প্রতিবাদী কবিতার দেয়ালিকা
|
|
|
এই পাতাটি পাশাপাশি, ডাইনে-বামে ও কবিতাগুলি উপর-নীচ স্ক্রল করে! This page scrolls sideways < Left - Right >. Poems scroll ^ Up - Down v.
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
স্বদেশবাসী বন্ধুগণ!
... পরিশেষে যে সব সাথী আজ অন্তরীনে অথবা কারাবাসে,
লাঞ্ছনা ও নির্যাতন ভোগ করিতেছেন,
আপনাদের মারফত দিয়া আমি তাঁহাদের নিকট
আমার সাদর অভিনন্দন ও প্রীতিপূর্ণ শুভেচ্ছা প্রেরণ করিতে
চাই।
তাঁহারা যেন মনের উৎসাহ আনন্দ ও স্ফূর্তি না হারান।
তাঁহাদের কে গিয়া বলুন যে মাতৃভূমির সম্মান ও মর্যাদা
তাঁহারাই রক্ষা করিয়াছেন।
তাঁহাদের লাঞ্ছনা ও নির্যাতন পৃথিবীকে জানাইয়া দিয়াছে যে---
পরাধীন ভারতবাসী আজ ইংরাজের সহিত সংগ্রামে রত।
আমরা যাহারা আজ ভারতের বাহিরে কাজ করিতেছি,
আমারা তাঁহাদের গর্বে গর্বিত।
প্রতিদিন তাঁহাদের কথা আমরা চিন্তা করি
এবং তাঁহাদের উদ্দেশ্যে প্রীতি ও শ্রদ্ধার অঞ্জলি নিবেদন করি।
আবার তাঁহাদের নিকট গিয়া বলুন যে
তাঁহাদের এই কারাবাস, দুঃখ ও ত্যাগ কখনো ব্যর্থ হইতে
পারে না।
স্বদেশবাসী বন্ধুগণ! নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু (২৩.১.১৮৯৭ - মৃত্যুহীন)। নেতাজীর, বিদেশ থেকে রেডিওতে প্রচারিত একটি বক্তৃতার শেষাংশ। নেতাজী জার্মানী থেকে
জাপান যাত্রার প্রাক্কালে, রেডিও বার্লিন থেকে কিছু রেকর্ড-করা বক্তৃতা, সম্প্রচার করার ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে ইংরেজরা তাঁর প্রকৃত অবস্থান না জানতে পারে। দক্ষিণপূর্ব
এশিয়া ও জাপানে পৌঁছে তিনি কিছু বক্তৃতা সেখানকার রেডিও থেকেও সম্প্রচার করেন। সেই বক্তৃতাগুলি “আমি সুভাষ বলছি” নামে খ্যাতি লাভ করে এবং প্রায় প্রত্যেক রেডিওর
মালিকের বাড়ীতেই, অতি গোপনে, জানালা-দরোজা বন্ধ করে, সেই বক্তৃতা শুনতে ভীড় করতেন ভারতবাসীগণ। ভিডিওটি সৌজন্যে সুজিত মন্ডল, ধান্যকুড়িয়া, ২নং বিশ্বাসপাড়া।
আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ NetajiSubhashVideos YouTube Channel. যদি এই মানুষেরা না জন্মাতেন, তাহলে আজ আমরা কি অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে “স্বাধীন” দেশে
জন্মাতে পারতাম? তাই এঁদের কথা, বাণী, বক্তৃতা, লেখা, আমাদের কাছে কবিতাই ! মিলনসাগর, এই বক্তৃতাটিকে, এই প্রতিবাদী সংকলনে স্থান দিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছে।
জয় হিন্দ! বন্দেমাতরম!
শিকল-পরার গান
এই শিকল-পরা ছল মোদের্ এ শিকল-পরা ছল |
এই শিকল প’রেই শিকল তোদের কর্ ব রে বিকল ||
তোদের বন্ধ কারার আসা মোদের বন্দী হ’তে নয়,
ওরে ক্ষয় ক’রতে আসা মোদের সবার বাঁধন-ভয় |
এই বাঁধন প’ড়েই বাঁধন-ভয়কে ক’রবো মোরা জয়,
এই শিকল-বাঁধা পা নয় এ শিকল-ভাঙা কল ||
তোমার বন্ধ ঘরের বন্ধনীতে কর্ ছ বিশ্ব গ্রাস,
আর ত্রাস দেখিয়েই কর্ বে ভাবছো বিধির শক্তি হ্রাস !
সেই ভয় দেখানো ভূতের মোরা কর্ ব সর্ব্বনাশ,
এবার আন্ বো মাভৈঃ-বিজয় -মন্ত্র বল-হীনের বল ||
তোমরা ভয় দেখিয়ে কর্ ছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয় ;
সেই ভয়ের টুটিই ধর্ ব টিপে,’ ক’রব তা’রে লয় |
মোরা আপনি ম’রে মরার দেশে আন্ ব বরাভয় ;
মোরা ফাঁসি প’রে আনব হাসি মৃত্যু-জয়ের ফল ||
ওরে ক্রন্দন নয় বন্ধন এই শিকল-ঝঞ্ঝনা,
এ যে মুক্তি পথের অগ্রদূতের চরণ-বন্দনা !
এই লাঞ্ছিতেরাই অত্যাচারকে হান্ ছে লাঞ্ছনা,
মোদের অস্থি দিয়েই জ্বলবে দেশে আবার বজ্রানল ||
ভাঙার গান
কারার ঐ লৌহ-কপাট, ভেঙে ফেল্ , কর্ রে লোপাট
রক্ত-জমাট শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী !
ওরে ও তরুণ ঈশান ! বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ !
ধ্বংস-নিশান উড়ুক প্রাচী’র, প্রাচীর ভেদি’ |
গাজনের বাজ্ না বাজা ! কে মালিক? কে সে রাজা?
কে দেয় সাজা, মুক্ত-স্বাধীন সত্য কে রে?
হা হা হা পায় যে হাসি, ভগবান পর্ বে ফাঁসি?
সর্ব্বনাশী শিখায় এ হীন্ তথ্য কে রে?
ওরে ও পাগলা ভোলা ! দে রে দে প্রলয়-দোলা
গারদগুলা জোর্ সে ধ’রে হেঁচ্ কা টানে !
মার হাঁক হৈদরী হাঁক, কাঁধে নে দুন্দুভি ঢাক
ডাক ওরে ডাক্ মৃত্যুকে ডাক্ জীবন পানে !
নাচে ঐ কাল-বোশেখী, কাটাবি কাল ব’সে কি?
দেয় রে দেখি ভীম-কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি’ !
লাথি মার্ ভাঙ্ রে তালা ! যত সব বন্দী-শালায়
আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা, ফেল্ উপাড়ি’ |
. বল বীর---
. বল উন্নত মম শির !
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর !
. বল বীর---
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি'
. চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি'
. ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,
. খোদার আসন "আরশ" ছেদিয়া
. উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর !
মম ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর !
. বল বীর---
. আমি চির-উন্নত শির !
আমি চিরদুর্দ্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাক্লোন, আমি ধ্বংস,
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর !
. আমি দুর্ব্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার !
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ'লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল !
আমি মানি নাকো কোনো আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম,
. ভাসমান মাইন !
আমি ধূর্জ্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর !
আমি বিদ্রোহী আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর !
. বল বীর---
. চির উন্নত মম শির !
আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণী,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণী !
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ |
আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠুমকি' ছমকি'
. পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি'
. ফিং দিয়া দিই তিন দোল্ !
আমি চপলা-চপল হিন্দোল !
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা',
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পঞ্জা,
. আমি উদ্দাম, আমি ঝঞ্ঝা !
আমি মহামারী, আমি ভীতি এ ধরিত্রীর |
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর |
. বল বীর---
. আমি চির-উন্নত শির !
. আমি চির-দুরন্ত-দুর্ম্মদ,
আমি দুর্দ্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দ্দম্ হ্যায়্ হর্দ্দম্
. ভরপুর মদ |
আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক, জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি !
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান |
আমি ইন্দ্রাণি-সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য্য,
মম এক হাতে-বাঁকা ভাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য্য |
আমি কৃষ্ণ-কণ্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির |
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর |
. বল বীর--- চির উন্নত মম শির |
আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক !
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনা ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ !
আমি বজ্র, আমি ঈশাণ-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার,
আমি পিনাক-পাণির ডমরু-ত্রিশূল, ধর্ম্মরাজের দণ্ড,
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ-প্রচণ্ড !
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব !
আমি প্রাণ-খোলা-হাসি উল্লাস,--- আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা-প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস !
আমি কভু প্রশান্ত,--- কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্প-হারী !
আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,
আমি উজ্জ্বল আমি প্রোজ্জ্বল,
আমি উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল্ দোল !
আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম-উদ্দাম, আমি ধন্যি |
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধাতার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর !
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত
. বুকে গতি ফের !
আমি অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
চিত- চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর !
আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল ক'রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা'র কাঁকন-চুড়ির কন্-কন্ |
আমি চির-শিশু, চির-কিশোর,
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর !
আমি উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাসী পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীনে গান গাওয়া!
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র রবি,
আমি মরু-নির্ঝর ঝর-ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!---
আমি তুরিয়ানন্দে ছুটে চলি এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে
. সব বাঁধ !
আমি উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব বিজয় কেতন !
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া
. স্বর্গ-মর্ত্ত্য করতলে,
. তাজি বোরবাক্ আর উচ্চৈস্রবা বাহন আমার
. হিম্মত-হ্রেস্বা হেঁকে চলে !
আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্নি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথার-কলরোল-কল-কোলাহল !
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া, দিয়া লম্ফ,
আণি ত্রাস সঞ্চারি ভুবনে সহসা, সঞ্চরি' ভূমি-কম্প !
. ধরি বাসুকির ফণা জাপটি',---
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি' !
. আমি দেব-শিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব-মায়ের অঞ্চল !
. আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
. মহা- সিন্ধু উতলা ঘুম্-ঘুম্
. ঘুম্ চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুম্
. মম বাঁশরী তানে পাশরি'
. আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী |
আমি রুষে উঠে' যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হারিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া !
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া !
আমি প্লাবন-বন্যা,
কভু ধরণীরে করি বরণীয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা---
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা !
আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণি !
আমি ছিন্নমস্তা চণ্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি !
আমি মৃণ্ময়, আমি চিন্ময়,
আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয় !
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
. বিশ্বের আমি চির দুর্জ্জয়,
. জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ-পাতাল-মর্ত্ত্য
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ !!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে
. সব বাঁধ !!
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
. নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার !
আমি হল বলরাম স্কন্ধে,
আমি উপাড়ি' ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে |
. মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
. আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উত্পীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাশে ধ্বনিবে না,
. অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে কণিবে না---
. বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
. আমি আমি সেই দিন হব শান্ত !
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন !
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন !
. আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন !
. আমি চির-বিদ্রোহী বীর---
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির !
আজি রক্ত নিশি-ভোরে / একি এ শুনি ওরে / মুক্তি-কোলাহল বন্দী-শৃঙ্খলে,
ঐ কাহারা কারাবাসে / মুক্তি-হাসি হাসে, / টুটেছে ভয়-বাধা স্বাধীন হিয়া-তলে
ললাটে লাঞ্ছনা-রক্ত-চন্দন, / বক্ষে গুরু শিলা, হস্তে বন্ধন
নয়নে ভাস্বরসত্য-জ্যোতি-শিখা, / স্বাধীন দেশ-বাণী কন্ঠে ঘন বোলে,
সে ধ্বনি ওঠে রণি’ ত্রিংশ কোটি ঐ / মানব-কল্লোলে ||
ওরা দু’পায়ে দ’লে গেল মরণ-শঙ্কারে, / সবারে ডেকে’ গেল শিকল ঝঙ্কারে,
বাজিল নভ-তলে স্বাধীন ডঙ্কা রে, / বিজয়-সঙ্গীত বন্দী গেয়ে’ চলে’
বন্দীশালা মাঝে ঝঞ্ঝা প’শেছে রে / উতল কলরোলে ||
আজি কারার সারা দেহে মুক্তি-ক্রন্দন, / ধ্বনিছে হা হা-স্বরে ছিঁড়িতে বন্ধন,
নিখিল গেহ যথা বন্দী-কারা, সেথা / কেন রে কারা ত্রাসে মরিবে বীর-দলে |
“জয় হে বন্ধন” গাহিল তাই তা’রা / মুক্ত নভ-তলে ||
আজি ধ্বনিছে দিগ্বধূ-শঙ্খ দিকে দিকে, / গগনে কা’রা যেন চাহিয়া অনিমিখে,
ধূ ধূ ধূ হোম-শিখা জ্বলিল ভারতে রে,
ললাটে জয়টীকা, প্রসূন-হার-গলে / চলে রে বীর চলে ;
সে নহে নহে কারা, যেখানে ভৈরব / রুদ্র-শিখা জ্বলে ||
জয় হে বন্ধন-মৃত্যু-ভয় হর ! মুক্তি-কামী জয় !
স্বাধীন-চিত জয় ! জয় হে !! / জয় হে ! জয় হে !
সুপার ( জেলের ) বন্দনা
তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে, তুমি ধন্য ধন্য হে।
আমার এ গান তোমারই ধ্যান, তুমি ধন্য ধন্য হে॥
রেখেছ সান্ত্রী পাহারা দোরে
আঁধার কক্ষে জামাই-আদরে,
বেঁধেছ শিকল-প্রণয়-ডোরে।
তুমি ধন্য ধন্য হে॥
আ--কাঁড়া চালের অন্ন-লবণ,
করেছ আমার রসনা-লোভন,
বুড়ো ডাঁটা-ঘাঁটা লাপ্ সী শোভন,
তুমি ধন্য ধন্য হে॥
ধর ধর খুড়ো চপেটা মুষ্টি,
খেয়ে গয়া পাবে সোজা স--গুষ্টি,
ওল ছোলা দেহ ধবল-কুষ্টি
তুমি ধন্য ধন্য হে॥
দুর্গম গিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার !
দুলিতেছে তরী ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ ?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ |
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার ||
তিমির রাত্রি মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান !
যুগযুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান |
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,
ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে দিতে হবে অধিকার ||
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরণ,
কান্ডারী ! আজি দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি-পণ !
“হিন্দু না ওরা মুসলিম ?” ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন ?
কান্ডারী ! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র !
গিরি-সঙ্কট, ভীরু যাত্রীরা, গুরু গরজায় বাজ,
পশ্চাত-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ !
কান্ডারী ! তুমি ভুলিবে কি পথ ? ত্যজিবে কি পথ মাঝ ?
করে হানাহানি, তবু চল টানি’ নিয়াছ যে মহাভার !
কান্ডারী ! তব সন্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালীর খুনে লাল হ’ল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর !
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর !
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার !
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান ?
আজি পরীক্ষা জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ ?
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুশিয়ার !
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভারত পুনরায় স্বাধীন হইবেই হইবে।
এবং স্বাধীনতার সূর্য্য উদয়ের খুব বেশী বিলম্বও নাই।
স্বাধীন ভারতের সকল কারাগারের লৌহ কপাট উন্মুক্ত হইবে
এবং ভারতমাতার শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা তখন কারা প্রকোষ্ঠের
অন্ধকার হইতে মুক্তি ও আনন্দের নির্মল আলোকে
বাহির হইয়া জয়মাল্যে ভূষিত হইবেন।
ইনকলাব জিন্দাবাদ!
আজাদ হিন্দ জিন্দাবাদ!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আমাদের চরম উদ্দেশ্য জাতির সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ
ও উন্নতি সাধন করা। সমস্ত বন্ধন হ’তে জাতিকে
চিরকালের জন্যে মুক্ত করা। এই সর্বাঙ্গীণ উন্নতি আনতে
হলে সর্বাগ্রে পরাধিনতার শৃঙ্খল মোচন করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় বন্ধন হতে জাতিকে প্রথমে মুক্ত করলে আমরা
সামাজিক ও অর্থনৈতিক ...রূপে মুক্ত করতে পারবো।
স্বাধীনতা একটা অখণ্ড সত্য।
এই স্বাধীনতা চাই জাতি এবং ব্যক্তি উভয়ের এখণ্ড
জীবনের জন্য। জাতি ও ব্যক্তিকে সমস্ত বন্ধন হতে
মুক্ত করলে আমরা আদর্শ জাতি ও আদর্শ মানুষ সৃষ্টি
করতে পারবো।
বন্ধুগণ! শৃঙ্খলা বা ডিসিপ্লিন না শিখলে আমরা কোনোদিন
মানুষ হবো না। বাঙালী জাতিকে শৃঙ্খলা বা ডিসিপ্লিন
শেখানো সহজ নয়। কিন্তু এই দূরহ ব্রত আমাদের উদযাপন
করতেই হবে। বাঙালী জাতিকে সংঘবদ্ধ ও নিয়মানুবর্তী
করে তুলতেই হবে। আজ ভারবাসীকে যে কথা বলার
প্রয়োজন নেই, যে আমরা স্বাধীনতার পথে অনেক দূর
অগ্রসর হয়েও এখনও গোলামীর শৃঙ্খল চূর্ণ করতে পারিনি।
কিন্তু আর আমরা বেশীদিন পরাধীন থাকবো না। বহুদিন
আমাদের চরম উদ্দেশ্য জাতির সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু (২৩.১.১৮৯৭ - মৃত্যুহীন)। নেতাজীর জাতীয় কংগ্রেসের কর্মকর্তা থাকাকালীন, প্রচারিত একটি বক্তৃতার অংশ। ভিডিওটি সৌজন্যে sudipta sengupta
YouTube Channel. যদি এই মানুষেরা না জন্মাতেন, তাহলে আজ আমরা কি অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে “স্বাধীন” দেশে জন্মাতে পারতাম? তাই এঁদের কথা, বাণী,
বক্তৃতা, লেখা, আমাদের কাছে কবিতাই ! মিলনসাগর, এই বক্তৃতাটিকে, এই প্রতিবাদী সংকলনে স্থান দিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছে। জয় হিন্দ! বন্দেমাতরম!
অপেক্ষা বৃহত্তর আন্দোলন আসছে। ওই আসন্ন
আন্দোলনের পূর্বাভাস আমরা চারি দিকে দেখতে পাচ্ছি।
এই বৃহত্তর আন্দোলনে প্রয়োজন হবে বৃহত্তর ত্যাগ ও
অধিকতর লাঞ্ছনা ও নির্যাতন ভোগ।
বন্ধুগন! আমাদের আরব্ধ সাধনাকে জয়যুক্ত করতে হবে।
আসুন আর সময়-ক্ষেপ না ক’রে আমরা কর্ম-সমুদ্রে
ঝাঁপিয়ে পড়ি এবং নিশিথের বিষম দুর্যোগে মাত্রাবিক্ষুব্ধ
বারিধি আমরা পারি দিই। স্বাধীনতার পথ কোনোদিন
সুখের পথ নয়। স্বাধীনতার পথ চিরকালই দুর্গম, বন্ধুর
কণ্টকাকীর্ণ পথ। এই পথ বেয়ে স্বাধীনতাকামী নর-নারী
সর্বযুগে সর্বদেশে মুক্তির ইতিহাস রচনা করে গেছেন।
তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরাও স্বাধীন ভারতের
নূতন ইতিহাস রচনা করবো। আমাদের সেবা, আমাদের
নিষ্ঠা, আমাদের আত্মত্যাগ, আমাদের লাঞ্ছনা ও নির্যাতন
ভোগ এর ফলে দীনদরিদ্রা, শৃঙ্খলিতা ভারতমাতা আবার
রাজরাজেশ্বরী হবেন। স্বাধীন ভারত আবার ধন-ধান্যে
পরিপূর্ণ হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে ষশস্বী হবে। আমাদের সাধনা
সার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত হবে। আমাদের জীবন ধন্য হবে।
পরে আবার জাতির হৃদয়ে জাগরণ এসেছে। এ জাতি
পরাধীনতার বন্ধনকে আর স্বীকার করে নিতে প্রস্তুত নয়।
তারা সারা প্রাণ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। এই নবজাগ্রত শক্তি
সুসংহত করে আমাদের বিজয়যাত্রার পথে পরিচালিত
করতে হবে। তা করলে আমাদের জয়লাভ অবশ্যম্ভাবী।
পূর্ণ স্বরাজ পেতে এখনও বিলম্ব আছে এবং তা অর্জন
করতে হলে, পুনরায় সংগ্রামের জন্যে, সত্যাগ্রহ
আন্দোলনের জন্যে প্রস্তুত হ’তে হবে। ১৯৩০ অথবা
১৯৩২ এ যে আন্দোলন আপনারা দেখেছিলেন, তার
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বন্ধুগণ! আমাদের জাতীয় মহাসভার ৫১ অধিবেশন এখন শেষ
হতে চলেছে। আমার পক্ষে এটা বড়ই আনন্দের বিষয় যে
এবারকার কার্যাবলী এমন নির্বিঘ্নে সুসম্পন্ন হয়েছে। আমি যখন
হরিপুরায় রওনা হই, তখন অনেকের মনে এরকম আশঙ্কা দেখা
দিয়েছিল যে হয়তো হরিপুরায় গত সুরাট কংগ্রেসের পুনরাভিনয়
হতে পারে। কিন্তু এটা আমাদের পক্ষে বড়ই সুখের কথা যে
ভগবানের আশীর্বাদে সে সমস্ত আশঙ্কা অলীক প্রতিপন্ন হয়েছে।
বন্ধুগন! আরেকটা কথা ভেবে আমার মনে আজ আনন্দ দেখা
দিচ্ছে। এখানকার অভ্যর্থনা সমিতি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল
মহাশয়ের পরিচালনায় যে ভাবে কাজ করেছেন এবং যে ভাবে
আমাদের জন্য সমস্তই ব্যবস্থা বন্দোবস্ত করেছেন, এটা আমাদের
পক্ষে বড়ই আনন্দের বিষয়। তাই তাঁদের নিকট আমি আমাদের
অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। এতৎব্যতিত এখানকার স্বেচ্ছা-
সেবক ও স্বেচ্ছাসেবিকারা যেভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমাদের
সেবা করেছেন, তাতে আমরা তাঁদের কাছেও কৃতজ্ঞ। সর্বপরি
এটা আমাদের পক্ষে পরম আনন্দের এবং গৌরবের বিষয় যে
মহাত্মা গান্ধী এখানে সশরীরে উপস্থিত থেকে তাঁর আশীর্বাদ ও
প্রেরণা আমাদের দিয়েছেন।
বন্ধুগণ! আমাদের জাতীয় মহাসভার নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু (২৩.১.১৮৯৭ - মৃত্যুহীন)। ১৯৩৮ সালে,
গুজরাটে, তাপ্তী নদীর তীরে অবস্থিত হরিপুরায়, জাতীয় কংগ্রেসের, হরিপুরা অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে ওয়াদিয়া-মুভিটোন কোম্পানি
দ্বারা চলচিত্রায়ণ করে রেকর্ড করা নেতাজীর একটি বক্তৃতা। ভিডিওটি সৌজন্যে NetajiSubhashVideos YouTube Channel. যদি এই
মানুষেরা না জন্মাতেন, তাহলে আজ আমরা কি অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে “স্বাধীন” দেশে জন্মাতে পারতাম? তাই
এঁদের কথা, বাণী, বক্তৃতা, লেখা, আমাদের কাছে কবিতাই ! মিলনসাগর, এই বক্তৃতাটিকে, এই প্রতিবাদী সংকলনে স্থান দিয়ে নিজেকে
ধন্য মনে করছে। জয় হিন্দ! বন্দেমাতরম!
