বাঙালি বড়ো বুদ্ধিমান, কে বলে সংসারে
কবি অশ্বিনীকুমার দত্ত (২৫.১.১৮৫৬ - ৭.১১.১৯২৩)।
বাঙালি বড়ো বুদ্ধিমান, কে বলে সংসারে |
এমন বোকা কোথাও না, দেখি যে কাহারে ||
. দেশের প্রতি নাই মমতা,
. বিদেশিয়ের পায়ের জুতা,
যা করে ইংরাজে তাই, ভালো তার বিচারে ||
বাঙালি ববু যারা, এমন হত মূর্খ তারা,
শুটকি চুরটের লেগে, অম্বরী তামাক, ছাড়ে ||
. সাচ্চা আতর গোলাপ ত্যজে,
. বিলাতি বিলাসে মজে,
কত টাকা উড়ায় তারা ভস্ম ল্যাভেন্ডারে ||
দুদিন স্কুলে গেলে, দেশি খাওয়া যান ভুলে,
পরমান্ন ছেড়ে তুষ্ট, গোমাংস-আহারে ||
. ওরে গোমাংস এ গরম দেশে,
. নিতান্ত যে সর্বনেশে,
বৈদ্যশাস্ত্রের সার কথা, হেসে উরায় তারে ||
. কোনো বাবু বিলেত গিয়ে,
. আসেন দেখ সাহেব হয়ে,
. পৃথিবী চমকে তার হ্যাটের বাহারে ||
গরমির দিনে গরম কোট, পায়েতে বিলাতি বুট,
কালোগায়ে বান্দর সাজেন, ইংরাজ নকল করে ||
দেশের বাণী
কবি মুন্সী কায়কোবাদ (১৮৫৭ - ১৯৫১)।
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী?
এ দেশের লোক যারা,
সকলইতো গেছে মারা,
আছে শুধু কতগুলি শৃগাল শকুনি!
সে কথা ভাবিতে হায়
এ প্রাণ যে ফেটে যায়,
হৃদয় ছাপিয়ে উঠে --- চোখ ভরা পানি |
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী!
এ দেশের লোক যত
বিলাস ব্যসনে রত
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা |
দেশ গেল ছারেখারে,
এ কথা বলিব কারে?
ভেবে ভেবে তবু মোর হয়ে গেছে সারা!
প্রাণভরা হাহাকার
চোখ ভরা অশ্রুধার,
এ হৃদি যে হয়ে গেছে মরুভূমি-পারা!
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা?
জানি আমি, কেন গেল ভারতের সিংহাসন
কবি রাজকৃষ্ণ রায় (২১.১০.১৮৪৯ - ১১.৩.১৮৯৪)।
॥ সাহানা - ধামাল॥
জানি আমি, কেন গেল ভারতের সিংহাসন,
জানি আমি, ভারতের বুকে কেন হুতাশন ||
কেন যে ভারত হেন, এ ঘোর কুদিন কেন,
তাও জানি, আরও জানি, যা না জানে অন্যজন |
কিন্তু কী দুঃখের কথা, জানি না কেন একতা,
. ভারতবাসীর নাই, একী বিধি-বিড়ম্বন---
হায়, কত দিন আর, রসাস্বাদ একতার,
. লবে না এ মূর্খ জাতি, ধৈরজে ধরিয়া মন ||
দিবানিশি চিন্তা কীসে, ইংরেজের সঙ্গে মিশে, তাদের পদতলে পড়ে থাকিবেন ডিনারে || ভাই বন্ধু বেরাদারে, আপনার বলতে লজ্জা করে, চটে যান বাবু বলে, ডাকিলে তাহারে || সাহেবের মূর্তি ধরে, থাকেন পঞ্চমেতে চড়ে, ইংরাজি ভাবেতে মত্ত আহারে বিহারে || বদনে বিরাজে সদা, বাঙালিরা বড়ো গাধা, দেহ মন জর্জরিত, ইংরাজি বিকারে || যতই বুদ্ধি রাখবে ভাই, দেখে বলিহারি যাই, দেশশুদ্ধ ছি ছি শুনো, তোমার এ ব্যভারে || কেন রে এ বিড়ম্বনা, বিদেশি এ ভাব ছাড়ো না, (দেখো) এত কর তবু তারা, পুছে না তোমারে ||
|
. ১
স্বদেশ স্বদেশ কর্চ্ছ কারে? এদেশ তোমার নয় ;---
এই যমুনা গঙ্গানদী, তোমার ইহা হ’ত যদি,
পরের পণ্যে, গোরা সৈন্যে জাহাজ কেন বয় ?
গোলকুণ্ডা হীরার খনি, বর্ম্মা ভরা চুণি মণি,
সাগর সেঁচে মুক্তা বেছে পরে কেন লয়?
স্বদেশ স্বদেশ কর্চ্ছ কারে, এদেশ তোমার নয়!
. ২
এই যে ক্ষেতে শস্য ভরা, তোমার ত নয় একটি ছড়া,
তোমার হ’লে তাদের দেশে চালান কেন হয়?
তুমি পাও না একটি মুষ্টি, মরছে তোমার সপ্ত গোষ্ঠি,
তাদের কেমন কান্তি পুষ্টি---জগৎ ভরা জয়।
তুমি কেবল চাষের মালিক, গ্রাসের মালিক নয়!
. ৩
স্বদেশ স্বদেশ কর্চ্ছ কারে, এদেশ তোমার নয়,
এই যে জাহাজ, এইযে গাড়ী, এইযে পেলেস্---এইযে বাড়ী,
এইযে থানা জেহেলখানা---এই বিচারালয়,
লাট, বড়লাট তারাই সবে, জজ মাজিষ্টর তারাই হবে,
চাবুক খাবার বাবু কেবল তোম্রা সমুদয়---
বাবুর্চি, খানসামা, আয়া, মেথর মহাশয়!
. ৪
স্বদেশ স্বদেশ কর্চ্ছ কারে, এদেশ তোমার নয়
আইন কানুনের কর্ত্তা তারা, তাদের স্বার্থ সকলধারা,
রিজার্ভ করা সুখ সুবিধা তাদের ভারতময়,
তোমার বুকে মেরে ছুরি, ভর্ ছে তাদের তেরজুরি,
তাদের তারেচে তাদের নাচে তাদের “বলে” ব্যয় ;
একশ রকম টেক্স দিবা, ব্যায়ের বেলায় তোমার কিবা,
গাধার কাছে বাধার বল বাঘের কবে ভয়?
স্বদেশ স্বদেশ কর্চ্ছ কারে এদেশ তোমার নয়!
. ৫
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
যেদেশ যাদের অধিকারে, তারাই তাদের বল্ তে পারে,
কুকুর মেকুর ছাগল কবে দেশের মালিক হয়?
যে সব বাবু বিলাত গিয়ে, ‘বাবুনি’দের সঙ্গে নিয়ে,
প্রসবিয়ে আনছে তাদের শাবক সমুদয়,
‘বৃটিশ বরণ’ ব’লে দাবী---কর্লে নাকি বিলাত পাবি?
লজ্জাহীনের গোষ্ঠি তোরা নাইক লজ্জা ভয়!
এই যদিরে ‘বৃটিশ বরণ’ মরণ কারে কয়?
. ৬
স্বদেশ স্বদেশ করিস কারে, এদেশ তোমার নয়,
কা’র স্বদেশে কাদের মেয়ে, এমনতর পথে পেয়ে,
জোর-জবরে গাড়ীর ভিতর শাড়ী কেড়ে লয়।
নপুংসকের গোষ্ঠি তোরা, জন্ম-অন্ধ কানা খোঁড়া,
ভিস্তিয়ালাস পাঙ্খাকুলি---পীলা ফাটায় ভয়!
কার স্বদেশে সর্ব্বনেশে এমন অভিনয়?
. ৭
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়!
যাহার লাঠী তাহার মাটী, চিরদিনের কথা খাঁটি,
এত নহে চা’র পেয়ালা চুমুক দিলে জয়!
রুখতে যারা কাঁপে ডরে, মারবার আগে আপ্ নি মরে,
খুসির বদল খুসি করে---‘সেলাম মহাশয়!’
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়!
.
৮
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়!
সোনার বাঙ্গলা সোনার ভূমি, হীরার ভারত বল্লে তুমি,
ভারত তোমার আসবে কোলে, এই কি মনে লয়?
‘সোনা’ ‘যাদু’ মিষ্টি ভাষে, ছেলে মেয়ে কোলে আসে,
স্বরাজ তাতে নাহি নারাজ, চাহে কাজের পরিচয়!
কবির কথায় তুষ্ট নাহে ‘ভবি’ মহাশয়!
. ৯
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
তাদের রাজ্যে তোদের থাকা, তাদের বেঙ্কে তোদের টাকা,
তাদের নোটে ভারত ঢাকা---বিশাল হিমালয়!
তাদের কলে তোরাই কুলি, তারাই নিচ্ছে টাকাগুলি,
তোদের কেবল ভিক্ষার ঝুলি---ক্ষুধায় মৃত্যু হয়!
তারাই রাজা, তারাই বণিক, তারাই সমদয়!
. ১০
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
কিসের বা তোর নেপাল ভুটান, সবাই তাদের পায়ে লুটান,
কুত্তার মতন পুচ্ছ গুটান---শিয়াল দেখে ভয়!
ওই যে ওদের ‘কাটমুণ্ডু’ সত্যই ও কাটামুণ্ডু,
রাহুর যেমন মরা তুণ্ডু হা করিয়ে রয়!
কেতুর মতন পুচ্ছ লুটান ভুটান মহাশয়!
. ১১
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
করদ মিত্র---নবাব রাজা, সবাই দেখি দক্ষ সাজা,
একটাও নয় মানুষ তাজা---অজার মাথা বয়,
ওগুলা সব মানুষ হলে, কোন্ দিকে কে যেত চলে,
ডেনিস পেনিস টেনিস খেলে ভারত ভূমি লয়?
মরু দেশের গরুকাটা ভারত কর জয়?
. ১২
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
যখন বাদশা মুসলমান, তখন তাদের ‘হিন্দুস্থান’,
ইংরেজ ‘ইণ্ডিয়া’ বলে এখন কেড়ে লয়!
অযোধ্যা কই---‘আউধ’ এযে, দাক্ষিণাত্য---ডেকান সে যে,
‘সিলনে’ গিলছে লঙ্কা---মুক্তা মণিময়!
ডমাউন আর ডিউ গোয়া, চুণি পান্না সোনার মোয়া,
যায় না তাদের ধরা ছোঁয়া, কে দেয় পরিচয়?
বারণাবত---ইন্দ্রপ্রস্থ, কই সে তোদের সমস্ত,
‘দিল্লী’র পরে ‘ডীল্লি’ হলো, আরো বা কি হয়!
স্বদেশ বলে কর্লে দাবি, আর কি তোরা এদেশ পাবি?
এ নয় তোদের ভারতবর্ষ চির-হর্ষময়!
. ১৩
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
কই সে শিল্প, কই সে কৃষি, কই সে যজ্ঞ---কই সে ঋযি,
কই সে পুণ্য তপোবনে ব্রহ্ম-বিদ্যালয়?
কোথায় বা সে ব্রহ্মচর্য্য, অসীম স্থৈর্য্য, অসীম ধৈর্য্য,
কই বা উগ্র সে তপস্যা---ইন্দ্রে লাগে ভয়?
কোথায় অসীম শৌর্য্যে-বীর্য্যে অসুর পরাজয়?
স্বপ্নে দেখে গোলাগুলি, চমকে উঠিস্ ভেড়াগুলি,
উইয়ের ঢিবি দেখে তোদের শিবির বলে ভয়!
প্তিজনের প্রতি বক্ষে, কোটি কোটি লক্ষে লক্ষে,
কই সে তোদের দেশ ভক্তির দুর্গ সমুদয়,
বিশ্বগ্রাসী অগ্নিসিন্ধু, কই সে বুকের রক্তবিন্দু,
ষ্পর্শ থাকুক দর্শনে তার শত্রুকুল ক্ষয়!
লোহার চেয়ে মহাশক্ত, ভক্ত-বীরের মাংস রক্ত,
তাদের বুকের অস্থি দিয়া বজ্র তৈয়ার হয়,
ব্রহ্মাবর্ত্তে প্রথম আসি, তাইতে তারা দৈত্য নাশি,
পুণ্যভূমি ভারতভূমি প্রথম করে জয়!
তাদের ‘স্বদেশ’ ভারত ছিল, তোদের স্বদেশ নয়!
. ঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
তেরজুরী - ট্রেজারী (Treasury)
বলে - বল নাচে
মেকুর - বিড়াল
বাবুনী - বাবুর স্ত্রী
বৃটিশ বরণ - বিলাতে ভুমিষ্ঠ সন্তান
সুরাদলন-সংগ্রামে সাজ বন্ধুগণ সামাজিক-সঙ্গীত কবি ত্রৈলোক্যনাথ সান্ন্যাল (১৮৪০ - ৩.২.১৯১৬) প্রসাদকুমার মুখোপাধ্যায় দ্বারা সংগৃহিত “সহস্র-সঙ্গীত” সংকলন (১৮৯২) থেকে নেওয়া।
॥ মল্লার, আড়াঠেকা॥
সুরাদলন-সংগ্রামে সাজ বন্ধুগণ। কর চূর্ণ মদ্যপাত্র, পাপ শুণ্ডিকাভবন॥ প্রচণ্ড অসুরদল, প্রচারি সুরা গরল, মহা পাপে ডুবাইল, ধর্ম্ম নীতি জ্ঞান ধন।
কাঁদিছে বিধবা কত, হইয়ে সর্ব্বস্ব হত, শুনিলে বিদরে প্রাণ ঝরে দুনয়ন। ব্যভিচার কুদৃষ্টান্তে, প্রবল কলঙ্ক স্রোতে, করিতেছে সর্ব্বনাশ ঘোর অনিষ্ট সাধন॥
|
ভাই ভাই কবি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (২৬.৬.১৮৩৮ - ৮.৪.১৮৯৪)।
সমবেত বাঙ্গালিদিগের সভা দেখিয়া।
১
এক বঙ্গ ভূমে জনম সবার,
এক বিদ্যালয়ে জ্ঞানের সঞ্চার,
এক দুঃখে সবে করি হাহাকার,
. ভাই ভাই সবে, কাঁদ রে ভাই।
এক শোকে শীর্ণ সবার শরীর,
এক শোকে বর নয়নের নীর,
এক অপমানে সবে নতশির,
. অধম বাঙ্গালি মোরা সবাই॥
২
নাহি ইতিবৃত্ত নাহিক গৌরব,
নাহি আশা কিছু নাহিক বৈভব,
বাঙ্গালির নামে করে ছিছি রব,
. কোমল স্বভাব, কোমল দেহ।
কোমল করেতে ধর কমলিনী,
কোমল শয্যাতে, কোমল শিঞ্জিনী,
কোমল শরীর, কোমল যামিনী,
. কোমল পিরীত, কোমল স্নেহ॥
৩
শিখিয়াছি শুধু উচ্চ চীত্কার !
