কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর মেঘনাদবধ কাব্য
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
মিলনসাগরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর মেঘনাদবধ কাব্যের সূচী...
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম
কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এর পরিচিতির পাতায় . . .
মেঘনাদবধ কাব্য অষ্টম সর্গ
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রথম প্রকাশ ১৮৬১।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে রামকমল সিংহ দ্বারা প্রকাশিত, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবি সজনীকান্ত দাস দ্বারা মূলতঃ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ সংস্করণ থেকে গৃহীত ও সম্পাদিত এবং ১২৭৪ বঙ্গাব্দে (১৮৬৭ সালে) প্রকাশিত, কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-কৃত টীকা ও ব্যাখ্যা সহ।
মিলনসাগরে প্রকাশ ২১শে ফেব্রুয়ারী ২০২৬।

গ্রন্থের ২১১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

অষ্টম সর্গ
(প্রেতপুরী নাম)

রাজকাজ সাধি যথা, বিরাম মন্দিরে,
প্রবেশি, রাজেন্দ্র খুলি রাখেন যতনে
কিরীট ; রাখিলা খুলি অস্তাচলচূড়ে
দিনান্তে শিরের রত্ন তমোহা মিহিরে
দিনদেব ; তারাদলে আইলা রজনী ;
আইলা রজনীকান্ত শান্ত সুধানিধি।
 শত শত অগ্নিরাশি জ্বলিল চৌদিকে
রণক্ষেত্রে। ভূপতিত যথায় সুরথী
সৌমিত্রি, বৈদেহীনাথ ভূপতিত তথা
নীরবে! নয়নজল, আবিরল বহি,
ভ্রাতৃলোহ সহ মিশি, তিতিছে মহীরে,
গিরিদেহে বহি যথা, মিশ্রিত গৈরিকে,
পড়ে তলে প্রস্রবণ! শূন্যমনাঃ খেদে
রঘুসৈন্য ;---বিভীষণ বিভীষণ রণে।
কুমুদ, অঙ্গদ, হনূ, নল, নীল বলী,
শরভ, সুমালী, বীরকেশরী .সুবাহু,
সুগ্রীব, বিষণ্ণ সবে প্রভুর বিষাদে!
 চেতন পাইয়া নাথ কহিলা কাতরে ;---
“রাজ্য ত্যজি, বনবাসে নিবাসিনু যবে,
লক্ষ্মণ, কুটীরদ্বারে, আইলে যামিনী,
ধনুঃ করে হে সুধন্বি, জাগিতে সতত
রক্ষিতে আমায় তুমি ; আজি রক্ষঃপুরে---
আজি এই রক্ষঃপুরে অরি মাঝে আমি,
বিপদ্-সলিলে মগ্ন ; তবুও ভুলিয়া
আমায়, হে মহাবাহু, লভিছ ভূতলে

১। বিরাম মন্দিরে---বিশ্রামগৃহে।
৪। তমোহা---অন্ধকারনাশক। মিহির---সূর্য্য।
১২। গৈরিক---ধাতুবিশেষ।
১৩। প্রস্রবণ---ঝরণা!

গ্রন্থের ২১২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

বিরাম? রাখিবে আজি কে, কহ, আমারে?
উঠ, বলি! কবে তুমি বিরত পালিতে
ভ্রাতৃ-আজ্ঞা? তবে যদি মম ভাগ্যদোষে---
চিরভাগ্যহীন আমি-ত্যজিলা আমারে,
প্রাণাধিক, কহ, শুনি, কোন্‌ অপরাধে
অপরাধী তব কাছে অভাগী জানকী?
দেবর লক্ষ্মণে স্মরি রক্ষঃকারাগারে
কাঁদিছে সে দিবানিশি! কেমনে ভুলিলে---
হে ভাই, কেমনে তুমি ভুলিলে হে আজি
মাতৃসম নিত্য যারে সেবিতে আদরে!
হে রাঘবকুলচূড়া, তব কুলবধুঃ,
রাখে বাঁধি পৌলস্তেয়? না শাস্তি সংগ্রামে
হেন দুষ্টমতি চোরে উচিত কি তব
এ শয়ন---বীরবীর্য্য সর্ব্বভুক্ সম
দুর্ব্বার সংগ্রামে তুমি? উঠ, ভীমবাহু,
রঘুকুলজয়কেতু! অসহায় আমি
তোমা বিনা, যথা রথী শূন্যচক্র রথে!
তোমার শয়নে হনূ বলহীন, বলি,
গুণহীন ধনুঃ যথা ; বিলাপে বিষাদে
অঙ্গদ ; বিষণ্ণ মিতা সুগ্রীব সুমতি,
অধীর কর্ব্বুরোত্তম বিভীষণ রথী,
ব্যাকুল এ বলীদল ! উঠ, ত্বরা করি,
জুড়াও নয়ন, ভাই, নয়ন উন্মীলি!
 “কিন্তু ক্লান্ত যদি তুমি এ দুরন্ত রণে,
ধনুর্দ্ধর, চল ফিরি যাই বনবাসে।
নাহি কাজ, প্রিয়তম, সীতায় উদ্ধারি,---

১২। পৌলস্তেয়---পুলস্তনন্দন রাবণ।
১৪। সর্ব্বভুক্ সম---অগ্নিতুল্য।
১৫। দুর্ব্বার---যাহাকে দুঃখে নিবারণ করা যায়।
১৯। বিলাপে---বিলাপ করে!
২১। কর্ব্বুরোত্তম---রাক্ষসশ্রেষ্ঠ।
২৩। উন্মীলি---উন্মীলন করিয়া অর্থাৎ প্রকাশিয়া, চাহিয়া।

গ্রন্থের ২১৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

অভাগিনী! নাহি কাজ বিনাশি রাক্ষসে।
তনয়-বৎসলা যথা সুমিত্রা জননী
কাঁদেন সরযূতীরে, কেমনে দেখাব
এ মুখ, লক্ষ্মণ, আমি, তুমি না ফিরিলে
সঙ্গে মোর? কি কহিব, সুধিবেন যবে
মাতা, ‘কোথা, রামভদ্র, নয়নের মণি
আমার, অনুজ তোর? কি বলে বুঝাব
উর্ম্মিলা বধূরে আমি, পুরবাসী জনে?
উঠ, বৎস! আজি কেন বিমুখ হে তুমি
সে ভ্রাতার অনুরোধে, যার প্রেমবশে,
রাজ্যভোগ ত্যজি তুমি পশিলা কাননে।
সমদুঃখে সদা তুমি কাঁদিতে হেরিলে
অশ্রুময় এ নয়ন ; মুছিতে যতনে
অশ্রধারা ; তিতি এবে নয়নের জলে
আমি, তবু নাহি তুমি চাহ মোর পানে,
প্রাণাধিক? হে লক্ষ্মণ, এ আচার কভু
(সুভ্রাতৃবৎসল তুমি বিদিত জগতে!)
সাজে কি তোমারে, ভাই, চিরানন্দ তুমি
আমার! আজন্ম আমি ধর্ম্মে লক্ষ্য করি,
পূজিনু দেবতাকুলে,---দিলা কি দেবতা
এই ফল? হে রজনি, দয়াময়ী তুমি
শিশির-আসারে নিত্য সরস কুসুমে,
নিদাঘার্ত ; প্রাণদান দেহ এ প্রসূনে!
সুধানিধি তুমি, দেব সুধাংশু ; বিতর
জীবনদায়িনী সুধা, বাঁচাও লক্ষ্মণে---
বাঁচাও, করুণাময়, ভিখারী রাঘবে।”

১। অভাগিনী---ইহা সীতার বিশেষণ। রামের সীতাকে অভাগিনী বলিবার তাৎপর্য্য এই যে, সীতার নিমিত্তেই লক্ষ্মণের এতাদৃশী দুরবস্থা ঘটিয়াছে।
২২। সরস---সরস করিয়া থাক।
২৩। এ প্রসূনে---লক্ষ্মণরূপ পুষ্পে।
২৪। বিতর---বিতরণ অর্থাৎ দান কর।

গ্রন্থের ২১৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

এইরূপে বিলাপিলা রক্ষঃকুলরিপু
রণক্ষেত্রে, কোলে করি প্রিয়তমানুজে ;
উচ্ছ্বাসিলা বীরবৃন্দ বিষাদে চৌদিকে,
মহীরুহব্যূহ যথা উচ্ছ্বাসে নিশীথে,
বহে যবে সমীরণ গহন বিপিনে।
 নিরানন্দ শৈলসুতা কৈলাস-আলয়ে
রঘুনন্দনের দুঃখে ; উৎসঙ্গ-প্রদেশে।
ধূর্জ্জটির পাদপদ্মে পড়িছে সঘনে
অশ্রুবারি, শতদলে শিশির যেমতি
প্রত্যূষে! সুধিলা প্রভু, “কি হেতু, সুন্দরি,
কাতরা তুমি হে আজি, কহ তা আমারে?”
“কি না তুমি জান, দেব?” উত্তরিলা দেবী
গৌরী ; “লক্ষণের শোকে, স্বর্ণলঙ্কাপুরে,
আক্ষেপিছে রামচন্দ্র, শুন, সকরুণে।
অধীর হৃাদয় মম রামের বিলাপে!
কে আর, হে বিশ্বনাথ, পূজিবে দাসীরে
এ বিশ্বে? বিষম লজ্জা দিলে, নাথ, আজি
আমায় ; ডুবালে নাম কলঙ্কসলিলে।
তপোভঙ্গ দোষে দাসী দোষী তব পদে,
তাপসেন্দ্র ; তেঁই বুঝি, দণ্ডিলা এরূপে?
কুক্ষণে আইল ইন্দ্র আমার নিকটে!
কুক্ষণে মৈথিলীপতি পূজিল আমারে!”
 নীরবিলা মহাদেবী কাঁদি অভিমানে।
হাসি উত্তরিলা শম্ভু, “এ অল্প বিষয়ে,
কেন নিরানন্দ তুমি, নগেন্দ্রনন্দিনি?
প্রের রাঘবেন্দ্র শূরে কৃতান্তনগরে

৪। নিশীথ---অর্দ্ধরাত্র।
৬। শৈলসুতা---গিরিবালা।‌
৭। উৎসঙ্গ-প্রদেশে---ক্রোড়দেশে অর্থাৎ কোলে।
৮। ধূর্জ্জটি---মহাদেব। সঘনে---ক্রমাগত, নিরন্তর, ঘন ঘন।
১৪। আক্ষেপিছে---আক্ষেপ করিতেছে।
২৬। কৃতান্তনগরে---যমপুরে।

গ্রন্থের ২১৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

মায়া সহ ; সশরীরে, আমার প্রসাদে,
প্রবেশিবে প্রেতদেশে দাশরথি রথী।
পিতা রাজা দশরথ দিবে তারে কয়ে
কি উপায়ে ভাই তার জীবন লভিবে,
আবার ; এ নিরানন্দ ত্যজ চন্দ্রাননে!
দেহ এ ত্রিশূল মম মায়ায়, সুন্দরি।
তমোময় যমদেশে অগ্নিস্তম্ভ সম
জ্বলি উজ্জ্বলিবে দেশ ; পূজিবে ইহারে
প্রেতকুল ; রাজদণ্ডে প্রজাকুল যথা।”
 কৈলাস-সদনে দুর্গা স্মরিলা মায়ারে।
অবিলম্বে কুহকিনী আসি প্রণমিলা
অম্বিকায় ; মৃদু স্বরে কহিলা পার্ব্বতী ;---
“যাও তুমি লঙ্কাধামে, বিশ্ববিমোহিনি।
কাঁদিছে মৈথিলীপতি, সৌমিত্রির শোকে।
আকুল ; সম্বোধি তারে সুমধুর ভাষে,
লহ-সঙ্গে প্রেতপুরে ; দশরথ পিতা
আদেশিবে কি উপায়ে লভিবে সুমতি
সৌমিত্রি জীবন পুনঃ, আর যোধ যত,
হত এ নশ্বর রণে। ধর পদ্মকরে
ত্রিশূলীর শূল, সতি। অগ্নিস্তম্ভ সম
তমোময় যমদেশে জ্বলি উজ্জ্বলিবে
অস্ত্রবর।” প্রণমিয়া উমায় চলিলা
মায়া। ছায়াপথে ছায়া পালাইলা দুরে
রূপের ছটায় যেন মলিন! হাসিল
তারাবলী---মণিকুল সৌরকরে যথা।
পশ্চাতে খমুখে রাখি আলোকের রেখা,
সিন্ধুনীরে তরী যথা, চলিলা রূপসী

২। প্রেতদেশ---মৃত ব্যক্তিদিগের স্থান, অর্থাৎ যমালয়।
৭। তমোময়---অন্ধকারময়।
২৬। খমুখে---আকাশমুখে অর্থাৎ আকাশে।
২৭। সিন্ধুনীরে---সমুদ্রজলে। তরী---নৌকা।

গ্রন্থের ২১৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

লঙ্কা পানে। কত ক্ষণে উতরিলা দেবী
যথায় সসৈন্যে ক্ষুণ্ণ রঘুকুলমণি।
পূরিল কনক-লঙ্কা স্বর্গীয় সৌরভে।
 রাঘবের কর্ণমূলে কহিলা জননী,
“মুছ অশ্রুবারিধারা, দাশরথি রথি,
বাঁচিবে প্রাণের ভাই ; সিন্ধুতীর্থ-জলে
করি স্নান, শীঘ্র তৃমি চল মোর সাথে
যমালয়ে ; সশরীরে পশিবে, সুমতি,
তুমি প্রেতপুরে আজি শিবের প্রসাদে।
পিতা দশরথ তব দিবেন কহিয়া
কি উপায়ে সুলক্ষণ লক্ষ্মণ লভিবে
জীবন। হে ভীমবাহু, চল শীঘ্র করি।
সৃজিব সুড়ঙ্গপথ ; নির্ভয়ে, সুরথি,
পশ তাহে ; যাব আমি পথ দেখাইয়া
তবাগ্রে। সুগ্রীব-আদি নেতৃপতি যত,
কহ সবে, রক্ষা তারা করুক লক্ষ্মণে।”
 সবিম্ময়ে রাঘবেন্দ্র সাবধানি যত
নেতৃনাথে, সিদ্ধুতীরে চলিলা সুমতি---
মহাতীর্থ। অবগাছি পূত স্রোতে দেহ
মহাভাগ, তূষি দেব পিতৃলোক-আদি
তর্পণে, শিবির-দ্বারে উতরিলা ত্বরা
একাকী। উজ্জ্বল এবে দেখিলা নৃমণি
দেবতেজঃপুঞ্জে গৃহ। কৃতাঞ্জলিপুটে,
পুষ্পাঞ্জলি দিয়া রথী পূজিলা দেবীরে
ভূষিয়া ভীষণ তনু সুবীর ভূষণে
বীরেশ, সুড়ঙ্গপথে পশিলা সাহসে---
কি ভয় তাহারে, দেব সুপ্রসন্ন যারে?
 চলিলা রাঘবশ্রেষ্ঠ, তিমির কানন-
পথে পথী চলে যথা, যবে নিশাভাগে

২৫। তনু---শরীর।

গ্রন্থের ২১৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

সধাংশুর অংশু পশি হাসে সে কাননে।
আগে আগে মায়াদেবী চলিলা নীরবে।
 কত ক্ষণে রঘুবর শুনিলা চমকি
কল্লোল, সহত্স্র শত সাগর উথলি
রোষে কল্লোলিছে যেন! দেখিলা সভয়ে
অদূরে ভীষণ পুরী, চিরনিশাবৃত!
বহিছে পরিখারূপে বৈতরণী নদী
বজ্রনাদে ; রহি রহি উথলিছে বেগে
তরঙ্গ, উথলে যথা তপ্ত পাত্রে পয়ঃ
উচ্ছ্বাসিয়া ধূমপুঞ্জ, ত্রস্ত অগ্রিতেজে!
নাহি শোভে দিনমণি সে আকাশদেশে ;
কিম্বা চন্দ্র, কিন্বা তারা ; ঘন ঘনাবলী,
উগরি পাবকরাশি, ভ্রমে শূন্যপথে
বাতগর্ভ, গর্জ্জি উচ্চে, প্রলয়ে যেমতি
পিনাকী, পিনাকে ইষু বসাইয়া রোষে!
 সবিস্ময়ে রঘুনাথ নদীর উপরে
হেরিলা অদ্ভুত সেতু, অগ্রিময় কভু,
কভু ঘন ধূমাবৃত, সুন্দর কভু বা
সুবর্ণে নির্ম্মিত যেন! ধাইছে সতত
সে সেতুর পানে প্রাণী লক্ষ লক্ষ কোটি---
হাহাকার নাদে কেহ ; কেহ বা উল্লাসে!
 সুধিলা বৈদেহীনাথ,---“কহ, কৃপাময়ি,
কেন নানা বেশ সেতু ধরিছে সতত?
কেন বা অগণ্য প্রাণী (অগ্নিশিখা হেরি
পতঙ্গের কুল যথা) ধায় সেতু পানে?”
 উত্তরিলা মায়াদেবী,---“কামরূপী সেতু,

৪। কল্লোল---কল কল শব্দ।
৭। পরিখা---গড়খাই।
৯। পয়ঃ---দুগ্ধ।
১৬1 পাবকরাশি---অগ্নিরাশি।
১৫। পিনাকী---মহাদেব। পিনাক---শিবধনুঃ। ইযু---বাণ।
২৬। কামরূপী---স্বেচ্ছারূপী, অর্থাৎ যখন যেমন ইচ্ছা সেইরূপ রূপ যে ধারণ করিতে পারে।

গ্রন্থের ২১৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

সীতানাথ ; পাপী-পক্ষে অগ্নিময় তেজে,
ধূমাবৃত ; কিন্তু যবে আসে পূণ্য-প্রাণী,
প্রশস্ত, সুন্দর, স্বর্গে স্বর্ণপথ যথা!
ওই যে অগণ্য আত্মা দেখিছ, নৃমণি,
ত্যজি দেহ ভবধামে, আসিছে সকলে
প্রেতপুরে, কর্ম্মফল ভুঞ্জিতে এ দেশে।
ধর্ম্মপথগামী যারা যায় সেতুপথে
উত্তর, পশ্চিম, পূর্ব্বদ্বারে ; পাপী যারা
সাঁতারিয়া নদী পার হয় দিবানিশি
মহাক্লেশে ; যমদূত পীড়য়ে পুলিনে,
জলে জ্বলে পাপ-প্রাণ তপ্ত তৈলে যেন!
চল মোর সাথে তুমি ; হেরিবে সত্বরে
 নরচক্ষুঃ কভু নাহি হেরিয়াছে যাহা।”
ধীরে ধীরে রঘুবর চলিল। পশ্চাতে,
সুবর্ণ-দেউটী সম অগ্রে কুহকিনী
উজ্জ্বলি বিকট দেশ। সেতুর নিকটে
সভয়ে হেরিলা রাম বিরাট-মুরতি
যমদূত দণ্ডপাণি। গর্জ্জি বজ্রনাদে
সুধিল কৃতান্তচর, “কে তুমি? কি বলে,
সশরীরে, হে সাহসি, পশিলা এ দেশে
আত্মময়? কহ ত্বরা, নতুবা নাশিব
দণ্ডাঘাতে মুহূর্ত্তেকে!” হাসি মায়াদেবী
শিবের ত্রিশূল মাতা দেখাইলা দূতে।
 নতভাবে নমি দূত কহিল সতীরে ;---
“কি সাধ্য আমার, সাধ্বি, রোধি আমি গতি
তোমার? আপনি সেতু স্বর্ণময় দেখ
উল্লাসে, আকাশ যথা ঊষার মিলনে!”
 বৈতরণী নদী পার হইলা উভয়ে।
লৌহময় পুরীদ্বার দেখিলা সম্মুখে

