| রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য |
| রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের সূচি |
| এইজন বিন্ধিল লোহার গন্ডাবর | আমি থাকি রণস্থলে তুমি যাহ ঘর || এত শুনি সত্বর কানড়া রূপবতী | অন্তঃপুর পাইল যেখানে হৈমবতী || কালু বীর দিল ঘন ধনুকে ঠঙ্কার | ধুমসী দাসীর কাছে বলে মার মার || অবনী আকাশ হৈল একাকার শর | ভঙ্গ দিল ধুমসী বাতাসে করি ভর || দেখা দিল সত্বর কানড়া বিদ্যমানে | জয়দূর্গা বাশুলি বসিয়া সেইখানে || নবীন অসুর যেন রণে অবতার | কানড়ার চরণে বলিল সমাচার || সহিতে নারিল আমি ভঙ্গ দিল রণে | পর্বত পাথর কাঁপে কালুর পাটনে || হেনবেলা কানড়া দেবীর পড়ে পায় | দেবী বলে শুন বেটী ইহার উপায় || বন্দী যদি বীর কালু মায়ারূপে হয় | এই দন্ডে লাউসেনে পাইবে নিশ্চয় || চিড়া মুড়ি ধন রাখ দক্ষিণ দুয়ারে | পরিপূর্ণ রামরস রাখিবে প্রকারে || এহার উপায় আদ্য কয়্যা দিল আমি | ঘুড়ি চড়্যা এখনি ভেটিতে যাবে স্বামী || মিথ্যা নহে মোর বাক্য জানে সর্বজন | গোপিনী দিলেক পূজা পাইল নারায়ণ || এত শুনি কানড়া কুমারী তড়বড়ি | দুয়ারে রাখিল ধন চিড়া আর মুড়ি || রামরস পরিপূর্ণ রাখিল কলসে | ঝিলি নাড়ু চিড়াভাজা মুড়কি সন্দেশে || সারি সারি সমুখে সুন্দর অনুশীল | দূর করে দাসী তবে কপাটের খিল || প্রবন্ধ কুটিল মনে সেখানে লুকায় | কালু বীর চিড়া মুড়ি দেখিবারে পায় || বিষ্ণুপদতলে দেখে দ্বিপ্রহর বেলা | মনে করে কলু বীর শুখায়েছে গলা || দয়াময় বিধাতা মনের সাধ দিল | রাধাকৃষ্ণ বলি বীর সেখানে বসিল || চিড়াভাজা মুড়ি পাইল ঝিলি নাড়ু তায়| সদ্য মকরন্দ বলি ধীর কলা খায় || গঙ্গা নারায়ণ বলে দেখি রামরস | বিক্রমপুরে বাশুলি সঙরে বার দশ || শিব শিব বলি বীর রামরস খায় | আদ্য রস জন্মিল গুণ পায় || মন হৈল চঞ্চল মদনে মন মজে | সমাচার আপনি ঝিনঝিন বাদ্য বাজে || আরক্ত লোচন ঘোর আপনি উজ্জ্বল | সর্বতনু কাঁপে যেন পত্র চলদল || সুবর্ণের ভাজনে সমুখে দেখে ধন | মনস্তাপ করে কালু ডেমের নন্দন || এই ধন হেতু আমি পরের চাকর | এ ধন লয়্যা আমি ফিব়্যা যাব ঘর || ব্যর্থ তার জীবন যাহার ধন নাঞি | লঘুবর্ণ ধনহেতু দরবারে বড়াঞি || অন্য লোক ঘোড়া চড়ে জামাজোড়া গায় | যেখানে সেখানে কড়ি আপনি ছড়ায় || পরের অধীন আমি এই ধন হেতু | ধন হেতু সমুদ্র বান্ধিতে চায় সেতু || অন্য বর্ণ বচনে সদাই উঠি বসি | ধন হৈতে ঘরে পরিপূর্ণ বারাণসী || এত বলি ধনুকে ধনের ভার বান্ধে | বাড়ীকে চলিল কালু তুলি বাম কান্ধে || ঈষত মাতাল কালু সমাচার রসে | পাছু হৈতে তখন ধুমসী দাসী হাসে || ডাক দিয়া বলে কালু পাপে মন দিলি | কোন পাপে ধনকড়ি কান্ধেতে তুলিলি || এত বলি পশ্চাত ধরিল বাম করে | মায়ারূপে বন্দী কালু হৈল বন্দীঘরে || ধুমসী দেবীর পায় করে নিবেদন | অন্তঃপুরে কালু বন্দী হইল এখন || এত শুনি ভবানী কন্যার মুখে চান | শুন ঝিএ কানড়া প্রবন্ধ বলি আন || তোমার জীবন ধন আসিব এখনি | লাউসেন দেখিবে ময়নার নৃপমণি || এত বলি ভবানী হাসেন খলখল | তরুতলে তুরঙ্গে লাউসেন বীরবল || যেই পথে বীর কালু কৈল ময়দান | সেই গনে রাউতের ঘোড়ার পয়ান || জোড়াশিঙ্গা সঘনে কাড়ায় কাঠি পড়ে | দেখা দিল লাউসেন