যদি
ধরে, দেবি, ভাবি দেখ বিশুদ্ধ কাঞ্চন-
কান্তি কত মনোহর!” অমনি অম্বিকা,
সুবর্ণ বরণ ঘন মায়ায় সৃজিয়া,
মায়াময়ী, আবরিলা চারু অবয়বে।
হায় রে, নলিনী যেন দিবা-অবসানে
ঢাকিল বদনশশী! কিম্বা অগ্নি-শিখা,
ভস্মরাশি মাঝে পশি, হাসি লুকাইলা!
কিম্বা সুধা-ধন যেন, চক্র-প্রসরণে,
বেড়িলেন দেব শক্রু সুধাংশু-মণ্ডলে!
দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত গৃহদ্বার দিয়া
বাহিরিলা সুহাসিনী, মেঘাবৃতা যেন
ঊষা! সাথে মনমথ, হাতে ফুল-ধনুঃ,
পৃষ্ঠে তূণ, খরতর ফুল-শরে ভরা---
কণ্টকময় মৃণালে ফুটিল নলিনী!
কৈলাস-শিখরি-শিরে ভীষণ শিখর
ভৃগুমান্ , যোগাসন নামেতে বিখ্যাত
ভুবনে ; তথায় দেবী ভুবন-মোহিনী
৬। মলম্বা---ন্বর্ণ পত্র। অম্বর---বসন। মলম্বা অন্বরে ইত্যাদি---তাম্র স্বর্ণপত্রস্বরূপ বস্ত্রাবৃত হইলে, অর্থাং তামায় গিল্টী করিলে যদি এত শোভা হয়, তাহা হইলে, বিশুদ্ধ কাঞ্চনকান্তি কত মনোহর হইবে। শ্রীপতি বিষ্ণু পুরুষ হইয়া স্ত্রী-বেশ ধরিতে যখন এত মনোহর হইয়াছিলেন, তখন তুমি প্রকৃত নারী, তোমাকে এ বেশে দেখিলে লোকের কি দশা না ঘটিবে?
২০। কণ্টকময় মৃণালে ইত্যাদি---অগ্রে দুর্গা নলিনীস্বরূপ, পশ্চাতে মদন কণ্টকময় মৃণাল। তূণস্থ শর---সকল কণ্টকস্বরূপ।
গ্রন্থের ৭২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
উত্তরিলা গজপতি। অমনি চৌদিকে
গভীর গহ্বরে বদ্ধ, ভৈরব নিনাদী
জলদল নীরবিলা, জল-কান্ত যথা
শান্ত শান্তিসমাগমে ; পলাইল দূরে
মেঘদল, তমঃ যথা ঊষার হসনে!
দেখিলা সম্মুখে দেবী কপর্দ্দী তপসী,
বিভূতি-ভূষিত দেহ, মুদিত নয়ন,
তপের সাগরে মগ্ন, বাহ্য-জ্ঞান-হত।
কহিলা মদনে হাসি সুচারুহাসিনী ;---
“কি কাজ বিলম্বে আর, হে শম্বর-অরি?
হান তব ফুল-শর।” দেবীর আদেশে,
হাঁটু পাড়ি মীনধ্বজ, শিঞ্জিনী টংকারি,
সম্মোহন-শরে শূর বিঁধিলা উমেশে!
সিহরিলা শূলপাণি। লড়িল মস্তকে
জটাজুট, তরুরাজী যথা গিরিশিরে
ঘোর মড় মড় রবে লড়ে ভূকম্পনে।
অধীর হইলা প্রভু! গরজিলা ভালে
চিত্রভানু, ধকধকি উজ্জ্বল জ্বলনে!
ভয়াকুল ফুল-ধনুঃ পশিলা অমনি
ভবানীর বক্ষঃ-স্থলে, পশয়ে যেমতি
কেশরী-কিশোর ত্রাসে, কেশরিণী-কোলে,
গম্ভীর নির্ঘোষে ঘোষে ঘনদল যবে,
বিজলী ঝলসে আঁখি কালানল তেজে!
উন্মীলি নয়ন এবে উঠিলা ধূর্জ্জটি।
মায়া-ঘন-আবরণ ত্যজিলা গিরিজা।
8। শান্তিদেবী আইলে যেমন সমুদ্র শান্তভাব ধরেন।
৬। কপর্দ্দী---মহাদেব।
১৮। চিত্রভানু--অগ্নি।
২১। কেশরী-কিশোর ইত্যাদি---মেঘের গর্জ্জনে এবং বিদ্যুদগ্নিতে ভীত হইয়া যেমন কেশরী-কিশোর অর্থাৎ সিংহশাবক সিংহীর ক্রোড়দেশে প্রবেশ করে, সেইরূপ শিবের ললাটস্থ অগ্নির গর্জ্জনে ও তেজে ভীত হইয়া, মদন ভগবতীর বক্ষঃস্থলে আশ্রয় লইলেন।
গ্রন্থের ৭৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
মোহিত মোহিনীরূপে, কহিলা হরষে
পশুপতি ; “কেন হেথা একাকিনী দেখি,
এ বিজন স্থলে, তোমা, গণেন্দ্রজননি?
কোথায় মৃগেন্দ্র তব কিঙ্কর, শঙ্করি?
কোথায় বিজয়া, জয়া?” হাসি উত্তরিলা
সুচারুহাসিনী উমা ; “এ দাসীরে, ভুলি,
হে যোগীন্দ্র, বহুদিন আছ এ বিরলে ;
তেঁই আসিয়াছি, নাথ, দরশন-আশে
পা দুখানি। যে রমণী পতিপরায়ণা,
সহচরী সহ সে কি যায় পতি-পাশে?
একাকী প্রত্যুষে, প্রভু, যায় চক্রবাকী
যথা প্রাণকান্ত তার!” আদরে ঈশান,
ঈষত হাসিয়া দেব, অজিন-আসনে
বলাইলা ঈশানীরে। অমনি চৌদিকে
প্রফুল্লিল ফুলকুল ; মকরন্দ-লোভে
মাতি শিলীমুখবৃন্দ আইল ধাইয়া ;
বহিল মলয়-বায়ু ; গাইল কোকিল ;
নিশার শিশিরে ধৌত কুসুম-আসার
আচ্ছাদিল শৃঙ্গবরে! উমার উরসে
(কি আর আছে রে বাসা সাজে মনসিজে
ইহা হতে!) কুসুমেষু, বসি কুতূহলে,
হানিলা, কুসুম-ধনুঃ টঙ্কারি কৌতুকে
শর-জাল ; ---প্রেমামোদে মাতিলা ত্রিশূলী!
লজ্জা-বেশে রাহু আসি গ্রাসিল চাঁদেরে,
হাসি ভস্মে লুকাইলা দেব বিভাবসু!
মোহন মূরতি ধরি, মোহি মোহিনীরে
কহিলা হাসিয়া দেব ; “জানি আমি, দেবি,
২৪-২৫। চন্দ্রচুড়কে কামমদে মত্ত দেখিয়া ললাটস্থ চন্দ্র লজ্জায় মলিন হইলেন। অগ্নিও ভস্মাবৃত হইয়া রহিলেন।
গ্রন্থের ৭৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
তোমার মনের কথা,---বাসব কি হেতু
শচী সহ আসিয়াছে কৈলাস-সদনে ;
কেন বা অকালে তোমা পূজে রঘুমণি?
পরম ভকত মম নিকষানন্দন ;
কিন্তু নিজ কর্ম্ম-ফলে মজে দুষ্টমতি।
বিদরে হৃদয় মম স্মরিলে সে কথা,
মহেশ্বরি! হায়, দেবি, দেবে কি মানবে,
কোথা হেন সাধ্য রোধে প্রাক্তনের গতি?
পাঠাও কামেরে, উমা, দেবেন্দ্র সমীপে।
সত্বরে যাইতে তারে আদেশ, মহেশি,
মায়াদেবী-নিকেতনে। মায়ার প্রসাদে,
বধিবে লক্ষ্মণ শূর মেঘনাদ শূরে।”
চলি গেলা মীনধ্বজ, নীড় ছাড়ি উড়ে
বিহঙ্গম-রাজ যথা, মুহুর্ম্মুহুঃ চাহি
সে সুখ-সদন পানে! ঘন রাশি রাশি,
স্বর্ণবর্ণ, সুবাসিত বাস শ্বাসি ঘন,
বরষি প্রসূনাসার---কমল, কুমুদী,
মালতী, সেঁউতি, জাতি, পারিজাত-আদি
মন্দ-সমীরণ-প্রিয়া---ঘিরিল চৌদিকে
দেবদেব মহাদেবে মহাদেবী সহ।
দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত হৈমময় দ্বারে
দাঁড়াইলা বিধুমুখী মদন-মোহিনী,
অশ্রুময় আঁখি, আহা! পতির বিহনে!
হেন কালে মধু-সখা উতরিলা তথা।
অমনি পসারি বাহু, উল্লাসে মন্মথ
আলিঙ্গন-পাশে বাঁধি, তুষিলা ললনে
১৯। তারে---ইন্দ্রকে।
১৫-১৬। ঘন রাশি রাশি ইত্যাদি। স্বর্ণবর্ণ মেঘপুঞ্জ সুরভিবায়ুস্বরূপ নিশ্বাস ত্যাগ এবং নানা প্রকার সুগন্ধ পুষ্প বৃষ্টি করিয়া দেব-দম্পতীকে বেষ্টিত করিল।
১৭। প্রসূনাসার---পুষ্পবৃষ্টি।
গ্রন্থের ৭৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
প্রেমালাপে। শুখাইল অশ্রুবিন্দু, যথা
শিশির-নীরের বিন্দু শতদল-দলে,
দরশন দিলে ভানু উদয়-শিখরে।
পাই প্রাণ-ধনে ধনী, মুখে মুখ দিয়া,
(সরস বসন্তকালে সারী শুক যথা)
কহিলেন প্রিয়-ভাষে ; “বাঁচালে দাসীরে
আশু আসি তার পাশে, হে রতি-রঞ্জন ;
কত যে ভাবিতেছিনু, কহিব কাহারে?
বামদেব নামে, নাথ, সদা, কাঁপি আমি,
স্মরি পুর্ব্ব-কথা যত! দুরন্ত হিংসক
শূলপাণি! যেয়ো না গো আর তার কাছে,
মোর কিরে প্রাণেশ্বর!” সুমধুর হাসে
উত্তরিলা পঞ্চশর ; “ছায়ার আশ্রমে,
কে কবে ভাস্কর-করে ডরায়, সুন্দরি!
চল এবে যাই যথা দেবকুল-পতি।”
সুবর্ণ-আসনে যথা বসেন বাসব,
উতরি মম্মথ তথা, নিবেদিলা নমি
বারতা। আরোহি রথে দেবরাজ রথী
চলি গেলা দ্রুতগতি মায়ার সদনে।
অগ্নিময় তেজঃ বাজী ধাইল অন্বরে,
অকম্প চামর শিরে? গম্ভীর নির্ঘোষে
ঘোষিল রথের চক্র, চূর্ণি মেঘদলে।
কত ক্ষণে সহস্রাক্ষ উতরিলা বলী
যথা বিরাজেন মায়া। ত্যজি রথ-বরে,
সুরকুল-রথীবর পশিলা দেউলে।
কত যে দেখিলা দেব কে পারে বর্ণিতে?
৩। ভানু---সূর্য্য।
৯। বামদেব---মহাদেব।
১৩। পঞ্চশর---পঞ্চবাণ অর্থাৎ কন্দর্প।
১৪। ভাস্কর-কর - সূর্য্যকিরণ।
১৬। বাসব---ইন্দ্র।
২০। বাজী---ঘোড়া।
২৩। সহস্রাক্ষ---ইন্দ্র।
গ্রন্থের ৭৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সৌর-খরতর-কর-জাল-সঙ্কলিত
আভাময় স্বর্ণাসনে বসি কুহকিনী
শক্তীশ্বরী। কর-যোড়ে বাসব প্রণমি
কহিলা ;---আশীষ দাসে, বিশ্ব-বিমোহিনি!”
আশীষি সুধিলা দেবী ;--- “কহ কি কারণে,
গতি হেথা আজি তব, অদিতি-নন্দন?”
উত্তরিলা দেবপতি ;--- “শিবের আদেশে,
মহামায়া, আসিয়াছি তোমার সদনে।
কহ দাসে, কি কৌশলে সৌমিত্রি জিনিবে
দশানন-পুত্রে কালি? তোমার প্রসাদে
(কহিলেন বিরূপাক্ষ) ঘোরতর রণে
নাশিবে লক্ষণ শূর মেঘনাদ শূরে।”
ক্ষণ কাল চিন্তি দেবী কহিলা বাসবে ;---
“দুরন্ত তারকাসুর, সুর-কুল-পতি,
কাড়ি নিল স্বর্গ যবে তোমায় বিমুখি
সমরে ; কৃত্তিকা-কুল-বল্লভ সেনানী,
পার্বতীর গর্ভে জন্ম লভিলা তৎকালে।
বধিতে দানব-রাজে সাজাইলা বীরে
আপনি বৃষভ-ধ্বজ, সৃজি রুদ্র-তেজে
অস্ত্রে। এই দেখ, দেব, ফলক, মণ্ডিত
সুবর্ণে ; ওই যে অসি, নিবাসে উহাতে
আপনি কৃতান্ত ; ওই দেখ, সুনাসীর,
ভয়ঙ্কর তূণীরে, অক্ষয়, পূর্ণ শরে,
বিষাকর ফণী-পূর্ণ নাগ-লোক যথা!
ওই দেখ ধনুঃ, দেব!” কহিলা হাসিয়া,
হেরি সে ধনুর কান্তি, শচীকান্ত বলী,
১। সৌর-খরতর-কর-জাল ইত্যাদি---সূর্য্যের করজালনির্ম্মিত, অর্থাৎ অতীব উজ্জ্বল।
৯। সৌমিত্রি---সুমিত্রানন্দন লক্ষ্মণ।
১৬। কৃত্তিকাকুলবল্লভ সেনানী---কার্ত্তিকেয়।
১৯। বৃষভ-ধ্বজ---শিব। ২০। ফলক---ঢাল।
২২। সুনাসীর---হে ইন্দ্র।
গ্রন্থের ৭৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
“কি ছার ইহার কাছে দাসের এ ধনুঃ
রত্নময়! দিবাকর-পরিধি যেমতি,
জ্বলিছে ফলক-বর---ধাঁধিয়া নয়নে!
অগ্নিশিখা-সম অসি মহাতেজস্কর!
হেন তূণ আর, মাতঃ, আছে কি জগতে?”
“শুন দেব,“ (কহিলেন পুনঃ মায়াদেবী)
“ওই সব অস্ত্রবলে নাশিলা তারকে
ষড়ানন। ওই সব অস্ত্রবলে, বলি,
মেঘনাদ-মৃত্যু, সত্য কহিনু তোমারে।
কিন্তু হেন বীর নাহি এ তিন ভুবনে,
দেব কি মানব, ন্যায়যুদ্ধে যে বধিবে
রাবণিরে। প্রের তুমি অস্ত্র রামানুজে,
আপনি যাইব আমি কালি লঙ্কাপুরে,
রক্ষিব লক্ষ্মণে, দেব, রাক্ষস-সংগ্রামে।
যাও চলি সুর-দেশে, সুরদল-নিধি।
ফুল-কুল-সখী ঊষা যখন খুলিবে
পূর্ব্বাশার হৈমদ্বারে পদ্মকর দিয়া
কালি, তব চির-ত্রাস, বীরেন্দ্রকেশরী
ইন্দ্রজিৎ-ত্রাস-হীন করিবে তোমারে---
লঙ্কার পঙ্কজ-রবি যাবে অস্তাচলে!”
মহানন্দে দেব-ইন্দ্র বন্দিয়া দেবীরে,
অস্ত্র লয়ে গেলা চলি ত্রিদশ-আলয়ে।
বসি দেব-সভাতলে কনক-আসনে
বাসব, কহিলা শূর চিত্ররথ শূরে ;---
“যতনে লইয়া অস্ত্র, যাও মহাবলি,
স্বর্ণ-লঙ্কা-ধামে তুমি। সৌমিত্রি কেশরী
মায়ার প্রসাদে কালি বধিবে সমরে
মেঘনাদে। কেমনে, তা দিবেন কহিয়া
১৭। পূর্ব্বাশায়---পূর্ব্বদিকের।
১৯। ইন্দ্রজিৎ-ত্রাস-হীন করিবে---কেন না লক্ষণ তাহাকে বধ করিবে।
গ্রন্থের ৭৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
মহাদেবী মায়া তারে। কহিও রাঘবে,
হে গন্ধর্ব্ব-কুল-পতি, ত্রিদিব-নিবাসী
মঙ্গল-আকাঙ্ক্ষী তার ; পার্ব্বতী আপনি
হর-প্রিয়া, সুপ্রসন্ন তার প্রতি আজি।
অভয় প্রদান তারে করিও সুমতি।
মরিলে রাবণি রণে, অবশ্য মরিবে
রাবণ ; লভিবে পুনঃ বৈদেহী সতীরে
বৈদেহী-মনোরঞ্জন রঘুকুল-মণি।
মোর রথে, রথীবর, আরোহণ করি
যাও চলি। পাছে তোমা হেরি লঙ্কা-পুরে,
বাধায় বিবাদ রক্ষঃ ; মেঘদলে আমি
আদেশিব আবরিতে গগনে ; ডাকিয়া
প্রভঞ্জনে, দিব আজ্ঞা ক্ষণ ছাড়ি দিতে
বায়ু-কুলে ; বাহিরিয়া নাচিবে চপলা ;
দম্ভোলি-গম্ভীর-নাদে পূরিব জগতে।”
প্রণমি দেবেন্দ্র-পদে, সাবধানে লয়ে
অস্ত্রে, চলি গেলা মর্ত্ত্যে চিত্ররথ রথী।
তবে দেব-কুল-নাথ ডাকি প্রভঞ্জনে
কহিলা, “প্রলয়-ঝড় উঠাও সত্বরে
লঙ্কাপুরে, বায়ুপতি ; শীঘ্র দেহ ছাড়ি
কারাবদ্ধ বায়ুদলে ; লহ মেঘদলে ;
দ্বন্দ্ব ক্ষণ-কাল বৈরী বারি-নাথ সনে
নির্ঘোষে!” উল্লাসে দেব চলিলা অমনি,
ভাঙিলে শৃঙ্খল লম্ফী কেশরী যেমতি,
যথায় তিমিরাগারে রুদ্ধ বায়ু যত
গিরি-গর্ভে। কত দূরে শুনিলা পবন
ঘোর কোলাহলে ; গিরি (দেখিলা) লড়িছে
১৪। চপলা---চঞ্চলা অর্থাৎ বিদ্যুৎ।
১৫। দম্ভোলি---বজ্র।
১৮। প্রভঞ্জন---বায়ু।
গ্রন্থের ৭৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
অন্তরিত পরাক্রমে, অসমর্থ যেন
রোধিতে প্রবল বায়ু আপনার বলে।
শিলাময় দ্বার দেব খুলিলা পরশে।
হুহুঙ্কারি বায়ুকুল বাহিরিল বেগে
যথা অম্বুরাশি, যবে ভাঙে আচম্বিতে
জাঙাল! কাঁপিল মহী ; গর্জ্জিল জলধি!
তুঙ্গ-শৃঙ্গধরাকারে তরঙ্গ-আবলী
কল্লোলিল, বায়ু-সঙ্গে রণরঙ্গে মাতি!
ধাইল চৌদিকে মন্দ্রে জীমূত ; হাসিল
ক্ষণ-প্রভা ; কড়মড়ে নাদিল দম্ভোলি।
পলাইলা তারানাথ তারাদলে লয়ে।
ছাইল লঙ্কায় মেঘ, পাবক উগরি
রাশি রাশি ; বনে বৃক্ষ পড়িল উপড়ি
মড়মড়ে ; মহাঝড় বহিল আকাশে ;
বর্ষিল আসার যেন সৃষ্টি ডুবাইতে
প্রলয়ে। বৃষ্টিল শিলা তড়তড়তড়ে।
পশিল আতঙ্কে রক্ষঃ যে যাহার ঘরে।
যথায় শিবির মাঝে বিরাঞ্জেন বলী
রাঘবেন্দ্র, আচম্বিতে উতরিল। রথী
চিত্ররথ, দিবাকর যেন অংশুমালী,
রাজ-আভরণ দেহে! শোভে কটিদেশে
সারসন, রাশি-চক্র-সম তেজোরাশি,
ঝোলে তাহে অসিবর---ঝল ঝল ঝলে!
কেমনে বর্ণিবে কবি দেব-তূণ, ধনুঃ,
১। অন্তরিত পরাক্রমে---কেন না পরাক্রমী বায়ুদল তাহার অন্তরে অর্থাৎ গর্ভদেশে আবদ্ধ রহিয়াছে।
৭। তুঙ্গ-শৃঙ্গধরাকারে---উচ্চ পর্ব্বতাকারে। তরঙ্গ-আবলী---টেউসমূহ।
৯। মন্দ্র---গম্ভীর শব্দ। জীমূত---মেঘ।
১০। ক্ষণপ্রভা---বিদ্যুৎ।
১৬। বৃষ্টিল শিলা---শিলাবৃষ্টি হইল।
২২। সারসন---কট্যাভরণ অর্থাৎ কোমরবন্ধ।
গ্রন্থের ৮০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
চর্ম্ম, বর্ম্ম, শূল, সৌর-কিরীটের আভা
স্বর্ণময়ী? দৈববিভা ধাঁধিল নয়নে
স্বর্গীয় সৌরভে দেশ পুরিল সহসা।
সসম্ভ্রমে প্রণমিয়া, দেবদূত-পদে
রঘুধর, জিজ্ঞাসিলা, “হে ত্রিদিববাসি,
ত্রিদিব ব্যতীত, আহা, কোন্ দেশ সাজে
এ হেন মহিমা, রূপে?---কেন হেথা আজি,
নন্দন-কানন ত্যজি, কহ এ দাসেরে?
নাহি স্বর্ণাসন। দেব, কি দিব বসিতে?
তবে যদি কৃপা, প্রভু, থাকে দাস প্রতি,
পাদ্য, অর্ঘ্য লয়ে বসো এই কুশাসনে।
ভিখারী রাঘব, হায়!” আশীষিয়া রথী
কুশাসনে বসি তবে কহিলা সুস্বরে ;---
“চিত্ররথ নাম মম, শুন দাশরথি ;
চির-অনুচর আমি সেবি অহরহঃ
দেবেন্দ্রে ; গন্ধর্ব্বকুল আমার অধীনে।
আইমু এ পুরে আমি ইন্দ্রের আদেশে।
তোমার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী দেবকুল সহ,
দেবেশ। এই যে অস্ত্র দেখিছ নৃমণি,
দিয়াছেন পাঠাইয়া তোমার অনুজে
দেবরাজ। আবির্ভাবি মায়া মহাদেবী
প্রভাতে, দিবেন কহি, কি কৌশলে কালি
নাশিবে লক্ষণ শূর মেঘনাদ শূরে।
দেবকুল-প্রিয় তুমি, রঘুকুল-মণি।
সুপ্রসন্ন তব প্রতি আপনি অভয়া!”
কহিলা রঘুনন্দন ; “আনন্দ-সাগরে
১। সৌর-কিরীট---সূর্য্যসদৃশ উজ্জ্বল মুকুট।
৫-৭। হে ত্রিদিববাসি ইত্যাদি---হে স্বর্গবাসি, আপনি যে এক জন স্বর্গীয় পুরুষ, তাহার কোন সন্দেহ নাই। কেন না, স্বর্গ ব্যতীত আর কোন্ স্থলে লোকের এরূপ মহিমা এবং রূপের সম্ভব আছে?
২১। আবির্ভাবি---আবির্ভূত হইয়া।
গ্রন্থের ৮১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ভাসিনু, গন্ধর্ব্বশ্রেষ্ঠ, এ শুভ সংবাদে!
অজ্ঞ নর আমি ; হায়, কেমনে দেখাব
কৃতজ্ঞতা? এই কথা জিজ্ঞাসি তোমারে।”
হাসিয়া কহিল দূত ; “শুন, রঘুমণি,
দেব প্রতি কৃতজ্ঞতা, দরিদ্র-পালন,
ইন্দ্রিয়-দমন, ধর্ম্মপথে সদা গতি ;
নিত্য সত্য-দেবী-সেবা ; চন্দন, কুসুম,
নৈবেদ্য, কৌষিক বস্ত্র আদি বলি যত,
অবহেলা করে দেব, দাতা যে যদ্যপি
অসৎ! এ সার কথা কহিনু তোমারে!
প্রণমিলা রামচন্দ্র ; আশীষিয়া রথী
চিত্ররথ, দেবরথে গেলা দেবপুরে।
থামিল তুমুল ঝড় ; শান্তিলা জলধি ;
হেরিয়া শশাঙ্কে পুনঃ তারাদল সহ
হাসিল কনকলঙ্কা। তরল সলিলে
পশি, কৌমুদিনী পুনঃ অবগাহে দেহ
রজোময় ; কুমুদিনী হাসিল কৌতুকে।
আইল ধাইয়া পুনঃ রণ-ক্ষেত্রে। শিবা
শবাহারী ; পালে পালে গৃধিনী, শকুনি,
পিশাচ। রাক্ষসদল বাহিরিল পুনঃ
ভীম-প্রহরণ-ধারী---মত্ত বীরমদে।
ইতি শ্রীমেঘনাদবধে কাব্যে অস্ত্রলাভো নাম
দ্বিতীয়ঃ সর্গঃ।
৮। বলি---পূজোপহার।
১৫-১৭। তরল সলিলে ইত্যাদি---রজোময় কৈমুদিনী অর্থাৎ রৌপ্যপ্রভা চন্দ্রিকা পুনঃ তরল সলিলে অর্থাৎ চঞ্চল জলে দেহ অবগাহে---অবগাহন করিতে লাগিল, অর্থাৎ মেঘমুক্ত চন্দ্রের কিরণজাল পুনঃ জলস্থলে শোভমান হইল।
১৯। শিবা---শৃগালী।
১৯ শবাহারী---মৃতদেহভক্ষক।
২১। ভীম প্রহরণ---ভয়ানক অস্ত্র।
মিলনসাগরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর সম্পূর্ণ মেঘনাদবধ কাব্যের বিভিন্ন সর্গ পড়তে নীচের সূচীতে ক্লিক করুন...
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম