কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর মেঘনাদবধ কাব্য
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
মিলনসাগরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর মেঘনাদবধ কাব্যের সূচী...
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম
কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এর পরিচিতির পাতায় . . .
মেঘনাদবধ কাব্য নবম সর্গ
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রথম প্রকাশ ১৮৬১।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে রামকমল সিংহ দ্বারা প্রকাশিত, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবি সজনীকান্ত দাস দ্বারা মূলতঃ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ সংস্করণ থেকে গৃহীত ও সম্পাদিত এবং ১২৭৪ বঙ্গাব্দে (১৮৬৭ সালে) প্রকাশিত, কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-কৃত টীকা ও ব্যাখ্যা সহ।
মিলনসাগরে প্রকাশ ২১শে ফেব্রুয়ারী ২০২৬।

গ্রন্থের ২৪৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

নবম সর্গ
(সংস্ক্রিয়া নাম)

ভাতিল বিভাবরী ; জয় রাম নাদে
নাদিল বিকট ঠাট লঙ্কার চৌদিকে।
 কনক-আসন ত্যজি, বিষাদে ভূতলে
বসেন যথায়, হায়, রক্ষোদলপতি
রাবণ; ভীষণ স্বন স্বনিল সে স্থলে
সাগরকল্লোলসম! বিম্ময়ে সুরথী
সুধিলা সারণে লক্ষি,---“কহ ত্বরা করি,
হে সচিবশ্রেষ্ঠ বুধ, কি হেতু নিনাদে
বৈরিবৃন্দ, নিশাভাগে নিরাননদ শোকে?
কহ শীঘ্র! প্রাণদান পাইল কি পুনঃ
কপট-সমরী মূঢ় সৌমিত্রি? কে জানে---
অনুকূল দেবকুল ভাই বা করিল!
অবিরামগতি স্রোতে বাঁধিল কৌশলে
যে রাম ; ভাসিল শিলা যার মায়াতেজে
জলমুখে ; বাঁচিল যে দুইবার মরি
সমরে, অসাধ্য তার কি আছে জগতে?
কহ শুনি, মন্ত্রিবর, কি ঘটিল এবে?”
 কর পুটি মন্ত্রিবর উত্তরিলা খেদে ;---
“কে বুঝে দেবের মায়া এ মায়াসংসারে,
রাজেন্দ্র? গন্ধমাদন, শৈলকুলপতি,
দেবাত্মা, আপনি আসি গত নিশাকালে,
মহৌষধ-দানে, প্রভু, বাঁচাইলা পুনঃ
লক্ষণে ; তেঁই সে সৈন্য নাদিছে উল্লাসে।

১। প্রভাতিল---প্রভাত হইল। বিভাবরী---রাত্রি।
৭। লক্ষি---লক্ষ্য করিয়া।
৮। সচিবশ্রেষ্ঠ---মন্ত্রিপ্রধান। বুধ---পণ্ডিত।
১৮। কর পুটি---করযোড় করিয়া।
২১। দেবাত্মা---দেবতা যাহার আত্মা, অর্থাৎ অধিষ্ঠাত্রী।

গ্রন্থের ২৪৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

হিমান্তে দ্বিগুণতেজঃ ভুজঙ্গ যেমতি,
গরজে সৌমিত্রি শূর---মত্ত বীরমদে ;
গরজে সুগ্রীব সহ দাক্ষিণাত্য যত,
যথা করিযূথ, নাথ, শুনি যুথনাথে!”
 বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি কহিলা সুরথী
লঙ্কেশ,--- “বিধির বিধি কে পারে খণ্ডাতে?
বিমুখি অমর মরে, সম্মুখ-সমরে
বধিনু যে রিপু আমি, বাঁচিল সে পুনঃ
দৈববলে? হে সারণ, মম ভাগ্যদোষে,
ভূলিলা স্বধর্ম্ম আজি কৃতান্ত আপনি!
গ্রাসিলে কুরঙ্গে সিংহ ছাড়ে কি হে কভু
তাহায়? কি কাজ কিন্তু এ বৃথা বিলাপে?
বুঝিনু নিশ্চয় আমি, “ডুবিল তিমিরে
কর্ব্বুর-গৌরব-রবি! মরিল সংগ্রামে
শূলীশম্ভুসম ভাই কুম্ভকর্ণ মম,
কুমার বাসবজয়ী, দ্বিতীয় জগতে
শক্তিধর! প্রাণ আমি ধরি কোন্‌ সাধে?
আর কি এ দোঁহে ফিরি পাব ভবতলে?
যাও তুমি, হে সারণ, যথায় সুরথী
রাঘব ;---কহিও শূরে,---“রক্ষঃকুলনিধি
রাবণ, হে মহাবাহু, এই ভিক্ষা মাগে
তব কাছে,---তিষ্ট তুমি সসৈন্যে এ দেশে
সপ্ত দিন, বৈরিভাব পরিহরি, রথি!

১। হিমান্তে---শীতাবসানে, অর্থাৎ গ্রীষ্মে। ভুজঙ্গ---সর্প।
৪। করিযূথ---হস্তী। যূথ---হন্ত্যাদির দল।
৭। অমর---যাহাদিগের মৃত্যু নাই, অর্থাৎ দেবতাদি। মর---যাহাদিগের মৃত্যু আছে, অর্থাৎ মনুষ্যাদি।
১১। গ্রাসিলে-- গ্রাস করিলে। কুরঙ্গ--মৃগ।
১৪। কর্ব্বুর-গৌরব-রবি---রাক্ষসকুলের গৌববস্বরূপ সূর্য্য।
১৫। শূলীশম্ভুসম---শূলধারিমহাদেবসদৃশ।
১৬। কুমার---পুত্র অর্থাৎ মেঘনাদ। বাসবজয়ী---ইন্দ্রের জেতা।
১৭। শক্তিধর---কার্ত্তিকেয়।
২৩। পরিহরি---পরিহার, অর্থাৎ ত্যাগ করিয়া।

গ্রন্থের ২৪৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

পুত্রের সৎক্রিয়া রাজা ইচ্ছেন সাঁধিতে
যথাবিধি। বীরধর্ম্ম পাল রঘুপতি!---
বিপক্ষ সুবীরে বীর সম্মানে সতত।
তব বাহুবলে, বলি, বীরশূন্য এবে
বীরযোনি স্বর্ণলঙ্কা! ধন্য বীরকুলে
তুমি! শুভ ক্ষণে ধনুঃ ধরিলা। নৃমণি!
অনুকূল তব প্রতি শুভদাতা বিধি ;
দৈববশে রক্ষঃপতি পতিত বিপদে ;
পরমনোরথ আজি পূরাও, সিরথি।”
যাও শীঘ্র, মন্ত্রিবর, রামের শিবিরে।”
 বন্দি রক্ষঃকুল-ইন্দ্রে, সঙ্গীদল সহ,
চলিলা সচিবশ্রেষ্ঠ। অমনি খুলিল
ভীষণ নিনাদে দ্বার দ্বারপাল যত।
ধীরে ধীরে রাক্ষোমন্ত্রী চলিলা বিষাদে
চির-কোলাহলময় পয়োনিধিতীরে।
 শিবিরে বসেন প্রভু রঘুকুলমণি,
আনন্দসাগরে মগ্ন ; সম্মুখে সৌমিত্রি
রথীশ্বর, যথা তরু হিমানীবিহনে
নবরস ; পূর্ণশশী সুহাস আকাশে
পূর্ণিমায় ; কিন্বা পদ্ম, নিশা-অবসানে,
প্রফুল্ল! দক্ষিণে রক্ষঃ বিভীষণ-বলী
মিত্র, আর নেতৃ যত---দুর্দ্ধর্ষ সংগ্রামে,---
দেবেন্দ্র বেড়িয়া যেন দেবকুল-রথী!
 কহিল সংক্ষেপে বার্ত্তা বার্ত্তাবহ ত্বরা ;---
“রক্ষঃকুলমন্ত্রী, দেব, বিখ্যাত জগতে,
সারণ, শিবিরদ্বারে সঙ্গিদল সহ ;---

১। সৎক্রিয়া---সৎকার, অর্থাৎ দাহাদি।
৩। বিপক্ষ ইত্যাদি---বীরপুরুষেরা বীর বিপক্ষ হইলেও তাহার সম্মান করিয়া থাকেন।
৫। বীরযোনি---বীরপ্রসবিনী, অর্থাৎ যেখানে আনেক বীর আছে।
১৫। পয়োনিধি---সমুদ্র।
২৪। বার্ত্তাবহ---যে সংবাদ বহন করে, অর্থাৎ দূত।

গ্রন্থের ২৪৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

কি আজ্ঞা তোমার, দাসে কহ নরমণি।”
 আদেশিলা রঘুবর, “আন ত্বরা করি,
বার্ত্তাবহ, মন্ত্রিবরে সাদরে এ স্থলে।
কে না জানে, দূতকুল অবধ্য সমরে?
 প্রবেশি শিবিরে তবে সারণ কহিলা---
(বন্দি রাজপদযুগ) “রক্ষঃকুলনিধি
রাবণ, হে মহাবাহু, এই ভিক্ষা মাগে
তব কাছে,--- ‘তিষ্ঠ তুমি সসৈন্যে এ দেশে
সপ্ত দিন, বৈরিভাব পরিহরি, রথি!
পুত্রের সৎক্রিয়া রাজা ইচ্ছেন সাধিতে
যথাবিধি। বীরধর্ম্ম পাল, রঘুপতি!---
বিপক্ষ সুবীরে বীর সম্মানে সতত।
তব বাহুবলে, বলি, বীরশূন্য এবে
বীরযোনি স্বর্ণলঙ্কা! ধন্য বীরকুলে
তুমি! শুভ ক্ষণে ধনুঃ ধরিলা, নৃমণি ;
অনুকূল তব প্রতি শুভদাতা বিধি ;
দৈববশে রক্ষঃপতি পতিত বিপদে ;---
পরমনোরথ আজি পূরাও, সুরথি।’ ”
 উত্তরিলা রঘুনাথ,---“পরমারি মম,
হে সারণ, প্রভু তব ; তবু তাঁর দুঃখে
পরম দুঃখিত আমি, কহিনু তোমারে!
রাহুগ্রাসে হেরি সূর্য্যে কার না বিদরে
হৃদয়? যে তরুরাজ জ্বলে তাঁর তেজে
অরণ্যে, মলিনমুখ সেও হে সে কালে!
বিপদে অপর পর সম মম কাছে,
মন্ত্রিবর! যাও ফিরি স্বর্ণলঙ্কাধামে
তুমি, না ধরিব অস্ত্র সপ্ত দিন আমি
সসৈন্যে। কহিও, বুধ, রক্ষকুলনাথে,
ধর্ম্মকর্ম্মে রত জনে কভু না প্রহারে

২৯। প্রহারে---প্রহার করে।

গ্রন্থের ২৪৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

ধার্ম্মিক!” এতেক কহি নীরবিলা বলী।
 নতভাবে রক্ষোমন্ত্রী কহিলা উত্তরি ;---
“নরকুলোত্তম তুমি, রঘুকুলমণি ;
বিদ্যা, বুদ্ধি, বাহুবলে অতুল জগতে!
উচিত এ কর্ম্ম তব, শুন, মহামতি!
অনুচিত কর্ম্ম কভু করে কি সুজনে?
যথা রক্ষোদলপতি নৈকষেয় বলী ;
নরদলপতি তুমি, রাঘব! কুক্ষণে---
ক্ষম এ আক্ষেপ, রথি, মিনতি ও পদে!---
কুক্ষণে ভেটিলে দোঁহা দোঁহে রিপুভাবে!
বিধির নির্ব্বন্ধ কিন্তু কে পারে খণ্ডাতে?
যে বিধি, হে মহাবাহু, সৃজিলা পবনে
সিন্ধু-অরি ; মৃগ-ইন্দ্রে গজ-ইন্দ্র রিপু ;
খগেন্দ্রে নাগেন্দ্রবৈরী ; তাঁর মায়াছলে
রাঘব রাবণ-অরি---দোষিব কাহারে?”
 প্রসাদ পাইয়া! দূত চলিলা সত্বরে
যথায় রাক্ষসনাথ বসেন নীরবে,
তিতিয়া বসন, মরি নয়ন-আসারে,
শোকার্ত্ত! হেথায় আজ্ঞা দিলা নরপতি
নেতাবৃন্দে ; রণসজ্জা ত্যজি কুতূহলে,
বিরাম লভিলা সবে যে যার শিবিরে।
 যথায় অশোকবনে বসেন বৈদেহী,---
অতল জলধিতলে, হায় রে, যেমতি
বিরছে কমলা সতী, আইলা সরমা---
রক্ষঃকুলরাজলক্ষ্মী রক্ষোবধূবেশে।
বন্দি চরণারবিন্দ বসিলা ললনা
পদতলে। মধুস্বরে সুধিলা মৈথিলি,---
“কহ মোরে, বিধুমুখি, কেন হাহাকারে

১৪। খগেন্দ্র---পক্ষিরাজ, গরুড়।
২৮। হাহাকারে---হাহাকার করে।

গ্রন্থের ২৪৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

এ দুদিন পুরবাসী? শুনিনু সভয়ে
রণনাদ সারাদিন কালি রণভূমে ;
কাঁপিল সঘনে বন, ভূকম্পনে যেন,
দূর বীরপদভরে ; দেখিনু আকাশে
অগ্রিশিখাসম শর ; দিবা-অবসানে,
জয়-নাদে রক্ষঃসৈন্য পশিল নগরে,
বাজিল রাক্ষসবাদ্য গম্ভীর নিক্কণে!
কে জিনিল? কে হারিল? কহ ত্বরা করি,
সরমে! আকুল মনঃ, হায় লো, না মানে
প্রবোধ! না জানি হেথা জিজ্ঞাসি কাহারে?
না পাই উত্তর যদি সুধি চেড়ীদলে।
বিকটা ত্রিজটা, সখি, লোহিতলোচনা,
করে খরসান অসি, চামুণ্ডারূপিণী,
আইল কাটিতে মোরে গত নিশাকালে,
ক্রোধে অন্ধা! আর চেড়ী রোধিল তাহারে ;
বাঁচিল এ পোড়া প্রাণ ঠেঁউ, সুকেশিনি !
এখনও কাঁপে হিয়া স্মরিলে দুষ্টারে!”
 কহিলা সরমা সতী সুমধুর ভাষে ;---
“তব ভাগ্যে, ভাগ্যবতি, হতজীব রণে
ইন্দ্রজিত! তেঁই লঙ্কা বিলাপে এরূপে
দিবানিশি। এত দিনে গতবল, দেবি,
কর্ব্বুর-ঈশ্বর বলী! কাঁদে মন্দোদরী ;
রক্ষ-কুলনারীকুল আকুল বিষাদে ;
নিরানন্দ রক্ষোরথী। তব পুণ্যবলে,
পদ্মাক্ষি, দেবর তব লক্ষ্মণ সুরথী
দেবের অসাধ্য কর্ম্ম সাধিলা সংগ্রামে,---
বধিলা বাসবজিতে---অজেয় জগতে!”
 উত্তরিলা প্রিয়ন্বদা,---“সুবচনী তুমি

১৯। প্রবোধ---সান্ত্না।
১৫। রোধিল---রোধ, অর্থাৎ আটক করিল।
২৮। সুবচনী---দেবীবিশেষ। সরমাপক্ষে সুসংবাদদায়িনী।

