কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর মেঘনাদবধ কাব্য
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
মিলনসাগরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর মেঘনাদবধ কাব্যের সূচী...
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম
মেঘনাদবধ কাব্য চতুর্থ সর্গ
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রথম প্রকাশ ১৮৬১।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে রামকমল সিংহ দ্বারা প্রকাশিত, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবি সজনীকান্ত দাস দ্বারা মূলতঃ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ সংস্করণ থেকে গৃহীত ও সম্পাদিত এবং ১২৭৪ বঙ্গাব্দে (১৮৬৭ সালে) প্রকাশিত, কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-কৃত টীকা ও ব্যাখ্যা সহ।
মিলনসাগরে প্রকাশ ২১শে ফেব্রুয়ারী ২০২৬।
গ্রন্থের ১০৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
চতুর্থ সর্গ
(অশোকবনং নাম)
নমি আমি, কবি-গুরু, তব পদাম্বুজে,
বাল্মীকি! হে ভারতের শিরঃচূড়ামণি,
তব অনুগামী দাস, রাজেন্দ্র-সঙ্গমে
দীন যথা যায় দূর তীর্থদরশনে!
তব পদ-চিহ্ন ধ্যান করি দিবা নিশি,
পশিয়াছে কত যাত্রী যশের মন্দিরে,
দমনিয়া ভব-দম দুরন্ত শমনে---
অমর! শ্রীভর্ত্তৃহরি ; শূরী ভবভূতি
শ্রীকণ্ঠ ; ভারতে খ্যাত বরপুত্র যিনি
ভারতীর, কালিদাস---সুমধুর-ভাষী ;
মুরারি-মুরলী-ধ্বনি-সদৃশ মুরারি
মনোহর ; কীর্ত্তিবাস, কীর্ত্তিবাস কবি,
১। কবিগুরু---কবিকুলপ্রধান, বাল্মীকি।
৩-৪। তব অনুগামী দাস ইত্যাদি---যেমন কোন দরিদ্র জন কোন প্রতাপশালী রাজার সমভিব্যাহারে দূর তীর্থ (যে তীর্থস্থলে সে একাকী গমনে অক্ষম) দর্শন করিতে যায় ; তেমনি
আমিও যশোমন্দিরস্বরূপ তীর্থে তোমার অনুসরণ করিতেছি।
৫-৮। তব পদ-চিহ্ন ধ্যান করি ইত্যাদি---হে কবিগুরু, তোমার পদচিহ্ন ধ্যান অর্থাৎ নিরীক্ষণ করিয়া কত যাত্রী, এ ভবমণ্ডলকে যিনি সর্ব্বদা দমন করেন, এমন যে যমরাজ, তাঁহাকে দমন করিয়া অর্থাৎ অমর হইয়া যশের মন্দিরে প্রবেশ করিয়াছে। অর্থাৎ অনেক কবি রামায়ণ অবলম্বন করিয়া বহুবিধ কাব্যরচনায় চিরস্থায়ী যশোলাভ করিয়াছেন।
৮। ভর্ত্তৃহরি---ভট্টিকাব্যের গ্রন্থকার। ভবভূতি---বীরচরিতাদি গ্রন্থের রচয়িতা।
৯-১০। ভারতে খ্যাত ইত্যাদি---রঘুবংশ-রচয়িতা কালিদাস, যিনি ভূভারতে ভারতীর অর্থাৎ সরস্বতীর বরপুত্র বলিয়া বিখ্যাত।
১১। মুরারি---শ্রীকৃষ্ণ। মুরলী---বংশী। দ্বিতীয় মুরারি---অনর্ঘরাঘব কাব্যের গ্রন্থকার। মুরারি-মুরলী-ধ্বনি-সদৃশ মুরারি মনোহর---শ্রীকৃষ্ণের বংশীধ্বনিস্বরূপ মুরারির রচনা মনোহর।
১২। কীর্ত্তিবাস---যাহাতে তে কীর্ত্তি সর্ব্বদা বসতি করে অর্থাৎ বিনি পরম যশস্বী। কীর্ত্তিবাস---কবি কীর্ত্তিবাস, যিনি ভাষা রামায়ণ রচনা করেন।
গ্রন্থের ১০৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
এ বঙ্গের অলঙ্কার!---হে পিতঃ, কেমনে,
কবিতা-রসের সরে রাজহংস-কুলে
মিলি করি কেলি আমি, না শিখালে তুমি!
গাঁথিব নূতন মালা, তুলি সযতনে
তব কাব্যোদ্যানে ফুল ; ইচ্ছা সাজাইতে
বিবিধ ভূষণে ভাষা ; কিন্তু কোথা পাব
(দীন আমি!) রত্নরাজী, তুমি নাহি দিলে,
রত্নাকর? কৃপা, প্রভু, কর অকিঞ্চনে।---
ভাসিছে কনক-লঙ্কা আনন্দের নীরে,
সুবর্ণ-দীপ-মালিনী, রাজেন্দ্রাণী যথা
রত্নহারা ! ঘরে ঘরে বাজিছে বাজনা ;
নাচিছে নর্তকী-বৃন্দ, গাইছে সুতানে
গায়ক ; নায়কে লয়ে কেলিছে নায়কী,
খল খল খল হাসি মধুর অধরে!
কেহ বা সুরতে রত, কেহ শীধু-পানে।
দ্বারে দ্বারে ঝোলে মালা গাঁথা ফল-ফুলে ;
গৃহাগ্রে উড়িছে ধ্বজ ; বাতায়নে বাতি ;
জনস্রোতঃ রাজ-পথে বহিছে কল্লোলে,
যথা মহোত্সবে, যবে মাতে পুরবাসী।
রাশি রাশি পুষ্প-বৃষ্টি হইছে চৌদিকে---
সৌরভে পূরিয়া পুরী। জাগে লঙ্কা আজি
নিশীথে, ফিরেন নিদ্রা দুয়ারে দুয়ারে,
১-৩। হে পিতঃ, কেমনে ইত্যাদি---হে কবিগুরু, যদি তুমি আমাকে না শিখাও, তাহা হইলে মহাকবিদিগের সহিত আমি কি প্রকারে কবিতাসরোবরে কেলি করি।
৯। ভাসিছে ইত্যাদি---বীরবর ইন্দ্রজিৎ এবং প্রমীলা সুন্দরীর সমাগমে লঙ্কাপুরবাসী জনসমূহ আনন্দে মগ্ন হইয়াছে।
১০। সুবর্ণ-দীপ-মালিনী---সুবর্ণদীপাবলী যাহার মালাস্বরূপ হইয়া জ্বলিতেছে।
১৩। কেলিছে---কেলি করিতেছে।
১৫। সুরতে---কামক্রীড়ায়। শীধু---মদ্য।
১৭। বাতায়ন---গবাক্ষ, জানালা।
১৯। যথা মহোত্সবে ইত্যাদি---যেরূপ, কোন পূরে পূরবাসী জনগণ মহোৎসবে মত্ত হইলে, হইয়া থাকে।
গ্রন্থের ১০৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কেহ নাহি সাধে তাঁরে পশিতে আলয়ে,
বিরাম-বর প্রার্থনে!---“মারিবে বীরেন্দ্র
ইন্দ্রজিত কালি রামে ; মারিবে লক্ষ্মণে ;
সিংহনাদে খেদাইবে শৃগাল-সদৃশ
বৈরী-দলে সিন্ধু-পারে ; আনিবে বাঁধিয়া
বিভীষণে ; পলাইবে ছাড়িয়া চাঁদেরে
রাহু ; জগতের আঁখি জুড়াবে দেখিয়া
পুনঃ সে সুধাংশু-ধনে ; ” আশা, মায়াবিনী,
পথে, ঘাটে, ঘরে, দ্বারে, দেউলে, কাননে,
গাইছে গো এই গীত আজি রক্ষঃপুরে---
কেন না ভাসিবে রক্ষঃ আহ্লাদ-সলিলে?
একাকিনী শোকাকুলা, অশোক-কাননে,
কাঁদেন রাঘব-বাঞ্ছা আঁধার কুটীরে
নীরবে! দুরন্ত চেড়ী, সতীরে ছাড়িয়া,
ফেরে দূরে মত্ত সবে উৎসব-কৌতুকে---
হীন-প্রাণা হরিণীরে রাখিয়া বাঘিনী
নির্ভয় হৃদয়ে যথা ফেরে দূর বনে!
মলিন-বদনা দেবী, হায় রে, যেমতি
খনির তিমির-গর্ভে (না পারে পশিতে
সৌর-কর-রাশি যথা) সূর্য্যকান্ত মণি,
কিন্বা বিম্বাধরা রমা অম্বুরাশি-তলে!
স্বনিছে পবন, দূরে রহিয়া রহিয়া
উচ্ছ্বাসে বিলাপী যথা! লড়িছে বিষাদে
৬-৭। রাহুরূপ রামের সৈন্য চন্দ্ররূপ কনক লঙ্কাকে ত্যাগ করিয়া দূরীভূত হইবে।
৮। আশা মায়াবিনী ইত্যাদি---পথে, ঘাটে, ঘরে, দ্বারে অর্থাৎ সর্ব্বত্রে সকলেই এই কথা কহিতেছে, যে ইন্দ্রজিৎ রাম ও লক্ষ্মণকে মারিবে ইত্যাদি।
১৩। রাঘব-বাঞ্ছা---সীতা দেবী।
১৮-২১। হায় রে, যেমতি ইত্যাদি---যে খনিগর্ভে সৌরকররাশি অর্থাৎ সূর্য্যকিরণপুঞ্জ প্রবেশ করিতে অক্ষম, সে খনিগর্ভে সূর্য্যকান্ত মণি যেরূপ আভাহীন ইত্যাদি। রমা---লক্ষ্মী। অম্বুরাশি---সাগর।
গ্রন্থের ১০৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ “” ; ?
মর্ম্মরিয়া পাতাকুল! বসেছে অরবে
শাখে পাখী! রাশি রাশি কুসুম পড়েছে
তরুমূলে, যেন তরু, তাপি মনস্তাপে,
ফেলিয়াছে খুলি সাজ! দূরে প্রবাহিণী,
উচ্চ বীচি-রবে কাঁদি, চলিছে সাগরে,
কহিতে বারীশে যেন এ দুখ-কাহিনী!
না পশে সুধাংশু-অংশু সে ঘোর বিপিনে।
ফোটে কি কমল কভু সমল সলিলে?
তবুও উজ্জল বন ও অপূর্ব্ব রূপে !
একাকিনী বসি দেবী, প্রভা আভাময়ী
তমোময় ধামে যেন! হেন কালে তথা
সরমা সুন্দরী আসি বসিলা কাঁদিয়া
সতীর চরণ-তলে, সরমা সুন্দরী---
রক্ষঃকুল-রাজলক্ষ্মী রক্ষোবধূ-বেশে!
কত ক্ষণে চক্ষু-জল মুছি সুলোচনা
কহিলা মধুর স্বরে ; “দুরন্ত চেড়ীরা,
তোমারে ছাড়িয়া, দেবি, ফিরিছে নগরে,
মহোৎসবে রত সবে আজি নিশা-কালে ;
এই কথা শুনি আমি আইনু পুজিতে
পা দুখানি। আনিয়াছি কৌটায় ভরিয়া,
সিন্দূর ; করিলে আজ্ঞা, সুন্দর ললাটে
দিব ফোঁটা। এয়ো তুমি, তোমার কি সাজে
এ বেশ? নিষ্ঠুর, হায়, দুষ্ট লঙ্কাপতি !
কে ছেঁড়ে পদ্মের পর্ণ? কেমনে হরিল
ও বরাঙ্গ-অলঙ্কার, বুঝিতে না পারি?”
কৌটা খুলি, রক্ষোবধূ যত্নে দিলা ফোঁটা
সীমন্তে ; সিন্দূর-বিন্দু শোভিল ললাটে,
৫। বীচি-রব---তরঙ্গশব্দ।
৬। এ দুখ-কাহিনী---সতীর দুঃখবার্ত্তা।
৯। ও অপূর্ব্ব রূপে---সীতার, অপূর্ব্ব রূপে।
২৭। সীমন্তে---সিঁথিতে।
গ্রন্থের ১০৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
গোধুলি-ললাটে, আহা! তারা-রত্ন যথা!
দিয়া ফোঁটা, পদ-ধূলি লইলা সরমা।
“ক্ষম, লক্ষ্মি, ছুঁইনু ও দেব-আকাঙ্ক্ষিত
তনু ; কিন্তু চির-দাসী দাসী ও চরণে!”
এতেক কহিয়া পুনঃ বসিলা যুবতী
পদতলে। আহা মরি, সুবর্ণ-দেউটী
তুলসীর মূলে যেন জ্বলিল, উজলি
দশ দিশ! মৃদু স্বরে কহিলা মৈথিলী ;---
“বৃথা গঞ্জ দশাননে তুমি, বিধুমুখি!
আপনি খুলিয়া আমি ফেলাইনু দূরে
আভরণ, যবে পাপী আমারে ধরিল
বনাশ্রমে। ছড়াইনু পথে সে সকলে.
চিহ্ন-হেতু। সেই সেতু আনিয়াছে হেথা---
এ কনক-লঙ্কাপুরে---ধীর রঘুনাথে!
মণি, মুক্তা, রতন, কি আছে লো জগতে,
যাহে নাহি অবহেলি লভিতে এ ধনে?”
কহিলা সরমা ; “দেবি, শুনিয়াছে দাসী
তব স্বয়ম্বর-কথা তব সুধা-মুখে ;
কেন বা আইলা বনে রঘু-কুল-মণি।
কহ এবে দয়া করি, কেমনে হরিল
তোমারে রক্ষেন্দ্র সতি? এই ভিক্ষা করি,
দাসীর এ তৃষ্ণা তোষ সুধা-বরিষণে!
দূরে দুষ্ট চেড়ীদল ; এই অবসরে
কহ মোরে বিবরিয়া, শুনি সে কাহিনী।
কি ছলে ছলিল রামে, ঠাকুর লক্ষ্মণে
এ চোর? কি মায়া-বলে রাঘবের ঘরে
প্রবেশি, করিল চুরি এ হেন রতনে?”
যথা গোমুখীর মুখ হইতে সুস্বনে
১৩-১৪। সেই সেতু---অলঙ্কার নিক্ষেপরূপ সেতু, অর্থাৎ আমার অকঙ্কারসকল পথে দেখিয়া প্রভু আমার তত্ত্ব পাইয়াছেন।
গ্রন্থের ১১০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
করে পূত বারি-ধারা, কহিল জানকী ;
মধুরভাষিণী সতী, আদরে সম্ভাষি
সরমারে,---হিতৈষিণী সীতার পরমা
তুমি, সখি! পূর্ব্ব-কথা শুনিবারে যদি
ইচ্ছা তব, কহি আমি, শুন মনঃ দিয়া।---
ছিনু মোরা, সুলোচনে, গোদাবরী-তীরে,
কপোত কপোতী যথা উচ্চ বৃক্ষ-চূড়ে
বাঁধি নীড়, থাকে সুখে ; ছিনু ঘোর বনে
নাম পঞ্চবটী, মর্ত্ত্যে সুর-বন-সম।
সদা করিতেন সেবা লক্ষ্মণ সুমতি।
দণ্ডক ভাণ্ডার যার, ভাবি দেখ মনে,
কিসের অভাব তার? যোগাতেন আনি
নিত্য ফল মূল বীর সৌমিত্রি ; মৃগয়া
করিতেন কভু প্রভূ ; কিন্তু জীবনাশে
সতত বিরত, সখি, রাঘবেন্দ্র বলী,---
দয়ার সাগর নাথ, বিদিত জগতে!
“ভুলিমু পূর্ব্বের সুখ। রাজার নন্দিনী,
রঘু-কুল-বধু আমি ; কিন্তু এ কাননে,
পাইনু, সরমা সই, পরম পিরীতি!
কুটীরের চারি দিকে কত যে ফুটিত
ফুলকুল নিত্য নিত্য, কহিব কেমনে?
পঞ্চবটী-বন-চর মধু নিরবধি!
জাগাত প্রভাতে মোরে কুহরি সুস্বরে
পিক-রাজ! কোন্ রাণী, কহ, শশিমুখি,
হেন চিত্ত-বিনোদন বৈতালিক-গীতে
খোলে আঁখি? শিখী সহ, শিখিনী সুখিনী
নাচিত দুয়ারে মোর! নর্ত্তক, নর্ত্তকী,
এ দোঁহার সম, রামা, আছে কি জগতে?
২৫। বৈতালিক---স্তুতিপাঠক।
গ্রন্থের ১১১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ “” ; ?
অতিথি আসিত নিত্য করভ, করভী,
মৃগ-শিশু, বিহঙ্গম, স্বর্ণ-অঙ্গ কেহ,
কেহ শুভ্র, কেহ কাল, কেহ বা চিত্রিত,
যথা বাসবের ধনুঃ ঘন-বর-শিরে ;
অহিংসক জীব যত। সেবিতাম সবে
মহাদরে ; পালিতাম পরম যতনে,
মরুভূমে স্রোতস্বতী তৃষাতুরে যথা,
আপনি সুজলবতী বারিদ-প্রসাদে।--
সরসী আরসি মোর! তুলি কুবলয়ে,
(অমূল রতন-সম) পরিতাম কেশে ;
সাজিতাম ফুল-সাজে ; হাসিতেন প্রভু,
বনদেবী বলি মোরে সম্ভাষি কৌতুকে!
হায়, সখি, আর কি লো পাব প্রাণনাথে?
আর কি এ পোড়া আঁখি এ ছার জনমে
দেখিবে সে পা দুখানি---আশার সরসে
রাজীব ; নয়নমণি? হে দারুণ বিধি,
কি পাপে পাপী এ দাসী তোমার সমীপে?”
এতেক কহিয়া দেবী কাঁদিলা নীরবে।
কাঁদিল সরমা সতী তিতি অশ্রু-নীরে।
কত ক্ষণে চক্ষুঃ-জল মুছি রক্ষোবধূ
সরমা কহিলা সতী সীতার চরণে ;---
“স্মরিলে পূর্ব্বের কথা ব্যথা মনে যদি
পাও, দেবি, থাক্ তবে ; কি কাজ স্মরিয়া?---
হেরি তব অশ্রু-বারি ইচ্ছি মরিবারে!”
উত্তরিলা প্রিয়ম্বদা (কাদম্বা যেমতি
মধু-স্বরা!) ; “এ অভাগী, হায়, লো সুভগে,
যদি না কাঁদিবে তবে কে আর কাঁদিবে
১। করভ---হস্তিশাবক।
৩। চিত্রিত---নানাবর্ণিত।
১৫-১৬। আশার সরসে রাজীব---আশারূপ সরোবরের পদ্মস্বরূপ অর্থাৎ চিরবাঞ্ছনীয়।
২৪। ইচ্ছি---ইচ্ছা করি।
২৫। প্রিয়ম্বদা---মিষ্টভাষিণী।
গ্রন্থের ১১২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
এ জগতে? কহি, শুন পূর্ব্বের কাহিনী।
বরিষার কালে, সখি, প্লাবন-পীড়নে
কাতর প্রবাহ, ঢালে, তীর অতিক্রমি,
বারি-রাশি দুই পাশে ; তেমতি যে মনঃ
দুঃখিত, দুঃখের কথা কহে সে অপরে।
তেঁই আমি কহি, তুমি শুন, লো সরমে।
কে আছে সীতার আর এ অররু-পুরে?
“পঞ্চবটী-বনে মোরা গোদাবরী-তটে
ছিনু সুখে। হায়, সখি, কেমনে বর্ণিব
সে কান্তার-কান্তি আমি? সতত স্বপনে
শুনিতাম বন-বীণা বন-দেবী-করে ;
সরসীর তীরে বসি, দেখিতাম কভু
সৌর-কর-রাশি-বেশে সুর-বালা-কেলি
পদ্মবনে ; কভু সাধ্বী ঋষি-বংশ-বধূ
সুহাসিনী আসিতেন দাসীর কুটীরে,
সুধাংশুর অংশু যেন অন্ধকার ধামে!
অজিন (রঞ্জিত, আহা, কত শত রঙে!)
পাতি বসিতাম কভু দীর্ঘ তরু-মূলে,
সখী-ভাবে সম্তাষিয়া ছায়ায়, কভু বা
কুরঙ্গিণী-সঙ্গে রঙ্গে নাচিতাম বনে,
গাইতাম গীত শুনি কোকিলের ধ্বনি!
নব-লতিকার, সতি, দিতাম বিবাহ
তরু-সহ ; চুম্বিতাম, মঞ্জরিত যবে
দম্পতী, মঞ্জরীবৃন্দে, আনন্দে সম্ভাষি
নাতিনী বলিয়া সবে! গুঞ্জরিলে অলি,
নাতিনী-জামাই বলি বরিতাম তারে!
২। প্লাবন---বন্যা।
৭। অররু-পুরে---রাাক্ষসপুরে।
১০। কান্তার---দুর্গম পথ।
১৩-১৪। সৌর-কর-রাশি-বেশে ইত্যাদি---পদ্মবনে সৌরকররাশি অর্থাৎ সূর্য্যকিরণসমূহ দেখিয়া ভাবিতাম, যেন দেবকন্যাসকল সৌরকরবেশে পদ্মবনে কেলি করিতেন।
১৭। অজিন---চর্ম্ম।
গ্রন্থের ১১৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কভু বা প্রভুর সহ ভ্রমিতাম সুখে
নদী-তটে ; দেখিতাম তরল সলিলে
নূতন গগন যেন, নব তারাবলী,
নব নিশাকান্ত-কান্তি! কভু বা উঠিয়া
পর্ব্বত-উপরে, সখি, বসিতাম আমি
নাথের চরণ-তলে, ব্রততী যেমতি
বিশাল রসাল-মূলে ; কত যে আদরে
তুষিতেন প্রভু মোরে, বরষি বচন-
সুধা, হায়, কব কারে? কব বা কেমনে?
শুনেছি কৈলাস-পুরে কৈলাস-নিবাসী
ব্যোমকেশ, স্বর্ণাসনে বসি গৌরী-সনে,
আগম, পুরাণ, বেদ, পঞ্চতন্ত্র কথা
পঞ্চ মুখে পঞ্চমুখ কহেন উমারে ;
শুনিতাম সেইরূপে আমিও, রূপসি,
নানা কথা! এখনও, এ বিজন বনে,
ভাবি আমি শুনি যেন সে মধুর বাণী!---
সাঙ্গ কি দাসীর পক্ষে, হে নিষ্ঠুর বিধি,
সে সঙ্গীত?”---নীরবিলা আয়ত-লোচনা
বিষাদে। কহিলা! তবে সরমা সুন্দরী ;---
“শুনিলে তোমার কথা, রাঘব-রমণি,
ঘৃণা জন্মে রাজ-ভোগে! ইচ্ছা করে, ত্যজি
রাজ্য-সুখ, যাই চলি হেন বন-বাসে!
কিন্তু ভেবে দেখি যদি, ভয় হয় মনে।
রবিকর যবে, দেবি, পশে বনস্থলে
তমোময়, নিজ গুণে আলো করে বনে
সে কিরণ ; নিশি যবে যায় কোন দেশে,
৬। ব্রততী---লতা।
১১। ব্যোমকেশ---মহাদেব।
১৭-১৮। সাঙ্গ কি ইত্যাদি---হে দারুণ বিধাতঃ, নাথের সঙ্গীতস্বরূপ বাক্যধ্বনি আর কি কখন আমার শ্রবণকূহরে প্রবেশ করিবে না?
২৪-২৫। বনস্থলে তমোময়---তমোময় বনস্থলে অর্থাৎ অন্ধকারপূর্ণ কাননে।
গ্রন্থের ১১৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
মলিন-বদন সবে তার সমাগমে!
যথা পদার্পণ তুমি কর, মধুমতি,
কেন না হইবে মুখী সর্ব্ব জন তথা,
জগত-আনন্দ তুমি, ভূবন-মোহিনী!
কহ, দেবি, কি কৌশলে হরিল তোমারে
রক্ষঃপতি? শুনিয়াছে বীণা-ধ্বনি দাসী,
পিকবর-রব নব পল্লব-মাঝারে
সরস মধুর মাসে ; কিন্তু নাহি শুনি
হেন মধুমাথা কথা কভু এ জগতে!
দেখ চেয়ে, নীলাম্বরে শশী, যাঁর আভা
মলিন তোমার রূপে, পিইছেন হাসি
তব বাক্য-সুধা, দেবি, দেব সুধানিধি!
নীরব কোকিল এবে আর পাখী যত,
শুনিবারে ও কাহিনী, কহিনু তোমারে।
এ সবার সাধ, সাধ্বি, মিটাও কহিয়া।”
কহিলা রাঘব-প্রিয়া ; “এইরূপে, সখি,
কাটাইনু কত কাল পঞ্চবটী-বনে
সুখে। ননদিনী তব, দুষ্টা সূর্পণখা।
বিষম জঞ্জাল আসি ঘটাইল শেষে!
শরমে, সরমা সই, মরি লো স্মরিলে
তার কথা! ধিক্ তারে! নারী-কুল-কালি।
চাহিল মারিয়া মোরে বরিতে বাঘিনী
রঘুবরে! ঘোর রোষে সৌমিত্রি কেশরী
খেদাইলা দূরে তারে। আইল ধাইয়া
রাক্ষস, তুমুল রণ বাজিল কাননে।
সভয়ে পশিনু আমি কুটীর মাঝারে।
কোদণ্ড-টংকারে, সখি, কত যে কাঁদিনু,
কব কারে? মুদি আঁখি, কৃতাঞ্জলি-পুটে
১১। পিইছেন---পান করিতেছেন।
গ্রন্থের ১১৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ডাকিনু দেবতা-কুলে রক্ষিতে রাঘবে!
আর্ত্তনাদ, সিংহনাদ উঠিল গগনে।
অজ্ঞান হইয়া আমি পড়িনু ভূতলে।
“কত ক্ষণ এ দশায় ছিনু যে, স্বজনি,
নাহি জানি ; জাগাইলা পরশি দাসীরে
রঘুশ্রেষ্ঠ। মৃদু স্বরে, (হায় লো, যেমতি
স্বনে মন্দ সমীরণ কুসুম-কাননে
বসন্তে!) কহিল কান্ত ; ‘উঠ, প্রাণেশ্বরি,
রঘুনন্দনের ধন! রঘু-রাজ-গৃহ-
আনন্দ। এই কি শয্যা সাজে হে তোমারে,
হেমাঙ্গি? ”---সরমা সখি, আর কি শুনিব
সে মধুর ধ্বনি আমি?’---সহসা পড়িলা
মূর্চ্ছিত হইয়া সতী ; ধরিল সরমা!
যথা যবে ঘোর বনে নিষাদ, শুনিয়া
পাখীর ললিত গীত বৃক্ষ-শাখে, হানে
স্বর লক্ষ্য করি শর, বিষম-আঘাতে
ছটফটি পড়ে ভূমে বিহঙ্গী, তেমতি
সহসা পড়িল সতী সরমার কোলে!
কত ক্ষণে চেতন পাইলা সুলোচনা।
কহিলা সরমা কাঁদি ; “ক্ষম দোষ মম,
মৈথিলি! এ ক্লেশ আজি দিনু অকারণে,
হায়, জ্ঞানহীন আমি!” উত্তর করিলা
মৃদু স্বরে সুকেশিনী রাঘব-বাসনা ;---
“কি দোষ তোমার, সখি? শুন মনঃ দিয়া,
কহি পুনঃ পূর্ব্ব-কথা। মারীচ কি ছলে
(মরুভূমে মরীচিকা, ছলয়ে যেমতি!)
১১। হেমাঙ্গি---হে সুবর্ণাঙ্গি।
১৪-১৭। যথা যবে ঘোর বনে ইত্যাদি---পতিবিরহশোকস্বরূপ ব্যাধ অদৃশ্যভাবে মধুর গীতগায়িনী পক্ষিস্বরূপ জানকীকে শরাঘাতে ভূমে পাতিত করিল।
২৬। মরীচিকা---মৃগতৃষ্ণা, সূর্য্যকিরণে জলভ্রম।
গ্রন্থের ১১৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ছলিল, শুনেছ তুমি সূর্পণখা-মুখে।
হায় লো, কুলগ্নে, সখি, মগ্ন লোভ-মদে,
মাগিনু কুরঙ্গে আমি! ধনুর্ব্বাণ ধরি,
বাহিরিলা রঘুপতি, দেবর লক্ষ্মণে
রক্ষা-হেতু রাখি ঘরে। বিদ্যুৎ-আকৃতি
পলাইল মায়া-মৃগ, কানন উজলি,
বারণারি-গতি নাথ ধাইল। পশ্চাতে---
হারানু নয়ন-তারা আমি অভাগিনী!
“সহসা শুনিনু, সখি, আর্ত্তনাদ দূরে---
‘কোথা রে লক্ষ্মণ ভাই, এ বিপত্তি-কালে?
মরি আমি!’ চমকিলা সৌমিত্রি কেশরী !
চমকি ধরিয়া হাত, করিনু মিনতি ;---
‘যাও বীর ; বায়ু-গতি পশ এ কাননে ;
দেখ, কে ডাকিছে তোমা? কাঁদিয়া উঠিল
শুনি এ নিনাদ, প্রাণ! যাও ত্বরা করি---
বুঝি রঘুনাথ তোমা ডাকিছেন, রথি!’
কহিলা সৌমিত্রি ; ‘দেবি, কেমনে পালিব
আজ্ঞা তব? একাকিনী কেমনে রহিবে
এ বিজন বনে তুমি? কত যে মায়াবী
রাক্ষস ভ্রমিছে হেথা, কে পারে কহিতে?
কাহারে ডরাও তুমি? কে পারে হিংসিতে
রঘুবংশ-অবতংসে এ তিন ভুবনে,
ভৃগুরাম-গুরু বলে?’---আবার শুনিনু
আর্ত্তনাদ ; ‘মরি আমি! এ বিপত্তি-কালে,
কোথা রে লক্ষ্মণ ভাই? কোথায় জানকি?’
ধৈরয ধরিতে আর নারিনু, স্বজনি!
২২। অবতংস--অলঙ্কার।
২৩। ভৃগুরাম-গুরু বলে---যিনি পরশুরামকে স্ববলে পরাজয় করিয়াছেন।
গ্রন্থের ১১৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ছাড়ি লক্ষণের হাত, কহিনু কুক্ষণে ;---
‘সুমিত্রা শাশুড়ী মোর বড় দয়াবতী ;
কে বলে ধরিয়াছিলা গর্ভে তিনি তোরে,
নিষ্ঠুর? পাষাণ দিয়া গড়িলা বিধাতা
হিয়া তোর! ঘোর বনে নির্দয় বাঘিনী
জন্ম দিয়া পালে তোরে, বুঝিনু, দুর্ম্মতি!
রে ভীরু, রে বীর-কুল-গ্লানি, যাব আমি,
দেখিব করুণ স্বরে কে স্মরে আমারে
দূর বনে?’ ক্রোধ-ভরে, আরক্ত-নয়নে
বীরমণি, ধরি ধনুঃ, বাঁধিয়া নিমিষে
পৃষ্ঠে তূণ, মোর পানে চাহিয়া কহিল ;---
‘মাতৃ-সম মানি তোমা, জনক-নন্দিনি,
মাতৃ-সম! তেঁই সহি এ বৃথা গঞ্জনা!
যাই আমি ; গৃহমধ্যে থাক সাবধানে।
কে জানে কি ঘটে আজি? নহে দোষ মম ;
তোমার আদেশে আমি ছাড়িনু তোমারে।
এতেক কহিয়া শূর পশিলা কাননে।
“কত যে ভাবিনু আমি বসিয়া বিরলে,
প্রিয়সখি, কহিব তা কি আর তোমারে?
বাড়িতে লাগিল বেলা ; আহ্লাদে নিনাদি,
কুরঙ্গ, বিহঙ্গ-আদি মৃগ-শিশু যত,
সদাব্রত-ফলাহারী, করভ করভী
আসি উতরিল সবে। তা সবার মাঝে
চমকি দেখিনু যোগী, বৈশ্বানর-সম
তেজস্বী, বিভূতি অঙ্গে, কমণ্ডলু করে,
শিরে জটা। হায়, সখি, জানিতাম যদি
১ । কহিনু কুক্ষণে---কেন না, আমি এরূপ গ্লানি না করিলে লক্ষ্মণ আমাকে কখনই ত্যাগ করিয়া যাইতেন না, এবং আমারও এ দুরবস্থা ঘটিত না।
২৪। বৈশ্বানর---অগ্নি।
২৫। কমণ্ডলু---যোগীদের পাত্রবিশেষ।
গ্রন্থের ১১৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ফুল-রাশি মাঝে দুষ্ট কাল-সর্প-বেশে,
বিমল সলিলে বিষ, তা হলে কি কভু
ভূমে লুটাইয়া শিরঃ নমিতাম তারে?
“কহিল মায়াবী ; ‘ভিক্ষা দেহ, রঘুবধূ,
(অন্নদা এ বনে তুমি!) ক্ষুধার্ত্ত অতিথে।’
“আবরি বদন আমি ঘোমটায়, সখি,
কর-পুটে কহিনু, ‘অঞ্জিনাসনে বসি,
বিশ্রাম লভুন প্রভু তরু-মূলে ; অতি-
ত্বরায় আসিবে ফিরি রাঘবেন্দ্র যিনি,
সৌমিত্রি ভ্রাতার সহ।’ কহিল দুর্ম্মতি---
(প্রতারিত রোষ আমি নারিনু বুঝিতে)
‘ক্ষুধার্ত অতিথি আমি, কহিনু তোমারে।
দেহ ভিক্ষা ; নহে কহ, যাই অন্য স্থলে।
অতিথি-সেবায় তুমি বিরত কি আজি,
জানকি? রঘুর বংশে চাহ কি ঢালিতে
এ কলঙ্ক-কালি, তুমি রঘু-বধূ? কহ,
কি গৌরবে অবহেলা কর ব্রহ্ম-শাপে?
দেহ ভিক্ষ ; শাপ দিয়া নহে যাই চলি।
দুরন্ত রাক্ষস এবে সীতাকান্ত-অরি---
মোর শাপে।’ ---লজ্জা ত্যজি, হায় লো স্বজনি,
ভিক্ষা-দ্রব্য লয়ে আমি বাহিরিনু ভয়ে,---
না বুঝে পা দিনু ফাঁদে ; অমনি ধরিল
হাসিয়া ভাসুর তব আমায় তখনি ;
“একদা, বিধুবদনে, রাঘবের সাথে
ভ্রমিতেছিনু কাননে ; দূর গুল্ম-পাশে
চরিতেছিল হরিণী! সহসা শুনিনু
ঘোর নাদ ; ভয়াকুলা দেখিনু চাহিয়া
ইরম্মদাকৃতি বাঘ ধরিল মৃগীরে!
১। ফুলরাশি ইত্যাদি---মৃগশিশু, করভ-করভী এ সকল ফলস্বরূপ। সদাব্রতফলাহারী জন্তুদলের মধ্যে রাবণ কালসর্পবেশী।
১১। প্রতারিত রোষ---রাগচ্ছল, অর্থাৎ কৃত্রিম রাগ।
গ্রন্থের ১১৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
‘রক্ষ, নাথ, বলি আমি পড়িনু চরণে।
শরানলে শূর-শ্রেষ্ঠ ভস্মিলা শার্দ্দুলে
মুহূর্ত্তে। যতনে তুলি বাঁচাইনু আমি
বন-সুন্দরীরে, সখি। রক্ষঃ-কুল-পতি,
সেই শার্দ্দুলের রূপে, ধরিল আমারে!
কিন্তু কেহ না আইল বাঁচাইতে, ধনি,
এ অভাগা হরিণীরে এ বিপত্তি-কালে।
পূরিনু কানন আমি হাহাকার রবে।
শুনিনু ক্রন্দন-ধ্বনি ; বনদেবী বুঝি
দাসীর দশায় মাতা কাতরা, কাঁদিলা!
কিন্তু বৃথা সে ক্রন্দন! হুতাশন-তেজে
গলে লৌহ ; বারি-ধারা দমে কি তাহারে?
অশ্র-বিন্দু মানে কি লো কঠিন যে হিয়া?
“দূরে গেল জটাজুট ; কমণ্ডলু দূরে!
রাজরথী-বেশে মূঢ় আমায় তুলিল
স্বর্ণরথে। কহিল যে কত দুষ্টমতি,
কভু রোষে গর্জ্জি, কভু সুমধুর স্বরে,
স্মরিলে, শরমে ইচ্ছি মরিতে, সরমা!
“চালাইল রথ রথী। কাল-সর্প-মুখে
কাঁদে যথা ভেকী, আমি কাঁদিনু, সুভগে,
বৃথা! স্বর্ণ-রথ-চক্র, ঘর্ঘরি নির্ঘোষে,
পূরিল কানন-রাজী, হায়, ডুবাইয়া
অভাগীর আর্ত্তনাদ! প্রভঞ্জন-বলে
ত্রস্ত তরুকুল যবে নড়ে মড়মড়ে,
কে পায় শুনিতে যদি কুহরে কপোতী?
৯। শুনিনু ক্রন্দন-ধ্বনি---আপনার ক্রন্দনধ্বনির প্রতিধ্বনি শুনিয়া দেবী ভাবিলেন, যেন বনদেৰী ইত্যাদি।
১১-১২। হুতাশন-তেজে ইত্যাদি---যাহার কঠিন হৃদয়, সে পরাক্রমে যেরূপ শান্ত হয়, করুণ বাক্যে তাদৃশ হয় না। যেমন অতি কঠিন বস্তু লৌহ অগ্নিসংযোগে গলিয়া থাকে, @@ তাহার কি করিতে পারে।
@@ --- অপাঠ্য অক্ষর।
গ্রন্থের ১২০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ফাঁফর হইয়া, সখি, খুলিনু সত্বরে
কঙ্কণ, বলয়, হার, সিঁথি, কণ্ঠমালা,
কুণ্ডল, নূপুর, কাঞ্চী ; ছড়াইনু পথে ;
তেঁই লো এ পোড়া দেহে নাহি, রক্ষোবধূ,
আভরণ। বৃথা তুমি গঞ্জ দশাননে।”
নীরবিলা শশিমুখী। কহিলা সরমা,---
“এখনও তৃষাতুরা এ দাসী, মৈথিলি ;
দেহ সুধা-দান তারে" সফল করিলা
শ্রবণ-কুহর আজি আমার!” সুস্বরে
পুনঃ আরম্ভিলা তবে ইন্দু-নিভাননা ;---
“শুনিতে লালসা যদি, শুন লো ললনে।
বৈদেহীর দুঃখ-কথা কে আর শুনিবে?
“আনন্দে নিষাদ যথা ধরি ফাঁদে পাখী
যায় ঘরে, চালাইল রথ লঙ্কাপতি ;
হায় লো, সে পাখী যথা কাঁদে ছটফটি
ভাঙিতে শৃঙ্খল তার, কাঁদিনু, সুন্দরি!
“হে আকাশ, শুনিয়াছি তুমি শব্দবহ,
(আরাধিনু মনে মনে) এ দাসীর দশা
ঘোর রবে কহ যথা রঘু-চূড়া-মণি,
দেবর লক্ষ্মণ মোর, ভূবন-বিজয়ী !
হে সমীর, গন্ধবহ তুমি ; দৃত-পদে
বরিনু তোমায় আমি, যাও ত্বরাকরি
যথায় ভ্রমেন প্রভু! হে বারিদ, তুমি
ভীমনাদী, ডাক নাথে গম্ভীর নিনাদে!
হে ভ্রমর মধুলোভি, ছাড়ি ফুল-কুলে
গুঞ্জর নিকুঞ্জে, যথা রাঘবেন্দ্র বলী,
সীতার বারতা তুমি ; গাও পঞ্চ স্বরে
সীতার দুঃখের গীত, তুমি মধু-সখা
২৬। গুঞ্জর---গুঞ্জনধ্বনি করিয়া কহ।
গ্রন্থের ১২১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কোকিল! শুনিবে প্রভু তুমি হে গাইলে’
এইরূপে বিলাপিনু, কেহ না শুনিল।
“চলিল কনক-রথ ; এড়াইয়া দ্রুতে
অভ্রভেদী গিরি-চূড়া, বন, নদ, নদী,
নানা দেশ। স্বনয়নে দেখেছ, সরমা,
পুষ্পকের গতি তুমি ; কি কাজ বর্ণিয়া?
“কত ক্ষণে সিংহনাদ শুনিনু সম্মুখে
ভয়ঙ্কর! থরথরি আতঙ্কে কাঁপিল
বাজী-রাজি, স্বর্ণরথ চলিল অস্থিরে!
দেখিনু, মিলিয়া আঁখি, ভৈরব-মূরতি
গিরি-পৃষ্ঠে বীর, যেন প্রলয়ের কালে
কালমেঘ! ‘চিনি তোরে’, কহিলা গম্ভীরে
বীর-বর, ‘চোর তুই, লঙ্কার রাবণ।
কোন্ কুলবধূ আজি হরিলি, দুর্ম্মতি?
কার ঘর আঁধারিলি, নিবাইয়া এবে
প্রেম-দীপ? এই তোর নিত্য কর্ম্ম, জানি।
অস্ত্রী-দল-অপবাদ ঘুচাইব আজি
বধি তোরে তীক্ষ শরে! আয় মূঢমতি!
ধিক্ তোরে রক্ষোরাজ! নির্লজ্জ পামর
আছে কি রে তোর সম এ ব্রহ্ম-মণ্ডলে?’
“এতেক কহিয়া, সখি, গর্জ্জিলা শূরেন্দ্র!
অচেতন হয়ে আমি পড়িনু স্যন্দনে!
“পাইয়া চেতন পুনঃ দেখিনু রয়েছি
ভূতলে। গগন-মার্গে রথে রক্ষোরথী
যুঝিছে সে বীর-সঙ্গে হুহুঙ্কার-নাদে।
অবলা-রসনা, ধনি, পারে কি বর্ণিতে
সে রণে? সভয়ে আমি মুদিনু নয়ন!
সাধিনু দেবতা-কুলে, কাঁদিয়া কাঁদিয়া,
৪। অভ্রভেদী---মেঘস্পর্শী, উচ্চতম।
৬। পুষ্পক---রাবণের রথ।
৯। অস্থিরে---অস্থির ভাবে।
২২। স্যন্দন---রথ।
গ্রন্থের ১২২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সে বীরের পক্ষ হয়ে নাশিতে রাক্ষসে,
অরি মোর ; উদ্ধারিতে বিষম সঙ্কটে
দাসীরে! উঠিনু ভারি পশিব বিপিনে,
পলাইব দূর দেশে। হায় লো, পড়িনু,
আছাড় খাইয়া, যেন ঘোর ভূকম্পনে!
আরাধিনু বসুধারে---‘এ বিজন দেশে,
মা আমার, হয়ে দ্বিধা, ভব বক্ষঃস্থলে
লহ অভাগীরে, সাধ্বি! কেমনে সহিছ
দুঃখিনী মেয়ের জালা? এস শীঘ্র করি!
ফিরিয়া আসিবে দুষ্ট ; হায়, মা, যেমতি
তস্কর আইসে ফিরি, ঘোর নিশাকালে,
পুঁতি যথা রত্ন-রাশি রাখে সে গোপনে---
পর-ধন! আসি মোরে তরাও, জননি!’
“বাজিল তুমুল যুদ্ধ গগনে, সুন্দরি ;
কাঁপিল বসুধা ; দেশ পূরিল আরবে!
অচেতন হৈনু পুনঃ। শুন, লো ললনে,
মনঃ দিয়া শুন, সই, অপূর্ব্ব কাহিনী।---
দেখিনু স্বপনে আমি বসুন্ধরা সতী
মা আমার! দাসী-পাশে আসি দয়াময়ী
কহিলা, লইয়া কোলে, সুমধুর বাণী ;---
‘বিধির ইচ্ছায়, বাছা, হরিছে গো তোরে
রক্ষোরাজ ; তোর হেতু সবংশে মজিবে
অধম! এ ভার আমি সহিতে না পারি,
ধরিনু গো গর্ভে তোরে লঙ্কা বিনাশিতে!
যে কুক্ষণে তোর তনু ছুঁইল দুর্ম্মতি
রাবণ, জানিনু আমি, সুপ্রসন্ন বিধি
এত দিনে মোর প্রতি ; আশীষিনু তোরে
জননীর জ্বালা দূর করিলি, মৈথিলি!---
১০-১১। হায় মা, যেমতি ইত্যাদি---যেরূপ তস্কর অর্থাৎ চোর নিহিত ধন লইব নিমিত্ত গুপ্ত স্থলে গোপনভাবে আইসে, সেইরূপ রাবণ আমার নিকট আবার আসিবেক।
গ্রন্থের ১২৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ভবিতব্য-দ্বার আমি খুলি, দেখ চেয়ে।’
“দেখিনু সম্মুখে, সখি, অভ্রভেদী গিরি ;
পঞ্চ জন বীর তথা নিমগ্ন সকলে
দুঃখের সলিলে যেন! হেন কালে আসি
উতরিলা রঘুপতি লক্ষ্মণের সাথে।
বিরস-বদন নাথে হেরি, লো স্বজনি,
উতলা হইনু কত, কত যে কাঁদিনু,
কি আর কহিব তার? বীর পঞ্চ জনে
পূজিল রাঘব-রাজে, পূজিল অনুজে।
একত্রে পশিলা সবে সুন্দর নগরে।
“মারি সে দেশের রাজা তুমুল সংগ্রামে
রঘুবীর, বসাইলা রাজ-সিংহাসনে
শ্রেষ্ঠ যে পুরুষ-বর পঞ্চ জন মাঝে।
ধাইল চৌদিকে দূত ; আইলা ধাইয়া
লক্ষ লক্ষ বীর-সিংহ ঘোর কোলাহলে।
কাঁপিল বসুধা, সখি, বীর-পদ-ভরে!
সভয়ে মুদিনু আঁখি! কহিলা হাসিয়া
মা আমার, ‘কারে ভয় করিস্, জানকি?
সাজিছে সুগ্রীব রাজা উদ্ধারিতে তোরে,
মিএ্রবর। বধিল যে শূরে তোর স্বামী,
বালি নাম ধরে রাজা বিখ্যাত জগতে।
কিষ্কিন্ধ্যা নগর ওই। ইন্দ্র-তুল্য বলী-
বৃন্দ চেয়ে দেখ্ সাজে।’ দেখিনু চাহিয়া,
চলিছে বীরেন্দ্র-দল জল-স্রোতঃ যথা
বরিষায়, হুহুঙ্কারি! ঘোর মড়মড়ে
ভাঙিল নিবিড় বন ; শুখাইল নন্দী ;
ভয়াকুল বন-জীব পলাইল দূরে ;
পূরিল জগত, সখি, গন্তীর নির্ঘোষে।
৩। পঞ্চ জন বীর---সুগ্রীব হনূমান প্রভৃতি।
১১। সে দেশের রাজা---অর্থাৎ বালি।
গ্রন্থের ১২৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
উতরিলা সৈন্য-দল সাগরের তীরে।
দেখিনু, সরমা সখি, ভাসিল সলিল
শিলা! শৃঙ্গধরে ধরি, ভীম পরাক্রমে
উপাড়ি, ফেলিল জলে বীর শত শত।
বাঁধিল অপূর্ব্ব সেতু শিল্পিকুল মিলি।
আপনি বারীশ পাশী, প্রভুর আদেশে,
পরিলা শৃঙ্খল পায়ে! অলঙ্ঘ্য সাগরে
লঙ্ঘি, বীর-মদে পার হইল কটক।
টলিল এ স্বর্ণ-পুরী বৈরী-পদ-চাপে,---
‘জয়, রঘুপতি, জয়!’ ধ্বনিল সকলে!
কাঁদিনু হরষে, সখি ! সুবর্ণ-মন্দিরে
দেখিনু সুবর্ণাসনে রক্ষঃ-কুল-পতি।
আছিল সে সভাতলে ধীর ধর্ম্মসম
বীর এক ; কহিল সে, ‘পূজ রঘুবরে,
বৈদেহীরে দেহ ফিরি ; নতুবা মরিবে
সবংশে!’ সংসার-মদে মত্ত রাঘবারি,
পদাঘাত করি তারে কহিল কুবাণী।
অভিমানে গেল। চলি সে বীর-কুঞ্জর
যথা প্রাণনাথ মোর।”---কহিল সরমা,
“হে দেবি, তোমার দুঃখে কত যে দুঃখিত
রক্ষোরাজানুজ বলী, কি আর কহিব?
দুজনে আমরা, সতি, কত যে কেঁদেছি
ভাবিয়া তোমার কথা, কে পারে কহিতে?”
“জানি আমি,” উত্তরিলা মৈথিলী রূপসী,---
“জানি আমি বিভীষণ উপকারী মম
পরম! সরমা সুখি, তুমিও তেমনি!
আছে যে বাঁচিয়া হেথা অভাগিনী সীতা,
সে কেবল, দয়াবতি, তব দয়া-গুণে!
১৩-১৪। ধীর ধর্ম্মসম বীর এক---এ স্থলে.সরমার পতি বিভীষণ।
গ্রন্থের ১২৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কিন্তু কহি, শুন মোর অপূর্ব্ব স্বপন!---
"সাজিল রাক্ষস-বৃন্দ যুঝিবার আশে ;
বাজিল রাক্ষস-বাদ্য ; উঠিল গগনে
নিনাদ। কাঁপিনু, সখি, দেখি বীর-দলে,
তেজে হুতাসন-সম, বিক্রমে কেশরী।
কত যে হইল রণ, কহিব কেমনে?
বহিল শোণিত-নদী! পর্ব্বত-আকারে
দেখিনু শবের রাশি, মহাভয়ঙ্কর।
আইল কবন্ধ, ভূত, পিশাচ, দানব,
শকুনি, গৃধিনী আদি যত মাংসাহারী
বিহঙ্গম ; পালে পালে শৃগাল ; আইল
অসংখ্য কুকুর। লঙ্কা পূরিল ভৈরবে।
“দেখিনু কর্ব্বুর-নাথে পুনঃ সভাতলে,
মলিন বদন এবে, অশ্রুময় আঁখি,
শোকাকুল! ঘোর বণে রাঘব-বিক্রমে
লাঘব-গরব, সই! কহিল বিষাদে
রক্ষোরাজ, “হায়, বিধি, এই কি রে ছিল
তোর মনে? যাও সবে, জাগাও যতনে
শূলী-শম্ভূ-সম ভাই কুম্ভকর্ণে মম।
কে রাখিবে রক্ষঃ-কুলে সে যদি না পারে?
ধাইল রাক্ষস-দল ; বাজিল বাজনা
ঘোর রোলে ; নারী-দল দিল হুলাহুলি।
বিরাট্-মূরতি-ধর পশিল কটকে
রক্ষোরথী। প্রভু মোর, তীক্ষতর শরে,
(হেন বিচক্ষণ শিক্ষা কার লো জগতে?)
কাটিলা তাহার শিরঃ! মরিল অকালে
জাগি সে দুরন্ত শূর। জয় রাম ধ্বনি
শুনিনু হরে, সই! কাঁদিল রাবণ!
১। কবন্ধ---মস্তকরহিত দেহ।
২৪। রক্ষোরথী---কুম্ভকর্ণ।
গ্রন্থের ১২৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কাঁদিল কনক-লঙ্কা হাহাকার রবে!
“চঞ্চল হইনু, সখি, শুনিয়া চৌদিকে
ক্রন্দন! কহিনু মায়ে, ধরি পা দুখানি,
‘রক্ষঃ-কুল-দুঃখে বুক ফাটে, মা, আমার!
পরেরে কাতর দেখি সতত কাতরা
এ দাসী ; ক্ষম, মা, মোরে!’ হাসিয়া কহিলা
বসুধা, 'লো রঘুবধূ, সত্য যা দেখিলি!
লণ্ডভণ্ড করি লঙ্কা দণ্ডিবে রাবণে
পতি তোর। দেখ পুনঃ নয়ন মেলিয়া॥
“দেখিনু, সরমা সখি, সুর-বালা-দলে,
নানা আভরণ হাতে, মন্দারের মালা,
পট্টবস্ত্র। হাসি তারা বেড়িল আমারে।
কেহ কহে, ‘উঠ, সতি, হত এত দিনে
দুরন্ত রাবণ রণে!’ কেহ কহে, ‘উঠ,
রঘুনন্দনের ধন, উঠ, ত্বরা করি,
অবগাহ দেহ, দেবি, সুবাসিত জলে,
পর নানা আভরণ। দেবেন্দ্রাণী শচী
দিবেন সীতায় দান আজি সীতানাথে!’
“কহিনু, সরমা সখি, করপুটে আমি ;
‘কি কাজ, হে সুরবালা, এ বেশ ভূষণে
দাসীর? যাইব আমি যথা কান্ত মম,
এ দশায়, দেহ আজ্ঞা ; কাঙ্গালিনী সীতা,
কাঙ্গালিনী-বেশে তারে দেখুন নৃমণি।’
“উত্তরিলা সুরবালা ; শুন লো মৈথিলি!
সমল খনির গর্ভে মণি ; কিন্তু তারে
পরিষ্কারি রাজ-হস্তে দান করে দাতা!’
“কাঁদিয়া, হাসিয়া, সই, সাজিনু সত্বরে।
হেরিনু অদূরে নাথে, হায় লো, যেমতি
২৬। পরিষ্কারি---পরিষ্কার করিয়া।
গ্রন্থের ১২৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কনক-উদয়াচলে দেব অংশুমালী!
পাগলিনী প্রায় আমি ধাইনু ধরিতে
পদযুগ, সুবদনে!---জাগিনু অমনি!---
সহসা, স্বজনি, যথা নিবিলে দেউটি,
ঘোর অন্ধকার ঘর ; ঘটিল সে দশা
আমার,---আঁধার বিশ্ব দেখিনু চৌদিকে!
হে বিধি, কেন না আমি মরিনু তখনি?
কি সাধে এ পোডা প্রাণ রহিল এ দেহে?”
নীরবিলা বিধুমুখী, নীরবে যেমতি
বীণা, ছিঁড়ে তার যদি! কাঁদিয়া সরমা
(রক্ষঃ-কুল-রাজ-লক্ষ্মী রক্ষোবধূ-রূপে)
কহিলা ; “পাইবে নাথে, জনক-নন্দিনি!
সত্য এ স্বপন তব, কহিনু তোমারে!
ভাসিছে সলিলে শিলা, পড়েছে সংগ্রামে
দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস কুম্ভকর্ণ বলী ;
সেবিছেন বিভীষণ জিষ্ণু রঘুনাথে
লক্ষ লক্ষ বীর সহ। মরিবে পৌলস্ত্য
যথোচিত শাস্তি পাই ; মজিবে দুর্ম্মতি
সবংশে! এখন কহ, কি ঘটিল পরে।
অসীম লালসা মোর শুনিতে কাহিনী।”
আরম্ভিলা পুনঃ সতী সুমধুর স্বরে ;---
রাবণে ; ভূতলে, হায়, সে বীর-কেশরী,
তুঙ্গ শৈল-শৃঙ্গ যেন চূর্ণ বজ্রাঘাতে!
“কহিল রাঘব-রিপু ; 'ইন্দীবর আঁখি
উন্মীলি, দেখ লো চেয়ে, ইন্দু-নিভাননে,
রাবণের পরাক্রম! জগত-বিখ্যাত
জটায়ু হীনায়ু আজি মোর ভুজ-বলে!
নিজ দোষে মরে মূঢ় গরুড়-নন্দন!
১৬। জিষ্ণু---জয়শীল।
১৭। পৌলস্ত্য---পুলস্ত্যনন্দন রাবণ।
গ্রন্থের ১২৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কে কহিল মোর সাথে যুঝিতে বর্ব্বরে?
“ ‘ধর্ম্ম-কর্ম্ম সাধিবারে মরিনু সংগ্রামে,
রাবণ' ;---কহিলা শূর অতি মৃদু স্বরে
'সম্মুখ সমরে পড়ি যাই দেবালয়ে।
কি দশা ঘটিবে তোর, দেখ রে ভাবিয়া?
শৃগাল হইয়া, লোভি, লোভিলি সিংহীরে!
কে তোরে রক্ষিবে, রক্ষঃ? পড়িলি সঙ্কটে,
লঙ্কানাথ, করি চুরি এ নারী-রতনে!’
“এতেক কহিয়া বীর নীরব হইলা!
তুলিল আমায় পুনঃ রথে লঙ্কাপতি।
কৃতাঞ্জলি-পুটে কাঁদি কহিমু, স্বজনি,
বীরবরে ; সীতা নাম, জনক-দুহিতা,
রঘুবধূ দাসী, দেব! শুন্য ঘরে পেয়ে
আমায়, হরিছে পাপী ; কহিও এ কথা
দেখা যদি হয়, প্রভু, রাঘবের সাথে
উঠিল গগনে রথ গম্ভীর নির্ঘোষে।
শুনিনু ভৈরব রব ; দেখিনু সম্মুখে
সাগর নীলোর্ম্মিময়! বহিছে কল্পোলে
অতল, অকুল জল, অবিরাম-গতি।
ঝাঁপ দিয়া জলে, সখি, চাহিনু ডুবিতে ;
নিবারিল দুষ্ট মোরে! ডাকিনু বারীশে,
জলচরে মনে মনে, কেহ না শুনিল,
অবহেলি অভাগীরে! অনম্বর-পথে
চলিল কনক-রথ মনোরথ-গতি।
“অবিলম্বে লঙ্কাপুরী শোভিল সম্মুখে।
সাগরের ভালে, সখি, এ কনক-পুরী
রঞ্জনের রেখা! কিন্তু কারাগার যদি
সুবর্ণ-গঠিত, তবু বন্দীর নয়নে
১৮। নীলোর্ম্মিময়---নীলবর্ণ তরঙ্গপরিপূর্ণ।
২৩। অনম্বর-পথে---আকাশপথে।
২৭। রঞ্জন---রক্তচন্দন, কেন না, লঙ্কা সুবর্ণগঠিত।
গ্রন্থের ১২৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কমনীয় কভু কি লো শোভে তার আভা?
সুবর্ণ-পিঞ্জর বলি হয় কি লো সুখী
সে পিঞ্জরে বদ্ধ পাখী? দুঃখিনী সতত
যে পিঞ্জরে রাখ তুমি কুঞ্জ-বিহারিণী!
কুক্ষণে জনম মম, সরমা সুন্দরি!
কে কবে শুনেছে, সখি, কহ, হেন কথা?
রাজার নন্দিনী আমি, রাজ-কুল-বধূ,
তবু বদ্ধ কারাগারে!”---কাঁদিলা রূপসী,
সরমার গলা ধরি ; কাঁদিলা সরমা।
কত ক্ষণে চক্ষুঃ-জল মুছি সুলোচনা
সরমা কহিলা ; “দেবি, কে পারে খণ্ডিতে
বিধির নির্ব্বন্ধ? কিন্তু সত্য যা কহিলা
বসুধা। বিধির ইচ্ছা, তেঁই লঙ্কাপতি
আনিয়াছে হরি তোমা! সবংশে মরিবে
দুষ্টমতি! বীর আর কে আছে এ পুরে
বীরযোনি? কোথা, সতি, ত্রিভুবন-জয়ী
যোধ যত? দেখ চেয়ে, সাগরের কূলে,
শবাহারী জন্তু-পুঞ্জ ভূঞ্জিছে উল্লাসে
শব-রাশি! কান দিয়া শুন, ঘরে ঘরে
কাঁদিছে বিধবা বধু! আশু পোহাইবে
এ দুঃখ-শর্ব্বরী তব! ফলিবে, কহিনু,
স্বপ্ন! বিদ্যাধরী-দল মন্দারের দামে
ও বরাঙ্গ রঙ্গে আসি আশু সাজাইবে!
ভেটিবে রাঘবে তুমি, বসুধা কামিনী
সরস বসন্তে যথা ভেটেন মধুরে!
১। কমনীয়---মনোহর, নয়মানন্দদায়ক।
১৫-১৬। এ পুরে বীরযোনি---বীরপুত্র-জন্মদায়িনী-স্বরূপ লঙ্কাপুরে, অর্থাৎ যেখানে বার জন্মায়।
২২। মন্দারের দামে---পারিজাতপুষ্পের মালায়।
২৪-২৫। বসুধা কামিনী ইত্যাদি---বসন্তে পৃথিবী বহুবিধ পুষ্পরূপ ভূষণে ভূষিতা হয়েন ইত্যাদি।
গ্রন্থের ১৩০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ভুলো না দাসীরে, সাধ্বি! যত দিন বাঁচি,
এ মনোমনদিরে রাখি, আনন্দে পূজিব
ও প্রতিমা, নিত্য যথা, আইলে রজনী,
সরসী হরষে পূজে কৌমুদিনী-ধনে।
বহু ক্লেশ, সুকেশিনি, পাইলে এ দেশে।
কিন্তু নহে দোষী দাসী!” কহিলা সুস্বরে
মৈথিলী ; “সরমা সখি, মম হিতৈষিণী
তোমা সম আর কি লো আছে এ জগতে?
মরুভূমে প্রবাহিণী মোর পক্ষে তুমি,
রক্ষোবধূ! সুশীতল ছায়া-রূপ ধরি,
তপন-তাপিত আমি, জুড়ালে আমারে!
মূর্ত্তিমতী দয়া তুমি এ নির্দ্দয় দেশে!
এ পঙ্কিল জলে পদ্ম! ভূজঙ্গিনী-রূপী
এ কাল কনক-লঙ্কা-শিরে শিরোমণি।
আর কি কহিব, সখি? কাঙ্গালিনী সীতা,
তুমি লো মহার্হ রত্ন! দরিদ্র, পাইলে
রতন, কভু কি তারে অযতনে, ধনি?”
নমিয়া সতীর পদে, কহিলা সরমা ;
“বিদায় দাসীরে এবে দেহ, দয়াময়ি!
না চাহে পরাণ মম ছাড়িতে তোমারে,
রঘু-কুল-কমলিনি! কিন্তু প্রাণপতি
আমার, রাঘব-দাস ; তোমার চরণে
আসি কথা কই আমি, এ কথা শুনিলে
রুষিবে লঙ্কার নাথ, পড়িব সঙ্কটে!”
কহিলা মৈথিলী ; “সখি, যাও ত্বরা করি,
নিজালয়ে ; শুনি আমি দূর পদ্-ধ্বনি ;
ফিরি বুঝি চেড়ীদল আসিছে এ বনে।”
আতঙ্কে কুরঙ্গী যথা, গেলা দ্রুতগামী
সরমা ; রহিলা দেবী সে বিজন বনে,
একটি কুসুম মাত্র অরণ্যে যেমতি।
ইতি শ্রীমেঘনাদবধে কাব্যে অশোকবনং নাম
চতুর্থঃ সর্গঃ।
৩। ও প্রতিমা---তোমার মূর্ত্তি।
২১--২২। প্রাণপতি আমার---বিভীষণ।
২৯। সে বিজন বনে---অর্থাৎ জনশূন্য অশোকবনে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রথম প্রকাশ ১৮৬১।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে রামকমল সিংহ দ্বারা প্রকাশিত, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবি সজনীকান্ত দাস দ্বারা মূলতঃ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ সংস্করণ থেকে গৃহীত ও সম্পাদিত এবং ১২৭৪ বঙ্গাব্দে (১৮৬৭ সালে) প্রকাশিত, কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-কৃত টীকা ও ব্যাখ্যা সহ।
মিলনসাগরে প্রকাশ ২১শে ফেব্রুয়ারী ২০২৬।
গ্রন্থের ১০৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
চতুর্থ সর্গ
(অশোকবনং নাম)
নমি আমি, কবি-গুরু, তব পদাম্বুজে,
বাল্মীকি! হে ভারতের শিরঃচূড়ামণি,
তব অনুগামী দাস, রাজেন্দ্র-সঙ্গমে
দীন যথা যায় দূর তীর্থদরশনে!
তব পদ-চিহ্ন ধ্যান করি দিবা নিশি,
পশিয়াছে কত যাত্রী যশের মন্দিরে,
দমনিয়া ভব-দম দুরন্ত শমনে---
অমর! শ্রীভর্ত্তৃহরি ; শূরী ভবভূতি
শ্রীকণ্ঠ ; ভারতে খ্যাত বরপুত্র যিনি
ভারতীর, কালিদাস---সুমধুর-ভাষী ;
মুরারি-মুরলী-ধ্বনি-সদৃশ মুরারি
মনোহর ; কীর্ত্তিবাস, কীর্ত্তিবাস কবি,
১। কবিগুরু---কবিকুলপ্রধান, বাল্মীকি।
৩-৪। তব অনুগামী দাস ইত্যাদি---যেমন কোন দরিদ্র জন কোন প্রতাপশালী রাজার সমভিব্যাহারে দূর তীর্থ (যে তীর্থস্থলে সে একাকী গমনে অক্ষম) দর্শন করিতে যায় ; তেমনি
আমিও যশোমন্দিরস্বরূপ তীর্থে তোমার অনুসরণ করিতেছি।
৫-৮। তব পদ-চিহ্ন ধ্যান করি ইত্যাদি---হে কবিগুরু, তোমার পদচিহ্ন ধ্যান অর্থাৎ নিরীক্ষণ করিয়া কত যাত্রী, এ ভবমণ্ডলকে যিনি সর্ব্বদা দমন করেন, এমন যে যমরাজ, তাঁহাকে দমন করিয়া অর্থাৎ অমর হইয়া যশের মন্দিরে প্রবেশ করিয়াছে। অর্থাৎ অনেক কবি রামায়ণ অবলম্বন করিয়া বহুবিধ কাব্যরচনায় চিরস্থায়ী যশোলাভ করিয়াছেন।
৮। ভর্ত্তৃহরি---ভট্টিকাব্যের গ্রন্থকার। ভবভূতি---বীরচরিতাদি গ্রন্থের রচয়িতা।
৯-১০। ভারতে খ্যাত ইত্যাদি---রঘুবংশ-রচয়িতা কালিদাস, যিনি ভূভারতে ভারতীর অর্থাৎ সরস্বতীর বরপুত্র বলিয়া বিখ্যাত।
১১। মুরারি---শ্রীকৃষ্ণ। মুরলী---বংশী। দ্বিতীয় মুরারি---অনর্ঘরাঘব কাব্যের গ্রন্থকার। মুরারি-মুরলী-ধ্বনি-সদৃশ মুরারি মনোহর---শ্রীকৃষ্ণের বংশীধ্বনিস্বরূপ মুরারির রচনা মনোহর।
১২। কীর্ত্তিবাস---যাহাতে তে কীর্ত্তি সর্ব্বদা বসতি করে অর্থাৎ বিনি পরম যশস্বী। কীর্ত্তিবাস---কবি কীর্ত্তিবাস, যিনি ভাষা রামায়ণ রচনা করেন।
গ্রন্থের ১০৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
এ বঙ্গের অলঙ্কার!---হে পিতঃ, কেমনে,
কবিতা-রসের সরে রাজহংস-কুলে
মিলি করি কেলি আমি, না শিখালে তুমি!
গাঁথিব নূতন মালা, তুলি সযতনে
তব কাব্যোদ্যানে ফুল ; ইচ্ছা সাজাইতে
বিবিধ ভূষণে ভাষা ; কিন্তু কোথা পাব
(দীন আমি!) রত্নরাজী, তুমি নাহি দিলে,
রত্নাকর? কৃপা, প্রভু, কর অকিঞ্চনে।---
ভাসিছে কনক-লঙ্কা আনন্দের নীরে,
সুবর্ণ-দীপ-মালিনী, রাজেন্দ্রাণী যথা
রত্নহারা ! ঘরে ঘরে বাজিছে বাজনা ;
নাচিছে নর্তকী-বৃন্দ, গাইছে সুতানে
গায়ক ; নায়কে লয়ে কেলিছে নায়কী,
খল খল খল হাসি মধুর অধরে!
কেহ বা সুরতে রত, কেহ শীধু-পানে।
দ্বারে দ্বারে ঝোলে মালা গাঁথা ফল-ফুলে ;
গৃহাগ্রে উড়িছে ধ্বজ ; বাতায়নে বাতি ;
জনস্রোতঃ রাজ-পথে বহিছে কল্লোলে,
যথা মহোত্সবে, যবে মাতে পুরবাসী।
রাশি রাশি পুষ্প-বৃষ্টি হইছে চৌদিকে---
সৌরভে পূরিয়া পুরী। জাগে লঙ্কা আজি
নিশীথে, ফিরেন নিদ্রা দুয়ারে দুয়ারে,
১-৩। হে পিতঃ, কেমনে ইত্যাদি---হে কবিগুরু, যদি তুমি আমাকে না শিখাও, তাহা হইলে মহাকবিদিগের সহিত আমি কি প্রকারে কবিতাসরোবরে কেলি করি।
৯। ভাসিছে ইত্যাদি---বীরবর ইন্দ্রজিৎ এবং প্রমীলা সুন্দরীর সমাগমে লঙ্কাপুরবাসী জনসমূহ আনন্দে মগ্ন হইয়াছে।
১০। সুবর্ণ-দীপ-মালিনী---সুবর্ণদীপাবলী যাহার মালাস্বরূপ হইয়া জ্বলিতেছে।
১৩। কেলিছে---কেলি করিতেছে।
১৫। সুরতে---কামক্রীড়ায়। শীধু---মদ্য।
১৭। বাতায়ন---গবাক্ষ, জানালা।
১৯। যথা মহোত্সবে ইত্যাদি---যেরূপ, কোন পূরে পূরবাসী জনগণ মহোৎসবে মত্ত হইলে, হইয়া থাকে।
গ্রন্থের ১০৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কেহ নাহি সাধে তাঁরে পশিতে আলয়ে,
বিরাম-বর প্রার্থনে!---“মারিবে বীরেন্দ্র
ইন্দ্রজিত কালি রামে ; মারিবে লক্ষ্মণে ;
সিংহনাদে খেদাইবে শৃগাল-সদৃশ
বৈরী-দলে সিন্ধু-পারে ; আনিবে বাঁধিয়া
বিভীষণে ; পলাইবে ছাড়িয়া চাঁদেরে
রাহু ; জগতের আঁখি জুড়াবে দেখিয়া
পুনঃ সে সুধাংশু-ধনে ; ” আশা, মায়াবিনী,
পথে, ঘাটে, ঘরে, দ্বারে, দেউলে, কাননে,
গাইছে গো এই গীত আজি রক্ষঃপুরে---
কেন না ভাসিবে রক্ষঃ আহ্লাদ-সলিলে?
একাকিনী শোকাকুলা, অশোক-কাননে,
কাঁদেন রাঘব-বাঞ্ছা আঁধার কুটীরে
নীরবে! দুরন্ত চেড়ী, সতীরে ছাড়িয়া,
ফেরে দূরে মত্ত সবে উৎসব-কৌতুকে---
হীন-প্রাণা হরিণীরে রাখিয়া বাঘিনী
নির্ভয় হৃদয়ে যথা ফেরে দূর বনে!
মলিন-বদনা দেবী, হায় রে, যেমতি
খনির তিমির-গর্ভে (না পারে পশিতে
সৌর-কর-রাশি যথা) সূর্য্যকান্ত মণি,
কিন্বা বিম্বাধরা রমা অম্বুরাশি-তলে!
স্বনিছে পবন, দূরে রহিয়া রহিয়া
উচ্ছ্বাসে বিলাপী যথা! লড়িছে বিষাদে
৬-৭। রাহুরূপ রামের সৈন্য চন্দ্ররূপ কনক লঙ্কাকে ত্যাগ করিয়া দূরীভূত হইবে।
৮। আশা মায়াবিনী ইত্যাদি---পথে, ঘাটে, ঘরে, দ্বারে অর্থাৎ সর্ব্বত্রে সকলেই এই কথা কহিতেছে, যে ইন্দ্রজিৎ রাম ও লক্ষ্মণকে মারিবে ইত্যাদি।
১৩। রাঘব-বাঞ্ছা---সীতা দেবী।
১৮-২১। হায় রে, যেমতি ইত্যাদি---যে খনিগর্ভে সৌরকররাশি অর্থাৎ সূর্য্যকিরণপুঞ্জ প্রবেশ করিতে অক্ষম, সে খনিগর্ভে সূর্য্যকান্ত মণি যেরূপ আভাহীন ইত্যাদি। রমা---লক্ষ্মী। অম্বুরাশি---সাগর।
গ্রন্থের ১০৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ “” ; ?
মর্ম্মরিয়া পাতাকুল! বসেছে অরবে
শাখে পাখী! রাশি রাশি কুসুম পড়েছে
তরুমূলে, যেন তরু, তাপি মনস্তাপে,
ফেলিয়াছে খুলি সাজ! দূরে প্রবাহিণী,
উচ্চ বীচি-রবে কাঁদি, চলিছে সাগরে,
কহিতে বারীশে যেন এ দুখ-কাহিনী!
না পশে সুধাংশু-অংশু সে ঘোর বিপিনে।
ফোটে কি কমল কভু সমল সলিলে?
তবুও উজ্জল বন ও অপূর্ব্ব রূপে !
একাকিনী বসি দেবী, প্রভা আভাময়ী
তমোময় ধামে যেন! হেন কালে তথা
সরমা সুন্দরী আসি বসিলা কাঁদিয়া
সতীর চরণ-তলে, সরমা সুন্দরী---
রক্ষঃকুল-রাজলক্ষ্মী রক্ষোবধূ-বেশে!
কত ক্ষণে চক্ষু-জল মুছি সুলোচনা
কহিলা মধুর স্বরে ; “দুরন্ত চেড়ীরা,
তোমারে ছাড়িয়া, দেবি, ফিরিছে নগরে,
মহোৎসবে রত সবে আজি নিশা-কালে ;
এই কথা শুনি আমি আইনু পুজিতে
পা দুখানি। আনিয়াছি কৌটায় ভরিয়া,
সিন্দূর ; করিলে আজ্ঞা, সুন্দর ললাটে
দিব ফোঁটা। এয়ো তুমি, তোমার কি সাজে
এ বেশ? নিষ্ঠুর, হায়, দুষ্ট লঙ্কাপতি !
কে ছেঁড়ে পদ্মের পর্ণ? কেমনে হরিল
ও বরাঙ্গ-অলঙ্কার, বুঝিতে না পারি?”
কৌটা খুলি, রক্ষোবধূ যত্নে দিলা ফোঁটা
সীমন্তে ; সিন্দূর-বিন্দু শোভিল ললাটে,
৫। বীচি-রব---তরঙ্গশব্দ।
৬। এ দুখ-কাহিনী---সতীর দুঃখবার্ত্তা।
৯। ও অপূর্ব্ব রূপে---সীতার, অপূর্ব্ব রূপে।
২৭। সীমন্তে---সিঁথিতে।
গ্রন্থের ১০৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
গোধুলি-ললাটে, আহা! তারা-রত্ন যথা!
দিয়া ফোঁটা, পদ-ধূলি লইলা সরমা।
“ক্ষম, লক্ষ্মি, ছুঁইনু ও দেব-আকাঙ্ক্ষিত
তনু ; কিন্তু চির-দাসী দাসী ও চরণে!”
এতেক কহিয়া পুনঃ বসিলা যুবতী
পদতলে। আহা মরি, সুবর্ণ-দেউটী
তুলসীর মূলে যেন জ্বলিল, উজলি
দশ দিশ! মৃদু স্বরে কহিলা মৈথিলী ;---
“বৃথা গঞ্জ দশাননে তুমি, বিধুমুখি!
আপনি খুলিয়া আমি ফেলাইনু দূরে
আভরণ, যবে পাপী আমারে ধরিল
বনাশ্রমে। ছড়াইনু পথে সে সকলে.
চিহ্ন-হেতু। সেই সেতু আনিয়াছে হেথা---
এ কনক-লঙ্কাপুরে---ধীর রঘুনাথে!
মণি, মুক্তা, রতন, কি আছে লো জগতে,
যাহে নাহি অবহেলি লভিতে এ ধনে?”
কহিলা সরমা ; “দেবি, শুনিয়াছে দাসী
তব স্বয়ম্বর-কথা তব সুধা-মুখে ;
কেন বা আইলা বনে রঘু-কুল-মণি।
কহ এবে দয়া করি, কেমনে হরিল
তোমারে রক্ষেন্দ্র সতি? এই ভিক্ষা করি,
দাসীর এ তৃষ্ণা তোষ সুধা-বরিষণে!
দূরে দুষ্ট চেড়ীদল ; এই অবসরে
কহ মোরে বিবরিয়া, শুনি সে কাহিনী।
কি ছলে ছলিল রামে, ঠাকুর লক্ষ্মণে
এ চোর? কি মায়া-বলে রাঘবের ঘরে
প্রবেশি, করিল চুরি এ হেন রতনে?”
যথা গোমুখীর মুখ হইতে সুস্বনে
১৩-১৪। সেই সেতু---অলঙ্কার নিক্ষেপরূপ সেতু, অর্থাৎ আমার অকঙ্কারসকল পথে দেখিয়া প্রভু আমার তত্ত্ব পাইয়াছেন।
গ্রন্থের ১১০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
করে পূত বারি-ধারা, কহিল জানকী ;
মধুরভাষিণী সতী, আদরে সম্ভাষি
সরমারে,---হিতৈষিণী সীতার পরমা
তুমি, সখি! পূর্ব্ব-কথা শুনিবারে যদি
ইচ্ছা তব, কহি আমি, শুন মনঃ দিয়া।---
ছিনু মোরা, সুলোচনে, গোদাবরী-তীরে,
কপোত কপোতী যথা উচ্চ বৃক্ষ-চূড়ে
বাঁধি নীড়, থাকে সুখে ; ছিনু ঘোর বনে
নাম পঞ্চবটী, মর্ত্ত্যে সুর-বন-সম।
সদা করিতেন সেবা লক্ষ্মণ সুমতি।
দণ্ডক ভাণ্ডার যার, ভাবি দেখ মনে,
কিসের অভাব তার? যোগাতেন আনি
নিত্য ফল মূল বীর সৌমিত্রি ; মৃগয়া
করিতেন কভু প্রভূ ; কিন্তু জীবনাশে
সতত বিরত, সখি, রাঘবেন্দ্র বলী,---
দয়ার সাগর নাথ, বিদিত জগতে!
“ভুলিমু পূর্ব্বের সুখ। রাজার নন্দিনী,
রঘু-কুল-বধু আমি ; কিন্তু এ কাননে,
পাইনু, সরমা সই, পরম পিরীতি!
কুটীরের চারি দিকে কত যে ফুটিত
ফুলকুল নিত্য নিত্য, কহিব কেমনে?
পঞ্চবটী-বন-চর মধু নিরবধি!
জাগাত প্রভাতে মোরে কুহরি সুস্বরে
পিক-রাজ! কোন্ রাণী, কহ, শশিমুখি,
হেন চিত্ত-বিনোদন বৈতালিক-গীতে
খোলে আঁখি? শিখী সহ, শিখিনী সুখিনী
নাচিত দুয়ারে মোর! নর্ত্তক, নর্ত্তকী,
এ দোঁহার সম, রামা, আছে কি জগতে?
২৫। বৈতালিক---স্তুতিপাঠক।
গ্রন্থের ১১১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ “” ; ?
অতিথি আসিত নিত্য করভ, করভী,
মৃগ-শিশু, বিহঙ্গম, স্বর্ণ-অঙ্গ কেহ,
কেহ শুভ্র, কেহ কাল, কেহ বা চিত্রিত,
যথা বাসবের ধনুঃ ঘন-বর-শিরে ;
অহিংসক জীব যত। সেবিতাম সবে
মহাদরে ; পালিতাম পরম যতনে,
মরুভূমে স্রোতস্বতী তৃষাতুরে যথা,
আপনি সুজলবতী বারিদ-প্রসাদে।--
সরসী আরসি মোর! তুলি কুবলয়ে,
(অমূল রতন-সম) পরিতাম কেশে ;
সাজিতাম ফুল-সাজে ; হাসিতেন প্রভু,
বনদেবী বলি মোরে সম্ভাষি কৌতুকে!
হায়, সখি, আর কি লো পাব প্রাণনাথে?
আর কি এ পোড়া আঁখি এ ছার জনমে
দেখিবে সে পা দুখানি---আশার সরসে
রাজীব ; নয়নমণি? হে দারুণ বিধি,
কি পাপে পাপী এ দাসী তোমার সমীপে?”
এতেক কহিয়া দেবী কাঁদিলা নীরবে।
কাঁদিল সরমা সতী তিতি অশ্রু-নীরে।
কত ক্ষণে চক্ষুঃ-জল মুছি রক্ষোবধূ
সরমা কহিলা সতী সীতার চরণে ;---
“স্মরিলে পূর্ব্বের কথা ব্যথা মনে যদি
পাও, দেবি, থাক্ তবে ; কি কাজ স্মরিয়া?---
হেরি তব অশ্রু-বারি ইচ্ছি মরিবারে!”
উত্তরিলা প্রিয়ম্বদা (কাদম্বা যেমতি
মধু-স্বরা!) ; “এ অভাগী, হায়, লো সুভগে,
যদি না কাঁদিবে তবে কে আর কাঁদিবে
১। করভ---হস্তিশাবক।
৩। চিত্রিত---নানাবর্ণিত।
১৫-১৬। আশার সরসে রাজীব---আশারূপ সরোবরের পদ্মস্বরূপ অর্থাৎ চিরবাঞ্ছনীয়।
২৪। ইচ্ছি---ইচ্ছা করি।
২৫। প্রিয়ম্বদা---মিষ্টভাষিণী।
গ্রন্থের ১১২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
এ জগতে? কহি, শুন পূর্ব্বের কাহিনী।
বরিষার কালে, সখি, প্লাবন-পীড়নে
কাতর প্রবাহ, ঢালে, তীর অতিক্রমি,
বারি-রাশি দুই পাশে ; তেমতি যে মনঃ
দুঃখিত, দুঃখের কথা কহে সে অপরে।
তেঁই আমি কহি, তুমি শুন, লো সরমে।
কে আছে সীতার আর এ অররু-পুরে?
“পঞ্চবটী-বনে মোরা গোদাবরী-তটে
ছিনু সুখে। হায়, সখি, কেমনে বর্ণিব
সে কান্তার-কান্তি আমি? সতত স্বপনে
শুনিতাম বন-বীণা বন-দেবী-করে ;
সরসীর তীরে বসি, দেখিতাম কভু
সৌর-কর-রাশি-বেশে সুর-বালা-কেলি
পদ্মবনে ; কভু সাধ্বী ঋষি-বংশ-বধূ
সুহাসিনী আসিতেন দাসীর কুটীরে,
সুধাংশুর অংশু যেন অন্ধকার ধামে!
অজিন (রঞ্জিত, আহা, কত শত রঙে!)
পাতি বসিতাম কভু দীর্ঘ তরু-মূলে,
সখী-ভাবে সম্তাষিয়া ছায়ায়, কভু বা
কুরঙ্গিণী-সঙ্গে রঙ্গে নাচিতাম বনে,
গাইতাম গীত শুনি কোকিলের ধ্বনি!
নব-লতিকার, সতি, দিতাম বিবাহ
তরু-সহ ; চুম্বিতাম, মঞ্জরিত যবে
দম্পতী, মঞ্জরীবৃন্দে, আনন্দে সম্ভাষি
নাতিনী বলিয়া সবে! গুঞ্জরিলে অলি,
নাতিনী-জামাই বলি বরিতাম তারে!
২। প্লাবন---বন্যা।
৭। অররু-পুরে---রাাক্ষসপুরে।
১০। কান্তার---দুর্গম পথ।
১৩-১৪। সৌর-কর-রাশি-বেশে ইত্যাদি---পদ্মবনে সৌরকররাশি অর্থাৎ সূর্য্যকিরণসমূহ দেখিয়া ভাবিতাম, যেন দেবকন্যাসকল সৌরকরবেশে পদ্মবনে কেলি করিতেন।
১৭। অজিন---চর্ম্ম।
গ্রন্থের ১১৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কভু বা প্রভুর সহ ভ্রমিতাম সুখে
নদী-তটে ; দেখিতাম তরল সলিলে
নূতন গগন যেন, নব তারাবলী,
নব নিশাকান্ত-কান্তি! কভু বা উঠিয়া
পর্ব্বত-উপরে, সখি, বসিতাম আমি
নাথের চরণ-তলে, ব্রততী যেমতি
বিশাল রসাল-মূলে ; কত যে আদরে
তুষিতেন প্রভু মোরে, বরষি বচন-
সুধা, হায়, কব কারে? কব বা কেমনে?
শুনেছি কৈলাস-পুরে কৈলাস-নিবাসী
ব্যোমকেশ, স্বর্ণাসনে বসি গৌরী-সনে,
আগম, পুরাণ, বেদ, পঞ্চতন্ত্র কথা
পঞ্চ মুখে পঞ্চমুখ কহেন উমারে ;
শুনিতাম সেইরূপে আমিও, রূপসি,
নানা কথা! এখনও, এ বিজন বনে,
ভাবি আমি শুনি যেন সে মধুর বাণী!---
সাঙ্গ কি দাসীর পক্ষে, হে নিষ্ঠুর বিধি,
সে সঙ্গীত?”---নীরবিলা আয়ত-লোচনা
বিষাদে। কহিলা! তবে সরমা সুন্দরী ;---
“শুনিলে তোমার কথা, রাঘব-রমণি,
ঘৃণা জন্মে রাজ-ভোগে! ইচ্ছা করে, ত্যজি
রাজ্য-সুখ, যাই চলি হেন বন-বাসে!
কিন্তু ভেবে দেখি যদি, ভয় হয় মনে।
রবিকর যবে, দেবি, পশে বনস্থলে
তমোময়, নিজ গুণে আলো করে বনে
সে কিরণ ; নিশি যবে যায় কোন দেশে,
৬। ব্রততী---লতা।
১১। ব্যোমকেশ---মহাদেব।
১৭-১৮। সাঙ্গ কি ইত্যাদি---হে দারুণ বিধাতঃ, নাথের সঙ্গীতস্বরূপ বাক্যধ্বনি আর কি কখন আমার শ্রবণকূহরে প্রবেশ করিবে না?
২৪-২৫। বনস্থলে তমোময়---তমোময় বনস্থলে অর্থাৎ অন্ধকারপূর্ণ কাননে।
গ্রন্থের ১১৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
মলিন-বদন সবে তার সমাগমে!
যথা পদার্পণ তুমি কর, মধুমতি,
কেন না হইবে মুখী সর্ব্ব জন তথা,
জগত-আনন্দ তুমি, ভূবন-মোহিনী!
কহ, দেবি, কি কৌশলে হরিল তোমারে
রক্ষঃপতি? শুনিয়াছে বীণা-ধ্বনি দাসী,
পিকবর-রব নব পল্লব-মাঝারে
সরস মধুর মাসে ; কিন্তু নাহি শুনি
হেন মধুমাথা কথা কভু এ জগতে!
দেখ চেয়ে, নীলাম্বরে শশী, যাঁর আভা
মলিন তোমার রূপে, পিইছেন হাসি
তব বাক্য-সুধা, দেবি, দেব সুধানিধি!
নীরব কোকিল এবে আর পাখী যত,
শুনিবারে ও কাহিনী, কহিনু তোমারে।
এ সবার সাধ, সাধ্বি, মিটাও কহিয়া।”
কহিলা রাঘব-প্রিয়া ; “এইরূপে, সখি,
কাটাইনু কত কাল পঞ্চবটী-বনে
সুখে। ননদিনী তব, দুষ্টা সূর্পণখা।
বিষম জঞ্জাল আসি ঘটাইল শেষে!
শরমে, সরমা সই, মরি লো স্মরিলে
তার কথা! ধিক্ তারে! নারী-কুল-কালি।
চাহিল মারিয়া মোরে বরিতে বাঘিনী
রঘুবরে! ঘোর রোষে সৌমিত্রি কেশরী
খেদাইলা দূরে তারে। আইল ধাইয়া
রাক্ষস, তুমুল রণ বাজিল কাননে।
সভয়ে পশিনু আমি কুটীর মাঝারে।
কোদণ্ড-টংকারে, সখি, কত যে কাঁদিনু,
কব কারে? মুদি আঁখি, কৃতাঞ্জলি-পুটে
১১। পিইছেন---পান করিতেছেন।
গ্রন্থের ১১৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ডাকিনু দেবতা-কুলে রক্ষিতে রাঘবে!
আর্ত্তনাদ, সিংহনাদ উঠিল গগনে।
অজ্ঞান হইয়া আমি পড়িনু ভূতলে।
“কত ক্ষণ এ দশায় ছিনু যে, স্বজনি,
নাহি জানি ; জাগাইলা পরশি দাসীরে
রঘুশ্রেষ্ঠ। মৃদু স্বরে, (হায় লো, যেমতি
স্বনে মন্দ সমীরণ কুসুম-কাননে
বসন্তে!) কহিল কান্ত ; ‘উঠ, প্রাণেশ্বরি,
রঘুনন্দনের ধন! রঘু-রাজ-গৃহ-
আনন্দ। এই কি শয্যা সাজে হে তোমারে,
হেমাঙ্গি? ”---সরমা সখি, আর কি শুনিব
সে মধুর ধ্বনি আমি?’---সহসা পড়িলা
মূর্চ্ছিত হইয়া সতী ; ধরিল সরমা!
যথা যবে ঘোর বনে নিষাদ, শুনিয়া
পাখীর ললিত গীত বৃক্ষ-শাখে, হানে
স্বর লক্ষ্য করি শর, বিষম-আঘাতে
ছটফটি পড়ে ভূমে বিহঙ্গী, তেমতি
সহসা পড়িল সতী সরমার কোলে!
কত ক্ষণে চেতন পাইলা সুলোচনা।
কহিলা সরমা কাঁদি ; “ক্ষম দোষ মম,
মৈথিলি! এ ক্লেশ আজি দিনু অকারণে,
হায়, জ্ঞানহীন আমি!” উত্তর করিলা
মৃদু স্বরে সুকেশিনী রাঘব-বাসনা ;---
“কি দোষ তোমার, সখি? শুন মনঃ দিয়া,
কহি পুনঃ পূর্ব্ব-কথা। মারীচ কি ছলে
(মরুভূমে মরীচিকা, ছলয়ে যেমতি!)
১১। হেমাঙ্গি---হে সুবর্ণাঙ্গি।
১৪-১৭। যথা যবে ঘোর বনে ইত্যাদি---পতিবিরহশোকস্বরূপ ব্যাধ অদৃশ্যভাবে মধুর গীতগায়িনী পক্ষিস্বরূপ জানকীকে শরাঘাতে ভূমে পাতিত করিল।
২৬। মরীচিকা---মৃগতৃষ্ণা, সূর্য্যকিরণে জলভ্রম।
গ্রন্থের ১১৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ছলিল, শুনেছ তুমি সূর্পণখা-মুখে।
হায় লো, কুলগ্নে, সখি, মগ্ন লোভ-মদে,
মাগিনু কুরঙ্গে আমি! ধনুর্ব্বাণ ধরি,
বাহিরিলা রঘুপতি, দেবর লক্ষ্মণে
রক্ষা-হেতু রাখি ঘরে। বিদ্যুৎ-আকৃতি
পলাইল মায়া-মৃগ, কানন উজলি,
বারণারি-গতি নাথ ধাইল। পশ্চাতে---
হারানু নয়ন-তারা আমি অভাগিনী!
“সহসা শুনিনু, সখি, আর্ত্তনাদ দূরে---
‘কোথা রে লক্ষ্মণ ভাই, এ বিপত্তি-কালে?
মরি আমি!’ চমকিলা সৌমিত্রি কেশরী !
চমকি ধরিয়া হাত, করিনু মিনতি ;---
‘যাও বীর ; বায়ু-গতি পশ এ কাননে ;
দেখ, কে ডাকিছে তোমা? কাঁদিয়া উঠিল
শুনি এ নিনাদ, প্রাণ! যাও ত্বরা করি---
বুঝি রঘুনাথ তোমা ডাকিছেন, রথি!’
কহিলা সৌমিত্রি ; ‘দেবি, কেমনে পালিব
আজ্ঞা তব? একাকিনী কেমনে রহিবে
এ বিজন বনে তুমি? কত যে মায়াবী
রাক্ষস ভ্রমিছে হেথা, কে পারে কহিতে?
কাহারে ডরাও তুমি? কে পারে হিংসিতে
রঘুবংশ-অবতংসে এ তিন ভুবনে,
ভৃগুরাম-গুরু বলে?’---আবার শুনিনু
আর্ত্তনাদ ; ‘মরি আমি! এ বিপত্তি-কালে,
কোথা রে লক্ষ্মণ ভাই? কোথায় জানকি?’
ধৈরয ধরিতে আর নারিনু, স্বজনি!
২২। অবতংস--অলঙ্কার।
২৩। ভৃগুরাম-গুরু বলে---যিনি পরশুরামকে স্ববলে পরাজয় করিয়াছেন।
গ্রন্থের ১১৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ছাড়ি লক্ষণের হাত, কহিনু কুক্ষণে ;---
‘সুমিত্রা শাশুড়ী মোর বড় দয়াবতী ;
কে বলে ধরিয়াছিলা গর্ভে তিনি তোরে,
নিষ্ঠুর? পাষাণ দিয়া গড়িলা বিধাতা
হিয়া তোর! ঘোর বনে নির্দয় বাঘিনী
জন্ম দিয়া পালে তোরে, বুঝিনু, দুর্ম্মতি!
রে ভীরু, রে বীর-কুল-গ্লানি, যাব আমি,
দেখিব করুণ স্বরে কে স্মরে আমারে
দূর বনে?’ ক্রোধ-ভরে, আরক্ত-নয়নে
বীরমণি, ধরি ধনুঃ, বাঁধিয়া নিমিষে
পৃষ্ঠে তূণ, মোর পানে চাহিয়া কহিল ;---
‘মাতৃ-সম মানি তোমা, জনক-নন্দিনি,
মাতৃ-সম! তেঁই সহি এ বৃথা গঞ্জনা!
যাই আমি ; গৃহমধ্যে থাক সাবধানে।
কে জানে কি ঘটে আজি? নহে দোষ মম ;
তোমার আদেশে আমি ছাড়িনু তোমারে।
এতেক কহিয়া শূর পশিলা কাননে।
“কত যে ভাবিনু আমি বসিয়া বিরলে,
প্রিয়সখি, কহিব তা কি আর তোমারে?
বাড়িতে লাগিল বেলা ; আহ্লাদে নিনাদি,
কুরঙ্গ, বিহঙ্গ-আদি মৃগ-শিশু যত,
সদাব্রত-ফলাহারী, করভ করভী
আসি উতরিল সবে। তা সবার মাঝে
চমকি দেখিনু যোগী, বৈশ্বানর-সম
তেজস্বী, বিভূতি অঙ্গে, কমণ্ডলু করে,
শিরে জটা। হায়, সখি, জানিতাম যদি
১ । কহিনু কুক্ষণে---কেন না, আমি এরূপ গ্লানি না করিলে লক্ষ্মণ আমাকে কখনই ত্যাগ করিয়া যাইতেন না, এবং আমারও এ দুরবস্থা ঘটিত না।
২৪। বৈশ্বানর---অগ্নি।
২৫। কমণ্ডলু---যোগীদের পাত্রবিশেষ।
গ্রন্থের ১১৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ফুল-রাশি মাঝে দুষ্ট কাল-সর্প-বেশে,
বিমল সলিলে বিষ, তা হলে কি কভু
ভূমে লুটাইয়া শিরঃ নমিতাম তারে?
“কহিল মায়াবী ; ‘ভিক্ষা দেহ, রঘুবধূ,
(অন্নদা এ বনে তুমি!) ক্ষুধার্ত্ত অতিথে।’
“আবরি বদন আমি ঘোমটায়, সখি,
কর-পুটে কহিনু, ‘অঞ্জিনাসনে বসি,
বিশ্রাম লভুন প্রভু তরু-মূলে ; অতি-
ত্বরায় আসিবে ফিরি রাঘবেন্দ্র যিনি,
সৌমিত্রি ভ্রাতার সহ।’ কহিল দুর্ম্মতি---
(প্রতারিত রোষ আমি নারিনু বুঝিতে)
‘ক্ষুধার্ত অতিথি আমি, কহিনু তোমারে।
দেহ ভিক্ষা ; নহে কহ, যাই অন্য স্থলে।
অতিথি-সেবায় তুমি বিরত কি আজি,
জানকি? রঘুর বংশে চাহ কি ঢালিতে
এ কলঙ্ক-কালি, তুমি রঘু-বধূ? কহ,
কি গৌরবে অবহেলা কর ব্রহ্ম-শাপে?
দেহ ভিক্ষ ; শাপ দিয়া নহে যাই চলি।
দুরন্ত রাক্ষস এবে সীতাকান্ত-অরি---
মোর শাপে।’ ---লজ্জা ত্যজি, হায় লো স্বজনি,
ভিক্ষা-দ্রব্য লয়ে আমি বাহিরিনু ভয়ে,---
না বুঝে পা দিনু ফাঁদে ; অমনি ধরিল
হাসিয়া ভাসুর তব আমায় তখনি ;
“একদা, বিধুবদনে, রাঘবের সাথে
ভ্রমিতেছিনু কাননে ; দূর গুল্ম-পাশে
চরিতেছিল হরিণী! সহসা শুনিনু
ঘোর নাদ ; ভয়াকুলা দেখিনু চাহিয়া
ইরম্মদাকৃতি বাঘ ধরিল মৃগীরে!
১। ফুলরাশি ইত্যাদি---মৃগশিশু, করভ-করভী এ সকল ফলস্বরূপ। সদাব্রতফলাহারী জন্তুদলের মধ্যে রাবণ কালসর্পবেশী।
১১। প্রতারিত রোষ---রাগচ্ছল, অর্থাৎ কৃত্রিম রাগ।
গ্রন্থের ১১৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
‘রক্ষ, নাথ, বলি আমি পড়িনু চরণে।
শরানলে শূর-শ্রেষ্ঠ ভস্মিলা শার্দ্দুলে
মুহূর্ত্তে। যতনে তুলি বাঁচাইনু আমি
বন-সুন্দরীরে, সখি। রক্ষঃ-কুল-পতি,
সেই শার্দ্দুলের রূপে, ধরিল আমারে!
কিন্তু কেহ না আইল বাঁচাইতে, ধনি,
এ অভাগা হরিণীরে এ বিপত্তি-কালে।
পূরিনু কানন আমি হাহাকার রবে।
শুনিনু ক্রন্দন-ধ্বনি ; বনদেবী বুঝি
দাসীর দশায় মাতা কাতরা, কাঁদিলা!
কিন্তু বৃথা সে ক্রন্দন! হুতাশন-তেজে
গলে লৌহ ; বারি-ধারা দমে কি তাহারে?
অশ্র-বিন্দু মানে কি লো কঠিন যে হিয়া?
“দূরে গেল জটাজুট ; কমণ্ডলু দূরে!
রাজরথী-বেশে মূঢ় আমায় তুলিল
স্বর্ণরথে। কহিল যে কত দুষ্টমতি,
কভু রোষে গর্জ্জি, কভু সুমধুর স্বরে,
স্মরিলে, শরমে ইচ্ছি মরিতে, সরমা!
“চালাইল রথ রথী। কাল-সর্প-মুখে
কাঁদে যথা ভেকী, আমি কাঁদিনু, সুভগে,
বৃথা! স্বর্ণ-রথ-চক্র, ঘর্ঘরি নির্ঘোষে,
পূরিল কানন-রাজী, হায়, ডুবাইয়া
অভাগীর আর্ত্তনাদ! প্রভঞ্জন-বলে
ত্রস্ত তরুকুল যবে নড়ে মড়মড়ে,
কে পায় শুনিতে যদি কুহরে কপোতী?
৯। শুনিনু ক্রন্দন-ধ্বনি---আপনার ক্রন্দনধ্বনির প্রতিধ্বনি শুনিয়া দেবী ভাবিলেন, যেন বনদেৰী ইত্যাদি।
১১-১২। হুতাশন-তেজে ইত্যাদি---যাহার কঠিন হৃদয়, সে পরাক্রমে যেরূপ শান্ত হয়, করুণ বাক্যে তাদৃশ হয় না। যেমন অতি কঠিন বস্তু লৌহ অগ্নিসংযোগে গলিয়া থাকে, @@ তাহার কি করিতে পারে।
@@ --- অপাঠ্য অক্ষর।
গ্রন্থের ১২০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ফাঁফর হইয়া, সখি, খুলিনু সত্বরে
কঙ্কণ, বলয়, হার, সিঁথি, কণ্ঠমালা,
কুণ্ডল, নূপুর, কাঞ্চী ; ছড়াইনু পথে ;
তেঁই লো এ পোড়া দেহে নাহি, রক্ষোবধূ,
আভরণ। বৃথা তুমি গঞ্জ দশাননে।”
নীরবিলা শশিমুখী। কহিলা সরমা,---
“এখনও তৃষাতুরা এ দাসী, মৈথিলি ;
দেহ সুধা-দান তারে" সফল করিলা
শ্রবণ-কুহর আজি আমার!” সুস্বরে
পুনঃ আরম্ভিলা তবে ইন্দু-নিভাননা ;---
“শুনিতে লালসা যদি, শুন লো ললনে।
বৈদেহীর দুঃখ-কথা কে আর শুনিবে?
“আনন্দে নিষাদ যথা ধরি ফাঁদে পাখী
যায় ঘরে, চালাইল রথ লঙ্কাপতি ;
হায় লো, সে পাখী যথা কাঁদে ছটফটি
ভাঙিতে শৃঙ্খল তার, কাঁদিনু, সুন্দরি!
“হে আকাশ, শুনিয়াছি তুমি শব্দবহ,
(আরাধিনু মনে মনে) এ দাসীর দশা
ঘোর রবে কহ যথা রঘু-চূড়া-মণি,
দেবর লক্ষ্মণ মোর, ভূবন-বিজয়ী !
হে সমীর, গন্ধবহ তুমি ; দৃত-পদে
বরিনু তোমায় আমি, যাও ত্বরাকরি
যথায় ভ্রমেন প্রভু! হে বারিদ, তুমি
ভীমনাদী, ডাক নাথে গম্ভীর নিনাদে!
হে ভ্রমর মধুলোভি, ছাড়ি ফুল-কুলে
গুঞ্জর নিকুঞ্জে, যথা রাঘবেন্দ্র বলী,
সীতার বারতা তুমি ; গাও পঞ্চ স্বরে
সীতার দুঃখের গীত, তুমি মধু-সখা
২৬। গুঞ্জর---গুঞ্জনধ্বনি করিয়া কহ।
গ্রন্থের ১২১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কোকিল! শুনিবে প্রভু তুমি হে গাইলে’
এইরূপে বিলাপিনু, কেহ না শুনিল।
“চলিল কনক-রথ ; এড়াইয়া দ্রুতে
অভ্রভেদী গিরি-চূড়া, বন, নদ, নদী,
নানা দেশ। স্বনয়নে দেখেছ, সরমা,
পুষ্পকের গতি তুমি ; কি কাজ বর্ণিয়া?
“কত ক্ষণে সিংহনাদ শুনিনু সম্মুখে
ভয়ঙ্কর! থরথরি আতঙ্কে কাঁপিল
বাজী-রাজি, স্বর্ণরথ চলিল অস্থিরে!
দেখিনু, মিলিয়া আঁখি, ভৈরব-মূরতি
গিরি-পৃষ্ঠে বীর, যেন প্রলয়ের কালে
কালমেঘ! ‘চিনি তোরে’, কহিলা গম্ভীরে
বীর-বর, ‘চোর তুই, লঙ্কার রাবণ।
কোন্ কুলবধূ আজি হরিলি, দুর্ম্মতি?
কার ঘর আঁধারিলি, নিবাইয়া এবে
প্রেম-দীপ? এই তোর নিত্য কর্ম্ম, জানি।
অস্ত্রী-দল-অপবাদ ঘুচাইব আজি
বধি তোরে তীক্ষ শরে! আয় মূঢমতি!
ধিক্ তোরে রক্ষোরাজ! নির্লজ্জ পামর
আছে কি রে তোর সম এ ব্রহ্ম-মণ্ডলে?’
“এতেক কহিয়া, সখি, গর্জ্জিলা শূরেন্দ্র!
অচেতন হয়ে আমি পড়িনু স্যন্দনে!
“পাইয়া চেতন পুনঃ দেখিনু রয়েছি
ভূতলে। গগন-মার্গে রথে রক্ষোরথী
যুঝিছে সে বীর-সঙ্গে হুহুঙ্কার-নাদে।
অবলা-রসনা, ধনি, পারে কি বর্ণিতে
সে রণে? সভয়ে আমি মুদিনু নয়ন!
সাধিনু দেবতা-কুলে, কাঁদিয়া কাঁদিয়া,
৪। অভ্রভেদী---মেঘস্পর্শী, উচ্চতম।
৬। পুষ্পক---রাবণের রথ।
৯। অস্থিরে---অস্থির ভাবে।
২২। স্যন্দন---রথ।
গ্রন্থের ১২২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
সে বীরের পক্ষ হয়ে নাশিতে রাক্ষসে,
অরি মোর ; উদ্ধারিতে বিষম সঙ্কটে
দাসীরে! উঠিনু ভারি পশিব বিপিনে,
পলাইব দূর দেশে। হায় লো, পড়িনু,
আছাড় খাইয়া, যেন ঘোর ভূকম্পনে!
আরাধিনু বসুধারে---‘এ বিজন দেশে,
মা আমার, হয়ে দ্বিধা, ভব বক্ষঃস্থলে
লহ অভাগীরে, সাধ্বি! কেমনে সহিছ
দুঃখিনী মেয়ের জালা? এস শীঘ্র করি!
ফিরিয়া আসিবে দুষ্ট ; হায়, মা, যেমতি
তস্কর আইসে ফিরি, ঘোর নিশাকালে,
পুঁতি যথা রত্ন-রাশি রাখে সে গোপনে---
পর-ধন! আসি মোরে তরাও, জননি!’
“বাজিল তুমুল যুদ্ধ গগনে, সুন্দরি ;
কাঁপিল বসুধা ; দেশ পূরিল আরবে!
অচেতন হৈনু পুনঃ। শুন, লো ললনে,
মনঃ দিয়া শুন, সই, অপূর্ব্ব কাহিনী।---
দেখিনু স্বপনে আমি বসুন্ধরা সতী
মা আমার! দাসী-পাশে আসি দয়াময়ী
কহিলা, লইয়া কোলে, সুমধুর বাণী ;---
‘বিধির ইচ্ছায়, বাছা, হরিছে গো তোরে
রক্ষোরাজ ; তোর হেতু সবংশে মজিবে
অধম! এ ভার আমি সহিতে না পারি,
ধরিনু গো গর্ভে তোরে লঙ্কা বিনাশিতে!
যে কুক্ষণে তোর তনু ছুঁইল দুর্ম্মতি
রাবণ, জানিনু আমি, সুপ্রসন্ন বিধি
এত দিনে মোর প্রতি ; আশীষিনু তোরে
জননীর জ্বালা দূর করিলি, মৈথিলি!---
১০-১১। হায় মা, যেমতি ইত্যাদি---যেরূপ তস্কর অর্থাৎ চোর নিহিত ধন লইব নিমিত্ত গুপ্ত স্থলে গোপনভাবে আইসে, সেইরূপ রাবণ আমার নিকট আবার আসিবেক।
গ্রন্থের ১২৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ভবিতব্য-দ্বার আমি খুলি, দেখ চেয়ে।’
“দেখিনু সম্মুখে, সখি, অভ্রভেদী গিরি ;
পঞ্চ জন বীর তথা নিমগ্ন সকলে
দুঃখের সলিলে যেন! হেন কালে আসি
উতরিলা রঘুপতি লক্ষ্মণের সাথে।
বিরস-বদন নাথে হেরি, লো স্বজনি,
উতলা হইনু কত, কত যে কাঁদিনু,
কি আর কহিব তার? বীর পঞ্চ জনে
পূজিল রাঘব-রাজে, পূজিল অনুজে।
একত্রে পশিলা সবে সুন্দর নগরে।
“মারি সে দেশের রাজা তুমুল সংগ্রামে
রঘুবীর, বসাইলা রাজ-সিংহাসনে
শ্রেষ্ঠ যে পুরুষ-বর পঞ্চ জন মাঝে।
ধাইল চৌদিকে দূত ; আইলা ধাইয়া
লক্ষ লক্ষ বীর-সিংহ ঘোর কোলাহলে।
কাঁপিল বসুধা, সখি, বীর-পদ-ভরে!
সভয়ে মুদিনু আঁখি! কহিলা হাসিয়া
মা আমার, ‘কারে ভয় করিস্, জানকি?
সাজিছে সুগ্রীব রাজা উদ্ধারিতে তোরে,
মিএ্রবর। বধিল যে শূরে তোর স্বামী,
বালি নাম ধরে রাজা বিখ্যাত জগতে।
কিষ্কিন্ধ্যা নগর ওই। ইন্দ্র-তুল্য বলী-
বৃন্দ চেয়ে দেখ্ সাজে।’ দেখিনু চাহিয়া,
চলিছে বীরেন্দ্র-দল জল-স্রোতঃ যথা
বরিষায়, হুহুঙ্কারি! ঘোর মড়মড়ে
ভাঙিল নিবিড় বন ; শুখাইল নন্দী ;
ভয়াকুল বন-জীব পলাইল দূরে ;
পূরিল জগত, সখি, গন্তীর নির্ঘোষে।
৩। পঞ্চ জন বীর---সুগ্রীব হনূমান প্রভৃতি।
১১। সে দেশের রাজা---অর্থাৎ বালি।
গ্রন্থের ১২৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
উতরিলা সৈন্য-দল সাগরের তীরে।
দেখিনু, সরমা সখি, ভাসিল সলিল
শিলা! শৃঙ্গধরে ধরি, ভীম পরাক্রমে
উপাড়ি, ফেলিল জলে বীর শত শত।
বাঁধিল অপূর্ব্ব সেতু শিল্পিকুল মিলি।
আপনি বারীশ পাশী, প্রভুর আদেশে,
পরিলা শৃঙ্খল পায়ে! অলঙ্ঘ্য সাগরে
লঙ্ঘি, বীর-মদে পার হইল কটক।
টলিল এ স্বর্ণ-পুরী বৈরী-পদ-চাপে,---
‘জয়, রঘুপতি, জয়!’ ধ্বনিল সকলে!
কাঁদিনু হরষে, সখি ! সুবর্ণ-মন্দিরে
দেখিনু সুবর্ণাসনে রক্ষঃ-কুল-পতি।
আছিল সে সভাতলে ধীর ধর্ম্মসম
বীর এক ; কহিল সে, ‘পূজ রঘুবরে,
বৈদেহীরে দেহ ফিরি ; নতুবা মরিবে
সবংশে!’ সংসার-মদে মত্ত রাঘবারি,
পদাঘাত করি তারে কহিল কুবাণী।
অভিমানে গেল। চলি সে বীর-কুঞ্জর
যথা প্রাণনাথ মোর।”---কহিল সরমা,
“হে দেবি, তোমার দুঃখে কত যে দুঃখিত
রক্ষোরাজানুজ বলী, কি আর কহিব?
দুজনে আমরা, সতি, কত যে কেঁদেছি
ভাবিয়া তোমার কথা, কে পারে কহিতে?”
“জানি আমি,” উত্তরিলা মৈথিলী রূপসী,---
“জানি আমি বিভীষণ উপকারী মম
পরম! সরমা সুখি, তুমিও তেমনি!
আছে যে বাঁচিয়া হেথা অভাগিনী সীতা,
সে কেবল, দয়াবতি, তব দয়া-গুণে!
১৩-১৪। ধীর ধর্ম্মসম বীর এক---এ স্থলে.সরমার পতি বিভীষণ।
গ্রন্থের ১২৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কিন্তু কহি, শুন মোর অপূর্ব্ব স্বপন!---
"সাজিল রাক্ষস-বৃন্দ যুঝিবার আশে ;
বাজিল রাক্ষস-বাদ্য ; উঠিল গগনে
নিনাদ। কাঁপিনু, সখি, দেখি বীর-দলে,
তেজে হুতাসন-সম, বিক্রমে কেশরী।
কত যে হইল রণ, কহিব কেমনে?
বহিল শোণিত-নদী! পর্ব্বত-আকারে
দেখিনু শবের রাশি, মহাভয়ঙ্কর।
আইল কবন্ধ, ভূত, পিশাচ, দানব,
শকুনি, গৃধিনী আদি যত মাংসাহারী
বিহঙ্গম ; পালে পালে শৃগাল ; আইল
অসংখ্য কুকুর। লঙ্কা পূরিল ভৈরবে।
“দেখিনু কর্ব্বুর-নাথে পুনঃ সভাতলে,
মলিন বদন এবে, অশ্রুময় আঁখি,
শোকাকুল! ঘোর বণে রাঘব-বিক্রমে
লাঘব-গরব, সই! কহিল বিষাদে
রক্ষোরাজ, “হায়, বিধি, এই কি রে ছিল
তোর মনে? যাও সবে, জাগাও যতনে
শূলী-শম্ভূ-সম ভাই কুম্ভকর্ণে মম।
কে রাখিবে রক্ষঃ-কুলে সে যদি না পারে?
ধাইল রাক্ষস-দল ; বাজিল বাজনা
ঘোর রোলে ; নারী-দল দিল হুলাহুলি।
বিরাট্-মূরতি-ধর পশিল কটকে
রক্ষোরথী। প্রভু মোর, তীক্ষতর শরে,
(হেন বিচক্ষণ শিক্ষা কার লো জগতে?)
কাটিলা তাহার শিরঃ! মরিল অকালে
জাগি সে দুরন্ত শূর। জয় রাম ধ্বনি
শুনিনু হরে, সই! কাঁদিল রাবণ!
১। কবন্ধ---মস্তকরহিত দেহ।
২৪। রক্ষোরথী---কুম্ভকর্ণ।
গ্রন্থের ১২৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কাঁদিল কনক-লঙ্কা হাহাকার রবে!
“চঞ্চল হইনু, সখি, শুনিয়া চৌদিকে
ক্রন্দন! কহিনু মায়ে, ধরি পা দুখানি,
‘রক্ষঃ-কুল-দুঃখে বুক ফাটে, মা, আমার!
পরেরে কাতর দেখি সতত কাতরা
এ দাসী ; ক্ষম, মা, মোরে!’ হাসিয়া কহিলা
বসুধা, 'লো রঘুবধূ, সত্য যা দেখিলি!
লণ্ডভণ্ড করি লঙ্কা দণ্ডিবে রাবণে
পতি তোর। দেখ পুনঃ নয়ন মেলিয়া॥
“দেখিনু, সরমা সখি, সুর-বালা-দলে,
নানা আভরণ হাতে, মন্দারের মালা,
পট্টবস্ত্র। হাসি তারা বেড়িল আমারে।
কেহ কহে, ‘উঠ, সতি, হত এত দিনে
দুরন্ত রাবণ রণে!’ কেহ কহে, ‘উঠ,
রঘুনন্দনের ধন, উঠ, ত্বরা করি,
অবগাহ দেহ, দেবি, সুবাসিত জলে,
পর নানা আভরণ। দেবেন্দ্রাণী শচী
দিবেন সীতায় দান আজি সীতানাথে!’
“কহিনু, সরমা সখি, করপুটে আমি ;
‘কি কাজ, হে সুরবালা, এ বেশ ভূষণে
দাসীর? যাইব আমি যথা কান্ত মম,
এ দশায়, দেহ আজ্ঞা ; কাঙ্গালিনী সীতা,
কাঙ্গালিনী-বেশে তারে দেখুন নৃমণি।’
“উত্তরিলা সুরবালা ; শুন লো মৈথিলি!
সমল খনির গর্ভে মণি ; কিন্তু তারে
পরিষ্কারি রাজ-হস্তে দান করে দাতা!’
“কাঁদিয়া, হাসিয়া, সই, সাজিনু সত্বরে।
হেরিনু অদূরে নাথে, হায় লো, যেমতি
২৬। পরিষ্কারি---পরিষ্কার করিয়া।
গ্রন্থের ১২৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কনক-উদয়াচলে দেব অংশুমালী!
পাগলিনী প্রায় আমি ধাইনু ধরিতে
পদযুগ, সুবদনে!---জাগিনু অমনি!---
সহসা, স্বজনি, যথা নিবিলে দেউটি,
ঘোর অন্ধকার ঘর ; ঘটিল সে দশা
আমার,---আঁধার বিশ্ব দেখিনু চৌদিকে!
হে বিধি, কেন না আমি মরিনু তখনি?
কি সাধে এ পোডা প্রাণ রহিল এ দেহে?”
নীরবিলা বিধুমুখী, নীরবে যেমতি
বীণা, ছিঁড়ে তার যদি! কাঁদিয়া সরমা
(রক্ষঃ-কুল-রাজ-লক্ষ্মী রক্ষোবধূ-রূপে)
কহিলা ; “পাইবে নাথে, জনক-নন্দিনি!
সত্য এ স্বপন তব, কহিনু তোমারে!
ভাসিছে সলিলে শিলা, পড়েছে সংগ্রামে
দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস কুম্ভকর্ণ বলী ;
সেবিছেন বিভীষণ জিষ্ণু রঘুনাথে
লক্ষ লক্ষ বীর সহ। মরিবে পৌলস্ত্য
যথোচিত শাস্তি পাই ; মজিবে দুর্ম্মতি
সবংশে! এখন কহ, কি ঘটিল পরে।
অসীম লালসা মোর শুনিতে কাহিনী।”
আরম্ভিলা পুনঃ সতী সুমধুর স্বরে ;---
রাবণে ; ভূতলে, হায়, সে বীর-কেশরী,
তুঙ্গ শৈল-শৃঙ্গ যেন চূর্ণ বজ্রাঘাতে!
“কহিল রাঘব-রিপু ; 'ইন্দীবর আঁখি
উন্মীলি, দেখ লো চেয়ে, ইন্দু-নিভাননে,
রাবণের পরাক্রম! জগত-বিখ্যাত
জটায়ু হীনায়ু আজি মোর ভুজ-বলে!
নিজ দোষে মরে মূঢ় গরুড়-নন্দন!
১৬। জিষ্ণু---জয়শীল।
১৭। পৌলস্ত্য---পুলস্ত্যনন্দন রাবণ।
গ্রন্থের ১২৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কে কহিল মোর সাথে যুঝিতে বর্ব্বরে?
“ ‘ধর্ম্ম-কর্ম্ম সাধিবারে মরিনু সংগ্রামে,
রাবণ' ;---কহিলা শূর অতি মৃদু স্বরে
'সম্মুখ সমরে পড়ি যাই দেবালয়ে।
কি দশা ঘটিবে তোর, দেখ রে ভাবিয়া?
শৃগাল হইয়া, লোভি, লোভিলি সিংহীরে!
কে তোরে রক্ষিবে, রক্ষঃ? পড়িলি সঙ্কটে,
লঙ্কানাথ, করি চুরি এ নারী-রতনে!’
“এতেক কহিয়া বীর নীরব হইলা!
তুলিল আমায় পুনঃ রথে লঙ্কাপতি।
কৃতাঞ্জলি-পুটে কাঁদি কহিমু, স্বজনি,
বীরবরে ; সীতা নাম, জনক-দুহিতা,
রঘুবধূ দাসী, দেব! শুন্য ঘরে পেয়ে
আমায়, হরিছে পাপী ; কহিও এ কথা
দেখা যদি হয়, প্রভু, রাঘবের সাথে
উঠিল গগনে রথ গম্ভীর নির্ঘোষে।
শুনিনু ভৈরব রব ; দেখিনু সম্মুখে
সাগর নীলোর্ম্মিময়! বহিছে কল্পোলে
অতল, অকুল জল, অবিরাম-গতি।
ঝাঁপ দিয়া জলে, সখি, চাহিনু ডুবিতে ;
নিবারিল দুষ্ট মোরে! ডাকিনু বারীশে,
জলচরে মনে মনে, কেহ না শুনিল,
অবহেলি অভাগীরে! অনম্বর-পথে
চলিল কনক-রথ মনোরথ-গতি।
“অবিলম্বে লঙ্কাপুরী শোভিল সম্মুখে।
সাগরের ভালে, সখি, এ কনক-পুরী
রঞ্জনের রেখা! কিন্তু কারাগার যদি
সুবর্ণ-গঠিত, তবু বন্দীর নয়নে
১৮। নীলোর্ম্মিময়---নীলবর্ণ তরঙ্গপরিপূর্ণ।
২৩। অনম্বর-পথে---আকাশপথে।
২৭। রঞ্জন---রক্তচন্দন, কেন না, লঙ্কা সুবর্ণগঠিত।
গ্রন্থের ১২৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
কমনীয় কভু কি লো শোভে তার আভা?
সুবর্ণ-পিঞ্জর বলি হয় কি লো সুখী
সে পিঞ্জরে বদ্ধ পাখী? দুঃখিনী সতত
যে পিঞ্জরে রাখ তুমি কুঞ্জ-বিহারিণী!
কুক্ষণে জনম মম, সরমা সুন্দরি!
কে কবে শুনেছে, সখি, কহ, হেন কথা?
রাজার নন্দিনী আমি, রাজ-কুল-বধূ,
তবু বদ্ধ কারাগারে!”---কাঁদিলা রূপসী,
সরমার গলা ধরি ; কাঁদিলা সরমা।
কত ক্ষণে চক্ষুঃ-জল মুছি সুলোচনা
সরমা কহিলা ; “দেবি, কে পারে খণ্ডিতে
বিধির নির্ব্বন্ধ? কিন্তু সত্য যা কহিলা
বসুধা। বিধির ইচ্ছা, তেঁই লঙ্কাপতি
আনিয়াছে হরি তোমা! সবংশে মরিবে
দুষ্টমতি! বীর আর কে আছে এ পুরে
বীরযোনি? কোথা, সতি, ত্রিভুবন-জয়ী
যোধ যত? দেখ চেয়ে, সাগরের কূলে,
শবাহারী জন্তু-পুঞ্জ ভূঞ্জিছে উল্লাসে
শব-রাশি! কান দিয়া শুন, ঘরে ঘরে
কাঁদিছে বিধবা বধু! আশু পোহাইবে
এ দুঃখ-শর্ব্বরী তব! ফলিবে, কহিনু,
স্বপ্ন! বিদ্যাধরী-দল মন্দারের দামে
ও বরাঙ্গ রঙ্গে আসি আশু সাজাইবে!
ভেটিবে রাঘবে তুমি, বসুধা কামিনী
সরস বসন্তে যথা ভেটেন মধুরে!
১। কমনীয়---মনোহর, নয়মানন্দদায়ক।
১৫-১৬। এ পুরে বীরযোনি---বীরপুত্র-জন্মদায়িনী-স্বরূপ লঙ্কাপুরে, অর্থাৎ যেখানে বার জন্মায়।
২২। মন্দারের দামে---পারিজাতপুষ্পের মালায়।
২৪-২৫। বসুধা কামিনী ইত্যাদি---বসন্তে পৃথিবী বহুবিধ পুষ্পরূপ ভূষণে ভূষিতা হয়েন ইত্যাদি।
গ্রন্থের ১৩০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ
ভুলো না দাসীরে, সাধ্বি! যত দিন বাঁচি,
এ মনোমনদিরে রাখি, আনন্দে পূজিব
ও প্রতিমা, নিত্য যথা, আইলে রজনী,
সরসী হরষে পূজে কৌমুদিনী-ধনে।
বহু ক্লেশ, সুকেশিনি, পাইলে এ দেশে।
কিন্তু নহে দোষী দাসী!” কহিলা সুস্বরে
মৈথিলী ; “সরমা সখি, মম হিতৈষিণী
তোমা সম আর কি লো আছে এ জগতে?
মরুভূমে প্রবাহিণী মোর পক্ষে তুমি,
রক্ষোবধূ! সুশীতল ছায়া-রূপ ধরি,
তপন-তাপিত আমি, জুড়ালে আমারে!
মূর্ত্তিমতী দয়া তুমি এ নির্দ্দয় দেশে!
এ পঙ্কিল জলে পদ্ম! ভূজঙ্গিনী-রূপী
এ কাল কনক-লঙ্কা-শিরে শিরোমণি।
আর কি কহিব, সখি? কাঙ্গালিনী সীতা,
তুমি লো মহার্হ রত্ন! দরিদ্র, পাইলে
রতন, কভু কি তারে অযতনে, ধনি?”
নমিয়া সতীর পদে, কহিলা সরমা ;
“বিদায় দাসীরে এবে দেহ, দয়াময়ি!
না চাহে পরাণ মম ছাড়িতে তোমারে,
রঘু-কুল-কমলিনি! কিন্তু প্রাণপতি
আমার, রাঘব-দাস ; তোমার চরণে
আসি কথা কই আমি, এ কথা শুনিলে
রুষিবে লঙ্কার নাথ, পড়িব সঙ্কটে!”
কহিলা মৈথিলী ; “সখি, যাও ত্বরা করি,
নিজালয়ে ; শুনি আমি দূর পদ্-ধ্বনি ;
ফিরি বুঝি চেড়ীদল আসিছে এ বনে।”
আতঙ্কে কুরঙ্গী যথা, গেলা দ্রুতগামী
সরমা ; রহিলা দেবী সে বিজন বনে,
একটি কুসুম মাত্র অরণ্যে যেমতি।
ইতি শ্রীমেঘনাদবধে কাব্যে অশোকবনং নাম
চতুর্থঃ সর্গঃ।
৩। ও প্রতিমা---তোমার মূর্ত্তি।
২১--২২। প্রাণপতি আমার---বিভীষণ।
২৯। সে বিজন বনে---অর্থাৎ জনশূন্য অশোকবনে।
মিলনসাগরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর সম্পূর্ণ মেঘনাদবধ কাব্যের বিভিন্ন সর্গ পড়তে নীচের সূচীতে ক্লিক করুন...
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম