বঙ্গবাণী
কবি আবদুল হাকিম (১৬২০ - ১৬৯০)।
এই কবিতাটি কবির "নুননামা" গ্রন্থের কবিতা।
কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।
সে সবে কবিল মোতে মনে হবিলাষ॥
তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।
নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্ব্বজন॥
আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।
দেখী ভাষা বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ॥
আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।
যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত॥
যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।
সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন॥
সর্ব্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।
বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী॥
মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।
হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ॥
যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি॥
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়।
নিজ দেশ তেয়াগি কেন বিদেশ ন যায়॥
মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।
দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি॥
প্রতিবাদী কবিতার দেয়ালিকা
|
|
|
এই পাতাটি পাশাপাশি, ডাইনে-বামে ও কবিতাগুলি উপর-নীচ স্ক্রল করে! This page scrolls sideways < Left - Right >. Poems scroll ^ Up - Down v.
|
বালো কুমারো ছঅ-মুণ্ডধারী
অবহট্ট ভাষার অজ্ঞাত কবি
কথ্য ভাষা হিসেবে অপভ্রষ্ট বা অবহট্ঠের স্থিতিকাল আনুমানিক খ্রীষ্টীয় অষ্টম
শতক থেকে দশম শতক। এর পরবর্তী স্তরে বিভিন্ন শ্রেণীর অবহট্ঠ থেকে
বিভিন্ন নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাগুলি (Neo Indo-Aryan or NIA), যেমন পূর্ব
ভারতের মাগধী প্রাকৃত থেকে এসেছে মাগধী অপভ্রংশ বা অবহট্ট, যার থেকে
জন্ম লাভ করে ছয়টি আধুনিক ভাষা --- বাংলা, অসমিয়া, ওড়িয়া, মৈথিলি,
ভোজপুরিয়া এবং মগহি।
শিবগৃহিণীর গর্হস্থ্যদুঃখের বর্ণনা---
বালো কুমারো ছঅ-মুণ্ডধারী
উবাঅহীণা মুই এক্ক-ণারী।
অহংণিসং খাই বিসং ভিখারী
গঈ ভবিত্তী কিল কা হমারী॥
“পুত্র বালক, উপরন্তু ছয়-মুণ্ডধারী (অর্থাৎ ছয় মুখে খায়), আমি একলা নারী
উপায়হীনা, (স্বামী) ভিখারী অহর্নিশ বিষ খায় | আমার কি গতি হইবে।”
নানান্ দেশে নানান্ ভাষা
কবি রামনিধি গুপ্ত, নিধুবাবু (১৭৪১ - ১৮৩৯)
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সংকলিত ও সম্পাদিত,
২২৭ জন কবির লেখা ৫৬৬৩টি গানের সংকলন “বাঙ্গালীর
গান” থেকে নেওয়া।
॥ কামোদ খাম্বাজ॥ জলদ তেতালা॥
নানান্ দেশে নানান্ ভাষা।
বিনে স্বদেশীয় ভাসে পুরে কি আশা॥
কত নদী সরোবর, কীবা ফল চাতকীর।
ধারাজল বিনে কভু ঘুচে কি তৃষা?
স্ত্রীর অভিমান
কবিয়াল যজ্ঞেশ্বরী (অষ্টাদশ - উনবিংশ শতক)
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সংকলিত ও সম্পাদিত, ২২৭ জন
কবির লেখা ৫৬৬৩টি গানের সংকলন “বাঙ্গালীর গান” থেকে নেওয়া।
কর্মক্রমে আশ্রমে সখা হলে যদি অধিষ্ঠান ;
হেরে মুখ, গেল দুঃখ,
দুটো কথার কথা বলি প্রাণ॥
আমায় বন্দী করে প্রেমে,
এখন ক্ষান্ত হলে হে ক্রমে ক্রমে,
দিয়ে জলাঞ্জলি এ আশ্রমে।
আমি কুলবতী নারী, পতি বই আর জানিনে ;
এখন অধীনী বলিয়ে ফিরে নাহি চাও ;
ঘরের ধন ফেলে প্রাণ---
পরের ধন আগুলে বেড়াও।
নাহি চেন ঘর বাসা, কী বসন্ত কী বরষা,
সতীরে করে নিরাশা
অসতীর আশা পুরাও।
রাজ্যে থেকে ভার্যের প্রতি কার্যে না কুলাও॥
তোমার মন হল বার বাগে,
গেল জন্মটা ওই পোড়া রোগে,
আমার সঙ্গে দেখা দৈবার্থ যোগে।
কথা কহিছ আমার সনে,
মন রয়েছে সেখানে,
প্রাণমনে কর সখা, পাখা হলে উড়ে যাও॥
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে
কবি লালন ফকির (১৭৭৪ - ১৭.১০.১৮৯০)
শিল্পী - অমর পাল। পাঠক সমাবেশ, আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এ
প্রকাশিত, আবুল আহসান চৌধুরী সংগ্রহীত, গবেষিত ও সম্পাদিত, “লালনসমগ্র” থেকে নেওয়া।
ভিডিওটি সৌজন্যে RDC Banglar Geeti YouTube Channel.
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।
লালন বলে জেতের কী রূপ
দেখলাম না এই নজরে॥
সুন্নত দিলে হয় মুসলমান
নারী লোকের কী হয় বিধান।
বামুন চিনি পৈতে প্রমাণ
বামনী চিনি কীসে রে॥
কেউ মালা কেউ তসবি গলে
তাইতে কি জাত ভিন্ন বলে।
আসা কিংবা যাওয়ার কালে
জেতের চিহ্ন রয় কার রে॥
জগৎ জুড়ে জেতের কথা
লোকে গল্প করে যথাতথা।
লালন বলে জেতের ফাতা
ডুবাইছি সাধবাজারে॥
এসব দেখি কানার হাটবাজার
কবি লালন ফকির (১৭৭৪ - ১৭.১০.১৮৯০)
শিল্পী - বাউল কাজল দেওয়ান। পাঠক সমাবেশ, আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা থেকে ফেব্রুয়ারি
২০০৮-এ প্রকাশিত, আবুল আহসান চৌধুরী সংগ্রহীত, গবেষিত ও সম্পাদিত, “লালনসমগ্র” থেকে
নেওয়া। ভিডিওটি সৌজন্যে Dhaka Tv YouTube Channel.
এসব দেখি কানার হাটবাজার
বেদ-বিধির পর শাস্ত্র কানা
আর এক কানা মন আমা॥
পণ্ডিত কানা অহংকারে
মাতব্বর কানা চোগলখোরে।
আন্দাজি এক খুঁটো গেড়ে
চেনে না সীমানা কা॥
এক কানা কয় আর এক কানারে
চল দেখি যাই ভবপারে।
নিজে কানা পথ চেনে না
পরকে ডাকে বারে বা॥
এক কানা উলামিলা
বোবাতে খায় রসগোল্লা।
লালন তেমনি মদনা কানা
ঘুমের ঘোরে দেয় বাহা॥
জাত গেল জাত গেল বলে
কবি লালন ফকির (১৭৭৪ - ১৭.১০.১৮৯০)
শিল্পী - ফরিদা পারভীন। পাঠক সমাবেশ, আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এ
প্রকাশিত, আবুল আহসান চৌধুরী সংগ্রহীত, গবেষিত ও সম্পাদিত, “লালনসমগ্র” থেকে নেওয়া।
ভিডিওটি সৌজন্যে S M Hassan RAJU YouTube Channel.
জাত গেল জাত গেল বলে
একি আজব কারখানা।
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি
সব দেখি তা না না না॥
যখন তুমি ভবে এলে
তখন তুমি কী জাত ছিলে
যাবার বেলায় কী জাত নিলে
এ-কথা আমায় বল না॥
ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল চামার-মুচি
এক জলে সব হয় গো শুচি
দেখে শুনে হয় না রুচি
যমে তো কাউকে ছাড়বে না॥
গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়
তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়
লালন বলে জাত কারে কয়
এই ভ্রম তো গেল না॥
পাপ-পুণ্যের কথা আমি
কবি লালন ফকির (১৭৭৪ - ১৭.১০.১৮৯০)
শিল্পী - শতাব্দী রায় মজুমদার। পাঠক সমাবেশ, আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা থেকে ফেব্রুয়ারি
২০০৮-এ প্রকাশিত, আবুল আহসান চৌধুরী সংগ্রহীত, গবেষিত ও সম্পাদিত, “লালনসমগ্র” থেকে
নেওয়া। ভিডিওটি সৌজন্যে MANUSH FOLK STUDIO YouTube Channel.
পাপ-পুণ্যের কথা আমি
কারে বা শুধাই।
এই দেশে যা পাপ গণ্য
অন্য দেশে পুণ্য তাই॥
তিব্বত নিয়ম অনুসারে
এক নারী বহু পতি ধরে
এই দেশে তা হলে পরে
ব্যভিচারী দণ্ড হয়॥
শূকর গরু দুইটি পশু
খাইতে বলেছেন যিশু
শুনে কেন মুসলমান হিন্দু
পিছেতে হটায়॥
দেশ সমস্যা অনুসারে
ভিন্ন বিধান হতে পারে
সূক্ষ্ম জ্ঞানের বিচার করে
পাপপুণ্যের নাই বালাই॥
পাপ হলে ভবে আসি
পুণ্য হলে স্বর্গবাসী
লালন বলে নমি উর্বশী
নিত্য নিত্য প্রমাণ পাই॥
ভক্তের দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই
কবি লালন ফকির (১৭৭৪ - ১৭.১০.১৮৯০)
শিল্পী - নিজাম সাঁই। পাঠক সমাবেশ, আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এ
প্রকাশিত, আবুল আহসান চৌধুরী সংগ্রহীত, গবেষিত ও সম্পাদিত, “লালনসমগ্র” থেকে নেওয়া।
ভিডিওটি সৌজন্যে Protap Majumder YouTube Channel.
ভক্তের দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই।
হিন্দু কি যবন বলে জাতের বিচার নাই॥
ভক্ত কবির জেতে জোলা
প্রেমভক্তিতে মাতোয়ারা
ধরেছে সে-ই ব্রজের কালা
দিয়ে সর্বস্ব ধন তাই॥
রামদাস মুচি ভবের পরে
ভক্তির বল সদাই করে
সেবায় স্বর্গে ঘণ্টা পড়ে
সাধুর মুখে শুনতে পাই॥
এক চাঁদে জগৎ আলো
এক বীজে সব জন্ম হলো।
ফকির লালন বলে মিছে কল'
আমি ভবে দেখতে পাই॥
মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে
কবি লালন ফকির (১৭৭৪ - ১৭.১০.১৮৯০)
শিল্পী - আজিজুর রহমান (আরজু)। পাঠক সমাবেশ, আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা থেকে
ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এ প্রকাশিত, আবুল আহসান চৌধুরী সংগ্রহীত, গবেষিত ও সম্পাদিত, “লালনসমগ্র”
থেকে নেওয়া। ভিডিওটি সৌজন্যে Lalon Biswasangha লালন বিশ্বসংঘ YouTube Channel.
মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে।
সে কি অন্য তত্ত্ব মানে॥
মাটির ঢিবি কাঠের ছবি
ভূত ভাবি সব দেবাদেবী
ভোলে না সে অন্যরূপী
মানুষ ভজে দিব্যজ্ঞানে॥
নরই সরই নূলা ঝুলা
পেঁচা পেঁচী আলাভোলা
তাতে নয় সে ভোলনেওয়ালা
যেজন মানুষ রতন চেনে॥
ফেয়ো ফেপী ফ্যাকসা যারা
ভাকা ভোকায় ভোলে তারা
লালন তেমনি চটা মারা
ঠিক দাঁড়ায় না একখানে॥
যে জন গুরুর দ্বারে জাত বিকিয়েছে
কবি লালন ফকির (১৭৭৪ - ১৭.১০.১৮৯০)
পাঠক সমাবেশ, আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৮-
এ প্রকাশিত, আবুল আহসান চৌধুরী সংগ্রহীত, গবেষিত ও সম্পাদিত,
“লালনসমগ্র” থেকে নেওয়া।
যে জন গুরুর দ্বারে জাত বিকিয়েছে।
তার কি আর জাতির ভয় আছে॥
সুতোর টানে পুতুল যেমন
নেচে ফেরে সারা জনম
নাচায় বাঁচায় সেহি একজন
গুরু নামে জগৎ জুড়েছে॥
গুরুমাখা ত্রিজগৎময়
কান্নাহাসি স্বর্গনরক হয়
উত্তম ম্লেচ্ছ কারে বলা যায়
দেখ গভীরেতে বুঝে॥
সকল পুণ্যের পুণ্যফল
গুরু বিনে নাই সম্বল
লালন কয় তার জনম সফল
যে জন গুরুধন পেয়েছে॥
সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন
কবি লালন ফকির (১৭৭৪ - ১৭.১০.১৮৯০)
শিল্পী - খইবার ফকীর। পাঠক সমাবেশ, আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এ
প্রকাশিত, আবুল আহসান চৌধুরী সংগ্রহীত, গবেষিত ও সম্পাদিত, “লালনসমগ্র” থেকে নেওয়া।
ভিডিওটি সৌজন্যে Gobinda Karmakar YouTube Channel.
সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন।
লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান॥
একই ঘাটে আসা যাওয়া
একই পাটনী দিচ্ছে খেওয়া
কেউ খায় না কারো ছোঁয়া
বিভিন্ন জল কে কোথা পান॥
বেদ-পুরাণে করেছে জারি
যবনের সাঁই হিন্দুর হরি
তাও তো আমি বুঝতে নারি
দুই রূপ সৃষ্টি কী তার প্রমাণ॥
বিবিদের নাই মুসলমানী
পৈতা যার নাই সেও তো বামনী
বোঝ রে ভাই দিব্যজ্ঞানী
লালন তেমনি জাত একখান৷॥
হাতের কাছে মামলা থুয়ে
কবি লালন ফকির (১৭৭৪ - ১৭.১০.১৮৯০)
পাঠক সমাবেশ, আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৮-
এ প্রকাশিত, আবুল আহসান চৌধুরী সংগ্রহীত, গবেষিত ও সম্পাদিত,
“লালনসমগ্র” থেকে নেওয়া।
হাতের কাছে মামলা থুয়ে
কেন ঘুরে বেড়াও ভেয়ে।
ঢাকা শহর দিল্লী-লাহোর
খুঁজলে মেলে এই দেহে॥
মনের ধোঁকায় যেথায় যাবি
ধাক্কা খেয়ে হেথায় ফিরবি
এমনি ভাবে ঘুরে মরবি
সন্ধান না পেয়ে॥
গয়া-কাশী মক্কা-মদিনা
বাইরে খুঁজলে ধান্দা যায় না
দেহরতি খুঁজলে পাবি
সকল তীর্থের ফল তাহে॥
দেখ দেখি মন রে আমার
অবিশ্বাসের ধন প্রাপ্তি হয় কার
যার বিশ্বাসের মন, নিকটে পায় ধন
লালন ফকির যায় কয়ে॥
সবে বলে লালন ফকির কোন্ জাতের ছেলে
কবি লালন ফকির (১৭৭৪ - ১৭.১০.১৮৯০)
শিল্পী - সাগর বাউল। পাঠক সমাবেশ, আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এ
প্রকাশিত, আবুল আহসান চৌধুরী সংগ্রহীত, গবেষিত ও সম্পাদিত, “লালনসমগ্র” থেকে নেওয়া।
ভিডিওটি সৌজন্যে Bangla Folk Dunia YouTube Channel.
সবে বলে লালন ফকির কোন্ জাতের ছেলে।
কারে বা কী বলি আমি দিশে না মেলে॥
শ্বেতদণ্ড জরায়ু ধরে
এক একেশ্বর সৃষ্টি করে
আগম নিগুম চরাচরে
তাই তো জাত ভিন্ন বলে॥
জাত বলিতে কী হয় বিধান
হিন্দু যবন বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতের আছে কিবা প্রমাণ
শাস্ত্র খুঁজিলে॥
মানুষের নাই জাতের বিচার
এক এক দেশে এক এক আচার
লালন বলে জেতের ব্যবহার
গিয়াছি ভুলে॥
এতকাল পরে সব ভেঙ্গে গেল ভূর
কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোষ্য
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (২৬.৯.১৮২০ - ২৯.৭.১৮৯১)
১৮৭১-৭৩ সালের মধ্যে রচিত “বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না
এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব”-এর প্রকাশনার পর শুরু হয় পণ্ডিত সমাজের তুমুল
আক্রমণ। সেই আক্রমণের উত্তরে “কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোষ্য” ছদ্মনামে,
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর “অতি অল্প হইল” প্রকাশিত করেন ১২৮০ বঙ্গাব্দে
(১৮৭৩)। সেই লেখাটি শুরু করেছিলেন তারানাথ তর্কবাচস্পতি কে নিয়ে,
এই কবিতাটি দিয়ে . . .
এতকাল পরে সব ভেঙ্গে গেল ভূর।
কতদর্প হৈলে বাচস্পতি বাহাদুর॥ ১॥
সকলের বড় আমি মম সম নাই।
কিসে এই দর্প কর ভেবে নাহি পাই॥ ২॥
অতি দর্পে লঙ্কাপতি সবংশে নিপাত।
অতি দর্পে বাচস্পতি তব অধঃপাত॥ ৩॥
গর্ব্বে ফেটে পড় সবে কর তৃণজ্ঞান।
অহঙ্কারী নাহি কেহ তোমার সমান॥ ৪॥
তুমি গো পণ্ডিতমূর্খ বুদ্ধিশুদ্ধিহীন।
অতি অপদার্থ তুমি অতি অর্ব্বাচীন॥ ৫॥
দিনের দিন্ সবে দীন
কবি মনমোহন বসু (১৪.৭.১৮৩১ - ৪.২.১৯১২)
১৯৫৯ সালে প্রকাশিত, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুণকুমার
মুখোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত উনবিংশ শতকের গীতিকবিতা
সংকলন থেকে নেওয়া।
দিনের দিন্ সবে দীন হয়ে পরাধীন!
অন্নাভাবে শীর্ণ, চিন্তাজ্বরে জীর্ণ, অপমানে তনু ক্ষীণ!
সে সাহস বীর্য নাহি আর্যভূমে, পূর্ব গর্ব সর্ব খর্ব হলো ক্রমে,
চন্দ্র-সূর্য-বংশ অগৌরবে ভ্রমে, লজ্জা-রাহু-মুখে লীন! ১।
অতুলিত ধন রত্ন দেশে ছিল, যাদুকর জাতি মন্ত্রে উড়াইল,
কেমনে হরিল কেহ না জানিল, এম্নি কৈল দৃষ্টিহীন! ২।
তুঙ্গ দ্বীপ হ'তে পঙ্গপাল এসে, সারা শষ্য গ্রাসে যত ছিল দেশে,
দেশের লোকের ভাগ্যে খোসা ভুষি শেষে, হায় গো রাজা কি কঠিন! ৩।
তাঁতি, কর্মকার, করে হাহাকার, সূতা জাঁতা টেনে অন্ন মেলা ভার---
দেশী বস্ত্র অস্ত্র বিকায় নাকো আর, হ'লো দেশের কি দুর্দিন! ৪।
আ'জ যদি এ রাজ্য ছাড়ে তুঙ্গরাজ, কলের বসন বিনা কিসে রবে লাজ?
ধ'র্বে কি লোক তবে দিগম্বরের সাজ---বাকল্, টেনা, ডোর, কপিন? ৫।
ছুঁই সূতো পর্যন্ত আসে তুঙ্গ হ'তে ; দীয়াশলাই কাটি, তাও আসে পোতে ;
প্রদীপটি জ্বালিতে, খেতে, শুতে, যেতে ; কিছুতেই লোক নয় স্বাধীন! ৬।
বল্লালি তুই যা রে বাঙালা ছেড়ে
কবি রাসবিহারী মুখোপাধ্যায় (২৫.১.১৮২৬ - ১০.৪.১৮৯৫)
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সংকলিত ও সম্পাদিত, ২২৭ জন
কবির লেখা ৫৬৬৩টি গানের সংকলন “বাঙ্গালীর গান” থেকে নেওয়া।
বল্লালি তুই যা রে বাঙালা ছেড়ে।
ডুবল ভারত কদাচারে
সোনার বাঙালা যায় রে ছারেখারে।
ভ্রুণহত্যা সঙ্গে করে, ব্যভিচার তুই যা রে মরে
পাপস্রোতে ভাসালি রে বঙ্গ-মায়েরে
অপার পাথারে।
কমলিনী সমাজে সব কুলীনের মেয়ে,
অনাথিনী বেসে থাকে মলিনা হয়ে,
ওরে ওদের দশা মনে হলে,
দুঃখেতে পাষাণ গলে, কেউ নাই ওদের ধরাতলে,
সদা মনানলে জ্বলে মরে।
শ্রোত্রিয় বংশজ বংশ গেল রে নিপাত,
ওরে কুমারী কুলীন-কুমারী করে অশ্রুপাত,
ওরে বিদ্যাশূন্য বৃহস্পতি,
তারা বলে সমাজপতি, ঘটক সনে করে যুক্তি,
দম্ভে কাঁপায় বঙ্গ পদভরে॥
মেল ভাঙো মেল ভাঙো কুলীন সবে
কবি রাসবিহারী মুখোপাধ্যায় (২৫.১.১৮২৬ - ১০.৪.১৮৯৫)
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সংকলিত ও সম্পাদিত, ২২৭ জন
কবির লেখা ৫৬৬৩টি গানের সংকলন “বাঙ্গালীর গান” থেকে নেওয়া।
মেল ভাঙো মেল ভাঙো কুলীন সবে।
তবে সে মঙ্গল হবে,
সমাজেতে রবে হে গৌরবে।
মেলে মেলে নাহি মিল,
ইথে কীরে ফল বলো, মিল মেলে মিলে মিল,
জাতি কুল সকলই রহিবে।
ঘরে ঘরে কুল-মেয়ে দুঃখে ভেসে যায়,
( ওরে ) কেমনে দেখো নয়নে পাষাণের প্রায়,
( ওরে ) বলো বলো খড়দ ফুলে,
কী গৌরবে আছো ফুলে,
দেশ নাশিলে সমূলে,
আর কত কাল রবে এ গৌরবে !
সযতনে অন্নদানে কুলকন্যাগণ,
( ওরে ) মূক-শুকপাখিসম করেছ পোষণ,
( ওরে ) তাতে কেন হয়ে ব্যাধ,
সে পাখি জীয়ন্তে বধো,
ওদের কিবা অপরাধ,
কেন এত বাদ সাধো তবে॥
বহুদিন পরে এসেছি, চিনি নাকো শ্বশুরবাড়ি
কবি রাসবিহারী মুখোপাধ্যায় (২৫.১.১৮২৬ - ১০.৪.১৮৯৫)
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সংকলিত ও সম্পাদিত, ২২৭ জন
কবির লেখা ৫৬৬৩টি গানের সংকলন “বাঙ্গালীর গান” থেকে নেওয়া।
বহুদিন পরে এসেছি, চিনি নাকো শ্বশুরবাড়ি
কোন পথে যাইব মাগো বিশ্বনাথ বারড়ির বাড়ি।
যারা ছিলো ছেলেপিলে, তাদের হল ছেলেপিলে,
বিয়ে করেই গেলুম ফেলে, বয়ে গেল বছরকুড়ি॥
বাড়ি ঘর তা নাহি চিনি,
( কেবল ) শ্বশুরেরই নামটি জানি,
উত্তরেতে বাগানখানি, সুপারি সব সারি সারি।
বাড়ির মধ্যে একচালা,
তারই মধ্যে হাঁড়ি চুলা, কক্ষে নিয়ে ভিক্ষার ঝোলা,
বেড়িয়ে বেড়ায় বাড়ি বাড়ি।
দ্বিজ রাসবিহারী বলে,
আর তো হাসি রাখতে নারি,
তুমি যাকে মা বলিলে, সে বটে তোমারই নারী॥
কুলের গৌরবে কত পিতা প্রতিকূল
কবি দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০ - ১.১১.১৮৭৩)
কবির “কমলেকামিনী” নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের গান।
কুলের গৌরবে কত পিতা প্রতিকূল,
না বিচারি বালিকার জীবনের হিত,
অবহেলে ফেলে কন্যা-কমল-কলিকা
অবিরত পাপে রত অপাত্র-অনলে।
দুহিতা স্নেহের লতা জানে ত জনক,
তবে কেন কুলমান-অভিমান-বশে
সম্প্রদানে স্বর্ণলতা শমনে অর্পণে!
সুযতনে তনয়ার বিদ্যা কর দান,
সদাচারে রত রাখ, দেহ ধর্ম্মজ্ঞান,
পরিণয়কালে তায় দেহ অনুমতি
আপনি বাছিয়া লতে আপনার পতি।
স্বদেশ-রক্ষা
কবি দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০ - ১.১১.১৮৭৩)
১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য দ্বারা সঙ্কলিত ও
সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার
সঙ্কলন ১৭৪১ -১৯৪৭” থেকে নেওয়া।
বাঁচিয়ে কি ফল যদি স্বাধীনতা যায়
পড়িবে কি সিংহরাজ শৃগালের পায়
স্বদেশ-রক্ষার তরে, সমরে কি কেহ ডরে,
শত গুণে হয় বলী স্বদেশ-রক্ষায়।
নীলকর
কবি দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০ - ১.১১.১৮৭৩)
১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য দ্বারা সঙ্কলিত ও
সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার
সঙ্কলন ১৭৪১ -১৯৪৭” থেকে নেওয়া।
হে নিরদয় নীলকরগণ,
আর সহে না প্রাণে এ নীল দাহন।
দাদনের সুকৌশলে, শ্বেত সমাজের বলে,
লুটেছে সকল তোহে কি আর আছে এখন।
দীন জনে দুঃখ দিতে কাহার না লাগে চিতে,
কেবল নীলের হেরি পাষাণ ,মান মন।
বৃটন স্বভাবে শেষে, কালি দিলে বঙ্গে এসে,
তরিলে জলধি-জল, পোড়াতে স্বর্ণ-ভবন।
কাঁহা গেয়ো বন্ধু চণ্ডীদাস। চাতকি পিয়াসীগণ না পাইআ বরিসণ নআনের নাগরে নিয়াস॥ কি করিল রাজা গৌড়েশ্বর। না জানিঞা প্রেম লেহ ব্রেথাই ধরিস দেহ বধ কৈলে প্রাণের দোসর॥ কেনে বা সভাতে কৈলে গান। স্বর্গ মঞ্চ(১) পাতালপুর আবির্ভূত পশু নর মানিনীর না রহিল মান॥ গান শুনি পার্চ্ছার(২) বেগম রাজারে কহে জানিঞা মরম॥ রাণি মনঃ কথা রাখিতে নারিল। চণ্ডিদাস সমে প্রিত করিতে হইল চিত তার প্রিতে আপন খুয়াল্যা॥ রাজা কহে মন্ত্রিরে ডাকিয়া। তরার্ণিত হস্থি আনি পিষ্ঠে পেলি(৩) বান্ধ টানি পিষ্ঠ খুদে বৈরী ছাড় গিয়া।(৪) কাঁহা গেয়ো বন্ধু চণ্ডীদাস। চাতকি পিয়াসীগণ না পাইআ বরিসণ নআনের নাগরে নিয়াস॥
|
এইমত নগরেনগরে সঙ্কীর্ত্তন। করাইতে লাগিলেন শচীর নন্দন॥ সভারে উঠিয়া প্রড়ু আলিঙ্গন করে। আপন গলার মালা দেই সভাকারে॥ দন্তে তৃণ করি প্রভু পরিহার করে। “অহর্নিশ ভাইসব! বোলহ কৃষেরে॥ প্রভুর দেখিয়া আর্ত্তি কান্দে সর্ব্বজন। কায়মনোবাক্যে লইলেন সঙ্কীর্ত্তন॥ পরম-আনন্দে সব নগরিয়াগণ। হাথে তালি দিয়া বোলে “রাম নারায়ণ”॥ মৃদঙ্গ মন্দিরা শঙ্খ আছে সর্ব্বঘরে। দুর্গোৎসবকালে বাদ্য বাজাবার তরে॥ সেই সব বাদ্য এবে কীর্ত্তনসময়ে। গায়েন বাঁয়েন সভে আনন্দহৃদয়ে॥ “হরি ও রাম রাম হরি ও রাম রাম।” এইমত নগরে উঠিল ব্রহ্ম-নাম॥ খোলাবেচা - শ্রীধর যায়েন সেইপথে। দীর্ঘ করি হরিনাম বলিতেবলিতে॥
|
মনুর প্রজা সৃষ্টি শতরূপা মনু সঙ্গে ক্রীড়া কুতূহলে। গুণযুত দুই সুত হৈল কতকালে॥ জ্যেষ্ঠ সুত প্রিয়ব্রত হইলা নৃপবর। রথচক্রে হৈল যার এ-সপ্ত সাগর॥ কনিষ্ঠ উত্তানপাদ বিদিত ভুবনে। ধ্রুব নামে পুত্র যার বিদিত পুরাণে॥ তিন কন্যা হইল তার রূপগুণবতী। আকৃতি প্রসূতি হৈল আর দেবহূতি॥ আকৃতিরে বিভা দিল রুচি মুনিবরে। দিলেন যৌতুক রথ তুরঙ্গ কুঞ্জরে॥ কর্দ্দম মুনিরে বিভা দিল দেবহূতি। দিলেক অনেক ধন দেব প্রজাপতি॥ প্রসূতিরে পরিগ্রহ কৈল দক্ষ মুনি। জন্মিলা তাঁহার ষোল তনয়া-রূপিনী॥ ষোড়শ কন্যার মধ্যে মুখ্যা সুতা সতী। বন্দী-মোক্ষ-হেতু দেবী আপনে প্রকৃতি॥ নারদের উপদেশে দক্ষ প্রজাপতি। মহাদেবে বিভা দিল নামে কন্যা সতী॥ নানা ধন যৌতুকে পুরিয়া অভিলাষ। বর-কন্যা পাঠাইয়া দিলেন কৈলাস॥ অভয়ার চরণে মজুক নিজ চিত। শ্রীকবিকঙ্কণে গান মধুর সঙ্গীত॥
|
সবে বলে গৌরীর বর মিল্যাছে ভাল। মদনমোহন রূপে ঘর কব়্যাছে আলো॥ এক যুবতী বলে সই মোর গোদা পতি। কোঁয়া-জ্বরের ওঁষধ সদা পাব কতি॥ ভাদ্র মাসের পাঁকুই বড়ই দুর্ব্বার। গোদে তৈল দিতে কত তুলিব ন্যাকার॥ শনি মঙ্গল বারে যখন মেঘের আরটী। তখন জানিবে গোদের পরিপাটি॥ আর যুবতী বলে পতির বর্জ্জিত দশন। শাক-সূপ-ঘণ্ট বিনে না করে ভোজন॥ দড় বেঞ্জন আমি যেই দিনে রান্ধি। মারয়ে পিড়ির বাড়ি কোণে বস্যা কান্দি॥ আর যুবতী বলে সই মোর কর্ম্ম মন্দ॥ অভাগিয়া পতি মোর দুই চক্ষু অন্ধ॥ কোন দেশে দুখিনী নাহিক মোর পারা। কোলের কাছে থাকিতে সদাই করে হারা॥
|
কারে কব লো যে দুখ আমার। সে কেমনে রবে ঘরে এত জ্বালা যার॥ বাঁদা আছি কুলফাঁদে পরাণ সতত কাঁদে না দেখিয়া শ্যামচাঁদে দিবসে আঁধার। ঘরে গুরু দুরাশয় সদা কলঙ্কিনী কয় পাপ ননদিনী ভয় কত সব আর॥ শ্যম অখিলের পতি তারে বলে উপপতি পোড়া লোক পাপমতি না বুঝে বিচার। পতি সে পুরুষাধম শ্যাম সে পুরুষোত্তম ভারতের সে নিয়ম কৃষ্ণচন্দ্র সার॥
চোর দেখি রামাগণ বলে হরি হরি। আহা মরি চোরের বালাই লয়ে মরি॥ কিবা বুক কিবা মুখ কিবা নাক কান। কিবা নয়নের ঠার কাড়ি লয় প্রাণ॥ ভূষণ লয়েছে কাড়ি হাতে পায় দড়ি। কেমনে এমন গায়ে মারিয়াছে ছড়ি॥ দেখ দেখ কোটালিয়া করিছে প্রহার। হায় বিধি চাঁদে কৈল রাহুর আহার॥ এ বড় বিষম চোর না দেখি এমন। দিনে কোটালের কাছে চুরি করে মন॥
|
গুণসাগর নাগর রায়। নগর দেখিয়া যায়॥ রূপের নাগর গুণের সাগর অগুরু চন্দন গায়। বেণী বিননিয়া চূড়া চিকনিয়া হেলয়ে মলয় বায়॥ মৃদু মধু হাসি বাজাইছে বাঁশী কোকিল বিকল তায়। ভুরুর ভঙ্গিতে নয়ন ইঙ্গিতে ভারতে ফিরিয়া চায়॥
দ্বারীরে শিরোপা দিয়া ঘোড়া জোড়া অস্ত্র। পদব্রজে চলিলা পরিয়া যুগ্ম১ বস্ত্র॥ বাম কক্ষে খুঙ্গী পুথি ডানি করে শুক। ধীরে ধীরে চলে ধীর দেখিয়া কৌতুক॥ প্রথম গড়েতে কোলাপোষের নিবাস। ইঙ্গরেজ ওলন্দাজ ফিরিঙ্গি ফরাস॥ দিনমার এলেমান করে গোলন্দাজী। সফরিয়া নানা দ্রব্য আনয়ে জাহাজী॥
|
॥ হরগৌরীর কন্দল॥
কেবা এমন ঘরে থাকিবে। জয়া। এ দুঃখ সহিতে কেবা পারিবে॥ আপনি মাখেন ছাই আমারে কহেন তাই কেবা সে বালাই ছাই মাখিবে। দামাল ছাবাল দুটি অন্ন চাহে ভূমে লুটি কথায় ভূলায়ে কেবা রাখিবে॥
বিষপানে নাহি লয় কথা কৈতে ভয় হয় উচিত কহিলে দ্বন্দ্ব বাড়িবে। মা বাপ পাষাণ-হিয়া ভিক্ষুকেরে দিল বিয়া ভারত এ দুঃখে ঘর ছাড়িবে॥
শিবার হইল ক্রোধ শিবের বচনে। ধক ধক জ্বলে অগ্নি ললাটলোচনে॥ শুনিলি বিজয়া জয়া বুড়াটির বোল। আমি যদি কই তবে হবে গণ্ডগোল॥ হায় হায় কি কহিব বিধাতা পাষণ্ডী। চণ্ডের কপালে পড়ে নাম হৈল চণ্ডী॥ গুণের নাহিক সীমা রূপ ততোধিক। বয়সে না দেখি গাছ পাথর বল্মীক॥
|
যা হোক এখন সে কথাটা,
রটছে যদি হয় আঁটা,
নগর মাঝে এখনি নাগর খুঁজে।
পতিত জমির দেই পাটা,
বেড়ে উঠে বুকের পাটা,
দিয়ে শত্রুর বুকের পাটা, নাচি গাঁয়ের মাঝে॥
পূজা করি গুরুর পাটা, দিয়ে ধূতি এক পাটা,
গুরুকে এখনি বরণ করি লো দিদি!
কালির যদি হয় কৃপাটা,
কালীকে দিব কাল পাঁটা,
বিচ্ছেদের ঘা-টা শুকায় যদি॥
সত্যপীরকে দিব বাটা,
সাধ পূর্ণ --- সাধু-সেবাটা,---
ক'রে ঘটা করি নিকেতনে।
পাছে কোন বদ লোকটা,
দেয় ইহাতে বাধাটা,---
ঐ ভয়টা সদা হতেছে মনে॥
অবিচার বিধাতার, দেহে নাই ধর্ম তার,
নারী পুরুষ দুই তাঁর সৃষ্টি।
বিধাতা পুরুষদিগকে,
দেখেছে কি সোণার চখে,
রমণীদিগে কেবল বিষদৃষ্টি॥
জননী ভারতভূমি, আর কেন থাক তুমি, ধর্ম্মরূপ ভুষাহীন হয়ে? তোমার কুমার যত, সকলেই জ্ঞানহত, মিছে কেন মর ভার বয়ে? পূর্ব্বকার দেশাচার কিছুমাত্র নাহি আর অনাচারে অবিরত রত। কোথা পূর্ব রীতি নীতি, অধর্মের প্রতি প্রীতি, শ্রুতি হয় শ্রুতিপথহত॥ দেশের দারুণ দুখ দেখিয়া বিদরে বুক, চিন্তায় চঞ্চল হয় মন। লিখিতে লেখনী কাঁদে ম্লানমুখ মসীছাঁদে শোক-অশ্রু করে বরিষণ॥ কি ছিল কি হ'ল, আহা, আর কি হইবে তাহা, ভারতের ভবভরা যশ। ঘুচিবে সকল রিষ্টি হবে সদা সুখ-বৃষ্টি, সর্ব্বাধারে সঞ্চারিবে রস॥ ভবভূপ-প্রিয়ারাণী, বাণীর প্রকৃত বাণী, মৃতপ্রায় পুরাতন ভাষা। সচেতন হয়ে পুন, গাইবে বিভুর গুণ, রসনায় নিত্য করি বাসা॥
|
আমরা
কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (২৫.১.১৮২৪ - ২৯.৬.১৮৭৩)
“চতুর্দশপদী কবিতাবলী” (১৮৬৬) কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
আকাশ-পরশী গিরি দমি গুণ-বলে,
নির্ম্মিল মন্দির যারা সুন্দর ভারতে ;
তাদের সন্তান কি হে আমরা সকলে?---
আমরা,--- দুর্ব্বল, ক্ষীণ, কুখ্যাত জগতে!
পরাধীন, হা বিধাতঃ! আবদ্ধ শৃঙ্খলে ;
কি হেতু নিবিল জ্যোতিঃ মণি, মরকতে?
ফুঁটিল ধুতুরা ফুল মানসের জলে
নির্গন্ধে---কে কবে মোরে? জানিব কি মতে?
বামণ দানব-কূলে, সিংহের ঔরসে
শৃগাল, কি পাপে মোরা কে কবে আমারে?
রে কাল! পূরিবি কি রে পুনঃ নব-রসে
রসশূন্য দেহ তুই? অমৃত-আসারে
চেতাইবি মৃত-কল্পে? পুনঃ কি হরষে
শুক্লকে ভারত-শশী ভাতিবে সংসারে?
কুশালনে ইন্দ্রজিৎ পূজে ইষ্টদেবে
নিভৃতে ; কৌষিক বস্ত্র, কৌষিক উত্তরী,
চন্দনের ফোঁটা ভালে, ফুলমালা গলে।
পুড়ে ধূপদানে ধূপ ; জ্বলিছে চৌদিকে
পূত ঘৃতরসে দীপ ; পুষ্প রাশি রাশি,
গণ্ডারের শৃঙ্গে গড়া কোষা কোষী, ভরা।
হে জাহ্নবি, তব জলে, কলুষনাশিনী
তুমি! পাশে হেম-ঘণ্টা, উপহার নানা,
হেম-পাত্রে ; রুদ্ধ দ্বার ; বসেছে একাকীরসহ
রথীন্ত্র, নিমগ্ন তপে চন্দ্রচূড় যেন---
যোগীন্দ্র,---কৈলাস গিরি। তব উচ্চ চূড়ে।
যথা ক্ষুধাতুর ব্যাঘ্র পশে গোষ্টগৃহে
যমদূত, ভীমবাহু লক্ষণ পশিলা
মায়াবলে দেবালয়ে। ঝন্ ঝনিল অসি
পিধানে, ধ্বনিল বাজি তূণীর-ফলকে,
কাঁপিল মন্দির ঘন বীরপদভরে।
চমকি মুদিত আঁখি মিলিলা রাবণি।
দেখিলা সম্মুখে বলী দেবাকৃতি রথী---
তেজস্বী মধ্যাহ্নে যথা দেব অংগুমালী !
সাষ্টাঙ্গে প্রণমি শূর, কৃতাঞ্জলিপুটে,
কহিলা, “হে বিভাবসু, শুভ ক্ষণে আজি
স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,
কে বাঁচিতে চায়?
দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে,
কে পরিবে পায়।
কোটিকল্প দাস থাকা নরকের প্রায় হে,
নরকের প্রায়!
দিনেকের স্বাধীনতা, স্বর্গসুখ-তায় হে,
স্বর্গসুখ তায়!
এ কথা যখন হয় মানসে উদয় হে,
মানসে উদয়!
পাঠানের দাস হবে ক্ষত্রিয়-তনয় হে,
ক্ষত্রিয়-তনয়॥
তখনি জ্বলিয়া উঠে হৃদয়-নিলয় হে,
হৃদয়- নিলয়।
নিবাইতে সে অনল বিলম্ব কি সয় হে,
বিলম্ব কি সয়?
অই শুন! অই শুন! ভেরীর আওয়াজ হে,
ভেরীর আওয়াজ।
সাজ সাজ সাজ বলে, সাজ সাজ সাজ হে,
সাজ সাজ সাজ॥
চল চল চল সবে, সমর-সমাজে হে,
সমর-সমাজ।
রাখহ পৈতৃক ধর্ম, ক্ষত্রিয়ের কাজ হে,
ক্ষত্রিয়ের কাজ॥
॥ বেহাগ-একতালা॥
“উন্নতি উন্নতি”--- উল্লাস-ভারতী,
কেন দিবারাতি বল রে?
কিসের উন্নতি? দেশের দুর্গতি,
দেখে শুনে তবু ভোল রে !
বটে জলে স্থলে, ভারতমণ্ডলে ;
যেন মন্ত্রবলে, ধোয়া-যন্ত্র চলে---
একই দিবসে কাশী যাও চ'লে---
তাই কি উল্লাসে পল রে? ১।
চঞ্চলা-দামিনী---বিমান-চারিণী,
তব বার্ত্তা বহে আসিয়া অবনী,
এ নব বিভব অদ্ভুত কাহিনী ;---
তাই কি বিস্ময়ে টল রে? ২।
কিন্তু একবার ভেবে দেখ সার---
এত যন্ত্র দেশে, যন্ত্রী কেবা তার?
স্বত্ব-অধিকার, তাহে কি তোমার?
মিছা আশা দোলে দোল রে! ৩ ;
কাঁহা গেয়ো বন্ধু চণ্ডীদাস (চণ্ডীদাসের মৃত্যু) কবি রামী বা রমমণি বা রামী রজকিনী (চতুর্দশ শতক)
এই পদটি ১৮৯৬ সালে, স্বাধীন ত্রিপুরার মহারাজ বীরচন্দ্রমাণিক্য দেব-বর্ম্মণ বাহাদুরের অর্থানুকুল্যে মুদ্রিত, দীনেশচন্দ্র সেনের “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (ইংরেজ প্রভাবের পূর্ব্ব পর্য্যন্ত)”, ২১৭-পৃষ্ঠায় এইরূপে
দেওয়া রয়েছে। ২২০-পৃষ্ঠায় এই পদটির প্রাপ্তি সম্বন্ধে দীনেশচন্দ্র লিখেছেন, “একখানি পাতা। উপকরণ---তুলোট কাগজ। আকার, ১৫ ১/৪ x ৫ ইঞ্চি। প্রতি পৃষ্ঠায় ১১ পংক্তি, অক্ষর প্রাচীন। সাহিত্য-পরিষৎ
পুস্তকাগারে রক্ষিত।”
কি করিল রাজা গৌড়েশ্বর। না জানিঞা প্রেম লেহ ব্রেথাই ধরিস দেহ বধ কৈলে প্রাণের দোসর॥ কেনে বা সভাতে কৈলে গান। স্বর্গ মঞ্চ(১) পাতালপুর আবির্ভূত পশু নর মানিনীর না রহিল মান॥ গান শুনি পার্চ্ছার(২) বেগম রাজারে কহে জানিঞা মরম॥ রাণি মনঃ কথা রাখিতে নারিল। চণ্ডিদাস সমে প্রিত করিতে হইল চিত তার প্রিতে আপন খুয়াল্যা॥ রাজা কহে মন্ত্রিরে ডাকিয়া। তরার্ণিত হস্থি আনি পিষ্ঠে পেলি(৩) বান্ধ টানি পিষ্ঠ খুদে বৈরী ছাড় গিয়া।(৪) আমি অনাথিনী নারী মাধবির ডালে ধরি উর্চ্চস্বরে ডাকি প্রাণনাথ। হস্তি চলে অতি জোরে ভালস্তে(৫) না দেখি তোরে মাথা এ পড়িল বজ্রাঘাত। রাণি কহে ছাড়িয়া না যায়(৬)।
|
কহিতে কহিতে প্রাণ আর দেহ সমাধান দুঁহু প্রাণ একত্রে মিলায়॥ ১॥ সুন প্রিয় রজকিনি আসকে হারালঙ প্রাণী এবার তরাবে তুমি মোরে। বেগম সহিত লেহ হা নাথ খুয়ালে দেহ প্রাণে মাল্য(৭) এ রাজা গুঁয়ারে(৮)। আসকে লভিত প্রাণ তখনি করিলে গান কেমনে জানিব হেন হবে। বৈরি শত ডংসে(৯) গায় চেতন পাইএ তায় তোমারে ডাকিএ আত্মাভাবে। এই করি আস মনে উর্ধ্বারিবে পতিত জনে তবে সে দুর্ল্লভ মানি প্রীত। নতুবা ফুরাল্য দায় বৈরী চোটে প্রাণ জায় কে য়ার করিবে মোর হীত। কান্দি কহে চণ্ডিদাস দশ দসার আস পুনু কর রজক কুমারি। নহিলে একলা জাই সঙ্গে মোর কেহ নাই কাছে য়াস্য তবে প্রাণে মরি॥ ২॥
|
সুন বন্ধু চণ্ডীদাস দুখিনিরে সঙ্গে করি লেহ॥ ধ্রু॥ চঞ্চল স্বভাব তোর চিত সভাতে গাইলে গীত মনের মরম করি সার। অনুরাগে কি না করিলে ফুত্কার। পাতি হাট বসাত্যে না দিলে। আসক আনলে পড়াইলে॥ বৈরি কাটে তোমার গায়। তুমি সে আনন্দ বাস তায়॥ মোর অঙ্গ সব ক্ষেতি হৈল। রুধিরে বসন ভিজ্যা গেল॥ পরসিত এ জনার মন। কতেক করাছ কদর্থন(১০)॥ রামি কহে যদি সঙ্গে নিবে তুরিতে পরাণ তেজ তবে॥ ৩॥
সুন প্রাণনাথ চণ্ডীদাস তার নির্ব্বন্ধন। দৈবের কর্ম্মফাঁস না যায় খণ্ডন॥ ছাড়ি পরিবার মোর সঙ্গ কর সভারে কহিলে সত্য। বাসুলি বচন না কৈলে সঙরণ তাহাতে মজাল্যে চিত্ত॥ আমা মুখ চাঞা গজপিষ্টে সুঞ্যা রয়্যাছ বন্ধন পাকে। রাজা গৌড়েশ্বর দুষ্ট কলেবর কেহনা বুঝাল তাকে॥
|
নাথ আমি সে রজকবালা। আমার বচন না সুনে রাজন বুঝিল কৃষ্ণের লীলা॥ সুদ্ধ কলেবর হইল জর্জ্জর দারুণ সঞ্জান ঘাতে। এ দুঙ্ঘ দেখিয়া বিদরএ হিয়া অভাগিরে লেহ সাথে॥ কহেন রামিনী সুন গুণমণি জানিলাঙ তোমার রীতি। বাশুলি বচন করিলে লংঘন সুনহ রসিক পতি॥ ৪॥
পার্চ্ছার বেগম কয়। সুন মহিনাথ মহাশয়॥ তুমি অবলা বচন রাখ। রসিক মণ্ডল দেখ॥ আমি সে অবলা নারি। তোমারে কহিএ বিনয় করি॥ যোড় করে কহে রামি। সুন নৃপ চূড়ামণি। সুন রসের স্বরূপ সে কেন বিনাস করহ তাহার দে। সে সামান্য মানুষ নহে। রতি স্থিতি তার দেহে। জাহার সুস্বর গানে। বিন্ধিল আমার প্রাণে॥
|
ভূবনে রাখিলে লাজ রাজা হে যবন জাতি। কি জানে রসের গতি। চণ্ডিদাস করি ধ্যান। বেগম তেজিল প্রাণ। সুনি শ্রস্তা(১১) ধবিনি(১২) ধায় পড়িল বেগম পায়॥ ৫॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
|
শব্দার্থ - ১। মঞ্চ = মর্ত্ত্য, ২। পার্চ্ছার = পাত্সাহের, ৩। পেলি = ফেলি, ৪। পিষ্ঠ খুদে বৈরী ছাড় গিয়া = পৃষ্টদেশ বিদীর্ণ করিয়া শত্রুকে বধ কর, ৫। ভালস্তে = ভাল
করিয়া, ৬। জায় = যেও, ৭। মাল্য = মরিল, ৮। গুঁয়ারে = নিষ্ঠুর, ৯। ডংসে = দংশে, ১০। কদর্থন = কষ্ট, ১১। শ্রস্তা = ত্রস্তভাবে, ১২। ধবিনি = ধুবসী, রজক কন্যা।
এইমত নগরেনগরে সঙ্কীর্ত্তন কবি বৃন্দাবন দাস
আনুমানিক ১৫৬০ খৃষ্টাব্দ নাগাদ, বৃন্দাবন দাস বিরচিত এবং ৪৫২ চৈতন্যাব্দে (১৩৪৬ বঙ্গাব্দে, ১৯৩৯খৃষ্টাব্দে) অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী "শ্রীচৈতন্যভাগবত" গ্রন্থের, মধ্য খণ্ড, ২৩শ অধ্যায়, ৩২২-পৃষ্ঠা। বিশ্বম্ভর মিশ্রর (সন্ন্যাস-পূর্বে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নাম) আদেশে তাঁর
অনুগামীগণ সারা নদীয়া শহর জুড়ে খোল-করতাল সহযোগে, রোজ কীর্ত্তন গাওয়া শুরু করেন। নদীয়ার কাজি তা বন্ধ করার আদেশ দেন। সেই আদেশ শুনে
বিশ্বম্ভর একটি সফল নাগরিক আন্দোলন সংঘটিত করেন এবং কাজির কাছ থেকে কীর্ত্তনের অধিকার আদায় করেন, আজ হতে প্রায় ৫০০ বছরেরও অধিক
সময়কাল পূর্বে। এখানে, বৃন্দাবনদাসের শ্রীচৈতন্যভাগবত থেকে কেবল শ্রীচৈতন্যের প্রতিবাদ ব্যক্ত করা অংশটি এখানে তুলে ধরা হলো। সঙ্কীর্ত্তন-রসোন্মত্ত
শ্রীধরের প্রতি পাষণ্ডীর দুর্ব্বচন। সঙ্কীর্ত্তন শ্রবণে কাজি ও পাষণ্ডীর কোপ। কাজীর ভয়। কীর্ত্তনের বাধ-শ্রবণে শ্রীচৈতন্যের হুঙ্কার ও প্রেমভক্তি-বৃষ্টির প্রতিজ্ঞা।
শুনিঞা কীর্ত্তন আরম্ভিলা মহানৃত্য। আনন্দে বিহ্বল হৈলা চৈতন্যের ভৃত্য॥ দেখিয়া তাহান সুখ নগরিয়াগণ। বেঢ়িয়া চৌদিগে সভে করেন কীর্ত্তন॥ গড়াগড়ি যায়েন শ্রীধর প্রেমরসে। বহির্মুখি-সকল দূরেতে থাকি হাসে’॥ কোন পাপী বোলে “হের্-দেখ ভাই-সব ! খোলাবেচা মুনিসাও হইল বৈষ্ণব॥ পরিধান-বস্ত্র নাহি, পেটে নাহি ভাত। লোকেরে জানায় ‘ভাব হইল আমা’ত’॥” নগরিয়াগুলা বোলে “মাগি খাই মরে। অকালেই দুর্গোৎসব মানিলেক ঘরে॥” এইমত পাষণ্ডীরা বল্গয়ে সদায়। প্রতিদিন নগরিয়াগণ 'কৃষ্ণ' গায়॥ একদিন দৈবে কাজি সেইপথে যায়। মৃদঙ্গ মন্দিরা শঙ্খ শুনিবারে পায়॥ হরিনাম-কোলাহল চতুর্দিগে মাত্র। শুনিঞা স্মঙরে কাজি আপনার শাস্ত্র॥
|
কাজি বোলে "ধরধর আজি করোঁ কার্য্য। আজি বা কি করে তোর নিমাঞি আচার্য্য॥” আথেব্যথে পলাইল নগরিয়াগণ। মহাত্রাসে কেশ কেহো না করে বন্ধন॥ যাহারে পাইল কাজি, মারিল তাহারে। ভাঙ্গিল মৃদঙ্গ, অনাচার কৈল দ্বারে॥ কাজি বোলে “হিন্দুয়ানি হইল নদীয়া। করিমু ইহার শাস্তি নাগালি পাইয়া॥ ক্ষমা করি যাঙ আজি, দৈবে হৈল রাতি। আরদিন লাগি পাইলেই লৈব জাতি॥” এইমত প্রতিদিন দুষ্টগণ লৈয়া॥ নগর ভ্রময়ে কাজি কীর্ত্তন চাহিয়া॥ দুঃখে সব নগরিয়া থাকে লুকাইয়া। হিন্দু-কাজি-সব আরো মারে কদর্থিয়া॥ কেহো বোলে “হরিনাম লৈব মনেমনে। হুড়াহুড়ি বলিয়াছে কেমন পুরাণে॥ লঙ্ঘিলে বেদের বাক্য এই শাস্তি হয়। ‘জাতি’ করিয়াও এ-গুলার নাহি ভয়॥
|
চলচল ভাইসব নগরিয়াগণ ! সর্ব্বত্র আমার আজ্ঞা করহ কথন॥ নিমাঞিপণ্ডিত যে করেন অহঙ্কারে। সব চুর্ণ হইবেক কাজির দুয়ারে॥ নগরেনগরে যে বুলেন নিত্যানন্দ। দেখ তার কোন্ দিন বাহিরায় রঙ॥ উচিত বলিতে হই আমরা 'পাষণ্ড'। ধন্য নর্দীয়ায় এত উপজিল ভণ্ড॥” ভয়ে কেহো কিছু নাহি করে প্রত্যুত্তর। গ্রভুস্থানে গিয়া সভে করিলা গোচর॥ “কাজির ভয়েতে আর না করি কীর্ত্তন। প্রতিদিন বুলে লই সহস্রেক জন॥ নবদ্বীপ ছাড়িয়া যাইব অন্যাস্থানে। গোচরিল এই দুই তোমার চরণে॥” কীর্ত্তনের বাঁধ শুনি প্রভু বিশম্ভর। ক্রোধে হইলেন প্রভু রুদ্র-মূর্ত্তিধর॥ হুঙ্কার করয়ে প্রভু শচীর নন্দন। কর্ণ ধরি ‘হরি’ বোলে নগরিয়াগণ॥ প্রভু বোলে “নিত্যানন্দ ! হও সাবধান। এইক্ষণে চল সর্ব্ব-বৈষ্ণবের স্থান॥ সর্ব্ব-নবদ্বীপে আজি করিমু কীর্ত্তন। দেখোঁ মোরে কোন্ কর্ম্ম করে কোন্ জন॥ দেখ আজি কাজির পোড়াঙ ঘরদ্বার। কোন্ কর্ম্ম করে দেখোঁ রাজা বা তাহার॥ প্রেমভক্তি-বৃষ্টি আজি করিব বিশাল। পাষণ্ডীর গণের হইব আজি কাল॥
|
কৃষ্ণের রহস্য আজি দেখিবেক যেই। একো মহাদীপ লই আসিবেক সেই॥ ভাঙ্গিয়া কাজির ঘর কাজির দুয়ারে। কীর্ত্তন করিমু, দেখোঁ কোন্ কর্ম্ম করে॥ অনন্ত-ব্রহ্মাণ্ড মোর সেবকের দাস। মুঞি বিদ্যমানেও কি ভয়ের প্রকাশ॥ তিলার্দ্ধেকো ভয় কেহো না করিহ মনে। বিকালে আসিবে ঝাট করিয়া ভোজনে॥”
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
|
মনুর প্রজা সৃষ্টি থেকে সতীর দেহত্যাগ কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (ষোড়শ শতক)॥ ১৫৭৯খৃষ্টাব্দে (৯৮৬বঙ্গাব্দ) রচিত, কবির “কবিকঙ্কণ চণ্ডী” গ্রন্থের অংশ-বিশেষ। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত কবি মুকুন্দরাম বিরচিত কবিকঙ্কণ-চণ্ডী, ১ম
ভাগ, থেকে। @ চিহ্নিত পংক্তিগুলি ১৯২৫ সালে (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত, নটবর চক্রবর্তী দ্বারা প্রকাশিত মুকুন্দরাম চক্রবর্ত্তী প্রণীত “কবিকঙ্কণ চণ্ডী” থেকে। @ চিহ্নিত পংক্তিগুলি, প্রথমোক্ত গ্রন্থে “. . ইত্যাদি।” করে মুদ্রিত রয়েছে। তাই আমাদের, কেবল ওই পংক্তিগুলির জন্য ২য় গ্রন্থটির সাহায্য নিতে হয়েছে। এই
অংশে, আজ থেকে প্রায় চার শো বছর পূর্বের বাংলায় (সারা দেশে তথা বিশ্বে বললেও ভুল হবে না) নারী জাতি, সমাজে যে চরম বঞ্চনা-লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য হতেন, তার কিছুটা কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম, "নারীগণের পতিনিন্দা" অধ্যায়ে মূর্ত করে তুলেছিলেন। দেশে নারীদের হয়ে
স্পষ্ট সত্য কথা বলে কবির তৎকালীন সমাজের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদকে, আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে এখানে তুলে ধরলাম।
অথ ভৃগুমুনির যজ্ঞারম্ভ এমন সময়ে ভৃগু বিরিঞ্চি-নন্দন। বৃহস্পতি আনি যজ্ঞ কৈল আরম্ভন॥ চারি বেদে পণ্ডিত অঙ্গিরা যাহে হোতা। সভাসদ হৈল যাহে আপনি বিধাতা॥ দেবগণে নিমন্ত্রণ কৈল ভৃগুমুনি। ঘরে ঘরে বার্ত্তা দেন নারদ আপুনি॥ আইলা দেব চক্রপাণি চাপিয়া গরুড়। বৃষভে চাপিয়া আইল দেব চন্দ্রচূড়॥ মহিষে চাপিয়া আইলা চতুর্দশ যম। হরিণে আইল উনপঞ্চাশ পবন॥ রাশিচক্রে চাপিয়া আইলা গ্রহগণ। রথে দশদিক্পাল কৈল আগমন॥ মরীচি কশ্যপ আদি যত দেবঋষি। যজ্ঞ দেখিবারে সবে হৈলা অভিলাষী॥ কেহো রথে কেহো গজে কেহো তুরঙ্গমে। আইলান দেবঋষি ভৃগু মুনি-ধামে॥ লক্ষ্মী সরস্বতী আদি যত দেবগণ। বিমানে ভূগুর পুরে করিল গমন॥ পাদ্য অর্ঘ্য দিল মুনি বসিতে আসন। মধুপর্ক দিয়া দিল নানা আয়োজন॥ সিদ্ধান্ত করয়ে কেহ কেহ পুর্ব্বপক্ষ। এমন সময়ে তথা আইলা মুনি দক্ষ॥
|
দক্ষকে দেখিয়া সভে করিল উত্থান। বিধি বিষ্ণু হর বিনে করিলা প্রণাম॥ অনত দেখিয়া শিবে দক্ষ কাঁপে রোষে॥ দেবগণে নিবেদয়ে গদগদ ভাষে॥ চণ্ডিকার চরণে মজুক নিজ চিত। @ শ্রীকবিকঙ্কণ গান মধুর সঙ্গীত॥ @
দক্ষের শিবনিন্দা
শুন রে সভার লোক এ বড় দারুণ শোক এই শিব আমার জামাতা। আসি আমি মখ-স্থান না করে আমার মান মোরে নতি না করিল মাথা॥ নারদে বলিব কি তব বাক্যে দিনু ঝি হেনই ভাঙ্গড় মতি পাপে। ত্রিভুবনে এক ধন্যা অপাত্রে দিলাম কন্যা তনু শুখাইল পরিতাপে॥ নাহি জানি আদি মূল কিবা জাতি কিবা কুল নাহি জানি কেবা মাতাপিতা। আমি ছার মন্দমতি অনলে ফেলিনু সতি সভামাঝে লাজে হেট মাথা॥
|
অঙ্গরাগ চিতা-ধূলি কান্ধেতে ভাঙ্গের ঝুলি বিষধর উত্তরি-বসন। হেন অমঙ্গল ধাম শিব থুইলা কেবা নাম দেব বুদ্ধি করে কোনজন॥ চাহিতে চাহিতে ভাল কুল মোর হইল কাল মোরে বাম হইল বিধাতা। ভূষণ হাড়ের মালা শ্মশানে বিনোদশালা হেন জন আমার জামাতা॥ যক্ষ রক্ষ প্রেত ভূত বসতি যাহার যূথ সহযোগ শয়ন-ভোজনে। জাতির নাহিক স্থিতি হেন জন সতীপতি দেবকুলে কেবল গঞ্জনে॥ সতী ঝিয়ে গুণনিধি তারে বিড়ম্বিলা বিধি পতি সে দরিদ্র দিগন্বর। কুলে হইল বড় দোষ মনে নাহি পরিতোষ অপযশ গেলা দিগন্তর॥ শ্বশুর যেমন তাত তারে না জুড়িল হাত সভা মাঝ কৈল অপমান। নহে লোকে অনুরাগ ঘুচুক যজ্ঞে ভাগ বেদ-পথে নয় অবধান॥ মহামিশ্র জগন্নাথ হৃদয় মিশ্রের তাত কবিচন্দ্র হৃদয়-নন্দন। তাহার অনুজ ভাই চণ্ডীর আদেশ পাই বিরচিল শ্রীকবিকক্কণ॥
|
অঙ্গরাগ চিতা-ধূলি কান্ধেতে ভাঙ্গের ঝুলি বিষধর উত্তরি-বসন। হেন অমঙ্গল ধাম শিব থুইলা কেবা নাম দেব বুদ্ধি করে কোনজন॥ চাহিতে চাহিতে ভাল কুল মোর হইল কাল মোরে বাম হইল বিধাতা। ভূষণ হাড়ের মালা শ্মশানে বিনোদশালা হেন জন আমার জামাতা॥ যক্ষ রক্ষ প্রেত ভূত বসতি যাহার যূথ সহযোগ শয়ন-ভোজনে। জাতির নাহিক স্থিতি হেন জন সতীপতি দেবকুলে কেবল গঞ্জনে॥ সতী ঝিয়ে গুণনিধি তারে বিড়ম্বিলা বিধি পতি সে দরিদ্র দিগন্বর। কুলে হইল বড় দোষ মনে নাহি পরিতোষ অপযশ গেলা দিগন্তর॥ শ্বশুর যেমন তাত তারে না জুড়িল হাত সভা মাঝ কৈল অপমান। নহে লোকে অনুরাগ ঘুচুক যজ্ঞে ভাগ বেদ-পথে নয় অবধান॥ মহামিশ্র জগন্নাথ হৃদয় মিশ্রের তাত কবিচন্দ্র হৃদয়-নন্দন। তাহার অনুজ ভাই চণ্ডীর আদেশ পাই বিরচিল শ্রীকবিকক্কণ॥
|
দক্ষের প্রতি নন্দীর শাপ এমন শুনিয়া নন্দী দক্ষের বচন। কম্পমান তন্তু হইল লোহিত লোচন॥ দক্ষে শাপ দিতে নন্দী জল নিল হাতে। নাহি হবে দক্ষ তোর গতি মুক্তিপথে॥ মহাদেবে যেই মুখে বল কুবচন। অচিরাতে হবে তোর ছাগল-বদন॥ পরস্পর দুইজনে হইল প্রতিকূল। জামাতা-শ্বশুরে হইল ভুজঙ্গ-নকুল॥ জামাতা শ্বশুরে দ্বন্দ্ব হৈল বহুকাল। দক্ষের হৃদয়ে শোক বাড়িল বিশাল॥ বিমনা হইযা শিব চলিলা কৈলাস। দক্ষ প্রজাপতি গেলা আপনার বাস॥ কতকালে কৈল ব্রহ্মা দক্ষেব সম্মান। সকল পুত্রের মাঝে করিল প্রধান॥ ব্রাহ্মণেরে প্রজা বলি ধরাইল ছাতা। প্রসাদ করিল তারে কনক পইতা॥ ব্রাহ্মণে পালিতে বুদ্ধি তারে দিল বিধি। এহ হইতে হইলা ওঝা কুলের পালধি॥ ব্রহ্মার প্রসাদে দক্ষের হইল মহাদম্ভ। বৃহস্পতি আনি যজ্ঞ করিল আরম্ত॥ নিমন্ত্রণ দিল দক্ষ সুর-নাগ-নরে। কহিল নারদ মুনি সবাকার ঘরে॥
|
দক্ষ প্রজাপতি নাথ তোমার শ্বশুর। তার যজ্ঞে তিন লোক চলিলা প্রচুর॥ তুমি আজ্ঞা দিলে আমি যাই পিতৃবাস। বাপের উৎসব দেখি বড় অভিলাষ॥ শুনিয়া ঈষৎ হাসি বলেন শঙ্কর। হেন বাক্য অনুচিত কি দিব উত্তর॥ বিনা নিমন্ত্রণে গেলে হবে মাথাকাটা। আমার প্রসঙ্গে তুমি পাবে বড় খোঁটা॥ বিনি নিমন্ত্রণে যাব বাপের সদন। ইথে দোষ নাহি নাথ লোকের গঞ্জন॥ এমন বলিয়া ধরে শিবের চরণ। নয়নে নিকলে জল গদ্গদ বচন॥ অভরার চরণে মজুক নিজ চিত। শ্রীকবিকঙ্কণ গান মধুর সঙ্গীত॥
শিবের নিকট গৌরীর প্রার্থনা অনুমতি দেহ হর যাইব বাপের ঘর যজ্ঞমহোৎসব দেখিবারে। ত্রিভুবনে বত বৈসে চলিল বাপের বাসে তনয়া কেমনে প্রাণ ধরে॥ চরণে ধরিয়া সাধি কৃপা কর কপানিধি যাব পঞ্চ দিবসের তরে। চিরদিন আছে আশ যাইব বাপের পাশ নিবেদন নাহি করি ডরে॥ সুমঙ্গল সূত্র করে আইনু তোমার ঘরে পুর্ণ বংসর হইল সাত। দুর কর অপরাধ পুরহ মনের সাধ
|
মায়ের রন্ধনে খাব ভাত॥ পর্ব্বতকন্দরে বসি নাহি পাট-পড়সী সীমন্তে সিন্দুর দিতে সখী। একদিন কোথা যাই যুড়াইতে নাহি ঠাঁই বিধি মোরে কৈল জন্মদুঃখী॥ পিতা বড় পুণ্যবান করিবে অনেক দান কন্যাগণে করিবে ব্যভার। অলঙ্কার পরিধান আগে আমি পাব মান অন্যবুদ্ধি নাহিক বাবার॥ শুনিয়া সতীর বাণী কহিলেন শূলপাণি শুন প্রিয়া আমার বচন। বাপঘরে যাবে যবে ভাল ত নহিবে তবে তাহে তুমি ত্যজিবে জীবন॥ মহামিশ্র জগন্নাথ হৃদয়মিশ্রের তাত কবিচন্দ্র হৃদয়নন্দন। @ তাঁহার অনুজ ভাই চণ্ডীর আদেশ পাই বিরচিল শ্রীকবিকঙ্কণ॥ @
গৌরীর দক্ষালয়ে গমন
যাইবারে অনুমতি নাহি দিল পশুপতি দাক্ষায়ণী হইলা কোপবতী। সক্রোধে হইয়া বামা চলিলা ভ্রকুটি-ভীমা একাকিনা বাপের বসতি॥ হইয়া উন্মত্ত-বেশা যান দেবী মুক্তকেশা না শুনিয়া শিবের বচন। শিবের ইঙ্গিত পায়া পাছে নন্দী যান ধায়্যা
|
বৃষভের করিয়া সাজন॥ সাড়িকা কুণ্ডল পেড়ি পাছে নিয়া যায় চেড়ি কেহ লয় বিউনী দর্পণ। পূরিয়া সুগন্ধি বারি কেহ লইয়া যায় ঝারি শ্বেতছত্র ধরে কোন জন॥ চলিলা অনেক সেনা সঙ্গে প্রেত-ভূত-দানা নেকাচোকা দুই সেনাপতি। আগে পাছে দানা ধায় রাঙ্গা ধূলা মাথে গায় দেখি হরষিতা হৈল সতী॥ বৃষ যোগাইলা নন্দী চাপিয়া চলিলা চণ্ডী শিরে ছত্র নন্দী সে ধরান। না জানি চলিলা কত তিন দিবসের পথ দু'পহরে করিল পয়ান॥ পাইলে বাপের গ্রাম শুনিয়ারা সতীর নাম প্রসূতি ধাইল বেগবতী। কোলেতে করিয়া সতী প্রসূতি পুলক অতি কৈল সতী মায়েরে প্রণতি॥ আনিয়া আপন ঘরে প্রসূতি দিলেন তারে পাদ্য-অর্ঘ্য বসিতে আসন। যতেক বহিনগণ সবে কৈল আলিঙ্গন ঘরের কুশল জিজ্ঞাসন॥ জননী ভগিনী সঙ্গে ক্ষণেক থাকিয়া রঙ্গে যান দেবী যজ্ঞের সদন। রচিয়া প্রিপদী ছন্দ পাঁচালী করিয়া বন্ধ বিরচিল শ্রীকবিকঙ্কণ॥
|
দক্ষের প্রতি গৌরীর নিবেদন জননী ভগিনী সঙ্গে করি সম্ভাষণ। সত্বরে চলিলা মাতা যজ্ঞের সদন॥ দক্ষের চরণে চণ্ডী করিল প্রণতি। হেটমুখে আশীর্ব্বাদ কৈল প্রজাপতি॥ আইয়াতে যাউক কাল ঘুচুক দুর্গতি। চিরজীবী হউক স্বামী সুস্থির সুমতি॥ না দেখিয়া যজ্ঞে দেবী শিবের পুজন। কোপে কম্পবান তনু বাপে জিজ্ঞাসন॥ শুন বাপা তোমারে করি যে অভিমান। সতী ঝিয়ে কেন তুমি টুটাইলে মান॥ ধর্ম্ম আদি তোমার যতেক বন্ধুজন। সবারে আসিতে যজ্ঞে দিলে নিমন্ত্রণ॥ শিবে নিমন্ত্রণ বাপা নাহি দিলে কেনে। সম্পদে মাতিয়া বুঝি না দেখ নয়নে॥ ব্রহ্মা যাঁর বাঞ্ছিত করেন পদধূলি। ইন্দ্র আদি দেব যাঁরে করে পুটাঞ্জলি॥ অন্য জামাতারে দিলে বস্ত্র অলঙ্কার। শিব পরে ভাল নহে তোমার বেভার॥ দুষ্টদৈব গ্রহ ফলে আমি তোমার ঝি। না করিলে ভাল কর্ম্ম নিবেদিব কি॥ এমন শুনিয়া দক্ষ সতীর বচন। বলেন সক্রোধ বাণী শুনে সর্বজন॥ অভয়া-চরণে প্রণাম লক্ষ লক্ষ। @ অনুক্ষণ রহু মন কায়-মনো-বাক্য॥ @
|
দক্ষের শিবনিন্দা
কহিতে উচিত কথা মনে পাচ্ছে পাও ব্যথা যেবা ছিল কপালে লিখন। তোমার কর্ম্মের গতি পতি হইল বাম-পথী তারে যজ্ঞে আনি কি কারণ॥ পরিধান বাঘছাল গলায় হাড়ের মাল বিভূতিভূষণ শোভে অঙ্গে। শ্মশানে যাহার স্থান কেবা তার করে মান প্রেত-ভূত চলে যার সঙ্গে॥ আরোহণ বৃষবরে শিঙ্গা-ডন্বরু করে ভক্ষ্যদ্রব্য ধুতুরার ফল। ভাঙ্গে বড় অভিলাষ ভূজঙ্গ উত্তরী-বাস ফনী হার ফণীর কুণ্ডল॥ তোমার কর্মের ফল পতি হইল পাগল দেড়ি অন্ন নাহি থাকে বাসে। অনুচিত কর্ম্ম তার মাথাতে জটার ভার দেখি যত দেবগণ হাসে॥ আরাধিয়া পশুপতি পাইলে পশুর গতি অহিসঙ্গে একত্রে শয়নে। হরশিরে শশিকলা অহি সঙ্গে যার মেলা দুই জন বঞ্চিত ভুবনে॥ আমি ত ব্রহ্মার সুত ত্রিভূবনে সুবিদিত মোরে তার শুন ব্যবহার। ভৃগুর যজ্ঞের স্থানে দেবগণ বিদ্যমানে মোরে না করিল নমস্কার॥
|
শুন ঝিগো মোর বাণী যজ্ঞে যদি শিবে আনি অবশ্য হইবে যজ্ঞনাশ। দেখিয়া শিবের গুণ আর যত দেবগণ এক স্থানে নাহি করে বাস॥ এমন দক্ষের কথা শুনিয়া ভুবন-মাতা ক্রোধমুখে বলেন উত্তর। রচিয়া ত্রিপদী ছন্দ পাঁচালী করিয়া বন্ধ গাইল মুকুন্দ কবিবর॥ সতীর দেহত্যাগ অণিমাদি করিয়া যাহার অষ্টসিদ্ধি। যাহার চরণ-রজঃ বাঞ্ছা করে বিধি॥ পিনাক ধনুক যার অনন্ত শিঞ্জিনী। যাহাতে হইলা শব দেবচক্রপাণি॥ সমুদ্র-মন্থনে ঘোর উঠিল গরল। তিন লোক দহে যেন প্রলয়-অনল॥ হেন বিষ পিয়ে শিব রাখিল জগৎ। সম্পদে মাতিয়া মুঢ় না জান মহৎ॥ চরণ-নিছনী যার চরণে রজ। দুর্লভ জানিয়া যার বাঞ্ছা কারে অজ॥ সহস্র কমলে হরে পূজা করে হরি। একটি কমল তাঁর শিব কৈল চুরি॥ মন্ত্র আছে পুষ্প নাহি ভাবে গদধর। ডানি চক্ষু দিল নিয়া শিবের উপর॥ কপালে ধরিয়া চক্ষু হৈল ত্রিলোচন। কমল-নয়ন হৈলা দেব নারায়ণ॥ দেব নাগ নরে শিবে করয়ে পূজন। তোমা বিনা দ্বেষভাব করে কোন্ জন॥
|
লোক-রিপু এিপুর দহন কৈল হর। কি কারণে হেন জনে বল কটূত্তর॥ শিবনিন্দা-শ্রবণে কবিব প্রতিকার। তোমার অঙ্গজ তনু না রাখিব আর॥ গুরুজন-নিন্দা শুনি আচ্ছাদি শ্রবণ। যেই নিন্দা করে তার করিয়ে শাসন॥ সেই স্থান ছাড়ি কিংবা যাই অন্য স্থান। পাপ-প্রতিকার-হেতু তেজিয়া পরাণ॥ হৃদয়-সরোজে চিন্তি শিবের চরণ। দৃঢ় করি মহামায়া পরিলা বসন॥ যোগেতে তেজিলা তনু জগতের মাতা। মুকুন্দ রচিল গৌরী-মঙ্গলের গাথা॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
@ চিহ্নিত পংক্তিগুলি ১৯২৫ সালে (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত, নটবর চক্রবর্তী দ্বারা প্রকাশিত মুকুন্দরাম চক্রবর্ত্তী প্রণীত “কবিকঙ্কণ চণ্ডী” থেকে। @ চিহ্নিত পংক্তিগুলি, প্রথমোক্ত গ্রন্থে “ . . ইত্যাদি।” করে মুদ্রিত রয়েছে। তাই আমাদের, কেবল ওই পংক্তিগুলির জন্য ২য় গ্রন্থটির সাহায্য নিতে হয়েছে।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
|
নারীগণের পতিনিন্দা
কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। ১৫৭৯খৃষ্টাব্দে (৯৮৬বঙ্গাব্দ) রচিত, কবির “কবিকঙ্কণ চণ্ডী” গ্রন্থের অংশ-বিশেষ। নারী জাতি, সমাজে যে চরম বঞ্চনা-
লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য হতেন, তার কিছুটা কবিকঙ্কণ, "নারীগণের পতিনিন্দা" অধ্যায়ে মূর্ত করে তুলেছিলেন। দেশে
নারীদের হয়ে স্পষ্ট সত্য কথা বলে কবি তৎকালীন সমাজের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ করেছিলেন তা আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে এখানে তুলে ধরলাম। কলিকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত কবি মুকুন্দরাম বিরচিত কবিকঙ্কণ-চণ্ডী, ১ম ভাগ, থেকে।
অন্ধমুনির মত মোর গেল সর্ব্বকাল। জলপাত্র বল্যা কানা তুল্যাছে বিড়াল॥ আর যুবতী বলে সখি মোর পতি কালা। আনের হইল্য ঘরকন্না মোরে হইল্য জ্বালা॥ দিনে ঠারে-ঠোরে কহি কথা পতির সনে। রাত্রি হইলে নিদ্রা যাই গরুড়-শয়নে॥ রন্ধনের তরে আমি যদি চাহি জল। দড়ি ধব়্যা এন্যে দেয় কালা মোরে ছাগল॥ আর যুবতী বলে সখি মোর কথা বুঝ। অভাগিয়া পতি মোর পিঠে বড় কুজ॥ চিৎ হয়্যা শুতে নারে কুজের প্রকারে। খুঁড়িয়া রেখ্যাছি খন্দ মেঝের ভিতরে॥ আর সখী বলে মোর বাঘুড়িয়া স্বামী। তার পেট পানে চেয়্যা মব়্যা থাকি আমি॥ পোয়ের পো হইয়াছে নাতির হইয়াছে ঝি। প্রয়োগ তেলে চুল পাকিছে বয়স বটে কি॥
|
নারীগণের পতিনিন্দা বিদ্যাসুন্দর, অন্নদামঙ্গল কাব্য (২য় খণ্ড)। কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র (১৭১২ - ১৭৬০)। বিদ্যাসুন্দর কাব্যের এই
অংশে, আজ থেকে তিন শো বছর পূর্বের বাংলায় (সারা দেশে তথা বিশ্বে বললেও ভুল হবে না) নারী জাতি, সমাজে যে চরম বঞ্চনা-লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে জীবন
অতিবাহিত করতে বাধ্য হতেন, তার কিছুটা কবি ভারতচন্দ্র, "নারীগণের পতিনিন্দা" অধ্যায়ে মূর্ত করে তুলেছিলেন। দেশে নারীদের হয়ে স্পষ্ট সত্য কথা বলে কবি
তৎকালীন সমাজের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ করেছিলেন তা আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে এখানে তুলে ধরলাম। কবি ভারতচন্দ্রের মাত্র ৪৮ বছরের জীবনের ২৫টি বছর কারারুদ্ধ
অবস্থায় থাকতে হয়েছিল, ১৭ থেকে ৪২ বছর বয়স পর্যন্ত, বিনা অপরাধে। তাই তাঁর মাত্র ৬ বছরের প্রকৃত রচনাকালের সম্ভার নিঃসন্দেহে আমাদের বিস্মিত করে।
কারে কব লো যে দুখ আমার। সে কেমনে রবে ঘরে এত জ্বালা যার॥ বাঁদা আছি কুলফাঁদে পরাণ সতত কাঁদে না দেখিয়া শ্যামচাঁদে দিবসে আঁধার। ঘরে গুরু দুরাশয় সদা কলঙ্কিনী কয় পাপ ননদিনী ভয় কত সব আর॥ শ্যম অখিলের পতি তারে বলে উপপতি পোড়া লোক পাপমতি না বুঝে বিচার। পতি সে পুরুষাধম শ্যাম সে পুরুষোত্তম ভারতের সে নিয়ম কৃষ্ণচন্দ্র সার॥
চোর দেখি রামাগণ বলে হরি হরি। আহা মরি চোরের বালাই লয়ে মরি॥ কিবা বুক কিবা মুখ কিবা নাক কান। কিবা নয়নের ঠার কাড়ি লয় প্রাণ॥ ভূষণ লয়েছে কাড়ি হাতে পায় দড়ি। কেমনে এমন গায়ে মারিয়াছে ছড়ি॥ দেখ দেখ কোটালিয়া করিছে প্রহার। হায় বিধি চাঁদে কৈল রাহুর আহার॥ এ বড় বিষম চোর না দেখি এমন। দিনে কোটালের কাছে চুরি করে মন॥
|
বিদ্যারে করিয়া চুরি এ হইল চোরা। ইহারে যদ্য়পি পাই চুরি করি মোরা॥ দেখিয়া ইহার রূপ ঘরে যেতে নারি। মনোমত পতি নহে সহিতে না পারি॥ আপন আপন পতি নিন্দিয়া নিন্দিয়া। পরস্পর কহে সবে কান্দিয়া কান্দিয়া॥ এক রামা বলে সই শুন মোর দুখ। আমারে মিলিল পতি কালা কালামুখ॥ সাধ করি শিখিলাম কাব্যরস যত। কালার কপালে পড়ি সব হৈল হত॥ বুঝাই চোরের মত চুপ করি ঠারে। আলোতে কিঞ্চিৎ ভাল প্রমাদ আঁধারে॥ নৈলে নয় তেঁই করি কষ্টেতে শয়ন। রোগী যেন নিম খায় মুদিয়া নয়ন॥ আর রামা বলে সই এ ত বরং সুখ। মোর দুখ শুনিলে পলাবে তোর দুখ॥ মন্দভাগা অন্ধ পতি দ্বন্দ্বে মাত্র ভাল। গোরা ছিনু ভাবিতে ভাবিতে হৈনু কাল॥ ভরা পূরা যৌবন উদাসে বাসি শূন্য। আঁধলারে দেখাইলে নাহি পাপ পূণ্য॥
|
বিদ্যারে করিয়া চুরি এ হইল চোরা। ইহারে যদ্য়পি পাই চুরি করি মোরা॥ দেখিয়া ইহার রূপ ঘরে যেতে নারি। মনোমত পতি নহে সহিতে না পারি॥ আপন আপন পতি নিন্দিয়া নিন্দিয়া। পরস্পর কহে সবে কান্দিয়া কান্দিয়া॥ এক রামা বলে সই শুন মোর দুখ। আমারে মিলিল পতি কালা কালামুখ॥ সাধ করি শিখিলাম কাব্যরস যত। কালার কপালে পড়ি সব হৈল হত॥ বুঝাই চোরের মত চুপ করি ঠারে। আলোতে কিঞ্চিৎ ভাল প্রমাদ আঁধারে॥ নৈলে নয় তেঁই করি কষ্টেতে শয়ন। রোগী যেন নিম খায় মুদিয়া নয়ন॥ আর রামা বলে সই এ ত বরং সুখ। মোর দুখ শুনিলে পলাবে তোর দুখ॥ মন্দভাগা অন্ধ পতি দ্বন্দ্বে মাত্র ভাল। গোরা ছিনু ভাবিতে ভাবিতে হৈনু কাল॥ ভরা পূরা যৌবন উদাসে বাসি শূন্য। আঁধলারে দেখাইলে নাহি পাপ পূণ্য॥ আর রামা বলে সই এ মাথার চূড়া। আমি এই যুবতী আমার পতি বুড়া॥ বদনে রদন লড়ে অদনে বঞ্চিত। সে মুখচুম্বনে সুখ না হয় কিঞ্চিত॥ আমার আবেশ দৈবে কোন কালে নয়। ধর্ম্ম ভাবি তাহার আবেশ যদি হয়॥ ঝাঁপনি কাঁপনি সারা কেবল উত্পাত।
|
অধর দংশিতে চায় ভেঙ্গে যায় দাঁত॥ গড়াগড়ি যায় বুড়া দাঁতের জ্বালায়। কাজের মাথায় বাজ বাঁচাইতে দায়॥ আর রামা বলে বুড়া মাথার ঠাকুর। মোর দুঃখ শুনি তোর দুঃখ যাবে দূর॥ কি কব পতির কথা লাজে মাথা হেঁট। মোটা সোটা মোর পতি বড় ভুড়ো পেট॥ অন্যের শুনিয়া সুখ দুঃখে পোড়ে মন। একেবারে নহে কভু চুম্ব আলিঙ্গন॥ বদনে চুম্বিতে চাহে আরম্ভিয়া হেটে। আঁটিয়া ধরিতে চাহে ঠেলে ফেলে পেটে॥ একে আরম্ভিতে হয় আরে অবসর। ইতো ভ্রষ্টস্তুতো নষ্ট ন পূর্ব্ব ন পর॥ আর রামা বলে ইথে না বলিও মন্দ। না চাপিতে চাপ পাও এ বড় আনন্দ॥ বামন বঙ্খুর পতি কৈতে লাজ পায়। তপাসিয়া নাহি পাই কোলেতে লুকায়॥ তাপেতে হইনু জরা না পূরিল সাধ। হাত ছোট আম বড় এ বড় প্রমাদ॥ আর রামা বলে সই না ভাবিহ দুখ। কোলশোভা হয়ে থাকে এহ বড় সুখ॥ রাজসভাসদ পতি বৈদ্যবৃত্তি করে। ভোজনের কালে মাত্র দেখা পাই ঘরে॥ নাড়ী ধরি স্থানে স্থানে করয়ে ভ্রমণ। আমি কাঁপি কামজ্বরে সে বলে উল্বণ॥ চতুর্ম্মুখ খাইতে বলে শুনে দুঃখ পায়।
|
বজ্জর পড়ুক চতুর্ম্মুখের মাথায়॥ আর রামা বলে সই কিছু ভাল বটে। নাড়ী ধরিবার বেলা হাতে ধরা ঘটে॥ রাজসভাসদ পতি ব্রাহ্মণপণ্ডিত। না ছোঁয় তরুণী তৈল আমিষে বঞ্চিত॥ ঋতু হৈলে৭ একবার সম্ভবে সম্ভাষ। তাহে যদি পর্ব্ব হয় তবে সর্ব্বনাশ॥ আর রামা বলে হৌক তথাপি পণ্ডিত। বরমেকাহুতিঃ কালে না করে বঞ্চিত॥ অবিজ্ঞ সর্ব্বজ্ঞ পতি গণক রাজার। বারবেলা কালবেলা সদা সঙ্গে তার॥ পাপরাশি পাপগ্রহ পাপতিথি তারা। অভাগারে এক দিন না ছাড়িবে পারা॥ সর্ব্বদা আঙ্গুল পাঁজি করি কাল কাটে। তাহাতে কি হয় মোর কৈতে বুক ফাটে॥ আর রামা বলে মন্দ না বলিহ তায়। পাইলে উত্তম ক্ষণ অবশ্য যোগায়॥ পাঁতিলেখা রাজার মুনশী মোর পতি। দোয়াতে কলম দিয়া বলে হৈল রতি॥ কেটে ফেলে পাঠ যদি দেখে তকরার। দোকর করিবে কাজ বালাই তাহার॥ আর রামা বলে সই ভাল ত মুনশী। বখশী আমার পতি সদাই খুনশী॥ কিঞ্চিত কশুর নাহি কশুর কাটিতে। বেহিসাবে এক বিন্দু না পারি লইতে॥
|
পরের হাজির গরহাজির লিখিতে। ঘরে গরহাজিরী সে না পায় দেখিতে॥ ফেরেব ফিকিরে ফেরে ফাঁকি ফুঁকি লেখে। কেবল আমার গুণে পুত্রমুখ দেখে॥ আর রামা বলে সই এ ত বড় গুণ। উকীল আমার পতি কিল খেতে দড়॥ স্ত্রীলোকের মত পড়ে মারি খেতে পারে। সবে গুণ যত দোষ মিথ্যা কয়ে সারে॥ আর রামা বলে সই এ ত ভাল শুনি। আমার৮ আরজবেগী পতি বড়৯ গুণী॥ আরজীর আটি ফরিয়াদিগণ সঙ্গে। বাথানিয়া গাই মত ফিরে অঙ্গভঙ্গে॥ আমি ফরিয়াদী ফরিয়াদীর মিশালে। করিতে না পারে নিশা টালে টোলে টালে॥ আর রামা বলে সই এ বুঝি উত্তম। খাজাঞ্চি আমার পতি সবারই অধম॥ চাঁদমুখা টাকা দেই সোনামুখে লয়ে। গণি দিতে ছাইমুখো অধোমুখ হয়॥ পরধন পরে দিতে যার এই হাল। তার ঠাঁই পানিফোঁটা পাইতে জঞ্জাল॥ কহে আর রসবতী গালভরা পান। পোদ্দার আমার পতি কৃপণপ্রধান॥ কোলে নিধি খরচ করিতে হয় খুন। চিনির বলদ সবে একখানি গুণ॥ আমারে ভুলায়ে লোক রাঙ্গ তামা দিয়া।
|
সে দেই তাহার শোধ হাত বদলিয়া॥ আর রামা বলে সই এ বড় সুধীর। অভাগীর পতি হিসাবের মুহুরীর॥ শেষ রাতে আসে সারা রাতি লিখে পড়ে। খায়াইতে জাগাইতে হয় দিয়া কড়ে॥ গোঁজা বিদ্যা না জানে হিসাবে দেই গোঁজা। নিকাশে তাহার গোঁজা তারে হয় গোঁজা॥ আর রামা সই এ বট্ গভীর। অভাগীর পতি নিকাশের মুহুরীর॥ মফঃসল সরবরা কেমন না জানে। অধিক যে দেখে তাহা রদ দিয়া টানে॥ জমা লেখে বাকী দেখে খরচেতে ভয়। পরে কৈলে খরচ তাহারে কটু কয়॥ আর রামা বলে সই এ বড় রসিক। অভাগীর পতি বাজেজমার মালিক॥ যম সম ধরিতে পরের বাজেজমা। নিজ ঘরে বাজেজমা না জানে অধমা॥ সবে তার এক গুণে প্রাণ ঝুরে মরে। বঁধু এলে তার ডরে কেহ নাহি ধরে॥ আর রামা বলে সই এ ত বড় গুণ। দপ্তরী আমার পতি তার গতি শুন॥ সদা ভাবে কোন ফর্দ্দ কেমনে গড়ায়। পড়াভাগ্য নিজে নাহি অন্যেরে পড়ায়॥ হেটে ফর্দ্দ হারায়ে উপরে হাতড়ায়। পরের কলমে সদা দোয়াতী যোগায়॥
|
আর রামা বলে সই এ ত শুনি ভাল। ঘড়েল পতির জ্বালে আমি হইনু কাল॥ রাত্রি দিন আট পর ঘড়ি পিটে মরে। তার ঘড়ি কে বাজায় তল্লাস না করে॥ রাতি নাহি পোহাইতে দুঘড়ি বাজায়। আপনি না পারে আরো বন্ধুরে খেদায়॥ আর রামা বলে আমি কুলীনের মেয়ে। যৌবন বহিয়া গেল বর চেয়ে চেয়ে॥ যদি বা হইল বিয়া কত দিন বই। বয়স বুঝিলে তার বড় দিদি হই॥ বিয়াকালে পণ্ডিতে পণ্ডিতে বাদ লাগে। পুনর্ব্বিয়া হবে কিবা বিয়া হবে আগে॥ বিবাহ করেছে সেটা কিছু ঘাটি ষাটি। জাতির যেমন হৌক কুলে বড় আঁটি॥ দুচারি বত্সরে যদি আসে একবার। শয়ন করিয়া বলে কি দিবি ব্যভার॥ সূতাবেচা কড়ি যদি দিতে পারি তায়। তবে মিষ্টমুখ নহে রুষ্ট হয়ে যায়॥ তা সবার দুঃখ শুনি কহে এক সতী। অপূর্ব্ব আমার দুঃখ কর অবগতি॥ মহাকবি মোর পতি কত রস জানে। কহিলে বিরস কথা সরস বাখানে॥ পেটে অন্ন হেটে বস্ত্র যোগাইতে নারে। চালে খড় বাড়ে মাটি শ্লেক পড়ি সারে॥
|
গড় বর্ণন কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র (১৭১২ - ১৭৬০)। বিদ্যাসুন্দর, অন্নদামঙ্গল কাব্য (২য় খণ্ড)। কবি ভারতচন্দ্রের মাত্র ৪৮ বছরের জীবনের ২৫টি বছর কারারুদ্ধ অবস্থায় থাকতে
হয়েছিল, ১৭ থেকে ৪২ বছর বয়স পর্যন্ত, বিনা অপরাধে। তাই তাঁর মাত্র ৬ বছরের প্রকৃত রচনাকালের সম্ভার নিঃসন্দেহে আমাদের বিস্মিত করে। কাব্যের এই অংশে কবি বর্দ্ধমান শহরের
কোতোয়ালি চক এর বর্ণনা করেছেন। সেখানে কয়েদিদের অবস্থাও উল্লেখ করেছেন, অনেক রেখে-ঢেকে, যা তিনি নিজের জীবনের ২৫ বছর ধরে ভোগ করেছিলেন, কারণ বর্দ্ধমান ও কৃষ্ণনগরের
রাজ-পরিবারের মধ্যে যেন কোনো ঝামেলা না বাঁধে। সেই যুগের এই কবিতাটি, একটি চরম প্রতিবাদী কবিতা হিসেবে আমরা স্বীকার করতে বাধ্য হলাম। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে ১৯৪৩
(ভাদ্র ১৩৫০) তে প্রকাশিত, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাস সম্পাদিত, কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল (২য় খণ্ড) বিদ্যাসুন্দর কাব্য থেকে নেওয়া।
দ্বিতীয় গড়ে দেখে যত মুসলমান। সৈয়দ মল্লিক সেখ মোগল পাঠান॥ তুরকী আরবী পড়ে ফারসী মিশালে। ইলিমিলি জপে সদা ছিলিমিলি মালে॥ তৃতীয় গড়েতে দেখে ক্ষত্রিয় সকল। অস্ত্রশাস্ত্রে বিশারদ সমরে অটল॥ চতুর্থ গড়েতে দেখে যত রজপুত। রাজার পালঙ্ক রাখে যুদ্ধে মজবুত॥ পঞ্চম গড়েতে দেখে যতেক রাহুত। ভাট বৈসে তার কাছে যাতায়াতে দূত॥ যষ্ঠ গড়ে দেখে যত বোঁদেলার থানা। আঁটাআঁটি সেউ গড়ে থাকে মালখানা॥ সেই গড়ে নানা জাতি বৈসে মহাজন।২ লক্ষ কোট্ পদ্ম শঙ্খে সঙ্খ্যা করে ধন॥ পড়ুয়া জানি কিছু না কহে সুন্দরে। অবধান হৌক বলি নমস্কার করে॥ এইরূপে ছয় গড় সকল দেখিয়া। প্রবেশে ভিতর গড় অভয়া ভাবিয়া॥৩
|
সমুখে দেখেন চক চান্দনী সুন্দর।৪ নৌবত বাজিছে মালখানার উপর॥ চকের মাঝেতে কোতোয়ালি চবুতরা। ফাটকে আটক যত বাজে দায় ধরা॥ ডাকাতি ছিনার চোর হাজার হাজার। বেড়ী পায় মেগে খায় বাজার বাজার॥ বসিছে কোতোয়াল ধূমকেতু নাম। যমালয়সমান লেছে ধুমধাম॥ ঠকঠকি হাড়ির কোড়ার পটপটি। চর্ম্ম উড়ে চর্ম্মপাদুকার চটচটি॥ কেহ বা দোহাই দেয় কেহ বলে হায়। কেহ বলে বাপ বাপ মরি প্রাণ যায়॥ কোটালের ভয়ে কেহ নাহি করে দয়া। ৫ (টীকায় অবশ্য পড়ুন) দেখিয়া সুন্দর ভয়ে ভাবেন অভয়া॥ ৬ (টীকায় অবশ্য পড়ুন) ভারত কহিছে কেন ভাবহ এখনি। ঠেকিবা যখন সুখ৭ জানিবা তখনি॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
|
টীকা - ১ - পুথি১, পুথি৪, গ --- দিব্য॥ ২ - পুথি১ --- সেই গড়ে বৈসে দেখে যত মহাজন॥ ৩ - পুথি২ --- প্রবেশে ভিতর গড় কালিকা স্মরিয়া। পুথি৩ --- প্রবেশে ভিতর গড়ে ভবানী ভাবিয়া।
৪ - পুথি১, পুথি৩ --- সমুখেতে দেখে চক চান্দনী সুন্দর। ৫ - পুথি১, পুথি৩ --- ছাতি ফাটে তৃষায় না দেয় কেহ পানি। ৬ - পুথি১ --- দেখিয়া সুন্দর রায় ভাবেন ভবানী। ৭ - পুথি২, পী --- দায়
হরগৌরীর কন্দল
কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র (১৭১২ - ১৭৬০)। অন্নদামঙ্গল কাব্য (১ম খণ্ড)। এখানে হর-গৌরীকে প্রায় মানব-মানবী রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং একজন হতদরিদ্র,
উদাসীন, নেশাখোর পতির, পত্নীর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখানো হয়েছে। ভারতচন্দ্রের মাত্র ৪৮ বছরের জীবনের ২৫টি বছর কারারুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয়েছিল, ১৭
থেকে ৪২ বছর বয়স পর্যন্ত, বিনা অপরাধে। তাই তাঁর মাত্র ৬ বছরের প্রকৃত রচনাকালের সম্ভার নিঃসন্দেহে আমাদের বিস্মিত করে।
সম্পদের সীমা নাই বুড়া গরু পুঁজি। রসনা কেবল কথা সিন্দুকের কুঁজি॥ কড়া পড়িয়াছে হাতে অন্ন বস্ত্র দিয়া। কেন সব কটু কথা কিসের লাগিয়া॥ আমার কপাল মন্দ তাই নাই ধন। উহার কপালে সবে হয়েছে নন্দন॥ কেমনে এমন কন লাজ নাহ হয়। কহিবারে পারি কিন্তু উপযুক্ত নয়॥ অলক্ষণা সুলক্ষণা যে হই সে হই। মোর আসিবার পূর্ব্বকালি ধন কই॥ গিয়াছিলে বুড়াটি ঘখন বর হয়ে। গিযাছিলে মোর তরে কত ধন লয়ে॥ বুড়া গরু লড়া দাঁত ভাঙ্গা গাছ গাড়ু। ঝুলি কাঁথা বাঘছাল সাপ সিদ্ধি লাড়ু॥ তখনো যে ধন ছিল এখনো সে ধন। তবে মোরে অলক্ষণা কন কি কারণ॥ উহার ভাগ্যের বলে হইয়াছে বেটা। কারে কব এ কৌতুক বুঝিবেক কেটা॥ বড় পুত্র গজমুখ চারি হাতে খান। সবে গুণ সিদ্ধি খেতে বাপের সমান॥ ভিক্ষা মাগি খুদ কোণ যে পান ঠাকুর। তাহার ইন্দুরে করে কাটুর কুটুর॥
|
ছোট পুত্র কাত্তিকেয় ছয় মুখে খায়। উপায়ের সীমা নাই ময়ূরে উড়ায়॥ উপযুক্ত দুটি পুত্র আপনি যেমন। সবে ঘরে আমি মাত্র এই অলক্ষণ॥ করেতে হইল কড়া সিদ্ধি বেটে বেটে। তৈল বিনা চুলে জটা অঙ্গ গেল ফেটে॥ শাঁখা শাড়ী সিন্দুর চন্দন পান গুয়া। নাহি দেখি আয়তি কেবল আচাভুয়া॥| ভারত কহিছে মা গো কত বল আর। শিবের যে তিরস্কার সেই পুরস্কার॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
|
ভারতের ভাগ্যবিপ্লব কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (৯.৩.১৮১১ - ২৪.১.১৮৫৯)
বাংলা কাব্যের আধুনিক যুগের সূচনা। ১৯১৯ সালে সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় দ্বারা প্রকাশিত কবিবর ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
প্রণীত, "ঈশ্বরগুপ্তের গ্রন্থাবলী (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ একত্রে)" গ্রন্থের কবিতা।
সভ্যতা সরোজলতা, প্রাপ্ত হবে প্রবলতা, মানুষের মনসরোবরে। প্রমোদ প্রফুল্ল কায়, সুখ-শতদল তায়, ফুটিবেক জ্ঞানসূর্য্য-করে॥ সুরব সৌরভ হয়ে, দশদিকে যশ লয়ে, প্রকাশিবে শুভ সমাচার। স্বাধীনতা মাতৃস্নেহে, ভারতের জরা-দেহে, করিবেন শোভার সঞ্চার॥ দুর হবে সব ক্লান্তি, পলাবে প্রবলা ভ্রান্তি, শান্তিজল হবে বরিষণ। পুণ্যভূমি পুনর্ব্বার, পূর্বসুখ সহকার, প্রাপ্ত হবে জীবন যৌবন॥ প্রবীণা নবীনা হয়ে, সন্তানসমূহ লয়ে, কোলে করি করিবে পালন। সুধা সম স্তনপানে, জননীর মুখপানে, একদৃষ্টে করিবে ঈক্ষণ॥ এরূপ স্বপনমত, কত হয় মনোগত, মনোমত ভাবের সঞ্চার। ফলে তাহা কবে হবে, প্রসূতির হাহারবে, সূত সবে করে হাহাকার॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
|
বিধাতার বিচার
দাশরথী রায়, দাশু রায় (২.১৮০৬ - ১৭.১০.১৮৫৭)
১৯৯৭ সালে প্রকাশিত, ডঃ অর্দ্ধেন্দুশেখর রায় সম্পাদিত “দাশরথি রায়ের পাঁচালী” সংকলন থেকে নেওয়া।
এত বিধির পক্ষপাত!
রমণীর পক্ষে পক্ষাঘাত,
পুরুষের সঙ্গে গলাগলি ভারি।
দুখ পেয়ে দুখ নাই বলা,
তাতেই আমাদের নাম অবলা,
কিছু ক'রতে নারি, তাই তো নারী॥
গর্ভে হলে ছেলে প্রবেশ, রমণীর দুখের শেষ,
পুরুষের কোনো ক্লেশ নাই।
বিধি আছেন পুরুষের বশে,
ব'সে বাপ হ'য়ে বসে,
সেই ছেলেদের বাপের দোহাই॥
পরশুরাম বাপের কথা,---
শুনে মায়ের কাটে মাথা!
নারীর বলিব কি আর মাথা!
বাপ থাকিতে বর্ত্তমান, গয়ায় গিয়ে পিণ্ডদান,---
মায়ের নাই, এত বাদী বিধাতা॥
বিধাতা তো নারীর পক্ষ, সকল পক্ষ বিপক্ষ,
সকল সহ্য করিতাম লো দিদি!
এইটি যদি করতো ভব্য, নামটি থুতো বৈধব্য,
সমান সমান ঐটে হতো যদি॥
**********************
পুরুষের য'বার মরে, ত'বার বিয়ে সই!
সে সুখী আমরা কেন নই!
কি দোষে একহাটে চোর মায়ে-ঝিয়ে হই॥
নারীর পতি কষ্ট পেলে, ঘরে এসে কষ্ট হ'লে,
সে যে কষ্ট, --- যে কষ্ট দেয় প্রাণে,---
সে কষ্ট সখী লো! কৃষ্ণ জানে!
মজিলে পর পুরুষেতে,
কলঙ্কিনী আমরা তাতে,
পুরুষ নিলে পরস্ত্রীকে, এত বাদ কই?॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
মেঘনাদ ও বিভীষণ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (২৫.১.১৮২৪ - ২৯.৬.১৮৭৩)।
১৮৬১ সালে প্রকাশিত, কবির “মেঘনাদ বধ” কাব্যের ৬ষ্ঠ সর্গের অংশ বিশেষ।
পূজিল তোমারে দাস, তেঁই, প্রভু, তুমি
পবিত্রিলা লঙ্কাপুরী ও পদ অর্পণে!
কিন্তু কি কারণে, কহ, তেজন্বি, আইলা
রক্ষঃকুলরিপু নর লক্ষণের রূপে
প্রসাদিতে এ অধীনে? এ কি লীলা তব,
প্রভাময়?” পুনঃ বলী নমিলা ভূতলে।
উত্তরিলা বীরদর্পে রৌদ্র দাশরথি ; ---
“নহি বিভাবসু আমি, দেখ নিরখিয়া,
রাবণি! লক্ষণ নাম, জন্ম রঘুকুলে !
সংহারিতে, বীরসিংহ্, তোমায় সংগ্রামে
আগমন হেথা মম ; দেহ রণ মোরে
অবিলম্বে।” যথা পথে সহসা হেরিলে
উর্ধ্ব ফণা ফণীশ্বরে, ত্রাসে হীনগতি
পথিক, চাহিলা বলী লক্ষ্মণের পানে।
সভয় হইল আজি ভয়শূন্য হিয়া !
প্রচণ্ড উত্তাপে পিণ্ড, হায় রে, গলিল!
গ্রাসিল মিহিরে রাহু, সহসা আঁধারি
তেজঃপুঞ্জ! অম্বুনাথে নিদাঘ শুষিল !
পশিল কৌশলে কলি নলের শরীরে !
বিস্ময়ে কহিলা শূর, “সত্য যদি তুমি
রামানুজ, কহ, রথি, কি ছলে পশিলা
রক্ষোরাজপুরে আজি? রক্ষঃ শত শত,
ষক্ষপতিত্রাস বলে, ভীম অস্ত্রপাণি,
রক্ষিছে নগর-দ্বার ; শৃঙ্গবরসম
এ পুর-প্রাচীর উচ্চ ; প্রাচীর উপরে
ভ্রমিছে অযুত যোধ চক্রাবলীরূপে ;---
কোন্ মায়াবলে, বলি, ভুলালে এ সবে?
মানবকুলসম্ভব, দেবকুলোদ্ভবে
কে আছে রথী এ বিশ্বে, বিমুখয়ে রণে
একাকী এ রক্ষোবৃন্দে? এ প্রপঞ্চে তবে
কেন বঞ্চাইছ দাসে, কহ তা দাসেরে,
সর্বভুক্? কি কৌতুক এ তব কৌতুকি?
নহে নিরাকার দেব, সৌমিত্রি ; কেমনে
এ মন্দিরে পশিবে সে? এখনও দেখ
রুদ্ধদ্বার! বর, প্রভু, দেহ এ কিঙ্করে!
নিঃশঙ্কা করিব লঙ্কা বধিয়া রাঘবে
আজি, খেদাইব দূরে কিষ্কিন্ধ্যা-অধিপে,
বাঁধি আনি রাজপদে দিব বিভীষণে
রাজদ্রোহী। ওই শুন, নাদিছে চৌদিকে
শৃঙ্গ শৃঙ্গনাদিগ্রাম! বিলম্বিলে আমি,
ভগ্নোদ্যম রক্ষঃ-চমূ, বিদাও আমারে !”
উত্তরিলা দেবাকৃতি সৌমিত্রি কেশবী,---
“কৃতান্ত আমি রে তোর, দুরন্ত রাবণি!
মাটি কাটি দংশে সর্প আয়ুহীন জনে !
মদে মত্ত সদা তুই ; দেব-বলে বলী,
তনু অবহেলা মূঢ়, করিস্ সতত
দেবকুলে! এত দিনে মজিলি দুর্মতি ;
দেবাদেশে রণে আমি আহ্বানি রে তোরে!”
এতেক কহিয়া বলী উলঙ্গিলা অসি
ভৈরবে! ঝলসি আঁখি কালানল-তেজে,
ভাতিল কৃপাণবর, শক্রুকরে যথা
ইরম্মদময় বজ্র! কহিলা রাবণি,---
“সত্য যদি রামানুজ তুমি, ভীমবাহু
লক্ষণ, সংগ্রাম-সাধ অবশ্য মিটাব
মহাহর্ষে আমি তব, বিরত কি কভু
রণরঙ্গে ইন্দ্রজিৎ? আতিথেয় সেবা,
তিষ্ঠি, লহ, শূরশ্রেষ্ঠ, প্রথমে এ ধামে---
রক্ষোরিপু তুমি, তবু অতিথি হে এবে।
সাজি বীরসাজে আমি। নিরস্ত্র যে অরি,
নহে রথিকূলপ্রথা আঘাতিতে তারে।
এ বিধি, হে বীরবর, অবিদিত নহে,
ক্ষত্র তুমি, তব কাছে ; ---কি আর কহিব?”
জলদ-প্রতিমম্বনে কহিলা সৌমিত্রি,---
"আনায় মাঝারে বাঘে পাইলে কি কভু
ছাড়ে রে কিরাত তাঁরে? বধিব এখনি,
অবোধ, তেমতি তোরে ! জন্ম রক্ষঃকুলে
তোর, ক্ষত্রধর্ম, পাপি, কি হেতু পালিব,
তোর সঙ্গে? মারি অরি পাবি যে কৌশলে!
কহিলা বাসবজেতা, (অভিমন্যু যথা
হেরি সপ্ত শূবে শূর তপ্তলৌহাকৃতি
রোষে 1) “ক্ষত্রকুলগ্লানি, শত ধিক্ তোরে,
লক্ষণ! নির্লজ্জ তুই! ক্ষত্রিয় সমাজে
রোধিবে শ্রবণপথ ঘৃণায়, শুনিলে
নাম তোর রথিবৃন্দ! তস্কর যেমতি,
পশিলি এ গৃহে তুই ; তস্কর-সদৃশ
শাস্তিয়া নিরস্ত তোরে করিব এখনি!
পশে যদি কাকোদর গরুড়ের নীড়ে,
ফিরি কি সে যায় কভু আপন বিবরে,
পামর! কে তোরে হেথা আনিল দুর্মতি?”
চক্ষের নিমিষে কোষা তুলি ভীমবাহু
নিক্ষেপিলা ঘোর নাদে লক্ষ্মণের শিরে।
পড়িলা ভূতলে বলী ভীম প্রহরণে,
পড়ে তরুরাজ যথা প্রভঞ্জনবলে
মড়মড়ে! দেব-অস্ত্র বাজিল ঝন্ ঝনি,
কাঁপিল দেউল যেন ঘোর ভূকম্পনে।
বহিল রুধির-ধারা ! ধরিলা সত্বরে
দেব-অসি ইন্দ্রজিৎ ;---নারিলা তুলিতে
তাহায় ! কার্মুক ধরি কর্ষিলা ; রহিল
সৌমিত্রির হাতে ধনুঃ! সাপটিলা কোপে
ফলক ; বিফল বল সে কাজ সাধনে !
যথা শুণ্ডধর টানে শুণ্ডে জড়াইয়া
শৃঙ্গধর-শৃঙ্গে বৃথা, টানিলা তূণীরে।
শূরেন্দ্র! মায়ার মায়া কে বুঝে জগতে!
চাহিলা দুয়ার পানে অভিমানে মানী।
সুচকিতে বীরবর দেখিলা সম্মুখে
ভীমতম শূল হস্তে, ধূমকেতুসম
খুল্লতাত বিভীষণে---বিভীষণ রণে !
"এতক্ষণে" --অরিন্দম কহিলা বিষাদে
"জানিনা কেমনে আসি লক্ষণ পশিল
রক্ষঃপুরে ! হায়, তাত, উচিত কি তব
একাজ, নিকষা সতী তোমার জননী,
সহোদর রক্ষশ্রেষ্ঠ? --শূলী-শম্ভূনিভ
কুম্ভকর্ণ? ভ্রাতৃপুত্র বাসব বিজয়ী?
নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?
চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?
কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমা, গুরুজন তুমি
পিতৃতুল্য | ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে,
পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে,
লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে।"
উত্তরিলা বিভীষণ;--"বৃথা এ সাধনা,
ধীমান্ ! রাঘবদাস আমি ; কি প্রকারে
তাঁহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতে
অনুরোধ ?" উত্তরিলা কাতরে রাবণি ;--
"হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে !
রাঘবের দাস তুমি ? কেমনে ও মুখে
আনিলে ও কথা, তাত, কহ তা দাসেরে !
স্থপিলা বিধুরে বিধি স্থানুর ললাটে ;
পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি
ধুলায়? হে রক্ষোরথি, ভুলিলে কেমনে
কে তুমি? জনম তব কোন্ মহাকুলে?
কেবা সে অধম রাম? স্বচ্ছ সরোবরে
করে ফেলি রাজ হংস পঙ্কজ কাননে ;
যায় কি সে কভু, পঙ্কিল সলিলে,
শৈবালদলের ধাম? মৃগেন্দ্র কেশরী
কবে, হে বীর-কেশরী, সম্ভাষে শৃগালে
মিত্রভাবে? অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি,
অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে।
ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, লক্ষণ ; নহিলে
অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে?
কহ, মহারথি, একি মহারথিপ্রথা?
নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে
এ কথা ! ছাড়হ পথ ; আসিব ফিরিয়া
এখনি ! দেখিব আজি, কোন্ দেববলে,
বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি !
দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ,
রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, পরাক্রম দাসের! কি দেখি
ডরিবে এ দাস হেন দুর্বল মানবে?
নিকুম্ভিলা-যজ্ঞাগারে প্রগল্ ভে পশিল
দম্ভী ; আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে।
তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পণ করে
বনবাসী ! হে বিধাতঃ, নন্দন-কাননে
ভ্রমে দুরাচার দৈত্য? প্রফুল্ল কমলে
কীটবাস? কহ, তাত, সহিব কেমনে
হেন অপমান আমি,--ভ্রাতৃ পুত্র তব?
তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে?"
মহামন্ত্রবলে যথা নম্রশিরঃ ফণী,
মলিনবদন লাজে, উত্তরিলা রথী
রাবণ-অনুজ, লক্ষি রাবণ-আত্মজে ;---
"নহি দোষী আমি, বত্স ; বৃথা ভর্ৎস মোরে
তুমি ! নিজ কর্ম দোষে হায় মজাইলা
এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি !
বিরত সতত পাপে দেবকুল ; এবে
পাপপূর্ণ লঙ্কা পুরী ; প্রলয়ে যেমতি
বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কাল-সলিলে !
রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী
তেঁই আমি ! পরদোষে কে চাহে মজিতে?"
রুষিলা বাসবত্রাস ! গম্ভীরে যেমতি
নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্র কোপি,
কহিলা বীরেন্দ্র বলী ;--- "ধর্মপথগামী,
হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে
তুমি ;---কোন্ ধর্মমতে, কহ দাসে, শুনি,
জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি,--এ সকলে দিলা
জলাঞ্জলি? শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি
পরজন, গুণহীন স্বজন, তথাপি
নির্গুণ স্বজন শ্রেয়ঃ, পরঃ পরঃ সদা !
এ শিক্ষা হে রক্ষোবর, কোথায় শিখিলে?
কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা ! হেন সহবাসে,
হে পিতৃব্য, বর্বরত কেন না শিখিবে?
গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্মতি।"
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১২.১৮২৭ - ১৩.৫.১৮৮৭)। "পদ্মিনী উপাখ্যান" কাব্যের কবিতা।
আমাদের মাতৃভূমি রাজপুতানার হে,
রাজপুতানার।
সকল শরীর ছুটে রুধিরের ধার হে,
রুধিরের ধার॥
সার্থক জীবন আর বাহুবল তার হে,
বাহুবল তার।
আত্মনাশে যেই করে দেশের উদ্ধার হে,
দেশের উদ্ধার॥
কৃতান্ত-কোমল কোলে আমাদ্র স্থান হে,
আমাদের স্থান।
এসো তার মুখে সবে হইব শয়ান হে,
হইব শয়ান॥
কে বলে শমন-সভা ভয়ের বিধান হে,
ভয়ের বিধান?
ক্ষত্রিয়ের জ্ঞাতি যম বেদের নিধান হে,
বেদের নিধান॥
স্মরহ ইক্ষ্বাকু-বংশে কত বীরগণ হে,
কত বীরগণ।
পরহিতে দেশ-হিতে ত্যাজিল জীবন হে,
ত্যাজিল জীবন॥
স্মরহ তাঁদের সব কীর্তি-বিবরণ হে,
কীর্তি বিবরণ!
বীরত্ব-বিমুখ কোন ক্ষত্রিয়-নন্দন হে?
ক্ষত্রিয়-নন্দন॥
অতএব রণভূমে চল ত্বরা যাই হে,
চল ত্বরা যাই।
দেশহিতে মরে যেই তুল্য তার নাই হে,
তুল্য তার নাই॥
যদিও যবনে মারি চিতোর না পাই হে,
চিতোর না পাই।
স্বর্গসুখে সুখী হব, এস সব ভাই হে,
এসো সব ভাই॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
উন্নতি উন্নতি কবি মনমোহন বসু (১৪.৭.১৮৩১ - ৪.২.১৯১২)। ১৯৬০ সালে
প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য বিদ্যাবিনোদ, কাব্য-ব্যকরণ-পুরাণ-কৃততীর্থ কর্ত্তৃক সংকলিত
ও সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা, দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার সংকলন (১৭৪১ - ১৯৮৭)”
থেকে নেওয়া।
নদী সিন্ধু নীরে পোত থরে থরে
গর্ব্ভে গুরু ভার চলে গর্ব্ব ভরে
তা দেখে পুলকে ভাব কি অন্তরে
দেশের দারিদ্র্য গেলরে॥ ৪ ।
কিন্তু রে অবোধ সে পোত কাহার,
স্বত্ব অধিকার তাহে কি তোমার?
যাদের বাণিজ্য তাদের ব্যাপার
ব্যাপারী ধবল-দল রে॥ ৫।
চিনির বলদ তোমরা কেবল
কেরাণী মুহুরী সরকারের দল।
কাকের কি লাভ পাকিলে শ্রীফল
উচ্ছিষ্ট খোসা সম্বল রে॥ ৬॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কামশাস্ত্র জানে কত কাব্য অলঙ্কার। কত মতে কত রতি বলিহারি তার॥ শাঁখা সোনা রাঙ্গা শাড়ী না পরিনু কভু। কেবল কাব্যের গুণে বিহারের প্রভু॥ ভাবে বুঝি এই চোর কবি হৈতে পারে। তেঁই চুরি করি বিদ্যা ভজিল ইহারে॥ গোদা কুঁজো কুরুণ্ডে প্রভৃতি আর যত। সকলের রমণী সকলে নিন্দে কত॥ দ্রুত হয়ে চোর লয়ে চলিল কোটাল। ভারত কহিছে গেল যথা মহীপাল॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
|
বল এই কি সেই ভারত! বল এই সেই ভারত হে॥
যে ভারত-রক্ষে, ধর্ম্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ
. ফলেছিল সুশোভিত কত॥
যে ভারতের বস্তু চন্দ্র-সূর্য্য-তারা,
অগ্রি-বাযু-বারি-বজ্র-বিদ্যুৎধারা,
যে ভারতের ছিল অধীনেতে ধরা,
. ষে ভারতের কীর্ত্তি গায় মহাভারত ৷
যে ভারতে শত শত মুনি-ঋষি,
যগ-যজ্ঞে রত ছিলেন অহর্নিশি,
যে ভাবতে ছিলেন সর্ব্বাপদবিনাশী,
. তত্ত্বদর্শী মহেশাদি দেব যত।
যে ভাবতে ছিল বেদাদি প্রধান,
যে ভারতে ছিল ব্রহ্ম-অনুষ্ঠান,
যে ভারতে সদা হ'ত সামগান,
. যে ভারত ছিল নিত্যোৎসবে রত।
যে ভারতে ছিল সর্ব কর্ম্মে ধর্ম্ম,
আহারে বিহারে ব্যবহারে ধর্ম্ম,
জীবনে ধর্ম্ম, মরণে ধর্ম্ম,
. যে ভারতে কর্ত্তেন ধর্ম্মরাজ রাজত্ব।
এই কি সেই তেজঃপুঞ্জ আর্য্যস্থান?
কার্য্য দেখে কিছুই হয় না অনুমান,
মনে হ'লে পরে জ্বলে উঠে প্রাণ,
. ব’লব কি আর মনে রইল মনোগত।
ভারত-বিলাপ কবি বিষ্ণুরাম চট্টোপাধ্যায় (৪.১৮৩২ - ৩.১৯০২)। ১৯৬০
সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য দ্বারা সঙ্কলিত ও সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা
দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার সঙ্কলন ১৭৪১ -১৯৪৭” থেকে নেওয়া।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
পাপেতে পৃথিবী খার।
ধর্ম্ম তথা নাই আর॥
অনেকে “মিলের” ছাত্র।
ধর্ম্ম কর্ম্ম কথা মাত্র॥
কপটতা ধর্ম্ম সাজে।
পৃথিবী ঢাকিয়া'আছে॥
ধর্ম্ম যদি চাও ভাই।
ধর্ম্মসাজে কাজ নাই॥
কপটতা পরিহর।
ভাল হও ভাল কর॥
পাপেতে পৃথিবী খার
কবি কাঙাল হরিনাথ বা হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩ - ১৬.৪.১৮৯৬)
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ দ্বারা ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের
হরিনাথ মজুমদার (কাঙ্গাল হরিনাথ) গ্রন্থের, “শেষ জীবন” অধ্যায় থেকে নেওয়া।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মানুষ না পশু? আজো আছে পশুদের দলে, পরস্পরে সভ্যভব্য বলে, নিজের পেটের দায় অন্যকে ধরিয়া খায়, সবে একা চায় ভূমণ্ডলে ৷ রাজা আর রাজ-অনুচর বিষম কঠোর স্বার্থপর, কেবল নিজের তরে নিদারুণ কর্ম্ম করে, বাধাইয়া দারুণ সমর! পরের দেশেতে ঢুকে পরের ছেলের বুকে মারে রুখে আগুনের গুলি। কেন রে কি দোষ তার করিয়াছে রে পামর? মানুষে মান্ধুষে যাও ভুলি? এ পশুত্বে, বীরত্বের নামে, আজো সবে পূজে ধরাধামে, ভীষণ রক্তের নদী বহিতেছে নিরবধি, রাক্ষসেরা মেতেছে সংগ্রামে। কতই অর্থর নাশ, কতই হৃদয়-হ্রাস, বুদ্ধির বিষম অপচয়! তবু স্বার্থ সাধিবারে, মানুষে মানুষে মারে পর-দুঃখে অন্ধ দুরাশয়! চারদিকে হাহাকার শ্রবণে পশে না তাঁর, বদ্ধকালা পাহাড় পাথর ; অতি ধীর বীর ইনি, বিশ্বজয়ী বিশ্বজিনি প্রজার শোকেতে কেন হবেন কাতর?
|
মানুষ না পশু? কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী (২১.৫.১৮৩৫ - ২৪.৫.১৮৯৪)
১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য দ্বারা সঙ্কলিত ও সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার সঙ্কলন
১৭৪১ -১৯৪৭” থেকে নেওয়া।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
যুগান্তরে লোক সবে শুনিয়া অবাক হবে--- মানুষে করিত বধ মানুষের প্রাণ, মুখে তারা ভাই ভাই, মনে মনে শ্রীতি নাই, কারো প্রতি কারো নাই আন্তরিক টান।
|
বাধাবিঘ্ন কত শত শত, করিতে মা তোর চরণবন্দন।
চাহি মা! গাহিতে তব গুণগান, কিন্ত তাহে রাজশাসন ভীষণ।
বন্দে মাতরম্ ধ্বনি যে বা করে, রাজদ্রোহী নাকি হয় সে বিচারে,
বাঁধে তারে চরে, রাখে কারাগারে, পলে পলে করে কত নির্যাতন।
কহিতে ভারত-জননীর জয়, শ্বেতাঙ্গের হয় অশান্তির উদয়,
যে কহে, তাহার যাতনা অপার, মা বলিতে কার এত বিড়ম্বন!
কে আছে মা তোর ভকত-সন্তান, কে সঁপেছে তব পদে মন প্রাণ,
শত গুপ্তচরে করে তার সন্ধান, কত অপরাধী যেন সেই জন!
বুক ফেটে যায়, মুখ ফুটে তাই, বলিতে ভারতে কারো সাধ্য নাই,
নিত্য নীরবে সহিতেছে সবে, মলিন বদনে মরম বেদন।
অত্যাচার
কবি গিরিশচন্দ্র সেন (১৮৩৬ - ১৯১০)
১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য দ্বারা সঙ্কলিত ও সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা
দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার সঙ্কলন ১৭৪১ -১৯৪৭” থেকে নেওয়া।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ওমা! রত্নগর্ভে! ভারত-জননী,
বীর প্রসবিনী স্বরূপ কও।
প্রভাত শশাঙ্ক সম প্রভাহীনা,
হইয়া এখন কেন মা রও?
* * * *
বীরের জননী বলিয়া তখন,
আদর করিয়া ডাকিত সবে।
তার পরিবর্ত্তে এবে দাস-মাতা,
এ দুঃখ কেমনে পরাণে সবে।
* * * *
দীন, হীন, ক্ষীণ, অসংখ্য অসংখ্য
এখন তোমার তনয় যত।
দাসেক পশরা, বহিয়া মস্তকে,
করিছে দুর্লভ জীবন গত।
আহা, এবে তব নন্দিনী যতেক,
বঞ্চে সর্বক্ষণ দাসীর মত।
লাঞ্ছনা গঞ্জনা অঙ্গের ভূষণ,
বিস্তারি সে সব কহিব কত।
* * * *
তাঁর প্রিয় কার্য্য সাধিতে যতনে,
শিখাও তোমার সন্তানগণে।
তব্ পদে পদে তরিবে বিপদে
পাবে স্বাধীনতা হারাণ ধনে।
ভারতের প্রতি
বিরাজমোহিনী দাসী (জন্ম আনু ১৮৩৬ - মৃত্যু অজ্ঞাত)
কবির ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত “কবিতাহার” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভানু অন্ত গেল, গোধূলি আইল ;---
রবি-কর-জাল আকাশে উঠিল
মেঘ হ’তে মেঘে খেলিতে লাগিল,
গগন শোভিল কিরণজালে ;---
কোথা বা সুন্দর ঘন কলেবর
সিন্দুরে লেপিয়া রাখে থরেথর,
কোথা ঝিকি ঝিকি হীরার ঝালর
যেন বা ঝুলায় গগন ভালে।
সোণার বরণ মাখিয়া কোথায়
জলধর জলে --- নয়ন জুড়ায়,
আবার কোথায় তুলা রাশি প্রায়
শোভে রাশি রাশি মেঘের মালা।
হেনকালে একা গিয়া গঙ্গাতীরে
হেরি মনোহর সে তট উপরে
রাজধানী এক, নব শোভা ধরে,
রয়েছে কিরণে হয়ে উজলা।
দ্বিতালা ত্রিতালা চৌতালা ভবন,
সুন্দর সুন্দর বিচিত্র গঠন,
রাজবর্ত্ম পাশে আছে সুশোভন---
গোধূলি রাগেতে রঞ্জিত কায়।
ভারত বিলাপ
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৭.৪.১৮৩৮ - ২৪.৫.১৯০৩)। ১৮৭১ সালে প্রকাশিত কবির “কবিতাবলি” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অদূরে দুর্জ্জয় দুর্গ গড়খাই,
প্রকাণ্ড মূরতি, জাগিছে সদাই,
বিপক্ষ পশিবে হেন স্থান নাই---
চরণ প্রক্ষালি জাহ্নবী ধায়।
গড়ের সমীপে আনন্দ উদ্যান,
যতনে রক্ষিত অতি রম্যস্থান,
প্রদোষে প্রত্যহ হয় বাদ্যগান.
নয়ন, শ্রবণ, তনু জুড়ায়।
জাহ্নবী সলিলে এদিকে আবার
দেখ জলযান কাতারে কাতার
ভাসে দিবানিশি---গুণবৃক্ষ যার
শালবৃক্ষ ছাপি ধ্বজা উড়ায়।
অহে বঙ্গবাসী জান কি তোমরা?
অলক জিনিয়া হেন মনোহরা
কার রাজধানী? কি জাতি ইহারা?
এ সুখ সৌভাগ্য ভোগে ধরায়।
নাহি যদি জান, এসে এই খানে,
চলেছে দেখিবে বিচিত্র বিমানে
রাজপুরুষেরা বিবিধ বিধানে---
গরবে মেদিনী ঠেকে না পায়।
অদূরে বাজিছে “রুল বৃট্যানিয়া,”
শকটে শকটে মেদিনী ছাইয়া
চলেছে দাপটে বৃটনবাসীয়া---
ইন্দ্রের ইন্দ্রত্ব আছে কোথায়!
হায় রে কপাল, ওদেরি মতন
আমরাই কেন করিতে গমন
না পারি সতেজে---বলিতে আপন
যে দেশে জনম, যে দেশে বাস?
ভয়ে ভয়ে যাই, ভয়ে তয়ে চাই,
গৌরাঙ্গ দেখিলে ভূতলে লুটাই,
ফুটিয়ে ফুকারি বলিতে না পাই---
এমনি সদাই হৃদয়ে ত্রাস।
কি হবে বিলাপ করিলে এখন,
হিন্দুকুললক্ষ্মী গিয়াছে যখন,
মনের মাহাত্ম্য হয়েছে নিধন---
তখনি সে সাধ ঘুচে গিয়াছে।
সাজে না এখন অভিলাষ করা---
আমাদের কাজ সুধু পায়ে ধরা---
শিরেতে ধরিয়া কলঙ্ক পসরা
ছুটিতে হইবে ওদেরি পাছে!
হায় বসুন্ধরা তোমার কপালে
এই কি ছিল মা, উদয়ের কালে
জগত কাঁদায়ে কিরণ ডুবালে---
পুরাতে নারিলে মনের আশা।
রূপে অনুপম নিখিল ধরায়
করিয়া বিধাতা সৃজিলা তোমায়---
দিলা সাজাইয়া অতুল ভূষায়---
তোর কি না আজি এ হেন দশা!
হায় রে বিধাতা, কেন দিয়াছিলি
হেন অলঙ্কার? কেন না গঠিলি
মরুভূমি করে---অরণ্যে রাখিলি,
এ হেন যাতনা হতো না তায়!
পারস্য পাঠান মোগল জাতি
হরিতে ভারত কিরীটের ভাতি
আসিত না হেথা, করিতে দুর্গতি---
অভাগা হিন্দুরে দলিতে পায়!
এই যে দেখিছ পুরী মনোহর
শতগুণ আরো শোভিত সুন্দর,
এই ভাগীরথী করে থরে থর
ধাইত তখন কতই সাধে!
গাইত তখন কতই সুস্বরে
এই সব পাখী তরু শোতা করে,
কতই কুসুম পরিমল ভরে
ফুটিয়া থাকিত কত আহ্লাদে।
আগেকার মত উঠিত তপন,
আগেকার মত চাঁদের কিরণ
ভাষিত গগনে---গ্রহ তারাগণ
ঘুরিত আনন্দে ঘেরিয়া ধরা ;---
যখন ভারতে অমৃতের কণা
হতো বরিষণ, বাজাইত বীণা
ব্যাস বাল্মীকি---বিপুল বাসনা
ভারত হৃদয়ে আছিল ভরা।
যখন ক্ষত্রিয় অতীব সাহসে
ধাইত সমরে মাতি বীর-রসে,
হিমালয়চূড়া গগন পরশে
গাইত যখন ভারত নাম।
ভারতবাসীরা প্রতি ঘরে ঘরে
গাইত যখন স্বাধীন অন্তরে
স্বদেশ মহিমা পুলকিত স্বরে,---
জগতে ভারত অতুল ধাম।
ধন্য বৃট্যানিয়া ধন্য তোর বল,
এ হেন ভূভাগ করে করতল,
রাজত্ব করিছ ইঙ্গিতে কেবল---
তোমার তেজের নাহি উপমা।
এখন কিঙ্কর হয়েছি তোমার
মনের বাসনা কি কহিব আর,
এই ভিক্ষা চাই করো গো বিচার---
অথর্ব্ব দাসীরে করো গো ক্ষমা।
দেখ্ চেয়ে দেখ প্রাচীন বয়েসে
তোর পদতলে পড়িয়ে কি বেশে
কাঁদিছে সে ভূমি, পূজিত যে দেশে
কত জনপদ গাহি মহিমা।
আগে ছিল রাণী---ধরা রাজধানী,
স্মরণে যেন গো থাকে সে কাহিনী,
এবে সে কিঙ্করী হয়েছে দুখিনী
বলিয়ে দম্ভ করো না গরিমা।
তোমারো ত বুকে কত কত বার
রিপু পদাঘাত করেছে প্রহার
কালেতে না জানি কি হবে আবার---
এই কথা সদা করো গো মনে।
পেয়েছে অমুল্য রতন ধরার
করো না ইহারে চরণে প্রহার---
দিও না যাতন৷ ভারত প্রাণে।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
অরে কুলাঙ্গার হিন্দু দুরাচার---
এই কি তোদের দয়া, সদাচার?
হয়ে আর্য্যবংশ --- অবনীর সার
রমণী বধিছ পিশাচ হয়ে!
এখনও ফিরিয়া দেখনা চাহিয়া
জগতের গতি ভ্রমেতে ডুবিয়া---
চরণে দলিয়া মাতা, সুতা, জায়া,
এখনো রয়েছ উন্মত্ত হয়ে?
বাঁধিয়া রেখেছ বামা রাশি রাশি
অনাথা করিয়া গলে দিয়া ফাঁসি,
কাড়িয়া লয়েছ কবরী, কঙ্কণ,
হার, বাজু, বালা, দেহের ভূষণ---
অনন্ত দুখিনী বিধবা নারী।
দেখ রে নিষ্ঠুর, হাতে লয়ে মালা
কুলীন সধবা অনূঢ়া অবলা
আছে পথ চেয়ে পতির উদ্দেশে,
অসংখ্য রমণী পাগলিনী বেশে---
কেহ বা করিছে বরমাল্য দান
মুমূর্ষুর গলে হয়ে ম্রিয়মাণ
নয়নে মুছিয়া গলিত বারি!
ভারত কামিনী
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৭.৪.১৮৩৮ - ২৪.৫.১৯০৩)। ১৮৭১ সালে প্রকাশিত কবির “কবিতাবলি” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
চারিদিকে হেথা ভারত জুড়িয়া,
সরসীকমল যেন রে ছিঁড়িয়া---
কামিনীমণ্ডলী রেখেছ তুলিয়া---
কোমল হৃদয় করেছ হতাশ,
না দেখিতে দেও অবনী আকাশ---
করে কারাবাস জগতে রয়ে।
অরে কুলাঙ্গার হিন্দু দুরাচার---
এই কি তোদের দয়া, সদাচার?
হয়ে আর্য্যবংশ --- অবনীর সার
রমণী বধিছ পিশাচ হয়ে!
এখনও ফিরিয়া দেখনা চাহিয়া
জগতের গতি ভ্রমেতে ডুবিয়া---
চরণে দলিয়া মাতা, সুতা, জায়া,
ছড়ায়ে কলঙ্ক পৃথিবী মাঝে! ---
দেখ না কি চেয়ে জগত উজ্জ্বল
এই সে ভারত, হিমানী অচল,
এই সে গোমূখী, যমুনার জল,
সিন্ধু, গোদাবরী, সরযূ সাজে?
জান না কি সেই অযোধ্যা, কোশল,
এই খানে ছিল, কলিঙ্গ পঞ্চাল,
মগধ, কনৌজ, ---সুপবিত্র ধাম
সেই উজ্জয়নী, নিলে যার নাম
ঘুচে মনস্তাপ কলুষ হরে?
এই রঙ্গভূমে করেছিল লীলা
আত্রেয়ী, জানকী, দ্রৌপদী, সুশীলা,
খনা, লীলাবতী প্রাচীন মহিলা---
সাবিত্রী ভারত পবিত্র করে।
এই আর্যভূমে বাঁধিয়া কুন্তল
ধরিয়া কৃপাণ কামিনী সকল,
প্রফুল্ল স্বাধীন পবিত্র অন্তরে
নিঃশঙ্ক হৃদয়ে ছুটিত সমরে---
খুলে কেশপাশ দিত পরাইয়া
ধনিদণ্ডে ছিলা আনন্দে ভাসিয়া---
সমর-উল্লাসে অধৈর্য্য হয়ে---
কোথা সে এখন অসিভল্লধার
মহারাষ্ট্র বামা, রাজোয়ারা নারী?
অরাতি বিক্রমে পরাজিত হলে
চিতানলে যারা তনু দিত ঢেলে
পতি, পিতা, সুত, সংহতি লয়ে।
বীরমাতা যারা বীরাঙ্গনা ছিল,
মহিমা কিরণে জগত ভাতিল---
কোথা এবে তারা --- কোথা সে
কিরণ?
আনন্দ কানন ছিল যে ভূবন
নিবিড় অটবী হয়েছে এবে!
আর কি বাজে সে বীণা সপ্তস্বরা
বিজয় নিনাদে বসুন্ধরা ভরা?
আর কি আছে সে মনের উল্লাস,
জ্ঞানের মর্য্যাদা, সাহসবিভাস
সে সব রমণী কোথা রে এবে?
সে দিন গিয়াছে --- পশুর অধম
হয়েছে ভারতে নারীর জনম ;
নৃশংস আচার, নীচ দুরাচার
ভারত ভিতরে যত কুলাঙ্গার
পিশাচের হেয় হয়েছে সবে।
তবে কেন আজও আছে ঐ গিরি
নাম হিমালয়, শৃঙ্গ উচ্চে ধরি?
তবে কেন আজও করিছে হুঙ্কার
ভারত বেষ্টিয়া জলধি দুর্ব্বার?
কেন তবে আজও ভারত ভিতরে
হিন্দুবংশাবলী শুনে সমাদরে
ব্যাস বাল্মীকি, বারিধারা ঝরে
সীতা, দময়ন্তী, সাবিত্রী রবে? ---
গভীর নিনাদে করিয়ে ঝঙ্কার,
বাজ্ রে বীণা বাজ্ একবার,
ভারতবাসীরে শুনায়ে সবে।
দেখ্ চেয়ে দেখ্ হোথা একবার---
প্রফুল্ল কোমল কুসুম আকার
য়ূনানী১ মহীলা হয় পারাপার
অকূল জলধি অকুতোভয়ে।
ধায় অশ্বপৃষ্ঠে অশঙ্কিত চিতে
কানন, কন্দর, উন্নত গিরিতে---
অপ্সরা আকৃতি পুরুষ সেবিতা
সাহিত্য, বিজ্ঞান, সঙ্গীতে ভূষিতা---
স্বাধীন প্রভাতে পবিত্র হয়ে।
আর কি ভারতে ওরূপে আবার
হবে রে অঙ্গনা-মহিমা প্রচার?---
পেয়ে নিজ মান, পরে নিজ বেশ
জ্ঞান, দম্ভ তেজে পূরে নিজ দেশ,---
বীর বংশাবলী প্রসূতি হবে?
এহেন প্রকাণ্ড মহীখণ্ড মাঝে
নাহি কিরে কোন বীরাত্মা বিরাজে---
এখনি উঠিয়া করে খণ্ড খণ্ড
সমাজের জাল করাল প্রচণ্ড---
স্বজাতি উজ্জ্বল করিয়া ভবে?
চৈতন্য গৌতম নাহি কিরে আর,
ভারত সৌভাগ্য করিতে উদ্ধার?---
ঋষি বিশ্বামিত্র, রাঘব, পাণ্ডব,
কেন জন্মেছিল মহাত্মা সে সব---
ভারত যদি না উন্নত হবে?
ধিক্ হিন্দুজাতি হয়ে আর্য্যবংশ,
নরকণ্ঠহার নারী কর ধ্বংস!
ভুলে সদাচার, দয়া, সদাশয়,
কর আর্য্যভূমি পূতিগন্ধময়,
ছড়ায়ে কলঙ্ক পৃথিবী মাঝে! ---
দেখ না কি চেয়ে জগত উজ্জ্বল
এই সে ভারত, হিমানী অচল,
এই সে গোমুখী, যমুনার জল,
সিন্ধু, গোদাবরী, সরযূ সাজে?
জান না কি সেই অযোধ্যা, কোশল,
এই খানে ছিল, কলিঙ্গ পঞ্চাল?
মগধ, কনৌজ, ---সুপবিত্র ধাম
সেই উজ্জয়নী, নিলে যার নাম
ঘুচে মনস্তাপ কলুষ হরে?
এই রঙ্গভূমে করেছিল লীলা
আত্রেয়ী, জানকী, দ্রৌপদী, সুশীলা,
খনা, লীলাবতী প্রাচীন মহিলা---
সাবিত্রী ভারত পবিত্র করে?---
অরে কুলাঙ্গার হিন্দু দুরাচার---
এই কি তোদের দয়া, সদাচার?
হয়ে আর্য্যবংশ --- অবনীর সার
রমণী বধিছ পিশাচ হয়ে?
এখনও ফিরিয়া দেখনা চাহিয়া
জগতের গতি ভ্রমেতে ডুবিয়া---
চরণে দলিয়া মাতা, সুতা, জায়া,
এখনো রয়েছ উন্মত্ত হয়ে?
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
১ - অর্থাৎ ইউরোপীয়।
রূপে-গুণে সুন্দরী নাতিনী ঘরে আছে। হেন বরে বিহা দিয়া রাখি আপন কাছে॥ নগরে নাগরীগণ খায় মনকলা। হরগৌরীর বিয়া হব শুভক্ষণ বেলা॥ নিবিষ্ট হইয়া ভজ চণ্ডীর চরণে। মধুর সঙ্গীত কবিকঙ্কণ ভণে॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কি কহিব বঁধু হে বলিতে না জুয়ায়।
কাঁদিয়া কহিতে পোড়া মুখে হাসি পায়॥
অনামুখ মিন্ সে গুলার কিবা বুকের পাটা।
দেবী পূজা বন্দ করে কুলে দেয় বাটা॥
দুঃখের কথা কৈতে গেলে প্রাণ কাঁদি উঠে।
মুখ ফুটে না বলতে পারি মরি বুক ফেটে॥
ঢাক পিটিয়ে সহজবাদ গ্রামে গ্রামে দেয় হে ?
চক্ষে না দেখে মিছে কলঙ্ক রটায় হে ?
ঢাক ঢোলে যে জন সুজন নিন্দা করে।
ঝঞ্ঝনা পড়ুক তার মস্তক উপরে॥
অবিচার পুরী দেশে আর না রহিব।
যে দেশে পাষণ্ড নাই সে দেশে যাব॥
বাসুলী দেবীর যদি কৃপা দৃষ্টি হয়।
মিছে কথা সেঁচা জল কত ক্ষণ রয়॥
আপনার নাক কাটি পরে বলে বোঁচা।
সে ভয় করে না রামী নিজে আছে সাঁচা॥
কি কহিব বঁধু হে বলিতে না জুয়ায়
ভণিতা রামী, কবি রামী রজকিনী। এই পদটি ১৩০৩ (১৮৯৬) সালে প্রকাশিত,
রমণীমোহন মল্লিক সম্পাদিত, "চণ্ডীদাস" গ্রন্থের জীবনী ও সমালোচনায় এই রূপে
দেওয়া রয়েছে। তিনি পদটি "পদসমুদ্র" গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|