নারিকেল খাইয়া রাজা হইল আনন্দিত |
আজু হইতে হইলা আমার মিত ||
বৈদ্য বিজয় গুপ্ত মনসাকিঙ্কর |
আর নারিকেল রাজা আনিল সত্বর ||
জলপানে তুষ্ট রাজা করে হুড়াহুড়ি |
এইকালে বল বল ভাই সরস লাচারি ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
৮
উষার মা ভাই কান্দে কোতোয়াল চান্দরে বান্ধে ভিন দেশে সাধুর অপমান | ধনা বলে একি হইল নারিকেল খেয়ে উষা মৈল আমা সবা হইল নিদান || হায় হায় কি হইল কেন বা ঊষা মরিল এযে মোর বিষম সঙ্কট | ধনা বেটা সন্ধি জানে পাইক ডাকে হাতসানে যাও তোমরা রাজার নিকট || ঊষার চাহিয়া সারা আগুন জ্বালিল ত্বরা দিল ঊষার মার্গেতে জ্বালিয়া | ঊষার মার্গে অগ্নি দেয় বলে বিষ হইল ক্ষয় তখনে লড় দিলেক উঠিয়া || ধনা বলে হায় হায় মরা মানুষ লড়ে ধায় এদেশে এমন বিচার | পদ্মাবতী দরশনে সানন্দে বিজয় গুণে সহায় হইল সদাগর ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
|
কবি বিজয় গুপ্তর মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
১০
তোমার দেশেতে যাব এক লক্ষ টাকা লব পেট ভরি খাব নারিকেল | আমার পাপিষ্ঠ রাজ তাহাতে পড়ুক বাজ এদেশে না হয় হেন ফল || শুনিয়া রাজার কথা পুরোহিত ওঝা তথা বলে রাজা আমি যাব সঙ্গে | শুনিয়া দ্বিজের বাণী কোতোয়াল বলে পুনি রাজা সঙ্গে আমি যাব রঙ্গে || ধন্য করে শিব পূজা ধন্য তুমি দেশের রাজা যে দেশে উপজে নারিকেল | সাধু বাণিজ্যে আইল বড় ভাগ্যে মিতা পাইল বিধি মোরে মিলাইল সকল || বলে পুরোহিত ওঝা একেলা কি যাবা রাজা তুমি যাইতে সাথে যাব আমি | শুনিয়া ব্রাহ্মণের বাণী পাত্র মিত্র কানাকানি দাস হইয়া সঙ্গে যাব আমি || রাজার অভিলাষে খল খলি চান্দ হাসে ভিন্ন দেশে যাবা রাজা হইয়া | যত নারিকেল নাও বত্সরে খাইলে না ফুরাও ধন দিয়া তুল বদলাইয়া || রাজা বলে শুন মিতা কহিছ উচিত কথা আমি নহে ধনেতে কাতর ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
|
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
৭
যদি সে রাজা মোর লইবা জীবন |
গোটা কতক কথা আমি করি নিবেদন ||
কান্দিয়া উষা দ্বারী কহে রাজার ঠাঁই |
সাতটি পরিজন আমার পালিবা গোসাঞি ||
তোমায় কহিলাম ঠাকুর মনে দুঃখ রহিল |
কাহার মুখ চাহিবে পুত্র খোদায় দুঃখ দিল ||
কাঁলাবলী নামে প্রিয়া সেবায় আগল |
অন্তকালে দেখা না হইল মোর কর্মফল ||
দৈবে মরিব মুই যেন করিলাম সার |
আমা হেন সেবক রাজা নাহি পাবা আর ||
হাতে নারিকেল উষা চারিদিকে চায় |
নারিকেল খেয়ে পাছে তার প্রাণ যায় ||
জল দেখিয়া নারিকেল দূরেতে ফেলায় |
ছলে মোহ দেখাইল বিষহরি মায় ||
ধর ধর করি সবে চান্দরে ধরিয়া |
সভার সাক্ষাতে তারে কিলায় পাড়িয়া ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
১১
নপুংসক লোক রাজা আনে ডাক দিয়া |
বাড়ির ভিতর মূলা দিল পাঠাইয়া ||
মূলার যত গুণ কহিতে নাহি অন্ত |
ইহার বদলে দিবা গজ হস্তীর দন্ত ||
হস্তীর দন্ত দেখিয়া চান্দ হাসে মনে মনে |
বিজু সিজু ডিঙ্গায় ভরিল ততক্ষণে ||
দুই মিত্র একত্র হইয়া করিল মন্ত্রণা |
রাজা দিল কোতয়াল চান্দ দিল ধনা ||
দোহে দোহার বস্তু আনে ভাগে ভাগে |
দুই জনার ভাল মন্দ দুই জনার লাগে ||
বিক্রম কেশর রাজা ধনে নহে উনা |
হরিদ্রা বদলে চান্দ লইলেক সোনা ||
সোনা লইয়া চান্দ হরিষ অপার |
সম্মুখে আসিল ধনা আঁখির ঠার ||
চন্দন কাষ্ঠের নৌকা দেখিতে সুন্দর |
সেই নৌকায় সোনা ভরে চান্দ সদাগর ||
নৌকা হইতে ধনা আসিল কৌতুকে |
কলাই লইয়া যায় রাজার সম্মুখে ||
চান্দ বলে অবধান কর মহাশয় |
কলাই হেন দ্রব্য বড় ভাগ্যে পায় ||
রান্ধিয়া বাড়িয়া খাইতে অধিক বাড়ে আশ |
অধিক তৃপ্তি হয় খাইতে নিরামিষ ||
আদা কাসুন্দ দিয়া করিয়া খিচুরী |
মুখে তুমি চিবাইলে শুনি মড়মড়ি ||
কলাই দেখিয়া রাজার আনন্দ বিশাল |
ইহার বদলে দিল মুকুতা প্রবল ||
বিধাতা প্রসন্ন হইলে দৈবে মেলে ধন |
চট দেখিয়া রাজা ভাবে মনে মন ||
রাজা বলে মিতা কও স্বরূপ বচন |
গাছের বাকল কেন আমার সদন ||
দুইখানি চট মেলি দিল তার পায় |
পরম সন্তুষ্ট রাজা সর্ব অঙ্গ ছায় ||
চট দেখিয়া রাজার কৌতুক হইল বড়ি |
এই কালে বল ভাই সরস লাচারি ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
৬
শিশু হইতে সেবাকারি না করিলাম ডাকাতি চুরি কোন দোষে মার বিষ দিয়া | নৃপতি কাইবে বিষ দৈবে করে বিমরিষ এড়াইল দিনের প্রভাবে || কোথা হইতে সাধু আইল মোর বধের ভাগী হইল কি করিব খাব কোন রীতে | এই দ্বারে হইলাম বুড়া যত সাধু আনিল ভরা বিষফল কেহ ত না আনে || সেয়ান সাধু কার্যে রাজা মারি রবে রাজ্যে আমার নির্বন্ধ এত দিনে || কিবা দোষ দিব তোরে শত্রুতে হিংসিল মোরে প্রাণ লইতে আনিল বিষফল | শিশু হইতে সেবা করি তোকারণে প্রাণে মরি তোমার স্থানে নিবেদি সকল || শুনিয়া দ্বারীর কথা রাজার মনে লাগে ব্যথা আপন মনে ধন্দ হেন বাসে | পদ্মাবতী পরশনে সানন্দে বিজয় ভণে ধনার দিকে চান্দ চাহি হাসে ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
|
কবি বিজয় গুপ্তর মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
১২