বিজ্ঞান আমাদের কাজে সহায়তা এখানে করেছে এবং আমি
আশা করি যে ভবিষ্যতে আমরা আমাদের প্রচারকার্য্যে ফিল্ম
এবং রেডিওর সাহায্য আরও বেশী নেব।
সর্বশেষে আমি আপনাদের কাছে আমার অন্তরের নিবেদন
জানাতে চাই। এই নিবেদন হচ্ছে এই যে আমাদের জাতির
ব্রত এখনো উদযাপন হয়নি। আমরা এখনো পরাধীন। এ
বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে স্বাধীনতার পথে আমরা অনেক
দূর এগিয়েছি। কিন্তু তথাপি দুঃখের সঙ্গে এবং লজ্জার সঙ্গে
স্বীকার করতেই হবে যে এখনও ভারতবর্ষে পূর্ণ স্বরাজ স্থাপিত
হয় নাই। আগামী কয়েক মাস এবং কয়েক বৎসরের ঘটনার
ওপরেতে আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ভর করবে।
তাই আসুন আমরা বদ্ধপরিকর হয়ে কাজে লেগে যাই।
আমাদের পরস্পরের মধ্যে সমস্ত বিবাদ-সংবাদ আমরা
পরিত্যাগ করি। আমরা সকলেই এক প্রাণ হয়ে দেশের সেবায়
আত্মনিয়োগ করি এবং স্বাধীনতা লাভের জন্য অগ্রণী হয়ে
আমরা সামনে চলি।
বন্ধুগণ! আমরা সকলে দাস হয়ে জন্মেছি। আসুন আমরা
সংকল্প করি যে আমরা মরবার পূর্বে স্বাধীন হবো। বন্দেমাতম!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শোন্ রে শোন্ বাংলা দেশের কাঙ্গাল চাষী ভাই |
( কেন ) ফলিয়ে চাষে সোনার ফসল
গ্রাসের বেলায় জোটেরে ছাই ||
( কেন ) ভাঙা কুঁড়েয় বাস
কপালে নিত্য উপবাস------
( যাদের ) খাওয়াই তারাই চাষা বলে করে উপহাস,
( তারা ) আসল নিয়ে দেয়রে মেকী,
শুনিয়ে সব ন্যায়ের ফাঁকি,
নেবার বেলায় হাঁকাহাঁকি দেবার বেলায় নাই-রে নাই ||
( পরে ) পরে হ্যাট বুট আর স্যুট,
বলে বিলকুল সব ঝুট,
মোদের বলে হল বলী মোদের করে লুঠ
( দিয়ে ) মিছে আশার ফাঁকা বুলি
ভয়ে মোদের ভিখের ঝুলি
( মোরা ) ধোঁকা খেয়েও বোকার মতন তাদের মুখ চাই |
( ও ভাই ) দিন যায় হেলায়
ঐ দ্যাখ বীরেরা সব ধায়---
নূতন সহজ সরল পথে নূতন দুনিয়ায় |
ভরসা রেখে আপন বলে,
এগিয়ে চল সবাই মিলে,
আঁধার শেষে আলোর দেশে মিলবে সুখের ঠাঁই ---
ও ভাই চল্ চল্ চল্ রে---
শোন্ রে শোন্ বাংলা দেশের কাঙ্গাল চাষী ভাই
কবি তুলসী লাহিড়ী (৪.৪.১৮৯৭ - ২২.৬.১৯৫৯)
রচনা ও সুর – তুলসী লাহিড়ী, শিল্পী – কমলা ঝরিয়া, ১৯৪৬।
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত, স্বপন সোম সংকলিত, “গানের ভিতর দিয়ে” ১ম খণ্ড থেকে নেওয়া।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
প্রাণে মনে মহা-মুক্তি-পণ জাগুক আজ,
. বুকে বুকে অগ্নিশিখার কেতন উড়ুক হায়,
অপমানে নত শীর্ষ ‘পর পড়ুক বাজ,
. ললাটেতে মৃত্যু-তিলক জ্বলুক আগুন প্রায়।
আঘাতে আহত বক্ষ পর শোণিত লাল
. দিকে দিকে শঙ্কা জাগাক মরণ-সমুদ্রের,
মরণে মরণে ত্রস্ত হোক মহান্ কাল,
. লোকে লোকে দুঃখ-ব্যথার রোদন উঠুক ঢের।
মুখরিত করি’ বিশ্ব-লোক প্রলয়-গান
. পলে পলে ছিন্ন করুক জগৎ-বীণার তার,
তারকা-তপনে বিদ্রোহের বিষম বান
. অবিরত ধ্বংস আনুক ভীষণ চমত্কার!
সহে না সহে না আর যে ভাই, চোখের জল,
. অপমানে খিন্ন মলিন জীবন-ফাগুন-কাল ;
আজিকে পুড়িয়া হোক না ছাই সুখের ছল,
. চারিদিকে হিংস্র ভীষণ লাগুক আগুন লাল।
বৃথা এ গুমরি’ কান্না তোর, বৃথাই হায়,
. কে শুনিবে আর্ত্তনাদের হৃদয়-বিদার-রব?
শিখাতে শিখাতে বহ্নি ঘোর গগন ছায়,
. শোন না কি অত্যাচারের নিদয় জয়োত্সব?
যৌবন-বোধন কবি প্রবোধচন্দ্র সেন (২৭.৪.১৮৯৭ - ২০.৯.১৯৮৬)
রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “প্রবাসী” পত্রিকার ভাদ্র ১৩৩০ ( অগাস্ট ১৯২৩) সংখ্যায় প্রকাশিত।
রেখে’ দে আজিকে অশ্রুপাত, হৃদয় বাঁধ,
. জীবনেরে দৃপ্ত তেজের কঠিন আধার কর ;
জাগারে বুকেতে যৌবনের প্রলয়-সাধ,
. শত কোটি ঝঞ্ঝা তুফান নাচুক বুকের ’পর।
কাঁপায়ে ধরণী তাণ্ডবের চলুক নাচ,
. দে উড়ায়ে দীর্ণ অযুত ভূবন-কমল-দল ;
কোটি রাঙা শিখা খাণ্ডবের জ্বলুক্ আজ,
. শিবে নে রে ধ্বংস বিনাশ, তরুণ পাগল-দল!
ঝলকে ঝলকে রক্ত-স্রোত মরণ-জয়
. পথে পথে মৃত্যু-রাজের বিষাণ বাজাক হায় ;
পলকে পলকে খড়গাঘাত কিরণময়
. দিকে দিকে মুক্তি-রথের কেতন উড়াক বায়!
আজিকে আসনে যৌবনের বসুক দুখ,
. তারি করে শঙ্খ-নিনাদ জাগাক মরণ-গান ;
ছিঁড়িয়া আনিয়া হৃৎ-কমল দে সুখটুক,
. তারি পায়ে অঞ্জলি হায় তরুণ-জীবন-দান।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অগ্নিময়ী! অগ্নি জ্বালো কায়ায় তুলি’ সাড়া।
রক্তে আমার বহাও তব বহ্নিরসধারা।
. তারার ম’ত ঊর্দ্ধ শিখা
. ধরি’ উঠুক সব ধূলিকা
মুক্ত কর ভাঙি’আমার মৃত্তিকার এই কারা।
( নাশি কালো আজি ঢালো তব আলোধারা )
. আঁখি তোমার যেমন জাগে
. জাগাও তেমন অনুরাগে
শরণবেদীর তলে জ্বলুক জীবন আত্মহারা।
. বোসে কমলমর্মসাথী
. কমলে মোর আসন পাতি’
আপন মাঝে লুপ্ত করো আপন মম যারা।
( নাশি’ কালো আজি ঢালো তব আলোধারা )
অগ্নিমন্ত্র
কবি সাহানা দেবী (১৮৯৭ - ১৯৯০), সুর ও স্বরলিপি - দিলীলকুমার রায়,
ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকা ভাদ্র ১৩৪৭ (সেপ্টেম্বর
১৯৪০) সংখ্যা থেকে নেওয়া। গানটি স্বরলিপি সমেত প্রকাশিত হয়েছিল।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই শিকল-পরা ছল কথা ও সুর - কাজী নজরুল ইসলাম (২৫.৫.১৮৯৮ - ২৯.৮.১৯৭৬)। কণ্ঠ শিল্পী - গিরীন
চক্রবর্তী। VDOটি সৌজন্যে Nazrul Center YouTube Channel.
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কারার ঐ লৌহ-কপাট কথা ও সুর - কাজী নজরুল ইসলাম (২৫.৫.১৮৯৮ - ২৯.৮.১৯৭৬)।
কণ্ঠ শিল্পী - গিরীন চক্রবর্তী। VDOটি সৌজন্যে শিরাজ সাঁই এর YouTube Channel.
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বিদ্রোহী কথা ও সুর - কাজী নজরুল ইসলাম (২৫.৫.১৮৯৮ - ২৯.৮.১৯৭৬)। গানে কণ্ঠ - গিরীন
চক্রবর্তী (উপরের VDO)। VDO, সৌজন্যে - YouTube Channel . . .মহম্মদ মনসুর আলী বিশ্বাস... ।
আবৃত্তি- কাজী সব্যসাচী (নীচের VDO)। VDO, সৌজন্যে - YouTube Channel . . . শাকিল সরকার...
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কান্ডারী হুশিয়ার কথা ও সুর - কাজী নজরুল ইসলাম (২৫.৫.১৮৯৮ - ২৯.৮.১৯৭৬)। গানে কণ্ঠ - ইলা বসু,
উত্পলা সেন, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মৃণাল গঙ্গোপাধ্যায় এবং অন্যান্যরা। VDO টি, সৌজন্যে -
Saregama Bengali YouTube Channel.
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে কথা - কাজী নজরুল ইসলাম (২৫.৫.১৮৯৮ - ২৯.৮.১৯৭৬)। শিল্পী -
অলক রায়চৌধুরী। VDOটি সৌজন্যে Alok Ray Chowdhury - Topic YouTube Channel . হুগলী জেলে অন্তরীন থাকাকালীন
কবি এই গানটি রচনা করেন রবীন্দ্রনাথের "তোমারি গেহে পালিছ ঠেলে" গানটির সুরে। আপাত লঘু ভাবের গান
হলেও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে তা ছিল এক বড় প্রতিবাদ!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আসে নাই ফিরে ভারত-ভারতী ?
. মা’র কতদিন দীপান্তর ?
পুণ্য বেদীর শূন্যে ধ্বনিল
. ক্রন্দন----‘দেড় শত বছর !’-----
সপ্ত-সিন্ধু তের নদী পার
. দীপান্তরের আন্দামান,
রূপের-কমল রূপার কাঠির
. কঠিন স্পর্শে যেখানে ম্লান,
শতদল যেথা শতধা ভিন্ন
. শস্ত্র-পাণির অস্ত্র-ঘায়
যন্ত্রী সেখানে সান্ত্রী বসায়ে
. বীণার তন্ত্রী কাটিছে হায়,
সেখান হ’তে কি বেতার-সেতারে
. এসেছে মুক্ত-বন্ধ সুর ?
মুক্ত কি আজ বন্দিনী বাণী ?
. ধ্বংস হ’ল কি রক্ষ-পুর ?
যক্ষপুরীর রৌপ্য-পঙ্কে
. ফুটিল কি তবে রপ-কমল ?
কামান গোলার সীসা-স্তূপে কি
. উঠেছে বাণীর শিশ-মহল ?
শান্তি-শুচিতে শুভ্র হ’ল কি
. রক্ত সোঁদাল খুন-খারাব ?
দ্বীপান্তরের বন্দিনী
কবি কাজী নজরুল ইসলাম (২৫.৫.১৮৯৮ - ২৯.৮.১৯৭৬)। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত কবির “ফণিমনসা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
তবে এ কিসের আর্ত আরতি,
. কিসের তরে এ শঙ্খারাব ?------
সাত সমুদ্র তের নদী পার
. দীপান্তরের আন্দামান,
বাণীযেথা ঘানি টানে নিশিদিন,
. বন্দী সত্য ভানিছে ধান,
জীবন-চুয়ানো সেই ঘানি হ’তে
. আরতির তেল এনেছ কি ?
হোমানল হ’তে বাণীর রক্ষী
. বীর ছেলেদের চর্বি ঘি ?
হায় শৌখিন পূজারী, বৃথাই
. দেবীর শঙ্খে দিতেছ ফু’,
পুণ্য বেদীর শূন্য ভেদিয়া
. ক্রন্দন উঠিতেছে শুধু !
পূজারী, কাহারে দাও অঞ্জলি ?
. মুক্ত ভারতী ভারতে কই ?
আইন যেখানে ন্যায়ের শাসক,
. সত্য বলিলে বন্দী হই,
অত্যাচারিত হইয়া যেখানে
. বলিতে পারি না অত্যাচার
যথা বন্দিনী সীতা-সম বাণী
. সহিছে বিচার-চেড়ীর মার,
বাণীর মুক্ত শতদল যথা
. আখ্যা লভিল বিদ্রোহী,
পূজারী, সেখানে এসেছ কি তুমি
. বাণী-পূজা উপচার বহি’ ?
সিংহেরে ভয়ে রাখে পিঞ্জরে,
. ব্যাঘ্রেরে হানে অগ্নি-শেল,
কে জানিত কালে বীণা খাবে গুলি,
. বাণীর কমল খাটিবে জেল !
তবে কি বিধির বেতার-মন্ত্র
. বেজেছে বাণীর সেতারে আজ,
পদ্মে-রেখেছে চরণ-পদ্ম
. যুগান্তরের ধর্মরাজ ?
তবে তাই হোক ! ঢাক’ অঞ্জলি,
. বাজাও পাঞ্চজন্য শাঁখ
দীপান্তরের ঘানিতে লেগেছে
. যুগান্তরের ঘুর্ণিপাক !
. সাম্যের গান গাই---
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই !
বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণ-কর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর |
বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্রুবারি
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী !
নরককুন্ড বলিয়া কে তোমা, করে নারী হেয়-জ্ঞান ?
তারে বল, আদি-পাপ নারী নহে, সে যে নর শয়তান |
অথবা পাপ যে--- -শয়তান যে--- নর নহে নারী নহে,
ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে !
এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল ফলিয়াছে যত ফল,
নারী দিল তাহে রূপ- -রস- -গন্ধ-- সুনির্মল |
তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছ তার প্রাণ ?
অন্তরে তার মোম্ তাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান !
জ্ঞানের লক্ষ্ণী, গানের লক্ষ্ণী, শস্য-লক্ষ্ণী নারী,
সুষমা-লক্ষ্ণী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি |
পুরুষ এনেছে দিবসের জ্বালা তপ্ত রৌদ্রদাহ,
কামিনী এনেছে যামিনী-শান্তি, সমীরণ, বারিবাহ !
দিবসে দিয়াছে শক্তি-সাহস, নিশীথে হয়েছে বধূ,
পুরুষ এসেছে মরুতৃষা ল’য়ে ----নারী যোগায়েছে মধু !
শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল পুরুষ চালাল হাল ;
নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল |
নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে
ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
. স্বর্ণ-রৌপ্যভার
নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হ’য়েছে অলঙ্কার !
নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,
যত কথা তার, হইল কবিতা, শব্দ হইল গান |
নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে
জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে !
জগতের যত বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান,
মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান্ |
কোন্ রণে কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে,
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর লেখা নাই তার পাশে !
কত মাতা দিল হৃদয় উপাড়ি’, কত বোন দিল সেবা,
বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা ?
কোনো কালে একা হয় নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে, বিজয়-লক্ষ্ণী নারী !
রাজা করিয়াছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিল রাণী,
রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি !
. পুরুষ হৃদয়-হীন,
মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ |
ধরায় যাঁদের যশ ধরে না ক’ অমর মহামানব,
বরষে বরষে যাঁদের স্মরণে করি মোরা উত্সব,
খেয়ালের বশে তাঁদের জন্ম দিয়াছে বিলাসী পিতা------
লব কুশে বনে ত্যজিয়াছে রাম, পালন করেছে সীতা !
নারী সে শিখাল শিশু-পুরুষের স্নেহ প্রেম দয়া মায়া,
দীপ্ত নয়নে পরাল কাজল বেদনার ঘন ছায়া |
অদ্ভুত রূপে পরুষ পুরুষ করিল সে ঋণ শোধ,
বুকে ক’রে তারে চুমিল যে, তারে করিল সে অবরোধ !
. তিনি নর-অবতার----
পিতার আদেশে জননীরে যিনি কাটেন হানি’ কুঠার !
পার্শ্ব ফিরিয়া শুয়েছেন আজ অর্ধনারীশ্বর,
নারী চাপা ছিল এতদিন, আজ চাপা পড়িয়াছে নর !
. সে যুগ হ’য়েছে বাসি,
যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক’, নারীরা আছিল দাসী !
বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,
কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও উঠিছে ডঙ্কা বাজি,
নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে
আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে !
. যুগের ধর্ম এই-----
পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই !
. শোনো মর্তের জীব,
অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব !
স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কারের যক্ষপুরীতে নারী,
করিল তোমায় বন্দিনী, বলো কোন্ সে অত্যাচারী ?
আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যাকুলতা,
আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা !
চোখে চোখে আজি চাহিতে পার না ; হাতে রুলি, পায়ে মল,
মাথার ঘোম্ টা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও শিকল !
যে ঘোম্ টা তোমা’ করিয়াছে ভীরু ওড়াও সে আবরণ !
দুর ক’রে দাও দাসীর চিহ্ন আছে যত আভরণ !
. ধরার দুলালী মেয়ে,
ফির’না ত আর গিরিদরীবনে শাখী-সনে গান গেয়ে !
কখন্ আসিল ‘প্লুটো’ যমরাজা নিশীথ পাখায় উ’ড়ে,
ধরিয়া তোমার পূরিল তাহার আঁধার বিবর-পুরে !
সেই সে আদিম বন্ধন তব, সেই হ’তে আছ মরি’
মরণের পুরে ; নামিল ধরায় সেইদিন বিভাবরী |
ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মত আয় মা পাতাল ফুঁড়ি !
আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুড়ি !
পুরুষ যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও-পদাঘাতে
লুটায়ে পড়িবে ও চরণ-তলে দলিত যমের সাথে !
এতদিন শুধু বিলালে অমৃত, আজ প্রয়োজন যবে
যে-হাতে পিয়ালে অমৃত, সে-হাতে কূট বিষ দিতে হবে !
. সে-দিন সুদূর নয়----
যে-দিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয় !
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেল্ ছ জুয়া।
ছুঁলেই তোর জাত যাবে ? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া ॥
হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাব্ লি এতেই জাতির জান,
তাই ত বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে এক শ’-খান !
এখন দেখিস ভারত-জোড়া, / প’চে আছিস বাসি মড়া,
মানুষ নাই আজ, আছে শুধু জাত-শেয়ালের হুক্কা হুয়া ॥
জানিস না কি ধর্ম্ম সে যে বর্ম্ম সম সহন-শীল,
তাকে কি ভাই ভাঙতে পারে ছোঁওয়া-ছুঁয়ির ছোট্ট ঢিল ।
যে জাত-ধর্ম্ম ঠুনকো এত, / আজ নয় কাল ভাঙবে সে ত’,
যাক্ না সে জাত জাহান্নামে, রইবে মানুষ, নাই পরোয়া ॥
দিন-কানা সব দেখ্ তে পাস্ নে দন্ডে দন্ডে পলে পলে,
কেমন ক’রে পিষছে তোদের পিশাচ জাতের জাঁতা-কলে ।
তোরা জাতের চাপে মারলি জাতি, / সূর্য্য ত্যজি নিলি বাতি,
তোদের জাত-ভগীরথ এনেছে জল জাত-বিজাতের জুতো ধোওয়া॥
মনু ঋষি অণু সমান বিপুল বিশ্বে যে বিধির,
বুঝলি না সেই বিধির বিধি, মনুর পায়েই নোয়াস্ শির।
ওরে মূর্খ ওরে জড়, / শাস্ত্র চেয়ে সত্য বড়,
তোরা চিন্ লি নে তা চিনির বলদ, সার হ’ল তাই শাস্ত্র বওয়া॥
সকল জাতই সৃষ্টি যে তাঁর, এ বিশ্ব-মায়ের বিশ্ব-ঘর,
মায়ের ছেলে সবাই সমান, তাঁর কাছে নাই আত্ম-পর।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
তোরা সৃষ্টিকে তাঁর ঘৃণা ক’রে, / স্রষ্টায় পূজিস্ জীবন ভ’রে,
ভষ্মে ঘৃত ঢালা সে যে বাছুর মেরে গাভী দোওয়া॥
বলতে পারিস্ বিশ্ব-পিতা ভগবানের কোন্ সে জাত ?
কোন্ ছেলের তাঁর লাগলে ছোঁওয়া অশুচি হন জগন্নাথ ?
নারায়ণের জাত যদি নাই, / তোদের কেন জাতের বালাই ?
তোরা ছেলের মুখে থু থু দিয়ে মা’র মুখে দিস ধূপের ধোঁয়া॥
ভগবানের ফৌজদারী-কোর্ট নাই সেখানে জাত-বিচার,
তোর পৈতে টিকি টুপি টোপর সব সেথা ভাই একাক্কার !
জাত সে শিকেয় তোলা র’বে , কর্ম্ম নিয়ে বিচার হবে,
তা’পর বামুন চাঁড়াল এক গোয়ালে, নরক কিংবা স্বর্গে থোওয়া ॥
এই আচার বিচার বড় ক’রে প্রাণ-দেতায় ক্ষুদ্র ভাবা ।
বাবা এই পাপেই আজ উঠতে বসতে সিঙ্গী-মামার খাচ্ছে থাবা !
তাই, নাই ক অন্ন , নাই ক বস্ত্র , / নাই সন্মান, নাই ক অস্ত্র,
এই জাত-জুয়াড়ীর ভাগ্যে আছে আরো অশেষ দুখ সওয়া ॥
মুসলিম আর হিন্দু মোরা দুই সহোদর ভাই।
এক বৃন্তে দু’টী কুসুম এক ভারতে ঠাঁই ॥
মুসলিম যাঁর সৃষ্টি রে ভাই হিন্দু সৃষ্টি তাঁরি
মোরা বিবাদ করে করি খোদার উপর খোদকারি।
শাস্তি এত আজ আমাদের হীন-দশা এই তাই॥
দুই জাতি ভাই সমান মরে মড়ক এলে দেশে
বন্যাতে দুই ভাইয়ের কুটীর সমানে যায় ভেসে।
বিধাতার সেই বিচারে ভাই বিভেদ নাহি পাই ॥
দুই জনারই মাঠেরে ভাই সমান বৃষ্টি ঝরে----
সব জাতিরই সকলকে তাঁর দান যে সমান ক’রে,
চাঁদ সূরযের আলো কেহ কম বেশী কি পাই ॥
ত্রিভুবনের বনমালী নানা রঙের ফুলে,
সাজিয়েছে এ বাগানখানি দেখরে নয়ন খুলে ।
বাইরে শুধু রঙের তফাৎ ভিতরে ভেদ নাই॥
মুসলিম আর হিন্দু মোরা দুই সহোদর ভাই
কবি কাজী নজরুল ইসলাম (২৫.৫.১৮৯৮ - ২৯.৮.১৯৭৬) । সুর - কমল দাশগুপ্ত, শিল্পী - আব্বাসউদ্দীন আহমদ ও
মৃণালকান্তি ঘোষের কণ্ঠে। আদি রেকর্ডিং ১৯৩৮। কবি নজরুলের “দেশাত্মবোধক গান” থেকে। ভিডিওটি সৌজন্যে
Siraj ShNai YouTube Channel.
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মোরা একই বৃন্তে দুটী কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুস্ লিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ॥
এক সে আকাশ মায়ের কোলে / যেন রবি-শশী দোলে,
এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ীর টান॥
মোরা এক সে দেশের খাই গো হাওয়া, এক সে দেশের জল,
এক সে মায়ের বক্ষে ফলে একই ফুল ও ফল।
এক সে দেশের মাটীতে পাই / কেউ গোরে কেউ শ্মশানে ঠাঁই,
মোরা এক ভাষাতে মাকে ডাকি, এক সুরে গাই গান॥
চিনতে নেরে আঁধার রাতে করি মোরা হানাহানি,
সকাল হলে হবে রে ভাই ভায়ে ভায়ে জানাজানি।
কাঁদব তখন গলা ধ’রে, / চাইব ক্ষমা পরস্পরে,
হাস্ বে সে দিন গরব ভরে এই হিন্দুস্থান॥
মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান
কবি কাজী নজরুল ইসলাম (২৫.৫.১৮৯৮ - ২৯.৮.১৯৭৬)
শিল্পী - কবির পুত্রবধু কল্যানী কাজী। কবি নজরুলের “দেশাত্মবোধক গান” থেকে। ভিডিওটি
সৌজন্যে Md. Mansur Ali Biswas YouTube Channel.
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
. গাহি সাম্যের গান----
যেখানে আসিয়া এক হ’য়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ মুসলিম-ক্রীশ্চান।
. গাহি সাম্যের গান !
কে তুমি? পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল গারো?
কন্ ফুসিয়াস্? চার্বাক-চেলা? ব’লে যাও, বল আরো !
. বন্ধু, যা খুশি হও,
পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
কোরাণ-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-
জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও যত সখ,----
কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
দোকানে কেন এ দর-কশাকশি? ---পথে ফুটে তাজা ফুল।
তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে’ দেখ নিজ প্রাণ !
তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম সকল যুগাবতার,
তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকলের দেবতার।
কেন খুঁজে ফের দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি-কঙ্কালে?
হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে।
. বন্ধু, বলিনি ঝুট,
এইকানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বুদ্ধ-গয়া এ, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
এইখানে ব’সে ঈশা মুসা পেল সত্যের পরিচয় !
এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান,
এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান !
. মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই !
বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’ !
কবি ও অকবি যাহা বল মোরে মুখ বুজে তাই সই সবি !
. কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
. ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে !
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি ?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী !
কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে !
বলে, ‘কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাঁশ ঠেলে !
. পড়েনাক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা’
. কেহ বলে ‘বৌ এ গিলিয়াছে গোটা !’
কেহ বলে, ‘মাটী হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে !
কেহ বলে, ‘তুই জেলে ছিলি ভালো, ফের যেন তুই যাস্ জেলে |
গুরু ক’ন, ‘তুই করেছিস শুরু তরোয়াল দিয়ে দাড়ি চাঁছা !
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা !’
. আমি বলি, প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি !
. অম্ নি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি !
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন ‘আড়ি চাচা !’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি নাড়ি কাছা !
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘মোল্--লা’রা কন হাত নেড়ে,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জা’ত মেরে !
. ফতোয়া দিলাম----কাফের কাজী ও,
. যদিো শহীদ হইতে রাজী ও !
“আমপারা” পড়া হাম্ বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে !’
হিন্দুরা ভাবে, ‘ফার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত নেড়ে!’
আন্ কেরা যত নন্ ভায়োলেন্ট নন্-কো’র দলও নন খুশী !
‘ভায়োলেন্সের ভায়োলিন্’ নাকি আমি বিপ্লবী-মন তুষি !
. ‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,
. ‘নয় চর্ কার গান কেন গা’বে ?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্ ফুসি !
স্বারাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের অঙ্কুশি’ !
নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা ! নারী ভাবে, নারী বিদ্বেষী !
‘বিলেত ফেরনি ?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন্, ‘এই তব বিদ্যে ছি !’
. ভক্তরা বলে ‘নবযুগ রবি’ !
. যুগের না হই, হুজুগের কবি
বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’শে কশি হৃদ-পেশী !
দু’কানে চশ্ মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্ বেশী !
কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুন্ডু, আমিই কি বুঝি তার কিছু ?
হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু !
. বন্ধু ! তোমরা দিলে না ক দাম,
. রাজ-সরকার রেখেছেন মান !
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন ! আর কিছু
শুনেছ কি, হু হু, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু ?
বন্ধু ! তুমি ত দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,
হাড় কালি হ’ল শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন বন্দীরে !
. যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,
. মেরে মেরে তাঁরে করিনু বিকল,
তবু যদি কথা শোনে সে পাগল ! মানিল না রবি-গান্ধীরে !
হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে !
আমি বলি, ওরে কথা শোন্ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস খোশ্ হালে ?
প্রায় ‘হাফ’ নেতা হ’য়ে উঠেছিস, এবার এ দাঁও ফস্ কালে
. ‘ফুল’ নেতা আর হবিনে যে হায় !-----
. বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা ! সেই তালে
নিস্ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে !
বোঝে না ক’ যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে,
গান শুনে সবে ভাবে, ভাবনা কি ? দিন যাবে এবে পান খেয়ে !
. রবে না ক’ ম্যালেরিয়া মহামারী,
. স্বরাজ আসিছে চ’ড়ে জুড়ি-গাড়ী,
চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে !
মাতা কয়, ওরে চুপ্ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্ চেয়ে !
ক্ষুধাতুর শিশু চায়না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন !
বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন !
. কেঁদে থুটে আসি পাগলের প্রায়,
. স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায় !
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান, তুমি আজিও আছ কি ? কালি ও চুণ
কেন ওঠে না’ক তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন ?
আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস !
কত শত কোটী ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস !
. এল কোটী টাকা, এল না স্বরাজ !
. টাকা দিতে নারে ভুখারী সমাজ !
মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ,
. খাও হে ঘাস !
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ !
বন্ধু গো, আর বলিতে পারিনা, বড় বিষ জ্বালা এই বুকে !
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে !
. রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা
. তাই লিখে যাই এ রক্ত লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু বড় দুখে !
অমর কাব্য তোমরা লিখিও , বন্ধু যাহারা আছ সুখে !
পরোয়া করিনা, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথার ওপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে !
প্রার্থনা ক’রো-----যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটী মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ !
. দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবুসা’ব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে !
. চোখ ফেটে এল জল,
এম্ নি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল ?
যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-সকট চলে,
বাবুসা’ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে !
বেতন দিয়াছ ? -----চুপ্ রও যত মিথ্যাবাদীর দল ;
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল !
রাজ-পথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,
রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,
বল’ত এ সব কাহাদের দান ! তোমার অট্টালিকা
কার খুনে রাঙা ? ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি ইঁটে আছে লিখা !
তুমি জান না ক’ কিন্তু পথের প্রতি ধূলিকণা জানে,
ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে !
. আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ।
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দুপাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি,
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদের ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উথ্বান !
তুমি শুয়ে রবে তেতালার’ পরে আমরা রহিব নীচে,
কুলি-মজুর কবি কাজী নজরুল ইসলাম (২৫.৫.১৮৯৮ - ২৯.৮.১৯৭৬)। কবিপুত্র কাজী সব্যসাচীর আবৃত্তি। কবি নজরুলের “সর্বহারা” থেকে। ভিডিওটি সৌজন্যে VoiceArt YouTube Channel.
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে !
সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটীর মমতা-রসে,
এই ধরণীর তরণীর হা’ল রবে তাহাদেরি বশে !
তারি পদরজে অঞ্জলি করি’ মাথায় লইব তুলি,
সকলের সাথে পথে চলি যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি !
আজ নিখিলের বেদনা-আর্ত পীড়িতের মাখি’ খুন,
লালে লাল হ’য়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ !
আজ হৃদয়ের জাম-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও,
রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও !
আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল,
মাতামাতি ক’রে ঢুকুক্ এ বুকে, খুলে দাও যত খিল !
সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়ুক আমাদের এই ঘরে,
মোদের মাথায় চন্দ্র সূর্য তারারা পড়ুক ঝ’রে
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি,
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শুন এক মিলনের বাঁশী।
. একজনে দিলে ব্যথা
সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা !
. একের অসন্মান
নিখিল মানব-জাতির লজ্জা ---সকলের অপমান !
মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উথ্বান,
ঊর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান !
কুলি-মজুর
. দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবুসা’ব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে !
. চোখ ফেটে এল জল,
এম্ নি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল ?
যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-সকট চলে,
বাবুসা’ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে !
বেতন দিয়াছ ? -----চুপ্ রও যত মিথ্যাবাদীর দল ;
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল !
রাজ-পথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,
রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,
বল’ত এ সব কাহাদের দান ! তোমার অট্টালিকা
কার খুনে রাঙা ? ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি ইঁটে আছে লিখা !
তুমি জান না ক’ কিন্তু পথের প্রতি ধূলিকণা জানে,
ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে !
. আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ।
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দুপাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি,
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদের ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উথ্বান !
তুমি শুয়ে রবে তেতালার’ পরে আমরা রহিব নীচে,
অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে !
সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটীর মমতা-রসে,
এই ধরণীর তরণীর হা’ল রবে তাহাদেরি বশে !
তারি পদরজে অঞ্জলি করি’ মাথায় লইব তুলি,
সকলের সাথে পথে চলি যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি !
আজ নিখিলের বেদনা-আর্ত পীড়িতের মাখি’ খুন,
লালে লাল হ’য়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ !
আজ হৃদয়ের জাম-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও,
রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও !
আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল,
মাতামাতি ক’রে ঢুকুক্ এ বুকে, খুলে দাও যত খিল !
সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়ুক আমাদের এই ঘরে,
মোদের মাথায় চন্দ্র সূর্য তারারা পড়ুক ঝ’রে
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি,
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শুন এক মিলনের বাঁশী।
. একজনে দিলে ব্যথা
সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা !
. একের অসন্মান
নিখিল মানব-জাতির লজ্জা ---সকলের অপমান !
মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উথ্বান,
ঊর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান !
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
কে তোমায় বলে ডাকাত বন্ধু, কে তোমায় চোর বলে?
চারিদিকে বাজে ডাকাতি ডঙ্কা, চোরেরই রাজ্য চলে!
চোর-ডাকাতের করিছে বিচার কোন সে ধর্মরাজ?
জিজ্ঞাসা করো, বিশ্ব জুড়িয়া কে নহে দস্যু আজ?
বিচারক! তব ধর্মদণ্ড ধরো,
ছোটোদের সব চুরি করে আজ বড়োরা হয়েছ বড়ো!
যারা যত বড়ো ডাকাত-দস্যু জোচ্চোর দাগাবাজ
তারা তত বড়ো সম্মানী গুণী জাতি-সংঘেতে আজ।
রাজার প্রাসাদ উঠিছে প্রজার জমাট-রক্ত-ইঁটে,
ডাকু ধনিকের কারখানা চলে নাশ করি কোটি ভিটে।
দিব্যি পেতেছ খল কলওলা মানুষ-পেষানো কল,
আখ-পেষা হয়ে বাহির হতেছে ভূখারি মানব-দল!
কোটি মানুষের মনুষ্যত্ব নিঙাড়ি কলওয়ালা
ভরিছে তাহার মদিরা-পাত্র, পুরিছে স্বর্ণ-জালা!
বিপন্নদের অন্ন ঠাসিয়া ফুলে মহাজন-ভুঁড়ি
নিরন্নদের ভিটে নাশ করে জমিদার চড়ে জুড়ি!
পেতেছে বিশ্বে বণিক-বৈশ্য অর্থ-বেশ্যালয়,
নীচে সেথা পাপ-শয়তান-সাকি, গাহে যক্ষের জয়!
অন্ন, স্বাস্থ্য, প্রাণ, আশা, ভাষা হারায়ে সকল-কিছু
দেউলিয়া হয়ে চলেছে মানব ধ্বংসের পিছু পিছু।
চোর ডাকাত
কবি কাজী নজরুল ইসলাম (২৫.৫.১৮৯৮ - ২৯.৮.১৯৭৬)। কবিপুত্র কাজী সব্যসাচীর আবৃত্তি। কবি নজরুলের “সর্বহারা” থেকে।
ভিডিওটি সৌজন্যে VoiceArt YouTube Channel. আমরা তাঁদের কাছে ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ কবিতার কথার জন্যও।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
পালাবার পথ নাই,
দিকে দিকে আজ অর্থ-পিশাচ খুঁড়িয়াছে গড়খাই।
জগৎ হয়েছে জিন্দানখানা,1 প্রহরী যত ডাকাত –
চোরে-চোরে এরা মাসতুতো ভাই, ঠগে ও ঠগে স্যাঙাত।
কে বলে তোমায় ডাকাত, বন্ধু কে বলে করিছ চুরি?
চুরি করিয়াছ টাকা ঘটি, বাটি, হৃদয়ে হানোনি ছুরি!
ইহাদের মতো অমানুষ নহ, হতে পার তস্কর,
মানুষ দেখিলে বাল্মীকি হও তোমরা রত্নাকর!
এক ঘেঁটু তার সাত ব্যাটা
শিব শিব রাম রাম
সাত ব্যাটা তার স্বাতন্ত্র
শিব শিব রাম রাম
এক ব্যাটা তার মোহান্ত
শিব শিব রাম রাম
মোহান্ত ভাই রে
শিব শিব রাম রাম
ফুল তুলতে যাই রে
শিব শিব রাম রাম
যত ফুল পাই রে
শিব শিব রাম রাম
আমার ঘেঁটুকে সাজাই রে
শিব শিব রাম রাম শিব শিব রাম রাম
শিব শিব রাম রাম শিব শিব রাম রাম
শির শিব রাম রাম শির শিব রাম রাম
দেশে আসিল জরিপ দেশে আসিল জরিপ
এই রাজা প্রজা ছেলে বুড়োর বুক ঢিপঢিপ
ঘেঁটুর গান কবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩.৭.১৮৯৮ - ১৪.৯.১৯৭১)। সুর - হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শিল্পী - মান্না দে ও
সমবেত কণ্ঠে। এই সহ-গীতিকার দুজনের নাম আমরা পেয়েছি PlanetRead.org নামক ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া গানের একটি PDF
থেকে। গানের কথার জন্য আমরা তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের "গণদেবতা" উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত তরুণ
মজুমদারের ছায়াছবিতে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা এই গানটি "ঘেঁটুর গান" বলে পরিচিত। এই গানটিতে গরিব চাষির জমি
লুট করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় গ্রামের মাস্টারমশাই দেবু পণ্ডিতের কারাদণ্ডের কাহিনী রয়েছে। গানটির ভিডিও সৌজন্যে Angel
Bengali Songs YouTube Channel.
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
দেশে আসিল জরিপ
দেশে আসিল জরিপ
দেশে আদিল জরিপ
পিওন এলো আমিন এলো এলো কানুনগো
এই বুড়ো শিবের দরবারে মানত মানুন গো
বুঝি আর মান থাকে না
বুঝি আর মান থাকে না
বুঝি আর মান থাকে না
হাকিম এলো ঘোড়ায় চড়ে সঙ্গেতে পেশকার
ওরে আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হলো দেশটার
বুঝি আর মান থাকে না
বুঝি আর মান থাকে না
বুঝি আর মান থাকে না
এই তাঁবু এলো চেয়ার এলো
তাঁবু এলো চেয়ার এলো কাগজ গাড়িগাড়ি
লোহার এ ছেকল এলো চল্লিশ মন ভারি
ক্ষেতে বুঝি ধান থাকে না
ক্ষেতে বুঝি ধান থাকে না
ক্ষেতে বুঝি ধান থাকে না
কুঁচবরণ রাঙা চোখ তারার মতোন ঘোরে
দন্ত কড়মড়ি হাঁকে হেই লুলুলুলু করে
কলিতে মাটি ফাটে না
কলিতে মাটি ফাটে না
কলিতে মাটি ফাটে না
পণ্ডিতমশাই দেবু ঘোষ তেজিয়ান বিদ্বান
জানের চেয়ে তার কাছে বেশি হলো মান
পণ্ডিতমশাই দেবু ঘোষ তেজিয়ান বিদ্বান
জানের চেয়ে তার কাছে বেশি হলো মান
ও সে আর সইতে পারে না
ও সে আর সইতে পারে না
কানুনগো কহিল তুই সে করে তুকারি
কানুনগো কহিল তুই সে করে তুকারি
এই আমার কাছে খাটবে না তোর
কোনো জুরিজারি হু হু
দেবু কারোর ধার ধারে না
দেবু কারোর ধার ধারে না
ও কারোর ধার ধারে না
দেবু ঘোষের পাকা ধানে ছেকল চল্লিশ মন
এই টেনে নিয়ে চলে আমিন ঝন্ ঝন্ ঝন্ ঝন্
ও সে কারোর মানা মানে না
ও সে কারোর মানা মানে না
কারোর মানা মানে না
দেবু ঘোষে বাঁধল এসে পুলিশ দারোগা
দেবু ঘোষে বাঁধল এসে পুলিশ দারোগা
বলে কানুনগোর কাছে হাতজোড় করো গা
দেবু ঘোষে বাঁধল এসে পুলিশ দারোগা
বলে কানুনগোর কাছে হাতজোড় করো গা
দেবু ঘোষ হেসে বলে
দেবু ঘোষ হেসে বলে না না না বলে না না না
বলে না না না
থাকিল পেছনে পড়ে সোনার বরণ নারী
ননীর পুলি শিশু ধুলায় গড়াগড়ি
দেবু ঘোষের মনটলে না
দেবু ঘোষের মনটলে না
ও ঘোষের মন টলে না
ফুলের মালা গলায় গিয়ে ঘোষ চলেন জেলে
অধম তারিনী লুটায় তাহার চরণতলে
দেবতা নইলে হায় এ কাজ কেউ পারে না
দেবতা নইলে হায় একাজ কেউ পারে না
দেবতা নইলে হায় একাজ কেউ পারে না
দেবতা নইলে হায় একাজ কেউ পারে না
একাজ কেউ পারে না
একাজ কেউ পারে না
ভীরু আছে, তাই গর্বে দুলিছে
বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় (১৮৯৮ - ১৮.১২.১৯৭৪)
ভীরু আছে, তাই গর্বে দুলিছে
. অত্যাচারির জয়-নিশান।
ক্লৈব্য রয়েছে, অন্যায় তাই
. নিঃস্বের করে রক্তপান॥
দুঃখের ভয়ে কাঁপি সদাই
. শৃংখলে আজি বন্দী তাই।
জীবনেরে বড়ো ভালবাসি ব’লে
. শয়তান এত শক্তিমান॥
আকাশ-বিদারী বজ্রকণ্ঠে
. গর্জিয়া বলো রে অন্যায়।
মরে যাবো তবু মস্তক কভু
. নত করিব না তোমার পায়॥
দেখিবে নূতন অরুণোদয়
. রাঙিয়া তুলিবে দিগ্বলয়!
মৃত্যুর পাশ ছিন্ন করিয়া
. জাগিয়া উঠিবে দৃপ্তপ্রাণ॥
মুক্তি মোদের পরাণ বঁধু
বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় (১৮৯৮ - ১৮.১২.১৯৭৪)
মুক্তি মোদের পরাণ বঁধু, বন্দীশালা---বাসর ঘর।
মরণ মোদের পিয়ার মধু, কামান শোনায় বাঁশীর স্বর॥
স্বাধীনতার প্রেমে পাগল, তাই ভেঙেছি ঘরের আগল।
আপন বুকের রক্তে রাঙা, মোদের মাথায় লাল টোপর॥
অমূল্য ধন্ মুক্তি রতন, বাইরে কোথায় খুঁজিস্ তায়?
দুঃখের বুকে সৃষ্টি তাহার, বন্দীশালার কারখানায়॥
ভালো তারে বাস্ লো যে জন, ব্যথায় তাহার ভরলো জীবন,
দৈন্য হোলো সাথের সাথী, সঙ্গী হোলো প্রলয় ঝড়॥
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই - প্রীতি নেই - করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব'লে মনে হয়
মহত্ব সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অদ্ভুত আঁধার এক
কবি জীবনানন্দ দাশ (১৭.২.১৮৯৯ - ২২.১০.১৯৫৪)
আবৃত্তি - সুবীর লরেন্স। কবির মৃত্যুর পর ১৯৬১ সালে প্রকাশিত “বেলা অবেলা
কালবেলা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। ভিডিওটি সৌজন্যে Subir Lawrence YouTube Channel.
মহামৈত্রীর বরদ-তীর্থে--- পুণ্য ভারতপুরে
পূজার ঘণ্টা মিশিছে হরষে নমাজের সুরে-সুরে !
আহ্নিক হেথা সুরু হয়ে যায় আজান বেলার মাঝে,
মুয়াজ্জেনের উদাস ধ্বনিটি গগনে গগনে বাজে ;
জপে ঈদগাতে তসবী ফকির, পূজারী মন্ত্র পড়ে,
সন্ধ্যা-উষায় বেদবাণী যায় মিশে কোরানের স্বরে ;
সন্ন্যাসী আর পীর
মিলে গেছে হেথা---মিশে গেছে হেথা মসজিদ, মন্দির !
কে বলে হিন্দু বসিয়া রয়েছে একাকী ভারত জাঁকি?
--- মুসলমানের হস্তে হিন্দু বেঁধেছে মিলন-রাখী ;
আরব মিশর তাতার তুর্কী ইরানের চেয়ে মোরা
ওগো ভারতের মোসলেমদল, তোমাদের বুক-জোড়া !
ইন্দ্রপ্রস্থ ভেঙেছি আমরা, আর্যাবর্ত ভাঙি
গড়েছি নিখিল নতুন ভারত নতুন স্বপনে রাঙি !
---নবীন প্রাণের সাড়া
আকাশে তুলিয়া ছুটিছে মুক্ত যুক্তবেণীর ধারা !
রুমের চেয়েও ভারত তোমার আপন, তোমার প্রাণ !
--- হেথায় তোমার ধর্ম অর্থ, হেথায় তোমার ত্রাণ ;
হেথায় তোমার আশান ভাই গো, হেথায় তোমার আশা ;
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
হিন্দু মুসলমান
কবি জীবনানন্দ দাশ (১৭.২.১৮৯৯ - ২২.১০.১৯৫৪)
আবৃত্তি - মোঃ ইকবাল রব্বানী। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ “ঝরা পালক” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
ভিডিওটি সৌজন্যে Durbin YouTube Channel.
যুগ যুগ ধরি এই ধূলিতলে বাঁধিয়াছ তুমি বাসা,
গড়িয়াছ ভাষা কল্পে-কল্পে দরিয়ার তীরে বসি,
চক্ষে তোমার ভারতের আলো--- ভারতেররবি, শশী,
হে ভাই মুসলমান
তোমাদের তরে কোল পেতে আছে ভারতের ভগবান !
এ ভারতভূমি নহেকো তোমার, নহেকো আমার একা,
হেথায় পড়েছে হিন্দুর ছাপ--- মুসলমানের রেখা ;
--- হিন্দু মনীষা জেগেছে এখানে আদিম উষার ক্ষণে,
ইন্দ্রদ্যুম্নে উজ্জয়িনীতে মথুরা বৃন্দাবনে !
পাটলীপুত্র শ্রাবস্তী কাশী কোশল তক্ষশীলা
অজন্তা আর নালন্দা তার রটিছে কীর্তিলীলা !
--- ভারতী কমলাসীনা
কালের বুকেতে বাজায় তাহার নব প্রতিভার বীণা !
এই ভারতের তখ্ তে চড়িয়া শাহানশাহার দল
স্বপ্নের মণিপ্রদীপে গিয়েছে উজলি আকাশতল !
--- গিয়েছে তাহারা কল্পলোকের মুক্তার মালা গাঁথি,
পরশে তাদের জেগেছে আরব-উপন্যাসের রাতি !