সিমুল্যার গড়ে || সিমুল্যায় সত্বর দিলেন দরশন | ডাক দিয়া বলে অশ্ব করি আরোহণ || কেবা আছে এ গড়ে শঙ্কর দশভূজা | বাজিপৃষ্ঠে বর মাগে লাউসেন রাজা || কেবা আছে এ গড়ে রাজার সৈন্য হানে | রণ মাগে লাউসেন তার বিদ্যমানে || বসন্তে কোকিল যেন শব্দ করে ডালে | জয়দূর্গা কানড়া শুনিল হেনকালে || ভবানী বলেন ঝিএ শুন মন দিয়া | উপদেশ বাক্য বলি তোরে বিবরিয়া || আমার বচন শুন কানড়া সুন্দরী | আরোহণ কর ঘুড়ি কালিনী পাখরি || হেত্যার বান্ধিয়া যাবে রাউতের বেশে | নাম কয়্যা পরিচয় পূর্ণ কলারসে || তবে যদি তম গুণি বিনয় বচনে | আমি গিয়া তোর বিভা দিব মাঝরণে || এত শুনি কানড়া মরমে উল্লসিত | রূপবাম ফকির ধর্মের গায় গীত || জরি জামাজোড়া বান্ধে বত্রিশ হেতার | কানড়া কুমারী সাজে যম অবতার || কালিনী পাখরি ঘুড়ি করে আরোহণ | সেনের উদ্দেশে রামা করিল গমন || দড়বড় লাউসেন সমুখে দেখা দিল | কানড়া দক্ষিণ করে জোহার করিল || জোড়হাতে কানড়া ঘুড়ির পিঠে রয় | সুবর্ণ কঙ্খণ শোভা দেখি সুধাময় || লজ্জাভাবে হেঁটমুখ রাউত সমুখে | জিজ্ঞাসেন লাউসেন দুই হাথ বুকে || কোন বর্ণ কহিবে তোমার কিবা নাম | এ গড়ে এমন কেবা করিল সংগ্রাম || বনিতা আকার দেখি পুরিষের বন্ধ | বচন শুনিল কিবা সুধা মকরন্দ || পরিচয় দেহ আগে তুমি কোন জন | জোড়হাথে কানড়া করিল নিবেদন || তোমার চরণে গোসাঞি শতেক প্রণাম | পরিচয় কহিল কানড়া নিজ নাম || ঈশ্বরী করিল পূজা তোমার কারণ | নয়নে দেখিতে তব রাতুল চরণ || তোমার বনিতা আমি তুমি মোর স্বামী | বৈশাখে দেবীর পায় পূজা দিল আমি || মনে সাধ তোমার গলায় দিব মালা | বাশুলি করিব পূজা দিয়া পূর্ণ ডালা || এত শুনি লাউসেন কর্ণে দিল হাথ | তিনবার স্মরণ কৈল জগন্নাথ || শিশুকাল হৈতে আমি ধর্মের তপসী | রাজার সম্বন্ধে তুমি মোর হও মাসী || হাথে সূতা বান্ধিলে অর্ধেক বিভা হয় | সতীর বচন আছে সর্বলোকে কয় || আমার বচন শুন কানড়া রূপসী | রাজার সম্বন্ধে তুমি হও মোর মাসী || রাজাকে বরণ দিলে হবে পাটরাণী | আমি তোমার আজ্ঞাকারী এই মনে জানি || ভানুমতী মহিষী তোমার হব দাসী | আমি কোন ছার তুমি সাক্ষাত উর্ব্বশী || কানড়া বলেন গোসাঞি তুমি মোর পতি | তুমি আমার ইহকাল পরকাল গতি || তুমি যদি হানিলে লোহার গন্ডাবর | চল যাই দুইজনে ময়না নগর || যেজন হানিব গন্ডা সেই মোর পতি | কিবা রাজা কিবা প্রজা কিবা অধিপতি || আজি হৈতে আপনি মাথার হৈবে ছাতা | নহে অনুমৃতা হব লয়্যা তোমার মাথা || এক তীরে এখনি পাঠাব যমঘর | নতুবা আনন্দ মনে হবে সয়ম্বর || ধনুকে টঙ্কার দিয়া জুড়িলেক শর | ঘুড়ি দেখি নাচে ঘোড়া অন্ডির পাখর || ঘোড়া বলে ঘুড়ি লো রাউতি পেল ভূঞে | হিসনি ফান্দনি পরিবন্ধ মুঞে মুঞে || আগানি পাছানি কথা কয় কানে কানে | কুরঙ্গ নয়নী কালি পাখরি বাখানে || তুমি পেল রাউতানি রাউত আমি পেলি | দেশান্তরে দুজনে করিব গিয়া কেলি || রাউত পেলিতে ঘোরে হিসনি ফান্দনি | তখন অশ্বের কানে কহিল অশ্বিনী || তুমি আমার পরাণ পাশ্চাত পাবে মন | লাউসেন কানড়া বিভা করিব এখন || ঘুড়ির বচন শুনি মন করে স্থির | কানড়া কুমারী হাসে লাউসেন বীর || . ****************** . কানড়াবিভা পালার পরের পৃষ্ঠায় . . . . পাতার উপরে . . . মিলনসাগর |