মিতা রে, তুমিত পন্ডিত মহাজন | চিন্তিত হইয়া তুমি দুর্লভ পাটের ভুনি ইহার বদলে কোন ধন | আমার দেশের জাতি জন কতক তাঁতী বুনাইতে অনেক দিবস লাগে | কেবল ধীরের কাম বস্ত্র বড় অনুপম প্রাণশক্তি টানিলে না ছিঁড়ে || তোমার দেশের কাছে আর যত দ্রব্য দর দিয়া করহ বিচার | পাঠাও তুমি চট চাহি সর্ব রাজ্যে ঠাঁই ঠাঁই কোন দেশে চট নাহি আর || রাজার যোগ্য বসন না পরে সামান্য জন অনেক শকতি ইহা কিনি | যতনে রাখিয়া ঘরে সর্বকাল লোকে পরে বড়ই দুর্লভ চটের ভুনি || চান্দর ললিত ভাবে খলখলি রাজা হাসে আপন হাতে চট মেলি চায় || একখানা কসিয়া পিন্ধে আর খানা মাথায় বান্ধে আর খান দিল সর্ব গায় || চট পরিয়া রাজা ডাক দিয়া আনে খোজা আবাসে পাঠাইলে কতখান | রাণীরে বলিও বাণী পরুক চটের ভুনি যেন দেখি জুড়ায় পরাণ || তোমারে কহিলাম সার এমন বসন নাহি আর ইহার বদলে কোন ধন | সাধু বলে মহাশয় এ বোল কভু মিথ্যা নয় তোমার তরে কহিব সকল || উচিত কহি মিতা নেও পাটের বস্তা বাছিয়া লও ইহার বদল || পদ্মাবতী দরশনে সানন্দে বিজয় ভণে যাহারে সদয় নারায়ণ ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
|
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
৫
রাজা বলে শুন ভাই আমার বচন |
উষা দ্বারীরে আন আমার সদন ||
রাজার কথায় একজন গেল ধাইয়া |
বাড়ির ভিতর দূত দিল পাঠাইয়া ||
সত্বরে চলিল ঊষা রাজার গোচর |
রাজ ব্যবহারে সেলাম করে তিনবার ||
রাজা বলে দ্বারী ভাই শুনরে বচন |
এই ফল খাবা তুমি আমার সদন ||
ভিন দেশী সদাগর নাহি বুঝি কার্য |
আমারে মারিয়া বুঝি লইবেক রাজ্য ||
ইনামের নামে বেটা কাতর হইয়া আসে |
আমি মরিলে রাজা ইনাম দিবা শেষে ||
প্রাণ ভয়ে আগু নহে কোপে নরপতি |
এড়াইতে নারি ফল লইল হাত পাতি ||
রাজার আগে কান্দে ঊষা দুঃখ লাগে বড়ি |
এই কালে বল ভাই সরস লাচারি ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
রাজা বই ইহার আর অন্যে নাহি খায় |
মূলা হেন দ্রব্য লোকে অতি ভাগ্যে পায় ||
হেন মত খাই মূলা তেন মত বুঝ কাজ |
গৃহিণীর প্রিয় বড় মূলার আনাজ ||
রান্ধিয়া ব্যঞ্জন খাইতে বড়ই হরিষ |
অধিক তৃপ্তি হয় খাইতে নিরামিষ ||
চান্দ বলে শুন ধনা আমার বচন |
আর যত বস্তু আছে আনহ্ এখন ||
এতেক শুনিয়া ধনা না করিল আন |
ডিঙ্গা ঘাটে পাইক লইয়া ধরিল যোগান ||
মুসুরির বদলে লইল রক্ত হিঙ্গুল |
বাউস বদলে দ্রাক্ষা লইল বহু মূল ||
ছাগল বদলে হরিণ লইল বড় দেখি ভাল |
বারকোষ বদলে লইল পিতলের থাল ||
এই সকল দ্রব্য লইয়া কৌতুক হইল বড়ি |
সংবাদ পড়িল ভাই বলিতে লাচারি ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
৪
বিষম বাঙ্গালী লোকে প্রকারে মারিতে তোকে তার লাগি আনিয়াছে বিষ ফল | সাধু বড় কহে সাঁচ ডাঙ্গর দীঘল গাছ মাথায় ছড়ায় ধরে ফল || বুঝিনু কপট যত বায়ু যেতে নাহি পথ তাতে জল গেলেক কেমনে | শাকবর্ণ বাহির কাল ছুলিলে যে বার হয় ধল লালবর্ণ হয় পরক্ষণে || আসিয়াছে বড় ঠাটে যুঝিবারে নাহি আঁটে তেকারণে করিছে মন্ত্রণা | কৌশল করিয়া বেটা ঘটাবে বিষম লেঠা না জানি কি ঘটায় যন্ত্রণা || শুন শুন মহাশয় বিষফল মনে লয় সব কথা শুনি বিপরীত | পদ্মাবতী দরশনে সানন্দে বিজয় ভণে নারিকেল থুইল ভূমিত ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
|
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
১৪
বস্তু বদল করে তারা তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
নারিকেল বদলে শঙ্খজোড় লইল রে তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
বারকোষ বদলে পিতলা থাল লইল রে তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
কুকুর বদলে ঘোড়া ভাল লইল রে তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
টিয়া বদলে শুক পাখী লইল রে তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
হরিদ্রা বদলে সোনা ভাল হইল রে তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
মুগ বদলে মুক্তা লইল রে তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
. ****************
. সূচি...
মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্ত-র মনসামঙ্গল কাব্য যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
|
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
১৫
দিবসের বিকি কিনি হরিষে করিয়া |
চক্ষুর নিমেষে লুঠে ডাকাতি করিয়া ||
রতন মাণিক্য সব দেখিতে উজ্জ্বল |
ছালা ভরিয়া সাধু নিলেক সকল ||
যত দ্রব্য ছিল মোর রাজ ভান্ডার ভিতর |
একে একে তুলিলেক ডিঙ্গার উপর ||
একে একে চৌদ্দ ডিঙ্গা সকল ভরিল |
মনে মনে সদাগর আনন্দে ভাসিল ||
চান্দ বলে আরে ধনা উপদেশ শুন |
যত দ্রব্য আছে ডিঙ্গার বাহিরে আন ||
মাল নিয়ে যায় ধনা বাজারে বাজারে |
দ্রব্যের সহিত তারে কোতোয়ালে ধরে ||
ধনারে লইয়া গেল রাজার গোচরে |
রাজা বলে হেন দ্রব্য নাহিক সহরে ||
রাজার হইল ক্রোধ ধনার হইল হাস |
রাজা যদি গরু হয় অবশ্য চাহি ঘাস ||
এক মুষ্টি কায়নের চাল হাতে করি |
রাজারে দিলেক ধনা বহু যত্ন করি ||
পাঁচ সের দুগ্ধ ধনা আনিলেক কিনিয়া |
ক্ষীর রান্ধি খায় সে বিরলে বসিয়া ||
ক্ষীর খেয়ে হয় রাজার হরিষ অপার |
সদাগর আসিলেক রাজার গোচর ||
সাধু বলে এইবার বিকিতে নাহি ভাস্য |
দেশে গেলে স্ত্রী আমাকে বলিবে পাগল ||
এক কাঠা কায়ন যে মাপিয়া থুইল |
কুড়ি কাঠা মুক্তা তার বদলে লইল ||
প্রবাল লইল আরো সমতুল্য তার |
মনে মনে সদাগর হরিষ অপার ||
মনে মনে ধনা তবে করিল বিচার |
দেখেছি রাজার ভান্ডে দ্রব্য নাহি আর ||
অন্দরেতে মহারাণী শুনিল শ্রবণে |
ডাক দিয়া ধাইকে আনিল তখনে ||
বিজয় গুপ্ত বলে গাইন কৌতুক হইল বড়ি |
সংবাদ পড়িল গাইন বলরে লাচারি ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
১৬
যত ধন মিতা চায় তুলি দিও তার নায় কি বুদ্ধিতে যাইতে পারি তথা | হেন মনে লহ ধাই পক্ষী হইয়া তথা যাই চটের বসন আছে যথা || মিতার ঘরে যত চেড়ী তারা পরে পাটের শাড়ী বিদ্যাধরি হেন লয় মনে | হেন ছার দেশ ছাড়ি তথা যাইতে ইচ্ছা করি একাসনে বসি সাধু সনে || ধাই বলে কি কহ মা হেন কথা বলিও না কেন যাবে সদাগর পাশ | রত্নময় আভরণ পরিতেছ সর্বক্ষণ তাহে তব নাহি মিটে আশ || এ কথা হইলে ফাঁস সাধু পাবে সর্বনাশ বিক্রমকেশর পাছে শুনে | পদ্মাবতী দরশনে সানন্দে বিজয় ভণে শুনিয়া কৌতুক সর্বজনে ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
|
খাসা ইনাম আনি কোতোয়ালকে দিল || বেলা অবশেষ হইল রবি ঘরে গেল | ভোজন করিয়া সাধু শয়ন করিল || নিদ্রা হইতে ওঠে সাধুর নন্দন | শয্যা ত্যাগী বাইরে গেলা ততক্ষণ || রাজার হুকুম পাইল পাইক শতে শতে | বারবেলা এড়িয়া চলিল ত্বরিতে || ভাল ভাল দ্রব্য নিল সঙ্গে করিয়া | রাজার নিকট যায় হরষিত হইয়া || তুলা লগ্নে যাত্রা করে চান্দর সদাগর | দুর্গা দুর্গা বলি চান্দ চাহে নাকের স্বর || রাজা ভেটিতে যায় কৌতুক হইল বড়ি | সংবাদ পড়িল গাইন বলরে লাচারি ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
|
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
৩
স্বভাব বিচক্ষণ সাধু পরের বুঝে মান |
রাজার সঙ্গেতে করে মিত্রতা সম্ভাষণ ||
কিবা বস্তু আনিয়াছ আমার সহরে |
সকল আনিয়া দেহ আমার গোচরে ||
এতেক শুনিয়া চান্দ ধনারে নেহালে |
কহিলেন যত রাজা সকলি শুনিলে ||
ইঙ্গিতে সদাগর কহিল ধনারে |
সস্তা দ্রব্য আনি দেহ রাজার গোচরে ||
কাঁচা আদা আনি বরি বাটা বাটা |
শুকনা খেজুর দিল মূলা আটা আটা ||
ভক্ষ্য দ্রব্য থুইল যত সারি সারি দিয়া |
নবেতে আনন্দ বড় এ সব দেখিয়া ||
গুবাক নারিকেল আর নাগরঙ্গ |
শুকনা খেজুর আর দিলেক ছোলঙ্গ ||
দেখিয়া কৌতুক রাজা মনে মনে পাঁচে |
এমন অপূর্ব ফল ধরে কোন গাছে ||
নারিকেল দেখি রাজা তখন জিজ্ঞাসে |
এমন অপূর্ব ফল আছে কোন দেশে ||
গোটা কয়েক গাছ আছে মোর অধিকারে |
গোটাকয়েক আনিয়াছি তোমা ভেটিবারে ||
নারিকেল খাইতে রাজার বড় আশ |
কাটারি আনিয়া ধনা খসাইল শাঁস ||
তোলা ছয় চিনি তবে জলে মিশাইয়া |
রাজার হাতেতে ধনা দিলেক আনিয়া ||
পাত্র সবে আসিয়া রাজা হাত ধরি |
না খাইও নারিকেল পরীক্ষা না করি ||
বিজয় গুপ্ত বলে মোরে রাখ বিষহরি
সংবাদ পড়িল গাইন বলরে লাচারি ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
১৭
একে একে চৌদ্দ ডিঙ্গা ভরিল সত্বর |
রোঙ্গাই পন্ডিত বলে সাধুর গোচর ||
দিনে দিনে বাড়ে বায়ু দক্ষিণ পবন |
দেশেতে যাইতে সাধু করহ মনন ||
এ দেশের মধ্যে যদি থাকে দুষ্টজন |
প্রকাশ করিলে যাবে তোমার জীবন ||
ডাব নারিকেল পচে শিমূলের তুলা |
রৌদ্রে শুকাইবে যত দিছ পাকা মূলা ||
চৌদ্দ ডিঙ্গা ভরিয়াছে হরষিত মন |
বিদায় লইতে চান্দ করিল গমন ||
করযোড়ে কহে সাধু আপন কাহিনী |
দেশের তরে যাই মিতা দেহ হে মেলানি ||
মেলানি দেহ হে তবে দেশে চলে যাই |
আবার আসিব মিতা বলিলাম তোমার ঠাঁই ||
আবার আসিবার কালে আনিব মাদার ফুল |
বুড়া কালে দিলে হয় তরুণ গাভুর ||
ডৌয়া আনিব রাজা মাণিক্যের তুল্য |
এক রাজার ধন আছে এক ডৌয়ার মূল্য ||
পাকা চালিতা আছে আর মাকাল ফল |
থাকুক খাবার কাজ দেখে জিবের পড়ে লাল ||
পাকা গাব দেখি রাজা হরিষ অন্তর |
ভক্তি করি আভরণ দিলেক সত্বর ||
কোলাকুলি করি কহে বিক্রমকেশর |
করিয়াছ উপকার তুমি সদাগর ||
কি দিব তোমাকে আমি কি আছে আমার |
এক লক্ষ টাকা দিল সাধুকে ব্যবহার ||
রোঙ্গাই পন্ডিত আর নফর যোগ্য ধনা |
ব্যবহার দিল তারে এক মণ সোনা ||
স্বভাবে বণিক জাতি বড়ই সেয়ানা |
রাজার ব্যবহার দিল চট চারিখানা ||
একখানা চট ধনা গুছান করিল |
রাজার সাক্ষাতে হস্ত বাড়াইয়া দিল ||
যোড় হাতে ধনা কহে রাজার গোচর |
ধন্য ধন্য করে রাজা কৌতুক অন্তর ||
সোনার টোপর রাখি খাটের উপরে |
সকল শরীরে রাজা চটের বস্ত্র পরে ||
সাধুর বচনে রাজা ধার কাছে কয় |
এই সব বস্ত্রে কেন গাত্র চুলকায় ||
ক্রোধ করি কহে ধনা আগুন অন্তর |
নিত্য পরি মোরা দেশের কাপড় ||
বান্ধিয়া রাখিছি মোরা পরম যতনে |
উত্সব আনন্দ হইলে পরি সেই দিনে ||
ভণে কবি বিজয় গুপ্ত মনসার বর |
চট বস্ত্র পরে রাজা বিক্রমকেশর ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
২
রাজার ভেটিতে যায় পট্টবস্ত্র দিয়া গায় এক ধাইতে সহস্রেক ধায় | রোঙ্গাই পন্ডিত চলে তেরা নফর চলে যাহার হাতে মিষ্ট নারিকেল || শুকনা পাটের পাত আর যত দ্রব্যজাত কোটি কোটি লড়ে সব দাতা | যোগিনী করিয়া পাছে দাঁড়াইল রাজার কাছে রাজা ঘনাইয়া নোয়ায় মাথা || খাট পাট সিংহাসন তাতে তোমার আরোহণ তোমার দেখি পুণ্য শরীর | কোথাকার সদাগর কি নাম কোথায় ঘর স্বরূপে কহিবা মোরে সার || চম্পক নগর ঘর নাম আমার চন্দ্রধর বাপ আমার ধনের কুবের | আমার দেশের কথা কি কব তোমার হেথা দ্রব্য মেলে অনেক প্রকার || পদ্মাবতী দরশনে সানন্দে বিজয় ভণে রাজারে ভেটিল সদাগর ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
|
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
১৮
মান্দারের ফুল আর চটের কাপড় |
পরিলে বুড়ায় হয় তরুণ নাগর ||
আরবার আনিব মিতা চলিতার ফল |
তাহারে খাইলে মিতা গায় হয় বল ||
আরবার আনিব মিতা পাকা কলা তাল |
তাহারে খাইতে মিতা বড়ই রসাল ||
আরবার আসিলে মিতা আনিব তেঁতুল |
ধনা বলে তারে খাইলে হয় জনম সফল ||
চান্দ বলে ধনা তুই ঘরের নফর হও |
এই সব মর্মকথা মিতার ঠাঁই কও ||
তাহার সমান ফল মর্ত্যলোকে নাই |
দেবতার ভাগ লাগি সৃজিলা গোসাঞি ||
মেলানি করিয়া তখন চান্দর সদাগর |
ডিঙ্গা ঘাটে গিয়া সাধু মিলিল সত্বর ||
মনে মনে চিন্তে সাধু ভবানীর পাও |
গঙ্গা পূজা করিয়া সাধু শীঘ্র বাহে নাও ||
স্নান করি সাধু করে দেবার্চ্চন |
নানা দেবের পূজা করে সাধুর নন্দন ||
ধূপ দীপ দিয়া পূজে চান্দ আনন্দিত মন |
শিবদুর্গা পূজে আর দেব নারায়ণ ||
কুবের বরুণ পূজে দেবতা পবন |
ইন্দ্র চন্দ্র ব্রহ্মা পূজে দেব হুতাশন ||
সকল দেব পূজা করে চান্দ মহাবলী |
গঙ্গারে পূজে ধবল ছাগল দিয়া বলি ||
সর্ব দেব পূজে চান্দ আনন্দিত মতি |
ঘৃণায় না পূজিল দেবী পদ্মাবতী ||
পূজা সাঙ্গ করিয়া চান্দ হইল কোপিত |
কোথা হইতে এক বুড়ী আসিল আচম্বিত ||
অতি বৃদ্ধা হয়ে আসে লড়ি করি ভর |
মাথায় আঙ্গুল চুল করে ফরফর ||
কোথা গেলা আরে ধনা মোর বোল ধর |
ঠেঙ্গা মারি বুড়ীরে পুরীর বাহির কর ||
চান্দর কোপ দেখি পদ্মার ভয় অতিশয় |
যোড় হাতে কহে দেবী করিয়া বিনয় ||
পদ্মা বলে কোপ এড় সাধুর তনয় |
অবধান কর আমি হই পরিচয় ||
কোপ পরিহর সাধু আমি নাগ জাতি |
মহাদেবের কন্যা আমি নাম পদ্মাবতী ||
যাত্রাকালে দেব পূজা ফুলে আর ধূপেতে |
তেকরণে আসিলাম তোমার পূজা খাইতে ||
মোর তরে কোপ এড় সাধুর কুমার |
মোর তরে ফুল জল দেও একবার ||
মোর পূজা করি চান্দ সুখে চলি যাও |
কান্ডারে বসিয়া আমি তরাইব নাও ||
ধনগর্বে না পূজ কর অহঙ্কার |
এবার হারাবা প্রাণ সমুদ্র মাঝার ||
চান্দ বলে কানি তোর লাজ নাই চিতে |
কোন মুখে আইলি তুই মোর পূজা খাইতে ||
যেই হাতে পূজি আমি শঙ্কর ভবানী |
সেই হাতে পূজা খাইতে চাহ দুষ্ট কানি ||
যেই হাতে পূজি আমি দেবী দশভূজা |
কোন মুখে চাহ তুমি সেই হাতের পূজা ||
মরণ জীয়ান যদি তুমি করিতে পার |
তবে কেন কাণা চক্ষুর ঔষধ না ধর ||
দূরে যাও লঘুজাতি না বলিস আর |
এত দেব মধ্যে করিস ধামনা ভাতার ||
তর্জে গর্জে চান্দ হেতাল লইয়া লাঁফে |
কলার বাকল হেন পদ্মার প্রাণ কাঁপে ||
দন্তে দন্তে সশনে করে কড়মড় |
প্রাণ লইয়া মনসা উঠিয়া দিল লড় ||
ত্রাসে যায় পদ্মাবতী আলুথালু চুলি |
পাছে পাছে ধায় চান্দ ধর ধর বলি ||
ত্রাসে যায় পদ্মাবতী আপন ভবন |
নেতার সঙ্গে কহে গিয়া আপন কথন ||
নৌকায় উঠিল চান্দ মনের কৌতুকে |
শিবদুর্গা বলিয়া নৌকায় গিয়া উঠে ||
দেশের নামে সর্বলোকে ধায় আগুসারে |
হাসিতে হাসিতে গেল কলিদয় সাগরে ||
হেথায় মনসা দেবী চিন্তিয়া বিকল |
অবিলম্বে যায় তরিয়া সমুদ্রের জল ||
বুদ্ধি বল ওগো নেতা কি হবে উপায় |
কি বুদ্ধি করিব চান্দ দেশে চলি যায় ||
বারে বারে যত বলে মনে দুঃখ পাই |
হেন মনে চান্দর চৌদ্দ ডিঙ্গা ডুবাই ||
ধন জন নিব চান্দর প্রাণে না মারিব |
তবে মনে সুখী হইয়া দুঃখ পাশরিব ||
নেতা বলে শুন কথা জয় বিষহরি |
তোমার প্রাণে চান্দরে কি করিতে পারি ||
বাপ মহেশ্বর চান্দর মাতা মহামায়া |
পুত্রভাবে তাঁহারা চান্দরে করে দয়া ||
আমার বচন তুমি শুন দিয়া মন |
গঙ্গার নিকটে তুমি যাও এইক্ষণ ||
অশেষ বিশেষ তাঁরে কহিও কথন |
গঙ্গা যদি করেন তোমার দুঃখ বিমোচন ||
তোমার প্রতি দয়া থাকে যদি আজ্ঞা পাও |
তবে সে ডুবাইতে পারে চান্দর চৌদ্দ নাও ||
এতেক শুনিয়া দেবী ভাবে মনে মন |
নাগরথ সাজাইয়া আনিল তখন ||
বিজয় গুপ্ত কবি ভণে মনসার বর |
বিদায় লইয়া যায় চান্দ সগাগর ||
রথে চড়ি রহিলা দেবী পদ্মাবতী |
বস্তু বদল পালা সমাপ্তি ইতি ||
. **************** সূচি...
মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
১ কোতোয়ালের মুখে রাজা শুনিয়া বচন | সংবাদ দিয়া আনিলেক পাত্র যতজন || কোতোয়াল বলে শুন নৃপবর |
|
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
৯
পাত্র মিত্র বলে ঊষা সত্য কথা কহ |
হাতসনে চক্ষু বুজি নিমেষ কেন রহ ||
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল
বস্তুবদল পালা
১৩
চান্দর ইঙ্গিত ধনা আনন্দিত মন |
পট্ট বস্ত্র লইয়া ধনা করিল গমন ||
রাজা বলে শুন মিতা আমার বচন |
আর যে বস্তু আছে তোলত এখন ||
এই পাতায় কোনো ভুল-ত্রুটি চোখে পড়লে অথবা যদি কোথাও ভুল বলে মনে হয়, তাহলে আমাদের এই ইমেলে জানাবেন। আমরা শুধরে নেবার চেষ্টা করবো। srimilansengupta@yahoo.co.in
|
|
|