| রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য |
| রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের সূচি |
| আচম্বিতে বাঘশিশু দেখিল তখন | চিনিতে নারিল সেই দৈবের কারণ || নকুলের ছানা বলি বান্ধিল বসনে | মনে কর অন্ন খাব পোড়ায়্যা আগুনে || বাঘশিশু বান্ধিয়া চলিল উভমুখে | জলঝারি রাজার সমুখে লয়্যা রাখে || মৃগয়া বিহনে রাজা মনে দুখ পায় | রামকৃষ্ণ বলিয়া ভূপতি জল খায় || হেনকালে পাট ঘোড়া জুড়িল হেঁসনি | বসন চিরিয়া বাঘ নিঃসরে আপনি || ফিরিয়া আরার করে মনুষ্যের পারা | মন হৈল চঞ্চল নেহারে চারিধারা || শিকার পাইয়া রাজা মনে সুখ পায় | কোলে নিয়া বাঘশিশু তবে জল খায় || পুনরপি পাট ঘোড়া জুড়িল হেঁসনি | বাঘেরে চাহিয়া কিছু বলে নৃপমণি || রাজা বলে এই ভাব পুত্রের সমান | অন্তঃকালে আমারে করিবে পিন্ডদান || এত বলি বাঘশিশু রাজা নিল কোলে | চড়িয়া হাথির পৃষ্ঠে নিজালয়ে চলে || চারিদিগে তুরঙ্গ সিফাই সাজোয়াল | সঘন দুন্দুভি বাজে জরপ রসাল || নিজালয়ে ভূপতি দিলেন দরশন | পাটরাণী-করে তারে কৈল সমর্পণ || পুত্র বলি পালন করিবে নিরন্তর | রাজা বলে এই মোর প্রাণের দোসর || এই কথা সভারে বলিল নরপতি | বাঘের পালন রাণী করে দিবারাতি || অলঙ্কার ভূষণ অনেক দিল গায় | সযতনে তাড়বালা শিশুকে পরায় || নিরবধি মধুর ভারতী শুনি মুঁঞে | সাধ কব়্যা এক দন্ড নাহি রাখে ভূঞে || বাছাধন বলি রাণী দুহাথে নাচায় | মোর বাছা বলিয়া সদাই চুম্ব খায় || ক্ষীরদন্ড সদাই বাঘের মুখে দেন | আদর করিয়া সদা কোলে তারে নেন || নিরবধি বাঘশিশু থাকে রাণীর কোলে | বাহির মহলে সদা লম্ফ দিয়া বোলে || এইরূপে জালালশিখর বাঘ পালে | দুই কানে সুবর্ণ মাণিক মোতি জ্বলে || ধর্মের আজ্ঞায় ধর্মের দাস গায় | আসর সহিত ধর্ম হবে বরদায় || একদিন ভোজনে বস্যাছে মহারাজা | ঝালে ঝোলে ব্যঞ্জনে খাসির মাংসভাজা || এমন সময় তথা বাঘ দেখা দিল | পুত্রের দ্বিগুণ ভাবে রাজা কোলে নিল || বাঘশিশু কোলে লয়্যা মনের কৌতুকে | মাংসভাজা ঐমনি তাহার দিল মুখে || মাংসভাজা খায়্যা বাঘ ভাবে মনে মনে | দৈবহেতু আহার চিনিনু এতদিনে || ক্ষীর খন্ড খাই আর চিনি চাঁপাকলা | সকল অসার মনে করে বাগবালা || বনপশু হয়্যা আমি মনুষ্যের ঘরে | অনুভবি কল্পনা জাতের ধর্ম ধরে || দন্ত কড়মড়ি বাঘা দেই ঘনে ঘন | কাছাড়িয়া নরপতি ফেলিল তখন || প্রাচীরে উঠিল বাঘ মনে হয়্যা ত্বরা | প্রথমে ধরিয়া খায় খোপের পায়রা || জোড়ে জোড়ে হাঁস খায় জোড়ে জোড়ে খাসি | পুখুরঘাটেতে খায় পরম রূপসী || গোঠে ধরে গোপন বালক ধরে গনে | চাঁপাকলা চিনি পারা পেলায় বদনে || ঘাড় ভাঙ্গ্যা খায় সব পুষনিয়া পাখি | দেউটির সমান জ্বলিছে দুই আঁখি || জালান্দার গড়ে হৈল বাঘের জঞ্জাল | প্রজামুখে বারতা পাইল মহীপাল || রাজা বলে পঞ্চ পাত্র বাধ বন্দী কর | ক্ষীরোদ মন্থনে যেন বিষ অনুসর || রাজার বচন শুনি মহাপাত্র কয় | বাঘটি পুষিলে তুমি কার্য ভাল নয় || নাগচন্দ্র ভূপতি শুন্যাছি ইতিহাস | শার্দূল কারণে তার হৈল সর্বনাশ || পাঁচপুত্র বাঘে খাইল আর তিন নাতি | অরুন্ধতি অনুরাধা বংশে দেয় বাতি || বাঘ বন্দী কর রাজা বলিল বচনে | দশা গুণে বাঘ শিশু বাড়ে দিনে দিনে || লৌকিক বচন আছে লিখিল পুরাণে | পালিলে বনের বাঘ পেষ নাহি মানে || রাজা দিল হুকুম লোহার খাঁচা আনে | দশ জনে লয়্যা যায় বাঘটি যেখানে || তেমাথা গনেতে বাঘ পড়িয়া ঘুমায় | সমুখে রাখিল খাঁচা অজা ঐরি তায় || নিদ্রা ভাঙ্গি বাঘ উঠে যেন সিংহবর | অজা ঐরি দেখে তবে খাঁচার ভিতর || লোভ হেতু মহাপাপ পাপে মৃত্যু হয় | প্রবেশ করিল খাঁচা শুন মহাশয় || অজা ঐরি একবারে সমুখে তাহার | দুয়ারে কুলুপ দড় দিলেক লোহার || তিন সাঙ্গে বাঘটি তুলিয়া তবে নিল | ভূপতির আজ্ঞা পায়্যা দলজে রাখিল || চরণে নূপুর নিল শ্রবণের সোনা | বিংশতি গাভীর দুগ্ধ সব হৈল মানা || ঐমনি লোহার খাঁচা ভাঙ্গিবারে চায় | দেবতার গরন কেমনে ভাঙ্গা যায় || দশদিন উপবাসী বাঘ কামদল | দৈবযোগে বান্ধা গেল সাগরের জল || পীযুষ মথনে বলে হলাহল উঠে | অনাহারী শার্দূল অঙ্গের বল টুটে || তবে রাজা জাল্লালশিখর ভাগ্যবান | একাদশী দিনে তার নাহি জলপান || . বাঘজন্ম পালার পরের পৃষ্ঠায় . . . . এই পাতার উপরে . . . মিলনসাগর |