জেগেছে নবীন মোগল-দিল্লী---লাহোর, ---ফতেহপুর,
নতুন প্রেমের রাগে
তাজমহলের তরুণিমা আজও উষার অরুণে জাগে !
জেগেছে হেথায় আকবরী আইন--- কালের নিকষ কোলে
বারবার যার উজল সোনার পরশ উঠিছে জ্বলে।
সেলিম, শাজাহাঁ --- চোখের জলেতে এক্শা করিয়া তারা
গড়েছে মিনার মহলা স্তম্ভ কবর ও শাহদারা !
--- ছড়ায়ে রয়েছে মোগল ভারত--- কোটি-সমাধির স্তূপ
তাকায়ে রয়েছে তন্দ্রাবিহীন--- অপলক, অপরূপ !
--- যেন মায়াবীর তুড়ি
স্বপনের ঘোরে স্তব্ধ করিয়া রেখেছে কনকপুরী !
মোতিমহলের অযুত রাত্রি, লক্ষ দীপের ভাতি
আজিও বুকের মেহেরাবে যেন জ্বালায়ে যেতেছে বাতি !
--- আজিও অযুত বেগম-বাঁদীর শষ্পশয্যা ঘিরে
অতীত রাতের চঞ্চল চোখ চকিতে যেতেছে ফিরে !
দিকে দিকে আজও বেজে ওঠে কোন্ গজল-ইলাহী গান !
পথহারা কোন্ ফকিরের তানে কেঁদে ওঠে সারা প্রাণ !
--- নিখিল ভারতময়
মুসলমানের স্বপন-প্রেমের গরিমা জাগিয়া রয় !
এসেছিল যারা ঊষর ধূসর মরুগিরিপথ বেয়ে,
একদা যাদের শিবিরে-সৈন্যে ভারত গেছিল ছেয়ে,
আজিকে তাহা পড়শি মোদের, মোদের বহিন-ভাই ;
---আমাদের বুকে বক্ষ তাদের, আমাদের কোলে ঠাঁই।
‘কাফের’ ‘যবন’ টুটিয়া গিয়াছে, ছুটিয়া গিয়াছে ঘৃণা,
মোস্লেম্ বিনা ভারত বিফল, বিফল হিন্দু বিনা ;
--- মহামৈত্রীর গান
বাজিছে আকাশে নব ভারতের গরিমায় গরীয়ান !
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ
বিকেলের নক্ষত্রের কাছে ;
সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে
নির্জনতা আছে।
এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা
সত্য ; তবু শেষ সত্য নয়।
কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে ;
তবুও তোমার কাছে আমার হদয়।
আজকে অনেক রূঢ় রৌদে ঘুরে প্রাণ
পৃথিবীর মানুষকে মানুষের মতো
ভালোবাসা দিতে গিয়ে তবু,
দেখেছি আমারই হাতে হয়তো নিহত
ভাই বোন বন্ধু পরিজন পড়ে আছে ;
পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন ;
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।
কেবলই জাহাজ এসে আমাদের বন্দরের রোদে
দেখেছি ফসল নিয়ে ইপনীত হয়
সেই শস্য অগণন মানুষের শব ;
শব থেকে উৎসারিত স্বর্ণের বিস্ময়
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সুচেতনা
কবি জীবনানন্দ দাশ (১৭.২.১৮৯৯ - ২২.১০.১৯৫৪)
আবৃত্তি - সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। কবির ১৯৫২ সালে প্রকাশিত “বনলতা সেন” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। ভিডিওটি সৌজন্যে The
Bengalian YouTube Channel.
আমাদের পিতা বুদ্ধ কনফুশিয়সের মতো আমাদেরও প্রাণ
মূক করে রাখে ; তবু চারি দিকে রক্তক্লান্ত কাজের আহ্বান।
সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে---এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি
হবে ;
সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ ;
এ বাতাস কী পরম সূর্যকরোজ্জ্বল ;---
প্রায় তত দূর ভালো মানব-সমাজ
আমাদের মতো ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে
গড়ে দেব, আজ নয়, ঢের দূর অন্তিম প্রভাতে।
মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,
না এলেই ভালো হত অনুভব করে ;
এসে যে গভীরতর লাভ হল সে সব বুঝেছি
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্ব্বল ভোরে ;
দেখেছি যা হল হবে মানুষের যা হবার নয়---
শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলই অনন্ত সূর্যোদয়।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
আলো-অন্ধকারে যাই---মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বৌধ কাঞ্জ করে ;
স্বপ্ন নয়---শান্তি নয়---ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয় ;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে ;
সব কাজ তুচ্ছ হয়---পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা---প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়।
সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে !
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে
সহজ লোকের মতো ; তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর ; কোনো নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর? শরীরের স্বাদ
কে বুঝিতে চায় আর? প্রাণের আহলাদ
সকল লেকের মতো কে পাবে আবার!
সকল লোকের মতো বীজ বুনে আর
স্বাদ কই । ফসলের আকাঙ্ক্ষায় থেকে,
শরীরে মাটির গন্ধ মেখে,
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বোধ
কবি জীবনানন্দ দাশ (১৭.২.১৮৯৯ - ২২.১০.১৯৫৪)। আবৃত্তি - শম্ভু মিত্র। কবির ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত “ধূসর
পাণ্ডুলিপি” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। ভিডিওটি সৌজন্যে Sambhu Mitra - Topic YouTube Channel.
উত্সাহে আলোর দিকে চেয়ে
চাষার মতন প্রাণ পেয়ে
কে আর রহিবে জেগে পৃথিবীর 'পরে?
স্বপ্ন নয়---শান্তি নয়---কোন্ এক বোধ কাজ করে
মাথার ভিতরে।
পথে চ'লে পায়ে---পারাপারে
উপেক্ষা করিতে চাই তারে ;
মড়ার খুলির মতো ধ'রে
আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে
তবু সে মাথার চারিপাশে,
তবু সে চোখের চারিপাশে,
তবু সে বুকের চারিপাশে ;
আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ'লে আসে।
আমি থামি---
সেও থেমে যায় ;
সকল লোকের মাঝে ব’সে
আমার নিজের মৃদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা?
আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?
আমার পথেই শুধু বাধা?
জন্মিয়াছে যারা এই পৃথিবীতে
সন্তানের মতো হ'য়ে---
সন্তানের জন্ম দিতে-দিতে
যাহাদের কেটে গেছে অনেক সময়,
কিংবা আজ সন্তানের জন্ম দিতে হয়
যাহাদের ; কিংবা যারা পৃথিবীর বীজখেতে
আসিতেছে চ'লে
জন্ম দেবে---জন্ম দেবে ব'লে ;
তাদের হৃদয় আর মাথার মতন
আমার হৃদয় না কি? তাহাদের মন
আমার মনের মতো না কি?
---তবু কেন এমন একাকী?
তবু আমি এমন একাকী।
হাতে তুলে দেখিনি কি চাষার লাঙল?
বাল্টিতে টানিনি কি জল?
কাস্তে হাতে কতোবার যাইনি কি মাঠে?
মেছোদের মতো আমি কতো নদী ঘাটে
ঘুরিয়াছি ;
পুকুরের পানা শ্যালা---আঁশ্টে গায়ের ঘ্রাণ গায়ে
গিয়েছে জড়ায়ে ;
---এই সব স্বাদ ;
---এ-সব পেয়েছি আমি ; বাতাসের মতন অবাধ
বয়েছে জীবন,
নক্ষত্রের তলে শুয়ে ঘুমায়েছে মন
একদিন ;
এই সব সাধ
জানিয়াছি একদিন---অবাধ---অগাধ ;
চ'লে গেছি ইহাদের ছেড়ে ;
ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
অবহেলা ক'রে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
ঘৃণা ক'রে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে ;
আমারে সে ভালোবাসিয়াছে,
আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা ক'রে চ'লে গেছে---যখন ডেকেছি বারে-বারে
ভালোবেসে তারে ;
তবুও সাধনা ছিলো একদিন--- এই ভালোবাসা ;
আমি তার উপেক্ষার ভাষা
আমি তার ঘৃণার আক্রোশ
অবহেলা ক'রে গেছি ; যে-নক্ষত্র---নক্ষত্রের দোষ
আমার প্রেমের পথে বার-বার দিয়ে গেছে বাধা
আমি তা ভুলিয়া গেছি ;
তবু এই ভালোবাসা---ধুলো আর কাদা---।
মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়---প্রেম নয়---কোনো এক বোধ কাজ করে।
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চ’লে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে :
সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!
অবসাদ নাই তার? নাই তার শান্তির সময়?
কোনোদিন ঘুমাবে না? ধীবে শুয়ে থাকিবার স্বাদ
পাবে নাকি? পাবে লা আহ্লাদ
মানুষের মুখ দেখে কোনোদিন।
মানুষীর মুখ দেখে কোনোদিন !
শিশুদের মুখ দেখে কোনোদিন !
এই বোধ---শুধু এই স্বাদ
পায় সেকি অগাধ---অগাধ!
পৃথিবীর পথ ছেড়ে আকাশের নক্ষত্রের পথ
চায় না সে?-করেছে শপথ
দেখিবে সে মানুষের মুখ?
দেখিবে সে মানুষীর মুখ?
দেখিবে সে শিশুদের মুখ?
চোখে কালো শিরার অসুখ,
কানে যেই বধিরতা আছে,
যেই কুঁজ---গলগণ্ড মাংসে ফলিয়াছে
নষ্ট শসা---পচা চালকুমড়াক ছাঁচে,
যে-সব হৃদয়ে ফলিয়াছে
---সেই সব।
মনে হয় এর চেয়ে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া ভালো।
এইখানে
পৃথিবীর এই ক্লান্ত এ অশান্ত কিনারার দেশে
এখানে আশ্চর্য সব মানুষ রয়েছে।
তাদের সম্রাট নেই, সেনাপতি নেই ;
তাদের হৃদয়ে কোনো সভাপতি নেই ;
শরীর বিবশ হ'লে অবশেষে ট্রেড-ইউনিয়নের
কংগ্রেসের মতো কোনো আশা হতাশার
কোলাহল নেই।
অনেক শ্রমিক আছে এইখানে।
আরো ঢের লোক আছে
সঠিক শ্রমিক নয় তারা।
স্বাভাবিক মধ্যশ্রেণী নিম্নশ্রেণী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিধি থেকে ঝ'রে
এরা তবু মৃত নয় ; অন্তবিহীন কাল মৃতবৎ ঘোরে।
নামগুলো কুশ্রী নয়, পৃথিবীর চেনা-জানা নাম এই সব।
আমরা অনেক দিন এ-সব নামের সাথে পরিচিত ; তবু,
গৃহ নীড় নির্দেশ সকলি হারায়ে ফেলে ওরা
জানে না কোথায় গেলে মানুষের সমাজের পারিশ্রমিকের
মতন নির্দিষ্ট কোনো শ্রমের বিধান পাওয়া যাবে ;
জানে না কোথায় গেলে জল তেল খাদ্য পাওয়া যাবে,
অথবা কোথায় মুক্ত পরিচ্ছন্ন বাতাসের সিন্ধুতীর আছে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এইসব দিনরাত্রি
কবি জীবনানন্দ দাশ (১৭.২.১৮৯৯ - ২২.১০.১৯৫৪)। আবৃত্তি - শম্ভু মিত্র। কবির মৃত্যুর পর ১৯৬১ সালে
প্রকাশিত “বেলা অবেলা কালবেলা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। ভিডিওটি সৌজন্যে subrata sinha YouTube Channel.
মেডিকেল ক্যাম্বেলের বেলগাছিয়ার
যাদবপুরের বেড কাঁচড়াপাড়ার বেড সব মিলে কতগুলো সব?
ওরা নয়---সহসা ওদের হ'য়ে আমি
কাউকে শুধায়ে কোনো ঠিকমতো জবাব পাইনি।
বেড আছে, বেশি নেই---সকলের প্রয়োজনে নেই।
যাদের আস্তানা ঘর তল্পিতল্লা নেই
হাসপাতালের বেড হয়তো তাদের তরে নয়।
বটতলা মুচিপাড়া তালতলা জোড়াসাঁকো-আরো ঢের ব্যর্থ অন্ধকারে
যারা ফুটপাত ধ'রে অথবা ট্রামের লাইন মাড়িয়ে চলছে
তাদের আকাশ কোন দিকে?
জানু ভেঙে প'ড়ে গেলে হাত কিছুক্ষণ আশাসীল
হ’য়ে কিছু চায়---কিছু খোঁজে ;
এ ছাড়া আকাশ আর নেই।
তাদের আকাশ
সর্বদাই ফুটপাতে,
মাঝে-মাঝে এম্বুলেনস্ গাড়ির ভিতরে
রণক্লাস্ত নাবিকেরা ঘরে
ফিরে আসে
যেন এক অসীম আকাশে।
এ-রকম ভাবে চ'লে দিন যদি রাত হয়, রাত যদি হ'য়ে যায় দিন,
পদাচিহ্নময় পথ হয় যদি দিকচিহ্নহীন,
কেবলই পাথুরেঘাটা নিমতলা চিৎপুর---
খালের এপার-ওপার রাজাবাজারের অস্পষ্ট নির্দেশে
হাঘরে হাভাতেদের তবে
অনেক বেডের প্রয়োজন ;
বিশ্রামের প্রয়োজন আছে,
বিচিত্র মৃত্যুর আগে শান্তির কিছুটা প্রয়োজন।
হাসপাতালের জন্যে যাহাদের অমূল্য দাদন,
কিংবা! যারা মরণের আগে মৃতদের
জাতিধর্ম নির্বিচারে সকলকে---সব তুচ্ছতম আর্তকেও
শরীরের সান্ত্বনা এনে দিতে চায়,
কিংবা যাবা এই সব মৃত্য রোধ ক’রে এক সাহসী পৃথিবী
সিবাতাস সমুজ্জ্বল সমাজ চেয়েছে---
তাদের ও তাদের প্রতিভা প্রেম সংকল্পকে ধন্যবাদ দিয়ে
মানুষকে ধন্যবাদ দিয়ে যেতে হয়।
মানুষের অনিঃশেষ কাজ চিন্তা কথা
রক্তের নদীর মতো ভেসে গেলে, তারপর, তবু, এক অমূল্য মুগ্ধতা
অধিকার ক'রে নিয়ে ক্রমেই নির্মল হ’তে পারে।
ইতিহাস অর্ধসত্যে কামাচ্ছন্ন এখনো কালের কিনারায়,
তবুও মানুষ এই জীবনকে ভালোবাসে, মানুষের মন
জানে জীবনের মানে : সকলের ভালো ক’রে জীবনযাপন।
কিন্তু সেই শুভ রাষ্ট্র ঢের দূরে আজ।
চারিদিকে বিকলাঙ্গ অন্ধ ভিড়---অলীক প্রয়াণ।
মন্বন্তর শেষ হ'লে পুণরায় নব মন্বন্তর,
যুদ্ধ শেন হ’য় গেলে নতুন যুদ্ধের নান্দীরোল,
মানুষের লালসার শেষ নেই ;
উত্তেজনা ছাড়া কোনো দিন ঋতু ক্ষণ
অবৈধ সংগম ছাড়া সুখ
অপরের মুখ ম্লান ক'রে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ
নেই।
কেবলি আসন থেকে বড়ো নবতর
সিংহাসনে যাওয়া ছাড়া গতি নেই কোনো।
মানুষের দুঃখ কষ্ট মিথ্যা নিষ্ফলতা বেড়ে যায়।
মনে পড়ে কবে এক রাত্রির স্বপ্নের ভিতরে
শুনেছি একটি কুষ্ঠকলঙ্কিত নারী
কেমন আশ্চর্য গান গায় ;
বোবা কালা পাগল মিনসে এক অপরূপ বেহালা বাজায় ;
গানের ঝংকারে যেন সে এক একান্ত শ্যাম দেবদারু গাছে
রাত্রির বর্ণের মতো কালো-কালো শিকারী বেড়াল
প্রেম নিবেদন করে আলোর রঙের মতো অগণন পাখিদের কাছে ;
ঝর্ ঝর্ ঝর্
সারারাত শ্রাবণের নির্গলিত ক্লেদরক্ত বৃষ্টির ভিতর
এ-প্রথিবী ঘুম স্বপ্ন রুদ্ধশ্বাস
শঠতা রিরংসা মৃত্যু নিয়ে
কেমন প্রমত্ত কালো গণিকার উল্লোল সংগীতে
মুখের ব্যাদান সাধ দুর্দান্ত গণিকালয়---নরক শ্মশান হ'লো সব।
জেগে উঠে আমাদের আজকের পৃথিবীকে এ-রকম ভাবে অনুভব
আমিও করেছি রোজ সকালের আলোর ভিতরে
বিকেলে---রাত্রির পথে হেঁটে ;
দেখেছি রজনীগন্ধা নারীর শরীর অন্ন মুখে দিতে গিয়ে
আমরা অঙ্গার রক্ত : শতাব্দীর অন্তহীন আগুনের ভিতরে দাঁডিয়ে।
এ-আগুন এত রক্ত মধ্যযুগ দেখেছে কখনো?
তবু সকল কাল শতাব্দীকে হিসেব নিকেশ ক'রে আজ
শুভ কাজ সুচনার আগে এই পৃথিবীর মানবহৃদয়
স্নিগ্ধ হয়---বীতশোক হয়?
মানুষের সব গুণ শান্ত নীলিমার মতো ভালো?
দীনতা : অন্তিম গুণ, অন্তহীন নক্ষত্রের আলো।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
দিনের আলোয় ওই চারিদিকে মানুষের অস্পষ্ট ব্যস্ততা :
পথে-ঘাটে ট্রাক ট্রামলাইনে ফুটপাতে ;
কোথাও পরের বাড়ি এখুনি নিলেম হবে---মনে হয়,
জলের মতন দামে।
সকলকে ফাণকি দিয়ে স্বর্গে পৌঁছুবে
সকলের আগে সকলেই তাই।
অনেকেরই উর্ধ্বশ্বাসে যেতে হয়, তবু
নিলেমের ঘরবাড়ি আসবাব---অথবা যা নিলেমের নয়
সে-সব জিনিস
বহুকে বঞ্চিত ক'রে দু-জন কি একজন কিনে নিতে পারে।
পৃথিবীতে সুদ খাটে : সকলের জন্যে নয়।
অনির্বচনীয় হুণ্ডি একজন দু-জনের হাতে।
পৃথিবীর এই সব উঁচু লোকদের দাবি এসে
সবই নেয়, নারীকেও নিয়ে যায়।
বাকি সব্ মানুষেরা অন্ধকারে হেমস্তের অবিরল পাতার মতন
কোথাও নদীর পানে উড়ে যেতে চায়,
অথবা মাটির দিকে--- পৃথিবীর কোনো পুনঃপ্রবাহের বীজের ভিতরে
মিশে গিয়ে। পৃথিবীতে ঢের জন্ম নষ্ট হ’য়ে গেছে জেনে, তবু
আবার সূর্যের গন্ধে ফিরে এসে ধূলো ঘাস কুসুমের অমৃতত্বে কবে
পরিচিত জল, আলো আধো অধিকারিণীকে অধিকার ক'রে নিতে হবে
ভেবে তা'রা অন্ধকারে লীন হ’য়ে যায়।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
১৯৪৬--৪৭
কবি জীবনানন্দ দাশ (১৭.২.১৮৯৯ - ২২.১০.১৯৫৪)। আবৃত্তি - সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার
সময়ে লেখা কিন্তু কবির মৃত্যুর পর ১৯৬১ সালে প্রকাশিত “বেলা অবেলা কালবেলা” কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত। ভিডিওটি সৌজন্যে
Autorun. Inf YouTube Channel.
লীন হ'য়ে গেলে তা'রা তখন তো--- মৃত।
মৃতেরা এ-পৃথিবীতে ফেরে না কখনো।
মৃতেরা কোথাও নেই ; আছে?
কোনো-কোনো অঘ্রাণের পথে পায়চারি-করা শান্ত মানুষের
হৃদয়ের পথে ছাড়া মৃতেরা কোথাও নেই ব’লে মনে হয় ;
তা হ'লে মৃত্যুর আগে আলো অন্ন আকাশ নারীকে
কিছুটা সুস্থিরভাবে পেলে ভালো হ'তো।
বাংলার লক্ষ গ্রাম নিরাশীয় আলোহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেল।
সূর্য অস্তে চ’লে গেলে কেমন সুকেশী অন্ধকার
খোঁপা বেঁধে নিতে আসে--- কিন্তু কার হাতে?
আলুলায়িত হ'য়ে চেয়ে থাকে--- কিন্তু কার তরে?
হাত নেই--- কোথাও মানুষ নেই ; বাংলার লক্ষ গ্রামরাত্রি একদিন
আলপনার, পটের ছবির,মতো সুহাস্যা, পটলচেরা চোখের মানুষী
হু'তে পেরেছিলো প্রায় ; নিভে গেছে সব।
এইখানে নবান্নের ঘ্রাণ ওরা সেদিনও পেয়েছে ;
নতুন চালের রসে রৌদ্রে কতো কাক
এ-পাড়ার বড়ো মেজো . . . ও-পাড়ার দুলে বোয়েদের
ডাকশাঁখে উড়ে এসে সুধা খেয়ে যেত ;
এখন টুঁ শব্দ নেই সেই সব কাকপাখিদেরও ;
মানুষের হাড় খুলি মাঙ্গষের গণনার সংখ্যাধীন নয় ;
সময়ের হাতে অন্তহীন।
ওখানে চাঁদের রাতে প্রান্তরে চাষার নাচ হ'তো
ধানের অদ্ভূত রস খেয়ে ফেলে মাঝি বাগ্দির
ঈশ্বরী মেয়ের সাথে
বিবাহের কিছু আগে--- বিবাহের কিছু পরে--- সন্তানের জন্মাবার আগে।
সে-সব সন্তান আজ এ-যুগের কুরাষ্ট্রের মুঢ়
ক্লান্ত লোকসমাজের ভিড়ে চাপা প'ড়ে
মৃত প্রায় ; আজকের এই সব গ্রাম্য সন্ততির
প্রপিতামহের দল হেসে খেলে ভালোবেসে--- অন্ধকারে জমিদারদের
চিরস্থায়ী ব্যবস্থাকে চড়কের গাছে তুলে ঘুমায়ে গিয়েছে।
ওরা খুব বেশি ভালো ছিলো না ; তবুও
আজকের মন্বন্তর দাঙ্গা দুঃখ নিরক্ষরতায়
অন্ধ শতছিন্ন গ্রাম্য প্রাণীদের চেয়ে
পৃথক আর-এক স্পষ্ট জগতের অধিবাসী ছিলো।
আজকে অস্পষ্ট সব? ভালো ক'রে কথা ভাবা এখন কঠিন ;
অন্ধকারে অর্ধসত্য সকলকে জানিয়ে দেবার
নিয়ম এখন আছে ; তারপর একা অন্ধকারে
বাকি সত্য আঁচ ক'রে নেওয়ার রেওয়াজ
র’য়ে গেছে ; সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে।
সৃষ্টির মনের কথা মনে হয়--- দ্বেষ।
সৃষ্টির মনের কথা : আমাদেরি আন্তরিকতাতে
আমাদেরি সন্দেহের ছায়াপাত টেনে এনে ব্যথা
খুঁজে আনা। প্রকৃতির পাহাড়ে পাথরে সমুচ্ছল
ঝর্ণার জল দেখে তারপর হৃদয়ে তাকিয়ে
দেখেছি প্রথম জল নিহত প্রাণীর রক্তে লাল
হ'য়ে আছে বলে বাঘ হরিণের পিছু আজো ধায় ;
মানুষ মেরেছি আমি--- তার রক্তে আমার শবীর
ভ’রে গেছে ; পৃথিবীর পথে এই নিহত ভ্রাতার
ভাই আমি ; আমাকে সে কনিষ্ঠের মতো জেনে তবু
হৃদয়ে কঠিন হ’য়ে বধ ক'রে গেল, আমি রক্তাক্ত নদীর
কল্লোলের কাছে শুয়ে অগ্রজপ্রতিম বিমৃঢ়কে
বধ ক'রে ঘুমাতেছি--- তাহার অপরিসর বুকের ভিতরে
মুখ রেখে মনে হয় জীবনের স্নেহশীল ব্রতী
সকলকে আলো দেবে মনে ক'রে অগ্রসর হ'য়ে
তবুও কোথাও কোনো আলো নেই ব'লে ঘুমাতেছে।
ঘুমাতেছে।
যদি ডাকি রক্তের নদীর থেকে কল্লোলিত হ'য়ে
ব'লে যাবে কাছে এসে, ‘ইয়াসিন আমি,
হানিফ মহম্মদ মকবুল করিম আজিজ---
আর তুমি?’ আমার বুকের ’পরে হাত রেখে মৃত মুখ থেকে
চোখ তুলে সুধাবে সে--- রক্তনদী উদ্বেলিত হ'য়ে
ব'লে যাবে, ‘গগন, বিপিন, শশী, পাথুরেঘাটার ;
মানিকতলার, শ্যামবাজারের, গ্যালিফ স্ট্রিটের, এণ্টালীর---’
কোথাকার কেবা জানে ; জীবনের ইতর শ্রেণীর
মানুষ তো এরা সব ; ছেঁড়া জুতো পায়ে
বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা করে ;
সৃষ্টির অপরিক্লান্ত চারণার বেগে
এই সব প্রাণকণা জেগেছিলো--- বিকেলের সূর্যের রশ্মিতে
সহসা সুন্দর ব’লে মনে হয়েছিলো কোনো উজ্জ্বল চোখের
মনীষী লোকের কাছে এই সব অনুর মতন
উদ্ভাসিত পৃথিবীর উপেক্ষিত জীবনগুলোকে।
সূর্যের আলোর ঢলে রোমাঞ্চিত রেণুর শরীরে
রেণুর সংঘর্ষে যেই শব্দ জেগে ওঠে
সেখানে সময় তার অনুপম কণ্ঠের সংগীতে
কথা বলে ; কাকে বলে? ইয়াসিন মকবুল শশী
সহসা নিকটে এসে কোনো-কিছু বলবার আগে
আধ খণ্ড অনন্তের অন্তরের থেকে যেন ঢের
কথা ব’লে গিয়েছিলো ; তবু---
অনন্ত তো খণ্ড নয় ; তাই সেই স্বপ্ন, কাজ, কথা
অখণ্ড অনন্তে অন্তর্হিত হ'য়ে গেছে ;
কেউ নেই, কিছু নেই--- সূর্য নিভে গেছে।
এ-যুগে এখন ঢের কম আলো সব দিকে, তবে।
আমধা এ-পৃথিবীর বহুদিনকার
কথা কাজ ব্যথা ভুল সংকল্প চিন্তার
মর্যাদায় গড়া কাহিনীর মূল্য নিংড়ে এখন
সঞ্চয় করেছি বাক্য শব ভাষা অনুপম বাচনের রীতি।
মানুষের ভাষা তবু অনুভূতিদেশ থেকে আলো
না পেলে নিছক ক্রিয়া ; বিশেষণ ; এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল ;
জ্ঞানের নিকট থেকে ঢের দুরে থাকে।
অনেক বিদ্যার দান উত্তরাধিকারে পেয়ে তবু
আমাদের এই শতকের
বিজ্ঞান তো সংকলিত জিনিসের ভিড় শুধু--- বেড়ে যায় শুধু ;
তবুও কোথাও তার প্রাণ নেই বলে অর্থময়
জ্ঞান নেই আজ এই পৃথিবীতে ; জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই।
এ-যুগে কোথাও কোনো আলো--- কোনো কান্তিময় আলো
চোখের সুমুখে নেই যাত্রিকের ; নেই তো নিঃসৃত অন্ধকার
রাত্রির মায়ের মতো : মানুষের বিহ্বল দেহের
সব দোষ প্রক্ষালিত ক'রে দেয়--- মানুষের বিহবল আত্মাকে
লোকসমাগমহীন একান্তের অন্ধকারে অন্তঃশীল ক'রে
তাকে আর সুধায় না--- অতীতের সুধানো প্রশ্নের
উত্তর চায় না আর--- শুধু শব্দহীন মৃত্যুহীন
অন্ধকারে ঘিরে রাখে, সব অপরাধ ক্লান্তি ভয় ভুল পাপ
বীতকাম হয় যাতে--- এ-জীবন ধীরে-ধীরে বীনশোক হয়,
স্নিগ্ধতা হৃদয়ে জাগে ; যেন দিকচিহ্নময় সমুদ্রের পারে
কয়েকটি দেবদারুগাছের ভিতরে অবলীন
বাতাসের প্রিয়কণ্ঠ কাছে আসে--- মানুষের রক্তাক্ত আত্মায়
সে-হাওয়া অনবচ্ছিন্ন সুগমের--- মানুষের জীবন নির্মল।
আজ এই পৃথিবীতে এমন মহানুভব ব্যাপ্ত অন্ধকার
নেই আর? সুবাতাস গভীরতা পবিত্রতা নেই?
তবুও মানুষ অন্ধ দুর্দশার থেকে স্নিগ্ধ আঁধারের দিকে
অন্ধকার হ'তে তার নবীন নগরী গ্রাম উৎসবের পানে
যে অনবনমনে চলেছে আজো--- তার হৃদয়ের
ভুলের পাপের উত্স অতিক্রম ক'রে চেতনার
বলয়ের নিজ গুণ বয়ে গেছে ব'লে মনে হয়।
বাংলার অঙ্গনেতে বাজায়েছ নটেশের রঙ্গমল্লী গাঁথা
অশান্ত সন্তান ওগো, ---বিপ্লবিনী পদ্মা ছিল তব নদী মাতা।
কালবৈশাখীর দোলা অনিবার দুলাইত রক্তপুঞ্জ তব
উত্তাল ঊর্মির তালে--- বক্ষে তব লক্ষ কোটি পন্নগ-উৎসব
উদ্যত ফণার নৃত্যে আস্ফালিত ধূর্জটির কণ্ঠ-নাগ জিনি,
ত্রন্বক-পিনাকে তব শষ্কাকুল ছিল সদা শক্র অক্ষৌহিণী।
স্পর্শে তব পুরোহিত, ক্লেদে প্রাণ নিমেষেতে উঠিত সঞ্চারি,
এসেছিলে বিষ্ণুচক্র মর্মন্তুদ--- ক্লৈব্যের সংহারী।
ভেঙেছিলে বাঙালির সর্বনাশী সুষুপ্তির ঘোর,
ভেঙেছিলে ধুলিশ্লিষ্ট শঙ্কিতের শৃঙ্খলের ডোর,
ভেঙেছিলে বিলাসের সুরাভাণ্ড তীব্র দর্পে, বৈরাগের রাগে,
দাঁড়ালে সন্ন্যাসী যবে প্রাচীমঞ্চে--- পৃথ্বী-পুরোভাগে।
নবীন শাক্যের বেশে, কটাক্ষেতে কাম্য পরিহরি
ভাসিয়া চলিলে তুমি ভারতের ভাবগঙ্গোত্তরী
আর্ত অস্পৃশ্যের তরে, পৃথিবীর পঞ্চমার লাগি ;
বাদলের মন্ত্র সম মন্ত্র তব দিকে দিকে তুলিলে বৈরাগী।
শান্তিপ্রিয় মুমূর্ষুর শ্মশানেতে এনেছিলে আহব-সংবাদ,
গাণ্ডীবের টঙ্কারেতে মুহুর্মুহু বলেছিলে, “আছি, আমি আছি !
কল্পশেষে ভারতের কুরুক্ষেত্রে আসিয়াছি নব সব্যসাচী।"
ছিলে তুমি দধীচির অস্থিময় বাসবের দম্ভোলির সম,
অলঙ্ঘ্য, অজেয়, ওগো লোকোত্তর, পুরুষোত্তম।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
দেশবন্ধু
কবি জীবনানন্দ দাশ (১৭.২.১৮৯৯ - ২২.১০.১৯৫৪)। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ “ঝরা পালক”-এর কবিতা।
কবিতাটি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ১৯২৫ সালে মৃত্যুর পরে লেখা। কবিতার কথার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ বাংলাকবিতা.কম
ওয়েবসাইটের কাছে। সেই ওয়েবসাইটে যেতে . . .।
ছিলে তুমি রুদ্রের ডম্বরুরূপে, বৈষ্ণবের গুপীযন্ত্র মাঝে,
অহিংসার তপোবনে তুমি ছিলে চত্রবর্তী ক্ষত্রিয়ের সাজে---
অক্ষয় কবচধারী শালপ্রাংশু রক্ষকের বেশে।
ছিলে তুমি সিংহশিশু, যোজনান্ত বিহরি একাকী
স্তব্ধ শিলাসন্ধিতলে ঘন ঘন গর্জনের প্রতিধ্বনি মাখি।
উন্মত্ত ঝটিকাসম, বহ্নিমান বিপ্লবের ঘোরে ;
শক্তিশেল অপঘাতে দেশবক্ষে রোমাঞ্চিত বেদনার ধ্বনি
ঘুচাতে আসিয়াছিলে মৃত্যুঞ্জয়ী বিশল্যকরণী।
শবসাধকের বেশে---সঞ্জীবনী অমৃত সন্ধানে।
রণনে রঞ্জনে তব হে বাউল, মন্ত্রমুগ্ধ ভারত, ভারতী ;
কলাবিৎ সম হায় তুমি শুধু দগ্ধ হলে দেশ-অধিপতি।
বিধিবশে দূরাগত বন্ধু আজ, ভেঙে গেছে বসুধা-নির্মোক,
অন্ধকার দিবাভাগে বাজে তাই কাজরীর শ্লোক।
গিরিতটে, ভূমিগর্ভ ছায়াচ্ছন্ন---উচ্ছ্বাসউচ্ছল।
যৌবনের জলরঙ্গ এসেছিল ঘনস্বনে দরিয়ার দেশে,
তৃষ্ণাপাংশু অধরেতে এসেছিল ভোগবতী ধারার আশ্লেষে।
অর্চনার হোমকুণ্ডে হবি সম প্রাণবিন্দু বারংবার ঢালি,
বামদেবতার পদে অকাতরে দিয়ে গেল মেধ্য হিয়া ডালি।
গৌরকান্তি শঙ্করের অম্বিকার বেদীতলে একা
চুপে চুপে রেখে এল পুঞ্জীভূত রক্তস্রোত-রেখা।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
১৬ জুন, ১৯২৫ সাল। আকস্মিকভাবে জীবনাবসান
হল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের। সারা দেশ শোকস্তব্ধ
হল। শোকাহত রবীন্দ্রনাথ শ্রদ্ধায় স্মরণে লিখলেন ---
‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ / মরণে তাহাই
তুমি করে গেলে দান।" দেশবন্ধুর মৃত্যুর পরেরদিনই
(১৭ জুন, ১৯২৫) বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম
তাঁর শ্রদ্ধা অর্পণ করলেন একটি গান রচনায়, নাম
‘অর্ঘ্য’। দেশবন্ধুর অন্তিমযাত্রায় ফুলের রাশির সাথে
চিত্তরঞ্জনের মরদেহের উপর নিবেদিত হয় নজরুলের
‘অর্ঘ্য’ গানটিও। এরপরে দেশবন্ধু স্মরণে নজরুল
লিখেছিলেন -- ‘ইন্দ্রপতন’ ও ‘সান্ত্বনা’ নামে দু'টি
কবিতা এবং তাঁর বিখ্যাত 'রাজভিখারী’ গানটি। সেই
সময় তরুণ কবি জীবনানন্দ লেখেন তাঁর এই
'দেশবন্ধু' কবিতাটি। এটি প্রকাশিত হয়েছিল
'বঙ্গবাণী' পত্রিকার বিশেষ 'চিত্তরঞ্জন স্মরণ' সংখ্যায়।
পরবর্তীকালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’-এও
কবিতাটি সংকলিত হয়। ভাবলে বিস্মিত হতে হয়
যে, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ – বাংলার এই
শ্রেষ্ঠ তিন কবির কলমেই উঠে এসেছিল চিত্তরঞ্জনের
জীবনাবসানে বিয়োগব্যথা। বাস্তবিকই ‘মৃত্যুহীন প্রাণ’
ছিলেন তিনি। কবিতাগুলি তারই উজ্জ্বল প্রমাণ।
জীবনানন্দ দাশের কবিতাটি প্রতিবাদী কবিতার
পাতায় আমরা চয়ন করেছি শুধু এর ঐতিহাসিক
মূল্য বিবেচনায় নয়। এই কবিতার মর্মবাণী যুগ-
যুগান্তরের বাংলা তথা সারা দেশ-দুনিয়ার
স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষের শোষণমুক্তি ও
পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচন করে "অধিকার বুঝে
নেওয়ার প্রখর দাবিতে" লড়াইয়ে যাঁরা 'মৃত্যুহীন প্রাণ',
অতীত ও বর্তমানের সেই সকল বিপ্লবীনায়কদের
প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবেও।---রাজেশ দত্ত॥
এই পৃথিবীর এ এক শতচ্ছিদ্র নগরী।
দিন ফুরুলে তারার আলো খানিক নেমে আসে।
গ্যাসের বাতি দাঁড়িয়ে থাকে রাতের বাতাসে।
দ্রুতগতি নরনাবীর ক্ষণিক শরীর থেকে
উৎসারিত ছায়ার কালো ভারে
আঁধার আলোয় মনে হ'তে পারে
এ-সব দেয়াল যে-কোনো নগরীর ;
সন্দেহ ভয় অপ্রেম দ্বেষ অবক্ষয়ের ভিড়
সূর্য তারার আলোয় অঢেল রক্ত হ'তে পারে
যে-কোনোদিন ; সে কতবার আঁধার বেশি শানিত হয়েছে ;
বাহক নেই--- দুরন্ত কাল নিজেই রয়েছে
নিজেরি শব নিজে মানুষ,
মানবপ্রাণের রহস্যময় গভীর গুহার থেকে
সিংহ শকুন শেয়াল নেউল সর্পদন্তস্ত ডেকে।
হৃদয় মাছে ব'লেই মানুষ, দেখ, কেমন বিচলিত হ’য়ে
বোনভাগ্নেকে খুন ক’রে সেই রক্ত দেখে আঁশটে হৃদয়ে
জেগে উঠে ইতিহাসের অধম স্থুলতাকে
ঘুচিয়ে দিতে জ্ঞানপ্রাতিভা আকাশ প্রেম নক্ষত্রকে ডাকে।
এই নগরী যে-কোনো দেশ, যে-কোনো পরিচয়ে
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অনন্দা
কবি জীবনানন্দ দাশ (১৭.২.১৮৯৯ - ২২.১০.১৯৫৪)
কবির মৃত্যুর পর ১৯৬১ সালে প্রকাশিত “বেলা অবেলা কালবেলা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। কবিতার কথার জন্য
আমরা কৃতজ্ঞ বাংলাকবিতা.কম ওয়েবসাইটের কাছে। সেই ওয়েবসাইটে যেতে . . .।
আজ পৃথিবীর মানবজাতির ক্ষয়ের বলয়ে
অন্তবিহীন ফ্যাক্টরি ক্রেন ট্রাকের শব্দে ট্র্যাফিক কোলাহলে
হৃদয়ে যা হারিয়ে গেছে মেশিনকণ্ঠে তাকে
শূন্য অবলেহুন থেকে ডাকে।
“তূমি কি গ্রীস পোল্যাণ্ড চেক প্যারিস মিউনিক
টোকিও রোম নিউইয়র্ক ক্রেমলিন আাটলান্টিক
লণ্ডন চীন দিল্লী মিশর করাচী পালেস্টাইন?
একটি মৃত্যু, এক ভূমিকা, একটি শুধু আইন।”
বলছে মেশিন। মেশিনপ্রতিম অধিনায়ক বলে :
“সকল ভূগোল নিতে হবে নতুন ক'রে গ'ড়ে
আমার হাতে গড়া ইতিহাসের ভেতরে,
নতুন সময় সীমাবলয় সবই তো আজ আমি ;
ওদের ছোঁয়া বাঁচিয়ে আমার স্বত্বাধিকারকামী ;
আমি সংঘ জাতি রীতি রক্ত হলুদ নীল ;
সবুজ শাদা মেরুন অশ্লীল
নিয়মগুলো বাতিল করি ; কালো কোর্তা দিয়ে
ওদের ধূসর পাটকিলে বফ্ কোর্তা তাড়িয়ে
আমার অনুচরের বৃন্দ অন্ধকারের বার
আলোক ক'রে কী অবিনাশ দ্বৈপ-পরিবার।
এই দ্বীপই দেশ ; এ-দ্বীপ নিখিল তবে।
অন্য সকল দ্বীপের হ’তে হবে
আমার মতো--- আমার অনুচরেব মতো ধ্রুব।
হে রক্তবীজ, তুমি হবে আমার আঘাত পেয়ে
অনবর্তুল আমির মতো শুভ।”
সবাই তো আজ যে যার অন্তরঙ্গ জিনিস খুঁজে
মানবভ্রাতাবোনকে বুকে টেনে নেবার ছলে
তাদের নিকেশ ক’রে অনির্বচন রক্তে এই পৃথিবীর জলে
নানারকম নতুন নামের বৃহৎ ভীষণ নদী হ’য়ে গেল,
এই পৃথিবীর সব নগরী পবিক্রমা ক'রে
নতুন অভিধানের শব্দে ছন্দে জেগে সুররিসর ভোরে
এ-সব নদী গভীরতর মানে পেতে চায়---
দিকসময়ের আতল রক্ত স্খালন ক’রে অননুতপ্ততায়,
বাস্তবিকই জল কি জলের নিকটতম মানে?
অথবা কি মানবরক্ত বহন করি নির্মম অজ্ঞানে?
কি আন্তরিক অর্থ কোথায় আছে?
এই পৃথিবীর গোষ্ঠীরা কি পরস্পরের কাছে
ভাইয়ের মতো : সৎ প্রকৃতির স্পষ্ট উৎস থেকে
মানবসভ্যতার এই মলিন ব্যতিক্রমে জেগে উঠে?
যে যার দেহ আত্মা ভালোবেসে অমল জলকণার মতন
সমুদ্রকে এক মুঠে
ধ’রে আছে?
ভালো ক'রে বেঁচে থাকার বিশদ নির্দেশে
সূর্যকরোজ্জ্বল প্রভাতে এসে
হিংসা গ্লানি মৃত্যুকে শেষ ক’রে
জেগে আছে?
জেগে উঠে সময়সাগরতীরে সূর্যস্রোতে
তবুও ক্লান্ত পতিত মলিন হ'তে
কি আবেদন আসছে মানুষ প্রতিদিনই---
কোথার থেকে শকুনক্রান্তি বলে :
“জলের নদী? জেগে উঠুক আপামরের রক্ত কোলাহলে।"
এ-সুর শুরু হয়েছিলো কুরুবর্ষে--- বেবিলনে ট্রয়ে,
মানুষ মানী জ্ঞানী প্রধান হ’য়ে গেছে, তবুও হৃদয়ে
ভালোবাসার যৌনকুয়াশা কেটে
যে-প্রেম আসে সেটা কি তার নিজের ছায়ার প্রতি?
জলের কলরোলের পাশে এই নগরীর অন্ধকারে আজ
আঁধার আরো গভীরতর ক'রে ফেলে সভাতার এই অপার
আত্মরতি ;
চারিদিকে নীল নরকে প্রবেশ করার চাবি
অসীম স্বর্গ খুলে দিয়ে লক্ষ কোটি নরককীটের দাবি
জাগিয়ে তবু সে-কীট ধ্বংস করার মতো হ'য়ে
ইতিহাসের গভীরতর শক্তি ও প্রেম রেখেছে কিছু হয়তো
হৃদয়ে।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে
উঠলাম আবার
তাকিয়ে দেখলাম পাণ্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার
অর্ধেক ছায়া
গুটিয়ে নিয়েছে যেন
কীর্তিনাশার দিকে।
ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম--- পুউষের
রাতে---
কোনোদিন আর জাগবো না জেনে
কোনোদিন জাগবো না আমি--- কোনোদিন জাগবো না
আর---
হে নীল কস্তুরী আভার চাঁদ,
তুমি দিনের আলো নও, উদ্যম নও, স্বপ্ন নও,
হৃদয়ে যে মৃত্যুর শান্তি ও স্থিরতা রয়েছে,
রয়েছে যে অগাধ ঘুম,
সে-আস্বাদ নষ্ট করবার মতো শেলতীব্রতা তোমার নেই,
তুমি প্রদাহ প্রবহমান যন্ত্রণা নও---
জানো না কি চাঁদ,
নীল কস্তুরী আভার চাঁদ,
জানো না কি নিশীথ,
আমি অনেক দিন--- অনেক অনেক দিন
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অন্ধকারের সারাৎসারে অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থেকে
হঠাৎ ভোরের আলোর মূর্খ উচ্ছ্বাসে নিজেকে পৃথিবীর
জীব ব'লে
বুঝতে পেরেছি আবার,
ভয় পেয়েছি,
পেয়েছি অসীম দুর্নিবার বেদনা,
দেখেছি রক্তিম আকাশে সূর্য জেগে উঠে
মানুষিক সৈনিক সেজে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য
আমাকে নির্দেশ দিয়েছে,
আমার সমস্ত হৃদয় ঘৃণায়--- বেদনায়--- আক্রোশ ভ'রে
গিয়েছে,
সূর্যের রৌদ্রে আক্রান্ত এই পৃথিবী যেন কোটি-কোটি
শুয়োরের আর্তনাদে
উৎসব শুরু করেছে।
হায়, উৎসব!
হৃদয়ের অবিরল অন্ধকারের ভিতর সূর্যকে ডুবিয়ে ফেলে
আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি,
অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর
মতো মিশে
থাকতে চেয়েছি।
হে নর, হে নারী,
তোমাদের পৃথিবীকে চিনিনি কোনোদিন ;
আমি অন্য কোনো নক্ষত্রের জীব নই।
যেখানে স্পন্দন, সংঘর্ষ, গতি, যেখানে উদ্যম, চিন্তা, কাজ,
সেখানেই সূর্য, পৃথিবী, বৃহস্পতি, কালপুরুষ,
অনন্ত আকাশ গ্রন্থি,
শত-শত শূকরের চিৎকার সেখানে,
শত-শত শূকরীর প্রসববেদনার আড়ম্বর,
এই সব ভয়াবহ আরতি!
গভীর অন্ধকারের ঘুমের আস্বাদে আমার আত্মা লালিত ;
আমাকে কেন জাগাতে চাও?
হে সময়গ্রন্থি, হে সূর্য, হে মাঘনিশীথের কোকিল, হে স্মৃতি,
হে হিম হাওয়া,
আমাকে জাগাতে চাও কেন?
অরব অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে
জেগে উঠবো না আর ;
তাকিয়ে দেখবো না নির্জন বিমিশ্র চাঁদ বৈতরণীর থেকে
অর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে
কীতিনাশার দিকে।
ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকবো--- ধীরে---
পউষের রাতে---
কোনোদিন জাগবো না জেনে---
কোনোদিন জাগবো না আমি--- কোনোদিন আর।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
কোনো হদে
কোথাও নদীর ঢেউয়ে
কোনো এক সমুদ্রের জলে
পরস্পরের সাথে দু-দণ্ড জলের মতো মিশে
সেই এক ভোরবেলা শতাব্দীর সূর্যের নিকটে
আমাদের জীবনের আলোড়ন---
হয়তো বা জীবনকে শিখে নিতে চেয়েছিলো।
অন্য এক আকাশের মতো চোখ নিয়ে
আমরা হেসেছি,
আমরা খেলেছি ;
স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো গ্লানি নেই তেবে
একদিন ভালোবেসে গেছি।
সেই সব রীতি আজ মৃতের চোখের মতো তবু---
তারার আলোর দিকে চেয়ে নিরালোক।
হেমন্তের প্রান্তরের তারার আলোক।
সেই জের টেনে আজো খেলি।
সূর্যালোক নেই--- তবু---
সূর্যালোক মনোরম মনে হ'লে হাসি।
স্বতই বিমর্ষ হ'য়ে ভদ্র সাধারণ
চেয়ে দ্যাখে তবু সেই বিষাদের চেয়ে
আরো বেশি কালো-কালো ছায়া
লঙ্গরখানার অন্ন খেয়ে
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
তিমির হননের গান
কবি জীবনানন্দ দাশ (১৭.২.১৮৯৯ - ২২.১০.১৯৫৪)। আবৃত্তি - মনিরুজ্জামান প্রমউখ । ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত কবির
“সাতটি তারার তিমির” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। ভিডিওটি সৌজন্যে মনিরুজ্জামান প্রমউখ'- এর YouTube Channel.
মধ্যবিত্ত মানুষের বেদনার নিরাশার হিসেব ডিঙিয়ে
নর্দমার থেকে শূন্য ওভারব্রিজে উঠে
নর্দমায় নেমে---
ফুটপাত থেকে দূর নিরুত্তর ফুটপাতে গিয়ে
নক্ষত্রের জ্যোৎস্নায় ঘুমাতে বা ম'রে যেতে জানে।
একা সব এই পথে ;
ওরা সব ওই পথে--- তবু
মধাবিত্তমদির জগতে
আমরা বেদনাহীন--- অন্তহীন বেদনার পথে।
কিছু নেই--- তবু এই জের টেনে খেলি ;
সূর্যালোক প্রজ্ঞাময় মনে হ'লে হাসি ;
জীবিত বা মৃত রমণীর মতো ভেবে--- অন্ধকারে---
মহানগরীর মৃগনাভি ভালোবাসি।
তিমিরহননে তবু অগ্রসর হয়ে
আমরা কি তিমিরবিলাসী?
আমরা তো তিমিরবিনাশী
হ'তে চাই।
আমরা তো তিমিরবিনাশী।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
ভোর,
আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল :
চারিদিকের পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো
সবুজ।
একটি তারা এখনও আকাশে রয়েছে :
পাডাগাঁর বাসরঘরে সবচেয়ে গোধুলি-মদির মেয়েটির মতো ;
কিংবা মিশরের মানুষী তার বুকের থেকে যে-মুক্তা আমার
নীল মদের
গেলাসে রেখেছিলো
হাজার-হাজার বছর আগে এক রাতে--- তেম্নি---
তেম্নি একটি তারা আকাশে জ্বলছে এখনও।
হিমের রাতে শরীর ‘উম্’ রাখবার জন্য দেশোয়ালীরা
সারারাত মাঠে
আগুন জ্বেলেছে---
মোরগফুলের মতো লাল আগুন ;
শুকনো অশ্বত্থপাতা দুমড়ে এখনও আগুন জ্বলছে তাদের ;
সূর্যের আলোয় তার রং কুঙ্কুমের মতো নেই আর ;
হয়ে গেছে রোগা শালিকের হৃদয়ের বিবর্ণ ইচ্ছার মতো।
সকালের আলোয় টলমল শিশিরে চারিদিকের বন ও আকাশ
ময়ূরের
সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিল করছে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভোর ;
সারারাত চিতাবাঘিনীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে
নক্ষত্রহীন, মেহগনির মতো অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে
অর্জুনের বনে ঘুরে-ঘুরে
সুন্দর বাদামী হরিণ এই ভোরের জন্য অপেক্ষা করছিলো।
এসেছে সে ভোরের আলোয় নেমে,
কচি বাতাবী লেবুর মতো সবৃজ সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে-ছিঁড়ে
খাচ্ছে ;
নদীর তীক্ষ্ণ শীতল ঢেউয়ে সে নামলো---
ঘুমহীন ক্লান্ত বিহ্বল শরীরটাকে স্রোতের মতো
একটা আবেগ দেওয়ার জন্য ;
অন্ধকারের হিম কুঞ্চিত জরায়ু ছিঁড়ে ভোরের রৌদ্রের মতো
একটা বিস্তীর্ণ উল্লাস পাবার জন্য ;
এই নীল আকাশের নিচে সূর্যের সোনার বর্শার মতো জেগে
উঠে
সাহসে সাধে সৌন্দর্যে হরিণীর পর হরিণীকে চমক লাগিয়ে
দেখার জন্য।
একটা অদ্ভূত শব্দ ।
নদীর জল মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল।
আগুন জ্বললো আবার--- উষ্ণ লাল হরিণের মাংস তৈরি হ’
য়ে এলো।
নক্ষত্রের নিচে ঘাসের বিছানায় ব’সে অনেক পুরোনো
শিশিরভেজ গল্প ;
সিগারেটের ধোঁয়া ;
টেরিকাটা কয়েকটা মানুষের মাথা ;
এলোমেলো কয়েকটা বন্দুক--- হিম--- নিষ্পন্দ নিরপরাধ ঘুম।
মানুষের মৃত্যু হ'লে তবুও মানব
থেকে যায়, অতীতের থেকে উঠে আজকের মাফের কাছে
প্রথমত চেতণার পরিমাপ নিতে আসে।
আজকের আগে যেই জীবনের ভিড় জমেছিলো
তারা ম'রে গেছে ;
প্রতিটি মানুষ তার নিজের স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে
অন্ধকারে হারায়েছে ;
তবু তারা আজকের আলোর ভিতরে
সঞ্চারিত হ’য়ে উঠে আজকের মানুষের সুরে
যখন প্রেমের কথা বলে
অথবা জ্ঞানের কথা---
অনন্ত যাত্রার কথা মনে হয় সে-সময়
দীপংকর শ্রীজ্ঞানের ;
চলেছে--- চলেছে---
একদিন বুদ্ধকে সে চেয়েছিলো ব’লে ভেবেছিলো।
একদিন ধূসর পাতায় যেই জ্ঞান থাকে--- তাকে।
একদিন নগরীর ঘুরোনো সিঁড়ির পথ বেয়ে
বিজ্ঞানে প্রবীণ হ’য়ে--- তবু--- কেন অম্বাপালীকে
চেয়েছিলো প্রণয়ে নিবিড় হ’য়ে উঠে!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মানুষের মৃত্যু হলে
কবি জীবনানন্দ দাশ (১৭.২.১৮৯৯ - ২২.১০.১৯৫৪)। কবির মৃত্যুর পর ১৯৬১ সালে প্রকাশিত “বেলা অবেলা কালবেলা”
কাব্যগ্রন্থের কবিতা। কবিতার কথার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ উইকিসোর্স.অর্গ ওয়েবসাইটের কাছে। সেই ওয়েবসাইটে যেতে . . .।
চেয়েছিলো---
পেয়েছিলো শ্রীমতীকে কম্প্র প্রাসাদে :
সেই সিঁড়ি ঘুরে প্রায় নীলিমার গায়ে গিয়ে লাগে ;
সিঁড়ি উদ্ভাসিত ক’রে রোদ ;
সিঁড়ি ধ’রে ওপরে ওঠার পথে আরেক রকম
বাতাস ও আলোকের আসা-যাওয়া স্থির ক'রে কী অসাধারণ
প্রেমের প্রয়াণ? তবু--- এই শেষ অনিমেষ পথে
দেখেছে সে কোনো এক মহীয়সী আর তার শিশু ;
দু-জনেই মৃত।
অথবা কেউ কি নেই!
ওইখানে কেউ নেই।
মৃত্যু আজ নাবীনর্দামার কাথে,
অন্তহীন শিশুফুটপাতে ;
আর সেই শিশুদের জনিতার কিউক্লীবতায়।
সকল রৌদ্রের মতো ব্যাস্ত আশা যদি
গোলকধাঁধায় ঘুরে আবার প্রথম স্থানে ফিরে আসে
শ্রীজ্ঞান কী তবে চেয়েছিলো?
সুর্য যদি কেবলি দিনের জন্ম দিয়ে যায়,
রাত্রি যদি শুধু নক্ষাত্রের,
মানুষ কেবলি যদি সমাজের জন্ম দেয়,
সমাজ অস্পষ্ট বিপ্লবের,
বিপ্লব নির্মম আবেশের,
তাহ'লে শ্রীজ্ঞান কিছু চেয়েছিলো?
নগরীর সিঁড়ি প্রায় নীলিমার গায়ে লেগে আছে
অথচ নগরী মৃত।
সে-সিঁড়ির আশ্চর্য নির্জন
দিগন্তরে এক মহীয়সী,
আর তার শিশু,
তবু কেউ নেই।
ঢের ভারতীয় কাল--- পৃথিবীর আয়ু--- শেষ ক’রে
জীবনের বঙ্গাব্দ পর্বের প্রান্তে ঠেকে,
পুনরুদযাপনের মতন আরেকবার এই
তেরোশো পঞ্চাশ সাল থেকে শুরু ক'রে ঢের দিন
আমারো হৃদয় এই সব কথা ভেবে
সৃষ্টির উৎস আর উৎসারিত মানুষকে তবু
ধন্যবাদ দিয়ে যায়।
কেননা সৃষ্টির নিহিত ছলনা ছেলে-ভুলোবার মতো তবু নয় ;
মানুষও ঘুমের আগে কথা ভেবে সব সমাধান
ক'রে নিতে চায় ;
কথা ভেবে হৃদয় শুকায় জেনে কাজ করে।
সময় এখনো শাদা জলের বদলে বোনভায়ের
নিয়ত বিপন্ন রক্ত রোজ
মানুষকে দিয়ে যায় ;
ফসলের পরিবর্তে মানুষের শরীরে মানুষ
গোলাবাড়ি উঁচু ক'রে রেখে নিয়তির
অন্ধকারে অমানব ;
তবুও গ্লানির মতো মানষের মনের ভিতরে
এই সব জেগে থাকে ব'লে
শতকের আয়ু--- আধো আয়ু--- আজ ফুরিয়ে গেলেও এই
শতাব্দীকে তারা
কঠিন নিস্পৃহভাবে আলোচনা ক'রে
আশায় উজ্জ্বল রাখে ; না হ'লে এ ছাড়া
কোথাও অন্য কোনো প্রীতি নেই।
মানুষের মৃত্যু হ'লে তবুও মানব
থেকে যায় ; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে
আরো ভালো--- আরো স্থির দিকনির্ণয়ের মতো চেতনার
পরিমাপে নিয়ন্ত্রিত কাজ
কতদূর অগ্রসর হ'য়ে গেল জেনে নিতে আসে।
ওরে ও বাঙালী, ওরে ও কাঙালী ওরে ওরো ভিক্ষুক,
পরের দুয়ারে হস্ত পাতিয়া আজো কি রে পাস সুখ !
কেরানীর জাতি বলি মারে লাথি উপহাস করে সবে
মানুষের মত যোগ দিবি কবে জীবনের উত্সবে !
সত্যিকারের মানুষ হায়রে সত্যিই কি নাই দেশে
মনুষ্যত্ব বিকায়ে সবাই চাকরিই চায় শেষে!
. হায় রে কপাল হায়,
চাকরি না পেলে বাঙালী-জীবন শুকায়ে মরিয়া যায়!
উত্সাহ, মান, প্রেম, সম্মান, স্বাস্থ, বুদ্ধি বল,
বাঙালীর হায় সবার মূলেতে চাকরিই সম্বল!
কাউনসিলেতে, করপোরেশানে, রাজদরবারে হায়,
বাঙালীর ছলে দুহাত পাতিয়া চাকরি কেবল চায়।
প্রেমের তাগিদে রসেছিল মীরা, “চাকর রাখ গো মোরে”
পেটের তাগিদে বাঙালী-চাকর বেড়ায় চরণ ধরে!
. হায় রে কপাল হায়,
চাকরি না পেলে বাঙালী-জীবন শুকায়ে মরিয়া যায়!
চাকরি পাইবে বলিয়া তাহার পরীক্ষা পাশ করা,
ডিগ্রী জুড়িয়া নামের শেষেতে গর্বে তুলিয়া ধরা!
কিন্তু অধুনা ডিগ্রী হলেই চাকরি মেলে না, মিতা,
সুতরাং বুলি ধরেছে বাঙালী লোখাপড়া শেখা বৃথা!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ওরে ও বাঙালী কবি বনফুল, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (১৯.৭.১৮৯৯ - ৯.২.১৯৭৯)।
১৯৫৮ সালে প্রকাশিত, কবির “বনফুলের ব্যঙ্গকবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
লেখাপড়া শেখা বৃথা ওরে তোর, কেরানি না হলি যদি,
প্রবন্ধে লেখে বাঙালী-লেখনী এই কথা নিরবধি !
. হায় রে কপাল হায়,
চাকরি না পেলে বাঙালী-জীবন শুকায়ে মরিয়া যায়!
মাড়োয়ারী হল বড়লোক নাকি করিয়া দোকানদারি,
মাড়োয়ারী-মোহ বাঙালী-মনেতে প্রভাব করেছে জারি !
লেখাপড়া শিখে লাভ নেই কিছু, দোকান খুলিয়া বোস,
কিন্তু হায় রে ক্যাপিটাল কই এযে মহা আফসোস |
অগত্যা শেষে বাঙালী-বালক পিসা বা মেসোকে ধরে
চাকরি চেষ্টা করিয়া বেড়ায় প্রতি অফিসের দোরে !
. হায় রে কপাল হায়,
চাকরি না পেলে বাঙালী-জীবন শুকায়ে মরিয়া যায়!
মানুষ হওয়া যে আগে দরকার, বাঙালী ভুলেছে তা কি !
সত্যিকারের মানুষ হলেই কতটুকু থাকে বাকি |
মনুষত্ব বিকশিত হলে বোঝা যায় নিমেষেই
জীবন ধারণ করিবার তরে বেশী প্রয়োজন নেই |
অল্প যা কিছু আছে প্রয়োজন, মানুষ হলে তা মেলে
আপিসে দোকানে স্বদেশে বিদেশে ঘরেতে কিংবা জেলে,
. মানুষ হওয়া যে চাই,
মানুষ না হলে সহজ-সরল নাহি কোন পন্থাই।
মানুষ হবার সাধনা কোথায়? কই চরিত্রবল?
জীবন-পথের কোথা ওরে তোর সেই সেরা সম্বল?
নির্ভিক প্রাণ, শিক্ষিত মন --- কই সে কর্ম-বীর?
এ যে দেখি শুধু চাকরি-লোলুপ ভিখারীর যত ভীড়।
ভিখারী কখনও পায় কি শ্রদ্ধা? কে দেবে তাহারে মান,
যে জন নিজেরে জীবনে কখনও করিল না সম্মান।
. মানুষ হওয়া যে চাই,
মানুষ না হলে সহজ-সরল নাহি কোন পন্থাই।
নেপোলিয়নের কীর্তি পড় নি? বুকার ওয়াশিংটন
ফোর্ড, এডিসন, গান্ধি, প্রতাপ, যতীন্দ্র, নেলসন
আরো কত আছে --- ভেবে দেখ তোরা জীবনে ইহারা সবে
মানুষ হবার সাধনা করিয়া ধন্য হয়েছে তবে।
মানুষের কাছে বিঘ্ন ও বাধা কিছু দুস্তর নয়,
বীর্যবন্ত রামচন্দ্র কি করে নি সাগর জয় ?
. মানুষ হওয়া যে চাই,
মানুষ না হলে সহজ-সরল নাহি কোন পন্থাই।
চাকরির লোভ ছাড়রে বাঙালী, চাকরির মোহ ভোল,
কুসুমের মত জগতের মাঝে নিজেকে ফুটায়ে তোল।
ফুল তো কাহারো চাকরি করে না, পাখী তো কেরানি নয়,
অথচ তাহারা কোন্ সুধারসে চির আনন্দময়?
আকাশ হইতে আলোর বারতা মরমে তাদের পশে,
সার্থক তারা প্রকৃতির কোলে ধরণীর প্রাণরসে।
. মানুষ হওয়া যে চাই,
মানুষ না হলে সহজ-সরল নাহি কোন পন্থাই।
মুগ্ধ হইলাম,
কহিলাম,
"ধন্য কবিবর,
এতকাল অন্তর-বিবর
ছিল অন্ধকারে।
আলোকিত তুমি তারে
করেছ আজিকে
কবিতাটি লিখে।
কী করিতে পারি, বন্ধু, কহ প্রতিদানে?"
চাহি মোর পাণে
কহে কবি তুলি কণ্ঠ ক্ষীণ
. "স্যর, I mean,
সার্থক কবিতা মোর, চিত্ত তব করিয়াছে জয়,
কিন্তু স্যর পাইলে অভয়
মনের কথাটি মোর কহি অকপটে।
কবিতা লিখেছি বটে
কিন্তু অন্তরে
যে কথাটি গুমরিয়া মরে
নিত্য রহি রহি
অভয় দেন তো যদি কহি ;
. I mean,
চাকরি একটি দয়া করে জুটাইয়া দিন।"
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
“জানেন? আমরা সিংহ ছিলাম
. মধ্য এশিয়া দেশে,
যদিও এখন আঁদাড়ে বাঁদাড়ে
. ঘুরিতেছি এই বেশে
চক্ষে মোদের থাকিত আগুন,
. মাথায় কেশর তাজ,
নখরে জ্বলিত ছোরার দীপ্তি,
. কণ্ঠে বাজিত বাজ।
লম্ফে লম্ফে হতাম আমরা
. গিরি মরুভূমি পার,
থাবার আঘাতে মেরেছি কতই
. হাতি ঘোড়া গণ্ডার।
জানি না মোদের পূর্বপুরুষ
. কিসে যে ভুলিয়া গেলেন,
খাইবার পাস অতিক্রমিয়া
. এ দেশে চলিয়া এলেন।
বহু শতাব্দী এই পোড়া দেশে
. বাস করিবার পর
এই দশা হায় হয়েছে মোদের
. কণ্ঠে ফোটে না স্বর।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জানেন কবি বনফুল, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (১৯.৭.১৮৯৯ - ৯.২.১৯৭৯)
১৯৫৮ সালে প্রকাশিত, কবির “বনফুলের ব্যঙ্গকবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
ধোঁয়ার ভয়েতে পালাই এখন,
. পাখার বাতাসে ডরি,
আঁধারে আড়ালে লুকাইয়া থাকি
. শিশুর চাপড়ে মরি!
এই দুর্দশা হয়েছে জানেন
. জল-বাতাসের গুণে --- "
কর্ণকুহরে কহিল মশক
. অবাক হইনু শুনে।
ইমার্জেন্সির ফলে
জল এসেছে কলে
. পিওন দিচ্ছে চিঠি
ঠিক সময় বসছে অফিস
. নেই কো খিটিমিটি
বে-টিকিটের প্যাসেঞ্জার
হচ্ছে সব গেরেপ্তার
ট্রেন হয় না লেট
হুদো হুদো ধরা পড়ছে চোর
. খুলছে জেলের গেট।
এর সঙ্গে করতো যদি
. ট্যাক্সের রেট
এবং যদি ভরতো মোদের পেট
বলতাম ইন্দিরাজী --- সত্যি তুমি গ্রেট।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ইমার্জেন্সির ফলে কবি বনফুল, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (১৯.৭.১৮৯৯ -
৯.২.১৯৭৯)। চিরন্তন মপখোপাধ্যায় সম্পাদিত “বনফুলের ডায়েরি মর্জিমহল” নামে
প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে নেওয়া। ২রা আগস্ট ১৯৭৫ তারিখে কবির ডায়রিতে লেখা।
স্বর্ণ লঙ্কা বানিয়ে রাবণ চালিয়েছিল বেশ
যতদিন না হরণ করে ধরলো সীতার কেশ
“অতিদর্পে হত লঙ্কা” সাক্ষ্য রামায়ণ---
মহাভারত হাঁকছে “সামাল! দামাল দুঃশাদন!”
যাজ্ঞসেনী মুক্ত বেণী---কোথায় গো ভীমসেন?
শ্রীভগবান্ সারখি কই? “আসবো” বলেছেন।
জাগো দেশের জড় ভরত, ভোলো লজ্জা ভয়
“জাতিম্মর” না হয়ে, হও বিজাতীয় বিস্ময়
রাজ্য তরে খুনোখুনি এ নহে নূতন
কিন্তু এ যে মুষিক বৃত্তি---কামড়ে, পলায়ন!
তেজস্বী যে, ধর্ম্মান্ধ সে হোক্ না, নাহি ভয়
বীরের মত লড়াই করে করুক বিশ্বজয়!
কাঁদাও কেন মা বহিনকে, বাচ্ছা শিশুকেই ;
শান্তি প্রিয় নিরীহ যে---ধুঁকছে এমনিতেই?
সাজাও চমু, বাজাও ভেঁপু, নাচাও সৈন্যদল,
যুযুৎসু যে মিটাও তাহার বুকের দাবানল---
ক্ষান্ত দেহ শান্তি প্রিয়ে, নারী, শিশু, বুড়ায়,---
ল'ড়েই লহ ইন্দ্রপ্রস্থ, উজল রাখো চূড়ায়!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ল’ড়েই লহ ইন্দ্রপ্রস্থ
কবি ক্যাপ্টেন রামেন্দু দত্ত (১০.২.১৯০০ - ১৯৬২)। ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার শ্রাবণ ১৩৫৪ (অগাস্ট ১৯৪৭) সংখ্যা থেকে।
ক্রুর অত্যাচারে নিপীড়িতা মাতা
চক্ষে অশ্রুরাশি কণ্ঠে কাতরতা,
ডাকি কহিলেন “কেবা আছ কোথা,
আপনার প্রাণে ঘুচাইবে জননীর ব্যথা!”
যারা আগে ছিল পিছে যায় ত্রাসে,
সব ঠেলে এক যুবা আগে আসে,
বক্ষে হানি কর উচ্চে কহে বীর,
“মাতৃভূমি লাগি আমি দিব শির!”
শত্রুর চর ছিল আসে পাশে,
শুনি সে ঘোষণা আগাইয়া আসে ;
বিদ্রুপে কহে বাঁধিয়া যুবারে
মরিবারে চাহ মিলিবে অচিরে।
বিদেশী দস্যুরে কহিল তরুণ
তুলি উচ্চশির মৃত্যু ভয়হীন,
“আমারে দেখাও মরণের ভয়,
মরণের ভয়ে আমি ভীত নয়।”
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা মৃত্যুকে কিভাবে দেখেছেন?
কবি বিপ্লবী গণেশ ঘোষ (২২.৬.১৯০০ - ১৬.১০.১৯৯৪)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত, ভারতের ছাত্র ফেডারেশন (SFI), পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য
কমিটির সম্পাদক মণ্ডলী দ্বারা সম্পাদিত কাব্যসংকলন “প্রতিবাদী বাংলা কবিতার সংকলন” থেকে পাওয়া। সর্বোপরি এই পাতার
ব্যাকগ্রাউণ্ড চিত্রটিতে যে অলিন্দের ছবি দেখা যাচ্ছে, গণেশ ঘোষ, সেই অলিন্দ-সংলগ্ন কোনো কালকুঠরীতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়ে
এসেছিলেন, যাতে আমরা স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করতে পারি। তাই তাঁদের মতো মানুষের কলমের ছোঁয়া আমাদের কাছে কবিতাই!
পরদিন অস্পষ্ট নবীন প্রভাতে,
সূর্য তখনো আসেনি ধরাতে,
ঘাতক আসিয়া কয় করাঘাতে,
“যেতে হবে এবে, এস মোর সাথে।”
বন্দী গভীর সুপ্তি মগনে
স্বপন দেখিছে মধুর আননে
দেবী এক আসি
মৃদু মৃদু হাসি,
মুখ তুলি দেবী চাহে যুবা পানে।
বসিল দেবী শয্যার ধারে,
হাত বুলাইয়া দিল শিরোপরে,
মুছাইয়া মুখ আপনার করে,
ঢালি দিলা স্নেহ সীমাহীন ধারে।
অঞ্চলে দেবী মুছায় বদন,
চুম্বনে সুধা ঢালে অনুক্ষণ ;
আপন কণ্ঠের মালাখানি খুলি
বন্দীর গলে পরাইলা তুলি।
“কে গো, কে গো, দয়াময়ী
আসিলে হোথায় ?” বন্দী শুধায় ;
দেবী শুধু কয়, “আজি মধুপ্রাতে হয়েছে সময়
এসেছি মৃত্যু বরিতে তোমায়।”
শোনিত অর্ঘ্যে ভারতের মাটি করিয়া লাল।
মরণের পারে যাহারা গিয়াছে মা’র দুলাল॥
. তাঁহারা মোদের প্রণাম নাও,
. তাঁহারা মোদের আশিস দাও,
বক্ষে বক্ষে সাড়া দাও তুলে ‘জাগো হল সকাল’॥
বিদেশী শাসন, মোহ বন্ধন----হল শিথিল,
শুরু হইয়াছে পথে পথে হের ভুখা মিছিল।
. তোমরা দাঁড়াও সমুখে আসি’
. যুগান্তরের জড়তা নাশি
মানুষ করিয়া তোলো তাহাদের
. ভয়ে যারা হ’ল ভীরুর পাল।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শোনিত অর্ঘ্যে ভারতের মাটি করিয়া লাল
কবি সজনীকান্ত দাস (১৫.৮.১৯০০ - ১১.২.১৯৬২), সুর - সুকৃতি সেন,
শিল্পী - সুকৃতি সেন ও গৌরী সেন, ১৯৪৭। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত, স্বপন
সোম সংকলিত, “গানের ভিতর দিয়ে” ১ম খণ্ড থেকে নেওয়া।
মঠমন্দির মসজিদ চূড়া
. ঢেকেছে এ সারা ভারতটাই।
মানুষ, দেশের দুঃখী মানুষ
. বলত মোদের কোথায় ঠাঁই ?
আমাদের মাঝে রক্তের নদী বহে প্রখর
সাম্প্রদায়িক ধর্ম ভীষণ ভয়ঙ্কর
এপারে ওপারে করে আছে ভীড়
মানুষ কোথায় বাঁধে বল নীড়
উর্ধে শূন্যে মাটি আর জলে
. আশ্রয় তার কোথাও নাই।
মানুষ এখানে অশুচি হয়েছে
. পবিত্র হেথা মাটি পাথর
জন্মের গুণে কেউ উঁচু শির
. সেই দোষে কেউ ভয়কাতর
আচার ধর্ম রুদ্ধ করেছে চলার পথ
মানুষে মানুষে প্রেম ভালোবাসা
. তার চেয়ে বড় শাস্ত্রের ভাষা
অন্ধ গোঁড়ামি-মাহাত্ম্য, বুকে
. কঠিন আঘাত হানিছে তাই।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মঠমন্দির মসজিদ চূড়া ঢেকেছে এ সারা ভারতটাই
কবি সজনীকান্ত দাস (১৫.৮.১৯০০ - ১১.২.১৯৬২), সুর ও শিল্পী - সুকৃতি সেন, ১৯৪৯। ১৯৯৮
সালে প্রকাশিত, স্বপন সোম সংকলিত, “গানের ভিতর দিয়ে” ১ম খণ্ড থেকে নেওয়া।
শ্মশানে কি নূতন ক’রে লাগল সবুজ রঙ
সঞ্জীবনী মন্ত্র সে কি ‘বন্দেমাতরম্’॥
উড়েছিল খাক্ হয়ে যা, ফুলের শোভা ধরল কি তা,
মৃত্যুপুরে নতুন প্রাণের দেখছি নতুন রঙ॥
‘করব কিংবা মরব’ মন্ত্রে জাগল সারা দেশ,
মরা মায়ের সঙ্গে আজি মনোহরণ বেশ,
যারা অধীনতার ফাঁসে, রুধেছিল জীবন-শ্বাসে,
বিদায়-ঘন্টা ওই তাহাদের বাজল যে ঢং ঢং।
শ্মশানে আজ নতুন ক’রে লাগল সবুজ রঙ॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শ্মশানে কি নূতন ক’রে লাগল সবুজ রঙ
কবি সজনীকান্ত দাস (১৫.৮.১৯০০ - ১১.২.১৯৬২), সুর ও শিল্পী - সুকৃতি সেন, ১৯৪৭। ১৯৯৮
সালে প্রকাশিত, স্বপন সোম সংকলিত, “গানের ভিতর দিয়ে” ১ম খণ্ড থেকে নেওয়া।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র সে তুমি
. দুলাল বাংলা মার
তোমারি আঘাতে কারার দুয়ার
. টুটিল অকস্মাৎ
স্বাধীন ভারত বক্ষে তোমার
. নির্ভীক পদাঘাত
নিজেরে করিয়া অকাতরে দান
তুমি গেয়ে গেলে জয় হিন্দ্ গান
দিয়ে দিল্লীর পথ সন্ধান
. লাগালে চমত্কার
জয়তু নেতাজী সুভাষচন্দ্র
. দুলাল বাংলা মা’র॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
নেতাজী সুভাষচন্দ্র সে তুমি
কবি সজনীকান্ত দাস (১৫.৮.১৯০০ - ১১.২.১৯৬২), সুর ও শিল্পী - সুকৃতি সেন, ১৯৪৮। ১৯৯৮
সালে প্রকাশিত, স্বপন সোম সংকলিত, “গানের ভিতর দিয়ে” ১ম খণ্ড থেকে নেওয়া।
বিভেদ রক্ত-সায়র মাঝারে
. মিলনের শ্বেত এ শতদল
ফুটিয়া উঠল পুণ্যে যাঁহার
. তাঁর নাম কভু নয় বিফল।
মহাত্মাজীকে করি প্রণাম
মুখে মুখে লই গান্ধীনাম
ভারতমাতার সন্তান মোরা এক আজ
. নাই দুইটি দল॥
হানাহানি ভুলে কোলাকুলি করি
. মনে মনে ভাবি চমত্কার
তাঁহারে স্বতই নতি করে মন
. অহিংসা প্রেম মন্ত্র যাঁর ;
. জয় জয় জয় গান্ধিনাম
. মহাত্মাজীরে করি প্রণাম
পথে পথে তাঁর শোনো জয়গান
. বিদীর্ণ করে গগনতল॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বিভেদ রক্ত-সায়র মাঝারে
কবি সজনীকান্ত দাস (১৫.৮.১৯০০ - ১১.২.১৯৬২), সুর - সুকৃতি সেন, শিল্পী - জগন্ময় মিত্র,
১৯৪৭। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত, স্বপন সোম সংকলিত, “গানের ভিতর দিয়ে” ১ম খণ্ড থেকে
নেওয়া।
‘মন্দিরেরি বন্দী তুমি
. তোমায় আমার নেই প্রয়োজন,’
তোমার ঘরে মিটবে না তো
. আমার প্রাণের সব আয়োজন।
জীবন নদী বিরাটকে তার
. ধরতে যে চায় আলিঙ্গনে
প্রাণের মাঝে, বুকের মাঝে
. প্রেমকে রাখি’ সঙ্গোপনে!
ক্ষুদ্র সে যে বৃহৎ হ’য়ে
. প্রাণ সাগরের অপর পারে
মহান্ হ’য়ে, মধুর হ’য়ে
. ছ’ড়িয়ে আছে বিশ্বদ্বারে!
ইঙ্গিতে সে ডাক দিয়ে যায়
. শক্তি যোগায় ক্লিষ্ট প্রাণে
বাধার বাঁধন কাটিয়ে দিয়ে
. পূর্ণ করে নবীন দানে!
মন্দিরেরি বন্দী পায়ে
. ঝরবে না ফুল বক্ষ-ঝরা
ছড়িয়ে গেছে পাঁপড়ি কোথায়
. কোন্ খানে সে দেয় গো ধরা!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্
তরলিকা দেবী (স্বদেশীদের আশ্রয়দাত্রী। ১৯০০ - ১২.১৯৮৩)
রায় জলধর সেন সম্পাদিত “ভারতবর্ষ” পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৫ (মে ১৯৩৮) সংখ্যা থেকে।
সত্য যে তা’ বাস্তবে এই
. কল্পনাতে যায় না পাওয়া,
রঙীন জালের সূতো দিয়ে,
. বহায় না সে মধুর হাওয়া।
গণ্ডী-বাঁধা আবেষ্টনের
. মধ্যে কোথাও দেব্ তা নেই,
সত্যরূপী চেতন জ্ঞানী
. সহজ, সরল, নির্ভীকেই
মাড়িয়ে চলে মিথ্যা গ্লানি
. পঙ্কিলতা, সুদুর্দ্দিনে,
আনন্দেরি বন্যা দিয়ে
. সব বাধাকে লয় সে জিনে।
নিষেধ বিধির পর্দ্দা ছিঁড়ে
. সত্য শিবম্ সুন্দরে
মন্দিরেরে ধ্বংস করি
. বসাই বুকের অন্দরে!
বোশেখ মাসে সূর্য্য যখন ধরার বুকে আগুন ঢালে,
আষাঢ়েতে আকাশ যখন আঁধার করে মেঘের জালে,
ভয় করিনে সেই দিনেও রৌদ্র-বৃষ্টি মাথায় ক’রে
ঘুরে বেড়াই মাঠের মাঝে তোমার ওগো তোমার তরে।
তবু আমার নামটি নাহি---তবু আমি মূর্খ চাষা
“স’রে দাঁড়া ছুঁসনে” ছাড়া আমার তরে নাইকো ভাষা!
তোমার যখন ঘুম ভাঙে না শুয়ে থাক শয্যামাঝে,
আমি তখন জেগে উ’ঠে ছু’ঠে চলি মাঠের কাজে।
অনাহারে অর্দ্ধাহারে মোটা সূতার গামছা প’রে।
ক্ষুধার অন্ন তৃষার বারি জোগার করি তোমার তরে।
তবু আমার নামটি নাহি তবু আমি মূর্খ চাষা!
“স’রে দাঁড়া ছুঁসনে” ছাড়া আমার তরে নাইকো ভাষা!
তোমার গায়ে রেশমী জামা শান্তিপুরের ধোয়া ধুতি
তোমার পায়ে জরির জুতো নয়শো যুগের পুরাণপুঁথি
মিশ্রিমাখা দুধের বাটী পাঁচ বেনুনের অন্নথালা
জান তো সে আমারি যে নগ্ন দেহের শোণিত ঢালা?
তবু আমার নাম করো না তবু আমি মূর্খ চাষা
“স’রে দাঁড়া ছুঁসনে” ছাড়া আমার তরে নাই কি ভাষা?
আমার গাছের ফলের ঝুড়ি গন্ধে ভরা পুষ্প সাজি,
আমার ক্ষেতের সবুজ ফসল ধান্য দূর্ব্বা শম্পরাজি,
এক কথাতে এই জগতে আমার বলতে যাহা আছে
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
চাষার দাবী কবি অক্রুরচন্দ্র ধর (জন্ম-মৃত্যু অজ্ঞাত, রচনাকাল ২০শতকের ২০এর দশক)
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৭ (জুলাই ১৯২০) সংখ্যায় প্রকাশিত।
সকলিতো দান করেছি অকাতরে তোমার কাছে।
তবু আমার নাম হ’লো না তবু আমি মূর্থ চাষা
“স’রে দাঁড়া ছুঁসনে” ছাড়া তোমার মুখে নাইকো ভাষা।
এত সাধের বুধী গাইয়ের মিষ্টিমধুর দুধের হাড়ি
চাট্টি পয়সার বিনিময়ে দিয়ে এসে তোমার বাড়ী,
বেগুণ পোড়া আলুভাতে পেয়েই আমি তুষ্ট থাকি,
তবু তুমি কথায় কথায় আমার প্রতি রুষ্টআঁখি?
আমার কষ্ট-উপার্জ্জিত টাকার থলি বাক্সে আমি’
সুদের সুদে তস্য সুদে আমারি খাও হাড় ক’খানি।
তবু তুমি জ্ঞানবন্ত, আমি একটা মূর্খ চাষা
“স’রে দাঁড়া ছুঁসনে” ছাড়া করতে নারি কোনই আশা!
তোমরা যেগো ইমান ছাড় শিখ্ লে দুটি ম্লেচ্ছ বুলি
আমরা শত বিপদেও বিশ্বেশ্বরে যাইনা ভুলি’।
লক্ষপতি হলেও তোমার “দেহি দেহি” সাধ না মিটে,
রাজার রাজ্য এই আমার দাদার কেলে পুরাণ ভিটে।
ভেবে দেখ এই ভাবেতে অত্যাচারে অবিচারে---
হিংসা দ্বেষ ঘেন্না আদি কঠিন পাপের গুরু ভারে,
মনুষ্যত্বের সোপান থেকে ক্রমেই তুমি যাচ্ছ নামি’,
ধীরে ধীরে সে পথ ধরে রোজকে রোজই উঠ্ ছি আমি।
যায় না তবু জ্ঞানের বড়াই কওনা দুটো মিষ্টিভাষা---
তোমার মত মানুষ হ’তে চাই না আমি---অজ্ঞ চাষা।
. অসমীয়া ভাষাভাষী,
কুসংস্কারের ভাষা-মরীচিকা ফেলেছে তোমারে গ্রাসি।
* * * * * * *
ডান্ডা চালায়ে গুন্ডা লেলায়ে প্রেত তান্ডবে দলি,
কাহার নিধন পর্বে মেতেছ শ্মশানের চিতা জ্বলি?
ব্রহ্মপুত্রের তীরে তীরে ধার সেই লেলিহান শিখা,
তোমার ললাট পোড়ায়ে আঁকিছে চিল কলঙ্ক লিখা।
* * * * * * *
. দেখিতে পাওনা তুমি---
তোমার পাপেতে ঘন ঘন কাঁপে মহা কামরূপ ভূমি
লাঞ্ছিতা সতী দক্ষ যজ্ঞে মৃত্যু বরণ করে,
আশিব আহবে রুদ্রের রোষ সংহার পুরে পুরে।
সতীর দেহের সাক্ষী আজিও পূতঃ কামাখ্যা স্থান
সহিবে কেমনে পাদ পীঠ তলে সতী নারী অপমান?
যত বড় হও অসুর প্রধান, দক্ষ অশিব যজ্ঞে
বিধির বিধান ছাগ মুন্ডের ঘটিবে তোমার ভাগ্যে।
* * * * * * *
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বলিদান কবি অতীন্দ্রলাল দাশ (২৫.৩.১৯০১ - ২৯.৩.১৯৭১)। রচনা ২.৮.১৯৬০। কবিপত্নী শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ দ্বারা ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত
“পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া। আসামে বাংলা ভাষা-ভাষীদের বিরুদ্ধে চলা অত্যাচারের বিরুদ্ধে লেখা কবিতা। বর্তমানে উচ্চতম আদালতের
ছত্রছায়ায় আসামে, CAA-NPR-NRC-র এর আঢ়ালে পুনর্বার "বঙ্গাল খেদা" আন্দোলনে, এই কবিতার চূড়ান্ত প্রাসঙ্গিকতা।
অসমীয়া ভাষা কুঞ্জ কাননে বানী পীঠ রচিবারে
শ্বেত শতদল লাল কবি দিলে মানব শোনিত ধারে।
. শোন নর শয়তান ---
বঙ্গবানীরে বলি দিয়া গাহ অহোম বাণীর গান ?
সে গান তোমারে বিদ্রূপ করে তোমারে ফেলিছে টানি,
নর-পিশাচের ধ্বনি উল্লাসে আসে কলঙ্ক গ্লানি।
মননে মননে ভাব বন্ধনে প্রেম প্রীতি পরিচয়
মানুষে মানুষে সঙ্গ সহিতে চির সাহিত্য হয়।
বিশ্ব বাণীর বীণায় রে বাজে বিশ্ব মনের সুর,
দেশে দেশে তাহা ভাষায় ভাষায় বহি চলে সুমধুর।
বঙ্গ বাণীর বলি চাহে নাত অহোম সরস্বতী,
দুষ্টা সরস্বতী মোহেতে মাতিয়াছ দুর্ম্মতি।
সরস্বতীর পূজায় লাগে না নরনারী বলিদান ;
জ্ঞানের খড়গে তব পশুত্বে কর আগে অবসান।
মহাভারতের পূরব প্রপান্তে নেফার অরূণাচল
লোহিতের বুকে রক্তের তৃষা জেগে উঠে চঞ্চল।
বন্ধুর পথ দুর্গম করি থরে থরে গিরি রাজি
পীত দানবের হুঙ্কার ধ্বনি সহসা উঠিল বাজি।
ভগবদ্ দ্বেষী মানবতা বৈরী ছলে বলে কৌশলে,
ভারত ভূমিরে গ্রাসিবারে চায় ন্যায় নীতি পায়ে দলে।
* * * * * *
মাতৃভূমি দীক্ষিত যত মায়ের সু-সন্তান
স্তব্দ করিতে অসুরের দলে হয়ে যায় আগুয়ান।
অস্ত্রে অস্ত্রে ভীম-পরিচয় ছুটিল প্রভঞ্জন
হাজারে হাজারে শত্রু মরিল ভারতের দুষমন।
শত শহীদের লহু ঝড়ে ঝড়ে তিতিল ধরণীতল
রক্তে তাদের লাল হয়ে গেল লোহিত নদীর জল।
* * * * * *
ওয়ালংয়ে আর লোহিতের বুকে সমর নহেত শেষ,
অসুর নিধন তান্ডব নাচে শংকর ব্যোমকেশ।
ত্রিনয়নে জ্বলে ধ্বক্ ধ্বক্ জ্বালা বম্ বম্ গাল বাজে
নব ভার্গব কঠোর কুঠারে উদ্যত রণ সাজে।
পরশুরামের কুন্ডের তীরে বীর্য বহ্নি জ্বলে,
রুদ্র ঈশান বাজায় বিষাণ ফুঁসিছে নাগিনী দলে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
লোহিত
কবি অতীন্দ্রলাল দাশ (২৫.৩.১৯০১ - ২৯.৩.১৯৭১)
রচনা ১২.১২.১৯৬২। কবিপত্নী শ্রীমতী মাধুরীকণা দাশ দ্বারা ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত “পঙ্কজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
* * * * * *
আকাশে বাতাসে ধনিয়া উঠিল অগ্নি দীপক তান,
দৃপ্ত চমকি জাগিয়া উঠেছে ভারতের সন্তান।
অমৃত মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছে ভারত সে অক্ষয়
রণ দুর্যোগে তূর্য্য ফুকারে জয় ভারতের জয়।
এ নহে কাহিনী এ নহে স্বপন জেনেছি সুনিশ্চয়
মানবের জয় দানবের ক্ষয় জয় ভারতের জয়।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
পাথরে মোড়ানো হৃদয় নগর
জন্মে না কিছু অন্ন—
এখানে তোমরা আসবে কিসের জন্য ?
বেচাকেনা আর লাভের খাতায়
এখানে জমানো রক্তপণ্য—
যারা দান দেয় তারা মুনাফায়
সাধুতার সুদ কষে তবে হয় দাতা,
নয়তো তারাও রাষ্ট্রচাকায় পিষ্ট, দরদী নাগর :
তাদের দেওয়ার ফলাবে না ধান শান-বাঁধা কলকাতা।
আসো যদি তবে শাবল হাতুড়ি
আনো ভাঙ্ বার যন্ত্র,
নতুন চাষের মন্ত্র।
গ্রামে যাও, গ্রামে যাও,
এক লাখ হয়ে মাঠে নদী ধারে
অন্ন বাঁচাও, পরে সারে সারে
চাবে না অন্ন, আনবে অন্ন ভেঙে এ-দৈত্যপুরী,
তোমরা অন্নদাতা।
জয় করো এই শান-বাঁধা কলকাতা॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অন্নদাতা
কবি অমিয় চক্রবর্তী (১০.৪.১৯০১ - ১২.৬.১৯৮৬)
বঙ্কিমচন্দ্র সেন সম্পাদিত “দেশ” পত্রিকার ১লা আশ্বিন ১৩৫০ (১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩) সংখ্যা
থেকে নেওয়া।
আমার কথা কি শুনতে পাও না তুমি?
কেন মুখ গুঁজে আছো তবে মিছে ছলে ?
কোথায় লুকোবে? ধু-ধু করে মরুভূমি ;
ক্ষ'য়ে-ক্ষ'য়ে ছায়া ম'রে গেছে পদতলে।
আজ দিগন্তে মরীচিকাও যে নেই ;
নির্বাক, নীল, নির্মম মহাকাশ।
নিষাদের মন মায়ামৃগে ম'জে নেই ;
তুমি বিনা তার সমুহ সর্বনাশ।
কোথায় পালাবে ? ছুটবে বা আর কত ?
উদাসীন বালি ঢাকবে না পদরেখা।
প্রাকপুরাণিক বাল্যবন্ধু যত
বিগত সবাই, তুমি অসহায় একা॥
ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে?
মনস্তাপেও লাগবে না ওতে জোড়া।
অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে?
কেবল শূণ্যে চলবে না আগাগোড়া।
তার চেয়ে আজ আমার যুক্তি মানো,
সিকতাসাগরে সাধের তরণী হও ;
মরুদ্বীপের খবর তুমিই জানো,
তুমি তো কখনো বিপদপ্রাজ্ঞ নও।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
উটপাখি
কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (৩০.১১.১৯০১ - ২৫.৬.২৯৬০)
১৯৫৪ সালে প্রকাশিত, বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “আধুনিক বাংলা কবিতা” কাব্য-সংকলের
কবিতা। সমাজের স্থিতাবস্থা-বিলাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
নব সংসার পাতি গে আবার, চলো
যে-কোনো নিভৃত কণ্টকাবৃত বনে।
মিলবে সেখানে অনন্ত নোনা জলও,
খসবে খেজুর মাটির আকর্শনে॥
ল্পলতার বেড়ার আড়ালে সেথা
গ'ড়ে তুলবো না লোহার চিড়িয়াখানা ;
ডেকে আনবো না হাজার হাজার ক্রেতা
ছাঁটতে তোমার অনাবশ্যক ডানা।
ভূমিতে ছড়ালে অকারি পালকগুলি
শ্রমণশোভন বীজন বানাবো তাতে ;
উধাও তাহার উড্ডীন পদধূলি
পুঙ্খে পুঙ্খে খুঁজবো না অমারাতে।
তোমার নিবিদে বাজাবো না ঝুমঝুমি,
নির্বোধ লোভে যাবে না ভাবনা মিশে ;
সে-পাড়াজুড়ানো বুলবুলি নও তুমি
বর্গীর ধান খায় সে উনতিরিশে॥
আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে
আমরা দুজনে সমান অংশিদার
অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে,
আমাদের 'পরে দেনা শোধবার ভার।
তাই অসহ্য লাগে ও-আত্মরতি।
অন্ধ হ'লে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?
আমাকে এড়িয়ে বাড়াও নিজেরই ক্ষতি।
ভ্রান্তিবিলাস সাজেনা দুর্বিপাকে।
অতএব এসো আমরা সন্ধি ক'রে
প্রত্যুপকারে বিরোধী স্বার্থ সাধি :
তুমি নিয়ে চল আমাকে লোকোত্তরে,
তোমাকে বন্ধু আমি লোকায়তে বাঁধি॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
হে বিধাতা,
অতিক্রান্ত শতাব্দীর পৈতৃক বিধাতা,
দাও মোরে ফিরে দাও অগ্রজের অটল বিশ্বাস।
যেন পূর্বপুরুষের মতো
আমিও নিশ্চিন্তে ভাবি ক্রীত, পদানত,
তুমি মোর আজ্ঞাবাহী দাস।
তাদের সমান
মণ্ডুকের কূপে মোরে চিরতরে রাখো, ভগবান।
কমঠবৃত্তির অহংকারে
ঢাকো ক্ষণভঙ্গুরতা। তাদের দৃষ্টান্ত-অনুসারে
আমিও ধরাকে যেন সরা জ্ঞান করি।
মর্যাদার ছিদ্রিত গাগরি
জোড়ে যেন বারংবার ডুবে আত্মপ্রসাদের স্রোতে।
রৌদ্র-জ্যোতি হ’তে
আবার ফিরাও মোরে তমসার প্রত্ন দায়ভাগে।
ঘুণধরা হাড়ে যেন লাগে
উঞ্ছপুষ্ট জ্যেষ্ঠদের তৈলসিক্ত মেদ ;
মরে যেন উদ্বন্ধনে অপজাত হৃদয়ের খেদ॥
পিতৃপিতামহদের প্রায়
তোমার নামের গুণে তীর্ণ হ’য়ে দশম দশায়
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
প্রার্থনা
কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (৩০.১১.১৯০১ - ২৫.৬.২৯৬০)
১৯৫৪ সালে প্রকাশিত, বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “আধুনিক বাংলা কবিতা” কাব্য-সংকলের কবিতা। ধর্মের বিশ্বাস ও শাসনের বিরুদ্ধে যুক্তির প্রতিবাদ।
মূঢ়, মূক গড্ডলেরে দিই যেন বলি
রক্তপিপাসিত যূপে।
বাচাল বিদ্রূপে
হুংকারিলে দুর্বৃত্তের উদ্ধত দম্ভোলি,
গুরুজনদের মতো করি যেন সাষ্টাঙ্গ প্রণাম
শক্তির উচ্চল পায়ে ; আর্তির সংক্রাম
কেটে গেলে কালক্রমে জনাকীর্ণ রাজপথ থেকে,
স্ফীত বুকে অপ্রতিষ্ঠ পৌরুষের ঝেড়ে
হাসিমুখে হাত নেড়ে
পলাতক সধর্মীরে ডেকে,
প্রমাণিতে পারি যেন সবই তব ইচ্ছা, ইচ্ছাময়॥
এলে পরে লাভের সময়,
সদসৎনির্বিচারে, সকলই তোমার দান ব’লে,
নিঃস্বের স্বেদাক্ত কড়ি হাতায়ে কৌশলে
আমিও জমাই যেন যক্ষসংরক্ষিত কোষাগারে।
শ্রুতিধর মান্ধাতার উক্তির উদ্ধারে
লুকায়ে ইন্দ্রিয়াসক্তি ; অবিমৃশ্য জন্মের জঞ্জলে
বিষায়ে সংকীর্ণ সৌধ ; জলে, স্থলে, নভে
বিরোধের বীজ বুনে ; নিরন্তর নিষ্কাম প্রসবে
ভগ্নস্বাস্থ্য গর্ভিণীর ক্লিন্ন অন্তকালে,
তোমার প্রতিভূ সেজে, উন্নরক স্বর্গের আশ্বাসে
সাধ্বীর সদ্ গতি যেন করি।
ঊর্ধ্বশ্বাস উত্সবের উদ্বায়ী উচ্ছ্বাসে
তোমারে পাসরি,
দারুণ দুর্দিনে যেন পূজা মেনে বিস্ময়ে শুধাই,
“স্মরণে কি নাই,
দয়াময়, আশ্রিতেরে স্মরণে কি নাই?”
ভগবান, ভগবান
অতীতের অলীক, আত্মীয় ভগবান,
অভিব্যাপ্ত আবির্ভাবে আজ
আমার স্বতন্ত্র শূন্যে করো তুমি আবার বিরাজ।
শকুনির ক্ষুধানিবারণে
শস্যশ্যাম কুরুক্ষেত্রে মায়াবাদ ভ’নে,
সূচ্যগ্রমেদিনীলোভী যুযুত্সুরে ক্ষমিতে শেখাও
অপরের অপঘাত। তুলে নাও,
আমার রথাশ্বরজ্জু, হে সারথি, তুলে নাও হাতে।
স্বার্থের সংঘাতে
বিতর্ক, বিচার হানো। মর্মে-মর্মে, মজ্জায়-মজ্জায়
জাগাও অন্যায়, শাঠ্য। হিংস্র অলজ্জায়
পুণ্যশ্লোক সগোত্রের তুল্য মূল্য দাও, দাও মোরে।
অপ্রকট সততার জোরে
আমার অন্তিম যাত্রা, অতিক্রমি’ সুমেরুর বাধা,
হয় যেন নন্দনে সমাধা,
যেখানে প্রতীক্ষারত সুরসুন্দরীরা
সুকৃতির পুরস্কারে পাত্রে ঢেলে অমৃতমদিরা,
নীবিবন্ধ খুলে,
শুয়ে আছে স্বপ্নাবিষ্ট কল্পতরুমূলে॥
কিন্তু যেথা সর্পিল নিষেধ
স্বপুচ্ছের উপজীব্যে সাধে আত্মবেদ
প্রমিতির বিষবৃক্ষে, অমিতির অচিন্ত্য অভাবে ;
অন্তরঙ্গ জনতার নিবিড় সদ্ভাবে
হয়নি বাসোপযোগী অদ্যাবধি যে-নিস্তাপ মরু ;
পশুপতি বাজারে ডমরু
মোর গোষ্ঠিপতিদের নাচায়নি যার ত্রিসীমায় ;
নিরালম্ব নিরালোকে যেথা
দেব-দ্বিজ-প্রবঞ্চিত ত্রিশঙ্কু ঝিমায়,
মৌনের মন্ত্রণা শোনে মৃত্যুবিপ্রলব্ধ নচিকেতা ;
সেখানে আমার তরে বিছায়ো না অনন্ত শয়ান,
হে ঈশান,
লুপ্তবংশ কুলীনের কল্পিত ঈশান॥
ঘন-তমসায় অঘোরে ঘুমায় তামসিক জনগণ,
অসুর-শাসনে পশুর মতন অজ্ঞান অচেতন।
. এমন সময় ঘুম ভাঙা ডাক---
. শোনা গেল দূরে ; সবে হতবাক,
বাতাসে ও ধ্বনি ওঠে রণি' রণি’ ---মন্ত্র সে মনোরম,
আধো-ঘুমে আধো-জাগরণে শোনে, “বন্দে মা-ত-রম্ !”
আলসে, বিলাসে, আরামে-বিরামে কেটে যায় দিনরাত,
এখনো নয়নে বিজড়িত ঘুম---ডাকিল কে দৈবাৎ?
. ওগো জাগো জাগো, যে আছ মানুষ,
. সুখ-শয্যায় রয়েছ বেহুঁস,---
নিজ দেশে মিছে পরবাসী হ'য়ে হারায়ো না সম্ভ্রম ;---
বন্দিনী মায়ে বন্দনা করো, “বন্দে মা-ত-রম্ !”
মায়ের মুক্তি-মন্ত্রে দীক্ষা নিল সম্তানদল,
নব-গঙ্গার জোয়ার ছুটিল এলো বন্যার জল।
. সেই বন্যায় ভেসে চলে সব,
. এলো জাগরণ, এলো বিপ্লব,
শাসনের নামে শোষণে লুটিছে পরদেশী হরদম,
সহিব না আর, বল বারবার, “বন্দে মা-ত-রম্ !”
শিশু বা কিশোর না করিল আর রক্ত আঁখির ভয়,
কত নর-নারী এলো ঘর ছাড়ি' গাহি’ জননীর জয়।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বন্দে মাতরম
কবি সুনির্মল বসু (২০.৭.১৯০২ - ২৫.২.১৯৫৭)
১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য দ্বারা সঙ্কলিত ও সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার
সঙ্কলন ১৭৪১ - ১৯৪৭” থেকে নেওয়া।
. আমাদের দেশ মোরা ফিরে চাই ;
. শুনিব না আর কোনো ছলনাই,
ছদ্মবেশী ও অভিভাবকের নাহি মানি বিক্রম,
তাড়াব তাদের সাগরের পারে,---“বন্দে মা-ত-রম্ !”
টনক নড়িল বিদেশী প্রভুর হেরিল সর্ব্বনাশ,
পীড়নে পীড়নে তাই ক্ষণে ক্ষণে ভারতে জাগালো ত্রাস।
. পূর্ণ হইল কত কারাগার,
. দ্বীপান্তরের ভরিল আগার,
হাসি’ দিল প্রাণ ফাঁসির মঞ্চে কত পুরুষোত্তম ;
আকাশে-বাতাসে ধ্বনিয়া উঠিল,---“বন্দে মা-ত-রম্ !”
আজি এ ভারত করিতে স্বাধীন সেই সে মন্ত্র-বল,
সেই মহানাদ, সে মহামন্ত্র কে করিবে নিষ্ফল?
. ঝষির ধ্যানের মূর্ত্ত প্রকাশ---
. সে মন্ত্র আজ কে ভুলিতে চাস্?
শাশ্বত হয়ে রহে যুগে যুগে যাহা “শিব-সত্যম্” ;
এসো এক সাথে মিলাই কণ্ঠ---“বন্দে মা-ত-রম্ !”
ঘরছাড়া সব বাঙাল
ভাতকাপড়ের কাঙাল
জুটলো এসে বঙ্গদেশে দণ্ডকবন ছেড়ে।
খবর শুনে টেকো মাথার গান্ধীটুপি নেড়ে
মহামাতা বচন দিলেন, “মোদ্দা কথা এই---
পিপীলিকার পাখনা ওঠে মরবার জন্যেই।
পাথর ভরা ভুঁই দিয়েছি চষতে---
টিন দিয়েছি ছাপড়া বেঁধে বসতে,
হাল কিনতে তঙ্কা দিলাম, আরও দিলাম মোষ---
হাভাতে সব বাঙালগুলো তাও মানে না পোষ!
সাফ কথাটাই বলছি তবে,
জলদি ফিরে আসতে হবে ;
দান খয়রাত দু’চার ফোঁটা না হয় দেবো আরও।
নইলে কানে দিলাম তুলো --- ফোঁপাও যত পারো।”
“ঠাঁই হবে না, ঠাঁই হবে না, যেতেই হবে ফিরে” ---
ছুটলো হুকুম গঙ্গা-অজয়-ইছামতীর তীরে।
কু লিসপাণি পুলিস এলো---এলো মোটর ট্রাক্
গুরুম গুরুম শব্দে হঠাৎ কানের পাটা ফাঁক।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কাশীপুরের বাসীকথা
কবি তারাপদ লাহিড়ী (১৯০২ - ১৯৮৬)
১৯৮০ সালে প্রকাশিত, কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দ্বারা সম্পাদিত কাব্যসংকলন
“ব্রাত্য পদাবলী” থেকে।
“কি হয়েছে?--- কিছু না তো---
ন্যাংটো মানুষ গোটাকতো
অকাল মরণ প্রাপ্ত হলো---এমনি তরো রোজ
মরছে কতো পোকামাকড় কে রাখে তার খোঁজ?
স্বাধীনতার পূণ্যাহ যে---শুনছো না তার বাদ্য?
নরমুণ্ড দু’চার গোটা বার্ষিকী বরাদ্দ।”
গলির মোড়ে একটা গাছ দাঁড়িয়ে
গাছ না গাছের প্রেতচ্ছায়া --
আঁকাবাঁকা শুকনো কতকগুলি কাঠির কঙ্কাল
শূন্যের দিকে এলোমেলো তুলে দেওয়া,
রুক্ষ রুষ্ট রিক্ত জীর্ণ
লতা নেই পাতা নেই ছায়া নেই ছাল-বাকল নেই
নেই কোথাও এক আঁচড় সবুজের প্রতিশ্রুতি
এক বিন্দু সরসের সম্ভাবনা।
ওই পথ দিয়ে
জরুরি দরকারে যাচ্ছিলাম ট্যাক্সি ক’রে।
ড্রাইভার বললে, ওদিকে যাব না।
দেখছেন না ছন্নছাড়া ক’টা বেকার ছোকরা
রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে--
চোঙা প্যান্ট, চোখা জুতো, রোখা মেজাজ, ঠোকা
কপাল--
ওখান দিয়ে গেলেই গাড়ি থামিয়ে লিফট চাইবে,
বলবে, হাওয়া খাওয়ান।
ওরা কারা?
চেনেন না ওদের?
ওরা বিরাট এক নৈরাজ্যের --এক নেই রাজ্যের
বাসিন্দে।
ওদের কিছু নেই
ভিটে নেই ভিত নেই রীতি নেই নীতি নেই
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ছন্নছাড়া অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯.৯.১৯০৩ - ২৯.১.১৯৭৬)। ২০০৯ সালে প্রকাশিত মেঘ বসু সম্পাদিত আবৃত্তির কবিতা কবিতার
আবৃত্তি কাব্য সংকলন থেকে নেওয়া।
আইন নেই কানুন নেই বিনয় নেই ভদ্রতা নেই
শ্লীলতা-শালীনতা নেই।
ঘেঁষবেন না ওদের কাছে।
কেন নেই?
ওরা যে নেই রাজ্যের বাসিন্দে--
ওদের জন্যে কলেজে সিট নেই
অফিসে চাকরি নেই
কারখানায় কাজ নেই
ট্রামে-বাসে জায়গা নেই
মেলায়-খেলায় টিকিট নেই
হাসপাতালে বেড নেই
বাড়িতে ঘর নেই
খেলবার মাঠ নেই
অনুসরণ করবার নেতা নেই
প্রেরণা-জাগানো প্রেম নেই
ওদের প্রতি সম্ভাষণে কারু দরদ নেই--
ঘরে-বাইরে উদাহরণ যা আছে
তা ক্ষুধাহরণের সুধাক্ষরণের উদাহরণ নয়,
তা সুধাহরণের ক্ষুধাভরণের উদাহরণ--
শুধু নিজের দিকে ঝোল- টানা।
এক ছিল মধ্যবিত্ত বাড়ির এক চিলতে ফালতু এক রক
তাও দিয়েছে লোপট ক’রে।
তাই এখন পথে এসে দাঁড়িয়েছে সড়কের মাঝখানে।
কোথ্বকে আসছে সেই অতীতের স্মৃতি নেই।
কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সেই বর্তমানের গতি নেই
কোথায় চলেছে নেই সেই ভবিষ্যতের ঠিকানা।
সেচ-হীন ক্ষেত
মণি-হীন চোখ
চোখ-হীন মুখ
একটা স্ফুলিঙ্গ-হীন ভিজে বারুদের স্তুপ।
আমি বললুম, না ওদিক দিয়েই যাব,
ওখান দিয়েই আমার শর্টকাট।
ওদের কাছাকাছি হতেই মুখ বাড়িয়ে
জিজ্ঞেস করলুম,
তোমাদের ট্যাক্ সি লাগবে ? লিফট চাই ?
আরে এই তো ট্যাক্ সি, এই তো ট্যাক্ সি, লে হালুয়া
সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল ওরা
সিটি দিয়ে উঠল
পেয়ে গেছি পেয়ে গেছি চল পানসি বেলঘরিয়া।
তিন-তিনটে ছোকরা উঠে পড়ল ট্যাক্ সীতে,
বললুম কদ্দুর যাবে।
এই কাছেই। ওই দেখতে পাচ্ছেন না ভিড় ?
সিনেমা না, জলসা না, নয় কোনো ফিল্মি তারকার
অভ্যর্থনা।
একটা নিরীহ লোক গাড়িচাপা পড়েছে,
চাপা দিয়ে গাড়িটা উধাও--
আমাদের দলের কয়েকজন গাড়িটার পিছে ধাওয়া
করেছে
আমরা খালি ট্যাক্ সি খুঁজছি।
কে সে লোক ?
একটা বেওয়ারিশ ভিখিরি।
রক্তে-মাংসে দলা পাকিয়ে গেছে ।
ওর কেউ নেই কিছু নেই
শোবার জন্য ফুটপাথ আছে তো মাথার উপরে ছাদ
নেই,
ভিক্ষার জন্য পাত্র একটা আছে তো
তার মধ্যে প্রকান্ড একটা ফুটো।
রক্তে মাখামাখি সেই দলা-পাকানো ভিখিরিকে
ওরা পাঁজাকোলা করে ট্যাক্ সির মধ্যে তুলে নিল।
চেঁচিয়ে উঠল সমস্বরে --আনন্দে ঝংকৃত হয়ে--
প্রাণ আছে, এখনো প্রাণ আছে ।
রক্তের দাগ থেকে আমার ভব্যতা ও শালীনতাকে
বাঁচাতে গিয়ে
আমি নেমে পড়লুম তাড়াতাড়ি।
তারপর সহসা শহরের সমস্ত কর্কশে-কঠিনে
সিমেন্টে-কংক্রিটে।
ইটে-কাঠে-পিচে-পাথরে দেয়ালে-দেয়ালে
বেজে উঠল এক দুর্বার উচ্চারণ
এক প্রত্যয়ের তপ্ত শঙ্খধ্বনি--
প্রাণ আছে, এখনো প্রাণ আছে
সমস্ত বাধা-নিষেধের বাইরেও
আছে অস্তিত্বের অধিকার।
ফিরে আসতেই দেখি
গলির মোড়ে গাছের সেই শুকনো বৈরাগ্য বিদীর্ণ ক’রে
বেরিয়ে পড়েছে হাজার-হাজার সোনালি কচি পাতা
মর্মরিত হচ্ছে বাতাসে,
দেখতে দেখতে গুচ্ছে গুচ্ছে উথলে উঠছে ফুল
ঢেলে দিয়েছে বুকের সুগন্ধ,
উড়ে এসেছে রঙ-বেরঙের পাখি
শুরু করেছে কলকন্ঠের কাকলি,
ধীরে ধীরে ঘন পত্রপুঞ্জে ফেলেছে স্নেহার্দ্র দীর্ঘছায়া
যেন কোনো শ্যামল আত্মীয়তা।
অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে দেখলুম
কঠোরের প্রচ্ছন্নে মাধুর্যের বিস্তীর্ণ আয়োজন।
প্রাণ আছে, প্রাণ আছে-- শুধু প্রাণই আশ্চর্য সম্পদ
এক ক্ষয়হীন আশা
এক মৃত্যুহীন মর্যাদা।
ঃঃঃঃঃঃঃঃ
চক্ষুকে বিশ্বাস করতে পারছি না :
আমার প্রকাশ্য গৃহচূড়ে উড়ছে আমার স্বদেশের
পতাকা---
তিমিরমুক্ত অম্বরের অভিমুখে
উথ্বিত হচ্ছে আমার নিরুদ্ধ আত্মার প্রথম উদার
সম্ভাষণ
আমার জন্মের প্রথম জয়ঘোষণা |
এক প্রান্তে গম্ভীর গৈরিক
অনপনেয় দুঃখের ঔদাস্য আর অপরিমেয় ত্যাগের
প্রসন্নতা ;
অন্য প্রান্তে উল্লাস-উজ্জ্বল সবুজের অপর্যাপ্তি
অমিত জীবনের সৃজনসৌন্দর্যের উদ্ভাবন ;
মধ্যস্থলে তুষারসঙ্কশা শুভ্রতা
কর্মের নির্মলতা ও অনবদ্য অন্তরমাধুর্যের প্রতীতি।
আর সেই শুভ্রতার অন্তরে ঘননীল অশোকচক্র,
সমস্ত অলাতচক্রের ঊর্ধ্বে
শান্তির স্থির বাণী
দিকে-দিকে দেশে-দেশে মৈত্রীর আমন্ত্রণ ;
শোকশূন্য সময়ের ঘূর্ণ্যমানতার প্রতীক
বর্তমান থেকে বৃহত্তর ভবিষ্যতের
মহত্তর সম্ভাবনায় নিয়ত-আবর্তিত
উড়ছে আমার ধ্রুব বিশ্বাসের ধ্বজপট
আমার বীজমন্ত্রের বৈজয়ন্তী।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
স্বাধীনতা কবি অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত, সাগরময় ঘোষ সম্পাদিত, “দেশ” পত্রিকার “সুবর্ণজয়ন্তী কবিতা-সংকলন” থেকে নেওয়া।
কত দুর্গম পর্বত ও কত কন্টকক্লেশিত অরণ্য পার
হয়ে
কত দুঃসহ দুর্যোগের মধ্য দিয়ে
অভ্রান্তলক্ষ্যে চলে এসেছ তোমরা,
দৃঢ় হাতে বহন করে এনেছ এই পতাকাকে।
কত রোষকষায়িত কশা, কত বলদর্পিত বুট
কত বর্বর বুলেট
ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছে তোমাদের,
কিন্তু বজ্রমুষ্টি শিথিল করতে পারেনি,
স্খলিত করতে পারেনি তোমাদের পতাকার উদ্ধতি,
নমিত করতে পারেনি তোমাদের দুষ্পরাজেয় প্রতিজ্ঞা
।
মায়ের বুকে সন্তানের মত
পক্ষিচঞ্চুপুটে তৃণখন্ডের মত
বারুদের বুকে বহ্নিকণার প্রত্যাশার মত
বহন করে এনেছে এই পতাকা
যাতে আমি প্রোথিত করতে পারি আমার প্রকাশ্য
গৃহচূড়ে।
নবীনারম্ভের নিশ্বাসে বিস্তার করতে পারি বুক,
জজ্জ্বল উপলব্ধিতে উদ্ধত করতে পারি মেরুদন্ড।
লেখনীকে বিশ্বাস করতে পারছি না
যা আমি আজ লিখছি এই মুহূর্তে।
কত বাক্য রুদ্ধ হয়ে গেছে তোমাদের কন্ঠে
দলিত হয়েছে কত অরুন্তদ আর্তনাদ
স্তব্ধ হয়েছে কত বঞ্চিত বুকের দ্রোহবাণী।
সত্যভাষের সেই অধিকারকে তবু বিধ্বস্ত হতে
দাওনি,
বহন করে এনেছ এই পতাকা
এই উদাত্ত বীরবার্তা ;
তন্দ্রিত আকাশে মুক্ত করে দিয়েছ
সিতপক্ষ কলহংসের কাকলি,
যাতে আমি পেতে পারি আমার ভাষা
লেখনীতে অপরাঙ্মুখ তীক্ষ্ণতা।
তাই আজ এই পতাকাকে যখন প্রণাম করি
প্রণাম করি তোমাদের দুর্জয় বীর্যবত্তাকে।
স্মরণ করি তোমাদের
যারা ফাঁসির রজ্জুকে মনে করেছে কন্ঠলগ্ন কোমল
ফুলমালা
মৃত্যুতে দেখেছ অমরত্বের রাজধানী।
স্মরণ করি তোমাদের
নাগ-নক্ষত্র যাদের যাত্রা,
যারা কারাকক্ষে নিয়তিনির্দিষ্ট হয়ে
যাপন করেছে অবিচ্ছেদ্য অন্ধকার,
আকাঙ্ক্ষার অগ্নিতেজে তপ্ত রেখেছ বক্ষঃস্থল,
জতুগৃহদাহে দেখেছ ইন্দ্রপ্রস্থের নির্মিতি।
আর তোমাদের স্মরণ করি
সেই সব অগণন নানহীন পথিক পদাতিকের দল,
নির্বিশঙ্ক জীবনের আহ্বানে
পদে-পদে রক্তচিহ্নিত করেছ পথ-প্রান্তর-জনপদ,
ঘরে ঘরে জ্বেলেছ
জায়া-জননীর হাহাকারের দাবাগ্নি।
যাতে আমি জীবনে পেতে পারি মর্যাদা
অমূল্য মূল্যবোধ |
যাতে হাতে পেতে পারি তেজিষ্ঠ লেখনী
কন্ঠে পেতে পারি দুর্বার কলস্বন
আর প্রকাশ্য গৃহচূড়ে এই অপ্রকল্প পতাকা॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