কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর মেঘনাদবধ কাব্য
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
মিলনসাগরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর মেঘনাদবধ কাব্যের সূচী...
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম
মেঘনাদবধ কাব্য ষষ্ঠ সর্গ
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রথম প্রকাশ ১৮৬১।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে রামকমল সিংহ দ্বারা প্রকাশিত, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবি সজনীকান্ত দাস দ্বারা মূলতঃ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ সংস্করণ থেকে গৃহীত ও সম্পাদিত এবং ১২৭৪ বঙ্গাব্দে (১৮৬৭ সালে) প্রকাশিত, কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-কৃত টীকা ও ব্যাখ্যা সহ।
মিলনসাগরে প্রকাশ ২১শে ফেব্রুয়ারী ২০২৬।
গ্রন্থের ১৫৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ষষ্ঠ সর্গ
(বধো নাম)
ত্যজি সে উদ্যান, বলী সৌমিত্রি কেশরী
চলিলা, শিবিরে যথা বিরাজেন প্রভু
রঘু-রাজ ; অতি দ্রুতে চলিলা সুমতি,
হেরি মৃগরাজে বনে, ধায় ব্যাধ যথা
অস্ত্রালয়ে,---বাছি বাছি লইতে সত্বরে
তীক্ষ্ণতর প্রহরণ নশ্বর সংগ্রামে।
কত ক্ষণে মহাযশাঃ উতরিল যথা
রঘুরথী। পদযুগে নমি, নমস্কারি
মিত্রবর বিভীষণে, কহিলা সুমতি,---
“কৃতকার্য্য আজি, দেব, তব আশীর্ব্বাদে
চিরদাস! স্মরি পদ, প্রবেশি কাননে,
পুজিনু চামুণ্ডে, প্রভু, সুবর্ণ দেউলে।
ছলিতে দাসেরে সতী কত যে পাতিলা
মায়াজাল, কেমনে তা নিবেদি চরণে,
মূঢ় আমি? চন্ত্রচূড়ে দেখিনু দুয়ারে
রক্ষক ; ছাড়িলা পথ বিনা রণে তিনি
তব পূণ্যবলে, দেব ; মহোরগ যথা
যায় চলি হতবল মহৌষধগুণে!
পশিল কাননে দাস ; আইল গর্জ্জিয়া
সিংহ ; বিমুখিনু তাহে ; ভৈরব হুঙ্কারে
বহিল তুমুল ঝড় ; কালাগ্নি সদৃশ
দাবাগ্নি বেড়িল দেশ ; পুড়িল চৌদিকে
বনরাজী ; কত ক্ষণে নিবিলা আপনি
২। শিবির---তাঁবু।
৬। প্রহরণ---যদ্বারা প্রহার করা যায়, অর্থাৎ অস্ত্র। নশ্বর---নাশক, সংহারক।
১৫। চন্দ্রচূড়---যাঁহার চুড়ায় চন্দ্র আছে। অর্ধাৎ মহাদেব।
১৭। মহোরগ---মহাসর্প।
গ্রন্থের ১৫৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
বায়ুসখা, বায়ুদেব গেলা চলি দূরে।
স্বরবালাদলে এবে দেখিনু সম্মুখে
কুঞ্জবনবিহারিণী ; কৃতাঞ্জলি-পুটে,
পূজি, বর মাগি দেব, বিদাইনু সবে।
অদূরে শোভিল বনে দেউল, উজলি
সুদেশ। সরসে পশি, অবগাহি দেহ,
নীলোৎপলাঞ্জলি দিয়া পূজিনু মায়েরে
ভক্তিভাবে। আবির্ভাবি বর দিলা মায়া।
কহিলেন দয়াময়ী,--- ‘সুপ্রসন্ন আজি,
রে সতীসুমিত্রাসুত,---দেব দেবী যত
তোর প্রতি। দেব-অস্ত্র প্রেরিয়াছে তোরে
বাসব ; আপনি আমি আসিয়াছি হেথা
সাধিতে এ কার্য্য তোর শিবের আদেশে।
ধরি দেব-অস্ত্র, বলি, বিভীষণে লয়ে,
যা চলি নগর মাঝে, যথায় রাবণি,
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে, পূজে বৈশ্বানরে।
সহসা, শার্দ্গূলাক্রমে আক্রমি রাক্ষসে,
নাশ্ তারে! মোর বরে পশিবি দুজনে
অদৃশ্য ; পিধানে যথা অসি, আবরিব
মায়াজালে আমি দোঁহে। নির্ভয় হৃদয়ে,
যা চলি, রে যশস্বি!’---কি ইচ্ছা তব, কহ,
নৃমণি? পোহায় রাতি ; বিলম্ব না সহে।
মারি রাবণিরে, দেব, দেহ আজ্ঞা দাসে!”
উত্তরিলা রঘুনাথ, “হায় রে, কেমনে---
যে কৃতান্তদূতে দূরে হেরি, ঊর্দ্ধশ্বাসে
ভয়াকুল জীবকুল ধায় বায়ুবেগে
প্রাণ লয়ে ; দেব নর ভস্ম যার বিষে ;---
১। বায়ুসখা---অগ্নি।
১৬। বৈশ্বানর---অগ্নি।
১৯। পিধান---খাপ। অসি---তরবারি।
২৫। কৃতান্তদূত---যমদূতস্বরূপ রাবণি।
২৭। যার বিষে---রাবণির ক্রোধানল-বিষে।
গ্রন্থের ১৫৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কেমনে পাঠাই তোরে সে সর্পবিবরে,
প্রাণাধিক? নাহি কাজ সীতায় উদ্ধারি।
বৃথা, হে জলধি, আমি বাঁধিনু তোমারে ;
অসংখ্য রাক্ষসগ্রাম বধিনু সংগ্রামে।
আনিনু রাজেন্দ্রদলে এ কনকপুরে
সসৈন্যে ; শোণিতস্রোতঃ, হায়, অকারণে,
বরিষার জলসম, আর্দ্রিল মহীরে!
রাজ্য, ধন, পিতা, মাতা, স্ববন্ধুবান্ধবে---
হারাইনু ভাগ্যদোষে ; কেবল আছিল
অন্ধকার ঘরে দীপ মৈথিলী ; তাহারে
(হে বিধি, কি দোষে দাস দোষী তব পদে?)
নিবাইল দুরদৃষ্ট! কে আর আছে রে
আমার সংসারে, ভাই, যার মুখ দেখি
রাখি এ পরাণ আমি? থাকি এ সংসারে?
চল ফিরি, পুনঃ মোরা যাই বনবাসে,
লক্ষণ! কুক্ষণে, ভুলি আশার ছলনে,
এ রাক্ষসপুরে, ভাই, আইনু আমরা।”
উত্তরিলা বীরদর্পে সৌমিত্রি কেশরী ;---
“কি কারণে, রঘুনাথ, সভয় আপনি
এত? দৈববলে বলী যে জন, কাহারে
ডরে সে ত্রিভুবনে? দেব-কুলপতি
সহস্রাক্ষ পক্ষ তব ; কৈলাস-নিবাসী
বিরূপাক্ষ ; শৈলবালা ধর্ম্ম-সহায়িনী!
দেখ চেয়ে লঙ্কা পানে ; কাল মেঘ সম
দেবক্রোধ আবরিছে স্বর্ণময়ী আভা
চারি দিকে! দেবহাস্য উজলিছে, দেখ,
১। সে সর্পবিবরে---রাবণিরূপ সর্পের গর্ত্তে, অর্থাৎ রাবণির নিকটে।
৪। রাক্ষসগ্রাম---রাক্ষসসমূহ।
২২। সহস্রাক্ষ---সহস্রচক্ষুঃ অর্থাৎ ইন্দ্র।
২৩। বিরূপাক্ষ---ত্রিলোচন, মহাদেব। শৈলবালা---গিরিবালা, দুর্গা।
গ্রন্থের ১৫৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
এ তব শিবির, প্রভু! আদেশ দাসেরে
ধরি দেব-অস্ত্র আমি পশি রক্ষোগৃহে ;
অবশ্য নাশিব রক্ষে ও পদপ্রসাদে।
বিজ্ঞতম তুমি, নাথ! কেন অবহেল
দেব-আজ্ঞা? ধর্ম্মপথে সদা গতি তব,
এ অধর্ম্ম কার্য্য, আর্য্য, কেন কর আজি?
কে কোথা মঙ্গলঘট ভাঙে পদাঘাতে?”
কহিলা মধুরভাষে বিভীষণ বলী
মিত্র ;---“যা কহিলা সত্য রাঘবেন্দ্র রথী।
দুরন্ত কৃতান্ত-দূত সম পরাক্রমে
রাবণি, বাসবত্রাস, অজেয় জগতে।
কিন্তু বৃথা ভয় আজি করি মোরা তারে।
স্বপনে দেখিনু আমি, রঘুকুলমণি,
রক্ষঃকুল রাজলক্ষ্মী ; শিরোদেশে বসি,
উজলি শিবির, দেব, বিমল কিরণে,
কহিলা অধীনে সাধ্বী ;--- ‘হায়! মত্ত মদে
ভাই তোর, বিভীষণ! এ পাপ-সংসারে
কি সাধে করি রে বাস, কলুষদ্বেষিণী
আমি? কমলিনী কভু ফোটে কি সলিলে
পঙ্কিল? জীমূতাবৃত গগনে কে কবে
হেরে তারা? কিন্তু তোর পূর্ব্ব কর্ম্মফলে
সুপ্রসন্ন তোর প্রতি অমর ; পাইবি
শূন্য রাজ-সিংহাসন, ছত্রদণ্ড সহ,
তুই। রক্ষঃকুলনাথ-পদে আমি তোরে
করি অভিষেক আজি বিধির বিধানে,
৪। অবহেল---অবহেলা কর।
৬। আর্য্য---মান্য।
৭। মঙ্গলঘট---মঙ্গলার্থ কলসী, অর্থাৎ পূর্ণকলসী।
১১। বাসবত্রাস---যাহাকে দেখিয়া ইন্দ্র ভীত হন।
১৮। কলুষদ্বেষিণী---পাপদ্বেষকারিণী।
২০। পঙ্কিল---পঙ্কযুক্ত অর্থাৎ ময়লা। জীমূতাবৃত---মেঘাচ্ছাদিত।
গ্রন্থের ১৫৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
যশস্বি! মারিবে কালি সৌমিত্রি কেশরী
ভ্রাতৃপুত্র মেঘনাদে ; সহায় হইবি
তুই তার! দেব-আজ্ঞা পালিস্ যতনে,
রে ভাবী কর্ব্বুররাজ!---’ উঠি জাগিয়া ;---
স্বর্গীয় সৌরভে পুর্ণ শিবির দেখিনু ;
স্বর্গীয় বাদিত্র, দূরে শুনিনু গগনে
মৃদু! শিবিরের দ্বারে হেরিনু বিম্ময়ে
মদনমোহনে মোহে যে রূপমাধুরী!
গ্রীবাদেশ আচ্ছাদিছে কাদম্বিনীরূপী
কবরী ; ভাতিছে কেশে রত্নরাশি ;---মরি!
কি ছার তাহার কাছে বিজলীর ছটা
মেঘমালে। আচম্বিতে অদৃশ্য হইলা
জগদম্বা। বহুক্ষণ রহিনু চাহিয়া
সতৃষ্ণ নয়নে আমি, কিন্তু না ফলিল
মনোরথ ; আর মাতা নাহি দিলা দেখা।
শুন দাশরথি রথি, এ সকল কথা
মন দিয়া। দেহ আজ্ঞা, সঙ্গে যাই আমি,
যথা যজ্ঞাগারে পূজে দেব বৈশ্বানরে
রাবণি। হে নরপাল, পাল সযতনে
দেবাদেশ! ইষ্টসিদ্ধি অবশ্য হইবে
তোমার, রাঘব-শ্রেষ্ঠ, কহিনু তোমারে!”
উত্তরিলা সীতানাথ সজল-নয়নে ;---
“স্মরিলে পূর্ব্বের কথা, রক্ষঃকুলোত্তম,
৪। ভাবী কর্ব্বুররাজ---ভবিষ্যৎ রক্ষোরাজ, অর্থাৎ যিনি রাবণের নিধনান্তর রাক্ষসদিগের রাজা হইবেন। বিভীষণের রাজ্যলাভ ভবিষ্যদগর্ভে, এজন্য বিভীষণকে ভাবী কর্ব্বুররাজ বলিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে।
৬। বাদিত্রৃ---বাজনা।
৮। মোহে---মোহিত করে।
৯। গ্রীবাদেশ---গলদেশ, ঘাড়।
৯-১০। কাদম্বিনীরূপী কবরী---মেঘমালাস্বরূপ কেশপাশ।
১৩। জগদম্বা---জগন্মাতা।
গ্রন্থের ১৫৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
আকুল পরাণ কাঁদে! কেমনে ফেলিব
এ ভ্রাতৃ-রতনে আমি এ অতল জলে?
হায়, সখে, মন্থরার কুপন্থায় যবে
চলিলা কৈকেয়ী মাতা, মম ভাগ্যদোষে
নির্দ্দয় ; ত্যজিনু যবে রাজ্যভোগ আমি
পিতৃসত্যরক্ষা হেতু ; স্বেচ্ছায় ত্যজিল
রাজ্যভোগ প্রিয়তম ভ্রাতৃ-প্রেম-বশে!
কাঁদিলা সুমিত্রা মাতা! উচ্চে অবরোধে
কাঁদিলা উর্ম্মিলা বধূ ; পৌরজন যত---
কত যে সাধিল সবে, কি আর কহিব?
না মানিল অনুরোধ ; আমার পশ্চাতে
(ছায়া যথা) বনে ভাই পশিল হরষে,
জলাঞ্জলি দিয়া সুখে তরুণ যৌবনে।
কহিলা সুমিত্রা মাতা ;--- ‘নয়নের মণি
আমার, হরিলি তুই, রাঘব! কেজানে,
কি কুহকবলে তুই ভুলালি বাছারে?
সঁপিনু এ ধন তোরে। রাখিস যতনে
এ মোর রতনে তুই, এই ভিক্ষা মাগি।’
“নাহি কাজ, মিত্রবর, সীতায় উদ্ধারি।
ফিরি যাই বনবাসে! দুর্ব্বার সমরে,
দেব-দৈত্য-নর-ক্রাস, রথীন্দ্র রাবণি!
সুগ্রীব বাহুবলেন্দ্র ; বিশারদ রণে
অঙ্গদ, সুযুবরাজ? বায়ুপুত্র হনু,
ভীমপরাক্রম পিতা প্রভঞ্জন যথা ;
ধূম্রাক্ষ, সমর-ক্ষেত্রে ধূমকেতু সম
অগ্নিরাশি ; নল, নীল ; কেশরী---কেশরী
বিপক্ষের পক্ষে শূর ; আর যোধ যত,
১-২। কেমনে ফেলিব ইত্যাদি---ভ্রাতৃরতনে লক্ষ্মণরূপ ভ্রাতৃশ্রেষ্ঠে। এ অতল জলে---মেঘনাদের ক্রোধরূপ অগাধ জলে।
৯। উর্ম্মিলা---লক্ষ্মণের পত্নী।
১৩। তরুণ যৌবন---নবযৌবন।
২৪। প্রভঞ্জন---বায়ু।
গ্রন্থের ১৫৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
দেবাকৃতি, দেববীর্য্য ; তুমি মহারছী ;---
এ সবার সহকারে নারি নিধারিতে
যে রক্ষে, কেমনে, কহ, লক্ষ্মণ একাকী
যুঝিবে তাহার সঙ্গে? হায়, মায়াবিনী
আশা, তেঁই, কহি, সখে, এ রাক্ষস-পুরে,
অলঙ্ঘ্য সাগর লঙ্ঘি, আইন আমরা।”
সহসা আকাশ-দেশে, আকাশ-সম্ভবা
সরস্বত্তী নিনাদিলা মধুর নিনাদে ;
“উচিত কি তব, কহ, হে বৈদেহীপতি,
সংশয়িতে দেববাক্য, দেবকুলপ্রিয়
তুমি? দেবাদেশ, বলি, কেন অবহেল?
দেখ চেয়ে শূন্য পানে।” দেখিলা বিস্ময়ে
রঘুরাজ, অহি সহ যুঝিছে অন্বরে
শিখী। কেকারৰ মিশি ফণীর স্বননে,
ভৈরব আরবে দেশ পূরিছে চৌদিকে!
পক্ষচ্ছায়া আবরিছে, ঘনদল যেন,
গগন ; জ্বলিছে মাঝে, কালানল-তেজে,
হলাহল! ঘোর রণে রণিছে উভয়ে।
মুহুর্মুহুঃ ভয়ে মহী কাঁপিলা ; ঘোষিল
উথলিয়া জলদল। কতক্ষণ পরে,
গতপ্রাণ শিখীবর পড়িলা ভূতলে ;
গরজিলা অজাগর---বিজয়ী সংগ্রামে।
কহিলা রাবণানুজ ;--- “স্বচক্ষে দেখিলা
১০। সংশয়িতে---সংশয় অর্থাৎ সন্দেহ করিতে।
১৩। অহি---সর্প। অন্বর---আকাশ।
১৪। শিখী---ময়ুর। কেকারব---কেকাশব্দ। ময়ূরের ধ্বনির নাম কেকা।
২০-২২। ময়ুর ও সর্পে সংগ্রাম হইয়া পরিশেষে ময়ুর পরাজিত হইয়া ভূমিতলে পতিত হইল, এতদ্ববর্ণনের মর্ম্ম এই, যে লক্ষ্মণ ও মেঘনাদে নাশ্য নাশক ভাব সম্বন্ধ হইলেও লক্ষ্মণের সহিত সংগ্রামে মেঘনাদের ময়ুরের দশা ঘটিবেক, অর্থাৎ লক্ষ্মণ রণে মেঘনাদের প্রাণ সংহার করিবেন।
গ্রন্থের ১৬০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
অদ্ভুত ব্যাপার আজি ; নিরর্থ এ নহে,
কহিনু বৈদেহীনাথ, বুঝ ভাবি মনে!
নহে ছায়াবাজী ইহা ; আশু যা ঘটিবে।
এ প্রপঞ্চরূপে দেব দেখালে তোমারে ;---
নির্বীরিবে লঙ্কা আজি সৌমিত্রি কেশরী!”
প্রবেশি শিবিরে তবে রঘুকুলমণি
সাজাইলা প্রিয়ানুজে দেব-অস্ত্রে। আহা,
শোভিলা সুন্দর বীর স্কন্দ তারকারি-
সদৃশ! পরিলা বক্ষে কবচ সুমতি
তারাময় ; সারসনে ঝল ঝল ঝলে
ঝলিল ভাস্বর অসি মণ্ডিত রতনে।
রবির পরিধি সম দীপে পৃষ্ঠদেশে
ফলক ; দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত, কাঞ্চনে
জড়িত, তাহার সঙ্গে নিষঙ্গ দুলিল
শরপূর্ণ। বাম হস্তে ধরিলা সাপটি
দেবধনুঃ ধনুর্দ্ধর ; ভাতিল মস্তকে
(সৌরকরে গড়া যেন) মুকুট, উজলি
চৌদিক ; মুকুটোপরি লড়িল সঘনে
সুচূড়া, কেশরীপৃষ্ঠে লড়য়ে যেমতি
কেশর! রাঘবানুজ সাজিলা হরষে,
তেজস্বী---মধ্যাহ্নে যথা দেব অংশুমালী!
শিবির হইতে বলী বাহিরিলা বেগে
ব্যগ্র, তুরঙ্গম যথা শৃঙ্গকুলনাদে,
সমরতরঙ্গ যবে উথলে নির্ঘোষে!
১। নিরর্থ---ব্যর্থ, নিষ্ফল।
৪। প্রপঞ্চরূপে---বিস্তারিতরূপে।
৫। নির্বীরিবে---নির্বীর করিবে।
৮। স্কন্দ---কার্ত্তিকেয়। তারকারি---তারকনাশক। একজন অসুরের নাম তারক।
১০। সারসন---কটিবদ্ধ।
১১। ভাস্বর---দীপ্তিশালী।
১৩। দ্বিরদ-রদ---হস্তিদন্ত। ফলক--ঢাল।
১৪। নিষঙ্গ---তূণ।
২০। কেশর---সিংহের ঘাড়ের লোম, এই নিমিত্ত সিংহের একটি নাম কেশরী।
গ্রন্থের ১৬১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
বাহিরিলা বীরবর ; বাহিরিলা সাথে
বীরবেশে বিভীষণ, বিভীষণ রণে।
বরষিলা পুষ্প দেব ; বাজিল আকাশে
মঙ্গলবাজনা ; শূন্যে নাচিল অপ্সরা।
স্বর্গ, মর্ত্ত্য, পাতাল পূরিল জয়রবে!
আকাশের পানে চাহি, কৃতাঞ্জলিপুটে,
আরাধিলা রঘুবর ; “তব পদাম্বুজে,
চায় গো আশ্রয় আজি রাঘব ভিখারী,
অম্বিকে! ভূল না, দেবি, এ তব কিঙ্করে!
ধর্ম্মরক্ষা হেতু, মাতঃ, কত যে পাইনু
আয়াস, ও রাঙা পদে অবিদিত নহে।
ভুঞ্জাও ধর্ম্মের ফল, মৃত্যুঞ্জয়-প্রিয়ে,
অভাজনে ; রক্ষ, সতি, এ রক্ষঃসমরে,
প্রাণাধিক ভাই এই কিশোর লক্ষ্মণে!
দুর্দ্দান্ত দানবে দলি, নিস্তারিলা তুমি,
দেববলে, নিস্তারিণি! নিস্তার অধীনে,
মহিষমর্দ্দিনি, মর্দ্দি দুর্ম্মদ রাক্ষসে!”
 এইরূপে রক্ষোরিপু স্তুতিলা সতীরে।
যথা সমীরণ বহে পরিমল-ধনে
রাজালয়ে, শব্দবহ আকাশ বহিলা
রাঘবের আরাধনা কৈলাসসদনে।
হাসিলা দিবিন্দ্র দিবে ; পবন অমনি
চালাইলা আশুতরে সে শব্দবাহকে।
২। বিভীষণ রণে---সংগ্রামে ভয়প্রদ।
৭। পদাম্বুজে---চরণকমলে।
১২। ভুঞ্জাও---ভোগ করাও। মৃত্যুঞ্জয়-প্রিয়ে---শিবপ্রিয়ে। শিবের একটি নাম মৃত্যুঞ্জয় অর্থাৎ যিনি মৃত্যুকে জয় করিয়াছেন।
১৪। কিশোর---বালক।
১৭। মর্দ্দি---মর্দ্দন অর্থাৎ নাশ করিয়া। দুর্ম্মদ---যাহাকে অতিকষ্টে নাশ করা যায়।
১৯। পরিমল-ধন---সৌরভস্বরূপ ধন।
২০। শব্দবহ---যে শব্দকে বহন করে।
২৩। আশুতরে---অতিশীঘ্র। শব্দবাহক---আকাশ।
গ্রন্থের ১৬২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
শুনি সে সু-আরাধনা, নগেন্দ্রনন্দিনী,
আনন্দে, তথাস্তু, বলি আশীষিলা মাতা।
হাসি দেখা দিলা ঊষা উদয়-অচলে,
আশা যথা, আহা মরি, আঁধার হৃদয়ে,
দুঃখতমোবিনাশিনী! কূঞ্জনিল পাখী
নিকুঞ্জে, গুঞ্জরি অলি, ধাইল চৌদিকে
মধুজীবী ; মৃদুগতি চলিলা শর্ব্বরী,
তারাদলে লয়ে সঙ্গে ; ঊষার ললাটে
শোভিল একটি তারা, শত-তারা-তেজে!
ফুটিল কুন্তলে ফুল, নব তারাবলী!
লক্ষ্য করি রক্ষোবরে রাঘব কহিলা ;
“সাবধানে যাও, মিত্র। অমূল রতনে
রামের, ভিখারী রাম অর্পিছে তোমারে,
রথীবর! নাহি কাজ বৃথা বাক্যব্যয়ে---
জীবন, মরণ মম আজি তব হাতে!”
আশ্বাসিলা মহেষ্বাসে বিভীষণ বলী।
“দেবকুলপ্রিয় তুমি, রঘুকুলমণি ;
কাহারে ডরাও, প্রভু? অবশ্য নাশিবে
সমরে সৌমিত্রি শূর মেঘনাদ শূরে।”
বন্দি রাঘবেন্দ্রপদ, চলিলা সৌমিত্রি
সহ মিত্র বিভীষণ। ঘন ঘনাবলী
বেড়িল দোঁহারে, যথা বেড়ে হিমানীতে
কুজ্ঝটিকা গিরিশৃঙ্গে, পোহাইলে রাতি।
চলিলা অদৃশ্যভাবে লঙ্কামুখে দোঁহে।
যথায় কমলাসনে বসেন কমলা---
রক্ষকুল-রাজলক্ষ্মী---রক্ষোবধূ-বেশে,
১। নগেন্দ্রনন্দিনী---গিরিরাজবালা।
৭ মধুজীবী---যাহরা মধু পান করিয়া জীবন ধাধণ করে।
১২। অমূল্য রতনে---লক্ষ্মণরূপ অমূল্য রত্নে।
১৬। মহেষ্বাস---মহাধনুর্দ্ধর।
২২। হিমানীতে---হিমসংহতিকালে অর্থাৎ শীতকালে।
গ্রন্থের ১৬৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
প্রবেশিলা মায়াদেবী সে স্বর্ণ-দেউলে।
হাসিয়া সুধিলা রমা, কেশববাসনা ;---
“কি কারণে, মহাদেবি, গতি এবে তব
এ পুরে? কহ, কি ইচ্ছা তোমার, রঙ্গিণি?”
উত্তরিলা মৃদু হাসি মায়া শক্তীশ্বরী ;---
“সম্বর, নীলাম্বুসুতে, তেজঃ তব আজি ;
পশিবে এ স্বর্ণপুরে দেবাকৃতি রথী
সৌমিত্রি ; নাশিবে শূর, শিবের আদেশে,
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে দম্ভী মেঘনাদে।---
কালানল মম তেজঃ তব, তেজস্বিনি ;
কার সাধ্য বৈরিভাবে পশে এ নগরে?
সুপ্রসন্ন হও, দেবি, করি এ মিনতি,
রাঘবের প্রতি তুমি! তার, বরদানে,
ধর্ম্মপথ-গামী রামে, মাধবরমণি!”
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি কহিলা ইন্দিরা ;---
“কার সাধ্য, বিশ্বধ্যেয়া, অবহেলে তব
আজ্ঞা? কিন্তু প্রাণ মম কাঁদে গো স্মরিলে
এ সকল কথা! হায়, কত যে আদরে
পূজে মোরে রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, রাণী মন্দোদরী,
কি আর কহিব তার? কিন্তু নিজদোষে
মজে রক্ষঃকুলনিধি! সম্বরিব, দেবি,
তেজঃ ;----প্রাক্তনের গতি কার সাধ্য রোধে?
কহ সৌমিত্রিরে তুমি পশিতে নগরে
নির্ভয়ে। সন্তুষ্ট হয়ে বর দিনু আমি,
সংহারিবে এ সংগ্রামে সুমিত্রানন্দন
বলী---অরিন্দম মন্দোদয়ীর নন্দনে!”
চলিলা পশ্চিম দ্বারে কেশববাসনা---
৬। সম্বর--সন্বরণ কর। নীলাম্বুসুতে---জলধিদুহিতে।
৯। দম্ভী---অহঙ্কারী।
১৬। বিশ্বধ্যেয়া---বিশ্বারাধ্যা।
২২। প্রাক্তন---অদৃষ্ট, কপাল।
২৬। অরিন্দম----শত্রুদমনকারী।
গ্রন্থের ১৬৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সুরমা, প্রফুল্ল ফুল প্রত্যুষে যেমতি
শিশির-আসারে ধৌত! চলিলা রঙ্গিণী
সঙ্গে মায়া। শুখাইল রম্ভাতরুরাজি ;
ভাঙিল মঙ্গলঘট ; শুষিলা মেদিনী
বারি। রাঙা পায়ে আসি মিশিল সত্বরে
তেজোরাশি, যথা পশে, নিশা-অবসানে,
সুধাকর-কর-জাল রবি-কর-জালে!
শ্রীভ্রষ্টা হইল লঙ্কা ; হারাইলে, মরি!
কুন্তলশোভন মণি ফণিনী যেমনি!
গম্ভীর নির্ঘোষে দূরে ঘোষিলা সহসা
ঘনদল ; বৃষ্টিছলে গগন কাঁদিলা ;
কল্লোলিলা জলপতি ; কাঁপিলা বসুধা।
আক্ষেপে, রে রক্ষঃপুরি, তোর এ বিপদে,
জগতের অলঙ্কার তুই, স্বর্ণময়ি!
প্রাচীরে উঠিয়া দোঁহে হেরিলা অদূরে
দেবাকৃতি সৌমিত্রিরে, কুজ্ঝটিকাবৃত
যেন দেব ত্বিষাম্পতি, কিম্বা বিভাবসু
ধূমপুঞ্জে। সাথে সাথে বিভীষণ রথী---
বায়ুসখা সহ বায়ু---দুর্ব্বার সমরে।
কে আজি রক্ষিবে, হায়, রাক্ষসভরসা
রাবণিরে! ঘন বনে, হেরি দূরে যথা
মৃগবরে, চলে ব্যাঘ্র গুল্ম-আবরণে,
সুযোগপ্রয়াসী ; কিম্বা নদীগর্ভে যথা
অবগাহকেরে দূরে নিরখিয়া, বেগে
২। আসার---বারিধারা।
১৭। ত্বিষাম্পতি---তেজস্পতি, সূর্য্য। বিভাবসু---অগ্নি।
১৯। বায়ুসখা---অগ্নি।
২০। রাক্ষসভরসা---রাক্ষসকূলের ভরসাস্বরূপ।
২২। গুল্ম-আবরণে---লতারূপ আবরণের মধ্য দিয়া।
২৩। সুযোগপ্রয়াসী---যে সুযোগে চেষ্টা করে।
২৪। অবগাহক---যে ব্যক্তি নদী পুষ্করিণী প্রভৃতিতে নামিয়া স্নান করে।
গ্রন্থের ১৬৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
যমচক্ররূপী নক্র ধায় তার পানে
অদৃশ্যে, লক্ষ্মণ শূর, বধিতে রাক্ষসে,
সহ মিত্র বিভীষণ, চলিলা সত্বরে।
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, বিদায়ি মায়ারে,
স্বমন্দিরে গেলা চলি ইন্দিরা সুন্দরী।
কাঁদিলা মাধবপ্রিয়া! উল্লাসে শুষিলা
অশ্রুবিন্দু বসুন্ধরা---শুষে শুক্তি যথা
যতনে, হে কাদম্বিনি, নয়নাম্বু তব,
অমূল্য মুকুতাফল ফলে যার গুণে
ভাতে যবে স্বাতী সতী গগনমণ্ডলে।
প্রবল মায়ার বলে পশিলা নগরে
বীরদ্বয়। সৌমিত্রির পরশে খলিল
দুয়ার অশনি-নাদে ; কিন্তু কার কানে
পশিল আরাব? হায়! রক্ষোরথী যত
মায়ার ছলনে অন্ধ, কেহ না দেখিলা
দুরন্ত কৃতান্তদূতসম রিপুদ্বয়ে,
কুসুম-রাশিতে অহি পশিল কৌশলে!
সবিস্ময়ে রামানুজ দেখিলা চৌদিকে
চতুরঙ্গ বল দ্বারে ;---মাতঙ্গে নিষাদী,
তুরঙ্গমে সাদীবৃন্দ, মহারথী রথে,
ভূতলে শমনদূত পদাতিক যত---
ভীমাকৃতি ভীমবীর্য্য ; অজেয় সংগ্রামে।
কালানল-সম বিভা উঠিছে আকাশে!
হেরিলা সভয়ে বলী সর্ব্বভূক্ রূপী
বিরূপাক্ষ মহারক্ষঃ প্রক্ষেড়নধারী,
১। যমচক্ররূপী---যমের চক্রস্বরূপ ভয়ানক। নক্রু---কুম্ভীর।
১৩। অশনি-নাদে---বজ্রধ্বনিতে।
১৯। নিষাদী---হস্ত্যারোহী, মাহুত।
২০। সাদী--অশ্বারূঢ়।
২৪। সর্ব্বভূক্ রূপী---অগ্নিসম তেজস্বী।
২৫। বিরূপাক্ষ---একজন রাক্ষসের নাম। প্রক্ষেড়ন---অস্ত্রবিশেষ।
গ্রন্থের ১৬৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সুবর্ণ স্যন্দনারূঢ় ; তালবৃক্ষাকৃতি
দীর্ঘ তালজঙ্ঘা শূর---গদাধর যথা
মুর-অরি ; গজপৃষ্ঠে কালনেমি, বলে
রিপুকুলকাল বলী ; বিশারদ রণে,
রণপ্রিয়, বীরমদে প্রমত্ত সতত
প্রমত্ত ; চিক্ষুর রক্ষঃ যক্ষপতি-সম ;---
আর আর মহাবলী, দেবদৈত্যনর-
চিরত্রাস! ধীরে ধীরে, চলিলা দুজনে ;
নীরবে উভয় পার্শ্বে হেরিলা সৌমিত্রি
শত শত হেম-হর্ম্ম্য, দেউল, বিপণি,
উদ্যান, সরসী, উত্স ; অশ্ব অশ্বালয়ে,
গজালয়ে গজবৃন্দ ; স্যন্দন অগণ্য
অগ্নিবর্ণ ; অস্ত্রশালা, চারু নাট্যশালা,
মণ্ডিত রতনে, মরি! যথা সুরপুরে!---
লঙ্কার বিভব যত কে পারে বর্ণিতে---
দেবলোভ, দৈত্যকুল-মাৎসর্য্য? কে পারে
গণিতে সাগরে রত্ন, নক্ষত্র আকাশে?
নগর মাঝারে শূর হেরিলা কৌতুকে
রক্ষোরাজরাজগৃহ। ভাতে সারি সারি
কাঞ্চনহীরকস্তম্ভ ; গগন পরশে
গৃহচূড়, হেমকূটশৃঙ্গাবলী যথা
বিভাময়ী। হস্তিদন্ত স্বর্ণকান্তি সহ
শোভিছে গবাক্ষে, দ্বারে, চক্ষুঃ বিনোদিয়া,
তুষাররাশিতে শোভে প্রভাতে যেমতি
সৌরকর! সবিস্ময়ে চাহি মহাযশাঃ
১। স্যন্দন---রথ।
৪। রিপুকুলকাল--- রিপুকুলের কাল, অর্থাৎ যমস্বরূপ।
১১। উৎস---প্রশ্রবণ, নির্ঝর।
১৬। দেবলোভ---দেবতাদিগের লোভজনক। অর্থাৎ যাছা দেখিয়া দেবতাদিগেরও লোভ জন্মে। মাৎসর্য্য---অন্যের সৌভাগ্যে দ্বেষ। এ স্থলে অহঙ্কার মাত্র।
২৪। তুষার---হিম, বরফ।
২৫। সৌরকর---সূর্য্যকিরণ।
গ্রন্থের ১৬৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সৌমিত্রি, শূরেন্দ্র মিত্র বিভীষণ পানে,
কহিলা,---“অগ্রজ তব ধন্য রাজকুলে,
রক্ষোবর, মহিমার অর্ণব জগতে।
এ হেন বিভব, আহা, কার ভবতলে?”
nbsp;বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি উত্তরিলা বলী
বিভীষণ,---“যা কহিলে সত্য, শূরমণি!
এ হেন বিভব, হায়, কার ভবতলে?
কিন্তু চিরস্থায়ী কিছু নহে এ সংসারে।
এক যায় আর আসে, জগতের রীতি,---
সাগরতরঙ্গ যথা! চল ত্বরা করি,
রথীবর, সাধ কাজ বধি মেঘনাদে
অমরতা লভ, দেব, যশঃসুধা-পানে!”
nbsp;সত্বরে চলিলা দোঁহে, মায়ার প্রসাদে,
অদৃশ্য ! রাক্ষসবধূ, মৃগাক্ষীগঞ্জিনী,
দেখিলা লক্ষ্মণ বলী সরোবরকূলে,
সুবর্ণ-কলসি কাঁথে, মধুর অধরে
সুহাসি! কমল ফুল ফোটে জলাশয়ে
প্রভাতে! কোথাও রথী বাহিরিছে বেগে
ভীমকায় ; পদাতিক, আয়সী-আবৃত,
ত্যজি ফুলশয্যা ; কেহ শৃঙ্গ নিনাদিছে
ভৈরবে নিবারি নিদ্রা ; সাজাইছে বাজী
বাজীপাল ; গজ্জি গজ সাপটে প্রমদে
মুদগর ; শোভিছে পট্ট-আবরণ পিঠে,
ঝালরে মুকুতাপাঁতি ; তুলিছে যতনে
সারথি বিবিধ অস্ত্র স্বর্ণধ্বজ রথে।
বাজিছে মন্দিরবৃন্দে প্রভাতী বাজনা,
১৪। মৃগাক্ষীগঞ্জিনী---সুন্দরীকুলগঞ্জনাকারিণী, অর্থাৎ যাহার সৌন্দর্য্যসন্দর্শনে সুন্দরীকূল লজ্জিত হয়।
১৯। আয়সী---লৌহময় কবচ।
২১। বাজী---ঘোড়া।
২২। বাজীপাল---অশ্বপালক, অর্থাৎ সইস।
২৩। পট্ট-আবরণ---পট্টবস্ত্রনির্ম্মিত আচ্ছাদন, অর্থাৎ গদি।
গ্রন্থের ১৬৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
হায় রে, সুমনোহর, বঙ্গগৃহে যথা
দেবদোলোত্সব বাদ্য, দেবদল যবে,
আবির্ভাবি ভবতলে, পূজেন রমেশে!
অবচয়ি ফুলচয়, চলিছে মালিনী
কোথাও, আমোদি পথ ফুল-পরিমলে
উজলি চৌদিক রূপে, ফুলকুলসখী
ঊষা যথা! কোথাও বা দধি দুগ্ধ ভারে
লইয়া ধাইছে ভারী ; ক্রমশঃ বাড়িছে
কল্লোল, জাগিছে পুরে পুরবাসী যত।
কেহ কহে,---“চল, ওহে উঠিগে প্রাচীরে।
না পাইব স্থান যদি না যাই সকালে
হেরিতে অদ্ভুত যুদ্ধ। জুড়াইব আঁখি
দেখি আজি যুবরাজে সমর-সাজনে,
আর বীরশ্রেষ্ঠ সবে।” কেহ উত্তরিছে
প্রগল্ ভে,---“কি কাজ, কহ, প্রাচীর উপরে?
মুহুর্তে নাশিবে রামে অনুজ লক্ষ্মণে
যুবরাজ, তার শরে কে স্থির জগতে?
দিবে বিপক্ষদলে, শুষ্ক তৃণে যথা
দহে বহ্নি, রিপুদমী! প্রচণ্ড আঘাতে
দণ্ডি তাত বিভীষণে, বাঁধিবে অধমে।
রাজপ্রসাদের হেতু অবশ্য আসিবে
রণজয়ী সভাতলে ; চল সভাতলে।”
কত যে শুনিলা বলী, কত যে দেখিলা,
কি আর কহিবে কবি? হাসি মনে মনে,
দেবাকৃতি, দেববীর্য্য, দেব-অস্ত্রধারী
চলিলা যশস্বী, সঙ্গে বিভীষণ রথী ;---
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার শোভিল অদূরে।
কুশাসনে ইন্দ্রজিত পূজে ইষ্টদেবে
8। অবচয়ি---অবচয়ন করিয়া তুলিয়া।
৬। উজলি---উজ্জ্বল করিয়া।
১৫। প্রগল্ ভে---অহঙ্কারে।
গ্রন্থের ১৬৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
নিভৃতে ; কৌষিক বস্ত্র, কৌষিক উত্তরী,
চন্দনের ফৌঁটা ভালে, ফুলমালা গলে।
পুড়ে ধূপদানে ধূপ ; জ্বলিছে চৌদিকে
পূত ঘৃতরসে দীপ ; পুষ্প রাশি রাশি,
গণ্ডাররর শৃঙ্গে গড়া কোষা কোষী, ভরা
হে জাহ্নবি, তব জলে, কলুষনাশিনী
তুমি! পাশে হেম-ঘণ্টা, উপহার নানা,
হেম-পাত্রে ; রুদ্ধ দ্বার ;---বসেছে একাকী
রথীন্দ্র, নিমগ্ন তপে চন্দ্রচূড় যেন---
যোগীন্দ্র---কৈলাস গিরি, তব উচ্চ চূড়ে!
যথা ক্ষুধাতুর ব্যাঘ্র পশে গোষ্ঠগৃহে
যমদূত, ভীমবাহু লক্ষ্মণ পশিলা
মায়াবলে দেবালয়ে। ঝন্ ঝনিল অসি
পিধানে, ধ্বনিল বাজি তূণীর-ফলকে,
কাঁপিল মন্দির ঘন বীরপদভরে।
চমকি মুদিত আঁখি মিলিলা রাবণি।
দেখিলা সম্মুখে বলী দেবাকৃতি রহী-_
তেজস্বী মধ্যাহ্নে যথা দেব অংশুমালী!
সাষ্টাঙ্গে প্রণমি শূর, কৃতাজলিপুটে,
কহিলা, “হে বিভাবসু, শুভ ক্ষণে আজি
পূজিল তোমারে দাস, তেঁই, প্রভু, তুমি
পবিত্রিলা লঙ্কাপুরী ও পদ অর্পণে!
কিন্তু কি কারণে, কহ, তেজস্বী, আইলা
রক্ষঃকুলরিপু নর লক্ষণের রূপে
প্রসাদিতে এ অধীনে? একি লীলা তব,
প্রভাময়?” পুনঃ বলী নমিলা ভূতলে।
উত্তরিলা বীরদর্পে রৌদ্র দাশরথি ;---
৪। পূত---মন্ত্র দ্বারা পবিত্র।
৬। কলুষনাশিনী---পাপনাশিনী।
৭। উপহার---উপকরণ, পূজাসামগ্রী।
২৫। প্রসাদিতে---প্রসাদ অর্থাৎ অনুগ্রহ করিতে।
২৭। রৌদ্র---ভয়ানক।
গ্রন্থের ১৭০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
“নহি বিভাবসু আমি, দেখ নিরখিয়া,
রাবণি! লক্ষ্মণ নাম, জন্ম রঘুকুলে!
সংহারিতে, বীরসিংহ, তোমায় সংগ্রামে
আগমন হেথা মম ; দেহ রণ মোরে
অবিলম্বে।” যথা পথে সহসা হেরিলে
ঊর্দ্ধফণা ফণীশ্বরে, ত্রাসে হীনগতি
পথিক, চাহিলা বলী লক্ষ্মণের পানে।
সভয় হইল আজি ভয়শূন্য হিয়া!
প্রচণ্ড উত্তাপে পিণ্ড, হায় রে, গলিল!
গ্রাসিল মিহিরে রাহু, সহসা আঁধারি
তেজঃপুঞ্জ! অম্বুনাথে নিদাঘ শুষিল!
পশিল কৌশলে কলি নলের শরীরে!
বিস্ময়ে কহিলা শূর, “সত্য যদি তুমি
রামানুজ, কহ, রথি, কি ছলে পশিলা
রক্ষোরাজপুরে আজি? রক্ষঃ শত শত,
যক্ষপতিত্রাস বলে, ভীম অস্ত্রপাণি,
রক্ষিছে নগর-দ্বার ; শৃঙ্গধরসম
এ পুর-প্রাচীর উচ্চ ; প্রাচীর উপরে
ভ্রমিছে অযুত যোধ চক্রাবলীরূপে ;---
কোন্ মায়াবলে, বলি, ভূলালে এ সবে?
মানবকুলসম্ভব, দেবকুলোদ্ভবে
কে আছে রথী এ বিশ্বে, বিমুখয়ে রণে
একাকী এ রক্ষোবৃন্দে? এ প্রপঞ্চে তবে
কেন বঞ্চাইছ দাসে, কহ তা দাসেরে,
সর্ব্বভুক্? কি কৌতুক এ তব, কৌতুকি?
নহে নিরাকার দেব, সৌমিত্রি ; কেমনে
এ মন্দিরে পশিবে সে? এখনও দেখ
৬। উর্দ্ধকণা---উদগতফণা, অর্থাৎ ফণাধারী।
৯ । পিণ্ড---লৌহপিও।
১০। মিহির---সূর্য্য।
১১। অম্বুনাথ---জলপতি, সমুদ্র। নিদাঘ---গ্রীষ্মোত্তাপ।
২৪। বঞ্চাইছ---বঞ্চনা করিতেছ।
২৫। সর্ব্বভুক্---সর্ব্বসংহারক অর্থাৎ অগ্নি।
গ্রন্থের ১৭১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
রুদ্ধ দ্বার! বর, প্রভু, দেহ এ কিঙ্করে
নিঃশঙ্কা করিব লঙ্কা বধিয়া রাঘবে
আজি, খেদাইব দূরে কিষ্কিন্ধ্যা-অধিপে,
বাঁধি আনি রাজপদে দিব বিভীষণে
রাজদ্রোহী। ওই শুন, নাদিছে চৌদিকে
শৃঙ্গ শৃঙ্গনাদিগ্রাম! বিলম্বিলে আমি,
ভগ্নোদ্যম রক্ষঃ-চমূ, বিদাও আমারে!”
উত্তরিলা দেবাকৃতি সৌমিত্রি কেশরী,---
“কৃতান্ত আমি রে তোর, দুরন্ত রাবণি!
মাটি কাটি দংশে সর্প আয়ুহীন জনে!
মদে মত্ত সদা তুই ; দেব-বলে বলী,
তবু অবহেলা, মূঢ়, করিস্ সতত
দেবকুলে! এত দিনে মজিলি দুর্ম্মতি ;---
দেবাদেশে রণে আমি আহ্বানি রে তোরে!”
এতেক কহিয়া বলী উলঙ্গিলা অসি
ভৈরবে! ঝলসি আঁখি কালানল-তেজে,
ভাতিল কৃপাণবর, শত্রুকরে যথা
ইরম্মদময় বজ্র! কহিলা রাবণি,---
“সত্য যদি রামানুজ তুমি, ভীমবাহু
লক্ষ্মণ ; সংগ্রাম-সাধ অবশ্য মিটাব
মহাহবে আমি তব, বিরত কি কভু
রণরঙ্গে ইন্দ্রজিৎ? আতিথেয় সেবা,
তিষ্ঠি, লহ, শূরশ্রেষ্ঠ। প্রথমে এ ধামে---
রক্ষোরিপু তুমি, তবু অতিথি হে এবে।
সাজি বীরসাজে আমি। নিরস্ত্র যে অরি,
৩। কিষ্কিন্ধ্যা অধিপ---কিষ্কিন্ধ্যার রাজা, অর্থাৎ সুগ্রীব।
৫। রাজদ্রোহী---রাজানিষ্টকারী।
৬। শৃঙ্গনাদিগ্রাম---শৃবাদকসমূহ।
৭। ভগ্নোদ্যম---ভগ্নোৎসাহ, হতাশ। রক্ষঃ-চমূ---রাক্ষস সেনা। বিদাও---বিদায় কর।
১৫। উলঙ্গিলা---উলঙ্গ করিলা অর্থাৎ খাপ হইতে বাহির করিলা।
১৭। কৃপাণবর---তরবারিশ্রেষ্ঠ। শত্রুকরে---ইন্দ্রহস্তে।
২১। মহাহবে---মহাযুদ্ধে।
গ্রন্থের ১৭২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
নহে রথীকুলপ্রথা আঘাতিতে তারে।
এ বিধি, হে বীরবর, অবিদিত নহে,
ক্ষত্র তুমি, তব কাছে ;---কি আর কহিব?”
জলদ-প্রতিম স্বনে কহিলা সৌমিত্রি,---
“আনায় মাঝারে বাঘে পাইলে কি কভু
ছাড়ে রে কিরাত তারে? বধিব এখনি,
অবোধ, তেমতি তোরে! জন্ম রক্ষঃকুলে
তোর, ক্ষত্রধর্ম্ম, পাপি, কি হেতু পালিব
তোর সঙ্গে? মারি অরি, পারি যে কৌশলে!”
কহিলা বাসবজেতা, (অভিমন্যু যথা
হেরি সপ্ত শূরে শূর তপ্তলৌহাকৃতি
রোষে!) “ক্ষত্রকুলগ্লানি, শত ধিক্ তোরে,
লক্ষ্মণ! নির্লজ্জ তুই। ক্ষত্রিয় সমাজে
রোধিবে শ্রুবণপথ ঘৃণায়, শুনিলে
নাম তোর রথীবৃন্দ! তস্কর যেমতি,
পশিলি এ গৃহে তুই ; তস্কর-সদৃশ
শাস্তিয়া নিরস্ত তোরে করিব এখনি!
পশে যদি কাকোদর গরুড়ের নীড়ে,
ফিরি কি সে যায় কভু আপন বিবরে,
পামর! কে তোরে হেথা আনিল দুর্ম্মতি?”
চক্ষের নিমিষে কোষা তুলি ভীমবাহু
নিক্ষেপিলা ঘোর নাদে লক্ষণের শিরে।
পড়িল ভূতলে বলী ভীম প্রহরণে,
পড়ে তরুরাজ যথা প্রভঞ্জনবলে
মড়মড়ে! দেব-অস্ত্র বাজিল ঝন্ ঝনি,
কাঁপিল দেউল যেন ঘোর ভূকম্পনে!
৪। জলদ-প্রতিম স্বনে---মেঘগর্জ্জনসদৃশ স্বরে।
৫। আনায়---জাল, ফাঁদ।
১১। সপ্ত শূরে---সাত জন বীরে।
১৪। রোধিবে---রোধ করিবে ; অর্থাৎ ঢাকিবে।
১৭। শাস্তিয়া---শাস্তি দিয়া।
১৮। কাকোদর---সর্প।
২৩। ভীম প্রহরণে---ভীম আঘাতে।
গ্রন্থের ১৭৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
বহিল রুধির-ধারা! ধরিলা সত্বরে
দেব-অসি ইন্দ্রজিৎ ;---নারিলা তুলিতে
তাহায়! কার্ম্মুক ধরি কর্ষিলা ; রহিল
সৌমিত্রির হাতে ধনুঃ! সাপটিলা কোপে
ফলক ; বিফল বল সে কাজ সাধনে!
যথা শুণ্ডধর টানে শুণ্ডে জড়াইয়া
শৃঙ্গধরশৃঙ্গে বৃথা, টানিলা তূণীরে
শূরেন্দ্র! মায়ার মায়া কে বুঝে জগতে!
চাহিলা দুয়ার পানে অভিমানে মানী।
সচকিতে বীরবর দেখিলা সম্মুখে
ভীমতম শূল হস্তে, ধূমকেতুসম
খুল্লতাত বিভীষণে---বিভীষণ রণে!
“এত ক্ষণে” অরিন্দম কহিলা বিষাদে---
“জানিনু কেমনে আসি লক্ষণ পশিল
রক্ষঃপুরে! হায়, তাত, উচিত কি তব
এ কাজ, নিকষা সতী তোমার জননী,
সহোদর রক্ষঃশ্রেষ্ঠ? শূলীশম্ভুনিভ
কুম্ভকর্ণ? ভ্রাতৃপুত্র বাসববিজয়ী?
নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?
চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?
কিন্ত নাহি গঞ্জি তোমা, গুরু জন তুমি
পিতৃতুল্য। ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে,
পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে,
লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে।”
উত্তরিলা বিভীষণ ; “বৃথা এ সাধনা,
৩। কার্ম্মুক---ধনুঃ।
৫। ফলক---ঢাল।
৬। শুণ্ডধর---হস্থী।
১২। খুল্লতাত---কনিষ্ঠ তাত, অর্থাৎ খুড়া।
১৭। শূলীশম্ভুনিভ---শূলাস্ত্রধারী মহাদেবসদৃশ।
১৮। বাসববিজয়ী---ইন্দ্রজিৎ।
২১। গঞ্জি---গঞ্জনা অর্থাৎ তিরস্কার করি।
২৪। ভঞ্জিব---ঘুচাইব। আহবে---সংগ্রামে।
২৫। সাধনা---প্রার্থনা, ইচ্ছা।
গ্রন্থের ১৭৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ধীমান্! রাঘবদাস আমি ; কি প্রকারে
তাহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতে
অনুরোধ?” উত্তরিলা কাতরে রাবণি ;---
“হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে!
রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে
আনিলে এ কথা, তাত, কহ তা দাসেরে!
স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে;
পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি
ধুলায়? হে রক্ষোরথি, ভুলিলে কেমনে
কে তুমি? জনম তব কোন্ মহাকুলে?
কে বা সে অধম রাম? স্বচ্ছ সরোবরে
করে কেলি রাজহুংস পঙ্কজ-কাননে ;
যায় কি সে কভু, প্রভু, পঙ্কিল সলিলে,
শৈবালদলের ধাম? মৃগেন্দ্র কেশরী,
কবে, হে বীরকেশরি, সম্ভাষে শৃগালে
মিত্রভাবে? অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি,
অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে।
ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, লক্ষণ ; নহিলে
অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে?
কহ, মহারথি, এ কি মহারথীপ্রথা?
নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে
একথা! ছাড়হ পথ ; আসিব ফিরিয়া
এখনি! দেখিব আজি, কোন্ দেববলে,
বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি!
দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ,
রক্ষঃশ্রেষ্ট, পরাক্রম দাসের! কি দেখি
ডরিবে এ দাস হেন দুর্ব্বল মানবে?
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রগল্ ভে পশিল
৪। ইচ্ছি---ইচ্ছা করি।
৭। বিধু---চন্দ্র। বিধি---বিধাতা। স্থানু---মহাদেব।
১৫। সম্ভাষে---সম্ভাষণ করে।
১৬। অজ্ঞ---নির্ব্বোধ।
গ্রন্থের ১৭৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
দম্ভী ; আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে।
তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পণ করে
বনবাসী! হে বিধাতঃ, নন্দন-কাননে
ভ্রমে দুরাচার দৈত্য? প্রফুল্ল কমলে
কীটবাস? কহ তাত, সহিব কেমনে
হেন অপমান আমি,---ভ্রাতৃ-পুত্র তব?
তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে?”
মহামন্ত্র-বলে যথা নম্রশিরঃ ফণী,
মলিনবদন লাজে, উত্তরিলা রথী
রাবণ-অনুজ, লক্ষি রাবণ-আত্মজে ;
“নহি দোষী আমি, বৎস ; বৃথা ভত্স মোরে
তুমি! নিজ কর্ম্ম-দোষে, হায়, মজাইলা
এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি!
বিরত সতত পাপে দেবকুল ; এবে
পাপপূর্ণ লঙ্কাপুরী ; প্রলয়ে যেমতি
বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কালসলিলে!
রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী
তেঁই আমি! পরদোষে কে চাহে মজিতে?”
রুষিলা বাসবত্রাস! গম্তীরে যেমতি
নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্র কোপি,
কহিলা বীরেন্দ্র বলী,---“ধর্ম্মপথগামী,
হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে
তুমি ;---কোন্ ধর্ম মতে, কহ দাসে, শুনি,
জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি,---এ সকলে দিলা
জলাঞ্জলি? শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি
১। দম্ভী---অহঙ্কারী। শাস্তি---শাস্তি দি।
১০। রাবণ-আত্মজে---রাবণপুত্রে, মেঘনাদে।
১১। ভর্ৎস---ভর্ৎসনা কর।
১৭। আশ্রয়ী---যে আশ্রয় অর্থাৎ শরণ লয়।
২০। নিশীথ---অর্দ্ধরাত্র। অম্বরে---আকাশে। মন্দ্রে---গভীর শব্দ করে। জীমূতেন্দ্র---মেঘরাজ। কোপি---কোপ করিয়া।
গ্রন্থের ১৭৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
পরজন, গুণহীন স্বজন, তথাপি
নির্গুণ স্বজন শ্রেয়ঃ, পরঃ পরঃ সদা!
এ শিক্ষা, হে রক্ষোবর, কোথায় শিখিলে?
কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা! হেন সহবাসে,
হে পিতৃব্য, বর্ব্বরতা কেন না শিখিবে?
গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্ম্মতি।”
হেথায় চেতন পাই মায়ার যতনে
সৌমিত্রি, হুহুঙ্কারে ধনুঃ টঙ্কারিলা বলী।
সন্ধানি বিন্ধিলা শূর খরতর শরে
অরিন্দম ইন্দ্রজিতে, তারকারি যথা
মহেষ্বাস শরজালে বিঁধেন তারকে!
হায় রে, রুধির-ধারা (ভূধর-শরীরে
বহে বরিষার কালে জলস্রোতঃ যথা,)
বহিল, তিতিয়া বস্ত্র, তিতিয়া মেদিনী!
অধীর ব্যথায় রথী, সাপটি সত্বরে
শঙ্খ, ঘণ্টা, উপহারপাত্র ছিল যত
যজ্ঞাগারে, একে একে নিক্ষেপিলা কোপে ;
যথা অভিমন্যু রথী, নিরস্ত্র সমরে
সপ্ত রথী অস্ত্রবলে, কভু বা হানিলা
রথচুড়, রথচক্র ; কভু ভগ্ন অসি,
ছিন্ন চর্ম্ম, ভিন্ন বর্ম্ম, যা পাইলা হাতে!
কিন্তু মায়াময়ী মায়া, বাহু-প্রসরণে,
ফেলাইলা দূরে সবে, জননী যেমতি
খেদান মশকবৃন্দে সুপ্ত সুত হতে
করপদ্ম-সঞ্চালনে! সরোষে রাবণি
ধাইলা লক্ষ্মণ পানে গর্জ্জি ভীম নাদে,
প্রহারকে হেরি যথা সম্মুখে কেশরী!
মায়ার মায়ায় বলী হেরিলা চৌদিকে
৪। সহবাস---সংসর্গ অর্থাৎ সঙ্গে থাকা।
৫। বর্ব্বরতা---মূর্খতা।
৯। সন্ধানি---সন্ধান করিয়া।
২২। বাহু প্রসরণ---হস্তের ইতস্ততঃ সঞ্চালন।
গ্রন্থের ১৭৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ভীষণ মহিষারূঢ় ভীম দণ্ডধরে ;
শূল হস্তে শূলপাণি ; শঙ্খ, চক্র, গদা
চতুর্ভুজে চতুর্ভুজ ; হেরিলা সভয়ে
দেবকুলরথীবৃন্দে সুদিব্য বিমানে।
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি দাঁড়াইলা বলী
নিষ্কল, হায় রে মরি, কলাধর যথা
রাহুগ্রাসে ; কিম্বা সিংহ আনায় মাঝারে।
ত্যজি ধনুঃ, নিষ্কোশিলা অসি মহাতেজাঃ
রামানুজ ; ঝলসিলা ফলক-আলোকে
নয়ন! হায় রে, অন্ধ অরিন্দম বলী
ইন্দ্রজিৎ, খড়গাঘাতে পড়িলা ভূতলে
শোণিতার্দ্র। থরথরি কাঁপিলা বসুধা ;
গর্জ্জিলা উথলি সিন্ধু! ভৈরব আরবে
সহসা পূরিল বিশ্ব! ত্রিদিবে, পাতালে,
মর্ত্ত্যে, মরামর জীব প্রমাদ গণিলা
আতঙ্কে! যথায় বসি হৈম সিংহাসনে
সভায় কর্ব্বূরপতি, সহসা পড়িল
কনক-মুকুট খসি, রথচূড় যথা
রিপুরথী কাটি যবে পাড়ে রথতলে।
সশঙ্ক লঙ্কেশ শূর স্মরিলা শঙ্করে!
প্রমীলার বামেতর নয়ন নাচিল!
আত্মবিস্মৃতিতে, হায়, অকস্মাৎ সতী
মুছিলা সিন্দূরবিন্দু সুন্দর ললাটে!
মূর্চ্ছিলা রাক্ষসেন্দ্রাণী মন্দোদরী দেবী
আচম্বিতে! মাতৃকোল নিদ্রায় কাঁদিল
শিশুকুল আর্ত্তনাদে, কাঁদিল যেমতি
ব্রজে ব্রজকুলশিশু, যবে শ্যামমণি,
৬। নিষ্কল---চন্দ্রপক্ষে কলারহিত, মেঘনাধপক্ষে তেজোহীন।
২০। শঙ্কর---মহাদেব।
২১। বামেতর---বাম হইতে ইতর বা ভিন্ন অর্থাৎ দক্ষিণ।
২৪। মূর্চ্ছিলা----মূর্চ্ছান্বিত হইলা।
গ্রন্থের ১৭৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
আঁধারি সে ব্রজপুর, গেলা মধুপুরে!
অন্যায় সমরে পড়ি, অসুরারি-রিপু,
রাক্ষসকুল-ভরসা, পরুষ বচনে
কহিলা লক্ষণ শূরে,--“বীরকুলগ্লানি,
স্বমিত্রানন্দন, তুই! শত ধিক্ তোরে!
রাবণনন্দন আমি, না ডরি শমনে!
কিন্তু স্তোর অস্ত্রাঘাতে মরিনু যে আজি,
পামর, এ চিরদুঃখ রহিল রে মনে!
দৈত্যকুলদল ইন্দ্রে দমিনু সংগ্রামে
মরিতে কি তোর হাতে? কি পাপে বিধাতা
দিলেন এ তাপ দাসে, বুঝিব কেমনে?
আর কি কহিব তোরে? এ বারতা যবে
পাইবেন রক্ষোনাথ, কে রক্ষিবে তোরে,
নরাধম? জলধির অতল সলিলে
ডুবিস্ যদিও তুই, পশিবে সেদেশে
রাজরোষ---বাড়বাগ্নিরাশিসম তেজে!
সে রোষ, কাননে যদি পশিস্, কুমতি!
নারিবে রজনী, মূঢ়, আবরিতে তোরে।
দানব, মানব, দেব, কার সাধ্য হেন.
ত্রাণিবে, সৌমিত্রি, তোরে, রাবণ রুষিলে?
কে বা এ কলঙ্ক তোর ভঞ্জিবে জগতে,
কলঙ্কি?” এতেক কহি, বিষাদে সুমতি
মাতৃপিতৃপাদপদ্ম স্মরিলা অন্তিমে।
অধীর হুইলা ধীর ভাবি প্রমীলারে
চিরানন্দ! লোহ সহ মিশি অশ্রুধারা,
অনর্গল বহি, হায়, আর্দ্রিল মহীরে।
৩। পরুষ---কর্কশ।
১২। বারতা---বার্ত্তা, খবর।
২১। ত্রাণিবে---ত্রাণ অর্থাৎ রক্ষা করিবে।
২৪। অন্তিমে---চরমে, শেষাবস্থায়, মৃত্যুকালে।
গ্রন্থের ১৭৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
লঙ্কার পঙ্কজ-রবি গেলা অস্তাচলে।
নির্ব্বাণ পাবক যথা, কিন্বা ত্বিষাম্পতি
শান্তরশ্মি, মহাবল রহিলা ভূতলে।
কহিলা রাবণানুজ সজল নয়নে ;---
“সুপট্ট-শয়নশায়ী তুমি, ভীমবাহু,
সদা, কি বিরাগে এবে পড়ি হে ভূতলে?
কি কহিবে রক্ষোরাজ হেরিলে তোমারে
এ শয্যায়? মন্দোদরী, রক্ষঃকুলেন্দ্রাণী
শরদিন্দুনিভাননা প্রমীলা সুন্দরী?
সুরবালা-গ্লানি রূপে দিতিসুতা যত
কিঙ্করী? নিকষা সতী---বৃদ্ধা পিতামহী?
কি কহিবে রক্ষঃকুল, চূড়ামণি তুমি
সে কুলে? উঠ, বস! খুল্লতাত আমি
ডাকি তোমা---বিভীষণ ; কেন না শুনিছ,
প্রাণাধিক? উঠ, বৎস, খুলিব এখনি
তব অনুরোধে দ্বার! যাও অস্ত্রালয়ে,
লঙ্কার কলঙ্ক আজি ঘুচাও আহবে!
হে কর্ব্বুরকুলগর্ব্ব, মধ্যাহ্নে কি কভু
যান চলি অস্তাচলে দেব অংশুমালী,
জগতনয়নানন্দ? তবে কেন তুমি
এ বেশে, যশস্বি, আজি পড়ি হে ভূতলে?
নাদে শৃঙ্গনাদী, শুন, আহ্বানি তোমারে ;
গর্জ্জে গজরাজ, অশ্ব হেষিছে ভৈরবে ;
সাজে রক্ষঃঅনীকিনী, উগ্রচণ্ডা রণে।
নগর-দুয়ারে অরি, উঠ, অরিন্দম!
এ বিপুল কুলমান রাখ এ সমরে!”
এইরূপে বিলাপিলা বিভীষণ বলী
৬। বিরাগ---দুঃখ।
৯। শরদিন্দুনিভাননা---শরচ্চন্দ্রসগৃশমুখী।
১৯। অংশুমালী---অংশু, কিরণ যাহার মালাস্বরূপ, অর্থাৎ সূর্য্য।
২৪। অনীকিনী---সেনা।
গ্রন্থের ১৮০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
শোকে। মিত্রশোকে শোকী সৌমিত্রি কেশরী
কহিলা,---“সম্বর খেদ, রক্ষঃচূড়ামণি!
কি ফল এ বৃথা খেদে? বিধির বিধানে
বধিনু এ যোধে আমি, অপরাধ নহে
তোমার! যাইব চল যথায় শিবিরে
চিন্তাকুল চিন্তামণি দাসের বিহনে।
বাজিছে মঙ্গলবাদ্য শুন কান দিয়া
ত্রিদশ-আলয়ে, শূর।” শুনিলা সুরথী
ত্রিদিব-বাদিত্র-ধ্বনি-স্বপনে যেমনি
মনোহর! বাহিরিলা আশুগতি দোঁহে,
শার্দ্দূলী অবর্ত্তমানে, নাশি শিশু যথা
নিষাদ, পবনবেগে ধায় ঊদ্ধশ্বাসে
প্রাণ লয়ে, পাছে ভীমা আক্রমে সহসা,
হেরি গতজীব শিশু, বিবশা বিষাদে!
কিন্বা যথা দ্রোণপুত্র অশ্বথামা রথী,
মারি সুপ্ত পঞ্চ শিশু পাণ্ডবশিবিরে
নিশীথে, বাহিরি, গেলা মনোরথগতি,
হরষে তরাসে ব্যগ্র, দুর্য্যোধন যথা
ভগ্ন-উরু কুরুরাজ কুরুক্ষেত্ররণে!
মায়ার প্রসাদে দোঁহে অদৃশ্য, চলিলা
যথায় শিবিরে শূর মৈথিলীবিলাসী।
প্রণমি চরণাম্বুজে, সৌমিত্রি কেশরী
নিবেদিলা করপুটে,--- “ও পদ-প্রসাদে,
রঘুবংশ-অবতংস, জয়ী রক্ষোরণে
এ কিঙ্কর! গতজীব মেঘনাদ বলী
২। সম্বর---পরিত্যাগ কর।
৩। বিধান---নিয়ম,আজ্ঞা।
১১। শার্দ্দূলী---ব্যাঘ্রী। অবর্ত্তমানে---অনুপস্থিতিকালে।
১২। নিষাদ---ব্যাধ।
১৩। আক্রমে---আাক্রমণ করে।
১৪। গতজীব---গতপ্রাণ, অর্থাৎ মৃত। বিবশা---অধীরা।
২৪। অবতংস---অলঙ্কার।
গ্রন্থের ১৮১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ “” ‘’ ; ?
শক্রজিৎ!” চুম্বি শিরঃ, আলিঙ্গি আদরে
অনুজে, কহিলা প্রভু সজল নয়নে,
“লভিনু সীতায় আজি তব বাহুবলে,
হে বাহুবলেন্দ্র! ধন্য বীরকুলে তুমি!
সুমিত্রা জননী ধন্য! রঘুকুলনিধি
ধন্য পিতা দশরথ, জন্মদাতা তব!
ধন্য আমি তবাগ্রজ! ধন্য জন্মভূমি
অযোধ্যা! এ যশঃ তব ঘোষিবে জগতে
চিরকাল! পূজ কিন্তু বলদাতা দেবে,
প্রিয়তম! নিজবলে দুর্ব্বল সতত
মানব ; সু-ফল ফলে দেবের প্রসাদে!”
মহামিত্র বিভীষণে সম্ভাষি সুস্বরে
কহিলা বৈদেহীনাথ,--- “শুভক্ষণে, সখে,
পাইনু তোমায় আমি এ রাক্ষসপুরে।
রাঘবকুলমঙ্গল তুমি রক্ষোবেশে!
কিনিলে রাঘবকুলে আজি নিজগুণে,
গুণমণি! গ্রহরাজ দিননাথ যথা,
মিত্রকুলরাজ তুমি, কহিনু তোমারে!
চল সবে, পূজি তাঁরে, শুভঙ্করী যিনি
শঙ্করী!” কুসুমাসার বৃষ্টিলা আকাশে
মহানন্দে দেববৃন্দ ; উল্লাসে নাদিল,
“জয় সীতাপতি জয়!” কটক চৌদিকে,---
আতঙ্কে কনক-লঙ্কা জাগিলা সে রবে।
ইতি শ্রীমেঘনাদবধে কাব্যে বধো নাম
ষষ্ঠঃ সর্গঃ।
২০। শঙ্করী---মঙ্গলদায়িনী, অর্থাৎ ভবানী, দুর্গা।
২২। কটক---সৈন্য।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রথম প্রকাশ ১৮৬১।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে রামকমল সিংহ দ্বারা প্রকাশিত, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবি সজনীকান্ত দাস দ্বারা মূলতঃ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ সংস্করণ থেকে গৃহীত ও সম্পাদিত এবং ১২৭৪ বঙ্গাব্দে (১৮৬৭ সালে) প্রকাশিত, কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-কৃত টীকা ও ব্যাখ্যা সহ।
মিলনসাগরে প্রকাশ ২১শে ফেব্রুয়ারী ২০২৬।
গ্রন্থের ১৫৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ষষ্ঠ সর্গ
(বধো নাম)
ত্যজি সে উদ্যান, বলী সৌমিত্রি কেশরী
চলিলা, শিবিরে যথা বিরাজেন প্রভু
রঘু-রাজ ; অতি দ্রুতে চলিলা সুমতি,
হেরি মৃগরাজে বনে, ধায় ব্যাধ যথা
অস্ত্রালয়ে,---বাছি বাছি লইতে সত্বরে
তীক্ষ্ণতর প্রহরণ নশ্বর সংগ্রামে।
কত ক্ষণে মহাযশাঃ উতরিল যথা
রঘুরথী। পদযুগে নমি, নমস্কারি
মিত্রবর বিভীষণে, কহিলা সুমতি,---
“কৃতকার্য্য আজি, দেব, তব আশীর্ব্বাদে
চিরদাস! স্মরি পদ, প্রবেশি কাননে,
পুজিনু চামুণ্ডে, প্রভু, সুবর্ণ দেউলে।
ছলিতে দাসেরে সতী কত যে পাতিলা
মায়াজাল, কেমনে তা নিবেদি চরণে,
মূঢ় আমি? চন্ত্রচূড়ে দেখিনু দুয়ারে
রক্ষক ; ছাড়িলা পথ বিনা রণে তিনি
তব পূণ্যবলে, দেব ; মহোরগ যথা
যায় চলি হতবল মহৌষধগুণে!
পশিল কাননে দাস ; আইল গর্জ্জিয়া
সিংহ ; বিমুখিনু তাহে ; ভৈরব হুঙ্কারে
বহিল তুমুল ঝড় ; কালাগ্নি সদৃশ
দাবাগ্নি বেড়িল দেশ ; পুড়িল চৌদিকে
বনরাজী ; কত ক্ষণে নিবিলা আপনি
২। শিবির---তাঁবু।
৬। প্রহরণ---যদ্বারা প্রহার করা যায়, অর্থাৎ অস্ত্র। নশ্বর---নাশক, সংহারক।
১৫। চন্দ্রচূড়---যাঁহার চুড়ায় চন্দ্র আছে। অর্ধাৎ মহাদেব।
১৭। মহোরগ---মহাসর্প।
গ্রন্থের ১৫৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
বায়ুসখা, বায়ুদেব গেলা চলি দূরে।
স্বরবালাদলে এবে দেখিনু সম্মুখে
কুঞ্জবনবিহারিণী ; কৃতাঞ্জলি-পুটে,
পূজি, বর মাগি দেব, বিদাইনু সবে।
অদূরে শোভিল বনে দেউল, উজলি
সুদেশ। সরসে পশি, অবগাহি দেহ,
নীলোৎপলাঞ্জলি দিয়া পূজিনু মায়েরে
ভক্তিভাবে। আবির্ভাবি বর দিলা মায়া।
কহিলেন দয়াময়ী,--- ‘সুপ্রসন্ন আজি,
রে সতীসুমিত্রাসুত,---দেব দেবী যত
তোর প্রতি। দেব-অস্ত্র প্রেরিয়াছে তোরে
বাসব ; আপনি আমি আসিয়াছি হেথা
সাধিতে এ কার্য্য তোর শিবের আদেশে।
ধরি দেব-অস্ত্র, বলি, বিভীষণে লয়ে,
যা চলি নগর মাঝে, যথায় রাবণি,
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে, পূজে বৈশ্বানরে।
সহসা, শার্দ্গূলাক্রমে আক্রমি রাক্ষসে,
নাশ্ তারে! মোর বরে পশিবি দুজনে
অদৃশ্য ; পিধানে যথা অসি, আবরিব
মায়াজালে আমি দোঁহে। নির্ভয় হৃদয়ে,
যা চলি, রে যশস্বি!’---কি ইচ্ছা তব, কহ,
নৃমণি? পোহায় রাতি ; বিলম্ব না সহে।
মারি রাবণিরে, দেব, দেহ আজ্ঞা দাসে!”
উত্তরিলা রঘুনাথ, “হায় রে, কেমনে---
যে কৃতান্তদূতে দূরে হেরি, ঊর্দ্ধশ্বাসে
ভয়াকুল জীবকুল ধায় বায়ুবেগে
প্রাণ লয়ে ; দেব নর ভস্ম যার বিষে ;---
১। বায়ুসখা---অগ্নি।
১৬। বৈশ্বানর---অগ্নি।
১৯। পিধান---খাপ। অসি---তরবারি।
২৫। কৃতান্তদূত---যমদূতস্বরূপ রাবণি।
২৭। যার বিষে---রাবণির ক্রোধানল-বিষে।
গ্রন্থের ১৫৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কেমনে পাঠাই তোরে সে সর্পবিবরে,
প্রাণাধিক? নাহি কাজ সীতায় উদ্ধারি।
বৃথা, হে জলধি, আমি বাঁধিনু তোমারে ;
অসংখ্য রাক্ষসগ্রাম বধিনু সংগ্রামে।
আনিনু রাজেন্দ্রদলে এ কনকপুরে
সসৈন্যে ; শোণিতস্রোতঃ, হায়, অকারণে,
বরিষার জলসম, আর্দ্রিল মহীরে!
রাজ্য, ধন, পিতা, মাতা, স্ববন্ধুবান্ধবে---
হারাইনু ভাগ্যদোষে ; কেবল আছিল
অন্ধকার ঘরে দীপ মৈথিলী ; তাহারে
(হে বিধি, কি দোষে দাস দোষী তব পদে?)
নিবাইল দুরদৃষ্ট! কে আর আছে রে
আমার সংসারে, ভাই, যার মুখ দেখি
রাখি এ পরাণ আমি? থাকি এ সংসারে?
চল ফিরি, পুনঃ মোরা যাই বনবাসে,
লক্ষণ! কুক্ষণে, ভুলি আশার ছলনে,
এ রাক্ষসপুরে, ভাই, আইনু আমরা।”
উত্তরিলা বীরদর্পে সৌমিত্রি কেশরী ;---
“কি কারণে, রঘুনাথ, সভয় আপনি
এত? দৈববলে বলী যে জন, কাহারে
ডরে সে ত্রিভুবনে? দেব-কুলপতি
সহস্রাক্ষ পক্ষ তব ; কৈলাস-নিবাসী
বিরূপাক্ষ ; শৈলবালা ধর্ম্ম-সহায়িনী!
দেখ চেয়ে লঙ্কা পানে ; কাল মেঘ সম
দেবক্রোধ আবরিছে স্বর্ণময়ী আভা
চারি দিকে! দেবহাস্য উজলিছে, দেখ,
১। সে সর্পবিবরে---রাবণিরূপ সর্পের গর্ত্তে, অর্থাৎ রাবণির নিকটে।
৪। রাক্ষসগ্রাম---রাক্ষসসমূহ।
২২। সহস্রাক্ষ---সহস্রচক্ষুঃ অর্থাৎ ইন্দ্র।
২৩। বিরূপাক্ষ---ত্রিলোচন, মহাদেব। শৈলবালা---গিরিবালা, দুর্গা।
গ্রন্থের ১৫৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
এ তব শিবির, প্রভু! আদেশ দাসেরে
ধরি দেব-অস্ত্র আমি পশি রক্ষোগৃহে ;
অবশ্য নাশিব রক্ষে ও পদপ্রসাদে।
বিজ্ঞতম তুমি, নাথ! কেন অবহেল
দেব-আজ্ঞা? ধর্ম্মপথে সদা গতি তব,
এ অধর্ম্ম কার্য্য, আর্য্য, কেন কর আজি?
কে কোথা মঙ্গলঘট ভাঙে পদাঘাতে?”
কহিলা মধুরভাষে বিভীষণ বলী
মিত্র ;---“যা কহিলা সত্য রাঘবেন্দ্র রথী।
দুরন্ত কৃতান্ত-দূত সম পরাক্রমে
রাবণি, বাসবত্রাস, অজেয় জগতে।
কিন্তু বৃথা ভয় আজি করি মোরা তারে।
স্বপনে দেখিনু আমি, রঘুকুলমণি,
রক্ষঃকুল রাজলক্ষ্মী ; শিরোদেশে বসি,
উজলি শিবির, দেব, বিমল কিরণে,
কহিলা অধীনে সাধ্বী ;--- ‘হায়! মত্ত মদে
ভাই তোর, বিভীষণ! এ পাপ-সংসারে
কি সাধে করি রে বাস, কলুষদ্বেষিণী
আমি? কমলিনী কভু ফোটে কি সলিলে
পঙ্কিল? জীমূতাবৃত গগনে কে কবে
হেরে তারা? কিন্তু তোর পূর্ব্ব কর্ম্মফলে
সুপ্রসন্ন তোর প্রতি অমর ; পাইবি
শূন্য রাজ-সিংহাসন, ছত্রদণ্ড সহ,
তুই। রক্ষঃকুলনাথ-পদে আমি তোরে
করি অভিষেক আজি বিধির বিধানে,
৪। অবহেল---অবহেলা কর।
৬। আর্য্য---মান্য।
৭। মঙ্গলঘট---মঙ্গলার্থ কলসী, অর্থাৎ পূর্ণকলসী।
১১। বাসবত্রাস---যাহাকে দেখিয়া ইন্দ্র ভীত হন।
১৮। কলুষদ্বেষিণী---পাপদ্বেষকারিণী।
২০। পঙ্কিল---পঙ্কযুক্ত অর্থাৎ ময়লা। জীমূতাবৃত---মেঘাচ্ছাদিত।
গ্রন্থের ১৫৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
যশস্বি! মারিবে কালি সৌমিত্রি কেশরী
ভ্রাতৃপুত্র মেঘনাদে ; সহায় হইবি
তুই তার! দেব-আজ্ঞা পালিস্ যতনে,
রে ভাবী কর্ব্বুররাজ!---’ উঠি জাগিয়া ;---
স্বর্গীয় সৌরভে পুর্ণ শিবির দেখিনু ;
স্বর্গীয় বাদিত্র, দূরে শুনিনু গগনে
মৃদু! শিবিরের দ্বারে হেরিনু বিম্ময়ে
মদনমোহনে মোহে যে রূপমাধুরী!
গ্রীবাদেশ আচ্ছাদিছে কাদম্বিনীরূপী
কবরী ; ভাতিছে কেশে রত্নরাশি ;---মরি!
কি ছার তাহার কাছে বিজলীর ছটা
মেঘমালে। আচম্বিতে অদৃশ্য হইলা
জগদম্বা। বহুক্ষণ রহিনু চাহিয়া
সতৃষ্ণ নয়নে আমি, কিন্তু না ফলিল
মনোরথ ; আর মাতা নাহি দিলা দেখা।
শুন দাশরথি রথি, এ সকল কথা
মন দিয়া। দেহ আজ্ঞা, সঙ্গে যাই আমি,
যথা যজ্ঞাগারে পূজে দেব বৈশ্বানরে
রাবণি। হে নরপাল, পাল সযতনে
দেবাদেশ! ইষ্টসিদ্ধি অবশ্য হইবে
তোমার, রাঘব-শ্রেষ্ঠ, কহিনু তোমারে!”
উত্তরিলা সীতানাথ সজল-নয়নে ;---
“স্মরিলে পূর্ব্বের কথা, রক্ষঃকুলোত্তম,
৪। ভাবী কর্ব্বুররাজ---ভবিষ্যৎ রক্ষোরাজ, অর্থাৎ যিনি রাবণের নিধনান্তর রাক্ষসদিগের রাজা হইবেন। বিভীষণের রাজ্যলাভ ভবিষ্যদগর্ভে, এজন্য বিভীষণকে ভাবী কর্ব্বুররাজ বলিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে।
৬। বাদিত্রৃ---বাজনা।
৮। মোহে---মোহিত করে।
৯। গ্রীবাদেশ---গলদেশ, ঘাড়।
৯-১০। কাদম্বিনীরূপী কবরী---মেঘমালাস্বরূপ কেশপাশ।
১৩। জগদম্বা---জগন্মাতা।
গ্রন্থের ১৫৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
আকুল পরাণ কাঁদে! কেমনে ফেলিব
এ ভ্রাতৃ-রতনে আমি এ অতল জলে?
হায়, সখে, মন্থরার কুপন্থায় যবে
চলিলা কৈকেয়ী মাতা, মম ভাগ্যদোষে
নির্দ্দয় ; ত্যজিনু যবে রাজ্যভোগ আমি
পিতৃসত্যরক্ষা হেতু ; স্বেচ্ছায় ত্যজিল
রাজ্যভোগ প্রিয়তম ভ্রাতৃ-প্রেম-বশে!
কাঁদিলা সুমিত্রা মাতা! উচ্চে অবরোধে
কাঁদিলা উর্ম্মিলা বধূ ; পৌরজন যত---
কত যে সাধিল সবে, কি আর কহিব?
না মানিল অনুরোধ ; আমার পশ্চাতে
(ছায়া যথা) বনে ভাই পশিল হরষে,
জলাঞ্জলি দিয়া সুখে তরুণ যৌবনে।
কহিলা সুমিত্রা মাতা ;--- ‘নয়নের মণি
আমার, হরিলি তুই, রাঘব! কেজানে,
কি কুহকবলে তুই ভুলালি বাছারে?
সঁপিনু এ ধন তোরে। রাখিস যতনে
এ মোর রতনে তুই, এই ভিক্ষা মাগি।’
“নাহি কাজ, মিত্রবর, সীতায় উদ্ধারি।
ফিরি যাই বনবাসে! দুর্ব্বার সমরে,
দেব-দৈত্য-নর-ক্রাস, রথীন্দ্র রাবণি!
সুগ্রীব বাহুবলেন্দ্র ; বিশারদ রণে
অঙ্গদ, সুযুবরাজ? বায়ুপুত্র হনু,
ভীমপরাক্রম পিতা প্রভঞ্জন যথা ;
ধূম্রাক্ষ, সমর-ক্ষেত্রে ধূমকেতু সম
অগ্নিরাশি ; নল, নীল ; কেশরী---কেশরী
বিপক্ষের পক্ষে শূর ; আর যোধ যত,
১-২। কেমনে ফেলিব ইত্যাদি---ভ্রাতৃরতনে লক্ষ্মণরূপ ভ্রাতৃশ্রেষ্ঠে। এ অতল জলে---মেঘনাদের ক্রোধরূপ অগাধ জলে।
৯। উর্ম্মিলা---লক্ষ্মণের পত্নী।
১৩। তরুণ যৌবন---নবযৌবন।
২৪। প্রভঞ্জন---বায়ু।
গ্রন্থের ১৫৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
দেবাকৃতি, দেববীর্য্য ; তুমি মহারছী ;---
এ সবার সহকারে নারি নিধারিতে
যে রক্ষে, কেমনে, কহ, লক্ষ্মণ একাকী
যুঝিবে তাহার সঙ্গে? হায়, মায়াবিনী
আশা, তেঁই, কহি, সখে, এ রাক্ষস-পুরে,
অলঙ্ঘ্য সাগর লঙ্ঘি, আইন আমরা।”
সহসা আকাশ-দেশে, আকাশ-সম্ভবা
সরস্বত্তী নিনাদিলা মধুর নিনাদে ;
“উচিত কি তব, কহ, হে বৈদেহীপতি,
সংশয়িতে দেববাক্য, দেবকুলপ্রিয়
তুমি? দেবাদেশ, বলি, কেন অবহেল?
দেখ চেয়ে শূন্য পানে।” দেখিলা বিস্ময়ে
রঘুরাজ, অহি সহ যুঝিছে অন্বরে
শিখী। কেকারৰ মিশি ফণীর স্বননে,
ভৈরব আরবে দেশ পূরিছে চৌদিকে!
পক্ষচ্ছায়া আবরিছে, ঘনদল যেন,
গগন ; জ্বলিছে মাঝে, কালানল-তেজে,
হলাহল! ঘোর রণে রণিছে উভয়ে।
মুহুর্মুহুঃ ভয়ে মহী কাঁপিলা ; ঘোষিল
উথলিয়া জলদল। কতক্ষণ পরে,
গতপ্রাণ শিখীবর পড়িলা ভূতলে ;
গরজিলা অজাগর---বিজয়ী সংগ্রামে।
কহিলা রাবণানুজ ;--- “স্বচক্ষে দেখিলা
১০। সংশয়িতে---সংশয় অর্থাৎ সন্দেহ করিতে।
১৩। অহি---সর্প। অন্বর---আকাশ।
১৪। শিখী---ময়ুর। কেকারব---কেকাশব্দ। ময়ূরের ধ্বনির নাম কেকা।
২০-২২। ময়ুর ও সর্পে সংগ্রাম হইয়া পরিশেষে ময়ুর পরাজিত হইয়া ভূমিতলে পতিত হইল, এতদ্ববর্ণনের মর্ম্ম এই, যে লক্ষ্মণ ও মেঘনাদে নাশ্য নাশক ভাব সম্বন্ধ হইলেও লক্ষ্মণের সহিত সংগ্রামে মেঘনাদের ময়ুরের দশা ঘটিবেক, অর্থাৎ লক্ষ্মণ রণে মেঘনাদের প্রাণ সংহার করিবেন।
গ্রন্থের ১৬০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
অদ্ভুত ব্যাপার আজি ; নিরর্থ এ নহে,
কহিনু বৈদেহীনাথ, বুঝ ভাবি মনে!
নহে ছায়াবাজী ইহা ; আশু যা ঘটিবে।
এ প্রপঞ্চরূপে দেব দেখালে তোমারে ;---
নির্বীরিবে লঙ্কা আজি সৌমিত্রি কেশরী!”
প্রবেশি শিবিরে তবে রঘুকুলমণি
সাজাইলা প্রিয়ানুজে দেব-অস্ত্রে। আহা,
শোভিলা সুন্দর বীর স্কন্দ তারকারি-
সদৃশ! পরিলা বক্ষে কবচ সুমতি
তারাময় ; সারসনে ঝল ঝল ঝলে
ঝলিল ভাস্বর অসি মণ্ডিত রতনে।
রবির পরিধি সম দীপে পৃষ্ঠদেশে
ফলক ; দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত, কাঞ্চনে
জড়িত, তাহার সঙ্গে নিষঙ্গ দুলিল
শরপূর্ণ। বাম হস্তে ধরিলা সাপটি
দেবধনুঃ ধনুর্দ্ধর ; ভাতিল মস্তকে
(সৌরকরে গড়া যেন) মুকুট, উজলি
চৌদিক ; মুকুটোপরি লড়িল সঘনে
সুচূড়া, কেশরীপৃষ্ঠে লড়য়ে যেমতি
কেশর! রাঘবানুজ সাজিলা হরষে,
তেজস্বী---মধ্যাহ্নে যথা দেব অংশুমালী!
শিবির হইতে বলী বাহিরিলা বেগে
ব্যগ্র, তুরঙ্গম যথা শৃঙ্গকুলনাদে,
সমরতরঙ্গ যবে উথলে নির্ঘোষে!
১। নিরর্থ---ব্যর্থ, নিষ্ফল।
৪। প্রপঞ্চরূপে---বিস্তারিতরূপে।
৫। নির্বীরিবে---নির্বীর করিবে।
৮। স্কন্দ---কার্ত্তিকেয়। তারকারি---তারকনাশক। একজন অসুরের নাম তারক।
১০। সারসন---কটিবদ্ধ।
১১। ভাস্বর---দীপ্তিশালী।
১৩। দ্বিরদ-রদ---হস্তিদন্ত। ফলক--ঢাল।
১৪। নিষঙ্গ---তূণ।
২০। কেশর---সিংহের ঘাড়ের লোম, এই নিমিত্ত সিংহের একটি নাম কেশরী।
গ্রন্থের ১৬১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
বাহিরিলা বীরবর ; বাহিরিলা সাথে
বীরবেশে বিভীষণ, বিভীষণ রণে।
বরষিলা পুষ্প দেব ; বাজিল আকাশে
মঙ্গলবাজনা ; শূন্যে নাচিল অপ্সরা।
স্বর্গ, মর্ত্ত্য, পাতাল পূরিল জয়রবে!
আকাশের পানে চাহি, কৃতাঞ্জলিপুটে,
আরাধিলা রঘুবর ; “তব পদাম্বুজে,
চায় গো আশ্রয় আজি রাঘব ভিখারী,
অম্বিকে! ভূল না, দেবি, এ তব কিঙ্করে!
ধর্ম্মরক্ষা হেতু, মাতঃ, কত যে পাইনু
আয়াস, ও রাঙা পদে অবিদিত নহে।
ভুঞ্জাও ধর্ম্মের ফল, মৃত্যুঞ্জয়-প্রিয়ে,
অভাজনে ; রক্ষ, সতি, এ রক্ষঃসমরে,
প্রাণাধিক ভাই এই কিশোর লক্ষ্মণে!
দুর্দ্দান্ত দানবে দলি, নিস্তারিলা তুমি,
দেববলে, নিস্তারিণি! নিস্তার অধীনে,
মহিষমর্দ্দিনি, মর্দ্দি দুর্ম্মদ রাক্ষসে!”
 এইরূপে রক্ষোরিপু স্তুতিলা সতীরে।
যথা সমীরণ বহে পরিমল-ধনে
রাজালয়ে, শব্দবহ আকাশ বহিলা
রাঘবের আরাধনা কৈলাসসদনে।
হাসিলা দিবিন্দ্র দিবে ; পবন অমনি
চালাইলা আশুতরে সে শব্দবাহকে।
২। বিভীষণ রণে---সংগ্রামে ভয়প্রদ।
৭। পদাম্বুজে---চরণকমলে।
১২। ভুঞ্জাও---ভোগ করাও। মৃত্যুঞ্জয়-প্রিয়ে---শিবপ্রিয়ে। শিবের একটি নাম মৃত্যুঞ্জয় অর্থাৎ যিনি মৃত্যুকে জয় করিয়াছেন।
১৪। কিশোর---বালক।
১৭। মর্দ্দি---মর্দ্দন অর্থাৎ নাশ করিয়া। দুর্ম্মদ---যাহাকে অতিকষ্টে নাশ করা যায়।
১৯। পরিমল-ধন---সৌরভস্বরূপ ধন।
২০। শব্দবহ---যে শব্দকে বহন করে।
২৩। আশুতরে---অতিশীঘ্র। শব্দবাহক---আকাশ।
গ্রন্থের ১৬২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
শুনি সে সু-আরাধনা, নগেন্দ্রনন্দিনী,
আনন্দে, তথাস্তু, বলি আশীষিলা মাতা।
হাসি দেখা দিলা ঊষা উদয়-অচলে,
আশা যথা, আহা মরি, আঁধার হৃদয়ে,
দুঃখতমোবিনাশিনী! কূঞ্জনিল পাখী
নিকুঞ্জে, গুঞ্জরি অলি, ধাইল চৌদিকে
মধুজীবী ; মৃদুগতি চলিলা শর্ব্বরী,
তারাদলে লয়ে সঙ্গে ; ঊষার ললাটে
শোভিল একটি তারা, শত-তারা-তেজে!
ফুটিল কুন্তলে ফুল, নব তারাবলী!
লক্ষ্য করি রক্ষোবরে রাঘব কহিলা ;
“সাবধানে যাও, মিত্র। অমূল রতনে
রামের, ভিখারী রাম অর্পিছে তোমারে,
রথীবর! নাহি কাজ বৃথা বাক্যব্যয়ে---
জীবন, মরণ মম আজি তব হাতে!”
আশ্বাসিলা মহেষ্বাসে বিভীষণ বলী।
“দেবকুলপ্রিয় তুমি, রঘুকুলমণি ;
কাহারে ডরাও, প্রভু? অবশ্য নাশিবে
সমরে সৌমিত্রি শূর মেঘনাদ শূরে।”
বন্দি রাঘবেন্দ্রপদ, চলিলা সৌমিত্রি
সহ মিত্র বিভীষণ। ঘন ঘনাবলী
বেড়িল দোঁহারে, যথা বেড়ে হিমানীতে
কুজ্ঝটিকা গিরিশৃঙ্গে, পোহাইলে রাতি।
চলিলা অদৃশ্যভাবে লঙ্কামুখে দোঁহে।
যথায় কমলাসনে বসেন কমলা---
রক্ষকুল-রাজলক্ষ্মী---রক্ষোবধূ-বেশে,
১। নগেন্দ্রনন্দিনী---গিরিরাজবালা।
৭ মধুজীবী---যাহরা মধু পান করিয়া জীবন ধাধণ করে।
১২। অমূল্য রতনে---লক্ষ্মণরূপ অমূল্য রত্নে।
১৬। মহেষ্বাস---মহাধনুর্দ্ধর।
২২। হিমানীতে---হিমসংহতিকালে অর্থাৎ শীতকালে।
গ্রন্থের ১৬৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
প্রবেশিলা মায়াদেবী সে স্বর্ণ-দেউলে।
হাসিয়া সুধিলা রমা, কেশববাসনা ;---
“কি কারণে, মহাদেবি, গতি এবে তব
এ পুরে? কহ, কি ইচ্ছা তোমার, রঙ্গিণি?”
উত্তরিলা মৃদু হাসি মায়া শক্তীশ্বরী ;---
“সম্বর, নীলাম্বুসুতে, তেজঃ তব আজি ;
পশিবে এ স্বর্ণপুরে দেবাকৃতি রথী
সৌমিত্রি ; নাশিবে শূর, শিবের আদেশে,
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে দম্ভী মেঘনাদে।---
কালানল মম তেজঃ তব, তেজস্বিনি ;
কার সাধ্য বৈরিভাবে পশে এ নগরে?
সুপ্রসন্ন হও, দেবি, করি এ মিনতি,
রাঘবের প্রতি তুমি! তার, বরদানে,
ধর্ম্মপথ-গামী রামে, মাধবরমণি!”
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি কহিলা ইন্দিরা ;---
“কার সাধ্য, বিশ্বধ্যেয়া, অবহেলে তব
আজ্ঞা? কিন্তু প্রাণ মম কাঁদে গো স্মরিলে
এ সকল কথা! হায়, কত যে আদরে
পূজে মোরে রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, রাণী মন্দোদরী,
কি আর কহিব তার? কিন্তু নিজদোষে
মজে রক্ষঃকুলনিধি! সম্বরিব, দেবি,
তেজঃ ;----প্রাক্তনের গতি কার সাধ্য রোধে?
কহ সৌমিত্রিরে তুমি পশিতে নগরে
নির্ভয়ে। সন্তুষ্ট হয়ে বর দিনু আমি,
সংহারিবে এ সংগ্রামে সুমিত্রানন্দন
বলী---অরিন্দম মন্দোদয়ীর নন্দনে!”
চলিলা পশ্চিম দ্বারে কেশববাসনা---
৬। সম্বর--সন্বরণ কর। নীলাম্বুসুতে---জলধিদুহিতে।
৯। দম্ভী---অহঙ্কারী।
১৬। বিশ্বধ্যেয়া---বিশ্বারাধ্যা।
২২। প্রাক্তন---অদৃষ্ট, কপাল।
২৬। অরিন্দম----শত্রুদমনকারী।
গ্রন্থের ১৬৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সুরমা, প্রফুল্ল ফুল প্রত্যুষে যেমতি
শিশির-আসারে ধৌত! চলিলা রঙ্গিণী
সঙ্গে মায়া। শুখাইল রম্ভাতরুরাজি ;
ভাঙিল মঙ্গলঘট ; শুষিলা মেদিনী
বারি। রাঙা পায়ে আসি মিশিল সত্বরে
তেজোরাশি, যথা পশে, নিশা-অবসানে,
সুধাকর-কর-জাল রবি-কর-জালে!
শ্রীভ্রষ্টা হইল লঙ্কা ; হারাইলে, মরি!
কুন্তলশোভন মণি ফণিনী যেমনি!
গম্ভীর নির্ঘোষে দূরে ঘোষিলা সহসা
ঘনদল ; বৃষ্টিছলে গগন কাঁদিলা ;
কল্লোলিলা জলপতি ; কাঁপিলা বসুধা।
আক্ষেপে, রে রক্ষঃপুরি, তোর এ বিপদে,
জগতের অলঙ্কার তুই, স্বর্ণময়ি!
প্রাচীরে উঠিয়া দোঁহে হেরিলা অদূরে
দেবাকৃতি সৌমিত্রিরে, কুজ্ঝটিকাবৃত
যেন দেব ত্বিষাম্পতি, কিম্বা বিভাবসু
ধূমপুঞ্জে। সাথে সাথে বিভীষণ রথী---
বায়ুসখা সহ বায়ু---দুর্ব্বার সমরে।
কে আজি রক্ষিবে, হায়, রাক্ষসভরসা
রাবণিরে! ঘন বনে, হেরি দূরে যথা
মৃগবরে, চলে ব্যাঘ্র গুল্ম-আবরণে,
সুযোগপ্রয়াসী ; কিম্বা নদীগর্ভে যথা
অবগাহকেরে দূরে নিরখিয়া, বেগে
২। আসার---বারিধারা।
১৭। ত্বিষাম্পতি---তেজস্পতি, সূর্য্য। বিভাবসু---অগ্নি।
১৯। বায়ুসখা---অগ্নি।
২০। রাক্ষসভরসা---রাক্ষসকূলের ভরসাস্বরূপ।
২২। গুল্ম-আবরণে---লতারূপ আবরণের মধ্য দিয়া।
২৩। সুযোগপ্রয়াসী---যে সুযোগে চেষ্টা করে।
২৪। অবগাহক---যে ব্যক্তি নদী পুষ্করিণী প্রভৃতিতে নামিয়া স্নান করে।
গ্রন্থের ১৬৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
যমচক্ররূপী নক্র ধায় তার পানে
অদৃশ্যে, লক্ষ্মণ শূর, বধিতে রাক্ষসে,
সহ মিত্র বিভীষণ, চলিলা সত্বরে।
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, বিদায়ি মায়ারে,
স্বমন্দিরে গেলা চলি ইন্দিরা সুন্দরী।
কাঁদিলা মাধবপ্রিয়া! উল্লাসে শুষিলা
অশ্রুবিন্দু বসুন্ধরা---শুষে শুক্তি যথা
যতনে, হে কাদম্বিনি, নয়নাম্বু তব,
অমূল্য মুকুতাফল ফলে যার গুণে
ভাতে যবে স্বাতী সতী গগনমণ্ডলে।
প্রবল মায়ার বলে পশিলা নগরে
বীরদ্বয়। সৌমিত্রির পরশে খলিল
দুয়ার অশনি-নাদে ; কিন্তু কার কানে
পশিল আরাব? হায়! রক্ষোরথী যত
মায়ার ছলনে অন্ধ, কেহ না দেখিলা
দুরন্ত কৃতান্তদূতসম রিপুদ্বয়ে,
কুসুম-রাশিতে অহি পশিল কৌশলে!
সবিস্ময়ে রামানুজ দেখিলা চৌদিকে
চতুরঙ্গ বল দ্বারে ;---মাতঙ্গে নিষাদী,
তুরঙ্গমে সাদীবৃন্দ, মহারথী রথে,
ভূতলে শমনদূত পদাতিক যত---
ভীমাকৃতি ভীমবীর্য্য ; অজেয় সংগ্রামে।
কালানল-সম বিভা উঠিছে আকাশে!
হেরিলা সভয়ে বলী সর্ব্বভূক্ রূপী
বিরূপাক্ষ মহারক্ষঃ প্রক্ষেড়নধারী,
১। যমচক্ররূপী---যমের চক্রস্বরূপ ভয়ানক। নক্রু---কুম্ভীর।
১৩। অশনি-নাদে---বজ্রধ্বনিতে।
১৯। নিষাদী---হস্ত্যারোহী, মাহুত।
২০। সাদী--অশ্বারূঢ়।
২৪। সর্ব্বভূক্ রূপী---অগ্নিসম তেজস্বী।
২৫। বিরূপাক্ষ---একজন রাক্ষসের নাম। প্রক্ষেড়ন---অস্ত্রবিশেষ।
গ্রন্থের ১৬৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সুবর্ণ স্যন্দনারূঢ় ; তালবৃক্ষাকৃতি
দীর্ঘ তালজঙ্ঘা শূর---গদাধর যথা
মুর-অরি ; গজপৃষ্ঠে কালনেমি, বলে
রিপুকুলকাল বলী ; বিশারদ রণে,
রণপ্রিয়, বীরমদে প্রমত্ত সতত
প্রমত্ত ; চিক্ষুর রক্ষঃ যক্ষপতি-সম ;---
আর আর মহাবলী, দেবদৈত্যনর-
চিরত্রাস! ধীরে ধীরে, চলিলা দুজনে ;
নীরবে উভয় পার্শ্বে হেরিলা সৌমিত্রি
শত শত হেম-হর্ম্ম্য, দেউল, বিপণি,
উদ্যান, সরসী, উত্স ; অশ্ব অশ্বালয়ে,
গজালয়ে গজবৃন্দ ; স্যন্দন অগণ্য
অগ্নিবর্ণ ; অস্ত্রশালা, চারু নাট্যশালা,
মণ্ডিত রতনে, মরি! যথা সুরপুরে!---
লঙ্কার বিভব যত কে পারে বর্ণিতে---
দেবলোভ, দৈত্যকুল-মাৎসর্য্য? কে পারে
গণিতে সাগরে রত্ন, নক্ষত্র আকাশে?
নগর মাঝারে শূর হেরিলা কৌতুকে
রক্ষোরাজরাজগৃহ। ভাতে সারি সারি
কাঞ্চনহীরকস্তম্ভ ; গগন পরশে
গৃহচূড়, হেমকূটশৃঙ্গাবলী যথা
বিভাময়ী। হস্তিদন্ত স্বর্ণকান্তি সহ
শোভিছে গবাক্ষে, দ্বারে, চক্ষুঃ বিনোদিয়া,
তুষাররাশিতে শোভে প্রভাতে যেমতি
সৌরকর! সবিস্ময়ে চাহি মহাযশাঃ
১। স্যন্দন---রথ।
৪। রিপুকুলকাল--- রিপুকুলের কাল, অর্থাৎ যমস্বরূপ।
১১। উৎস---প্রশ্রবণ, নির্ঝর।
১৬। দেবলোভ---দেবতাদিগের লোভজনক। অর্থাৎ যাছা দেখিয়া দেবতাদিগেরও লোভ জন্মে। মাৎসর্য্য---অন্যের সৌভাগ্যে দ্বেষ। এ স্থলে অহঙ্কার মাত্র।
২৪। তুষার---হিম, বরফ।
২৫। সৌরকর---সূর্য্যকিরণ।
গ্রন্থের ১৬৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সৌমিত্রি, শূরেন্দ্র মিত্র বিভীষণ পানে,
কহিলা,---“অগ্রজ তব ধন্য রাজকুলে,
রক্ষোবর, মহিমার অর্ণব জগতে।
এ হেন বিভব, আহা, কার ভবতলে?”
nbsp;বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি উত্তরিলা বলী
বিভীষণ,---“যা কহিলে সত্য, শূরমণি!
এ হেন বিভব, হায়, কার ভবতলে?
কিন্তু চিরস্থায়ী কিছু নহে এ সংসারে।
এক যায় আর আসে, জগতের রীতি,---
সাগরতরঙ্গ যথা! চল ত্বরা করি,
রথীবর, সাধ কাজ বধি মেঘনাদে
অমরতা লভ, দেব, যশঃসুধা-পানে!”
nbsp;সত্বরে চলিলা দোঁহে, মায়ার প্রসাদে,
অদৃশ্য ! রাক্ষসবধূ, মৃগাক্ষীগঞ্জিনী,
দেখিলা লক্ষ্মণ বলী সরোবরকূলে,
সুবর্ণ-কলসি কাঁথে, মধুর অধরে
সুহাসি! কমল ফুল ফোটে জলাশয়ে
প্রভাতে! কোথাও রথী বাহিরিছে বেগে
ভীমকায় ; পদাতিক, আয়সী-আবৃত,
ত্যজি ফুলশয্যা ; কেহ শৃঙ্গ নিনাদিছে
ভৈরবে নিবারি নিদ্রা ; সাজাইছে বাজী
বাজীপাল ; গজ্জি গজ সাপটে প্রমদে
মুদগর ; শোভিছে পট্ট-আবরণ পিঠে,
ঝালরে মুকুতাপাঁতি ; তুলিছে যতনে
সারথি বিবিধ অস্ত্র স্বর্ণধ্বজ রথে।
বাজিছে মন্দিরবৃন্দে প্রভাতী বাজনা,
১৪। মৃগাক্ষীগঞ্জিনী---সুন্দরীকুলগঞ্জনাকারিণী, অর্থাৎ যাহার সৌন্দর্য্যসন্দর্শনে সুন্দরীকূল লজ্জিত হয়।
১৯। আয়সী---লৌহময় কবচ।
২১। বাজী---ঘোড়া।
২২। বাজীপাল---অশ্বপালক, অর্থাৎ সইস।
২৩। পট্ট-আবরণ---পট্টবস্ত্রনির্ম্মিত আচ্ছাদন, অর্থাৎ গদি।
গ্রন্থের ১৬৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
হায় রে, সুমনোহর, বঙ্গগৃহে যথা
দেবদোলোত্সব বাদ্য, দেবদল যবে,
আবির্ভাবি ভবতলে, পূজেন রমেশে!
অবচয়ি ফুলচয়, চলিছে মালিনী
কোথাও, আমোদি পথ ফুল-পরিমলে
উজলি চৌদিক রূপে, ফুলকুলসখী
ঊষা যথা! কোথাও বা দধি দুগ্ধ ভারে
লইয়া ধাইছে ভারী ; ক্রমশঃ বাড়িছে
কল্লোল, জাগিছে পুরে পুরবাসী যত।
কেহ কহে,---“চল, ওহে উঠিগে প্রাচীরে।
না পাইব স্থান যদি না যাই সকালে
হেরিতে অদ্ভুত যুদ্ধ। জুড়াইব আঁখি
দেখি আজি যুবরাজে সমর-সাজনে,
আর বীরশ্রেষ্ঠ সবে।” কেহ উত্তরিছে
প্রগল্ ভে,---“কি কাজ, কহ, প্রাচীর উপরে?
মুহুর্তে নাশিবে রামে অনুজ লক্ষ্মণে
যুবরাজ, তার শরে কে স্থির জগতে?
দিবে বিপক্ষদলে, শুষ্ক তৃণে যথা
দহে বহ্নি, রিপুদমী! প্রচণ্ড আঘাতে
দণ্ডি তাত বিভীষণে, বাঁধিবে অধমে।
রাজপ্রসাদের হেতু অবশ্য আসিবে
রণজয়ী সভাতলে ; চল সভাতলে।”
কত যে শুনিলা বলী, কত যে দেখিলা,
কি আর কহিবে কবি? হাসি মনে মনে,
দেবাকৃতি, দেববীর্য্য, দেব-অস্ত্রধারী
চলিলা যশস্বী, সঙ্গে বিভীষণ রথী ;---
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার শোভিল অদূরে।
কুশাসনে ইন্দ্রজিত পূজে ইষ্টদেবে
8। অবচয়ি---অবচয়ন করিয়া তুলিয়া।
৬। উজলি---উজ্জ্বল করিয়া।
১৫। প্রগল্ ভে---অহঙ্কারে।
গ্রন্থের ১৬৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
নিভৃতে ; কৌষিক বস্ত্র, কৌষিক উত্তরী,
চন্দনের ফৌঁটা ভালে, ফুলমালা গলে।
পুড়ে ধূপদানে ধূপ ; জ্বলিছে চৌদিকে
পূত ঘৃতরসে দীপ ; পুষ্প রাশি রাশি,
গণ্ডাররর শৃঙ্গে গড়া কোষা কোষী, ভরা
হে জাহ্নবি, তব জলে, কলুষনাশিনী
তুমি! পাশে হেম-ঘণ্টা, উপহার নানা,
হেম-পাত্রে ; রুদ্ধ দ্বার ;---বসেছে একাকী
রথীন্দ্র, নিমগ্ন তপে চন্দ্রচূড় যেন---
যোগীন্দ্র---কৈলাস গিরি, তব উচ্চ চূড়ে!
যথা ক্ষুধাতুর ব্যাঘ্র পশে গোষ্ঠগৃহে
যমদূত, ভীমবাহু লক্ষ্মণ পশিলা
মায়াবলে দেবালয়ে। ঝন্ ঝনিল অসি
পিধানে, ধ্বনিল বাজি তূণীর-ফলকে,
কাঁপিল মন্দির ঘন বীরপদভরে।
চমকি মুদিত আঁখি মিলিলা রাবণি।
দেখিলা সম্মুখে বলী দেবাকৃতি রহী-_
তেজস্বী মধ্যাহ্নে যথা দেব অংশুমালী!
সাষ্টাঙ্গে প্রণমি শূর, কৃতাজলিপুটে,
কহিলা, “হে বিভাবসু, শুভ ক্ষণে আজি
পূজিল তোমারে দাস, তেঁই, প্রভু, তুমি
পবিত্রিলা লঙ্কাপুরী ও পদ অর্পণে!
কিন্তু কি কারণে, কহ, তেজস্বী, আইলা
রক্ষঃকুলরিপু নর লক্ষণের রূপে
প্রসাদিতে এ অধীনে? একি লীলা তব,
প্রভাময়?” পুনঃ বলী নমিলা ভূতলে।
উত্তরিলা বীরদর্পে রৌদ্র দাশরথি ;---
৪। পূত---মন্ত্র দ্বারা পবিত্র।
৬। কলুষনাশিনী---পাপনাশিনী।
৭। উপহার---উপকরণ, পূজাসামগ্রী।
২৫। প্রসাদিতে---প্রসাদ অর্থাৎ অনুগ্রহ করিতে।
২৭। রৌদ্র---ভয়ানক।
গ্রন্থের ১৭০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
“নহি বিভাবসু আমি, দেখ নিরখিয়া,
রাবণি! লক্ষ্মণ নাম, জন্ম রঘুকুলে!
সংহারিতে, বীরসিংহ, তোমায় সংগ্রামে
আগমন হেথা মম ; দেহ রণ মোরে
অবিলম্বে।” যথা পথে সহসা হেরিলে
ঊর্দ্ধফণা ফণীশ্বরে, ত্রাসে হীনগতি
পথিক, চাহিলা বলী লক্ষ্মণের পানে।
সভয় হইল আজি ভয়শূন্য হিয়া!
প্রচণ্ড উত্তাপে পিণ্ড, হায় রে, গলিল!
গ্রাসিল মিহিরে রাহু, সহসা আঁধারি
তেজঃপুঞ্জ! অম্বুনাথে নিদাঘ শুষিল!
পশিল কৌশলে কলি নলের শরীরে!
বিস্ময়ে কহিলা শূর, “সত্য যদি তুমি
রামানুজ, কহ, রথি, কি ছলে পশিলা
রক্ষোরাজপুরে আজি? রক্ষঃ শত শত,
যক্ষপতিত্রাস বলে, ভীম অস্ত্রপাণি,
রক্ষিছে নগর-দ্বার ; শৃঙ্গধরসম
এ পুর-প্রাচীর উচ্চ ; প্রাচীর উপরে
ভ্রমিছে অযুত যোধ চক্রাবলীরূপে ;---
কোন্ মায়াবলে, বলি, ভূলালে এ সবে?
মানবকুলসম্ভব, দেবকুলোদ্ভবে
কে আছে রথী এ বিশ্বে, বিমুখয়ে রণে
একাকী এ রক্ষোবৃন্দে? এ প্রপঞ্চে তবে
কেন বঞ্চাইছ দাসে, কহ তা দাসেরে,
সর্ব্বভুক্? কি কৌতুক এ তব, কৌতুকি?
নহে নিরাকার দেব, সৌমিত্রি ; কেমনে
এ মন্দিরে পশিবে সে? এখনও দেখ
৬। উর্দ্ধকণা---উদগতফণা, অর্থাৎ ফণাধারী।
৯ । পিণ্ড---লৌহপিও।
১০। মিহির---সূর্য্য।
১১। অম্বুনাথ---জলপতি, সমুদ্র। নিদাঘ---গ্রীষ্মোত্তাপ।
২৪। বঞ্চাইছ---বঞ্চনা করিতেছ।
২৫। সর্ব্বভুক্---সর্ব্বসংহারক অর্থাৎ অগ্নি।
গ্রন্থের ১৭১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
রুদ্ধ দ্বার! বর, প্রভু, দেহ এ কিঙ্করে
নিঃশঙ্কা করিব লঙ্কা বধিয়া রাঘবে
আজি, খেদাইব দূরে কিষ্কিন্ধ্যা-অধিপে,
বাঁধি আনি রাজপদে দিব বিভীষণে
রাজদ্রোহী। ওই শুন, নাদিছে চৌদিকে
শৃঙ্গ শৃঙ্গনাদিগ্রাম! বিলম্বিলে আমি,
ভগ্নোদ্যম রক্ষঃ-চমূ, বিদাও আমারে!”
উত্তরিলা দেবাকৃতি সৌমিত্রি কেশরী,---
“কৃতান্ত আমি রে তোর, দুরন্ত রাবণি!
মাটি কাটি দংশে সর্প আয়ুহীন জনে!
মদে মত্ত সদা তুই ; দেব-বলে বলী,
তবু অবহেলা, মূঢ়, করিস্ সতত
দেবকুলে! এত দিনে মজিলি দুর্ম্মতি ;---
দেবাদেশে রণে আমি আহ্বানি রে তোরে!”
এতেক কহিয়া বলী উলঙ্গিলা অসি
ভৈরবে! ঝলসি আঁখি কালানল-তেজে,
ভাতিল কৃপাণবর, শত্রুকরে যথা
ইরম্মদময় বজ্র! কহিলা রাবণি,---
“সত্য যদি রামানুজ তুমি, ভীমবাহু
লক্ষ্মণ ; সংগ্রাম-সাধ অবশ্য মিটাব
মহাহবে আমি তব, বিরত কি কভু
রণরঙ্গে ইন্দ্রজিৎ? আতিথেয় সেবা,
তিষ্ঠি, লহ, শূরশ্রেষ্ঠ। প্রথমে এ ধামে---
রক্ষোরিপু তুমি, তবু অতিথি হে এবে।
সাজি বীরসাজে আমি। নিরস্ত্র যে অরি,
৩। কিষ্কিন্ধ্যা অধিপ---কিষ্কিন্ধ্যার রাজা, অর্থাৎ সুগ্রীব।
৫। রাজদ্রোহী---রাজানিষ্টকারী।
৬। শৃঙ্গনাদিগ্রাম---শৃবাদকসমূহ।
৭। ভগ্নোদ্যম---ভগ্নোৎসাহ, হতাশ। রক্ষঃ-চমূ---রাক্ষস সেনা। বিদাও---বিদায় কর।
১৫। উলঙ্গিলা---উলঙ্গ করিলা অর্থাৎ খাপ হইতে বাহির করিলা।
১৭। কৃপাণবর---তরবারিশ্রেষ্ঠ। শত্রুকরে---ইন্দ্রহস্তে।
২১। মহাহবে---মহাযুদ্ধে।
গ্রন্থের ১৭২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
নহে রথীকুলপ্রথা আঘাতিতে তারে।
এ বিধি, হে বীরবর, অবিদিত নহে,
ক্ষত্র তুমি, তব কাছে ;---কি আর কহিব?”
জলদ-প্রতিম স্বনে কহিলা সৌমিত্রি,---
“আনায় মাঝারে বাঘে পাইলে কি কভু
ছাড়ে রে কিরাত তারে? বধিব এখনি,
অবোধ, তেমতি তোরে! জন্ম রক্ষঃকুলে
তোর, ক্ষত্রধর্ম্ম, পাপি, কি হেতু পালিব
তোর সঙ্গে? মারি অরি, পারি যে কৌশলে!”
কহিলা বাসবজেতা, (অভিমন্যু যথা
হেরি সপ্ত শূরে শূর তপ্তলৌহাকৃতি
রোষে!) “ক্ষত্রকুলগ্লানি, শত ধিক্ তোরে,
লক্ষ্মণ! নির্লজ্জ তুই। ক্ষত্রিয় সমাজে
রোধিবে শ্রুবণপথ ঘৃণায়, শুনিলে
নাম তোর রথীবৃন্দ! তস্কর যেমতি,
পশিলি এ গৃহে তুই ; তস্কর-সদৃশ
শাস্তিয়া নিরস্ত তোরে করিব এখনি!
পশে যদি কাকোদর গরুড়ের নীড়ে,
ফিরি কি সে যায় কভু আপন বিবরে,
পামর! কে তোরে হেথা আনিল দুর্ম্মতি?”
চক্ষের নিমিষে কোষা তুলি ভীমবাহু
নিক্ষেপিলা ঘোর নাদে লক্ষণের শিরে।
পড়িল ভূতলে বলী ভীম প্রহরণে,
পড়ে তরুরাজ যথা প্রভঞ্জনবলে
মড়মড়ে! দেব-অস্ত্র বাজিল ঝন্ ঝনি,
কাঁপিল দেউল যেন ঘোর ভূকম্পনে!
৪। জলদ-প্রতিম স্বনে---মেঘগর্জ্জনসদৃশ স্বরে।
৫। আনায়---জাল, ফাঁদ।
১১। সপ্ত শূরে---সাত জন বীরে।
১৪। রোধিবে---রোধ করিবে ; অর্থাৎ ঢাকিবে।
১৭। শাস্তিয়া---শাস্তি দিয়া।
১৮। কাকোদর---সর্প।
২৩। ভীম প্রহরণে---ভীম আঘাতে।
গ্রন্থের ১৭৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
বহিল রুধির-ধারা! ধরিলা সত্বরে
দেব-অসি ইন্দ্রজিৎ ;---নারিলা তুলিতে
তাহায়! কার্ম্মুক ধরি কর্ষিলা ; রহিল
সৌমিত্রির হাতে ধনুঃ! সাপটিলা কোপে
ফলক ; বিফল বল সে কাজ সাধনে!
যথা শুণ্ডধর টানে শুণ্ডে জড়াইয়া
শৃঙ্গধরশৃঙ্গে বৃথা, টানিলা তূণীরে
শূরেন্দ্র! মায়ার মায়া কে বুঝে জগতে!
চাহিলা দুয়ার পানে অভিমানে মানী।
সচকিতে বীরবর দেখিলা সম্মুখে
ভীমতম শূল হস্তে, ধূমকেতুসম
খুল্লতাত বিভীষণে---বিভীষণ রণে!
“এত ক্ষণে” অরিন্দম কহিলা বিষাদে---
“জানিনু কেমনে আসি লক্ষণ পশিল
রক্ষঃপুরে! হায়, তাত, উচিত কি তব
এ কাজ, নিকষা সতী তোমার জননী,
সহোদর রক্ষঃশ্রেষ্ঠ? শূলীশম্ভুনিভ
কুম্ভকর্ণ? ভ্রাতৃপুত্র বাসববিজয়ী?
নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?
চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?
কিন্ত নাহি গঞ্জি তোমা, গুরু জন তুমি
পিতৃতুল্য। ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে,
পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে,
লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে।”
উত্তরিলা বিভীষণ ; “বৃথা এ সাধনা,
৩। কার্ম্মুক---ধনুঃ।
৫। ফলক---ঢাল।
৬। শুণ্ডধর---হস্থী।
১২। খুল্লতাত---কনিষ্ঠ তাত, অর্থাৎ খুড়া।
১৭। শূলীশম্ভুনিভ---শূলাস্ত্রধারী মহাদেবসদৃশ।
১৮। বাসববিজয়ী---ইন্দ্রজিৎ।
২১। গঞ্জি---গঞ্জনা অর্থাৎ তিরস্কার করি।
২৪। ভঞ্জিব---ঘুচাইব। আহবে---সংগ্রামে।
২৫। সাধনা---প্রার্থনা, ইচ্ছা।
গ্রন্থের ১৭৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ধীমান্! রাঘবদাস আমি ; কি প্রকারে
তাহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতে
অনুরোধ?” উত্তরিলা কাতরে রাবণি ;---
“হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে!
রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে
আনিলে এ কথা, তাত, কহ তা দাসেরে!
স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে;
পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি
ধুলায়? হে রক্ষোরথি, ভুলিলে কেমনে
কে তুমি? জনম তব কোন্ মহাকুলে?
কে বা সে অধম রাম? স্বচ্ছ সরোবরে
করে কেলি রাজহুংস পঙ্কজ-কাননে ;
যায় কি সে কভু, প্রভু, পঙ্কিল সলিলে,
শৈবালদলের ধাম? মৃগেন্দ্র কেশরী,
কবে, হে বীরকেশরি, সম্ভাষে শৃগালে
মিত্রভাবে? অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি,
অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে।
ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, লক্ষণ ; নহিলে
অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে?
কহ, মহারথি, এ কি মহারথীপ্রথা?
নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে
একথা! ছাড়হ পথ ; আসিব ফিরিয়া
এখনি! দেখিব আজি, কোন্ দেববলে,
বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি!
দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ,
রক্ষঃশ্রেষ্ট, পরাক্রম দাসের! কি দেখি
ডরিবে এ দাস হেন দুর্ব্বল মানবে?
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রগল্ ভে পশিল
৪। ইচ্ছি---ইচ্ছা করি।
৭। বিধু---চন্দ্র। বিধি---বিধাতা। স্থানু---মহাদেব।
১৫। সম্ভাষে---সম্ভাষণ করে।
১৬। অজ্ঞ---নির্ব্বোধ।
গ্রন্থের ১৭৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
দম্ভী ; আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে।
তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পণ করে
বনবাসী! হে বিধাতঃ, নন্দন-কাননে
ভ্রমে দুরাচার দৈত্য? প্রফুল্ল কমলে
কীটবাস? কহ তাত, সহিব কেমনে
হেন অপমান আমি,---ভ্রাতৃ-পুত্র তব?
তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে?”
মহামন্ত্র-বলে যথা নম্রশিরঃ ফণী,
মলিনবদন লাজে, উত্তরিলা রথী
রাবণ-অনুজ, লক্ষি রাবণ-আত্মজে ;
“নহি দোষী আমি, বৎস ; বৃথা ভত্স মোরে
তুমি! নিজ কর্ম্ম-দোষে, হায়, মজাইলা
এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি!
বিরত সতত পাপে দেবকুল ; এবে
পাপপূর্ণ লঙ্কাপুরী ; প্রলয়ে যেমতি
বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কালসলিলে!
রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী
তেঁই আমি! পরদোষে কে চাহে মজিতে?”
রুষিলা বাসবত্রাস! গম্তীরে যেমতি
নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্র কোপি,
কহিলা বীরেন্দ্র বলী,---“ধর্ম্মপথগামী,
হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে
তুমি ;---কোন্ ধর্ম মতে, কহ দাসে, শুনি,
জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি,---এ সকলে দিলা
জলাঞ্জলি? শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি
১। দম্ভী---অহঙ্কারী। শাস্তি---শাস্তি দি।
১০। রাবণ-আত্মজে---রাবণপুত্রে, মেঘনাদে।
১১। ভর্ৎস---ভর্ৎসনা কর।
১৭। আশ্রয়ী---যে আশ্রয় অর্থাৎ শরণ লয়।
২০। নিশীথ---অর্দ্ধরাত্র। অম্বরে---আকাশে। মন্দ্রে---গভীর শব্দ করে। জীমূতেন্দ্র---মেঘরাজ। কোপি---কোপ করিয়া।
গ্রন্থের ১৭৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
পরজন, গুণহীন স্বজন, তথাপি
নির্গুণ স্বজন শ্রেয়ঃ, পরঃ পরঃ সদা!
এ শিক্ষা, হে রক্ষোবর, কোথায় শিখিলে?
কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা! হেন সহবাসে,
হে পিতৃব্য, বর্ব্বরতা কেন না শিখিবে?
গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্ম্মতি।”
হেথায় চেতন পাই মায়ার যতনে
সৌমিত্রি, হুহুঙ্কারে ধনুঃ টঙ্কারিলা বলী।
সন্ধানি বিন্ধিলা শূর খরতর শরে
অরিন্দম ইন্দ্রজিতে, তারকারি যথা
মহেষ্বাস শরজালে বিঁধেন তারকে!
হায় রে, রুধির-ধারা (ভূধর-শরীরে
বহে বরিষার কালে জলস্রোতঃ যথা,)
বহিল, তিতিয়া বস্ত্র, তিতিয়া মেদিনী!
অধীর ব্যথায় রথী, সাপটি সত্বরে
শঙ্খ, ঘণ্টা, উপহারপাত্র ছিল যত
যজ্ঞাগারে, একে একে নিক্ষেপিলা কোপে ;
যথা অভিমন্যু রথী, নিরস্ত্র সমরে
সপ্ত রথী অস্ত্রবলে, কভু বা হানিলা
রথচুড়, রথচক্র ; কভু ভগ্ন অসি,
ছিন্ন চর্ম্ম, ভিন্ন বর্ম্ম, যা পাইলা হাতে!
কিন্তু মায়াময়ী মায়া, বাহু-প্রসরণে,
ফেলাইলা দূরে সবে, জননী যেমতি
খেদান মশকবৃন্দে সুপ্ত সুত হতে
করপদ্ম-সঞ্চালনে! সরোষে রাবণি
ধাইলা লক্ষ্মণ পানে গর্জ্জি ভীম নাদে,
প্রহারকে হেরি যথা সম্মুখে কেশরী!
মায়ার মায়ায় বলী হেরিলা চৌদিকে
৪। সহবাস---সংসর্গ অর্থাৎ সঙ্গে থাকা।
৫। বর্ব্বরতা---মূর্খতা।
৯। সন্ধানি---সন্ধান করিয়া।
২২। বাহু প্রসরণ---হস্তের ইতস্ততঃ সঞ্চালন।
গ্রন্থের ১৭৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ভীষণ মহিষারূঢ় ভীম দণ্ডধরে ;
শূল হস্তে শূলপাণি ; শঙ্খ, চক্র, গদা
চতুর্ভুজে চতুর্ভুজ ; হেরিলা সভয়ে
দেবকুলরথীবৃন্দে সুদিব্য বিমানে।
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি দাঁড়াইলা বলী
নিষ্কল, হায় রে মরি, কলাধর যথা
রাহুগ্রাসে ; কিম্বা সিংহ আনায় মাঝারে।
ত্যজি ধনুঃ, নিষ্কোশিলা অসি মহাতেজাঃ
রামানুজ ; ঝলসিলা ফলক-আলোকে
নয়ন! হায় রে, অন্ধ অরিন্দম বলী
ইন্দ্রজিৎ, খড়গাঘাতে পড়িলা ভূতলে
শোণিতার্দ্র। থরথরি কাঁপিলা বসুধা ;
গর্জ্জিলা উথলি সিন্ধু! ভৈরব আরবে
সহসা পূরিল বিশ্ব! ত্রিদিবে, পাতালে,
মর্ত্ত্যে, মরামর জীব প্রমাদ গণিলা
আতঙ্কে! যথায় বসি হৈম সিংহাসনে
সভায় কর্ব্বূরপতি, সহসা পড়িল
কনক-মুকুট খসি, রথচূড় যথা
রিপুরথী কাটি যবে পাড়ে রথতলে।
সশঙ্ক লঙ্কেশ শূর স্মরিলা শঙ্করে!
প্রমীলার বামেতর নয়ন নাচিল!
আত্মবিস্মৃতিতে, হায়, অকস্মাৎ সতী
মুছিলা সিন্দূরবিন্দু সুন্দর ললাটে!
মূর্চ্ছিলা রাক্ষসেন্দ্রাণী মন্দোদরী দেবী
আচম্বিতে! মাতৃকোল নিদ্রায় কাঁদিল
শিশুকুল আর্ত্তনাদে, কাঁদিল যেমতি
ব্রজে ব্রজকুলশিশু, যবে শ্যামমণি,
৬। নিষ্কল---চন্দ্রপক্ষে কলারহিত, মেঘনাধপক্ষে তেজোহীন।
২০। শঙ্কর---মহাদেব।
২১। বামেতর---বাম হইতে ইতর বা ভিন্ন অর্থাৎ দক্ষিণ।
২৪। মূর্চ্ছিলা----মূর্চ্ছান্বিত হইলা।
গ্রন্থের ১৭৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
আঁধারি সে ব্রজপুর, গেলা মধুপুরে!
অন্যায় সমরে পড়ি, অসুরারি-রিপু,
রাক্ষসকুল-ভরসা, পরুষ বচনে
কহিলা লক্ষণ শূরে,--“বীরকুলগ্লানি,
স্বমিত্রানন্দন, তুই! শত ধিক্ তোরে!
রাবণনন্দন আমি, না ডরি শমনে!
কিন্তু স্তোর অস্ত্রাঘাতে মরিনু যে আজি,
পামর, এ চিরদুঃখ রহিল রে মনে!
দৈত্যকুলদল ইন্দ্রে দমিনু সংগ্রামে
মরিতে কি তোর হাতে? কি পাপে বিধাতা
দিলেন এ তাপ দাসে, বুঝিব কেমনে?
আর কি কহিব তোরে? এ বারতা যবে
পাইবেন রক্ষোনাথ, কে রক্ষিবে তোরে,
নরাধম? জলধির অতল সলিলে
ডুবিস্ যদিও তুই, পশিবে সেদেশে
রাজরোষ---বাড়বাগ্নিরাশিসম তেজে!
সে রোষ, কাননে যদি পশিস্, কুমতি!
নারিবে রজনী, মূঢ়, আবরিতে তোরে।
দানব, মানব, দেব, কার সাধ্য হেন.
ত্রাণিবে, সৌমিত্রি, তোরে, রাবণ রুষিলে?
কে বা এ কলঙ্ক তোর ভঞ্জিবে জগতে,
কলঙ্কি?” এতেক কহি, বিষাদে সুমতি
মাতৃপিতৃপাদপদ্ম স্মরিলা অন্তিমে।
অধীর হুইলা ধীর ভাবি প্রমীলারে
চিরানন্দ! লোহ সহ মিশি অশ্রুধারা,
অনর্গল বহি, হায়, আর্দ্রিল মহীরে।
৩। পরুষ---কর্কশ।
১২। বারতা---বার্ত্তা, খবর।
২১। ত্রাণিবে---ত্রাণ অর্থাৎ রক্ষা করিবে।
২৪। অন্তিমে---চরমে, শেষাবস্থায়, মৃত্যুকালে।
গ্রন্থের ১৭৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
লঙ্কার পঙ্কজ-রবি গেলা অস্তাচলে।
নির্ব্বাণ পাবক যথা, কিন্বা ত্বিষাম্পতি
শান্তরশ্মি, মহাবল রহিলা ভূতলে।
কহিলা রাবণানুজ সজল নয়নে ;---
“সুপট্ট-শয়নশায়ী তুমি, ভীমবাহু,
সদা, কি বিরাগে এবে পড়ি হে ভূতলে?
কি কহিবে রক্ষোরাজ হেরিলে তোমারে
এ শয্যায়? মন্দোদরী, রক্ষঃকুলেন্দ্রাণী
শরদিন্দুনিভাননা প্রমীলা সুন্দরী?
সুরবালা-গ্লানি রূপে দিতিসুতা যত
কিঙ্করী? নিকষা সতী---বৃদ্ধা পিতামহী?
কি কহিবে রক্ষঃকুল, চূড়ামণি তুমি
সে কুলে? উঠ, বস! খুল্লতাত আমি
ডাকি তোমা---বিভীষণ ; কেন না শুনিছ,
প্রাণাধিক? উঠ, বৎস, খুলিব এখনি
তব অনুরোধে দ্বার! যাও অস্ত্রালয়ে,
লঙ্কার কলঙ্ক আজি ঘুচাও আহবে!
হে কর্ব্বুরকুলগর্ব্ব, মধ্যাহ্নে কি কভু
যান চলি অস্তাচলে দেব অংশুমালী,
জগতনয়নানন্দ? তবে কেন তুমি
এ বেশে, যশস্বি, আজি পড়ি হে ভূতলে?
নাদে শৃঙ্গনাদী, শুন, আহ্বানি তোমারে ;
গর্জ্জে গজরাজ, অশ্ব হেষিছে ভৈরবে ;
সাজে রক্ষঃঅনীকিনী, উগ্রচণ্ডা রণে।
নগর-দুয়ারে অরি, উঠ, অরিন্দম!
এ বিপুল কুলমান রাখ এ সমরে!”
এইরূপে বিলাপিলা বিভীষণ বলী
৬। বিরাগ---দুঃখ।
৯। শরদিন্দুনিভাননা---শরচ্চন্দ্রসগৃশমুখী।
১৯। অংশুমালী---অংশু, কিরণ যাহার মালাস্বরূপ, অর্থাৎ সূর্য্য।
২৪। অনীকিনী---সেনা।
গ্রন্থের ১৮০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
শোকে। মিত্রশোকে শোকী সৌমিত্রি কেশরী
কহিলা,---“সম্বর খেদ, রক্ষঃচূড়ামণি!
কি ফল এ বৃথা খেদে? বিধির বিধানে
বধিনু এ যোধে আমি, অপরাধ নহে
তোমার! যাইব চল যথায় শিবিরে
চিন্তাকুল চিন্তামণি দাসের বিহনে।
বাজিছে মঙ্গলবাদ্য শুন কান দিয়া
ত্রিদশ-আলয়ে, শূর।” শুনিলা সুরথী
ত্রিদিব-বাদিত্র-ধ্বনি-স্বপনে যেমনি
মনোহর! বাহিরিলা আশুগতি দোঁহে,
শার্দ্দূলী অবর্ত্তমানে, নাশি শিশু যথা
নিষাদ, পবনবেগে ধায় ঊদ্ধশ্বাসে
প্রাণ লয়ে, পাছে ভীমা আক্রমে সহসা,
হেরি গতজীব শিশু, বিবশা বিষাদে!
কিন্বা যথা দ্রোণপুত্র অশ্বথামা রথী,
মারি সুপ্ত পঞ্চ শিশু পাণ্ডবশিবিরে
নিশীথে, বাহিরি, গেলা মনোরথগতি,
হরষে তরাসে ব্যগ্র, দুর্য্যোধন যথা
ভগ্ন-উরু কুরুরাজ কুরুক্ষেত্ররণে!
মায়ার প্রসাদে দোঁহে অদৃশ্য, চলিলা
যথায় শিবিরে শূর মৈথিলীবিলাসী।
প্রণমি চরণাম্বুজে, সৌমিত্রি কেশরী
নিবেদিলা করপুটে,--- “ও পদ-প্রসাদে,
রঘুবংশ-অবতংস, জয়ী রক্ষোরণে
এ কিঙ্কর! গতজীব মেঘনাদ বলী
২। সম্বর---পরিত্যাগ কর।
৩। বিধান---নিয়ম,আজ্ঞা।
১১। শার্দ্দূলী---ব্যাঘ্রী। অবর্ত্তমানে---অনুপস্থিতিকালে।
১২। নিষাদ---ব্যাধ।
১৩। আক্রমে---আাক্রমণ করে।
১৪। গতজীব---গতপ্রাণ, অর্থাৎ মৃত। বিবশা---অধীরা।
২৪। অবতংস---অলঙ্কার।
গ্রন্থের ১৮১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ “” ‘’ ; ?
শক্রজিৎ!” চুম্বি শিরঃ, আলিঙ্গি আদরে
অনুজে, কহিলা প্রভু সজল নয়নে,
“লভিনু সীতায় আজি তব বাহুবলে,
হে বাহুবলেন্দ্র! ধন্য বীরকুলে তুমি!
সুমিত্রা জননী ধন্য! রঘুকুলনিধি
ধন্য পিতা দশরথ, জন্মদাতা তব!
ধন্য আমি তবাগ্রজ! ধন্য জন্মভূমি
অযোধ্যা! এ যশঃ তব ঘোষিবে জগতে
চিরকাল! পূজ কিন্তু বলদাতা দেবে,
প্রিয়তম! নিজবলে দুর্ব্বল সতত
মানব ; সু-ফল ফলে দেবের প্রসাদে!”
মহামিত্র বিভীষণে সম্ভাষি সুস্বরে
কহিলা বৈদেহীনাথ,--- “শুভক্ষণে, সখে,
পাইনু তোমায় আমি এ রাক্ষসপুরে।
রাঘবকুলমঙ্গল তুমি রক্ষোবেশে!
কিনিলে রাঘবকুলে আজি নিজগুণে,
গুণমণি! গ্রহরাজ দিননাথ যথা,
মিত্রকুলরাজ তুমি, কহিনু তোমারে!
চল সবে, পূজি তাঁরে, শুভঙ্করী যিনি
শঙ্করী!” কুসুমাসার বৃষ্টিলা আকাশে
মহানন্দে দেববৃন্দ ; উল্লাসে নাদিল,
“জয় সীতাপতি জয়!” কটক চৌদিকে,---
আতঙ্কে কনক-লঙ্কা জাগিলা সে রবে।
ইতি শ্রীমেঘনাদবধে কাব্যে বধো নাম
ষষ্ঠঃ সর্গঃ।
২০। শঙ্করী---মঙ্গলদায়িনী, অর্থাৎ ভবানী, দুর্গা।
২২। কটক---সৈন্য।
মিলনসাগরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর সম্পূর্ণ মেঘনাদবধ কাব্যের বিভিন্ন সর্গ পড়তে নীচের সূচীতে ক্লিক করুন...
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম