প্রতিবাদী কবিতার দেয়ালিকা
|
|
|
এই পাতাটি পাশাপাশি, ডাইনে-বামে ও কবিতাগুলি উপর-নীচ স্ক্রল করে! This page scrolls sideways < Left - Right >. Poems scroll ^ Up - Down v.
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ধান ফলানোর ছড়া মিছেই
সুখ ফলানোর ছড়া
বৃষ্টি আনার মন্ত্র মিছেই
মোহর ঘড়া ঘড়া
ধান চাইলাম ধান, সই লো
বছর ভরে ধান
মাথা গোঁজার ঠাঁই চাইলাম
একটু বাসস্থান
কিছুই পেলাম না -
ফুল-সিঁদুর দিলাম, তবু
ব্রতের ঠাকুর মুখ তুলল না
ধান ফলানোর ছড়া মিছেই
সুখ ফলানোর ছড়া
বৃষ্টি আনার মন্ত্র মিছেই
মোহর ঘড়া ঘড়া
ধান ফলানোর ছড়া কথা - কবি রঞ্জিত গুপ্ত (জন্ম ২৬.৪.১৯৪৭)। গীতিরূপ ও সুর - বিপুল চক্রবর্তী,
শিল্পী - অনুশ্রী চক্রবর্তী। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত অনুশ্রী বিপুলের “আমরা হাঁটি যেখানে মাটি” ক্যাসেটের গান।
অনুশ্রী চক্রবর্তীর কণ্ঠে গানের ভিডিওটি সৌজন্যে dharasahasra YouTube Channel.
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জমি চাইলাম জমি, সই লো
জমি দু-এক কাঠা
পোড়া জীবনে স্বামী চাইলাম
স্বামী গতর খাটা
কিছুই পেলাম না -
ফুল-সিঁদুর দিলাম, তবু
ব্রতের ঠাকুর মুখ তুলল না
ধান ফলানোর ছড়া মিছেই
সুখ ফলানোর ছড়া
বৃষ্টি আনার মন্ত্র মিছেই
মোহর ঘড়া ঘড়া
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শিবের নাচ নাচতে পারো না
তোমার নাচে নাচো কেবল তুমি
সময় মাটি কিছুই নড়ে না
চতুর্দিকে স্তব্ধ পটভূমি!
শব্দে তোমার ধ্বণি আছে
প্রতিধ্বণি কই?
তোমার কথা শুনে আমি
শোনাই তোমাকেই!
রাস্তা দিয়ে মিছিল চলে
মিছিল চলে যায়
পথের মানুষ শব্দ শোনে
অর্থ বোঝা দায়!
একাই তারা একশো হয়েছে
একশো মূখে লক্ষ লোকের হাঁক
চতুর্দিকে শব্দ ফেটেছে
কোথাও তবু, কোথাও যেন ফাঁক!
শিবের নাচ নাচতে পারো না কবি রঞ্জিত গুপ্ত (জন্ম ২৬.৪.১৯৪৭)। সুর ও কণ্ঠ - অনুপ
মুখোপাধ্যায়। গানটি রয়েছে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত ও সংকলিত গণসংগীত সংগ্রহ সংকলনে।
ভিডিওটি সৌজন্যে INRECO BENGALI YouTube Channel.
এই মিছিল প্রাণের মিছিল না
মর্মে যেন দোলন লাগে না
এই মিছিল প্রাণের মিছিল না
রাস্তা টলে, জীবন টলে না!
শিবের নাচ নাচতে পারো না
তোমার নাচে নাচো কেবল তুমি
সময় মাটি কিছুই নড়ে না
চতুর্দিকে স্তব্ধ পটভূমি॥
শেষ স্তবকটি গানে ব্যবহার করা হয়নি।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
দিবসগুলি পালিত হয়,
শপথগুলি নয়
নকল-বুঁদির কেল্লা গ'ড়ে,
নকল শত্রু জয়!
দিবস তুমি শুধুই ছবি,
শুধুই পটে লিখা!
শপথগুলি হাওয়ায় হারায়,
বিলীন জয়টীকা!
বারোমাসে তেরো পাবণ,
তবুও বাংলাদেশ।
বারোমাস্যার দুঃখিনী তুই,
কেঁদে ভেজাস কেশ . . .
দিবসগুলি পালিত হয় কবি রঞ্জিত গুপ্ত (জন্ম ২৬.৪.১৯৪৭)। সুর ও কণ্ঠ - অনুপ মুখোপাধ্যায়।
গানটি রয়েছে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত ও সংকলিত গণসংগীত সংগ্রহ সংকলনে। ভিডিওটি
সৌজন্যে INRECO BENGALI YouTube Channel.
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অচিন দেশের অচিন ময়না তুই
উড়ে এসে কী গান শোনালি
কন্ঠে যে তোর গ্রাম-বাংলার টান
পূব-বাংলার অবাক ভাটিয়ালি
এ-কী গান, গান শুধুই গান?
নাকি পক্ষী মনের কথা তোর-ই
দূর দেশেতে সই পাতালি কাকে
নদীর ধারে জলাগ্রামে বাড়ী
এই কী তবে সোনাবন্ধু রে তোর
এ-দেশে আর মানুষ পেলি না
রাজা তোকে দেননি কি কিছুই
ধবল প্রাসাদ পালঙ্ক একখানা?
অচিন দেশের অচিন ময়না তুই কবি রঞ্জিত গুপ্ত (জন্ম ২৬.৪.১৯৪৭)। সুর ও কণ্ঠ - অনুপ মুখোপাধ্যায়। কবিতাটির
রচনাকাল- ৭০ দশকের শেষভাগে সুরারোপ- ৮০র দশকের প্রথমভাগে। রেকর্ডিং ও প্রথম প্রকাশ- সাল ১৯৮৮। গানটি রয়েছে ১৯৯০
সালে প্রকাশিত সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত ও সংকলিত গণসংগীত সংগ্রহ সংকলনে।
ভিডিওটি সৌজন্যে INRECO BENGALI YouTube Channel.
বিশ্ব টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতা চলাকালীন সরকার-আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে চীনা টেবিলটেনিস দলের খেলোয়াড়েরা “আমার বাড়ি
যাইও বন্ধু বইতে দিমু পিড়া / খাইতে দিমু তোমায় আমি শালিধানের চিড়া”, এই গানটি করেন, তা শুনে কবি এই গানটি লিখেছিলেন।
রাজা তোকে ঘুরে দেখাননি কি
নীল সরোবর স্ফটিক নির্ঝরিনী
তবু কেন মন ওঠে না তোর
পক্ষীরে তোর গুমোর কীসের শুনি!
রাজার পাড়ায় শুধুই রাজার লোক
বেড়ায় ঘুরে বণিক ইন্দ্রানীরা
সেইখানে কই তেমন একটি লোক
থাকলে দিত শালিধানের চিড়া''॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
দারুণ গভীর থেকে ডাক দাও মানুষের মা
ঘুমঘোর যেন ভেঙে যায়
আমরা ঘুমের শিশু
গাঢ় ঘুম অঙ্গে লেগেছে
মাগো, ঘুম ভেঙে দাও।
ডাকো যেন মেঘ ডেকে ওঠে
ডাকো যেন সমুদ্র গর্জায়
ডাকো যেন বেজে ওঠে শাঁখ
চারিদিকে মৃত্যুর হানা
বর্গী এসেছে বলে ঘুম পাড়িও না
মাগো, ঘুম ভেঙে দাও।
দারুণ গভীর থেকে ডাক দাও কবি রঞ্জিত গুপ্ত (জন্ম ২৬.৪.১৯৪৭)। সুর ও কণ্ঠ - প্রতুল মুখোপাধ্যায়।
গানটি রয়েছে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত ও সংকলিত গণসংগীত সংগ্রহ সংকলনে। ভিডিওটি সৌজন্যে
Pratul Mukherjee - Topic YouTube Channel.
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
একটা পাভলভীয় কুকুর
খাবারের বদলে রোজ দুবেলা যাকে শোনানো হত
দূরসংবেদী কোন ঘন্টাধ্বনি
আর কুকুরটার লালা ঝরত
তার মনে হত অসংখ্য রুপোলি বিন্দু
ছুটে আসছে
এক একটা মুহূর্ত সময়ের জোড় খুলে
প্রথম বিন্দু থেকে উজ্জ্বল গোলক
তারপর এক একটি প্রতিস্থাপিত প্রতিবিশ্ব
সেই বিযুক্ত তলে
ভারহীন শূন্য ইথারে
একটা কাল্পনিক প্রাণী
সেই সুদৃশ্য মোড়ক
মাঝখানে কিছু নেই
হ্যাভ এ ব্রেক
হ্যাভ এ কিটক্যাট
টেলিব্র্যান্ড, প্যানোরামা, সামসাঙ
তোমাদের জন্য হাফ চকলেট
বাকিটা পরে
পাভলভীয় কুকুরটা দেখে
আর লালা ঝরায়
পাভলভের কুকুর কবি রঞ্জিত গুপ্ত (জন্ম ২৬.৪.১৯৪৭)। ৩.২.২০১১ ও ১১.২.২০১১ তারিখে, মিলনসাগরের পক্ষে কবির সাক্ষাৎকার
নিয়েছিলেন মানস গুপ্ত। সেই সাক্ষাৎকারেই কবি আমাদের এই কবিতাটি, তাঁর অন্যান্য কবিতার সঙ্গে দিয়েছিলেন যা মিলনসাগরে কবির পাতায়
তোলা রয়েছে।
একসময় ঘেউ ঘেউ করতে করতে
গরাদ গলিয়ে নেমে আসে নিচে
মেগাহিট, টাইমেক্স, টু-ইন-ওয়ান
এডিডাস, ল্যাকমে, ওপেল
গ্রাইন্ডার, জুসার, মিক্ সার
আলট্রা, এক্সট্রা, সুপার, সুপ্রীম
একরাশ ফিচেল সারস তার হাত ফসকে
তাকে ছুঁয়ে উড়ে যাচ্ছে
তার মুখময় পালকের ছায়া
কুকুরটা লাফায় ঝাপায় চেঁচায়
তারপর ঘুমিয়ে পড়ে
স্বপ্নের ভেতর সমস্ত ঘুমন্ত জলাভূমি, লোকালয়
আদিগন্ত মাঠ, ক্ষেতজমি, হাওড়, বাওড় পেরিয়ে
আবছা দূর সুবিন্দুতে যেখানে সময় তিনমুখে
তিনটে প্রপাতের মত নামছে
সেইখানে মায়াকুন্ডে, জলে
সে দেখে-----
ক্রুদ্ধ মারমুখী হেরে ফতুর
পৃথিবীর শেষ বাজির আরেক জুয়াড়ি
তারই মত আরেকটা কুকুর
‘এই সেই সারসের নিষিদ্ধ পাইকার’-----
মস্তিষ্কের তীব্র প্রদাহে, ক্ষোভে জিঘাংসায়
সমস্ত কাঁচ আঁচড়ে কামড়ে
ভেঙে চৌচির করে
সব ফক্কা
কই কিচ্ছু নেই !
কুকুরটা পাগল হয়ে গেল
আর দূরসংবেদী ঘন্টা তখনও বেজেই চলেছে :
হ্যাভ এ কিটক্যাট
হ্যাভ এ ব্রেক
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ছবি আঁকতে গেলে মায়ের কোলে ছেলেকে দেখাবেই
কিন্তু আসলে কোন ছেলে মায়ের কোলে নেই,
ছেলেরা সব কোল খালি ক'রে
কেউ বরানগরে কেউ বারাসতে খুন হচ্ছে
ছবি আঁকতে গেলে তবু চিত্রকর মায়ের কোলে ছেলেকে দেখাবেই।
কবি, ভুমি বলতে---মানুষের যা আছে
তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর তার মুখ
ছবিতে কেউ মুখ বিশ্রী আঁকলে তুমি সইতে পারতে না।
সেই মুখ যখন ছবিতে নয়, সত্যি সত্যি
জেলখানায় প্রচণ্ড মারে ফুলে বীভৎস দেখায়
তখন তুমি কি ক’রে তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সহ্য কর?
মাকে নিয়ে কবিতা লিখবে
মায়ের দুঃখ নিয়ে
যদি মা রথের মেলায় চুড়ি কিনতে এসে
হাত ফস্কে হারায় তার
লাল জামা লাল জুতো লাল মোজার ছোট্ট ছেলেটাকে।
খোলা চিঠি কবি রঞ্জিত গুপ্ত (জন্ম ২৬.৪.১৯৪৭)। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত, পুলক চন্দ সম্পাদিত “রক্তে ভাসে স্বদেশ সময়” কাব্য
সংকলনের কবিতা।
মাকে নিয়ে কবিতা লেখো নি
যখন মা দাঁড়ালো জেল-গেটে---
জেল-গেটে, আহত বা নিহতের তালিকায়
নিজের ছেলের নাম, নিজের ছেলের মুখ, নিজের ছেলেকে খুঁজে নিতে।
ছবিতে, কবিতায়, তোমাদের মানুষগুলোর পা মাটিতে মাথা ওপরে করা
জীবনে, সত্যিকারের জীবনে তবে কেন
মানুষগুলোর মাথা নিচে পা ওপরে ঝোলানো,
আর মুখ দিয়ে সমানে রক্তবমন হয়?
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জেলের ভেতরে যারা মারা গেলি
তোদের কি বলবো
শুধু এইটুকু জেনে রাখ
তোদের যারা মারলো
তাদের মৃত্যু হবে তোদের চেয়েও মর্মান্তিক, আরো মর্মান্তিক
তোরা তো মারা গেলি চাক-দিক আটকানো জেলখানায়
চার দেয়ালের অন্ধকারে
আর ওরা, সমস্ত পৃথিবী
হাটখোলা পেয়েও
কোথাও পালিয়ে দু'দণ্ড বসবার সময় পাবে না
যেখানেই যাবে সেখানেই
একটু বাদেই শুনবে ক্রমশ নিকটবর্তী বহু কণ্ঠের কোলাহল
কাছে আসছে ধরতে তাদের
কোন দিকে যাবে তারা?
উত্তর
দক্ষিণ
পূর্ব
পশ্চিম
যেখানেই যাবে সেখানেই
দেখবে বিশাল পৃথিবী কুঁচকিয়ে গুটিয়ে
মুহূর্তে
বিকট জেলখানা হয়ে গেছে॥
জেলখানা কবি রঞ্জিত গুপ্ত (জন্ম ২৬.৪.১৯৪৭)। প্রথম প্রকাশিত ১৯৭২ স্পন্দন
পত্রিকার জুলাই সংখ্যায়। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত, পুলক চন্দ সম্পাদিত “রক্তে ভাসে স্বদেশ
সময়” কাব্য সংকলন থেকে আমরা পেয়েছি।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আগাছা ছাড়াই, আল বাঁধি, জমি চষি, মই দিই,
বীজ বুনি, নিড়োই, দিনের পর
দিন চোখ ফেলে রাখি শুকনো আকাশের দিকে। ঘাম ঢালি
খেত ভ’রে, আসলে রক্ত ঢেলে দিই
নোনা পানিরূপে ; অবশেষে মেঘ ও মাটির দয়া হলে
খেত জুড়ে জাগে প্রফুল্ল সবুজ কম্পন।
খরা, বৃষ্টি, ঝড়, ও একশো একটা উপদ্রব কেটে গেলে
প্রকৃতির কৃপা হ’লে এক সময়
মুখ দেখতে পাই থোকাথোকা সোনালি শস্যের।
এতো ঘামে, নিজেকে ধানের মতোই
সিদ্ধ করে, ফলাই সামান্য, যেনো একমুঠো, গরিব শস্য।
মূর্খ মানুষ, দূরে আছি, জানতে ইচ্ছে করে
দিনরাত লেফ-রাইট লেফ-রাইট করলে ক-মণ শস্য ফলে
এক গন্ডা জমিতে?
তৃতীয় বিশ্বের একজন চাষীর প্রশ্ন
কবি হুমায়ুন আজাদ (২৮.৪.১৯৪৭ - ১১.৮.২০০৪)। আমরা ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ বাংলারকবিতা.কম
ওয়েবসাইটের কাছে কারণ এই কবিতাটি আমরা সেখান থেকে নিয়েছি। সেই ওয়েবসাইটে যেতে
এখানে ক্লিক করুন . . .।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শেকলে বাঁধা শ্যামল রূপসী, তুমি-আমি, দুর্বিনীত দাসদাসী-
একই শেকলে বাঁধা প’ড়ে আছি শতাব্দীর পর শতাব্দী।
আমাদের ঘিরে শাঁইশাঁই চাবুকের শব্দ, স্তরে স্তরে শেকলের ঝংকার।
তুমি আর আমি সে-গোত্রের যারা চিরদিন উৎপীড়নের মধ্যে গান গায়-
হাহাকার রূপান্তরিত হয় সঙ্গীতে-শোভায়।
লকলকে চাবুকের আক্রোশ আর অজগরের মতো অন্ধ শেকলের
মুখোমুখি আমরা তুলে ধরি আমাদের উদ্ধত দর্পিত সৌন্দর্য:
আদিম ঝরনার মতো অজস্র ধারায় ফিনকি দেয়া টকটকে লাল রক্ত,
চাবুকের থাবায় সুর্যের টুকরোর মতো ছেঁড়া মাংস
আর আকাশের দিকে হাতুড়ির মতো উদ্যত মুষ্টি।
শাঁইশাঁই চাবুকে আমার মিশ্র মাংসপেশি পাথরের চেয়ে শক্ত হয়ে ওঠে
তুমি হয়ে ওঠো তপ্ত কাঞ্চনের চেয়েও সুন্দর।
সভ্যতার সমস্ত শিল্পকলার চেয়ে রহস্যময় তোমার দু-চোখ
যেখানে তাকাও সেখানেই ফুটে ওঠে কুমুদকহ্লার
হরিণের দ্রুত ধাবমান গতির চেয়ে সুন্দর ওই ভ্রূযুগল
তোমার পিঠে চাবুকের দাগ চুনির জড়োয়ার চেয়েও দামি আর রঙিন
তোমার দুই স্তন ঘিরে ঘাতকের কামড়ের দাগ মুক্তোমালার চেয়েও ঝলোমলো
তোমার ‘অ, আ’ –চিৎকার সমস্ত আর্যশ্লোকের চেয়েও পবিত্র অজর
বাঙলা ভাষা
হুমায়ুন আজাদ (২৮.৪.১৯৪৭ - ১১.৮.২০০৪)। আমরা ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ বাংলারকবিতা.কম ওয়েবসাইটের কাছে কারণ এই কবিতাটি আমরা
সেখান থেকে নিয়েছি। সেই ওয়েবসাইটে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
তোমার দীর্ঘশ্বাসের নাম চন্ডীদাস
শতাব্দী কাঁপানো উল্লাসের নাম মধুসূদন
তোমার থরোথরো প্রেমের নাম রবীন্দ্রনাথ
বিজন অশ্রুবিন্দুর নাম জীবনানন্দ
তোমার বিদ্রোহের নাম নজরুল ইসলাম
শাঁইশাঁই চাবুকের আক্রোশে যখন তুমি আর আমি
আকাশের দিকে ছুঁড়ি আমাদের উদ্ধত সুন্দর বাহু, রক্তাক্ত আঙুল,
তখনি সৃষ্টি হয় নাচের নতুন মুদ্রা;
ফিনকি দেয়া লাল রক্ত সমস্ত শরীরে মেখে যখন আমরা গড়িয়ে পড়ি
ধূসর মাটিতে এবং আবার দাঁড়াই পৃথিবীর সমস্ত চাবুকের মুখোমুখি,
তখনি জন্ম নেয় অভাবিত সৌন্দর্যমন্ডিত বিশুদ্ধ নাচ;
এবং যখন শেকলের পর শেকল চুরমার ক’রে ঝনঝন ক’রে বেজে উঠি
আমরা দুজন, তখনি প্রথম জন্মে গভীর-ব্যাপক-শিল্পসম্মত ঐকতান-
আমাদের আদিগন্ত আর্তনাদ বিশশতকের দ্বিতীয়ার্ধের
একমাত্র গান।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আপনাকে দেখিনি আমি ; তবে আপনি
আমার অচেনা
নন পুরোপুরি, কারণ বাঙলার
মায়েদের আমি
মোটামুটি চিনি, জানি। হয়তো
গরিব পিতার ঘরে
বেড়ে উঠেছেন দুঃক্ষিণী
বালিকারূপে ধীরেধীরে ;
দুঃক্ষের সংসারে কুমড়ো ফুলের
মতো ফুটেছেন
ঢলঢল, এবং সন্ত্রস্ত ক’রে
তুলেছেন মাতা
ও পিতাকে। গরিবের ঘরে ফুল
ভয়েরই কারণ।
তারপর একদিন ভাঙা পালকিতে চেপে
দিয়েছেন
পাড়ি, আর এসে উঠেছেন আরেক গরিব
ঘরে;
স্বামীর আদর হয়তো ভাগ্যে
জুটেছে কখনো, তবে
অনাদর জুটেছে অনেক। দারিদ্র্য,
পীড়ন, খণ্ড
গোলামের গর্ভধারিণী
হুমায়ুন আজাদ (২৮.৪.১৯৪৭ - ১১.৮.২০০৪)। আমরা ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ বাংলারকবিতা.
কম ওয়েবসাইটের কাছে কারণ এই কবিতাটি আমরা সেখান থেকে নিয়েছি। সেই
ওয়েবসাইটে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
প্রেম, ঘৃণা, মধ্যযুগীয়
স্বামীর জন্যে প্রথাসিদ্ধ
ভক্তিতে আপনার কেটেছে জীবন।
বঙ্গীয় নারীর
আবেগে আপনিও চেয়েছেন বুক জুড়ে
পুত্রকন্যা,
আপনার মরদ বছরে একটা নতুন
ঢাকাই
শাড়ি দিতে না পারলেও বছরে বছরে
উপহার
দিয়েছেন আপনাকে একের পর এক
কৃশকায়
রুগ্ন সন্তান, এবং তাতেই আপনার
শুষ্ক বুক
ভাসিয়ে জেগেছে তিতাসের তীব্র
জলের উচ্ছ্বাস।
চাঁদের সৌন্দর্য নয়, আমি জানি
আপনাকে মুগ্ধ
আলোড়িত বিহ্বল করেছে সন্তানের
স্নিগ্ধ মুখ,
আর দেহের জ্যোৎস্না। আপনিও
চেয়েছেন জানি
আপনার পুত্র হবে সৎ, প্রকৃত
মানুষ। তাকে
দারিদ্র্যের কঠোর কামড় টলাবে
না সততার
পথ থেকে, তার মেরুদণ্ড হবে দৃঢ়,
পীড়নে বা
প্রলোভনে সে কখনো বুটদের সেজদা
করবে না।
আপনার উচ্চাভিলাষ থাকার তো কথা
নয়, আপনি
আনন্দিত হতেন খুবই আপনার পুত্র
যদি হতো
সৎ কৃষিজীবী, মেরুদণ্ডসম্পন্ন
শ্রমিক, কিংবা
তিতাসের অপরাজেয় ধীবর। আপনি
উপযুক্ত
শিক্ষা দিতে পারেন নি
সন্তানকে;- এই পুঁজিবাদী
ব্যবস্থায় এটাই তো স্বাভাবিক,
এখানে মোহর
ছাড়া কিছুই মেলে না, শিক্ষাও
জোটে না। তবে এতে
আপনার কোনো ক্ষতি নেই জানি;
কারণ আপনি
পুত্রের জন্যে কোনো রাজপদ, বা ও
রকম কিছুই
চান নি, কেবল চেয়েছেন আপনার
পুত্র হোক
সৎ, মেরুদণ্ডী, প্রকৃত মানুষ।
আপনার সমস্ত
পবিত্র প্রার্থনা ব্যর্থ ক’রে
বিশশতকের এই
এলোমেলো অন্ধকারে আপনার পুত্র
কী হয়েছে
আপনি কি তা জানেন তা, হে অদেখা
দরিদ্র জননী?
কেনো আপনি পুত্রকে
পাঠিয়েছিলেন মুঘলদের
এই ক্ষয়িষ্ণু শহরে, যেখানে
কৃষক এসে লিপ্ত
হয় পতিতার দালালিতে, মাঠের
রাখাল তার
নদী আর মাঠ হ’য়ে ওঠে হাবশি
গোলাম?
আপনি কি জানেন, মাতা, আপনার
পুত্র শহরের
অন্যতম প্রসিদ্ধ গোলাম আজ?
আপনি এখন
তাকে চিনতেও ব্যর্থ হবেন,
আপনার পুত্রের দিকে
তাকালে এখন কোনো মস্তক পড়ে না
চোখে, শুধু
একটা বিশাল কুঁজ চোখে পড়ে।
দশকে দশকে
যতো স্বঘোষিত প্রভু দেখা
দিয়েছেন মুঘলদের
এ-নষ্ট শহরে, আপনার পুত্র তাদের
প্রত্যেকের
পদতলে মাথা ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে
পৃষ্ঠদেশ জুড়ে
জন্মিয়েছে কুঁজ আর কুঁজ; আজ তার
পৃষ্ঠদেশ
একগুচ্ছ কুঁজের সমষ্টি;-
মরুভূমিতে কিম্ভুত
বহুকুঁজ উটের মতোই এখন দেখায়
তাকে।
সে এখন শহরের বিখ্যাত গোলাম
মজলিশের
বিখ্যাত সদস্য, গোলামিতে সে ও
তার ইয়ারেরা
এতোই দক্ষ যে প্রাচীন,
ঐতিহাসিক গোলামদের
গৌরব হরণ ক’রে তারা আজ মশহুর
গোলাম
পৃথিবীর। এখন সে মাথা তার
তুলতে পারে না,
এমনকি ভুলেও গেছে যে একদা তারও
একটি
মাথা ছিলো, এখন সে বহুশীর্ষ
কুঁজটিকেই মাথা
ব’লে ভাবে। খাদ্যগ্রহণের পর
স্বাভাবিক পদ্ধতিও
বিস্মৃত হয়েছে সে, প্রভুদের
পাদুকার তলে
প’ড়ে থাকা অন্ন চেটে খাওয়া ছাড়া
আর কিছুতেই
পরিতৃপ্তি পায় না আপনার পুত্র,
একদা আপনার
স্তন থেকে মধুদুগ্ধ শুষে নিয়ে
জীবন ধারণ
করতো যে বালক বয়সে। এখন সে
শত্রু পাখি
ও নদীর, শত্রু মানুষের, এমন কি
সে আপনার
স্তন্যেরও শত্রু। তার জন্য
দুঃক্ষ করি না, কতোই
তো গোলাম দেখলাম এ-বদ্বীপে
শতকে শতকে।
কিন্তু আপনার জন্যে, হে গরিব
কৃষক-কন্যা, দুঃক্ষী
মাতা, গরিব-গৃহিণী, আপনার জন্যে
বড় বেশি
দুঃখ পাই;- আপনার পুত্রের
গোলামির বার্তা আজ
রাষ্ট্র দিকে দিকে, নিশ্চয়ই তা
পৌঁছে গেছে তিতাসের
জলের গভীরে আর কুমড়োর খেতে,
লাউয়ের
মাঁচায়, পাখির বাসা আর চাষীদের
উঠানের কোণে।
তিতাসের জল আপনাকে দেখলে ছলছল
ক’রে
ওঠে, ‘ওই দ্যাখো গোলামের
গর্ভধারিণীকে’; মাঠে
পাখি ডেকে ওঠে, ‘দ্যাখো গোলামের
গর্ভধারিণীকে’;
আপনার পালিত বেড়াল দুধের বাটি
থেকে
দু-চোখ ফিরিয়ে বলে, ‘গোলামের
গর্ভধারিণীর
হাতের দুগ্ধ রোচে না আমার জিভে’,
প্রতিবেশী
পুরুষ-নারীরা অঙ্গুলি সংকেত
ক’রে কলকণ্ঠে
বলে, ‘দ্যাখো গোলামের
গর্ভধারিণীকে।’ এমন কি
প্রার্থনার সময়ও আপনি হয়তো বা
শুনতে পান
‘গোলামের গর্ভধারিণী, ধারিণী’
স্বর ঘিরে ফেলছে
চারদিক থেকে। আপনি যখন অন্তিম
বিশ্রাম
নেবেন মাটির তলে তখনো হয়তো
মাটি ফুঁড়ে
মাথা তুলবে ঘাসফুল, বাতাসের
কানে কানে ব’লে
যাবে, ‘এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক
গর্ভধারিণী
গোলামের।’ ভিজে উঠবে মাটি
ঠাণ্ডা কোমল অশ্রুতে।
কী দোষ আপনার? মা কি কখনোও জানে
দশমাস
ধ’রে যাকে সে ধারণ করছে সে মানুষ
না গোলাম?
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
গরিবেরা সাধারণত সুন্দর হয় না।
গরিবদের কথা মনে হ’লে সৌন্দর্যের কথা মনে পড়ে না কখনো।
গরিবদের ঘরবাড়ি খুবই নোংরা, অনেকের আবার ঘরবাড়িই নেই।
গরিবদের কাপড়চোপড় খুবই নোংরা, অনেকের আবার কাপড়চোপড়ই নেই।
গরিবেরা যখন হাঁটে তখন তাদের খুব কিম্ভুত দেখায়।
যখন গরিবেরা মাটি কাটে ইট ভাঙে খড় ঘাঁটে গাড়ি ঠেলে পিচ ঢালে তখন তাদের
সারা দেহে ঘাম জবজব করে, তখন তাদের খুব নোংরা আর কুৎসিত দেখায়।
গরিবদের খাওয়ার ভঙ্গি শিম্পাঞ্জির ভঙ্গির চেয়েও খারাপ।
অশ্লীল হাঁ ক’রে পাঁচ আঙ্গুলে মুঠো ভ’রে সব কিছু গিলে ফেলে তারা।
থুতু ফেলার সময় গরিবেরা এমনভাবে মুখ বিকৃত করে
যেনো মুখে সাতদিন ধ’রে পচছিলো একটা নোংরা ইঁদুর।
গরিবদের ঘুমোনোর ভঙ্গি খুবই বিশ্রী।
গরিবেরা হাসতে গিয়ে হাসিটাকেই মাটি ক’রে ফেলে।
গান গাওয়ার সময়ও গরিবদের একটুও সুন্দর দেখায় না।
গরিবেরা চুমো খেতেই জানে না, এমনকি শিশুদের চুমো খাওয়ার সময়ও
থকথকে থুতুতে তারা নোংরা করে দেয় ঠোঁট নাক গাল।
গরিবদের আলিঙ্গন খুবই বেঢপ।
গরিবদের সঙ্গমও অত্যন্ত নোংরা, মনে হয় নোংরা মেঝের ওপর
সাংঘাতিকভাবে ধ্বস্তাধ্বস্তি করছে দু’টি উলঙ্গ অশ্লীল জন্তু।
গরীবের সৌন্দর্য
হুমায়ুন আজাদ (২৮.৪.১৯৪৭ - ১১.৮.২০০৪)। আমরা ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ বাংলারকবিতা.কম ওয়েবসাইটের কাছে কারণ এই কবিতাটি আমরা সেখান থেকে নিয়েছি।
সেই ওয়েবসাইটে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .। শাহিদা ফেন্সীর কণ্ঠে আবৃত্তি শুনুন এই ভিডিওটিতে, সৌজন্যে - বাকরুদ্ধ তিতির YouTube Channel.
গরিবদের চুলে উকুন আর জট ছাড়া কোনো সৌন্দর্য নেই।
গরিবদের বগলের তলে থকথকে ময়লা আর বিচ্ছিরি লোম সব জড়াজড়ি করে।
গরিবদের চোখের চাউনিতে কোনো সৌন্দর্য নেই,
চোখ ঢ্যাবঢ্যাব ক’রে তারা চারদিকে তাকায়।
মেয়েদের স্তন খুব বিখ্যাত, কিন্তু গরিব মেয়েদের স্তন শুকিয়ে শুকিয়ে
বুকের দু-পাশে দুটি ফোড়ার মতো দেখায়।
অর্থাৎ জীবনযাপনের কোনো মুহূর্তেই গরিবদের সুন্দর দেখায় না।
শুধু যখন তারা রুখে ওঠে কেবল তখনি তাদের সুন্দর দেখায়।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ-পরিষদ; চলে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে
চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত দলিল
নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র
আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চলে গেছে নষ্টদের
অধিকারে। চ’লে যাবে শহর বন্দর ধানক্ষেত
কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক
মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ পবিত্র প্যাগোডা।
অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে ;
চাষার সমস্ত স্বপ্ন আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন
সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।
আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
কড়কড়ে রৌদ্র আর গোলগাল পূর্ণিমার চাঁদ
নদীরে পাগল করা ভাটিয়ালি খড়ের গম্বুজ
শ্রাবণের সব বৃষ্টি নষ্টদের অধিকারে যাবে।
রবীন্দ্রনাথের সব জ্যোৎস্না আর রবিশংকরের
সমস্ত আলাপ হৃদয়স্পন্দন গাথা ঠোঁটের আঙুর
ঘাইহরিণীর মাংসের চিৎকার মাঠের রাখাল
কাশবন একদিন নষ্টদের অধিকারে যাবে।
চলে যাবে সেই সব উপকথাঃ সৌন্দর্য-প্রতিভা-মেধা ;
এমনকি উন্মাদ ও নির্বোধদের প্রিয় অমরতা
নির্বাধ আর উন্মাদদের ভয়ানক কষ্ট দিয়ে
অত্যন্ত উল্লাসভরে নষ্টদের অধিকারে যাবে।
আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
সবচে সুন্দর মেয়ে দুইহাতে টেনে সারারাত
চুষবে নষ্টের লিঙ্গ; লম্পটের অশ্লীল উরুতে
গাঁথা থাকবে অপার্থিব সৌন্দর্যের দেবী। চ’লে যাবে,
কিশোরীরা চ’লে যাবে, আমাদের তীব্র প্রেমিকারা
ওষ্ঠ আর আলিঙ্গন ঘৃণা ক’রে চ’লে যাবে, নষ্টদের
উপপত্নী হবে। এই সব গ্রন্থ শ্লোক মুদ্রাযন্ত্র
শিশির বেহালা ধান রাজনীতি দোয়েলের স্বর
গদ্য পদ্য আমার সমস্ত ছাত্রী মার্ক্স-লেনিন,
আর বাঙলার বনের মত আমার শ্যামল কন্যা-
রাহুগ্রস্থ সভ্যতার অবশিষ্ট সামান্য আলোক
আমি জানি তারা সব নষ্টদের অধিকারে যাবে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এ লাশ আমরা রাখবো কোথায় ?
তেমন যোগ্য সমাধি কই ?
মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো
অথবা সুনীল-সাগর-জল-
সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই !
তাইতো রাখি না এ লাশ
আজ মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,
হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।
এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়
কবি হুমায়ুন আজাদ (২৮.৪.১৯৪৭ - ১১.৮.২০০৪)। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার
পর ১৯৭৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কবিতায় প্রতিক্রিয়া কবি হুমায়ুন আজাদের। আমরা
ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ বাংলারকবিতা.কম ওয়েবসাইটের কাছে কারণ এই কবিতাটি আমরা
সেখান থেকে নিয়েছি। সেই ওয়েবসাইটে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ছেলেবেলায় আমি যেখানে খেলতাম
তিরিশ বছর গিয়ে দেখি সেখানে একটি মসজিদ উঠেছে।
আমি জানতে চাই ছেলেরা এখন খেলে কোথায়?
তারা বলে ছেলেরা এখন খেলে না, মসজিদে পাঁচবেলা নামাজ পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময় বুড়িগঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়ে
যেখানে একঘণ্টা পরস্পরের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলাম আমি আর মরিয়ম,
গিয়ে দেখি সৌদি সাহায্যে সেখানে একটা লাল ইটের মসজিদ উঠেছে।
কোথাও নিষ্পলক দৃষ্টি নেই চারদিকে জোব্বা আর আলখাল্লা।
পঁচিশ বছর আগে বোম্বাই সমুদ্রপারে এক সেমিনারে গিয়ে
যেখানে আমরা সারারাত নেচেছিলাম আর পান করেছিলাম আর নেচেছিলাম,
১৯৯৫-এ গিয়ে গিয়ে দেখি সেখানে এক মস্ত মন্দির উঠেছে।
দিকে দিকে নগ্ন সন্ন্যাসী, রাম আর সীতা, সংখ্যাহীন হনুমান;
নাচ আর পান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ফার্থ অফ ফোর্থের তীরের বনভূমিতে যেখানে সুজ্যান আমাকে
জড়িয়ে ধ’রে বাড়িয়ে দিয়েছিলো লাল ঠোঁট,
সেখানে গিয়ে দেখি মাথা তুলেছে এক গগনভেদি গির্জা।
বনভূমি ঢেকে আকাশ থেকে মাটি পর্যন্ত ঝুলছে এক ক্রুদ্ধ ক্রুশকাঠ।
প্রার্থনালয়
কবি হুমায়ুন আজাদ (২৮.৪.১৯৪৭ - ১১.৮.২০০৪)। কবির ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত “কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমরা ভীষণভাবে
কৃতজ্ঞ ইবেঙ্গলিলাইব্রেরি.কম ওয়েবসাইটের কাছে কারণ এই কবিতাটি আমরা সেখান থেকে নিয়েছি। সেই ওয়েবসাইটে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
আমি জিজ্ঞেস করি কেনো দিকে দিকে দিকে এতো প্রার্থণালয়।
কেনো খেলার মাঠ নেই গ্রামে?
কেনো নদীর ধারে নিষ্পলক পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকার স্থান নেই?
কেনো জায়গা নেই পরস্পরকে জড়িয়ে ধ’রে চুম্বনের?
কেনো জায়গা নেই নাচ আর পানের?
তারা বলে পৃথিবী ভ’রে গেছে পাপে, আসমান থেকে জমিন ছেয়ে গেছে গুনাহ্য়
তাই আমাদের একমাত্র কাজ এখন শুধুই প্রার্থনা।
চারদিকে তাকিয়ে আমি অজস্র শক্তিশালী মুখমণ্ডল দেখতে পাই,
তখন আর একথা অস্বীকার করতে পারি না।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আমার চোখের সামনে প’চে গ’লে নষ্ট হলো কতো শব্দ,
কিংবদন্তি, আদর্শ, বিশ্বাস। কতো রঙিন গোলাপ
কখনোবা ধীরে ধীরে, কখনো অত্যন্ত দ্রুত, পরিণত হলো
নোংরা আবর্জনায়।
আমার বাল্যে ‘বিপ্লব’ শব্দটি প্রগতির উত্থান বোঝাতো।
যৌবনে পা দিতে-না-দিতেই দেখলাম শব্দটি প’চে যাচ্ছে–
ষড়যন্ত্র, বুটের আওয়াজ, পেছনের দরোজা দিয়ে
প্রতিক্রিয়ার প্রবেশ বোঝাচ্ছে।
‘সংঘ’ শব্দটি গত এক দশকেই কেমন অশ্লীল হয়ে উঠেছে।
এখন সংঘবদ্ধ দেখি নষ্টদের, ঘাতক ডাকাত ভণ্ড আর
প্রতারকেরাই উদ্দীপনাভরে নিচ্ছে সংঘের শরণ। যারা
মানবিক, তারা কেমন নিঃসঙ্গ আর নিঃসংঘ ও
অসহায় হয়ে উঠছে দিনদিন।
আমার চোখের সামনে শহরের সবচেয়ে রূপসী মেয়েটি
প্রথমে অভিনেত্রী, তারপর রক্ষিতা, অবশেষে
বিখ্যাত পতিতা হয়ে উঠলো।
আমার চোখের সামনে
কবি হুমায়ুন আজাদ (২৮.৪.১৯৪৭ - ১১.৮.২০০৪)। কবির ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত “যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল”
কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমরা ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ ইবেঙ্গলিলাইব্রেরি.কম ওয়েবসাইটের কাছে কারণ এই কবিতাটি আমরা সেখান
থেকে নিয়েছি। সেই ওয়েবসাইটে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
এক দশক যেতে-না-যেতেই আমি দেখলাম
বাঙলার দিকে দিকে একদা আকাশে মাথা-ছোঁয়া মুক্তিযোদ্ধারা
কী চমৎকার হয়ে উঠলো রাজাকার।
আর আমার চোখের সামনেই রক্তের দাগ-লাগা সবুজ রঙের
বাঙলাদেশ দিন দিন হয়ে উঠলো বাঙলাস্তান।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সকলেই আজকাল স্তাবকতা করে জনতার।
স্বৈরাচারী, রাজনীতিব্যবসায়ী, ও তাত্ত্বিকেরা তো বটেই,
জনতার কবিসম্প্রদায়ও অক্লান্ত স্তাবকতা করে জনতার।
স্তাবকতা আত্মোন্নতির উপায় মাত্র; এতে জনতার
কোনো লাভ নেই। স্বৈরাচারী স্তাবকতা করে
সিংহাসনে টেকার জন্যে; রাজনীতিব্যবসায়ী স্তাবকতা
করে সিংহাসনে ওঠার আশায়। তাত্ত্বিকেরা
স্তাবকতা করে, কারণ তাদেরও চোখ নিবদ্ধ
সিংহাসনের আশেপাশে।
জনতার কবিসম্প্রদায়ও লাভের আশায়ই
স্তাবকতা করে জনতার।
তবে যে প্রকৃত কবি, যার ভালোবাসা বিশুদ্ধ প্রকৃত,
সে স্তব করতে পারে, কিন্তু স্তাবকতা
করে না কখনো। সে জানে জনতাও দেবতা নয়;
জনতাও বিপথগামী হয় অন্ধকারে;
পদস্খলিত হয় পিচ্ছিল রাস্তায়। তাই সে স্তাবকতার বদলে
নিজেকেই করে তোলে অগ্নিশিখা, জনতা তখন
পথ খুঁজে পায়। জনতা অনুসরণ করে কবিকে।
কবি, অগ্নিশিখা, কখনো অনুসরণ
করে না জনতাকে।
কবি ও জনতাস্তাবকতা
কবি হুমায়ুন আজাদ (২৮.৪.১৯৪৭ - ১১.৮.২০০৪)। কবির ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত “যতোই
গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমরা ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ
ইবেঙ্গলিলাইব্রেরি.কম ওয়েবসাইটের কাছে কারণ এই কবিতাটি আমরা সেখান থেকে নিয়েছি।
সেই ওয়েবসাইটে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আজকাল আমি কোনো প্রতিভাকে ঈর্ষা করি না।
মধুসূদন রবীন্দ্রনাথ এমন কি সাম্প্রতিক ছোটোখাটো
শামসুর রাহমানকেও ঈর্ষাযোগ্য ব’লে গণ্য
করি না; বরং করুণাই করি। বড় বেশি ঈর্ষা
করি গরু ও গাধাকে;–মানুষের কোনো পর্বে গরু
ও গাধারা এতো বেশি প্রতিষ্ঠিত, আর এতো বেশি
সম্মানিত হয় নি কখনো। অমর ও জীবিত
গরু ও গাধায় ভরে উঠছে বঙ্গদেশ; যশ খ্যাতি
পদ প্রতিপত্তি তাদেরই পদতলে। সিংহ নেই,
হরিণেরা মৃত; এ-সুযোগে বঙ্গদেশ ভ’রে গেছে
শক্তিমান গরু ও গাধায়। এখন রবীন্দ্রনাথ
বিদ্যাসাগর বাঙলায় জন্ম নিলে হয়ে উঠতেন
প্রতিপত্তিশালী গরু আর অতি খ্যাতিমান গাধা।
গরু ও গাধা
কবি হুমায়ুন আজাদ (২৮.৪.১৯৪৭ - ১১.৮.২০০৪)। কবির ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত “যতোই
গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমরা ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ
ইবেঙ্গলিলাইব্রেরি.কম ওয়েবসাইটের কাছে কারণ এই কবিতাটি আমরা সেখান থেকে নিয়েছি।
সেই ওয়েবসাইটে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
তোমার দুই চির-অপ্রতিষ্ঠিত পুত্র কবি ও কৃষক (নিষাদেরাই
প্রতিষ্ঠিত চিরকাল) তোমার রূপের কথা
রটায় দিনরাত। একজন ধানখেতে তোমার দেহের
স্তব করে যেই গান গেয়ে ওঠে অন্যজন অমনি পুথির ধূসর
পাতা ভরে তোলে সমিল পয়ারে।
একজনকে তুমি এক বিঘে ধান দিলে সে তোমার দশ বিঘে
ভ’রে তোলে গানে। অন্যজনকে যখন তুমি
একটি পংক্তি দাও সে তখন দশশ্লোক স্তব রচে তোমার রূপের।
এ ছাড়া তোমার স্তব কোনো কালে বেশি কেউ
করে নি কখনো, বরং কুৎসাই রটিয়েছে শতকে শতকে।
এখন তো তুমি অপরিহার্য নও তোমার অধিকাংশ পুত্রের জন্যেই।
অনেকের চোখেই এখন মরুভূমি তোমার চেয়েও বেশি
সবুজ ও রূপসী, আর শীতপ্রধান অঞ্চলের উষ্ণতা রক্তেমাংসে
উপভোগে উৎসাহী সবাই, তাই তোমাকে ‘বিদায়’ না ব’লেই তারা
ছেড়ে যাচ্ছে তোমার উঠোন। আর চিরকালই
ঝোপঝাড়ে পাটখেতে ওৎ পেতে আছে অজস্র ধর্ষণকারী।
কতোবার যে দশকে দশকে ধর্ষিতা হয়েছো তুমি, তোমার আর্ত চিৎকার
মিশে গেছে মাঠে ঘাটে তুমি তার হিশেবও রাখো নি।
নষ্ট হৃৎপিণ্ডের মতো বাঙলাদেশ
কবি হুমায়ুন আজাদ (২৮.৪.১৯৪৭ - ১১.৮.২০০৪)। কবির ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত “যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। আমরা ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ ইবেঙ্গলিলাইব্রেরি.কম ওয়েবসাইটের কাছে কারণ এই কবিতাটি আমরা সেখান থেকে নিয়েছি। সেই
ওয়েবসাইটে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
তুমি সেই কৃষক-কন্যা, যে ধর্ষিতা হলে প্রতিবাদে কোনো দিন
সরব হয় না গ্রাম। আমিও যে খুব ভক্তি করি ভালোবাসি
তোমাকে, তা নয়; ভাগ্যগুণে অন্য গোলার্ধে আমিও বিস্তর রূপসী
দেখেছি। তাদের ওষ্ঠ গ্রীবা বাহু এখনো রক্তে
তোলে ঢেউ, অর্থাৎ তোমার রূপে আমার দু-চোখ অন্ধ হয় নি কখনো।
অপরিহার্য ভাবি না তোমাকে, তবু যেই রক্তে চাপ পড়ে
টের পাই পাঁজরের তলে নষ্ট হৃৎপিণ্ডের মতো বাঙলাদেশ
সেঁটে আছো অবিচ্ছেদ্যভাবে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মাতৃগর্ভে অন্ধকারে ছিলে; এখন তথাকথিত
আলোতে এসেছো। ভাবছো চারদিক আলোকখচিত।
অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যা, শিশু পুত্র আমি বারেবারে
স্মরণ করিয়ে দিতে চাই এক কূট অন্ধকারে
আসলে পৌঁচেছো। এ-সূর্য, বিদ্যুৎ, নিঅন টিউব
বড়ো বড়ো বেশি প্রবঞ্চক : পৃথিবীতে অন্ধকার খুব।
পথ দেখানোর ছলে এরা কোনো ভয়াবহ খাদে
পৌঁছে দেবে তোমাদের; বিপজ্জনক সব ফাঁদে
আটকে যাবে। চারদিকে ধ্বনিত হবে আর্ত চিৎকার,
নিজেদের ঘিরে দেখবে থাবা-মেলা ক্রূর অন্ধকার।
তথাকথিত এ-আলো ঠাণ্ডা, দুষ্ট, কদর্য, কুটিল,
চক্রান্তপরায়ণ, অন্ধকারের চেয়েও অশ্লীল।
আর ওই সমাজরাক্ষস, তোমরা যে-দিকেই যাবে
সে-দিকেই মেলে দেবে হিংস্র হাত ধরে গিলে খাবে
সুযোগ পেলেই। তাই সাবধান, একটু ফসকালে
পৌঁছে যাবে উদ্ধাররহিত কোনো নিস্তল পাতালে।
আমি শুধু জন্মদাতা, পিতা নই; জনক যদিও–
এ-বাস্তবে, অন্ধকারে আমি নই অনুসরণীয়।
আমি গেছি যেই পথে সেটা ভুল পথ; গেছে যারা
সরল সঠিক পুণ্য পথে পথপ্রদর্শক তারা
পুত্রকন্যাদের প্রতি, মনে মনে
কবি হুমায়ুন আজাদ (২৮.৪.১৯৪৭ - ১১.৮.২০০৪)। কবির ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত “যতোই গভীরে যাই মধু যতোই
ওপরে যাই নীল” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমরা ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ ইবেঙ্গলিলাইব্রেরি.কম ওয়েবসাইটের কাছে
কারণ এই কবিতাটি আমরা সেখান থেকে নিয়েছি। সেই ওয়েবসাইটে যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
তোমাদের। সামাজিক পিতাদের পদাংক মুখস্থ
কোরো দিনরাত; অক্ষয় ধৈর্যে জেনে নিয়ে সমস্ত
পবিত্র গন্তব্য। কারণ তারাই এই অন্ধকারে
মোক্ষধামে পৌঁছোনোর ঠিক পথ বলে দিতে পারে।
হে পুত্র, তুমি কিছুতেই বিশ্বাস রেখো না। ইস্কুলে
শেখাবে যে-সব মস্ত মিথ্যা, তাতে কখনোও ভুলে
বিশ্বাস কোরো না। তোমার সামনে খোলা যে-পুস্তক
জেনো তা প্রচণ্ড ভণ্ড, মিথ্যাভাষী, আর প্রতারক।
মনে রেখো যারা গলে ওই সব মুদ্রিত মিথ্যায়,
পরাজয় নিয়তি তাদের, তারা ধ্বংস হয়ে যায়।
ঘৃণা কোরো সতোকে সামাজিক পিতাদের মতো
প্রত্যেক মুহূর্তে, অসত্যকে জপ কোরো অবিরত।
সুনীতি বর্জন কোরো, মহত্ত্বের মুখে ছুঁড়ো থুতু,
মনুষ্যত্বকে মাড়াতে দ্বিধাহীন হয় যেনো জুতো
তোমার পায়ের। দুর্বলকে নিশ্চিন্তে পদাঘাত কোরো
পায়ের আভাস পেলে সবলের নত হয়ে পোড়ো
তার দিকে, চিরকাল সবলের থেকো পদানত,
তার পদযুগলের চকচকে পাদুকার মতো।
শত্রু হোয়ো মানুষের, দানবের পক্ষে চিরদিন
দিয়ো জয়ধ্বনি; প্রতিক্রিয়াশীলতার নিশান উড্ডীন
রেখো গৃহে ও গাড়িতে; নিয়ো তুমি প্রত্যহ উদ্যোগ
যাতে পৃথিবীতে পুনরায় ফিরে আসে মধ্যযুগ।
যা কিছুই মানবিক তার শিরে, হে আমার পুত্র,
সকালে দুপুরে রাত্রে ঢেলো তুমি মল আর মূত্র।
তুমি তো জানো না কন্যা, শ্যামলাঙ্গী, অমৃত হৃদয়া,
চলছে আজ উজ্জ্বল পতিতাবৃত্তি, এবং মৃগয়া
এ-গ্রহে, পৃথিবীতে পতিতারাই প্রসিদ্ধ এখন।
জেনো প্রতিভা-সৌন্দর্য নয় শুধু যৌন আবেদন
তোমার সম্পদ। শিখে নিয়ে তুমি তার নিপুণ প্রয়োগ,
চিত্ত নয়, দেহ দিয়ে পৃথিবীকে কোরো উপভোগ।
তোমাকে সম্ভোগ করতে দিয়ো না কাউকে; প্রীতি-স্নেহ
থেকে দূরে থেকো; যাকে ইচ্ছে হয় তাকে দিয়ে দেহ,
কিন্তু কক্ষণো কাউকে হৃদয় দিয়ো না। তুমি তবে
পরিণত হবে লাশে; আমন্ত্রিত হবে না উৎসবে।
পুত্র তুমি জপ কোরো দিনরাত–টাকা, টাকা, টাকা,
টাকা, টাকা। একমাত্র ওই বস্তু ইন্দ্রজাল মাখা
পৃথিবীতে; সব কিছু নষ্ট হয়, সবই নশ্বর;
টিকে থাকে শুধু টাকা–শক্তিমান, মেধাবী, অমর।
জেনো পুত্র মহত্ত্বে গৌরব নেই, কালোবাজারিতে
নিহিত গৌরব; অমর্ত্য গীতাঞ্জলির থেকে পৃথিবীতে
জুতোও অনেক দামি, অমরত্বের চেয়ে শোনো প্রিয়,
বহুগুণে মনোরম শীততাপনিয়ন্ত্রিত গৃহ।
ভুল পথে, আমার মতোন, যেয়ো নাকো; অবিকল
হয়ো তুমি সামাজিক পিতাদের মতোই গাড়ল।
মাতৃগর্ভে অন্ধকারে ছিলে; এখন তথাকথিত
আলোতে এসেছো। ভাবছো চারদিক আলোকখচিত।
অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যা, শিশু পুত্র আমি বারেবারে
স্মরণ করিয়ে দিতে চাই এক কূট অন্ধকারে
আসলে পৌঁচেছে। এ-সূর্য, বিদ্যুৎ, নিঅন টিউব
বড়ো বেশি প্রবঞ্চক : পৃথিবীতে অন্ধকার খুব।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভেবেছ অমিত শক্তিধর তুমি গরিষ্ঠের জোরে
ভেবেছ ইচ্ছেমত চলার অধিকার হয়েছে তোমার
ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে চাও সরব প্রতিবাদ
আম জনতার।
এত বড় স্পর্ধা তোমাকেই মানায়
ইতিহাস কি বলে?
কত দুর্দম শক্তি, কত অহংকার মিশে গেছে
সময়ের বেনোজলে,
সে কথা তুমি ভুলে যেতে পার
এমন বেকুব তো তুমি নও
স্থিত হও, শান্ত হও, নির্বিবাদে
ফিরে এসো শান্তির ছায়াতলে।
ভাবো, আবার ভাবো, ভেবে কাজ করো
কাজ করে ভাবার বদলে।
তোমার সিদ্ধান্তের ফলে
যারা ঝরে গেল অকালে
তুমি কি ফেরাতে পারো তাদের
অসময়ে যারা গেল চলে!
কোনো এক শাসকের প্রতি কবি দুর্গাদাস মিদ্যা (জন্ম ১৫ই অগাস্ট ১৯৪৭)।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের কবিতা। এই কবিতাটি “ফোরাম অব ফ্রি থিঙ্কার্স” এর মুখপত্র
“দর্পণে মুক্তমন” পত্রিকাতে এপ্রিল ২০০৭ এর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
তাই বলি সাধু সাবধান
ক্ষেতে শোভা পাকা সোনালী স্বপ্ন মাখা ধান
সে তুমি বেশ ভালো জানো
ক্ষত করা তোমার কাজ নয়
ক্ষততে প্রলেপ লাগানোই
হোক তোমার আসল পরিচয়॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অগ্নি তুমি দগ্ধ কর কাকে
অতি সাধারণ সে, ভয়েই সিঁটিয়ে থাকে
ভাতের থালায় টান মেরেছে যে
কেমন করে বুকের জ্বালা মোছে।
ভোরের আলো তখন ছিল ক্ষীণ
মানুষ ! ছিল বেড়ার পাশে
পশুর চেয়ে হীন,
অষ্টাদশী নষ্ট চাঁদের ফাঁদে
একলা শুয়ে মরণ কাঁদন কাঁদে
আগুন তখন তুমি
মুছিয়ে দিলে কলঙ্কের দাগ
হায় প্রকৃতি, তোমার বুকে
প্রভাত আলোর করুণ অস্তরাগ।
প্রকৃতির ডাক কবি দুর্গাদাস মিদ্যা (জন্ম ১৫ই অগাস্ট ১৯৪৭)।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের কবিতা। এই কবিতাটি “লুব্ধক” পত্রিকার
পঁচিশে বৈশাখ ২০০৭ এর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এসো, আজ এক ব্যতিক্রমী
গল্পের কথা বলি, যে ছিল
কৃষকের সাথি, আজ সে
পুঁজিপতির পাশে বসে অক্লেশে।
আজ সে পাঁচতারা হোটেলে
বড় সহজ সাবলীল, হঠাত্
করে সাঁতরে পার হয় পচা ডোবা, খানা।
এখন সুইমিংপুলের নীল জলে
ভিজে থাকে তার অন্তর্বাস।
এই সেদিনও বলেছিল
পুঁজিবাদ নিপাত যাক,
আজ তারা পালটেছে স্লোগান
এখন আর কাস্তেতে শাণ নয়
এখন আর কৃষিবিপ্লবের গান নয়
এখন শুধু নয়া পুঁজিপতির সন্ধান।
পুরানো বলিয়া কবি দুর্গাদাস মিদ্যা (জন্ম ১৫ই অগাস্ট ১৯৪৭)। সিঙ্গুর-
নন্দীগ্রাম আন্দোলনের কবিতা। এই কবিতাটি নেতাজীনগর, কলকাতা থেকে “একুশে
ফেব্রুয়ারি উদযাপন কমিটি” পত্রিকার জুলাই ২০০৭ এর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
এও তো জানা ছিল এতকাল
ভেক না ধরলে ভিখ পাওয়া ভার
এখন ভেকের আর কী প্রয়োজন
শুধু ভিক্ষায় চলে না সংসার।
তাই বদলেছি জামা
বদলেছি পুরানো স্লোগান
ছিঁড়েফুঁড়ে গেছে বড় পুরাতন বিপ্লবের
অভিধান।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এরকম জুতোর মধ্যে মানুষকে রেখো না
এরকম জুতোর মধ্যে
মানুষকে রেখো না।
বড়ো সংঘাতিক. . .
বড়ো সাংঘাতিক
. ক্ষমতা নিয়ে
. সে এসেছে . . .
দুটো হাতেই
দুটো হাতেই সেই চিহ্ন . . .
আজো
এমন কোনো মানুষ জন্মায়নি
যার হাতে
যার হাতে আদিম চিহ্ন নেই!
এরকম জুতোর মধ্যে
মানুষকে রেখো না॥
এরকম জুতোর মধ্যে মানুষকে রেখো না
কবি সুব্রত রুদ্র (জন্ম ১৯.৮.১৯৪৭)। সুর - অনুপ মুখোপাধ্যায়। আমরা গানটি
পেয়েছি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত ও সংকলিত গণসংগীত সংগ্রহ
সংকলন থেকে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অমাবস্যার রাতে সাদা থান পরে চারু মজুমদার
ধানক্ষেতের আল ধরে মার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন
তিনি কেবলই যাচ্ছেন আর ফোঁটা ফোঁটা
রক্ত পড়ছে
মা তাকিয়ে আছেন দরজার দিকে
পৃথিবী কী যেন বোঝাচ্ছে। তুমি শুনতে পাও?
ফুল ঝরে পড়ার অনেক কথা
পৃথিবী একা কতক্ষণ জেগে থাকবে ?
তুমি পৃথিবীর কাটা ঘাস নও,
তুমি পুরনো কাস্তে নও,
তুমি পৃথিবীর খুলে বলবার সময়, তুমি তৈরি,
তুমি মুহূর্ত
তুমি ভারতবর্ষ নও, ভারতবর্ষের জেল একটা
ছোট্ট খাঁচা পাঁচ ফুট চওড়া কাগজ
তুমি ফুলের গায়ে মাখা রক্ত
হাওয়া দিচ্ছে, মনে থাকে যেন তুমি সুদর্শনের শরীর।
সুদর্শনের শরীর
কবি সুব্রত রুদ্র (জন্ম ১৯.৮.১৯৪৭)। কবির কলকাতার বাসভবনে নেওয়া তাঁর একটি
সাক্ষাৎকারের সময় তিনি এই কবিতাটি মিলনসাগরকে দিয়েছিলেন। ২৯.৩.২০১১
তরিখে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মানস গুপ্ত।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
একদিন সকালে চুল আঁচড়ানো শেষ করে মুখে
মানুষের চর্বি দিয়ে তৈরী ক্রিম
মাখতো লাগল মানুষ ৷
তারপর একটা শিশি থেকে খানিকটা
মানুষের হাড় নিংরানো গ্লিসারিন
মাখলো ঠোঁটে।
ঘানিতে ফেলে বের কর হলো
মানুষের জন্য মানুষের তেল।
মোটা মোটা লোহার পাইপে ক’রে
শিশুশ্রমিকদের মাংস এনে ভরিয়ে ফেললাম জলা---
নাম রাখা হলো নতুন লবণ হ্রদ।
জগৎসংসার কাঁপিয়ে জন্মাচ্ছে মানুষ,
খিলখিল ক’রে হেসে উঠছে
একদল মানুষের জয়।
লবণ হ্রদ
কবি সুব্রত রুদ্র (জন্ম ১৯.৮.১৯৪৭)। আমরা কবিতাটি পেয়েছি ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও অতীন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত ও সংকলিত “মে-দিনের কবিতা”
কাব্যসংকলন থেকে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
॥ প্রচলিত একটি তরজা গান অনুসরণে॥
দর্পণে কি রত্ব আছে
অন্ধে জানে না
শুকনো ফুলে ভ্রমর এসে
মধু পাবে না!
পারিজাত আর শিমুল ফুলে
এদের কেমন মিশিয়ে দিলে
গিনিপোষা রামছাগলে
হয় কি তুলনা!
রাজহংস আর শকুন পাখী
এদের কেমন ধারা দেখি
চাল কল আর কাঠের ঢেকি
হয় কি তুলনা!
দর্পণে কি রত্ন আছে
কথা ও সুর - বিনয় চক্রবর্তী। আমরা গানটি পেয়েছি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত সুব্রত
রুদ্র সম্পাদিত ও সংকলিত গণসংগীত সংগ্রহ সংকলন থেকে।
খাঁচায় আছে একটি পাখী
ডালে বসে একটি পাখী
দুটি পাখীর ডানা একই
তবু হয় কি তুলনা!
আঁধার ঘরে তেলের বাতি
স্টিশান ঘরে বিজলী বাতি
আলো কর দুটি বাতি
এদের হয় কি তুলনা!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
চাই রে চাই রে চাই মুক্তি
(মোরা) চাই রে চাই রে চাই মুক্তি।
চাই রে চাই রে চাই সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীর চাই মুক্তি
মোরা মানছি না মুচলেকা মানছি না মানবো না
মানছি না অন্যায় যুক্তি।
হিংসা অহিংসার প্রশ্ন যারা তুলছো
তারা ভুলছো
তারা ভুলছো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা ভুলছো।
(চাই) সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীর চাই বিনাশর্তে চাই মুক্তি।
মৃত্যুঞ্জয়ী সেই ভাই বোন বন্ধুরা
নিয়েছিলো মুক্তির দীক্ষা
তারা চায় না করুণা
তারা চায় না চায় না প্রাণভিক্ষা।
মুচলেকা আদায়ের লিখিত প্রতিশ্রুতি
আদায়ের কথা যারা বলবে,
যারা বলবে,
তারা জেনে রেখো আমাদের সংগ্রাম চলবেই
চলবেই চলবেই চলবে,
প্রতিরোধে প্রতিবাদে আঘাতে আঘাতে
ঐ লৌহ প্রাচীর জেনো টলবে
ঐ লৌহ প্রাচীর জেনো টলবে।
চাই রে চাই রে চাই মুক্তি
কথা ও সুর - কবি অমিতেশ সরকার (জন্মকাল অজ্ঞাত)। আমরা গানটি পেয়েছি ১৯৯০
সালে প্রকাশিত সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত ও সংকলিত গণসংগীত সংগ্রহ সংকলন থেকে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শাদা অতীতের মতো----পাথরখন্ডের মতো কয়েকটি অতীত ওই
ঝুঁকে পড়ে আসন্নের অনাস্বাদিত কোনো ঘ্রাণের উদ্দেশে
যেখানে----সেসব দেখে প্রতিটি জলই যেন স্থির
যেন সমুদ্রের বুকে এক-একটি অন্তহীন শ্মশান ফুটেছে
আরো বেশি শাদা শাদা অতীতের মতো যেন একটি বিশাল
জ্যোত্স্নার বিভঙ্গ। শুধু পাথরের স্মৃতি? একী শুধু পাথরেরই স্মৃতি?
সুদীর্ঘ ছায়ার মতো কালোমানুযের ঢল, সুদীর্ঘ রাত্রির মতো ক্ষুধা
দুঃখের আনন্দ যারা ভাগ করে নিতে পারে ---সেইসব আসন্নের দানে
যা কিছু ঘটেছে তারও শান্তিলাভ হয়। আধফোটা
ঢেউয়ের কল্যাণবোধে কী দীপ্ত কী অচঞ্চল কী যেন সে মর্মস্পর্শী বোধের সাগর
ধ্বনিরা মানে না তবু এভাবেও কালের নীরব
ঘন শ্মশানের মতো জড়ো হয়। কী যে বাঙময় জ্বলে ওঠে
জীবনের মধুক্ষেত্র একটি ভ্রমর আজও একটি পরাগরেণু বুকে তুলে নিয়ে
বহুদূর দেশ থেকে যেভাবে সে উড়ে আসে নিকটের দেশে
যেভাবে, জানে না কেউ, আজও তুমি আর এই স্পন্দমান মুহূর্তটি যার কোনো
বিগত বা অনাগত নেই
উভয়ে মিলিতভাবে বিপরীতধর্মিতার লক্ষ করে চারিদিকে ধ্বস্ত সৃষ্টি শুষে নিতে নিতে
পাথরে শ্যাওলার দাগ দ্রুত রাঙা হয়
আমার কয়েকটি প্রতিবাদ কবি অমিতাভ গুপ্ত (জন্ম ৫.৯.১৯৪৭)। কবিতা আবৃত্তি - অচ্যুত ভট্টাচার্য।
কখাজাতক প্রযোজিত কবি অমিতাভ গুপ্তর কবিতা আবৃত্তির সি.ডি. “অসমাপ্ত ভারতের দিকে”-এর কবিতা। কবিতাটি
শুনতে নীচে প্লেয়ারে ক্লিক করুন . . .।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অনাদরের বয়েস ঊনষাট
পেরিয়ে গেল। চিনতে পেরেছ?
একটু আগের আগস্ট মাসের মত
পতাকাছায়া, সন্ধ্যাবেলার মেঘ
অনাদরের পুচ্ছ পরেছে
বারণ কর। পতাকাছায়া যেন
জড়িয়ে থাকে তোমারও যৌবনে
আগস্ট মাসে পনেরো তারিখের
ভ্রূণের ভানে উনিশে ভাদ্র
মায়ের পাঁজর টুকরো হওয়ার পরে
অনাদরের জন্ম হয়েছিল
সিংহ--মুখ ফিরিয়ে হেসে ওঠে
গজিয়ে ওঠে চিতাবাঘের থাবা
সিঙ্গুরের শীতের ডিসেম্বরে
শিস্ দিচ্ছে সশস্ত্র অস্ত্রেরা
অনাদরের স্বভাবদোষ। কেন
মানবে না সে নতুন পলাশীকে?
দোষ
কবি অমিতাভ গুপ্ত (জন্ম ৫.৯.১৯৪৭)
২০১০ সালে প্রকাশিত কবির “বিন্দু বিন্দু ধরিত্রী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ক্রমশ যেখানে আজও বাস করি লেটারবক্সের মতো যে অপেক্ষা যার কোনও
. অন্তর্গত তালাচাবি নেই
বিদেশি শস্যের পাশে উত্ফুল্ল ভারতীয় ফসল যেভাবে
শুয়ে থাকে আধোলিপ্ত। মরে ঝরে যাক যারা বুকচিরে
ধ্যান
রোপণ করেছে তবু শিঙার মতন যেন অতর্কিত ফুঁসে
উঠেছে জঙ্গল আর কে কাকে কীভাবে যেন ক্রমাগত খুন করে যায়
ক্রমশ লেটারবক্সে উড়ে আসে এস এম এস উড়ে আসে ব্রেকিং নিউজ
এসব শহরে তাই আরও বেশি রাজনীতি আরও বেশি বেঁড়ে গরু পুচ্ছ দোলায়
ফেঁসে--যাওয়া রাস্তা আর ল্যান্ডমাইনের ফাঁদে আদিম ও নুয়ে পড়া মাঠ
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের
রিমোট একটু মুচরে দৃশ্যত দেখেছি তাই ঈষৎ লাজুক
লক্ষ করি ঘাতকের জিভ থেকে চুঁইয়ে--পড়া রক্তও নিহতের সর্বশেষ উচ্চারিত
. বাক্যের মতোই পাঁশুটে
লক্ষ করি মোটা মোটা ফাইলের বাকল জড়িয়ে ওই মন্ত্রপাঠ করে পার্লামেন্ট
লক্ষ করি অন্ধের নড়ির মতো বাঁকা সেমিনার
ভূতগ্রস্ত ওই ওই বাঁশবন ওই উই মুষিকের ক্ষিপ্র গর্ত ওই
চিকণ মসৃণ
স্পেশাল ইকনমিক জোন পালাচ্ছে বুটের ভারি গম্ভীর ও অজ্ঞাতপূর্ব আওয়াজে
এতদিন পরে শুধু মনে হয় মনে হতে পারে
ভাবকল্প শেষ হলে বেদান্তেও অকথিত নিয়তি ফুরাবে
গ্রিন হান্ট কবি অমিতাভ গুপ্ত (জন্ম ৫.৯.১৯৪৭)। ২০১০ সালে প্রকাশিত কবির “বিন্দু বিন্দু ধরিত্রী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
২
ময়ূরীনদীর ক্লান্ত কেকাধ্বনি যেভাবে যেমন করে জলমর্মরের
দিকে, ওই মিশে গেল। নতুন অতীত নিয়ে দিগন্তের ভাঙা আর গড়া
ধীরে ধীরে আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। আটবিক শবর নিষাদ
চরিত্র গঠন করছে
হয়তো এখানে এসে একদিন ধ্বংসাবশেষের মতো
. মিলিয়ে গিয়েছে
এইপটে, হয়তো--বা, ধূসরের ধুলো দিয়ে ধূসরের ধূসরতা দিয়ে
কোনো--এক পুনর্বার শশাঙ্কের উত্ক্ষিপ্ত সন্তান
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অন্তর্বয়নের সব ধ্বনিকেই ভেঙে দিয়ে দুহাজার তিনশ বাইশ
বৎসরাধিক আগে কোনো-এক মহীন্দর কোনো-এক ক্ষুদ্র সমুদ্রের
মাঝমধ্যিখানে
দাঁড়িয়ে, কী অজ্ঞাতকুলশীল ভাষায় যা বলেছিল তার অর্থ
খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছি
. তখন তো কাশীপুর বরাহনগর থেকে মরিচঝাঁপির
রাস্তা পাকা হয়নি তেমন কিংবা খুচরো মার্কেটিং-এর জন্য ছোটছোট মোটরগাড়ির
প্রয়োজন বোঝেনি হাবারা
. সূতোর গুটির মতো জড়ানো শব্দের ঘোরে
মুর্ছিত অথবা তরঙ্গোদ্যত নীল নীল বিষ ছুঁয়ে চকিত বুঝেছি
এ জীবন শুধুমাত্র পূর্ণ নয় এ জীবন শুধুমাত্র অর্ধবৃত্তাকার
যেরকম লালগড়ে পড়ে আছে ধনুকের মতো বাঁকা শিশুর কঙ্কাল
দুহাজার তিনশ বাইশ হয়তো অল্পই সময়
তখনো তো বারাসাত বানতলা নন্দীগ্রাম ছিল কিনা সঠিক জানিনা শুধু
লোহিত পীতাভ শত স্বর্ণমুদ্রা ছিল
স্বাভাবিক নরবলি দিয়ে রঘুডাকাতেরা বেলপাতার উপর রক্তচন্দনেই নাম
লিখতে অভ্যস্ত ছিল
. বোতামের বুক টিপে টাকা
বের করা তখনো শিখিনি শুধু দিগন্তটি ততটাই কাছে ছিল যতটা সুদূর
হতে পারে টেথিসের জল ফুঁড়ে জন্ম নেওয়া তিমির পেটের মত
. উদারপিচ্ছিল থমকে যাওয়া
ষোড়শ বা সপ্তদশ মহাজনপদ
থমকে যাওয়া কবি অমিতাভ গুপ্ত (জন্ম ৫.৯.১৯৪৭)। ২০১০ সালে প্রকাশিত
কবির “বিন্দু বিন্দু ধরিত্রী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মালঞ্চপাতার মতো আঁচল বিছিয়ে দিয়ে, কাছে এল। রোদে অনাদরে
রাঙা হয়ে উঠেছে শিশুর ক্ষুদ্র ঠোট
পাহাড়ের চুড়ো থেকে নেমে এসেছেন পিতা নির্জনে, মায়ের
দেহগন্ধ, মৃদু আতরের
ইয়ং বেঙ্গলের মতো গড়ে উঠছে কলকাতা। ঈশোপনিষদের ছেঁড়াপাতাটির মতো
উড়ে আসছে ভারতবর্ষেরা
দিগ্মী, শুধু দিগন্বরী। শব্দটির সঙ্গে যদি দেবী যুক্ত হয় তবে দিগন্বরী দেবী
তিনি কিন্তু পূর্ণ পিতামহী
দিগ্মী, শুধু দিগন্বরী। শুধু তার স্তনবৃন্ত থেকে ঝরে পড়েছিল মহাজীবনের স্বাদ
শিশুটির ক্ষুদ্র ওষ্ঠাধরে
“সূতজননীরে ছলি আজ যদি রাজজননীরে মাতা বলি---
তবে ধিক্ মোরে”
উৎসর্গ : রবিঠাকুরের ধাইমাকে
কবি অমিতাভ গুপ্ত (জন্ম ৫.৯.১৯৪৭)। ২০১০ সালে প্রকাশিত কবির “বিন্দু
বিন্দু ধরিত্রী” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
তুমি আবার সামনে কেন এলে?
বেশ তো ছিলে ধুলোয়,ধুলো মেখে
নিজের মাঠে নিজে লাঙল ঠেলে,
পথে তোমায় কে এনেছে ডেকে?
ওই ফসল,বেচবে কেউ আরো,
অন্য কেউ হাত বসাবে ধানে,
ওই জমি তো অন্য আর কারো-
দু'মুঠো চাল জুটবে অপমানে।
দূরের কিছু ঝাঁচকচকে জামা
কিনেই নেবে তোমার ক্ষেতখামার
তুমি আবার সামনে কেন এলে?
কবি বিশ্বজিত চ্যাটার্জী (জন্মকাল অজ্ঞাত)। ২০২০ সালের কৃষক
আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লেখা কবিতা।
মিলনসাগরের কৃষক আন্দোলনের দেয়ালিকায় তোলা হয় ১২.১২.২০২০
তারিখে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কোভ্যাক্সিনের জন্যে আমি ঘুরছি অলিগলি,
কেউবা যেন বললো কানে, "নেই কি পতঞ্জলি?"
গরুর হিসি, ভাইপো পিসি, গুহায় বসা সাধু,
কেউতো কিছু করবেনা ভাই, মরতে হবে চাঁদু।
কোভ্যাক্সিনের জন্যে আমি ঘুরছি অলিগলি
কবি বিশ্বজিত চ্যাটার্জী (জন্মকাল অজ্ঞাত)। করোনা-কালে কেন্দ্র তথা রাজ্য
সরকারের অবৈজ্ঞানিক ও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ। মিলনসাগরের
করোনা ভাইরাসের দেয়ালিকায় তোলা হয় ২৮.৪.২০২১।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
স্পষ্ট বলো, হ্যাঁ কিংবা না ;
ধোঁয়াটে কথা আর শুনবোনা।
কথার প্যাঁচে জড়িয়ে দেবে কাকে,
ভোটলীলাতে সরিয়ে দেবে কাকে?
টাকা উড়ছে, উড়ছে তোর বাণী ;
কিনে নিচ্ছে আদানি আম্বানি
আমার শ্রম, আমার ভিটেমাটি;
মাঠ ছেড়ে তাই এখন পথে হাঁটি।
ওরা তো লুটছে, ওরা তো ছুটছে,
তবু পথ ঘিরে কারা যে জুটছে-
তুমিতো বলবে, "হা হা আমি সব জানি,
কেউ মাওবাদী, বাকিরা খালিস্তানি"।
স্পষ্ট বলো, হ্যাঁ কিংবা না
কবি বিশ্বজিত চ্যাটার্জী (জন্মকাল অজ্ঞাত)। ২০২০ সালের কৃষক
আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লেখা কবিতা। মিলনসাগরের কৃষক আন্দোলনের
দেয়ালিকায় তোলা হয় ১২.১২.২০২০ তারিখে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বলো বলোরে বলো সবে, বলো রে বাঙালির জয়
বাংলাদেশের নদীর বুকে এই বলি গান গাইয়া যাই
বলো বলোরে বলো সবে, বলো রে বাঙালির জয়
বাংলাদেশের নদীর বুকে এই বলি গান গাইয়া যাই
বলো বলোরে বলো সবে, বলো রে বাঙালির জয়
বাংলাদেশের নদীর বুকে এই বলি গান গাইয়া যাই
এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া
ওদের কণ্ঠভরা ধান ওদের গোলা ভরা ধান
ওদের কণ্ঠভরা ধান ওদের গোলা ভরা ধান
এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া
কতই সুখে একসাথেতে বাস করি রে ভাই
এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া
বলো বলোরে বলো সবে, বলো রে বাঙালির জয়
বাংলাদেশের নদীর বুকে এই বলি গান গাইয়া যাই
ওরে নদী ভরা মাছ মোদের ফলে ভরা গাছ
ওরে নদী ভরা মাছ মোদের ফলে ভরা গাছ
এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া
ফুল ফসলের তুলনা আর এমন কোথাও নাই
এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া
বলো বাঙালির জয় কবি মহম্মদ মোসাদ আলি (জন্মকাল অজ্ঞাত)। সুর - সমর দাস। অজ্ঞাত সমবেত শিল্পীবৃন্দের কণ্ঠে শুনুন। গানটি বাংলাদেশের মুক্তি
আন্দোলনের সমর্থনে রচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ঠিক পরবর্তী সময়েরই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি সংকলন হল একটি এলপি রেকর্ড যার নাম ছিল
“বাংলাদেশের হৃদয় হতে”, প্রকাশিত হয়েছিল গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে। এই রেকর্ডের দুই পিঠ মিলিয়ে ছিল মোট ১২টি গান। এই গানটি সেই সংকলন থেকে। ভিডিওটি
সৌজন্যে Various Artists - Topic YouTube Channel. এই গানটি শুনে লেখা।
বলো বলোরে বলো সবে, বলো রে বাঙালির জয়
বাংলাদেশের নদীর বুকে এই বলি গান গাইয়া যাই
ওরে মাঠে মাঠে কত সোনা আছে সবার জানা
ওরে মাঠে মাঠে কত সোনা আছে সবার জানা
এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া
সোনার দেশে বাস করি ভাই অভাব মোদের নাই
এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া, এই হেই হেইয়া
বলো বলোরে বলো সবে, বলো রে বাঙালির জয়
বাংলাদেশের নদীর বুকে এই বলি গান গাইয়া যাই
বলো বলোরে বলো সবে, বলো রে বাঙালির জয়
বাংলাদেশের নদীর বুকে এই বলি গান গাইয়া যাই
বাংলাদেশের নদীর বুকে এই বলি গান গাইয়া যাই
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আজ ধর্মঘট |
উপরি পাওনা ছুটি এক মিলে গেছে
অফিস পাড়ার ছোট বড় মেজোবাবুদের আজ,
চমত্কার সর্ষে ইলিশের শেষ দুপুরের ঘুম
সন্ধ্যায় জনমনরঞ্জনী টিভি সিরিয়াল আর
সুমন চ্যাটার্জীর গানে ছুটি কাটে বেশ |
চৌরাস্তার মোড়ে আজ ক্রিকেট জমেছে,
দুর্দান্ত কৈশোর তার স্পর্দ্ধার চূড়ায়
নিজেকে কখনোভাবে সুনীল, শচীন !
প্রসিদ্ধ পত্রিকা নিয়ে কেউ কেউ আজ
ছুটির দিনটি মাখে আলস্যে আরামে |
শুধু পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বাড়ি বাড়ি
বাসন মাজার কাজে ছুটি নেই ওর,
ওর কোনো ধর্মঘট নেই, সভা নেই,
বোনাস ও ইনক্রিমেন্টের জন্য কর্মবিরতি নেই |
দুইবেলা তিনশত পয়ষট্টি দিন
বাড়ি বাড়ি এঁটো কাটা বাসনের স্তুপ
কলঘরে নর্দমার পাশে অদ্ভুত জীবন
ওর শুধু বয়ে যায়---
ধর্মঘট
কবি কৃষ্ণা বসু (জন্ম ১৭.১১.১৯৪৭)। ২০০৩ সালে দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত
কৃষ্ণা বসুর “শ্রেষ্ঠ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই নদীর্তীর, হু হু হাওয়া, পুড়িয়ে মারবে বলে এখানে এনেছ, সাজানো রয়েছে
চিতা, ---চিতার উপরে শুয়ে প্রিয় স্বামীটির শব। চারিদিকে হুলুধ্বনি ওড়ে। যেন
কোনো যাত্রাপালা, নাট্যরঙ্গ, আমাকে পুড়িয়ে মারবে বলে এত লোক দেখতে
এসেছে, এই হত্যা নাট্য দৃশ্যখানি দেখে নেবে বলে এখানে এসেছে। চেনা
মুখ অচেনা মুখেরা চেয়ে আছে আমার মুখের দিকে। ---আনি কার দিকে চাই?
প্রত্যেকেই এরা দেখতে চাইছে, তাহলে, মৃত্যু আমার? কেন মরে যেতে হবে?
কেন চলে যেতে হবে রঙভরা, রূপভরা মায়া পৃথিবীর এই টান ছেড়ে দিয়ে?
কেন যাব? কেউ যায়? কেউ কেউ যায়! বোকা বেকুবের মতো, আত্মহত্যার
গানে কেউ কেউ ভেসে যায় শ্বশানবাতাসে,---আমি তো তেমন গানে ভাসতে
চাইনি ; আমি বাঁচতে চেয়েছি আ-জীবন। আঃ, জীবন জীবন নামের জাদু, জাদু-
গানে ভেসে গেছি কত কতবার, কত কতবার। বেঁচে থাকা দারুণ ব্যাপার। হাঃ---
আমি বেঁচে থাকতে চাই, মরতে চাই না কিছুতেই! কিন্তু ঐ বেজে উঠল
শ্মশানের ঢাক, এ এয়োতি নারী মুখে উলুধ্বনি ওড়ে, এ কাঁসি বাজছে, ঢাকের
প্রবল তালে তালে, ঐ সমুদ্রশঙ্খের ধ্বনি বেঞ্জে উঠল বাতাসে বাতাসে---
সকলেই চাইছে এরা আমার মরণ? অসহ্য জ্বালাপোডার মরণ এরা সকলেই
চাইল তাহলে? এরা সব প্রতিবেশী গ্রামবাসী, স্বজন-আত্মীয়,---এরা এসেছে
দেখবে বলে, আমার জ্বলে পুড়ে খাক্ হয়ে মরে যাওয়া দেখে সুখ পাবে বলে?
ওগো আগামী জন্মের মেয়ে, ওগো নতুন যুগের এয়োতিরা, ওগো আত্মপরিচয়ে
বেঁচে থাকা স্বাধীন নারীরা, ওগো মহাকাল, লিখে রেখো, ---কীভাবে যে বিনা-
অপরাধে জ্বলে পুড়ে মরে যেতে হয়েছিল শত শত সদ্য বিধবাকে---শোকে
নয়, ভয়ে মরে গিয়েছিল তারা! না যদি মরত তবে খুঁচিয়ে পিটিয়ে তাকে জ্বলন্ত
চিতার ওপর দিত তুলে!---এই হত্যা, ---এই খুন, এই নির্বিকার নিষ্ঠুরতা, লিখে
রেখো মহাকাল, লিখে রেখো বুকের ভিতর, ওগো আগামী জন্মের মেয়ে লিখে
নিও রক্তস্রোতে, শিরা ধমনীতে, ওগো আলোর জাতিকা মেয়ে যারা---
সতীদাহ কবি কৃষ্ণা বসু (জন্ম ১৭.১১.১৯৪৭)। ১১ নং জাতিস্মরী সিরিজের কবিতা। ২০১২ সালে
প্রকাশিত, পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা সমগ্র” সংকলনের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ঘর চেয়েছে, মাথার ওপর চেয়েছে ঠিক ছাদ,
ঘর দাওনি, সমাজ-ও না, জীবন বরবাদ।
ঘরের থেকে খেদিয়ে শেষ সমাজ ঠিক রাখো,
বারাণসী বৃন্দাবনে মথুরাতে ডাকো ;
ডাকছ কেন? ভিক্ষাজীবী জীবন করুণার,
ভিতর থেকে বাইরে থেকে হাজার রকম মার,
কে মেরেছে? মারল কারা? সফল সমাজ-পতি
পুড়িয়ে দেন, আগুন লাগান, নাম দিয়েছেন ‘সতী’,
সতীই যদি না হবি তো ‘বিধবা’ হোস তবে,
ভোক্তা পুরুষ কেমন রাখেন কোথায রাখেন, কবে ;
মেয়েমানুষ দাম পেয়েছে, নিজস্ব নেই স্বত্ব,
মাংস বেচে শরীর বেচে বেচে নিজের রক্ত ;
দলে দলে ভিখারিনী বিধবাদের দাহ,
রৌপ্য দিয়ে ভিখারিনীর কিনছে সংবাহ!
এসব কথা বলা বারণ এসব কথাই নষ্ট,
উঠবে কেন শিল্পকলায় ধরবে কেন স্পষ্ট?
সনাতনী কবি কৃষ্ণা বসু (জন্ম ১৭.১১.১৯৪৭)। ১১ নং জাতিস্মরী সিরিজের কবিতা। ২০১২ সালে
প্রকাশিত, পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা সমগ্র” সংকলনের কবিতা।
শিল্পী কিংবা নির্দেশকে এসব কথাই খোঁজে,
বিশ্ব যদি বেবাক হয়ে জঘন্যতা বোঝে,
মান যাবে না? সামস্ত এই ভারতভূমির গর্ব
ধুলোয় লুটোয়, দেশকে করে অকিঞ্চিৎ ও খর্ব,
জীবন সত্য তীব্রভাবে ধরতে চেয়ে নারী,
সত্যি বলছি এইভাবে আর করলে বাড়াবাড়ি
ক্যামেরা ও কলম তুলি এসব নেবো কেড়ে,
একুশ শতক জুড়ে ছড়াই আমরা সনাতনী ;
টাকা ছাড়াই শরীর কিনি, কিনি তোদের মন-ই,
ভিতর ক্ষত দগদগে ঘা দেখাতে হোস হন্যে,
বিবাদ কেন ছড়িয়ে দিস, বিপ্লবিনী কন্যে?
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শ্রীচরণকমলেষু মাগো,
কেমন রয়েছ তুমি কিছুই জানি না।
আমি ভালো নেই, কিচু মাত্র ভালো নেই।
আমি কি সমস্ত ছেড়ে চলে যাবো, মাগো ?
কার কাছে যাবো, বলো, কে রয়েছে আমাকে নেবার !
তুমিও আশ্রিত জানি দাদার সংসারে,
‘জুতিয়ে বেঁকিয়ে দেব মুখ’, বলে তোমার জামাই
কাল রাতে গর্জন করেছে, চড় মেরেছিল জোরে,
না, মা সত্যি জুতো মারেনি, এখনও, তবে,
মারবে বলেছে কোনো দিন।
কেন বিয়ে দিয়েছিলি মা রে ?
দাসী খাটাবার জন্য কেন তুমি আমাকে পাঠালে
চেলি বেনারসী কনে চন্দনের সস্নেহ সুঘ্রাণে ?
আজ পনের বছর ধরে ঘর করে,
সেবা করে, সেবা করে, মুখ বুজে থেকে,
তার কাছে সত্যি কথা জানতে চেয়েছি,
মাইনের সব টাকা কোনখানে যায়,
স্বাভাবিক অধিকারে জানতে চেয়েছি সব কিছু ;
তখন-ই জুতিয়ে বেঁকিয়ে দেবে মুখ বলে আমাকে শাসায়।
একটি সামান্য চিঠি কবি কৃষ্ণা বসু (জন্ম ১৭.১১.১৯৪৭)। ২০০৩ সালে দে’জ পাবলিশিং থেকে
প্রকাশিত কৃষ্ণা বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
মাগো, আমি কার কাছে যাবো,
ছোটন তোতন খুব ছোট আছে আজো,
ওরা কোন্ নির্ভরতা দিতে পারে বলো ?
বিয়ের পরের বাড়ি, বিয়ের আগের বাড়ি, বলো,
কোন বাড়ির আমার নিজের অধিকারে ?
মাগো, মুখ বুজে, মার খেয়ে রান্না করে,
সেবা করে, ‘রমণীরতন’ হয়ে জীবন কাটাবো ?
মাগো, বলো, আমার নিজের বাড়ি কোনখানে আছে ?
মেয়েদের নিজেদের বাড়ি থাকে কোনো দিন ?
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভ্রূণহত্যার দেশে এসেছি হঠাৎ
শিশুকন্যা ভ্রূণগুলি খুন হয় নিখুঁত আঙুলে !
সুসভ্যতা উঠে এসে প্রাণপণে টিপে ধরে
অজাত কন্যার কচি টুটি।
যে মুখ দুধের স্বাদ তখনো পায়নি,
তার কচি মুখে তুমি গরল পুরেছ
সভ্যতা, তোমাকে অযুত ধন্যবাদ !
না গো, এই সকরুণ উপমহাদেশে
নারী হয়ে, মেয়ে হয়ে জন্মাবো না আর
মৃত্যুর চিকন ফাঁস পরে নিতে তোমাদের হাতে।
‘দেবী’ শব্দটির অর্থ অভিধানে পূজনীয়া,
ব্যবহারে দাসীই জেনেছ,
এই ভন্ড, ভুল মাতৃতন্ত্রের স্বদেশে
তন্ত্রাচারে মাকেই সবচে বেশী হেলা,
হেলা ফেলা দিয়ে গেছ সুসভ্যতা তুমি !
না, কোনো অভিমান নয়, অভিমান অতি
মহার্ঘ সঞ্চয়, ভুল ব্যবহারে তাকে
নষ্ট করা ঠিক নয়, রাগ নয়, অভিযোগ নয়,
প্রত্যাহার করে নিই সমস্ত দাবীই----।
শুধু এক প্রার্থনা রেখে যাই মহাকালের নিকট
----‘নারীহীন, মাতৃহীন, কন্যাহীন যোষিত সংসর্গহীন
বান্ধবীবিহীন হয়ে বেঁচে থাক্, আগামী প্রজাতি।’
কন্যাভ্রূণ কবি কৃষ্ণা বসু (জন্ম ১৭.১১.১৯৪৭)। ২০০৩ সালে দে’জ পাবলিশিং
থেকে প্রকাশিত কৃষ্ণা বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
নদীতে মঞ্জুষা করে কে ভাসায় আপন প্রাণের ধনখানি ?
নাড়ি ছেঁড়া, শতপাকে বাঁধা প্রাণের পুতলিটিকে
কে ভাসায় নদীর জলের অনিশ্চয়ে ?
শিশুটির কান্না নিয়ে দুলে দুলে চলেছে মঞ্জুষা ;
বুকের ভিতরে তার লুকানো রয়েছে মূঢ় ভয়, প্রাণভয় |
সাবধানে ভেসে যেও, গোপন পেটিকা,
অধিরথ ঠিক এসে সমর্থ সস্নেহ হাতে তুলে নেবে তোকে ;
সাবধানে যেও সোনা, বুকের মানিক,
বীভত্স করুণ এই সভ্য ভন্ড দেশ,
জননীর পরিচয়ে শিশুটিকে রাখতে চায়নি,
চেয়েছে পিতার পরিচয়, একমাত্র পিতারই পরিচয় |
বেড়ে ওঠো রাধেয় বালক, অস্ত্রশিক্ষা শুরু হোক,
শেখাবেন যুদ্ধবিদ্যা দ্রোণাচার্য, স্নেহার্ত শিক্ষক |
অস্ত্র পরীক্ষার ভরা মাঠে তোমার নিশ্চিত স্পর্ধা
স্পর্শ করে অর্জুনের অসহ্য গরিমা,
যখন কিছুতে তোমাকে সম্পূর্ণ দমানো যাচ্ছে না
ঠিক সে সময় ইতর নিষ্ঠুর প্রশ্ন ছুড়ে দেয় সুসভ্যতা,
যে প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দায় কোনো মতে নেই তো তোমার,
‘কী তোর পিতার নাম ? কী নাম বাপের তোর, বল ?’
পক্ষপাত দুষ্ট দ্রোণ আচার্য প্রধান, ব্রহ্মাস্ত্র দেয়নি তোকে ;
মহেন্দ্র পর্বতে গিয়ে ব্রাহ্মণ বালক সেজে তাই
পরশুরামের কাছে সেই বিদ্যা ভিক্ষা করেছিলে ?
‘সব শিক্ষা ব্যর্থ হবে’----- এই শাপ বার হয় শিক্ষকের মুখে ?
বজ্রকীট দংশনের তীব্র জ্বালা সহ্য করে চুপ করে হতভাগ্য যুবা ;
আপন পুত্রের জন্য ইন্দ্র ভিক্ষাছলে
কর্ণ কবি কৃষ্ণা বসু (জন্ম ১৭.১১.১৯৪৭)। ২০০৩ সালে দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত কৃষ্ণা বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
চুরি করে নিয়ে যায়
তোর সহজাত কবচকুন্ডল, প্রাণের নিশ্চয় ;
পিতামহ ব্রহ্মচারী ভীষ্ম তোকে ‘অর্ধরথী’ বলে ব্যঙ্গ করে ;
ভীষ্ম মরে গেলে দ্রোণের অধীনে তুমি যুদ্ধ করো,
চতুর্দিকে কেঁপে ওঠে তোমার প্রবল পরাক্রমে,
ত্রয়োদশদিনে করো অভিমন্যু-বধ, সে খুব লজ্জার কথা,
ষোড়শ বর্ষের যোদ্ধা তাকে মেরে ফেলো সাত রথী,
তুমি তার অন্যতম ছিলে, কিন্তু সমস্ত জীবন ধরে, বলো,
সহস্র রথীর মার কে খেয়েছে ? তুমি ছাড়া, শুধু তুমি ছাড়া ?
মহাকাব্যের নায়ক এসে বলে যায় যুদ্ধের সমীপ লগ্নে
তোর জন্মকথা ; ইন্দ্র এসে চুরি করে নিয়ে যায় কবচকুন্ডল !
--- এসবের মার সমস্ত জীবন ধরে সযে যাও |
ষোড়শ দিবসে সেনাপতি হও মহাসমরের, সপ্তদশ দিনে
তোমার রথের চাকা মেদিনী কামড়ে ধরে, এগোতে দেয় না |
পিতাদের তৈরি করা ভুল পৃথিবীতে, এই সামন্ত সমাজে
যোগ্যতার চেয়ে বড় জন্মপরিচয় !
তোমার আপন ভাই, সহোদর, অঞ্জলিক বাণে
এ-ফোড় ও-ফোড় করে রক্তাক্ত তোমাকে,
মার খাও, মরে যাও, সমস্ত জীবন ধরে শুধু মার খাও,
পৃথার প্রথম পুত্র মার খাও জীবনের হাতে,
অযুত নিযুত কোটি ভুলে ভরা সমাজের হাতে ;
এক লক্ষ দশ হাজার শ্লোক গড়িয়ে গড়িয়ে নামে শোক |
তোমার চোখের জল আর তোমার রক্তের স্রোতে
ভরে যায়, ভেসে যায় ব্যাসের কলম !
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জামায় এত ফুল দেখেছিস মা, যেতে যেতে
গায়ে আঁকলি ইলিবিলি ডাল, কুচো পাতার বাদাড়
আঁচল সামলে মা তুই যাস কোথায় ?
যায় কোথায় ?
পরবাস থেকে তোর বনবাসে এলাম মা,
মা তুই বনবিবি হবি ?
তোর চরণ ছুঁয়ে বনে সিঁধবো আমি গোলপাতা আর
মধু খুঁজব, খেজুর ডাল কেটে ছড়ি বানাবো।
তোর থানে দুই মোরগ চড়াত আমার বাপ
আমার জেবে পাখা তড়পাচ্ছে পাশ করার দুটো কাগজ
কালিতে উল্কি ফোটানো পাকা ছাপ দেওয়া
এসব উছলে দেব তোর চরের সূলায়
হরিণে জল খাওয়া নদীর কাদায়,
নাগ ছোবলে নীলবর্ণ রাত-জোছনা বাঘের দন্তে
ঝিল মিল করে মা তোর বন ঘরে,
আমার কলেজ পাশের উল্কি সারা গায়ে লিখল নীলবর্ণ
আমার চোখের সাদায় দংশে তারা
আমাকেও সাপ বানায় আমি সাপ হব না মা।
দখিন রায়ের ক্রোধী বহিন বনবিবি তোর
রক্ত বরণ কন্যে হব মা,
বনঘরে হাঁটব বাঘিনীর মতো।
চুনি কোটাল কবি ব্রততী ঘোষ রায় (জন্ম ১৯৪৭)। ২০১৩ সালে প্রকাশিত, নমিতা চৌধুরী ও
অনিন্দিতা বসু সান্যাল সম্পাদিত “মহিলা কবিদের বাংলা কবিতা সংকলন ১৪০০-২০০০ দামিনী” কাব্য-সংকলন
থেকে নেওয়া।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
Our freedom and its daily sustenance are the colour
of blood and swollen with sacrifice. Our sacrifice is a
conscious one : it is in payment for the freedom we
are building. --- Che
যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায়
আমি তাকে ঘৃণা করি---
যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে
আমি তাকে ঘৃণা করি---
যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরাণী
প্রকাশ্য পথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না
আমি তাকে ঘৃণা করি---
আটজন মৃতদেহ
চেতনার পথ জুড়ে শুয়ে আছে
আমি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাচ্ছি
আট জোড়া খোলা চোখ আমাকে ঘুমের মধ্যে দেখে
আমি চিত্কার ক’রে উঠি
আমাকে তারা ডাকছে অবেলায় উদ্যানে সকল সময়
আমি উন্মাদ হয়ে যাব
আত্মহত্যা করবো
যা ইচ্ছা হয় করবো
কবিতা এখনই লেখার সময়
ইস্তাহারে দেয়ালে স্টেনসিলে
নিজের রক্ত অশ্রু হাড় দিয়ে কোলাজ পদ্ধতিতে
এখনই কবিতা লেখা যায়
তীব্রতম যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন মুখে
সন্ত্রাসের মুখোমুখি---ভ্যানের হেডলাইটের ঝলসানো আলোয়
স্থির দৃষ্টি রেখে
এখনই কবিতা ছুঁড়ে দেওয়া যায়
.৩৮ ও আরো যা যা আছে হত্যাকারীর কাছে
সব অস্বীকার ক’রে এখনই কবিতা পড়া যায়
লক্-আপের পাথর-হিম কক্ষে
ময়না তদন্তের হ্যাজা আলোকে কাঁপিয়ে দিয়ে
হত্যাকারীর পরিচালিত বিচারালয়ে
মিথ্যা অশিক্ষার বিদ্যায়তনে
শোষণ ও ত্রাসের রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে
সামরিক-অসামরিক কর্তৃপক্ষের বুকে
কবিতার প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হোক
বাংলাদেশের কবিরাও লোরকার মতো প্রস্তুত থাকুক
হত্যার শ্বাসরোধের লাশ নিখোঁজ হওয়ার
স্টেনগানের গুলিতে সেলাই হয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত থাকুক
তবু কবিতার গ্রামাঞ্চল দিয়ে কবিতার শহরকে
ঘিরে ফেলবার একান্ত দরকার
এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না
এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না
এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না
এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না
আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেব
বুকের মধ্যে নেব কুয়াশায় ভেজা কাশ বিকেল ও ভাসান
সমস্ত শরীর ঘিরে জোনাকী না পাহাড়ে পাহাড়ে জুম
অহণিত হৃদয় শষ্য, রূপকথা ফুল নারী নদী
প্রতিটি শহিদের নামে এক-একটি তারকার নাম দেব ইচ্ছেমতো
ডেকে নেব টলমলে হাওয়া রৌদ্রের ছায়ায় মাছের চোখের মতো দীঘি
ভালবাসা---যার থেকে আলোকবর্ষ দূরে জন্মাবধি অচ্ছুৎ হয়ে আছি---
তাকেও ডেকে নেব কাছে বিপ্লবের উত্সবের দিন
হাজার ওয়াট্ আলো চোখে ফেলে রাত্রিদিন ইন্টারোগেশন্
মানি না
নখের মধ্যে সূঁচ বরফের চাঙ্গড়ে শুইয়ে রাখা
মানি না
পা বেঁধে ঝুলিয়ে রেখে যতক্ষণ রক্ত ঝরে নাক দিয়ে
মানি না
ঠোঁটের উপরে বুট জ্বলন্ত শলাকায় সারা গা’য় ক্ষত
মানি না
ধারালো চাবুক দিয়ে খণ্ড খণ্ড রক্তাক্ত পিঠে সহসা অ্যালকহল্
মানি না
নগ্নদেহে ইলেক্ট্রিক শক্ কুৎসিত বিকৃত যৌন অত্যাচার
মানি না
পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা খুলির মধ্যে রিভলভার ঠেকিয়ে গুলি
মানি না
কবিতা কোন বাধাকে স্বীকার করে না
কবিতা সশস্ত্র কবিতা স্বাধীন কবিতা নির্ভিক
চেয়ে দেখো মায়কোভস্কি হিকমেত নেরুদা আরাগ এলুয়ার
তোমাদের কবিতাকে আমরা হেরে যেতে দিইনি
বরং সারাটা দেশ জুড়ে নতুন একটা মহাকাব্য লেখবার চেষ্টা চলছে
গেরিলা ছন্দে রচিত হতে চলেছে সকল অলংকার
গর্জে উঠুক মাদল
প্রবাল দ্বীপের মতো আদিবাসী গ্রাম
রক্তে লাল নীল ক্ষেত
শঙ্খচূড়ের বিষ-ফণা মুখে আহত তিতাস
বিষাক্ত মৃত্যুসিক্ত তৃষ্ণায় কুচিলা
টঙ্কারে সূর্য অন্ধ উৎক্ষিপ্ত গাণ্ডীবের ছিলা
তীক্ষ্ণ তীব্র হিংস্রতম ফলা---
ভাল্লা তোমার টাঙ্গি পাশ
ঝলকে ঝলকে বল্লম চর-দখলের সড়কি বর্শা
মাদলের তালে তালে রক্তচক্ষু ট্রাইবাল টোটেম
বন্দুক কুকরি দা ও রাশি রাশি সাহস
এত সাহস যে আর ভয় করে না
আরো আছে ক্রেন্ দাঁতাল বুলডোজার কনভয়ের মিছিল
চলমান ডাইনামো টারবাইন লেদ ও ইঞ্জিন
ধ্বস নামা কয়লার মিথেন অন্ধকারে কঠিন হীরার মতো চোখ
আশ্চর্য ইস্পাতের হাতুড়ি
ডক্ জুটমিল ফার্ণেসের আকাশে উত্তোলিত সহস্র হাতে
না ভয় করে না
ভয়ের ফ্যাকাশে মুখ কেমন অচেনা লাগে
যখন জানি মৃত্যু ভালবাসা ছাড়া কিছু নয়
আমাকে হত্যা করলে
বাংলার সব ক’টি মাটির প্রদীপে শিখা হয়ে ছড়িয়ে যাব
আমার বিনাশ নেই
বছর বছর মাটির মধ্য হতে সবুজ আশ্বাস হয়ে ফিরে আসবো
আমার বিনাশ নেই---
সুখে থাকবো দুঃখে থাকবো সন্তান-জন্মে সত্কারে
বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন
যে-মৃত্যু রাত্রির শীতের জ্বলন্ত বুদ্বুদ্ হয়ে উঠে যায়
সেই দিন সেই যুদ্ধ সেই মৃত্যু আনো
সেভেন্থ ফ্লিটকে রুখে দিক সপ্তডিঙ্গা মধুকর
শিঙ্গা ও শঙ্খে যুদ্ধারম্ভ ঘোষিত হয়ে যাক
রক্তের গন্ধ নিয়ে বাতাস যখন মাতাল
জ্বলে উঠুক কবিতা বিস্ফোরক বারুদের মাটি---
আল্পনা গ্রাম নৌকা নগর মন্দির
যখন তরাই থেকে সুন্দরবনের সীমা
সারারাত্রি কান্নার পর শুষ্ক দাহ্য হয়ে আছে
যখন জন্মভূমির মাটি ও বধ্যভূমির কাদা এক হয়ে গেছে
তখন আর দ্বিধা কেন
সংশয় কিসের
ত্রাস কি
আটজন স্পর্শ করছে
গ্রহণের অন্ধকারে ফিস্ ফিস্ ক’রে বলছে কোথায় কখন প্রহরা
তাদের কণ্ঠে অযুত তারকাপুঞ্জ ছায়াপথ সমুদ্র
গ্রহ থেকে গ্রহে ভেসে বেড়াবার উত্তরাধিকার---
কবিতার জ্বলন্ত মশাল
কবিতার মলোটভ ককটেল
কবিতার টলউইন্ অগ্নিশিখা
এই আগুনের আকাঙ্ক্ষাতে আছড়ে পড়ুক।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কেন চেয়ে আছ গো মা
চিৎ হয়ে শুয়ে টেবিলের ওপরে
মাথায় রক্তমাথা, ব্যাণ্ডেজ না পতাকা
কিছু কি দেখছো তুমি? ক্ষুব্ধ জন্মভূমি!
শুনতে পাচ্ছ? বলতে চাইছো কোন কথা?
না কি শব্ দহীন মর্গে দৃশ্যমান ঠাণ্ডা নিরবতা।
না-শোনাই ভাল ওই ঘাতকের নির্লজ্জ দামামা
কেন চেয়ে আছ গো মা
ওরা কিছু দেবা না তোমাকে এমনটা নয়
এতটা অকৃতজ্ঞ ওরা? না কি দেদারে সদয়
হার্মাদ আদরে ওরা বিলিয়েছে
সরকারি বা বেসরকারি টোটা
খুলিফাটা --- যার শব্ দে উড়ে গিয়েছিল
মাছরাঙা, আয়নাপক্ষি, গাংশালিক, শ্যামা,
কেন চেয়ে আছ গো মা
পুলিশ ছিল শিরস্ত্রাণে, সঙ্গে ছিল বস্ত্রে-মুখ-আবৃত খুনে
তখন কি গ্রহণে টেকেছিল কৃষ্ণছায়া চরাচর
তত্পর হয়েছিল তখন কি নরকের বাসিন্দারা
ভূপৃষ্ঠে নেমেছিল কীচক-পিশাচবুদ্ধি যৌথবাহিনী
মুখে হায়নার মত ডাক, বুট পায়ে চটি পায়ে ছোটে
এ-ভাবে কি হানা দিত বর্গি বা সন্ত্রাসী বোম্বেটে
রাইফেল, রিভলভার, লাঠি, ছুরি, পাইপগান, বোমা
অভাগীর স্বর্গ কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)। এই কবিতাটি 'দৈনিক স্টেটসম্যান' পত্রিকাতে ২০ এপ্রিল ২০০৭ এ প্রকাশিত হয়েছিল।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কবিতা। @ - প্রত্যেকবুদ্ধ - বিশ্বে যখন বুদ্ধ অনুপস্থিত থাকেন, ধর্ম যখন লুপ্ত হয়ে যায়, তখন খণ্ডমহিমা নিয়ে যাঁরা পথ দেখেন, তাঁরা প্রত্যেকবুদ্ধ। --- সূত্র নাগার্জুন।
---নন্দীগ্রামের সেই মাকে আমরা দেখেছি টিভিতে। মাথায় ব্যাণ্ডেজ জড়ানো। নিষ্প্রাণ। চোখ খোলা।---
ট্রিগারে দক্ষ টান, খান খান মুহুর্ত বা চূর্ণ লহমা
কেন চেয়ে আছ গো মা
যে-ট্রলারে চেপে সমুদ্র থেকে আসে খুন করা মাছ
সে-ট্রলারে খুন হওয়া ছেলে সমুদ্র গভীরে চলে যায়
মাটির পাহাড় ঢাকে দগ্ধ মৃত শিশু
চাপ চাপ রক্ত চাটে রৌদ্র জিভ, ওরে বুদ্ধিজীব মাছি
ধর্ষিত মেয়েদের রুধিরাক্ত চুল, অন্তর্বাস, ওড়না
নখে দাঁতে ছেঁড়া শাড়ি
তার মধ্যো দেখা যায় একরত্তি ইউনিফর্ম---
নিতান্ত স্কুলবালিকার জামা
কেন চেয়ে আছ গো মা
বৃষ্টির ঝালর, কনে দেখবার আলো,
কোকতুর পাখির ডাক
সব তোমার
কষ্ণকের হলুদ,আকাশে বাটনার ছোপ,
শিলাবর্ষণের ডগর
সব তোমার
শিশির ফোঁটার ছোট-ছোট হাত পা,
চমকানো গঙ্গাফড়িং
মেঘলোকে উড়ন্ত বিদ্যুত্
সব তোমার
সমুদ্র থেকে উঠে আসা শাঁখা,
দুধ ও কাজলের দেয়ালা
গঙ্গাপুজোর মেলার আলো
সব তোমার
সব তোমার সব তোমার সব তোমার সব তোমার
তোমার মুখপানে চেয়ে রূপকথা বলে যাবে
ব্যাঙ্গমী ব্যাঙ্গমা
কেন চেয়ে আছ গো মা
তোমারই স্মরণে দেখ আকাশ প্রদীপ জ্বলে কত
চাঁদ, গ্রহ, তারা --- চোখ বোজো
কুয়াসার আচ্ছাদন ঢাকুক তোমায়
চোখ বোজো
ধান, খই, ফুল, নদী জড়াবে তোমায়
চোখ বোজো
আরতি ও আজানে জেন বড় শান্তি আনে
চোখ বোজো
চোখ বোজো চোখ বোজো চোখ বোজো চোখ বোজো
তুমি কি প্রত্যেকবুদ্ধ @, খোলা চোখে করুণা না ক্ষমা
কেন চেয়ে আছ গো মা
সূর্য রোজ তোমার হয়ে
আকাশে জমা দেবে রক্তমাখা হলফনামা
কেন চেয়ে আছ গো মা
কেন চেয়ে আছ গো মা
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই হচ্ছে মওকা, এই উঠছে হাওয়া
গরিবদের ধাওয়া করার
কী আনন্দ, গরিবদের তাড়া করে যাওয়া
ক্যানেস্তারা পিটিয়ে জন্তু তাড়ানোর মতো
এই উঠছে হাওয়া
গরিবরা মোক্ষম ধন্দে পড়েছে
রাক্ষসের ফুঁ-তে তাদের ভিটে উড়ে যাচ্ছে
পায়ের তলার সরতে থাকা মাটি
আরও বেশি করে যাচ্ছে তলিয়ে
তারিয়ে তারিয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করার
এই হয়েছে বরাদ্দ সময়
ইতিহাসের সিরিয়ালে
সময় হল টাকা এবং এই হল সময়
গরিবদের ফাঁকা করে দেওয়ার
গরিবরা পড়েছে জব্বর গ্যাঁড়াকলে
তারা জানে না তাদের পাশে লেনিন না লোকনাথ
তারা জানে না গুলি চলবে নাকি চলবে না!
তারা জানে না শহর, গ্রাম কেউ তাদের চায় না
এত না-জানা হল জ্বরের এক ঘোর
যখন মানুষ তো দূর, ঘরদোর, কাঁসা, বাটি
সব প্রজাপতি হয়ে উড়ে যায়
এই হচ্ছে মওকা
কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)।
একেই বলে গরিব তাড়াবার সময়
গরিবদের পাশ থেকে কবিরা চলে গেছে
ওদের নিয়ে কবিতা কেউ লিখতে চাইছে না
ওদের মুখ দেখলে জ্বলে যাচ্ছে গা
এই উঠেছে হাওয়া, এই হচ্ছে মওকা
গরিবদের ধাওয়া করার
ক্যানেস্তারা পিটিয়ে জন্তু তাড়ানোর মতো
গরিবদের তাড়া করে যাওয়া
এই হচ্ছে মওকা, এই উঠছে হাওয়া
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
পার্থ, না, মিথ্যে বলবো না
আমাকে দিয়ে হবেনা এ কাজ
ম্যানিফেস্টো আমাকে স্ক্র্যাপ দরে ছেড়ে দিক
বন্ধ কল-কারখানা
কখনো কবিতার বিষয় হতে পারে না
আবার বলছি--- না, অনাহক লোক হাসাব না।
তুমি আমার চেয়েও ভালো করে জানো
কবিতার জন্ম হল সেই সুন্দরী মেয়েটির মধ্যে
যাকে শ্রম ও ছন্দের এক সুভৌল শরীর বলে দেশে দেশে
হৃদয় কেমন শ্রম করছে রক্তের নদীদের নিয়ে
কোলিয়ারিতে নেমে যাচ্ছে খাঁচাবন্দী মজুরের গান
ডকের ঐ নিরবচ্ছিন্ন কবিতার হুটার
যার্নেসের শব্দে ভাসে, হাতুড়ির আলোয় আসে
কত কথা আলোকমালায়--- কত না কবিতার জন্যে
কত মানুষের শ্রম, সশ্রম অস্তিত্বের, পাল্টানোর স্বাদ।
নিস্তব্ধতা, যা মুখের ওপর সুখের ওপর পাথর
আমি তা নিয়ে কবিতা লিখতে পারবো না।
আশ্চর্য এক কবিতা শোনা যায় আমি জানি
যখন ম্যানিফেস্টো ছাপা হয় এখানে ওখানে
কিন্তু যদি কখনো ছাপা বন্ধ হয়ে যায়
(নববর্ষের শুভেচ্ছা বলে ওটাকে না ভাবাই ভালো)
বন্ধ কলকারখানা নিয়ে কবিতা কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)।২০১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “বুলেটপ্রুফ কবিতা”
কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
যদি ট্রেডল মেশিন চুপ করে থাকে
মরে যায় সীসের অক্ষর
ভাবলে আমার মন হিমঘরে নিভে আসে
লেদ চুপ, পাওয়ার লুমে মৌনতা, ঠাণ্ডা জেনারেটর
থমকে আছে কনভেয়ার বেল্ট, মোটর, এক্সহস্ট ফ্যান
লটকে আছে তালা কারখানার ভাগাড়ের গেটে
ভারতের “রুর” জুড়ে রূঢ় রসিকতা এই আশির দশকে
(পার্থ, সেই পাঁউরুটির কারখানাটা খুলেছে?)
অধিগ্রহণ, মন্দা, স্ফীতি, লে-অফ, ছাঁটাই, বয়লারে বিস্ফোরণ
“বেলডাঙার চিনিকল চালু হবে”
এদিকে যে ফাঁড়াই হয়ে যাচ্ছে মানুষ
হাড়কল মজুরেরা হাড় গুঁড়ো করে এখন তাদের স্বপ্নের
“বন্ধ করাৎকল আবার খুলবে বলেছেন”
এদিকে যে ফাঁড়াই হয়ে যাচ্ছে মানুষ--- কেমন সেই মানুষ?
নিষ্পাপ মানুষ, অলৌকিক মানুষ, মজবুত মানুষ
হারামি অর্থনীতির এক নির্মোহ পেষাই কলে
কখনো ফেরার, কখনো অসুস্থ, কোথাও কৌটো নাড়ছে
কখনো আত্মঘাতী, কোথাও গ্রেফতার, কোথাও বোবা
কখনো রক্ত বেচে, কখনো লাফিয়ে পড়ে, কখনো টুঁটি কামড়ে
এই অপমানিত শ্রমের, নির্যাতিত শ্রমিকের, মৃত্যুর নিয়মের জন্যে
কোনো কবিতার নির্মাণ বা প্রতীক্ষা নেই
নেই কোনো ছন্দ, গতি-জাড্য বা বৈজ্ঞানিক আনন্দের ভাষা
আমার দুচোখে তাই তাসার শব্দ নেই
বন্ধ কলকারখানায় বিশ্বকর্মা পুজো এবারও হলো না।
কবিতার কারখানায় আমিও একজন সাধারণ মজুর
মেঘের ওভারঅল পরে বাড়ি ফিরি
তাই পার্থ, ছেপে দিও ম্যানিফেস্টোতে
বন্ধ কল-কারখানা নিয়ে কবিতা যদি লিখতেই হয়
তাহলে পাঠিয়ে দেব--- কালো পাতা, মর্গের রোদ্দুর,
টিবির রক্তশূন্য মুখ, মরচে পড়া ব্লেড
আর এইসব হাহাকার ও দুঃখী চিত্রকল্পের এক্স-রে করলে দেখা যাবে
পুঁজির ফুসফুসে এক হিংস্র ঘাতক ক্যানসার
ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষিপ্রতায় সমাজ-ব্যবস্থার দেহে
এবং এই অমোঘ ও নিশ্চিত মৃত্যু আমি
গভীর, গভীরতম আনন্দের সাঙ্গে লক্ষ করে যাচ্ছি।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মাফিয়া, মন্ত্রী, পুলিশ
সকলেই সংবাদ হয়ে রয়েছে
ক্যাবারে শিল্পী, খুনে লরি, বিষাক্ত ব্যাঙের ছাতা
তারাও সংবাদ
সংবাদের শিরোনামে লেনিন-কণ্ঠীরা
বোমা, ব্যালট-বাক্স, কফিনো সামিল
চারদিকে সংবাদের কলতান
শিশুরা দেখল এত তাদের গলা
বা কপালের জোর নেই
কোনো মতেই সংবাদ হতে পারবে না তারা
তখন তারা দল বেঁধে মরে গেল
শিশুদের সংবাদ কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)।
২০১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “বুলেটপ্রুফ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
হাস্পাতালে শিশুমৃত্যুর প্রেক্ষিতে লেখা কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
রোজই যখন কাগজ বা টিভি খুলি
সেলিব্রেটিদের দেখতে পাই
যেমন একটা মশা একটা ব্যাঙের
ক্যাসেট ও সিডি বাজারে ছাড়লো
তিনটে কেঁদো শুয়োর এবং দুটো
ফিমেল কাকড়াবিছে
কোনো ফিল্মের মহরতে
একটা টিকটিকি কবিতা পড়ছে
শুনছে মুগ্ধ মাকড়সা
এবং বেশিরভাগ স্থির ও অচল দৃশ্যে
মন্ত্রীদের দেখা যায়--- ব্যস্ত মাছি।
কচ্ছপ, বাঁদর, আর্মাডিলো, শকুন
ও চামচিকেদেরও দেখা যায়
নানা ক্ষেত্রে সেলিব্রেটি ওরা
যেরকম সেলিব্রেটি তেমনটি মাসোহারা
সব থেকে বিস্ময়কর হল
এই সেলিব্রেটিদের পেছনে যে
ডাইনোসর রয়েছে
তাকে খুবই কম দেখা যায়
তার বন্ধু অজগরকে তো
দেখাই যায় না।
সেলিব্রেটি
কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)
২০১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “বুলেটপ্রুফ কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মেঘের মুখোশে ঢাকা চাঁদ
যাকে কালও রাস্তায় আটকে থাকা
কোলা বোতলের ছিপি বলেছিল কেউ
আজ রাতে
শ্বাসরুদ্ধ গরমের তেতে ওঠা হাওয়াতে
মনে হচ্ছে লুকনো টিফিন কৌটো
বিস্ফোরক সম্ভাবনা নিয়ে
খুঁজলে হয়তো ইলেকট্রিক তারও চোখে পড়ে যাবে
গ্রেহাউন্ড, কোবরার ট্রাক
পিষে যাবে, মিশে যাবে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে
থুড়থুড়ে বুড়ো, শণ-চুলে অপুষ্টির শিশু,
ক্লান্ত, জীর্ণ প্রায় অশরীর মা
প্রকৃতির পাতা নিতে ওরা আর জঙ্গলে ঢুকতে পারে না
মরদরা দিয়েছে গাঢাকা
পরবেতে নেচে ওঠা মাঠগুলো ফাঁকা
ছত্রধরের সঙ্গে ডুয়েল লড়তে এসেছে ছত্রপতি
তাই থেকে থেকে
তোতলাচ্ছে ইনস্যাস, ৯ এম. এম., এ কে!
হে মেঘ, আড়াল-মেঘ, বার্তাবহ মেঘ, কামোফ্লাজ মেঘ
কবে তুমি ছুঁড়ে দেবে লক্ষ লক্ষ তীক্ষধার বৃষ্টির তীর
লালগড় কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)। ২০১৩ সালে প্রকাশিত, কবির “বুলেটপ্রুফ
কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। লালগড় আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লেখা কবিতা।
ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে এই রাষ্ট্ররূপী ভাঁড়েদের ভিড়?
যেভাবেতে গুমরোয় ধিকি ধিকি তুষ
সেভাবেই জ্বলে যাবে বুটে চাপা পড়া
মা-মাটি-মানুষ?
মক্ শো-তে টক্-শোতে
যদি ভাবে বেঁচে যাবে ঘর
চলছে চলবে এই প্রসিদ্ধ ক্লাউনদের সার্কাস
যদি ভাব বিজ্ঞাপিত নিরোরাই টেনে যাবে বেহালার ছড়
তাহলে এলার্ম টানো
থামাতে এ বিস্ফোরক ট্রেন
রক্তচক্ষু জ্বালবে না কোনো প্ল্যাটফর্ম
এ হল--- lull before the storm
লালগড়!
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অন্ধকারে জন্ম তোর
দেখেও যাবি অন্ধকার
অন্ধকারে মৃত্যু হবে
অন্ধকারে জন্ম যার।
অনন্তকাল থাকবে ক্ষুধা
দারিদ্র্য ও মৃত্যু শাপ
মশাল হাতে নাচবে প্রেত
বন্যা, খরা, দুর্বিপাক।
অনাথ শিল্ত, চক্ষু বসা
পিতার চিতা, মাতার ছাই
চলছে চলবে গুরুর দশা
মরণ, মারণ--- চলবে তাই।
জ্বলবে কুমির, বাঘের চোখ
আমিষ গাছের বিষম ফল
লতাবে সাপ কাঁটায় কাঁটায়
পচা নদীর বদ্ধ জল।
অন্ধকারে জন্ম তোর
দেখেও যাবি অন্ধকার
অন্ধকারে মৃত্যু হবে
অন্ধকারে জন্ম যার।
তৃতীয় বিশ্বের শিশুদের কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)
১৯৯৭ সালে প্রকাশিত, কবির “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
॥ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শ্রদ্ধাস্পদেষু॥
গাঢ় আঁধার দুমড়ে ভেঙে কোথায় চলেছিস
আগুন খেতে যাচ্ছি আমি, তোদের বাবার কী
এই দেশেতে কবির জন্ম দগ্ধ অভিশাপ
মাকড়কুলে সিংহ হেন, ভস্মে ঢালার ঘি।
যাবজ্জীবন হেলায় থাকি, প্রসাদ করে তুচ্ছ
জিভের ওপর গনগনে আঁচ কয়লা রেখে দি
মুষিক কবি, শৃগাল কবি ওড়ায় ন্যাড়া পুচ্ছ
আগুন ক্ষেতের শস্য দেহ ভস্মে সঁপে দি।
প্রতিষ্ঠানের প্রসাদ বিষ্ঠা হেলায় ঠেলে ফেলে
কবি থাকেন কাঠের চিতায় এমন আঁকি পট
অবহেলায় অবোধ এবং খেলায় এলেবেলে
কবির চিতায় পাপতরাসী গাঁথে তাঁহার মঠ।
কবির ঔদ্ধত্য কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)। ১৯৯৭ সালে
প্রকাশিত, কবির “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
ঘেন্না করি অবজ্ঞাতে বুটের পেরেক, চামড়া
আগুন হতে গেছেন তিনি, স্বর্ণপ্রভ কাঠ
ঘেন্না করি রাতবিরেতে আছেন যেমন---আমরা
দুস্থ ইতর ভাষাবিহীন নগ্ন এ তল্লাট
গণ্ডি ভেঙে আগুন মেঙে কোথায় চলেছিস
সেখায় খুশি যাচ্ছি আমি, তোদের বাবার কী
এই দেশেতে কবির জন্ম দগ্ধ অভিশাপ
বেশ্যাকূলে সীতার সামিল, ভস্মে ঢালার ঘি।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
॥ প্রেরণা গোবিন্দচন্দ্র দাস॥
স্বদেশ নয় এ, মড়ার ভাগাড়
চলতে ফিরতে পায়ে ফোটে হাড়
লাশের বিলাস, লাশের পাহাড়
যেই দিকে চাই, দুচোখময়।
গোবিন্দদাস থাকলে বলত
কথায় তাহার আগুন জ্বলত
যাহার দাপে গরীব কাঁপে
ঠিক যেন সে অন্ধ হয়
স্বদেশ, স্বদেশ করছ কাকে--- এদেশ তোমার নয়।
ভূসর্গে যে উপবাসী
শাস্ত্রে তারাই নরকবাসী
খাদ্য তাহার পচা, বাসি
নর্দমা উচ্ছিষ্টময়
শোষক চতুর বেনের দেশে
কক্ষনো তার জায়গা হয়?
সংবিধানে কার অধিকার
বেকারি আর ক্ষুধায় মরার
বাঁচতে বেশ্যাবৃত্তি করার
চক্ষু যাহার বাষ্পময়
বুদ্ধিজীবীর মাতৃভূমি,
শস্যজীবী নিরাশ্রয়।
স্বদেশ গাথা কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত, কবির “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার
দেশ না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
গোবিন্দদাস থাকত যদি
বলত কাব্যে নিরবধি
বুদ্ধিজীবীর পাছায় দুচোখ
আকাশ তাহার দেখতে নয়
স্বদেশ, স্বদেশ করছ কাকে---এদেশ তোমার নয়।
শেয়াল শকুন পথের ধারে
কাপড় খুলে ন্যাংটা করে
যাহার চিত্র চিত্রকরের
দেশ-বিদেশে কদর হয়
সংবাদে তার কান্না ছাপে
সাহিত্যিকের চক্ষু ভাপে
ঠোঁটের ডগায় সিগার কাঁপে
মদ গিলিয়া শান্ত হয়
কলম শুধু মলম লাগায়
ক্ষত যেমন তেমন রয়।
বিবেক রাখে পর্দা ঢাকা
তাকে রবীন্দ্রনাথ রাখা
শাক দিয়ে মাছ নিত্য ঢাকা
সেবাদাসের কর্ম হয়
গোবিন্দদাস বলত থাকলে
সারাজীবন বিষ্ঠা মাখলে
কৃত্রিম এই ধুপের ধোঁয়ায়
গুয়ের কুবাস বিদায় হয়?
স্বদেশ, স্বদেশ করছ কাকে---এদেশ তোমার নয়।
রেলস্টেশনে, হাসপাতালে
বাজার খোলা, খাম চাতালে
শহর নগর রেল পাতালে
কাহার দিবস রাত্রি হয়
জেলহাজতে, হাড়িকাহে
দুইবেলা যার মুণ্ডু কাটে
চিতা যাহার জ্বলছে মাঠে
শ্বশানে চোখ অশ্রুময়
স্বদেশ, স্বদেশ করছ কাকে---এদেশ তোমার নয়।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অবশ্যই আমরা যারা গরিবগুরবো
থ্যাঁতলানো, আধসেদ্ধ, আধপোড়া বা তিরিক্ষে
কখনো খচ্চর, প্রায়ই হারামি
আমাদের একজন নেতা চাই
কিন্তু তিনি অতিমানব না হলেই ভালো
তার আশ্চর্য বীরত্ব, দক্ষতা বা চরিত্রগুণ
এই নিয়ে ছাপানো গল্প আমরা চাই না
অত কিছু হলে তিনি কি
আমাদের মতো হাঘরে, ফক্কড়, রগচটা, এলেবেলেদের
নেতৃত্ব দিতে আসতেন
আমরা বুঝে গেছি
কোনো নেতাই একযুগ এগিয়ে ভাবতে পারে না
বরং তাঁরা আখের গুছনো গুবলেট করে
আমাদের সব আখের খেত ভোগে চলে যায়
অনেক অনেক নেতাকে দেখে
শেষমেশ আমরা এই সিদ্ধান্তে এসেছি
নেতা কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)। কবিতাটি ১৯৮৯ সালে “সীমান্ত” পত্রিকায় প্রকাশিত
হয়। আমরা পেয়েছি “ভাষাবন্ধন প্রকাশনী” থেকে, কবির মৃত্যুর পর ২০১৫ সালে, রাজীব চৌধুরী দ্বারা সংকলিত ও
সম্পাদিত “নবারুণ ভট্টাচার্য অগ্রন্থিত কবিতা” কাব্য-সংকলনে থেকে।
রাখাল যেমন ছাগল বা গোরুদের পেছনে থাকে
তিনিও সেরকম হবেন
সামনে কোনো বাঁশিওয়ালা আমরা চাই না
উপরন্তু সামনের দিকেই যখন গুলিটুলি
খাবার সম্ভাবনা
আমরা একজন সাধারণ নেতা চাই
যার বুদ্ধির একটা রেশ থাকবে
যিনি বড়জোর এককাঠি বেশি সরেশ হবেন
যিনি ভুল করলে আমরা ক্যাঁক করে চেপে ধরব
এবং অবশাই তাঁকে বোবা, কালা, মাতাল, লম্পট
বা চোর হলে চলবে না
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জরায়ুর মধ্যে বুলেট খেয়েছিলাম বলে
আমি জন্মাতে পারিনি
তাই বলতে পারব না কোন দলের লোক
কোন জমানার পুলিশ গুলি করেছিল
বলতে পারব না আমার মা
বিপ্লবী বা প্রতিবিপ্লবী--- কোন দলের
সমর্থক ছিলেন
বুলেট কোনো বাধার তোয়াক্কা করে না
সে কোনো চর্মাচ্ছাদন, সুক্ষ্ম বিল্লির স্লেহ
এবং জন্মজলকে খাতির করে না
বুলেটের কোনো বুদ্ধি নেই, নৈতিকতা নেই
চূড়ান্ত বিশ্লেষণে কোনো যথার্থতা
বা অব্যক্ত অর্থও নেই
বুলেট হল বুলেট
তাকে অন্ধ ঘাতক বলে ভাবলে
দৃষ্টিহীন অপমানিত হবে
হত্যাকারীও মানবিকতা হারাবে
যাই হোক, জরায়ুর মধ্যে বুলেট খেয়েছিলাম বলে
আমি জন্মাতে পারিনি
আমি কে আমি জানি না
জানার সময় পাইনি
বুলেট হল বুলেট কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)। কবিতাটি ১৯৯০ সালে “শারদীয়া পরিচয়” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আমরা
পেয়েছি “ভাষাবন্ধন প্রকাশনী” থেকে, কবির মৃত্যুর পর ২০১৫ সালে, রাজীব চৌধুরী দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত “নবারুণ ভট্টাচার্য অগ্রন্থিত কবিতা” কাব্য-
সংকলনে থেকে।
জানার সময় আমি আর কখনো পাব না
আমি কালা, বোবা, অন্ধ ও অচেতন
এবার পুলিশ, নেতা, মাফিয়া, উর্দিপরা, উর্দি না পরা
সবাই আমাকে খুঁজতে বেরোতে পারো
নির্ভয়ে এসো, নির্মম হয়ে এসো
সেবার আমি স্তম্ভিত হয়েছিলাম
এবার তোমাদের স্তম্ভিত হওয়ার পালা
তোমরা সন্ধান চালাও বুলেট নিয়ে
কিন্তু মনে রেখো
বুলেটের কোনো বুদ্ধি নেই, নৈতিকতা নেই
চূড়ান্ত বিশ্লেষণে কোনো যথার্থতা
বা অব্যক্ত অর্থও নেই
বুলেট হল বুলেট
বুলেট এক গেলাস, জল বা মদ
বা একটা সিগারেট নয়
না জন্মালেও অন্ধকারে এক একটা
প্রশ্নের ঢেউ ওঠাই
ঢেউ ফিরে যায়
আমার, না জন্মানো আমার
এত প্রশ্নের পাথর পাষাণ অন্ধকার
চূর্ণ করতে বিস্ফোরণে
হতভম্ব বুলেট কী জানে
বিদগ্ধ, সত্যনিষ্ঠ পাঠক
তুমি কী জানো এত অসম্ভব জিজ্ঞাসার মানে
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ধর্ষণের পর
দু-পা ধরে একটি মেয়েকে
চিরে ফেলা যায়
তৈরি হতে পারে
অভাবনীয় এক মৃত্যুর জ্যামিতি
কোণের বিভাজন
যে কোণ থেকে
মহেঞ্জোদড়োর মুদ্রায়
আমরা তরুলতা
জন্মাতে দেখেছি
মহেঞ্জোদড়োর লিপি
পাঠ করা যায়নি
বোঝা যায়নি
কী ভেবেছিল ধর্ষক
অসাড় দর্শক
কাগজে ও টিভিতে
সব জেনে ফেলে
ক্লোরোফর্ম করা অক্ষরে ও ছবিতে
মর্গে থাকে বলে
কারও কঙ্কালঢাকা মাংস
পচে যায় না
অবিকৃত, অবিকল থেকে যায়
কামদুনি কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)। কবিতাটি ২০১৩
সালে “ভাষাবন্ধন, উত্সব” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আমরা পেয়েছি “ভাষাবন্ধন প্রকাশনী”
থেকে, কবির মৃত্যুর পর ২০১৫ সালে, রাজীব চৌধুরী দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত
“নবারুণ ভট্টাচার্য অগ্রন্থিত কবিতা” কাব্য-সংকলনে থেকে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভীষণ রাগে, কণ্ঠরুদ্ধ শোকে বা ভাবলেশহীন নির্লিপ্ততায়
যেভাবেই দেখি না কেন গত তিন বছরে ২৮টি বন্ধ কারখানায়
শ্রমিকের মৃত্যুসংখ্যা ৯১৯ যার মধ্যে ৪১টি আত্মহত্যা / আত্মহত্যা
মহাপাপ--- এই সব কথাগুলো এবারে বাতিল করতে হবে বোধহয়
কারণ এমন কোনো ভরসা নেই যাতে করে আমি এই
ছাব্বিশে বৈশাখ বুক ফুলিয়ে বলতে পারি যে ৯১৯কে ৯২০
হতে দেব না, হয়তো হয়েই গেছে বা ৪২ নম্বর আত্মহত্যার সময়
হাত থেকে কেড়ে নেব আ্যাসিড বা ফলিডলের শিশি, থামিয়ে দেব
ইলেকট্রিক ট্রেন বা আটকাতে পারব না আরও একটি কারখানা
বন্ধ হয়ে যাওয়া
এত অপমান বহন করে বাঁচতে হয়
এত ছোট, এত অকিঞ্চিৎকর হয়ে বাঁচার ভান করতে হয়
এত হারতে হয়, হারতে হয়
কাল ছিল পঁচিশে বৈশাখ / ভোটের বাজার বলেই এবার অলিতে গলিতে রাস্তায়
গলতায় দেদারে রবীন্দ্রপ্রেমী গুছিয়ে নেমেছিল, যাই হোক কোথায় যেন স্পিকারে
গমগম করে চলছিল ক্যাসেট : আমার জীর্ণ পাতা যাবার বেলায় ডাক দিয়ে
যায় বারে বারে / অকস্মাৎ ধ্বংসের এক স্মৃতি মনে পড়ে গেল--- ইন্দোনেশিয়ায়
১৯৬৫-র সেই কমিউনিস্ট-কোতলে, মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত এক কমিউনিস্ট নেতা
ওই গান গেয়ে উঠেছিলেন---
ডাক দিয়ে যায় বারে বারে
নতুন পাতার দ্বারে দ্বারে
হঠাৎ মনে পড়ে গেল ১৯১৭, ১৯৪৯, ১৯৫৮, ১৯৭০ কয়েকটা ম্যাজিক
সংখ্যা যাই হোক ৯১৯+দের কথা এখন কে ভাববে যখন গান্ধিবাদ, বিষাক্ত
৯ ১ ৯ কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)। কবিতাটি জুন ১৯৯১ সালে “ম্যানিফেস্টো” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আমরা পেয়েছি “ভাষাবন্ধন
প্রকাশনী” থেকে, কবির মৃত্যুর পর ২০১৫ সালে, রাজীব চৌধুরী দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত “নবারুণ ভট্টাচার্য অগ্রন্থিত কবিতা” কাব্য-সংকলনে থেকে।
পদ্মফুল বা বিষাক্ত মার্কসবাদী নেতার একমাত্র আশ্রয় হেলিকপ্টার / যখন কোটি
কোটি টাকায় ফ্লুরোসেন্ট লেখায় সিটি অফ জয় ছয়লাপ / যখন নানাবিধ
বিশেষণে, স্বর্গীয় অলৌকিক জ্ঞোতিতে, সিদ্ধার্থের বুদ্ধবাণীতে আকাশবাতাস
মশগুল / যখন ফিল্মস্টার থেকে ক্রিকেটার থেকে বডিবিল্ডার থেকে মাফিয়া
লিডার সবাই দেশকে বাঁচাতে উদগ্রীব / এত দেশপ্রেমিক প্যাট্রিয়ট মিসাইল উড়ছে
যে চাঁদ তারা কিছুই দেখা যাচ্ছে না
মেট্রোরেল থেকে পেট্রোডলার
টালাট্যাঙ্ক থেকে সুইস ব্যাঙ্ক
---এক জব্বর হিসেব
অপারগ হতে পারি কিন্তু অকৃতজ্ঞ নই
ভীতু, ধুড় হতে পারি কিন্তু সত্যি কথা মিনমিন করে
হলেও বলব
এই সংসদীয় ধনতন্ত্রে তিলমাত্র বিশ্বাস করি না
বিশ্বাস করি মানবিকতায়, সহমর্মিতায়, গণতন্ত্রে
যা অসম্পূর্ণ হলেও অনাহারে মৃত্যু বা আত্মহত্যা
অন্তত ঠেকাতে পারে
একটা কাঁধের পাশে আরেকটা কাঁধ এনে একটা
বাঁধ বাঁধতে পারে মৃত্যু, হতাশা ও দুঃস্বপ্নের বিরুদ্ধে
অন্তত এটুকুই হোক
আপাতত এটুকুই কিভাবে করা যায়
পরের কথা দেখা যাবে পরে
বসস্তে নতুন পাতা আসে, শীতে পাতা ঝরে
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ফুটপাথের শিশুটি মারা গেছে আন্ত্রিক অসুখে
ফুটপাথের মা এখনও হতভম্ব বসে
শিশুটি যার ওপর ঘুমোতো সেই দোকানের ছেঁড়া পলিথিন
বিছোনো আছে এখনও
বিছোনো আছে সাধের আসন।
চারিদিকে ঘুছে ফিরছে টহলদার যান্ত্রিক শহর
এই শহরের ফুটপাতে আর সেই শিশুটি
খেলা করবে না কুকুর ও রোদ্দুরের সঙ্গে
এই শহরে আর কোনোদিন বাংলায় কবিতা লেখা হবে না
গান গাইবে না ভোরের পাখি।
ডিজেল সন্ধ্যা ভেসে গেল ওভারব্রিজের দিকে
ওপারের আকাশে উঠেছে সেরামিক চাঁদ
শোনা যাচ্ছে অন্ধকার ট্রেনের শব্দ
আকাশের তলায় পেতে রাখা আছে সাধের আসন।
সাধের আসন কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)। কবির একটি অপ্রকাশিত কবিতা।
আমরা পেয়েছি “ভাষাবন্ধন প্রকাশনী” থেকে, কবির মৃত্যুর পর ২০১৫ সালে, রাজীব চৌধুরী দ্বারা সংকলিত ও
সম্পাদিত “নবারুণ ভট্টাচার্য অগ্রন্থিত কবিতা” কাব্য-সংকলনে থেকে।
ফুটপাথের শিশুটি মারা গেছে আন্তরিক অসুখে
ফুটপাথের মা এখনও ঝিরঝির বৃষ্টিতে বসে আছে
শিশুটি যার ওপর ঘুমোতো
দোকানের সেই ছেঁড়া পলিথিন
বাতাসের ঝাপটায় একটু একটু সরছে।
জোর হাওয়া দিলে
উড়ে চলে যাবে সাধের আসন
ফুটপাথের মা চুপ করে বসে থাকবে
বাতাসে ভর করে মুখ বুজে চলে যাবে
সাধের আসন।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এক
ওই দেখো জতুগৃহ
ওই দেখো কারবালা
মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবো
এরপর কার পালা?
দুই
গুলি চালানো ভালো নয়
মানুষের ওপর
পুলিশ গুলি চালায়
দাঙ্গাবাজদের ওপরে
গুলি চালাবার জন্যে
বদলি হয়ে যায়
পুলিশ অফিসার
দেখছি কবিতায় কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩.৬.১৯৪৮ - ৩১.৭.২০১৫)।
কবিতাটি প্রকাশিত হয় “এবং সায়ক” পত্রিকায়, প্রকাশকাল জানা যায়নি । আমরা
পেয়েছি “ভাষাবন্ধন প্রকাশনী” থেকে, কবির মৃত্যুর পর ২০১৫ সালে, রাজীব চৌধুরী
দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত “নবারুণ ভট্টাচার্য অগ্রন্থিত কবিতা” কাব্য-সংকলনে
থেকে।
তিন
একদিকে কোটিপতি
অন্যদিকে কোটি পতঙ্গ
এরই মধ্যে বেশ থাকি
জব্দ হয়ে, ডানার সঙ্গে
চার
শয়তান এই টেবিলে খায়
শয়তান এই চেয়ারে বসে
বুশ আর ব্রেয়ার
শয়তান তেলে ডুবিয়ে মানুষ খাচ্ছে
শুরু হতে চলেছে--- তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
চ্যান্টার - অশ্ব আর গ্রহদের নিয়ে আমি এখন আর পালিয়ে বেড়াই না
নির্দোষদের বন্দি করার নীতি ধ্বংস করে আমি আমার খনন শুরু করি
এবং বস্তুতঃ এমন একটা বক্তব্য উচ্চকণ্ঠে তুলে ধরতে চেষ্টা করি
ঐন্দ্রজালিক উদোম ন্যাংটো সব বিশ্লেষণকে যা আগেই এড়িয়ে যায়
আমি চিন্তানায়কদের দিকে কখনও তাকাইনি, এখনও তাকাচ্ছি না
তবে জেলের টাইপরা সুপারকে কয়েকবার বলেছি :
আপনাদের শ্রুতিঘোড়াটি একমাত্র ‘সর্বশক্তিমান’ নয়, আপনিও!
বন্দিনিবাসেও দু-দশদিন অন্তর তাই আমার চামড়া ভাঁজ করে শুকিয়ে ফেলা হয়
ভোঁ… ভোঁ… ও অশান্ত অঞ্চল গান শব্দে ‘পাগলি’ বেজে ওঠে…
রাজনীতি কবি শম্ভু রক্ষিত (১৬.৮.১৯৪৮ - ২৯.৫.২০২০)। হাংরিয়ালিস্ট আন্দোলনের কবিতা।
আমরা কৃতজ্ঞ “তবুও প্রয়াস ওয়েবসাইট”-এ ২৯.৫.২০২০ তারিখে প্রকাশিত, মলয় রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ
“কবি শম্ভু রক্ষিত : হাংরি আন্দোলন থেকে মহাপৃথিবী”, থেকে প্রাপ্ত। ইন্দিরা গান্ধির চাপানো এমারজেন্সির
সময়ে জেলে পোরা হয়েছিল কবি শম্ভু রক্ষিতকে। প্রেসিডেন্সি জেলে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে থাকার সময়ে ২
ডিসেম্বর ১৯৭৬ তিনি এই কবিতাটি লিখেছিলেন। সেই ওয়েবসাইটে যেতে . . .।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
যারা আমাকে ডিগডিগে
আমার রুহকে যুদ্ধের হিরো
আমার ঈশ্বরকে অনিষ্টজনক
আমার কবিতাকে
চাকচিক্যময় আভিজাত্য বা বিক্ষিপ্ত প্রলাপ মনে করে
আহ ভাইরে
তারা বাণিজ্যের অযথার্থ ক্ষমতা দিয়ে
তাদের নাক কান মুখ দখল করে
এই শক্তিশালী প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের
অস্তিত্ব রক্ষা করুক
যারা বালি ফুঁড়ে
আমাকে বাল্যপাঠ শেখাচ্ছে
আহ ভাইরে
তারা মেকি সুন্দরের মিথ্যে সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে
অন্তত একটা ছোটোখাটো দেবদূতের সন্ধান করুক
অকেজো জ্যুকবক্সে স্হির ডিস্ক
জীবনের আর ভাঙা ইঁটের
অশুভ যুদ্ধপরায়ণ যন্ত্রণায় আন্তর্জাতিক কোরাস
মুক্তিবাদ কবি শম্ভু রক্ষিত (১৬.৮.১৯৪৮ - ২৯.৫.২০২০)। হাংরিয়ালিস্ট আন্দোলনের কবিতা। আমরা কৃতজ্ঞ
“তবুও প্রয়াস ওয়েবসাইট”-এ ২৯.৫.২০২০ তারিখে প্রকাশিত, মলয় রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ “কবি শম্ভু রক্ষিত : হাংরি
আন্দোলন থেকে মহাপৃথিবী”, থেকে প্রাপ্ত। সেই ওয়েবসাইটে যেতে . . .।
আহ ভাইরে
কবরখানা আর সুড়ঙ্গের মধ্যে গুঞ্জন-করা
আস্তাবলের ধূর্ত পিটপিটে মায়া
মধ্যে মধ্যে ফ্যাঁকড়া
আহ ভাইরে
কাঁধে অগ্নিবর্ণের ক্যামেরা
হাতে অ্যান্টিএয়ারক্র্যাফ্ট ট্রানজিসটার
অন্য সম্রাটের দায় যাতে মেটে
মাংস ভেদ করে সচল ফ্রেস্কোর মতো
এই সব রেডিও-টিভি-অ্যাকটিভ যুবশক্তি
মুক্তিবাদ এবং জাঁকজমক খুঁড়ে নৈশ-স্তব্ধতা
আহ ভাইরে
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সহ্য করো নারী, সহ্য করো, পুরুষতান্ত্রিক
সমাজে নারীদের সহ্য করাই নিয়ম।
ধর্ষণ করে, খুন করে দেহ পুড়িয়ে দেওয়া হবে,
প্রশাসন জেনেও জানবে না; কেননা
ধর্ষিতা, নিহত নারীর মরদেহ ফেরত পাবার
কিংবা মৃতাকে শেষবার দেখার
অনুমতি মিলবে না জননীর, পিতার, স্বামীর।
সহ্য করো নারী, সহ্য করো, কতোই তো
সহ্য করেছো সেই সতীদাহের কাল থেকে,
যখন বল প্রয়োগ করে তোমাকে টেনে
নিয়ে যাওয়া হোত জ্বলন্ত চিতার দিকে।
তারপর হাত পা বেঁধে ছুঁড়ে দেওয়া হোত
ক্ষুধার্ত চিতার উপর, আর তোমার আর্তচিৎকার
ঢেকে দেওয়া হোত ঢাক ঢোলের বাদ্যিতে।
তুমি সহ্য করেছো অনেক, অগ্নি-পরীক্ষা
থেকে বস্ত্রহরণের অপমান; তোমাকে বাধ্য
করা হয়েছে গ্রহণ করতে পতিতাবৃত্তি।
রাজদরবারে কখনও নৃত্যপটিয়সী, কখনও
বজরায় প্রমোদ-ভ্রমণে দেহসঙ্গিনী; ঝাড়লন্ঠনের
আলো আর নূপুর-নিক্কনে উচ্চকিত হয়েছে হারেম ;
প্রকৃত দুর্গা কবি অজিত বাইরী (জন্ম ৮.১১.১৯৪৮)। মিলনসাগরে এই কবিতার প্রকাশ - ১৪.১১.২০২০।
আর তোমার চোখের জলে ভরে গেছে
উন্মাদদের নিশি-যাপনের রঙিন পেয়ালা।
এসবও সহ্য করেছো তুমি; বলো, সহ্যের
আরও কী বাকি? নিজের দেহকে এবার
করে তোলো কষ্টিপাথর, ওষ্ঠে রাখো বিষ ;
যেন চুম্বন করামাত্র নীল হয়ে যায়
প্রেমহীন কামার্ত পুরুষের পাশব-দেহ।
নিষ্কলুষ ভালোবাসা তুমিও চেয়েছিলে ;
পুরাণের সতী, বেহুলা, শৈব্যার আত্মত্যাগ
প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো পাপড়ি মেলে আছে।
যদি প্রেমের কাছে কেউ পরাজিত না-হয় ;
তবে অস্ত্র তুলে নাও হাতে; অসুরের
বক্ষ বিদীর্ণ হোক তোমার ত্রিশূলে,
তুমি হও পশুত্ব নিধনের প্রকৃত দুর্গা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শোন ভারতবর্ষ, তাদের কথা শোন--
যারা রেললাইনে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
শোন ভারতবর্ষ, তাদের কথা শোন--
যাদের ক্ষুধার পোড়া রুটি
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলো রেললাইনের আশপাশে।
বাড়ি ছাড়া সেইসব পরিযায়ী শ্রমিকদের
কথা শোন, যারা বহুদূরের পথ
পাড়ি দিয়ে ফিরতে চেয়েছিল
স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, পরিবার-পরিজনের কাছে।
যারা ফেরার কোন যান না-পেয়ে
হাঁটতে শুরু করেছিল মাইলের-পর-মাইল।
কেউ চল্লিশ, কেউ পঞ্চাশ মাইল।
হেঁটে এসেছিল, তারপর ক্লান্ত হয়ে
ঘুমিয়ে পড়েছিল রেললাইনের উপর।
বোঝেনি এ-পথে দৌড়ে আসবে মৃত্যুদূত
আর ফলের খোসার মতো পিষে দিয়ে যাবে।
চর্তুদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে দেহাংশ--
রক্ত, রক্তের ছোপ এখানে ওখানে
যতটুকু রক্ত অবশিষ্ট ছিল শুকনো শরীরে।
বলো, ভারতবর্ষ বলো কবি অজিত বাইরী (জন্ম ৮.১১.১৯৪৮)। মিলনসাগরে কবির পাতায়
প্রকাশকাল ১৪.১১.২০২০। এই কবিতাটি মিলনসাগরের “করোনা ভাইরাস ও পরিযায়ী শ্রমিকের দেয়ালিকায়”
তোলা হয় ১৫.৪.২০২০ তারিখে। সেই পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
শোন ভারতবর্ষ, শোন তাদের কথা
যারা স্বগৃহে ফেরার প্রার্থনাটুকু
জানিয়েছিল শুধু, তাদের ওইটুকু আর্জি
মঞ্জুর করোনি; অথচ তারা তোমারই
সন্তান, তারা দরিদ্র, তারা নিঃস্ব
পেটের তাগিদে দূর পরবাসী।
বলো তুমি ভারতবর্ষ, তাদেরও কী আত্মজের
মুখ দেখার অধিকার ছিল না? তাদেরও
কী ম-র কাছে ফেরার ছিল না দায়?
এত নিষ্ঠুর তুমি, এত নিষ্করুণ!--
বলো, ভারতবর্ষ বলো।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জ্বালাও প্রদীপ ঘরে ঘরে
মহাকালের দোর হতে দূর হোক অন্ধকার।
মৃত্যু বাজাচ্ছে ঘন্টাধ্বনি,
তার চাই আরো, আরো, আরো লাশ---
কে করে কার সৎকার!
লাশের ভারে নুয়ে পড়েছে পৃথিবী ;
জীবনের গতি থেমে গেছে আচম্বিতে।
শিশু থেকে বৃদ্ধ
কারো জীবনের নেই নিশ্চয়তা,
আতঙ্কের দৃষ্টি মেলে গুণছে সবাই মুহূর্ত।
মিথ্যে হয়ে গেছে ঈশ্বর।
মিথ্যে হয়ে গেছে আল্লা।
ভয়ঙ্কর নৈরাশ্য এনে দিয়েছে মানুষে মানুষে সমতা।
কাঙ্ক্ষিত ছিল না বর্ণহীন একতা।
মৃত্যুর দিগন্তে বর্ণহীন একতা।
জ্বালাও প্রদীপ, নিকষ রাত্রির মতো
জেনো, মৃত্যুর একটাই রঙ।
মৃত্যুর একটাই রঙ কবি অজিত বাইরী (জন্ম ৮.১১.১৯৪৮)। এই কবিতাটি
মিলনসাগরের “করোনা ভাইরাস ও পরিযায়ী শ্রমিকের দেয়ালিকায়” তোলা হয় ১৫.৪.২০২০
তারিখে। সেই পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
শব আগলে বসে আছি আমি
শব আগলে বসে আছে নৌসাদ
দাহ করার কিংবা গোর দেবার
সুযোগটুকুও মিলছে না।
সব শ্মশান, সব গোরস্থান ভরে গেছে শবে;
বাতাসে শুধু সৎকারের হাহাকার।
শত চুল্লির শিখা জিভ বাড়াচ্ছে
একের-পর-এক চিতার দিকে।
একই কবরে উপর্যুপরি শব চাপিয়ে
সংকুলান হচ্ছে না কবরস্থানের।
এ মৃত্যু-মিছিলের শেষ কোথায়?
মৃত্যু শুধু অপরিণাম ধ্বংসের কথা বলছে।
শব আগলে বসে আছি
কবি অজিত বাইরী (জন্ম ৮.১১.১৯৪৮)।
করোনা-কালে স্মশান ও গোরোস্থানের অপ্রতুলতা নিয়ে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জাতি তত্ত্বের জালিয়াতি খেলে
যারা করেছিল দেশভাগ
ক্ষমতার লোভে খেলেছিল যারা
রক্ত হোলির ফাগ
তারা হোল আজ মহানেতা
তারাই কর্ণধার
ইতিহাস জানি করবে না ক্ষমা
তাদেরই মিথ্যাচার
কত ছলাকলা কত ছেলেখেলা
আজও চলছে জানি
যে দিকে তাকাই দেখিতে যে পাই
মিথ্যার হাতছানি
কল্প লোকের মিথ্যা গল্প
শুনে যাই অবিরত
আছি মিথ্যা ভিতের উপরে দাঁড়ায়ে
এমনই ভাগ্যহত
নির্মম সত্য
কবি সমরেন্দ্র দাশগুপ্ত (জন্ম ২৫.১১.১৯৪৮)
নীতিহীন যত নেতার কন্ঠে
শুনি সাম্যবাদের গীতি
ভয়ে শঙ্কায় শিউড়ে যে উঠি
দেখে দেশের পরিস্থিতি
খুন ধর্ষণ বলাত্কারের
এ কোন পীঠস্থান
লজ্জাতো নাই তবু গেয়ে যায়
সাম্যের জয়গান
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বলতো ভাই। আমরা সবাই,
কেমন ধারার বুদ্ধিমান।
নেতার কথায় উঠি বসি,
নেত্রীর গলায় গাই যে গান।
সাধা গলা নাইবা থাকুক,
নাইবা থাকুক, লয় ও তান।
হেড়ে গলায় গাইছি তবু,
নেতার গাওয়া কোরাস গান।
নেতাই যে গীতিকার তার,
সুরটাওতো তারই দেওয়া।
সেই সুরেতে গাইতে গিয়ে,
ভুলি সবাই নাওয়া খাওয়া।
মানতে হবে, দিতে হবে,
এটাই গানের কথা ভাই।
নাই প্রয়োজন অর্থ বোঝার,
শিখিয়েছেন মোড়ল মশাই।
ডান্ডা মাথায় ঝান্ডা গুজে,
দল বেঁধে সব ময়দানে যাই।
চিড়িয়াখানা যাদুঘরআর,
ভিক্টোরিয়ায় ঘুরে বেড়াই।
দৃশ্যপট
কবি সমরেন্দ্র দাশগুপ্ত (জন্ম ২৫.১১.১৯৪৮)
আজকে, নেতা নেত্রী আছেন যারা
দক্ষ তারা কুশীলব।
ওদের, সেবার কৃপায় দেশ জননী ,
হোল যে আজ মৃত শব।
ওরা লক্ষ টাকার ধার ধারে না,
করছে কোটী কোটী আত্মসাৎ।
মাত্র পাঁচটি বছর সুযোগ পেলেই
করবে জানি বাজীমাৎ।
সংসারেরই জোয়াল ধরে,
উঠছে সবার নাভিশ্বাস।
এই ভোট ব্যালটের মায়াজালে,
ডাকছি নিজেদেরই সর্ব্বনাশ।
দিনে দিনে লাফিয়ে বাড়ে,
আজকে দেশের বাজার দর।
নেতাদের হয় বাড়ী গাড়ি,
পুড়ছে তোমার সুখের ঘর।
আমরা দিলাম না হয় গলায় দড়ি,
নাইতো ওদের মাথা ব্যাথা।
ওদের তাতে কি আসে যায়,
চোর না শোনে ধর্মের কথা ।
দেশের তরে জীবন দিল,
দীনেশ ক্ষুদি কানাইলাল।
উত্তর সুরী আমরা সবাই,
নেতা হয়ে দিচ্ছি চাল।
কোথায় শক্তিরূপী ভক্তিমতী,
শান্তি সুধা সুনীতি বোস।
আজকে নারীর চাল চল নে,
হয় যে দুঃখ হয় আফসোস।
রক্ত দিল কত শহীদ,
লাভ কি তাতে হোল ভাই।
কংস রাজার বংশধর সব,
দেশটাকে যে লুটে খাই।
শাসক হয়ে বেনের দলই,
করছে যে আজ দেশ শাসন।
হিংস্র ক্রূর হায়নার দল,
কাড়ছে মায়ের বসন ভূষণ।
মানবরূপী দানব ওরা,
মনুষ্যত্বের নাই বালাই।
ওরা অর্থ পেলে করতে পারে,
যখন তখন যা খুশি তাই।
ওরা নিজেরাই ডুবে আছে
আকন্ঠ ঐ পাপ করে।
কয়েক কোটী হাতিয়ে নিয়ে,
ছিচকে চোরের বিচার করে।
ধন্যি যত নেতা নেত্রী,
তোমাদের দেই ধন্যবাদ।
যা খুশি তাই করছো সবাই,
নাই তো তবু প্রতিবাদ।
তবুও কেন ভোট দিতে যাই,
লাইন দিয়ে দেই ব্যালটে ছাপ।
তাই তো সবার সইতে যে হয়,
দুঃখ, ব্যথা মনঃস্তাপ।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
করতে ধ্বংস কংশ রাবণ,
চাই যে আবার অকাল বোধন।
হৃদয়টাকে করেই শোধন,
ছিঁড়তে হবে মোহের বাধন।
লাভ লালসার জতুগৃহ,
ভাঙ্গতে হবে নির্ব্বিচারে।
আত্ম ত্যাগের দীক্ষা যে চাই,
আজকে সবার ঘরে ঘরে।
আত্ম সত্তা বিকিয়ে দিয়ে,
চাইনা কারোর দয়ার দান।
আত্ম সুখের অলীক আশায়,
চাইনা অস্তিত্বেরই অপমান।
চাইনা হোতে শিকারতো আর,
বারংবারই বঞ্চনার।
ছিনিয়ে নিতে হবে যে আজ,
বেঁচে থাকার অধিকার।
বোধন কবি সমরেন্দ্র দাশগুপ্ত (জন্ম ২৫.১১.১৯৪৮) রচনা
১৫.০১.২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৫.১.২০২১।
বৃহন্নলার বেশ ধরেই,
চাইনা হোতে বশংবদ,
একটু শুধু লাভের আশায়,
চাইনা বলতে শেখানো গত্
প্রত্যয়েরই প্রতিজ্ঞাতে,
চাই যে আবার মহারণ,
মূল্য বোধের মূল্যকে চাই,
চাই জীবনের মূল্যায়ন।
মন্ত্রী নেতার চাইনা ভাষণ,
চাইনা মিথ্যা প্রহসন।
চলার পথে চাইনাতো আর
ছল চাতুরীর আলিঙ্গন।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এইবার শান দাও হাতিয়ার
কাছাকাছি এসে গেছে বিপ্লব,
শোষকের রক্তেই উত্সব
এইবার শান দাও হাতিয়ার।
গ্রামে গ্রামে গড়ে তোলো দুর্বার
যুদ্ধের দৃঢ় সব ইউনিট-----
রক্তের, সাহসের ইউনিট---
হয়ে ওঠো সকলেই ক্ষুধাধার।
ভয় নেই, শ্রমিকের-কৃষকের
চেতনায় চেতনায় সৈনিক,
আমরা নতুন প্রাণ দৈনিক
আনবোই সফলতা জীবনের॥
এইবার শান দাও হাতিয়ার
দ্রোণাচার্য ঘোষ (৭.১২.১৯৪৮ - ৬.২.১৯৭২)
রচনা ২০.৩.১৯৬৯। কবি, নকশালবাড়ী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত
ছিলেন বলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং পুলিস কাস্টডিতেই
গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। সরকার পক্ষের থেকে রটনা
করা হয় যে জেল পালানোর সময় তাঁকে গুলি করে মারা হয়েছিল।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অনেকক্ষণ তোমার কাছে বসেছিলাম
অনেকক্ষণ
তোমার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে মোহহীন বয়স---
ঠিক যেরকম আমার পার্টি ;
আমার মুক্তির দিগন্ত ---- বিপ্লব ;
তার থেকে অন্য কিছু নও।
তুমি আমার সম্বন্ধে কি ভাবো আমি জানি না,
যেমন জানি না
বিপ্লবের শেষ অবধি থাকবো কিনা আমি
কিন্তু এটা স্পষ্ট
শেষকে পাবার আশা নিয়েই আমার শুরু
যেমন শুরু করেছিলাম তোমাকে ভালোবাসা।
জানি জয় আমাদের হবেই
আমাদের সংগ্রাম কোনো খেয়ালী মনের কল্পনা নয়,
তা কঠিন বাস্তব।
তাই এটাও আজ স্পষ্ট
ভালোবাসা আর বিপ্লব, বিপ্লব আর ভালোবাসা---
কেউ পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়।
বিপ্লবের জন্যই ভালোবাসা আর ভালোবাসার জন্যই বিপ্লব।
কৃষ্ণার উদ্দেশে কয়েকটি ছত্র কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ (৭.১২.১৯৪৮ - ৬.২.১৯৭২)। রচনা ১৫.৪.১৯৬৯,
বেদেডাঙ্গা। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় সমীক্ষা পত্রিকার ষষ্ঠ বর্ষ, ১ম সঙ্কলন, মে ১৯৮৩ সালে। কবি, নকশালবাড়ী
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং পুলিস কাস্টডিতেই গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়।
সরকার পক্ষের থেকে রটনা করা হয় যে জেল পালানোর সময় তাঁকে গুলি করে মারা হয়েছিল।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
রক্তের ভিতর বিক্ষোভ
মানুষগুলো একমুঠো ভাতের জন্য পাগল
তবু ওরা ভাত ছড়ায়
রাশি রাশি ভাত দিয়ে তৈরি করে মদ
মানুষ নিঙ্ ড়ানো রক্তেই হয় উত্সব।
এ উত্সব ছিঁড়ে ফ্যালো,
ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও সশস্ত্র শক্তিতে,
মানুষের উপর যে অত্যাচার -----
তাকে চিরকালের মতন নিশ্চিহ্ন ক’রে দাও।
তবেই আসবে মুক্তি
রাশি রাশি ভাত আমাদের চিরকাল
রাশি রাশি সুখ আমাদের চিরকাল
শোষণহীন স্বাধীন স্বদেশ
খুলে দেবে তার ভাঁড়ার।
রক্তের ভিতর বিক্ষোভ কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ (৭.১২.১৯৪৮ - ৬.২.১৯৭২)। রচনা ১৫.৪.১৯৬৯, বেদেডাঙ্গা।
কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় সমীক্ষা পত্রিকার ষষ্ঠ বর্ষ, ১ম সঙ্কলন, মে ১৯৮৩ সালে। কবি, নকশালবাড়ী আন্দোলনের সঙ্গে
যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং পুলিস কাস্টডিতেই গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। সরকার পক্ষের
থেকে রটনা করা হয় যে জেল পালানোর সময় তাঁকে গুলি করে মারা হয়েছিল।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ক্ষমতার গর্বে স্ফীত শাসকের দল
এখন মিনার গড়ে শোষিতের হাড় দিয়ে, রক্ত-মজ্জা দিয়ে
মিনার ক্রমশ দূর আকাশের কাছাকাছি হয়---
আকাশ তবুও দূর বয়ে যায় সফল শরীরে !
মাটিতে নিস্তেজ দেহ বেশিরভাগ মানুষেরা এইসব মিনারের গায়ে
বার বার মাথা ঠেকে --- ভাবে এই পথে মুক্তি, ওই
রক্তচোষা খুশি হ’লে সহসা তাদের মুক্তি দেবে তুলে হাতে,---
মাথাগুলো ফুটো হয়, নিস্তেজ শরীর হয় ক্রমশ নিস্তেজ ---
ওদের রক্তের রঙে ধনিকশ্রেণীর হয় নতুন শিল্পের অভিসার।
অতর্কিতে মিনারের ভিত্ ওঠে টলে
চোখে চোখে প্রশ্ন ঘোরে --- এ কোন্ নতুন শক্তি এলো?
চোখে চোখে প্রশ্ন ঘোরে --- এরকম মিনার উপড়ে
সশস্ত্র শক্তির রোদে চলা কি সঠিক?
ক্ষমতার গর্বে স্ফীত শাসকের দল কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ (৭.১২.১৯৪৮ - ৬.২.১৯৭২)।
কবি, নকশালবাড়ী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং পুলিস কাস্টডিতেই
গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। সরকার পক্ষের থেকে রটনা করা হয় যে জেল পালানোর সময় তাঁকে গুলি
করে মারা হয়েছিল।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কৃষক আজ প্রস্তুত হও শ্রমিকের নেতৃত্বে
কৃষিবিপ্লব রাজনীতি নাও বজ্রকঠিন চিত্তে :
ছিঁড়ে ফ্যালো ঐ ভোট ভোট রব
. অস্ত্র ছেনাও শাসকের
উচ্ছেদ করো জমিদার আর উচ্ছেদ করো শোষকের।
স্বাধীনতা চাই, স্বাধীনতা আজ
. গরিবের চাই স্বাধীনতা
যে-কোনো মূল্যে স্বাধীনতা চাই
. মানবো না আর অধিনতা
এই রাষ্ট্রীয় শাসন যন্ত্র
. ভেঙে ফ্যালো দ্রুত ভেঙে ফ্যালো
লালে লাল হোক, রক্ত নিশানে
. জলুক শ্রমিক শ্রেণীর আলো।
এসো বিপ্লবে আমরা সবাই অস্ত্র হাতে
উচ্ছেদ করো কায়েমী স্বার্থ রক্তপাতে।
খর বিদ্যুৎ জ্বেলে দিই শোষকদের কৃষিবিপ্লবে
এসো আজ মাতি, শোষণ ছিঁড়বে লাল উৎসবে।
ডাক কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ (৭.১২.১৯৪৮ - ৬.২.১৯৭২)। রচনা ৮.৩.১৯৬৮, চুঁচড়ো। কবি, নকশালবাড়ী
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং পুলিস কাস্টডিতেই গুলি করে তাঁকে হত্যা
করা হয়। সরকার পক্ষের থেকে রটনা করা হয় যে জেল পালানোর সময় তাঁকে গুলি করে মারা হয়েছিল।
বেঁচে থাকে চিরকাল ---- তারাই সুদূর,
হায় মনুষ্যত্ব। বাসনা মরছে কেঁদে
তবুও রক্তের কোনো সূচনা ছাড়ে না
পর্যাপ্ত সময়গুলি। অন্ধকার জীবনের শুধুই ক্রন্দন !
সেই চিরন্তন মানুষেরা এখনো শোষণ মুক্ত
. হয়নি ভারতে
আমার ভারত কাঁদে অন্ধকার খেলাঘরে
. মৃত্যুর আলোড়ন
একদিন এইসব খেলাঘর ভেঙে দিয়ে
. রুখে উঠবে সশস্ত্র শক্তি
জেনো অনন্তকালের বিপ্লবী শ্রমিক সব ;
একথা জানাচ্ছি ধ্রুব শোষণের
. মাঝখানে ব’সে !
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সারা সকাল উজ্জ্বল বয়স ব’লে দিচ্ছে পথ
সারা সকাল গ্রামে গ্রামে প্রস্তুতি,
যে প্রস্তুতি চীন-আলবেনিয়া-ভিয়েতনামে
যে প্রস্তুতি শ্রমিকশ্রেণীর দূর্গ।
এই আধা-ঔপনিবেশিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক দেশে
যে দেশ এখনও পরাধীন
সেখানে মেহনতী মানুষের মুক্তিপণ—বিপ্লব
গরম ভাতের মতন রক্তের অভিষেক।
দরজায় দরজায় ডাক যায়— শেকল ছেঁড়ো
শেকল ছেঁড়ার শক্তির জন্যেই উদ্যম।
শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিপণ ----বিপ্লব,
গরম ভাতের মতন রক্তের অভিষেক।
সমস্ত দিন সমস্ত জীবন শুধু এই
শুধু মুক্তির জন্যই আমাদের সমস্ত সংগ্রাম
সশস্ত্র কৃষক যুদ্ধ। জনযুদ্ধের পথেতেই শোষণ উচ্ছেদ
আর গরম ভাতের মতন রক্তের অভিষেক॥
গরম ভাতের মতন রক্তের অভিষেক কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ (৭.১২.১৯৪৮ - ৬.২.১৯৭২)।
রচনা ১৪.১২.১৯৬৮। কবি, নকশালবাড়ী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং পুলিস
কাস্টডিতেই গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। সরকার পক্ষের থেকে রটনা করা হয় যে জেল পালানোর সময়
তাঁকে গুলি করে মারা হয়েছিল।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আজ মনে হয় এসেছে সময়,
অস্ত্র ধরো!
ভারত মায়ের বীর সন্তান,
ক্ষতম করো!
নরকের থেকে তুলেছে মাথা,
ক্লেদাক্ত হাত ধরেছে হিজাব,
এতো সাহস !
উপড়ে শিকড় ফেল রাস্তায়,
লাথিয়ে মারো ।
মায়ের আব্রু কেড়েছে এদের
এতো সাহস ।
ভায়ে ভায়ে যাতে হয় সংঘাত
তুলেছে ধরে তাই জাত-পাত,
এদের ঘারে ধাক্কা মারো।
অনেক হয়েছে শান্তি মিছিল,
কথায় গানে।
ভারত ছাড়ো কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। কবিতাটি
মিলনসাগরের “NPR-NRC-CAA বিরোধী দেয়ালিকায়” তোলা হয় ১৮.১.২০২০ তারিখে।
আছে যত বীর মা’র সন্তান
দাঁড়াও ঘুরে ।
অনেক সহ্য করেছি আমরা,
এবার , ক্ষতম করো।
কুকুরের মতো করবে গুলি?
এতো সাহস,
নিজের মাথার খুলিটি এখন রক্ষা করো।
অনেক হয়েছে এবার তোমরা,
ভারত ছাড়ো॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
অনেক রাত হলো এখন শীতের রাত !
রাস্তায় কেন মাগো! আমরা বাড়ি যাব না?
না রে খুকি আমরা এখন হারিয়েছি ঘর বাড়ি,
কেন এমন বলছ মাগো,
আমি তো তিক দেখতে পাচ্ছি,
ঔ তো আমার বাড়ি।
ঘরে চল মা ভাত বেড়ে দে
বড্ড ক্ষিদে পেটে!
বুঝছি না মা মোটে।
আমি কি ছাই বুঝছি কিছু
কেন যে কেউ কেড়ে নিল পায়ের তলার মাটি
জন্ম নিলাম এই দেশে তে তবু নাকি আমরা
নই ভারতীয় ; ...খাঁটি।
শশুরের ভিটে ছেড়ে মেয়ের হাত ধরে ;
ঠিকানাহীন বিধবা মা পথে পথে ঘোরে ৷
আশ্রয়হীন ছিন্নমূল অবাক মানুষ যতো
কোন প্রাণে কেউ দেয় যে এদের এত বড়ো ক্ষতো।
বিচার বুদ্ধি কোথায় এদের দেশ চালায় যারা
দেশে-মাকে কি বাসবে ভালো এ সব লক্ষীছাড়া।
অনেক রাত হলো কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। কবিতাটি
মিলনসাগরের “NPR-NRC-CAA বিরোধী দেয়ালিকায়” তোলা হয় ১৮.১.২০২০ তারিখে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ফুটপাথে তোমার দেখে চমকে উঠেছিলাম ।
মাগো তোমার কাপড় কেন ছেঁড়া !
যে হাত পেতেছ – কত শীর্ণ ,
ফুলে আছে নীল নীল শিরা ।
দু-চার আনা দয়া করে, কেউ বা দুটাকা দেয়,
আমি দেব দশ ।
আহারে, খাওনি বুঝি সারা দিন,
দোকানী বুড়ি-মাকে দাও তো রুটি
আরও কিছু মিষ্টির রস ।
বিস্ময়ে হতবাক তুমি খাও পেট ভরে –
আমি বিব্রত ! প্রণাম করোনা করে জোরে।
প্রতিদিন নানা পথে দান করি –
সে কি শুধু পুণ্য সঞ্চয় –
হয়ত তাই, হয়ত বা নয় ।
পথে যত ভিখারিনী বুড়ি
তাদের কষ্ট দেখে বুক ফেটে যায় ।
বৃদ্ধাশ্রমে মা আমার থাকে কেন –
উত্তর পাবেনা তবু –সে জিগ্যাসার !
বৃদ্ধাশ্রমে মা কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। মিলনসাগরে কবির
পাতার জন্য, এই কবিতাটি কবি পাঠিয়েছিলেন ২০১৪ সালের মার্চ মাসে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
সোহাগবালা, সোহাগবালা
দুয়ার খোল্ তোর।
রাত গিয়েছে চলে সোহাগ,
এসেছে আজ ভোর॥
দুয়ার খোল্ সোহাগবালা,
রাত হয়েছে ভোর –
ছেঁড়া কাপড় ফেলে সোহাগ,
নতুন কাপড় পর।
নতুন রঙে সাজিয়ে ডালা
প্রভাত বরণ কর।
সোহাগবালা, সোহাগবালা
নতুন কাপড় পর।
রাত গিয়েছে চলে সোহাগ,
এসেছে আজ ভোর॥
পুরানো তোর মালাখানি
দে রে ছুঁড়ে ফেলে।
নতুন মালা গাঁথ্ রে সোহাগ,
শিশির-ভেজা ফুলে॥
সোহাগবালা কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। পরিবর্তন, গীতিরূপান্তর, সুর ও কণ্ঠ - রাজেশ দত্ত।
সুরারোপ ২৭ মে, ২০১৮। এখানে কবিতার গীতিরূপটি দেওয়া হলো। মূল কবিতা মিলনসাগরে কবির পাতায়
দেওয়া রয়েছে। মিলনসাগরে কবির পাতার জন্য, এই কবিতাটি কবি পাঠিয়েছিলেন ২০১৪ সালের মার্চ মাসে।
ভিডিওটি সৌজন্যে Rajesh Datta YouTube Channel.
রাতের সাথে বাসি কান্না
দে রে বিদায় আজ –
দুঃখ-সুখের সাজিয়ে ডালা
এলো সুখের সাজ।
সোহাগ রে, তোর দুঃখ গাঁথ্
সুখের সুতোয় আজ।
দুয়ার খোল্ সোহাগবালা,
পর রে নতুন সাজ।
রাত গিয়েছে চলে সোহাগ,
এসেছে ভোর আজ॥
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বাংলা মায়ের এপার ওপার হিন্দু মুসলমান।
এপারেতে থাকে দিদি ওপাড়ে ভাইজান।
গানের কলি লিখে লিখে দিদি ভাসায় জলে।
গানের ভেলায় সাজায় ভাই সুরে, ছন্দে, তালে।
দিদির চোখে স্বপ্নে শুধু গলায় যে নেই সুরে ;
ভাইজান কয় দিদির দুঃখ করব আমি দূর।
এপার বাংলা ওপাড় বাংলা বাঁধব আমি সুরে –
সবুর কর দিদি ,সে দিন আর তো নেই দূরে।
ভাইজান গায় উদার গলায় তার সুর ছুঁয়ে যায় মন ;
গর্বে স্নেহে ভরে ওঠে দিদির নরম মন।
দিদি আর ভাইজান তারা হিন্দু মুসলমান,
এপার ওপাড় এক করল তাদের যুগল গান॥
হিন্দু মুসলমান কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)।
মিলনসাগরে কবির পাতার জন্য, এই কবিতাটি কবি পাঠিয়েছিলেন
২০১৪ সালের মার্চ মাসে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
রশিদ-মিঞা রিক্সা চালায় সকাল দুপুর রাত
তাইতে তাদের জোটে কাপড় তাইতে জোটে ভাত।
রশিদ-মিঞার ছোট্ট ছেলে রমজান তার নাম
বায়না ধরে পড়বে সে যে করবে না এই কাম।
রশিদ গিয়ে বললে বাবু পড়বে আমার ছেলে,
ভর্তি করে নেবে বল কত রূপয় দিলে ?
হেডমাস্টার বলে কিছুই দিতে হবে নাকো
ডোনেশনের বাক্সে কেবল হাজার-খানেক রাখো।
বই খাতা ব্যাগ নিয়ে যখন রমজান যায় স্কুলে,
গরীব বাপের সিনা তখন গর্বে ওঠে ফুলে।
বর্ষাকালের এক দুপুরে হঠাত্ ভাঙ্গন ধরে
স্কুলঘরটার একটা দেয়াল পড়ল ভেঙ্গে ঝরে।
পাঁচটি শিশু পড়ল চাপা গেল তাদের প্রাণ,
তাদের মাঝে একটি শিশু রশিদের রমজান।
স্তব্ধ রশিদ বসে আছে পাথরচাপা বুকে ,
হেডমাষ্টার হেঁকে বলেন নসীব বলে একে।
কানাকড়ি ছিলনারে যার জীবনের দাম,
দশটি হাজার ক্ষতিপূরণ করবে রাজ্য দান।
রূপয় আমি চাইনা বাবু দাও ফিরিয়ে জান-
ডুকরে কাঁদে রশিদ-মিঞা -আয় ফিরে রমজান॥
রমজান কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। মিলনসাগরে
কবির পাতার জন্য, এই কবিতাটি কবি পাঠিয়েছিলেন ২০১৪ সালের
মার্চ মাসে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আধুনিক মাটি, আনবিক ব্যাধি ভরা,
জরার্জীন গাটি, আঁকা বাঁকা শিরা,
কালেরে লন্ডভন্ড, করেছে এ কি কান্ড
কঙ্কাল করেছে মানুষ,
ভাল ছিল গান্ডীব ধণুষ ।
আত্মীয় কাকে বলি, আত্মা নেই আর ।
আছে শুধু বুভুক্ষুর আর্ত হাহাকার ।
অরে মহাকাল তোর ললুপ রসনা
ফেলে রেখে গেছে কেন জীর্ন বাসনা !
চিতা জ্বলে দূরে আমি সমুখে দাঁড়ায়ে,
চেয়ে চেয়ে দেখি বিশ্ব কি ভাবে হাড়ায়
দয়া, মায়া, ক্ষমা , প্রেম, বিশ্বাস সততা,
দূষণে ঘিরেছে প্রাণ, শুধু চাই যে ক্ষমতা ।
মার, কাটো , শেষ কর, কর বলাতকার ,
কন্যাসম ! তাতে বল যায় আসে কার !
মিথ্যা বোঝার ভার নিয়ে দেহ ঘিরে
নগ্ন অন্তরে দেখ পশু বাস করে ।
ফিরে নাও ফিরে নাও ফিরে নাও এরে,
অট্টহাস্য বিদ্রূপের আছে শুধু ঘিরে ।
বিচার কে করে, কাকে নালিশ বা করে,
পশুর অধম জীব পুলিশের ঘরে ।
এই যদি সভ্যতা, চাই না তা আর,
টেনে আন পথে ওকে
চাই অসভ্য বিচার॥
চাই অসভ্য বিচার কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। মিলনসাগরে
কবির পাতার জন্য, এই কবিতাটি কবি পাঠিয়েছিলেন ২০১৪ সালের মার্চ মাসে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আকাশ নীল আর নেই,
তাকে ঘিরে আছে ধুসর
ধুলো আর ধোঁয়া,
কবি,
তোমার সোনালী ধানের শিষে
বিষাক্ত হাতের ছোঁয়া
কেড়ে নেয় কৃষকের প্রাণ!
মাঠের সবুজে কেউ আগুন দিয়েছে
সে আগুন জ্বলে তার পেটে,
হাল -চাষি কার খোঁজে শহরে গিয়েছে,
সে যে ভুলে গেছে রসদের খোঁজে হেঁটে
শস্যের ঘ্রাণ
আকাশ নীল আর নেই
কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)।
মিলনসাগরে কবির পাতার জন্য, এই কবিতাটি কবি পাঠিয়েছিলেন ২০১৪ সালের মার্চ মাসে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ফুটপাথে মানুষের বসতি দেখেও
না দেখেই চলে যাই, চলে যাও তুমিও
নিজেদের সাজানো সংসারে।
কারণ আমরা তো কেউ বুদ্ধ নই ।
তবু হৃদয়ের তন্ত্রীতে শির শিরে ব্যথা,
তবু বুকে সমুদ্র-মন্থন শেষে
যে গরল উঠে আসে,
সে কালিতে মূর্ত হয় তোমার কবিতা।
আর আমি সে কাজলে দু-চোখ সাজাই।
তোমার লেখনী বেয়ে পত্রিকায় উঠে আসে
দরিদ্র পরিবার ।
আর তুমি জায়গা করে নাও
পাঠকের হৃদয় মন্দিরে ।
আমরা কেউ বুদ্ধ নই
কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)।
মিলনসাগরে কবির পাতার জন্য, এই কবিতাটি কবি পাঠিয়েছিলেন ২০১৪ সালের মার্চ মাসে।
আমার দু-চোখে কেন জল ছল ছল,
আমার বুকের মাঝে নীল বিষ ব্যথা।
ফুটপাথে সংসার আমিও দেখেছি,
তবু কেন কবিতায় লিখিনি সে কথা।
এতদিনে শীতরাতে, গনগনে রোদে,
কুঁকড়ে, ঝলসে গেছে,
দু-চারটে জীবন।
কে তাদের নিয়ে ভাবে।
তুমি আছে তোমার কাব্য জগতে ,
আমি মরি ঈর্ষায় ডুবে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এখনো আছিস তুই এখনো আছিস
এক টুকরো আলো হয়ে অন্ধকার এ মিশে
যে কালে যে দেশে
মন্দির এ মসজিদ এ কাশী বা মেক্কায়
মরেনি মানুষ .
সে কাল সে দেশ থেকে ছেরেনি বন্ধন
যত খুন যত মৃত্যু যত অহংকার
আকাশ বাতাস ভরা যত হাহাকার
যত রক্ত লাল
শিরায় শিরায় নাচে
তারও চেয়ে শক্তিময়ী
এক বিন্দু বিশ্বাস
ধরেছে নিশ্বাস
ঘৃনা তাকে পারবেনা ছুঁতে . . .
বিশ্বাস
কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)।
মিলনসাগরে কবির পাতার জন্য, এই কবিতাটি কবি পাঠিয়েছিলেন ২০১৪ সালের মার্চ মাসে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আমি উদ্ভিদ, সবুজ শ্যামলা ঘাস
আদিগন্ত ছেয়ে থাকি
আমার বুকের পরে
কচি কচি ঘাস ফুল মাথা তুলে চায়
আকাশে তাকায়
আমি মহীরুহ হয়ে মাটি কামড়ে থাকি
আম জাম বট ফলে ডাল পালা ঢাকি
বেল যুই গোলাপের গাছে
প্রাণ পেতে রাখি
আমি প্রকৃতির দান
আমি তোমাদের কন্যা সন্তান
চারি দিকে কান পেতে শোনো
প্রকিতি বলছে ডেকে
সবুজ বাঁচাও
সবুজ ধংশ শেষ হলে
পৃথিবীটা অগ্নি গর্ভে যাবে চলে -
তোমরা কি চাও !
আমি তোমাদের কন্যা সন্তান। আমাকে বাঁচাও।
আমাকে বাঁচাও
কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)।
মিলনসাগরে কবির পাতার জন্য, এই কবিতাটি কবি পাঠিয়েছিলেন ২০১৪ সালের মার্চ মাসে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
বাবু আমার মস্ত বড়োলোক,
অনেক বাড়ি গাড়ি;
গিন্নিমা তো রোজই পরেন
নতুন দামি সারি ।
আলমারিটা ঠাসা থাকে
সারি আর গয়নাতে;
ঠাকুর জানেন আমার মনে
লোভ জাগেনা তাতে।
এসব নিয়ে... কি করব আমি!
বাপ মা হারা মূর্খ ছোটো জাত,
বরটা আমার মাতাল বদ্জাত।
ভাত দেয় না
কিল মারার গোঁসাই।
ভাতের খিদেকাজ করে মেটাই।
এক সকালে খবর এল ,
আমার বরের নাকি জ্বর!
লিখল আমার মানুষ,
লক্ষ্মী ফিরে এস সত্বর।
মরার আগে ক্ষমা চাইব গো বৌ!
প্রাণ মন জুরে নোনা জলভাঙ্গা ঢেউ!
করুনা করো কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। এই কবিতাটি মিলনসাগরের “করোনা ভাইরাস ও
পরিযায়ী শ্রমিকের দেয়ালিকায়” তোলা হয় ১৫.৪.২০২০ তারিখে। সেই পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
গিন্নি মায়ের পায়ে গিয়ে,
পড়লাম আমি কেঁদে!
কিছু টাকা দাও মাগো ,আমার
স্বামীর যে খুব জ্বর!
বাঁকা হাসি হেসে গিন্নিমা বলে,
সে কি! স্বামী আছে নাকি তোর ?
সবই তো জানো মা!
কাটা ঘায়ে কেন নুনের ছিটা দাও!
সেবা করে আমি সারিয়ে তুলব,
মাগো কিছু টাকা কডি দাও।
তোর টাকা নিয়ে দেশে পালাবার ফন্দি,
বুঝিনা ভাবিস তুই ।
করোনা ধরেছে বর তোর মরবেই।
তার চেয়ে কাজ কর মন দিয়ে
কাজ নেই দেশে গিয়ে।
এমন কথা বোলোনা মা গো,
দেশে আমি যাবই যাব,
মাইনা টা দাও হাতে।
এতো বছরের খাওয়া পরা,
কত খরচ হয়েছে জানিস!
বেতন আর বাকি কিছু নেই।
মাগো শুধু অভাবের তাডনায়,
এক হাতে আমি সামলেছি
যত কাজ!
রাঁধুনি, ধোপানি, বাসন মাজার ঝি,
দোকান বাজার ঝারা পোঁছা
আরো কত কাজ সংসারে
সবই তো করেছি!
খাওয়া পরা ছাড়া কিচ্ছুটি
পাব নাকি !
খুব বড গলা দেখি তোর!
আমি কি বুঝিনা টাকা করি
সোনা দানা,
লুকিয়ে পাঠাস দেশে,
চোর!!
পেয়ে যাব ঠিক ঝি আর চাকর,
আছে টাকা রোগে পাব ডাক্তার!
মাগো এতো করোনা অহংকার!
সাহস কতো ছোটোলোক কোথাকার,
ভাত ছড়ালে কাকের অভাব
হয়না জানিস কি তা।
দয়া করো মাগো থামো !
আজই যাব চলে,
টাকা ছাড়া শুধু কপাল ঠুকে !
এতো টা কঠিন প্রাণ!
হায় ভগবান,
কখোনো বুঝিনি তা ।
খালি হাতে
ফিরে
এক কাপডেতে যমের সাথে লড়ে,
ফেরালাম ঘরে,
ঘরের মানুষ
গৃহদেবতার বরে।
ঘর ছেড়ে আর যাসনি রে বৌ,
আজ থেকে আমি
করব রে কাজ
আমার ........ঘরের
লক্ষ্মী তুই ।
চোখের সামনে রামধণু।
আর জলে থৈ থৈ মন।
শহরে তে এক অজনা জ্বরে
ধনী দরীদ্র কত মানুষের গেল প্রাণ!
করোনা কোনো অসুখের নাম,
কখোনো শুনিনি আগে।
গিন্নিমা সেই করোনায় মৃত
শুনে তীর যেন বুকে লাগে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ছেলে আমার চাকরি পেয়েছিল,
ফুটপাথে বসে আছি তার অপেক্ষায়।
দূরে ঐ গাছের উপর শকুন বসেছে,
কি তীব্র ব্যাগ্রতায়।
দুদিন পাইনি দেখা,
কি জানি কেমন আছে একা একা,
আমার চোখের মনি, প্রাণের স্পন্দন।
দুরাত ফেরেনি ঘরে,
বসে আছি তার অপেক্ষায়।
ছেলে আমার বলেছিল,
মাগো তুমি চিন্তা কোরোনাকো,
ফিরে এসে খেয়ে নেব যা রেঁধেছ তাই।
জন্মদিনের পরে দুটো দিন চলে গেছে,
বসে আছি তার অপেক্ষায়।
আগুনে ঝলসান কালো মাংসের তাল,
প্লাসটিকে মুরে রেখেছিল কাছে,
সে নাকি আমার ছেলে।
এত দুঃখেও হাসি পায়।
তোমরা কি চোখের মাথা খেলে,
আমার খোকার ছবি এই দেখ,
ঠিক যেন দেবদুত হেসে চেয়ে আছে,
খোকা ওরে আয় কোলে আয়,
বসে আছি তোর অপেক্ষায়॥
স্টিফেন হাউস
কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কি বিশাল মৃত্যু যোগ্য করেছ আয়োজোন,
রামের নামে দিচ্ছ বলি আমাদের পরিজন।
শ্মশানে পুড়েছ দেহ শত শত,
জানিনা অপেক্ষায় আছে আর কত
শোকাকুল পরিবার।
চারি পাশে মরা পোড়া গন্ধ।
আর লাশের পাহাড়।
কিছু দূরে আকাশ জুড়ে শকুন ওড়ে,
গংগা বক্ষে লাশ।
নদীর পাড়ে আধ পোড়া কত মরা,
কুকুর মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে খায়। হায়,
দেশের করেছ এমন সর্বনাশ॥
মৃত্যু-মেলা
কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আজ আমার মন ভালো নেই,
কোথাও তোমার দেখা না পাই।
বুক টা খালি করে,
কোথায় গেলে চলে ;
এমন বড় দুঃসময়ে তোমার ছোঁয়া..
অনেক বড় পাওয়া।
রোদ বৃষ্টি ঝড়ে,
টুকরো হৃদয় ভাঙত যদি
নিতে আপন করে।
সুখ দুঃখের ঝর্না ধারায়
ভরিয়ে আমায়
দেখা দিতে নতুন কৰিতায়॥
আজ আমার মাটির মায়ের চরম দুঃসময়।
আকাশ আর ছোঁয় না মাটি,
ঢাকা আছে চিতার ধোঁয়ায়
তর্পন আজ করবো কোথায়,
মা গঙ্গা কোল পেতেছে শবের ধারা বয়
গন্ধ পুতিময়।
পচন ধরা রুদ্ধ শ্বাসে ভিক্ষা করি
আয় নেমে আয় বজ্র বেশে ত্রিশূলধারী
করে দে ছারখার ..এই অনাচার,
মর্তে নরক আনল যারা
ক্রোধানলে তাদের দগ্ধ কর॥
দেখা দে আজ নতুন মহীমায়॥
নতুন মহীমায় কবি সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
ভোটের মুখে নগর জুড়ে, বানতলা আর বানতলা,
---কে যে দোষী কে নির্দোষী, এই নিয়ে সব জটলা।
সি.পি.এম বলে কংগ্রেস, আর কংগ্রেস বলে সি.পি.এম
আসল দোষীর খোঁজ নাই, হায়রে পুলিশ, শেম্ শেম্।
"প্রফুল্ল সেন" বৃদ্ধ নেতা করলেন তিনি অনশন,
"জ্যোতি বাবু", বলেন তিনি "কতই ঘটে এমন ঘটন"।
যতই ঘটুক এ ঘটনা ; দাবি জনতার একটাই,
তদন্ত করে বিচার করে আসল দোষীর শাস্তি চাই।
তা যদি না পারে দিতে মহামান্য সরকার,
কি লাভ তবে ভোটে জিতে, মন্ত্রী হবার দরকার?
ঘটত যদি এ ঘটনা বড় বাবুদের পরিবারে,
থাকতেন কি এমন ভাবে উদাসীন হয়ে চুপ করে?
অতএব নেতাগন, শুনুন তবে জনতার বাণী,
সুষ্ঠভাবে করুন বিচার সুবিচারক আনি।
বানতলা
ভারতী ভট্টাচার্য (জন্ম ১৯৪৮)। রচনা ১৭ই জুন ১৯৯০, বেগুসরাই, বিহার।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জিভ উপড়ে নেওয়া হবে, হাত পা কেটে
ঠুঁটো জগন্নাথ
কোনো কথা নয়
অধিকার নিয়ে কোনো কথা নয়, কোনো
লেখাপত্তরও চলবে না
কলমের নিব্ বাঁকিয়ে ফ্যালো
না হ’লে
কলমের নিব্ তোমারই কণ্ঠনালীতে
ফুটিয়ে দেওয়া হবে
না, কোনো কথাবার্তা নয়
সেলাই করো, ঠোঁট দুটে সেলাই করে রাখো
বেঁচে থাকতে চাও স্বাধীন!
বন্দী কবি সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। রচনা জুন ১৯৭৫। ১৯৮০
সালে প্রকাশিত, কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “ব্রাত্য পদাবলী”
কাব্যসংকলনের কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
১
জেলখানা থেকে সুবীর লিখেছে ওর মাকে---
‘... তুমিই আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছো প্রথম। তোমাকে আর
কী লিখবো। জেলখানায় দাদাকে ওরা
পিটিয়ে মেরেছে, আমি জানি, তাতে একটুও ভেঙ্গে পড়োনি তুমি।
তুমিও জানো, আমিও
যে কোনো দিন
দাদা বা জেলের অন্যান্য নিহত শহিদের মৃত্যুর ভাগ
আমারও শরীরে আসতে পারে। তাতেই বা
কী এসে যায়। তুমিই আমাকে ছেলেবেলায়
একটা গপ্পো বলে আমায় শান্ত করতে। সেই গপ্পের নায়ক
আমাদের চাযীরা।
গল্পের চাষীদের ওপর জোতদারদের অত্যাচার
কোনোদিনও তাদের নির্বংশ ক'রে দিতে পারে নি ; এমন কি
কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও নয়। কোনো কোনো বছর
এক বিশেষ জাতের পোকা এসে সমস্ত সোনালী ধান
নষ্ট ক’রে দিতো, জোতদাররা লুঠ ক'রে নেয়ার
সুযোগ পাবার আগেই। কোনো কোনো সময়
এই কাণ্ড ঘটাতো অতিবৃষ্টি বা অন্যান্য দুর্যোগ।
তারপরেও কি চাষীরা শুকনোমুখে শুধু বসেই থাকতো? তারা
নতুন ক'রে ফসল ফলাতে লেগে যেতো।...
আমরা বেশ কিছু ভুল করেছি ঠিকই, আর তার খেশারত
আমরাই দিয়েছি সব চাইতে বেশী, আরো হয়তো দিতে হবে।
কয়েদখানার কবিতা কবি সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। অর্জুন চক্রবর্তী সম্পাদিত “রক্ত ঝরাতে পারিনাতো একা” (২০০৫) কাব্যসংকলন থেকে
নেওয়া।
কিন্তু মা
আমাদের মৃত্যুগুলোর মূল কথা এখানেই। আর এই সারকথা
প্রথমে তুমিই শিখিয়েছো আমাকে,
যে-কোনো মা
তাঁর সন্তানকে এই-ই শেখান।...
সুবীরের মায়ের পাঁচ আঙুলের ভেতর সেই চিঠি
হাজার-হাজার কপি হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে
সমস্ত মায়ের কাছে।
সুবীরের বাবা শক্তমুখে চেয়ে আছেন আকাশের দিকে।
২.
বনশ্রী কমলকে লিখেছে জেলখানা থেকে---
‘...কয়েকদিন ধরে বেশ নাকিকান্না দেখতে পাচ্ছি কিছু কিছু
খবরের কাগজে। যেন পুলিশের অত্যাচারে আমাদের আর
কিছু অবশিষ্ট নেই। এদের অবস্থা সত্যিই
খুব খারাপ। ভাবছে,
চিরকালীন মিথ্যে প্রচারে ওরা দেশের মানুষকে
হাঁদা বানিয়ে রাখতে পারবে। ভাবছে,
‘যে-কোনো রকম অপমানজনক শর্তে
আমরা জেল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বড়োই ব্যাকুল---’
ওদের এই মিথ্যে প্রচারে
জেলের বাইরে লোকজন ধাঁধাঁয় পড়ে যাবে!
মূর্খগুলোও জেনে গেছে : আমরা বেশীদিন আর
জেলের ভেতরে থাকছি না।
খুব ক্ষেপে উঠেছে সেইজন্যে।
ওদের ক্ষেপে ওঠার ক্ষমতা গত চার পাঁচ বছরে
দেখলাম অনেকবারেই। তাতে আমাদের বিন্দুমাত্র
এসে যায় নি, এটা বুঝতে পেরে
ওরা আরো ভড়কে গেছে।
বিমলকে যেদিন ওরা জেলের ভেতর পিটিয়ে মারলো, আর
ওর বিকৃত লাশটা নিয়ে আমার সামনে ফেলে রাখলো কয়েক মিনিট
আমি সেদিন মাত্র একটি বারের জন্যে বিমলের দিকে তাকিয়ে
উবু হয়ে বসে চুমু খেয়েছি ওর মুখে। তারপর ওদের দিকে
কিছুক্ষণ চেয়েছিলাম, আমার মুখের দিকে চাইবার সাহস
করে নি ওদের কেউ আর।
ওরা ভয় পেয়েছে, ভীষণ। ওদের ভয় কেটে যাবার
কোনো সম্ভাবনা নেই আর।...'
কমলের আধ ময়লা পাঞ্জাবীর হাজার হাজার পকেটে সেই চিঠি
লেপ্টে আছে সর্বক্ষণ।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
এই আমি ধরে রাখছি তোর হাতের ওপর
তোর ঘন নিশ্বাসে এই তপ্ত মুখ এ-মুল্লুক থেকে সে-মুল্লুক
ছুটে ছুটে হয়রান মাথা রাখে শ্রান্ত কপালে তোর
ঘুমের দেশের ভিতর শতরঞ্জ দৃশ্য দেখে---
এই দ্যাখ এক এক ক’রে মুছে যাচ্ছে তোর সমস্ত নীল স্বপ্ন
জেলখানায় পিটিয়ে মারা লাশ দেখে তোর ঘুরে যাচ্ছে মাথা
বেয়নেটের খোঁচায় তোর মাটি, তোর রত্নগর্ভা মাটি হয়ে যাচ্ছে পর্যুদস্ত
আকাশের হাজার চাঁদ তাক্ করে উঁচিয়ে আছে বন্দুকের নল
তুই ডাইনে ফিরতে পারিস না, বাঁয়ে না, এমন কি ঊর্ধ্বমুখ হওয়াও
নিষিদ্ধ
তোকে পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে নতমুখে।
তোর বুকের ওপর প্রতিবাদ মিছিল
মিছিলে প্রতিবাদ, তাই নিহত যুবক
এমন কি সন্তানের নিহত শরীরও ফিরে পায় না জননী
ফিরে আসে, শূন্য হাতে ফিরে ফিরে আসে . . .
আর স্বাধীন দেশের মহান শান্তি রক্ষায় অবিচল
কর্মনিষ্ঠ পুলিশের পোশাক-আষাক।
তুমি আমার মাটি, আমার জননী, মুখ থুবড়া পড়ে আছো।
তুমি আমার মাটি, আমার জননী কবি সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)।
কবির নিজের সম্পাদিত “স্পন্দন পত্রিকা (১৯৭৪) তে প্রথম প্রকাশ। পুলক চন্দ সম্পাদিত “রক্তে ভাসে
স্বদেশ সময়” (১৯৭৭) কাব্যসংকলনে পরে প্রকাশিত হয়।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
চার দেওয়ালের ভেতর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে সেই শরীর
আমরা যাদের জানি না---
চার দেওয়ালের ভেতর কেউ আদিমন্ত্র উচ্চারণ করে?
আমরা তাও জানিনা।
এই বাইরের লোক, আমরা
কোনো দেওয়ালেই আটকে থাকতে পারি না
সেই জন্যেই আজকাল ঠিকঠাক চুপচাপ থাকি
আর চুপচাপ থাকা শুনি ভালো, যেমন জ্যেষ্ঠেরা বলেন।
অথবা সমস্ত শরীর নিয়ে টলায়মান খানাখন্দে শুয়ে থাকি
এইভাবে খানাখন্দে পড়ে থাকা অবশ্য খুব খারাপ---
যেমন জ্যেষ্ঠেরা বলেন।
আর আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস ঠিক চলে যায় কোনো না কোনো
দেওয়ালের ভেতর
চলে গিয়ে মাঝে মাঝে ফিরে আসে কারো কারো বুকের কাছে
কারো কারো মুখের কাছেও
তখনই আরম্ভ হয়হৈ চা, পরিষ্কার রক্তপাত, আরেকটি গাথা।
জেলখানার প্রভাবে কবি সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। রচনা এপ্রিল ১৯৭৬। কবি
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “ব্রাত্য পদাবলী” (১৯৮০) কাব্যসংকলনে প্রকাশিত।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
জেলখানার দেশ
হাতে তোমার পাথর বেড়ী, পায়ে তোমার . . .
আমার পায়েও, আমার হাতেও . . .
কী উল্লাসে ঘুরে বেড়ায় সশস্ত্র পোশাক
বিন্দু দিয়ে গড়া, রক্ত বিন্দু
কার ?
জেলখানার দেশ
. জেলের ভেতরে মানুষ
জেলের ভেতরে জেল
. তার ভেতরে মানুষ
জেলের ভেতরে খুন
. গারদ ভাঙার শব্দ
জেলের ভেতরে জেল, তার ভেতরে খুন
. গারদ ভাঙার শব্দ
গারদ ভাঙার শব্দ চতুর্দিকে।
জেলখানার দেশে কবি সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। “লক্ষ চোখের সামনে”
(১৯৭৩) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। পুলক চন্দ সম্পাদিত “রক্তে ভাসে স্বদেশ সময়” (১৯৭৭) কাব্যসংকলনে
পরে প্রকাশিত হয়।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
. ১
কি যে ছিল মনে মনে নিজে সে কি জানতো?
ছিল না কিছুই মান তবু সবে মানতো
. একদিন ঝোপ বুঝে যেই
. দিল কোপ, এমনি সবেই
দিল ঝাড়, সেই থেকে বসে বসে কাঁদতো॥
. ২
দেশে এত বেকার কেন?---যেই না বলা অমনি দ্যেখে
চতুর্দিকে ফিসফিসানি, ‘এসব কথা বলিস কাকে ?
. ধরবে যখন পুলিস বাবু
. মরবি তখন foolish বাবু
দ্যাখ না দেখি চালাক মানুষ সবাই কেমন চুপটি থাকে?’
. ৩
চুপটি থাকা চালাক-বাবু হঠাৎ দেখি চোঁচা দৌড়
থামলে গিয়ে হাঁফ ছেড়ে সে সামনে যখন দেখল গৌড়
. ‘কি হয়েছে ?’ যেই না তাকে বলা
. ---‘আমাদের ওই পুলিস বাবুর চেলা
চুপটি থাকায় সন্দ করে, তাই দিয়েছি সোজা দৌড়।’
ছড়া কিছু আজগুবি : ভূমিকা
কবি সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। রচনা ১৯৭১। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “ব্রাত্য পদাবলী” (১৯৮০)
কাব্যসংকলনে প্রকাশিত।
. ৪
ভাবছি তো বসে বসে চেঁচানোটা মুশকিল
এখন তো আরও দেখি চুপচাপ ঘরে খিল
. দিয়ে বসে আর কোনো লাভ নেই
. খুব বেশী চুপচাপ দেখলেই
দরজা জানলা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে মারে কিল।
. ৫
‘সুতরাং, চুপ থেকে লাভ নেই
বেশী চেঁচানোর সাথে ভাব নেই।’
. এই বলে বোকাদের রাজা
. বলে আরো, ‘দামামাটা বাজা
যুদ্ধটুদ্ধ ছাড়া জান দিয়ে লাভ নেই।’
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
মানুষ মানুষকে ভালোবাসছে
আমি তোমাকে ভালোবাসছি
---এই বিষয় নিয়ে গড়ে-ওঠা কবিতার শরীর
সর্বসময়েই আক্রান্ত হয়। কবিতার নিরাপত্তা চাই, ঝড়-জল লঙ্জার
হাত থেকে বাঁচার-জন্যে পোশাক চাই, আশ্রয় চাই। সেজন্যেই
ভালোবাসার এই কবিতায় পরাতে হয় সামাজিক পোশাক, আশ্রয়
সেজন্যেই এই ভালোবাসার কবিতায় পরাতে হয় রাজনৈতিক চেতনা
আশ্রয়---
সামাজিক জ্ঞান, যা মানুষের বেঁচে থাকার শর্ত---
শরীরমন জিইয়ে রাখতে গেলে
খাবার দরকার খাবার চাই
পোশাক দরকার পোশাক চাই
ঘরবাড়ী দরকার ধরবাড়ী চাই
সুশিক্ষা দরকার সুশিক্ষা চাই
হ্যাঁ, এসব চাই। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে যে-কোনো
মতামত রাখার সুযোগ চাই।
এতএব, সত্যিকারের গণতন্ত্র চাই
তাই
যারা গণতন্ত্রের গান গেয়ে জেলে পোরে অন্যমতের মানুষকে
এই কবিতা তাদের ক্ষমা করছে না।
ভালোবাসার কবিতা কবি সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৪৮)। ২০১১ সালে প্রকাশিত, সব্যসাচী গোস্বামী সম্পাদিত "শেকল ভাঙার
কবিতা" কবিতা সংকলন গ্রন্থের কবিতা। গ্রন্থটির প্রকাশক "বন্দীবার্তা" পত্রিকার পক্ষ থেকে শুক্লা ভৌমিক, কলকাতা।
(১৯শে এপ্রিল, ১৯৭৭, কলকাতায় সারাদিন ধরে 'বন্দীমুক্তি দাবী-দিবস'-এর কর্মসূচী পালন করতে করতে পথচারীদের কাছ থেকে বন্দীমুক্তির দাবীর সমর্থনে গণস্বাক্ষর-সংগ্রহকালীন
রচিত এই কবিতাটি ওই দিন সন্ধ্যাবেলায় দক্ষিণ কলকাতায় বিভিন্ন পথসভায় পাঠ করা হয়। সন্ধ্যাকালীন গণস্বাক্ষর অভিযান চালাতে চালাতে একটি সাংস্কৃতিক মিছিল দক্ষিণ
কলকাতা পরিক্রমা কারার সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে কিছুক্ষণ থেমে পথসভা করে। সেই পথসভাগুলিতে বন্দীমুক্তির দাবীতে বক্তব্য রাখা হয় এবং ওই দাবীর ভিত্তিতে রচিত বেশ কিছু
কবিতা পাঠ করা হয়। বর্তমান কবিতাটি পাঠ করার সময়ে এই কয়টি কথা মনে রাখা ভালো।)
যারা গণতন্ত্রের গান গেয়ে নতুন রাজনৈতিক সরকার
তৈরী করে, অথচ নিজেদের দলের লোকজনদের ওপর থেকে গ্রেপ্তারী
পরোয়ানা
তুলে নেয়, নিজেদের দলের লোকজনদের শর্তহীনভাবে জেলের বাইরে
নিয়ে আসে, কিন্তু আন্যদলের লোকদের বিভিন্ন অজুহাতে জেলে আটকে রাথে,
কিংবা অন্যদলের বন্দীলোকজনদের ছেড়ে দেয়ার শর্ত হিসাবে নিজেদের
রাজনৈতিক
আদর্শ মেনে নিতে বলে
এই কবিতা সেইসব ঘৃণ্য, সংকীর্ণ ব্যক্তিদের এবং তাদের কাজকে ক্ষমা
করছেনা
কেননা, এই কবিতা দাঁড়িয়ে আছে প্রশস্ত ভালোবাসার বোধের ওপরে।
শুধুমাত্র “রাষ্ট্রীয় জরুরী অবস্থা”র বর্বরতার বিরুদ্ধে
এই কবিতা রায় দেয় নি
“জরুরী অবস্থা”র আগেকার বর্বরতার বিরুদ্ধেও
এই কবিতা রায় দিয়েছে।
যে-কোনো বর্বরতার বিরুদ্ধে আর রাজনৈতিক বন্দীরাখার অপকৌশলের বিরুদ্ধে
এই কবিতা
মানুষের ভালোবাসার হাত জড়ো ক’রে প্রতিধ্বনি তুলছে আকাশে বাতাসে---
আসলে রাজনৈতিক কারণে ধৃত যে-কোনো বন্দীর নিঃশর্ত মুক্তি চাই
সমস্ত রকমের বর্বরতার অবসান চাই।
এটা কি রাজনৈতিক কবিতা? হ্যাঁ, তাই।
এটা কি সামাজিক বোধের কবিতা? হ্যা, তাও।
তবু এটা ব্যক্তিগত ভালোবাসার কবিতা? হ্যাঁ, তবু।
পথসভায় কবিতা পাঠ করতে করতে, শুনতে শুনতে
পথসভায় বন্দী মুক্তির দাবীর গান করতে করতে, শুনতে শুনতে
মাঝে-মাবেই উত্তেজিত হয়ে উঠছে এই কবিতা
কেননা, উত্তেজনার যথেষ্ট কারণ আছে, কেননা আমার
ভাইকে ছাড়া হচ্ছে না, বোনকেও নয়, বন্ধুকেও নয়
প্রেমিকাকে নয়-স্ত্রীকে নয়
মা বাবাকেও না
সবাইকেই অন্ধকূপে আটকে রেখে জঘন্য অত্যাচার
চালাচ্ছে অমানুষিক মেনিমুখো অহিংসামাথা সহিংস চক্রাস্ত।
এরপরেও এই কবিতার আর উত্তেজনাহীন থাকার ক্ষমতা নেই।
কিন্তু সে পরম উত্তেজনার যে-কোন রূপ প্রকাশ করতে রাজী নয়
কারণ সে জানে, তাতে উস্কানিদেয়া গুপ্তচরেরাই লাভবান হয় বেশী
তাতে এই কবিতাই আহত হয়, বন্দী হয়, এমন কি মৃত্যুমুখেও যেতে পারে
এবং
সমস্ত বন্দীমুক্তির দাবীর আন্দোলনও বন্দী হয়ে যেতে পারে।
এই ভালোবাসার কবিতা ক্রমশই পোড়-খাওয়া যুবক হয়ে উঠছে বন্দীমুক্তি
আন্দোলনের ভেতর
আজ সকালবেলার ভেতরেই বন্দীমুক্তির দাবীতে
এই কবিতা কলকাতা শহরে সংগ্রহ করেছে ত্রিশ হাজার
গণস্বাক্ষর, টিপ্ সই
আর কয়েকঘন্টার ভেতরে সে সংগ্রহ করবে আরো কয়েক হাজার অন্তত।
আসলে রাজনৈতিক কারণে ধৃত বন্দীরা নিঃশর্তভাবে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত
এই কবিতা ক্রমাগত আরো শক্ত হয়ে উঠবে
এই কবিতা জন্ম দিচ্ছে আরো অনেক বন্দীমুক্তি দাবীর কবিতার
পথসভার এই কবিতা জন্ম দেবে আরও অনেক কবিতার পথসভার
সেই মিছিল মুক্ত ক'রে আনবে সমস্ত জেলখানায় বন্দী
মানুষের ভালোবাসার মানুষকে
মুক্ত করবে মানুষের ভালোবাসার কবিতা
মানুষের ভালোবাসার কবিতা।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
And by the power of a word I start my life again
I was born to know you
To name you Liberty. - Paul Eluard
ভিখারীর বুকে পা রেখে রাণী হবার আহ্লাদ
প্রাসাদে দরবারে সভাসমিতিতে টবে টবে ফুটে ওঠা
মৌসুমী মন্ত্রী হবার সাধ
ছ’'লক্ষ পোষা জহ্লাদ
আর ঐসব জেলখানার প্রতিদিন একফুট একফুট ক'রে উঁচু হওয়া
লম্বা টানা পাঁচিল উল্টিয়ে তছনছ ক'রে
ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছি এই কবিতায়---
হাত দাও---মানুষের তপ্ত পরশ পাবে হরফে হরফে
লাইনে লাইনে মানুষের জ্বলে-ওঠা নিশ্বাস ক্রোধ
কান পাতো-লিঞ্চড্ নিগ্রোর চিৎকারে ভিয়েৎনামীদের বিজয় উল্লাসে
গ্রামগঞ্জের পোড়-খাওয়া চাষীদের দীর্ঘ মিছিলের নিশ্বাসে
আর যেভাবে শব্দ উঠে আসে ধর্মঘটী মজুরের বুক ফেটে
সেভাবে দশদিক বধির ক'রে দেবে সব ক’টা অক্ষর
আমি এই কবিতাকে মুহূর্তের জন্যেও থামতে দেবনা দাঁড়ি ও কমায়
যেভাবে দেশময় শোষিত মানুষের প্রতিবাদ ছুটে যায়
একটুও না থেকে না বিশ্রাম ক'রে
এক শহর থেকে এক গ্রামে এক গ্রাম থেকে অন্য থামে
যেভাবে এক শতাব্দী থেকে অন্য এক শতাব্দীর ধ্বনিত আহ্বানে
আমাকে সনাক্ত করো বিদ্রোহী নামে কবি অতনু চট্টোপাধ্যায় (জন্মকাল অজ্ঞাত)। প্রথম প্রকাশ “নক্ষত্রের রোদ”
পত্রিকার নভেম্বর ১৯৭৩ সংখ্যায়। ২০১১ সালে প্রকাশিত, সব্যসাচী গোস্বামী সম্পাদিত "শেকল ভাঙার কবিতা" কবিতা সংকলন গ্রন্থের
কবিতা। গ্রন্থটির প্রকাশক "বন্দীবার্তা" পত্রিকার পক্ষ থেকে শুক্লা ভৌমিক, কলকাতা।
এক দেশ থেকে অন্য দেশে অক্লান্ত প্রতিরোধ ছুটে আসে
আর যেভাবে হে-মার্কেট খেকে নিহত মজুরের সার্ট
হাতে হাতে পতাকা হয়ে ছুটে যায়
আমি ঠিক এভাবে এই কবিতাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাবো
শব্দের গ্রেনেডে উড়িয়ে দেবো ওই কবিতার শিরোনাম---
আমি মার খেয়ে পড়ে যাওয়া মানুষকে
হাঁটুতে ভর রেখে পুনশ্চ উঠে যেতে দেখেছি বলে
এই কবিতায় দু হাতে দু হাঁটুতে ধুলোর দাগ রেখে দেবো
চামড়ার উপরে সোনালী রেখায় আগামী দেশের মানচিত্রে
গ্রাম নদীরেখা পাহাড়ের ভ্রুলেখা কাঁপতে দেখেছি বলে
এই কবিতায় শহীদের করতলের ছাপ তুলে নেবো
আমি নিহত মৃত নিখোঁজ মানুষকে
প্রিয়জনদের বুক কাঁপিয়ে দিয়ে ফিরতে দেখেছি বলো
এই কবিতায় হারানো মানুষদের পদশব্দ ধবনিত হতে দেবো
পেশী ফুলে ওঠে ছেঁড়া কামিজের নীচে---
ভূখা পেটের সমস্ত ব্যথা আবার দুলে ওঠে
এই কবিতার কোমরে খাপে ঝুলে থাকে তোমাদের পরিচিত তরবারি
চুপ ক'রে থাকে শেষতম ইঙ্গিতের প্রতীক্ষায়
কিছুই নেই যা থাকতে পারে পথে পথে চিরন্তন বাধার
দাঁতে নখ কাটে তোর পাহারাদার রাণী তোর প্রতিদিনকার আহ্লাদ
তোর পোষা মন্ত্রীদের ফুল হয়ে উঠবার সাধ
বেশ ক'রে ঝালিয়ে নে
আমাদের প্রতিহিংসার চারধারে তোর পাহারা পরিখা জেলখানার
ফুটোফাটাগুলো বেশ ক'রে মেরামত ক'রে নে
আমি তোর এই সবের পাশাপাশি দুঃখের ধারালো আলিপন গেঁথে
আটকে রাখছি যাবতীয় প্রতিবাদ
আটকে রাখছি তোকে দেখে অসভ্য মানুষের হাসাহাসি টিটকারী
আর মানুষের সংগঠিত হবার নিয়ম কানুন---প্রতিজ্ঞাবদ্ধ পায়চারী
গ্রিল দেওয়া লম্বা বারান্দায় হাঁটতে থাকুক
তোদের সুরক্ষিত নিষ্ফল আক্রোশ
আমাদের ঢের বেশি দোষ হোক অপরাধ ক'রে যাই ঢের বেশি
ঢের বেশি অন্যায় রণে আমাদের ঢের বেশি দোষ হোক
পুরানো করোটিতে তোর রাজমুকুট পরার স্পর্ধা আরো বেশি ক'রে
গ্রিল দেওয়া লম্বা বারান্দায় থাবা থেকে চাটতে থাকুক
হাত পিছলে পালানো মানুষের রক্ত ও লবণাক্ত স্মৃতি
আমি যথারীতি দেখে যাই রেখে যাই---
দ্বিগুণ জোরে বন্ধ দরজায় চাপ দিচ্ছে মানুষ
তার দশ আঙুলের রাগ এই কবিতায়
দ্বিগুণ জোরে শক্ত হাতকড়ি ভেঙ্গে ফেলেছে মানুষ
ভাঙ্গার মট্ মট্ শব্দ এই কবিতায়
আড়াআড়ি শিকলের প্যাঁচ কেটে ফেলে তার ডোরাকাটা স্মৃতি পিঠে
বুকে নিয়ে
আরো বেশি ক'রে ভয়ঙ্কর হিংস্র হয়ে ওঠে সবক’টা ইমেজ
প্রতিদিন চাষীকে ভিখারী বানানো
মজুরকে “হুজুর” বলিয়ে ফুটপাতে শোয়ানো
প্রতিদিন কালো ভ্যান ছোটানো পাড়ায় পাড়ায়
আর প্রতিরাতে---
“জানো আমি দুর্ভিক্ষ দেখে কেঁদে উঠি খরা দেখে ঘরা ঘরা অশ্রু ঢালি
আমি তৃষ্ণার্ত মানুষের ছটফট করা দেখে বারবার জমকালো প্রতিজ্ঞায় বলে উঠি
ছুটি আজ তোর ছুটি---আগামী জন্মে শোনাবো মুঠি খুলে
জলের সমস্ত করতালি”
আমি তোদের এই সবের কাছাকাছি আবারও এই কবিতার ভিতরে রাখি---
তৃষ্ণার্ত মানুষেরা ফাটিয়ে চৌচির ক'রে যায় জমানো জলের ট্যাঙ্ক
দুর্ভিক্ষের ভেতরে থেকে বাদামী কঙ্কাল উঠে এসে
লুটে খায় লুকানো চালের গুদাম
ময়লা নীল লুঙ্গি থেকে একফালি ছিড়ে নিয়ে
আহতকে ব্যান্ডেজ বেঁধে এই কবিতায় গ্রামীণ শুশ্রুষা
নিহতকে কোলে রেখে শহীদ-স্তম্ভের মতো স্পর্ধায় মাথা তোলে
ভাঙ্গার দেবতার কাছে মানুষের শেষতম প্রার্থনা বর চায়
পাহাড় ফাটিয়ে পথ ক'রে নেবার মতো সমর্থ শক্ত দুটি হাত
ভূলুষ্ঠিত প্রতিবাদগুলিও জটিল শেকড় ছড়ায় কথামতো গ্রাম ও আধা-শহরে
ডাক ওঠে---ঘরে ঘরে ফিরে এসো শহীদ আজ পুনর্বার জেগে ওঠ।
দেয়ালে দেয়ালে মুছে-ফেলা শব্দগুলো স্পষ্ট হয়ে ফোটো
এই কবিতার শব্দগুলোর মাঝখানের একরত্তি শূন্যতা তুমিও ভরে ওঠো
আলকাতরায় লেখা ঘৃণার উচ্চারণে
“বদলা চাই বদলা নিতে জেগে ওঠো"
লম্বা প্রিজন্ ভ্যানে দেয়ালে কাঁটাতারে সংবিধানে আইনে বেআইনে ঘেরা
সব ক’টা জেলখানা ভেঙ্গে পালিয়ে এসেছি এই কবিতার প্রতিবাদে
আমাকে সনাক্ত করো বিদ্রোহী নামে পুনশ্চ হুলিয়া বার করো
পুনরুত্থিত জাগরণে আমাকে দেখে ভীত হোক
রাণী-জহ্লাদ-মৌসুমী মন্ত্রীদের বাসনার আস্বাদ
সনাক্ত কর রাণী প্রতিটি হরফের ছিটকানি
ছুঁয়ে আছে মানুষের মুক্তি-খোঁজা রোগা রোগা হাতের একরোখা ভালোবাসা
আমি এই কবিতাকে কোনওদিন কাঁদতে দেবো না মানুষের দুঃখের কাঁধ ছুঁয়ে
আমি তাকে শেখাবো পুনর্বার ফুঁসে উঠবার নতুন উপক্রমণিকা
এই কবিতার মাটি খুঁড়ে গুপ্তধনের মতো নিহত যুবকের
সযত্নে লুকানো ইস্তাহার বার ক'রে এই পুনশ্চ বিলোচ্ছি ঘরে দোরে
হাতে হাতে গুঁজে দিচ্ছি “ভেতর ও বাহিরের জেলখানা ভেঙ্গে ফেলো একসাথে”
এই কবিতাকে সব শেষে আমি রেখে দিয়ে আসবো শস্যহীন মাঠে
ধানের চারার মতো
সস্তা পাটের শাড়ির মতো একে শুকাতে দেবো বস্ত্রহীন গেরস্তের আঙিনায়
আমাকে তবু সনাক্ত করো নিহত শহীদ পলাতক বিদ্রোহী নামে
আমি ভাঙ্গার দেবতার কাছে প্রার্থনায় দীর্ঘ গানে
দু মুঠো উপছানো শক্তি চেয়ে নিয়ে
সব ক’টা জেলখানা ফাটিয়ে চলে এসেছি এই কবিতার ত্রাণে...
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
কবি দ্রাণাচার্য ঘোষকে মনে রেখে।
I go to my death and O my friends you will know the reason why--- Louis Aragon
রক্তমাখা দ্রোণফুল পড়ে আছে ঘাতকের থাবার তলায়
. ওই ফুল একদিন ফুটেছিল জ্যোত্স্নায়, কবিতায়
. তাহার মায়ের স্নেহের ছায়ায়।
থই থই সুখের ভীষণ ভেতরে বাংলো বাড়ি
. বাংলো বাড়ির ভেতরে সোফাসেট
. সোফাসেটে ঘুমন্ত বুলডগ।
আর ওই মহার্ঘ কুকুর যেখানে পেচ্ছাব করে
. সেখানে নয়ন-শোভা লন, সুরম্য উদ্যান . . .
সমাজের এরকম বমি-ওথলানো ঘিন ঘিন ছবি দেখেছিল দ্রোণ।
দ্রোণ ফুল কবি সনৎ দাশগুপ্ত (জন্মকাল অজ্ঞাত)। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, “ইস্পাতের পাতে মরচে ধরে না” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
আমরা পেয়েছি ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত, পুলক চন্দ সম্পাদিত “রক্তে ভাসে স্বদেশ সময়” কাব্যসংকলন থেকে। কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ,
নকশালবাড়ী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং পুলিস কাস্টডিতেই গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়।
সরকার পক্ষের থেকে রটনা করা হয় যে জেল পালানোর সময় তাঁকে গুলি করে মারা হয়েছিল।
তাই গ্রাম থেকে গ্রামে ক্ষুধায় ক্ষুধায়
. ভূমিহীনের জ্বলন্ত হাঁসুয়ায় যখন হাড়ের টঙ্কার
. ক্রোধের বিস্ফার,
তখন দু’হাতে ঝড়ের আকাশ ক’রে তপ্ত লালা চরাচর জুড়ে
ওই ক্রোধ ছুঁয়েছিল দ্রোণ : সন্মের মাটিতে জানু পেতে বসে
সমস্ত শৌখীন কবিতাবলির ধূসর পাণ্ডুলিপি ছিঁড়ে
শিশুর মুখের দুধের গন্ধের মতো পবিত্র গলায় বলেছিল দ্রোণ :
এ মাটি আমার, এ মানুষ আমার---
. গ্রাম থেকে গ্রামে
. ধ্বনি থেকে প্রতিধ্বনি, আমার আমার।
রক্তমাখা দ্রোণফুল এখন রক্ত পতাকা হয়ে উড়ছে হাওয়ায়
জেলের টাওয়ার ছাড়িয়ে অনেক উঁচুতে মেঘের চূড়োয়।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
আজ ২৫শে ডিসেম্বর,
কলকাতায় বড়দিন।
ওই বিখ্যাত পার্ক স্টীট জুড়ে আজ কারা যেন আলোর ইন্দ্রজালে
স্বর্গ বানিয়েছে
বিশাল বাশাল কেকের চারপাশে আজ কারা নাকি জীবনের
. সব দুঃখ ভুলে গেছে
হয়ত বা পরস্পর তারা নার্গিস ফুলের
. অ্যালসেসিয়ান ডগের গল্পে ভীষণ মশগুল
মানিব্যাগে তাদের নোটের মসৃণ পাহাড়
. হাতে হাতে শ্যাম্পেনের গ্লাস
কাঁটায় কাঁটায় ঠিক রাত বারোটার অন্ধকার
. লম্পটের গলিত শিস
দ্রুতলয় উন্মত্ত অর্কেস্ট্রার তালে তালে মাতালের বিকট চিত্কার:
“থ্রী চিয়ার্স ফর স্ট্রীপটীজ” --- ন্যাংটো মেয়ের নাচ।
আর ওই আলোর সামিয়ানা ছেড়ে একটু হেঁটে গেলে
সরাসরি বিপরীত অন্ধকারে জান্তব গলির মুখে ক্ষুধার্ত পতিতা
যীশুর জন্মদিনে শরীরের নরম মাংস বিকিয়ে
এক টুকরো রুটির সুখ কিনে নেবে---
নয়ত নিজস্ব শিশুর জন্য একটা সস্তার কেক
. সাথে মায়ের মমতা
ব্যাস্ , এবারের মতো তার বড়দিন শেষ।
কলকাতার বড়দিন এরকমই হয়,
কলকাতায় বড়দিন কবি সনৎ দাশগুপ্ত (জন্মকাল অজ্ঞাত)। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, “ইস্পাতের পাতে মরচে ধরে না”
কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমরা পেয়েছি ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত, পুলক চন্দ সম্পাদিত “রক্তে ভাসে স্বদেশ সময়” কাব্যসংকলন থেকে।
উত্সবের আলোয় ইন্দ্রপুরীর মতো বিপুল স্কাইস্ক্রেপারের পাশে
লক-আউট কারখানার শতছিন্ন লাগাতার তাঁবু ;
গ্রেট ইস্টার্ণের পঞ্চাশ টাকা পাউণ্ড কেকের পাঁচ হাত দূরে
সিকি পাউণ্ড রুটির জন্য সারাদিন হন্যে হকার
. বেকার
. তহবিলের কৌটো হাতে ছাঁটাই স্রমিক ;
অথচ আজ কলকাতায় বড়দিন---মোমবাতি, কার্ড আর শুভেচ্ছার রাত।
তাই আমি এরকম নির্লজ্জ প্রতারণার কষ্টকর রাতে
খেলনার ঝুলি কাঁধে এই স্বপ্নময় সান্টাক্লজের
অনিন্দ্যসুন্দর বৃদ্ধ পুতুলের ঠিক উলটো দিকে
অন্তত একলক্ষ হাভাতে শিশুর ক্ষুধার আর্তনাদ শুনতে পাই
তখন হাতের কাছে বেপাত্তা যীশুর স্বর্গীয় কলার ঝাঁকিয়ে
বোমার মতো গলায় স্প্লিন্টার ছিটিয়ে
ভয়ঙ্কর চিত্কার ক’রে বলতে ইচ্ছা হয়:
মানিনা তোমার ক্ষমার মন্ত্রণা
রক্তে রক্তে দ্যাখো উদ্যত স্টেনগান
ফায়ার!
কে রোখে রক্তের পথ
মারের বদলে মার।
কে দেবে জবাব
শুধু সেন্টপল গীর্জার নির্জন গম্বুজে রক্তাক্ত যীশুর ছায়া কাঁপে।
এই পাতার পশ্চাৎপটের ছবিটি আন্দামানের সেলুলার জেলের, যা যে কোনো রাষ্ট্র দ্বারা তার জনগণের উপরে চরম নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রতীক। আবার এই দেয়াল ও গরাদগুলিই স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনপণ করা প্রতিবাদেরও প্রতীক!
|
|
|
"এই ব্যাটা, তোর কাগজ আছে?"
"আজ্ঞে, মালিক"। "দেখা"।
"এই যে হুজুর,"
"এ আবার কী?
কিচ্ছুটি নেই লেখা।"
"লেখা তো ছিল,
গত সনের বানে
মুছায়ে দিছে ভাসায়ে দিছে ঘর।"
"এই কথাডার মানে?"
এও জানে না, ওই বা বুঝি জানে?
এইরকমই কথাবার্তা চলছে পরস্পর।
"আপনি কিছু লিখে দ্যান না কেনে?"
ভিখিরিটি বললো অতঃপর।
হাত বাড়ালো, বললো, মৃদুস্বর,
"আঁকিয়া দ্যান আমার ভাগ্যরেখা।"
কথোপকথন
কবি বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জী (জন্মকাল অজ্ঞাত)। NPR-NRC-CAA.
বিরোধী কবিতা। মিলনসাগরের দেয়ালিকায় তোলা হয়
১৯.১.২০২০।