“ভিক্ষা দাও ! ভিক্ষা দাও ! ভিক্ষা দাও !” সার
দেহি দেহি দেহ বল বার বার
. না পেলে গালি দাও মিছামিছি।
দানের অযোগ্য চাও তবু দান,
মানের অযোগ্য চাও তবু মান,
বাঁচিতে অযোগ্য রাখ তবু প্রাণ,
. ছিছি ছিছি ছিছি !
. ছি ছি ছি ছি ছি !
৪
কার উপকার করেছ সংসারে ?
কোন্ ইতিহাসে তব নাম করে ?
কোন্ বৈজ্ঞানিক বাঙ্গালির ঘরে ?
. কোন্ রাজ্য তুমি করেছ জয় ?
কোন্ রাজ্য তুমি শাসিয়াছ ভাল ?
কোন্ মারাথনে ধরিয়াছ ঢাল ?
এই বঙ্গভূমি এ কাল সে কাল
. অরণ্য, অরণ্য অরণ্যময়॥
৫
কে মিলাল আজি এ চাঁদের হাট ?
কে খুলিল আজ মনের কপাট ?
পড়াইব আজি এ দুঃখের পাঠ,
. শুন ছি ছি রব, বাঙ্গালির নামে,
য়ুরোপে মার্কিনে ছিছি ছিছি বলে,
শুন ছিছি রব, হিমালয়তলে,
শুন ছিছি রব, সমুদ্রের জলে,
. স্বদেশে, বিদেশে, নগরে গ্রামে॥
৬
কি কাজ বহিয়া এ ছার জীবনে,
কি কাজ রাখিয়া এ নাম ভুবনে,
কলঙ্ক থাকিতে কি ভয় মরণে ?
. চল সবে মরি পশিয়া জলে।
গলে গলে ধরি, চল সবে মরি,
সারি সারি সারি, চল সবে মরি,
শীতল সলিলে এ জ্বালা পাসরি,
. লুকাই এ নাম, সাগরতলে॥
বিদায় হও মা ভগবতি
হুতোমপ্যাঁচা, কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০ - ২৪.৭.১৮৭০)।
কবির ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে রচিত “হুতোমপ্যাঁচার নক্সা” গ্রন্থের “দুর্গোত্সব” অধ্যায়ের
গান।
গান
বিদায় হও মা ভগবতি! এ সহরে এসো নাকো আর।
দিনে দিনে কলিকাতার মর্ম্ম দেখি চমত্কার॥
জষ্টিসেরা ধর্ম্ম-অবতার, কায়মনে কচ্চেন সুবিচার।
এদিকে ধূলোর তরে রাজপথেতে চেঁচিয়ে চেয়ে চলা ভার॥
পথে হাগামোতা চলবে না, লাহোরের জল তুলতে মানা,
লাইসেন্সচেক্স মাথটচাঁদা, পাইখানায় বাসি ময়লা রবে না।
হেল্থ অফিসর, সেতখানার মেজেষ্টর, ইনকমের আসেসর সাল্লে সবারে
আবার গবর্ণরের গুয়েদৃষ্টি, সৃষ্টিছাড়া ব্যবহার।
অসহ্য হতেছে মাগো! অসাধ্য বাস করা আর॥
জীয়ন্তে এই ত জ্বালা মাগো! ---মলেও শান্তি পাবে না,
মুখাগ্নির দফা রফা কলেতে করবে সত্কার।
হুতোমদাস তাই সহর ছেড়ে আসমানে করেন বিহার॥
প্রতিবাদী কবিতার দেয়ালিকা
|
|
|
এই পাতাটি পাশাপাশি, ডাইনে-বামে ও কবিতাগুলি উপর-নীচ স্ক্রল করে! This page scrolls sideways < Left - Right >. Poems scroll ^ Up - Down v.
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কত কাল পরে বল ভারত রে!
দুখ-সাগর সাঁতারি পার হবে?
অবসাদ-হিমে ডুবিয়ে ডুবিয়ে,
ও কি শেষ-নিবেশ রসাতল রে।
নিজ বাসভূমে, পরবাসী হলে,
পর দাসখতে সমুদায় দিলে।
নিজ অন্ন পরে, কর পণ্যে দিলে,
পরিবর্ত্ত ধনে দুরভিক্ষ নিলে।
তুমি অন্ধ হয়ে, পরস্বর্গ সুখে,
তুমি আজও দুখে, কালও দুখে !
নিজ ভাল বুঝে, পর মন্দ নিলে,
ছিল আপন যা ভাল তাও দিলে !
পর হাতে দিয়ে, ধনরত্ন সুখে,
বহ লৌহ-বিনির্ম্মিত হার বুকে।
পর ভীষণ আসন, আনন রে,
পর পণ্যে ভরা তন্থু আপন রে।
পর দীপশিখা, নগরে, নগরে,
তুমি যে তিমিরে, তুমি সে তিমিরে।
ঘুচি কাঞ্চন-ভাজন, শোধ শিরে,
হ'লো ইন্ধন কাচ প্রচার ঘরে।
খনিখাত খুঁড়ে, খুঁজিয়ে খুঁজিয়ে,
পূঁজিপাত নিলে ফুটিয়ে লুটিয়ে।
ভারত বিলাপ কবি গোবিন্দচন্দ্র রায় (১৮৩৮ - ১৯১৭)। কবির "গীতিকবিতা” (১৮৮২) গ্রন্থের কবিতা। এইরূপে
আমরা পেয়েছি ১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য দ্বারা সঙ্কলিত ও সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও
কবিতার সঙ্কলন ১৭৪১ -১৯৪৭” থেকে।
লভিয়ে বলবুদ্ধি, পরের বসে,
হত জীবন চা-অহিফেন চষে।
শিখিলে যত জ্ঞান. নিশীথে জেগে,
উপযুক্ত হল পরসেবা লেগে।
হলো চাকরী সার, যথায় তথায়,
অপমান সদায় কথায় কথায়।
শুনিবে বল কে, তব আপন কে,
পর-দাস-দশায় বধিব সবে।
অহ! কে কহিবে এ সুদীর্ঘ কথা,
সমসিন্ধু অপার অগাধ ব্যথা।
বিধি বাদী হলে, পরমাদ রটে,
পরমাদ হিতে হতবোধ ঘটে।
কি ছিলে কি হলে, কি হতে চলিলে,
অবিবেক বশে কিছু না বুঝিলে।
নয়নে কি সহে, এ কলঙ্ক-দুখ,
পর রঞ্জন অঞ্জনে কাল মুখ।
নিজ শোণিত শোষি, পরে পুরিলে,
তুষিতে কুল-শীল-স্বধর্ম্ম দিলে।
পর বেশ নিলে পর দেশ গেলে,
তবু ঠাঁই মিলে নাহি দাস ব'লে।
মন চায় কথায় কৌপীন পরি,
ভব দুখ গেয়ে সব দেশ ঘুরি!
শিখিলে পর শিক্ষিত জ্ঞান যত।
কিছু না, কিছু না, শুধু বাক্য-গত।
কহিতে বুক চায়, দু’ভাগ হতে,
নয়নে উথলে জলস্রোত শতে।
কত নিগ্রহ নিত্য অশেষ মতে,
সহিতেছ নিরন্তর ঘট-পথে।
তব নির্ভর নিত্য পরের করে,
অশনে বসনে গননের তরে।
মিলি কার্য্য করে, পণ্ড কীটগণে,
তব যুদ্ধ কদাচন ভ্রাতৃগণে।
যদি দেয় পরে স্বরগের সুখে,
তব শ্লাঘ্য নহে স্ববশের দুখে।
বন বর্ব্বরও স্ববশত্ব খুঁজে,
তবু ভারত সে সব নাহি বুঝে।
তব আশ কিসে? তুমি নাশ তরে,
হয় এর করে, নয় ওর করে।
অহ! যে দিকে আঁখি পড়ে ফিরিতে,
নিরক্ষে শুধু পঞ্জর চারি ভিতে।
কি হলে, কি হলো শূরবাসী জনে,
উনমত্ত সুরা রসনে ব্যসনে।
র’লো কাগজ সার ধনীর ঘরে,
সুদবৃত্তি হালো দিনপাত তরে।
যত ক্ষত্রকুল দরবান হ'লো,
দ্বিজ পাচক ঘোটকরান হ’লো।
সব জ্ঞান রলো পুঁথি পদতলে,
হ'লো পল্পবগ্রাহক বিজ্ঞদলে।
র’লো ধর্ম্ম কি, ভক্ষ-অভক্ষ নিয়ে,
তমজালে বিকীর্ণ সুদিন হিয়ে।
অলসে অবশে পরগ্রাস রসে,
ক্রমে দীন দশা দিবসে দিবসে।
হয় লাজ মনে গত আর্য সনে,
গণিকে যত এ সব হীন জনে।
ছি! ছি! আজি এ কুৎসিত বেশ পরে,
কি সুখে সকলে ঘুম যাও ঘরে।
ধর প্রীতি মনে যদি দেশ বলে,
ভাস রে সকলে, ভাস অশ্রজলে।
ত্যজ রে ত্যজ, আত্মসুখের কথা,
ত্যজ আমোদ-ভোগ-বিলাস বৃথা।
পর কষ্ট বিভূতি শরীরগণে,
চল চৌদিক সাধন আহরণে।
গত কালের তাবত পাপফলে,
ধৌত আজি সবে নয়নের জলে।
খুইয়ে নিজ দেশ মলিন মুখে,
ভজনায় কি পৌরুষ স্বার্থসুখে।
যদি মানুষ, মানুষ নাহি হ'লে
ফললাভ কি মানুষ নাম নিলে?
যদি কাক হয়ে কিছু নাহি হ'বে
কর জীবনধারণে ক্ষান্ত সবে।
ডুবি যাক্ জলে তবে বাস যথা,
ভুলি যাক্ সবে তব নামকথা।
কভু যেন কেহ নাহি পায় কবে,
খুঁজি ভারত নামক দেশ ভবে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভারত-ললনা
দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় (২০.৪.১৮৪৪ - ৭.৬.১৮৯৮)
কবির “জাতীয় সংগীত” গ্রন্থ কে নেওয়া। আমরা নিয়েছি ১৯০৫ সালে প্রকাশিত
দুর্গাদাস লাহিড়ী সংকলিত ও সম্পাদিত, ২২৭ জন কবির লেখা ৫৬৬৩টি গানের
সংকলন “বাঙ্গালীর গান” থেকে।
না জাগিলে সব ভারত-ললনা,
এ ভারত আর জাগে না জাগে না।
অতএব জাগ, জাগ গো ভগিনী,
হও "বীর-জায়া, বীর-প্রসবিনী"।
শুনাও সন্তানে, শুনাও তখনি,
বীর-গুণ-গাথা-বিক্রম-কাহিনী,
স্তন্যদুগ্ধ যবে পিয়াও জননী।
বীরগর্বে তার নাচুক ধমনী,
তোরা না করিলে এ মহাসাধনা,
এ ভারত আর জাগে না জাগে না।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কী আছে মোদের --- না আছে কী।
আছে আমাদের নঙ্গল-জোঁয়াল ;
আছে আমাদের দাম্ রা আবাল ;
কড়া-পড়া পা রোদে-পোড়া-ছাল,
এ উভয়েই আছে --- বহিতে হাল।
লজ্জা ঢাকিবার আছে নেঙ্গটি।
কী আছে মোদের --- না আছে কী॥
আছে আমাদের ভারতমণ্ডল ---
ফলশষ্যপূর্ণা, খাটিবার বল ---
আছে শরীরেতে ; কাস্তে লয়ে হাতে,
তাড়াতাড়ি পারি কাটিতে ফসল।
পাই তুষ, নাড়া, বিচালি সকল ;
তণ্ডুল ঘরেতে নাই সে কেবল।
খাইতে না পাই তাতে কি দুখী,
কী আছে মোদের --- না আছে কী॥
বাণিজ্য বিষয়ে ছোটো কি আমরা,
ধরি সদা হাতে দাঁড়ি-বাটখাড়া।
আমাদের কর্ম বেচা-কেনা করা।
মোরা নইলে কার ব্যবসা ঘটে,
তবে কি না লাভ পরেরই বটে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কী আছে মোদের --- না আছে কী
কবি জগদ্বন্ধু ভদ্র (১৮৪২ - ১৯০৬)। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সংকলিত ও সম্পাদিত, ২২৭ জন কবির
লেখা ৫৬৬৩টি গানের সংকলন “বাঙ্গালীর গান” থেকে নেওয়া।
. ॥ গান॥
আমরাই সব --- লাভে করে কী,
কী আছে মোদের --- না আছে কী॥
মাস্টার, কেরানি, বাজার-সরকার,
পদে একচেটে আছে অধিকার।
খানসামা, প্যাদা, কে আছে আর,
রেলওয়ে মোরা স্টেশন-মাস্টার ;
আমাদের হাতে কত কাজের ভার।
ম্যাজিস্ট্রেট, জজ প্রভৃতি চকুরি ---
আমাদের নাই ; তাতে কী হে ভাই,
বিদেশীয়েরা নেয় ? নেক তুচ্ছ করি।
অমন ঝুঁকি তে মোরা কি পা দি ;
কী আছে মোদের --- না আছে কী॥
শিল্পে আমাদেরে কে পারে ছাড়াতে,
সাক্ষী তার দেখো, ঢেঁকি, চরকা, তাঁতে।
দুরবিন, কম্পাস, রেলের গাড়িতে,
পারে কি তণ্ডুল, সুতা, বস্ত্র দিতে ;
তবে বিদেশিরা বড়ো কি কলেতে,
কীসে মোরা ছোটো, বলো না দেখি।
কী আছে মোদের ? না আছে কী॥
মাটি, কাঠ, খড়, আছয়ে সকল,
আছে নিপূণতা গৃহ নির্মিবার ;
তবে যে মোদের কুটিরে বাস,
হা, হা, সেটি শুদ্ধ নম্রতা-প্রকাশ।
চালে খড় নাই, থেকে কী ফল,
গায়েতে পড়িবে --- পড়ুক জল,
কিছুতেই মোরা হই না বিকল।
ক্ষুদ্র কাজে মন, দিবো কী কারণ।
আমরা কি ছোটো, নচ্ছার পাজি।
কী আছে মোদের --- না আছে কী॥
সৈনিক-বিদ্যায় নহি মোরা কম ;
পত্নীরে তাড়াতে কালান্তক যম।
ছেলেরে ঠেঙাতে ভীমশূরোত্তম ;
কাটি শত শত পেনের মাথা।
কলম-কামান যখন চালাই,
দিস্তা দিস্তা তোপে কাগজ উড়াই।
কোন জাতি ধরে এ হেন ক্ষমতা,
রক্তপাতে বটে বিরত থাকি ;
সেটি ধর্মভয়ে --- ধরমসাখী।
কী আছে মোদের --- না আছে কী॥
নির্বোধ বেটারা বলে শুনতে পাই,
‘বাঙালি সমাজে একতা নাই’।
কেন না থাকিবে, দেখো রাত্রি দিবে,
ধর্মঘট কত করি ঠাঁই-ঠাঁই।
কারো জাতি মারি, কারো বন্ধ করি ---
কুল-পুরোহিত, জ্ঞাতি, ধোপা, নাই।
আর দেখো, শ্রাদ্ধ-বিবাহ উত্সবে,
হয়ে একতায় একত্রিত সবে,
খাই লুচি, লাবড়া, সন্দেশ, বরফি ;
সপাসপ মারি বুন্দে ক্ষীর, দধি।
একতার বল, কী আর বাকি ?
কী আছে মোদের --- না আছে কী॥
বংশের মর্যাদা আমাদের যত,
অপর জাতির আছে কি তত,
মর্যাদা-কারণে কন্যা বিনাপণে,
দেই না বিবাহ, দৃঢ় কুলব্রত।
দুধের বালক কুলীন হইলে
বুড়ো মেয়ে তার দেই গেঁথে গলে।
কিম্বা, ঝোপ বুঝে, বুড়ো এঁড়ে বরে,
পাঁচ সাত মেয়ে দেই এক কালে।
ছেলে বিয়ে দিতে হইয়া কশাই,
কনের পিতার তিন কুল খাই।
ভদ্রাসনে তার ঘুঘু যে চরাই,
বংশের মর্যাদা সামান্য একি!
কী আছে মোদের --- না আছে কী॥
‘নাই আমাদের কার্য-তত্পরতা’
যে বলে, প্রকাশ তাহারই মূর্খতা।
যে আজ্ঞা হুজুর --- বলিতে তত্পর,
আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কে অপর ;
অনুকরণেতে কত নিপুণতা।
দানশীলদের বদান্যতাভোগী,
দাতব্য-চিকিত্সা-আলয়ের রোগী,
জন্মাতে মোদের কেমন পটুতা।
ধামা-ধরা-কাজে, মানব সমাজে,
কারে কি আমরা দখল দিই।
কী আছে মোদের --- না আছে কী॥
‘বাঙালি অবোধ’ বলে কেহ কেহ,
যে বলে, সে বোকা --- কী তার সন্দেহ।
পর-ভাষা রড়ি, পর-ভাব চুরি,
করি, নিজ-ভাব বলিয়া চালাই ;
তোতাগিরি কত সর্বত্র ফলাই।
লিখি ইতিহাস, লিখি নবন্যাস,
আর কত শত লিখি ছাইপাঁশ।
সভা-সমিতিতে, কংগ্রেসে, বেদিতে,
কেমন বক্তৃতা-ফোয়ারা ছুটাই।
পেটেন্ট দাওয়াই করি আবিস্কার,
রোগশোকহীন করি এ সংসার।
আলু অর্ধখান বাঁধিয়া কারেতে
রাঙেতে মুড়িয়া ঝুলাই গলেতে ;
রোগীর বগলে চুঙ্গিটি বসাই,
বুকে পিঠে তার লাগাই সানাই ;
সাজিয়া ডাক্তার, কশে লই ফি।
কী আছে মোদের --- না আছে কী॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
পরাধীনতা কি কষ্ট কবি লক্ষ্মীমণি দেবী
(জন্ম সম্ভবতঃ উনিশ শতকের মাঝামাঝি, মৃত্যু অজ্ঞাত)। কলিকাতা বামাবোধিনী সভা
হতে প্রকাশিত, বামারচনাবলী, প্রথম ভাগ, ১১মাঘ ১২৭৮ (জানুয়ারী ১৮৭২)।
পরাধীন যেই জন তার কোথা মান।
দিন দিন হয় তার কত অপমান॥
পরাধীন মনুষ্যের কিছু নাহি সুখ।
শয়নে ভোজনে তার সদাই অসুখ॥
আপনার মন নহে আপনার বশ।
কত কষ্টে রহে লোক হয়ে পরবশ॥
তোষামদ করে থাকা সহজাত নয়।
দিবা নিশি নয়নেতে বারিধারা বয়॥
পরের অধীনে রাখি আপন জীবন।
তথাপি না কোন কালে পায় তার মন॥
পরের রাখিতে মন চক্ষে বহে জল।
সুখসূর্য একেবারে যায় অস্তাচল॥
মন প্রাণ সচঞ্চল কখন কি হয়।
পদ্মপত্রবারি যথা স্থির নাহি রয়॥
পরাধীন নর নারী কারাবাসী মত।
সতত মলিন মুখ দুঃখ কব কত॥
প্রভুর বদন হেরে উড়ে যায় প্রাণ।
কি জানি কখন হয় দণ্ডের বিধান॥
কথায় কথায় বলে দূর হতে হবে।
আমার গৃহেতে আর কতকাল রবে॥
পরাধীন লোক নাহি নিজ কার্য পায়।
পরেতে গঞ্জনা করে ছুতায় লতায়॥
পরের যোগাতে মন ওষ্ঠাগত প্রাণ।
ওহে নাথ! পরাধীনে কর পরিত্রাণ॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বঙ্গনারী
দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় (২০.৪.১৮৪৪ - ৭.৬.১৮৯৮)
কবির “জাতীয় সংগীত” গ্রন্থ কে নেওয়া। আমরা নিয়েছি ১৯০৫ সালে প্রকাশিত
দুর্গাদাস লাহিড়ী সংকলিত ও সম্পাদিত, ২২৭ জন কবির লেখা ৫৬৬৩টি গানের
সংকলন “বাঙ্গালীর গান” থেকে।
কি পাপে পাঠালে বিধি করে বঙ্গনারী।
প্রকৃতিরঞ্জিত ছবি জন-মনোহারী॥
জলে স্থলে শূণ্যে একা, সুরূপ লাবণ্যমাখা।
এ পোড়া নয়ন আছে দেখিতে না পারি।
পিঞ্জরের পাখীসম, দিবানিশি অষ্ট যাম,
ঘুরে ফিরে এক ঠাঁই, বার বার তা নেহারি।
সেই বাড়ী সেই ঘর, সেই দ্বার নিরন্তর,
দেখে দেখে ক্লান্ত আঁখি আর ত দেখিতে নারি।
এ চক্ষের কি এই ফল, দিবানিশি অশ্রুজল,
বহিছে অজস্রধারে, যেন নির্ঝরের বারি।
মোরে অন্ধকারে রাখো, প্রকৃতির রূপ ঢাকো,
তামসী নিশার সম ঘোর আঁধার প্রসারি॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
উঠ জাগো শ্রমজীবী ভাই!
উপস্থিত যুগান্তর
চলাচল নারীনর
ঘুমাবার আর বেলা নাই,
উঠ জাগো ডাকিতেছি তাই।
ঘোর রোল ভারতে উঠিল
অগ্রসর অগ্রসর
এই রব ঘোরতর
শুনে কর্ণ বধির হইল,
উঠিতেছে যে যেখানে ছিল।
ওই দেখ চলেছে সকলে,
মধ্যবিত্ত ভদ্র যারা
সর্বাগ্রেতে ধায় তারা
পায় পায় ধনীরাও চলে,
ছোট বড় ধায় কুতৃহলে।
জাগিবার বাকী কেবা আর
যাহারা অবলা বলে
বিখ্যাত ধরাতলে,
সেই নারী উঠেছে এবার,
মহানন্দে হয় আগুসার!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শ্রমজীবী
কবি শিবনাথ শাস্ত্রী (৩১.১.১৮৪৭ - ৩০.৯.১৯১৯)
১৯৯০ সালে প্রকাশিত, সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত, “গণসংগীত সংগ্রহ” কাব্য সংকলনের কবিতা।
নবদৃশ্য ভারতে উদয়!
নবরাজ সমাগমে
নবশক্তি নবোদ্যমে
পূর্ণ আজি সবারি হৃদয়
আজ দেশ যেন অগ্নিময়।
হেনকালে কে ঘুমাতে পারে!
অকর্মণ্য জড় যারা
ঘুমায় ঘুমাক তারা!
থাকে থাকে অজ্ঞান আঁধারে,
শ্রমজীবি! ডাকিছে তোমারে।
সমাজের মূল তোরা ভাই!
কে দেখেছে ধরাতলে
মূল বিনা তরু চলে।
মাথা চলে তাতে লাভ নাই ;
যথা ছিল রহিবে তথায়।
ওই দেখ সাগরের পারে,
শ্রমজীবী শত শত
কেমন সংগ্রামে রত।
এই ব্রত---রবে না আঁধারে
আয় তারা দেখি যে সবারে।
আয় তবে শ্রমজীবীগণ
নবোৎসাহে চলে আর,
সময় বহিয়া যায়,
ঘোরতর বাজিতেছে রণ
যা করিয়ে সার্থক জীবন।
শ্রম নামে কল্পতরু
অতি চমৎকার,
যাহা চাবে তাহা পাবে
নিকটে তাহার।
ঃঃঃঃঃঃঃ
. (১)
অভাগীর কেউ নাই! কার কাছে কাঁদিব?
এসব দুঃখের কথা কার কাছে বলিব?
. তাই বলি বিভাবরি!
. অভাগীকে কৃপাকরি
আঁধার অঞ্চলে ঢাকো, প্রাণ ভরে কাঁদিব,
তোমারি নিকটে সখি! অশ্রুজলে ভাসিব!
. (২)
কত শত অশ্রু তুমি রেখেছ ত ঢাঁকিয়া,
সহস্র নিশ্বাস যায় বায়ু সনে বহিয়া।
. মোর অশ্রু সেই সনে,
. রাখ সখি! সংগোপনে ;
জুড়াই তাপিত প্রাণ প্রাণ-ভরে কাঁদিয়া,
তোমার অঞ্চল যাক অশ্রুজলে ভিজিয়া।
. (৩)
অয়ি! সুখময়ি নিশি! তারা-হার পরিয়া,
বসুধার সিংহাসনে রহেছ ত বসিয়া।
. চেয়ে দেখ পদতলে
. পড়ে লতা ভাসে জলে,
তুলে লও প্রাণ-ফুল, দয়া করে ছিঁড়িয়া,
নিরমল ফুল থাক তারা সনে মিশিয়া |
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
পরিত্যক্তা রমণী
কবি শিবনাথ শাস্ত্রী (৩১.১.১৮৪৭ - ৩০.৯.১৯১৯)। ১৮৮০ সালে প্রকাশিত কবির “পুষ্পমালা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
॥ সময়---নিশীথ। সমীপে, নির্ব্বাণোন্মুখ প্রদীপ। নবপ্রসূতা কুমারী শয়ানা॥
. (৪)
অথবা পার লো যদি হাহাকার বহিতে,
অভাগীর হাহাকার লও তথা ত্বরিতে,
. যথা সেই নিরদয়,
. ঘুমাইছে এ সময় ;
যাও তথা হাহাকারে নিদ্রাভঙ্গ করিতে,
নিদ্রাভঙ্গে অভাগীর দুঃখ-কথা কহিতে।
. (৫)
অভাগীর হাহাকারে যেই আঁখি মেলিবে,
অমনি রজনি! তুমি ধীর স্বরে বলিবে,
. “ঘুমাও এরবে কেন
. নয়ন মেলিলে হেন?
অবলার হাহাকার কেন বৃথা শুনিবে?
ঘুমাও কাঁদুক তারা চিরকাল কাঁদিবে।”
. (৬)
রে দীপ! তোমার তৈল ফুরাইয়া আসিছে,
তাই মরি শিখা তব নিবু নিবু করিছে ;
. আশা-তৈল পামরার
. বিন্দুমাত্র নাহি আর,
তবু কেন প্রাণ-শিখা এতক্ষণ জ্বলিছে ?
দুর্ব্বল হৃদয়বর্ত্তি হুহু করে পুড়িছে ?
. (৭)
পুড়িতে পুড়িতে শেষ অবশ্যই হইবে ;
তখন এ পাপ শিখা একেবারে নিবিবে।
. হাহাকার, অশ্রুজল,
. ঘুচে যাবে এ সকল ;
নির্দ্দয় পতির আশ সেই দিন মিটিবে,
সেই দিন কমলের শতদল ফুটিবে।
. (৮)
বিপন্নের বন্ধু তুমি চিরদিন ঘোষণা,
তবে কেন মৃত্যু! আজ অভাগীরে লও না ?
. নারী প্রাণে কত সয়
. তাই যদি দেখা হয়,
যথেষ্ট হয়েছে! সত্য আর প্রাণে সয় না,
ফেটে মরি পুড়ে মরি সত্য আর সয় না।|
. (৯)
একা ছিনু, ছিনু ভাল, একাকিনী পড়িয়া
কাঁদিতাম এ বিজনে অশ্রুজলে ভাসিয়া,
. কত কষ্ট আছে ভালে,
. কেন এলি হেন কালে ?
নিজে মরি তোমাকে লো কি করিব লইয়া ?
যাই যদি কার কাছে যাইব লো রাখিয়া ?
. (১০)
তোমারি মায়ায় প্রাণ আর যেতে চায় না,
অনল কি বিষ-পানে আর মন ধায় না।
. এ হেন জ্বালায় মোরে
. চিরদিন রাখিবারে,
এলে কি রে ? একি কাণ্ড যে তোমারে চায় না,
তারি ঘরে এলে তুমি! অন্য সেধে পায় না।
. (১১)
এখন নিতান্ত শিশু কিছু তুমি জান না,
সর্ব্বনেশে মা মা, কথা বলিতে পার না।
. “কেন মা কাঁদিস” বলে
. জিজ্ঞাসিবে বড় হলে,
কি উত্তর দিব তার ?---প্রাণে তাত সবে না ;
কাঁদিবে আমার সনে তাও প্রাণে সবে না।
. (১২)
স্বর্গের বিহঙ্গ! তুমি নিজ পক্ষ ধরিয়া,
অতএব এই বেলা শীঘ্র যাও উড়িয়া।
. চিরদিন কাঁদিবারে,
. কেন এলে কারাগারে ?
মায়ের দুর্দশা দেখে উপদেশ লইয়া,
নিষ্কলঙ্ক মূর্ত্তি! যাও মানে মানে উড়িয়া।
. (১৩)
জন্মেছি কাঁদিতে আমি মরিব ত কাঁদিয়া,
পড়ে আছি, পড়ে থাকি তুমি যাও চলিয়া ;
. এই বেলা যাও তবে ;
. মা বলে ডাকিবে যবে,
নারিব বিদায় দিতে এইরূপ করিয়া,
দোঁহারে পুড়িতে হবে মায়া জালে পড়িয়া।
. (১৪)
যাইবার কালে তুমি সেই পথে যাইবে,
তাহাকে নিদ্রিত তথা দেখিবারে পাইবে,
. ধীরে বসি পদতলে,
. প্রথমেতে বাবা বলে,
মধুস্বরে ধীরে ধীরে তিন বার ডাকিবে
সম্বোধিয়া তিন বার শেষে চুপ করিবে।
. (১৫)
তাতে আঁখি নাহি মেলে---পদতলে বসিয়া
হে নির্দ্দয়! জাগো “বলে”---জাগাইবে ডাকিয়া ;
. তবু যদি নাহি চায়,
. তখনি ছাড়িবে তায়,
“নারী-হত্যা-পাতকিন্! জাগো জাগো!” বলিয়া
গগণ-বিদারি-স্বরে বলিবে লো ডাকিয়া।
. (১৬)
জাগিলে বলিবে “কেন এনেছিলে আমারে,
সেই অভাগীর সনে ভাসাইতে পাথারে ?
. যাই আমি হে কঠিন!
. সুখে থাকো চিরদিন,
এই আশীর্ব্বাদ সে করিয়াছে তোমারে,
বলে গেনু, কর তুমি যাহা হয় বিচারে।”
. (১৭)
পবিত্র বিহঙ্গ! তুমি এই কথা বলিয়া,
নিরমল পাখা দুটি গগণেতে তুলিয়া,
. বিধুমুখে মৃদু হেঁসে
. উড়ে যেও নিজ দেশে,
তুমি গেলে, পিছু পিছু আমি যাব ছুটিয়া,
কমলের শতদল শোভা পাবে ফুটিয়া।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
“আর্য্য” ---আজি এ ভারতে,
নিষ্ঠুর! এনাম কেন ধ্বনিলে আবার?
. মরুভূমে পিপাসায়,
. ষে জন জ্বলি'ছে, হায় !
“সুশীতল জল” কাণে কেন কহ তা'র?
কেন মৃগ-তৃষ্ণিকার কর আবিষ্কার?
“আর্য্য” ---মোহান্ধ যুবক !
নিশীথ নিদ্রায় তুমি দেখেছ স্বপন ;
. পুনর্ব্বার নিদ্রা যাও,
. যদ্যপি শুনিতে পাও,
এই মধুময় নাম---সুদূর-স্মরণ!
নিশ্চয়, যুবক ! তুমি দেখেছ স্বপন।
স্বপন না হবে যদি,---
অনন্ত সময়-গর্ভে যেই নাম, হায়!
. অকালে হইয়া লয়,
. আজি তছুপরে বয়,
দ্বিতীয় লহরী দর্পে কাঁপায়ে ধরায়,
সেই নাম আজি তুমি পাইলে কোথায়?
ইতিহাসে?--- অবিশ্বাস!
ইতিহাস নহে,---অনুমানের সাগর!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আর্য্য-দর্শন
কবি নবীনচন্দ্র সেন (১০.২.১৮৪৭ - ২৩.১.১৯০৯)।
১৮৮৭ সালে প্রকাশিত, কবির “অবকাশরঞ্জিনী ২য় খণ্ড” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
. তব ইতিহাসে কয়,
. এই সেই আর্য্যালয়,
আমরা সে বীর্য্যবান আর্য্যের কুমার ;
চন্দ্রসূর্য্যবংশে, এই জোনাকি-সঞ্চার?
না, না,---এ যে অসম্ভব!
অসম্ভব,---এই সেই আর্য্যাবর্ত্ত নহে ;
. কুরুক্ষেত্র মহারণ,
. হ'ল যথা সংঘটন,
সেই আর্য্যাবর্ত্ত---কেন করিব প্রত্যয়---
একটী ইংরাজ-ভয়ে কম্পিত হৃদয়!
ছিল যেই---পুণ্যভূমি ;
অনন্ত-ঐশ্বর্য্য-খনি,---ভাণ্ডার ;
. যাহার মলয়ানিলে,
. যাহার জাহ্নবী-জলে,
বহিত, ভাসিত, চির-আনন্দ অপার,
আজি তথা দুর্ভিক্ষের ধ্বনি হাহাকার!
এই নহে আর্য্যাবর্ত্ত ;
আমরাও নহি সেই আর্য্যের কুমার ;
. তাহাদের বীর্য্য-বল,
. ছিল যেন দাবানল,
পৃষ্ঠে তূণ, করে ধনু, কক্ষে তরবার ;
আমাদের---অশ্রজল, ভিক্ষা-পাত্র সার !
কি দোষে না জানি, হায়!
বিধাতার কাছে দোষী আমরা সকল,
. তেজোহীন, বীর্য্য হীন,
. ততোধিক পরাধীন ;
আমাদের---হায়! কোন্ পাপের এ ফল?
করে ভিক্ষা-পাত্র,---কণ্ঠে দাসত্ব-শৃঙ্খল।
হায়! ওই দীনহীন,
অনন্ত-বিষাদ-ভাণ্ড---ভারত-সন্তান,
. ভয়ে বাক্য নাহি সরে,
. স্বেদ সহ অশ্রুঝরে ;
কহিও না তা’র কাণে এই আর্য্যনাম,
বিষাদ-সাগরে তা'র উঠিবে তুফান।
সৃষ্টিকর্ত্তা !---বল নাথ !---
সর্ব্ব-শক্তিমান্ তুমি, তবে কি কারণ,
. প্রত্যেক পবনঘায়,
. উঠিতে পড়িতে, হায় !
এই ক্ষুদ্র বালিরাশি করিলে সৃজন,---
আর্য্যবংশে কুলাঙ্গার---কলঙ্ক-অর্পণ?
শুনেছি মঙ্গলময়---
তুমি নাথ, তুমি নাথ দয়ার নিদান ;
. হতভাগ্য হিন্দুচয়
. সৃজি’ ওহে দয়াময় !
জগতের কি মঙ্গল করিলে বিধান?
দুর্ব্বল পতঙ্গে করি অনলে প্রদান?
বিদরে হৃদয়, নাথ !
বল, হায়, কি মঙ্গল করিলে সাধন?
. তীব্র আর্য্য-বংশ-রবি,
. বাল্মীকি কল্পনা-ছবি,
অনন্ত রাহুর গ্রাসে করিয়া অর্পণ?
এই গ্রাসমুক্ত, নাথ ! হবে কি কখন?
হায়! যেই আর্য্যনাম
আছিল জগতপুজ্য ; ---আছিল অচল,
. অটল হিমাদ্রি-সম,
. সিন্ধু জিনি' পরাক্রম,
আজি সে বাতাস-ভরে করে টলমল,
আজি সেই নাম ওই পদ্মপত্রে জল!
বৃথা তবে, প্রিয়বর!
নাহি আর্য্য ; কেন “আর্য্য-দর্শন” এখন?
. কি আছে আর্য্যের আর,
. বিনে ওই---হাহাকার,
নাহি অঙ্গ, নাহি মন, নাহি সে জীবন,
কি আর দেখিবে “আর্য্য-দর্শন” এখন?
ওই আর্য্য-ভস্ম-রাশি !
ভাগীরথী দুই তীরে, ওই স্তূপাকার !
. জানিয়াছি দৃঢ়মতে,
. পতিত-পাবনী হ'তে,
এ পতিত বংশ নাহি হইবে উদ্ধার ;
না পারিবে ভাগীরথী ;---তবে যদি আর।
আর কোন মহারথী
বাজাইয়া পাঞ্চজন্য, ধরি' তরবার,
. করি' সিংহনাদ-ধ্বনি,
. আনে রক্ত-তরঙ্গিণী,
আর্য্যরক্তে আর্য্যাবর্ত্ত ভাসায় আবার,
তবে যদি আর্য্যবংশ জাগে পুনর্ব্বার।
সেই দিন আর্য্যাবর্ত্ত
দেখিবে নবীন শশী, নবীন গগন ;
. উদিবে নবীন রবি,
. গাইবে নবীন কবি,
দেখিবে নবীন “আর্য্য-দর্শন” তখন ;
কি দেখিবে?---কত দিনে?---সকলি স্বপন!
ঃঃঃঃঃঃঃঃ
ভাইরে একালে কার
আর ধর্ম্ম রইল না।
বামুন কায়েত পাতী নেড়ে,
মিয়েঁ মোল্লা চাপ দেড়ে,
ভাল বলি বল কারে,
খুঁজে পেলেম না॥
গরু খায় হিন্দু হয়ে,
আবার শুয়োর চাক্ষে মুন্সী ভায়ে,
ভট্টাচার্য্যের মুরগীর আড়ত,
চামড়ার কারখানা॥
ফোঁটা-কাটা বামন ঠাকুর,
নেঙ্গটি কান্দে কদ্রে, মজুর,
পাগড়ী মাথায় বুড়ো হুজুর,
কাকেও চেনা যায় না॥
দুই এক গণ্ডা পয়সা পেলে,
এরা ধর্ম্ম কর্ম শিকেয় তুলে,
সকলি করিতে পারে,
কিছু আটকে না॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভাইরে একালে কার আর ধর্ম্ম রইল না
কবি মীর মোশার্রফ হোসেন (১৩.১১.১৮৪৭ - ১৯.১২.১৯১১)। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত, পারিজাত মজুমদারের “মীর মোশার্রফ
হোসেন ও তাঁর বাউল গান” গ্রন্থের গান।
হিন্দু, খ্রীষ্টান, শ্লাম জাতি,
সকল জেতের এই গতি,
পয়গম্বর, দেবতা আদি,
কেহ আর মানে না॥
মুসলমান দাড়ি ফেলে,
বাম্ নের পৈতে বালসীর তলে,
শূদ্রের মালা শিকায় তোলা,
আর গলায় নেয় না॥
কেউ কুড়জালী ঝুলায় গলে,
ওরে মোল্লা বেড়ান কাছা খুলে,
সুযোগ পেলে গাড়ু গামছা
নিতে ছাড়ে না॥
ঠেটা গুরু ঝুটা পীর,
বালা হাতে নেড়ার ফকীর,
এরা আসল শয়তান, কাফের বেইমান,
তাকি তোমরা জান না॥
ভাল নয় ভাই বাড়াবাড়ি,
একদিন যেতে হবে যমের বাড়ী,
টাকাকড়ি, জোরের জারি, তথায় খাটবে না,
ক্ষুদ্র জীব মশার কথায় রাগ কর না॥
মিছে ভাই জাতির বিচার, আচার ব্যাভার,
মিছে রে এই দুনিয়াদারী॥
দিন কয়েকের জন্য
কেন কর এত বুঝতে নারি॥
তাঁর কাছে নাহি ভিন্ন, কেহ অন্য,
সকলই তাঁর কারিগরী॥
দেখ কৃষ্ণ, বিষ্ণু, মুসা, ইসা,
নানক, নিতাই জটাধারী।
অরে ভাই অন্নপূর্ণা, বিবি ফাতেমা,
মোহাম্মদ পয়দা তাঁরি॥
অরে নাই ভেদাভেদ, বর্ণ বিভেদ,
কিছু প্রভেদ, কাছে তাঁরি।
মশা কয়, ধোকায় পড়ে বোকা হয়ে,
করি আমরা মারামারি॥
আখেরে কিছু রবে না, হবে কানা,
‘আখের কানা’ মনে করি।
এস ভাই সবাই মিলে, দেল খুলে
দেলের ম'লা দূর করি॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মিছে ভাই জাতির বিচার, আচার ব্যাভার
কবি মীর মোশার্রফ হোসেন (১৩.১১.১৮৪৭ - ১৯.১২.১৯১১)
১৯৫৯ সালে প্রকাশিত, পারিজাত মজুমদারের “মীর মোশার্রফ
হোসেন ও তাঁর বাউল গান” গ্রন্থের গান।
॥ বাউল গান॥
ভজন-সাধন করবি, রে মন, কোন্ রাগে।
. আগে মেয়ের অনুগত হও গে॥
জগৎ-জোড়া মেয়ের বেড়া রে,
. কেবল একপতি সাঁইজী জাগে॥
মেয়ে সামান্য ধন নয়,
জগৎ করছে আলোময়,
কোটি চন্দ্র জিনি’ কিরণ
. বুঝি আছে মেয়ের পায়।
মেয়ে ছাড়া ভজন করা রে
. তা হবে না কোনো যোগে॥
ষদি রূপার টাকা পায়,
জীবে কপালে ছোঁওয়ায়,
কত রজত-কাঞ্চন সোনা-রূপা পতি
. দিচ্ছে মেয়ের পায়।
মেয়ে এমন ধন নাহি চিনে রে জীব
. পড়বে পাপের ভোগে॥
মেয়ে মেরো নারে ভাই,
. মারলে গুরুমারা হয়,
মেয়ের আহ্লাদিনী নাম
. রেখেছেন চৈতন্য গোঁসাই।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভজন-সাধন করবি, রে মন, কোন্ রাগে
কবি ফকির পাঞ্জ শাহ (১৮৫১ - ১২.৮.১৯১৪)
এই গানটি ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যর “বাংলার বাউল ও বাউল গান”, ফকির পাঞ্জ শাহ,
৭৫৩-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে। নারীজাতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যত্নবান হতে বলছেন কবি।
ও যার দরশনে দুঃখ হরে রে
. ও তার চরণে শরণ নিগে॥
বলে হীরু চাঁদ আমার, মেয়ে মনোহর,
যার আকর্ষণে জগৎপতি করল রাধার দাস-
স্বীকার।
তুই ধরি যদি গুরুর চরণ রে,
. পাঞ্জ মেয়ের চরণ ধর আগে॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
॥ বাউল গান॥
জেতের বড়াই কি।
ইহকাল-পরকালে জেতে করে কি॥
আমার মনে বলে অগ্নি জ্বেলে দিই জেতের মুখি॥
এক জেতের বোঝা ল’য়ে,
চিরকাল কাটালাম মানী মানুষ হ’য়ে,
মানের গৌরব, কুলের গৌরব,
ধন্ধবাজি সব দেখি।
লোকে পেটের জালায় দেশান্তরী হয়,
হিন্দু মুসলমানের বোঝা মাথায় ক'রে বয়,
কার বা জাতি, কেবা দেখে
ঘরে এলে চিহ্ন কি।
জেতে অন্ন নাহি দিবে,
রোগে না ছাড়িবে,
পাপ করিলে কোম্পানী সব জাত
ধ'রে ল’য়ে যাবে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জেতের বড়াই কি
কবি ফকির পাঞ্জ শাহ (১৮৫১ - ১২.৮.১৯১৪)
এই গানটি ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যর “বাংলার বাউল ও বাউল গান”, ফকির পাঞ্জ শাহ,
৭৫৭-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে। নারীজাতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যত্নবান হতে বলছেন কবি।
মৃত্যু হ'লে যাবে চ'লে,
জেতের উপায় হবে কি॥
মন ডাক আল্লা ব’লে
কুলের গৌরব ফেলে,
অকুলের কুল মালেক আল্লা
তাইরি লেহ চিনে।
পাঞ্জ বলে, যত করলাম,
সকলই ফাঁকিজুকি॥
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
॥ বাউল গান॥
জ্যান্ত কালী ঘরের মাঝে দেখলি না,
পুতুল পূজে মলি হারে দিনকানা॥
জ্যান্ত তারে না চিনিয়া,
খড়ের বুন্দেয় ধর্না দিয়া,
কি পেলি বল রে ভায়া,
বল সোনা॥
এমন মূর্খ হিন্দু জাতি,
না জেনে কোথায় প্রকৃতি,
পুতুল পূজে দিবা রাতি,
মরে দেখ না॥
যে শক্তিতে সৃজন সংসার
তারে কেউ চিনলে না এবার,
দুদ্দু বলে জগত-মাঝার,
কি রূপ কারখানা॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জ্যান্ত কালী ঘরের মাঝে দেখলি না
দুদ্দু শাহ (আনুমানিক ১৮৫০ - ১৯০০)
এই গানটি ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যর “বাংলার বাউল
ও বাউল গান”, ফকির পাঞ্জ শাহ, ৮১৬-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।
নারীজাতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যত্নবান হতে বলছেন কবি।
১ ভারতে আবার কেন হাহাকার ধ্বনি। ভীষণ নিনাদ করি বাজিল অকাল ভেরি অনশনে মরিতেছে লক্ষ লক্ষ প্রাণী। কে আর শুনিবে সেই দুঃখের কাঁদুনি॥
২ মান্দ্রাজ-দুর্ভিক্ষ শুনে প্রাণ ফেটে যায়। উলঙ্গ কৃপাণ করে যতনে ধারণ ক’রে দুর্ভিক্ষ ভীষণ বেষে হায়! হায়! হায়! প্রথমে পশিল আসি দরিদ্র-চালায়॥
৩ অনাথ হইল ছার যত গৃহিজন। দিন রাত খেটে খেটে নাহি মুষ্টি অন্ন পেটে নিরাহারে প’ড়ে আছে শবের মতন। কে দেবে যতনে মুখে সলিল ওদম?
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মান্দ্রাজ-দুর্ভিক্ষ কবি তরঙ্গিণী দাসী (রচনাকাল ১৮৭৭)
১৮৭৭ সালে প্রকাশিত, কবির “নিষ্ফল তরু” কাব্য ও প্রবন্ধ গ্রন্থের কবিতা। ১৮৭৭ সালে মাদ্রাজে প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ হয়, যাকে “দ্য
গ্রেট ম্যাড্রাস ফেমিন অফ ১৮৭৭” নামে অভিহিত করা হয়। দক্ষিণ ভারতের এই দুর্ভিক্ষে, অনাহারে প্রায় ৫৫লক্ষ মানুষের
মৃত্যু হয়। ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের গঠনের ৮ বছর পূর্বে বাংলার এক সামান্যা নারী ইংল্যাণ্ডের রাণীর কাছে করছেন
প্রতিবাদ, তাঁর এই কবিতার মধ্য দিয়ে!
দূষিত দেশাচারে নিমিত্ত বিলাপ
কবি ক্ষীরোদা মিত্র (জন্ম সম্ভবতঃ উনিশ শতকের মাঝামাঝি, মৃত্যু অজ্ঞাত)। কলিকাতা
বামাবোধিনী সভা হতে প্রকাশিত, বামারচনাবলী, প্রথম ভাগ, ১১মাঘ ১২৭৮ (জানুয়ারী ১৮৭২)।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ওহে পিতা জ্ঞানদাতা অনাথের নাথ,
অভাগা নারীর প্রতি কর দৃষ্টিপাত।
তোমা বই দুঃখ আর জানাই কাহারে,
তোমার সমান বন্ধু কে আছে সংসারে?
কৌলিন্য কুপ্রথা আর বৈধব্য আচারে,
চির দুঃখে দহিতেছে হিন্দু অবলারে।
আহা! কত দিন আর রবে এ সকল,
অবলার দুঃখানল করিতে প্রবল!
অসভ্যতা কুসংস্কার আর দেশাচার,
করিতেছে ক্রমে ক্রমে দেশ অধিকার।
বিদ্যাহীনা জ্ঞানহীনা যত নারীগণ,
রয়েছে সকলে বন্য পশুর মতন।
অজ্ঞান তনয়াগণে কর জ্ঞানদান,
যাহাতে করিতে পারে ধর্ম্ম অনুষ্ঠান।
অজ্ঞানবশতঃ হায় তোমারে না জানে,
কাল্পনিক দেব দেবী স্রষ্টা বলি মানে।
আহা কবে এই ভ্রম হবে দূরীকৃত,
সকলেই হইবেক ঈশ্বরেই প্রীত,
সত্যের উজ্জ্বল জ্যোতিঃ হইবে বিস্তার,
নাশিবেক অবলার অজ্ঞান আঁধার।
আহা! কবে ভগ্নীগণ! হয়ে একমত,
পিতার আদেশ মোরা পালিব সতত।
এস হে ভগিনীগণ! কর মনোযোগ,
বিমল আনন্দ সুধা করিতে সম্ভোগ।
ওহে পিতা তুমি বিনা কারো সাধ্য নয়,
ঘুচাইতে আমাদের দুঃখ সমুদয়।
যখন তোমার কৃপা করিহে স্মরণ,
আনন্দেতে উচ্ছ্বসিত হয় মম মন।
তখনি আশ্বাস পায় হৃদয় আমার,
ঘুচাবেন নারী দুঃখ সত্য সারাত্সার।
নারী হিতকারী যত মহোদয়গণ,
করিছেন যত্ন সুখ করিতে বর্দ্ধন।
তাঁহাদের শুভ ইচ্ছা হউক সফল,
হইবে হইবে তাহে দেশের মঙ্গল।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
হা দেশাচার!
বামাবোধিনীর অনামা নারী কবি (উনিশ শতকের মাঝামাঝি)। বারাসতস্থ কোন ভদ্র কুলবালা। কলিকাতা বামাবোধিনী সভা হতে প্রকাশিত,
বামারচনাবলী, প্রথম ভাগ, ১১মাঘ ১২৭৮ (জানুয়ারী ১৮৭২)।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জগদীশ করেছেন জগৎ সৃজন,
যত কিছু বস্তু সব সুখের কারণ।
সুখময় যিনি তাঁর কার্য সুখময়,
সুখের বিষয় কভু দুঃখ নাহি রয়।
তবে যে পাইছে কষ্ট নরগণ এত,
আপনার ক্রিয়া দেষ নহে অবগত।
তাঁহার প্রদত্ত যাহা সুখের কারণ,
একটি ইহার নহে অসার সৃজন।
কাম আদি যত বৃত্তি নিকৃষ্ট গণিত,
সকলি শিবের হেতু হয়েছে সৃজিত।
ছয় রিপু রিপু বলি অনেকেই বলে ;
রিপু নয় রিপুগণ হিতকারী ফলে।
অরাতি শাসন হেতু দ্বেষের সৃজন,
ক্রোধের উদ্ভব দুষ্ট করিতে দমন।
প্রজার উত্পত্তি হেতু কামের উত্পত্তি,
পালিতে শৈশব কাল মোহের আরতি।
এইরূপে রিপুগণ সবে হিতে রত,
ঐশিক আদেশে কার্য্য করে স্বভাবতঃ।
প্রকৃতিরে রোধিবারে সাধ্য আছে কার,
বিপরীত ফললাভ বিপরীতে তার।
স্বভাবের কর্ত্তা যিনি জগত ঈশ্বর,
তাঁহার আদেশ এই মানব উপর।
“স্বভাবের ভাব বুঝে কর ব্যবহার,
উপরে উঠনা হও অনুগামী তার।”
শ্বাপদাদি করি দেখ যত পশুগণ,
সবে স্বভাবের পথে করে বিচরণ।
বিভুদত্ত সংস্কারে করিছে ভ্রমণ।
সাধ্য কি উপরে উঠে করিয়া লঙ্ঘন।
নাহি বটে নরকুলে সেরূপ সংস্কার,
কিন্তু বোধ দিয়াছেন বিনিময়ে তার।
বোধবলে দেখ দেখি করি বতর্কন,
লঙ্ঘিলে স্বভাবে হয় কাহাকে লঙ্ঘন?
স্বভাবতঃ রিপুগণ বপুবাসে স্থিত।
যার যে স্ববৃত্তি তাহা পালিতে উদ্যত।
যেরূপ শরীর ক্ষয়ে ক্ষুধার উদয়,
ঈঙ্গিতে করিয়া জ্ঞাত অভাব নাশয়।
ক্ষুধারে দমন করি রাখ কিছু দিন,
নাশিবে জীবন ক্রমে তনু হয়ে ক্ষীণ।
সেইরূপ রিপুগণ যার যে সময়,
যথাযোগ্য কাল পেয়ে হইবে উদয়।
কি সাধ্য তোমার তারে রোধ করিবারে।
বিপরীত ফল পাবে রোধিলে তাহারে।
প্রদীপের পশ্চাতে যেরূপ অন্ধকার,
কার্য্যকারণেতে আছে যোগ সে প্রকার।
প্রতি কার্য্য তত্ত্ব কর পাইবে কারণ,
কাহারো উদ্ভব নহে বিনা প্রয়োজন।
তবে কেন কার্য্য কর বিপরীত তার,
না হয় চেতন কিহে দেখি বার বার?
ব্যভিচার ভ্রুণহত্যা যুগল প্রভাবে,
প্লাবিত হয়েছে দেশ আর নাহি রহে।
দারুণ বৈধব্য দশা অসীম যাতন,
সহিতে নারিয়া দেখ কত নারীগণ।
অনায়াসে অপথে করিছে পদার্পণ।
ধর্ম্মে দিয়া জলাঞ্জলি অধর্ম্ম অর্চ্চন।
বিধবাবিবাহ কিহে এ হতে দূষণ,
যুক্তি ও স্বভাবসহ নহে কি মিলন,
শাস্ত্র কি নিষেধ করি করিছে শাসন,
বল হে বল হে সিধী নিষেধ কারণ?
ধন্য ধন্য কুসংস্কার তরেরে বাখানি,
স্বর্গীয় আদেশ লঙ্ঘে তোরে শ্রেষ্ঠ মানি।
দুরাচার দেশাচার কি তোর শাসন,
কেমন কঠিন প্রাণ দয়াহীন মন।
অবলার প্রতি কেন এত নিদারুণ,
চির ব্রহ্মচর্য্য বিধি করেছ অর্পণ!
বিধবার দেহ কি হে পাষাণে নির্ম্মিত,
জড় পিণ্ডবৎ সুধু চেতনা রহিত।
নাহি কি মনোজ বৃত্তি নাহি রিপুগণ,
রস রক্তে দেহ কিহে হয় নি সৃজন?
বহু পাপ করিয়া অবলা জন্মিয়াছে,
ভারত মাঝারে হিন্দু রমণী হয়েছে।
একেত অভাবে শিক্ষা বিদ্যালোকহীনা,
সদা অন্তঋপুররুদ্ধা বন্দিনী সমানা।
হিতাহিতজ্ঞানহীন পশুর সমান,
তদুপরি এই দশা করেছ বিধান।
করেছ দেশীয় গণ তাহে ক্ষতি নাই,
তোমাদের কি হইবে ভাবি সদা তাই।
ইহারা করেছে পাপ ভোগে হবে ক্ষয়।
কিন্তু তোমাদের পাপ হতেছে সঞ্চয়।
রাশি রাশি পুঞ্জ পুঞ্জ হয়েছে সঞ্চিত,
পরিণাম বলে বোধ নাহি কি কিঞ্চিত?
জগত পিতার কাছে কি কথা কহিবে,
অন্তর্যামী তিনি তাঁরে কিসে প্রতারিবে?
অপার করুণা তাঁর হেরেও নয়নে,
নহে কি সদয় ভাব আবির্ভাব মনে।
মহারাণী বিক্টোরিয়া ইংলণ্ডবাসিনী,
তাঁর প্রতি কত ভক্তি প্রভু বলে গণি।
গবর্ণর জেনেরল অধীন তাঁহার,
তাঁরে দেখি নত আঁখি নম্র ব্যবহার।
ভয় কি ভক্তির বলে কর এ প্রকার,
যা হোক করিতে হয় নীতি ব্যবহার।
বলহে সুসভ্যদল জিজ্ঞাসি এখন,
জগদীশ প্রতি ভাব আছে কি তেমন?
আছে কি শাসন ভয় আছে ভালবাসা।
অপ্রত্যক্ষ বলে কিহে অস্তিত্বে নিরাশা?
ব্যাভারে নাস্তিকবৎ অস্তি বল মুখে,
নতুবা কি বঙ্গমাতা মরে এত দুখে!
ভ্রুণরক্তে ভারতের কেন হে দূষণ,
কে দিবে অসৎ কাজে উত্সাহ এমন?
প্রতি গ্রাম প্রতি পল্লি পুরেছে বেশ্যায়।
নাশিছে অগণ্য শিশু হায় হায় হায়!!
অবলার আচরিত পাপ দাবানলে,
দিতেছ আহুতি সবে উত্সাহ অনিলে।
কোথা বিভু কৃপাময় করি নমস্কার,
কাতরা কিঙ্করীগণে হের একবার।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
পালিত কপোতিনীর প্রতি
বামাবোধিনীর অনামা নারী কবি (উনিশ শতকের মাঝামাঝি)। ঢাকাস্থ কোন রমণী। বঙ্গবন্ধু থেকে উদ্ধৃত। কলিকাতা বামাবোধিনী
সভা হতে প্রকাশিত, বামারচনাবলী, প্রথম ভাগ, ১১মাঘ ১২৭৮ (জানুয়ারী ১৮৭২)।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বল ওগো কপোতিনী, কেন এত বিষাদিনী, হেরিতেছি বলগো তোমায়। প্রকাশিয়া বল না আমায়॥ এত দুঃখী কোন দুখে, আহা সদা অধোমুখে, নেত্রনীর কর সম্বরণ। সুধাও আমায় বিবরণ॥ সুবর্ণ শিকল পদে, সদা আছ উচ্চপদে, সুবর্ণ পিঞ্জরে অবস্থান। ইথেও কি ভোলে না গো প্রাণ? তোমার সন্তোষ তরে, অপূর্ব্ব কোটরাপুরে, রহিয়াছে খাবার সকল। তবু তুমি কেন গো চঞ্চল? বল করি বিচরণ করি আহারাহরণ, তাতেই বা কত সুখোদয়। বল মোরে হইবে সদয়॥ শুন ওগো কপোতপ্রিয়ে, বলিতে বিদরে হিয়ে, আমিও গো পিঞ্জরবাসিনী। কিবা সুখে বঞ্চে স্বেচ্ছাধীনী॥ আছ তুমি যে সুখেতে, স্বর্ণময় পিঞ্জরেতে, আমাদের নাহি এত সুখ। তুমি কেন হও গো বিমুখ?
|
না দেয় গঞ্জনা কেহ, দাসীত্ব ভার না বহ, অন্নজলে নাহিক অভাব। তবে কেন ভাব নানা ভাব? ছিলে যবে স্বচ্ছাধীনী, ভ্রমি বনে একাকিনী, কত সুখ লভিছিলে তায়! কি দুঃখে বা আছো গো হেথায় বেড়াইতে নানা বন, শাখা করি আরোহণ, কত কষ্টে যাপিছ যামিনী! এত সুখে আছ বিষাদিনী। বুঝুলাম এতক্ষণে, তব ভাব দরশনে, তোমরাই বুঝিয়াছ সার। নাহি বহ অধীনতা ভার! শুন ওগো বিহগিনী, মোরা অতি অভাগিনী, অন্তঃপুর পিঞ্জর নিবাসী। আছি সদা অধীনের দাসী। চিরদিন একমত, হিতাহিত জ্ঞানহত, জ্ঞান ধর্ম্মে দিয়ে বিসর্জ্জন। একবাবে করিছি যাপন। তুমি নও চিরদাসী, কিছুদিন তরে আসি, হেরিতেছ দুঃখের বয়ান। হবে পুনঃ দুঃখ অবসান।
|
হায়রে মোদের দুঃখ, বলিলে বিদরে বুক, এর চেয়ে পাখী যদি হই। তবু বুঝি মনসুখে রই। ধন্য ওগো কপোতিনী, মানবিনী হতমানী, হয়ে আছে দেখে তব সুখ। তাই ঢাকে ঘোমটাতে মুখ। কি বলিব বিধাতারে, বলিতে প্রাণ বিদরে, মোরা বুঝি তব কন্যা নই, তাই সদা এত দুঃখ সই। না হইয়ে ধর্ম্মাধীনী, আছি সদা পরাধীনী, সদা থাকি ক্রীত দাসী প্রায়। এই কি তব অভিপ্রায়? পাই কত মর্ম্মব্যথা, তথাপি না বলি কথা, সদা মুখ ঢাকি ঘোমটায়। এই কিহে তব অভিপ্রায়? হয়ে দেশাচার দাসী, অজ্ঞান সলিলে ভাসি, কাটিলাম এ দুর্লভ কায়। এই কি তব অভিপ্রায়?
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
|
চল্ রে চল্ সবে ভারত সন্তান
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (৪.৫.১৮৪৯ - ৪.৩.১৯২৫)
গানটি প্রথম প্রকাশিত হয় “বীণা-বাদিনী” পত্রিকার চৈত্র ১৩০৪ সংখ্যায় (১৮৯৮)। আমর গানটি ১৯৫৯
সালে প্রকাশিত শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় সংকলিত ও সম্পাদিত “উনবিংশ
শতকের গীতিকবিতা সংকলন” থেকে নিয়েছি। VDOটি সৌজন্যে Calcutta Youth Choir YouTube Channel.
চল্ রে চল্ সবে ভারত সন্তান
মাতৃভূমি করে আহ্বান!
বীর-দর্পে পৌরুষ-গ্রবে
সাধ্ রে সাধ্ সবে দেশের কল্যাণ।
পুত্র ভিন্ন মাত্র-দৈন্য
কে করে মোচন ?
উঠ, জাগো, সবে বল --- মা গো !
তব পদে সঁপিনু পরাণ।
এক তন্ত্রে কর তপ,
এক মন্ত্রে জপ্ ;
শিক্ষা দীক্ষা লক্ষ্য মোর এর,
এক সুরে গাও সবে গান।
দেশ-দেশান্তে যাও রে আনতে
নব নব জ্ঞান
নব ভাবে, নবোত্সাহে মাতো
উঠাও রে নবতর তান।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
লোক রঞ্জন লোক গঞ্জন
না করি দৃকপাত
যাহা শুভ, যাহা ধ্রুব, ন্যায়
তাহাতে জীবন কর দান।
দলাদলি সব ভুলি
হিন্দু-মুসলমান ;
এক পথে এক সাথে চল
উড়াইয়ে একতা নিশান।
আমি অনুরক্ত ভারত-ভক্ত,
ভারত-মাতার সুসন্তান।
. (আমার) দাও তুলে নিশান। ( ধ্রু )
. (১)
বীরত্ব আমার যত,
মুখে ফুটে বোলবো কত,
ভারত-উদ্ধারের মত,
. নিয়ে, থাকি দিনমান।
শুধু রাত্রিকালে, ইয়ার পেলে,
. গড়ের মাঠে সখের প্রাণ!
. (২)
পোড়া ভারতের তরে,
যখন আমায় শোকে ধরে,
ডেকে ডুকে সভা কোরে,
. ইংরেজীতে ছাড়ি তাম।
ও ছার মা@@ যা, কর্ম্মনাশা,
. সভা@@ অপমান!
. (৩)
যুটিয়ে হাটের নেড়া,
ছেলেদের বানিয়ে ভেড়া,
ভারতে ভারত-ছাড়া,
. কোর্ত্তে আমি যত্নবান।
ভারত ভক্তের গান
কবি ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮.৫.১৮৪৯ - ২৩,৩,১৯১১)। কবির “পাঁচু ঠাকুর” (৩খণ্ডে, ১৮৮৪-
৮৫), তৃতীয় কাণ্ডের গান। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রকাশিত “ইন্দ্রনাথ গ্রন্থাবলী”, থেকে প্রাপ্ত।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আমার পেট্রিয়টি, নেহাত খাঁটি,
. গোটা ভারত লবেজান!
. (৪)
এখন আমার কাঁধে ঝুলি,
মুখে ভারত ভারত বুলি,
দিয়েছি জলাঞ্জলি,
. ভারত-মাতার কুল-মান।
এমন খোদ-বিরাগী স্বার্থত্যাগী
. কে আছে আমার সমান?
. (৫)
“জেনানা” কারাগারে,
রমণী কি থাকতে পারে?
কূলে থেকে বাহির কোরে,
. স্বাধিনতা করি দান।
আমি আপনি গোলাম, গেলাম গেলাম,
. ভাবি নে তার অপমান!
. (৬)
লেখা পড়া ষোলো কলা,
বোধোদয় বানান ফলা,
নবেলের প্রেমের পালা,
. কুলবালার ব্রহ্ম-জ্ঞান।
হের, নাচে গানে, তানে মানে,
. ঘরে পাই এলাহীজান!
. (৭)
আমার খুব ভাল রুচি,
বিধবা পেলে কচি,
বাদ দিয়ে খেঁদি পেঁচী,
. মারি চোরা গোপ্তা টান!
তখন, মায়ের কান্না, বাপের ধন্না,
. সকল করি তুচ্ছ জ্ঞান!
. (৮)
ধোরেচি ধর্ম্ম-ধ্বজা,
মানিনে পরব্ পূজা,
সার কোরে চক্ষু-বোজা,
. একটি লাফে ব্রহ্মজ্ঞান।
সাদা অনুতাপে, সকল পাপে,
. হেলায় করি পিণ্ডদান!
. (৯)
ঘরে বাহিরে জুতো,
রেলের গাড়ীতে গুঁতো,---
খেয়ে দেয়ে, পেয়ে ছুতো,
. মন কোরেছে অভিমান।
এখন সেই রাগে, দেশ-অনুরাগে,
. ধূতি ছেড়ে পেন্টুলান।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
@ - অপাঠ্য অথবা অমুদ্রিত।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মন বসে না দেশের হিতে
কবি রাজকৃষ্ণ রায় (২১.১০.১৮৪৯ - ১১.৩.১৮৯৪)।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, যোগেন্দ্রনাথ শর্ম্মা দ্বারা প্রকাশিত, স্বদেশ-সঙ্গীত
কাব্য-সংকলনের কবিতা।
॥ রামপ্রসাদী সুর॥
মন বসে না দেশের হিতে
বাগান ভোজে যাওরে ম’জে
গরীবগুলি পায় না খেতে।
গেজেটে নাম উঠবে বলে
টাকা ঢাল চাঁদার খাতে,
তেলা মাথায় তেল ঢেলে দাও
হাজার সেলাম ঠুলকে মাথে
কাজের বেলা কাণা হলে
দেশটা গেল অধঃপাতে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বঙ্গচ্ছেদ
কবি অমৃতলাল বসু, রসরাজ (১৭.৪.১৮৫৩ - ২.৭.১৯২৯)
১৯০৫ সালে প্রকাশিত, যোগেন্দ্রনাথ শর্ম্মা সম্পাদিত “স্বদেশ-সঙ্গীত” কাব্য-
সংকলনের গান।
ওরা জোর ক'রে দেয় দিক্ না বঙ্গ বলিদান।
আমরা রব অন্তরঙ্গ, এক অঙ্গে মনের সঙ্গে মিশিয়ে প্রাণ।
. আমরা জাত বাঙ্গালী প্রেম-কাঙ্গালী---
. ভাবচিস্ তোরা মন ভাঙালি,
তা’ নয়, জ্বালিয়ে আগুন, ক'রে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিলি প্রাণের টান।
. আমাদের চোখ ফিরেছে মায়ের কুঁড়েতে,
. বিদেশী চিনির চেয়ে দেশের গুড়েতে,
আবার কর্কচেতে হয়েছে রুচি, চাই নে তোদের লবণ দান।
. আমাদের ভাতের সঙ্গে তাঁত বজায় থাক,
. নাই বা দেখাই সাজের জাঁক,
তোদের এই চক্চকান মধুর চাকে, করবো না আর বিষ পান।
. তোদের কাচের বাসন কাচের চুড়ি,
. ফেলবো ভেঙ্গে মেরে তুড়ি,
করে দেবতা সাক্ষী, ঘরের লক্ষ্মী, শাঁখার আবার রাখবে মান।
. তোদের শাপে হ'ল আশীর্ব্বাদ
. দৃঢ় হ'ল মনের বাঁধ,
এই বিসংবাদে বঙ্গভেদে, আমরা হলুম আবার তেজীয়ান্।
পেয়ে মর্ম্মে আঘাত, কর্ম্মে হাত, বাক্যি ছেড়ে দেবে বুদ্ধিমান্।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভারত-শ্মশান মাঝে আমি যে বিধবাবালা
কবি আনন্দচন্দ্র মিত্র (১৮৫৪ - ২২.১২.১৯০৩)
১৯৫৯ সালে প্রকাশিত, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়
সংকলিত ও সম্পাদিত উনবিংশ শতকের গীতিকবিতা সংকলনের গীত।
॥ লুমঝিঝিট - পোস্তা॥
ভারত-শ্মশান মাঝে, আমি রে বিধবাবালা।
বিষের মূরতি ক’রে, বিধি আমায় পাঠাইলা!
জানি না কেমন পতি, মনে নাই রে সে মূরতি ;
তথাপি যুবতী হ’য়ে পেটে অন্ন নাই দু বেলা।
বিবাহ কি তাও জানি নে, কেবলমাত্র প’ড়ে মনে,
অনিচ্ছাতে শৈশবেতে খেলেছি এক দুঃখের খেলা।
পিতা মাতা নিদয় হ’য়ে, পরের হাতে সঁপে দিয়ে ;
ছিঁড়ে নিয়ে কোমল কলি, কণ্টকে গাঁথিল মালা।
না বুঝিলেম ভালবাসা, নাহি সুখ নাহি আশা ;
কারে ক’ব এ দুর্দশা, কে বুঝিবে মর্মজ্বালা।
পথিক বলে দেশাচারে, গেল ভারত ছারেখারে ;
পাপিষ্ঠ ভারতবাসী, পাষাণ হ’য়ে না দেখিলা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সাধের ভারত ভূমি ঢাকিল কি অন্ধকারে
কবি আনন্দচন্দ্র মিত্র (১৮৫৪ - ২২.১২.১৯০৩)
॥ মল্লার - আড়াঠেকা॥
সাধের ভারত ভূমি ঢাকিল কি অন্ধকারে।
সবে অন্ধ মহামোহে, মত্ত হয়ে পরদ্রোহে,
নিজ হস্তে নিজগৃহ, দুখানলে দগ্ধ করে॥
কীবা মহৎ কীবা ক্ষুদ্র, কীবা ব্রহ্মণ কীবা শূদ্র,
কীবা ধনী কী দরিদ্র, শত্রুভাব ঘরে ঘরে ;
সবে বটে ভাই ভাই, কারো প্রতি স্নেহ নাই,
সঁপিয়াছে দুঃখিনীরে, জন্মভূমি-জননীরে।
এই দম্ভ-পাপে হায়, অনাহারে মৃতপ্রায় ;
সহস্র ভারত-যুবা ভিক্ষা করে দ্বারে দ্বারে॥
কেহ চির পরবাসে, দুঃখের সাগরে ভাসে,
জীবনে মৃতের মত অনাদরে অত্যাচারে।
এই দম্ভ-মহাপাপে, পুড়িতেছে মনস্তাপে,
দুঃখিনী ভারতনারী ভসিছে নয়নাসারে ;
ভ্রুণহত্যা ব্যভিচারে, গেল দেশ ছারে খারে,
পাপিষ্ঠ ভারতবাসী, দেখেও তা দেখে না রে॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
স্বদেশ কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস (১৬.১.১৮৫৫ - ১.১০.১৯৯৮)।
রচনা - ময়মনসিংহ, ১৩১৪ বঙ্গাব্দ (১৯০৭)। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত সম্পাদিত গোবিন্দ চয়নিকা কাব্য
সংকলন (১৯৪৮) থেকে নেওয়া।
১ বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? এমন অধম জাতি, বুকে মার শত লাথি, মুখে মার শত ঝাঁটা, অনায়াসে সয়! না দেখিতে লেইয়ে পু’ছে, সে ফেলে যে দাগ মু’ছে, যাহারে মেরেছে এ যে সে-যেন সে-নয়! তার নাই স্পর্শ বোধ, ঘৃণা পিত্তি হর্ষ ক্রোধ, শূয়রের চেয়ে চর্ম্ম স্থুল অতিশয়। মেড়ার ডলিলে কাণ, সেও করে অভিমান, সে-ও এসে মারে ঢুস্ , নাহি করে ভয় ; * * * * বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? ২ বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয় মানুষের মত নহে, এদের শোণিতে বহে, নরক-নর্দ্দমা শিরা পচাগন্ধময়। কেবলে হৃৎপিণ্ড উহা,
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বাঙালী কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস (১৬.১.১৮৫৫ - ১.১০.১৯৯৮)।
রচনা - লত্পদি, ঢাকা, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ (১৮৯৬)। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত সম্পাদিত গোবিন্দ চয়নিকা কাব্য
সংকলন (১৯৪৮) থেকে নেওয়া।
নীচতার অন্ধগুহা, পাতিত্যের প্রস্রবণ, প্রাণ উহা নয়! অস্থিতে ও-নহে মজ্জা, ভরা শুধু ঘৃণা লজ্জা, কলঙ্কে গাঢ় ক্লেদ হয়েছে সঞ্চয়! প্রতি লোম কূপে কূপে, অপমান অনুরূপে, করেছে অনন্ত ছিদ্র নাহিক সংশয়! বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? ৩ বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? কি আছে মানবধর্ম্ম, কি করে মানবধর্ম্ম, কি দিয়ে চিনিব বল পশু এরা নয়? এ-কি মত খায় @@ হাগে আর কাযে নাহি লাগে, এদের জীবন শুধু বিষ্ঠামূত্রময়। নাহি বীর্য্য নাহি তেজ, উদরে গুণ্ঠিত লেজ, বিলুণ্ঠিত পরপদে সকল সময়! অলস শিথিল অতি, স্খলিত জীবন-গতি,
|
আখিভরা অশ্রুজল বুকভরা ভয়, বিচার বিতর্কহীন, আত্মজ্ঞানে উদাসীন, অবিচারে পরবাক্যে করিবে প্রত্যয়! এমন পশ্চাদ্গামী, সদা ঘৃণা করি আমি, @ মাখিয়া মারি ঝাঁটা যত মনে লয়! বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? ৪ বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? যত মুসলমান হিন্দু, পতনের মহাসিন্ধু, নাহি ধর্ম্ম এক বিন্দু অতি নীচাশয়! বৃথা ও তিলক ফোটা, পাঁচ ওক্ত মাথা-কোটা, ধূর্ত্তামি ভণ্ডামি ওটা নিশ্চয় নিশ্চয়! একমেবাদ্বিতীয়ং, সে-ও থিয়েটারি সং, কলেজি নলেজি ঢং আর কিছু নয়। শত ভাল কীট কৃমি, এরা নরকের তিমি, ইহাদের আদি অন্ত অনন্ত নিরয়!
|
অধম পিশাচগুলি, গর্দ্দভের পদধূলি মাথায় মাখিয়া ছি ছি, বড়লোক হয়, বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? ৫ বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? হেন ঘোর মিথ্যাভাষী, অনুগ্রহ অভিলাষী, জগতে ধনীর দাস আর কেহ নয়। হ’তে তার কৃপা-পাত্র, কি শিক্ষক কিবা ছাত্র, উকীল ডাক্তার আদি সম্পাদক-চয়, যারা বড় মান্য গণ্য, দেশের উদ্ধার জন্য, “বঙ্গের উজ্জ্বল আলো” যাহাদের কয় ; যত তার অবিচার, যত তার ব্যভিচার, যত তার ভয়ঙ্কর কার্য্য পাপময়, জানিয়া নাহিক জানে, শুনিয়া শোনেনা কাণে, তাহারি প্রশংসা গানে করে জয় জয়। এমন সাহস-হীন, ভীরু কাপুরুষ ক্ষীণ, বলিতে উচিত কথা সঙ্কুচিত হয় ; পাপেরেও বলে পুণ্য, হেন মনুষ্যত্ব শূন্য, এমন করিয়া করে বিবেক-বিক্রয়।
|
এ নীচ নিরয়গামী, সদা ঘৃণা করি আমি, দেখিলে এদের মুখ মহাপাপ হয়, বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? ৬ বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? বৃথা ও ইংরাজী শিক্ষা, বৃথা ও পাশ্চাত্য দীক্ষা ; প্রসবে যে বি.এ., এম.এ. বিশ্ব-বিদ্যালয়, কি বলিব শেম্ শেম্, রাস্কেল ফুল্ ডেম্, গোল্ড্ পাম্প্ কিন্ সব আর কিছু নয়! বৃথা অই হেট্ কোট্. বিজাতী কথার চোট্, হৃদয়ে নাহিক মোটে জ্ঞানের উদয় ; আপনার প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন দেশী, দরিদ্র দীনের দুঃখে গলে না হৃদয়, করে না জীবন-পণ উদ্ধারে বিপন্নজন, অত্যাচারে যদি দেশ ছারখার হয়। বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? ৭ বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? এই যে ভাওয়ালবাসী, নিত্য অশ্রুজলে ভাসি,
|
অবিচারে ব্যভিচারে ভস্মীভূত হয়, কে করে তাহার খোঁজ, অসুরেরা রোজ রোজ, কত যে কূলের বধু চুলে ধরি লয়! দিবালোকে দ্বিপ্রহরে, পতিরে বাঁধিয়া ঘরে, কোলের কাড়িয়া লয় কত কুবলয়। কত যে জননী বোন্, কাটিয়া ঘরের কোণ, চুরি করে পিশাচেরা নিশীথ সময়। কি ব্রাহ্মণ কিবা শুদ্র, কিবা বড় কিবা ক্ষুদ্র, * * * * তিলে তিলে পলে পলে পুড়িছে হৃদয়, এরা আহা চক্ষু খেয়ে, একটু দেখে না চেয়ে, ইহাদেরি একদেশী প্রতিবেশী হয়! ও উচ্চ শিক্ষায় ধিক্, আমি যা’ দিয়েছি ---ঠিক্,১ জগতে জঘণ্য হেন নাহি নীচাশয়, বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়? ৮ বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়! কোথায় সাগর পারে, তুরুকে আর্ম্মাণি মারে, ইংরেজ রুষের তারা কেহই ত নয়! এক গোষ্ঠি এক জাতি,
|
নহে তার এক জাতি, কেবল খৃষ্টের সনে এক পরিচয়! তবু যে আর্ম্মাণি-নারী, ত্যজিল আখির বারি, তাহাতে ডুবিল ‘আল্প্’ অল্প কি বিস্ময়! অবিচারে ব্যভিচারে, তাহাদেরি হাহাকারে, বিলাতী আকাশ ভেঙ্গে চূরমার হয়! তাদেরি---তাদেরি জন্য, কি হৃদয় ধন্য ধন্য, খেপিয়াছে খৃষ্টানের জাতি সমুদয়, শিক্ষিত বীরের প্রাণ, কি মহান্! কি মহান্! করুণায় যেন এক কালান্ত প্রলয়! নাহি বুঝে আত্মপর, নাহি বুঝে দেশান্তর, বিপন্ন উদ্ধারে তারা প্রাণ করে ব্যয়, না ছাড়ে সম্রাট রাজা, পাপীরে প্রদানে সাজা, উত্পীড়িত নারী নরে দিতেছে অভয়! স্বাধীন তুরষ্ক---রুম, সুলতানের সিংহভূম, এস্ লামের প্রিয় পূজ্যস্থান পুণ্যময়। আশী বছরের বুড়া২ তাহারে করিতে গুড়া করিয়াছে পদাঘাত সহস দুর্জ্জয়!
|
মোদের শিক্ষাভিমানী, নব্য বাবু সভ্য জ্ঞানী, থাক্ তার পর-দুঃখে গলিবে হৃদয়, রেলে কি জাহাজে গেলে, কেহ তারে ঠে’লে ফে’লে নিলে তার মা বোনেরে চুপ্ করে রয়। জুতা, লাথি, ঝাঁটা বেতে, এরা না কিছুতে চেতে, অচেতন জড়ে কবে ব্যথা বোধ হয়? দেও তারে শত গালি, দেও গালে চূণ কালী, বেহায়ার তাতে কিবা লোক-লাজ-ভয়। বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
|
১ - ‘আমি যা দিয়েছি---ঠিক’ - কবি মগের মুল্লুক
নামক পুস্তিকায় ভাওয়ালের রাজা ও ম্যানেজারের
ব্যভিচার-অবিচারের যে কাহিনী লিখিয়াছিলেন,
এখানে ঐ পুস্তিকার প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছেন। মগের
মুল্লুক বাজেয়াপ্ত।
২ - গ্ল্যাডস্টোন, ইংলণ্ডের মন্ত্রী
লেইয়ে - লেহন
ডলিলে - মলিলে
@ - এই অক্ষরগুলি ছাপা নেই বা পড়া যাচ্ছে না।
১
ও ভাই বঙ্গবাসী, আমি মর্লে,
তোমারা আমার চিতায় দিবে মঠ !
আজ যে আমি উপাস করি,
না খেয়ে শুকায়ে মরি,
হাহাকারে দিবানিশি
ক্ষুধায় করি ছট্ ফট্ |
সে দিকেতে নাইক' দৃষ্টি,
কেবল তোমাদের কথা মিষ্টি,
নির্জলা এ স্নেহ-বৃষ্টি,
শিল পড়িছে পট্ পট্ |
ও ভাই বঙ্গবাসী, আমি মর্লে,
তোমারা আমার চিতায় দিবে মঠ !
২
দুধটুকু নাই নারীর বুকে,
মাড়টুকু নাই দিতে মুখে,
ক্ষুধায় কাতর শিশু ছেলে
ধুলায় লুটে চট্ পট্ !
শুষ্কচোখ কণ্ঠতল,
এক বিন্দু নাইক জল,
লোল-রসনা, ভাম-লোচনা,
চাহিছে নারী কট্ মট্ !
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আমার চিতায় দিবে মঠ কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস (১৬.১.১৮৫৫ - ১.১০.১৯৯৮)।
রচনা - লত্পদি, ঢাকা, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ (১৮৯৬)। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত সম্পাদিত গোবিন্দ চয়নিকা কাব্য
সংকলন (১৯৪৮) থেকে নেওয়া।
শতছিন্ন বসন গায়ে,
শত চক্ষে লজ্জা চায়,
এমনি দৈন্য এমনি দুঃখ,
যোটে মোটে ছালার চট্ !
নীলগিরি নাহি সে খোপা
শুকনা মরা বিন্না ছোপা,
তৈল বিনা রুক্ষ কেশ
অযতনে শিবের জট্ !
শুষ্ক জীর্ণ শ্মশানকালী
সারিন্দার খোল পেটটি খালি,
আকাল ভারে বাঁচান দেহ
কাঁকাল-ভাঙ্গা কটিতট্ !
আমি মর্লে,
তোমারা আমার চিতায় দিবে মঠ,
ও ভাই বঙ্গবাসী, !
৩
পাখীও ত গাছের ডালে,
আপন বাসায় শাবক পালে
আমার নাই সে আশা, নাই সে বাসা,
কেমন বিপদ, কি সংকট |
আমি থাকি পরের বাড়ী,
নিয়ে ছেলেপপুলে নারী,
নাই যে ডালা কুলা হাড়ী,
বাপ-দাদার সে ভাঙা ঘট্ !
ও ভাই বঙ্গবাসী, আমি মর্লে,
তোমারা আমার চিতায় দিবে মঠ !
৪
আমি আজ
স্বদেশ-চ্যুত বিদেশবাসী
পরদেশ পর-প্রত্যাশী,
না জানিয়া মর্লেম আমি,
ব্যাস-কাশী --- এ পদ্মার-তট্ !
দেখিনি এমন দারুন জা'গা,
লক্ষ্মীছাড়া হতভাগা
তিন পয়সা এক বেতের আগা,---
কি মহার্ঘ, কি দুর্ঘট !
আমি মর্লে, তোমারা আমার চিতায়
দিবে মঠ!
৫
হেথা ছলনা বঞ্চনা খালি,
কে কার ভোগে দেবে বালি |
এ কিষ্কিন্ধ্যায় সবাই "বালী"
আত্মম্ভরী মর্কট !
জানেনা এরা সত্য বাক্য,
ব্যবসা এদের মিথ্যা সাক্ষ্য,
চোর গেরস্থ দু'জনারি পক্ষ,
উভচর সব কর্কট !
এরা, শিকড়ে শিকড়ে বাঁশি বাঁধা,
সকল কলার এক ছড়া---কাঁধা,
এদের, অসাধ্য নাই,---স্বার্থে আঁধা,
আকাশে "ব" নামায় বট,
কুক্ষণে হেথা আসিয়াছি,
এখন, পালাতে পার্লে প্রাণে বাঁচি |
এরা জন্তুর চেয়ে অধম পশু
আত্মগুপ্ত কূর্ম কর্মঠ !
আমি মর্লে, তোমারা আমার চিতায়
দিবে মঠ !
৬
কথার বন্ধু অনেক আছে,
কথায় তুলে দিবে গাছে,
বিপদ কালে পাইনে কাছে
কেমন স্নেহ অকপট,
অভাব দুঃখ শুনলে পরে,
পাছে কিছু চাইব ডরে,
স্বভাব-দোষে স'রে পড়ে
চোরের মত দেয় চম্পট !
কত বন্ধু দেশের নেতা,
মূখবন্ধ স্বাধীন-চেতা,
কাজের বেলায় আরেক কেতা
হৃদয় ভরা ঘোর কপট,
লেখক মেরে অনাহারে,
লুঠবে টাকা উপহারে,
সাহিত্যের যে কসাই বন্ধু
বিষম ধূর্ত, বিষম শঠ |
আমি মর্লে, তোমারা আমার চিতায়
দিবে মঠ !
ও ভাই বঙ্গবাসী !
৭
যা হোক, আমি শত ধন্য,
কৃতজ্ঞ কৃতার্থমন্য
তোমাদের এ স্নেহের জন্য
আজ তোমাদের সন্নিকট |
চিতায় মঠ বা দিবে কেহ,
গড়বে "স্ট্যাচু" অর্ধ-দেহ',
ছায়া-চিত্র রাখবে কেহ
কেউ বা তৈল চিত্রপট !
করবে তোমারা শোক-সভা,
চোখে চসমা স্বেতজবা,
ওষ্ঠে চুরুট ধূম্রপ্রভা,
করতালি চট্ পট্,
স্বর্গ কিম্বা নরক হ'তে,
আসব তখন আকাশ-পথে,
দেখতে আমার শোকসভা,
সঙ্গে নিয়ে অলকট !
সত্যই কি লজ্জা শরম
বাঙালীরে করেছে বয়কট্ ?
কে তুমি ধরায় সতি,
. পবিত্রতা মূর্ত্তিমতী,
শুভ্র সুবিমল যেন প্রভাতের ফুল?
. নাহি সাজ সজ্জা কোন,
. মণি রত্ন আভরণ ;
আপন রূপেতে তবু আপনি অতুল।
. সংসার কঠোর ঘোর,
. ভেঙ্গেছে আশ্রয় তোর,
ছিন্ন বৃন্তে বিকশিত সৌন্দর্য্য-তরুণা ;
. ম্লান ধরাতলে বাস,
. অধরে অটুট হাস,
হৃদয়ে লুকান অশ্রু, নয়নে করুণা।
. আপনার নাই কেহ,
. বিশ্ব তাই নিজ গেহ,
পরকে আনন্দ দানে তোমার মহিমা ;
. যে যায় দলিত ক’রে
. তব বাস তারো তরে,
বঙ্গের বিধবা তুমি স্বর্গের গরিমা !
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বঙ্গের বিধবা
কবি স্বর্ণকুমারী দেবী (২৮.৮.১৮৫৫ - ৩.৭.১৯৩২)
১৮৯৫ সালে প্রকাশিত, কবির “কবিতা ও গান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
হা ধিক মানব, তুই কি করিলি, হীন!
অনন্ত শকতি তোর অক্ষয় ভাণ্ডার,
অনন্ত প্রেমের স্ফূর্ত্তি ইচ্ছার অধীন ;
জানিয়াও জানিলিনে ব্যবহার তার !
চৌদিকে ছড়ান এই ব্রহ্মাণ্ড অপার
ছাপিয়া উঠেছে তোর জীবন্ত মহিমা ;
অনন্ত এ জীবনের নিত্য পারাবার
অনন্ত জ্ঞানের জ্যোতি, নাহি তার সীমা।
ক্ষুদ্র জড় শক্তি পৃথ্বী, অতি ক্ষুদ্র ওরে,
অপ্রেম অন্যায় মিথ্যা প্রবৃত্তির কণা!
বুঝিতে পারিনে কোন বিস্মৃতির ভরে
তারি মাঝে হারাইলি মহান আপনা?
অনন্ত আনন্দ জ্যোতি দিলি বিনিময়,
লভি শুধু এক বিন্দু আঁধার সংশয় !
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
হা ধিক মানব
কবি স্বর্ণকুমারী দেবী (২৮.৮.১৮৫৫ - ৩.৭.১৯৩২)
১৮৯৫ সালে প্রকাশিত, কবির “কবিতা ও গান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শ্মশান ত ভালবাসিস্ মাগো
কবি অশ্বিনীকুমার দত্ত (২৫.১.১৮৫৬ - ৭.১১.১৯২৩)
গানটি আমরা পেয়েছি, ১৯৮৩ সালে গিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত,
গীতা চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “বাংলা স্বদেশী গান” সংকলন থেকে।
শ্মশান ত ভালবাসিস্ মাগো ! তবে কেন ছেড়ে গেলি?
এত বড় বিকট শ্মশান এ জগতে কোথায় পেলি?
দেখ, সে হেথা কি হয়েছে, ত্রিশ কোটি শব পড়ে আছে,
কত ভূত-বেতাল নাচে, রঙ্গে ভঙ্গে করে কেলি!
ভূত-পিশাচ তাল-বেতাল নাচে আর বাজায় গাল
সঙ্গে ধায় ফেরুপাল, এটা ধরি ওটা ফেলি’।
আয় না হেখায় নাচবি শ্যামা! শব হবে শিব পা ছুঁয়ে মা,
জগত জুড়ে বাজবে দামা, দেখবে জগত নয়ন মেলি!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ওরে শশী কি দেখিস্ আর এ ভারত-ভুবনে
কবি অশ্বিনীকুমার দত্ত (২৫.১.১৮৫৬ - ৭.১১.১৯২৩)
গানটি আমরা পেয়েছি, ১৯৮৩ সালে গিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত,
গীতা চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “বাংলা স্বদেশী গান” সংকলন থেকে।
॥ বেহাগ - আড়া॥
ওরে শশী কি দেখিস্ আর এ ভারত-ভুবনে।
সোনার উদ্যান আজি পরিণত শ্মশানে॥
এই কি সেই ভারতবর্ষ, যাকে শত শত বর্ষ,
রঞ্জিয়াছ তুমি শশী, ঐ সুস্নিগ্ধ কিরণে ;
আজি শশী হায় হায়, দেখ অন্ধকারময়,
যত জ্যোত্স্না ঢাল তুমি, মেঘভরা গগনে।
কি আর বলিব শশী, ত্রিশ কোটি শব তথা,
গৃধিনী শকুনি তাদের, টানিতেছে সঘনে॥
তোমার সেই চন্দ্রবংশ, ক্রমে ক্রমে হল ধ্বংস,
সে খবর বুঝি শশী, পশে নাই শ্রবণে।
থাক্ শুনে কাজ নাই, শুনিবে সে খবর যাই,
পরিবে কালিমা রেখা, হাসি মাখা বদনে॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ওরে ভাই কিসের লেগে দিনে দিনে এমন হলে
কবি অশ্বিনীকুমার দত্ত (২৫.১.১৮৫৬ - ৭.১১.১৯২৩)
গানটি আমরা পেয়েছি, ১৯৮৩ সালে গিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, গীতা
চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “বাংলা স্বদেশী গান” সংকলন থেকে।
॥ বাউলের সুর॥
ওরে ভাই কিসের লেগে দিনে দিনে এমন হলে?
ওরে আর্য্যকুলে জনম ল'য়ে সকলই কি ভুলে গেলে?
কিসে যে ভাই এমন হল বিদ্যাবুদ্ধি সকল গেল,
ওরে কপাল ভেঙ্গে এমন করে কি যে পেলে?
ওরে ইন্দ্রিয় সেবাতে ভাইরে দিবানিশি মজে রইলে।
(ও ভাই) নাচেগানে থিয়েটারে কেমন এক মূর্ত্তি ধরে,
বেড়াও মিলে সবে পান চিবিয়ে দলে দলে ;
ওরে দিনান্ত রে দেশের দশা একবার ও ভাই না ভাবিলে।
দেশী তাঁতি কর্ম্মকারে অনাহারে ভাতে মরে,
(তুমি) বিদেশী বিলাসের খোঁজে কাল কাটালে ;
ওরে দেশের ভালবাসা নাই রে জনমিয়ে আর্য্যকুলে।
ইংরেজী নভেল পড়ে বেড়াও সদা গর্ব্ব করে,
ও ভাই আর্য্যঋষির গাঁথা যত জলে ফেলে,
এভাব দেখে তোমার ভাই রে আমরা ভাসি সদা নয়নজলে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আর সহে না, সহে না, জননী
কবি বিপিনচন্দ্র পাল (৭.১১.১৮৫৮ - ২০.৫.১৯৩২)
সৌমেন্দ্রনাথ গঙ্গেপাধ্যায় সম্পাদিত “স্বদেশী আন্দোলন ও বাংলা সাহিত্য” কাব্য-
সংকলনের গান। আমরা গানটি পেয়েছি ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত গীতা চট্টোপাধ্যায়
সম্পাদিত “বাংলা স্বদেশী গান” সংকলন থেকে।
॥ মুলতান - একতালা॥
আর সহে না, সহে না, জননী, এ যাতনা আর সহে না ;
আর নিশিদিন হয়ে শক্তিহীন পড়ে থাকি, প্রাণ চাহে না।
তুমি মা অভয়া জননী যাহার, কি ভয় কি ভয় এ ভবে তাহার,
দানব-দলনী ত্রিদিব-পালনী, করাল-কৃপাণী তুমি মা ;---
ঊর মা! আজিকে সে-রূপে পরানে, ডাকি মা কালিকে ! ডাকি গো সঘনে,
নয়নে অশনি জাগাও জননী ! নহিলে এ ভয় যাবে না।
ঊর মা বাহুতে, শকতিরূপিণী, ঊর মা হৃদয়ে ও রণরঙ্গিণী !
রিপুকুল মাঝে, সন্তান ল’য়ে দাঁড়া মা হৃদয়-রমা ;---
প্রলয়-হুঙ্কারে, হর-হৃদি হতে উঠিয়ে দাঁড়া মা এ ভারত মাঝে ;
শোণিত-তরঙ্গে, মাতি' রণরঙ্গে, মাভৈঃ বাণী আজ শোনা মা!
নৃমুণ্ডমালিনী, তুই মা কল্যাণী, তুই শিবে শিবমনোমোহিনী !
বিনা তোর কৃপা, বিনা তোর কৃপাণ, এ ভারত-বন্ধন ঘুচে না।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বাজায়োনা আর মোহন বাঁশী
কবি বিপিনচন্দ্র পাল (৭.১১.১৮৫৮ - ২০.৫.১৯৩২)
হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা” কাব্য-সংকলনের গান। আমরা গানটি
পেয়েছি ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত গীতা চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “বাংলা স্বদেশী গান”
সংকলন থেকে।
বাজায়োনা আর মোহন বাঁশী
আজি রুদ্ররূপে ভীমবেশে প্রকাশ’ পরাণে আসি॥
বন্ধ কর সব কুসুম গন্ধ,
রুদ্ধ কর মলয় মন্দ,
স্তব্ধ কর যত ললিত সুছন্দ, প্রকাশি অট্টহাসি।
জীবন-মায়া আজি কর হে ভিন্ন,
দয়া-বন্ধন কর হে ছিন্ন,
জাগাও সংহার জগত-পূর্ণ প্রলয়-পয়োধি-রাশি॥
দলিত কর হে চরণতলে
সকল ভীরুতা সব দুর্ব্বলে,
ভীম অসি ধরে, শ্মশানে মশানে, ভীষণ সাজাও আসি॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আছিস্ কোন উল্লাসে? “করালী” ছদ্মনামে কবি ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়
(১.২.১৮৬১ - ২৭.১০.১৯০৭)। নলিনীরঞ্জন সরকার সংকলিত ও সম্পাদিত “বন্দনা”
কাব্যসংকলনের গান। আমরা গানটি পেয়েছি ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত গীতা চট্টোপাধ্যায়
সম্পাদিত “বাংলা স্বদেশী গান” সংকলন থেকে।
আছিস্ কোন উল্লাসে?
সদাই বিদেশী জোঁক রক্ত চোষে।
জলে গেলে জলের জোঁকে
ধরে জীবের আশে পাশে ;
এ যে এমনি নচ্ছার জোঁকা
জলে স্থলে ধরল ঠেসে।
জোঁকের ভয়ে হ'লি পোক,
জন্ম নিয়ে বীর-ঔরসে ;
তোদের কাণ্ড হেরি' জগত জুড়ি,
হো হো রবে সবাই হাসে।
অস্থি চর্ম হ'ল রে সার,
রক্ত নাহি রক্তকোষে ;
এখন বাঁচতে চেলে ফেল সে জোঁক
বয়কট্ চূণা মুখে ঘ'সে।
খেতে নাই ঘরে অন্ন,
শুইতে বাঞ্ছা তক্তপোষে ;
তোরা ধনে প্রাণে গেলি মারা
বিলাসের চুলকানি দোষে।
করালীর পদাবলী
উড়াইও না উপহাসে,
দেখছ না সোনার ভারত হচ্ছে শ্মশান
দুষ্ট জোঁকার শ্বাস প্রশ্বাসে !
কবি করালী বা ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
৪ কি হ’ল! কি হ’ল! হায় কি হ’ল! কি হ’ল! দুর্ভিক্ষ-রাক্ষসী আসি শত শত প্রাণী নাশি চৌদিক ব্যাপিয়া হায় জ্বালিল অনল। জ্বলিল সোণার বঙ্গে ঘোর চিতানল।
৫ প’ড়ে আছে শিশু-পুত্র শবের মতন। জনক কাঁদিছে পাছে দয়িতা তাহার কাছে হাহাকারে করিতেছে ধরায় লুণ্ঠন। জ্বলিছে জঠরানল সংশয়-জীবন।
৬ কে দিবে আহার তারে করিয়ে যতন। কে চাহিবে মুখপানে, জীবন ওদন দানে বাঁচাইবে দরিদ্রের অমূল্য জীবন আছে কি কোখাঁও হেন পুরুষ-রতন।
|
৭ জনক জননী ত্যজি সন্তান-মায়ায় লয়ে ছুরি খরশাণ বধে তনয়ের প্রাণ, আবার লইয়ে হানে আপন গলায়। নিভাতে শোকের জ্বালা হায়! হায় ! হায়!
৮ নচেৎ কে করে বল তনয় বিক্রয়? জননী জীবন ধ’রে সম্তানে বিক্রয় করে সামান্য অর্থের তরে হায়! হায়! হায়! পাষাণ এ কথা শুনে মরি গ'লে যায়!
৯ যে শুনে এ কথা তার কেঁদে ওঠে প্রাণ। অন্নাভাবে কত শত মরিতেছে অবিরত এক দিনে ছয় লক্ষ শ্মশানে শয়ান। কাঁদিল ভারত-মাতা, কাঁদিল পাষাণ।
|
১০ কোথা গো ভারতেশ্বরি ইংলণ্ডবাসিনি! চেয়ে দেখ একবার মান্দ্রাজের ছারখার জঠর-অনলে পুড়ে দিবস যামিনী ছটফটি করে যবে হাহাকার ধ্বনি।
১১ এখন নিশ্চিন্ত থাকা তব অনুচিত। কর কর দয়া দান রাখ তনয়ের প্রাণ ঘুচাও দারিদ্র্য-জ্বালা কর গো বিহিত। নচেৎ মান্দ্রাজবাসী মরিবে নিশ্চিত॥
১২ ধনবান ছিল যারা দরিদ্র এখন। দরিদ্র আছিল যারা পথে পথে ফেরে তারা হা অন্ন হা অন্ন করি করিছে রোদন। সবার শোণিত শোষে দারিদ্র্য-ভীষণ॥
|
১৩ নিরানন্দ মনে ঐ কৃষক সুজন। বসিয়া ক্ষেত্রের তলে ভাসিয়া নয়ন জলে ভাবিছে কোথায় ধান্য বঙ্গের জীবন। কেমনে বাঁচাব হায় দারসুতগণ॥
১৪ এ দুঃখ ঘুচাতে আর নাহি অন্য জন বিনা সে ত্রিলোক-পাতা কে আছে এমন দাতা অকাতরে বাঁচাইবে দরিদ্র-জীবন? 'নিখিল ব্রহ্মাণ্ড যিনি করেন পালন॥
১৫ হে বিভো করুণাময় কাঙ্গাল-শরণ। দুর্ভিক্ষ করাল গ্রাসে কত লক্ষ প্রাণ নাশে ঘুচাও দারিদ্রা-জ্বালা রাখহ জীবন। করযোড়ে এই ভিক্ষা পতিতপাবন॥
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|