রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য
কবি রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গলের পরিচিতির পাতায় . . .
রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের সূচি
রূপরামের ধর্ম্মমঙ্গল
|| আদ্য ঢেকুর পালা ||
|| গজেন্দ্র মোক্ষণ ||

অগস্ত্য মুনির শাপে অক্রুনের ( ? ) ভূপ |
আচম্বিতা সেইখানে হৈল গজরূপ ||
পরিবার সঙ্গতি বঞ্চিতে গেল বন |
জলেতে নাম্বিয়া রক্ষা করিল জীবন ||
অবিলম্বে কুন্ভীর ধরিল তার পায় |
গজে আর কুম্ভীরে অনর্থ বয়্যা যায় ||
চতুর্ভূজরূপে হরি গরুড়বাহনে |
গজেন্দ্র-মোক্ষণ হেতু দিল দরশনে ||
এই অধ্যায় শুন্যা রাজা প্রেমে পুলকিত |
হেন বেলা কর্ণসেন হৈল উপনীত ||
জোহার করিল গিয়া রাজার চরণে |
এস্য এস্য বার ভূঞা ডাকে চারিপানে ||
কেহ দেই রাম নাম কেহ দেই হাথ |
পাষন্ডীর উপরে পড়িল বজ্রাঘাত ||
হাতে ধরি ভূপতি বসাল্য একাসনে |
বারতা জিজ্ঞাসা করে প্রফুল্লবদনে ||
কিমর্থ মলিন মুখ অরুণ নয়ন |
সভাই বলহ গরি বাড়িল সন্মান ||
অনাদ্যের পদরেণু ভরসা কেবল |
দ্বিজ রূপরাম গান ধর্ম্মের মঙ্গল ||

তবে যদি জিজ্ঞাসা করিল গৌড়েশ্বর |
কর্ণসেন রায় বলে দরবার ভিতর ||
কান্দিতে কান্দিতে বলে মাথায় দিয়া হাত |
পউষ মাসে মাথায় পড়িল বজ্রাঘাত ||
প্রাণ লয়্যা গৌড়ে এস্যাছি রাতারাতি |
ইছাই নিলেক ঘোড়া মালমাত্তা হাতী ||
সাতপুরুষের ভূম নিলেক গোয়ালা |
নবদন্ড ধরিলে তিমির করে আলা ||
এতদিনে বিধাতা বিযোগে দুখ দিল |
নৃপতির সন্নিধানে কান্দিতে লাগিল ||
বার ভূঞা রহিল তাহার মুখ চায়্যা |
আশ্বাস করিল রাজা হাতে পান দিয়া ||
বার ভূঞা সংহতি সমরে দিব হানা |
বলবন্ত ইছাই জানিব বীরপনা ||
দড়বড়ি এখনি সাজিব দলবল |
পার হয়্যা যাব নদী অজয়ার জল ||
মসীবর্ণ বদন অরুণবর্ণ আঁখি |
ঢেকুর ঐরিষ্টী হৈল ভাল নহে দেখি ||
জ্বলন্ত পাবক নিবারণ ভাল নয় |
সমূখে বসিয়া পাত্র মহামদ কয় ||
অতিশয় ক্রোধ হৈলে অকার্য্য অনেক |
রাজা হৈল গোয়ালা দেবতা পরতেক ||
না করিহ ক্রোধ রাজা ধরি তব পায় |
সন্নিধানে মহাপাত্র আপনে বুঝায়  ||
পাঠাইয়া দিব আগে ভাট গঙ্গাধর |
পরোয়ানা লিখিব সোমঘোষ বরাবর ||
তবে যদি বেবাক পাঠায় ইরসাল |
তবে যদি অবশ্য এ সব ঠাকুরাল  ||
কদাচিত বেবাক না দেয় রাজকর |
উভুদলে সাঁজে যাব তাহার উপর ||
এত বলি পরোয়ানা লিখিল শীঘ্রগতি |
ভাটকে বলিল চল ঢেকুর বসতি ||
এহাতে বিলম্ব নাঞী এক দন্ড সয় |
অজয় ঢেকুরে কর এখনি বিজয় ||
সোমঘোষে বলিবে বিশেষ বিবরণ |
পালকি চড়িয়া ভাট করিল গমন ||
বারজন মহলা ( ? )  পালকিখান ধরে |
আনন্দে করিএ যাত্রা অজয় নগরে ||
পার হয়্যা ভৈরবী ভবানীপুর পায় |
অজয় ঢেকুর ভাট গঙ্গাধর যায় ||
পাঁচদিন ঢেকুর নগরে গতায়ত |
সত্বরে ঢেকুর পাল্য গুয়ালা সাক্ষাত ||
সোমঘোষ গুয়ালা দরবারে বসিয়াছে |
হেন বেলা রাজার পরোয়ানা দিল কাছে ||
তিনবার প্রণাম পরোয়ানা দেখি কৈল |
মোহর ভাঙ্গিয়া পত্র দরবারে পড়িল ||
যথাযোগ্য পরোয়ানা লিখেচে সর্ব্বজন |
ইরসাল বেবাক কড়ি দিবে ততক্ষণ ||
পরোয়ানা পড়িয়া সোমঘোষ কয় |
ইরসাল বেবাক কর দিব মহাশয় ||
হিসাব করিল সর্ব্ব ঢেকুরের কর |
সোমঘোষ আনি দিল ভাট বরাবর ||
ভাটকে ইনাম দিল দিব্য অলঙ্কার |
বিদায় হইল ভাট তাহার দরবার ||
আরোহণ করে পুনু পালকি উপরে |
বারবেলা যাত্রা করে গৌড় সহরে ||
আগুপাছু শিঙ্গা পড়ে টমক নিশান |
গৌড়-পদ্ধতি মুখে করিল পয়ান ||
অজয় নদীর কূলে দরশন দিল |
লোহাটা বর্জ্জর বীর ইছাই দেখিল ||
ইছাই বলেন শুন লোহাটা বর্জ্জর |
কোন বেটা যায় পথে পালকি উপর ||
গড়ে হৈতে যায় কে কাড়ায় কাটী দিয়া |
লোহাটা তাহার কাছে উত্তরিল গিয়া ||
মহাজন দেখি বীর করিল প্রণাম |
বলিবে আমার আগে বাড়ী কোন গ্রাম ||
তুমি কাহার চাকর তোমার নাম কি |
মুখে বাক্য নাহি সরে পাবকে যেন ঘি ||
এতেক শুনিয়া বলে ভাট গঙ্গাধর |
গৌড় সহরে বাড়ি রাজার চাকর ||
হিসাব করিয়া কর সোমঘোষ দিল |
রাজ-দরবারে যাই তোমারে বলিল ||
লোহাটা বর্জ্জর বলে ইছাএর পায় |
অকালে আগুন যেন পেল্যা দিল গায়  ||
কেবা আছে এমন সংসারে বল ধরে |
অধিকার আমার উপরে কেবা করে ||
এদেশে আসিলে নাঞী বিধাতার সাধ |
যমরাজা না করে আমার সনে বাদ ||
কোন বেটা নিতে পারে ঢেকুরের কর |
দিগারে হুকুম দিল ইছাই সুন্দর ||
অনাদ্যের মায়া কহে নাঞী যায় |
অনাদ্যমঙ্গল দ্বিজ রূপরাম গায় ||

দড় পায়্যা হুকুম দিগার সভে ধরে |
ইলিক পয়জার মারে ভাট গঙ্গাধরে ||
আশে পাশে মারে কেহ বন্দুকের ছড়া ||
রতিমাষা হইল গাএর জামাজোড়া ||
বলিতে কহিতে [ তবে ] বাড়ে অনুরাগ |
মাথা মুড়াইয়া দিয়া নরুণের দাগ ||
বাম গালে কালি দিল ডানি গালে চুন |
ভাট বলে খাব আমি করিয়া বেরূন  ||
একনাথ্যা করে তারে নগর চাতরে |
বানুরে বানর যেন নাচায় ঘরে ঘরে ||
নগরে নগরে বুলে বাজারে বাজার |
সোমঘোষ তখন পাইল সমাচার ||
শীঘ্রগতি দেখিল ভাটের অপমান |
কহিবারে লাগিল ইছাই সন্নিধান ||
ব্রহ্মচারী বৈষ্ণব বসিব নাঞী দেশে |
সদাই ইহার হিংসা রজনী দিবসে ||
পূর্ব্বকালে আমি যখন গৌড়ে নিবাসী |
ভাট গঙ্গাধর ছিল আমার পড়সি ||
এহারে ইনাম দেহ চড়নের ঘোড়া |
মাথায় পাগড়ি দেয় গায় জামাজোড়া ||
পরুস্কার পায়্যা ভাট হইল বিদায় |
গৌড়-দরবারে আসি তবে জয় খায় ||
ভাট বলে শুন রাজা বিপদ-বারতা |
দশমুখ হইলে কই ইছাএর কথা ||
ইন্দ্রের সম্পত্তি দেখি ইছাএর বাসে |
লক্ষ্মীদেবী আপুনি বাহিরে বসিয়াছে ||
যমরাজা বরুণ পবন আজ্ঞাকারী |
বিধাতা আপুনি তার বস্যাছে দুয়ারি ||
সোমঘোষ বেবাক গণিয়া দিল কর |
মাঝপথে কাড়্যা নিল ইছাই কুঙর ||
মাথা মুড়াইয়া মুখে দিল চুনকালি |
কুলোক ( ? ) বলিয়া কত দিল গালাগালি ||
পার হয়্যা অজয় ঢেকুরে দিল হানা |
কালি কিম্বা পরশু গৌড়ে দিব হানা ||
নিবেদিল ভাট যদি রাজার সমাজ |
আপুনি রুষিল রাজা বলে সাজ সাজ ||
দড়মাসা দামামা দগড়ে পড়ে কাটি |
বাইশ হাত কাঁপে গেল গোউড়ের মাটি ||
সাজ সাজ শবদে সঘনে পড়ে সাড়া |
কত ঠাঞী শিঙ্গা বাজে কত ঠাঞী কাড়া ||
ধর্ম্মের মায়া কহনে নাঞী যায় |
হরি হরি বল সভে ধর্ম্মের সভায় ||

এক মনে শুন সভে ধর্ম্ম-ইতিহাস |
দু-মন করিলে হয় ধন পুত্র নাশ ||
তৈনাৎ হইল যদি নব লক্ষ সেনা |
নস্কর ভিতরে বাজে ব্যালিশ বাজনা ||
চারি পণ কাড়া বাজে সাত পণ শিঙ্গা |
ধিঙ্গ ধিঙ্গ মাদল বাজায় ধিঙ্গা ধিঙ্গা ||
গেঁজ গেঁজ গেজর গেজর জগঝাঁপ |
কেহ বলে কেমনে মহিম হব সাঁপ ||
টিং টিং কাড়া বাজে সঘনে বীর ঢাক |
ঢালি ঢাল কাছাড়িয়া মারে উড়া পাক ||
চারিদিগে সাজিল তুরঙ্গ আর হাতি |
ঝলমল রাজার মাথায় দন্ড ছাতি ||
আড়ম্বরে কাঁপিল আকাশ-পুরন্দর |
বারভূঞা আগু দলে যমের দোসর ||
তুরঙ্গ নাচায় তারা তার ঊর্ণ বড় |
সিফাই দাবায় ঘোড়া বুকে নাঞী ডর ||
আগুদলে দুড় দুড় সঘনে পড়ে দামা |
দুই হাজার হাতি সঙ্গে আগে খানসামা ||
কর্ণসেন আপুনি রাজার কাছে যায় |
ছয় বেটা ছয় ঘোড়া সঘনে চালায় ||
উভুদলে পার হৈল ভৈরবীর জল |
ভুঞার পয়াণে মহী করে টলমল ||
ষোল ক্রোশ জুড়িয়া পদাতি পড়ে ঠাট |
গোত্তাগাছি ভৈরবী রাখিল গোলাহাট ||
স্নানপূজা দান নাঞী নৃপতির মনে |
ঢেকুরে দিলেক দেখা অজয় পুলিনে ||
শুন্যাছি পিতার মুখে বল্যা যেন রাজা ( ? )  |
লঙ্ঘিবারে এ নদী নারিল কোন রাজা ||
মনে নাঞী অনুমান পাত্রের বচন |
ঐমনি চলিল রাজা চড়িয়া বারণ ||
তড়ে ছিল মাতঙ্গ সলিলে দিল পা |
আচম্বিতে দুর্দুড় জলের শুনি রা ||
বাও নাঞী বাতাস নাঞী বরষা বাদল |
মাঘমাসে নদী বাড়ে বিধাতার বল ||
সলিলের শব্দ শুনি ভূপতি পাছায় |
তিন হাজার হাতী ঘোড়া জলেতে স্যাজায় ||
অজয়ার বন্যা দেখি ত্রাস হৈল মনে |
মহারাজ মোকাম করিল ভুঞ্যাগণে ||
ষোল ক্রোশ উত্তরিল রাজার নস্কর |
অনর্থ বাড়িল গিয়া ঢেকুর ভিতর ||
শ্যামরূপা দেবী তখন বসিয়া দেউলে |
ইছাএ ডাকিয়া তখন বলেন বিরলে ||
উভুদলে এক রাজা বারভুঞ্যাগণ |
লোহাটা বর্জ্জর বলে পাঠাই এখন ||
যত দিন নাঞী হয় কচ্ছপ অবতার |
ততদিন তোমাকে দিয়াছি অধিকার ||
আমি রণে যাব বাপু তুমি বৈস ঘরে |
দশ গৌড়েশ্বর তোর কি করিতে পারে ||
উপলক্ষ বলে যদি লোহাটা বর্জ্জর |
নবলক্ষ সৈন্যকে পাঠাব যমঘর ||
উপলক্ষ বিনা কার্য্য না হয় কখন |
উপলক্ষ বিনা বাপু না হয় নিধন ||
একদন্ড পাঠাইলে অনেক কার্য্য হয় |
চারিদিকে বৈ নহে শুখাব অজয় ||
শিরোধার্য্য সত্বরে দেবীর বাক্য নিল |
লোহাটা বর্জ্জর বীর সংগ্রামে সাজিল ||
ব্যালিশ কোটাল সঙ্গে যমের সমান |
তরণি উপরে চড়ে অতি বেগবান ||
কাড়া শিঙ্গা টমক নিশান ঘনে ঘন |
তরঙ্গে তরঙ্গে তরী করিল গমন ||
পঞ্চমুখে হাতি ঘোড়া রাহুত মাহুত |
লোহাটা দিলেক তাড়া যেন যমদূত ||
অনাদ্যের মায়া কহনে নাঞী যায় |
অনাদ্যমঙ্গল দ্বিজ রূপরাম গায় ||

অকালে অনিল যেন উত্তর অম্বরে |
লোহাটা উরিয়া পড়ে লস্কর ভিতরে ||
আথালি পাথালি সৈন্য হানে ঝনঝন |
মধ্যরণে রাউত সর্দ্দার কাটা যান ||
দুহাতে হেত্যার ধরি উভুদলে চোট |
হিমালয় সদৃশ কুঞ্জর যায় লৌট  ||
বারভূঞ্যা বলে যুঝে রাজা গৌড়েশ্বর |
উলটি পালটি হানা দিলেক বর্জ্জর ||
ঘোড়ার হিষুঁনি শুনি হাতির নিনাদ |
আকাশ পাতাল ভেদি হইল প্রমাদ ||
রামরায় সিফাই হাথির পিঠে যুঝে |
দামার শব্দ যেন দেবতা গরজে ||
রণে যুঝে আগুরি দক্ষিণ-চূড়ামণি |
সমুখে দিয়াছে হানা রাখে বাণ আনি ||
কর্ণসেন দিয়াছে দক্ষিণ দিগে হানা |
ছয় বেটা রণে যুঝে বাণে বিচতক্ষণা ||
কেহ বা তুরঙ্গ-পিঠে কেহ বা টাঙ্গনে |
পিতার সঙ্গতি পুত্র যুঝে মাঝ রণে ||
রাজা পাত্র বারণে বসিয়া বলে মার |
গুলি পড়ে একা রণে পঞ্চাশ হাজার ||
গগনে দুরন্ত গোলা পড়ে দামদুম |
হুড় হুড় শব্ দে ব্রহ্মার ভাঙ্গে ঘুম ||
ঢালি পাইক সর্দ্দার সবার আগে যুঝে |
ভুজঙ্গের সোনা বলি ( ? ) টাল করে ভুজে ||
এ কারণে লোহাটা হয়্যাছে লক্ষ জন |
হাতি ঘোড়া সৈন্য কাটে না যায় গগন ||
বসুমতী পদভরে করে টলমল |
ভীম যেন নষ্ট করে কুরুসৈন্য বল ||
রামের টমক যেন নাশে মেঘনাদ |
তাকে চায়্যা দ্বিগুণ বাড়িল পরমাদ ||
কুঞ্জর-ঘটায় যেন সিংহ বলবান |
শার্দ্দুল শূকর পানে যেন গতি যান ||
এক মাথা কাটিতে হাজার মাথা পড়ে |
কদলী বিনাশ যেন বৈশাখের ঝড়ে ||
রণমধ্যে জয়দুর্গা উরিল আপুনি |
সঙ্গেতে উড়িল তাঁর চৌষট্টী যোগিনী ||
ডাকিনী যোগিনী যুদ্ধ করে চারি পানে |
চাঁপা ফুল বল্যা হাতি তুল্যা পরে কানে ||
ডানি হাতে কাতি দরে বাম হাতে খর্পর |
বিপর্য্যয় ডাক ছাড়ে ডাগর ডাগর ||
হাসিতে হাসিতে হাতি চুমুকিয়া খায় |
মীন ঘুরাইলে যেন চিলে লয়্যা যায় ||
রাক্ষসী পিশাচী বস্যা হাসে এক ঠাঞী |
সুপরিয়া ( ? )  ঘোড়া গিলে বোল চোল নাঞী ||
ধাওধাই যুঝে কেহ উলঙ্গ হইয়া |
কি খাব কি খাব বল্যা নাচে পাক দিয়া ||
অতি বৃদ্ধ ডাকিনী ডাগর শব্দ ডাকে |
হস্তা যেন জন্তু গিলে চুপ দিয়া থাকে ||
রণমাঝে অবতার সর্ব্বমঙ্গলা |
দুইদন্ড সংগ্রামে পরিল মুন্ডমালা ||
ডাকাডাকি পড়িল কুচ্ছিত কলরব |
সমুখ সমরে সৈন্য ভঙ্গ দিল সব ||
পালাল্য সর্দ্দারসিংহ সভাকার চুড়া |
বাঁশবনে লুকাইল মান্ধাতার খুড়া ||
দিগে দিগে পলায় রাউত আসোআর |
লোহাটা বর্জ্জর বণে বলে মার মার ||
তাড়াতাড়ি ব্যালিশ দিগার হানে কাটে |
আচম্বিতে কুরুক্ষেত্র অজয়ার ঘাটে ||
হান্যা পেল্যা উলটি পালটি ঝটঝট |
আচম্বিতে ভঙ্গ দিল হস্তী ঘোড়া ঠাট ||
ভঙ্গ দিল মহাপাত্র রাজা গৌড়েশ্বর |
কর্ণসেনের ছয় বেটা গেল যমঘর ||
বারভুঞ্যা সর্দ্দার পালায় দলবল |
শোকে রাজা কর্ণসেন তৃষ্ণায় বিকল ||
রণ জিন্যা লোহাটা বর্জ্জর গেল ঘর |
রূপরাম গান গীত অনাদ্যের বর ||

রাজা পাত্র ভুঞা বঙ্গ দিল রণে |
গোউড় সহরে দেখা দিল সর্ব্বজনে ||
অজয়ার উত্তরে রুধিরের গঙ্গা বয় |
লোহাটা ঢেকুর গেল রণ হৈল জয় ||
ইছাই হইল রাজা ঢেকুর ভেতরে |
পুত্রশোকে কান্দে কর্ণসেন নৃপবরে ||
কান্দিতে কান্দিতে যান গৌড় ভুবন |
ছয় পুত্র রণে মৈল নাঞী দেখে গন  ||
বন্ধুঘরে কর্ণসেন দিল দরশন |
যুগল নয়ন আঁখি আষাঢ়-শ্রাবণ ||
বন্ধুঘরে আছেন বনিতা আর দাসী |
রাজ্য গেল বিধাতা করিল বনবাসী ||
শীলাবতী রাণীকে বলএ বিবরণ |
ছয় বেটা মৈল তোর ঢেকুরের রণ ||
সাত পুরুষের ভূম এতদিনে গেল |
বনিতা সমুখে শোকে কান্দিতে লাগিল ||
ছয় বধূ অনুমৃতা হৈল জরাতুর ( ? ) |
পুত্রশোকে মৈল রাণী খাইয়া মাহুর ||
চেয়্যা দেখে দশদিক সব হৈল শূন |
ধন কড়ি লুটিল ভান্ডার হৈল উন ||
শোকে হৈল কাতর অম্বর নাঞী রাখে |
মন হৈল পাগল বদনে ভস্ম মাখে ||
দূরে রাখে অম্বর নিলেক বাঘছাল |
এত দিনে ঘুচিল সংসার মায়াজাল ||
তপস্যা করতে আমি যাব মধুবন |
বিশেষ বনিতা শোকে হৈল অচেতন ||
বৃন্দাবনে তপস্যা করিতে চলে যাই |
মনেতে পড়িল তার গৌড়েশ্বর ভাই ||
বাঘছাল পরিধান তখনি পরিল |
পুনর্ব্বার রাজার দরবারে দেখা দিল ||
রাজার সমুখে আসি কর্ণসেন কান্দে |
বারভুঞাগণ সব বুক নাঞী বান্ধে ||
কর্ণসেন কান্দে তবে নৃপতির পায় |
বাঘছাল বুকে দিয়া গড়াগড়ি যায় ||
ছয় পুত্র মরিতে মরিল ছয় বধূ |
অনুমৃতা আনন্দে হইল ছয় বধূ ||
উভয়সঙ্কটে শোকে মৈল সত্যবতী |
গয়া গঙ্গা এহার অবশ্য চাই গতি ||
আপনার পিন্ডদান করিব আপনি |
হাসিতে হাসিতে হারাইনু চিন্তামণি ||
দ্বিজে দান নাঞী দিনু না বলিনু হরি |
মকরন্দ থাকিতে গরল খায়্যা মরি ||
জ্ঞাতি নাঞী সংসারে বঞ্চিতে যাব কোথা |
রমণী মরণে মন হৈল মহীলতা ||
বড় দুখ মরমে রাখাল ভূম নিল |
কর্ণসেন পুত্রশোকে কান্দিতে লাগিল ||
আশ্বাস করিছে রাজা হাতে দিয়া হাত |
মন বাঞ্ছা সদাই আপুনি অচিরাত ||
আপনার কল্যাণ আপুনি চিন্ত ভাই |
ঘরে বসি থাকিলে সকল তীর্থ পাই ||
গয়া গঙ্গা এখানে পৈরাগ বৃন্দাবন |
কিমর্থ পাগল হৈলে সচঞ্চল মন ||
পুরুষ থাকিতে জোড়ে কতেক পরশ |
কেবা নাঞী বিভা করে চারি পাঁচ দশ ||
আপনা চাহিতে ভাই চাই অনুক্ষণ |
তার পাছে জায়া রাখি তবে রাখি ধন ||
দুখ সুখ সম্পদ সকল মনে পড়ে |
নিদারুণ বিধাতা আপুনি ভাঙ্গে গড়ে ||
অল্পকালে আমার মরিল দুবরাজ |
তুমি কেন সমাজ জুড়িয়া কর লাজ ||
মনদড়া হয়্যা যদি রাম নাম জপে |
কি করিব গয়া গঙ্গা কী করিব তপে ||
দশাগুণে মরি ভাই দশাগুণে তরি |
দশাগুণে জনক জননী হয় বৈরী ||
কালি কিম্বা পরশ্ব তোমার বিভা দিব |
রূপবতী রাজকন্যা হুকুমে আনিব ||
এক রাত্রে দশগন্ডা বিভা দিতে পারি |
সংসার ছাড়িয়ে কেন বৈরাগী-বেশ ধরি ||
দিন কথ ভান্ডার লিখিয়া থাক রায় |
মনে দুখ পায়্যাছে সুবর্ণ যেন পায় ||
এত যদি গৌড়শ্বর করিল আশ্বাস |
বাঘছাল রাখিয়া পরিল পট্টবাস ||
মহারাজ পরাইল অষ্ট অলঙ্কার |
শোক পাসরিয়া বৈসে জয়মুনি ভান্ডার ||
দরবার ভাঙ্গিয়া রায় করিল গমন |
বাসাকে বিদায় হৈল বারভূঞাগণ ||
অনাদ্যার মায়া কহনে নাঞী যায় |
দ্বিজ রূপরাম গায় অনাদ্যের পায় ||

দুই পায়ে রাজার যে উচিত কমল ( ? )  |
আগু পাছু নফর ভৃঙ্গার গঙ্গাজল ||
অন্তর মহল বৈ দিল দরশন |
ভানুমতী রাণী বস্যা অপূর্ব্ব আসন ||
ছোট বনি সমুখে বস্যাছে রঞ্জাবতী |
পট্টবাস আপুনি পরাইল ভানুমতী ||
কথদূর হৈতে দেখে আপুনি রাজন |
রঞ্জাবতী কন্যা দেখি ভাবে মনে মন ||
কোন দেবতার কন্যা মোর অন্তপুরে |
রূপ দেখে দেবতা রহিতে নারে ঘরে ||
এত ভাবি রাজা গেল রাণীর নিকটে |
জিজ্ঞাসিল মহারাজা ইনি কেবা বটে ||
প্রণাম করিয়া বলে ভানুমতী রাণী |
রঞ্জাবতী বিদ্যাধরী অনুজা ভগিনী ||
অনুজা ভগিনী মোর নাম রঞ্জাবতী |
কালি আস্যাছিল বনি আঁধিয়া ( ? )  রমতি ||
কালি পাঠাইয়া দিব বড় দুঃখ মনে |
মায়ের জীবন ধন বিদিত ভুবনে ||
সাধের ভগিনী ছোট মায়ের পরাণ |
পরিচয় পায়্যা রাজা বলে বিদ্যমান ||
রাজা বলে রঞ্জাবতী তুমি হৈলে শালী |
আপুনি যাচিয়া দিবে যৌবনের ডালি ||
রঞ্জাবতী বলে শুন গৌড়ের ঈশ্বর |
তোমার সদৃশ কত আমার নফর ||
পরিহাস ভূপতি করিল কুতূহলে |
রাণীকে বলিছে কিছু বসিয়া বিরলে ||
বিরলে বসিয়া বলে নৃপচূড়মণি |
কর্ণসেনে বিভা দিব তোমার ভগিনী ||
তুমি মন করিলে তাহার বিভা হয় |
জ্ঞাতি-বন্ধু পালনে অনেক পুণ্য হয় ||
ভানুমতী রাণী বলে শুন মন দিয়া |
রঞ্জাবতী বিভা যদি দেহ লুকাইয়া ||
মহাপাত্র এ কর্ম্ম করিতে নাঞী দিব |
বুড়া বর কর্ণসেন এ বোল বলিব ||
তবে যদি এ কথায় তুমি দিলে মন |
লুকাইয়া বিভা দেহ গৌড় ভূবন ||
বসন্তের পাবকে ফেলিলে পদ্মফুল |
[ বনি ] কোলে করি কান্দে সহজে আকুল ||
দুইমতি দিবসের শিশির পালা সায় |
অনাদ্যমঙ্গল দ্বিজ রূপরাম গায় ||

.     ******************     
.                                                                    
পাতার উপরে . . .     


মিলনসাগর
১    বন্দনা  পালা     
.          
গনেশ বন্দনা    
.          
ধর্ম্ম বন্দনা    
.          
ঠাকুরাণী বন্দনা     
.          
চৈতন্য বন্দনা    
.          
সরস্বতী বন্দনা     
.          
বিপ্র বন্দনা      
.          
দিগ্ বন্দনা    
২   
আত্মকাহিনী    
৩   
স্থাপনা পালা    
৪    
আদ্য ঢেকুড় পালা    
.           
গজেন্দ্র মোক্ষণ    
৫    রঞ্জার বিবাহপালা     
৬   লুইচন্দ্র পালা     
৭   শালেভর পালা    
৮   লাউসেনের জন্মপালা      
৯   লাউসেন চুরিপালা    
১০ আখড়া পালা     
১১ ফলানির্মাণ পালা     
১২ মল্লবধ পালা      
১৩ বাঘজন্মপালা     
১৪ বাঘবধ পালা      
১৫ জামতি পালা      
১৬ গোলাহাটপালা      
১৭ হস্তিবধপালা      
১৮ কাঙুরযাত্রাপালা      
১৯ কলিঙ্গাবিভাপালা     
২০ লৌহগন্ডারপালা       
২১কানড়াবিভাপালা      
২২অনুমৃতাপালা     
২৩ ইছাইবধপালা     
২৪ অঘোরবাদলপালা     
২৫ জাগরণপালা     
২৬ স্বর্গারোহণপালা