গ্রন্থের ২৪৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

মম পক্ষে, রক্ষোবধু, সদা লো এ পুরে!
ধন্য বীর-ইন্দ্র-কুলে সৌমিত্রি কেশরী।
শুভ ক্ষণে হেন পুত্রে সুমিত্রা শাশুড়ী
ধরিলা সুগর্ভে, সই! এত দিনে বুঝি
কারাগারদ্বার মম খুলিলা বিধাতা
কৃপায়! একাকী এবে রাবণ দুর্ম্মতি
মহারথী লঙ্কাধামে। দেখিব কি ঘটে,---
দেখিব আর কি দুঃখ আছে এ কপালে?
কিন্তু শুন কান দিয়া! ক্রমশঃ বাড়িছে
হাহাকার-ধ্বনি, সখি।”---কহিলা সরমা
সুবচনী,---“কর্ব্বুরেন্দ্র রাঘবেন্দ্র সহ
করি সন্ধি, সিন্ধুতীরে লইছে তনয়ে
প্রেতক্রিয়াহেতু, সতি! সপ্ত দিবা নিশি
না ধরিবে অস্ত্র কেহ এ রাক্ষসদেশে
বৈরিভাবে--এ প্রতিজ্ঞা করিল নৃমণি
রাবণের অনুরোধে ;---দয়াসিন্ধু, দেবি,
রাঘবেন্দ্র! দৈত্যবালা প্রমীলা সুন্দরী---
বিদরে হৃদয়, সাধ্বি, স্মরিলে সে কথা!---
প্রমীলা সুন্দরী ত্যজি দেহ দাহস্থলে,
পতির উদ্দেশে সতী, পতিপরায়ণা,
যাবে স্বর্গপুরে আজি! হরকোপানলে,
হে দেবি, কন্দর্প যবে মরিলা পুড়িয়া,
 মরিলা কি রতি সতী প্রাণনাথে লয়ে?”
কাঁদিলা রাক্ষসবধূ তিতি অশ্রঃনীরে
শোকাকুলা। ভবতলে মূর্ত্তিমতী দয়া
সীতারূপে, পরদুঃখে কাতর সতত,
কহিলা---সজল আঁখি, সম্ভাষি সখীরে ;---
“কুক্ষণে জনম মম, সরমা রাক্ষসি!
সুখের প্রদীপ, সখি, নিবাই লো সদা
প্রবেশি যে গৃহে, হায়, অমঙ্গলারূপী

গ্রন্থের ২৫০-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

আমি। পোড়া ভাগ্যে এই লিখিলা বিধাতা।
নরোত্তম পতি মম, দেখ, বনবাসী!
বনবাসী, সুলক্ষণে, দেবর সুমতি
লক্ষ্মণ! ত্যজিলা প্রাণ পুত্রশোকে, সখি,
শ্বশুর! অযোধ্যাপুরী আঁধার লো এবে,
শৃন্য রাজসংহাসন! মরিলা জটায়ু,
বিকট বিপক্ষপক্ষে ভীমভুজবলে,
রক্ষিতে দাসীর মান! হ্যাদে দেখ হেথা,---
মরিল বাসবজিৎ অভাগীর দোষে,
আর রক্ষোরথী যত, কে পারে গণিতে!
মরিবে দানববালা অতুলা এ ভবে
সৌন্দর্য্য! বসন্তারম্ভে, হায় লো, শুখাল
হেন ফুল!”---“দোষ তব,”---সুধিলা সরমা,
(মুছিয়া নয়নজল--“কহ কি, রূপসি?
কে ছিঁড়ি আনিল হেথা এ স্বর্ণব্রততী,
বঞ্চিয়া রসালরাজে? কে আনিল তুলি
রাঘবমানসপদ্ম এ পাক্ষলদেশে?
নিজ কর্ম্মদোষে মজে লঙ্কা-অধিপতি!
আর কি কহিবে দাসী?” কাঁদিলা সরমা
শোকে! রক্ষঃকুলশোকে সে অশোক-বনে,
কাঁদিলা রাঘববাঞ্ছা---দুঃখী পর-দুঃখে।
 খুলিল পশ্চিম দ্বার অশনি-নিনাদে।
বাহিরিল লক্ষ রক্ষঃ স্বর্ণদণ্ড করে,
কৌষিক পতাকা তাহে উড়িছে আকাশে।
রাজপথ-পার্শ্বদ্বয়ে চলে সারি সারি
নীরবে পতাকিকুল, সর্ব্বাগ্রে দুন্দুভি
করিপৃষ্ঠে পূরে দেশ গম্ভীর আরবে।
পদব্রজে পদাতিক কাতারে কাতারে ;

১৫। স্বর্ণব্রততী---স্বর্ণলতা।
১৬। রসাল---আম্রবৃক্ষ।
২১। রাঘববাঞ্ছা---রাঘবের বাঞ্ছাস্বরূপ
২৬। পতাকিকুল---পতাকাধারীর দল।

গ্রন্থের ২৫১-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

বাজীরাজী সহ গজ ; রথীবৃন্দ রথে
মৃদুগতি, বাজে বাদ্য সকরুণ ক্বণে।
যত দূর চলে দৃষ্টি, চলে সিন্ধুমুখে
নিরানন্দে রক্ষোদল! ঝক ঝক ঝকে
স্বর্ণ-বর্ম্ম ধাঁধি আঁখি! রবিকরতেজে
শোভে হৈমধ্বজদণ্ড ; শিরোমণি শিরে ;
অসিকোষ সারসনে? দীর্ঘ শূল হাতে ;---
বিগলিত অশ্রুধারা, হায় রে, নয়নে!
 বাহিরিল বীরাঙ্গনা (প্রমীলার দাসী)
পরাক্রমে ভীমা-সমা, রূপে বিদ্যাধরী,
রণবেশে ;--- কৃষ্ণ-হয়ে নৃমুণ্ডমালিনী,
মলিন বদন, মরি, শশিকলাভাবে
নিশা যথা! অবিরল ঝরে অশ্রুধারা,
তিতি বস্ত্র, তিতি অশ্ব, তিতি বসুধারে!
উচ্ছ্বাসিছে কোন বামা ; কেহ বা কাঁদিছে
নীরবে ; চাহিছে কেহ রঘুসৈন্য পানে
অগ্নিময় আঁখি রোষে, বাঘিনী যেমনি
(জালাবৃত) ব্যাধবর্গে হেরিয়া অদূরে
হায় রে, কোথা সে হাসি---সৌদামিনী-ছটা!
কোথা সে কটাক্ষশর, কামের সমরে
সর্ব্বভেদী? চেড়ীবৃন্দ মাঝারে বড়বা
শূনপৃষ্ঠ, শোতাশূন্য, কুসুম বিহনে
বৃন্ত যথা! ঢুলাইছে চামর চৌদিকে
কিস্করী ; চলিছে সঙ্গে বামাব্রজ কাঁদি
পদব্রজে ; কোলাহল উঠিছে গগনে!
প্রমীলার বীরবেশ শোভে ঝলঝলে

২। ক্বণে---শব্দে।
৭। অসিকোষ---খাপ। সারসন---কোমরবন্ধ।
১১। কৃষ্ণ-হয়ে---কৃষবর্ণ অশ্বে।
১৫। উচ্ছ্বাসিছে---উচ্ছ্বাস, অর্থাৎ নিশ্বাস ছাড়িতেছে।
২৩। বৃন্ত---বোঁটা।
২৪। বামাব্রজ---স্ত্রীসমূহ।

গ্রন্থের ২৫২-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

বড়বার পৃষ্ঠে,---অসি, চর্ম্ম, তৃণ, ধনুঃ,
কিরীট, মণ্ডিত, মরি, অমূল রতনে!
সারসন মণিময় ; কবচ খচিত
সুবর্ণে,---মলিন দোঁহে। সারসন স্মরি,
হায় রে, সে সরু কটি! কবচ ভাবিয়া
সে সু-উচ্চ কুচযুগে---গিরিশৃঙ্গসম!
ছড়াইছে খই, কড়ী, স্বর্ণমুদ্রা-আদি
অর্থ, দাসী ; সকরুণে গাইছে গায়কী ;
পেশল-উরস হানি কাঁদিছে রাক্ষসী!
 বাহিরিল মৃদুগতি রথবৃন্দ মাঝে
রথবর, ঘনবর্ণ, বিজলীর-ছটা
চক্রে ; ইন্দ্রচাপরূপী ধ্বজ চূড়দেশে ;---
কিন্তু কান্তিশূন্য আজি, শূন্যকান্তি যথা
প্রতিমাপঞ্জর, মরি, প্রতিমা বিহনে
বিসর্জ্জন-অন্তে!---কাঁদে ঘোর কোলাহলে
রক্ষোরথী, ক্ষণ বক্ষঃ হানি মহাক্ষেপে
হতজ্ঞান! রথমধ্যে শোভে ভীম ধনুঃ,
তূণীর, ফলক, খড়গ, শংখ, চক্র, গদা-
আদি অস্ত্র; সুকবচ ; সৌরকর-রাশি-
সদৃশ কিরীট ; আর বীরভূষা যত।
সকরুণ গীতে গীতী গাইছে কাঁদিয়া
রক্ষোদুঃখ! স্বর্ণমুদ্রা ছড়াইছে কেহ,
ছড়ায় কুসুম যথা লড়ি ঘোর ঝড়ে
তরু! সুবাসিত জল ঢালে জলবহ,
দমি উচ্চগামী রেণু, বিরত সহিতে

৯। পেশল---কোমল। উরস--বক্ষঃস্থল। হানি---আঘাত করিয়া।
১৪। প্রতিমাপঞ্জর---দুর্গাদি প্রতিমার ঠাট অর্থাৎ কাটাম। দ্বিতীয় প্রতিমা--দুর্গাদির প্রতিমূর্ত্তি।
১৫। বিসর্জ্জন---জলাশয়ে ক্ষেপণ, অর্থাৎ ভাসান।
১৮। ফলক---ঢাল।
১৯। সৌরকর---সূর্য্যকিরণ। ২১। গীতী---গায়ক।
২৪। জলবহ---যে জল বহন করে, অর্থাৎ ভারী, ভিস্তি।

গ্রন্থের ২৫৩-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

পদভর। চলে রথ সিন্ধুতীরমুখে।
 সুবর্ণ-শিবিকাসনে, আবৃত কুসুমে,
বসেন শবের পাশে প্রমীলা সুন্দরী,
মর্ত্ত্যে রতি মৃত কাম সহ সহগামী!
ললাটে সিন্দুর-বিন্দু, গলে ফুলমালা,
কঙ্কণ মূণালভূজে ; বিবিধ ভূষণে
ভূষিতা রাক্ষসবধূ। ঢুলাইছে কাঁদি
চামরিণী সুচামর ; কাঁদি ছড়াইছে
ফুলরাশি বামাবৃন্দ। আকুল বিষাদে,
রক্ষঃকুল-নারীকুল কাঁদে হাহারবে।
হায় রে, কোথা সে জ্যোতিঃ ভাতিত যে সদা
মুখচন্দ্রে? কোথা, মরি, সে সুচারু হাসি,
মধুর অধরে নিত্য শোভিত যে, যথা
দিনকর-কররাশি তোর বিম্বাধরে,
পঙ্কজিনি? মৌনব্রতে ব্রতী বিধুমুখী---
পতির উদ্দেশে প্রাণ ও বরাঙ্গ ছাড়ি
গেছে যেন যথা পতি বিরাজেন এবে!
শুখাইলে তরুরাজ, শুধায় রে লতা,
স্বয়ম্বরা বধু ধনী। কাতারে, কাতারে,
চলে রক্ষোরথী সাথে, কোষশূন্য অসি
করে, রবিকর তাহে ঝলে ঝলঝলে,
কাঞ্চন-কঞ্চুক-বিভা নয়ন ঝলসে!
উচ্চে উচ্চারয়ে বেদ বেদজ্ঞ চৌদিকে ;
বহে হবির্ব্বহ হোত্রী মহামন্ত্র জপি ;
বিবিধ ভূষণ, বস্ত্র, চন্দন, কস্তুরী,
কেশর, কুঙ্কুম, পুষ্প বহে রক্ষোবধূ

২। শিবিকা---পাল্কি বিশেষ, অর্থাৎ চৌপালা।
৮। চামরিণী-চামরধারিবী, অর্থাৎ যাহারা চামর ঢুলায়।
১১। ভাতিত---ভাতি অর্থাৎ দীপ্তি পাইত।
২৩। উচ্চারয়ে---উচচারণ করে।
২৪। হবির্ব্বহ---অগ্নি। হোত্রী---হোমকর্ত্তা

গ্রন্থের ২৫৪-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

স্বর্ণপাত্রে ; স্বর্ণকুম্ভে পূত অম্ভোরাশি
গাঙ্গেয়। সুবর্ণদীপ দীপে চারি দিকে।
বাজে ঢাক, বাজে ঢোল, কাড়া কড়কড়ে ;
বাজে করতাল, বাজে মৃদঙ্গ, তুম্বকী ;
বাজিছে ঝাঁঝরী, শংখ ; দেয় হুলাহুলি
সধবা রাক্ষসনারী আর্দ্র অশ্রুনীরে---
হায় রে, মঙ্গলধ্বনি অমঙ্গল দিনে!
 বাহিরিলা পদব্রজে রক্ষঃকুলরাজা
রাবণ ;--- বিশদবস্ত্র, বিশদ উত্তরি,
ধুতুরার মালা যেন ধূর্জ্জটির গলে ;---
চারি দিকে মন্ত্রিদল দূরে নতভাবে।
নীরব কর্ব্বুরপতি, অশ্রপূর্ণ আঁখি,
নীরব সচিববৃন্দ, অধিকারী যত
রক্ষঃশ্রেঠ। বাহিরিল কাঁদিয়া পশ্চাতে
রক্ষোপুরবাসী রক্ষঃ---আবাল, বনিতা,
বৃদ্ধ ; শূন্য করি পুরী, আঁধার রে এবে
গোকুলভবন যথা শ্যামের বিহনে!
ধীরে ধীরে সিন্ধুমুখে, তিতি অশ্রুনীরে,
চলে সবে, পূরি দেশ বিষাদ-নিনাদে!
 কহিলা অঙ্গদে প্রভূ সুমধুর স্বরে---
“দশ শত রথী সঙ্গে যাও, মহাবলি
যুবরাজ, রক্ষঃ সহ মিত্রভাবে তুমি,
সিন্ধুতীরে! সাবধানে যাও, হে সুরথি!
আকুল পরাণ মম রক্ষঃকুলশোকে!
এ বিপদে পরাপর নাহি ভাবি মনে,
কুমার! লক্ষ্মণ-শূরে হেরি পাছে রোষে,
পূর্ব্বকথা স্মরি মনে কর্ব্বুরাধিপতি,
যাও তুমি, যুবরাজ! রাজচূড়ামণি,

১। পূত-পবিত্র।
২। গাঙ্গেয়---গঙ্গাসম্বন্ধী।
১। বিশদবস্ত্র---শুভ্র পরিধেয় বস্ত্র।
২৫। পরাপর---আপন পর।

গ্রন্থের ২৫৫-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

পিতা তব বিমুখিলা সমরে রাক্ষসে,
শিষ্টাচারে, শিষ্টাচার, তোষ তুমি তারে!”
 দশ শত রথী সাথে চলিলা সুরথী
অঙ্গদ সাগরমুখে। আইলা আকাশে
দেবকুল ;---ঐরাবতে দেবকুলপতি।
সঙ্গে বরাঙ্গনা শচী অনন্তযৌবনা,
শিখিধ্বজে শিখিধ্বজ স্কন্দ তারকারি
সেনানী ; চিত্রিত রথে চিত্ররথ রথী,
মৃগে বায়ুকুলরাজ ; ভীষণ মহিষে
কৃতান্ত ; পুষ্পকে যক্ষ, অলকার পতি ;---
আইলা রজনীকান্ত শান্ত সুধানিধি,
মলিন তপনতেজে ; আইলা সুহাসী
অশ্বিনীকুমারযুগ, আর দেব যত।
আইলা সুরসুন্দরী, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা,
কিন্নর, কিন্নরী। রঙ্গে বাজিল অন্বরে
দিব্য বাদ্য। দেব-ঋষি আইলা কৌতুকে,
আর আর প্রাণী যত ত্রিদিবনিবাসী।
 উতরি সাগরতীরে, রচিলা সত্বরে
যথাবিধি চিতা রক্ষঃ ; বহিল বাহকে
সুগন্ধ চন্দনকাষ্ঠ, ঘৃত ভারে ভারে।
মন্দাকিনী-পূতজলে ধুইয়া যতনে
শবে, সুকৌষিক বস্ত্র পরাই, থুইল
দাহস্থানে রক্ষোদল ; পড়িলা গম্ভীরে
মন্ত্র রক্ষঃ-পুরোহিত। অবগাহি দেহ
মহাতীর্থে সাধ্বী সতী প্রমীলা সুন্দরী
খুলি রত্ন-আভরণ, বিতরিলা সবে।

২। [ হে ] শিষ্টাচার---হে ভদ্র।
৭। স্কন্দ---কার্ত্তিকেয়।
৮। সেনানী---সেনাপতি। চিত্রিত---নানাবর্ণিত।
১২। তপনতেজে---সূর্য্যতেজে।
১৫। অম্বরে---আকাশে।
১৬। দিব্য---স্বর্গীয়।
২৬। বিতরিলা---বিতরণ অর্থাৎ দান করিল।

গ্রন্থের ২৫৬-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

প্রণমিয়া গুরুজনে মধুরভাষিণী,
সম্ভাষি মধুরভাষে দৈত্যবালাদলে,
কহিলা,---“লো সহচরি, এত দিনে আজি
ফুরাইল জীবলীলা জীবলীলাস্থলে
আমার। ফিরিয়া সবে যাও দৈত্যদেশে!
কহিও পিতার পদে এ সব বারতা,
বাসন্তি! মায়েরে মোর”---হায় রে, বহিল
সহসা নয়নজল! নীরবিলা সতী ;---
কাঁদিল দানববালা হাহাকার রবে!
 মুহূর্তে সম্বরি শোক, কহিলা সুন্দরী,
“কহিও মায়েরে মোর, এ দাসীর ভালে
লিখিলা বিধাতা যাহা, তাই লো ঘটিল
এত দিনে! যাঁর হাতে সঁপিলা দাসীরে
পিতা মাতা, চলিনু লো আজি তাঁর সাথে ;---
পতি বিনা অবলার কি গতি জগতে?
আর কি কহিব, সখি? ভুল না লো তারে---
প্রমীলার এই ভিক্ষা তোমা সবা কাছে!”
 চিতায় আরোহি সতী (ফুলাসনে যেন!)
বসিলা আনন্দমতি পতি-পদতলে ;
প্রফুল্প কুসুমদাম কবরী-প্রদেশে।
বাজিল রাক্ষসবাদ্য ; উচ্চে উচ্চারিল
বেদ বেদী ; রক্ষোনারী দিল হুলাহুলি ;
সে রবের সহ মিশি উঠিল আকাশে
হাহারব! পুষ্পবৃষ্টি হইল চৌদিকে।
বিবিধ ভূষণ, বস্ত্র, চন্দন, কস্তুরী,
কেশর, কুঙ্কুম-আদি দিল রক্ষোবালা
যথাবিধি ; পশুকুলে নাশি তীক্ষ্ণ শরে

৪। জীবলীলাস্থলে---জীবনের লীলার স্থানে অর্থাৎ সংসারে।
১৮। আরোহি---আরোহণ করিয়া।
২০। কুসুমদাম---ফুলমালা। কবরী---কেশপাশ।
২২। বেদী---বেদজ্ঞ।

গ্রন্থের ২৫৭-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

ঘৃতাক্ত করিয়া রক্ষঃ যতনে থুইল
চারি দিকে, যথা মহানবমীর দিনে,
শাক্ত ভক্ত-গৃহে, শক্তি, তব পীঠতলে !
 অগ্রসরি রক্ষোরাজ কহিলা কাতরে ;
“ছিল আশা, মেঘনাদ, মূদিব অন্তিমে
এ নয়নদ্বয় আমি তোমার সম্মুখে ;---
সঁপি রাজ্যভার, পুত্র, তোমায়, করিব
মহাযাত্রা। কিন্তু বিধি---বুঝিব কেমনে
তার লীলা? ভাঁড়াইলা সে সুখ আমারে!
ছিল আশা, রক্ষঃকুল-রাজ-সিংহাসনে
জুড়াইব আঁখি, বৎস, দেখিয়া তোমারে,
বামে রক্ষকুললক্ষ্মী রক্ষোরাণীরূপে
পুত্রবধূ! বৃথা আশা! পূর্ব্বজন্মফলে
হেরি তোমা দোঁহে আজি এ কাল-আসনে!
কর্ব্বুর-গৌরব-রবি চির রাহুগ্রাসে!
সেবিনু শিবেরে আমি বহু যত্ন করি,
লভিতে কি এই ফল? কেমনে ফিরিব,---
হায় রে, কে কবে মোরে, ফিরিব কেমনে
শূন্য লঙ্কাধামে আর? কি সান্ত্বনাছলে
সান্ত্বনিব মায়ে তব, কে কবে আমারে?
কোথা পুত্র পুত্রবধূ আমার? সুধিবে
যবে রাণী মন্দোদরী,---“কি সুখে আইলে
রাখি দোঁহে সিন্ধুতীরে, রক্ষঃকুলপতি?
কি কয়ে বুঝাব তারে? হায় রে, কি কয়ে?
হা পুত্র! হা বীরশ্রেষ্ঠ! চিরজয়ী রণে।
হা মাতঃ রাক্ষসলক্ষ্মী! কি পাপে লিখিলা
এ পীড়া দারুণ বিধি রাবণের ভালে?”

৩। শাক্ত---শক্তি-উপাসক। শক্তি---দুর্গা।
৫। অন্তিমে---শেষাবস্থায় অর্থাাৎ মরণকালে।
৮। মহাযাত্রা---মরণযাত্রা।
২০। সান্ত্বনিব---সান্ত্বনা করিব।
২৭। দারুণ---কঠিন, নিষ্ঠুর।

গ্রন্থের ২৫৮-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

 অধীর হইলা শূলী কৈলাস-আলয়ে!
লড়িল মস্তকে জটা ; ভীষণ গর্জ্জনে
গর্জ্জিল ভুজঙ্গবৃন্দ ; ধক ধক ধকে
জ্বলিল অনল ভালে ; ভৈরব কল্লোলে
কল্লোলিলা ত্রিপথগা, বরিষায় যথা
বেগবতী স্রোতস্বতী পর্ব্বতকন্দরে!
কাঁপিল কৈলাসগিরি থর থর থরে!
কাঁপিল আতঙ্কে বিশ্ব ; সভয়ে অভয়া
কৃতাঞ্জলিপুটে সাধ্বী কহিলা মহেশে ;---
 “কি হেতু সরোষ, প্রভু, কহ তা দাসীরে?
মরিল সমরে রক্ষঃ বিধির বিধানে ;
নহে দোষী রঘুরথী! তবে যদি নাশ
অবিচারে তারে, নাথ, কর ভস্ম আগে
আমায়।” চরণযুগ ধরিলা জননী।
 সাদরে সতীরে তুলি কহিলা ধূর্জ্জটি ;---
“বিদরে হৃদয় মম, নগরাজবালে,
রক্ষোদুঃখে! জান তুমি কত ভালবাসি
নৈকষেয় শূরে আমি! তব অনুরোধে,
ক্ষমিব, হে ক্ষেমঙ্করি, শ্রীরাম লক্ষ্মণে।”
 আদেশিলা অগ্নিদেবে বিষাদে ত্রিশূলী ;---
“পবিত্রি, হে সর্ব্বশুচি, তোমার পরশে,
আন শীঘ্র এ সুধামে রাক্ষসদম্পতী।
ইরম্মদরূপে অগ্নি ধাইলা ভূতলে!
সহসা জ্বলিল চিতা। সচকিতে সবে
দেখিলা আগ্নেয় রথ ; সুবর্ণ-আসনে
সে রথে আসীন বীর বাসববিজয়ী

১। শূলী---মহাদেব।
৩। ভুজঙ্গবৃন্দ---সর্পসমূহ।
৪। অনল---অগ্নি।
৫। ত্রিপথগা--- ত্রিপথগামিনী অর্থাৎ গঙ্গা।
৬। স্রোতস্বতী---নদী।
৮। আতঙ্কে---ভয়ে।
২১। সর্ব্বশুচি---সকলকে যে পবিত্র করে, অর্থাৎ অগ্নি।
২৩। ইরম্মদরূপে---বজ্রাগ্নিরূপে।

গ্রন্থের ২৫৯-পৃষ্ঠা ঃঃঃঃঃ

দিব্যমুক্তি! বাম ভাগে প্রমীলা রূপসী,
অনস্ত যৌবনকান্তি শোভে তনুদেশে ;
চিরসুখহাসিরাশি মধুর অধরে!
 উঠিল গগনপথে রথবর বেগে ;
বরষিলা পুষ্পাসার দেবকুল মিলি ;
পূরিল বিপুল বিশ্ব আনন্দ-নিনাদে!
 দুগ্ধধারে নিবাইল উজ্জ্বল পাবকে
রাক্ষস। পরম যত্নে কুড়াইয়া সবে
ভস্ম, অম্বুরাশিতলে বিসর্জ্জিলা তাহে!
ধৌত করি দাহস্থল জাহ্নবীর জলে
লক্ষ রক্ষঃশিল্পী আশু নির্ম্মিল মিলিয়া
স্বর্ণ-পাটিকেলে মঠ চিতার উপরে ;---
ভেদি অভ্র, মঠচূড়া উঠিল আকাশে।
 করি স্নান সিন্ধুনীরে, রক্ষোদল এবে
ফিরিলা লঙ্কার পানে, আর্দ্র অশ্রুনীরে---
বিসর্জ্জি প্রতিমা যেন দশমী দিবসে!
সপ্ত দিবানিশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে॥

ইতি শ্রীমেঘনাদবধে কাব্যে সংস্ক্রিয়া নাম
নবমঃ সর্গঃ।




২। তনুদেশে---শরীরে।
৫। পুষ্পসার---পুষ্পবৃষ্টি।
১২। পাটিকেলে---ইট। মঠ---মন্দির।
১৬। বিসর্জ্জি---বিসর্জ্জন করিয়া। প্রতিমা---দুর্গাদির প্রতিমূর্ত্তি।


গ্রন্থ সমাপ্ত।



মিলনসাগরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর সম্পূর্ণ মেঘনাদবধ কাব্যের বিভিন্ন সর্গ পড়তে নীচের সূচীতে ক্লিক করুন...
প্রথম সর্গ - অভিষেকো নাম
দ্বিতীয় সর্গ - অস্ত্রলাভো নাম
তৃতীয় সর্গ - সমাগমো নাম
চতুর্থ সর্গ - অশোকবনং নাম
পঞ্চম সর্গ - উদ্যোগো নাম
ষষ্ঠ সর্গ - বধো নাম
সপ্তম সর্গ - শক্তিনির্ভেদো নাম
অষ্টম সর্গ - প্রেতপুরী নাম
নবম সর্গ - সংস্ক্রিয়া নাম