১০। পীড়য়ে---পীড়া দেয়। পুলিনে---তীরে।

গ্রন্থের ২১৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

রঘুপতি ; চক্রাকৃতি অগ্নি রাশি রাশি
ঘোরে অবিরাম-গতি চৌদিক উজলি!
আগ্নেয় অক্ষরে লেখা দেখিলা নৃমণি
ভীষণ তোরণ-মুখে,---“এই পথ দিয়া
যায় পাপী দুঃখদেশে চির দুঃখ-ভোগে ;---
হে প্রবেশি, ত্যজি স্পৃহা, প্রবেশ এ দেশে!”
 অস্থিচর্ম্মসার দ্বারে দেখিলা সুরথী
জ্বর-রোগ। কভু শীতে কাঁপে ক্ষীণ তনু
থর থরি ; ঘোর দাহে কভু বা দহিছে,
বাড়বাগ্নিতেজে যথা জলদলপতি।
পিত্ত, শ্লেষ্মা, বায়ু, বলে কভু অক্রমিছে
অপহরি জ্ঞান তার। সে রোগের পাশে
বিশাল-উদর বসে উদরপরতা ;---
অজীর্ণ ভোজন-দ্রব্য উগরি দুর্ম্মতি
পুনঃ পুনঃ, দুই হস্তে তুলিয়া গিলিছে
সুখাদ্য! তাহার পাশে প্রমত্তত্ব হাসে
ঢুলু ঢুলু ঢুলু আঁখি! নাচিছে, গাইছে
কভু, বিবাদিছে কভু, কাঁদিছে কভূ বা
সদা জ্ঞানশূন্য মূঢ়, জ্ঞানহর সদা!
তার পাশে দুষ্ট কাম, বিগলিত-দেহ
শব যথা, তবু পাপী রত গো সুরতে---
দহে হিয়া অহরহঃ কামানলতাপে!
তার পাশে বসি যক্ষ্মা শোণিত উগরে,

৩। আগ্নেয়---অগ্নিময়।
৪। তোরণ---গেট।
৬। স্পৃহা---ইচ্ছা, লোভ ৷
১১। শ্লেষ্মা---কফ।
১৩। বিশাল-উদর---লম্বোদর।
১৪। অজীর্ণ---অপাক।
১৪-১৬। অজীর্ণ ভোজন-দ্রব্য ইত্যাদির তাৎপর্য্য এই যে, ঔদরিক ব্যক্তির ভোজন-লালসা অধিক হয় সুতরাং সে উপাদেয় সামগ্রীর ভক্ষণস্পৃহার পূর্ব্বভক্ষিত অপাক দ্রব্যজাত উদ্গীরণ-পূর্ব্বক উদর শূন্য করে।
১৬-১৯। প্রমত্তত্ব---প্রমত্ততা। নৃত্য, গীত, ক্রন্দন, জ্ঞানহরণ প্রভৃতি ক্রিয়া প্রমত্ততার স্বাভাবিক লক্ষণ।
২৩। যক্ষ্মা---যক্ষ্মাকাস।

গ্রন্থের ২২০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

কাসি কাসি দিবানিশি ; হাঁপায় হাঁপানি---
মহাপীড়া! বিসূচিকা, গতজ্যোতিঃ আঁখি ;
মুখ-মল-দ্বারে বহে লোহের লহরী
শুভ্রজলরয়রূপে! তৃষারূপে রিপু
আক্রমিছে মুহুমুহুঃ ; অঙ্গগ্রহ নামে
ভয়ঙ্কর যমচর গ্রহিছে প্রবলে
ক্ষীণ অঙ্গ, যথা ব্যাঘ্র, নাশি জীব বনে,
রহিয়া রহিয়া পড়ি কামড়ায় তারে
কৌতুকে ! অদূরে বসে সে রোগের পাশে
উন্মত্ততা,---উগ্র কভু, আহুতি পাইলে
উগ্র অগ্নিশিখা যথা। কভু হীনবলা।
বিবিধ ভূষণে কভু ভূষিত ; কভু বা
উলঙ্গ, সমর-রঙ্গে হরপ্রিয়া যথা
কালী! কভু গায় গীত করতালি দিয়া
উন্মদা ; কভু বা কাঁদে ; কভু হাসিরাশি
বিকট অধরে ; কভু কাটে নিজ গলা
তীক্ষ অস্ত্রে ; গিলে বিষ ; ডুবে জলাশয়ে,
গলে দড়ি! কভু, ধিক্! হাব ভাব-আদি
বিভ্রমবিলাসে বামা আহ্বানে কামীরে
কামাতুরা! মল, মূত্র, না বিচারি কিছু,
অন্ন সহ মাখি, হায়, খায় অনায়াসে!
কভু বা শৃঙ্খলাবদ্ধা, কভু ধীরা যথা
স্রোতোহীন প্রবাহিণী---পবন বিহনে!
আর আর রোগ যত কে পারে বর্ণিতে?
 দেখিলা রাঘব রথী অগ্নিবর্ণ রথে

২। বিসূচিকা---ওলাওঠা, উদয়-পীড়া।
৪। শুভ্রজলরয়রূপে---শুভ্রজলবেগরূপে। অর্থাৎ ওলাউঠা রোগে সর্ব্বশরীরের শোণিত জলরূপে পরিণত হইয়া মুখ ও মলদ্বার দিয়া বহির্গত হইতে থাকে। আর পিপাসা, আকর্ষণী প্রভৃতি ক্রিয়া উক্ত রোগের প্রধান লক্ষণ।
৫। অঙ্গগ্রহ---আকর্ষণী, ধনুষ্টঙ্কার, খেঁচারোগ।
২৩। প্রবাহিণী---নদী।

গ্রন্থের ২২১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

(বসন শোণিতে আর্দ্র, খর অসি করে,)
রণে! রথমুখে বসে ক্রোধ সূতবেশে!
নরমুণ্ডমালা গলে, নরদেহরাশি
সম্মুখে! দেখিলা হত্যা, ভীম খড়গপাণি ;
ঊর্দ্ধবাহু সদা, হায়, নিধনসাধনে!
বৃক্ষশাখে গলে রজ্জু দুলিছে নীরবে
আত্মহত্যা, লোলজিহব, উন্মীলিত আঁখি,
ভয়ঙ্কর! রাঘবেন্দ্রে সম্ভাষি সুভাষে
কহিলেন মায়াদেবী---“এই যে দেখিছ
বিকট শমনদূত যত, রঘুরথি,
নানা বেশে এ সকলে ভ্রমে ভূমণ্ডলে
অবিশ্রাম, ঘোর বনে কিরাত যেমতি
মৃগয়ার্থে! পশ তুমি কৃতান্তনগরে,
সীতাকান্ত ; দেখাইব আজি হে তোমারে
কি দশায় আত্মকুল জীবে আত্মদেশে!
দক্ষিণ দুয়ার এই ; চৌরাশি নরক-
কুণ্ড আছে এই দেশে। ঢল ত্বরা করি”
 পশিলা কৃতান্তপুরে সীতাকান্ত বলী,
দাবদগ্ধ বনে, মরি, খতুরাজ যেন
বসন্ত ; অমৃত কিম্বা জীবশূন্য দেহে!
অন্ধকারময় পুরী, উঠিছে চৌদিকে
আর্ত্তনাদ ; ভূকম্পনে কাঁপিছে সঘনে
জল, স্থল ; মেঘাবলী উগরিছে রোষে
কালাগ্নি ; দুর্গন্ধময় সমীর বহিছে,
লক্ষ লক্ষ শব যেন পুড়িছে শ্মশানে!
 কত ক্ষণে রঘুশ্রেষ্ঠ দেখিলা সম্মুখে

১। খর---তীক্ষ্ণ।
২। সূতবেশে---সারথিবেশে।
৫। নিধনসাধনে---নাশসম্পাদনে অর্থাৎ মারণে।
১৫। জীবে---জীবিত থাকে।
১৯। দাবদগ্ধ--দাবানলদগ্ধ।
২৪। দুর্গন্ধময়---দুর্গন্ধপূর্ণ। সমীর---সমীরণ, পবন, বায়ু।

গ্রন্থের ২২২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

মহাহ্রদ ; জলরূপে বহিছে কল্লোলে
কালাগ্নি! ভাসিছে তাহে কোটি কোটি প্রাণী
ছটফটি হাহাকারে! “হায় রে, বিধাতঃ
নির্দ্দয়, সৃজিলি কি রে আমা সবাকারে
এই হেতু? হা দারুণ, কেন না মরিনু
জঠর-অনলে মোরা মায়ের উদরে?
কোথা তুমি, দিনমণি? তুমি, নিশাপতি
সুধাংশু? আর কি কভু জুড়াইব আঁখি
হেরি তোমা দোঁহে, দেব? কোথা সুত, দারা,
আত্মবর্গ? কোথা, হায়, অর্থ যার হেতু
বিবিধ কুপথে রত ছিনু রে সতত---
করিনু কুকর্ম্ম, ধর্ম্মে দিয়া জলাঞ্জলি?”
 এইরূপে পাপী-প্রাণ বিলাপে সে হ্রদে
মুহুর্মুহুঃ। শূন্যদেশে অমনি উত্তরে
শূন্যদেশভবা বাণী ভৈরব নিনাদে”---
“বৃথা কেন, মূঢ়মতি, নিন্দিস্‌ বিধিরে
তোরা? স্বকরম-ফল ভূঞ্জিস্ এ দেশে!
পাপের ছলনে ধর্ম্মে ভুলিলি কি হেতু?
সুবিধি বিধির বিধি বিদিত জগতে!”
 নীরবিলে দৈববাণী, ভীষণ-মূরতি
যমদূত হানে দণ্ড মস্তক-প্রদেশে?
কাটে কৃমি ; বজ্রনখা, মাংসাহারী পাখী
উড়ি পড়ি ছায়াদেহে ছিঁড়ে নাড়ী-ভুঁড়ি
হুহুঙ্কারে! আর্ত্তনাদে পূরে দেশ পাপী!
 কহিলা বিষাদে মায়া রাঘবে সম্ভাষি,---
“রৌরব এ হ্রদ নাম, শুন, রঘুমণি,
অগ্নিময়! পরধন হরে যে দুর্ম্মতি,

