কবি বিজয় গুপ্ত-র মনসামঙ্গল কাব্য
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
১  
মনসার জন্ম পালা

গৌরী কোন্দল পালা     

মনসা বিবাহ পালা     

অষ্ট নাগের জন্ম পালা   

অমৃত মথন পালা   
  ১. মনোহর নামে এক বৎসের উত্পত্তি   
২. কোথায় নিধি পাইলা আমায় এড়িয়া গেলা   
৩. বত্স পান করে ক্ষীর শুকাইল নদ  
৪. বিদগ্ধ জনের ঠাঁই করিলাম অঞ্জলি   
৫. দেখিয়া পুষ্পের গতি শচী আর শচীপতি  
৬. দুর্বাসা দেখিয়া ইন্দ্র হইল চমকিত     
৭. দেখিয়া মালা ভূমিতলে মুনিবর কোপে জলে   
৮. শুনিয়া মুনির শাপ আসিল পুরন্দর  
৯. একদিন মহামায়া গোসাঞির স্থানে বলে  
১০. শুনিয়া অমৃত খন্ড মন্দার মথন দন্ড  
১১. সুরভি রহিল গিয়া ইন্দ্রের সদনে  
১২. তুমি প্রভু অচেতন অনাথ হইল দেবগণ  
১৩. শিব দেখি পদ্মাবতী ব্যাকুল হইল গতি   
১৪. পদ্মাবতীর বরে হউক সবাকার জয়  
১৫. দেখিয়া শিবের গতি শোকান্বিত পদ্মাবতী   
১৬. নির্জনে বসিল গিয়া শিব লইয়া কোলে    

বনবাস পালা       

হাসন হুসন যুদ্ধ পালা     

গুয়াবাড়ি কাটা পালা       

ধন্বন্তরি বধ পালা     
১০
ছয় কুমার বধ পালা     
১১
ঝালুবাড়ির পূজা পালা  
১২
যমযুদ্ধ পালা      
১৩
যাত্রাপাটন পাটন পালা     
১৪
বস্তুবদল পালা     
১৫
ডিঙ্গা বুড়ান, লক্ষ্মীন্দরের জন্ম ও চান্দ লাঞ্ছনা পালা
১৬
লখিন্দরের বিবাহের জোড়ানি পালা    
১৭
লোহার বাসর ঘর নির্মাণ পালা     
১৮
লখিন্দর বিবাহ পালা       
১৯
লখিন্দর দংশন পালা   
২০
ভাসান পালা      
২১
স্বর্গারোহণ পালা     
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা


মনোহর নামে এক বৎসের উত্পত্তি |
তখনে না গেল সে মায়ের সংহতি ||
এড়িয়া মায়ের পাশ আসিল নানা স্থান |
শিবের কার্য করিতে আসিল ধেনু জ্ঞান ||
জীবন হইল শেষ ভাবে মনে মনে |
দৈবগতি দেখা হইল নারদের সনে ||
আপনার বত্স দেখি ধেনুর কৌতুক |
তুষ্ট হয়ে চাহে ধেনু নিজ পুত্রের মুখ ||
কোথায় গিয়াছ পুত্র না বলিয়া মায় |
তোমার বোলচালে কিছু আমার নাহি দায় ||
বিজয় গুপ্ত বলে গাইন কার্যে দাও চিত |
এই কালে বল ভাই লাচারির গীত ||

.                                   ****************                         
সূচি...    


মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

               ৩
বত্স পান করে ক্ষীর শুকাইল নদ |
মনের কোপেতে শিব বলে গদ গদ ||
মনের কোপেতে শিবের আঁখি টলমল |
মহাদেব বলে বত্স পুড়িব সকল ||
কামধেনুর পুত্র হয়ে মোর কার্যে বাদ |
আজি হতে হবে তোমার যবন অপবাদ ||
বত্সকে শাপিয়া শিব শান্ত করিল চিত |
দুখ আঁখি পাকাইয়া চাহে চারি ভিত ||
দেখিয়া শিবের কোপ গাভী পাইল ভয় |
দন্তেতে করিয়া ঘাস করিল বিনয় ||
ধেনু বলে গোসাঞি তুমি জগতে পূজিত |
বত্সকে করিতে কোপ না হয় উচিত ||
অপরাধ অনুরূপ প্রতিফল পায় |
পুত্রের হইল শাপ কি হবে উপায় ||
শিবের চরণে ধেনু বলে ধীরে ধীরে |
আজ্ঞা হয় পুনরায় ভরিয়া দিব ক্ষীরে ||
খাল খন্দ ভরিয়া জলেতে করে গো |
নদীর কূল ভাঙ্গিয়া যেন জলে করে গো ||
দুই কূল ভাঙ্গিয়া নদী বহে ক্ষীরধার |
পূর্বের যেমন ছিল হইল আর বার ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
মনসামঙ্গল কাব্যের সূচি
দয়া কর দেব শূলপাণি |
মায়ের দুগ্ধ বত্স খায়                 ইথে কোপ না যুয়ায়
কোপ কেন করহ আপনি ||

.                                                             ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
*
নাচিতে নাচিতে রম্ভারে বাড়ে মনরঙ্গ ||
যেন মতে নাচে রম্ভা তেন করে বেশ |
এক দৃষ্টে চাহে সবে না করে নিমেষ ||
দেবগণ মুনিগণ যত বড় বড় |
দেখিয়া রম্ভার নৃত্য হইল সবে জড় ||
নৃত্যে রঞ্জাইল রম্ভা দেবের সমাজ |
রম্ভার নৃত্যে তুষ্ট আপনি দেবরাজ ||
সৌভাগ্য নিলয় নাম গন্ধর্বের শালা |
রম্ভারে প্রসাদ দিল পারিজাতের মালা ||
প্রণাম করিয়া রম্ভা মালা নিল করে |
ভক্তিকরি থুইল মালা শিরের উপরে ||
মালা পাইয়া রম্ভা চলিলেক ঘরে |
মেলানি করিয়া চলে যত বিদ্যাধরে ||
রম্ভার সহিত চলে যত বিদ্যাধরী |
রাজপথ দিয়া চলে নানা লীলা করি ||
ধীরে চলে রম্ভা হইয়া হরষিত |
দুর্বাসা মুনিরে পথ দেখে আচম্বিত ||
দিগম্বরের বেশে যায় উন্মত্তের ছন্দে |
কটিতে করঙ্গ গোটা দন্ড গোটা কান্ধে ||
ফটিকের জপমালা জপে ধীরে ধীরে |
তপের প্রভাবে মুনির নির্মল শরীর ||
মালা দেখি মুনিবর খুজিল রম্ভাতে |
প্রণাম করিয়া রম্ভা মালা দিল হাতে ||
মালা পাইয়া দিল মুনি শিবের উপরে
উন্মত্তের বেশে ফেরে নগরে নগরে
এইরূপে করে মুনি নগর ভ্রমণ
কুতূহলে প্রবেশ করিল উপবনে
মাতা যাহার রুক্মিণী বাপ দিবাকর
তাহারে সদয় হউক দেব মহেশ্বর
ভণে কবি কর্ণপূর মধুর প্রবন্ধ
পয়ার এড়িয়া বল লাচারির ছন্দ ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা



দেখিয়া পুষ্পের গতি              শচী আর শচীপতি
হৃদয়ে না ধরে আনন্দ |
মধুকর পালে পালে               ঘন ঘন পড়ে ডালে
পিয়ে পিয়ে উঠে মকরন্দ ||
গোলাপ মল্লিকা ধাই                 কূটজ কাঞ্চন যাই
শেফালিকা বকুল তিলক |
কদম্ব কেতকী জুতি                  ধুতুরা টগর তথি
সূর্যমণি করবী বকুল ||
কুটজ জয়ন্তী তথি                      নীলকন্ঠ মালতী
নাগেশ্বর চম্পক লবঙ্গ |
তিলক অপরাজিতা                   লবঙ্গ মাধবীলতা
বান্ধলী দেখিতে সুরঙ্গ ||
কুঞ্জ শতবর্গ আয়া                 স্থলপদ্ম আর কেয়া
পারিজাত ফুটে চারিভিতে |
তুলসী মালতী যত                তাহা বা কবিব কত
জবা পুষ্প দিতে সূর্য অর্ঘ্য ||
শিরিষ নেহালী আর                  সপ্তচ্ছেদ কর্ণহার
এলাইচ তুলসী পলাশ |
ভ্রমিয়া পুষ্পের বন                 আধিক আনন্দ মন
পুষ্প লইয়া করয়ে বিলাপ ||
সুরপতি আর শচী                 দোহে এক মন রুচি
শচীরে বলিলা দেবরায় |
হরষ হইয়া অতি                      দেবরাজ সুরপতি
মালা দিল শচীর গলায় |
ভ্রমিয়া পুষ্পের বন                       হরষিত দুইজন
ত্বরিতে চলিলা কুতূহলে |
মত্ত হস্তী চলে ধীরে                মেলে মন্দাকিনী তীরে
রহিলা গিয়া কল্পতরু তলে ||
কর্ণপুর কবি ভণে                       পথে দুর্বাসা সনে
দেখা হইল আচম্বিতে ||

.                                                             ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

           ৬
দুর্বাসা দেখিয়া ইন্দ্র হইল চমকিত |
ঐরাবত হইতে ইন্দ্র নামিল ভূমিত ||
প্রণাম করিল ইন্দ্র ভক্তি পুরঃসর  |
মালা দিয়া আশীর্বাদ করে মুনি বর ||
পারিজাত মালা দেখিয়া ইন্দ্রের বিষ্ময় |
লইলেন মালা গোটা দুর্বাসার ভয়ে ||
নৃত্য শেষে যেই মালা রম্ভারে দিল |
সেই মালা দিয়া মুনি আমায় বিড়ম্বিল ||
মুনির গৌরবে মালা রাখিলেন হাতে |
ক্ষণেক বিলম্বে থুইল ঐরাবত সাথে ||
মালা শোভা করে তাহার গন্ডের উপর |
গঙ্গার প্রভাবে যেন কৈলাস শিখর ||
ভ্রমিতে ভ্রমিতে ইন্দ্র হইল আনন্দিত |
পারিজাত গন্ধে ইন্দ্র হইল মোহিত ||
শুন্ড দিয়া মালা গোটা ধরে নানা ভিতে |
ঘ্রাণ লইয়া মালা ফেলে রাজপথে ||
এইরূপে ভ্রম হইয়া গেল পুরন্দর |
সায়ংসন্ধ্যা করিয়া চলে মুনি বর ||
যেই খানে ইন্দ্র সনে হইল দরশন |
সেইখানে ভূমে মালা দেখে তপোধন ||
মালাগোটা ভূমিতে দেখিয়া মুনি পাইল তাপ |
তখনি চিন্তিল মুনি ইন্দ্রেরে দিতে অভিশাপ ||
দশনে অধর চাপে মুখে নাহি রাও |
কোপে গরলে পুরে মুনির সর্ব গাও ||
অল্পজ্ঞান করি মনে না কর ভয় |
অদ্য হইতে ইন্দের শ্রী হউক ক্ষয় ||
ধনমদে মত্ত হইয়া আমারে না গোণে |
শ্রী ক্ষয় হউক তার আমার বচনে ||
ভণে কবি কর্ণপুর পয়ার প্রবন্ধ |
মিলিল আসিয়া গীত লাচারির ছন্দ ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা



দেখিয়া মালা ভূমিতলে                 মুনিবর কোপে জলে
গগনে পরশে অহঙ্কারে |
দশনে অধর চাপে                        সকল শরীর কাঁপে
ভ্রূকুটি কে পারে সহিবারে ||
চর্মধারী মাথায় জটা                    তেকারণে দেখে টুটা
দর্প কেবা না জানে আমার |
যদি লয় হেন যতি                         হরিহর প্রজাপতি
এ তিন সৃজিতে পারি আমি ||
আশীর্বাদে পুরন্দরে               মালা দিলাম তাহার তরে
ভক্তি করি লইল অতিশয় |
হেন মালা ভূমে লোটে                   দেখিয়া পরাণ ফাটে
এ দুঃখ কি শরীরে মোর সয় ||
মোর তরে দিয়া লাজ                       সাধিলা এই কাজ
শ্রীর এড়ুক গিয়া আশা |
না জানে আমার সার                     অক্ষয় বচন যাহার
সেই মুনি দুর্বাসা ||
দেবরাজ হেনমতে                        লজ্জা দিল পদে পদে
এ বেটার এত দুষ্ট মতি |
ঠেকিল আমার পাকে                    কোনজন তারে রাখে
আজি আমার বুঝিব শকতি ||
না জান আমারে তুই                    গৌতম মুনি নহে মুই
যাহার স্ত্রী করিলা হরণ |
দেশ ভরি অপযশ                      সে পুনঃ তাহারি বশ
সেই লাজে না হয় মরণ ||
কর্ণপুর কবি ভণে                      ক্রোধে হইল তপোধনে
ইন্দ্রেরে দিলা শাপবাণী |
শুনিয়া ইন্দ্রের শাপ                      দেবগণের হইল কোপ
সুরপুরী হইল জানাজানি ||

.                                                             ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
*
মথন করিতে আনে পর্বত মন্দার |
শুইয়াছে অনেক পশু তাহার উপর ||
সিংহ আদি আছে তথা যত বনচর |
আর্তনাদ করে সবে তাহার উপর ||
ক্ষীরোদের জলে দিল যতেক ঔষধি |
গন্ধর্বেরা করে নিত্য নাহিক অবধি ||
মন্দার মথন দন্ড বাসুকী ছাদন |
ক্ষীরোদ দেখিতে হরি আসিল তখন ||
দেবগণে ধরে গিয়া বাসুকীর ফণা |
দেখিয়া সকল দৈত্য হইল বিমনা ||
সহজে সর্পের চক্ষু সজল নয়ন |
তাহার হাতের পুচ্ছ অতি সুলক্ষণ ||
কাহার শকতি বুঝে গোসাঞির হৃদয় |
নিশ্বাস এড়িয়া দৈত্য বলে হইল ক্ষয় ||
ক্ষীরোদের মধ্যে কূর্মরূপে রহিল শ্রীহরি |
বিশ্বরূপ হইয়া রহিল মন্দার শৃঙ্গ ধরি ||
এই রূপে সুরাসুরে ভ্রময়ে মন্দার |
মথন করিতে লাগে ক্ষীরোদ সাগর ||
অনুক্ষণ পবন দেবের দিকে চায় |
অসুর কারণে তারা শ্রম নাহি পায় ||
বিজয় গুপ্ত বলে ভাই হও সাবহিত |
পয়ার এড়িয়া বল লাচারির গীত ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

                  ৯
একদিন মহামায়া গোসাঞির স্থানে বলে |
এথা রহিয়া কার্য নাহি চল অন্যস্থলে ||
আগে মোরে খাইয়া পদ্মার বাড়িল বড়াই |
তার পাছে খাইল পদ্মা আপনা জামাই ||
তার পাছে হইল তোমার অচেতন |
এবে হইল পদ্মার পুত্র অষ্টজন ||
না জানি মনসা মোরে কি করয়ে এখন |
আপনে না জান তুমি দেব ত্রিলোচন ||
এত শুনি মহাদেব ভাবে মনে মন |
অখনে করিব দেবী সমুদ্র মথন ||
হরিহর নারায়ণ দেব ষড়ানন |
সমুদ্র মথিতে গেল যত দেবগণ ||
দেবগণ সহিতে গেল ব্রহ্মা বিষ্ণুহর |
গন্ধর্ব অসুর আদি যত চরাচর ||
মন্দার পর্বত হইল মথনের লড়ি |
বাসুকি সর্প হইল মথনের দড়ি ||
ব্রহ্মা বিষ্ণু হর করে সমুদ্র মথন |
আনন্দিত হইল তখন ই তিন ভুবন ||
বিজয় গুপ্তে বলে গাইন হও সাবহিত |
পয়ার এড়িয়া বল লাচারির গীত ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

১০

শুনিয়া অমৃত খন্ড                    মন্দার মথন দন্ড
নাগরাজ করিল ছাদন |
মিলিল অসুর দলে               নামিয়া ক্ষীরোদ জলে
করিবারে লাগিল মথন ||
প্রথমে আছিল নীর            মথিতে মথিতে ক্ষীর    
লবণ উঠিল ভাগ ভাগ |
সুরভি উঠিল যবে                আনন্দিত দেব সবে
সবে যার করিবে যাগ ||
বদন মন্ডিত আঁখি                   যেন করুণা লক্ষ্মী
দৈত্যগণ এক দৃষ্টে চায় |
যোজন জুড়িল গন্ধে                 যেন বুঝি অনুবন্ধে
পারিজাত উঠিল তথায় ||
রূপে গুণে বিলক্ষণ                    উঠিল অপ্সরাগণ
আনন্দিত হইল দেব যত |
পরম সুন্দর ছাঁদ                       উঠিল নূতন চাঁদ
তাহার সৌষ্ঠব কত কব ||
কমন্ডুলু লক্ষ করি                   হস্তেতে অমৃত ধরি
সর্ব শেষে উঠিল ধন্বন্তরি |
কি কহিব তাহার আর              নাম শুনিয়া যাহার
ব্যাধি পলায় ভয় করি ||
উঠিলেন মহেশ্বরী                    কমল হস্তেতে করি
বসিয়া আছেন বিচিত্র আসনে |
দেখিয়া দেবতা সব                যোড় হস্তে করে স্তব
নাচে গাহে বিদ্যাধরিগণে ||
উঠে উচ্চৈশ্রবা হাতি                   হরষিত শূলপতি
পারিজাত উঠে ততক্ষণ |
পারিজাত পুষ্প পাইয়া               ইন্দ্র হরষিত হইয়া
রাখিলেন আপনা ভবন ||
দিব্য মাল্য করে ধরে                 অলঙ্কার কলেবরে
বিশ্বকর্মা তথা আসি |
দেখিয়া লক্ষ্মীর মুখ                     ঘুচিল সকল দুঃখ
দেবগণ জীল হেন বাসি ||
সমুদ্রে মিসদি দিল                      দুগ্ধ ঘুচি দধি হইল
রাশি রাশি দধি হইল তখন |
দেবগণ টানে চোটে                 সাগর হইতে রত্ন ওঠে
অমৃত জন্মিল ততক্ষণ ||
অমৃত পাইয়া দেবগণ                 হইল আনন্দিত মন
বিষ্ণু হইলা লক্ষ্মীপতি |
বিজয় গুপ্তে বলে সার              মোর গতি নাহি আর
দয়া কর দেবী পদ্মাবতী ||

.                                                               ****************                                                   
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

                ১১
সুরভি রহিল গিয়া ইন্দ্রের সদনে  |
পারিজাত তরু রইল ইন্দ্রের কাননে ||
বাড়নি দৈত্যের পুরী চলিল সম্ভ্রমে |
কল্পতরু রইল গিয়া ইন্দ্রের আশ্রমে ||
ললাটে শিখরে চন্দ্র ধরিয়া শঙ্কর |
তদবধি হইল নাম চন্দ্রশেখর ||
স্বর্গে রহিল গিয়া বৈদ্য ধন্বন্তরি |
ইন্দ্রপুরে রইল গিয়া যত বিদ্যাধরী ||
ঐরাবত উচ্চৈঃশ্রবা পুরন্দর নিল |
কৌস্তভমণি শ্রীহরি আপনি গলায় নিল ||
দৃষ্টি পাতি চাহে লক্ষ্মী দেবতা সকল |
কুতূহলে রহিল গিয়া হরির বক্ষস্থল ||
দৃষ্টি পাতি আপ্যায়িত হইল পুরন্দর |
সুন্দর অঙ্গ হইল ইন্দ্র রূপে মনোহর ||
কাজলের বর্ণ হইল দারুণ গরল |
তেজ সহিতে নারে দেবতা সকল ||
তুমি দেবের দেব কি বলিব আর |
সৃষ্টি রক্ষা করিতে আজ তোমার অধিকার ||
অমৃত মথিতে গোসাঞি তুমি কর মন |
গরলের জ্বালায় পোড়ে সকল ভুবন ||
প্রসন্ন পুরঃসর যতেক বলিল পুরন্দর |
প্রণাম করিয়া বলে শিবের গোচর ||
সহজে দয়াল শিব না করিল আন |
গন্ডুষ করিয়া কালকূট বিষ করে পান ||
গন্ডুষ করিলা বিষ খাইলা যোগ বলে |
ঊর্ধ্বগতি হইল বিষ জঠরে জ্বলে ||
বিষ পানে মহেশ্বর হইল অচেতন |
দেখিয়া দেবতা সবের স্থির নহে মন ||
বিষ জ্বালে তিন আঁখি করে টলমল |
কান্দিয়া বিকল হইল দেবতা সকল ||
সকল দেবতা কান্দে স্থির নহে হিয়া |
চন্ডীরে আনিতে নারদ দিল পাঠাইয়া ||
চলিল নারদ মুনি অতি শীঘ্র গতি |
সত্বরে মিলিল গিয়া যথায় পার্বতী ||
বলিল নারদ গিয়া দেবীর নিকট |
কহিলা সকল কথা শিবের সঙ্কট ||
বিষ খাইয়া অচেতন দেখ ত্রিলোচন |
দেখিতে চাহ যদি চল এইক্ষণ ||
নারদের কথায় পার্বতী বিকল |
উচ্চৈঃস্বরে কান্দে দেবী চক্ষে পড়ে জল ||
নারদ সঙ্গে করি দেবী চলিল তখন |
দেখিয়া শিবমুখ করয়ে ক্রন্দন ||
প্রাণের প্রভু বলি কান্দে দীঘল বোলে |
ত্বরায় করিয়া দেবী শিব লইল কোলে ||
উলটি পালটি চাহে নাহিক চেতন |
বিষাদ ভাবিয়া দেবী করয়ে ক্রন্দন ||
কাহার বচনে প্রভু খাইলা গরল |
বিষের জ্বালায় তিন আঁখি করে টলমল ||
হাত পাও না চলে না বহে পবন |
মুখ হইতে লাল বাহি পড়ে ঘনঘন ||
বিজয় গুপ্তে বলে গাইন বল হরিনাম |
লাচারি পড়িল এবে পয়ার বিশ্রাম ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

১২

তুমি প্রভু অচেতন                 অনাথ হইল দেবগণ
কি করিলা কালবিষ খাইয়া |
কেন আনিলা বিপদ                 কেন বা মথিলা নদ
ঘরে যাব কাহারে লইয়া ||
তুমি প্রভু মৃত্যুঞ্জয়                   তোমার হইল ক্ষয়
এই দুঃখ সহিব কেমনে |
হেন সাধ্য রাখে কে                তোমারে লঙ্ঘিবে যে
আমা ছাড়ি গেলা কোন স্থানে ||
এই কি বিধির গতি                 ইন্দ্র আদি প্রজাপতি
যক্ষ রক্ষ যাহার সৃজন |
সেই প্রভু গরলেতে                   প্রাণ দিল আচম্বিতে
কেন আর রাখিব জীবন ||
মুখ বাহি পড়ে লাল               তোমারে দেখিতে ভাল
দেখিয়া বিদরে মোর বুক |
ছিঁড়ে যায় বুক মোর                 কার্তিক গণেশ তোর
তাহারা চাহিবে কার মুখ ||
তুমি পাগল শিব                    আপনে হারাইলা জীব
উহাতে আরের দায় কিরে |
কেবা নহে শুনে কানে               ছাওয়ালেও ইহ জানে
বিষ খাইলে কে বা নহে মরে ||
দেখিয়া দুর্গতি তোর                  শরীর বিদরে মোর
কহিতে বড়ই অখ্যাতি |
গরল করিয়া পান                     মহাদেব ছাড়ে প্রাণ
লোকেতে রহিবে অখ্যাতি ||
কতমত কান্দে গৌরী                   শিবের চরণ ধরি
বিকল হইল গণপতি |
কান্দিতেছে দেবগণে                 সানন্দে বিজয় ভণে
হাসিতে লাগিল পদ্মাবতী ||

.                                                               ****************                                                   
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

১৩

শিব দেখি পদ্মাবতী                 ব্যাকুল হইল গতি
কোন বিধি দিল সন্তাপ |
কি করিব কোথায় যাব           কাহারে বাপু বলিব
গা তোল তোল মোর বাপ ||
জন্মিল কমল বনে                  তুষ্ট হইল দেবগণে
সত্যই করিল বিড়ম্বন |
আনি মুনির কন্দন                মোরে কৈলা সমর্পণ
ছাড়িয়া গেলা মুনি তপেধন ||
সতাই সঙ্গে বাদ হইল             বাম চক্ষু কানা কৈল
সেই কথা ঘোষে সর্ব লোকে |
মোর সম দুঃখী জন                 আর নাহি ত্রিভুবন
প্রাণ মোর যায় তোমার শোকে ||
দৈবে এত কৈল মোরে            তাহে কেন বাপু মরে
কেন হেন করিলা নারায়ণ |
পদ্মাবতী দরশনে                   সানন্দে বিজয় ভনে
সভাসদ রাখ দেবগণ ||

.                                                               ****************                                                   
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

             ১৪
পদ্মাবতীর বরে হউক সবাকার জয় |
স্বামীর তরে কান্দে দেবী ব্যাকুল হৃদয় ||
সংসারের সার শিব বিষে অচেতন |
চারিদিকে বেড়িয়া কান্দে দেবগণ ||
ব্রহ্মা নারায়ণ কান্দে কান্দে পুরন্দর |
কুবের বরুণ কান্দে শূন্য মহেশ্বর ||
পবন অনল আর অশ্বিনী কুমার |
চারিদিকে বেড়িয়া করিছে হাহাকার ||
অবোধ ছাওয়াল হেন কান্দে বিপরীত |
তুমি দেবী নাহি জান পদ্মার চরিত ||
গরলে মরিবে কেন মনসার বাপ |
কিসের লাগিয়া তুমি মনে ভাব তাপ ||
আমি বলি পদ্মাবতী যদি চাহে শিব |
আপনে জীয়াইতে পারে শঙ্করের জীব ||
বিষাদ ভাবিয়া দেবী এড়িল ক্রন্দন |
পদ্মা নাহি জীয়াইবে কোনজন ||
এতেক বলিয়া দেবী এড়িল ক্রন্দন |
নারদ মুনি পাঠাইয়া দিল ততক্ষণ ||
মুষল বাহনে নারদ চলে শীঘ্রগতি |
ত্বরিতে মিলিল গিয়া যথা পদ্মাবতী ||
নারদকে দেখিয়া পদ্মা বলে ভাই |
বিনয় করিয়া আসনে দিল ঠাঁই ||
নারদ বলেন দিদি আসনে কার্য নাই |
তোমার কারণে মোরে পাঠাইছেন গোসাঞি ||
বিষ খাইয়া ঢলিয়াছেন দেব ত্রিলোচন |
শিবের চৈতন্য  করিতে চল এইক্ষণ ||
নেতা বলে এখনই চল বিষহরি |
মাধবরথ তোমারে দিলেন শ্রীহরি ||
নেতার বচনে পদ্মা করিল মতি |
নারদের সঙ্গে নেতা চলিল শীঘ্রগতি ||
কার্যের গৌরবে পদ্মা চলিয়াছে ঝাটে |
আঁখির নিমেষে গেল মহাদেবের নিকটে ||
পদ্মারে দেখিয়া দেবী হাসেন কুতূহলে |
ঝি ঝি বলিয়া পদ্মারে নিল কোলে ||
যতেক দেবগণ হইয়া আগুসার |
মধুর বচন স্তুতি করে মনসার ||
এ শব শুনিয়া পদ্মা চিন্তিল কারণ |
শিব চৈতন্য করিতে বসিল তখন ||
বিজয় গুপ্ত বলে গাইন ভাব পদ্মাবতী |
পয়ার এড়িয়া বল লাচারির গীতি ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

১৫

দেখিয়া শিবের গতি                      শোকান্বিত পদ্মাবতী
চন্ডীরে ভর্ৎসিয়া কহে বাণী |
অন্যে দুঃখ দিতে গেলে                দুঃখ হয় আপন কপালে
ঘটে ইহা জানিও পার্বতী ||
তোমার কার্যের ফলে                        মৃত্যুঞ্জয় ধরাতলে
মৃতপ্রায় আছেন পড়িয়া |
কি কহিব হায় হায়                      শোকে প্রাণ যায় যায়
শিব দেখি বিদরিছে হিয়া ||
দেখিয় পিতার মুখ                          বিদরে আমার বুক
তব দোষ পাসরিনু মনে |
পিতারে বাঁচাই আমি                      সাক্ষাতে দেখহ তুমি
কোপ না করিও আর মনে ||

.                                                               ****************                                                   
সূচি...    


মিলনসাগর
*
সুখেতে ইন্দ্র করে পুরীতে প্রবেশ |
মঙ্গল করিল ইন্দ্র অশেষ বিশেষ ||
তীর্থ জল দিয়া ইন্দ্র করিলেক স্নান |
রাজযোগ্য বস্ত্র যত করিল পরিধান ||
সিংহাসনে আরোহণ করিলা পুরন্দর |
কমলারে ভক্তি অতি করে সুরেশ্বর ||
নমো নমো মহেশ্বরী জগতের মাতা |
না বোঝে তোমার শক্তি হরিহর ধাতা ||
তুমি সন্ধ্যা গায়ত্রী তুমি সরস্বতী |
মহাবিদ্যা জান তুমি দেবী ভগবতী ||
তুমি যাহারে সৃষ্টি কর সেই যে গুণবান |
সেই সে কুলীন ধন্য সেই যে প্রধান ||
নির্গুণ পুরুষে যদি কর দৃষ্টি পাত |
বৃহস্পতি শুক্র হয় তাহার সাক্ষাৎ ||
শুনিয়া ইন্দ্রের স্তব লক্ষ্মীর কৌতুক |
মূর্তিমতী হইলা লক্ষ্মী ইন্দ্রের সন্মুখ ||
পরিচয় মাগহ ইন্দ্র তুমি মাগ বর |
শুনিয়া লক্ষ্ণীর বাক্য বলে পুরন্দর ||
সহস্রাক্ষ হউক মোর সকল ভবন |
কোনকালে না ছাড়িও আমার সদন ||
এইরূপে বর তারে দিলেন কমলা |
সেইরূপে লক্ষ্মীমাতা ইন্দ্রেরে বর দিলা ||
যেই জন শুনে এই অমৃত কথন |
ইন্দ্রের সমান সুশ্রী হয় সেই জন ||
যাহাদের সদনে এই গীতের প্রচার |
কোনকালে লক্ষ্মী না ছাড়ে তাহার ||
নায়কের কোঙর হউক চিরজীবী |
পুত্র পৌত্র সুখে থাকুন পৃথিবী ||
তাহার পুরুক আশা যত মনোরথ |
পরমায়ু হোক তার অষ্টোত্তর শত ||
সেই লক্ষ্মী তাহারে হউক অভিলাষ |
তাহার বিপক্ষ যত পাউক বিনাশ ||
যাবৎ পৃথিবীতে থাকেন চন্দ্রাদিত্য |
উদয়ন শ্রী তোমার হউক নিত্য নিত্য ||
ভণে কবি কর্ণপুর বিষহরির দাস |
যাহার প্রসাদে হইল গীতের প্রকাশ ||
বিজয় গুপ্ত রচে পুথি মনসার বর |
অমৃত মথন পালা এইখানে সোসর ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা



কোথায় নিধি পাইলা                  আমায় এড়িয়া গেলা
ভোগে শোকে শরীর বিরস |
জল যদি নাহি খাও                    খালি দুধ পিয়ে যাও
দন্তে আজু না খাইবে ঘাস ||
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

            ৪
বিদগ্ধ জনের ঠাঁই করিলাম অঞ্জলি |
মন দিয়া শুন কিছু সরস পাঁচালী ||
যেরূপে ইন্দ্রেরে শাপ দিল মহামুনি |
এমত অদ্ভুত কথা কভু নহে শুনি ||
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

        ৮
শুনিয়া মুনির শাপ আসিল পুরন্দর |
যোড়হস্তে স্তুতি করে মুনির গোচর ||
মুনি বলে মোরে আগে করিলা লাঘব |
কপট প্রবন্ধে এখন মোর কর স্তব ||
চল চল পুরন্দর আপনার পুরী |
চতুর জনার সঙ্গে না কর চাতুরি ||
শাপ দিয়া এখন না পারি ঘুচাইবার |
আমা হইতে কোন কার্য না হবে তোমার ||
তোমার চরণে গোসাঞি করিলাম অপরাধ |
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

অমৃত মথন পালা

          ১৬
নির্জনে বসিল গিয়া শিব লইয়া কোলে |
জয় জয় করিয়া দেবতা সব বলে ||
শুনিয়া দেবের স্তুতি বিষহরি বশ |
মন্ত্র পড়িয়া দিল ঔষধের রস ||
কানেতে কহিয়া মন্ত্র দিল ততক্ষণ |
এই পাতায় কোনো ভুল-ত্রুটি চোখে পড়লে অথবা যদি
কোথাও ভুল বলে মনে হয়, তাহলে আমাদের এই ইমেলে
জানাবেন। আমরা শুধরে নেবার চেষ্টা করবো।
srimilansengupta@yahoo.co.in