| রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য |
| রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের সূচি |
| রাম না দেখিয়া রাজা দশরথ মৈল | কর্ণসেন পিতা প্রতি সেইরূপ হৈল || প্রথম পউসে মুন্ডে পড়িল বজ্জর | কর্পূর কান্দিয়া গেল জননীর ঘর || কর্পূর বারতা বলে কান্দিয়া কান্দিয়া | লাউসেন দাদা মৈল ঢেকুর যুঝিয়া || যাহার কারণে তুমি শালে দিলে ভর | হেন লাউসেন মৈল ঢেকুর ভিতর || এতদিন রাজত্ব বিধাতা হৈল বাম | রাজমোহে মাতিল না গণে পরিণাম || রঞ্জাবতী শুনিঞা কাছাড় খায়্যা পড়ে | রহায় হায় শব্দ হৈল ময়নার গড়ে || পথে ঘাটে লোক যত করে কানাকানি | কেহ বলে রাজার মহলে কিবা শুনি || খসিয়া পড়িল বলে পর্বতের চূড়া | আনে বলে কর্ণসেন হৈল আঁটকুড়া || রাজার ভবনে বড় হৈল অমঙ্গল | রঞ্জাবতী পুত্রশোকে সহজে বিকল || বদনে বদন দিয়া বলে পরিতাপ | না দেও উত্তর কেন লাউসেন বাপ || শোকে হয়্যা পাগল বিরূপ বাক্য বলে | আমি মরি তুমি থাক আমার বদলে || উরসে আঘাত হানি বলে হায় হায় | ব্যাকুল হইয়া শোকে গড়াগড়ি যায় || ভুজঙ্গ ব্যাকুল যেন হারাইয়া মণি | মদনে হারায়্যা যেন পাগল রুক্মিণী || কল্যাণী মাণিকী দাসী মুখে জল দিল | রঞ্জাবতী বলে কোথা লাউসেন গেল || জোড়হাথে কর্পূর করিল নিবেদন | সকল ছাড়িয়া সার কর নারায়ণ || শিশু অভিমুন্যু মৈল কুরুক্ষেত্র রণে | রামের ভগিনী প্রাণ ধরিল কেমনে || আপনি সারথি যার সেই মায়াধরে | ষোল বত্সরের শিশু আজি কেন মরে || উত্তরা বঞ্চিত হৈল প্রথম যৌবনে | দয়ার ঠাকুর হরি কত খেলা জানে || সুধন্বা পড়িল রণে কৃষ্ণের সমুখ | অভাগিনী জননী কেমনে ধরে বুক || একদন্ড সময় ব্রহ্মার আজি কালি | কোথা গেল রাবণ কেমনে মৈল বালী || কিছু নহে সংসার গণিয়া দেখ মনে | যাবকে পাবক যেন নিশির সপনে || রাজার হুকুম দড় গোউড় শহরে | মুন্ড দরশনে যেন চারি রাণী মরে || বিধবা রমণী বলে রাখিবারে নাই | বারতা বলিতে চাই কলিঙ্গার ঠাঁই || এত শুনি রঞ্জাবতী উঠিয়া বসিল | কলিঙ্গা রাণীর ঘরে দরশন দিল || রঞ্জাবতী বলে শুন আমার বচন | অজয়া যুঝিয়া মৈল তোর প্রাণধন || এত বলি মুন্ড দিল কলিঙ্গার আগে | রাজার বচন শুনি মনে ভয় লাগে || আম্রডাল ভাঙ্গিল রাউতি চারিজন | বদনে ঈষত হাসি মধুর ভাষণ || রাম নারায়ণ হরি বলে উভরায় | কোনখানে কি রহিল ফিব়্যা নাহি চায় || গুপিনী হারাল্য কৃষ্ণ এই গীত গান | সাঙ্গাতিনী সই কান্দে অঝোর নয়ান || কাঞ্চন কাকই কেহ দেই তার চুলে | কেহবা তাম্বুল দেই বদনকমলে || জোড়হাথে কেহবা আশিষ মাগ্যা লয় | কান্দা কান্দা কপালে সিন্দুর কেহ দেয় || চারি সতী আনন্দে চড়িল চতুর্দোলে | অনুমৃতা হত্যে যান কালিনীর কূলে || চন্দ্রমুখী কলিঙ্গা ছড়ায় খই কলা | বাহিরিয়া দেখে লোক বিধাতার খেলা || কালিনী গঙ্গার ঘাটে দিল দরশন | হরিগানে তান্ডব করিল সতীগণ || নির্মাণ করিল কুন্ড কর্পূর পাতর | পতঙ্গ সমুখে বহ্নি উঠিল অম্বর || গঙ্গাস্নান করে তবে এ চারি রাউতি | রাঙ্গা শঙ্খ রাখিয়া দুকূলে দিল বাতি || কুন্ডের সমুখে সতী দিল দরশন | অগ্নিপূজা করিল রাউতি চারিজন || সাতবার প্রদিক্ষণ শাস্ত্রের বিহিত | তিনবার প্রদিক্ষণ করিল তুরিত || পরম সুন্দরী সব সদা হাস্যমুখে | অসতী বিলাপ করে সংসারের সুখে || ঝাঁপ দিতে আগুনে সাহস বড় মনে | হেনবেলা বৈকুন্ঠে জানিলা নিরঞ্জনে || রাখিবারে রাউতি ধাইলা মায়াধর | ধাওাধাই পাইল রাজ্য ময়না নগর || কত দূরে দেখিলা কলিঙ্গা শশিমুখী | সীতাকে রাখিতে যেন ধাইল বাল্মীকি || ব্রাহ্মণের রূপে দেখা দিলা নিরঞ্জন | দন্ডবত করিল রাউতি চারিজন || আশীর্বাদ করিলা যুগের যুগপতি | পাটরাণী কলিঙ্গা হইবে পুত্রবতী || কানড়া কুমারী হবে সাত পোএর মা | এত শুনি চারিজনার মুখে নাঞি রা || কলিঙ্গা সুন্দরী শুনি বিপ্রের বচন | অভয় চরণযুগে করে নিবেদন || নিজ দুঃখ বলিতে নয়ানে খসে লো | প্রাণনাথ মরিল কেমনে হবে পো || মরিল আমার স্বামী ঢেকুর ভিতরে | কালি সমাচার আইল মুন্ড দেখ করে || মৃত্যুকাল সমুখে এমন আশীর্বাদ | অলঙ্ঘ বিপ্রের আজ্ঞা এ বড় প্রমাদ || বিধবার পুত্র হৈল ব্রাহ্মণের বরে | সূর্যবংশে ভগীরথ বিদিত সংসারে || যার কীর্তি জাহ্নবী জগতপূর্ণ যশ | পুরাণে এ সব সাক্ষী শ্রবণে সরস || বাদ করে এহাতে এমন কেবা আছে | বলিতে বলিতে তার বাম আঁখি নাচে || ঠাকুর বলেন সতী শুন সমাদরে | মোর মনে লয় তোর স্বামী নাঞি মরে || হেন কার্য করহ লাজের মাথা খায়্যা | কীর্তনে তান্ডব কর বড় ঘরের মায়্যা || দরিদ্র ব্রাহ্মণ আমি নবদ্বীপে ঘর | ভিক্ষা হেতু গিয়াছিলু ঢেকুরের গড় || দেখিল ইছাই ঘোষ বড়ই কৃপণ | গোয়ালা বর্বর জাতি বড় অভাজন || অভিশাপ দিলু তারে অজয়ার পার | দেখা হৈল বীর কালু লাউসেনকুমার || না বলিতে ভিক্ষা দিল মাণিক অঙ্গুরী | হয় নয় চায়্যা দেখ রাজার সুন্দরী || অঙ্গুরী দেখিল হাথে সূর্যের উদয় | কেহ বলে সেই বটে কেহ বলে নয় || হেঁটমুখে রহিল কলিঙ্গা চন্দ্রমুখী | রামের অঙ্গুরী যেন পাইল জানকী || শশিমুখী সুন্দরী অন্তরে অনুমান | কানড়া বলেন দিদি কর অবধান || সুবর্ণ সুরত কুলে কালি পাছে দেও | পরিণাম উদ্ধার করিয়া বন্য লেও || দয়া করি বলেন ঠাকুর চক্রপাণি | পুনরপি শুন গো কলিঙ্গা পাটরাণী || কদাচিত না মরে তেমার প্রাণনাথ | নেহালিয়া দেখ বাম হাথের আয়াত || লোহাটা বজ্জর মৈল বীর কালুর রণে | তার মুন্ড আস্যাছিল গোউড় ভুবনে || পুনর্বার পাটরাণী চল অন্তঃপুর | এতখানি করে তোর মাতুলশ্বশুর || লোহাটা বজ্জের মুন্ড জৌয়ের নির্মাণ | পাবকে রাখিয়া সতী দেখ সাবধান || এখনি গলিত হব পাবক পরশে | প্রভুর ভারতী শুনি সতী সব হাসে || হেন ছার বচনে প্রত্যয় কেবা যায় | নাচিতে নাচিতে সতী কৃষ্ণগুণ গায় || . ****************** . অনুমৃতা পালার পরের পৃষ্ঠায় . . . . পাতার উপরে . . . মিলনসাগর |