৯। দারা---স্ত্রী।
১৫। শূন্যদেশভবা বাণী---আকাশবাণী অর্থাৎ দৈববাণী।
১৯। সুবিধি---সুনিয়ম। বিধির---বিধাতার। বিধি---নিয়ম।
২২। কৃমি---কীট, পোকা।
২৪। পূরে---পূর্ণ করে।‌

গ্রন্থের ২২৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

তার চিরবাস হেথা ; বিচারী যদ্যপি
অবিচারে রত, সেও পড়ে এই হ্রদে ;
আর আর প্রাণী যত, মহাপাপে পাপী।
না নিবে পাবক হেথা, সদা কীট কাটে!
নহে সাধারণ অগ্নি কহিনু তোমারে,
জ্বলে যাহে প্রেতকুল এ ঘোর নরকে,
রঘুবর ; অগ্নিরূপে বিধিরোষ হেথা
জ্বলে নিত্য! চল, রথি, চল, দেখাইব
কুম্ভীপাকে ; তপ্ত তৈলে যমদূত ভাজে
পাপীবৃন্দে যে নরকে ! ওই শুন, বলি,
অদূরে ক্রন্দনধ্বনি! মায়াবলে আমি
রোধিয়াছি নাসাপথ তোমার, নহিলে
নারিতে তিষ্ঠিতে হেথা, রঘুশ্রেষ্ঠ রথি!
কিম্বা চল যাই, যথা অন্ধতম কূপে
কাঁদিছে আত্মহা পাপী হাহাকার রবে
চিরবন্দী!” করপুটে কহিলা নৃপতি,
“ক্ষম, ক্ষেমঙ্করি, দাসে! মরিব এখনি
পরদুঃখে, আর যদি দেখি দুঃখ আমি
এইরূপ! হায়, মাতঃ, এ ভবমণ্ডলে
স্বেচ্ছায় কে গ্রহে জন্ম, এই দশা যদি
পরে? অসহায় নর ; কলুষকুহকে
পারে কি গো নিবারিতে?” উত্তরিলা মায়া,---
“নাহি বিষ, মহেষ্বাস, এ বিপুল ভবে,
না দমে ঔষধ যারে! তবে যদি কেহ
অবহেলে সে ঔষধে, কে বাঁচায় তারে?

১৫। আত্মহা---আত্মঘাতী।
১৬। চিরবন্দী---চিরবন্দী-স্বরূপ। আত্মঘাতীদিগকে চিরবন্দী বলিবার তাৎপর্য্য এই যে, তাহাদের উক্ত কূপনামক নরক হইতে নিষ্কৃতি পাইবার কখনই সম্ভাবনা নাই।
২১। কলুষকুহকে---পাপকুহকে।
২৫। অবহেলে---অবহেলা করে।

গ্রন্থের ২২৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

কর্ম্মক্ষেত্রে পাপ সহ রণে যে সুমতি,
দেবকুল অনুকূল তার প্রতি সদা ;---
অভেদ্য কবচে ধর্ম্ম আবরেন তারে!
এ সকল দণ্ডস্থল দেখিতে যদ্যপি,
হে রথি, বিরত তুমি, চল এই পথে!”
 কত দূরে সীতাকান্ত পশিলা কান্তারে---
নীরব, অসীম, দীর্ঘ ; নাহি ডাকে পাখী,
নাহি বহে সমীরণ সে ভীষণ বনে,
না ফোটে কুসুমাবলী---বনসুশোভিনী।
স্থানে স্থানে পত্রপুঞ্জে ছেদি প্রবেশিছে
রশ্মি, তেজোহীন কিন্তু, রোগীহাস্য যথা।
 লক্ষ লক্ষ লক্ষ প্রাণী সহসা বেড়িল
সবিম্ময়ে রঘুনাথে, মধুভাণ্ডে যথা
মক্ষিক। সুধিল কেহ সকরুণ স্বরে,
“কে তুমি, শরীরি? কহ, কি গুণে আইলা
এ স্থলে? দেব কি নর, কহ শীঘ্র করি?
কহ কথা ; আমা সবে তোষ, গুণনিধি,
বাক্য-সুধা-বরিষণে! যে দিন হরিল
পাপপ্রাণ যমদূত, সে দিন অবধি
রসনাজনিত ধ্বনি বঞ্চিত আমরা।
জুড়াল নয়ন হেরি অঙ্গ তব, রথি,
বরাঙ্গ, এ কর্ণদ্বয়ে জুড়াও বচনে!”

১। রণে---রণ করে।
৩। আবরেন---আবরণ করেন, ঢাকেন। অর্থাৎ ধর্ম্ম তাহাকে রক্ষা করেন।
৬। কান্তার---দুর্গম পথ।
১০-১১। রোরীহাস্যের সহিত কিরণাবলীর উপমা দিবার মর্ম্ম এই যে, যেমন পীড়িত ব্যক্তির হাস্যে কোন রস বা শক্তি নাই, সেইরূপ কিরণজালের পত্রমধ্য দিয়া প্রবেশ করাতে কেবল আলোকমাত্র আছে, কিন্তু তাহাতে কোন তেজঃ নাই।
১৭। তোষ---তুষ্ট কর।
২০। রসনাজনিত ধ্বনি---রসনোচ্চারিত শব্দ, অর্থাৎ মানববাক্য।
২২। বরাঙ্গ---শ্রেষ্ঠাঙ্গ, অর্থাৎ সুন্দর ৷

গ্রন্থের ২২৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

উত্তরিলা রক্ষোরিপু, “রঘুকুলোদ্ভব
এ দাস, হে প্রেতকুল ; দশরথ রথী
পিতা, পাটেশ্বরী দেবী কৌশল্যা জননী ;
রাম নাম ধরে দাস ; হায়, বনবাসী ;
ভাগ্য-দোষে! ত্রিশূলীর আদেশে ভেটিব
পিতায়, তেঁই গো আজি এ কৃতান্তপুরে।”
 উত্তরিল প্রেত এক, “জানি আমি তোমা,
শূরেন্দ্র ; তোমার শরে শরীর ত্যজিনু
পঞ্চবটীবনে আমি!” দেখিলা নৃমণি
চমকি মারীচ রক্ষে---দেহহীন এবে!
 জিজ্ঞাসিলা রামচন্দ্র, “কি পাপে আইলা
এ ভীষণ বনে, রক্ষঃ, কহ তা আমারে?”
“এ শাস্তির হেতু হায়, পৌলস্ত্য দুর্ম্মতি,
রঘুরাজ!” উত্তরিলা শূন্যদেহ প্রাণী,
“সাধিতে তাহার কার্য্য বঞ্চিনু তোমারে,
তেঁই এ দুর্গতি মম!” আইল দূষণ
সহ খর, (খর যথা তীক্ষ্ণতর অসি
সমরে, সজীব যবে,) হেরি রঘুনাথে,
রোষে, অভিমানে দোঁহে চলি গেলা দূরে,
বিযদন্তহীন অহি হেরিলে নকুলে
বিষাদে লুকায় যথা! সহসা পূরিল
ভৈরব আরবে বন, পালাইল রড়ে
ভূতকুল, শুষ্ক পত্র উড়ি যায় যথা
বহিলে প্রবল ঝড়! কহিলা শূরেশে
মায়া, “এই প্রেতকুল, শুন রঘুমণি,

৫। ভেটিব---সাক্ষাৎ করিব।
১৩। পৌলস্ত্য---পুলস্তনন্দন রাবণ।
১৭। খর---খরনামক রাক্ষস।
২০। অহি---সর্প। নকুল---নেউল। খর দূষণের বিষদন্তহীন সর্পের সহিত তুলনা দিবার তাৎপর্য্য এই যে, যেমন সর্পের বিষ-দাঁত ভাঙ্গিলে আর বল থাকে না, সেইরূপ খর দূষণ রামের নিকট পরাজিত হওয়া অবধি পরাক্রমশূন্য হইয়াছে।

গ্রন্থের ২২৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

নানা কুণ্ডে করে বাস ; কভু কভু আসি
ভ্রমে এ বিলাপবনে, বিলাপি নীরবে।
ওই দেখ যমদূত খেদাইছে রোষে
নিজ নিজ স্থানে সবে!” দেখিলা বৈদেহী-
হৃদয়কমলরবি, ভূত পালে পালে,
পশ্চাতে ভীষণ-মূর্ত্তি যমদূত ; বেগে
ধাইছে নিনাদি ভূত, মূগপাল যথা
ধায় বেগে ক্ষুধাতুর সিংহের তাড়নে
ঊদ্ধশ্বাস! মায়া সহ চলিল বিষাদে
দয়াসিন্ধু রামচন্দ্র সজল নয়নে।
 কত ক্ষণে আর্তনাদ শুনিলা সুরথী
সিহরি! দেখিলা দূরে লক্ষ লক্ষ নারী,
আভাহীন, দিবাভাগে শশিকলা যথা
আকাশে! কেহ বা ছিঁড়ি দীর্ঘ কেশাবলী,
কহিছে, “চিকণি তোরে বাঁধিতাম সদা,
বাঁধিতে কামীর মনঃ ধর্ম্ম কর্ম্ম ভুলি,
উম্মদা যৌবনমদে!” কেহ বিদরিছে
নখে বক্ষঃ কহি, “হায়, হীরামুক্তা ফলে
বিফলে কাটানু দিন সাজাইয়া তোরে ;
কি ফল ফলিল পরে!” কোন নারী খেদে
কুড়িছে নয়নদ্বয়, (নির্দ্দয় শকুনি
মৃতজীব-আঁখি যথা) কহিয়া, “অঞ্জনে
রঞ্জি তোরে, পাপচক্ষুঃ, হানিতাম হাসি
চৌদিকে কটাক্ষশর ; সুদর্পণে হেরি
বিভা তোর, ঘৃণিতাম কুরঙ্গনয়নে!
গরিমার পুরস্কার এই কি রে শেষে?”

২১। কুড়িছে---উপড়াইতেছে, অর্থাৎ তুলিয়া ফেলিতেছে।
২২। অঞ্জন---কাজল।
২৫। ঘৃণিতাম---ঘৃণা করিতাম।
২৬। গরিমার---গৌরবের। কেশাবলী প্রভৃতির চিকণ বন্ধনাদির দ্বারা কামিগণের মনোহরণাদিপূর্ব্বক নানা সুখভোগ বর্ণনানন্তর “গরিমার পুবস্কার" ইত্যাদি বর্ণনার তাৎপর্য্য এই যে, কেশাবলী প্রভৃতি দ্বারা যে স্বর্গতুল্য সুখভোগ করিয়াছি, অবশেষে কি সে সুখভোগ নরকভোগ রূপে পরিণত হইল।

গ্রন্থের ২২৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

 চলি গেলা বামাদল কাঁদিয়া কাঁদিয়া।---
পশ্চাতে কৃতান্তদূতী, কুন্তল-প্রদেশে
স্বনিছে ভীষণ সর্প ; নখ অসি-সম ;
রক্তাক্ত অধর ওষ্ঠ ; দুলিছে সঘনে
কদাকার স্তনযুগ ঝুলি নাভিতলে ;
নাসাপথে অগ্নিশিখা জ্বলি বাহিরিছে
ধক্ ধকি ; নয়নাগ্নি মিশিছে তা সহ।
 সম্ভাষি রাঘবে মায়া কহিলা, “এই যে
নারীকুল, রঘুমণি, দেখিছ সম্মুখে,
বেশভূষাসক্তা সবে ছিল মহীতলে।
সাজিত সতত দুষ্টা, বসন্তে যেমতি
বনস্থলী, কামী-মনঃ মজাতে বিভ্রমে
কামাতুরা! এবে কোথা সে রূপমাধুরী,
সে যৌবনধন, হায়?” অমনি বাজিল
প্রতিধ্বনি, “এবে কোথা সে রূপমাধুরী,
সে যৌবনধন, হায়!” কাঁদি ঘোর রোলে
চলি গেলা বামাকুল যে যার নরকে।
 আবার কহিলা মায়া “পুনঃ দেখ চেয়ে
সম্মুখে, হে রক্ষোরিপু,” দেখিলা নৃমণি
আর এক বামাদল সম্মোহন রূপে!
পরিমলময় ফুলে মণ্ডিত কবরী,
কামাগ্নির তেজোরাশি কুরঙ্গ-নয়নে,
মিষ্টতর সুধা-রস মধুর অধরে!
দেবরাজ-কম্বু-সম মণ্ডিত রতনে

৪। রক্তাক্ত---রক্তমিশ্রিত।
২৪। কম্বু---শঙ্খ। কবিরা সচরাচর শঙ্খের সহিত গ্রীবা অর্থাৎ ঘাড়ের তুলনা দিয়া থাকেন।

গ্রন্থের ২২৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

গ্রীবাদেশ ; সূক্ষ্ম স্বর্ণ-সুতার কাঁচলি
আচ্ছাদন-ছলে ঢাকে কেবল দেখাতে
কুচ-রুচি, কাম-ক্ষুধা বাড়ায়ে হৃদয়ে
কামীর! সুক্ষীণ কটি ; নীল পট্টবাসে,
(সূক্ষ্ম অতি) গুরু উরু যেন ঘৃণা করি
আবরণ, রম্ভা-কান্তি দেখায় কৌতুকে,
উলঙ্গ বরাঙ্গ যথা মানসের জলে
অপ্সরীর, জল-কেলি করে তারা যবে।
বাজিছে নূপুর পায়ে, নিতম্বে মেখলা ;
মৃদঙ্গের রঙ্গে, বীণা, রবাব, মন্দিরা,
আনন্দে স্বরঙ্গ সবে মন্দে মিলাইছে।
সঙ্গীত-তরঙ্গে রঙ্গে ভাসিছে অঙ্গনা ।
 রূপস পুরুষদল আর এক পাশে
বাহিরিল মৃদু হাসি ; সুন্দর যেমতি
কৃত্তিকা-বল্লভ দেব কার্ত্তিকেয় বলী,
কিন্বা, রতি, মনমথ, মনোরথ তব!
 হেরি সে পুরুষ-দলে কামমদে মাতি
কপটে কটাক্ষ-শর হানিলা রমণী,---
কঙ্কণ বাজিল হাতে শিঞ্জিনীর বোলে।
তপ্ত শ্বাসে উড়ি রজঃ কুসুমের দামে
ধূলারূপে জ্ঞান-রবি আশু আবরিল।
হারিল পুরুষ রণে ; হেন রণে কোথা
জিনিতে পুরুষদলে আছে হে শকতি?

১-৪। সূক্ষ্ম স্বর্ণ-সূতার কাঁচলি---স্তনাবরণ, স্তনকে আচ্ছাদন না করিয়া বরং তাহার রুচি অর্থাৎ কান্তি বৃদ্ধি করতঃ কামিগণের কামানল উদ্দীপ্ত করে।
৪-৮। এই স্রীলোকদিগের পরিধান-বসন নীলবর্ণ এবং এত পাতলা যে, তদ্দ্বারা উরুদেশের আবরণ দূরে থাকুক, বরং তন্মধ্য দিয়া আপন কান্তিসকল এমন প্রকাশ করিতেছে যে, যেমন বস্ত্রহীনা অপ্সরীদলের কান্তি তাহাদের জলকেলিকালে প্রকাশ পায়।
১৬। কিম্বা হে রতিদেবি, এই সকল পুরুষ তোমার মনোরথ মন্মথের তুল্য সুন্দর।
২০-২৩। পুরুষকুল-দর্শনে এই সকল দুর্ব্বৃত্তা নারীগণের কামরিপু প্রবল হওয়াতে তাহাদের স্বাসবায়ু উত্তপ্ত হইয়া উঠিল, এবং তাহাদের কণ্ঠস্থিত কুসুমমালায় রজঃ অর্থাৎ কুসুমধূলি উড়াইরা ইত্যাদি। ইহার তাৎপর্য্য এই যে, এই স্ত্রীলোকেরা কামে বিবশা হইল। পুরুষদলও তাহাদের হাব ভাব লাবণ্য দর্শনে একবারে বিমোহিত হইয়া পড়িল।

গ্রন্থের ২২৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

 বিহঙ্গ বিহঙ্গী যথা প্রেমরঙ্গে মজি
করে কেলি যথা তথা---রসিক নাগরে,
ধরি পশে বন-মাধে রসিকা নাগরী---
কি মানসে, নয়ন তা কহিল নয়নে!
 সহসা পূরিল বন হাহাকার রবে!
বিস্ময়ে দেখিলা রাম করি জড়াজড়ি
গড়াইছে ভূমিতলে নাগর নাগরী
কামড়ি আঁচড়ি, মারি হস্ত, পদাঘাতে।
ছিঁড়ি চুল, কুড়ি আঁখি, নাক মুখ চিরি
বজ্রনখে। রক্তস্রোতে তিতিলা ধরণী।
যুঝিল উভয়ে ঘোরে, যুঝিল যেমতি
কীচকের সহ ভীম নারী-বেশ ধরি
বিরাটে। উতরি তথা যমদূত যত
লৌহের মুদ্গর মারি আশু তাড়াইলা ,
দুই দলে। মৃদুভাষে কহিলা সুন্দরী
মায়া রঘুকুলনন্দন রাঘবনন্দন ;---
 “জীবনে কামের দাস, শুন, বাছা, ছিল
পুরুষ ; কামের দাসী রমণী-মণ্ডলী।
কাম-ক্ষুধা পূরাইল দোঁহে অবিরামে
বিসর্জ্জি ধর্ম্মেরে, হায়, অধর্ম্মের জলে,
বর্জ্জি লজ্জা ;---দণ্ড এবে এই যমপুরে।
ছলে যথা মরীচিকা তৃষাতুর জনে,
মরু-ভূমে ; স্বর্ণকান্তি মাকাল যেমতি
মোহে ক্ষুধাতুর প্রাণে ; সেই দশা ঘটে
এ সঙ্গমে ; মনোরথ বৃথা দুই দলে।
আর কি কহিব, বাছা, বুঝি দেখ তুমি।

১-৪। বিহঙ্গ বিহঙ্গী যথা, এ স্থলে নারী ও পুকষদলের বিহঙ্গ বিহঙ্গীর সহিত তুলনা দিবার তাৎপর্য্য এই যে, রতিকালে তাহাদের যেমন স্থানাস্থান ও সময়াসময়ের বিবেচনা থাকে না, নারী ও পুরুষগণেরও এ স্থলে সেই দশা ঘটিয়া উঠিল।
২২-২৬। মরু-ভুমে মরীচিকা কেবল তৃষার উৎপাদক মাত্র, কিন্তু তৃষার নিবারণে সে শত্তিহীনা। মাকাল ফলেরও অবিকল সেই ধর্ম্ম, এ সুরূপা স্ত্রীদল ও সুদৃশ্য পুরুষদল বিধাতায় দণ্ডবিধানানুসারে উভয়ে উভয়ের মনোরথ সফল করিতে অক্ষম, তন্নিমিত্তই উপরি উক্ত বিষাদ। প্রথম দর্শনে উভয়ের মনে যে অনুরাগ জন্মে, সে অনুরাগ বৃথা হইয়া মহা ক্রোধরূপ ধারণ করে।

গ্রন্থের ২৩০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

এ দুর্ভোগ, হে সুভগ, ভোগে বহু পাপী
মর-ভূমে নরকাগ্রে ; বিধির এ বিধি---
যৌবনে অন্যায় ব্যয়ে বয়েসে কাঙ্গালী।
অনির্ব্বেয় কামানল পোড়ায় হৃদয়ে ;
অনির্ব্বেয় বিধি-রোষ কালানল-রূপে
দহে দেহ, মহাবাহু, কহিনু তোমারে---
এ পাপী-দলের এই পুরস্কার শেষে!”---
 মায়ার চরণে নমি কহিলা নৃমণি,
“কত যে অদ্ভুত কাণ্ড দেখিনু এ পূরে,
তোমার প্রসাদে, মাতঃ, কে পারে বর্ণিতে?
কিন্তু কোথা রাজ-ঋষি? লইব মাগিয়া
কিশোর লক্ষণে ভিক্ষা তাহার চরণে---
লহ দাসে সে সুধামে, এ মম মিনতি।”
 হাসিয়া কহিলা মায়া, “অসীম এ পুরী,
রাঘব, কিঞ্চিৎ মাত্র দেখানু তোমারে।
দ্বাদশ বৎসর যদি নিরন্তর ভ্রমি
কৃতান্ত-নগরে, শূর, আমা দোঁহে, তবু
না হেরিব সর্ব্বভাগ! পূর্ব্বদ্বারে সুখে
পতি অহ করে বাস পতিপরায়ণা
সাধ্বীকুল ; স্বর্গে, মর্ত্ত্যে, অতুল এ পুরী
সে ভাগে ; সুরম্য হর্ম্ম্য সুকানন মাঝে,
সুসরসী সুকমলে পরিপূর্ণ সদা,

১-৭। এই অসাধারণ বর্ণনা নীতিশূণ্য নহে, প্রথমতঃ পাঠকগণের মনে ইহা অশ্লীল বোধ হইতে পারে, ফলতঃ ইহা তাহা নহে। কবি এ কুপাপের যে দণ্ড এ স্থলে বর্ণনা করিয়াছেন, তাহা কোন মতেই এতদপেক্ষা সুকৌশলে প্রকাশ করা যায় না। এই নীতিগর্ভ উপদেশবাক্যটি বোধ হয়, সকলেরই অনায়াসে হৃদয়ঙ্গম হইবেক। (যৌবনে অন্যায় ব্যয়ে বয়েসে কাঙ্গালী) এই বর্ণনাটি নূতন সঙ্কলিত।
১২। কিশোর---বালক।
২২। সুসরসী---সুসরোবর।

গ্রন্থের ২৩১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

বাসন্ত সমীর চির বহিছে সুস্বনে,
গাইছে সুপিকপুঞ্জ সদা পঞ্চস্বরে।
আপনি বাজিছে বীণা, আপনি বাজিছে
মুরজ, মন্দিরা, বাঁশী, মধু সপ্তস্বরা!
দধি, দুগ্ধ, ঘৃত, উৎসে উথলিছে সদা
চৌদিকে, অমৃতফল ফলিছে কাননে ;
প্রদানেন পরমান্ন আপনি অন্নদা!
চর্ব্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয়, যা কিছু যে চাহে,
অমনি পায় সে তারে, কামধুকে যথা
কামলতা, মহেষ্বাস, সদ্য ফলবতী।
নাহি কাজ যাই তথা ; উত্তর দুয়ারে
চল, বলি, ক্ষণকাল ভ্রম মে সুদেশে।
অবিলম্বে পিতৃ-পদ হেরিবে, নূমণি!”
 উত্তরাভিমুখে দোঁহে চলিলা সত্বরে।
দেখিলা বৈদেহীনাথ গিরি শত শত
বন্ধ্য, দগ্ধ, আহা, যেন দেবরোষানলে!
তুঙ্গশূঙ্গশিরে কেহ ধরে রাশি রাশি
তুষার ; কেহ বা গর্জ্জি উগরিছে মুহুঃ
আগ্নি, দ্রবি শিলাকুলে অগ্নিময় স্রোতে,
আবরি গগন ভস্মে, পূরি কোলাহলে
চৌদিক্‌! দেখিলা প্রভু মরুক্ষেত্র শত
অসীম, উত্তপ্ত বায়ু বহি নিরবধি
তাড়াইছে বালিবৃন্দে ঊর্ম্মিদলে যেন!
দেখিলা তড়াগ বলী, সাগর-সদৃশ

১। বাসন্ত সমীর---বসন্তানিল।
৫। উৎস---ফুয়ারা।
৭। প্রদানেন---প্রদান করেন।
৮। চর্ব্ব্য---যে বস্তু চর্বণ করিয়া খাইতে হয়। চোষ্য---যে বস্তু চুষিয়া খাইতে হয়। লেহ্য---বে বস্তু চাটিয়া খাইতে হয়। পেয়---যে বস্তু পান করিতে হয়।
৯। কামধুক---স্বর্গ। কাম---ইচ্ছা, অভিলাষ। ধুক্---দোহনকর্ত্তা। অর্থাৎ যেখানে মনোরথ পূর্ণ করেন।
১৬। বন্ধ্য---ফলশূন্য, বাঁজা।
১৮। তুষার---হিম, বরফ।
১৯। দ্রবি---দ্রব করিয়া অর্থাৎ গলাইয়া।
২৪। তড়াগ---সরোবর।

গ্রন্থের ২৩২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

অকুল ; কোথায় ঝড়ে হুঙ্কারি উথলে
তরঙ্গ পর্ব্বতাকৃতি ; কোথায় পচিছে
গতিহীন জলরাশি ; করে কেলি তাহে
ভীষণ-মূরতি ভেক, চীৎকারি গম্ভীরে !
ভাসে মহোরগবৃন্দ, অশেষশরীরী
শেষ যথা ; হলাহল জ্বলে কোন স্থলে ;
সাগর-মন্থনকালে সাগরে যেমতি।
এ সকল দেশে পাপী ভ্রমে, হাহারবে
বিলাপি! দংশিছে সর্প ; বৃশ্চিক কামড়ে,
ভীষণদশন কীট! আগুন ভূতলে,
শূন্যদেশে ঘোর শীত! হায় রে, কে কবে
লভয়ে বিরাম ক্ষণ এ উত্তর দ্বারে!
 দ্রুতগতি মায়া সহ চলিলা সুরথী।
নিকটয়ে তট যবে, যতনে কাণ্ডারী
দিয়া পাড়ী জলারণ্যে, আশু ভেটে তারে
কুসুমবনজনিত পরিমলসখা
সমীর ; জুড়ায় কান শুনি বহুদিনে
পিককুল-কলরব, জনরব সহ ;---
ভাসে সে কাণ্ডারী এবে আনন্দ-সলিলে।
সেইরূপে রঘুবর শুনিলা অদূরে
বাদ্যধ্বনি! চারি দিকে হেরিলা সুমতি
সবিস্ময়ে স্বর্ণসৌধ, সুকাননরাজী
কনক-প্রসূন-পূর্ণ ;---সুদীর্ঘ সরসী,
নবকুবলয়ধাম! কহিলা সুস্বরে
মায়া, “এই দ্বারে, বীর, সম্মুখসংগ্রামে
পড়ি, চিরসুখ ভুঙ্জে মহারথী যত।

৩। কেলি---ক্রীড়া, খেলা।
8। ভেক---বেঙ।
৫। মহোরগবৃন্দ---মহাসর্পসমূহ। অশেষশরীরী---দীর্ঘ দেহবিশিষ্ট।
৬। শেষ---শেষনামক সর্প। অনন্ত নাগ।
২২। স্বর্ণসৌধ---সুবর্ণ অট্টালিকা।
২৩। কনক-প্রসূন-পূর্ণ---স্বর্ণকুসুম-পরিপূর্ণ । সরসী---সরোবর।

গ্রন্থের ২৩৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

অশেষ, হে মহাভাগ, সম্ভোগ এ ভাগে
সুখের! কানন-পথে চল ভীমবাহু,
দেখিবে যশস্বী জনে, সঞ্জীবনী পুরী
যা সবার যশে পূর্ণ, নিকুঞ্জ যেমতি
সৌরভে। এ পুণ্যভূমে বিধাতার হাসি
চন্দ্র-সূর্য্য-তারারূপে দীপে, অহরহঃ
উজ্জ্বলে” কৌতুকে রথী চলিলা সত্বরে,
অগ্রে শূলহস্তে মায়া! কতক্ষণে বলী
দেখিলা সম্মুখে ক্ষেত্র---রঙ্গভূমিরূপে।
কোন স্থলে শূলকুল শালবন যথা
বিশাল ; কোথায় হেষে তুরঙ্গমরাজী
মণ্ডিত রণভূষণে ; কোথায় গরজে
গজেন্দ্র! খেলিছে চর্ম্মী অসি চর্ম্ম ধরি ;
কোথায় যুঝিছে মল্ল ক্ষিতি টলমলি ;
উড়িছে পতাকাচয় রণানন্দে যেন।
কুসুম-আসনে বসি, স্বর্ণবীণা করে,
কোথায় গাইছে কবি, মোহি শ্রোতাকুলে,
বীরকুলসংকীর্ত্তনে। মাতি সে সঙ্গীতে,
হুঙ্কারিছে বীরদল ; বর্ষিছে চৌদিকে,
না জানি কে, পারিজাত ফুল রাশি রাশি,
সুসৌরভে পূরি দেশ। নাচিছে অপ্সরা ;
গাইছে কিন্নরকুল, ত্রিদিবে যেমতি।
 কহিলা রাঘবে মায়া, “সত্যযুগ-রণে
সম্মুখসমরে হত রথীশ্বর যত,
দেখ এই ক্ষেত্রে আজি, ক্ষত্রুচূড়ামণি!
কাঞ্চনশরীর যথা হেমকূট, দেখ
নিশুম্ভে ; কিরীট-আভা উঠিছে গগনে---
মহাবীর্য্যবান্‌ রথী। দেবতেজোদ্ভবা

৯। রঙ্গভূমি---যুদ্ধক্ষেত্র।
১৫। পতাকাচয়---পতাকাসমূহ।
১৮। বীরকুলসংকীর্ত্তন---বীরকুলের যশোগান।

গ্রন্থের ২৩৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

চণ্ডী ঘোরতর রণে নাশিলা শূরেশে।
দেখ শুম্ভে, শূলীশম্ভুনিভ পরাক্রমে ;
ভীষণ মহিষাসুরে, তুরঙ্গমদমী ;
ত্রিপুরারি-অরি শূর সুরথী ত্রিপুরে ;---
বৃত্র-আদি দৈত্য যত, বিখ্যাত জগতে।
সুন্দ উপসুন্দ দেখ আনন্দে ভাসিছে
ভ্রাতৃপ্রেমনীরে পুনঃ।” সুধিলা সুমতি
রাঘব, “কেন না হেরি, কহ দয়াময়ি
কুম্ভকর্ণ, অতিকায়, নরান্তক (রণে
নরান্তক), ইন্দ্রজিৎ আদি রক্ষঃ-শূরে?”
 উত্তরিলা কুহকিনী, “অন্ত্যেষ্টি ব্যতীত,
নাহি গতি এ নগরে, হে বৈদেহীপতি।
নগর বাহিরে দেশ, ভ্রমে তথা প্রাণী,
যত দিন প্রেতক্রিয়া না সাধে বান্ধবে
যতনে ;---বিধির বিধি কহিনু তোমারে।
চেয়ে দেখ, বীরবর, আসিছে এদিকে
সুবীর ; অদৃশ্যভাবে থাকিব, নৃমণি,
তব সঙ্গে ; মিষ্টালাপ কর রঙ্গে, তুমি।”
এতেক কহিয়া মাতা অদৃশ্য হইল।
 সবিস্ময়ে রঘুবর দেখিলা বীরেশে
তেজস্বী ; কিরীটচূড়ে খেলে সৌদামিনী,
ঝল ঝলে মহাকায়ে, নয়ন ঝলসি,
আভরণ! করে শূল, গজপতিগতি।
 অগ্রসরি শূরেশ্বর সম্ভাষি রামেরে,
সুধিলা,---“কি হেতু হেথা সশরীরে আজি,
রঘুকুলচুড়ামণি? অন্যায় সমরে
সংহারিলে মোরে তুমি তুষিতে সুগ্রীবে ;

৪। ত্রিপুরারি-অরি---শিবশক্র।
৯-১০। প্রথম নরান্তক---একজন রাক্ষসের নাম। দ্বিতীয় নরান্তক---নরকূলের অন্তকারী, অর্থাৎ যম।
১১। অন্ত্যেষ্টি---ঔর্দ্ধদেহিক ক্রিয়া অর্থাৎ শ্রাদ্ধাদি।

গ্রন্থের ২৩৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

কিন্তু দূর কর ভয় ; এ কৃতান্তপূরে
নাহি জানি ক্রোধ মোরা, জিতেন্দ্রিয় সবে।
মানবজীবনস্রোতঃ পৃথিবী-মণ্ডলে,
পঙ্কিল, বিমল রয়ে বহে সে এ দেশে।
আমি বালি।” সলজ্জায় চিনিলা নৃমণি
রথীন্দ্র কিষ্কিন্ধ্যানাথে! কহিলা হাসিয়া
বালি, “চল মোর সাথে, দাশরথি রথি!
ওই যে উদ্যান, দেব, দেখিছ অদূরে
সুবর্ণ-কুসুমময়। বিহারেন সদা
ও বনে জটায়ু রথী, পিতৃসখা তব!
পরম পীরিতি রথী পাইবেন হেরি
তোমায়! জীবনদান দিলা মহামতি
ধর্ম্মকর্ম্মে---সতী নারী রাখিতে বিপদে ;
অসীম গৌরব তেঁই! চল ত্বরা করি।”
 জিজ্ঞাসিলা রক্ষোরিপু, “কহ, কৃপা করি,
হে সুরথি, সমসুখী এদেশে কি তোমা
সকলে?” “খনির গর্ভে” উত্তরিলা বালি,
“জনমে সহস্র মণি, রাঘব ; কিরণে
নহে সমতুল সবে, কহিনু তোমারে ;---
তবু আভাহীন কেবা, কহ, রঘুমণি?”
এইরূপে মিষ্টালাপে চলিলা দুজনে।
 রম্য বনে, বহে যথা পীযূষসলিলা
নদী সদা কলকলে, দেখিলা নৃমণি,
জটায়ু গরুড়পুত্রে, দেবাকৃতি রথী ;
দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত, বিবিধ রতনে
খচিত আসনাসীন! উথলে চৌদিকে
বীণাধ্বনি! পদ্মপর্ণবর্ণ বিভারাশি

৪। বিমল রয়ে---নির্ম্মল বেগে।
৯। বিহারেন---বিহার করেন।
২২। পীযূষসলিলা---অমৃতজলা।
২৬। আসনানীন---আসনোপবিষ্ট।

গ্রন্থের ২৩৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

উজ্জ্বলে সে বনরাজী, চন্দ্রাতপে ভেদি
সৌরকরপুঞ্জ যথা উৎসব-আলয়ে!
চিরপরিমলময় সমীর বহিছে
বাসস্ত! আদরে বীর কহিলা রাঘবে,---
“জুড়ালে নয়ন আজি, নরকুলমণি
মিত্রপৃত্র! ধন্য তুমি! ধরিলা তোমারে
শুভক্ষণে গর্ভে, শুভ, তোমার জননী ৷
ধন্য দশরথ সখা, জন্মদাতা তব!
দেবকুলপ্রিয় তুমি, তেঁই সে আইলে
সশরীরে এ নগরে। কহ, বৎস, শুনি,
রণ-বার্ত্তা! পড়েছে কি সমরে দুর্ম্মতি
রাবণ?” প্রণমি প্রভূ কহিলা সুস্বরে,---
“ও পদ-প্রসাদে, তাত, তুমুল সংগ্রামে,
বিনাশিনু বহু রক্ষে ; রক্ষঃকুলপতি
রাবণ একাকী বীর এবে রক্ষঃপুরে।
তার শরে হতজীব লক্ষ্মণ সুমতি
অনুজ ; আইল দাস এ দুর্গম দেশে,
শিবের আদেশে আজি! কহ, কৃপা করি,
কহ দাসে, কোথা পিতা, সখা তব, রথি?”
  কহিলা জটায়ু বলী, “পশ্চিম দুয়ারে
বিরাজেন রাজ-ঋষি রাজ-ঋষিদলে।
নাহি মানা মোর প্রতি ভ্রমিতে সে দেশে ;
যাইব তোমার সঙ্গে, চল, রিপুদমি!”
 বহুবিধ রম্য দেশ দেখিলা সুমতি,
বহু স্বর্ণ-অট্টালিকা ; দেবাকৃতি বহু
রথী ; সরোবরকূলে, কুসুমকাননে,
কেলিছে হরষে প্রাণী, মধুকালে যথা

১। চন্দ্রাতপ---চাঁদোয়া।
২৩। রিপু্দমি---শক্রদমনকারি।
২৪ । রম্য দেশ---মনোহর স্থান।
২৭। কেলিছে---কেলি করিতেছে। মধুকালে---বসন্তকালে।

গ্রন্থের ২৩৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

গুঞ্জরে ভ্রমরকুল সুনিকুঞ্জবনে ;
কিম্বা নিশাভাগে যথা খদ্যোত, উজলি
দশ দিশ! দ্রুতগতি চলিলা দুজনে!
লক্ষ লক্ষ লক্ষ প্রাণী বেড়িল রাঘবে।
 কহিলা জটায়ু বলী, “রঘুকুলোদ্ভব
এ সুরথী! সশরীরে শিবের আদেশে,
আইলা এ প্রেতপুরে, দরশন-হেতু
পিতৃপদ ; আশীর্ব্বাদি যাহ সবে চলি
নিজস্থানে, প্রাণীদল।” গেলা চলি সবে
আশীর্ব্বাদি। মহানন্দে চলিলা দুজনে।
কোথায় হেমাঙ্গগিরি উঠিছে আকাশে
বৃক্ষচূড়, জটাচূড় যথা জটাধারী
কপর্দ্দী! বহিছে কলে প্রবাহিণী ঝরি!
হীরা, মণি, মুক্তাফল ফলে স্বচ্ছ জলে।
কোথায় বা নীচদেশে শোভিছে কুসুমে
শ্যামভূমি ; তাহে সরঃ, খচিত কমলে!
নিরন্তর পিকবর কুহরিছে বনে।
 বিনতানন্দনাত্মজ কহিল সম্ভাষি
রাঘবে, “পশ্চিম দ্বার দেখ, রঘুমণি!
হিরন্ময় ; এ সুদেশে হীরক-নির্ম্মিত
গৃহাবলী। দেখ চেয়ে, স্বর্ণবৃক্ষমূলে,
মরকতপত্রছত্র দীর্ঘশিরোপরি,
কনক-আসনে বসি দিলীপ নৃমণি,
সঙ্গে সুদক্ষিণা সাধ্বী! পূজ ভক্তিভাবে
বংশের নিদান তব। বসেন এ দেশে
অগণ্য রাজর্ষিগণ,---ইক্ষাকু, মান্ধাতা,
নহুষ প্রভৃতি সবে বিখ্যাত জগতে।

১৩। কপর্দ্দী---শিব। কল---মধুরাস্ফুট শব্দ।
১৬। সরঃ---সরোবর।
১৮। বিনতানন্দনাত্মজ---গরুড়পুত্র অর্থাৎ জটায়ু।
২৪। সুদক্ষিণা--দিলীপের স্ত্রী।
২৫। নিদান---আদিকারণ, মূল।

গ্রন্থের ২৩৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

অগ্রসরি পিতামহে পূজ, মহাবাহু!”
 অগ্রসরি রথীশ্বর সাষ্টাঙ্গে নমিলা
দম্পতীর পদতলে ; সুধিলা আশীষি
দিলীপ, “কে তুমি? কহ, কেমনে আইলা
সশরীরে প্রেতদেশে, দেবাকৃতি রথি?
তব চন্দ্রানন হেরি আনন্দসলিলে
ভাসিল হৃদয় মম!” কহিলা সুস্বরে
সুদক্ষিণা, “হে সুভগ, কহ ত্বরা করি,
কে তুমি? বিদেশে যথা স্বদেশীয় জনে
হেরিলে জুড়ায় আঁখি, তেমনি জুড়াল
আঁখি মম, হেরি তোমা! কোন্‌ সাধ্বী নারী
শুভক্ষণে গর্ভে তোমা ধরিল, সুমতি!
দেবকুলোদ্ভব যদি, দেবাকৃতি, তুমি,
কেন বন্দ আমা দোঁহে? দেব যদি নহ,
কোন্‌ কুল উজ্জ্বলিলা নরদেবরূপে?”
 উত্তরিলা দাশরথি কৃতাঞ্জলিপুটে,---
“ভুবনবিখ্যাত পুত্র রঘু নামে তব,
রাজর্ষি, ভুবন যিনি জিনিলা স্ববলে
দিগ্বিজয়ী, অজ নামে তাঁর জনমিলা
তনয়---বসুধাপাল ; বরিলা অজেরে
ইন্দুমতী ; তার গর্ভে জনম লভিলা
দশরথ মহামতি ; তাঁর পাটেশ্বরী
কৌশল্যা ; দাসের জন্ম তাঁহার উদরে।
সুমিত্রা-জননী-পুত্র লক্ষ্মণ-কেশরী,
শত্রুঘ্ন---শক্রঘ্ন রণে! কৈকেয়ী জননী
ভরত ভ্রাতারে, প্রভু, ধরিলা গরভে!”
 উত্তরিলা রাজ-ঋষি, “রামচন্দ্র তুমি,
ইক্ষাকু-কুলশেখর, আশীষি তোমারে!

২। অগ্রসরি---অগ্রসর হইয়া।
১৪। বন্দ---বন্দনা কর।
২৫। শত্রুঘ্ন---শত্রুনাশক।

গ্রন্থের ২৩৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

নিত্য নিত্য কীর্ত্তি তব ঘোষিবে জগতে,
যত দিন চন্দ্র সূর্য্য উদয়ে আকাশে,
কীর্ত্তিমান! বংশ মম উজ্জ্বল ভূতলে
তব গুণে, গুণিশ্রেষ্ঠ! ওই যে দেখিছ
স্বর্ণগিরি, তার কাছে বিখ্যাত এ পুরে,
অক্ষয় নামেতে বট বৈতরণীতটে।
বৃক্ষমূলে পিতা তব পূজেন সতত
ধর্ম্মরাজে তব হেতু ; যাও, মহাবাহু,
রঘুকুল-অলঙ্কার, তাঁহার সমীপে।
কাতর তোমার দুঃখে দশরথ রথী।”
 বন্দি চরণারবিন্দ আনন্দে নৃমণি,
বিদায়ি জটায়ু শূরে, চলিলা একাকী
(অন্তরীক্ষে সঙ্গে মায়া) স্বর্ণগিরি দেশে
সুরম্য, অক্ষয় বৃক্ষে হেরিলা সুরথী
বৈতরণী নদীতীরে, পীযূষসলিলা
এ ভুমে ; সুবর্ণ-শাখা, মরকত পাতা,
ফল, হায়, ফলছটা কে পারে বর্ণিতে?
দেবারাধ্য তরুরাজ, মুকতিপ্রদায়ী।
 হেরি দূরে পুত্রবরে রাজর্ষি, প্রসরি
বাহুযুগ, (বক্ষঃস্থল আর্দ্র অশ্রুজলে)
কহিলা, “আইলি কি রে এ দুর্গম দেশে
এত দিনে, প্রাণাধিক, দেবের প্রসাদে,
জুড়াতে এ চক্ষুঃদ্বয়? পাইনু কি আজি
তোরে, হারাধন মোর? হায় রে, কত যে
সহিনু বিহনে তোর, কহিব কেমনে,
রামভদ্র? লৌহ যথা গলে অগ্নিতেজে,
তোর শোকে দেহত্যাগ করিনু অকালে।
মুদিনু নয়ন, হায়, হৃদয়জ্বলনে।

১৩। অন্তরীক্ষে---আকাশে।
১৮। দেবারাধ্য---দেবতাদিগের আরাধনীয়।
১৯। প্রসরি---বিস্তার করিয়া, অর্থাৎ বাড়াইয়।

গ্রন্থের ২৪০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

নিদারুণ বিধি, বৎস, মম কর্ম্মদোষে
লিখিলা আয়াস, মরি, তোর ও কপালে,
ধর্ম্মপথগামী তুই! তেঁই সে ঘটিল
এ ঘটনা ; তেঁই, হায়, দলিল কৈকেয়ী
জীবনকাননশোভা আশালতা মম
মত্ত মাতঙ্গিনী রূপে।” বিলাপিলা বলী
দশরথ ; দাশরথি কাঁদিলা নীরবে।
 কহিলা রাঘবশ্রেষ্ঠ, “অকূল সাগরে
ভাসে দাস, তাত, এবে ; কে তারে রক্ষিবে
এ বিপদে? এ নগরে বিদিত যদ্যপি
ঘটে যা ভবমণ্ডলে, তবে ও চরণে
অবিদিত নহে, কেন আইল এ দেশে
কিঙ্কর! অকালে, হায়, ঘোরতর রণে,
হত প্রিয়ানুজ আজি! না পাইলে তারে,
আর না ফিরিব যথা শোভে দিনমণি,
চন্দ্র, তারা! আজ্ঞা দেহ, এখনি মরিব,
হে তাত, চরণতলে! না পারি ধরিতে
তাহার বিরহে প্রাণ!" কাঁদিলা নৃমণি
পিতৃপদে ; পুত্রদুঃখে কাতর, কহিলা
দশরথ,---“জানি আমি, কি কারণে তুমি
আইলে এ পুরে, পুত্র। সদা আমি পূজি
ধর্ম্মরাজে, জলাঞ্জলি দিয়া সুখভোগে,
তোমার মঙ্গল হেতু। পাইবে লক্ষ্মণে,
সুলক্ষণ! প্রাণ তার এখনও দেহে
বদ্ধ, ভগ্ন কারাগারে বদ্ধ বন্দী যথা।
সুগন্ধমাদন গিরি, তার শৃঙ্গদেশে
ফলে মহৌষধ, বৎস, বিশল্যকরণী,
হেমলতা ; আনি তাহা বাঁচাও অনুজে।

২। আয়াস---ক্লেশ, দুঃখ।

গ্রন্থের ২৪১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ 

আপনি প্রসন্নভাবে যমরাজ আজি
দিলা এ উপায় কহি। অনুচর তব
আশুগতিপুত্র হনূ, আশুগতিগতি ;
প্রের তারে ; মুহুর্ত্তেকে আনিবে ঔষধে,
ভীমপরাক্রম বলী প্রভঞ্জনসম ।
নাশিবে সময়ে তুমি বিষম সংগ্রামে
রাবণে ; সবংশে নষ্ট হবে দুষ্টমতি
তব শরে ; রঘুকুললক্ষ্মী পুত্রবধূ
রঘুগৃহ পুনঃ মাতা ফিরি উজ্জ্বলিবে ;---
কিন্তু সুখ ভোগ ভাগ্যে নাহি, বৎস, তব!
পুড়ি ধূপদানে, হায়, গন্ধরস যথা
সুগন্ধে আমোদে দেশ, বহু ক্লেশ সহি,
পূরিবে ভারতভূমি, যশস্বি, সুযশে!
মম পাপ হেতু বিধি দণ্ডিলা তোমারে ;---
স্বপাপে মরিনু আমি তোমার বিচ্ছেদে।
 “অর্দ্ধগত নিশামাত্র এবে ভূমণ্ডলে।
দেববলে বলী তুমি, যাও শীঘ্র ফিরি
লঙ্কাধামে ; প্রের ত্বরা বীর হনূমানে ;
আনি মহৌষধ, বৎস, বাঁচাও অনুজে ;---
রজনী থাকিতে যেন আনে সে ঔষধে।”
 আশীষিলা দশরথ দাশরথি শূরে।
পিতৃ-পদধূলি পুত্র লইবার আশে,
অর্পিলা চরণপদ্মে করপদ্ম ;---বৃথা!
নারিলা স্পর্শিতে পদ! কহিলা সুস্বরে
রঘুজ-অজ-অঙ্গজ দশরথাঙ্গজে ;---
“নহে ভূতপূর্ব্ব দেহ এবে যা দেখিছ,
প্রাণাধিক! ছায়া মাত্র! কেমনে ছুঁইবে
এ ছায়া, শরীরী তুমি? দর্পণে যেমতি

৩। আশুগতিপুত্র---পবনপুত্র। আশুগতিগতি---পবনগতি, অর্থাৎ পবনের ন্যায় দ্রুতগামী।
8। প্রের---প্রেরণ কর, পাঠাও।

গ্রন্থের ২৪২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

প্রতিবিম্ব, কিম্বা জলে, এ শরীর মম।---
অবিলম্বে, প্রিয়তম, যাও লঙ্কাধামে।”
 প্রণমি বিস্ময়ে পদে চলিলা সুমতি,
সঙ্গে মায়া। কত ক্ষণে উতরিলা বলী
যথায় পতিত ক্ষেত্রে লক্ষণ সুরথী ;
চারি দিকে বীরবৃন্দ নিদ্রাহীন শোকে।

ইতি শ্রীমেঘনাদবধে কাব্যে প্রেতপুরী নাম
অষ্টমঃ সর্গঃ।





মিলনসাগরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর সম্পূর্ণ মেঘনাদবধ কাব্যের বিভিন্ন সর্গ পড়তে নীচের সূচীতে ক্লিক করুন...
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম