কবি বিজয় গুপ্ত-র মনসামঙ্গল কাব্য
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
১  
মনসার জন্ম পালা

গৌরী কোন্দল পালা     

মনসা বিবাহ পালা     

অষ্ট নাগের জন্ম পালা   

অমৃত মথন পালা   

বনবাস পালা       

হাসন হুসন যুদ্ধ পালা     

গুয়াবাড়ি কাটা পালা       

ধন্বন্তরি বধ পালা     
১০
ছয় কুমার বধ পালা     
১১
ঝালুবাড়ির পূজা পালা  
১২
যমযুদ্ধ পালা      
  ১. শুন শুন আর লোক হয়ে একমন   
২.পূর্ব জনমের ফলে মনসা হরিল ছলে    
৩. উষারে বেড়িয়া কান্দে যত দেব গণ   
৪. ছাড়িয়া লাজ ভয়ে শিবের সাক্ষাতে কয়ে    
৫. তুমি জগন্নাথ সংসারের সার    
. চল চল আরে দূত জড়িয়া বাণের সুতা    
৭. বিষের জ্বালায় দূত করে ছটফট   
৮. সাজ সাজ বলে দূত লোহার মুদগর হাতে   
৯. পদ্মাবতী আই সবারে দেও বর   
১০. শুন শুন আরে দূত শুন রে বচন    
১১. ছোট বড় নাগ সাজে চলিল পদ্মার কাজে   
১২. রণস্থলে পদ্মাবতী আসিয়া তখন    
১৩. বাপের স্ত্রী সতাই গেলাম তাঁহার ঠাঁই    
১৪. সেই পদ্মাবতী সবারে দেও বর   
১৩
যাত্রাপাটন পাটন পালা     
১৪
বস্তুবদল পালা     
১৫
ডিঙ্গা বুড়ান, লক্ষ্মীন্দরের জন্ম ও চান্দ লাঞ্ছনা পালা
১৬
লখিন্দরের বিবাহের জোড়ানি পালা    
১৭
লোহার বাসর ঘর নির্মাণ পালা     
১৮
লখিন্দর বিবাহ পালা       
১৯
লখিন্দর দংশন পালা   
২০
ভাসান পালা      
২১
স্বর্গারোহণ পালা     
লঘুজাতি কাণী কহে অশেষ লাঞ্ছনা |
চম্পক নগরে মোর পূজা করা মানা ||
যত গালি চান্দ মোরে দেয় দন্ডে দন্ডে |
তোমার দিক চাহি তার মুন্ড রাখি কন্ঠে ||
বাম পায়ে ভাঙ্গে ঘট নাহি করে শঙ্কা |
হেতালের বাড়ি দিয়া কাঁক করিল বেঁকা ||
বিষ খেয়ে মরি কিবা সমুদ্রে দিব ঝাঁপ |
চান্দর নাম শুনি মোর ডরে লাগে তাপ  ||
তাহার ঘরণী সোনা অতি বুদ্ধিমতি |
শিশুকাল হইতে মোরে পূজে দিবারাতি ||
নাগে নষ্ট করিল তাহার পুত্র ছয়জন |
পুত্র শোকে গালি দেয় মোরে সর্বক্ষণ ||
ঝালুয়ার মন্ডপে তারে দিছি পুত্রবর |
কোন বুদ্ধি করিব বল দেব মহেশ্বর ||
মোর বরে তাহার গর্ভে জন্মিবে কুমার |
তাহা হইতে হবে মোর বাদের উদ্ধার ||
তোমার চরণে বাপ মোর নিবেদন |
সেনেকার গর্ভে জন্ম হইবে কোনজন ||
মোর যাত্রাফলে কার্য দৈবযোগ ঘটে |
দূরের সাধন আসি মিলিল নিকটে ||
অনুরুদ্ধ ঊষা দুই দেবচরিত্র হতে |
আজ্ঞা কর দুইজনে নেই পৃথিবীতে ||
অনিরুদ্ধের জন্ম হবে সোনেকার উদরে |
ঊষা জন্ম লওয়াইব সাহে বানিয়ার ঘরে ||
পরম সুন্দর হইবে প্রথম যৌবন |
দুইজনের করাইব বিবাহের ঘটন ||
আপনার নিজ কার্য করিয়া সাধন |
আরবার আনিব তোমার সদন ||
পদ্মার বচনে শিব ভাবে মনে মন |
কহিতে লাগিলা ঊষা অনিরুদ্ধের কথন ||
ঊষা অনুরুদ্ধ আমি দিব তোমার হাতে |
আমার গোচরে পালন করিও ভালমতে ||
অনিরুদ্ধ ঊষা মোর প্রাণের দোসর |
মর্ত্যলোকে দুঃখ তারে না দিও বিস্তর ||
মোর বোল না শুনিয়া যদি দাও তাপ |
তুমি নহে কন্যা আমার আমি নহে বাপ ||
মহাদেব পদ্মাবতী যত কহে কথা |
তাহা শুনিয়া উষার মনে লাগে ব্যথা ||
বিজয় গুপ্ত কবি কহে সঙ্কেত প্রবন্ধ |
পয়ার এড়িয়া বল লাচারির ছন্দ ||

.                                   ****************                         
সূচি...    


মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা

                  ৩
উষারে বেড়িয়া কান্দে যত দেব গণ |
অধোমুখী হইয়া কান্দে দেব নারায়ণ ||
জয়া বিজয়া কান্দে আপনে ভবানী  |
আরের কি কাজ কান্দে গঙ্গাঠাকুরাণী  ||
কার্তিক গনেশ কান্দে ভবানী নন্দন |
চারিদিকে হুড়াহুড়ি কান্দে দেবগণ ||
রম্ভা উর্বশী কান্দে আরো চিত্ররেখা |
না জানি কতদিনে আর হয় দেখা ||
ঊষার ক্রন্দন যদি হইল অবসান |
অনিরুদ্ধ কান্দে শিবের বিদ্যমান ||
অনিরুদ্ধ বলে শিব ঠাকুরালী ভাল |
গোরা কাটিয়া গাছ উপরে জল ঢাল ||
কামদেবের তনয় অনুরুদ্ধ ছাওয়াল চরিত |
শিবের চরণ ধরি কান্দে বিপরীত ||
বৈদ্য বিজয় গুপ্তের সরস রচিত |
চন্ডিকার প্রসাদে রচিল মনসার গীত ||
লাজ ভয় এড়ি ঊষা উচ্চৈস্বরে কান্দে |
এই কালে বল ভাই লাচারির ছন্দে ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
মনসামঙ্গল কাব্যের সূচি
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা



পূর্ব জনমের ফলে                  মনসা হরিল ছলে
মোরা অভাগিনী  অভাজন |
ভুমে লোটাইয়া গাও            ধরিয়া শিবের পাও
তুমি শিব সংহার কারণ ||
পোড়া কপালের ফলে           হারালাম এক কালে
মোরে শাপ দিলা অকারণ |
তব কন্যা পদ্মাবতী                কপট করিল অতি
কামরূপে ভুলাইল মন ||
ঐ যে নাগের পরে              ওই খাইয়াছে মোরে
ওর লাগি যাব ক্ষিতিতল |
চাহিল যে বিষদৃষ্টে                তাল ভঙ্গ পাও টুটে
এনা দোষে দিলা মোরে ফল ||
মুই অভাগিনী নারী                  দুর্লভ অমরা পুরী
ছাড়িয়া যাইতে দুঃখ লাগে |
যোনিতে কঠোর বাস            শুনে মোর লাগে ত্রাস
কত পাপ করিলাম যুগে যুগে ||
অনুরুদ্ধ মোর পতি                   বাসুদেবের নাতি
কামদেব আমার শ্বশুর |
পালিয়া গৌরব তার                 না রাখিলা একবার
তুমি শিব নিদয় নিষ্ঠুর ||
মহাদেব বলে ঊষা                 তোমার দৈবের দশা
এ হেন করিল দৈবগতি |
এতকাল মোর আগে                 নৃত্য কর অনুরাগে
তাহে কেন এল পদ্মাবতী ||
আর না ভাবিও মনে              সপিলাম পদ্মার স্থানে
পদ্মা তোমা করিবেন উদ্ধার |
মর্ত্যে ভুঞ্জিয়া রাজ                  সাধিয়া পদ্মার কাজ
নিকটে আসিও আরবার ||
শিবের সদয় ভাবে                    প্রশংসিল সর্বদেবে
উষারাণী হইল নিঃশব্দ |
পদ্মাবতীর শ্রীচরণে                  সানন্দে বিজয় ভণে
শুনিয়া কৌতুক সভাসদ ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা



ছাড়িয়া লাজ ভয়ে                  শিবের সাক্ষাতে কয়ে
তুমি দেব ভুবন কারণ |
তুমি দেব ত্রিপুরারি                    হইলা আমার বৈরী
বিনা অপরাধে দিলা শাপি |
শিশু হতে করি আশ             তাখে তুমি করিলা নাশ
তোমার পায়ে আমি বড় পাপী ||
নিজ অনুগত জন                     শাপি দিলা কি কারণ
মোর পিতামহ বনমালী  |
তোমা সেবক বাণ অসুর         ঊষার জনক মোর শ্বশুর
যাহার কারণ কইলা যুদ্দ ভারি ||
তিলেক গৌরব তার                    না রাখিলা একবার
তুমি শিব নিদয় নিঠুর |
বিজয় গুপ্তে বলে সার                 মোর গতি নাহি আর
দেবী পদ্মাবতী দয়া কর ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
*
ব্রহ্মা বলে শুন ঊষা আমার বচন  |
তোমারে বর দিব আমি তাহে দেও মন ||
শুনিয়া ব্রহ্মার বাক্য ঊষা হরষিত |
প্রণাম করিয়া ঊষা পড়িল ভূমিত ||
ঊষা বলে ব্রহ্মা তুমি দেবের প্রধান  |
আমার যত পাপপূণ্য তোমার বিদ্যমান ||
সংসারের সার তুমি জগত গোসাঞি |
লুকাইয়া পাপ করলে তোমার অবিদিত নাই ||
মোর যত পাপপূণ্য কহি তোমার ঠাঁই |
মহাদেবের শাপে আমি নরলোকে যাই ||
স্বরূপে গোসাঞি তুমি মোরে দিবা বর |
তোমার প্রসাদে যেন হই জাতিস্মর ||
ঊষার বচনে ব্রহ্মা দুঃখিত অন্তর |
এবমস্তু বলিয়া ঊষারে দিল বর ||
ব্রহ্মা বলে ঊষা তুমি করিলে বড় কর্ম |
সবুষ জাতি হইয়া স্মরিলা পূর্ব ধর্ম ||
মোর বরে হবে তোমার সুন্দর আকৃতি |
সংসারের স্ত্রী হইতে হবা তুমি সতী  ||
সুবর্ণ রজত লৌহ তামা পিতল |
তোমার অগ্নি জ্বালে হইবে কোমল ||
সঙ্গীতজ্ঞানে গৌরব করিবে সর্বজন |
মরিলে মরা জীয়াইবা হারাইলে পাইবা ধন ||
অনিরুদ্ধ পতি তোমার হইবে অবশ্য |
নরলোকে ইহার না করিও রহস্য ||
সাত পাঁচ দুঃখ কিছু না ভাবিও মনে |
দুই কুল উদ্ধারিয়া আসিবা কত দিনে  ||
অন্তর্ধান অগ্নিদেব হইল তখন |
স্বরূপে অগ্নিতে প্রবেশ করিল দুইজন ||
চন্দন কাষ্ঠের অগ্নি জ্বলিছে প্রচুর |
এক দৃষ্টে চাহে সব মন্দাকিনীর কূল ||
যখনে অগ্নিতে প্রবেশ করিলা দুইজন |
চিত্রগুপ্ত করে যমপুরে লিখন ||
আয়ুশেষে পরমায়ু দিনে দিনে টাকি |
পাতায় পাতায় লিখে ওয়াসিল বাকী ||
টুটিল কাল তাহার আয়ু হইল শেষ |
কোন দূত পাঠাইয়া করহ আদেশ ||
চিত্রগুপ্তের মুখে যম শুনিয়া বচন |
দোহারে আনিতে দূত পাঠায় তিনজন ||
ত্রিদশ ত্রিশিরা আর শূকর বদন |
লোহার দড়ি পরিধান রক্ত লোচন ||
লোহার দড়ি লইয়া চলে মুষল লোহার |
বায়ুগতি যায় দূত শূন্যে করি ভর ||
তাড়াতাড়ি যায় দূত জাহ্নবীর তটে |
বেড়িয়া রহিল গিয়া কুন্ডের নিকটে ||
লোহার মুদগর মারে কুন্ড চাপিয়া |
অনিরুদ্ধ ঊষার প্রাণ লইল কাড়িয়া ||
অনিরুদ্ধ ঊষার প্রাণ দূতে লইয়া যায়  |
পাকল আঁখি করিয়া বিষহরি চায় ||
কোথা হইতে আসিয়াছ তুই বেটা কে |
প্রাণে যদি না মরিব পরিচয় দে ||
পাপীজন নিতে তোর যমের অধিকার |
পূণ্যজন নিতে যম কোথাকার ছার ||
দ্বারকার লোক নিতে না পার একগোটা |
হরিশচন্দ্র রাজা হইতে মোর দেখ টুটা ||
কোন কর্ম করিতে যম হইল উপযোগ |
সর্বক্ষণ পাপ ভুঞ্জে শরীরে বাড়ে রোগ ||
দূত বলে পদ্মাবতী বৃথা হও কুপিত |
আমার যমের অধিকার সংসার বিদিত ||
স্থল জল হুতাশন ভাস্কর আদি যত |
লম্বোদর লম্ব অষ্ট দেখিতে অদ্ভুত ||
হেন যমের পদ্মা যে হয় তাপি |
যমের দোষ নাই সেই সব পাপী  ||
ত্রিদশ ভুবনে মোর যম মহাশয় |
তাহার প্রসাদে মোর কারে নাহি ভয় ||
যাহার নুন খাই তাহার কর্ম করি |
অকারণে পাকল আঁখি কর বিষহরি ||
যমের প্রসাদে নাই কাহার কুপ্পরি |
অকারণে লজ্জা পাইবা জয় বিষহরি ||
দূতের মুখে পদ্মাবতী পাইয়া অনুত্তর |
নাগগণের তরে দেবী বলে ধর ধর |
ধর ধর বলিয়া দেবী জ্বলিয়া গেল কোপ |
হরিণ দেখিয়া হেন বাঘে মারে ছোপ ||
পদ্মার আদেশে নাগ মারিলেক ছোপ  |
শুকনা কাষ্ঠেতে যেন কুড়ালের কোপ  ||
বিস্তর দুর্গতি কৈলা কেহ নাহি কাছে  |
ঝড়ে উড়াইল যেন দুই তাল গাছে  ||
বিষের আজরে লোটায় ভূমিতলে |
অনিরুদ্ধ ঊষার জীব পদ্মা বাঁধিল আঁচলে  ||
এতেক শুনিয়া দূত পদ্মার বচন |
দুই জনের জীব লইয়া করিল গমন  ||
এতেক দেখিয়া তবে দেবী বিষহরি  |
ধামু ধামু বলি পদ্মা ডাকে শীঘ্র করি ||
পদ্মাবতী বলে নাগ শুনরে বচন |
দুই দূতে ফল দেও যেন লয় মন  ||
চারি নাগ লইয়া ধামু চলিলা আপনি |
বায়ুগতি চলে যেন হেন অনুমানি ||
দেখিতে না দেখি যেন বায় উড়ে রেখা  |
ধামুর সঙ্গে যমদূতের পথে হৈল দেখা ||
ধামু নাগের সহিত দূতের পথে হইল দ্বন্দ্ব |
এই কালে বল ভাই লাচারির ছন্দ  ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা



চল চল আরে দূত               জড়িয়া বাণের সুতা
উহার মাতা মনসার দাসী |
যে জন পদ্মার দায়                তারে নারে যমরায়
আর যেবা জন মরে কাশী ||
অনুচর তুই ছার                পদ্মারে না বলে আর,
সকল সংসারে যারে পূজে |
যেজন গঙ্গায় মরে                যম নিতে নাহি পারে
সে জন বৈকুন্ঠে সুখ ভুঞ্জে ||
তার প্রভু ধর্মরাজ              সেই কিবা বোঝে কাজ
কেবা তারে হেন বুদ্ধি দেও |
বিচারিয়া চাহ পাছে            কোন কালে হেন আছে
পদ্মার সেবক জনে নেও ||
অহঙ্কারে ধামু রোষে             কোপে যত দূত হাসে
ঘনঘন মোচরায় দাড়ি |
কোপ মুখে যম দূতে               লোহার মুদগর হাতে
ধামুরে মারিতে মারে বাড়ি ||
পঞ্চনাগ একভিত                     রুষিল দূতের চিত
সংগ্রাম বাধিল অদ্ভুত |
বিজয় গুপ্ত কবি কয়                 রসিকের মনে লয়
নাগ মুখে দাঁড়ান যমদূত ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
*
শুনিয়া দূতের কথা ধর্মের নন্দন |
জ্বলিয়া উঠিল যেন জলন্ত হুতাশন ||
যম বলে আরে দূত শুন মোর বাণী  |
মোর দূত মরিয়াছে কানি বড় প্রাণী ||
নর বেটা চান্দ তারে জিনিতে না পারে |
আজি সে কানি কি আমার দূত মারে ||
আমার সঙ্গে বাদ করে এত বড় পদ |
আজি রণে আসিলে হইবে স্ত্রী বধ ||
এত বড় দর্প কানির কিছু নারে বোঝে |
শৃগাল হইয়া সে সিংহের সঙ্গে যোঝে ||
সিংহের সনে যুঝিতে আসে হইয়া শৃগাল |
আজি রণে করিব তার বংশের পাখাল  ||
সাজ সাজ আরে দূত পর তাড়াতাড়ি  |
ঝাটে করি মার গিয়া জয় বিষহরি  ||
শুনিয়া যমের বাক্য যত সৈন্যগণ  |
রণমুখে ধাইয়া চলে হরষিত মন  ||
বিজয় গুপ্ত বলে গাইন কৌতুক হইল বড়ি |
এই কালে বল ভাই সরস লাচারি  ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা



সাজ সাজ বলে দূত            লোহার মুদগর হাতে
ঝাটে সাজ উষা আনিবার  |
যমে হাহাকার করে              পাঁচশত দূতে লড়ে
জয় জয় করে আনিবার ||
সাজিয়া যমরায়                    যুদ্ধ করিতে যায়
সাজ সাজ বলে দূতগণে |
বীর দর্পে লড়ালড়ি                সবে করে হুড়াহুড়ি
সাজিয়া চলিলা সর্বজনে | |
জয়ধর্ম জয়মঙ্গলা               যমরাজার দুই শালা
আগুয়ান চলে দুই জন |
ধর্ম ধর্মক্ষ দূত                    আর চলে যায় ভূত
চলে সবে হরষিত মন ||
কালা চোরা নিশা খোঁড়া         নিলজ্জিত দন্ত মুড়া
বিষমুখা বিকট দশন |
জয়মঙ্গলা কালা                 যমরাজের দুই শালা
ভাটির রাজ্যে যাহার আসন ||
এক দূত নামে লোদ             হাতে পায় চারি গোদ
তাহার ভাই শূকরবদন |
এক দূত নীলাই                      এই আছে এই নাই
তারা যেন সঞ্চরে গগন ||
এক দূত ব্রজকাল            যাহার কান্ধে লোহার শাল
মূলাদাঁতী খিচরীর ভূত |
দেখিয়া তাহার সাজন                 চলে যত দূতগণ
সমরে চলিলা রবির সুত ||
ত্রিপদ ত্রিশিরা লড়ে                  যমের হুঙ্কার পড়ে
সাজ সাজ বলে দূতগণে  ||
দেখিয়া কটকের সাজন               কৌতুক ধর্মরাজন
চলে যম যুদ্ধের কারণে ||
সাজিল যে ধর্মরায়                   যুদ্ধ করিবারে ধায়
রণভূণি করিল পয়ান |
ধূমধুমী বাদ্য বাজে                যুদ্ধ করিবারে সাজে
যত দূত ধরিল যোগান ||
নারদ কহে বিবরণ                    শুনে যত দেবগণ
দেখিতে আসিল পুরন্দর |
সকল দেবতা সাজে                 রণজয়ী বাদ্য বাজে
যম হইল বৈতরণী পার ||
যে সকল হইল পার                 নাহি কাহার নিস্তার
আপনি হরিবা যমরায় |
যদি নিজে ভাল চাহ                   পদ্মার শরণ লহ
বৈদ্য বিজয় গুপ্তে গীত গায় ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
*
তোমার সহিত যম করিবেক রণ  |
তে কারণে আমা সব পাঠাইছে শমন  ||
আমা সবার কথা দেবী শুন গো বচন |
অনিরুদ্ধ উষার জীব দেও এইক্ষণ ||
নহে আসি যুদ্ধ কর যদি লয় মন |
আজুকার যুদ্ধে হইবে তোমার নিধন ||
আমার যমের সনে বাদ করে হেন জন নাই |
আজুকার যুদ্ধে হইবে তোমার নিধন ||
আমার যমের সনে বাদ করে হেন জন নাই |
আজুকার যুদ্ধে তোমার ভাঙ্গিবে বড়াই ||
দূত মুখে পদ্মাবতী শুনিয়া বচন |
জ্বলিয়া উঠিল যেন জ্বলন্ত হুতাশন ||
কোপে রাঙ্গা আঁখি পদ্মা চাহে চারি ধারে |
মোর আগে বেটা এত অহঙ্কার করে ||
স্ত্রী জাতি দেখিয়া মোরে নাহি ভাবে সম |
আজি রণে পশিলে হইবে যমের যম ||
এতেক শুনিয়া দূত চলিল সত্বর |
কহিল সকল কথা যমের গোচর ||
শুনিয়া দূতের কথা যমের পরিপাটী  |
সংবাদ দিয়া আনে পদ্মা নাগ উনকোটি ||
বিজয় গুপ্ত বলে গাইন কৌতুক হইল বড়ি |
এই কালে বল ভাই সরস লাচারি ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কি বুদ্ধি করিব নেতা বল এইক্ষণ  ||
নেতা বলে পদ্মাবতী শুন গো বচন  |
আমি বিদ্যমানে চিন্তা কর কি কারণ ||
এক যুক্তি বলি দেবী তাহে দেও মন |
সংবাদে উনকোটী নাগ আন এইক্ষণ ||
তাহার চতুর্দশ যম মোর নাগ উনকোটী |
বিষ জ্বালে পুড়িয়া মারিব না রাখিব একগোটি ||
নেতার বচনে পদ্মার আনন্দিত মন |
নাগ নাগ বলিয়া দেবী করিল স্মরণ ||
আসিল উনকোটী নাগ দেবীর দরশন |
দেবী বলে নাগ তোমরা শুনরে বচন ||
কিরূপে জিনিব যম রবির নন্দন |
নাগগণে বলে মাতা চিন্তা নাহি মন ||
আমরা জিনিব যম রবির নন্দন |
নাগগণে বলে মাতা চিন্তা নাহি মন ||
নাগের কথায় পদ্মাবতী আনন্দিত মন |
নাগ আভরণ পরি চলিল তখন ||
কামরাজ নাগ পরে সিঁথিতে সিন্দুর |
কর্ণফুলিয়া নাগে দেবী পরে কর্ণফুল  ||
পায় পাশুলি শোভিয়াছে ধোড়া |
পায়ের মল খাড়ু বিঘতিয়া বোড়া ||
তেসারিয়া সাপে দেবীর হৃদয়ের কাঁচুলি |
পিঙ্গলিয়া নাগে পরে পলার হাঁসলী ||
মণিনাগ দিয়া দেবীর মাথায় মণি জ্বলে |
নাগ আভরণ দেবী সাজিল শরীরে ||
নাগরথে চড়িয়া দেবী আনন্দিত মন |
নেতার সংহতি করি চলিল তখন ||
সমুদ্রের কূলে করিলা রণভূমের স্থান  |
কোটী কোটী নাগে গিয়া ধরিল যোগান ||
বৈদ্য বিজয় গুপ্ত মনসার দাস |
যাহার কবিতায় হইল গীতের প্রকাশ ||
তোমার চরণে মাগো রহুক ভকতি |
বলিব লাচারির গীত পয়ারের গতি ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা

১১

ছোট বড় নাগ সাজে                     চলিল পদ্মার কাজে
রণসাজে সাজায় ব্রাহ্মণী |
প্রথমে অনন্ত চলে                     শিরে হাজার মণি জ্বলে
গর্জনেতে কাঁপে মেদিনী  ||
জয় জয় দিয়া হাঁক                          চলিল তক্ষক নাগ
বিষজ্বালে দহে রবি শশী  ||
যত বৃক্ষ আশপাশ                            সকল হইল নাশ
আকাশে উঠিল ভস্মরাশি ||
জয় জয় বাদ্য বাজে                     উনকোটী নাগ সাজে
মনসা সাজিল নাগরথে |
বিজয় গুপ্ত সুরচিত                        রচিল পাঁচালী গীত
মনসার চরণ ধরি মাথে ||
পদ্ম মহাপদ্ম চলে                             গর্জনে ধরণী টলে
যাহার বিষে মোহ দেবরাজে |
ফুলি কর্কট নাগে                             চলিল সবার আগে
আপনি চলিলা নাগরাজে ||
ফণী নাগ চলে ধাইয়া                       বিষের ভান্ডার লইয়া
যাহার ঘায় নাহিক নিস্তার |
নাগগণ সঙ্গে করি                               বিচিত্র রথে চড়ি
নেতা হইলা আবাসের বাহির ||
আর নাগ মহাকাল                           মুখ যাহার পাতাল
পদ্মারে প্রণাম করি বলে  |
যদি আজ্ঞা কর তুমি                       যমেরে গিলিব আমি
কোন কার্যে আর নাগ চলে ||
এইরূপ নাগ সবে                             প্রণাম করিল তবে
রণস্থলে মিলিল তখন
বিজয় গুপ্তের প্রবন্ধ                        রচিল লাচারির ছন্দ
দেখিয়া হরিষ সর্বজন ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
*
অর্ধচন্দ্র বাণ যম লইল তখন ||
জীবন্যাস করিয়া বাণ এড়ে শীঘ্রগতি |
পবনবাণে নিবারিল দেবী পদ্মাবতী  ||
শিলামুখ বাণ দেবী করিল সন্ধান |
ইন্দ্রবাণে যমরাজ করে দুইখান ||
ঐশিক বাণ যম এড়িলা ধনুকে |
বজ্রঘাত শব্দে পড়ে মনসার বুকে ||
বাণ খেয়ে মোহ গেলা পদ্মাবতী |
গরুর বাণ যমরাজ এড়ে শীঘ্রগতি ||
গরুর দেখিয়া যত সর্প পলায় |
রহ রহ বলিয়া ডাকে দেবী মনসায় ||
অর্ধচন্দ্র বাণ এড়ে দেবী পদ্মাবতী  |
সেই বাণে কাটিলেন যমের সারথি ||
নেতা বলে পদ্মাবতী হও স্থির কায়া |
এড়হ অনন্ত বাণ চুর হইবে মায়া  ||
নেতার বচনে আনন্দিত মন |
যত মহেন্দ্র অস্ত্র এড়িল তখন ||
যত যত ব্রহ্মঅস্ত্র মনসার শিক্ষা |
যম রাজার উপর করিল পরীক্ষা ||
বাণ ঘায়ে ব্যথা পাইয়া ধর্মরায়ে |
কাল মুদগর তুলিয়া লইল বাহে ||
মুদগর লইয়া যম থর থর কাঁপে  |
ডাক দিয়া মনসারে বলে মহাকোপে ||
যম বলে কানি সাহস বুঝি থাক |
এড়িলাম মুদ্গর আপনারে রাখ ||
এই বলিয়া যমরায় এড়িল তখন |
মুদ্গর দেখিয়া পদ্মা ভয় পাইল মন ||
নেতা নেতা বলে ডাকে ঘনে ঘন |
নেতা আসি হেন কালে দিল দরশন ||
মুদ্গর ফুটিয়া পদ্মা ভয় পাইল ব্রাহ্মণী |
নেতা বলে দেবী তুমি দুষ্ট-সংহারিণী ||
যাবৎ নহে য়মরায় করে উপহাস |
অনন্ত ঘিরিয়া তুলি এড় নাগপাশ ||
নেতার বচনে মনসা পাইল সন্ধি |
এড়িলেক নাগপাশ যম হইল বন্দী  ||
হাসিয়া মনসা দেবী চলিল তখন |
সত্বরে চলিয়া গেল যমের সদন  ||
হরিষে মনসা দেবী ধরে তাহার হাতে |
গলায় কাপড় দিয়া তুলিলেক রথে ||
বিজয় গুপ্ত বলে ভাই কৌতুক হইল বড়ি |
সংবাদ পড়িল গাইন বলরে লাচারি ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা

১৩

বাপের স্ত্রী সতাই                      গেলাম তাঁহার ঠাঁই
বাদ করিলাম তাঁহার সনে  |
অনেক কাকুতি তায়                 কার্তিকে ধরিয়া পায়
তবে গৌরী জিয়াইলাম আমি  ||
আমার বিষের তেজে                    নীলকন্ঠ দেবরাজে
আপনে হইল অচেতন ||
কিসেরে বা মা কর রাও                মাথায় তুলিয়া চাও
যুদ্ধ হারিলা রবির নন্দন ||
এত তিন ভুবনমাঝে               মোরে জিনে কেবা আছে
ইহা তুমি না শুনিও কানে ||
আমার বিষের ঘায়                    ইন্দ্রাদি দেব স্থির নয়
তাতে কিরূপে জিনিবা সকলে ||
পদ্মার অভক্ত যে                          অবিলম্বে তার ক্ষে
ভক্তজনে সর্বত্র কল্যাণ ||
বিজয় গুপ্ত কহে সার                   মোর গতি নাহি আর
সভাসদে কহে সম্মান ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
*
নাগপাশে মনসা করিল দেখ বন্দি ||
নারদ বলেন যম না কান্দিও আর |
অনিরুদ্ধ ঊষা পদ্মা পাইল শিবের দ্বার ||
( নারদ বলিল দেবী শুন গো বচন |
বিদায় দেও যাউক যম আপন ভবন ||
নারদের বচনে পদ্মা করিলা আদেশ  |
যম ছাড়িয়া নাগ সব গেল নিজ দেশ ||
পদ্মা বলে যম কেন করিলা বিবাদ |
মিছা মিছা পাইলা দুঃখ ক্ষম অপরাধ ||
যম বিদায় দিল জয় বিষহরি |
আনন্দে চলিয়া গেল আপনার পুরী ||
নারদ চলিয়া গেল ব্রহ্মার গোচরে |
যাহার যে নিজালয়ে চলিল সত্বরে || )
বিজয় গুপ্ত রচে পুঁথি মনসার বর |
যম যুদ্ধ পালা গাইলাম এখানে সোসর ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা


( শুন শুন আর লোক হয়ে একমন |
সরস প্রসঙ্গ যত গীত বিবরণ ||
সেই সব কথা শুন কর্ণপুট ভরি |
যেই রূপে অনিরুদ্ধ হরিল বিষহরি ||
এক দিন অনিরুদ্ধ ঊষা দুইজন |
পর্বত শিখরে দোহে করিছে ভ্রমণ ||
ছয় পুত্র শোকে সোনা করিছে ক্রন্দন |
তাহা দেখি ঊষারাণীর বিষাদিত মন ||
ঊষা বলে শুন প্রভু আমার বচন |
কিরূপে সোনেকার হবে শোক নিবারণ ||
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা

                 ৫
তুমি জগন্নাথ সংসারের সার |
বিনা অপরাধে শাপ হইল ঊষার ||
শিশুকাল হইতে থাকি তোমার পাশে |
কামদেব তনয় প্রভু তোমার দাসে ||
তোমাতে ভক্তি না হইল মুই ছার পাপী |
নিজ অনুগত গোসাঞি কোন দোষে শাপি ||
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা

               ৭
বিষের জ্বালায় দূত করে ছটফট |      
অনেক শান্তিতে গেলা যমের নিকট ||
সর্বাঙ্গে নাগের গা রক্ত পড়ে বাহিয়া |
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা

                ৯
পদ্মাবতী আই সবারে দেও বর |
বৈতরণী পার যম হইল সত্বর ||
একে একে পার হইল বৈতরণী জল |
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা

                ১০
শুন শুন আরে দূত শুন রে বচন |
কি করিতে পারে মোরে ধর্মের নন্দন ||
এত বড় দর্প বেটার বলিয়া পাঠায় সে |
সে তো নরের যম চার যম কে ||
এই  কথা কহিও দূত তোর ধর্মরাজের আগে  |
সুখে থাকিতে তারে বিধি বিধি বাদে লাগে
আমারে নারী লোক দেখে পুরুষ সেই জন  |
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা

                 ১২
রণস্থলে পদ্মাবতী আসিয়া তখন |
নেতা নেতা বলি দেবী ডাকে ঘন ঘন ||
পদ্মার আদেশে নেতা আসিল তখন |
পদ্মাবতী বলে নেতা শুন গো বচন ||
যত নাগ আসিয়াছে যুদ্দ করিবারে |
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

যমযুদ্ধ পালা

                 ১৪
( সেই পদ্মাবতী সবারে দেও বর |
বন্ধন সহিত যম রহিল সত্বর ||  )
এই পাতায় কোনো ভুল-ত্রুটি চোখে পড়লে অথবা যদি
কোথাও ভুল বলে মনে হয়, তাহলে আমাদের এই ইমেলে
জানাবেন। আমরা শুধরে নেবার চেষ্টা করবো।
srimilansengupta@yahoo.co.in