| রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য |
| রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের সূচি |
| রূপরামের ধর্ম্মমঙ্গল || আদ্য ঢেকুর পালা || |
| || গজেন্দ্র মোক্ষণ || অগস্ত্য মুনির শাপে অক্রুনের ( ? ) ভূপ | আচম্বিতা সেইখানে হৈল গজরূপ || পরিবার সঙ্গতি বঞ্চিতে গেল বন | জলেতে নাম্বিয়া রক্ষা করিল জীবন || অবিলম্বে কুন্ভীর ধরিল তার পায় | গজে আর কুম্ভীরে অনর্থ বয়্যা যায় || চতুর্ভূজরূপে হরি গরুড়বাহনে | গজেন্দ্র-মোক্ষণ হেতু দিল দরশনে || এই অধ্যায় শুন্যা রাজা প্রেমে পুলকিত | হেন বেলা কর্ণসেন হৈল উপনীত || জোহার করিল গিয়া রাজার চরণে | এস্য এস্য বার ভূঞা ডাকে চারিপানে || কেহ দেই রাম নাম কেহ দেই হাথ | পাষন্ডীর উপরে পড়িল বজ্রাঘাত || হাতে ধরি ভূপতি বসাল্য একাসনে | বারতা জিজ্ঞাসা করে প্রফুল্লবদনে || কিমর্থ মলিন মুখ অরুণ নয়ন | সভাই বলহ গরি বাড়িল সন্মান || অনাদ্যের পদরেণু ভরসা কেবল | দ্বিজ রূপরাম গান ধর্ম্মের মঙ্গল || তবে যদি জিজ্ঞাসা করিল গৌড়েশ্বর | কর্ণসেন রায় বলে দরবার ভিতর || কান্দিতে কান্দিতে বলে মাথায় দিয়া হাত | পউষ মাসে মাথায় পড়িল বজ্রাঘাত || প্রাণ লয়্যা গৌড়ে এস্যাছি রাতারাতি | ইছাই নিলেক ঘোড়া মালমাত্তা হাতী || সাতপুরুষের ভূম নিলেক গোয়ালা | নবদন্ড ধরিলে তিমির করে আলা || এতদিনে বিধাতা বিযোগে দুখ দিল | নৃপতির সন্নিধানে কান্দিতে লাগিল || বার ভূঞা রহিল তাহার মুখ চায়্যা | আশ্বাস করিল রাজা হাতে পান দিয়া || বার ভূঞা সংহতি সমরে দিব হানা | বলবন্ত ইছাই জানিব বীরপনা || দড়বড়ি এখনি সাজিব দলবল | পার হয়্যা যাব নদী অজয়ার জল || মসীবর্ণ বদন অরুণবর্ণ আঁখি | ঢেকুর ঐরিষ্টী হৈল ভাল নহে দেখি || জ্বলন্ত পাবক নিবারণ ভাল নয় | সমূখে বসিয়া পাত্র মহামদ কয় || অতিশয় ক্রোধ হৈলে অকার্য্য অনেক | রাজা হৈল গোয়ালা দেবতা পরতেক || না করিহ ক্রোধ রাজা ধরি তব পায় | সন্নিধানে মহাপাত্র আপনে বুঝায় || পাঠাইয়া দিব আগে ভাট গঙ্গাধর | পরোয়ানা লিখিব সোমঘোষ বরাবর || তবে যদি বেবাক পাঠায় ইরসাল | তবে যদি অবশ্য এ সব ঠাকুরাল || কদাচিত বেবাক না দেয় রাজকর | উভুদলে সাঁজে যাব তাহার উপর || এত বলি পরোয়ানা লিখিল শীঘ্রগতি | ভাটকে বলিল চল ঢেকুর বসতি || এহাতে বিলম্ব নাঞী এক দন্ড সয় | অজয় ঢেকুরে কর এখনি বিজয় || সোমঘোষে বলিবে বিশেষ বিবরণ | পালকি চড়িয়া ভাট করিল গমন || বারজন মহলা ( ? ) পালকিখান ধরে | আনন্দে করিএ যাত্রা অজয় নগরে || পার হয়্যা ভৈরবী ভবানীপুর পায় | অজয় ঢেকুর ভাট গঙ্গাধর যায় || পাঁচদিন ঢেকুর নগরে গতায়ত | সত্বরে ঢেকুর পাল্য গুয়ালা সাক্ষাত || সোমঘোষ গুয়ালা দরবারে বসিয়াছে | হেন বেলা রাজার পরোয়ানা দিল কাছে || তিনবার প্রণাম পরোয়ানা দেখি কৈল | মোহর ভাঙ্গিয়া পত্র দরবারে পড়িল || যথাযোগ্য পরোয়ানা লিখেচে সর্ব্বজন | ইরসাল বেবাক কড়ি দিবে ততক্ষণ || পরোয়ানা পড়িয়া সোমঘোষ কয় | ইরসাল বেবাক কর দিব মহাশয় || হিসাব করিল সর্ব্ব ঢেকুরের কর | সোমঘোষ আনি দিল ভাট বরাবর || ভাটকে ইনাম দিল দিব্য অলঙ্কার | বিদায় হইল ভাট তাহার দরবার || আরোহণ করে পুনু পালকি উপরে | বারবেলা যাত্রা করে গৌড় সহরে || আগুপাছু শিঙ্গা পড়ে টমক নিশান | গৌড়-পদ্ধতি মুখে করিল পয়ান || অজয় নদীর কূলে দরশন দিল | লোহাটা বর্জ্জর বীর ইছাই দেখিল || ইছাই বলেন শুন লোহাটা বর্জ্জর | কোন বেটা যায় পথে পালকি উপর || গড়ে হৈতে যায় কে কাড়ায় কাটী দিয়া | লোহাটা তাহার কাছে উত্তরিল গিয়া || মহাজন দেখি বীর করিল প্রণাম | বলিবে আমার আগে বাড়ী কোন গ্রাম || তুমি কাহার চাকর তোমার নাম কি | মুখে বাক্য নাহি সরে পাবকে যেন ঘি || এতেক শুনিয়া বলে ভাট গঙ্গাধর | গৌড় সহরে বাড়ি রাজার চাকর || হিসাব করিয়া কর সোমঘোষ দিল | রাজ-দরবারে যাই তোমারে বলিল || লোহাটা বর্জ্জর বলে ইছাএর পায় | অকালে আগুন যেন পেল্যা দিল গায় || কেবা আছে এমন সংসারে বল ধরে | অধিকার আমার উপরে কেবা করে || এদেশে আসিলে নাঞী বিধাতার সাধ | যমরাজা না করে আমার সনে বাদ || কোন বেটা নিতে পারে ঢেকুরের কর | দিগারে হুকুম দিল ইছাই সুন্দর || অনাদ্যের মায়া কহে নাঞী যায় | অনাদ্যমঙ্গল দ্বিজ রূপরাম গায় || দড় পায়্যা হুকুম দিগার সভে ধরে | ইলিক পয়জার মারে ভাট গঙ্গাধরে || আশে পাশে মারে কেহ বন্দুকের ছড়া || রতিমাষা হইল গাএর জামাজোড়া || বলিতে কহিতে [ তবে ] বাড়ে অনুরাগ | মাথা মুড়াইয়া দিয়া নরুণের দাগ || বাম গালে কালি দিল ডানি গালে চুন | ভাট বলে খাব আমি করিয়া বেরূন || একনাথ্যা করে তারে নগর চাতরে | বানুরে বানর যেন নাচায় ঘরে ঘরে || নগরে নগরে বুলে বাজারে বাজার | সোমঘোষ তখন পাইল সমাচার || শীঘ্রগতি দেখিল ভাটের অপমান | কহিবারে লাগিল ইছাই সন্নিধান || ব্রহ্মচারী বৈষ্ণব বসিব নাঞী দেশে | সদাই ইহার হিংসা রজনী দিবসে || পূর্ব্বকালে আমি যখন গৌড়ে নিবাসী | ভাট গঙ্গাধর ছিল আমার পড়সি || এহারে ইনাম দেহ চড়নের ঘোড়া | মাথায় পাগড়ি দেয় গায় জামাজোড়া || পরুস্কার পায়্যা ভাট হইল বিদায় | গৌড়-দরবারে আসি তবে জয় খায় || ভাট বলে শুন রাজা বিপদ-বারতা | দশমুখ হইলে কই ইছাএর কথা || ইন্দ্রের সম্পত্তি দেখি ইছাএর বাসে | লক্ষ্মীদেবী আপুনি বাহিরে বসিয়াছে || যমরাজা বরুণ পবন আজ্ঞাকারী | বিধাতা আপুনি তার বস্যাছে দুয়ারি || সোমঘোষ বেবাক গণিয়া দিল কর | মাঝপথে কাড়্যা নিল ইছাই কুঙর || মাথা মুড়াইয়া মুখে দিল চুনকালি | কুলোক ( ? ) বলিয়া কত দিল গালাগালি || পার হয়্যা অজয় ঢেকুরে দিল হানা | কালি কিম্বা পরশু গৌড়ে দিব হানা || নিবেদিল ভাট যদি রাজার সমাজ | আপুনি রুষিল রাজা বলে সাজ সাজ || দড়মাসা দামামা দগড়ে পড়ে কাটি | বাইশ হাত কাঁপে গেল গোউড়ের মাটি || সাজ সাজ শবদে সঘনে পড়ে সাড়া | কত ঠাঞী শিঙ্গা বাজে কত ঠাঞী কাড়া || ধর্ম্মের মায়া কহনে নাঞী যায় | হরি হরি বল সভে ধর্ম্মের সভায় || এক মনে শুন সভে ধর্ম্ম-ইতিহাস | দু-মন করিলে হয় ধন পুত্র নাশ || তৈনাৎ হইল যদি নব লক্ষ সেনা | নস্কর ভিতরে বাজে ব্যালিশ বাজনা || চারি পণ কাড়া বাজে সাত পণ শিঙ্গা | ধিঙ্গ ধিঙ্গ মাদল বাজায় ধিঙ্গা ধিঙ্গা || গেঁজ গেঁজ গেজর গেজর জগঝাঁপ | কেহ বলে কেমনে মহিম হব সাঁপ || টিং টিং কাড়া বাজে সঘনে বীর ঢাক | ঢালি ঢাল কাছাড়িয়া মারে উড়া পাক || চারিদিগে সাজিল তুরঙ্গ আর হাতি | ঝলমল রাজার মাথায় দন্ড ছাতি || আড়ম্বরে কাঁপিল আকাশ-পুরন্দর | বারভূঞা আগু দলে যমের দোসর || তুরঙ্গ নাচায় তারা তার ঊর্ণ বড় | সিফাই দাবায় ঘোড়া বুকে নাঞী ডর || আগুদলে দুড় দুড় সঘনে পড়ে দামা | দুই হাজার হাতি সঙ্গে আগে খানসামা || কর্ণসেন আপুনি রাজার কাছে যায় | ছয় বেটা ছয় ঘোড়া সঘনে চালায় || উভুদলে পার হৈল ভৈরবীর জল | ভুঞার পয়াণে মহী করে টলমল || ষোল ক্রোশ জুড়িয়া পদাতি পড়ে ঠাট | গোত্তাগাছি ভৈরবী রাখিল গোলাহাট || স্নানপূজা দান নাঞী নৃপতির মনে | ঢেকুরে দিলেক দেখা অজয় পুলিনে || শুন্যাছি পিতার মুখে বল্যা যেন রাজা ( ? ) | লঙ্ঘিবারে এ নদী নারিল কোন রাজা || মনে নাঞী অনুমান পাত্রের বচন | ঐমনি চলিল রাজা চড়িয়া বারণ || তড়ে ছিল মাতঙ্গ সলিলে দিল পা | আচম্বিতে দুর্দুড় জলের শুনি রা || বাও নাঞী বাতাস নাঞী বরষা বাদল | মাঘমাসে নদী বাড়ে বিধাতার বল || সলিলের শব্দ শুনি ভূপতি পাছায় | তিন হাজার হাতী ঘোড়া জলেতে স্যাজায় || অজয়ার বন্যা দেখি ত্রাস হৈল মনে | মহারাজ মোকাম করিল ভুঞ্যাগণে || ষোল ক্রোশ উত্তরিল রাজার নস্কর | অনর্থ বাড়িল গিয়া ঢেকুর ভিতর || শ্যামরূপা দেবী তখন বসিয়া দেউলে | ইছাএ ডাকিয়া তখন বলেন বিরলে || উভুদলে এক রাজা বারভুঞ্যাগণ | লোহাটা বর্জ্জর বলে পাঠাই এখন || যত দিন নাঞী হয় কচ্ছপ অবতার | ততদিন তোমাকে দিয়াছি অধিকার || আমি রণে যাব বাপু তুমি বৈস ঘরে | দশ গৌড়েশ্বর তোর কি করিতে পারে || উপলক্ষ বলে যদি লোহাটা বর্জ্জর | নবলক্ষ সৈন্যকে পাঠাব যমঘর || উপলক্ষ বিনা কার্য্য না হয় কখন | উপলক্ষ বিনা বাপু না হয় নিধন || একদন্ড পাঠাইলে অনেক কার্য্য হয় | চারিদিকে বৈ নহে শুখাব অজয় || শিরোধার্য্য সত্বরে দেবীর বাক্য নিল | লোহাটা বর্জ্জর বীর সংগ্রামে সাজিল || ব্যালিশ কোটাল সঙ্গে যমের সমান | তরণি উপরে চড়ে অতি বেগবান || কাড়া শিঙ্গা টমক নিশান ঘনে ঘন | তরঙ্গে তরঙ্গে তরী করিল গমন || পঞ্চমুখে হাতি ঘোড়া রাহুত মাহুত | লোহাটা দিলেক তাড়া যেন যমদূত || অনাদ্যের মায়া কহনে নাঞী যায় | অনাদ্যমঙ্গল দ্বিজ রূপরাম গায় || অকালে অনিল যেন উত্তর অম্বরে | লোহাটা উরিয়া পড়ে লস্কর ভিতরে || আথালি পাথালি সৈন্য হানে ঝনঝন | মধ্যরণে রাউত সর্দ্দার কাটা যান || দুহাতে হেত্যার ধরি উভুদলে চোট | হিমালয় সদৃশ কুঞ্জর যায় লৌট || বারভূঞ্যা বলে যুঝে রাজা গৌড়েশ্বর | উলটি পালটি হানা দিলেক বর্জ্জর || ঘোড়ার হিষুঁনি শুনি হাতির নিনাদ | আকাশ পাতাল ভেদি হইল প্রমাদ || রামরায় সিফাই হাথির পিঠে যুঝে | দামার শব্দ যেন দেবতা গরজে || রণে যুঝে আগুরি দক্ষিণ-চূড়ামণি | সমুখে দিয়াছে হানা রাখে বাণ আনি || কর্ণসেন দিয়াছে দক্ষিণ দিগে হানা | ছয় বেটা রণে যুঝে বাণে বিচতক্ষণা || কেহ বা তুরঙ্গ-পিঠে কেহ বা টাঙ্গনে | পিতার সঙ্গতি পুত্র যুঝে মাঝ রণে || রাজা পাত্র বারণে বসিয়া বলে মার | গুলি পড়ে একা রণে পঞ্চাশ হাজার || গগনে দুরন্ত গোলা পড়ে দামদুম | হুড় হুড় শব্ দে ব্রহ্মার ভাঙ্গে ঘুম || ঢালি পাইক সর্দ্দার সবার আগে যুঝে | ভুজঙ্গের সোনা বলি ( ? ) টাল করে ভুজে || এ কারণে লোহাটা হয়্যাছে লক্ষ জন | হাতি ঘোড়া সৈন্য কাটে না যায় গগন || বসুমতী পদভরে করে টলমল | ভীম যেন নষ্ট করে কুরুসৈন্য বল || রামের টমক যেন নাশে মেঘনাদ | তাকে চায়্যা দ্বিগুণ বাড়িল পরমাদ || কুঞ্জর-ঘটায় যেন সিংহ বলবান | শার্দ্দুল শূকর পানে যেন গতি যান || এক মাথা কাটিতে হাজার মাথা পড়ে | কদলী বিনাশ যেন বৈশাখের ঝড়ে || রণমধ্যে জয়দুর্গা উরিল আপুনি | সঙ্গেতে উড়িল তাঁর চৌষট্টী যোগিনী || ডাকিনী যোগিনী যুদ্ধ করে চারি পানে | চাঁপা ফুল বল্যা হাতি তুল্যা পরে কানে || ডানি হাতে কাতি দরে বাম হাতে খর্পর | বিপর্য্যয় ডাক ছাড়ে ডাগর ডাগর || হাসিতে হাসিতে হাতি চুমুকিয়া খায় | মীন ঘুরাইলে যেন চিলে লয়্যা যায় || রাক্ষসী পিশাচী বস্যা হাসে এক ঠাঞী | সুপরিয়া ( ? ) ঘোড়া গিলে বোল চোল নাঞী || ধাওধাই যুঝে কেহ উলঙ্গ হইয়া | কি খাব কি খাব বল্যা নাচে পাক দিয়া || অতি বৃদ্ধ ডাকিনী ডাগর শব্দ ডাকে | হস্তা যেন জন্তু গিলে চুপ দিয়া থাকে || রণমাঝে অবতার সর্ব্বমঙ্গলা | দুইদন্ড সংগ্রামে পরিল মুন্ডমালা || ডাকাডাকি পড়িল কুচ্ছিত কলরব | সমুখ সমরে সৈন্য ভঙ্গ দিল সব || পালাল্য সর্দ্দারসিংহ সভাকার চুড়া | বাঁশবনে লুকাইল মান্ধাতার খুড়া || দিগে দিগে পলায় রাউত আসোআর | লোহাটা বর্জ্জর বণে বলে মার মার || তাড়াতাড়ি ব্যালিশ দিগার হানে কাটে | আচম্বিতে কুরুক্ষেত্র অজয়ার ঘাটে || হান্যা পেল্যা উলটি পালটি ঝটঝট | আচম্বিতে ভঙ্গ দিল হস্তী ঘোড়া ঠাট || ভঙ্গ দিল মহাপাত্র রাজা গৌড়েশ্বর | কর্ণসেনের ছয় বেটা গেল যমঘর || বারভুঞ্যা সর্দ্দার পালায় দলবল | শোকে রাজা কর্ণসেন তৃষ্ণায় বিকল || রণ জিন্যা লোহাটা বর্জ্জর গেল ঘর | রূপরাম গান গীত অনাদ্যের বর || রাজা পাত্র ভুঞা বঙ্গ দিল রণে | গোউড় সহরে দেখা দিল সর্ব্বজনে || অজয়ার উত্তরে রুধিরের গঙ্গা বয় | লোহাটা ঢেকুর গেল রণ হৈল জয় || ইছাই হইল রাজা ঢেকুর ভেতরে | পুত্রশোকে কান্দে কর্ণসেন নৃপবরে || কান্দিতে কান্দিতে যান গৌড় ভুবন | ছয় পুত্র রণে মৈল নাঞী দেখে গন || বন্ধুঘরে কর্ণসেন দিল দরশন | যুগল নয়ন আঁখি আষাঢ়-শ্রাবণ || বন্ধুঘরে আছেন বনিতা আর দাসী | রাজ্য গেল বিধাতা করিল বনবাসী || শীলাবতী রাণীকে বলএ বিবরণ | ছয় বেটা মৈল তোর ঢেকুরের রণ || সাত পুরুষের ভূম এতদিনে গেল | বনিতা সমুখে শোকে কান্দিতে লাগিল || ছয় বধূ অনুমৃতা হৈল জরাতুর ( ? ) | পুত্রশোকে মৈল রাণী খাইয়া মাহুর || চেয়্যা দেখে দশদিক সব হৈল শূন | ধন কড়ি লুটিল ভান্ডার হৈল উন || শোকে হৈল কাতর অম্বর নাঞী রাখে | মন হৈল পাগল বদনে ভস্ম মাখে || দূরে রাখে অম্বর নিলেক বাঘছাল | এত দিনে ঘুচিল সংসার মায়াজাল || তপস্যা করতে আমি যাব মধুবন | বিশেষ বনিতা শোকে হৈল অচেতন || বৃন্দাবনে তপস্যা করিতে চলে যাই | মনেতে পড়িল তার গৌড়েশ্বর ভাই || বাঘছাল পরিধান তখনি পরিল | পুনর্ব্বার রাজার দরবারে দেখা দিল || রাজার সমুখে আসি কর্ণসেন কান্দে | বারভুঞাগণ সব বুক নাঞী বান্ধে || কর্ণসেন কান্দে তবে নৃপতির পায় | বাঘছাল বুকে দিয়া গড়াগড়ি যায় || ছয় পুত্র মরিতে মরিল ছয় বধূ | অনুমৃতা আনন্দে হইল ছয় বধূ || উভয়সঙ্কটে শোকে মৈল সত্যবতী | গয়া গঙ্গা এহার অবশ্য চাই গতি || আপনার পিন্ডদান করিব আপনি | হাসিতে হাসিতে হারাইনু চিন্তামণি || দ্বিজে দান নাঞী দিনু না বলিনু হরি | মকরন্দ থাকিতে গরল খায়্যা মরি || জ্ঞাতি নাঞী সংসারে বঞ্চিতে যাব কোথা | রমণী মরণে মন হৈল মহীলতা || বড় দুখ মরমে রাখাল ভূম নিল | কর্ণসেন পুত্রশোকে কান্দিতে লাগিল || আশ্বাস করিছে রাজা হাতে দিয়া হাত | মন বাঞ্ছা সদাই আপুনি অচিরাত || আপনার কল্যাণ আপুনি চিন্ত ভাই | ঘরে বসি থাকিলে সকল তীর্থ পাই || গয়া গঙ্গা এখানে পৈরাগ বৃন্দাবন | কিমর্থ পাগল হৈলে সচঞ্চল মন || পুরুষ থাকিতে জোড়ে কতেক পরশ | কেবা নাঞী বিভা করে চারি পাঁচ দশ || আপনা চাহিতে ভাই চাই অনুক্ষণ | তার পাছে জায়া রাখি তবে রাখি ধন || দুখ সুখ সম্পদ সকল মনে পড়ে | নিদারুণ বিধাতা আপুনি ভাঙ্গে গড়ে || অল্পকালে আমার মরিল দুবরাজ | তুমি কেন সমাজ জুড়িয়া কর লাজ || মনদড়া হয়্যা যদি রাম নাম জপে | কি করিব গয়া গঙ্গা কী করিব তপে || দশাগুণে মরি ভাই দশাগুণে তরি | দশাগুণে জনক জননী হয় বৈরী || কালি কিম্বা পরশ্ব তোমার বিভা দিব | রূপবতী রাজকন্যা হুকুমে আনিব || এক রাত্রে দশগন্ডা বিভা দিতে পারি | সংসার ছাড়িয়ে কেন বৈরাগী-বেশ ধরি || দিন কথ ভান্ডার লিখিয়া থাক রায় | মনে দুখ পায়্যাছে সুবর্ণ যেন পায় || এত যদি গৌড়শ্বর করিল আশ্বাস | বাঘছাল রাখিয়া পরিল পট্টবাস || মহারাজ পরাইল অষ্ট অলঙ্কার | শোক পাসরিয়া বৈসে জয়মুনি ভান্ডার || দরবার ভাঙ্গিয়া রায় করিল গমন | বাসাকে বিদায় হৈল বারভূঞাগণ || অনাদ্যার মায়া কহনে নাঞী যায় | দ্বিজ রূপরাম গায় অনাদ্যের পায় || দুই পায়ে রাজার যে উচিত কমল ( ? ) | আগু পাছু নফর ভৃঙ্গার গঙ্গাজল || অন্তর মহল বৈ দিল দরশন | ভানুমতী রাণী বস্যা অপূর্ব্ব আসন || ছোট বনি সমুখে বস্যাছে রঞ্জাবতী | পট্টবাস আপুনি পরাইল ভানুমতী || কথদূর হৈতে দেখে আপুনি রাজন | রঞ্জাবতী কন্যা দেখি ভাবে মনে মন || কোন দেবতার কন্যা মোর অন্তপুরে | রূপ দেখে দেবতা রহিতে নারে ঘরে || এত ভাবি রাজা গেল রাণীর নিকটে | জিজ্ঞাসিল মহারাজা ইনি কেবা বটে || প্রণাম করিয়া বলে ভানুমতী রাণী | রঞ্জাবতী বিদ্যাধরী অনুজা ভগিনী || অনুজা ভগিনী মোর নাম রঞ্জাবতী | কালি আস্যাছিল বনি আঁধিয়া ( ? ) রমতি || কালি পাঠাইয়া দিব বড় দুঃখ মনে | মায়ের জীবন ধন বিদিত ভুবনে || সাধের ভগিনী ছোট মায়ের পরাণ | পরিচয় পায়্যা রাজা বলে বিদ্যমান || রাজা বলে রঞ্জাবতী তুমি হৈলে শালী | আপুনি যাচিয়া দিবে যৌবনের ডালি || রঞ্জাবতী বলে শুন গৌড়ের ঈশ্বর | তোমার সদৃশ কত আমার নফর || পরিহাস ভূপতি করিল কুতূহলে | রাণীকে বলিছে কিছু বসিয়া বিরলে || বিরলে বসিয়া বলে নৃপচূড়মণি | কর্ণসেনে বিভা দিব তোমার ভগিনী || তুমি মন করিলে তাহার বিভা হয় | জ্ঞাতি-বন্ধু পালনে অনেক পুণ্য হয় || ভানুমতী রাণী বলে শুন মন দিয়া | রঞ্জাবতী বিভা যদি দেহ লুকাইয়া || মহাপাত্র এ কর্ম্ম করিতে নাঞী দিব | বুড়া বর কর্ণসেন এ বোল বলিব || তবে যদি এ কথায় তুমি দিলে মন | লুকাইয়া বিভা দেহ গৌড় ভূবন || বসন্তের পাবকে ফেলিলে পদ্মফুল | [ বনি ] কোলে করি কান্দে সহজে আকুল || দুইমতি দিবসের শিশির পালা সায় | অনাদ্যমঙ্গল দ্বিজ রূপরাম গায় || . ****************** . পাতার উপরে . . . মিলনসাগর |